ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর রাবেয়া আল-আদাবিয়া (রহি’মাহাল্লাহ); যিনি ‘রাবেয়া বসরী’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন।বিজ্ঞ আলেমদের বক্তব্য থেকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তিনি ছিলেন তাবি-তাবিঈন যুগের এক অনন্য ও পরহেজগার নারী। তিনি হিজরী ১০০ সনে ইরাকের বসরা নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮০ বছর বয়সে ১৮০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। রাবেয়া বসরী একজন ‘যাহিদাহ’ (দুনিয়া বিমুখ), ‘আবিদাহ’ (আল্লাহর ইবাদত গুজার) এবং অত্যন্ত বিনয়ী নারী হিসেবে জগদ্বিখ্যাত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, সেই যুগে ‘তাসাউফ’ বা সুফিবাদ বর্তমানের মতো নির্দিষ্ট নাম কিংবা বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিচিত ছিল না; বরং তখন এমন কিছু ইবাদতগুজার মানুষ ছিলেন যারা তাদের পরহেজগারিতা ও দুনিয়াবিমুখতার জন্য স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।সালাফে সালেহীনের বহু ইমাম তাঁর প্রশংসা করেছেন—যাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ)। একইভাবে ইবনুল জাওজী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সিফাতুস সাফওয়া-এ রাবেয়ার গুণাবলি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর জীবনীর ওপর একটি স্বতন্ত্র রচনাও সংকলন করেছেন।যদিও পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ তাঁর প্রতি ‘হুলুল’ (সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির মাঝে মিশে যাওয়া) মতবাদের অভিযোগ আরোপ করেছেন, তবে মহান মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ ইমাম আয‑যাহাবী তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সিয়ারু আলামিন নুবালা-তে এ অভিযোগকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
Friday, March 6, 2026
রাবেয়া বসরী কে ছিলেন
.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৪৮) তার সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ গ্রন্থে রাবেয়া বসরীর জীবনীতে লিখেছেন:رابعة العدوية البصرية الزاهدة العابدة الخاشعة، رابعة بنت إسماعيل أم عمر ولاؤها للعتكيين، ولها سيرة في جزء لابن الجوزي،”রাবেয়া আদবিয়া আল-বাসরিয়া ছিলেন অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ, ইবাদতগুজার এবং আল্লাহভীরু নারী। তিনি ছিলেন ইসমাঈলের কন্যা এবং উম্মে আমর উপনামে পরিচিত। তাঁর বংশীয় সম্পর্ক ছিল আতিক গোত্রের সাথে। ইবনুল জাওজী তাঁর জীবনী নিয়ে একটি পুস্তিকা লিখেছেন।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন;সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ২৪১)
.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) আরও উল্লেখ করেন যে, ইবনে আবিদ দুনইয়া বর্ণনা করেছেন: মুহাম্মদ বিন হুসাইন আমাদের বলেছেন, উবাইস বিন মাইমুন আল-আত্তার আমাকে বলেছেন, রাবেয়া আদবিয়ার সেবিকা আবদাহ বিনতে আবি শাওয়াল বলেছেন:
كانت رابعة تصلي بالليل كله فإذا طلع الفجر هجعت في مصلاها هجعة خفيفة حتى يسفر الفجر فكنت أسمعها تقول : إذا وثبت من مرقدها ذلك وهي فزعة : يا نفس كم تنامين ؟ إلى كم تقولين ؟ يوشك أن تنامي نومة لا تفوقين منها إلا ليوم النشور قالت فكان هذا دأبها دهرها حتى ماتت
“রাবেয়া সারা রাত ধরে (তাহাজ্জুদের) নামাজ আদায় করতেন। যখন ফজর উদিত হতো, তিনি তাঁর জায়নামাজে অল্প সময়ের জন্য একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেন (হালকা ঘুমাতেন)। যখন সুবহে সাদিক স্পষ্ট হয়ে যেত, তখন তিনি তাঁর বিছানা থেকে আতঙ্কিত হয়ে লাফিয়ে উঠতেন এবং আমি তাঁকে বলতে শুনতাম:”হে নফস (মন)! তুমি আর কতকাল ঘুমাবে? কতক্ষণ এভাবে (অচেতনে) পড়ে থাকবে?খুব শীঘ্রই তুমি এমন এক ঘুমে বিভোর হতে যাচ্ছ,(মৃত্যু) যা থেকে হাশরের দিন (পুনরুত্থান দিবস) ছাড়া আর কখনোই জাগবে না। বর্ণনাকারী আবদাহ বলেন—মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সারা জীবন এটিই ছিল তাঁর চিরচেনা স্বভাব ( অর্থাৎ তিনি এভাবেই নিজেকে নসিহত করতেন)।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনুল ঈমাদ হাম্বালী; শযারাতুয যাহাব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯৩) এবং সিফাতুস সফওয়াহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৭)।
.
আবু সাঈদ ইবনুল আ’রাবী (রহি’মাহুল্লাহ) বলেন:أما رابعة فقد حمل الناس عنها حكمة كثيرة، وحكى عنها سفيان وشعبة وغيرهما ما يدل على بطلان ما قيل عنها”লোকেরা রাবেয়ার থেকে অনেক প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা-বার্তা বর্ণনা করেছে। সুফিয়ান আস-সাউরী, শু’বাহ এবং অন্যান্য (প্রসিদ্ধ হাদীসের রাবীগণ) তাঁর হিকমাহ বর্ণনা করেছেন,যা তাঁর নামে প্রচলিত ভিত্তিহীন কথাগুলোকে বাতিল বা মিথ্যা প্রমাণ করে।”
.
রাবেয়া আদবিয়ার দিকে নিসবত করা একটি কবিতার চরণের ভুল ব্যাখ্যা করে তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। কবিতাটি হলো:ولقد جعلتك في الفؤاد محدثي * وأبحت جسمي من أراد جلوسي.”আমি তো হৃদয়ে তোমাকেই (আল্লাহকে) স্থান দিয়েছি,আর আমার দেহটা রেখেছি তাদের জন্য, যারা আমার সান্নিধ্যে বসতে চায়।”
.
সুফিবাদের পরিভাষায় এই চরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো:”আমার অন্তর সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন (হৃদয়ের সঙ্গী)। আর মানুষের সাথে যখন আমি বসি বা কথা বলি, তখন কেবল আমার শরীরটাই সেখানে উপস্থিত থাকে (দেহকে তাদের জন্য রেখেছি), কিন্তু আমার রুহ বা আত্মা থাকে তাঁরই সান্নিধ্যে।” অর্থাৎ, তিনি বলতে চেয়েছেন তিনি লোকসমাজে থাকলেও মানসিকভাবে পুরোপুরি আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন। মানুষের সাথে তাঁর লেনদেন কেবল শরীর বা লৌকিকতার পর্যায়ে, হৃদয়ের পর্যায়ে নয়।
.
অথচ এই কবিতার অর্ধেক অংশ দিয়ে কেউ কেউ তাঁকে ‘হুলুল’ (সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার বিলীন হওয়া) এবং পুরো অংশ দিয়ে ‘ইবাহাত’ (শরীয়তের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া) এর দিকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এর জবাবে ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وهذا غلو وجهل ولعل من نسبها إلى ذلك مُباحي حلولي ليحتج بها على كفرها كاحتجاجهم بخبر ” كنت سمعه الذي يسمع به”আর এটি (রাবেয়ার প্রতি এই অভিযোগ) অতিরঞ্জন এবং মূর্খতা। সম্ভবত যারা তাকে (রাবেয়াকে) এগুলোর সাথে সম্পর্কিত করেছে, তারা হলো এমন ‘মুবাহি’ (যারা মনে করে শরিয়তের সবকিছু তাদের জন্য বৈধ হয়ে গেছে) ও ‘হুলুলি’ (সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিতে বিলীন হওয়ার প্রবক্তা), যারা তাদের নিজেদের কুফুরীর সপক্ষে এটি দ্বারা দলিল পেশ করতে চায়—ঠিক যেভাবে তারা (নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদের সপক্ষে) ‘আমি তার কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শোনে’—এই বর্ণনাটি (হাদিসে কুদসি) দিয়ে দলিল পেশ করে থাকে।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন;সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড:৮; পৃষ্ঠা: ২৪১)
.
জেনে রাখা ভাল যে, রাবেয়া বসরী রহি’মাহাল্লাহ থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোন ‘কারামত’ বা অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হয়নি। তবে তাঁর থেকে অনেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী এবং তাঁর দুনিয়া বিমুখ জীবনের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন রাবেয়া বসরী (রহি’মাহাল্লাহ) সুফিয়ান আস-সাউরী রহি’মাহুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,إنما أنت أيام معدودة فإذا ذهب يوم ذهب بعضك ، يوشك إذا ذهب البعض أن يذهب الكل وأنت تعلم ، فاعمل“আপনার জীবন সামান্য কতগুলো দিনের সমষ্টি মাত্র। যখনই একটা দিন অতিবাহিত হয়, আপনার জীবনের একটা অংশ শেষ হয়ে যায়। শীঘ্রই এমন একটা সময় আসবে, যখন দিনগুলো শেষ হয়ে আপনার জীবনও শেষ হয়ে যাবে। আপনি এই কথা জানেন, সুতরাং সে অনুযায়ী আমল করুন।”(ইবনুল ঈমাদ হাম্বালী; শযারাতুয যাহাব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯৩; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫৯৯৪)
.
রাবেয়া বসরী (রহি’মাহাল্লাহ)-এর প্রজ্ঞার আরও উদাহরণ হচ্ছে তাঁর এই বাণীاستغفر الله من قلة صدقي في قولي : أستغفر الله“আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার ব্যাপারে আমার আন্তরিকতার অভাব থাকার কারণেও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।”
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক! দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো—ভারতীয় উপমহাদেশে রাবেয়া বসরী (রহিমাহা)-কে ঘিরে যে অসংখ্য কাহিনী প্রচলিত আছে, সেগুলোর বড় অংশেই ঐতিহাসিক সত্যের তুলনায় অতিরঞ্জন ও অলঙ্কারই বেশি পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন বক্তা ও লেখক তাঁর নামে এমন সব ঘটনা ও বক্তব্য বর্ণনা করেন, যেগুলোর অনেকগুলোরই নির্ভরযোগ্য কোনো সনদ নেই; বরং কখনো কখনো সেগুলো ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব মনগড়া কাহিনীর প্রভাবে অনেক সময় সঠিক মানহাজের অনুসারীদের মধ্যেও ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়—তাঁরা মনে করেন, হয়তো রাবেয়া বসরী (রহি.) নিজেই কোনো ভ্রান্ত মতের অনুসারী ছিলেন; অথচ প্রকৃত সত্য তা নয়। উদাহরণস্বরূপ: সূফীবাদের কিছু অনুসারী—বিশেষত দেওবন্দী ও বেরেলুবী পরিমণ্ডলে তাঁর সম্পর্কে নানা আজগুবী ও ভিত্তিহীন কাহিনী প্রচারিত হয়েছে। যেমন একটি প্রচলিত গল্পে কুখ্যাত চরমোনাই পীর তার বইয়ে লিখেছেন,“একদিন রাবেয়া বসরী তাঁর এক হাতে আগুন আরেক হাতে পানি নিয়ে রাস্তায় বের হলেন। লোকেরা তাঁকে এইভাবে বের হতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? রাবেয়া বসরী বললেন, “হে ভীতুর দলেরা! তোমরা যারা আল্লাহর ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করো, আমি এই পানি দিয়ে জাহান্নামকে নিভিয়ে দিব। তখন তোমরা কিসের ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে? আর তোমরা যারা জান্নাতের লোভে আল্লাহর ইবাদত করো হে লোভীর দলেরা! আমি এই আগুন দিয়ে জান্নাত পুড়িয়ে দেব। তাহলে তোমরা কিসের লোভে আল্লাহর ইবাদত করবে? আমি আল্লাহর শাস্তির ভয়ে কিংবা জান্নাতের লোভে ইবাদত করি না। আমি তো মাওলার প্রেমে তাঁর ইবাদত করি।” অথচ এ গল্পটি নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে প্রমাণিত নয়; বরং এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। এই ধরনের গোমরাহীপূর্ণ গল্পের কারণে অনেক সময় সঠিক মানহাজের লোকেরাও ভুলভাবে ধারণা করেন যে, রাবেয়া বসরী (রহি.) হয়তো নিজেই ভ্রান্ত বা বিদআতি ছিলেন ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাঁরা তাঁর সমালোচনা করে বসেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।যেমনটি ইমাম আয-যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) সহ বহু মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর নামে প্রচলিত অধিকাংশ কাহিনীই ভিত্তিহীন। বরং তিনি ছিলেন একজন বিদুষী, ইবাদতগুজার ও মুত্তাকী নারী। অতএব অন্যদের রচিত মনগড়া বক্তব্য তাঁর ওপর আরোপ করা মোটেও ইনসাফসম্মত নয়। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment