প্রশ্ন: নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নাকি এটি বিদআত হিসেবে গণ্য হবে?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক অমূল্য নিয়ামত—যা একবার অতিবাহিত হলে আর কখনো ফিরে আসে না। কুরআন-এর সূরা আল-আসর আমাদের স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, সময়ের যথাযথ ব্যবহার না করলে মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; তবে যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে,সত্যের উপদেশ দেয় এবং ধৈর্যের উপর অবিচল থাকে তারাই প্রকৃত সফলকাম। হাদিসেও সতর্ক করা হয়েছে যে, মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় দুটি নিয়ামত নিয়ে—সুস্থতা ও অবসর।এমনকি কিয়ামতের দিন মানুষকে তার জীবন এবং বিশেষত যৌবন কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করেছে! এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।এই উপলব্ধি থেকেই সময়কে মূল্যবান মনে করে তা কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা প্রকৃত সফলতার পথ। অথচ আধুনিক যুগে জীবনযাত্রা ক্রমেই ব্যস্ত ও জটিল হয়ে উঠেছে; একই সঙ্গে এমন বহু মাধ্যম ও পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা মানুষকে দ্বীন থেকে উদাসীন করে দিতে পারে। তাই দুনিয়াবি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা, নফল ইবাদতে যত্নবান হওয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও হিফয, অর্থ-তাফসির অধ্যয়ন এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।এ লক্ষ্য অর্জনে যেসকল বৈধ পরিকল্পনা,পদ্ধতি বা উপকরণ সহায়ক হয়,সেগুলো গ্রহণ করা শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ ও উপকারী। সুতরাং দৈনন্দিন সুন্নাহসম্মত আমল স্মরণ রাখা ও সেগুলো নিয়মিত পালন করার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত বা শিক্ষামূলকভাবে কোনো চার্ট বা তালিকা তৈরি করা সত্তাগতভাবে বিদআত নয়। কারণ এতে নতুন কোনো ইবাদত প্রবর্তন করা হয় না; বরং শরিয়তে প্রমাণিত আমলগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পালনের জন্য এটি একটি সহায়ক মাধ্যম।অতএব এগুলো মূলত সময় ব্যবস্থাপনা ও স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আধুনিক পদ্ধতি, যা ইবাদত ও দৈনন্দিন দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে। তাই যথাযথ বিশ্লেষণ ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা না করে কোনো বিষয়কে সরাসরি বিদআত বলে আখ্যা দেওয়া সঠিক নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি ও প্রয়োগের ধরন অনুযায়ী তা বিদআতের অন্তর্ভুক্তও হতে পারে। এজন্য কোন ক্ষেত্রে এটি বৈধ মাধ্যম আর কোন ক্ষেত্রে বিদআত সে বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
.
নিয়মিত ইবাদত ও আমল সহজভাবে পালন করার জন্য ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কোন পরিস্থিতিতে শরিয়তসম্মত (বৈধ) হবে এবং কোন অবস্থায় তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে?
.
নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কখন বৈধ হবে এবং কখন তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে—এ বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে একটি মৌলিক নীতিকে সামনে রাখতে হয়। মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপ সাধারণত দুই ধরনের:
(১️). দ্বীনি কার্যক্রম (ইবাদত ও আকীদা সংক্রান্ত)
(২️). দুনিয়াবী কার্যক্রম (জীবনযাপন ও পার্থিব কাজকর্ম) দুনিয়াবী কাজের ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি হলো—এগুলো মূলত মুবাহ (বৈধ), যতক্ষণ না কোনো নিষিদ্ধ বিষয়ের সাথে জড়িত হয়। তাই একজন মুসলিম তার সুবিধা অনুযায়ী দিনের কাজগুলো নির্দিষ্ট সময়ে ভাগ করে নিতে পারেন।যেমন,সকালে কাজে যাওয়ার সময় নির্ধারণ করা,বিকেলে ফিরে আসার সময় ঠিক করা,খাবার, বিশ্রাম বা ব্যায়ামের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা ইত্যাদি এই আচরণগুলো মূলত ‘মুবাহ’ বা বৈধ। এগুলোর কোনোটিকে ‘বিদআত’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না; কারণ এগুলো ইবাদতের পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারিত নয়, বরং জীবনকে সুশৃঙ্খল করার উপায় মাত্র। বিদআত মূলত সেই বিষয়গুলোতে প্রযোজ্য, যেগুলো দ্বীনের অংশ হিসেবে নতুনভাবে প্রবর্তন করা হয়—যেমন আকীদা, ইবাদতের নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা এমন কোনো আমলকে শরিয়তের নির্ধারিত রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যার শরয়ী দলিল নেই।এই ভিত্তিতে বলা যায়—দৈনন্দিন ইবাদতসমূহ নিয়মিত ও সুসংগঠিতভাবে আদায় করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের তালিকা তৈরি করা নীতিগতভাবে বিদআত নয়। তবে কিছু বিশেষ অবস্থায় এটি বিদআতের রূপ নিতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে এ ধরনের রুটিন প্রণয়ন শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে, আর শর্ত ভঙ্গ হলে তা বিদআত হিসেবে গণ্য হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো সেই শর্তগুলো কী?
.
আমরা আমাদের পূর্বসূরি সন্মানিত ইমামগণের ফাতওয়ার আলোকে যা বুঝতে পেরেছি তার আলোকে বললে এই রুটিনকে বিদআতমুক্ত ও বৈধ রাখার জন্য নিম্নলিখিত শর্তসমূহ পূরণ করা অপরিহার্য:
.
(ক) প্রথমত: দৈনন্দিন ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত সময়কে সুশৃঙ্খলভাবে ভাগ করে নিজের জন্য একটি তালিকা বা চার্ট তৈরি করা নীতিগতভাবে জায়েজ। উদাহরণস্বরূপ: ফজরের পর কুরআন তেলাওয়াত ও হিফজ রিভিশন,যোহরের পর আক্বীদা বা ফিকহ অধ্যয়ন,আসরের পর কোনো ইলমি মজলিসে অংশগ্রহণ, মাগরিবের পর সন্তানদের লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব;এই ধরনের সুশৃঙ্খল রুটিনের কোনো দিকই বিদআত হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ এটি ইবাদতের অংশ নয়; এটি কেবল দৈনন্দিন কাজগুলো সুসংগঠিতভাবে সম্পন্ন করার একটি মাধ্যম মাত্র; যাতে কোনো দায়িত্ব অবহেলা না হয়।তাছাড়া যেসব বিষয় কেবল ‘মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়,সেগুলি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।পক্ষান্তরে, যদি কেউ এই তালিকা তৈরিকে স্বতন্ত্র ইবাদত মনে করে, অথবা এটিকে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ বলে বিশ্বাস করে, কিংবা মনে করে যে শুধু এ ধরনের চার্ট তৈরির মাধ্যমেই বিশেষ সওয়াব অর্জিত হয়—তবে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ এ ধরনের বিশ্বাসের শরয়ি কোনো ভিত্তি নেই। উপরন্তু, এ বিষয়ে ইসলামি শরীয়তে কিংবা খুলাফায়ে রাশেদীন-এর পক্ষ থেকেও কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা বর্ণিত হয়নি।
.
(খ) দ্বিতীয়ত: এই ধরনের তালিকা বা চার্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরিয়তে ইবাদতের জন্য যে সময়, পদ্ধতি ও বিধান নির্ধারিত রয়েছে, তা অবশ্যই ঠিক সেই নিয়মেই পালন করতে হবে। আর অতিরিক্ত নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো সময়, দিন বা সংখ্যা বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারণ না করে, বরং নিজের সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী সুন্নাহ অনুসরণ করে আমল করে—তবে তা বিদআত নয়। কারণ এটি মূলত আমলকে সুশৃঙ্খলভাবে গুছিয়ে নেওয়ার অন্তর্ভুক্ত, আর এতে শরিয়তসম্মত কোনো আপত্তি নেই। বরং ন্যায়নিষ্ঠ সালাফদের জীবনেও এমন পদ্ধতির দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।সালাফগণ নিজেদের সাথে অঙ্গীকার করতেন এবং সময়কে মূল্যবানভাবে কাজে লাগাতেন যা বর্তমান ভাষায় “সময় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা” হিসেবে পরিচিত।অতএব, এমন উদ্যোগ যা মানুষকে নেক আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়।কারণ এগুলো নিজে ইবাদত নয়; বরং ইবাদত পালনে সহায়ক মাধ্যম। এগুলো মানুষকে স্মরণ করায়, অনুপ্রাণিত করে এবং তার সময়কে সুশৃঙ্খল করে তোলে।পক্ষান্তরে,শরিয়তের স্পষ্ট দলিল ছাড়া নিজ উদ্যোগে ইবাদতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন, সময় বা সংখ্যা নির্ধারণ করা বা তা বাধ্যতামূলক করে নেওয়া বিদআত হিসেবে গণ্য হবে। যেমন—রজব মাসের ২৭ তারিখকে নির্দিষ্ট করে মিরাজ উদযাপন করা, অথবা দুই ঈদের বাইরে অন্য কোনো দিনকে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নির্ধারণ করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ ঐতিহাসিকভাবে মিরাজের রাত নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয় এবং এ রাতে বিশেষ কোনো ইবাদত শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। একইভাবে মুসলিমদের জন্য দুই ঈদের বাইরে অন্য কোনো দিনকে ইবাদতের উদ্দেশ্যে উৎসব হিসেবে পালন করার কোনো শর‘ই ভিত্তি নেই।
.
গ) তৃতীয়ত: ইবাদতের জন্য কোনো রুটিন বা চার্ট প্রণয়ন করা হলে তা যেন কেবল আত্মশুদ্ধি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত চারিত্রিক উন্নতির সহায়ক মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এর মূল উদ্দেশ্য হবে—শরঈ দলিলের আলোকে কোন সময় কোন ইবাদত আদায় করা হবে তা স্মরণ রাখা এবং নিজের আমলকে সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক করা।ইবাদতের সময় বিন্যাসে আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হলো নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর পবিত্র জীবন। তিনি ফজরের পর সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন; ফজরের সালাত আদায়ের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মুসাল্লায় অবস্থান করে আল্লাহর যিকির ও তাসবিহে মগ্ন থাকতেন অথবা সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে বিনয়ী আলাপচারিতায় সময় কাটাতেন। এরপর ইশরাকের দুই রাকাত সালাত আদায়ের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু করতেন।একইভাবে তাঁর দিনের সমাপ্তিও ছিল শান্ত ও সুশৃঙ্খল। এশার সালাতের পর অহেতুক গল্প-গুজব পরিহার করে দ্রুত ঘরে ফিরে যেতেন, পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করতেন, বিশ্রাম নিতেন এবং রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে বিশেষ ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন। এ ছাড়া একজন মুসলিমের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দৈনন্দিন কাজগুলোকে সালাতের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো উচিত, যাতে কোনো দায়িত্ব মসজিদে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক না হয়। যেমন—ফজরের পর কুরআন তিলাওয়াত ও হিফজের পুনরালোচনা যোহরের পর ফিকহ বা আকীদার অধ্যয়ন,আসরের পর ইলমি মজলিসে অংশগ্রহণ,মাগরিবের পর সন্তানদের শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব ইত্যাদি এ ধরনের সুশৃঙ্খল রুটিনের কোনো অংশই বিদআত নয়; কারণ এটি নিজেই ইবাদত নয়, বরং ইবাদত ও দায়িত্বগুলোকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার একটি মাধ্যম মাত্র। আর যে বিষয় কেবল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাতে বিদআতের অবকাশ থাকে না।পক্ষান্তরে,ইবাদত সম্পন্ন হওয়ার পর কে কতটুকু আমল করল তার ওপর নম্বর নির্ধারণ করা,ইবাদত শেষে টিক চিহ্ন দিয়ে সেগুলো মূল্যায়ন করা, লোক দেখানো মানসিকতা সৃষ্টি করা, অন্যদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করা, কাউকে এমন তালিকা অনুসরণে বাধ্য করা, কিংবা নিজের নির্ধারিত পদ্ধতিকে সবার জন্য অপরিহার্য মনে করে চাপিয়ে দেওয়া বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এ ধরনের আচরণ বিদআতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হতে পারে।কারণ,ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন; কিন্তু যখন তা প্রতিযোগিতা, বাহ্যিক মূল্যায়ন বা সামাজিক চাপের রূপ নেয়, তখন ইবাদতের রূহ ও ইখলাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
.
অতএব, ইবাদত পালনের সহজার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমল-চার্ট তৈরি করা বৈধ, তবে শর্ত হলো এটি শুধুমাত্র নিজের ইবাদত ও নেক আমল সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রণীত হতে হবে, শরীয়তের সীমা অতিক্রম করা যাবে না, এবং এতে কোনো ধরনের অবৈধ প্রভাব বা বিদআতধর্মী ধারণা সৃষ্টি করা যাবে না।এই আলোচনার ভাব উপলব্ধি করার সুবিধার্থে, নীচে সম্মানিত ইমামগণের প্রাসঙ্গিক ফাতওয়া সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
تصرفات العباد من الأقوال والأفعال نوعان : عبادات يصلح بها دينهم ، وعادات يحتاجون إليها في دنياهم ، فباستقراء أصول الشريعة نعلم أن العبادات التي أوجبها الله أو أحبها لا يثبت الأمر بها إلا بالشرع . وأما العادات فهي ما اعتاده الناس في دنياهم مما يحتاجون إليه ، والأصل فيه عدم الحظر ، فلا يحظر منه إلا ما حظره الله سبحانه وتعالى … والعادات الأصل فيها العفو ، فلا يحظر منها إلا ما حرمه ، وإلا دخلنا في معنى قوله تعالى : ( قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ آللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ ) .ولهذا ذم الله المشركين الذين شرعوا من الدين ما لم يأذن به الله وحرموا ما لم يحرمه … وهذه قاعدة عظيمة نافعة”
“মানুষের কথা ও কাজ এই সব আমল দুই প্রকার:
এক প্রকার হলো ইবাদত, যার দ্বারা তাদের দ্বীন শুদ্ধ হয়। আরেক প্রকার হলো (আদাত) দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজকর্ম,যা তাদের দুনিয়ার জীবনের জন্য দরকার। শরয়ী মূলনীতি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা জানতে পারি যে সব ইবাদত আল্লাহ ফরজ করেছেন বা পছন্দ করেন, সেগুলোর বিধান কেবল শরিয়তের (দলিলের) মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে। আর দৈনন্দিন প্রয়োজনসমূহ হলো মানুষের দুনিয়াবি জীবনে প্রচলিত ও প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ। এগুলোর মূলনীতি হলো মুক্ত বা বৈধ থাকা এগুলোর মধ্যে কেবল সেটাই নিষিদ্ধ হবে,যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নিষিদ্ধ করেছেন।অতএব,(আদাতের) দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার মূলনীতি হলো অব্যাহতি (ছাড়, ক্ষমা ও অবকাশ); সুতরাং যা আল্লাহ হারাম করেননি, তা হারাম বলা যাবে না।অন্যথায় আমরা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীর অর্থের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ব:”বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রিযিক নাযিল করেছেন, তার কিছু তোমরা হারাম আর কিছু হালাল করে নিয়েছ? বলুন, আল্লাহ কি তোমাদের এ অনুমতি দিয়েছেন, না কি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছ?”।(সূরা ইউনুস: ৫৯)। একারণেই আল্লাহ তাআলা সেই মুশরিকদের নিন্দা করেছেন, যারা এমন কিছু দ্বীনের মধ্যে চালু করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি, এবং এমন কিছু হারাম করেছিল যা আল্লাহ হারাম করেননি।..আর এটি (ইবাদত ও আদাতের পার্থক্য বুঝা) একটি অত্যন্ত মহান ও উপকারী মূলনীতি।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২১; পৃষ্ঠা: ১৭-১৮)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: বিদআত কি ‘বিদআতে হাসানা’ (উত্তম বিদআত) এবং ‘বিদআতে সাইয়্যিআ’ (মন্দ বিদআত) এই দুই ভাগে বিভক্ত?
তিনি উত্তরে বলেন:
لا يمكن أن يقال عن البدعة في دين الله: إنها بدعةٌ حسنـة أبداً مع قول النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم: كل بدعةٍ ضلالة. فإن هذه الجملة؛ أعني : (كل بدعةٍ ضلالة) صدرت من أفصح الخلق محمدٍ صلى الله عليه وعلى آله وسلم ، وأنصح الخلق ، وأعلم الخلق بشرع الله، وأعلم الخلق بمدلول خطابه، وقد قال هذه الجملة العامة: (كل بدعةٍ ضلالة) فكيف يأتي إنسانٌ بعد ذلك، فيقول: البدعة منها ما هو بدعةٌ سيئة، ومنها ما هو بدعةٌ حسنة. وهل هذا إلا إخراج لقول رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم عن ظاهره، فالبدعة كلها بدعةٌ سيئة ، والبدعة كلها ضلالة.
لكن قد يستحسن الإنسان شيئاً يظنه بدعة وما هو ببدعة، وقد يستحسن شيئاً، وهو بدعة يظنه حسناً، وما هو بحسن، أما أن يجتمع كونه بدعة وكونه حسناً، فهذا لا يمكن أبداً؛ فمثلاً قد يقول القائل: بناء المدارس بدعة؛ لأنها لم تكن معروفة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم، لكنه بدعةٌ حسنة.
فنقول: لا شك أن بناء المدارس حصل، لكنه ليس البدعة التي أرادها الرسول صلى الله عليه وعلى آله وسلم؛ إذ إن بناء المدارس وسيلة لتنظيم الدراسة، وتهيئة الدروس للدارسين، وليس مقصوداً في ذاته؛ بمعنى أننا لسنا نتعبد لله تعالى، ببناء المدارس على أن البناء نفسه عبادة؛ ولكن نتعبد لله تعالى ببناء المدارس على أنها وسيلةٌ؛ لحفظ العلم، وتنظيم العلم، ووسيلةُ المقصود مقصودة؛ ولهذا كان من القواعد المقررة عند العلماء أن للوسائل أحكام المقاصد …وخلاصة القول:أنه لا يمكن أن تكون البدعة الشرعية تنقسم إلى قسمين؛ حسنة، وسيئة، مع قول الرسول عليه الصلاة والسلام: (كل بدعةٍ ضلالة) ، وأن ما ظنه بعض الناس بدعةً، وهو حسن؛ فإن ظنه إياه بدعة خطأ، وما ظنه الإنسان حسناً، وهو بدعة حقيقةً؛ فإن ظنه أنه حسن خطأ”
“আল্লাহর দ্বীনে কোনো বিদ‘আত সম্পর্কে কখনো বলা যাবে না: এটি হাসানা’ বা ‘উত্তম বিদ‘আত। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:”প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।”(সহীহ মুসলিম হা/৮৬৭) এই ব্যাপক কথাটি বলেছেন সর্বাধিক শুদ্ধ ভাষার অধিকারী, সর্বাধিক উপদেশদাতা, আল্লাহর শরিয়ত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী, এবং নিজের কথার অর্থ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি যখন সাধারণভাবে বলেছেন: প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা, তখন এর পর কেউ এসে বলে বিদ‘আতের কিছু ভালো, কিছু মন্দ এটি কি রাসূলের কথাকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে বের করে দেওয়া নয়? অতএব, বিদ‘আত সবই মন্দ এবং সবই ভ্রষ্টতা। তবে এমন হতে পারে কেউ কোনো বিষয়কে বিদ‘আত মনে করে ভালো ভাবছে, অথচ তা আসলে বিদ‘আত নয়। আবার কেউ কোনো বিদ‘আতকে ভালো মনে করছে, অথচ তা ভালো নয়। কিন্তু কোনো বিষয় একই সঙ্গে বিদ‘আতও হবে এবং ভালোও হবে এটা কখনো সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ কেউ বলতে পারে:মাদরাসা বা বিদ্যালয় নির্মাণ বিদ‘আত, কারণ তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ছিল না তবে এটি ভালো বিদ‘আত।
জবাবে আমরা বলি: নিঃসন্দেহে মাদরাসা/বিদ্যালয় নির্মাণ (পরবর্তীতে) উদ্ভাবিত হয়েছে; কিন্তু এটি সেই বিদ‘আত নয় যা রাসূল (ﷺ) )শরীয়তের দৃষ্টিতে) উদ্দেশ্য করেছেন। কারণ বিদ্যালয় নির্মাণ মূল উদ্দেশ্য নয় বরং এটি পড়াশোনাকে সুসংগঠিত করা, শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ প্রস্তুত করা এসবের একটি মাধ্যম (ওয়াসিলা) মাত্র; এটি নিজে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ইবাদত (মাকসুদ) নয়। অর্থাৎ, আমরা মাদ্রাসা নির্মাণকে ইবাদত মনে করে করছি না যে, এই নির্মাণ কাজটুকুই একটি ইবাদত; বরং এটিকে জ্ঞান সংরক্ষণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর ইবাদত করি।আর মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে মাধ্যম বা উপায় অবলম্বন করা হয়, তা সেই লক্ষ্যেরই পর্যায়ভুক্ত হয়। একারণেই উলামায়ে কেরামের নিকট একটি স্বীকৃত মূলনীতি হলো: ‘উপায়সমূহ মূল উদ্দেশ্যের বিধানেরই অনুগামী হয়।’ (অর্থাৎ উদ্দেশ্য যদি পুণ্যময় হয়, তবে সেই উদ্দেশ্যে গৃহীত মাধ্যমও সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হবে)।সুতরাং সারকথা হলো: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুস্পষ্ট বাণী:”প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা” বিদ্যমান থাকা অবস্থায় শরয়ী বিদআতকে ‘হাসানা’ (উত্তম) ও ‘সাইয়্যিআ’ (মন্দ) এই দুই ভাগে বিভক্ত করার অবকাশ নেই। সুতরাং, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো উত্তম কাজকে (যা শরীয়তসম্মত) ‘বিদআত’ মনে করে, তবে তার সেই ধারণাই ভুল। আর যদি কেউ প্রকৃত কোনো বিদআতকে ‘উত্তম’ মনে করে, তবে তার সেই সিদ্ধান্ত বা মনে করাটাই ভুল।”(গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪০৫১২)
.
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”ধর্মীয় লেকচার বা ইলমি হালকার জন্য প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা কি নিষিদ্ধ বিদআত? যেহেতু ইলম অন্বেষণ একটি ইবাদত অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ইবাদতের জন্য কোনো সময় নির্দিষ্ট করেননি। একইভাবে একদল ভাই যদি প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট রাতে মসজিদে একত্রিত হয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কি সেটি বিদআত হবে?
তিনি উত্তরে বলেন:
“إن تحديد يوم معين منتظم لإلقاء محاضرة، أو حلقة علم ليس ببدعة منهي عنها، بل هو مباح، كما يقرر يوم معين في المدارس والمعاهد لحصة الفقه، أو التفسير أو نحو ذلك.ولا شك أن طلب العلم الشرعي من العبادات ، لكن توقيته بيوم معين تابع لما تقتضيه المصلحة، ومن المصلحة أن يعين يوم لذلك حتى لا يضطرب الناس. وطلب العلم ليس عبادة مؤقتة بل هو بحسب ما تقتضيه المصلحة والفراغ.لكن لو خص يوماً معيناً لطلب العلم باعتبار أنه مخصوص لطلب العلم وحده فهذا هو البدعة.وأما اتفاق مجموعة على الالتقاء في ليلة معينة لقيام الليل فهذا بدعة؛ لأن إقامة الجماعة في قيام الليل غير مشروعة إلا إذا فعلت أحياناً وبغير قصد ، كما جرى للنبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم مع عبد الله بن عباس رضي الله عنهما.
“একটি নির্দিষ্ট দিন বা সময় নির্ধারণ করে নিয়মিত কোনো লেকচার (বক্তৃতা) বা ইলমি হালকার (শিক্ষামূলক আসর) আয়োজন করা কোনো নিষিদ্ধ বিদআত নয়, বরং এটি বৈধ। যেমনটি স্কুল বা মাদরাসায় ফিকহ বা তাফসিরের ক্লাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন ও সময় নির্ধারন করা হয়।নিঃসন্দেহে শরয়ী ইলম অর্জন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত তবে এটিকে নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া মানুষের সুবিধা ও প্রয়োজনের (মাসলাহাহ) ওপর নির্ভরশীল, যাতে মানুষের জন্য সুবিধা হয় এবং বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।কারন দ্বীনি জ্ঞান অর্জন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ইবাদত নয়, বরং এটি সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়।কিন্তু,যদি কেউ এই বিশ্বাস নিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনকে (ইলম) জ্ঞান অর্জনের জন্য নির্ধারিত করে যে, কেবল ওই দিনটিই ইলম অর্জনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ (শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত),তাহলে তা বিদ‘আত হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে,যদি কোনো দল নির্দিষ্ট রাতে একত্রিত হয়ে নিয়মিত তাহাজ্জুদের জামাত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তা বিদ‘আত। কারণ কিয়ামুল লাইল জামাতে আদায় করা শরয়তসম্মত নয়, তবে মাঝে মাঝে, পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ছাড়া হয়ে গেলে তা বৈধ যেমনটি নবী ﷺ)-এর সাথে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ২৬, পৃষ্ঠা: ১৮২)
.
ইমাম ইবনে উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: কিছু মানুষ তাদের নিজেদের ফরয নামাজসমূহ এবং সুন্নাতে রাতিবাহ (ফরয নামাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সুন্নাত নামাজসমূহ) আদায়ের হিসাব রাখার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। আর তা হলো, সে একটি ছক বা রুটিন তৈরি করে। এই ছকটি এক সপ্তাহের নামাজ আদায়ের হিসাব রাখার জন্য তৈরি করা হয়। যেখানে সে নামাজের প্রতিটি ওয়াক্তের সামনে দুটি করে ঘর বা বর্গ রাখে; যার একটি ফরযের জন্য এবং অন্যটি সুন্নাতে রাতিবাহর জন্য। অতঃপর যখন সে জামা‘আতের সাথে ফরয নামাজ আদায় করে, তখন সে তার নামাজের জন্য একটি নাম্বার বা পয়েন্ট (কিংবা টিক চিহ্ন) দেয়। আর যখন সে সুন্নাতে রাতিবাহ আদায় করে, তখন তার জন্য একটি নাম্বার দেয়। আর যদি সে নামাজ না পড়ে, তবে সে কোনো নাম্বার দেয় না… এভাবেই চলতে থাকে। অতঃপর সপ্তাহের শেষে সে মোট নাম্বার বের করে। আর এই কাগজটিতে এক মাসের জন্য চারটি ছক থাকে। এরা বলে: নিশ্চয়ই এই ধরনের মাধ্যম ফরয ও সুন্নাতসমূহ আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে সাহায্য করে। সুতরাং এই পদ্ধতির ব্যাপারে আপনার মতামত কী? এটি কি শরী‘আতসম্মত নাকি নয়? এবং এটি প্রচার করার ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
অতঃপর তিনি জবাবে বলেছিলেন:
هذه الطريقة غير مشروعة ، فهي بدعة ، وربما تسلب القلب معنى التعبد لله تعالى ، وتكون العبادات كأنها أعمال روتينية كما يقولون ، وفي الصحيحين عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال : دخل رسول الله صلى الله عليه وسلم المسجد فإذا حبل ممدود بين ساريتين ، فقال : ( ما هذا ) ؟ ، قالوا : حبل لزينب تصلي فإذا كسلت ، أو فترت أمسكت به فقال : ( حلوه ، ليصل أحدكم نشاطه فإذا كسل ، أو فتر فليقعد ) ، ثم إن الإنسان قد يعرض له أعمال مفضولة في الأصل ثم تكون فاضلة في حقه لسبب ، فلو اشتغل بإكرام ضيف نزل به عن راتبة صلاة الظهر لكان اشتغاله بذلك أفضل من صلاة الراتبة .
وإني أنصح شبابنا من استعمال هذه الأساليب في التنشيط على العبادة ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم حذر من مثل ذلك حيث حث على اتباع سنته وسنة الخلفاء الراشدين ، وحذر من البدع ، وبين أن كل بدعة ضلالة ، يعني وإن استحسنها مبتدعوها ، ولم يكن من هديه ولا هدي خلفائه وأصحابه رضي الله عنهم مثل هذا “
“এই পদ্ধতি শরীয়তসম্মত নয় বরং এটি বিদ‘আত। কখনো কখনো এটি অন্তর থেকে আল্লাহর জন্য ইবাদতের প্রকৃত অনুভূতিও ছিনিয়ে নিতে পারে এবং ইবাদতসমূহ যেন রুটিন মাফিক কাজে পরিণত হয়, যেমনটি তারা বলে। আর সহীহাইনে (বুখারী ও মুসলিমে) আনাস ইবনু মালিক (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন দুই স্তম্ভের মাঝে একটি দড়ি টানানো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: এই রশিটি কিসের? সাহাবীগণ বললেন: এটি যায়নাব (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহা)-এর রশি,তিনি নামাজ পড়েন, অতঃপর যখন ক্লান্ত হয়ে যান বা অলসতা অনুভব করেন, তখন এটি ধরে রাখেন। তখন নবীজি (ﷺ) বললেন: না, এটি খুলে ফেলো। তোমাদের কারো উচিত তার উদ্যম থাকা অবস্থায় নামাজ পড়া। অতঃপর যখন সে অলসতা অনুভব করবে বা ক্লান্ত হয়ে যাবে, তখন সে যেন বসে পড়ে।”(সহীহ বুখারী হা/১১৫০) আর নিশ্চয়ই মানুষের সামনে এমন কিছু আমল উপস্থিত হতে পারে, যা মূলত? অন্য কাজের তুলনায়) ফযীলতের দিক থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিশেষ কোনো কারণে সেটি তার জন্য অধিক ফজিলতপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।যেমন- কোনো মেহমান এলো,আর তাকে সম্মান-আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকার কারণে যোহরের সুন্নাতে রাতিবাহ পড়তে না পারে, তবে সেই মুহূর্তে মেহমানদারিতে নিয়োজিত থাকা তার জন্য সুন্নাতে রাতিবাহ পড়ার চেয়েও উত্তম।আর আমি আমাদের যুবকদের ইবাদতে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরণের (মনগড়া) পদ্ধতি অবলম্বন করা থেকে সতর্ক করছি। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জাতীয় কাজ থেকে সতর্ক করেছেন;যেখানে তিনি তাঁর সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত অনুসরণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এবং তিনি বিদ‘আত থেকে সতর্ক করেছেন। আর তিনি স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা। অর্থাৎ যদিও বিদ‘আতকারীরা একে ভালো মনে করে। আর এই ধরনের কাজ তাঁর হিদায়াত বা আদর্শ এবং তাঁর খলীফাগণ ও সাহাবায়ে কিরামগণের (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) হিদায়াত বা আদর্শের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ১১১)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”আমরা ছয়জন বন্ধু প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর একজনের বাড়িতে দ্বীনি মজলিস করি। আমাদের কর্মসূচিতে কুরআন তিলাওয়াত, নববীর চল্লিশ হাদিস, মিনহাজুল মুসলিম ও রিজালুন হাওলার রাসূল ﷺ) পাঠ এবং নসিহত অন্তর্ভুক্ত থাকে।আমাদের বিশেষ একটি পদ্ধতি হলো ‘মুসাবাকা টেবিল’ (আমলের ছক)। এটি একটি মাসিক ফরম যেখানে প্রতিদিনের আমল (যেমন: জামাতে সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, নফল রোজা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা) লিপিবদ্ধ করা হয়। আমরা দেখেছি, এই ছকটি অনুসরণ করলে আমলে গতি আসে, আর এটি ছেড়ে দিলে অলসতা জেঁকে বসে। জানার বিষয় হলো, আত্মশুদ্ধি বা আমল সংশোধনের উদ্দেশ্যে এই ধরনের ‘আমলনামা’ বা ‘মুসাবাকা টেবিল’ মেইনটেইন করার শরয়ি বিধান কী?
শাইখ হাফিজাহুল্লাহ উত্তরে বলেন:
” الحمد لله : الذي يظهر لي أن اتخاذ هذا الجدول والتنافس على فقراته : بدعة ؛ لأنه يتضمن التفاخر ، والإعجاب بالعمل ، ويتضمن كذلك إظهار العمل الذي إخفاؤه أفضل ؛ لأن إخفاء العمل من الصدقة ، وتلاوة القرآن ، أو الذكر : أبعد عن الرياء ، قال تعالى : ( ادعوا ربكم تضرعاً وخفية ) الأعراف/ 55 ، وقال : ( ذكر رحمت ربك عبده زكريا إذ نادى ربه نداء خفياً ) مريم/ 2 ، 3 ، وأحد السبعة الذين يظلهم الله في ظله : ( رجل تصدق بصدقة فأخفاها حتى لا تعلم شماله ما تنفق يمينه ) .فالذي ينبغي : التواصي بالتزود من نوافل الطاعات ، والإكثار من ذلك ، وكلٌّ يعمل ما تيسر له فيما بينه وبين ربه ، وبهذا يحصل التعاون على البر والتقوى ، وتحصل السلامة مما يفسد العمل ، أو ينقص ثوابه ، والله الموفق ، والهادي إلى سبيل الرشاد ، والله أعلم “
“যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমার নিকট যা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—এই ধরনের তালিকা (ছক) তৈরি করা এবং এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর বিভিন্ন অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতা করা একটি বিদ‘আত (দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবন);কারণ এটি (নিজের আমল নিয়ে) অহংকার এবং নিজের আমলের প্রতি নিজে মুগ্ধ হওয়ার (আত্মতৃপ্তির) বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে,একইসাথে এটি এমন সব আমল প্রকাশ করে দেয় যা গোপন রাখাই ছিল অতি উত্তম;কেননা দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত কিংবা জিকিরের মতো আমলগুলো গোপন রাখা ‘রিয়া’ (লোক। দেখানো মানসিকতা) থেকে অধিকতর নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো কাকুতি-মিনতি করে এবং গোপনে।’ (সূরা আল-আরাফ: ৫৫) তিনি আরও বলেন: ‘(এটি) আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা জাকারিয়ার প্রতি; যখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডেকেছিলেন নিভৃতে (গোপনে)।”(সূরা মারইয়াম: ২-৩),আর (কিয়ামতের দিন) যে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর (আরশের) ছায়াতলে স্থান দেবেন, তাদের একজন হলো: ‘সেই ব্যক্তি যে এমনভাবে সদকা করে যে, তার ডান হাত কী খরচ করছে তার বাম হাতও তা জানতে পারে না’।সুতরাং যা করা উচিত তা হলো: নফল ইবাদত বেশি বেশি করার জন্য এবং এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য একে অপরকে উপদেশ দেওয়া এবং প্রত্যেকে তার রবের সাথে একান্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে যতটুকু সম্ভব আমল করবে, এর মাধ্যমেই নেক কাজ ও তাকওয়ার ওপর পারস্পরিক সহযোগিতা অর্জিত হবে; এবং এমন সব বিষয় থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে যা আমলকে নষ্ট করে দেয় কিংবা আমলের সওয়াব কমিয়ে দেয়। আল্লাহই তাওফিকদাতা, তিনিই সঠিক পথের হেদায়েতকারী। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।”(http://www.islamway.com/?iw_s=Fatawa&iw_a=view&fatwa_id=8762
.
মহান আল্লাহ আমাদের জীবনকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত করার তাওফিক দান করুন। তিনি-ই সর্বাধিক জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
No comments:
Post a Comment