February 22, 2026

এক নজরে সিয়াম বা রোজার জরুরি মাসআলা-মাসায়েল

 ❑ ১. সিয়ামের সংজ্ঞা:

সিয়াম (الصيام) আরবি শব্দ। বহুবচন। একবচন সওম (الصوم)। বাংলায় রোজা যা মূলত ফারসি ভাষায় থেকে আগত। সওম-এর শাব্দিক অর্থ, বিরত থাকা।
শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিক (ফজর) থেকে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকাই হল সিয়াম বা রোজা।
❑ ২. রোজা রাখার বিধান:
নিম্নে বর্ণিত কতিপয় শর্ত সাপেক্ষ প্রত্যেক মুসলিম নারী ও পুরুষের ওপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ।
❖ আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” [সূরা আল-বাকারা: ১৮৩]
❖ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ
“ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ সম্পাদন করা এবং রমজানের রোজা রাখা।” [সহিহ বুখারী: ৮ ও সহিহ মুসলিম: ১৬]
❑ ৩. রোজা ফরজ হওয়ার শর্তাবলি:
রোজা ফরজ হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই━
১. মুসলিম হতে হবে। অমুসলিমের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য নয়।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চাদের রোজা রাখা আবশ্যক নয়। তবে তাদেরকে অভ্যস্ত করার জন্য রোজা রাখার জন্য উৎসাহিত করা উচিত।
৩. সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন হতে হবে। পাগলের উপর রোজা ফরজ নয়।
৪. রোজা রাখার শারীরিক সক্ষমতা থাকতে হবে। রোজা রাখতে অক্ষম বা যার জন্য কষ্টসাধ্য তার জন্য রোজা রাখা আবশ্যক নয়। যেমন: বয়োবৃদ্ধ, দীর্ঘ মেয়াদী রোগী কিংবা শয্যাশায়ী ব্যক্তির জন্য রোজা রাখা আবশ্যক নয়।
প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বা গরমে ভারী কাজ করার কারণে রোজা রাখতে কষ্ট হলে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ নয়। এ ক্ষেত্রে হয় কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিবে অথবা রাত্রিকালীন কাজ করবে।
৫. শরিয়তের বাধামুক্ত থাকতে হবে। (যেমন: ঋতুস্রাব, সন্তান প্রসবোত্তর স্রাব নির্গত হওয়া ইত্যাদি)
❑ ৪. রোজার নিয়ত:
ক. মনে মনে রোজা রাখার নিয়ত থাকা আবশ্যক। মুখে উচ্চারণ করে আরবিতে ‘নাওয়াইতু আন আসুমা..” অথবা বাংলায় নিয়ত উচ্চারণ করা বিদআত।
খ. ফজরের পূর্বেই নিয়ত করা আবশ্যক।
গ. পুরো মাসের জন্য মাসের শুরুতে একবার নিয়ত করাই যথেষ্ট। তবে প্রতি রাতে আলাদা আলাদা নিয়ত করা উত্তম।
উল্লেখ্য যে, কোনও কারণে রোজা ভাঙলে পুনরায় শুরু করার সময় আবার নিয়ত করতে হবে।
❑ ৪. রোজা ভঙ্গের কারণ সমূহ:
◈ ক. যেকারণে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয় তা হল, রোজা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা:
যদি কোনও ব্যক্তি রমজান মাসে ইচ্ছাকৃত ভাবে স্ত্রী সহবাস করে তবে তার রোজা ভেঙে যাবে এবং এর বদলে একটি রোজা কাজা করার পাশাপাশি কাফফারা (টানা ৬০টি রোজা রাখা) আদায় করতে হবে। তাও সম্ভব না হলে একটি রোজার বিনিময়ে ৬০ জন গরিব-অসহায় মানুষকে খাবার খাওয়াতে হবে বা খাদ্যদ্রব্য প্রদান করতে হবে। (জনপ্রতি সোয়া কেজি চাল)। টাকা দেওয়া শরিয়ত সম্মত নয়।
◈ খ. যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায় কিন্তু শুধু কাজা আবশ্যক হয় (কাফফারা নয়):
নিচের কারণগুলোর কোনও একটি ঘটলে রোজা ভেঙে যাবে এবং রমজানের পর সেই রোজার পরিবর্তে একটি রোজা রেখে দিলেই হবে (কাফফারা আবশ্যক নয়):
➧ (১). ইচ্ছাকৃত ভাবে পানাহার করা: সুবহে সাদিক বা ফরজ উদিত হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইচ্ছাকৃত ভাবে কোনও খাবার, পানীয়, ওষুধ ইত্যাদি গ্রহণ করা।
উল্লেখ্য যে, এমন কিছু যা সাধারণত খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় না তা ইচ্ছাকৃত ভাবে গিলে ফেললেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। যেমন: পাথর, মাটি বা অখাদ্য অন্য কিছু।
➧ (২) ইচ্ছাকৃত ভাবে বমি করা: যদি কেউ আঙুল দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে মুখ ভরে ইচ্ছাকৃত ভাবে বমি করে। রোগ বা অন্য কোনও কারণে অনিচ্ছা বশতঃ বমি হলে রোজা ভঙ্গ হবে না।
➧ (৩) নাক বা কানে ওষুধ প্রবেশ করানো: যদি এমন কোনও তরল ওষুধ ব্যবহার করা হয় যা সরাসরি পাকস্থলীতে পৌঁছে যায়।
– রোজা অবস্থায় রক্ত দান করলে বা হিজামা (সিঙ্গা) লাগালে রোজা ভঙ্গ হওয়ার বিষয়টি দ্বিমতপূর্ণ। অধিক বিশুদ্ধ মতে, রোজা ভঙ্গ হবে না। কিন্তু যেহেতু অনেক আলেমের মতে রোজা ভেঙ্গে যাবে তাই সতর্কতা এবং মতবিরোধ থেকে বাঁচার স্বার্থে সম্ভব হলে তা দিনে না করে রাতে করাই ভালো।
➧ (৪) ভুলবশত ইফতার বা সেহরি করা: সময় শেষ হওয়ার পর সেহরি খাওয়া অথবা সময় হওয়ার আগে ইফতার করে ফেলা (যদিও ব্যক্তি মনে করেছিল সময় আছে)।
উল্লেখ্য যে, উক্ত রোজা কাজা করার বিষয়ে আলেমদের মাঝে দ্বিমত আছে। তবে অধিক বিশুদ্ধ মতে তা কাজা করে নিবে। এটাই অধিক সতর্কতামূলক অবস্থান।
➧ (৫) রোজা অবস্থায় অসতর্কতা বশত কোনও কিছু খেলে বা পান করলে রাজা ভঙ্গ হয় না। তবে স্মরণ আসার সাথে সাথে পানাহার বন্ধ করতে হবে। এমনকি মুখে থাকলেও তা ফেলে দিতে হবে।
➧ (৬) নারীদের পিরিয়ড বা সন্তান প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাব: রোজা থাকা অবস্থায় দিনের যেকোনো সময় ঋতুস্রাব শুরু হলে বা বাচ্চা প্রসব হলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
❑ ৫. যাদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে (৫টি শ্রেণি):
✪ ১. অসুস্থ ব্যক্তি: যদি রোজা রাখার কারণে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে তাহলে রোজা ভাঙতে পারবেন এবং পরবর্তীতে সুস্থ হলে তা কাজা করবেন।
✪ ২. মুসাফির: সফরের কারণে কষ্ট হলে রোজা ভঙ্গ করা জায়েজ। তবে কষ্ট না হলে রোজা রাখাই উত্তম। ভাঙ্গলে পরবর্তীতে তা কাজা করা আবশ্যক।
আল্লাহ তাআালা বলেন,
وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ
“আর তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ অথবা সফরে আছে (সে অন্য সময়ে কাজা করবে)।” [সূরা আল বাকারা: ১৮৫
✪ ৩. ঋতুমতী ও প্রসূতি নারী:
মহিলাদের মাসিক ঋতুস্রাব বা সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর স্রাব চলাকালীন সময় (সর্বোচ্চ মেয়াদ ৪০ দিন) রোজা রাখা আবশ্যক নয়। রোজা অবস্থায় স্রাব শুরু হলে বা বাচ্চা প্রসব হলে স্বয়ংক্রিয় রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে রমজানের পরে আগামী রমজানের পূর্বে তা কাজা করে নিতে হবে।
✪ ৪. গর্ভবতী ও দুগ্ধ দানকারী মা: যদি নিজের বা বাচ্চার ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলে তার তিনি রোজা ভাঙতে পারবেন এবং পরে কাজা করবেন। তবে যদি কোনও ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে তবে রোজা রাখা মুস্তাহাব।
✪ ৫. অতিবৃদ্ধ বা দীর্ঘমেয়াদী রোগী: যারা একেবারেই রোজা রাখতে সক্ষম নন তাদের জন্য রোজা রাখা আবশ্যক নয়। তবে প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্যদ্রব্য (ফিদিয়া যার পরিমাণ সোয়া কেজি চাল) দিতে হবে।
❑ ৬. রোজার মূল শিক্ষা ও উদ্দেশ্য:
❍ ১. তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি অর্জন:
রোজার প্রধান এবং মূল উদ্দেশ্য হল মানুষের মনে আল্লাহর ভয় বা সচেতনতা সৃষ্টি করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” [সূরা বাকারা: ১৮৩]
❍ ২. নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ (আত্মশুদ্ধি):
সারাদিন নিজের বৈধ চাহিদা (খাবার ও পানীয়) পরিহার করার মাধ্যমে একজন মুমিন তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। এটি মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।
❍ ৩. ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা:
ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে রোজাদার ধৈর্যের গুণ অর্জন করে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসকে “ধৈর্যের মাস” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
❍ ৪. সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব বোধ:
অনাহারে থাকার যন্ত্রণা অনুভবের মাধ্যমে সমাজের অভাবী ও দরিদ্র মানুষের কষ্টের প্রতি সহমর্মিতা সৃষ্টি হয়। এটি দান-সদকা ও মানুষের সেবায় উৎসাহিত করে।
❍ ৫. আখলাক বা চরিত্রের সংশোধন:
রোজা অবস্থায় মিথ্যা বলা, গিবত করা বা ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকা বাধ্যতামূলক।
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও সে অনুযায়ী কাজ বর্জন করেনি, তার পানাহার বর্জন করাতে আল্লাহর কোনও প্রয়োজন নেই।” [সহিহ বুখারী: ১৯০৩]
❍ ৬. শারীরিক সুস্থতা:
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার ফলে শরীরের পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায় এবং শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যায়, যা সুস্থতার জন্য সহায়ক। এ ছাড়াও অনেক উপকার আছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
“আর তোমাদের রোজা রাখাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পারো।” [সূরা বাকারা: ১৮৪]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পদ্ধতির আলোকে সিয়াম পালনের তওফিক দান করুন এবং তা কবুল করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate