Monday, October 12, 2026

জয়িফ বা দুর্বল হাদিসের পরিচয়

 জয়িফ বা দুর্বল হাদিসের পরিচয়, চেনার সহজ উপায় এবং হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মতভেদ হলে করণীয়:

প্রশ্ন: দুর্বল হাদিস কাকে বলে? দুর্বল হাদিস চেনার সহজ উপায় কী? আর কোনো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাক্কিক আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলে করণীয় কী?
উত্তর:
🔸জঈফ হাদিস কাকে বলে?
উত্তর: কোন হাদিসে সহিহ বা হাসান হাদিসের এক বা একাধিক শর্ত না পাওয়া গেলে তাকে জঈফ বা দুর্বল হাদিস বলে।
ইবনুস সালাহ বলেন,
الحَدِيثُ الضَّعِيفُ: مَا فَقَدَ أَحَدَ شُرُوطِ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ: أَيْ: كُلُّ حَدِيثٍ لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ، وَكَذَا لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الحَسَنِ، فَهُوَ ضَعِيفٌ، وَهُوَ أَنْوَاعٌ تَزِيدُ عَنِ الخَمْسِينَ نَوْعًا
“যে হাদিসে সহিহ হাদিসের সব শর্ত পাওয়া যায়নি এবং হাসান হাদিসের শর্তও পূর্ণ হয়নি, সেটিই জয়িফ। জয়িফ হাদিসের প্রকার পঞ্চাশের বেশি।” [মুকাদ্দিমা ইবনিস সালাহ, পৃ. ৪১]
🔸জইফ হাদিস চেনার উপায়:
জঈফ বা দুর্বল হাদিস (اَلْحَدِيثُ الضَّعِيفُ) চেনার মূল চাবিকাঠি হলো দুটি বিষয় দেখা: সনদের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হওয়া অথবা বর্ণনাকারীর (রাবির) মধ্যে এমন ত্রুটি থাকা, যার কারণে হাদিসটি বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।
কোনো হাদিস সহিহ হতে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়:
১. সনদের ধারাবাহিকতা
২. বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা (আদালত)
৩. বর্ণনাকারীর সংরক্ষণক্ষমতা (জবত)
৪. শায (شَاذٌّ) না হওয়া, অর্থাৎ অধিক নির্ভরযোগ্য রাবির বিপরীত না হওয়া
৫. গোপন ত্রুটি (عِلَّةٌ) না থাকা
এই শর্তগুলোর এক বা একাধিক শর্ত লঙ্ঘিত হলে হাদিসটি সাধারণত জঈফ হিসেবে গণ্য হয়।
▪️জঈফ হওয়ার প্রধান দুটি কারণ:
ক. সনদের ত্রুটি (اِنْقِطَاعُ السَّنَدِ)
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে হাদিস-সংকলক পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের যে ধারা, তার মাঝখান থেকে এক বা একাধিক রাবি বাদ পড়লে হাদিসটি দুর্বল হয়।
উদাহরণ: কোনো তাবেয়ি যদি মাঝের সাহাবির নাম উল্লেখ না করে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বরাতে হাদিস বর্ণনা করেন, তবে তাকে মুরসাল (اَلْمُرْسَلُ) হাদিস বলে।
মুরসাল সম্পর্কে আলেমদের মতভেদ আছে। জমহুর মুহাদ্দিসের মতে মুরসাল দুর্বল। তবে হানাফি ও মালিকি ফকিহগণ নির্ভরযোগ্য তাবিঈর মুরসাল গ্রহণ করেন আর ইমাম শাফিঈ (রাহ.) কিছু শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করেন।
খ. বর্ণনাকারীর ত্রুটি (طَعْنٌ فِي الرَّاوِي):
১. স্মৃতিশক্তি ও সংরক্ষণে দুর্বলতা: রাবির স্মৃতিশক্তি প্রখর না হলে, কিংবা তিনি হাদিস ওলটপালট করে ফেললে বা অতিমাত্রায় ভুল করলে।
২. চরিত্রগত ত্রুটি: রাবি মিথ্যাবাদী, মিথ্যায় অভিযুক্ত বা পাপাচারী (ফাসিক) হলে। এর স্তরভেদ আছে:
– প্রমাণিত মিথ্যাবাদীর হাদিস মাওযূ (اَلْمَوْضُوعُ) বা জাল।
– মিথ্যায় অভিযুক্ত রাবির হাদিস মাতরূক (اَلْمَتْرُوكُ) বা পরিত্যক্ত।
৩. অজ্ঞাত রাবি: রাবির পরিচয় বা অবস্থা জানা না থাকলে (اَلْمَجْهُولُ)।
৪. কিতাব বা পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণে ত্রুটি: রাবি নিজের লিখিত কিতাব বা পাণ্ডুলিপি ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলে।
▪️আধুনিক যুগে সাধারণ মানুষ কীভাবে চিনবে?
সাধারণ মুসলিমদের পক্ষে মূল আরবি সনদ যাচাই করা কঠিন। তাই সহজ উপায় হলো মুহাদ্দিসদের রায় দেখা:
– হাদিসের কিছু কিতাবের সংস্করণে বর্তমান যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের (যেমন আল্লামা আলবানি, শায়খ শুআইব আরনাউত) হুকুম বা তাহকিক পাওয়া যায়। সেখানে হাদিসের পাশে “জঈফ” (ضَعِيفٌ) লেখা থাকলে সহজেই চেনা যায়।
– সুনানে তিরমিজিতে ইমাম তিরমিজি নিজেও অনেক হাদিসের মান উল্লেখ করেছেন।
▪️জঈফ মানেই কি সর্বদা প্রত্যাখ্যাত?
না, হালকা দুর্বলতার কোনো হাদিস যদি একাধিক সনদে সমর্থিত হয় তবে তা হাসান লিগাইরিহি (حَسَنٌ لِغَيْرِهِ) স্তরে উন্নীত হতে পারে। তবে মারাত্মক দুর্বলতার হাদিস (যেমন মিথ্যাবাদী রাবির) একাধিক সনদেও শক্তিশালী হয় না।
▪️আলেমদের মতভেদ থাকলে করণীয়:
কোনো হাদিসের মান নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মতভেদ থাকলে একজন সাধারণ মুসলিমের করণীয়:
১. নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞের মত গ্রহণ:
হাদিসের মান সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ণীত হয় না, হয় ইলমের গভীরতা ও দলিলের শক্তির ভিত্তিতে। তাই যে মুহাদ্দিসের তাহকিক অধিক নির্ভরযোগ্য ও উম্মাহর কাছে সমাদৃত, তাঁর মতকে অগ্রাধিকার দিন।
২. ইমান-আকিদা ও হালাল-হারামের ক্ষেত্রে সতর্কতা: এসব বিষয়ে কোনো হাদিস নিয়ে জোরালো মতভেদ থাকলে সেটির ওপর নির্ভর না করাই উত্তম। কারণ ইবাদত ও আকিদার ভিত্তি গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণিত উৎসের ওপর হওয়া উচিত।
৩. ফাজায়েলের ক্ষেত্রে জঈফ হাদিস:
একদল আলেমের মতে কিছু শর্তে ফাজায়েলে (ভালো কাজের ফজিলতে) জঈফ হাদিস আমলযোগ্য। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী শর্ত তিনটি:
– (ক) দুর্বলতা মারাত্মক না হওয়া।
– (খ) হাদিসটি কোনো প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত হওয়া।
– (গ) আমলের সময় এটিকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে প্রমাণিত বলে বিশ্বাস না করা।
তবে অনেক মুহাদ্দিস ফাজায়েলের ক্ষেত্রেও জঈফ হাদিস অনুযায়ী আমল না করার পক্ষে মত দিয়েছেন, আর তাঁদের মতকেই অনেক মুহাদ্দিস অগ্রগণ্য মনে করেন। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
৪. উদার মনোভাব: এটি ইজতিহাদি (গবেষণামূলক) বিষয়। কোনো আলেম একটি হাদিসকে সহিহ বললে আর অন্যজন জঈফ বললে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্ক বা কাদা ছোড়াছুড়ি করা উচিত নয়। উভয় পক্ষের আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক ইলম অর্জনের এবং সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

সহিহ হাদিস কাকে বলে

 প্রশ্ন: সহিহ হাদিস কাকে বলে?

হাদীস:
🔸‘সহিহ’-এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় ইমাম ইবনুস সালাহ (রহ.) বলেন:
«أَمَّا الْحَدِيثُ الصَّحِيحُ: فَهُوَ الْحَدِيثُ الْمُسْنَدُ الَّذِي يَتَّصِلُ إِسْنَادُهُ بِنَقْلِ الْعَدْلِ الضَّابِطِ عَنِ الْعَدْلِ الضَّابِطِ إِلَى مُنْتَهَاهُ، وَلَا يَكُونُ شَاذًّا وَلَا مُعَلَّلًا»
“সহিহ হাদিস হলো সেই মুসনাদ (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সনদ পৌঁছেছে এমন) হাদিস, যার সনদ (বর্ণনা পরম্পরা) আদিল (ন্যায়পরায়ণ ও সৎ) ও পূর্ণ আয়ত্তশক্তিসম্পন্ন বর্ণনাকারী কর্তৃক আদিল ও পূর্ণ আয়ত্তশক্তিসম্পন্ন বর্ণনাকারী থেকে সনদের শেষ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে বর্ণিত এবং যা শায (অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত) বা মুআল্লাল (গোপন ত্রুটিযুক্ত) নয়।” [মুকাদ্দিমা ইবনিস সালাহ]
শব্দগুলোর ব্যাখ্যা:
– মুসনাদ: যার সনদ বা বর্ণনা সূত্র রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে পৌঁছেছে। (তবে মুসনাদের সংজ্ঞায় মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছু মতভেদ আছে।)
– আদিল: যে বর্ণনাকারী মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান, কবিরা গুনাহ ও প্রকাশ্য ফিসক থেকে মুক্ত এবং মুরুআত (ব্যক্তিত্ব ও শিষ্টাচার) বিরোধী কাজ থেকে বিরত।
– শায: কোনো গ্রহণযোগ্য (সিকাহ) বর্ণনাকারী যদি তাঁর চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য বা সংখ্যায় বেশি বর্ণনাকারীর বিপরীত বর্ণনা করেন তাহলে সেই বর্ণনা শায।
– মুআল্লাল: যে হাদিসের সনদ বা মতনে এমন সূক্ষ্ম ও গোপন ত্রুটি (ইল্লত) আছে, যা বাহ্যিকভাবে সহিহ মনে হলেও গভীর অনুসন্ধানে ধরা পড়ে।
🔸 হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন:
«وَخَبَرُ الآحَادِ بِنَقْلِ عَدْلٍ تَامِّ الضَّبْطِ، مُتَّصِلِ السَّنَدِ، غَيْرِ مُعَلَّلٍ وَلَا شَاذٍّ: هُوَ الصَّحِيحُ لِذَاتِهِ»
“যে খবরে আহাদ ন্যায়পরায়ণ ও পূর্ণ আয়ত্তশক্তির অধিকারী বর্ণনাকারীর মাধ্যমে অবিচ্ছিন্ন সনদ পরম্পরায় বর্ণিত হয় এবং মুআল্লাল (গোপন ত্রুটিযুক্ত) ও শায (অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত) নয়, সেটিই সহিহ লি-যাতিহি।” [নুখবাতুল ফিকার]
উল্লেখ্য যে, হাফেজ ইবনে হাজার নুখবাতুল ফিকার-এ খবরকে প্রথমে মুতাওয়াতির ও আহাদে ভাগ করেছেন। মুতাওয়াতিরের বর্ণনাকারীর সংখ্যা এত বেশি যে তাঁদের মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব। তাই এর সত্যতা প্রমাণে আদালত, জব্‌ত ইত্যাদি শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজন পড়ে না। এসব শর্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে খবরে আহাদের ক্ষেত্রে। তাই তিনি আহাদের আলোচনায় এই সংজ্ঞা দিয়েছেন।
🔹মোটকথা: হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য ৫টি শর্ত থাকা আবশ্যক। যথা:
১. অবিচ্ছিন্ন সনদ: হাদিসটি এমন অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত হওয়া, যার কোথাও একজন বর্ণনাকারীও বাদ পড়েননি।
২. আদালত: সনদের প্রত্যেক বর্ণনাকারী সততা ও ন্যায়নিষ্ঠায় প্রশ্নাতীত হওয়া।
৩. পূর্ণ আয়ত্তশক্তি (জব্‌ত): বর্ণনাকারী পূর্ণ আয়ত্তশক্তির অধিকারী হওয়া, অর্থাৎ হাদিস সংরক্ষণে কোনো ত্রুটি না থাকা, চাই তা মুখস্থ রাখার ক্ষেত্রে হোক বা লিখে রাখার ক্ষেত্রে।
৪. শায না হওয়া: বর্ণনাকারীর বর্ণনা তাঁর চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বিপরীত না হওয়া।
৫. মুআল্লাল না হওয়া: হাদিস বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সনদ বা মতনে কোনো গোপন ত্রুটি ধরা না পড়া।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

প্রতি মাসে কুরআন খতম করা একটি অবহেলিত সুন্নাহ

 প্রশ্ন: প্রতি মাসে অন্তত একবার কুরআন কারিম শেষ করা কি সুন্নাহসম্মত?

উত্তর: হ্যাঁ, প্রতি মাসে অন্তত একবার পুরো কুরআন খতম করা একটি বরকতময় আমল, যার ভিত্তি সহিহ হাদিসে আছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর আগ্ৰহ ও আমলের আধিক্য জানতে পেরে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে প্রতি মাসে একবার খতম করার নির্দেশনা দেন।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اقْرَأِ الْقُرْآنَ فِي كُلِّ شَهْرٍ»، قَالَ: قُلْتُ: إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ: «فَاقْرَأْهُ فِي عِشْرِينَ لَيْلَةً»، قَالَ: قُلْتُ: إِنِّي أَجِدُ قُوَّةً، قَالَ: «فَاقْرَأْهُ فِي سَبْعٍ وَلَا تَزِدْ عَلَى ذَلِكَ»
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন: “তুমি প্রতি মাসে একবার কুরআন খতম করো।”
আমি বললাম: “আমার এর চেয়ে বেশি পড়ার শক্তি আছে।”
তিনি বললেন: “তাহলে বিশ রাতে খতম করো।”
আমি আবার বললাম: “আমার আরও শক্তি আছে।”
তিনি বললেন: “তাহলে সাত দিনে খতম করো এবং এর বেশি বাড়িয়ো না।” [সুনানে আবু দাউদ, ১৩৮৮, সহিহ]
তবে তিলাওয়াতে তাড়াহুড়ো না করে বোঝার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
«لَا يَفْقَهُ مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ فِي أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثٍ»
“যে ব্যক্তি তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করে, সে তা বুঝতে পারে না।” [সুনানে আবু দাউদ, ১৩৯০, সহিহ]
▪️ফতওয়ায়ে বিন বায (রাহ.):
শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, প্রতি মাসে কুরআন খতমের রুটিন রাখা কি বিদআত?
তিনি উত্তরে বলেন:
فَخَتْمُ الْقُرْآنِ فِي كُلِّ شَهْرٍ أَمْرٌ مَطْلُوبٌ مَشْرُوعٌ، النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِهِ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو، كَانَ يَخْتِمُهُ كُلَّ يَوْمٍ فَقَالَ لَهُ: يَخْتِمُهُ فِي كُلِّ شَهْرٍ، يَقْرَؤُهُ فِي كُلِّ شَهْرٍ. فَإِذَا رَتَّبَ الرَّجُلُ أَوِ الْمَرْأَةُ خَتْمَ الْقُرْآنِ فِي كُلِّ شَهْرٍ، فَهُوَ حَسَنٌ وَمَشْرُوعٌ، أَمَرَ بِهِ النَّبِيُّ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ. وَإِنْ خَتَمَهُ فِي أَقَلَّ أَوْ فِي أَكْثَرَ فَلَا حَرَجَ، وَلَكِنَّ الْأَفْضَلَ أَلَّا يَنْزِلَ عَنْ سَبْعٍ، إِذَا كَانَ عِنْدَهُ اجْتِهَادٌ وَأَحَبَّ أَنْ يَخْتِمَ فِي سَبْعٍ فَلَا بَأْسَ.
“প্রতি মাসে কুরআন খতম করা একটি কাঙ্ক্ষিত ও শরিয়তসম্মত আমল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) কে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন, যিনি প্রতিদিন একবার খতম করতেন। তিনি তাঁকে বললেন, প্রতি মাসে একবার খতম করতে। তাই কোনো পুরুষ বা নারী যদি প্রতি মাসে খতমের রুটিন ঠিক করেন তবে তা উত্তম ও শরিয়তসম্মত, যার নির্দেশ নবী (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) দিয়েছেন। আর কেউ এর চেয়ে কম বা বেশি সময়ে খতম করলেও কোনো অসুবিধা নেই। তবে উত্তম হলো সাত দিনের কম সময়ে খতম না করা। কারও যদি বেশি পরিশ্রমের আগ্রহ থাকে এবং তিনি সাত দিনে খতম করতে চান, তাতে কোনো বাধা নেই।” [ফতোয়া নূরুন আলাদ দারব, শাইখ বিন বায]
▪️ইমাম নওয়াবি উল্লেখ করেছেন,
أَنَّ الْمُخْتَارَ اخْتِلَافُ ذَلِكَ بِحَالِ النَّاسِ. قَالَ السُّيُوطِيُّ فِي «الْإِتْقَانِ»: أَخْرَجَ ابْنُ أَبِي دَاوُدَ، عَنْ مَكْحُولٍ، قَالَ: كَانَ أَقْوِيَاءُ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ فِي سَبْعٍ، وَبَعْضُهُمْ فِي شَهْرٍ، وَبَعْضُهُمْ فِي شَهْرَيْنِ، وَبَعْضُهُمْ فِي أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ. اهـ
“নির্বাচিত মত হলো, এ বিষয়ে সময়ের পরিমাণ মানুষের অবস্থাভেদে ভিন্ন হয়। ইমাম সুয়ূতি আল-ইতকান গ্রন্থে বলেন: ইবনে আবু দাউদ মাকহূল থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের মধ্যে যাঁরা শক্তিশালী ছিলেন, তাঁরা সাত দিনে কুরআন পড়তেন। তাঁদের কেউ কেউ এক মাসে, কেউ কেউ দুই মাসে এবং কেউ কেউ তার চেয়েও বেশি সময়ে পড়তেন।”
▪️ কীভাবে সহজে মাসে একবার খতম করবেন?
প্রতিদিন এক পারা করে তিলাওয়াত করলে ৩০ দিনে ৩০ পারা শেষ হয়। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর চার পৃষ্ঠা করে পড়লে একদিনে এক পারা (প্রায় ২০ পৃষ্ঠা) সহজেই হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করার এবং তা বোঝার তাওফিক দিন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

ইমাম গাজালি এর কিতাবাদী পড়া এবং বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

 ইমাম গাজালি (রহ.)-এর কিতাবাদী পড়া: বিজ্ঞ আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রশ্ন: ইমাম গাজালি তো সহিহ আকিদার ছিলেন না। তাঁর থেকে ইলম নেওয়ার বিধান কী?
উত্তর: আবু হামেদ আল-গাজালি (১০৫৮–১১১১ খ্রি.-খোরাসান) ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত একজন চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁকে বিশাল ইসলামি পণ্ডিত ও মুসলিম দার্শনিক মনে করা হলেও বিশুদ্ধ আকিদা ও সুন্নাহর মানদণ্ডে তাঁর বহু দৃষ্টিভঙ্গি তীব্র সমালোচনার যোগ্য। বিশেষ করে তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহে আকিদা ও তাসাউফ-সংক্রান্ত আলোচনায় গ্রীক দর্শন, ইলমে কালাম ও সুফিবাদের বিভ্রান্তিকর তত্ত্বের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে যা সাধারণ মুসলিমদের আকিদা ও ইমানের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আকিদার ক্ষেত্রে তিনি গোঁড়া আশআরি মতবাদের অনুসারী ছিলেন এবং সুফিবাদের নামে নানা বিদআতি ও জটিল দর্শন প্রচার করেছেন। ভারত উপমহাদেশেও তাঁর গ্রন্থাবলী ও চিন্তা-চেতনা ব্যাপকভাবে পঠিত হলেও, সহিহ সুন্নাহর অনুসারী উলামায়ে কেরাম তাঁর আকিদাগত বিভ্রান্তি, গ্রীক দর্শনের তোষণ এবং জইফ-জাল হাদিস নির্ভর আলোচনার কারণে তাঁকে অত্যন্ত কঠোরভাবে মূল্যায়ন ও সমালোচনা করেছেন। এর চেয়েও মারাত্মক বিষয় হলো, তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’-এ ভুরি ভুরি দুর্বল (জইফ) এবং মনগড়া ও বানোয়াট (জাল) হাদিস রয়েছে। সঠিক আকিদার গভীর ইলম এবং সুন্নাহর বিশুদ্ধতা প্রমাণের যোগ্যতা না থাকলে এসব বিষাক্ত ও বিভ্রান্তিকর আলোচনা সাধারণ দ্বীনদারদের ইমানকে পথভ্রষ্ট করে তুলতে পারে। তাই পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সহিহ সুন্নাহর শক্ত ভিত্তি ছাড়া তাঁর ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ বা কালামশাস্ত্রের কিতাবসমূহ স্পর্শ করাও সাধারণ পাঠকের জন্য একেবারেই নিরাপদ নয়। কেবল সেই সব বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনই তাঁর রচনা থেকে চরম সতর্কতা অবলম্বন করে জ্ঞান আহরণ করতে পারেন, যাঁদের সঠিক ও ভ্রান্ত চিন্তা আলাদা করার এবং সহিহ ও জাল হাদিসের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিরূপণ করার পূর্ণ দক্ষতা রয়েছে। ‘ইহয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে হাদিসের নামে যেসব বানোয়াট কথা স্থান পেয়েছে, তা থেকে উম্মাহকে সতর্ক করতে মুহাদ্দিসগণ যুগ যুগ ধরে কঠিন ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন: হাফেজ ইরাকি (রহ.)-এর মতো প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ এ গ্রন্থের হাদিসগুলোর তাখরিজ করে এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা দুর্বল ও জাল বর্ণনাগুলোকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ও উন্মোচিত করেছেন। ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)-ও এ গ্রন্থের বিভ্রান্তি ও হাদিস জালিয়াতির বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তীতে আধুনিক যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি (রহ.) এ গ্রন্থের হাদিসগুলোর বিস্তারিত তাহকিক ও তাখরিজ পেশ করে সত্য-মিথ্যাকে স্পষ্টভাবে পৃথক করে দিয়েছেন। অতএব, সুন্নাহর অনুসরণে সচেতন প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক হলো, এ ধরনের ভ্রষ্ট সুফিবাদ, ভ্রান্ত আকিদা ও জইফ-জাল হাদিসে ভরা কিতাব সরাসরি পাঠ করা থেকে বিরত থাকা। যদি কেউ পাঠ করতেই চায় তবে অবশ্যই হাফেজ আল-ইরাকি (রহ.) বা শায়খ আলবানি (রহ.)-এর তাহকিককৃত সংস্করণ কিংবা সুন্নাহর অনুসারী নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের সতর্কতামূলক ব্যাখ্যা ও টীকা-সংবলিত সংস্করণই কেবল গ্রহণ করা উচিত।
❑ ইমাম গাজালি ও তাঁর লিখিত বই-পুস্তকের ব্যাপারে পূর্ববর্তী আলেমদের অবস্থান:
এ বিষয়ে যুগে যুগে বিজ্ঞ ও সচেতন আলেমগণ জাতিকে সতর্ক করে এসেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে কয়েকজনের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
✪ ১. কাজি ইয়াজ (মৃত্যু: ৫৪৪ হি.) বলেন,
«وَالشَّيْخُ أَبُو حَامِدٍ ذُو الْأَنْبَاءِ الشَّنِيعَةِ، وَالتَّصَانِيفِ الْفَظِيعَةِ، غَلَا فِي طَرِيقَةِ التَّصَوُّفِ، وَتَجَرَّدَ لِنَصْرِ مَذَاهِبِهِمْ، وَصَارَ دَاعِيَةً فِي ذَلِكَ، وَأَلَّفَ فِيهِ تَوَالِيفَهُ الْمَشْهُورَةَ، أُخِذَ عَلَيْهِ فِيهَا مَوَاضِعُ، وَسَاءَتْ بِهِ ظُنُونُ أُمَّةٍ، وَاللهُ أَعْلَمُ بِسِرِّهِ، وَنَفَذَ أَمْرُ السُّلْطَانِ عِنْدَنَا بِالْمَغْرِبِ وَفَتْوَى الْفُقَهَاءِ بِإِحْرَاقِهَا وَالْبُعْدِ عَنْهَا، فَامْتُثِلَ ذَلِكَ».
[سِيَرُ أَعْلَامِ النُّبَلَاءِ، ١٩/٣٢٧]
“শায়খ আবু হামেদ (গাজালি) যাঁর সম্পর্কে নানাবিধ গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং যাঁর বেশ কিছু লেখালেখি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তিনি তাসাউফের পথে অতিমাত্রায় নিমগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। সুফিদের মতবাদ সমর্থনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়ে তিনি এর একনিষ্ঠ প্রচারকে পরিণত হন এবং এ বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত বইগুলো রচনা করেন। তবে এসব লেখার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলেমদের প্রবল আপত্তি ছিল, যা অনেক মানুষের মনে তাঁর সম্পর্কে চরম সংশয় ও নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। অবশ্য তাঁর ভেতরের আসল নিয়ত আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের মাগরেব (পশ্চিম মুসলিম বিশ্ব) অঞ্চলে সুলতানের রাজকীয় ফরমান এবং ফকিহদের ফতোয়া অনুযায়ী তাঁর বইগুলো পুড়িয়ে ফেলার ও তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ জারি করা হয়, আর আমলও করা হয় সেই নির্দেশ অনুসারেই।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৯/৩২৭]
✪ ২. ইমাম ইবনুল জাওজি (মৃত্যু: ৫৯৭ হি.) বলেন,
«اعْلَمْ أَنَّ فِي كِتَابِ الْإِحْيَاءِ آفَاتٍ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا الْعُلَمَاءُ، وَأَقَلُّهَا الْأَحَادِيثُ الْبَاطِلَةُ الْمَوْضُوعَةُ، وَإِنَّمَا نَقَلَهَا كَمَا اقْتَرَاهَا ـ جَمَعَهَا ـ لَا أَنَّهُ افْتَرَاهَا، وَلَا يَنْبَغِي التَّعَبُّدُ بِحَدِيثٍ مَوْضُوعٍ وَالِاغْتِرَارُ بِلَفْظٍ مَصْنُوعٍ، وَكَيْفَ أَرْتَضِي لَكَ أَنْ تُصَلِّيَ صَلَوَاتِ الْأَيَّامِ وَاللَّيَالِي، وَلَيْسَ فِيهَا كَلِمَةٌ قَالَهَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكَيْفَ أُوثِرُ أَنْ يَطْرُقَ سَمْعَكَ مِنْ كَلَامِ الْمُتَصَوِّفَةِ الَّذِي جَمَعَهُ وَنَدَبَ إِلَى الْعَمَلِ بِهِ مَا لَا حَاصِلَ لَهُ مِنَ الْكَلَامِ فِي الْفَنَاءِ، وَالْبَقَاءِ، وَالْأَمْرِ بِشِدَّةِ الْجُوعِ، وَالْخُرُوجِ إِلَى السِّيَاحَةِ فِي غَيْرِ حَاجَةٍ، وَالدُّخُولِ فِي الْفَلَاةِ بِغَيْرِ زَادٍ، إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِمَّا قَدْ كَشَفْتُ عَنْ عَوَارِهِ فِي كِتَابِي تَلْبِيسِ إِبْلِيسَ».
“জেনে রেখো, ‘এহইয়া’ গ্রন্থে এমন কিছু গুরুতর ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে, যা বিজ্ঞ আলেম ছাড়া সাধারণ মানুষের ধরা কঠিন। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ক্ষতিকর বিষয় হলো বাতিল ও জাল হাদিসের সংযোজন। তবে তিনি এসব নিজে বানিয়ে লেখেননি, বরং বিভিন্ন সূত্রে যেভাবে পেয়েছেন সেভাবেই সংগ্রহ করে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাই বলে জাল হাদিসের ওপর ভিত্তি করে ইবাদত করা কিংবা মনগড়া কথার ফাঁদে পা দেওয়া তো মোটেও সংগত নয়।
আমি কীভাবে এটা মেনে নিই যে, তুমি দিন-রাতের বিশেষ কিছু নামাজ পড়ে কাটিয়ে দেবে অথচ তার এক বর্ণও রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখ নিঃসৃত নয়? আর কেনই-বা আমি চাইব যে, সুফিদের এমন সব অসার কথাবার্তা তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাক যা তিনি গ্রন্থে একত্র করে অনুসরণের তাগিদ দিয়েছেন? যেমন: ফানা ও বাকার অবাস্তব তত্ত্ব, প্রচণ্ড ক্ষুধা সহ্য করার সাধনা, অহেতুক দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো, কিংবা কোনও পাথেয় ছাড়া ভয়াল মরুভূমিতে নেমে পড়ার মতো নির্দেশসমূহ। এসব বিষয়ের অসারতা ও ক্ষতিকর রূপ আমি আমার ‘তালবিসু ইবলিস’ গ্রন্থে বিস্তারিত উন্মোচন করে দিয়েছি।” [মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন, পৃ. ১৬–১৭]
✪ ৩. ইমাম জাহাবি (মৃত্যু: ৭৪৮ হি.) বলেন,
«أَمَّا الْإِحْيَاءُ فَفِيهِ مِنَ الْأَحَادِيثِ الْبَاطِلَةِ جُمْلَةٌ، وَفِيهِ خَيْرٌ كَثِيرٌ لَوْلَا مَا فِيهِ مِنْ آدَابٍ وَرُسُومٍ وَزُهْدٍ مِنْ طَرَائِقِ الْحُكَمَاءِ، وَمُنْحَرِفِي الصُّوفِيَّةِ، نَسْأَلُ اللهَ عِلْمًا نَافِعًا. وَقَامَ الْمَلِكُ عَلِيُّ بْنُ يُوسُفَ بْنِ تَاشْفِينَ مَلِكُ الْمُرَابِطِينَ بِإِحْرَاقِ كِتَابِ الْإِحْيَاءِ. قَالَ الذَّهَبِيُّ: وَكَانَ شُجَاعًا مُجَاهِدًا عَادِلًا دَيِّنًا وَرِعًا صَالِحًا، مُعَظِّمًا لِلْعُلَمَاءِ مُشَاوِرًا لَهُمْ».
“‘ইহইয়া’ গ্রন্থে বেশ কিছু বাতিল ও বানোয়াট হাদিস রয়েছে। অবশ্য এতে প্রচুর কল্যাণকর আলোচনাও আছে যদি না এতে দার্শনিকদের ঢং এবং বিচ্যুত সুফিদের পথ থেকে নেওয়া কিছু আচার-অনুষ্ঠান ও সন্ন্যাসব্রতের অনুপ্রবেশ ঘটত। আমরা আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞানের প্রার্থনা করি। আর মুরাবিতুন সাম্রাজ্য [Almoravid Dynasty-১০৪০-১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দ] শাসক বাদশাহ আলি ইবনে ইউসুফ ইবনে তাশফিন ‘ইহইয়া’ গ্রন্থটি পুড়িয়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেন।” ইমাম জাহাবি আরও বলেন: “তিনি (আলি ইবনে ইউসুফ) ছিলেন অত্যন্ত বীর, মুজাহিদ, ন্যায়পরায়ণ, দ্বীনদার, পরহেজগার ও সৎ এক শাসক; তিনি আলেমদের গভীর শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতেন।” [সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২০/১২৪] গাজালি ও তার রচিত কিতাবাদীর ব্যাপারে পূর্ববর্তী বিজ্ঞ আলেমদের পক্ষ থেকে সতর্কী করণ মূলক আরও অনেক বক্তব্য আছে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে বিশুদ্ধ আকিদার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহিহ সুন্নাহ অনুসরণে জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন। তৎসঙ্গে সব রকম ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস এবং বাতিল এবং ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড ও আচার-অনুষ্ঠান থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

অটোরিকশা টুকটুক ইত্যাদির লাইসেন্স ভাড়া দেওয়ার শরয়ি ও আইনগত বিধান

 অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার, টুকটুক ইত্যাদির লাইসেন্স ভাড়া দেওয়ার শরয়ি ও আইনগত বিধান

প্রশ্ন: যারা লাইসেন্সের ব্যবসা করে অর্থাৎ অটোরিকশার লাইসেন্স ভাড়া দেয়। এটি কি হালাল ব্যবসা?
উত্তর: অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার, টুকটুক ইত্যাদি মটরযানের লাইসেন্স ভাড়া দেওয়া ইসলামি শরিয়ত এবং দেশের প্রচলিত আইন উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সম্পূর্ণ অবৈধ ও নিষিদ্ধ। সঙ্গত কারণে এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থও হারাম। কারণ লাইসেন্স হলো একটি ব্যক্তিগত অনুমতিপত্র বা সনদ যা কোনো ভাড়া দেওয়ার মতো বাণিজ্যিক পণ্য নয়। অর্থের বিনিময়ে এটি অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়া প্রতারণা ও আইনগত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
কেন হারাম তার কয়েকটি কারণ—
✪ ১. লাইসেন্স নেওয়ার সময় সরকারের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তা ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়। অথচ ইসলামে চুক্তি ও অঙ্গীকার রক্ষা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
“হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।” [সূরা মায়িদাহ: ১]
✪ ২. লাইসেন্স মূলত নির্দিষ্ট ব্যক্তির অনুকূলে ইস্যু করা হয়। এটি অন্য কেউ ব্যবহার করলে তা ধোঁকাবাজির শামিল। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
“যে আমাদের সাথে ধোঁকাবাজি করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” [সহীহ মুসলিম: ১০১]
✪ ৩. অযোগ্য বা লাইসেন্সহীন কোনো চালক অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে গাড়ি চালালে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ হুমকির মুখে পড়ে। ইসলামে অন্যকে ক্ষতি বা বিপদে ফেলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
لاَ ضَرَر وَلاَ ضِرَارَ
“কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪০]
❑ উপার্জনের সঠিক পদ্ধতি:
গাড়ি বা অটো থেকে আয় করতে চাইলে নিজের নামে ইস্যুকৃত মটরযানটি কোনো দক্ষ ও বিশ্বস্ত চালকের কাছে নির্ধারিত দৈনিক বা মাসিক ভাড়ায় চুক্তি অনুযায়ী দেওয়া যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে চালকের অবশ্যই নিজস্ব বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাস, হায়েস, পিকআপ, বাস, মাইক্রো বাস, মিনিবাস, ট্রাক ইত্যাদি সকল প্রকার মটরযানের ক্ষেত্রেই একই বিধান প্রযোজ্য।
❑ প্রচলিত আইনগত বিধান:
বাংলাদেশের ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এবং মোটরযান বিধিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্স হস্তান্তর বা ভাড়া দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
◆ ড্রাইভিং লাইসেন্স একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দলিল। এর মালিক কোনোভাবেই এটি অন্য কাউকে হস্তান্তর বা ভাড়া দিতে পারেন না।
◆ ভাড়া দেওয়া লাইসেন্স দিয়ে গাড়ি চালানো অবস্থায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মূল লাইসেন্সধারী ব্যক্তিও অপরাধের সহযোগী হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাঁর লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত হতে পারে।
◆ অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে গাড়ি চালালে সংশ্লিষ্ট চালকের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
সুতরাং হালাল পন্থায় জীবিকা অর্জনে, সুনাগরিক হিসেবে দেশের আইন মেনে চলা এবং আইনগত জটিলতা এড়াতে লাইসেন্স ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

বিতরের পর বসে দুই রাকাত নামাজ

 প্রশ্ন: বিতর শেষ করার পর বসে বসে দুই রাকাত নামাজ পড়ার বিধান কী? এর কি কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল আছে?

উত্তর: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে:
«اجْعَلُوا آخِرَ صَلَاتِكُمْ بِاللَّيْلِ وِتْرًا»
“তোমরা রাতের সর্বশেষ নামাজ বিতর করো।” [সহিহ বুখারি: ৯৯৮] তবে সহিহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে:
«كُنَّا نُعِدُّ لَهُ سِوَاكَهُ وَطَهُورَهُ، فَيَبْعَثُهُ اللَّهُ مَا شَاءَ أَنْ يَبْعَثَهُ مِنَ اللَّيْلِ، فَيَتَسَوَّكُ وَيَتَوَضَّأُ، وَيُصَلِّي تِسْعَ رَكَعَاتٍ لَا يَجْلِسُ فِيهَا إِلَّا فِي الثَّامِنَةِ، فَيَذْكُرُ اللَّهَ وَيَحْمَدُهُ وَيَدْعُوهُ، ثُمَّ يَنْهَضُ وَلَا يُسَلِّمُ، ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي التَّاسِعَةَ، ثُمَّ يَقْعُدُ فَيَذْكُرُ اللَّهَ وَيَحْمَدُهُ وَيَدْعُوهُ –يعني: يَتَشَهَّدُ–، ثُمَّ يُسَلِّمُ تَسْلِيمًا يُسْمِعُنَا، ثُمَّ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ بَعْدَمَا يُسَلِّمُ وَهُوَ قَاعِدٌ، فَتِلْكَ إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يَا بُنَيَّ، فَلَمَّا أَسَنَّ نَبِيُّ اللَّهِ –صلى الله عليه وسلم– وَأَخَذَهُ اللَّحْمُ أَوْتَرَ بِسَبْعٍ، وَصَنَعَ فِي الرَّكْعَتَيْنِ مِثْلَ صَنِيعِهِ الْأَوَّلِ، فَتِلْكَ تِسْعٌ يَا بُنَيَّ، وَكَانَ نَبِيُّ اللَّهِ –صلى الله عليه وسلم– إِذَا صَلَّى صَلَاةً أَحَبَّ أَنْ يُدَاوِمَ عَلَيْهَا»
“আমরা তাঁর জন্য মিসওয়াক ও ওজুর পানি প্রস্তুত রাখতাম। রাতে আল্লাহ যখন চাইতেন তাঁকে জাগিয়ে দিতেন। তিনি মিসওয়াক করতেন ও ওজু করতেন। তারপর নয় রাকাত নামাজ পড়তেন। অষ্টম রাকাত ছাড়া কোনো রাকাতে বসতেন না। সেখানে আল্লাহর জিকির করতেন, তাঁর প্রশংসা করতেন ও দোয়া করতেন। এরপর সালাম না ফিরিয়ে উঠে দাঁড়াতেন এবং নবম রাকাত পড়তেন। তারপর বসে আল্লাহর জিকির, প্রশংসা ও দোয়া করতেন এবং আমাদের শুনিয়ে সালাম ফেরাতেন। সালামের পর বসা অবস্থায় আরও দুই রাকাত পড়তেন। হে বৎস, এই হলো এগারো রাকাত। যখন নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বয়স হলো এবং শরীর ভারী হয়ে গেল তখন তিনি সাত রাকাত বিতর পড়তেন এবং ওই দুই রাকাত আগের মতোই পড়তেন। হে বৎস, এই হলো নয় রাকাত। আর আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোনো নামাজ পড়লে তাতে নিয়মিত থাকা পছন্দ করতেন।” [সহিহ মুসলিম: ৭৪৬]
▪️ ইমাম নওয়াবি শরহু মুসলিম-এ উল্লেখ করেছেন:
(الصَّوَابُ أَنَّ هَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ فَعَلَهُمَا –صلى الله عليه وسلم– بَعْدَ الْوِتْرِ جَالِسًا؛ لِبَيَانِ جَوَازِ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْوِتْرِ، –يعني: وَأَنَّ الْأَمْرَ بِجَعْلِ الْوِتْرِ آخِرَ الصَّلَاةِ إِنَّمَا هُوَ لِلِاسْتِحْبَابِ لَا عَلَى سَبِيلِ الْوُجُوبِ–، وَبَيَانِ جَوَازِ النَّفْلِ جَالِسًا، وَلَمْ يُوَاظِبْ عَلَى ذَلِكَ –صلى الله عليه وسلم–، بَلْ فَعَلَهُ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ أَوْ مَرَّاتٍ قَلِيلَةً)
“সঠিক কথা হলো, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দুই রাকাত বিতরের পর বসে পড়েছেন বিতরের পর নামাজ পড়া যে জায়েজ তা বোঝানোর জন্য। অর্থাৎ বিতরকে শেষ নামাজ করার নির্দেশটি মুস্তাহাব; ওয়াজিব হিসেবে নয়। পাশাপাশি বসে নফল পড়া যে জায়েজ তা স্পষ্ট করাও এর উদ্দেশ্য ছিল। তবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটি নিয়মিত করেননি; বরং একবার, দুইবার বা অল্প কয়েকবার করেছেন।”
▪️ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর মাজমুউল ফাতাওয়া কিতাবে বলেছেন,
(وَأَمَّا صَلَاةُ الرَّكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْوِتْرِ فَهَذِهِ رَوَى فِيهَا مُسْلِمٌ فِي صَحِيحِهِ إِلَى النَّبِيِّ –صلى الله عليه وسلم– أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّي بَعْدَ الْوِتْرِ رَكْعَتَيْنِ وَهُوَ جَالِسٌ، وَرُوِيَ ذَلِكَ مِنْ حَدِيثِ أُمِّ سَلَمَةَ فِي بَعْضِ الطُّرُقِ الصَّحِيحَةِ أَنَّهُ كَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ إِذَا أَوْتَرَ بِتِسْعٍ، –كَأَنَّهُ يَأْتِي بِهَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ لِإِتْمَامِ الْإِحْدَى عَشْرَةَ–، فَإِنَّهُ كَانَ يُوتِرُ بِإِحْدَى عَشْرَةَ، ثُمَّ كَانَ يُوتِرُ بِتِسْعٍ وَيُصَلِّي بَعْدَ الْوِتْرِ رَكْعَتَيْنِ وَهُوَ جَالِسٌ. وَأَكْثَرُ الْفُقَهَاءِ مَا سَمِعُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ؛ وَلِهَذَا يُنْكِرُونَ هَذِهِ –هَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ–، وَأَحْمَدُ وَغَيْرُهُ سَمِعُوا هَذَا وَعَرَفُوا صِحَّتَهُ، وَرَخَّصَ أَحْمَدُ أَنْ تُصَلَّى هَاتَانِ الرَّكْعَتَانِ وَهُوَ جَالِسٌ كَمَا فَعَلَ –صلى الله عليه وسلم–، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ لَمْ يُنْكَرْ عَلَيْهِ، لَكِنْ لَيْسَتْ وَاجِبَةً بِالِاتِّفَاقِ، وَلَا يُذَمُّ مَنْ تَرَكَهَا، وَلَا تُسَمَّى زِحَافَةً، –الصَّلَاةُ مِنْ جُلُوسٍ هَلْ تُسَمَّى زِحَافَةً؟ هَذَا كَلَامٌ يُمْكِنُ تَدَاوُلَهُ بَعْضُ النَّاسِ فِي وَقْتٍ مِنَ الْأَوْقَاتِ–، فَلَيْسَ لِأَحَدٍ إِلْزَامُ النَّاسِ بِهَا وَلَا الْإِنْكارُ عَلَى مَنْ فَعَلَهَا…، وَهَذَا الْحَدِيثُ الصَّحِيحُ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّهُ لَمْ يَكُنْ يُدَاوِمُ عَلَيْهَا)
“বিতরের পর দুই রাকাত নামাজ সম্পর্কে ইমাম মুসলিম তাঁর সহিহ গ্রন্থে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বিতরের পর বসে দুই রাকাত পড়তেন। উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদিস থেকেও কোনো কোনো সহিহ সনদে এসেছে, তিনি নয় রাকাত বিতর পড়লে এমন করতেন, যেন এই দুই রাকাত দিয়ে এগারো রাকাত পূর্ণ করতেন। কারণ তিনি প্রথমে এগারো রাকাত পড়তেন, পরে নয় রাকাত বিতর পড়ে বসে দুই রাকাত আদায় করতেন। অধিকাংশ ফকিহ এই হাদিস শোনেননি বলে এর আপত্তি করতেন। কিন্তু ইমাম আহমদ ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এটি শুনেছেন এবং এর সহিহ হওয়া অনুধাবন করেছেন। তাই ইমাম আহমদ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মতো বসে এই দুই রাকাত পড়ার অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং যে এটি পড়বে তাকে নিষেধ করা যাবে না। তবে এটি সর্বসম্মতভাবে ওয়াজিব নয়। তাই যে পড়ে না তাকে নিন্দাও করা যাবে না আর একে ‘অসমীচীন’ ও বলা যাবে না। ফলে মানুষকে এটি পড়তে বাধ্য করার কিংবা কেউ পড়লে তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। আর এই সহিহ হাদিস প্রমাণ করে যে, তিনি এটি সব সময় নিয়মিত করতেন না।”
🔸 বসে নফল নামাজ পড়ার সাধারণ বিধান:
সাধারণ অবস্থায় নফল নামাজ বসে পড়া জায়েজ। তবে সওয়াব দাঁড়িয়ে পড়ার অর্ধেক। সহিহ হাদিসে এসেছে:
«صَلَاةُ الْقَاعِدِ عَلَى النِّصْفِ مِنْ صَلَاةِ الْقَائِمِ»
“বসে নামাজ পড়ার সওয়াব দাঁড়িয়ে পড়ার অর্ধেক।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ১২৩০, সহিহ বুখারি: ১১১৫]
এটি সক্ষম ব্যক্তির নফল নামাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু ফরজ নামাজে সক্ষম ব্যক্তির জন্য দাঁড়িয়ে পড়া আবশ্যক (রুকন)। আর যে ব্যক্তি অসুস্থতা বা বার্ধক্যের কারণে দাঁড়িয়ে পড়তে অক্ষম তিনি ফরজ বা নফল যেটাই বসে পড়বেন পূর্ণ সওয়াবই পাবেন।
▪️ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এই দুই রাকাতের হেকমত প্রসঙ্গে বলেন:
(الصَّوَابُ أَنْ يُقَالَ: إِنَّ هَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ تَجْرِيَانِ مَجْرَى السُّنَّةِ وَتَكْمِيلِ الْوِتْرِ، فَإِنَّ الْوِتْرَ عِبَادَةٌ مُسْتَقِلَّةٌ وَلَا سِيَّمَا إِنْ قِيلَ بِوُجُوبِهِ، فَتَجْرِي الرَّكْعَتَانِ بَعْدَهُ مَجْرَى سُنَّةِ الْمَغْرِبِ مِنَ الْمَغْرِبِ، فَإِنَّهَا وِتْرُ النَّهَارِ، وَالرَّكْعَتَانِ بَعْدَهَا تَكْمِيلٌ لَهَا، فَكَذَلِكَ الرَّكْعَتَانِ بَعْدَ وِتْرِ اللَّيْلِ، وَاللَّهُ أَعْلَمُ)
“সঠিক কথা হলো, এই দুই রাকাত সুন্নতের মতো এবং বিতরের পরিপূরক।
বিতর একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, বিশেষত যদি এটিকে ওয়াজিব বলা হয়। তাই এর পরের দুই রাকাত মাগরিবের পরের সুন্নতের মতো কাজ করে, যা মাগরিবের পূর্ণতা যোগায়। কারণ মাগরিব হলো দিনের বিতর আর তার পরের দুই রাকাত তার পরিপূরক। ঠিক তেমনি রাতের বিতরের পরের দুই রাকাতও বিতরের পূর্ণতাদানকারী। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।”
সারসংক্ষপ হলো, বিতরের সালাতের পর দুই রাকাত সালাত আদায় করার বিষয়টি প্রমাণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বসে এই দুই রাকাত সালাত আদায় করেছেন, যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
মূল: ডক্টর শায়খ আব্দুল করিম আল-খুযাইর (হাফিযাহুল্লাহ)। [সৌদি সিনিয়র ওলামা পরিষদের সাবেক সদস্য]।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

বিতরের পর বসে দুই রাকাত নফল নামাজের শরয়ি বিধান

 প্রশ্ন: বিতরের নামাজের পর বসে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ার বিধান কী? এটি কি নিয়মিত আমল হিসেবে করা যাবে?

উত্তর: বিতরের নামাজের পর মাঝেমধ্যে বসে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া জায়েয। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো কখনো এভাবে নামাজ আদায় করেছেন। তবে এটিকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা এবং প্রতিদিনের নির্ধারিত সুন্নাতের মতো নিয়মিত আদায় করা সুন্নাতসম্মত নয়। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা ও উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতরের পর বসে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন।
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْوِتْرِ وَهُوَ جَالِسٌ
“রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতরের পর বসে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন।” [সহিহ মুসলিম: ৭৩৮]
▪️এ দুই রাকাত পড়ার উদ্দেশ্য কী?
আলেমগণ উল্লেখ করেছেন, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ আমলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিতরের পর নামাজ পড়া জায়েজ এ বিষয়টি উম্মতের কাছে স্পষ্ট করা এবং বসে নফল নামাজ আদায় করা যে বৈধ তা বাস্তবে দেখিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটি নিয়মিত সুন্নাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে করেননি; বরং মাঝেমধ্যে আদায় করেছেন, যাতে এর বৈধতা স্পষ্ট হয়।
▪️নিয়মিত পড়ার বিধান:
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিতরের পর বসে দুই রাকাত নামাজ নিয়মিতভাবে আদায় করতেন না। তাই এটিকে প্রতিদিনের স্থায়ী অভ্যাস বা নিয়মিত সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
রাতের নামাজের ক্ষেত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিয়মিত নির্দেশনা হলো, রাতের নামাজকে বিতরের মাধ্যমে শেষ করা।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«اجْعَلُوا آخِرَ صَلَاتِكُمْ بِاللَّيْلِ وِتْرًا»
“তোমরা রাতের নামাজের সর্বশেষ নামাজটি বিতর করো।” [সহিহ বুখারি: ৯৯০]
✪ ইমাম নওয়াবি তাঁর শরহু মুসলিম-গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
الصَّوَابُ أَنَّ هَاتَيْنِ الرَّكْعَتَيْنِ فَعَلَهُمَا –صلى الله عليه وسلم– بَعْدَ الْوِتْرِ جَالِسًا؛ لِبَيَانِ جَوَازِ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْوِتْرِ، –يعني: وَأَنَّ الْأَمْرَ بِجَعْلِ الْوِتْرِ آخِرَ الصَّلَاةِ إِنَّمَا هُوَ لِلِاسْتِحْبَابِ لَا عَلَى سَبِيلِ الْوُجُوبِ–، وَبَيَانِ جَوَازِ النَّفْلِ جَالِسًا، وَلَمْ يُوَاظِبْ عَلَى ذَلِكَ –صلى الله عليه وسلم–، بَلْ فَعَلَهُ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ أَوْ مَرَّاتٍ قَلِيلَةً
“সঠিক কথা হলো, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দুই রাকাত বিতরের পর বসে পড়েছেন বিতরের পর নামাজ পড়া যে জায়েজ তা বোঝানোর জন্য। অর্থাৎ বিতরকে শেষ নামাজ করার নির্দেশটি মুস্তাহাব; ওয়াজিব হিসেবে নয়। পাশাপাশি বসে নফল পড়া যে জায়েজ তা স্পষ্ট করাও এর উদ্দেশ্য ছিল। তবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটি নিয়মিত করেননি; বরং একবার, দুইবার বা অল্প কয়েকবার করেছেন।”
সংক্ষেপ কথা হলো, বিতরের পর বসে দুই রাকাত নফল নামাজ মাঝেমধ্যে পড়া জায়েজ। কেউ কখনো তা আদায় করলে তাকে বাধা দেওয়ার কারণ নেই। তবে এটিকে প্রতিদিনের নিয়মিত আমল বা স্থায়ী সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। বরং নিয়মিতভাবে রাতের নামাজের সমাপ্তি বিতরের মাধ্যমে করাই নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতিষ্ঠিত সুন্নত। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদি বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate