Sunday, February 22, 2026

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা

 ভূমিকা: আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর—যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” [সূরা নিসা: ৫৯]
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
“আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা সে সময় আমার সুন্নাত এবং খুলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতের পরিণাম গোমরাহি বা ভ্রষ্টতা।” [আবু দাউদ, তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ]। কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও হাদিসের অনুরূপ অর্থে আরও অনেক আয়াত ও সহিহ হাদিস রয়েছে, যার তাৎপর্য হচ্ছে মুসলমানদের উপর আবশ্যক হচ্ছে তারা ফরজ, সুন্নাত ও নফলসহ সকল প্রকার এবাদত আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের নির্দেশিত তরিকা অনুযায়ী সম্পাদন করবে এবং তাতে সকল প্রকার বিদআত থেকে বিরত থাকবে। রমজান মাসে তারাবির নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবাদত। তাই আমাদেরকে এক্ষেত্রেও সুন্নাতের অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে তারাবির নামাজের রাকাতের ক্ষেত্রে। আসুন আমরা সহিহ হাদিসের আলোকে তারাবির নামাজের সঠিক রাকাত সংখ্যা জেনে নেই।

◈ তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা:
রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল তথা তারাবির নামাজের সঠিক রাকাত সংখ্যা হচ্ছে বিতরসহ ১১। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বদা রাতের নামাজ বা তারাবির নামাজ এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। উম্মুল মুমেনীন আয়েশা (রা.) থেকে ১১ রাকাত পড়ার কথাই বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে। তাঁকে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রাতের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন:
مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً، يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا فَلاَ تَسْأَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي ثَلاَثًا
“রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজান কিংবা অন্য মাসে রাতের নামাজ এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। তিনি প্রথমে (দু রাকাত দু রাকাত করে) চার রাকাত পড়তেন। তুমি তার দীর্ঘ কিয়াম ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। তিনি পুনরায় চার রাকাত (দুই রাকাত দুই রাকাত করে) পড়তেন। তুমি তার দীর্ঘ কিয়াম ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিনি ৩ রাকাত বিতর পড়তেন।” [বুখারি ও মুসলিম]। সায়েব বিন ইয়াজিদ (রা.) বলেন:
أَمَرَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ وَتَمِيمًا الدَّارِيَّ أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً
“উমর বিন খাত্তাব (রা.) উবাই বিন কাব এবং তামীম দারীকে এগার রাকাত তারাবির নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।” [মুআত্তা ইমাম মালিক]
এটিই আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের দাবী। এটিই ছিল অধিকাংশ সাহাবি, তাবেঈ এবং ইমামদের আমল। তারা এগার রাকাতের বেশি তারাবির নামাজ পড়তেন না।

◆ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ:) তারাবির নামাজের রাকাতের ব্যাপারে সকল মত এক স্থানে একত্রিত করেছেন:
১) তিন রাকাত বিতরসহ ১১ রাকাত।
২) তিন রাকাত বিতরসহ ১৩ রাকাত।
৩) তিন রাকাত বিতরসহ ২১ রাকাত।
৪) তিন রাকাত বিতরসহ ২৩ রাকাত।
৫) তিন রাকাত বিতরসহ ৩৯ রাকাত।
৬) তিন রাকাত বিতরসহ ৪১ রাকাত।
৭) তিন রাকাত বিতরসহ ৪৯ রাকাত।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি উপরের সবগুলো মত উল্লেখ করার পর বলেন: “তবে তারাবির নামাজের রাকাতের ব্যাপারে আয়েশা (রা.) এর হাদিস ব্যতীত অন্য কোন হাদিস সহিহ সনদে প্রমাণিত হয়নি। আর তা হচ্ছে তাঁর কথা: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজান কিংবা অন্য মাসে রাতের নামাজ এগার রাকাতের বেশি পড়তেন না। তিনি আরও বলেন:
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ২০ রাকাত তারাবিহ পড়ার হাদিসের সনদ দুর্বল এবং বুখারি ও মুসলিম শরিফে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিসের বিরোধী। আর বাকি বর্ণনাগুলো সাহাবি, তাবেয়ি এবং তাদের পরবর্তী যুগের আলেমগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে। তারা যদি কিরাত দীর্ঘ করতেন তাহলে রাকাত সংখ্যা কম করতেন। আর সংক্ষিপ্ত কিরাত পাঠ করলে রাকাত সংখ্যা বাড়াতেন।

সার সংক্ষেপ:
সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও উত্তম হচ্ছে, কিরাত দীর্ঘ করে বিতরসহ ১১ রাকাত তারাবির নামাজ পড়া। তবে কতিপয় আলেম বলেছেন, তারাবির নামাজ ১১ রাকাতের চেয়ে বেশি পড়তে চাইলে কোন অসুবিধা নেই। লেখক: আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানি।

❑ শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী (রাহ.) এর সংযোজন:
মূলতঃ ১১ রাকাত বা ২০ রাকাত বলে কথা নয়। যে কোন সংখ্যায় মানুষ রাতের নফল নামাজ পড়তে পারে। যেটা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাওলি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু যদি নির্ধারণ করা হয় যে ৮ রাকাত পড়া সুন্নত। তাহলে দলিল দরকার। এক্ষেত্রে আমরা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ফে’লী হাদিস পাই, যাতে প্রমাণ হয় তিনি ৮ রাকাতই পড়েছেন। সুতরাং ৮ রাকাতই সুন্নাত। কিন্তু বেশি পড়তে চাইলে তার অনুমতি আছে। তাকে বাধা দেয়া যাবে না। এই কারণেই মক্কা-মদিনায় ২০ রাকাত পড়া হয় এবং শেষ দশকে ৩৩ রাকাত পড়া হয়। (অবশ্য বর্তমানে মক্কা-মদিনায় রমজানের ১ম রাতেই তিন রাকাত বিতর সহ ১৩ রাকাত করে পড়া হয়-সম্পাদক)। কিন্তু কথা হচ্ছে যদি বলা হয় ২০ রাকাতই সুন্নাত- ৮ রাকাত নয়, তাহলে ২০ রাকাত সুন্নাত বলার পক্ষে সহিহ দলিল দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো নয়ই, সাহাবায়ে কেরাম থেকেও কোন সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। ওমার (রা.) এর ব্যাপারে যে বর্ণনাগুলো উল্লেখ করা হয় তা জঈফ। দলিলের অনুপযুক্ত। বরং ওমর (রা.) থেকে মুআত্তা মালেকে ৮ রাকাতের পক্ষেই সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায়।
ওমার (রা.) থেকে তারাবির বিষয়ে ৩ রকমের বর্ণনা পাওয়া যায়:
◈ ১) ৩৬ রাকাত। কিন্তু বর্ণনাটি জঈফ। এটি রয়েছে কিয়ামুল্লায়ল মারওয়াযীতে।
◈ ২) ২৩ রাকাত। এ বর্ণনাটিও জঈফ। এটি মুআত্তায় আছে। কারণ যার বরাতে বর্ণনাটি এসেছে তিনি ওমার (রা.) এর যুগে জন্ম গ্রহণই করেননি।
◈ ৩) ১১ রাকাত। এটি মুআত্তা মালেকে বর্ণিত হয়েছে। এটি সহিহ বর্ণনা। যেমন আলবানি সাহেব তা সহিহ বলেছেন।
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে মারফূ সূত্রে ২০ রাকাতের পক্ষে যে হাদিস উল্লেখ করা হয় তা খুবই দুর্বল বা জাল। বর্ণনাটি বাইহাকি, তবারানি ও ইবনে আবি শায়বায় উল্লেখ হয়েছে। সে সম্পর্কে বাইহাকি নিজেই বলেন উহা জঈফ। তাছাড়া হানাফি মাজহাবের আলেমগণও হাদিসটি জঈফ হওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। যেমন: আল্লামা যাইলাঈ নসবুর রায়া গ্রন্থে, মোল্লা আলী কারী, বদরুদ্দিন আইনি, আনোয়ার শাহ কাশমিরি (রহ:) প্রমূখগণ উল্লেখযোগ্য। বদরুদ্দিন আইনি বলেন, তবারানি ও ইবনে আবি শায়বা বর্ণিত হাদিসটি জঈফ হওয়ার সাথে সাথে বুখারি ও মুসলিমের বর্ণিত আয়েশা (রা.) এর হাদিসের বিরোধী হওয়ার কারণে পরিত্যাজ্য। [উমদাতুল কারী-বদরুদ্দীন আইনী]।আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানি হাদিসটিকে জাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

❑ একটি সংশয় ও তার অবসান: তারাবিহ এবং তাহাজ্জুদের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?

প্রশ্ন: সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা কাউন্সিলের সাবেক প্রধান মুফতী সম্মানিত শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (র:)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারাবিহ, কিয়ামুল লাইল এবং তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: সম্মানিত শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (র:) বলেন:
الصلاة في الليل تسمى تهجداً، وتسمى قيام الليل، كما قال الله سبحانه: {وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ} الآية، وقال سبحانه: {يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ * قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا}، وقال سبحانه في وصف عباده الأبرار: {كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجعُونَ}. أما التراويح فهي تطلق عند العلماء على قيام الليل في رمضان أول الليل، مع التخفيف وعدم الإطالة، ويجوز أن تسمى تهجداً، وأن تسمى قياماً لليل، ولا مشاحة في ذلك.
“রাতের নামাজকে তাহাজ্জুদ বলা হয়। একে কিয়ামও বলা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ
‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়, ওটা তোমার জন্য নফল।’ [সূরা বনী ইসরাঈল: ৭৯]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا
‘ওহে চাদরে আবৃত (ব্যক্তি), রাতে নামাজে দাড়াও, রাতের কিছু অংশ বাদে।’ [সূরা মুজাম্মেল: ১-২]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
آخِذِينَ مَا آتَاهُمْ رَبُّهُمْ ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُحْسِنِينَ كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجعُونَ
‘তাদের প্রতিপালক যা তাদেরকে দিবেন, তা তারা ভোগ করবে, কারণ তারা পূর্বে (দুনিয়ার জীবনে) ছিল সৎ কর্মশীল। তারা রাত্রিকালে খুব কমই শয়ন করত।’ [সূরা যারিয়াত: ১৬-১৭]
আর মানুষের উপর সহজ করে এবং বেশি দীর্ঘ না করে রমজান মাসে রাতের প্রথম ভাগে কিয়ামুল লাইল করাকে আলেমদের পরিভাষায় তারাবিহ হিসেবে নামকরণ করা হয়। একে তাহাজ্জুদ এবং কিয়ামুল লাইল হিসেবে নামকরণ করাও জায়েজ আছে। এতে কোন অসুবিধা নেই। আল্লাহই তাওফিক দাতা।”

❑ উপরাক্ত আলোচনার সারসংক্ষেপ:
✪ রাকাত সংখ্যা: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজানে বা রমজানের বাইরে সর্বদা বিতরসহ ১১ রাকাত নামাজ পড়তেন, যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
✪ উমর (রা.)-এর আমল: উমর (রা.) উবাই বিন কাব (রা.)-কে যখন জামাতে নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দেন, তখন রাকাত সংখ্যা ছিল ১১ রাকাত (মুআত্তা ইমাম মালিক)।
✪ রাকাতের ভিন্নতা: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর মতে, ২০ রাকাত বা তার বেশি পড়ার যেসব বর্ণনা রয়েছে, সেগুলো সনদের দিক থেকে দুর্বল অথবা সহিহ হাদিসের পরিপন্থী। মূলত সাহাবি ও তাবেইগণ কিরাত দীর্ঘ করলে রাকাত কম পড়তেন এবং কিরাত সংক্ষিপ্ত করলে রাকাত বাড়িয়ে নিতেন।
✪ তারাবিহর জন্য সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও উত্তম পদ্ধতি হলো, কিরাত দীর্ঘ করে ১১ রাকাত পড়া। তবে কেউ চাইলে এর চেয়ে বেশিও পড়তে পারেন। এতে কোনো বাধা নেই।
✪ নামকরণ: রাতের নামাজকে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইল (রাতের নফল সালাত) বলা হয়। রমজান মাসে রাতের প্রথম ভাগে কিছুটা সহজভাবে এই নামাজ পড়া হয় বলে একে ‘তারাবিহ’ বলা হয়। মূলত তাহাজ্জুদ ও তারাবিহ একই নামাজ।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

গ্রন্থনা ও সম্পাদনা:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

আল্লাহ আল্লাহ ও হু হু জিকির

 ‘আল্লাহ-আল্লাহ’ ও ‘হু-হু’ জিকির: বিদআতি পীর ও ভ্রান্ত সুফিদের মনগড়া জিকির:

– শাইখ আব্দুর রাজ্জাক বিন আব্দুল মুহসিন আল বদর (হাফিযাহুল্লাহ)
“এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, বিভ্রান্ত কিছু পীর ও তাদের অনুসারীরা জিকিরের ফজিলতকে নিজেদের মনগড়াভাবে তিন ভাগে ভাগ করে থাকে:
✪ ১. সাধারণ মানুষের জিকির (ذكر العامة): তাদের মতে এটি হলো “لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ” (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) বলা।
✪ ২. খাস বা বিশিষ্টদের জিকির (ذكر الخاصة): যা হলো শুধু “اللهُ، اللهُ” (আল্লাহ, আল্লাহ) বলা।
✪ ৩. খাসুল খাস বা অতি বিশিষ্টদের জিকির (ذكر خاصة الخاصة): যা হলো শুধু “هُوَ، هُوَ” (হু-হু) বলা।
ভ্রান্ত সুফিদের কিতাবগুলোতে এই মনগড়া নিয়মগুলো পাওয়া যায়। তারা মনে করে, আল্লাহর নাম “الله” (আল্লাহ) বা সর্বনাম “هُوَ” (হু) শব্দগুলো শত শত বার আওড়ানোই হলো শ্রেষ্ঠ জিকির। এমনকি তারা গোল হয়ে বসে বিকট শব্দে চিৎকার করে সমস্বরে এই জিকির করে।
হেদায়েতপ্রাপ্ত এক তওবাকারী ব্যক্তি—আল্লাহ তাকে রহম করুন—তার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেন: “আমরা এক বাগানে জড়ো হতাম এবং সবাই মিলে চিৎকার করে ‘হু, হু’ শব্দে জিকির করতাম। আল্লাহর কসম! আপনি যদি দেয়ালের ওপাশে থাকতেন, তবে আমাদের সেই আওয়াজ শুনে ভাবতেই পারতেন না যে এগুলো মানুষের কণ্ঠ! অথচ আমরা তখন মনে করতাম, আমরাই পৃথিবীর সেরা জিকিরকারী।”
❑ শরয়ি জিকির কেমন হওয়া উচিত?
পীরপন্থীদের এই পদ্ধতি স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা। এর প্রতিবাদে একটি মৌলিক কথা হলো: শরিয়তসম্মত জিকির হতে হলে তাকে অবশ্যই একটি পূর্ণাঙ্গ ও অর্থবোধক বাক্য হতে হবে।
কুরআন ও সুন্নাহর জিকিরগুলো খেয়াল করলে দেখবেন, সেগুলো সব পূর্ণাঙ্গ বাক্য এবং তার একেকটি চমৎকার অর্থ আছে:
سُبْحَانَ اللهِ
“আল্লাহ অতি পবিত্র।”
الْحَمْدُ للهِ
“সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।”
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।”
اللهُ أَكْبَرُ
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
أَسْتَغْفِرُ اللهَ
“আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।”
এখন প্রশ্ন হলো, শুধু “আল্লাহ, আল্লাহ” বা “হু, হু” বললে কী অর্থ প্রকাশ পায়? কোনো অমুসলিম যদি সারা দিনে হাজার বারও শুধু “আল্লাহ” শব্দটি বলে, সে কি মুসলমান হতে পারবে? কখনোই না। তাকে অবশ্যই “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” নামক পূর্ণাঙ্গ বাক্যটি বলতে হবে। ঠিক একইভাবে জিকিরের ক্ষেত্রেও শুধু নাম নয় বরং পূর্ণ বাক্য বলা জরুরি।
❑ একক নামে জিকির যে বাতিল তার প্রমাণ:
একক নামে জিকির করাকে শ্রেষ্ঠ মনে করা একটি চরম মূর্খতা। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়:
১. তিনি বলেছেন,
أَحَبُّ الْكَلَامِ إِلَى اللهِ أَرْبَعٌ: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ
“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটি: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার।” [সহীহ মুসলিম]
২. তিনি আরও বলেছেন,
لأَنْ أَقُولَ سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ للهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ
“সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলা আমার কাছে দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।” [সহীহ মুসলিম]
মোটকথা, শুধু “আল্লাহ, আল্লাহ” বলে জিকির করা শরিয়তসম্মত কোনো পদ্ধতি নয়। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ কথা বা বাক্যই নয়। কারণ এর দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ পায় না। এই পদ্ধতিতে না আছে কোনো প্রশংসা, না আছে কোনো সওয়াব।
সুতরাং আল্লাহর শেখানো ও রাসূলের দেখানো পদ্ধতি ছেড়ে পীরদের আবিষ্কৃত এই বিদআতি জিকির কখনোই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।” (সমাপ্ত)
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

কেন আমাদের দুআ কবুল হয় না বা দুআ কবুলের প্রধান অন্তরায়গুলো কী

 আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে দুআ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে অনেক সময় আমাদের কিছু ভুল বা অসতর্কতার কারণে সেই দুআ প্রত্যাখ্যাত হয়।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দুআ কবুলের প্রধান বাধাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
▪️১. হারাম উপার্জন ও খাদ্যাভ্যাস:
দুআ কবুল না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে জীবনধারণ করা।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে দীর্ঘ সফর করে ক্লান্ত, যার চুলগুলো এলোমেলো এবং দেহ ধূলিমলিন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘ইয়া রব, ইয়া রব!’ বলে ডাকছে। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারাই পরিপুষ্ট হয়েছে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:
فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
“তবে তার দুআ কীভাবে কবুল হতে পারে?” [সহীহ মুসলিম: ১০১৫]
▪️২. দুআর মধ্যে তাড়াহুড়ো করা:
অনেকে দুআ করার পর দ্রুত ফল চান এবং না পেলে হতাশ হয়ে দুআ করা ছেড়ে দেন। এটি দুআ কবুলের অন্তরায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
“তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয় যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে; (তাড়াহুড়ো হলো) সে বলে যে, আমি দুআ করলাম কিন্তু আমার দুআ তো কবুল হলো না।” [সহিহ বুখারি: ৬৩৪০, সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫]
▪️৩. পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ করা:
যদি কেউ অন্যায় কোনো কাজের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য দুআ করে তবে সেই দুআ কবুল হয় না।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لاَ يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ
“বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয় যতক্ষণ না সে কোনো পাপ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ করে।” [সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫]
▪️৪. উদাসীন মনে দুআ করা:
আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা না রেখে বা অমনোযোগী হয়ে দুআ করলে তা কবুল হয় না।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
ادْعُوا اللَّهَ وَأَنْتُمْ مُوقِنُونَ بِالإِجَابَةِ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ لاَ يَسْتَجِيبُ دُعَاءً مِنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لاَهٍ
“তোমরা কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করো এবং জেনে রেখো—নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দুআ কবুল করেন না।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৪৭৯, সহিহ]
▪️৫. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ত্যাগ করা:
সমাজে যখন মানুষ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা ছেড়ে দেয় তখন তাদের দুআ কবুল হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلاَ يُسْتَجَابُ لَكُمْ
“অবশ্যই তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে; নতুবা আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন তখন তোমরা তাঁর কাছে দুআ করবে কিন্তু তিনি তোমাদের দুআ কবুল করবেন না।” [সুনানে তিরমিজি: ২১৬৯, হাসান]
▪️৬. নিরন্তর গুনাহ ও অবাধ্যতা:
গুনাহে লিপ্ত থাকা এবং তওবা না করা দুআর পথে বড় বাধা। যখন অন্তর পাপে আচ্ছন্ন থাকে তখন তা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায়।
▪️৭. আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস বা সন্দেহ:
দুআ করার সময় যদি মনে সন্দেহ থাকে যে “আল্লাহ কবুল করবেন কি না” তবে সেই দুআর কার্যকারিতা কমে যায়। দৃঢ় বিশ্বাস দুআ কবুলের অন্যতম শর্ত। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
▪️৮. সময় ও অবস্থার প্রতি অজ্ঞতা:
কিছু বিশেষ সময় আছে যখন দুআ বেশি কবুল হয়—যেমন সিজদার সময়, রাতের শেষ প্রহর, জুমার দিন আসর নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়, রোজা অবস্থায়, বিশেষভাবে ইফতারের মুহূর্ত, সফর অবস্থায়, বৃষ্টি বর্ষণের সময় ইত্যাদি। এসব মোক্ষম সময়কে অবহেলা করা মানে সুযোগ হারানো।
▪️৯. আল্লাহর হিকমত ও প্রজ্ঞা:
কখনো আল্লাহ আমাদের চাওয়া মতো দুআ কবুল না করে তার বদলে আমাদের জন্য যা উত্তম তা দান করেন। অথবা সেই দুআর বিনিময়ে কোনো বিপদ দূর করেন কিংবা তা আখিরাতের জন্য জমা রাখেন।
মোটকথা, আল্লাহর দরবারে দুআ হলো ইবাদতের মূল। তাই দুআ কবুলের জন্য প্রধান শর্ত হলো—নিজের উপার্জন হালাল রাখা, দুআর আদব রক্ষা করা এবং পূর্ণ একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। আমরা যদি নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আল্লাহর কাছে চাই তবে তিনি অবশ্যই আমাদের ডাক শুনবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

রমজান মাসে কখন কখন দুআ কবুলের সম্ভাবনা বেশি

 প্রশ্ন: আমরা জানি, রমজানে রোজা অবস্থায় দুআ কবুল হয়। প্রশ্ন হল, রোজা ছাড়া সন্ধ্যার পরও কি রমজান মাসে দুআ কবুল হয়?

উত্তর: রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্তই বরকতময়। কেউ যদি তওবার শর্তাবলী (গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প) ঠিক রেখে তওবা করে। তবে আল্লাহ তা কবুল করবেন বলে আশা করা যায়—চাই তা রমজান হোক বা অন্য মাসে হোক, রমজানের দিনে হোক বা রাতে হোক। তবে শর্ত হল, যেসব কারণে দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় সেগুলো থেকে মুক্ত থাকতে হবে। যেমন: হারাম উপার্জন ও খাদ্যাভ্যাস পরিত্যাগ, দুআর মধ্যে তাড়াহুড়ো করা না করা, উদাসীন মনে দুআ না করা ইত্যাদি)। তবে রমজানে রোজা অবস্থায় দুআ করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অনুরূপভাবে যেহেতু রাতের শেষাংশে দুআ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই রমজানেও যদি কেউ শেষ রাতে (সেহরির সময়) আল্লাহর নিকট দুআ করে তাহলে তার দুআ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি আশা করা যায় ইনশাআল্লাহ।
◈ ১. রোজাদার ব্যক্তির দুআ কবুল হয়:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রোজাদারের দুআ আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। তিনি বলেছেন:
ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ، وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ
“তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: রোজাদার ব্যক্তি যতক্ষণ না সে ইফতার করে, ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং মজলুমের (অত্যাচারিত ব্যক্তির) দুআ।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৫৯৮, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭৫২]
আল্লামা আলবানি রহ. সহ আধুনিক অনেক মুহাদ্দিস এই হাদিসটিকে ‘সহিহ’ বা ‘হাসান’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
◈ ২. ইফতারের মুহূর্তের দুআ কবুলের অধিক আশা ব্যঞ্জক সময়:
ইফতারের সময়টি দুআ কবুলের জন্য অত্যন্ত আশা ব্যঞ্জক মুহূর্ত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِهِ لَدَعْوَةً مَا تُرَدُّ
“নিশ্চয়ই ইফতারের সময় রোজাদারের এমন একটি দুআ রয়েছে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭৫৩]
এ হাদিসটি সহিহ না কি জঈফ এ বিষয়ে মুহাদ্দিসদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে। আল্লামা আলবানি রহ. এটিকে সনদগতভাবে জঈফ সাব্যস্ত করলেও ইমাম বুসিরি, ইবনে হাজার আসকালানি, আহমদ শাকের সহ কতিপয় মুহাদ্দিস সহিহ/হাসান হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
মোটকথা, এ হাদিসটিকে জঈফ ধরে নিলেও রোজা অবস্থায় দুআ কবুলের সহিহ হাদিস অনুযায়ী এবং ইফতারের আগে রোজাদারদের দুর্বল অবস্থায় থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ইফতারের পূর্বে দুআ করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইনশাআল্লাহ।
তাই রোজাদারের উচিৎ, সারা দিন রোজা অবস্থায় দুয়া করার সুযোগকে হাত ছাড়া না করা। বিশেষ করে ইফতারে আগের সময়টিকে দুআর জন্য বেশি গুরুত্ব দেয়া
◈ ৩. রমজানের প্রতিটি দিন ও রাতে দুআ কবুলের সম্ভাবনা থাকে:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
إِنَّ لِلَّهِ فِى كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ عُتَقَاءَ مِنَ النَّارِ فِى شَهْرِ رَمَضَانَ ، وَإِنَّ لِكُلِّ مُسْلِمٍ دَعْوَةً مُسْتَجَابَةً
“নিশ্চয়ই রমজানের প্রতি দিন ও রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে (জাহান্নাম থেকে) মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা রয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকের এমন একটি দুআ রয়েছে যা কবুল হয়।” [মুসনাদে আহমদ: ৭৪৫০, সহিহ আত তারগিব: ১০০২]
◈ ৪. শেষ রাতের (সেহরির সময়) দুআ কবুলের আশা ব্যঞ্জক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সময়:
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
“আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং ঘোষণা করেন— কে আছো যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব? কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?” [সহিহ বুখারি: ১১৪৫, সহিহ মুসলিম: ৭৫৮]
মোটকথা, রমজানের দিন ও রাত উভয়ই দুআ ও তওবা কবুলের জন্য অত্যন্ত কার্যকর সময়। বিশেষ করে সেহরির সময় এবং ইফতারের পূর্ব মুহূর্তটি আমাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা পালনের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের সকল হালাল মন বাসনা পূর্ণ করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

হাজত বা বিভিন্ন সমস্যা ও সংকট থেকে মুক্তি লাভ এবং প্রয়োজন পূরণের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যায় নামাজ পড়া কি সুন্নাহ সম্মত আমল

 আমাদের সমাজের কিছু আলেম বিশেষ কোনও প্রয়োজন বা হাজত পূরণের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত (যেমন: ১০০ বা ১০০০ রাকাত) নামাজ পড়ার কথা বলে থাকেন অথচ প্রকৃতপক্ষে ইসলামের শরিয়তে এর কোন ভিত্তি নেই। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু জরুরি বিষয়ে আলোচনা করা হল:

❑ ১. নির্দিষ্ট সংখ্যায় নামাজ পড়া:
কোনও হাজত পূরণের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যায় নামাজ পড়ার ব্যাপারে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কোনও বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়নি। এমনকি সাহাবায়ে কেরাম বা তাবেয়িগণের আমল থেকেও এমন কোনও নজির পাওয়া যায় না। সুতরাং ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের পক্ষ থেকে এমন সংখ্যা নির্দিষ্ট করা বিদআত-এর অন্তর্ভুক্ত।
❑ ২. যৌথভাবে নামাজ ভাগ করে পড়া:
অনেকে মিলে ভাগ করে (যেমন: ৫০ জন মিলে ১০০০ রাকাত) নামাজ আদায় করা আরেকটি নব-উদ্ভাবিত পদ্ধতি বা বিদআত। ইবাদতের মূল কাঠামো পরিবর্তন করে এমন মনগড়া পদ্ধতির আবিষ্কারক এবং প্রচারক মূলত তারাই, যারা সুন্নাহর চেয়ে প্রচলিত প্রথাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। না জেনে এসব অন্ধভাবে অনুসরণ করা দ্বীনি মূর্খতারই বহিঃপ্রকাশ।
৩. নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার সঠিক পদ্ধতি:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কোনও সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেননি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَٱسْتَعِينُوا۟ بِٱلصَّبْرِ وَٱلصَّلَوٰةِ
“আর তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।” [সূরা বাকারা: ৪৫]
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও বিশেষ কোনও সংখ্যা নির্ধারণ করেননি। তাই আমাদের কর্তব্য হল ফরজ, সুন্নত ও সাধারণ নফল নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
◯ নামাজের মধ্যে আল্লাহর অতি নিকটবর্তী হয়ে দোয়া করার দুটি বিশেষ জায়গা রয়েছে:
◈ ক. সিজদা অবস্থায়:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই সেজদা অবস্থায় নিজের হাজতগুলো তুলে ধরে অধিক পরিমাণে দুআ করলে তা আল্লাহর নিকট কবুল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
◈ খ. শেষ তাশাহুদে:
সালাম ফেরানোর আগেও দুআ করার কথা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং এখানেও অধিক পরিমাণে দুআ করা যায়। উভয় ক্ষেত্রে হাদিসে বর্ণিত মাসনুন দুআগুলো পাঠ করা হোক অথবা নিজ ভাষায় প্রয়োজনীয় দুআ করা হোক-উভয়টিই শরিয়ত সম্মত। এছাড়াও যেকোনো নামাজ ও অন্যান্য নেক আমলের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে ইনশাআল্লাহ তিনি মনোবাসনা পূর্ণ করবেন। উল্লেখ্য যে, প্রচলিত ‘সালাতুল হাজত’ সংক্রান্ত হাদিসগুলোও সনদের বিচারে বিশুদ্ধ নয়।
✪ সৌদি আরবের ফতওয়া বোর্ড-এর ফতওয়া:
“أما ما يسمى بصلاة الحاجة: فقد جاءت بأحاديث ضعيفة ومنكرة -فيما نعلم- لا تقوم بها حجة، ولا تصلح لبناء العمل عليها.
“আর যাকে সালাতুল হাজত (প্রয়োজন পূরণের নামাজ) বলা হয়: আমাদের জানামতে এই বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো দুর্বল ও আপত্তিকর—যা দলিল হিসেবে পেশ করার যোগ্য নয় এবং এর ওপর ভিত্তি করে আমল করাও সঠিক নয়।” [ফাতাওয়া লাজনা দায়িমাহ্, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১৬১]
সুতরাং দ্বীনের মধ্যে নিত্য-নতুন পদ্ধতি বা সংখ্যা আবিষ্কার না করে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রদর্শিত সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করাই নাজাতের পথ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহর ওপর অটল থাকার এবং সকল প্রকার বিদআত থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Translate