Friday, March 6, 2026

রাবেয়া বসরী কে ছিলেন

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর রাবেয়া আল-আদাবিয়া (রহি’মাহাল্লাহ); যিনি ‘রাবেয়া বসরী’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন।বিজ্ঞ আলেমদের বক্তব্য থেকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তিনি ছিলেন তাবি-তাবিঈন যুগের এক অনন্য ও পরহেজগার নারী। তিনি হিজরী ১০০ সনে ইরাকের বসরা নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮০ বছর বয়সে ১৮০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। রাবেয়া বসরী একজন ‘যাহিদাহ’ (দুনিয়া বিমুখ), ‘আবিদাহ’ (আল্লাহর ইবাদত গুজার) এবং অত্যন্ত বিনয়ী নারী হিসেবে জগদ্বিখ্যাত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, সেই যুগে ‘তাসাউফ’ বা সুফিবাদ বর্তমানের মতো নির্দিষ্ট নাম কিংবা বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিচিত ছিল না; বরং তখন এমন কিছু ইবাদতগুজার মানুষ ছিলেন যারা তাদের পরহেজগারিতা ও দুনিয়াবিমুখতার জন্য স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।সালাফে সালেহীনের বহু ইমাম তাঁর প্রশংসা করেছেন—যাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ)। একইভাবে ইবনুল জাওজী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সিফাতুস সাফওয়া-এ রাবেয়ার গুণাবলি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর জীবনীর ওপর একটি স্বতন্ত্র রচনাও সংকলন করেছেন।যদিও পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ তাঁর প্রতি ‘হুলুল’ (সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির মাঝে মিশে যাওয়া) মতবাদের অভিযোগ আরোপ করেছেন, তবে মহান মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ ইমাম আয‑যাহাবী তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সিয়ারু আলামিন নুবালা-তে এ অভিযোগকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৪৮) তার সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ গ্রন্থে রাবেয়া বসরীর জীবনীতে লিখেছেন:رابعة العدوية البصرية الزاهدة العابدة الخاشعة، رابعة بنت إسماعيل أم عمر ولاؤها للعتكيين، ولها سيرة في جزء لابن الجوزي،”রাবেয়া আদবিয়া আল-বাসরিয়া ছিলেন অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ, ইবাদতগুজার এবং আল্লাহভীরু নারী। তিনি ছিলেন ইসমাঈলের কন্যা এবং উম্মে আমর উপনামে পরিচিত। তাঁর বংশীয় সম্পর্ক ছিল আতিক গোত্রের সাথে। ইবনুল জাওজী তাঁর জীবনী নিয়ে একটি পুস্তিকা লিখেছেন।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন;সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ২৪১)
.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) আরও উল্লেখ করেন যে, ইবনে আবিদ দুনইয়া বর্ণনা করেছেন: মুহাম্মদ বিন হুসাইন আমাদের বলেছেন, উবাইস বিন মাইমুন আল-আত্তার আমাকে বলেছেন, রাবেয়া আদবিয়ার সেবিকা আবদাহ বিনতে আবি শাওয়াল বলেছেন:
كانت رابعة تصلي بالليل كله فإذا طلع الفجر هجعت في مصلاها هجعة خفيفة حتى يسفر الفجر فكنت أسمعها تقول : إذا وثبت من مرقدها ذلك وهي فزعة : يا نفس كم تنامين ؟ إلى كم تقولين ؟ يوشك أن تنامي نومة لا تفوقين منها إلا ليوم النشور قالت فكان هذا دأبها دهرها حتى ماتت
“রাবেয়া সারা রাত ধরে (তাহাজ্জুদের) নামাজ আদায় করতেন। যখন ফজর উদিত হতো, তিনি তাঁর জায়নামাজে অল্প সময়ের জন্য একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেন (হালকা ঘুমাতেন)। যখন সুবহে সাদিক স্পষ্ট হয়ে যেত, তখন তিনি তাঁর বিছানা থেকে আতঙ্কিত হয়ে লাফিয়ে উঠতেন এবং আমি তাঁকে বলতে শুনতাম:”হে নফস (মন)! তুমি আর কতকাল ঘুমাবে? কতক্ষণ এভাবে (অচেতনে) পড়ে থাকবে?খুব শীঘ্রই তুমি এমন এক ঘুমে বিভোর হতে যাচ্ছ,(মৃত্যু) যা থেকে হাশরের দিন (পুনরুত্থান দিবস) ছাড়া আর কখনোই জাগবে না। বর্ণনাকারী আবদাহ বলেন—মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সারা জীবন এটিই ছিল তাঁর চিরচেনা স্বভাব ( অর্থাৎ তিনি এভাবেই নিজেকে নসিহত করতেন)।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনুল ঈমাদ হাম্বালী; শযারাতুয যাহাব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯৩) এবং সিফাতুস সফওয়াহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৭)।
.
আবু সাঈদ ইবনুল আ’রাবী (রহি’মাহুল্লাহ) বলেন:أما رابعة فقد حمل الناس عنها حكمة كثيرة، وحكى عنها سفيان وشعبة وغيرهما ما يدل على بطلان ما قيل عنها”লোকেরা রাবেয়ার থেকে অনেক প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা-বার্তা বর্ণনা করেছে। সুফিয়ান আস-সাউরী, শু’বাহ এবং অন্যান্য (প্রসিদ্ধ হাদীসের রাবীগণ) তাঁর হিকমাহ বর্ণনা করেছেন,যা তাঁর নামে প্রচলিত ভিত্তিহীন কথাগুলোকে বাতিল বা মিথ্যা প্রমাণ করে।”
.
রাবেয়া আদবিয়ার দিকে নিসবত করা একটি কবিতার চরণের ভুল ব্যাখ্যা করে তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। কবিতাটি হলো:ولقد جعلتك في الفؤاد محدثي * وأبحت جسمي من أراد جلوسي.”আমি তো হৃদয়ে তোমাকেই (আল্লাহকে) স্থান দিয়েছি,আর আমার দেহটা রেখেছি তাদের জন্য, যারা আমার সান্নিধ্যে বসতে চায়।”
.
সুফিবাদের পরিভাষায় এই চরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো:​”আমার অন্তর সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন (হৃদয়ের সঙ্গী)। আর মানুষের সাথে যখন আমি বসি বা কথা বলি, তখন কেবল আমার শরীরটাই সেখানে উপস্থিত থাকে (দেহকে তাদের জন্য রেখেছি), কিন্তু আমার রুহ বা আত্মা থাকে তাঁরই সান্নিধ্যে।” অর্থাৎ, তিনি বলতে চেয়েছেন তিনি লোকসমাজে থাকলেও মানসিকভাবে পুরোপুরি আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন। মানুষের সাথে তাঁর লেনদেন কেবল শরীর বা লৌকিকতার পর্যায়ে, হৃদয়ের পর্যায়ে নয়।
.
অথচ এই কবিতার অর্ধেক অংশ দিয়ে কেউ কেউ তাঁকে ‘হুলুল’ (সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার বিলীন হওয়া) এবং পুরো অংশ দিয়ে ‘ইবাহাত’ (শরীয়তের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া) এর দিকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এর জবাবে ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وهذا غلو وجهل ولعل من نسبها إلى ذلك مُباحي حلولي ليحتج بها على كفرها كاحتجاجهم بخبر ” كنت سمعه الذي يسمع به”আর এটি (রাবেয়ার প্রতি এই অভিযোগ) অতিরঞ্জন এবং মূর্খতা। সম্ভবত যারা তাকে (রাবেয়াকে) এগুলোর সাথে সম্পর্কিত করেছে, তারা হলো এমন ‘মুবাহি’ (যারা মনে করে শরিয়তের সবকিছু তাদের জন্য বৈধ হয়ে গেছে) ও ‘হুলুলি’ (সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিতে বিলীন হওয়ার প্রবক্তা), যারা তাদের নিজেদের কুফুরীর সপক্ষে এটি দ্বারা দলিল পেশ করতে চায়—ঠিক যেভাবে তারা (নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদের সপক্ষে) ‘আমি তার কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শোনে’—এই বর্ণনাটি (হাদিসে কুদসি) দিয়ে দলিল পেশ করে থাকে।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন;সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড:৮; পৃষ্ঠা: ২৪১)
.
জেনে রাখা ভাল যে, রাবেয়া বসরী রহি’মাহাল্লাহ থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোন ‘কারামত’ বা অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হয়নি। তবে তাঁর থেকে অনেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী এবং তাঁর দুনিয়া বিমুখ জীবনের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন রাবেয়া বসরী (রহি’মাহাল্লাহ) সুফিয়ান আস-সাউরী রহি’মাহুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,إنما أنت أيام معدودة فإذا ذهب يوم ذهب بعضك ، يوشك إذا ذهب البعض أن يذهب الكل وأنت تعلم ، فاعمل“আপনার জীবন সামান্য কতগুলো দিনের সমষ্টি মাত্র। যখনই একটা দিন অতিবাহিত হয়, আপনার জীবনের একটা অংশ শেষ হয়ে যায়। শীঘ্রই এমন একটা সময় আসবে, যখন দিনগুলো শেষ হয়ে আপনার জীবনও শেষ হয়ে যাবে। আপনি এই কথা জানেন, সুতরাং সে অনুযায়ী আমল করুন।”(ইবনুল ঈমাদ হাম্বালী; শযারাতুয যাহাব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯৩; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫৯৯৪)
.
রাবেয়া বসরী (রহি’মাহাল্লাহ)-এর প্রজ্ঞার আরও উদাহরণ হচ্ছে তাঁর এই বাণীاستغفر الله من قلة صدقي في قولي : أستغفر الله“আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার ব্যাপারে আমার আন্তরিকতার অভাব থাকার কারণেও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।”
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক! দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো—ভারতীয় উপমহাদেশে রাবেয়া বসরী (রহিমাহা)-কে ঘিরে যে অসংখ্য কাহিনী প্রচলিত আছে, সেগুলোর বড় অংশেই ঐতিহাসিক সত্যের তুলনায় অতিরঞ্জন ও অলঙ্কারই বেশি পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন বক্তা ও লেখক তাঁর নামে এমন সব ঘটনা ও বক্তব্য বর্ণনা করেন, যেগুলোর অনেকগুলোরই নির্ভরযোগ্য কোনো সনদ নেই; বরং কখনো কখনো সেগুলো ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব মনগড়া কাহিনীর প্রভাবে অনেক সময় সঠিক মানহাজের অনুসারীদের মধ্যেও ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়—তাঁরা মনে করেন, হয়তো রাবেয়া বসরী (রহি.) নিজেই কোনো ভ্রান্ত মতের অনুসারী ছিলেন; অথচ প্রকৃত সত্য তা নয়। উদাহরণস্বরূপ: সূফীবাদের কিছু অনুসারী—বিশেষত দেওবন্দী ও বেরেলুবী পরিমণ্ডলে তাঁর সম্পর্কে নানা আজগুবী ও ভিত্তিহীন কাহিনী প্রচারিত হয়েছে। যেমন একটি প্রচলিত গল্পে কুখ্যাত চরমোনাই পীর তার বইয়ে লিখেছেন,“একদিন রাবেয়া বসরী তাঁর এক হাতে আগুন আরেক হাতে পানি নিয়ে রাস্তায় বের হলেন। লোকেরা তাঁকে এইভাবে বের হতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? রাবেয়া বসরী বললেন, “হে ভীতুর দলেরা! তোমরা যারা আল্লাহর ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করো, আমি এই পানি দিয়ে জাহান্নামকে নিভিয়ে দিব। তখন তোমরা কিসের ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে? আর তোমরা যারা জান্নাতের লোভে আল্লাহর ইবাদত করো হে লোভীর দলেরা! আমি এই আগুন দিয়ে জান্নাত পুড়িয়ে দেব। তাহলে তোমরা কিসের লোভে আল্লাহর ইবাদত করবে? আমি আল্লাহর শাস্তির ভয়ে কিংবা জান্নাতের লোভে ইবাদত করি না। আমি তো মাওলার প্রেমে তাঁর ইবাদত করি।” অথচ এ গল্পটি নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে প্রমাণিত নয়; বরং এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। এই ধরনের গোমরাহীপূর্ণ গল্পের কারণে অনেক সময় সঠিক মানহাজের লোকেরাও ভুলভাবে ধারণা করেন যে, রাবেয়া বসরী (রহি.) হয়তো নিজেই ভ্রান্ত বা বিদআতি ছিলেন ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাঁরা তাঁর সমালোচনা করে বসেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।যেমনটি ইমাম আয-যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) সহ বহু মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর নামে প্রচলিত অধিকাংশ কাহিনীই ভিত্তিহীন। বরং তিনি ছিলেন একজন বিদুষী, ইবাদতগুজার ও মুত্তাকী নারী। অতএব অন্যদের রচিত মনগড়া বক্তব্য তাঁর ওপর আরোপ করা মোটেও ইনসাফসম্মত নয়। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নাকি বিদআত

 প্রশ্ন: নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নাকি এটি বিদআত হিসেবে গণ্য হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক অমূল্য নিয়ামত—যা একবার অতিবাহিত হলে আর কখনো ফিরে আসে না। কুরআন-এর সূরা আল-আসর আমাদের স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, সময়ের যথাযথ ব্যবহার না করলে মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; তবে যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে,সত্যের উপদেশ দেয় এবং ধৈর্যের উপর অবিচল থাকে তারাই প্রকৃত সফলকাম। হাদিসেও সতর্ক করা হয়েছে যে, মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় দুটি নিয়ামত নিয়ে—সুস্থতা ও অবসর।এমনকি কিয়ামতের দিন মানুষকে তার জীবন এবং বিশেষত যৌবন কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করেছে! এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।এই উপলব্ধি থেকেই সময়কে মূল্যবান মনে করে তা কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা প্রকৃত সফলতার পথ। অথচ আধুনিক যুগে জীবনযাত্রা ক্রমেই ব্যস্ত ও জটিল হয়ে উঠেছে; একই সঙ্গে এমন বহু মাধ্যম ও পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা মানুষকে দ্বীন থেকে উদাসীন করে দিতে পারে। তাই দুনিয়াবি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা, নফল ইবাদতে যত্নবান হওয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও হিফয, অর্থ-তাফসির অধ্যয়ন এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।এ লক্ষ্য অর্জনে যেসকল বৈধ পরিকল্পনা,পদ্ধতি বা উপকরণ সহায়ক হয়,সেগুলো গ্রহণ করা শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ ও উপকারী। সুতরাং দৈনন্দিন সুন্নাহসম্মত আমল স্মরণ রাখা ও সেগুলো নিয়মিত পালন করার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত বা শিক্ষামূলকভাবে কোনো চার্ট বা তালিকা তৈরি করা সত্তাগতভাবে বিদআত নয়। কারণ এতে নতুন কোনো ইবাদত প্রবর্তন করা হয় না; বরং শরিয়তে প্রমাণিত আমলগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পালনের জন্য এটি একটি সহায়ক মাধ্যম।অতএব এগুলো মূলত সময় ব্যবস্থাপনা ও স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আধুনিক পদ্ধতি, যা ইবাদত ও দৈনন্দিন দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে। তাই যথাযথ বিশ্লেষণ ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা না করে কোনো বিষয়কে সরাসরি বিদআত বলে আখ্যা দেওয়া সঠিক নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি ও প্রয়োগের ধরন অনুযায়ী তা বিদআতের অন্তর্ভুক্তও হতে পারে। এজন্য কোন ক্ষেত্রে এটি বৈধ মাধ্যম আর কোন ক্ষেত্রে বিদআত সে বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
.
▪️
নিয়মিত ইবাদত ও আমল সহজভাবে পালন করার জন্য ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কোন পরিস্থিতিতে শরিয়তসম্মত (বৈধ) হবে এবং কোন অবস্থায় তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে?
.
নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কখন বৈধ হবে এবং কখন তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে—এ বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে একটি মৌলিক নীতিকে সামনে রাখতে হয়। মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপ সাধারণত দুই ধরনের:
(১️). দ্বীনি কার্যক্রম (ইবাদত ও আকীদা সংক্রান্ত)
(২️). দুনিয়াবী কার্যক্রম (জীবনযাপন ও পার্থিব কাজকর্ম) দুনিয়াবী কাজের ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি হলো—এগুলো মূলত মুবাহ (বৈধ), যতক্ষণ না কোনো নিষিদ্ধ বিষয়ের সাথে জড়িত হয়। তাই একজন মুসলিম তার সুবিধা অনুযায়ী দিনের কাজগুলো নির্দিষ্ট সময়ে ভাগ করে নিতে পারেন।যেমন,সকালে কাজে যাওয়ার সময় নির্ধারণ করা,বিকেলে ফিরে আসার সময় ঠিক করা,খাবার, বিশ্রাম বা ব্যায়ামের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা ইত্যাদি এই আচরণগুলো মূলত ‘মুবাহ’ বা বৈধ। এগুলোর কোনোটিকে ‘বিদআত’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না; কারণ এগুলো ইবাদতের পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারিত নয়, বরং জীবনকে সুশৃঙ্খল করার উপায় মাত্র। বিদআত মূলত সেই বিষয়গুলোতে প্রযোজ্য, যেগুলো দ্বীনের অংশ হিসেবে নতুনভাবে প্রবর্তন করা হয়—যেমন আকীদা, ইবাদতের নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা এমন কোনো আমলকে শরিয়তের নির্ধারিত রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যার শরয়ী দলিল নেই।এই ভিত্তিতে বলা যায়—দৈনন্দিন ইবাদতসমূহ নিয়মিত ও সুসংগঠিতভাবে আদায় করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের তালিকা তৈরি করা নীতিগতভাবে বিদআত নয়। তবে কিছু বিশেষ অবস্থায় এটি বিদআতের রূপ নিতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে এ ধরনের রুটিন প্রণয়ন শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে, আর শর্ত ভঙ্গ হলে তা বিদআত হিসেবে গণ্য হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো সেই শর্তগুলো কী?
.
আমরা আমাদের পূর্বসূরি সন্মানিত ইমামগণের ফাতওয়ার আলোকে যা বুঝতে পেরেছি তার আলোকে বললে এই রুটিনকে বিদআতমুক্ত ও বৈধ রাখার জন্য নিম্নলিখিত শর্তসমূহ পূরণ করা অপরিহার্য:
.
(ক) প্রথমত: দৈনন্দিন ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত সময়কে সুশৃঙ্খলভাবে ভাগ করে নিজের জন্য একটি তালিকা বা চার্ট তৈরি করা নীতিগতভাবে জায়েজ। উদাহরণস্বরূপ: ফজরের পর কুরআন তেলাওয়াত ও হিফজ রিভিশন,যোহরের পর আক্বীদা বা ফিকহ অধ্যয়ন,আসরের পর কোনো ইলমি মজলিসে অংশগ্রহণ, মাগরিবের পর সন্তানদের লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব;এই ধরনের সুশৃঙ্খল রুটিনের কোনো দিকই বিদআত হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ এটি ইবাদতের অংশ নয়; এটি কেবল দৈনন্দিন কাজগুলো সুসংগঠিতভাবে সম্পন্ন করার একটি মাধ্যম মাত্র; যাতে কোনো দায়িত্ব অবহেলা না হয়।তাছাড়া যেসব বিষয় কেবল ‘মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়,সেগুলি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।পক্ষান্তরে, যদি কেউ এই তালিকা তৈরিকে স্বতন্ত্র ইবাদত মনে করে, অথবা এটিকে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ বলে বিশ্বাস করে, কিংবা মনে করে যে শুধু এ ধরনের চার্ট তৈরির মাধ্যমেই বিশেষ সওয়াব অর্জিত হয়—তবে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ এ ধরনের বিশ্বাসের শরয়ি কোনো ভিত্তি নেই। উপরন্তু, এ বিষয়ে ইসলামি শরীয়তে কিংবা খুলাফায়ে রাশেদীন-এর পক্ষ থেকেও কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা বর্ণিত হয়নি।
.
(খ) দ্বিতীয়ত: এই ধরনের তালিকা বা চার্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরিয়তে ইবাদতের জন্য যে সময়, পদ্ধতি ও বিধান নির্ধারিত রয়েছে, তা অবশ্যই ঠিক সেই নিয়মেই পালন করতে হবে। আর অতিরিক্ত নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো সময়, দিন বা সংখ্যা বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারণ না করে, বরং নিজের সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী সুন্নাহ অনুসরণ করে আমল করে—তবে তা বিদআত নয়। কারণ এটি মূলত আমলকে সুশৃঙ্খলভাবে গুছিয়ে নেওয়ার অন্তর্ভুক্ত, আর এতে শরিয়তসম্মত কোনো আপত্তি নেই। বরং ন্যায়নিষ্ঠ সালাফদের জীবনেও এমন পদ্ধতির দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।সালাফগণ নিজেদের সাথে অঙ্গীকার করতেন এবং সময়কে মূল্যবানভাবে কাজে লাগাতেন যা বর্তমান ভাষায় “সময় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা” হিসেবে পরিচিত।অতএব, এমন উদ্যোগ যা মানুষকে নেক আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়।কারণ এগুলো নিজে ইবাদত নয়; বরং ইবাদত পালনে সহায়ক মাধ্যম। এগুলো মানুষকে স্মরণ করায়, অনুপ্রাণিত করে এবং তার সময়কে সুশৃঙ্খল করে তোলে।পক্ষান্তরে,শরিয়তের স্পষ্ট দলিল ছাড়া নিজ উদ্যোগে ইবাদতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন, সময় বা সংখ্যা নির্ধারণ করা বা তা বাধ্যতামূলক করে নেওয়া বিদআত হিসেবে গণ্য হবে। যেমন—রজব মাসের ২৭ তারিখকে নির্দিষ্ট করে মিরাজ উদযাপন করা, অথবা দুই ঈদের বাইরে অন্য কোনো দিনকে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নির্ধারণ করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ ঐতিহাসিকভাবে মিরাজের রাত নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয় এবং এ রাতে বিশেষ কোনো ইবাদত শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। একইভাবে মুসলিমদের জন্য দুই ঈদের বাইরে অন্য কোনো দিনকে ইবাদতের উদ্দেশ্যে উৎসব হিসেবে পালন করার কোনো শর‘ই ভিত্তি নেই।
.
গ) তৃতীয়ত: ইবাদতের জন্য কোনো রুটিন বা চার্ট প্রণয়ন করা হলে তা যেন কেবল আত্মশুদ্ধি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত চারিত্রিক উন্নতির সহায়ক মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এর মূল উদ্দেশ্য হবে—শরঈ দলিলের আলোকে কোন সময় কোন ইবাদত আদায় করা হবে তা স্মরণ রাখা এবং নিজের আমলকে সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক করা।ইবাদতের সময় বিন্যাসে আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হলো নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর পবিত্র জীবন। তিনি ফজরের পর সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন; ফজরের সালাত আদায়ের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মুসাল্লায় অবস্থান করে আল্লাহর যিকির ও তাসবিহে মগ্ন থাকতেন অথবা সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে বিনয়ী আলাপচারিতায় সময় কাটাতেন। এরপর ইশরাকের দুই রাকাত সালাত আদায়ের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু করতেন।একইভাবে তাঁর দিনের সমাপ্তিও ছিল শান্ত ও সুশৃঙ্খল। এশার সালাতের পর অহেতুক গল্প-গুজব পরিহার করে দ্রুত ঘরে ফিরে যেতেন, পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করতেন, বিশ্রাম নিতেন এবং রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে বিশেষ ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন। এ ছাড়া একজন মুসলিমের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দৈনন্দিন কাজগুলোকে সালাতের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো উচিত, যাতে কোনো দায়িত্ব মসজিদে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক না হয়। যেমন—ফজরের পর কুরআন তিলাওয়াত ও হিফজের পুনরালোচনা যোহরের পর ফিকহ বা আকীদার অধ্যয়ন,আসরের পর ইলমি মজলিসে অংশগ্রহণ,মাগরিবের পর সন্তানদের শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব ইত্যাদি এ ধরনের সুশৃঙ্খল রুটিনের কোনো অংশই বিদআত নয়; কারণ এটি নিজেই ইবাদত নয়, বরং ইবাদত ও দায়িত্বগুলোকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার একটি মাধ্যম মাত্র। আর যে বিষয় কেবল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাতে বিদআতের অবকাশ থাকে না।পক্ষান্তরে,ইবাদত সম্পন্ন হওয়ার পর কে কতটুকু আমল করল তার ওপর নম্বর নির্ধারণ করা,ইবাদত শেষে টিক চিহ্ন দিয়ে সেগুলো মূল্যায়ন করা, লোক দেখানো মানসিকতা সৃষ্টি করা, অন্যদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করা, কাউকে এমন তালিকা অনুসরণে বাধ্য করা, কিংবা নিজের নির্ধারিত পদ্ধতিকে সবার জন্য অপরিহার্য মনে করে চাপিয়ে দেওয়া বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এ ধরনের আচরণ বিদআতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হতে পারে।কারণ,ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন; কিন্তু যখন তা প্রতিযোগিতা, বাহ্যিক মূল্যায়ন বা সামাজিক চাপের রূপ নেয়, তখন ইবাদতের রূহ ও ইখলাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
.
অতএব, ইবাদত পালনের সহজার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমল-চার্ট তৈরি করা বৈধ, তবে শর্ত হলো এটি শুধুমাত্র নিজের ইবাদত ও নেক আমল সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রণীত হতে হবে, শরীয়তের সীমা অতিক্রম করা যাবে না, এবং এতে কোনো ধরনের অবৈধ প্রভাব বা বিদআতধর্মী ধারণা সৃষ্টি করা যাবে না।এই আলোচনার ভাব উপলব্ধি করার সুবিধার্থে, নীচে সম্মানিত ইমামগণের প্রাসঙ্গিক ফাতওয়া সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
تصرفات العباد من الأقوال والأفعال نوعان : عبادات يصلح بها دينهم ، وعادات يحتاجون إليها في دنياهم ، فباستقراء أصول الشريعة نعلم أن العبادات التي أوجبها الله أو أحبها لا يثبت الأمر بها إلا بالشرع . وأما العادات فهي ما اعتاده الناس في دنياهم مما يحتاجون إليه ، والأصل فيه عدم الحظر ، فلا يحظر منه إلا ما حظره الله سبحانه وتعالى … والعادات الأصل فيها العفو ، فلا يحظر منها إلا ما حرمه ، وإلا دخلنا في معنى قوله تعالى : ( قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ آللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ ) .ولهذا ذم الله المشركين الذين شرعوا من الدين ما لم يأذن به الله وحرموا ما لم يحرمه … وهذه قاعدة عظيمة نافعة”
“মানুষের কথা ও কাজ এই সব আমল দুই প্রকার:
এক প্রকার হলো ইবাদত, যার দ্বারা তাদের দ্বীন শুদ্ধ হয়। আরেক প্রকার হলো (আদাত) দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজকর্ম,যা তাদের দুনিয়ার জীবনের জন্য দরকার। শরয়ী মূলনীতি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা জানতে পারি যে সব ইবাদত আল্লাহ ফরজ করেছেন বা পছন্দ করেন, সেগুলোর বিধান কেবল শরিয়তের (দলিলের) মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে। আর দৈনন্দিন প্রয়োজনসমূহ হলো মানুষের দুনিয়াবি জীবনে প্রচলিত ও প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ। এগুলোর মূলনীতি হলো মুক্ত বা বৈধ থাকা এগুলোর মধ্যে কেবল সেটাই নিষিদ্ধ হবে,যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নিষিদ্ধ করেছেন।অতএব,(আদাতের) দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার মূলনীতি হলো অব্যাহতি (ছাড়, ক্ষমা ও অবকাশ); সুতরাং যা আল্লাহ হারাম করেননি, তা হারাম বলা যাবে না।‌অন্যথায় আমরা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীর অর্থের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ব:”বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রিযিক নাযিল করেছেন, তার কিছু তোমরা হারাম আর কিছু হালাল করে নিয়েছ? বলুন, আল্লাহ কি তোমাদের এ অনুমতি দিয়েছেন, না কি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছ?”।(সূরা ইউনুস: ৫৯)। একারণেই আল্লাহ তাআলা সেই মুশরিকদের নিন্দা করেছেন, যারা এমন কিছু দ্বীনের মধ্যে চালু করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি, এবং এমন কিছু হারাম করেছিল যা আল্লাহ হারাম করেননি।..আর এটি (ইবাদত ও আদাতের পার্থক্য বুঝা) একটি অত্যন্ত মহান ও উপকারী মূলনীতি।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২১; পৃষ্ঠা: ১৭-১৮)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: বিদআত কি ‘বিদআতে হাসানা’ (উত্তম বিদআত) এবং ‘বিদআতে সাইয়্যিআ’ (মন্দ বিদআত) এই দুই ভাগে বিভক্ত?
তিনি উত্তরে বলেন:
لا يمكن أن يقال عن البدعة في دين الله: إنها بدعةٌ حسنـة أبداً مع قول النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم: كل بدعةٍ ضلالة. فإن هذه الجملة؛ أعني : (كل بدعةٍ ضلالة) صدرت من أفصح الخلق محمدٍ صلى الله عليه وعلى آله وسلم ، وأنصح الخلق ، وأعلم الخلق بشرع الله، وأعلم الخلق بمدلول خطابه، وقد قال هذه الجملة العامة: (كل بدعةٍ ضلالة) فكيف يأتي إنسانٌ بعد ذلك، فيقول: البدعة منها ما هو بدعةٌ سيئة، ومنها ما هو بدعةٌ حسنة. وهل هذا إلا إخراج لقول رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم عن ظاهره، فالبدعة كلها بدعةٌ سيئة ، والبدعة كلها ضلالة.
لكن قد يستحسن الإنسان شيئاً يظنه بدعة وما هو ببدعة، وقد يستحسن شيئاً، وهو بدعة يظنه حسناً، وما هو بحسن، أما أن يجتمع كونه بدعة وكونه حسناً، فهذا لا يمكن أبداً؛ فمثلاً قد يقول القائل: بناء المدارس بدعة؛ لأنها لم تكن معروفة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم، لكنه بدعةٌ حسنة.
فنقول: لا شك أن بناء المدارس حصل، لكنه ليس البدعة التي أرادها الرسول صلى الله عليه وعلى آله وسلم؛ إذ إن بناء المدارس وسيلة لتنظيم الدراسة، وتهيئة الدروس للدارسين، وليس مقصوداً في ذاته؛ بمعنى أننا لسنا نتعبد لله تعالى، ببناء المدارس على أن البناء نفسه عبادة؛ ولكن نتعبد لله تعالى ببناء المدارس على أنها وسيلةٌ؛ لحفظ العلم، وتنظيم العلم، ووسيلةُ المقصود مقصودة؛ ولهذا كان من القواعد المقررة عند العلماء أن للوسائل أحكام المقاصد …وخلاصة القول:أنه لا يمكن أن تكون البدعة الشرعية تنقسم إلى قسمين؛ حسنة، وسيئة، مع قول الرسول عليه الصلاة والسلام: (كل بدعةٍ ضلالة) ، وأن ما ظنه بعض الناس بدعةً، وهو حسن؛ فإن ظنه إياه بدعة خطأ، وما ظنه الإنسان حسناً، وهو بدعة حقيقةً؛ فإن ظنه أنه حسن خطأ”
“আল্লাহর দ্বীনে কোনো বিদ‘আত সম্পর্কে কখনো বলা যাবে না: এটি হাসানা’ বা ‘উত্তম বিদ‘আত। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:”প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।”(সহীহ মুসলিম হা/৮৬৭) এই ব্যাপক কথাটি বলেছেন সর্বাধিক শুদ্ধ ভাষার অধিকারী, সর্বাধিক উপদেশদাতা, আল্লাহর শরিয়ত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী, এবং নিজের কথার অর্থ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি যখন সাধারণভাবে বলেছেন: প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা, তখন এর পর কেউ এসে বলে বিদ‘আতের কিছু ভালো, কিছু মন্দ এটি কি রাসূলের কথাকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে বের করে দেওয়া নয়? অতএব, বিদ‘আত সবই মন্দ এবং সবই ভ্রষ্টতা। তবে এমন হতে পারে কেউ কোনো বিষয়কে বিদ‘আত মনে করে ভালো ভাবছে, অথচ তা আসলে বিদ‘আত নয়। আবার কেউ কোনো বিদ‘আতকে ভালো মনে করছে, অথচ তা ভালো নয়। কিন্তু কোনো বিষয় একই সঙ্গে বিদ‘আতও হবে এবং ভালোও হবে এটা কখনো সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ কেউ বলতে পারে:মাদরাসা বা বিদ্যালয় নির্মাণ বিদ‘আত, কারণ তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ছিল না তবে এটি ভালো বিদ‘আত।
জবাবে আমরা বলি: নিঃসন্দেহে মাদরাসা/বিদ্যালয় নির্মাণ (পরবর্তীতে) উদ্ভাবিত হয়েছে; কিন্তু এটি সেই বিদ‘আত নয় যা রাসূল (ﷺ) )শরীয়তের দৃষ্টিতে) উদ্দেশ্য করেছেন। কারণ বিদ্যালয় নির্মাণ মূল উদ্দেশ্য নয় বরং এটি পড়াশোনাকে সুসংগঠিত করা, শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ প্রস্তুত করা এসবের একটি মাধ্যম (ওয়াসিলা) মাত্র; এটি নিজে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ইবাদত (মাকসুদ) নয়। অর্থাৎ, আমরা মাদ্রাসা নির্মাণকে ইবাদত মনে করে করছি না যে, এই নির্মাণ কাজটুকুই একটি ইবাদত; বরং এটিকে জ্ঞান সংরক্ষণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর ইবাদত করি।আর মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে মাধ্যম বা উপায় অবলম্বন করা হয়, তা সেই লক্ষ্যেরই পর্যায়ভুক্ত হয়। একারণেই উলামায়ে কেরামের নিকট একটি স্বীকৃত মূলনীতি হলো: ‘উপায়সমূহ মূল উদ্দেশ্যের বিধানেরই অনুগামী হয়।’ (অর্থাৎ উদ্দেশ্য যদি পুণ্যময় হয়, তবে সেই উদ্দেশ্যে গৃহীত মাধ্যমও সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হবে)।সুতরাং সারকথা হলো: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুস্পষ্ট বাণী:”প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা” বিদ্যমান থাকা অবস্থায় শরয়ী বিদআতকে ‘হাসানা’ (উত্তম) ও ‘সাইয়্যিআ’ (মন্দ) এই দুই ভাগে বিভক্ত করার অবকাশ নেই। সুতরাং, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো উত্তম কাজকে (যা শরীয়তসম্মত) ‘বিদআত’ মনে করে, তবে তার সেই ধারণাই ভুল। আর যদি কেউ প্রকৃত কোনো বিদআতকে ‘উত্তম’ মনে করে, তবে তার সেই সিদ্ধান্ত বা মনে করাটাই ভুল।”(গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪০৫১২)
.
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”ধর্মীয় লেকচার বা ইলমি হালকার জন্য প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা কি নিষিদ্ধ বিদআত? যেহেতু ইলম অন্বেষণ একটি ইবাদত অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ইবাদতের জন্য কোনো সময় নির্দিষ্ট করেননি। একইভাবে একদল ভাই যদি প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট রাতে মসজিদে একত্রিত হয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কি সেটি বিদআত হবে?
তিনি উত্তরে বলেন:
“إن تحديد يوم معين منتظم لإلقاء محاضرة، أو حلقة علم ليس ببدعة منهي عنها، بل هو مباح، كما يقرر يوم معين في المدارس والمعاهد لحصة الفقه، أو التفسير أو نحو ذلك.ولا شك أن طلب العلم الشرعي من العبادات ، لكن توقيته بيوم معين تابع لما تقتضيه المصلحة، ومن المصلحة أن يعين يوم لذلك حتى لا يضطرب الناس. وطلب العلم ليس عبادة مؤقتة بل هو بحسب ما تقتضيه المصلحة والفراغ.لكن لو خص يوماً معيناً لطلب العلم باعتبار أنه مخصوص لطلب العلم وحده فهذا هو البدعة.وأما اتفاق مجموعة على الالتقاء في ليلة معينة لقيام الليل فهذا بدعة؛ لأن إقامة الجماعة في قيام الليل غير مشروعة إلا إذا فعلت أحياناً وبغير قصد ، كما جرى للنبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم مع عبد الله بن عباس رضي الله عنهما.
“একটি নির্দিষ্ট দিন বা সময় নির্ধারণ করে নিয়মিত কোনো লেকচার (বক্তৃতা) বা ইলমি হালকার (শিক্ষামূলক আসর) আয়োজন করা কোনো নিষিদ্ধ বিদআত নয়, বরং এটি বৈধ। যেমনটি স্কুল বা মাদরাসায় ফিকহ বা তাফসিরের ক্লাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন ও সময় নির্ধারন করা হয়।নিঃসন্দেহে শরয়ী ইলম অর্জন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত তবে এটিকে নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া মানুষের সুবিধা ও প্রয়োজনের (মাসলাহাহ) ওপর নির্ভরশীল, যাতে মানুষের জন্য সুবিধা হয় এবং বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।কারন দ্বীনি জ্ঞান অর্জন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ইবাদত নয়, বরং এটি সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়।কিন্তু,যদি কেউ এই বিশ্বাস নিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনকে (ইলম) জ্ঞান অর্জনের জন্য নির্ধারিত করে যে, কেবল ওই দিনটিই ইলম অর্জনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ (শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত),তাহলে তা বিদ‘আত হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে,যদি কোনো দল নির্দিষ্ট রাতে একত্রিত হয়ে নিয়মিত তাহাজ্জুদের জামাত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তা বিদ‘আত। কারণ কিয়ামুল লাইল জামাতে আদায় করা শরয়তসম্মত নয়, তবে মাঝে মাঝে, পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ছাড়া হয়ে গেলে তা বৈধ যেমনটি নবী ﷺ)-এর সাথে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ২৬, পৃষ্ঠা: ১৮২)
.
ইমাম ইবনে উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: কিছু মানুষ তাদের নিজেদের ফরয নামাজসমূহ এবং সুন্নাতে রাতিবাহ (ফরয নামাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সুন্নাত নামাজসমূহ) আদায়ের হিসাব রাখার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। আর তা হলো, সে একটি ছক বা রুটিন তৈরি করে। এই ছকটি এক সপ্তাহের নামাজ আদায়ের হিসাব রাখার জন্য তৈরি করা হয়। যেখানে সে নামাজের প্রতিটি ওয়াক্তের সামনে দুটি করে ঘর বা বর্গ রাখে; যার একটি ফরযের জন্য এবং অন্যটি সুন্নাতে রাতিবাহর জন্য। অতঃপর যখন সে জামা‘আতের সাথে ফরয নামাজ আদায় করে, তখন সে তার নামাজের জন্য একটি নাম্বার বা পয়েন্ট (কিংবা টিক চিহ্ন) দেয়। আর যখন সে সুন্নাতে রাতিবাহ আদায় করে, তখন তার জন্য একটি নাম্বার দেয়। আর যদি সে নামাজ না পড়ে, তবে সে কোনো নাম্বার দেয় না… এভাবেই চলতে থাকে। অতঃপর সপ্তাহের শেষে সে মোট নাম্বার বের করে। আর এই কাগজটিতে এক মাসের জন্য চারটি ছক থাকে। এরা বলে: নিশ্চয়ই এই ধরনের মাধ্যম ফরয ও সুন্নাতসমূহ আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে সাহায্য করে। সুতরাং এই পদ্ধতির ব্যাপারে আপনার মতামত কী? এটি কি শরী‘আতসম্মত নাকি নয়? এবং এটি প্রচার করার ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
অতঃপর তিনি জবাবে বলেছিলেন:
هذه الطريقة غير مشروعة ، فهي بدعة ، وربما تسلب القلب معنى التعبد لله تعالى ، وتكون العبادات كأنها أعمال روتينية كما يقولون ، وفي الصحيحين عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال : دخل رسول الله صلى الله عليه وسلم المسجد فإذا حبل ممدود بين ساريتين ، فقال : ( ما هذا ) ؟ ، قالوا : حبل لزينب تصلي فإذا كسلت ، أو فترت أمسكت به فقال : ( حلوه ، ليصل أحدكم نشاطه فإذا كسل ، أو فتر فليقعد ) ، ثم إن الإنسان قد يعرض له أعمال مفضولة في الأصل ثم تكون فاضلة في حقه لسبب ، فلو اشتغل بإكرام ضيف نزل به عن راتبة صلاة الظهر لكان اشتغاله بذلك أفضل من صلاة الراتبة .
وإني أنصح شبابنا من استعمال هذه الأساليب في التنشيط على العبادة ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم حذر من مثل ذلك حيث حث على اتباع سنته وسنة الخلفاء الراشدين ، وحذر من البدع ، وبين أن كل بدعة ضلالة ، يعني وإن استحسنها مبتدعوها ، ولم يكن من هديه ولا هدي خلفائه وأصحابه رضي الله عنهم مثل هذا “
“এই পদ্ধতি শরীয়তসম্মত নয় বরং এটি বিদ‘আত। কখনো কখনো এটি অন্তর থেকে আল্লাহর জন্য ইবাদতের প্রকৃত অনুভূতিও ছিনিয়ে নিতে পারে এবং ইবাদতসমূহ যেন রুটিন মাফিক কাজে পরিণত হয়, যেমনটি তারা বলে। আর সহীহাইনে (বুখারী ও মুসলিমে) আনাস ইবনু মালিক (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন দুই স্তম্ভের মাঝে একটি দড়ি টানানো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: এই রশিটি কিসের? সাহাবীগণ বললেন: এটি যায়নাব (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহা)-এর রশি,তিনি নামাজ পড়েন, অতঃপর যখন ক্লান্ত হয়ে যান বা অলসতা অনুভব করেন, তখন এটি ধরে রাখেন। তখন নবীজি (ﷺ) বললেন: না, এটি খুলে ফেলো। তোমাদের কারো উচিত তার উদ্যম থাকা অবস্থায় নামাজ পড়া। অতঃপর যখন সে অলসতা অনুভব করবে বা ক্লান্ত হয়ে যাবে, তখন সে যেন বসে পড়ে।”(সহীহ বুখারী হা/১১৫০) আর নিশ্চয়ই মানুষের সামনে এমন কিছু আমল উপস্থিত হতে পারে, যা মূলত? অন্য কাজের তুলনায়) ফযীলতের দিক থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিশেষ কোনো কারণে সেটি তার জন্য অধিক ফজিলতপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।যেমন- কোনো মেহমান এলো,আর তাকে সম্মান-আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকার কারণে যোহরের সুন্নাতে রাতিবাহ পড়তে না পারে, তবে সেই মুহূর্তে মেহমানদারিতে নিয়োজিত থাকা তার জন্য সুন্নাতে রাতিবাহ পড়ার চেয়েও উত্তম।আর আমি আমাদের যুবকদের ইবাদতে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরণের (মনগড়া) পদ্ধতি অবলম্বন করা থেকে সতর্ক করছি। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জাতীয় কাজ থেকে সতর্ক করেছেন;যেখানে তিনি তাঁর সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত অনুসরণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এবং তিনি বিদ‘আত থেকে সতর্ক করেছেন। আর তিনি স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা। অর্থাৎ যদিও বিদ‘আতকারীরা একে ভালো মনে করে। আর এই ধরনের কাজ তাঁর হিদায়াত বা আদর্শ এবং তাঁর খলীফাগণ ও সাহাবায়ে কিরামগণের (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) হিদায়াত বা আদর্শের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ১১১)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”আমরা ছয়জন বন্ধু প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর একজনের বাড়িতে দ্বীনি মজলিস করি। আমাদের কর্মসূচিতে কুরআন তিলাওয়াত, নববীর চল্লিশ হাদিস, মিনহাজুল মুসলিম ও রিজালুন হাওলার রাসূল ﷺ) পাঠ এবং নসিহত অন্তর্ভুক্ত থাকে।আমাদের বিশেষ একটি পদ্ধতি হলো ‘মুসাবাকা টেবিল’ (আমলের ছক)। এটি একটি মাসিক ফরম যেখানে প্রতিদিনের আমল (যেমন: জামাতে সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, নফল রোজা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা) লিপিবদ্ধ করা হয়। আমরা দেখেছি, এই ছকটি অনুসরণ করলে আমলে গতি আসে, আর এটি ছেড়ে দিলে অলসতা জেঁকে বসে। জানার বিষয় হলো, আত্মশুদ্ধি বা আমল সংশোধনের উদ্দেশ্যে এই ধরনের ‘আমলনামা’ বা ‘মুসাবাকা টেবিল’ মেইনটেইন করার শরয়ি বিধান কী?
শাইখ হাফিজাহুল্লাহ উত্তরে বলেন:
” الحمد لله : الذي يظهر لي أن اتخاذ هذا الجدول والتنافس على فقراته : بدعة ؛ لأنه يتضمن التفاخر ، والإعجاب بالعمل ، ويتضمن كذلك إظهار العمل الذي إخفاؤه أفضل ؛ لأن إخفاء العمل من الصدقة ، وتلاوة القرآن ، أو الذكر : أبعد عن الرياء ، قال تعالى : ( ادعوا ربكم تضرعاً وخفية ) الأعراف/ 55 ، وقال : ( ذكر رحمت ربك عبده زكريا إذ نادى ربه نداء خفياً ) مريم/ 2 ، 3 ، وأحد السبعة الذين يظلهم الله في ظله : ( رجل تصدق بصدقة فأخفاها حتى لا تعلم شماله ما تنفق يمينه ) .فالذي ينبغي : التواصي بالتزود من نوافل الطاعات ، والإكثار من ذلك ، وكلٌّ يعمل ما تيسر له فيما بينه وبين ربه ، وبهذا يحصل التعاون على البر والتقوى ، وتحصل السلامة مما يفسد العمل ، أو ينقص ثوابه ، والله الموفق ، والهادي إلى سبيل الرشاد ، والله أعلم “
“যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমার নিকট যা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—এই ধরনের তালিকা (ছক) তৈরি করা এবং এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর বিভিন্ন অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতা করা একটি বিদ‘আত (দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবন);কারণ এটি (নিজের আমল নিয়ে) অহংকার এবং নিজের আমলের প্রতি নিজে মুগ্ধ হওয়ার (আত্মতৃপ্তির) বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে,একইসাথে এটি এমন সব আমল প্রকাশ করে দেয় যা গোপন রাখাই ছিল অতি উত্তম;কেননা দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত কিংবা জিকিরের মতো আমলগুলো গোপন রাখা ‘রিয়া’ (লোক। দেখানো মানসিকতা) থেকে অধিকতর নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো কাকুতি-মিনতি করে এবং গোপনে।’ (সূরা আল-আরাফ: ৫৫) তিনি আরও বলেন: ‘(এটি) আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা জাকারিয়ার প্রতি; যখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডেকেছিলেন নিভৃতে (গোপনে)।”(সূরা মারইয়াম: ২-৩),আর (কিয়ামতের দিন) যে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর (আরশের) ছায়াতলে স্থান দেবেন, তাদের একজন হলো: ‘সেই ব্যক্তি যে এমনভাবে সদকা করে যে, তার ডান হাত কী খরচ করছে তার বাম হাতও তা জানতে পারে না’।সুতরাং যা করা উচিত তা হলো: নফল ইবাদত বেশি বেশি করার জন্য এবং এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য একে অপরকে উপদেশ দেওয়া এবং প্রত্যেকে তার রবের সাথে একান্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে যতটুকু সম্ভব আমল করবে, এর মাধ্যমেই নেক কাজ ও তাকওয়ার ওপর পারস্পরিক সহযোগিতা অর্জিত হবে; এবং এমন সব বিষয় থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে যা আমলকে নষ্ট করে দেয় কিংবা আমলের সওয়াব কমিয়ে দেয়। আল্লাহই তাওফিকদাতা, তিনিই সঠিক পথের হেদায়েতকারী। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।”(http://www.islamway.com/?iw_s=Fatawa&iw_a=view&fatwa_id=8762
.
মহান আল্লাহ আমাদের জীবনকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত করার তাওফিক দান করুন। তিনি-ই সর্বাধিক জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Wednesday, February 25, 2026

রোযা ও রমাযান সম্পর্কিত ৫১টি যয়ীফ ও জাল হাদীস!!!!!!!!!!!!!!

 

রোযা ও রমাযান সম্পর্কিত ৫১টি যয়ীফ ও জাল হাদীস!!!!!!!!!!!!!!
রোযা ও রমাযানকে কেন্দ্র করে বহু যয়ীফ ও জাল হাদীস লোকমুখে তথা বহু বই-পুস্তকে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। এ স্থলে সেই শ্রেণীরই কিছু হাদীস সংক্ষেপে উল্লেখ করব। যাতে পাঠক তা পাঠ করে সতর্ক হতে পারেন এবং তদ্দবারা আমল ও তাতে উল্লেখিত কথার উপর বিশ্বাস না করে বসেন। আর এ কথা বিদিত যে, কোন জাল তো দূরের কথা, কোন যয়ীফ হাদীস দ্বারা আমল করা বৈধ নয়; চাহে সে হাদীস আহকাম সম্পর্কিত হোক অথবা ফাযায়েলে আ’মাল সম্পর্কিত। বরং সহীহ ও শুদ্ধভাবে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তাই আমলের জন্য যথেষ্ট; যদি আমরা সত্যপক্ষে আমল করতে চাই।[1] উক্ত প্রকার কিছু হাদীস নিম্নরূপঃ-

Sunday, February 22, 2026

ইসলামে চাঁদাবাজির বিধান ও তা প্রতিরোধে করণীয়

 বর্তমানে চাঁদাবাজি আমাদের সমাজের একটি মারাত্নক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ এই চাঁদাবাজি। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং ফৌজদারি অপরাধ যা নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার জন্য হুমকী স্বরুপ। ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অরাজকতা ও দুর্নীতি—সবকিছুর নেপথ্যে চাঁদাবাজির প্রভাব স্পষ্ট। দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, নির্মাণ খাত—সবখানেই চাঁদাবাজির মহোৎসব। দেশীয় আইনে চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এছাড়া পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলাম অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এবং এর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। পবিত্র আল-কুরআন ও হাদিসে চাঁদাবাজির মতো অন্যায় ও জুলুমের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তির বিধান। এই জুলুমের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের জাগরণ এখন সময়ের দাবি।
▪️চাঁদাবাজির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি:
চাঁদাবাজি বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক জোরপূর্বক, ভয়ভীতি দেখিয়ে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে অন্যায়ভাবে অন্যের নিকট থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায় করা।
এটি সরাসরি একটি জুলুম ও অপরাধ।
চাঁদাবাজি অনেক সময় ব্যক্তি পর্যায়ে, আবার কখনো কখনো রাষ্ট্র বা প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত অংশের মাধ্যমেও সংঘটিত হয়ে থাকে।
▪️চাঁদাবাজির ক্ষতিকর দিকসমূহ:
চাঁদাবাজির ক্ষতিকর দিকগুলো অত্যন্ত ব্যাপক এবং এর প্রভাব ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনীতির উপর সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
যেমন—
– ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সচ্ছলতা বিনষ্ট করে।
– চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্কে থাকে।
– শারীরিক আঘাত বা প্রাণহানির ভয় থাকে।
– ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন।
– শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
– পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হয়ে মূল্য বৃদ্ধি পায়।
– দুর্নীতিবাজ আমলাদের কারণে রাষ্ট্রের আয়ের উৎস সংকুচিত হয়।
– আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাঁদাবাজির ফলে অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়‌।
▪️ইসলামে চাঁদাবাজির বিধান:
ইসলামের শাসনব্যবস্থায় মানুষের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর আইন বিদ্যমান। ইসলামের নীতিমালায় সরকার, প্রশাসন বা কোনো সংগঠনের পক্ষে ব্যক্তির ওপর অবৈধ চাপ সৃষ্টি করে টাকা আদায়ের সুযোগ নেই। প্রশাসনের কেউ যদি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে সে আমানতের খেয়ানত করছে।
রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ»
“তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রক্ষক এবং প্রত্যেকেই তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”
[সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
এই হাদিস প্রশাসনিক দায়িত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে, যা চাঁদাবাজিকে সম্পূর্ণভাবে অবৈধ প্রমাণ করেছে।
▪️ইসলামে চাঁদাবাজির পরিণতি:
ইসলামে অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রহণের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। এতে আল্লাহর অভিশাপ ও গজব নেমে আসে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
وَضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلًۭا قَرْيَةًۭ كَانَتْ ءَامِنَةًۭ مُّطْمَئِنَّةًۭ يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًۭا مِّن كُلِّ مَكَانٍۢ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ ٱللَّهِ فَأَذَاقَهَا ٱللَّهُ لِبَاسَ ٱلْجُوعِ وَٱلْخَوْفِ بِمَا كَانُوا۟ يَصْنَعُونَ
“আল্লাহ একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দেন, যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত; তার কাছে চারদিক থেকে প্রচুর রিজিক আসত। কিন্তু তারা আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। ফলে আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কারণে ক্ষুধা ও ভয়ের পোশাক পরিয়ে দিলেন।” [সুরা বাকারা: ১৮৮]
চাঁদাবাজি যেহেতু জুলুম তাই এটি আল্লাহর গজব ডেকে আনে।
কুরআন ও হাদিসে এসেছে, অন্যায়ভাবে উপার্জিত সম্পদ জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।
▪️কুরআনে চাঁদাবাজির সতর্কতা:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَا تَأْكُلُوٓا۟ أَمْوَٰلَكُم بَيْنَكُم بِٱلْبَٰطِلِ وَتُدْلُوا۟ بِهَآ إِلَى ٱلْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا۟ فَرِيقًۭا مِّنْ أَمْوَٰلِ ٱلنَّاسِ بِٱلْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ﴾
“তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং তা বিচারকদের কাছে পৌঁছিও না, যাতে জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের একটি অংশ পাপের মাধ্যমে ভোগ করতে পারো।”
[সূরা নিসা: ২৯]
আরো বলেন,
﴿يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا تَأْكُلُوٓا۟ أَمْوَٰلَكُم بَيْنَكُم بِٱلْبَٰطِلِ إِلَّآ أَن تَكُونَ تِجَـٰرَةً عَن تَرَاضٍۢ مِّنكُمْ﴾
“হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে তা বৈধ।” [সুরা নিসা: ২৯]
আরো বলেন,
﴿إِنَّمَا ٱلسَّبِيلُ عَلَى ٱلَّذِينَ يَظْلِمُونَ ٱلنَّاسَ وَيَبْغُونَ فِى ٱلْأَرْضِ بِغَيْرِ ٱلْحَقِّ ۚ أُو۟لَـٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌۭ﴾
“দোষারোপ তো তাদের ওপরই, যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং অন্যায়ভাবে পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করে। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সুরা শুরা: ৪২]
এসব আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, চাঁদাবাজি একটি প্রকাশ্য জুলুম ও সীমালঙ্ঘন।
▪️হাদিসে চাঁদাবাজির সতর্কতা:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
«مَنِ ٱقْتَطَعَ حَقَّ ٱمْرِئٍۢ مُسْلِمٍۢ بِیَمِينِهِ فَقَدْ أَوْجَبَ ٱللَّهُ لَهُ ٱلنَّارَ»
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ করে, সে কেয়ামতের দিন আগুন বহন করে আসবে।”
[সহিহ বুখারি: ৬৫৩৮]
তিনি আরো বলেন,
«مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا»
“যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম: ১৮৩৩[
চাঁদাবাজরা সাধারণত প্রতারণা, হুমকি ও ভয়ভীতির মাধ্যমে টাকা আদায় করে, যা এই হাদিসের আওতায় পড়ে।
▪️আধুনিক সমাজ ও চাঁদাবাজি:
বর্তমান যুগে চাঁদাবাজি নানা রূপে বিস্তার লাভ করেছে। যেমন—
– ট্রান্সপোর্ট চাঁদা
– দোকানপাট থেকে মাসিক চাঁদা
– বিভিন্ন দলের নামে চাঁদা
– পুলিশের নামে চাঁদা
ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে হারাম ও অন্যায় বলেছে।
▪️চাঁদাবাজি প্রতিরোধে করণীয়:
চাঁদাবাজি প্রতিরোধে প্রয়োজন—
– সামাজিক জনসচেতনতা বৃদ্ধি
– ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার প্রচার
– আইনের কঠোর প্রয়োগ
– রাজনৈতিক প্রশ্রয় বন্ধ
– সুশাসন ও জবাবদিহিতা
– দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ প্রশাসন
– ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা
– প্রযুক্তিনির্ভর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
– জেলখানায় নৈতিক শিক্ষা
– দলমত নির্বিশেষে সামাজিক প্রতিরোধ
▪️চাঁদাবাজি বন্ধে ব্যাংকখাতের করণীয়:
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ—
– বেকারদের কর্মসংস্থানে সহজ শর্তে বিনিয়োগ করতে পারে
– উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে পারে
– সিএসআর কার্যক্রমে কর্মমুখী প্রকল্প নিতে পারে
– চাঁদাবাজি হারাম—এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাতে পারে
– অবৈধ লেনদেন সনাক্তে নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।
বর্তমানে চাঁদাবাজি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া এক ভয়ানক ব্যাধি, যা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার ভিত্তিমূলকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। ইসলামে এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান রয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে চাঁদাবাজির নিন্দা ও এর পরিণতির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা প্রমাণ করে ইসলাম একটি শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কতটা গুরুত্ব দেয়। তাই ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে। ইসলামের দেখানো পথে, যেখানে কারো ওপর কোনো ধরনের জুলুম বা অন্যায় চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, এমন একটি চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনই সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

লেখক: মোঃ খায়রুল হাসান।

সিএসএএ ব্যাংকার এবং সার্টিফায়েড শরিআহ অ্যাডভাইজার অ্যান্ড অডিটর।

গ্ৰন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

উৎস: বানিজ্য প্রতিদিন (banijjoprotidin)

সিয়ামের ১২টি অমূল্য ফজিলত ও মর্যাদা

 মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের শ্রেষ্ঠ সোপান হল পবিত্র রমজান মাস। এটি কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির তরে নিজের প্রবৃত্তি ও চাহিদাকে বিসর্জন দেওয়ার এক অনন্য ইবাদত। হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই মাসের অসংখ্য ফজিলত ও সিয়াম পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন।

সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ তাআলা পরকালে যেমন সম্মানিত করবেন তেমনি দুনিয়াতেও তাকে গুনাহ মুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা দান করেছেন।
নিম্নে সন্নাহর আলোকে রমজানের ১২ এর ১২টি বিশেষ ফজিলত তুলে ধরা হল:
✪ ১. রোজার প্রতিদান আল্লাহ তাআলা নিজে দেবেন:
আল্লাহ তাআলা রোজাকে নিজের জন্য খাস করেছেন এবং এর প্রতিদান তিনি নিজেই দেবেন।
আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
«كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ»
“আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য, শুধু রোজা ছাড়া। কারণ রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ২. পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা:
রমজানের রোজা গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ»
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্ববর্তী সকল (সগিরা বা ছোট) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহি]
✪ ৩. রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর নিকট প্রিয়:
রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে অতি পছন্দনীয়। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ»
“সেই সত্তার শপথ যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশক আম্বরের ঘ্রাণ অপেক্ষাও অধিক সুগন্ধিময়।” [সহিহ বুখারী]
✪ ৪. এক রমজান থেকে অন্য রমজান মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মিটিয়ে দেয়:
আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ، وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ، وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ، مُكَفِّرَاتٌ مَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ»
“পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে অন্য জুমা এবং এক রমজান থেকে অন্য রমজান—এদের মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়।” [সহিহ মুসলিম]
✪ ৫. রাইয়ান নামক বিশেষ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ:
জান্নাতে প্রবেশের জন্য রোজাদারদের জন্য স্বতন্ত্র ভিআইপি গেট থাকবে। তারা সেখান দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
প্রখ্যাত সাহাবি সহল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ، يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، يُقَالُ: أَيْنَ الصَّائِمُونَ؟ فَيَقُومُونَ لَا يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ، فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ»
“জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা আছে। কেয়ামতের দিন কেবল রোজাদাররাই সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে—রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা প্রবেশ করার পর দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে, ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে ঢুকতে পারবে না।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ৬. জাহান্নাম থেকে মুক্তি:
রমজানে প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«إِنَّ لِلَّهِ عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءَ، وَذَلِكَ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ»
“নিশ্চয় ইফতারের সময় আল্লাহর নিকট অনেক জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা থাকে। আর এমনটি (রমজানের) প্রতি রাতেই ঘটে থাকে।” [ইবনে মাজাহ; আল্লামা আলবানি একে সহিহ বলেছেন]
✪ ৭. দ্বিগুণ আনন্দ:
রোজাদারের জন্য দুটি বিশেষ মুহূর্ত অত্যন্ত আনন্দদায়ক। আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَلِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا: إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ بِفِطْرِهِ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ»
“রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে যা তাকে আনন্দিত করে: যখন সে ইফতার করে তখন ইফতারের কারণে আনন্দিত হয়, আর যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তার রোজার কারণে আনন্দিত হবে।” [মুত্তাফাক আলাইহ]
✪ ৮. দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা:
ইফতারের সময় রোজাদারের দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
«ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ، وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ، وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللَّهُ فَوْقَ الْغَمَامِ…»
“তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: রোজাদার ব্যক্তি যতক্ষণ না সে ইফতার করে, ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং মজলুমের (অত্যাচারিতের) দোয়া। আল্লাহ তাআলা সেই দোয়া মেঘমালার উপরে উঠিয়ে নেন..।” [তিরমিজি; ইমাম তিরমিজি একে হাসান এবং আল্লামা আলবানি সহিহ বলেছেন]
✪ ৯. হাশরের ময়দানে সুপারিশ:
রোজা ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، يَقُولُ الصِّيَامُ: أَيْ رَبِّ، مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ، وَيَقُولُ الْقُرْآنُ: مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ، قَالَ: فَيُشَفَّعَانِ»
“রোজা এবং কুরআন কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে: হে আমার রব! আমি তাকে দিনে খাবার ও প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কুরআন বলবে: আমি তাকে রাতে ঘুমানো থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” [আহমদ; মুহাক্কিকগণ একে সহিহ বলেছেন]
✪ ১০. ঢাল স্বরূপ সুরক্ষা:
রোজা দুনিয়াতে গুনাহ থেকে এবং আখেরাতে আগুন থেকে রক্ষা করে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ»
“আর রোজা হল (জাহান্নামের আগুন ও গুনাহ থেকে বাঁচার) ঢাল।” [মুত্তাফাক আলাইহি]
✪ ১১. জাহান্নাম থেকে ৭০ বছরের দূরত্ব:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَا مِنْ عَبْدٍ يَصُومُ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا بَاعَدَ اللَّهُ بِذَلِكَ الْيَوْمِ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا»
“যে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক দিন রোজা রাখবে আল্লাহ সেই একদিনের বিনিময়ে তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের পথ দূরে সরিয়ে দেবেন।” [সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম]
✪ ১২. রোজাদার এবং জাহান্নামের মাঝে আসমান ও জমিনের দূরত্ব সমান খন্দক তৈরি করা হবে:
প্রখ্যাত সাহাবি আবু উমামা আল বাহিলি (রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ خَنْدَقًا كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় (সন্তুষ্টির জন্য) একদিন রোজা রাখবে, আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝখানে আসমান ও জমিনের দূরত্বের সমান একটি পরিখা তৈরি করে দেবেন।” [তিরমিজি; ইমাম তিরমিজি একে হাসান সহিহ এবং আল্লামা আলবানি হাসান সহিহ বলেছেন]
রমজানের এই রহমত ও মাগফিরাতের বসন্তকে কাজে লাগিয়ে আমরা যেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে সিয়াম পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
وَصَلَّىٰ اللهُ وَسَلَّمَ وَبَارَكَ عَلَىٰ نبينا مُحَمَّد، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أجمعين، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
জুবইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

Translate