Sunday, February 22, 2026

কথিত শবে বরাতে বিশেষ কিছু ‌ইবাদত-বন্দেগি করা কি শরিয়ত সম্মত

 প্রশ্ন: অর্ধ শাবানের রাতে (কথিত শবে বরাতে) বিশেষ কিছু ‌ইবাদত-বন্দেগি করা কি শরিয়ত সম্মত?

উত্তর: এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কথা হল, কথিত শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন ইবাদত-‌বন্দেগি করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। চাই তা বাড়িতে হোক বা মসজিদে হোক। একাকী হোক বা দলবদ্ধভাবে হোক। (যদিও কতিপয় আলেম মনে করেন এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু তাদের কথা দলিল দ্বারা সমর্থিত নয়।) কেননা এ রাতে ইবাদত করার বিশুদ্ধ কোন দলিল নেই। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে কোন প্রমাণ নেই যে, তারা এ রাতে কোন ধরণের ‌ইবাদত-বন্দেগি করতেন। সুতরাং এটি একটি দ্বীনের মধ্যে একটি সংযোজিত বিদআত। যার পক্ষে কুরআন-সুন্নাহর দলিল নেই এবং সাহাবি-তাবেঈগণেরও এজমা তথা সম্মিলিত কোন সিদ্ধান্তও পাওয়া যায় না। এ রাতে যদি বিশেষ কোন ইবাদত-‌বন্দেগি করা ফজিলতপূর্ণ হত তাহলে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে আমল করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিতেন এবং সাহাবিগণ তা পালনে পিছুপা থাকাটা অকল্পনীয় ব্যাপার। তবে কারও যদি আগে থেকে অন্যান্য রাতে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দুআ, তাসবিহ পাঠ এবং নফল সালাত আদায়ের অভ্যাস থাকে তাহলে সে এ রাতেও তা অব্যাহত রাখতে পারে। কিন্তু আগেও নাই পরেও নাই…হঠাৎ করে এ রাতে উঠে বিশেষ ইবাদত-‌বন্দেগিতে লিপ্ত হতে হলে এ বিষয়ে অবশ্যই রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবিদের আমল থাকতে হবে। অন্যথায় তা বিদআত হিসেবে পরিগণিত হবে।
❑ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.-এর ফতওয়া:
প্রশ্ন: শাবান মাসের ১৫ তারিখ (নিসফে শাবান) রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে কি কোনো সহিহ হাদিস প্রমাণিত আছে? এবং সেই রাতে কিয়াম (ইবাদত) করার ফজিলত সম্পর্কে কি কোনো সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে?
উত্তর:
لا، تخصيص يوم النصف من شعبان بالعبادة، أو الصيام، أو ليلة النصف لا أصل له، بل هو بدعة، الصحيح من أقوال العلماء أنه بدعة، والأحاديث التي فيه ضعيفة، ليلة النصف من شعبان كلها ضعيفة، وبعضها موضوع، لا صحة لها.
“না, শাবান মাসের মধ্যবিত্ত দিনকে (১৫ তারিখ) ইবাদত বা রোজার জন্য নির্দিষ্ট করা, অথবা ১৫ই শাবানের রাতকে (ইবাদতের জন্য) বিশেষায়িত করার কোনো ভিত্তি নেই। বরং এটি একটি বিদআত। ওলামায়ে কেরামের বিশুদ্ধ অভিমত অনুযায়ী এটি বিদআত। এই বিষয়ে যে হাদিসগুলো রয়েছে সেগুলো দুর্বল (জয়িফ)। ১৫ই শাবানের রাত সংক্রান্ত সব হাদিসই দুর্বল। আর তার মধ্যে কিছু তো বানোয়াট (মওজু)- এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।”
❑ শাইখ ইবনে জিবরিন-এর ফতওয়া:
প্রশ্ন: শাবান মাসের মধ্যরাত্রির (১৫ই শাবান) ফজিলত সম্পর্কে কি কোনো হাদিস বর্ণিত হয়েছে?
শাইখ ইবনে জিবরিন (রাহ.)-কে শাবান মাসের মধ্যরাত্রিতে ইবাদত করার বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন:
“لم يثبت في فضل ليلة النصف من شعبان خبر صحيح مرفوع يعمل بمثله حتى في الفضائل بل وردت فيها آثار عن بعض التابعين مقطوعة و أحاديث أصحها موضوع أو ضعيف جداً و قد اشتهرت تلك الروايات في كثير من البلاد التي يغمرها الجهل من أنها تكتب فيه الآجال و تنسخ الأعمار … إلخ و على هذا فلا يشرع إحياء تلك الليلة و لا صيام نهارها و لا تخصيصها بعبادة معينة و لا عبرة بكثرة من يفعل ذلك من الجهلة، و الله أعلم
“শাবান মাসের মধ্যরাত্রির (নিসফে শাবান) ফজিলত সম্পর্কে আমলযোগ্য কোনো সহিহ ‘মারফু’ হাদিস প্রমাণিত নেই, এমনকি আমলের ফজিলতের ক্ষেত্রেও নয়। বরং এই বিষয়ে কিছু তাবেয়ীর থেকে কিছু ‘মাকতু’ আছার (বক্তব্য) বর্ণিত হয়েছে। আর এ সংক্রান্ত হাদিসগুলোর মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে বিশুদ্ধ বলে দাবি করা হয় সেগুলোও হয় বানোয়াট (মওজু) অথবা অত্যন্ত দুর্বল (যয়িফ জিদান)। অজ্ঞতা আচ্ছন্ন অনেক দেশে এই বর্ণনাগুলো বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে—এই রাতে মানুষের মৃত্যু ও আয়ু নির্ধারণ বা পরিবর্তন করা হয়… ইত্যাদি।
এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, এই রাতকে কেন্দ্র করে ইবাদত করা, এর দিনে রোজা রাখা কিংবা একে বিশেষ কোনো ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা শরিয়তসম্মত নয়। আর কত অধিক সংখ্যক অজ্ঞ লোক এটি পালন করছে, তা বিবেচ্য বিষয় নয়। আল্লাহই ভালো জানেন।” [আল মাজমুউছ সামীন মিন ফিকহি ওয়া ফাতাওয়া আস সিয়াম লিল আল্লামাহ ইবনে জিবরীন]
শাবান মাসে ইবাদতের বিষয়ে সহিহ সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি হলো:
• এই রাতের ফজিলতে কোনো সহিহ মারফু হাদিস নেই।
• মানুষের ভাগ্য বা হায়াত-মউত এই রাতে লেখা হয়—এমন ধারণার কোনো সহিহ ভিত্তি নেই (এটি মূলত লাইলাতুল কদরের বৈশিষ্ট্য)।
• রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন তবে তিনি ১৫ তারিখকে এককভাবে নির্দিষ্ট করতেন না।
• যদি কেউ নিয়মিত প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে (আইয়ামে বিজ) রোজা রাখেন। তবে তিনি শাবান মাসেও তা রাখতে পারেন।
• নিসফে শাবান বা ১৫ই শাবানের রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং ক্ষমা ঘোষণা করেন মর্মে কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক মুহাদ্দিসের মতে ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য। তবে সেই রাতে বিশেষ কোনো পদ্ধতিতে নামাজ বা উৎসব পালন করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
সুতরাং এই রাত বা দিনকে আলাদা ইবাদত বা রোজার জন্য নির্দিষ্ট করা শরিয়তসম্মত নয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate