‘আল্লাহ-আল্লাহ’ ও ‘হু-হু’ জিকির: বিদআতি পীর ও ভ্রান্ত সুফিদের মনগড়া জিকির:
– শাইখ আব্দুর রাজ্জাক বিন আব্দুল মুহসিন আল বদর (হাফিযাহুল্লাহ)
“এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, বিভ্রান্ত কিছু পীর ও তাদের অনুসারীরা জিকিরের ফজিলতকে নিজেদের মনগড়াভাবে তিন ভাগে ভাগ করে থাকে:
✪ ১. সাধারণ মানুষের জিকির (ذكر العامة): তাদের মতে এটি হলো “لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ” (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বলা।
✪ ২. খাস বা বিশিষ্টদের জিকির (ذكر الخاصة): যা হলো শুধু “اللهُ، اللهُ” (আল্লাহ, আল্লাহ) বলা।
✪ ৩. খাসুল খাস বা অতি বিশিষ্টদের জিকির (ذكر خاصة الخاصة): যা হলো শুধু “هُوَ، هُوَ” (হু-হু) বলা।
ভ্রান্ত সুফিদের কিতাবগুলোতে এই মনগড়া নিয়মগুলো পাওয়া যায়। তারা মনে করে, আল্লাহর নাম “الله” (আল্লাহ) বা সর্বনাম “هُوَ” (হু) শব্দগুলো শত শত বার আওড়ানোই হলো শ্রেষ্ঠ জিকির। এমনকি তারা গোল হয়ে বসে বিকট শব্দে চিৎকার করে সমস্বরে এই জিকির করে।
হেদায়েতপ্রাপ্ত এক তওবাকারী ব্যক্তি—আল্লাহ তাকে রহম করুন—তার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেন: “আমরা এক বাগানে জড়ো হতাম এবং সবাই মিলে চিৎকার করে ‘হু, হু’ শব্দে জিকির করতাম। আল্লাহর কসম! আপনি যদি দেয়ালের ওপাশে থাকতেন, তবে আমাদের সেই আওয়াজ শুনে ভাবতেই পারতেন না যে এগুলো মানুষের কণ্ঠ! অথচ আমরা তখন মনে করতাম, আমরাই পৃথিবীর সেরা জিকিরকারী।”
❑ শরয়ি জিকির কেমন হওয়া উচিত?
পীরপন্থীদের এই পদ্ধতি স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা। এর প্রতিবাদে একটি মৌলিক কথা হলো: শরিয়তসম্মত জিকির হতে হলে তাকে অবশ্যই একটি পূর্ণাঙ্গ ও অর্থবোধক বাক্য হতে হবে।
কুরআন ও সুন্নাহর জিকিরগুলো খেয়াল করলে দেখবেন, সেগুলো সব পূর্ণাঙ্গ বাক্য এবং তার একেকটি চমৎকার অর্থ আছে:
سُبْحَانَ اللهِ
“আল্লাহ অতি পবিত্র।”
الْحَمْدُ للهِ
“সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।”
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।”
اللهُ أَكْبَرُ
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
أَسْتَغْفِرُ اللهَ
“আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।”
এখন প্রশ্ন হলো, শুধু “আল্লাহ, আল্লাহ” বা “হু, হু” বললে কী অর্থ প্রকাশ পায়? কোনো অমুসলিম যদি সারা দিনে হাজার বারও শুধু “আল্লাহ” শব্দটি বলে, সে কি মুসলমান হতে পারবে? কখনোই না। তাকে অবশ্যই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” নামক পূর্ণাঙ্গ বাক্যটি বলতে হবে। ঠিক একইভাবে জিকিরের ক্ষেত্রেও শুধু নাম নয় বরং পূর্ণ বাক্য বলা জরুরি।
❑ একক নামে জিকির যে বাতিল তার প্রমাণ:
একক নামে জিকির করাকে শ্রেষ্ঠ মনে করা একটি চরম মূর্খতা। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়:
১. তিনি বলেছেন,
أَحَبُّ الْكَلَامِ إِلَى اللهِ أَرْبَعٌ: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ
“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটি: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার।” [সহীহ মুসলিম]
২. তিনি আরও বলেছেন,
لأَنْ أَقُولَ سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ
“সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলা আমার কাছে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।” [সহীহ মুসলিম]
মোটকথা, শুধু “আল্লাহ, আল্লাহ” বলে জিকির করা শরিয়তসম্মত কোনো পদ্ধতি নয়। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ কথা বা বাক্যই নয়। কারণ এর দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ পায় না। এই পদ্ধতিতে না আছে কোনো প্রশংসা, না আছে কোনো সওয়াব।
সুতরাং আল্লাহর শেখানো ও রাসূলের দেখানো পদ্ধতি ছেড়ে পীরদের আবিষ্কৃত এই বিদআতি জিকির কখনোই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।” (সমাপ্ত)
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment