মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের শ্রেষ্ঠ সোপান হল পবিত্র রমজান মাস। এটি কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির তরে নিজের প্রবৃত্তি ও চাহিদাকে বিসর্জন দেওয়ার এক অনন্য ইবাদত। হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই মাসের অসংখ্য ফজিলত ও সিয়াম পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।
সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ তাআলা পরকালে যেমন সম্মানিত করবেন তেমনি দুনিয়াতেও তাকে গুনাহ মুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা দান করেছেন।
নিম্নে সন্নাহর আলোকে রমজানের ১২ এর ১২টি বিশেষ ফজিলত তুলে ধরা হল:
✪ ১. রোজার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজে দেবেন:
আল্লাহ তাআলা রোজাকে নিজের জন্য খাস করেছেন এবং এর প্রতিদান তিনি নিজেই দেবেন।
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
«كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ»
“আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, শুধু রোজা ছাড়া। কারণ রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ২. পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা:
রমজানের রোজা গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্ববর্তী সকল (সগিরা বা ছোট) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহি]
✪ ৩. রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর নিকট প্রিয়:
রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে অতি পছন্দনীয়। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ»
“সেই সত্তার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশক আম্বরের ঘ্রাণ অপেক্ষাও অধিক সুগন্ধিময়।” [সহিহ বুখারী]
✪ ৪. এক রমজান থেকে অন্য রমজান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মিটিয়ে দেয়:
আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ، وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ»
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে অন্য জুমা এবং এক রমজান থেকে অন্য রমজান—এদের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়।” [সহিহ মুসলিম]
✪ ৫. রাইয়ান নামক বিশেষ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ:
জান্নাতে প্রবেশের জন্য রোজাদারদের জন্য স্বতন্ত্র ভিআইপি গেট থাকবে। তারা সেখান দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
প্রখ্যাত সাহাবি সহল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ، يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، يُقَالُ: أَيْنَ الصَّائِمُونَ؟ فَيَقُومُونَ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ»
“জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা আছে। কেয়ামতের দিন কেবল রোজাদাররাই সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে—রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে, ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে ঢুকতে পারবে না।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ৬. জাহান্নাম থেকে মুক্তি:
রমজানে প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«إِنَّ لِلَّهِ عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءَ، وَذَلِكَ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ»
“নিশ্চয় ইফতারের সময় আল্লাহর নিকট অনেক জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা থাকে। আর এমনটি (রমজানের) প্রতি রাতেই ঘটে থাকে।” [ইবনে মাজাহ; আল্লামা আলবানি একে সহিহ বলেছেন]
✪ ৭. দ্বিগুণ আনন্দ:
রোজাদারের জন্য দুটি বিশেষ মুহূর্ত অত্যন্ত আনন্দদায়ক। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَلِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا: إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ بِفِطْرِهِ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ»
“রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে যা তাকে আনন্দিত করে: যখন সে ইফতার করে তখন ইফতারের কারণে আনন্দিত হয়, আর যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তার রোজার কারণে আনন্দিত হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ৮. দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা:
ইফতারের সময় রোজাদারের দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
«ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ، وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللَّهُ فَوْقَ الْغَمَامِ…»
“তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: রোজাদার ব্যক্তি যতক্ষণ না সে ইফতার করে, ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং মজলুমের (অত্যাচারিতের) দোয়া। আল্লাহ তাআলা সেই দোয়া মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেন..।” [তিরমিজি; ইমাম তিরমিজি একে হাসান এবং আল্লামা আলবানি সহিহ বলেছেন]
✪ ৯. হাশরের ময়দানে সুপারিশ:
রোজা ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يَقُولُ الصِّيَامُ: أَيْ رَبِّ، مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ، وَيَقُولُ الْقُرْآنُ: مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ، قَالَ: فَيُشَفَّعَانِ»
“রোজা এবং কুরআন কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে: হে আমার রব! আমি তাকে দিনে খাবার ও প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কুরআন বলবে: আমি তাকে রাতে ঘুমানো থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” [আহমদ; মুহাক্কিকগণ একে সহিহ বলেছেন]
✪ ১০. ঢাল স্বরূপ সুরক্ষা:
রোজা দুনিয়াতে গুনাহ থেকে এবং আখেরাতে আগুন থেকে রক্ষা করে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ»
“আর রোজা হল (জাহান্নামের আগুন ও গুনাহ থেকে বাঁচার) ঢাল।” [মুত্তাফাক আলাইহি]
✪ ১১. জাহান্নাম থেকে ৭০ বছরের দূরত্ব:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَا مِنْ عَبْدٍ يَصُومُ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا بَاعَدَ اللَّهُ بِذَلِكَ الْيَوْمِ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا»
“যে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক দিন রোজা রাখবে আল্লাহ সেই একদিনের বিনিময়ে তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের পথ দূরে সরিয়ে দেবেন।” [সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম]
✪ ১২. রোজাদার এবং জাহান্নামের মাঝে আসমান ও জমিনের দূরত্ব সমান খন্দক তৈরি করা হবে:
প্রখ্যাত সাহাবি আবু উমামা আল বাহিলি (রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ خَنْدَقًا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় (সন্তুষ্টির জন্য) একদিন রোজা রাখবে, আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝখানে আসমান ও জমিনের দূরত্বের সমান একটি পরিখা তৈরি করে দেবেন।” [তিরমিজি; ইমাম তিরমিজি একে হাসান সহিহ এবং আল্লামা আলবানি হাসান সহিহ বলেছেন]
রমজানের এই রহমত ও মাগফিরাতের বসন্তকে কাজে লাগিয়ে আমরা যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে সিয়াম পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
وَصَلَّىٰ اللهُ وَسَلَّمَ وَبَارَكَ عَلَىٰ نبينا مُحَمَّد، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أجمعين، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
জুবইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব
No comments:
Post a Comment