প্রশ্ন: ফরজ গোসল করলে ওয়াক্ত শেষ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা থাকলে সে ক্ষেত্রে কি গোসল ছাড়া সালাত পড়া যাবে?
উত্তর: এ ক্ষেত্রে ফরজ গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করার পরই সালাত পড়তে হবে। গোসল ছাড়া সালাত পড়ার সুযোগ নাই। কেননা সালাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য পবিত্রতা শর্ত। হাদিসে এসেছে, আনাস বিন মালিক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,
لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ صَلاَةً بِغَيْرِ طُهُورٍ
“আল্লাহ পবিত্রতা ছাড়া সালাত কবুল করেন না।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৪]
সুতরাং গোসল করতে গিয়ে সালাতের সময় পার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও আগে গোসল করবে তারপরে সালাত আদায় করবে। গোসল ছাড়া কেবল ওজু কিংবা তায়াম্মুম করে সালাত শুদ্ধ হবে না। তবে আগামীতে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি যেন, গোসল করে সময় মত সালাত আদায় করা যায়। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরণের অলসতা বা অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ মর্মে বিজ্ঞ আলেমদের কতিপয় ফতওয়া তুলে ধরা হল:
❑ প্রশ্ন ১: যদি কেউ জুনুবি (গোসল ফরজ হওয়া) অবস্থায় ঘুম থেকে ওঠে এবং আশঙ্কা করে যে, গোসল করতে গেলে নামাজের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে তাহলে সে কি তায়াম্মুম করবে?
প্রশ্ন ২: একজন ব্যক্তি ফজরের নামাজের ইকামতের সময় ঘুম থেকে জেগে উঠলেন এবং তিনি জুনুবি অবস্থায় আছেন। যদি তিনি গোসল করতে যান তবে জামাত ছুটে যাবে। এমতাবস্থায় তিনি কি শুধু অজু করে মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করবেন এবং পরে ফিরে এসে গোসল করে ফজরের দুই রাকাত (সুন্নতসহ) আদায় করবেন, নাকি জামাত ছুটে গেলেও গোসল করবেন?
উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ। জুনুবি ব্যক্তির জন্য নামাজের উদ্দেশ্যে গোসল করা ফরজ। শুধুমাত্র অজুর মাধ্যমে তার নামাজ শুদ্ধ হবে না। ব্যক্তির ওপর গোসল করা ওয়াজিব, এমনকি যদি তার জামাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তবুও। বরং সে যদি দেরি করে জাগ্রত হয় এবং আশঙ্কা করে যে গোসল করতে গেলে নামাজের ওয়াক্তই শেষ হয়ে যাবে তবুও জমহুর বা অধিকাংশ আলেমের মতে তাকে গোসলই করতে হবে—আর এটিই সঠিক মত। কারণ সে এক্ষেত্রে মাজুর বা অপারগ। তার ক্ষেত্রে নামাজের ওয়াক্ত হলো, যখন সে জাগ্রত হয়েছে সেই সময়টি। কারণ আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, সাহাবিগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট তাদের ঘুমের কারণে নামাজ ছুটে যাওয়ার কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন:
“إِنَّهُ لَيْسَ فِي النَّوْمِ تَفْرِيطٌ إِنَّمَا التَّفْرِيطُ فِي الْيَقَظَةِ فَإِذَا نَسِيَ أَحَدُكُمْ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَلْيُصَلِّهَا إِذَا ذَكَرَهَا”
“নিশ্চয়ই ঘুমে কোনো অবহেলা নেই; অবহেলা তো জাগ্রত অবস্থায়। সুতরাং তোমাদের কেউ যখন কোনো নামাজ ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে থাকার কারণে তা ছুটে যায় তবে সে যখনই তা স্মরণ করবে (বা জাগ্রত হবে) তখনই যেন তা আদায় করে নেয়।” [সুনানে তিরমিজি: ১৭৭, সুনানে নাসায়ি: ৬১৫, সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৭, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৬৯৮। আলবানি একে সহিহ তিরমিজিতে সহিহ বলেছেন এবং হাদিসটির মূল অংশ বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে।]
✪ জমহুর উলামাদের মত বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কুদামা রহ. বলেন:
وإذا كان الماء موجودا إلا أنه إذا اشتغل بتحصيله واستعماله فات الوقت , لم يبح له التيمم , سواء كان حاضرا أو مسافرا , في قول أكثر أهل العلم منهم : الشافعي وأبو ثور وابن المنذر وأصحاب الرأي وعن الأوزاعي , والثوري : له التيمم . رواه عنهما الوليد بن مسلم
“যদি পানি বিদ্যমান থাকে কিন্তু তা সংগ্রহ ও ব্যবহারে সময় ব্যয় করলে ওয়াক্ত পার হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে তবে তায়াম্মুম করা বৈধ হবে না—সে মুকিম হোক বা মুসাফির। এটি অধিকাংশ আলেমদের মত, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম শাফেয়ি, আবু সাওর, ইবনুল মুনজির এবং আসহাবুর রায় (হানাফি আলেমগণ)। তবে আওযায়ি এবং সাওরি থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, সে তায়াম্মুম করতে পারবে।” [আল মুগনি: ১/১৬৬]
✪ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন:
ومن استيقظ آخر وقت صلاة وهو جنب وخاف إن اغتسل خرج الوقت اغتسل وصلى , ولو خرج الوقت , وكذا من نسيها
“যে ব্যক্তি নামাজের ওয়াক্তের শেষ সময়ে জুনুবি অবস্থায় জাগ্রত হলো এবং আশঙ্কা করল যে, গোসল করলে ওয়াক্ত চলে যাবে সে গোসল করবে এবং নামাজ পড়বে যদিও ওয়াক্ত চলে যায়। যে ব্যক্তি নামাজ ভুলে গেছে তার বিধানও অনুরূপ।” [আল ইখতিয়ারাত আল ফিকহিয়্যাহ]
✪ শাইখ ইবনে উসাইমিন রহ. কে প্রশ্ন করা হয়: পানি গরম করার ক্ষেত্রে যদি কেউ অলসতা করে অথবা মরুভূমিতে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে এবং ওয়াক্ত পার হয়ে যাওয়ার ভয় করে তবে সে কী করবে? সে কি পানি গরম করবে নাকি তায়াম্মুম করবে?
তিনি উত্তর দেন:
يجب عليه أن يسخن الماء ولو كان يخشى خروج الوقت ، وذلك لأن النائم إذا قام من نومه فوقت الصلاة في حقه من استيقاظه وليس من دخول وقتها ، لقول النبي عليه الصلاة والسلام : (من نام عن صلاة أو نسيها فليصلها إذا ذكرها) فجعل وقتها عند الذكر بالنسبة للنسيان ، وكذلك عند الاستيقاظ بالنسبة للنوم ، فنحن نقول : إذا قمت مثلاً من نومك قبل طلوع الشمس بنحو خمس دقائق أو عشر دقائق إن تيممت أدركت الصلاة في الوقت وإن اغتسلت خرج الوقت ، فنقول : اغتسل ولو خرج الوقت ، وذلك لأن وقت الصلاة في حقك كان عند استيقاظك من النوم ، وليس من طلوع الفجر ، لأنك معذور به
“তার ওপর পানি গরম করা ওয়াজিব, এমনকি যদি সে ওয়াক্ত শেষ হওয়ার ভয়ও করে। কারণ ঘুমন্ত ব্যক্তি যখন জাগ্রত হয় তখন থেকে তার নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয়; ওয়াক্ত প্রবেশের সময় থেকে নয়। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি কোনো নামাজ থেকে ঘুমিয়ে থাকে অথবা ভুলে যায় তবে সে যখনই তা স্মরণ করবে তখনই যেন তা আদায় করে নেয়।’ তিনি ভুলে যাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্মরণ হওয়ার সময়কে এবং ঘুমন্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে জাগ্রত হওয়ার সময়কে নামাজের ওয়াক্ত নির্ধারণ করেছেন।
তাই আমরা বলি: যদি আপনি সূর্যোদয়ের ৫ বা ১০ মিনিট আগে ঘুম থেকে ওঠেন এবং তায়াম্মুম করলে ওয়াক্তের মধ্যে নামাজ পাওয়া যায় কিন্তু গোসল করলে ওয়াক্ত পার হয়ে যায় তবুও আপনি গোসলই করবেন যদিও ওয়াক্ত পার হয়ে যায়। কারণ আপনার ক্ষেত্রে নামাজের ওয়াক্ত আপনার জাগ্রত হওয়ার মুহূর্ত থেকে শুরু হয়েছে; ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া থেকে নয়। কারণ আপনি তখন ঘুমের কারণে অপারগ ছিলেন।” [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব] আল্লাহই ভালো জানেন। [ইসলামকিউএ (IslamQA), ফতোয়া নং ৯৪৩১১]
❑ আল্লামা বিন বায রাহ. এর ফতওয়া:
প্রশ্ন: যদি কোনো ব্যক্তি স্বপ্নদোষের কারণে জুনুবি (গোসল ফরজ) হয় এবং সূর্য ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে তার ঘুম ভাঙে তবে সে কি ওয়াক্ত চলে যাওয়ার ভয়ে জুনুবি অবস্থাতেই নামাজ পড়বে, নাকি আগে গোসল করবে এবং তারপর নামাজ আদায় করবে?
উত্তর: “যখন মানুষ জুনুবি অবস্থায় জাগ্রত হয়, সে আগে গোসল করবে। জুনুবি অবস্থায় সে নামাজ পড়বে না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
– مَن نَسيَ صَلاةً أو نامَ عنها، فإنَّ كَفَّارتَها أنْ يُصَلِّيَها إذا ذكَرَها
“যে ব্যক্তি নামাজ থেকে ঘুমিয়ে থাকে অথবা ভুলে যায়, সে যখনই তা স্মরণ করবে (বা জাগ্রত হবে) তখনই যেন তা আদায় করে নেয়, এছাড়া এর আর কোনো কাফফারা নেই।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] এটিই হলো তার (নামাজের) ওয়াক্ত। সে গোসল করবে তারপর নামাজ পড়বে। জুনুবি অবস্থায় নামাজ পড়ার কোনো সুযোগ নেই; সে সূর্যোদয়ের সময় জাগ্রত হোক বা সূর্যোদয়ের পর, অথবা আসরের সময় ঘুমিয়ে থাকার পর আসর ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর জাগ্রত হোক না কেন—সে গোসল করবে তারপর নামাজ পড়বে।” [বিন বায, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]। মোটকথা, যদি আপনার ঘুম সূর্যোদয়ের মাত্র ৫-১০ মিনিট আগে ভাঙে এবং আপনি নিশ্চিত থাকেন যে, গোসল করলে সূর্য উঠে যাবে তবুও আপনাকে আগে গোসলই করতে হবে। গোসল শেষ করে আপনি যখন নামাজ পড়বেন তখন সেটি আল্লাহর নিকট ‘সময়মতো’ পড়া হিসেবেই গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment