Wednesday, September 10, 2025

যদি চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ সরাসরি চোখে দেখা না যায় তবে কেবল সংবাদপত্রের খবর বা কিছু জ্যোতির্বিদের তথ্যের ওপর নির্ভর করে কি গ্রহণের সালাত আদায় করা যাবে

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ দেখা না গেলে গ্রহণের সালাত আদায় করা বৈধ নয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لاَ يَنْكَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ مِنَ النَّاسِ، وَلَكِنَّهُمَا آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُمَا فَقُومُوا فَصَلُّوا “কোন লোকের মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তবে তা আল্লাহ্‌র নিদর্শনসমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। তাই তোমরা যখন সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হতে দেখবে, তখন দাঁড়িয়ে যাবে এবং সালাত আদায় করবে।”(সহিহ বুখারী হা/১০৪১; সহীহ মুসলিম হা/১৫২১)। এই হাদীসে আলোকে সূর্যগ্রহণের সালাত শুরু হবে তখনই, যখন তা দেখা যাবে কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমরা যখন এটি দেখবে, তখন নামাযের জন্য দ্রুত দাঁড়াও।’ সুতরাং কেবল জ্যোতির্বিদদের সংবাদে সালাত পড়া বৈধ নয়।”

.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: যদি সূর্য মেঘে আচ্ছন্ন থাকে, অথচ এর আগে গণমাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হয় যে অমুক সময়ে আল্লাহর ইচ্ছায় সূর্যগ্রহণ হবে এ অবস্থায় কি গ্রহণের নামায আদায় করতে হবে, যদিও বাস্তবে গ্রহণ দেখা যায়নি?
উত্তরে শাইখ বলেন:
لا يجوز أن يصلي اعتماداً على ما ينشر في الجرائد، أو يذكر بعض الفلكيين، إذا كانت السماء غيماً ولم ير الكسوف ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم علق الحكم بالرؤية ، فقال عليه الصلاة والسلام : (فإذا رأيتموهما فافزعوا إلى الصلاة) ، ومن الجائز أن الله تعالى يخفي هذا الكسوف عن قوم دون آخرين لحكمة يريدها
“গ্রহণের সালাত আদায় করা বৈধ নয় যদি তা কেবল সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর বা কিছু জ্যোতির্বিদদের কথার ওপর নির্ভর করে হয় যখন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে গ্রহণ দেখা যায় না। কারণ নবী (ﷺ) গ্রহণের সালাতকে প্রত্যক্ষ দেখা’র সাথে শর্তযুক্ত করেছেন। তিনি ﷺ বলেছেন: “তোমরা যখন এ দু’টিকে (সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ) দেখবে, তখন সালাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ো।” এছাড়াও এটা সম্ভব যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর হিকমত ও প্রজ্ঞার কারণে কোনো এক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে গ্রহণকে আড়াল করে রাখেন, আবার অন্য কোনো সম্প্রদায়ের কাছে তা প্রকাশ করে দেন।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ৩০৯)
.
ইবন উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) অন্য স্থানে আরও বলেছেন:
ثم إن الإعلان عنه [يعني : الكسوف] أوجد مشكلة أخرى، يعلنون عن الكسوف ويكون كسوفا جزئيا صغيرا لا يتبين، فبعض الناس يتعجل ويصلي، كما حدث قبل سنة أو سنتين أعلن عن الكسوف لكنه ما بان، وإذا أعلن عنه ولكنه لم يبن فإنها لا تجوز الصلاة؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ( إذا رأيتموه فصلوا ).والكسوف عند أهل الفلك أحياناً يراد به الظل بمعنى: أن النور يخف لكنه يتبين” .
তাছাড়া গ্রহণের ঘোষণা আরেকটি সমস্যার সৃষ্টি করে। তারা কখনও কখনও গ্রহণের ঘোষণা দেয়, অথচ সেটি আংশিক এবং এত ক্ষুদ্র হয় যে চোখে দৃশ্যমানই হয় না। তবুও কিছু মানুষ তাড়াহুড়ো করে সালাত পড়ে ফেলে। যেমনটি এক-দুই বছর আগে ঘটেছিল ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে গ্রহণ দেখা যায়নি। সুতরাং যদি গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয় অথচ তা চোখে স্পষ্টভাবে দেখা না যায়, তবে গ্রহণের সালাত আদায় করা জায়েয নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:“যখন তোমরা তা দেখবে, তখন সালাতের দিকে ধাবিত হও।”জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, কখনও কখনও যে গ্রহণ বলা হয় তা আসলে উপচ্ছায়া (Penumbra-আংশিক ছায়া), যার ফলে আলো কিছুটা ক্ষীণ হয়, কিন্তু প্রকৃত গ্রহণ চোখে স্পষ্ট দেখা যায় না।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১৬/৩১)।
.
মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মসজিদে নাবাউয়ীর মুদার্রিস এবং মসজিদে কুবার সম্মাননীয় ইমাম ও খতিব, আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-ফাক্বীহ, ড. সুলাইমান বিন সালীমুল্লাহ আর-রুহাইলী (হাফিযাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: যদি আমরা এমন একটি শহরে থাকি যেখানে মেঘ চাঁদ দেখতে বাধা দেয় এবং আমরা চন্দ্রগ্রহণ না দেখি, তাহলে কি সালাত পড়া হবে?
উত্তরে শাইখ বলেন: والجواب صلاة الخسوف منوطة برؤيته لا بالمعرفة الفلكية ، فإذا لم ير الخسوف في المدينة بالكلية فلا تصلى صلاة الخسوف”চন্দ্রগ্রহণের সালাত কেবল তখনই আদায় করা হবে যখন তা চোখে দেখা যাবে; জ্যোতির্বিজ্ঞান বা ফ্যালকিক হিসাব অনুযায়ী জানলেই যথেষ্ট নয়। যদি শহরে মোটেই চন্দ্রগ্রহণ দেখা না যায়, তাহলে চন্দ্রগ্রহণের সালাত আদায় করা হবে না।”(শাইখের অফিসিয়াল আইডি থেকে)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

প্রচলিত ঈদে মীলাদুন নবী পালন করার শারঈ হুকুম কী

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ইসলামী শরিয়তে “ঈদে মিলাদুন্নবী” বলে কোন কিছু নেই।প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নাবী উদযাপন একটি সুস্পষ্ট বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনো ঈদে মীলাদুন্নাবী পালন করেননি এবং করতেও বলেননি। চার খলীফাসহ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবীর কেউ এ অনুষ্ঠান পালন করেননি। লক্ষাধিক সাহাবীর কোনো একজনও এ উৎসব পালন করেননি। পরবর্তী যুগের তাবেঈ ও তাবেঈ-তাবেঈগণও পালন করেননি। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিমসহ হাদীস গ্রন্থ সংকলনকারী মুহাদ্দিসগণও পালন করেননি। এমনকি চার মাযহাবের ইমামগণসহ পরবর্তী মুসলিম উম্মাহর হকপন্থী কোন আলেম এ ধরণের কোন দিবস সম্পর্কে জানতেন না;বরং এ ঈদ বা উৎসবটি উদ্ভাবন করেছে কিছু বিদআতী বাতেনী গোষ্ঠী। এটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যুর প্রায় ৫৯৪ বছর পর ৬০৪ হিজরীতে আবিষ্কৃত হয়।এরপর থেকে মানুষ এ বিদআত পালন করে আসছে; অথচ আলেমগণ সর্বকালে ও সর্বস্থানে এ বিদআত সম্পর্কে মানুষকে হুশিয়ার করে আসছেন। তাছাড়া কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলিল ও মুসলমানদের ইজমার ভিত্তিতে জানা যায় যে, ইসলামে উৎসব শুধু দুটি- ঈদুল ফিতর (রোযা ভঙ্গের উৎসব) ও ঈদুল আযহা (পশু উৎসর্গের উৎসব)। এ দুটি ছাড়া আর যত উৎসব আছে সেটা কোন ব্যক্তির সাথে, কোন গোষ্ঠীর সাথে, কোন ঘটনার সাথে বা বিশেষ কোন ভাবাবেগের সাথে সংশ্লিষ্ট হোক না কেন সেটা বিদআতি (নবউদ্ভাবিত) উৎসব। এ ধরনের কোন উৎসব পালন করা,সেদিনকে কেন্দ্র করে ওয়াজ মাহফিল করা, খাবার বিতরণ করা,কিংবা এসব দিবস পালনে সম্মতি দেয়া বা কোনভাবে সহযোগিতা করা অথবা সেই দিনে খুশি প্রকাশ করা কোন মুসলমানের জন্য জায়েয নয়। কেননা এটি আল্লাহর সীমারেখার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে সে নিজের উপর নিজেই জুলুমকারী। এই উৎসবে অথবা এ ধরনের অন্য কোন হারাম উৎসবে কোনভাবে সহযোগিতা করা মুসলমানদের জন্য হারাম। সেটা যে ধরনের সহযোগিতা হোক না কেন; যেমন খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা, ক্রয়বিক্রয় করা, জিনিসপত্র প্রস্তুত করা, উপঢৌকন প্রদান করা, পত্র বিনিময় করা, প্রচার-প্রচারণা চালানো ইত্যাদি। কারণ এ ধরনের সহযোগিতা পাপ-কাজে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সহযোগিতার মধ্যে গণ্য। “সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ০২]

.
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দ্বীন। এ দ্বীন পরিপূর্ণ, বিধায় আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিদআত থেকে বিরত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর বিদআতকারীর ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ “যে ব্যক্তি আমাদের শরীআতে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত”(সহীহ বুখারী,হা/২৬৯৭;সহীহ মুসলিম,হা/১৭১৮) তিনি (ﷺ) আরও বলেন,وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَة ‘তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করা হতে বিরত থাকো। নিশ্চয়ই প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদআত ও প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী”।(আবূ দাঊদ,হা/৪৬০৭; তিরমিযী, হা/২৬৭৬)অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,وَكُلَّ ضَلاَلَةٍ فِى النَّارِ”আর প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণাম জাহান্নাম”।(সুনানে নাসাঈ, হা/১৫৭৮)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] আল-বায়ান লি আখতায়ি বাযিল কুত্তাব’ গ্রন্থে বলেন: لا يخفى ما ورد في الكتاب والسنة من الأمر باتباع ما شرعه الله ورسوله والنهي عن الابتداع في الدين ، قال تعالى : ( قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ) ، وقال تعالى : ( اتَّبِعُواْ مَا أنزل إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلاَ تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ ) ، وقال تعالى : ( وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلاَ تَتَّبِعُواْ السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ) وقال صلى الله عليه وسلم : ( إن أصدق الحديث كتاب الله، وخير الهدي هدي محمد ، وشر الأمور محدثاتها ) ، وقال صلى الله عليه وسلم : ( من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد ) وفي رواية لمسلم : ( من عمل عملًا ليس عليه أمرنا فهو رد ) “কুরআন ও হাদিসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক প্রদত্ত বিধানের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং ধর্মীয় বিষয়ে নতুন কিছু প্রবর্তন করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে- এটি কারো অজানা নয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীলও দয়ালু।[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১] তিনি আরও বলেন: “তোমরা অনুসরণ কর, যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে কর্তাদের অনুসরণ করো না।”।[সূরা আরাফ, আয়াত: ৩] তিনি আরও বলেন: “তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তা হলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে।”[সূরা আনআম, আয়াত: ১৫৩] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “নিশ্চয় শ্রেষ্ঠ সত্যবাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। সর্বোত্তম আদর্শ হচ্ছে- নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ। সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে- নব প্রবর্তিত বিষয়গুলো।” তিনি আরও বলেন: “যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনে এমন কোন বিষয় চালু করে যা এতে নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত”। সহিহ মুসলিমের এ বর্ণনায় এসেছে- “যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে যা আমাদের দ্বীনে নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত”(আল-বায়ান লি আখতায়ি বাযিল কুত্তাব; পৃষ্ঠা: ২৬৮-২৭০)
.
▪️ঈদে মীলাদুন নবী’ সম্পর্কে কতিপয় বিদ্বানের অভিমত:
.
(১).হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ,শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:الاحتفال بمولد النبي ﷺ بدعة من البدع المحدثة التي لم يفعلها أحد من السلف الصالح”নাবী (ﷺ)-এর জন্মদিন উদযাপন করা একটি বিদ‘আত, যা সালাফে সলেহীনের কেউই করেননি”।(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৬; পৃষ্ঠা: ৩১৭)
.
(২).বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:لَا يَجُوزُ الِاحْتِفَالُ بِمَوْلِدِ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا غَيْرِهِ؛ لِأَنَّ ذَٰلِكَ مِنَ الْبِدَعِ الْمُحْدَثَةِ فِي الدِّينِ؛ لِأَنَّ الرَّسُولَ لَمْ يَفْعَلْهُ، وَلَا خُلَفَاؤُهُ الرَّاشِدُونَ، وَلَا غَيْرُهُمْ مِنَ الصَّحَابَةِ رِضْوَانُ اللهِ عَلَيْهِمْ، وَلَا التَّابِعُونَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ فِي الْقُرُونِ الْمُفَضَّلَةِ، وَهُمْ أَعْلَمُ النَّاسِ بِالسُّنَّةِ، وَأَكْمَلُ حُبًّا لِرَسُولِ اللهِ، وَمُتَابَعَةً لِشَرْعِهِ مِمَّنْ بَعْدَهُمْ”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মীলাদ বা অন্য কারও মীলাদ উদযাপন করা জায়েয নেই। কারণ এটি দ্বীনের মধ্যে সৃষ্ট নতুন বিদআত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি করেননি, তাঁর খুলাফায়ে রাশেদীনও করেননি, অন্য কোনো ছাহাবীও করেননি এবং মর্যাদাপূর্ণ যুগে তাদের ন্যায়সঙ্গত অনুসরণকারীগণও (তাবেঈ) করেননি। অথচ তারা ছিলেন সুন্নাহ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং তাঁর শরীআতের অনুসরণে পরবর্তীদের চেয়ে অধিক অগ্রগামী”।(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৭৮)
.
(৩) সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إِنَّ الِاحْتِفَالَ بِالْمَوْلِدِ النَّبَوِيِّ لَيْسَ مَعْرُوفًا عَنِ السَّلَفِ الصَّالِحِ، وَلَا فَعَلَهُ الْخُلَفَاءُ الرَّاشِدُونَ، وَلَا فَعَلَهُ الصَّحَابَةُ، وَلَا التَّابِعُونَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ، وَلَا أَئِمَّةُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ”নিশ্চয়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মদিন উদযাপন সালাফে ছালেহীনের মধ্যে পরিচিত ছিল না। আর না খুলাফায়ে রাশেদীন তা করেছিলেন, না সাহাবীগণ তা করেছিলেন, না তাদেরকে ন্যায়সঙ্গতভাবে অনুসরণকারী তাবেঈন তা করেছিলেন আর না তাদের পরবর্তী মুসলিম ইমামগণ তা করেছিলেন”।(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ২১; পৃষ্ঠা: ৬২)
.
(৪)‌ সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:ঈদে মিলাদুন্নবী, শিশুদের জন্মদিন, মা দিবস, কিংবা বৃক্ষরোপন-সপ্তাহ ইত্যাদি উদযাপন করার বিধান কি? উত্তরে তারা বলেন:
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وبعد:
أولا : العيد اسم لما يعود من الاجتماع على وجه معتاد إما بعود السنة أو الشهر أو الأسبوع أو نحو ذلك فالعيد يجمع أموراً منها : يوم عائد كيوم عيد الفطر ويوم الجمعة ، ومنها : الاجتماع في ذلك اليوم ، ومنها : الأعمال التي يقام بها في ذلك اليوم من عبادات وعادات .
ثانيا : ما كان من ذلك مقصوداً به التنسك والتقرب أو التعظيم كسبا للأجر ، أو كان فيه تشبه بأهل الجاهلية أو نحوهم من طوائف الكفار فهو بدعة محدثة ممنوعة داخلة في عموم قول النبي صلى الله عليه وسلم : ” من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد ” رواه البخاري ومسلم ، مثال ذلك الاحتفال بعيد المولد وعيد الأم والعيد الوطني لما في الأول من إحداث عبادة لم يأذن بها الله ، وكما في ذلك التشبه بالنصارى ونحوهم من الكفرة ، ولما في الثاني والثالث من التشبه بالكفار ، وما كان المقصود منه تنظيم الأعمال مثلاً لمصلحة الأمة وضبط أمورها ، وتنظيم مواعيد الدراسة والاجتماع بالموظفين للعمل ونحو ذلك مما لا يفضي به التقرب والعبادة والتعظيم بالأصالة ، فهو من البدع العادية التي لا يشملها قوله صلى الله عليه وسلم : ” من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد ” فلا حرج فيه بل يكون مشروعاً .وبالله التوفيق وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم .
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল ﷺ এর উপর। তারপর,
এক: স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বছর ঘুরে, মাস ঘুরে কিংবা সপ্তাহ ঘুরে যে সম্মিলন বার বার ফিরে আসে সেটাই ঈদ বা উৎসব। ঈদ নিম্নোক্ত বৈশিষ্টগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে: পুনঃ পুনঃ ফিরে আসে এমন দিন; যেমন- ঈদুল ফিতর ও জুমার দিন। ঐ দিনে সম্মিলন ঘটা। ঐদিনে যে কর্মগুলো করা হয় সেগুলো ইবাদত শ্রেণীর কিংবা প্রথাগত।
দুই: এ দিবসগুলোর মধ্যে যে দিবস দ্বারা উদ্দেশ্য হয় ইবাদত ও নৈকট্য হাছিল কিংবা সওয়াব অর্জনের জন্য সম্মান প্রদর্শন কিংবা যে দিবসের ক্ষেত্রে জাহেলি যুগের লোক বা তাদের মত অন্য কাফের গোষ্ঠীর সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায় সেগুলো নব-উদ্ভাবিত ও নিন্দনীয় বিদাত এবং সেটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নোক্ত বাণীর মধ্যে পড়ে যাবে “যে ব্যক্তি আমাদের শরিয়তে এমন কিছু চালু করবে যা শরিয়তে নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত।”[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] এর উদাহরণ হচ্ছে­– ঈদে মিলাদুন্নবী, মা দিবস, জাতীয় দিবস ইত্যাদি পালন করা। এগুলোর মধ্যে প্রথমটিতে এমন এক ইবাদত এর নবপ্রচলন রয়েছে আল্লাহ্‌ যার অনুমোদন দেননি। এছাড়াও এর মধ্যে খ্রিস্টান ও অন্যান্য কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টির মধ্যে কাফেরদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে।পক্ষান্তরে, যে সব দিবসগুলো পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে– উম্মতের কল্যাণ সাধনে তাদের কর্মে শৃঙ্খলা আনা, পাঠদানের সময়সূচী বিন্যস্ত করা, কর্মকর্তাদের মিটিং এর সময়সূচী বিন্যস্ত করা ইত্যাদি যেগুলো মূলতঃই আল্লাহ্‌র নৈকট্য, তাঁর ইবাদত, কিংবা সম্মানপ্রদর্শনের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় সেগুলো হচ্ছে– অভ্যাসগত বিদাত; যেগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে ব্যক্তি আমাদের শরিয়তে এমন কিছু চালু করে যা শরিয়তে নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত” এর অধিভুক্ত হবে না। তাই সেগুলোতে দোষের কিছু নেই। আল্লাহ্‌ই উত্তম তাওফিকদাতা, আমাদের নবী মুহাম্মদ, তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সাহাবীবর্গের ওপর আল্লাহ্‌র রহমত বর্ষিত হোক।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৫৯; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০০৭০)
.
(৫).সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] বলেন,الِاحْتِفَالُ بِمَوْلِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِدْعَةٌ فِي الدِّينِ.”নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মদিন উদযাপন করা দ্বীনের মধ্যে বিদআত”(আল-ইজলাল আল-ইলমী ওয়াল আমালী; পৃষ্ঠা: ১৫২)
.
এমনকি প্রচলিত মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জবাইকৃত পশুর গোশত খাওয়ার হুকুম কি?এ সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে,,,।
জবাবে তিনি বলেন:إن كان ذبحها لصاحب المولد فهذا شرك أكبر ، أما إن كان ذبحها للأكل فلا شيء في ذلك ، لكن ينبغي ألا يؤكل منها ، وأن لا يحضر المسلم إنكارا عليهم بالقول والفعل ؛ إلا أن يحضر لنصيحتهم بدون أن يشاركهم في أكل أو غيره “যদি যার মিলাদ (জন্ম বার্ষিকী) তাঁর জন্য এ পশু জবাই করা হয় তাহলে এটি শিরকে আকবার (বড় শিরক)। আর যদি গোশত খাওয়ার জন্য জবাই করা হয় তাতে কিছু নেই। তবে কোন মুসলমানের সে গোশত খাওয়া উচিত নয়; সে অনুষ্ঠানে যাওয়া উচিত নয়; যাতে করে মুসলমান কথা ও কাজের মাধ্যমে বিদআতীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পারেন। আর যদি তাদেরকে নসিহত করার উদ্দেশ্যে উপস্থিত হতে চান সেটা করতে পারেন; তবে তাদের খাবার বা অন্য কিছুতে অংশ গ্রহণ করবে না।'(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৭৪)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নাবী ইতিহাসনির্ভর আলোচনা হলেও শরীয়তে এর কোনো বৈধতা নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবা ও খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ইসলামে ইবাদত ও উৎসব নির্ধারিত হয় কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা; তাই নিজের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ইবাদতের পদ্ধতি বা দিন নির্ধারণ করা বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত। বিদ‘আত পরিহার করে সুন্নাহর উপর অবিচল থাকাই প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্ম দিবস পালন নয়, বরং পরিপূর্ণভাবে তাঁকে অনুসরণই কাম্য। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইমাম সুফইয়ান আস-সাওরী রাহিমাহুল্লাহ এর কিছু নাসীহাহ

 প্রখ্যাত তাবি‘ঈ, আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস, ইমাম সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৯৭ হি: মৃত: ১৬১ হি] বলেন:

البكاء عشرة أجزاء ‌تسعة ‌لغير ‌الله. وواحد لله، فإذا جاء الذي لله في السنة مرة فهو كثير
“কান্নার দশটি ধরন রয়েছে। তন্মধ্যে নয় ধরনের কান্না আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কারণে হয়। আর মাত্র এক ধরনের কান্না আল্লাহর জন্য হয়ে থাকে। সুতরাং বছরে একবারও যদি আল্লাহর জন্য কান্না আসে, তবে সেটাই অনেক বেশী”।(হিলয়াতুল আওলিয়া; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১১)
.
আমাদের ইমাম সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ)-আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে দুনিয়ার দুঃখে কান্না করা সাধারণ বিষয়, কিন্তু আল্লাহর ভয়ে কান্না করা বিরল ও মহামূল্যবান সম্পদ। একজন মুসলিমের উচিত চেষ্টা করা যেন তার চোখ অন্তত কিছু সময় আল্লাহর ভয়ে অশ্রুসিক্ত হয়। কারণ সেই কান্নাই আখিরাতে মুক্তির আলামত। মূল বক্তব্য তিনটি দিক থেকে বুঝা যায়:
.
(ক).মানুষের কান্না সবসময় আল্লাহর জন্য হয় না।
অধিকাংশ সময় মানুষ দুনিয়ার ক্ষতি, কষ্ট, স্বজন হারানো, দুঃখ-ক্লেশ, মান-সম্মানহানি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ইত্যাদি কারণে কাঁদে। তাই তিনি বলেছেন কান্নার দশ ভাগের নয় ভাগই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারণের জন্য হয়।
.
(খ).আল্লাহর জন্য কান্না খুবই বিরল। অর্থাৎ পাপের অনুশোচনা, আখিরাতের ভয়, আল্লাহর মহিমা উপলব্ধি, তাঁর সাথে হৃদয়ের সম্পর্কের কারণে যে চোখ অশ্রুসিক্ত হয় এটাই প্রকৃত “আল্লাহর জন্য কান্না”। কিন্তু তা খুব অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা যায়।
.
(গ).সত্যিকারের কান্নার মূল্য অনেক বড়।তাই তিনি বলেছেন, যদি কারো জীবনে অন্তত বছরে একবারও আল্লাহর ভয়ে ও তাঁর মহিমার স্মরণে অন্তর থেকে প্রকৃত কান্না আসে, তবে সেটিই এক বিরাট নিয়ামত। কেননা সেই কান্না একজন মানুষের জন্য আল্লাহর নৈকট্যের নিদর্শন ও চূড়ান্ত সফলতার প্রমাণ।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।

সালাতের মধ্যে কান্না করা সম্পর্কে শারঈ নীতিমালা

 প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর কান্না মানুষের একটি স্বভাবজাত বিষয় এবং অন্তরের লালিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ। কান্নার বিভিন্ন কারণ ও উপলক্ষ থাকে। কখনো আনন্দ-বেদনায়, কখনো প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায়, কখনো শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রনায়, আবার কখনো স্বীয় সৃষ্টিকর্তার স্মরণে মুমিন বান্দার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ে। আবার কখনো কুরআনের অমিয় বাণীর সুমধুর মূর্ছনা তার হৃদয়জগতকে আন্দোলিত করে চক্ষুযুগলকে সিক্ত করে তোলে। বান্দা যখন স্বীয় পাপের কথা মনে করে অনুতপ্ত হয়, মৃত্যু-কবর-জান্নাত-জাহান্নাম ও আল্লাহর আযাবের কথা স্মরণ করে অশ্রু বর্ষণ করে, তখন সেই অশ্রুধারা তার জীবনকে স্নিগ্ধ করে তোলে। তবে আল্লাহর জন্য কান্নার অনুভূতিটা সবার মাঝে জাগ্রত হয় না। কিন্তু আল্লাহর ভয়ে কারো দু’চোখ থেকে যদি এক ফোটা অশ্রুও বর্ষিত হয় এবং তিনি যদি সেটা গোপন করতে পারেন, তবে তিনি পৃথিবীর সফল বান্দাদের একজন গণ্য হবেন। কেননা আল্লাহর রাসূল ﷺ) বলেছেন,”সেই ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশে নীচে ছায়া পাবে, যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে, ফলে তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়”।(সহীহ বুখারী হা/৬৬০; মুসলিম হা/১০৩১; মিশকাত হা/৭০১।

.
▪️দ্বিতীয়ত: সালাতরত অবস্থায় কান্না করার তিনটি অবস্থা হতে পারে।
.
(১).সালাতরত অবস্থায় যদি কেউ দুনিয়াবী দুঃখ-কষ্ট বা বিপদ-আপদ স্মরণ করে কিংবা অনুরূপ কোনো দুনিয়াবী কারণে উচ্চ আওয়াজে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং কান্না থামানোর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে, তবে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ এটি সালাত-বহির্ভূত কাজ হিসেবে গণ্য হয়। অধিকাংশ ফিকাহবিদ এ বিষয়ে একমত।
.
(২).সালাতরত অবস্থায় যদি অসুখ-বিসুখ,শারীরিক ব্যথা-বেদনা, মানসিক কষ্ট বা দুনিয়ার বিপদ-মুসিবতের কথা স্মরণ করে ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কান্না আসে, তবে তা সম্ভব হলে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে হবে। ইনশাআল্লাহ,এতেও সালাতের কোনো ক্ষতি হবে না। কারন এই উম্মতের অনিচ্ছাকৃত ভুল ত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করবেন।দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “হে আমাদের রব্ব! যদি আমরা বিস্মৃত হই অথবা ভুল করি তবে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।”[সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬] আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি সেটাই করব। আরও দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “আর এ ব্যাপারে তোমরা কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তোমাদের কোন অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা স্বেচ্ছায় করেছে (তা অপরাধ), আর আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”[সূরা আহযাব, আয়াত: ৫] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমার উম্মত থেকে ভুল ও বিস্মৃতি এবং যে ক্ষেত্রে তাদেরকে জবরদস্তি করা হয় সেটার গুনাহ উঠিয়ে নেয়া হয়েছে।
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ গ্রন্থে এসেছে, وأما البكاء في الصلاة لمصاب دنيوي : فإن كان مغلوباً عليه ، ولا يمكن دفعه فلا حرج عليه ، ولا تبطل صلاته بذلك ، أما إن كان يقدر على دفعه فلم يدفعه واسترسل معه وكان بكاؤه بصوت فهو مبطل للصلاة عند الأئمة الأربعة رحمهم الله ، واشترط بعضهم كالشافعي وأحمد لبطلان الصلاة أن يظهر منه حرفان .আর যদি সালাতের মধ্যে দুনিয়াবী কোনো বিপদের কারণে কান্না আসে:যদি তা অনিচ্ছাকৃতভাবে তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং সে তা দমন করতে অক্ষম হয়, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই এবং তার সালাতও নষ্ট হবে না।কিন্তু যদি সে দমন করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দমন না করে, বরং কান্নায় লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং সে কান্না শব্দযুক্ত হয়, তবে চার ইমামের মতে তা সালাত নষ্টকারী। তবে তাঁদের মধ্যে কিছুজন, যেমন ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ, শর্ত করেছেন যে সালাত বাতিল হওয়ার জন্য অন্তত দুই অক্ষর উচ্চারিত হওয়া আবশ্যক।”(আল-মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ১৭০)
.
(৩).সালাতরত অবস্থায় যদি একজন বান্দা আল্লাহর ভয়, কবরের আযাব, জাহান্নামের শাস্তি, মৃত্যুর কষ্ট, আখিরাতের কঠোর পরিণতি বা কুরআনে বর্ণিত হুঁশিয়ারি স্মরণ করে অশ্রু ঝরায়, তবে এতে তার সালাতের কোনো ক্ষতি হবে না; বরং এটি মুস্তাহাব (উত্তম) হিসেবে গণ্য হয়। এমন অনুভূতি এবং কণ্ঠনিষ্ঠ অশ্রু ঝরানোই মুত্তাকী ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও সৎকর্মশীলদের থেকে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে।সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:

البكاء عند قراءة القرآن ، وعند السجود ، وعند الدعاء من صفات الصالحين ، والإنسان يحمد عليه
“কুরআন তিলাওয়াত করার সময়, সিজদায় এবং দু‘আ করার সময় কান্না করা এগুলো সৎকর্মশীলদের গুণাবলি, আর মানুষ এর জন্য প্রশংসিত হয়।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২৩৮)
.
▪️উপরোল্লিখিত তিনটি বিষয়ের সমর্থনে আমরা কুরআন, সুন্নাহ ও প্রখ্যাত আলেমদের বক্তব্য থেকে দলিল উপস্থাপন করার প্রয়াস চালাবো।”
.
মহান আল্লাহ বলেন,اِذَا تُتۡلٰی عَلَیۡهِمۡ اٰیٰتُ الرَّحۡمٰنِ خَرُّوۡا سُجَّدًا وَّ بُکِیًّا “তাদের নিকট করুণাময় (আল্লাহর) আয়াত পাঠ করা হলে তারা লুটিয়ে পড়ে সিজদা ও ক্রন্দন করত।” (সূরা মরিয়ম;১৯/৫৮) হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,عَنْ مُطَرِّفِ بْنِ عَبْدِ اللّهِ بْنِ الشِّخِّيرِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ وَهُوَ يُصَلِّىْ وَلِجَوْفِه أَزِيْزٌ كَأَزِيزِ الْمِرْجَلِ يَعْنِىْ: يَبْكِىْ”মুত্বররিফ ইবনে ‘আবদুল্লাহ ইবনে শিখখীর (রহঃ) নিজের পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম এমতাবস্থায় যে, তিনি সালাত আদায় করছিলেন এবং তাঁর ভিতর ডেগের ফুটন্ত পানির মত আওয়াজ হচ্ছিল। অর্থাৎ তিনি কান্নাকাটি করছিলেন।অন্য বর্ণনায় রয়েছে, বর্ণনাকারী বলেছেন,رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ يُصَلِّىْ وَفِىْ صَدْرِه أَزِيزٌ كَأَزِيزِ الرَّحَا مِنَ الْبُكَاءِ“আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাত আদায় করতে দেখছি। এমতাবস্থায় তাঁর সিনার মধ্যে চাক্কির আওয়াজের ন্যায় কান্নার আওয়াজ থাকত।”(মুসনাদে আহমদ হা/১৬৩১২; আবু দাউদ হা/৯০৪; নাসায়ী ১২১৪; সহীহ আত তারগীব হা/৫৪৪; সহীহ ইবনে হিব্বান ৭৫৩; শাইখ আলবানী এটিকে সহীহ বলেছেন) অপর বর্ননায় এসেছে, আল্লাহর রসূল (ﷺ) এর অসুখ যখন খুব বেড়ে গিয়েছিল, তখন তাঁকে নামাযের সময় হয়েছে বললে তিনি বললেন, “তোমরা আবূ বাকারকে নামায পড়াতে বল।” আয়েশা رضي الله عنها বললেন, ‘আবূ বাকার তো নরম-দিলের মানুষ। উনি যখন কুরআন পড়েন, তখন কান্না রুখতে পারেন না।’ মহানবী (ﷺ) বললেন, “তোমরা ওকে বল, ওই নামায পড়াবে।” আয়েশা رضي الله عنها পুনরায় ঐ একই কথা বললে মহানবী (ﷺ) ও পুন: বললেন, “ওকে বল, ওই নামায পড়াবে।”(সহীহ বুখারী হা/৬৮৭-৭১৩; সহীহ মুসলিম হা/৪১৮)
.
হাদিসটির ব্যাখ্যায় হাফিয যাইনুদ্দীন আবুল ফারজ ‘আব্দুর রহমান বিন শিহাব যিনি ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী নামে প্রসিদ্ধ রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] তাঁর ফাতহুল বারী-এ বলেছেন:
والنشيج : هوَ رفع الصوت بالبكاء . قاله أبو عبيد وغيره …
(قالت عائشة : قلت : إن أبا بكر إذا قام مقامك لم يسمع الناس من البكاء) . مقصوده من إيراد هذا الحديث في هذا الباب : أن النبي صلى الله عليه وسلم أمر أبا بكر أن يصلي بالناس، مع تكرار القول لهُ أنه إذا قام مقامه لا يسمع الناس من البكاء ، فدل على أن البكاء من خشية الله في الصلاة لا يضر الصلاة ، بل يَزينها ؛ فإن الخشوع زينة الصلاة …وقد اختلف العلماء في البكاء في الصلاة على ثلاثة أقوال : …وما تقدم عن أبي بكر وعمر رضي الله عنهما يدل على أن البكاء في الصلاة من خشية الله حسن جميل ، ويقبح أن يقال : لا يبطلها ؛ فإن ما كانَ زينة الصلاة وزهرتها وجمالها؛ كيف يقنع بأن يقال فيهِ : غير مبطل ؟ ولم يزل السلف الصالح الخاشعون لله على ذَلِكَ . روى الإمام أحمد في “كتاب الزهد” بإسناده ، عن نافع ، قالَ : كانَ ابن عمر يقرأ في صلاته ، فيمر بالآية فيها ذكر الجنة ، فيقف عندها فيدعو ويسأل الله الجنة . قالَ: ويدعو ويبكي. قالَ : ويمر بالآية فيها ذكر النار، فيدعو ويستجير بالله منها. وبإسناده ، عن ابن أبي ملكية ، قالَ صحبت ابن عباس من مكة إلى المدينة . قالَ : وكان إذا نزل قام ينتظر الليل ، فسأله أيوب : كيف كانت قراءته ؟ قالَ: قرأ: (وَجَاءتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ) ق/19.فجعل يرتل، ويكثر في ذَلِكَ النشيج. وروى ابن أبي الدنيا بإسناده ، عن القاسم بن محمد ، قالَ : كنت غدوت يوما فإذا عائشة قائمة تسبح – يعني : تصلي – وتبكي ، وتقرأ : فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا وَوَقَانَا عَذَابَ السَّمُومِ [الطور:27 ]. وتدعو وتبكي، وترددها. فقمت حتى مللت القيام ، فذهبت إلى السوق لحاجتي، ثم رجعت، فإذا هي قائمة كما هي، تصلي وتبكي. والروايات في هذا عن التابعين ومن بعدهم كثيرة جدا ، وإنما ينكر ذَلِكَ من غلبت عليهِ الشقوة ، أو سبقت لهُ الشقوة
নাশীজ : এটি হলো কান্নার সময় স্বর উচ্চ করা। এ কথা বলেছেন আবু উবাইদ ও অন্যান্যরা।(আয়েশা রা. বলেছেন: আমি বললাম আবু বকর যদি আপনার স্থানে দাঁড়ান, তবে মানুষ তাঁর কান্নার কারণে তাঁর কুরআন পাঠ শুনতে পাবে না)। ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন: তিনি এ হাদীসটি এই অধ্যায়ে আনার উদ্দেশ্য হলো: নবী (ﷺ) বারবার এ কথা বলার পরও যে, আবু বকর যদি তাঁর স্থানে দাঁড়ান তবে মানুষ কান্নার কারণে তাঁর কুরআন পাঠ শুনতে পাবে না তবুও নবী (ﷺ) তাঁকে ইমামতি করতে আদেশ দিয়েছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর ভয়ে সালাতে কান্না করা সালাতের কোনো ক্ষতি করে না; বরং তা সালাতকে শোভিত করে। কেননা খুশূ-খুযূই হলো সালাতের সৌন্দর্য আর সালাতে কান্না করার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে তিনটি মতামত রয়েছে, আবু বকর ও হযরত উমর রা. থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, তা এটাই প্রমাণ করে যে, আল্লাহভীতির কারণে সালাতে কান্না করা অত্যন্ত সুন্দর ও প্রশংসনীয় কাজ। এবং এটা বলা যে, ‘এতে সালাত ভঙ্গ হয় না’ খুবই অনুপযুক্ত উক্তি। কারণ, যা সালাতের অলংকার, সৌন্দর্য ও শোভা, তার ব্যাপারে শুধু ‘অবৈধ করে না’ বলা কীভাবে যথেষ্ট হতে পারে? সালাফে সালিহীনরা যারা আল্লাহভীরু ছিলেন, তারা এভাবেই ছিলেন।ইমাম আহমাদ তাঁর কিতাবুয-যুহদ-এ নিজ সনদে নাফি‘ থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, ইবন উমর সালাতের মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। যখন জান্নাতের উল্লেখ আসতো, তখন সেখানে থেমে দোয়া করতেন এবং আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইতেন। তিনি দোয়া করতেন ও কাঁদতেন। আর যখন জাহান্নামের উল্লেখ আসতো, তখন তিনি দোয়া করতেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।এবং তাঁর সনদে ইবন আবি মুলায়কা থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন আমি ইবন আব্বাসের সঙ্গে মক্কা থেকে মদিনা সফর করেছি। আয়ূব তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন : তাঁর কুরআন তিলাওয়াত কেমন ছিল? তিনি বললেন: তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করতেন:”আর মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে এসেছে (সে) সত্যই; এটা (তা-ই) যা থেকে তুমি পালাতে চাচ্ছিলে।”(সূরা ক্বাফ: ১৯) তিনি ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করতেন এবং এ সময় অনেক বেশি কান্না করতেন। আর ইবনু আবি দুনইয়া তাঁর সনদে কাসিম ইবন মুহাম্মদ থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন একদিন আমি সকালে বের হলাম, দেখি আয়েশা রা. দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন (অর্থাৎ নফল নামাজ) এবং কাঁদছেন। তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন: “অতঃপর আমাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন।” সূরা তূর: ২৭] তিনি দোয়া করছিলেন, কাঁদছিলেন এবং বারবার আয়াতটি পুনরাবৃত্তি করছিলেন।আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, যতক্ষণ না দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। এরপর বাজারে নিজের কাজে গেলাম, আবার ফিরে এলাম। তখনও দেখি তিনি একইভাবে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন এবং কাঁদছেন।এ ব্যাপারে তাবে‘ঈন এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম থেকে অসংখ্য রেওয়ায়েত রয়েছে। আসলে, শুধু সেই মানুষই এটাকে অস্বীকার করবে, যার উপর শকওয়া (অভাগ্য) প্রাধান্য পেয়েছে বা যার জন্য পূর্ব থেকেই শকওয়া নির্ধারিত হয়ে গেছে।” (ইবনু রজব হাম্বলী; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৩৪-১৩৫)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,”َأَمَّا الْبُكَاءُ وَالتَّأَوُّهُ وَالْأَنِينُ الَّذِي يَنْتَظِمُ مِنْهُ حَرْفَانِ فَمَا كَانَ مَغْلُوبًا عَلَيْهِ لَمْ يُؤَثِّرْ ، وَمَا كَانَ مِنْ غَيْرِ غَلَبَةٍ فَإِنْ كَانَ لِغَيْرِ خَوْفِ اللَّهِ أَفْسَدَ الصَّلَاةَ”যেখানে কান্না, আর্তনাদ এবং গোঙানি থেকে দুটি অক্ষর উৎপন্ন হয় যদি তা চাপিয়ে দেওয়া (অনিয়ন্ত্রিত) হয় তবে এর কোনো প্রভাব নেই; আর যদি তা চাপিয়ে দেওয়া না হয় এবং আল্লাহর ভয়ের বাইরে অন্য কোনো কারণে হয়, তবে তা সালাত নষ্ট করে।”(ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনী; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৯৪-৩৯৫)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:مَا يُغْلَبُ عَلَيْهِ الْمُصَلِّي مِنْ عُطَاسٍ وَبُكَاءٍ وَتَثَاؤُبٍ فَالصَّحِيحُ عِنْدَ الْجُمْهُورِ أَنَّهُ لَا يُبْطِلُ وَهُوَ مَنْصُوصُ أَحْمَد وَغَيْرِهِ”সালাতরত অবস্থায় হাঁচি, কান্না ও হাই ওঠা ইত্যাদি যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে জুমহুরের (অধিকাংশ আলেমদের) সঠিক মত অনুযায়ী তা সালাত নষ্ট করে না। এবং এটি ইমাম আহমদ ও অন্যান্যদের স্পষ্ট বাণী।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২২; পৃষ্ঠা: ৬২৩)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
“البكاء في الصلاة إذا كان من خشية الله عز وجل والخوف منه وتذكر الإنسان أمور الآخرة وما يمر به في القرآن الكريم من آيات الوعد والوعيد فإنه لا يبطل الصلاة . وأما إذا كان البكاء لتذكر مصيبة نزلت به أو ما أشبه ذلك فإنه يبطل الصلاة ؛ لأنه حدث لأمر خارج عن الصلاة ، وعليه أن يحاول علاج نفسه من هذا البكاء حتى لا يتعرض لبطلان صلاته ، ويشرع له أن لا يكون في صلاته مهتماً بغير ما يتعلق بها فلا يفكر في الأمور الأخرى ؛ لأن التفكير في غير ما يتعلق بالصلاة في حال الصلاة ينقصها كثيرا
“নামাজে কান্না যদি আল্লাহ তাআলা কে ভয় করা, তাঁর মহিমার ভীতি, পরকালের কথা স্মরণ করা, এবং কুরআন মাজীদের ওয়াদা-ওয়াঈদের আয়াতসমূহ থেকে প্রভাবিত হওয়ার কারণে হয় তাহলে এতে নামাজ ভঙ্গ হয় না। কিন্তু যদি কান্না হয় কোনো দুনিয়াবী বিপদ-আপদ স্মরণ করার কারণে অথবা এ জাতীয় কারণে, তবে তা নামাজ ভঙ্গ করবে; কেননা এটি নামাজের বাইরের কারণে ঘটে। এজন্য নামাজি ব্যক্তির উচিত এই ধরনের কান্না থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা, যাতে নামাজ বাতিল হয়ে না যায়। তার জন্য শরীয়তসম্মত বিষয় হলো, নামাজে এমন কোনো কিছুর প্রতি মনোযোগী না হওয়া যা নামাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; যেন অন্য বিষয় নিয়ে চিন্তা না করে। কেননা নামাজের বাইরে অন্য বিষয়ে চিন্তা করা নামাজকে অনেক দুর্বল করে দেয়।”
(ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব: ১৪১/৯)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হলো:তারাবীহ কিংবা অন্যান্য নামাযে উচ্চস্বরে কান্নার শব্দ বের হওয়ার বিধান কী? উল্লেখ্য,এতে অন্যদের বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
তিনি জবাব দিলেন:
لا شك أن البكاء من خشية الله عز وجل من صفات أهل الخير والصلاح، وكان النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يخشع في صلاته ويكون لصدره أزيز كأزيز المرجل ، وقال الله تبارك وتعالى: (وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعاً) (الإسراء: 109).
فالبكاء عند قراءة القرآن، وعند السجود، وعند الدعاء من صفات الصالحين، والإنسان يحمد عليه، والأصوات التي تسمع أحياناً من بعض الناس هي بغير اختيارهم فيما يظهر، وقد قال العلماء رحمهم الله: إن الإنسان إذا بكى من خشية الله، فإن صلاته لا تبطل، ولو بان من ذلك حرفان فأكثر. لأن هذا أمر لا يمكن للإنسان أن يتحكم فيه، ولا يمكن أن نقول للناس : لا تخشعوا في الصلاة ولا تبكوا. بل نقول: إن البكاء الذي يأتي بتأثر القلب مما سمع، أو مما استحضره إذا سجد؛ لأن الإنسان إذا سجد استحضر أنه أقرب ما يكون إلى ربه عز وجل كما قال النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: (أقرب ما يكون العبد من ربه وهو ساجد) .والقلب إذا استحضر هذا وهو ساجد، لا شك أنه سيخشع ويحصل البكاء، ولا أستطيع أن أقول للناس : امتنعوا عن البكاء، ولكني أقول : إن البكاء من خشية الله والصوت الذي لا يمكن للإنسان أن يتحكم فيه لا بأس به، بل كما تقدم البكاء من خشية الله تعالى من صفات أهل الخير والصلاح”
“এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে আল্লাহ তাআলার ভয়ে কান্না করা নেককার ও সৎ ব্যক্তিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নবী ﷺ নামাজে বিনয়াভরে দণ্ডায়মান হতেন, আর তাঁর বুক থেকে হাঁড়িতে ফুটন্ত পানির মতো শব্দ শোনা যেত। আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন:“তারা কান্নাকাটি করতে করতে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং এতে তাদের বিনয় আরও বৃদ্ধি পায়।”(সূরা বনী ইসরাঈল: ১০৯) অতএব, কুরআন তিলাওয়াতের সময়, সিজদার সময় কিংবা দোয়ার সময় কান্না করা হলো সৎ ব্যক্তিদের গুণ। এর মাধ্যমে মানুষ প্রশংসিত হয়।মানুষের কাছ থেকে যে কান্নার শব্দ বের হয়, অনেক সময় তা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে এটিই পরিষ্কার বিষয়। আলেমগণ বলেছেন: যদি কেউ আল্লাহর ভয় থেকে কেঁদে ফেলে, তবে তার নামাজ ভঙ্গ হবে না যদিও সেই কান্নার মধ্যে থেকে দুই অক্ষর বা তার বেশি উচ্চারিত হয়ে যায়। কেননা এটা মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আমরা তো তাকে বলতে পারি না: “তুমি নামাজে খুশূ করো না, কেঁদো না। বরং আমরা বলি: যদি কান্না আসে হৃদয়ের প্রভাব থেকে সে যা শুনেছে তার কারণে, অথবা সিজদার মুহূর্তে যা হৃদয়ে উদয় হয়েছে তার কারণে তাহলে এতে কোনো দোষ নেই। কারণ মানুষ যখন সিজদায় থাকে তখনই সে তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। যেমন নবী ﷺ বলেছেন: “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সিজদায় থাকে।” সুতরাং সিজদার সময় যখন মানুষ এ বিষয়টি স্মরণ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই হৃদয়ে বিনয় সৃষ্টি হয় এবং কান্না আসে। আমি তো কাউকে বলতে পারি না: “কান্না থেকে বিরত থাকো।”বরং আমি বলি: আল্লাহর ভয় থেকে আসা কান্না এবং যে শব্দ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এতে কোনো অসুবিধা নেই। বরং যেমন পূর্বেই বলা হয়েছে, আল্লাহর ভয় থেকে কান্না করা নেককার ও সৎ ব্যক্তিদের গুণ।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২৩৮)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সালাত। আল্লাহ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন তাঁর স্মরণে নিবেদিত থাকার জন্য—﴿وَأَقِمِ الصَّلاَةَ لِذِكْرِي﴾ (ত্বোয়া-হা ২০:১৪)। ইবাদতের প্রাণ হলো একাগ্রতা; তা ছাড়া সালাত কেবল দায়সারা শরীরচর্চায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, এনে দেয় না অন্তরের প্রশান্তি ও নেকীর অনুপ্রেরণা। কিন্তু আজকের ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে সালাতে খুশূ অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রাসূল (ﷺ) এর এই হাদীস বাস্তবে রূপ নিয়েছে: “এই উম্মত থেকে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি উঠিয়ে নেয়া হবে, তা হলো খুশূ এমনকি একাগ্রচিত্ত মুছল্লী খুঁজে পাওয়া যাবে না।” সুতরাং আমাদের উচিত সালাতে যত্নশীল হওয়া। আর সালাতের মধ্যে আল্লাহর ভয়, আখিরাতের শাস্তি ও কুরআনের আয়াতে প্রভাবিত হয়ে কান্না করা মুস্তাহাব এবং সালেহীনদের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দুনিয়াবি কষ্ট বা ব্যথায় কান্না এলে তা দমন করার চেষ্টা করবে। চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণে না এলে সালাত নষ্ট হবে না। তবে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জোরে জোরে কান্না করলে সালাত বাতিল হয়ে যাবে এ বিষয়ে অধিকাংশ ফকীহ একমত।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: উস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Wednesday, September 3, 2025

ইসলামে মেহমানদারীর বিধান ও আদব সমূহ

 প্রশ্ন: ইসলামে মেহমানদারীর বিধান কি? আতিথেয়তার আদব সমূহ সম্পর্কে শার’ই নির্দেশনা জানতে চাই?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর প্রকৃত মুসলিম মেহমান আসলে কখনো বিরক্ত হয় না, মন খারাপও করে না। বরং সে খুশি হয় এবং মেহমানের সম্মান ও ইজ্জত যথাযথভাবে রক্ষা করে। কারণ সে জানে, মেহমান আসলে তার অধিকার অনুযায়ী সম্মান পাবে। আবু শুরাইহ আল আদাবী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) যখন এ হাদীসটি বলেছেন তখন আমার দু’কান তা শুনেছে এবং দু’চোখ তা দেখেছে। তিনি বলেছেন-من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليكرم ضيفه جائزته. قالوا وما جائزته قال يومه وليله والضيافة ثلاثة ايام فما كان وراء ذٰلك فهو صدقة عليه. وقال من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليقل خيرا أو ليصمت”যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তার উচিত সাধ্যমত অতিথি আপ্যায়ন করা। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, সাধ্যমত কথার তাৎপর্য কী? তিনি বললেন, একদিন একরাত। মেহমানদারী সর্বোচ্চ তিন দিন। এর বেশী যদি কেউ করে সেটি তার বদান্যতা। তিনি আরও বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তার উচিত ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা”।(সহীহ বুখারী; হা/৫৬৭৩; সহীহ মুসলিম হা/৪৮) লোকমান হাকিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, চারটি বস্তু থেকে কারোরই অনীহা থাকা উচিৎ নয়, যদিও সে আমীর বা ভদ্রলোক হোক: (১).পিতার সম্মানে জায়গা ছেড়ে দেওয়া। (২).মেহমানের মেহমানদারি করা। (৩).স্বীয় বাহনের পরিচর্যা করা। (৪).আলিমের খেদমত করা। বকর বিন আব্দুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,‌إِذَا ‌أَتَاكَ ‌ضَيْفٌ فَلَا تَنْتَظِرْ بِهِ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ، وَتَمْنَعْهُ مَا عِنْدَكَ، بَلْ قَدِّمْ إِلَيْهِ مَا حَضَرَ، وَانْتَظِرْ بِهِ بَعْدَ ذَلِكَ مَا يَزِيدُ مِنْ إِكْرَامِهِ، “যখন তোমার বাড়িতে কোন মেহমান আসবে, তখন তোমার ঘরে যা নেই তা আনার জন্য মেহমানকে অপেক্ষায় রেখো না। আর তোমার ঘরে যা আছে তা দিয়ে আপ্যায়ন করবে না এমনটি যেন না হয়; বরং উপস্থিত যা পাও, তা-ই তার সামনে পেশ কর। এরপর অন্য কিছু দিয়ে আরো আপ্যায়ন করার ব্যবস্থা করতে পার”।(বুরজুলানী, আল-কারামু ওয়াল জূদ, পৃষ্ঠা: ৫২)
.
▪️ইসলামে মেহমানদারি করার শারঈ হুকুম কি?
.
ইসলামে অতিথেয়তার গুরুত্ব অপরিসীম।শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে আতিথেয়তার হুকুম সম্পর্কে ইমামগনের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।আলেমগন কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এটিকে তিন স্তরে ভাগ করেছেন:
.
(১).বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) অধিকার: একজন অতিথিকে কমপক্ষে একদিন একরাত স্বাগত ও সেবা দেওয়া।
(২).সুন্নত আদব: অতিথিকে তিন দিনের জন্য যত্ন ও সম্মান প্রদর্শন করা।
(৩).সাধারণ সদকা:আর তিন দিনের পর থেকে তা হবে সদকা ও সৎকাজ,ব্যক্তি চাইলে করবে, চাইলে করবে না।
অর্থাৎ এটি ব্যক্তির ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। এইভাবে অতিথির সম্মান নিশ্চিত করা ইসলামে অত্যন্ত প্রিয় ও প্রশংসনীয় কাজ হিসেবে বিবেচিত।আর নবী (ﷺ) সহিহ হাদিসে, এ তিনটি স্তরই বর্ণনা করেছেন যা আবু শুরাইহ আল খুযায়ী থেকে এসেছে।(সহীহ বুখারী হা/৫৬৭৩; সহীহ মুসলিম হা/৪৮)
.
ইমাম খাত্তাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন বলেছেন:
قوله : (جائزته يوم وليلة) سئل مالك بن أنس عنه فقال : يُكرمه ، ويتحفه ، ويخصه ، ويحفظه ، يوماً وليلة ، وثلاثة أيام ضيافة .قلت : يريد أنه يتكلف له في اليوم الأول بما اتسع له من بِر ، وألطاف ، ويقدِّم له في اليوم الثاني والثالث ما كان بحضرته ، ولا يزيد على عادته ، وما كان بعد الثلاث : فهو صدقة ، ومعروف ، إن شاء فعل ، وإن شاء ترك .
(তার অতিথি সেবার অধিকার এক দিন ও এক রাত)। এ বিষয়ে মালিক ইবনে আনাসকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন: তাকে সম্মান করবে, উপহার দেবে, বিশেষভাবে যত্ন নেবে এবং তার হেফাজত করবে একদিন ও একরাত, আর তিন দিন হলো অতিথেয়তা।আমি (খাত্তাবি) বলি: তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে প্রথম দিনে তার জন্য সাধ্যানুযায়ী যত্ন ও অনুগ্রহ করবে, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে তার সামনে যা উপস্থিত আছে তাই পরিবেশন করবে, অতিরিক্ত কিছু করবে না। আর তিন দিনের পর থেকে তা হবে সদকা ও সৎকাজ, চাইলে করবে, চাইলে করবে না।”(মাআলিমুস সুনান; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৩৮)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ, ইমাম ইবনু ক্বাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন:
إن للضيف حقّاً على مَن نزل به ، وهو ثلاث مراتب : حق واجب ، وتمام مستحب ، وصدقة من الصدقات ، فالحق الواجب : يوم وليلة , وقد ذكر النبي صلى الله عليه وسلم المراتب الثلاثة في الحديث المتفق على صحته من حديث أبي شريح الخزاعي – وساق الحديث السابق –
“অতিথির অধিকার রয়েছে যে ব্যক্তি তার কাছে অবতরণ করে, আর এর তিনটি স্তর আছে: একটি হচ্ছে বাধ্যতামূলক অধিকার, আরেকটি পূর্ণাঙ্গ সুন্নত আদব, আরেকটি হলো সাধারণ সদকা। বাধ্যতামূলক অধিকার হলো: একদিন ও একরাত। আর নবী ﷺ এ তিনটি স্তরই বর্ণনা করেছেন সহিহ হাদিসে, যা আবু শুরাইহ আল খুযায়ী থেকে এসেছে এবং তিনি আগের হাদিস বর্ণনা করেছেন।”(ইবনু ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৬৫৮)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন;والواجب يوم ليلة ، والكمال ثلاثة أيام ؛ لما روى أبو شريح الخزاعي – وساق الحديث -“বাধ্যতামূলক হলো এক দিন ও এক রাত, আর পূর্ণতা হলো তিন দিন; কারণ আবু শুরাইহ আল-খুযায়ী থেকে হাদিস এসেছে এবং তিনি হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।”(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খন্ড: ১১; পৃষ্ঠা: মুগনী ১১/৯১)
.
অতিথি যাকে সম্মান করা ওয়াজিব,এবং যার অধিকার গৃহস্বামীর ওপর প্রযোজ্য, তিনি হলেন ভ্রমণকারী অতিথি অর্থাৎ যে ব্যক্তি নিজের শহর বা গ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গা থেকে এসেছে। সুতরাং যার ঘরে তিনি অবতরণ করবেন, তার কর্তব্য হলো তাকে আহার করানো ও যথাযথ সম্মান দেওয়া। যদি গৃহস্বামী তা না করে, তবে অতিথির তার সম্পদের ওপর অধিকার থাকে।তবে এ বিধান স্থানীয় দর্শনার্থীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যে ভ্রমণকারী নয়। এ ধরনের অতিথিকে বলা যেতে পারে: “ফিরে যান।” যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:وَإِنْ قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
“যদি তোমাদেরকে বলা হয়: ‘ফিরে যাও’, তবে তোমরা ফিরে যাবে; এটা তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।” (সূরা নূর: ২৮) আমাদের এ কথার সমর্থনে বহু সহীহ হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে অতিথির অধিকার মূলত ভ্রমণকারীর জন্য, স্থানীয় অধিবাসীর জন্য নয়। যেমন উকবাহ বিন আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বললাম, আপনি আমাদেরকে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে থাকেন। আমরা এমন সব জনপদে যাত্রাবিরতি করি যারা আমাদের আপ্যায়ন করে না। এ ব্যাপারে আপনার কি অভিমত? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে বলেনঃ যদি তোমরা কোন বসতি এলাকায় যাত্রাবিরতি করো এবং তারা মেহমানের আপ্যায়নযোগ্য ব্যবস্থা করলে তা তোমরা গ্রহণ করো। আর যদি তারা তা না করে, তবে তাদের থেকে তাদের সামর্থ্য অনুসারে মেহমানদারির ন্যায্য দাবি আদায় করো।”(সহীহুল বুখারী হা/২৪৬১, ৬১৩৭, সহীহ মুসলিম হা/১৭২৭) আতিথেয়তার (অতিথি আপ্যায়নের) বিধান এবং কার ওপর এটি প্রযোজ্য এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
.
আল মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ-তে বলা হয়েছে:
“وقد ذهب الحنفية والمالكية والشافعية إلى أن الضيافة سنَّة ، ومدتها ثلاثة أيام ، وهو رواية عن أحمد .والرواية الأخرى عن أحمد – وهي المذهب – أنها واجبة ، ومدتها يوم ليلة ، والكمال ثلاثة أيام . وبهذا يقول الليث بن سعد .ويرى المالكية وجوب الضيافة في حالة المجتاز الذي ليس عنده ما يبلغه ويخاف الهلاك .والضيافة على أهل القرى والحضر ، إلا ما جاء عن الإمام مالك ، والإمام أحمد – في رواية – أنه ليس على أهل الحضر ضيافة ، وقال سحنون : الضيافة على أهل القرى ، وأما أهل الحضر فإن المسافر إذا قدم الحضر وجد نزلاً – وهو الفندق – فيتأكد الندب إليها ولا يتعين على أهل الحضر تعينها .
“হানাফি, মালিকি ও শাফেয়ি ফকিহদের মতে অতিথেয়তা সুন্নাত, আর এর মেয়াদ তিন দিন। ইমাম আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এরও একটি বর্ণনা এ কথাই নির্দেশ করে। তবে তাঁর আরেকটি বর্ণনা যেটি তাঁর মাযহাব হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছে সেটা হলো: অতিথেয়তা ওয়াজিব; এর মেয়াদ এক দিন এক রাত। আর তিন দিন পর্যন্ত তা পূর্ণতা বা সম্পূর্ণ সুন্নাতরূপে গণ্য হবে। এ মতের সাথে ইমাম লাইস ইবনু সা‘দ রহ.-ও একমত। মালিকিরা আরও বলেছেন: যদি কোনো পথিক থাকে যার কাছে কিছুই নেই, আর আশঙ্কা থাকে যে সে ক্ষুধায় কষ্ট পেয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন তার জন্য অতিথেয়তা ওয়াজিব হবে। অতিথেয়তা গ্রামাঞ্চল ও শহরের লোকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে ইমাম মালিক রহ. এবং ইমাম আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর একটি বর্ণনায় এসেছে: শহরের লোকদের জন্য অতিথেয়তা (ওয়াজিব হিসেবে) নেই। সানহুন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: অতিথেয়তা গ্রামীণ লোকদের ওপর ওয়াজিব, কিন্তু নগরবাসীর ওপর নয়। কারণ, শহরে আগন্তুক এলে সেখানে সরাইখানা (হোটেল) পাওয়া যায়। তাই শহরে অতিথেয়তা করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে ঠিকই, তবে তা শহরের অধিবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।(আল-মাউসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড: ২৮, পৃষ্ঠা: ৩১৬–৩১৭)
.
সবচেয়ে সঠিক অভিমত আল্লাহই সর্বজ্ঞাত হলো: পথচারী মুসাফিরের জন্য আতিথেয়তা করা ওয়াজিব। এ হুকুমে শহরবাসী ও গ্রামবাসীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; বরং সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] হাজ্জাওয়ির (রহিমাহুল্লাহ) এই কথার ব্যাখ্যায় বলেছেন:
وَتَجِبُ ضِيَافَةُ المُسْلِمِ الْمُجْتَازِ بِهِ فِي الْقُرَى يَوْماً وَلَيْلَةً” .
قال : قوله : ” وتجب ضيافة المسلم ” : ” تجب ” هذا بيان حكم الضيافة ، والضيافة أن يَتلقَّى الإنسان مَن قدم إليه ، فيكرمه ، وينزله بيته ، ويقدم له الأكل ، وهي من محاسن الدين الإسلامي ، وقد سبقنا إليها إبراهيم عليه الصلاة والسلام ، كما قال الله تعالى : ( هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ الْمُكْرَمِينَ ) الذاريات/ 24 ، أي : الذين أكرمهم إبراهيم ، ولا يمتنع أن يقال : والذين أكرمهم الله عزّ وجل بكونهم ملائكة .فحكم الضيافة واجب ، وإكرام الضيف – أيضاً – واجب ، وهو أمر زائد على مطلق الضيافة ، قال النبي عليه الصلاة والسلام : ( من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فليكرم ضيفه ) ، أي : من كان يؤمن إيماناً كاملاً : فليكرم ضيفه …. قوله : ” المجتاز به ” يعني : الذي مرَّ بك وهو مسافر ، وأما المقيم : فإنه ليس له حق ضيافة ، ولو كان المقيم له حق الضيافة : لكان ما أكثر المقيمين الذين يقرعون الأبواب ! فلا بد أن يكون مجتازاً ، أي : مسافراً ومارّاً ، حتى لو كان مسافراً مقيماً يومين ، أو ثلاثة ، أو أكثر : فلا حق له في ذلك ، بل لا بد أن يكون مجتازاً .قوله : ” في القرى ” دون الأمصار ، والقرى : البلاد الصغيرة ، والأمصار : البلاد الكبيرة ، قالوا : لأن القرى هي مظنة الحاجة ، والأمصار بلاد كبيرة فيها مطاعم ، وفنادق ، وأشياء يستغني بها الإنسان عن الضيافة ، وهذا – أيضاً – خلاف القول الصحيح ؛ لأن الحديث عامّ ، وكم من إنسان يأتي إلى الأمصار وفيها الفنادق ، وفيها المطاعم ، وفيها كل شيء ، لكن يكرهها ويربأ بنفسه أن يذهب إليها ، فينزل ضيفاً على صديق ، أو على إنسان معروف ، فلو نزل بك ضيف – ولو في الأمصار – : فالصحيح : الوجوب .
“গ্রামে পথিক মুসলিমের জন্য এক দিন এক রাতের আতিথেয়তা ওয়াজিব।তিনি বলেন: “আতিথেয়তা ওয়াজিব” বলতে বোঝানো হয়েছে যে, যখন কোনো ব্যক্তি তোমার কাছে আসে, তাকে সম্মান প্রদর্শন করা, তার জন্য ঘরে স্থান দেওয়া এবং খাবার পরিবেশন করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। আতিথেয়তার সূচনা করেছিলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম।আল্লাহ বলেন: “আপনার কাছে কি ইবরাহীমের সম্মানীত মেহমানদের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে?”(সূরা যারিয়াত: ২৪) অর্থাৎ ইবরাহীম যে মেহমানদের সম্মান করতেন, তারা আল্লাহর দৃষ্টিতেও সম্মানিত ছিলেন। কারণ তারা ছিলেন ফেরেশতা। অতএব আতিথেয়তার হুকুম ওয়াজিব। অতিথিকে সম্মান করাও ওয়াজিব, যা সাধারণ আতিথেয়তার অতিরিক্ত একটি শিষ্টাচার। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।অর্থাৎ যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান রাখে, সে যেন অবশ্যই অতিথিকে সম্মান করে। পথিক বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তি, যে তোমার কাছে এসেছে কিন্তু সফরে আছে। স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ব্যক্তির জন্য আতিথেয়তার অধিকার প্রযোজ্য নয়। কারণ যদি স্থায়ীদের জন্যও তা প্রযোজ্য হত, তাহলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দরজায় কড়া নাড়ত। এমনকি যদি কেউ দু’দিন বা তিন দিন অবস্থান করে, তাহলেও তার জন্য আতিথেয়তার হক নেই; তিনি অবশ্যই পথচলতি হতে হবে।“গ্রামে” বলা হয়েছে শহরের বদলে,গ্রাম বলতে ছোট জনপদকে বোঝানো হয়েছে, আর শহর বলতে বড় নগরকে। তারা বলেন:কারণ গ্রামে সাধারণত সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে। অন্যদিকে শহরে হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য ব্যবস্থা থাকে, যা মানুষের আতিথেয়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমায়। তবে হাদীসের দিক থেকে এটিকে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। কারণ হাদীসের বক্তব্য সাধারণ। অনেক সময় এমন ঘটে যে কেউ বড় শহরে আসলেও হোটেল বা রেস্টুরেন্ট পছন্দ করে না, বরং কোনো বন্ধু বা পরিচিত জনের বাসায় অতিথি হতে চায়। সুতরাং, যদি শহরেও অতিথি আসে সঠিক মত হলো: তার আতিথেয়তা ওয়াজিব।”(ইবনু উসাইমীন; শারহুল মুমতি আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪৮–৫১)।
.
▪️এক নজরে আতিথেয়তার আদব সমূহ:
মানুষ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী বা অন্য কারো নিকটে অতিথি হয় ও আতিথ্য গ্রহণ করে। ইসলাম এক্ষেত্রে কিছু আদব পালন করার নির্দেশ দিয়েছে। এগুলি মেনে চলার মাধ্যমে পাস্পরিক সম্পর্ক সুন্দর করা এবং নেকী অর্জনের চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। নিম্নে আতিথেয়তার আদব উল্লেখ করা হল:
.
(১).মেহমানকে স্বাগত জানানো: মেহমানকে অভ্যর্থনা জানানো মুস্তাহাব। রাসূল (ﷺ) তাঁর নিকটে আগত মেহমানদেরকে স্বাগত জানাতেন।(দেখুন সহীহ বুখারী হা/৩৫৭, ৩১৭১; সহীহ মুসলিম হা/৩৩৬)
.
(২).অতিথিকে সম্মান করা: অতিথিকে সম্মান করা রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশ। তাই সাধ্যমত মেহমানকে সম্মান করা মেযবানের জন্য যরূরী। রাসূল (ﷺ) বলেন,وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ،”যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন মেহমানের সম্মান করে”।(সহীহ বুখারী হা/৬০১৮-১৯; সহীহ মুসলিম হা/৪৭)
.
(৩).অতিথিকে দ্রুত খাবার পরিবেশন করা ও তার প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখা: অতিথি এলে বিলম্ব না করে খাবার পরিবেশন করা উচিত, যেমন নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর অতিথিদের জন্য দ্রুত গো-মাংস প্রস্তুত করে সামনে রেখেছিলেন।”(সূরা যারিয়াত: ২৪-২৭)।একইভাবে তাদের জন্য গোসলখানা, টয়লেট ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থাও করা উচিত।
.
(৪).সম্ভব হলে মেহমানের আপ্যায়ন নিজে করা: মেহমানের আপ্যায়ন সাধ্যপক্ষে মেযবানকে নিজেই করা উচিত। যেমন ইবরাহীম (আঃ) নিজেই মেহমানদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, فَرَاغَ إِلَى أَهْلِهِ فَجَاءَ بِعِجْلٍ سَمِينٍ، فَقَرَّبَهُ إِلَيْهِمْ قَالَ أَلَا تَأْكُلُونَ، ‘অতঃপর সে দ্রুত চুপিসারে নিজ পরিবারবর্গের কাছে গেল এবং একটি মোটা-তাজা গো-বাছুর (ভাজা) নিয়ে আসল। অতঃপর সে তা তাদের সামনে পেশ করল ও বলল, ‘তোমরা কি খাবে না’? (সূরা যারিয়াত: ২৬-২৭)। এজন্য ইমাম বুখারী অধ্যায় রচনা করেছেন,باب إِكْرَامِ الضَّيْفِ وَخِدْمَتِهِ إِيَّاهُ بِنَفْسِهِ ‘মেহমানের সম্মান করা এবং নিজেই মেহমানের খিদমত করা’ অনুচ্ছেদ।(সহীহ বুখারী, তরজমাতুল বাব, নং ৮৫)
.
(৫).অতিথির সাথে অভিনয় বা ভান না করা: অতিথির সাথে কৃত্রিম আচরণ না করা কিংবা এমন কোন ব্যবহার না করা যাতে তার নিকটে অভিনয় প্রকাশ পায়। আনাস (রাঃ) বলেন, كُنَّا عِنْدَ عُمَرَ فَقَالَ نُهِينَا عَنِ التَّكَلُّفِ، ‘আমরা ওমর (রাঃ)-এর কাছে ছিলাম। তখন তিনি বললেন, (যাবতীয়) কৃত্রিমতা হ’তে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।(সহীহ বুখারী হা/৭২৯৩) অন্যত্র রাসূল (ﷺ) বলেন,لاَ يَتَكَلَّفَنَّ أَحَدٌ لِضَيْفِهِ مَا لاَ يَقْدِرُ عَلَيْهِ-“কেউ যেন তার মেহমানের সাথে এমন কৃত্রিম আচরণ না করে, যা করার সাধ্য (প্রকৃতপক্ষে) তার নেই”।(সহীহুল জামে‘ হা/৭৬০৮; সিলসিলা সহীহাহ হা/২৪৪০)
.
(৬).অতিথিকে নিজেদের উপরে প্রাধান্য দেওয়া: নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনের উপরে অতিথিকে প্রাধান্য দেওয়া। এতে আল্লাহর সন্তোষ লাভ করা যায়। এক্ষেত্রে আবু তালহা (রাঃ) ও তার স্ত্রী কর্তৃক মেহমান আপ্যায়নের ঘটনা স্মর্তব্য।(দেখুন বুখারী হা/৩৭৯৮; সহীহ মুসলিম হা/২০৫৪)
.
(৭).ডানদিক থেকে খাবার পরিবেশন শুরু করা: প্রথমে ডান দিক থেকে খাবার পরিবেশন করা সুন্নাত।(সহীহ বুখারী হা/২৩৫১, ২৩৫২; সহীহ মুসলিম হা/২০২৯, ২০৩০; মিশকাত হা/৪২৭৩, ৪২৭৪)
.
(৮).মেহমানের সামনে রাগ না করা ও অসহনশীল না হওয়া: মেহমানের সামনে রাগ প্রকাশ করা এবং তার সম্মুখে অসহনশীল আচরণ করা সমীচীন নয়।(দেখুন: সহীহ বুখারী হা/৬০২, ৬১৪০)
.
(৯).সেবার মাধ্যমে অতিথিকে কষ্ট না দেওয়া: অতিথির সেবা-যত্ন করতে গিয়ে এমন অতিরিক্ত কিছু না করা যাতে সেটা তার কষ্টের কারণ হয়। যেমন জোর করে বেশী খাবার তুলে দেওয়া কিংবা তার সাথে বেশী সময় দিতে গিয়ে এবং তার সাথে আলাপচারিতা করতে গিয়ে তার বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটানো ইত্যাদি।
.
(১০).মেহমানের কারণে বিরক্তি বা অস্বস্তি প্রকাশ না করা: মেহমানের আগমনের কারণে বিরক্তি প্রকাশ না করা এবং তার সাথে কথাবার্তা ও আচরণে যেন সেটা প্রকাশ না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। তার সাথে হাসিমুখে ও ভালভাবে কথা বলা এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাক্ষাৎ করা। তার আগমনে মেযবান অসন্তুষ্ট নয়, এটা যাতে মেহমানের সামনে ফুটে ওঠে সেই চেষ্টা করা।আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,«الكلمة الطيبة صدقة»“সুন্দর কথা সদকা স্বরূপ।”(সহীহ বুখারী হা/২৯৮৯)
.
(১১).মেহমান খাবার গ্রহণ শেষ করার পূর্বে খাবার তুলে না নেওয়া: খাবার পরিবেশনের পরে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, মেহমান তার প্রয়োজন মত খাবার গ্রহণ করেছেন কি-না। তার প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার পূর্বে খাবার উঠিয়ে নেওয়া সমীচীন নয়। অনেক ক্ষেত্রে মেহমান লজ্জায় খাবার কম খেতে পারে কিংবা খাদ্যের পাত্র তুলে নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তিনি লজ্জায় খাবার গ্রহণ শেষ করতে পারেন। তাই পাত্র তোলার পূর্বে এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
.
(১২).বিদায়কালে মেহমানের সাথে বাড়ীর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া: মেহমান যখন চলে যেতে চাইবেন তখন তার সাথে বাড়ীর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া মুস্তাহাব। এতে বদান্যতা যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি এটা মেহমানের সমাদর ও যত্নের পূর্ণতা এবং তার উত্তম আতিথেয়তার বহিঃপ্রকাশ”(ফাৎহুল বারী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৫২৮)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate