Wednesday, October 29, 2025

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ধর্ষকের শাস্তির বিধান ও তা থেকে সমাজকে রক্ষার উপায়সমূহ

▪️প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ধর্ষণ বলতে বোঝায়—কোনো নারীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অবৈধ যৌন সম্পর্কে লিপ্ত করতে বাধ্য করা; এতে তার (নারীর) পবিত্রতা, মর্যাদা ও মানবিক সম্মান পদদলিত হয় এবং সে গভীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
.
ধর্ষক দুই প্রকার:
▪️প্রথম প্রকার: যে ব্যক্তি অস্ত্র ব্যবহার না করে এবং নারীকে অপহরণ না করেও তাকে ব্যভিচারে বাধ্য করে। এই ক্ষেত্রে তার ওপর ব্যভিচারের হদ্দ শাস্তি প্রয়োগ হবে, যদি ব্যভিচার প্রমাণিত হয়। হোক তা তার নিজের স্বীকারোক্তির মাধ্যমে, অথবা চারজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যে। যদি সে অবিবাহিত হয়, তবে তাকে একশত বেত্রাঘাত করা হবে। আর যদি সে বিবাহিত হয়, তবে তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। কিছু আলেম বলেছেন: ধর্ষককে নারীর মহর (যেমনটা সাধারণত বিয়ের সময় দেওয়া হয়) পরিশোধ করতে হবে।
.
শাইখুল ইসলাম হুজ্জাতুল উম্মাহ ইমামু দারিল হিজরাহ আবূ ‘আব্দুল্লাহ মালিক বিন আনাস আল-আসবাহী আল-মাদানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৭৯ হি.] বলেছেন:الأمر عندنا في الرجل يغتصب المرأة، بكراً كانت أو ثيبا : أنها إن كانت حرة : فعليه صداق مثلها…، والعقوبة في ذلك على المغتصِب، ولا عقوبة على المغتصبة في ذلك كله”আমাদের মতে,কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করে সে নারী কুমারী হোক বা বিধবা হোক,তবে যদি সে স্বাধীন (দাসী নয়) নারী হয়, তার জন্য সমপর্যায়ের নারীদের মতোই মোহরানা নির্ধারিত হবে। এবং এ অপরাধের শাস্তি কেবল ধর্ষণকারী পুরুষের ওপরই প্রযোজ্য হবে; ধর্ষিত নারীর ওপর এর কোনো শাস্তি নেই।”(মুয়াত্তা ইমাম মালিক; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৭৩৪)
.
ইমাম আল-বাজী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:المستكرَهة ؛ إن كانت حرة : فلها صداق مثلها على من استكرهها، وعليه الحد، وبهذا قال الشافعي، وهو مذهب الليث، وروي عن علي بن أبي طالب رضي الله عنه .وقال أبو حنيفة والثوري: عليه الحد دون الصداق.والدليل على ما نقوله : أن الحد والصداق حقان: أحدهما لله، والثاني للمخلوق، فجاز أن يجتمعا، كالقطع في السرقة، وردها “যদি জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করা নারী স্বাধীন হয়, তবে তার সমপর্যায়ের নারীর মতোই তার জন্য মোহর নির্ধারিত হবে, আর যিনি তাকে বাধ্য করেছেন, তার ওপর ব্যভিচারের হদ্দ প্রয়োগ করা হবে। এই মতই ইমাম শাফেয়ী, ইমাম লায়স এবং আলী ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা ও সুফিয়ান সাওরী (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেছেন: তার উপর হদ্দ প্রযোজ্য হবে, কিন্তু মোহরানা প্রযোজ্য হবে না। আমাদের কথার দলিল হলো এই যে, হদ্দ এবং মোহর উভয়ই দুই ধরনের অধিকার: একটিতে আল্লাহর অধিকার, আর অন্যটিতে সৃষ্টির অধিকার। সুতরাং এ দুটি একসঙ্গে প্রযোজ্য হতে পারে, যেমন চুরির ক্ষেত্রে (হাত) কাটা হয় এবং চুরি করা জিনিস ফেরত দেওয়া হয়। (মুনতাকা শারহুল মুয়াত্তা; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৬৮–২৬৯)
.
ইমাম ইবনু আব্দুল বার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وقد أجمع العلماء على أن على المستكرِه المغتصِب الحدَّ، إن شهدت البينة عليه بما يوجب الحد، أو أقر بذلك. فإن لم يكن: فعليه العقوبة (يعني : إذا لم يثبت عليه حد الزنا لعدم اعترافه ، وعدم وجود أربعة شهود ، فإن الحاكم يعاقبه ويعزره العقوبة التي تردعه وأمثاله). ولا عقوبة عليها إذا صح أنه استكرهها وغلبها على نفسها ، وذلك يعلم بصراخها، واستغاثتها ، وصياحها”সমস্ত আলেম একমত হয়েছেন যে, যে ব্যক্তি জোরপূর্বক কোনো নারীকে ধর্ষণ করে, তার উপর হদ্দ প্রযোজ্য হবে যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ দ্বারা সেটি প্রমাণিত হয়, অথবা সে নিজেই তা স্বীকার করে। যদি এমন প্রমাণ না থাকে, তবে তার উপর তাআযির শাস্তি (বিচারকের বিবেচনায় প্রদত্ত শাস্তি) প্রযোজ্য হবে অর্থাৎ, যদি ব্যভিচারের শাস্তি প্রমাণিত না হয় তার অস্বীকারের কারণে বা চারজন সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে, তাহলে বিচারক তাকে এমন শাস্তি দেবেন যা তাকে ও তার মতো অন্যদের নিবৃত্ত করবে। আর নারীর ওপর কোনো শাস্তি নেই যদি প্রমাণিত হয় যে সে জোরপূর্বক বাধ্য করা হয়েছে এবং সে নিজেকে রক্ষা করতে অক্ষম ছিল। এটা বোঝা যায় তার চিৎকার, সাহায্যের আবেদন ও আর্তনাদের মাধ্যমে। (আল ইস্তিজকার; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৪৬)
.
▪️দ্বিতীয় প্রকার: যে ব্যক্তি অস্ত্রের মাধ্যমে কোনো নারীকে জোরপূর্বক ব্যভিচারে বাধ্য করে, অথবা নারীকে অপহরণ করে সে তার সাথে ব্যভিচার করুক বা না করুক তার জন্য ডাকাতি বা সন্ত্রাসী হামলার শাস্তি প্রযোজ্য হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় শাসক বা তার প্রতিনিধি চারটি বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নিতে পারেন:
১. কেবল হত্যা,
২. নতুবা শুলে চড়িয়ে হত্যা করা,
৩. বিপরীত দিকের হাত ও পা কেটে ফেলা,
৪. অথবা দেশ থেকে নির্বাসন দেওয়া।
দলিল হচ্ছে আল্লাহর বানী:اِنَّمَا جَزٰٓؤُا الَّذِیۡنَ یُحَارِبُوۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ وَ یَسۡعَوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ فَسَادًا اَنۡ یُّقَتَّلُوۡۤا اَوۡ یُصَلَّبُوۡۤا اَوۡ تُقَطَّعَ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ اَرۡجُلُهُمۡ مِّنۡ خِلَافٍ اَوۡ یُنۡفَوۡا مِنَ الۡاَرۡضِ ؕ ذٰلِكَ لَهُمۡ خِزۡیٌ فِی الدُّنۡیَا وَ لَهُمۡ فِی الۡاٰخِرَۃِ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ”যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় তাদের শাস্তি কেবল এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে বা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে বা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে বা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। দুনিয়ায় এটাই তাদের লাঞ্ছনা ও আখেরাতে তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে।”(সুরা মায়েদা;৩৩) হাদীসে এসেছে, একদল লোক মদীনায় আসল, তারা মদীনার আবহাওয়া সহ্য করতে পারল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে সাদকার উট যেখানে থাকে সেখানে অবস্থানের অনুমতি দিলেন। যাতে তারা উটের দুধ ও প্রস্রাব পান করতে পারে। কিন্তু তারা রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলোকে নিয়ে চলে যেতে লাগল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পিছু ধাওয়া করতে নির্দেশ দিলেন। পরে তারা ধৃত হলো। তখন তাদের হাত-পা কেটে দেয়া হলো, চোখ উপড়ে ফেলা হলো, এবং তাদেরকে মদীনার কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকায় ফেলে রাখা হলো।”(সহীম বুখারী হা/১৫০১; মুসলিম হা/১৬৭১)
.
সৌদি আরবের হাইয়াতু কিবারিল উলামা কর্তৃক ডাকাতি ও অপহরণ অপরাধ বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে:
” إن جرائم الخطف والسطو لانتهاك حرمات المسلمين على سبيل المكابرة والمجاهرة: من ضروب المحاربة والسعي في الأرض فساداً، المستحقة للعقاب الذي ذكره الله سبحانه في آية المائدة ، سواء وقع ذلك على النفس أو المال أو العرض ، أو أحدث إخافة السبيل وقطع الطريق. ولا فرق في ذلك بين وقوعه في المدن والقرى، أو في الصحارى والقفار، كما هو الراجح من آراء العلماء رحمهم الله تعالى.
قال ابن العربي يحكي عن وقت قضائه : رُفِعَ إلي قومٌ خرجوا محاربين إلى رفقة، فأخذوا منها امرأة مغالَبة على نفسها من زوجها ومن جملة المسلمين معه ، فاحتملوها ، ثم جد فيهم الطلب، فأُخذوا، وجيء بهم ، فسألت من كان ابتلاني الله به من المفتين فقالوا : ليسوا محاربين ! لأن الحرابة إنما تكون في الأموال لا في الفروج ! فقلت لهم : إنا لله وإنا إليه راجعون ! ألم تعلموا أن الحرابة في الفروج أفحش منها في الأموال ؟! وأن الناس كلهم ليرضون أن تذهب أموالهم وتُحرب من بين أيديهم ولا يُحرب المرء من زوجته وبنته ، ولو كان فوق ما قال الله عقوبة، لكانت لمن يسلب الفروج”
“যেসব অপরাধ যেমন অপহরণ বা ডাকাতি মুসলিমদের জান-মাল ও সম্মান লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে ও জোর করে সংঘটিত হয়, সেগুলো ডাকাতি বা হামলা ও পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ ছড়ানোর অন্তর্ভুক্ত অপরাধ। এই ধরনের অপরাধের জন্য আল্লাহ তাআলা সূরা মায়িদায় যে কঠোর শাস্তির কথা বলেছেন, তা-ই প্রযোজ্য হবে সে অপরাধ জান-মাল বা সম্মানের (ইজ্জতের) উপর হোক, কিংবা মানুষের পথ চলা ভয়ঙ্কর করে তোলা বা পথ কেটে নেওয়ার মাধ্যমে হোক। এ ব্যাপারে কোনো পার্থক্য নেই যে অপরাধটি শহর বা গ্রামে সংঘটিত হয়েছে, নাকি মরুভূমি ও জনশূন্য প্রান্তরে ঘটেছে বরং এ বিষয়ে অধিকাংশ আলেমের মতে, উভয় ক্ষেত্রেই একই বিধান প্রযোজ্য হবে। ইবনুল আরাবী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিচারকত্বের সময়কার একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন আমার নিকট কিছু লোককে হাজির করা হলো, যারা একদল সফরকারীর উপর আক্রমণ করেছিল। তারা ঐ কাফেলা থেকে এক মহিলাকে জোরপূর্বক তার স্বামী ও কাফেলার অন্য মুসলমানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর লোকেরা তাদের পিছু নেয়, অবশেষে তাদের ধরা হয় এবং আমার সামনে আনা হয়। তখন আল্লাহ আমাকে যাদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন, অর্থাৎ সেই সময়ের কিছু মুফতিদের কাছে আমি বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলাম। তারা বলল: এরা ডাকাত বা সশস্ত্র বিদ্রোহী নয়! কারণ সশস্ত্র ডাকাতি তো কেবল সম্পদের ব্যাপারে হয়, নারীদের বিষয়ে নয়।তখন আমি বললাম: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন তোমরা কি জানো না যে নারীর ইজ্জতের উপর হামলাই তো সম্পদের উপর হামলার চেয়েও জঘন্য? মানুষ তো সবাই রাজি থাকবে তাদের সম্পদ চলে যাক, কিন্তু কেউই রাজি হবে না যে তার স্ত্রী বা কন্যাকে কেউ লাঞ্ছিত করুক। যদি আল্লাহ তাআলা যে শাস্তি নির্ধারণ করেছেন তার চেয়েও কঠিন কোনো শাস্তি থাকত, তবে তা এই লোকদেরই জন্য হতো।”(সিনিয়র আলেম বোর্ডের একটি গবেষণা থেকে সংগৃহীত, যার শিরোনাম: “ডাকাতি, অপহরণ ও মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত শরয়ি বিধান”(আরবি মূল:الحكم في السطو والاختطاف والمسكرات), পৃষ্ঠা ১৯২–১৯৪; গৃহীত; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪৫৩৭৫১)
.
▪️ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় শাস্তি (দন্ড) বাস্তবায়নের ক্ষমতা কার:
ইসলামী শরী‘আতের বিধান মোতাবেক রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে কোন অবস্থাতেই কোন রায় বাস্তবায়ন করা যাবে না। শাস্তি (হদ্দ) বা দন্ডবিধি কার্যকর করার ক্ষমতা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় মুসলিম প্রশাসনের। যে কেউ যখন তখন যেখানে ইচ্ছা এই বিধান কার্যকর করলে একটি দেশের প্রশাসনিক অবকাঠামো ধ্বংস হবে। সাথে সাথে সুষ্ঠু সমাজের স্বাভাবিক সুখ-শান্তি বিপর্যস্ত হবে। ফলে শাস্তির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। অর্থাৎ অপরাধীকে শাস্তি দানের মাধ্যমে অন্যদের শিক্ষা প্রদান পূর্বক সমাজ থেকে অপরাধ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হবে। ফলে পরবর্তীতে শাস্তির মূল উদ্দেশ্য- সমাজের শান্তি-শৃংখলা ও সমৃদ্ধি অর্জিত হবে এবং মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ সাধিত হবে।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:وَلا يُقِيمُ الحُدُودَ إِلَّا الحَاكِمُ المُسْلِمُ، أَوْ مَنْ يَقُومُ مَقَامَ الحَاكِمِ، وَلا يَجُوزُ لِأَفْرَادِ المُسْلِمِينَ أَنْ يُقِيمُوا الحُدُودَ؛ لِمَا يَلْزَمُ عَلَى ذَلِكَ مِنَ الفَوْضَى وَالفِتْنَةِ.”হাদ বা দণ্ডবিধি (শরী‘আত নির্ধারিত শাস্তি) মুসলিম শাসক বা শাসকের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ছাড়া আর কেউই কার্যকর করতে পারবে না। সাধারণ মুসলিমদের পক্ষে দণ্ডবিধি কার্যকর করা জায়েয নেই। কারণ এর ফলে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি হবে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ;খণ্ড:২২;পৃষ্ঠা:৭;ফাতওয়া নং-১৭৭৪৩।
.
▪️দ্বিতীয়ত: কেউ কোন নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করার চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার জন্য করণীয় কী? সে কি অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে?
.
যে নারীর সাথে জোরপূর্বক যেনা করার চেষ্টা করা হচ্ছে সে নারীর উপর আত্মরক্ষা করা ফরজ। তিনি কিছুতেই দুর্বৃত্তের কাছে হার মানবেন না। এজন্য যদিদুর্বৃত্তকে হত্যা করে নিজেকে বাঁচাতে হয় সেটা করবেন। এই আত্মরক্ষা ফরজ। ধর্ষণ করতে উদ্যত ব্যক্তিকে হত্যা করার কারণে তিনি দায়ী হবেন না। এমনকি কোন নারী প্রাণান্তকর চেষ্টা করার পর যদি নিজে নিহত হয়, তবে তিনি শহীদের মর্যাদা পাবেন।দলিল হচ্ছে, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, مَنْ قُتِلَ دُوْنَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيْدٌ وَمَنْ قُتِلَ دُوْنَ أَهْلِهِ أَوْ دُوْنَ دَمِهِ أَوْ دُوْنَ دِيْنِهِ فَهُوَ شَهِيْدٌ ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল সে শহীদ। যে ব্যক্তি তার পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল সে শহীদ। যে ব্যক্তি তার জীবন রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল সে শহীদ। যে ব্যক্তি তার দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেল সে শহীদ’ (আবূ দাঊদ, হা/ ৪৭৭২)। অন্য হাদীসে এসেছে, উবাইদ ইবনু উমাইর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, أَنَّ رَجُلًا أَضَافَ نَاسًا مِنْ هُذَيْلٍ فَأَرَادَ امْرَأَةً عَلَى نَفْسِهَا فَرَمَتْهُ بِحَجَرٍ فَقَتَلَتْهُ فَقَالَ عُمَرُ وَاَللهِ لَا يُودَى أَبَدًا ‘হুযাইল গোত্রের এক ব্যক্তি কিছু লোককে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করল। সে ব্যক্তি মেহমানদের মধ্য থেকে এক মহিলাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল। তখন সে মহিলা তাকে পাথর ছুড়ে মেরে লোকটিকে হত্যা করল। সে মহিলার ব্যাপারে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! কখনই পরিশোধ গ্রহণ করা হবে না (মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক হা/১৭৯১৯)।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] তাঁর মুগনী গ্রন্থে এসেছে-( وقال أحمد في امرأة أرادها رجل على نفسها فقتلته لتحصن نفسها ، قال أحمد : إذا علمت أنه لا يريد إلا نفسها فقتلته لتحصن نفسها فلا شئ عليها . وذكر أحمد حديثا يرويه الزهري عن القاسم بن محمد ، عن عبيد بن عمير أن رجلا أضاف ناسا من هذيل ، فأراد امرأة عن نفسها فرمته بحجر فقتلته . فقال عمر : و الله لا يودى أبدا – أي لا تدفع عنه دية – ؛ ولأنه إذا جاز الدفع عن ماله الذي يجوز بذله وإباحته ، فدفع المرأة عن نفسها وصيانتها عن الفاحشة وحفظ عرضها من الزنا الذي لا يباح بحال ولا يجوز به البذل أولى من دفع الرجل عن ماله . وإذا ثبت هذا فإنه يجب عليها أن تدفع عن نفسها إن أمكنها ذلك ؛ لأن التمكين منها محرم وفي ترك الدّفع تمكين )”যে নারীকে কোন পুরুষ ভোগ করতে উদ্যত হয়েছে ইমাম আহমাদ এমন নারীর ব্যাপারে বলেন: আত্মরক্ষা করতে গিয়ে সে নারীযদি তাকে মেরে ফেলে… ইমাম আহমাদ বলেন: যদি সে নারী জানতে পারেন যে, এ ব্যক্তি তাকে উপভোগ করতে চাচ্ছে এবং আত্মরক্ষার্থে তিনি তাকে মেরে ফেলেন তাহলে সে নারীর উপর কোন দায় আসবে না। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ একটি হাদিস উল্লেখ করেন যে হাদিসটি যুহরি বর্ণনা করেছেন কাসেম বিন মুহাম্মদ থেকে তিনি উবাইদ বিন উমাইর থেকে। তাতে রয়েছে- এক ব্যক্তি হুযাইল গোত্রের কিছু লোককে মেহমান হিসেবে গ্রহণ করল। সে ব্যক্তি মেহমানদের মধ্য থেকে এক মহিলাকে ধর্ষণ করার চেষ্টাকরেছিল। তখন সে মহিলা তাকে পাথর ছুড়ে মারেন। যার ফলে লোকটি মারা যায়। সে মহিলার ব্যাপারে উমর (রাঃ) বলেন: আল্লাহর শপথ, কখনই পরিশোধ করা হবে না অর্থাৎ কখনোই এই নারীর পক্ষ থেকে দিয়ত (রক্তমূল্য) পরিশোধ করা হবে না। কারণ যদি সম্পদ রক্ষার্থে লড়াই করা জায়েয হয় যে সম্পদ খরচ করা, ব্যবহার করা জায়েয তাহলে কোন নারীর তার আত্মরক্ষার্থে, খারাপ কাজ থেকে নিজেকে হেফাযত করতে গিয়ে, যেনা থেকে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে- যে গুনাহ কোন অবস্থায় বৈধ নয়- লড়াই করা সম্পদ রক্ষার লড়াই এর চেয়ে অধিক যুক্তিপূর্ণ। এইটুকু যখন সাব্যস্ত হল সুতরাং সে নারীর যদি আত্মরক্ষা করার সামর্থ্য থাকে তাহলে সেটা করা তার উপর ওয়াজিব। কেননা দুর্বৃত্তকে সুযোগ দেয়া হারাম। এক্ষেত্রে আত্মরক্ষা না করাটাই তো সুযোগ দেয়া।”(আল-মুগনি; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৩১) আল্লাহ ভাল জানেন। (আল-মুফাসসাল ফি আহকামিল মারআ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪২-৪৩)
.
আর যদি কোন অসহায় নারী নিহত হওয়ার আশংকায় ধর্ষণের শিকার হয় তাহলে তার উপর কোন অপরাধ বা শাস্তি বর্তাবে না। তবে ধৈর্যধারণ করে মৃত্যুকে বরণ করে নিলে সেটা তার জন্য উত্তম হবে। কিন্তু মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া তার উপর ফরজ নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَمَنِ اضۡطُرَّ غَیۡرَ بَاغٍ وَّ لَا عَادٍ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ‘অবশ্য যে লোক অনন্যোপায় হয়ে পড়ে এবং নাফরমানী ও সীমালঙ্ঘনকারী না হয়, তার জন্য কোন পাপ নেই’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৭৩) সুনানে বাইহাকীতে এসেছে- আবু আব্দুর রহমান আল-সুলামি হতে বর্ণিত তিনি বলেন: উমর (রাঃ) এর নিকট এক মহিলাকে ধরে আনাহল। সে মহিলা তীব্র পিপাসায় কাতর ছিল এবংএক রাখালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মহিলাটি রাখালের কাছে পানি চাইল। রাখাল তাকে পানি দিতে অস্বীকৃতি জানাল- যদি না মহিলারাখালকে জৈবিক চাহিদাপূরণ করার সুযোগ না দেয়। উমর (রাঃ) এ মহিলাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করলেন। তখন আলী (রাঃ) বললেন: এ মহিলা অনন্যোপায় ছিল। আমার অভিমত হল- তাকে খালাস দিন। তখন উমর (রাঃ) মহিলাটিকে খালাস দিলেন। আমি বলব: এই বিধানএখনো চলমানআছে। যদি কোন নারী কোন পুরুষের কাছে থাকা খাবার বা পানীয়ের তীব্র প্রয়োজনের সম্মুখীন হয় এবং সে পুরুষ যেনা করা ছাড়া সেটা দিতে রাজি না হয়,আর সে নারীস্বীয়জীবন নাশের আশংকা করে নিজেকে সে পুরুষের হাতে তুলে দেয় সেক্ষেত্রে সে নারীর উপর শরয়ি হদ্দ (যেনার দণ্ড) কায়েম করা হবে না। কেউ যদি বলেন: এমতাবস্থায় নিজেকে তুলে দেয়া কি জায়েয; নাকি মৃত্যু হলেওধৈর্য রাখা ওয়াজিব? উত্তর হচ্ছে: এই নারীর ক্ষেত্রে শরয়ি হুকুম হচ্ছে- জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার নারীর হুকুম। যে নারীকে এই বলেহুমকি দেয়া হয়:‘সুযোগ দিলে দে; না হয় তোকে মেরে ফেলব’। ধর্ষণের শিকার নারীর উপর হদ্দ কায়েম করা হবে না। মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য সে নারী নিজের ইজ্জত বিসর্জন দিতে পারে। তবে যদি কোন নারীধৈর্যধারণ করে মৃত্যুকেবরণ করে নেয় তবে সেটা তার জন্য উত্তম। কিন্তু এক্ষেত্রে ধৈর্য ধরা তার উপর ফরজ নয়। আল্লাহই ভাল জানেন।”(ইবনু কাইয়্যেম; “আত-তুরুকুলহুকমিয়্যা” অনুচ্ছেদ: ১৮; গৃহীত; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪০১৭)
.
▪️তৃতীয়ত: ধর্ষনের মত জঘন্য অপরাধ থেকে সমাজকে রক্ষার উপায়সমূহ কি?
.
আমাদের যুবসমাজ ও পুরো সমাজকে এই ধ্বংসাত্মক অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। এতে বিভিন্ন সংস্থা, সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিত্ব এবং নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এটি কেবল সমষ্টিগত দায়িত্ব নয়, ব্যক্তিগত দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও পবিত্রতা তখনই নিশ্চিত করা সম্ভব, যখন ব্যভিচার ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সকল কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই কার্যকর প্রতিরোধমূলক উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—
.
(১).সাধারণভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা:মানুষকে জানানো যে ব্যভিচার কত বড় পাপ, এটি এমন একটি মহাপাপ যার কদর্যতা ও নিষিদ্ধতা সম্পর্কে বুদ্ধি ও শরীয়ত উভয়ই একমত। এটি জাতির ধ্বংস, বিপর্যয় ও দুর্যোগের কারণ। আর পরকালে এর প্রতিদান হলো জাহান্নাম।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,ليس بعد قتل النفس أعظم من الزنا”আত্মহত্যা বা কাউকে হত্যা করার পর ব্যভিচারের চেয়ে বড় কোনো গুনাহ নেই।”(গিদাউল আলবাব; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৩৫) তাছাড়া মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:وَلاَ تَقْرَبُواْ الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاء سَبِيلاً “আর যিনার ধারে-কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।”(সূরা বনি ইসরাইল: ৩২)
উক্ত আয়াতের তাফসিরে সৌদি আরবের প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.] বলেছেন:ووصف الله الزنى وقبحه بأنه ( كَانَ فَاحِشَةً ) أي إثم يستفحش في الشرع والعقل والفِطَر ؛ لتضمنه التجري على الحرمة في حق الله وحق المرأة وحق أهلها أو زوجها وإفساد الفراش واختلاط الأنساب وغير ذلك من المفاسد . وقوله: ( وَسَاءَ سَبِيلا ) أي : بئس السبيل سبيل من تجرأ على هذا الذنب العظيم “আল্লাহ তাআলা ব্যভিচারকে (যাকে তিনি বলেছেন কানা ফাহিশাহ) কুখ্যাত অশ্লীল কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ এটি এমন এক অপরাধ যা শরীয়ত, বুদ্ধি ও প্রকৃতি তিনটি দিক থেকেই অত্যন্ত ঘৃণ্য। কারণ এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে:আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করা, নারীর অধিকার লঙ্ঘন করা ও তার পরিবার বা স্বামীর প্রতি অন্যায় করা,শয্যা ও গৃহের পবিত্রতা নষ্ট করা, বংশের মিলমিশ ও পরিচয়ের গোলযোগ সৃষ্টি করা, এবং আরও বহু ধরনের অনর্থ সৃষ্টি হয়।এছাড়াও আল্লাহ তাআলা বলেন: «وَسَاءَ سَبِيلا», অর্থাৎ এটি একটি অত্যন্ত কুখ্যাত ও বিপজ্জনক পথ। যে ব্যক্তি এই মহাপাপের দিকে এগিয়ে যায়, সে নিজের জন্য এমন একটি পথ বেছে নিয়েছে যা অসন্তোষ ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।”(তাফসিরু সা’দী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৫৭)
.
(২).যুবসমাজকে সতর্ক করা:যুবকদের জানাতে হবে ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়লে সমাজে যে ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসে যেমন:মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগের বিস্তার,অবৈধ সন্তানের জন্ম,পারিবারিক কাঠামোর ধ্বংস, সন্তানদের অনিয়মিত বা ভবঘুরে হয়ে যাওয়া, নৈতিক অবক্ষয়,বিবাহবিচ্ছেদের বৃদ্ধি,এবং অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। সমাজে যদি অশ্লীলতা ও উন্মুক্ত যৌনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তবে এটি পরিবার, সম্প্রদায় এবং সমগ্র সভ্যতার ভিত্তি নষ্ট করে,পরিণতিতে সমাজ ভেঙে পড়ে এবং সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়।তাই যুবসমাজকে সতর্ক করা জরুরি, যেন তারা সঠিক পথে চলতে পারে এবং সমাজ সুস্থ ও সুশৃঙ্খল থাকে।
.
(৩).বৈধ যৌন সম্পর্কের পথ সুগম করা: অর্থাৎ, বৈধ বিবাহের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপনকে উৎসাহিত করা। মানুষকে সচেতন করা যে বিয়ে করা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত, এবং যে ব্যক্তি বিয়ে করে সে নিজের দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে। পাশাপাশি,বৈবাহিক সম্পর্ক তার ও তার স্ত্রীকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর নিকট তা গ্রহণযোগ্য আমল ও পুরস্কারের কারণ হয়।
.
(৪).বিবাহে বাধা দূর করা:সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বিয়েতে প্রতিবন্ধকতা দূর করা।দারিদ্র্য যদি বিয়ের পথে অন্তরায় হয়, তাহলে দরিদ্র যুবকদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) আল্লাহর বাণী:وَ اَنۡكِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡكُمۡ وَ الصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِكُمۡ وَ اِمَآئِكُمۡ ؕ اِنۡ یَّكُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِهِمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ “আর তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন তাদের বিয়ে সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও। তারা অভাবগ্ৰস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন; আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ”। (সূরা নুর;৩২) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,زوجوا من لا زوج له منكم ، فإنه طريق التعفف”যার বিয়ে হয়নি,তাকে বিয়ে করাও এটি পবিত্রতা অর্জনের একটি মাধ্যম।”(তাফসিরে কুরতুবী; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ২৩৯)
.
আবু উবাইদুল কাসিম ইবনু সাল্লামের আল আমওয়াল গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে,খলিফা উমর ইবনু আব্দুল আজীজ (রাহিমাহুল্লাহ) ইরাকের গভর্নরকে লিখেছিলেন,أن انظر كل بكر وليس له مال فشاء أن تزوجه فزوجه وأصدق عنه “যে কোনো অবিবাহিত যুবক আছে, যার কোনো সম্পদ নেই, এবং সে যদি বিবাহ করতে চায়, তাহলে তুমি তাকে বিবাহ করিয়ে দাও এবং তার পক্ষ থেকে মোহরানা প্রদান করো।”(আল আমওয়াল; পৃষ্ঠা: ২৫১)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] তাঁর মুগনী গ্রন্থে বলেছেন:يلزم الرجل إعفاف ابنه إذا احتاج إلى النكاح ، وهذا ظاهر مذهب الشافعي”যখন পুত্র বিবাহের প্রয়োজন অনুভব করে, তখন পিতার জন্য তার বিবাহের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। এটাই ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাবের স্পষ্ট মতামত।”(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খন্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৫৮৭)
.
(৫).সমাজ ও অভিভাবকদের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ন্যূনতম দায়িত্ব হলো, মোহরানায় অতিরিক্ততা পরিহার করা, বিবাহের খরচ নিয়ে গর্ব বা অহঙ্কার না করা, এবং বিয়ের মাধ্যমে আর্থিক লাভের চেষ্টা না করা। আবুল আজফা আস্-সুলামী (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার মিম্বারে খুতবা দিয়ে বলেছিলেন,أَلَا لَا تُغَالُوا بِصُدُقِ النِّسَاءِ، فَإِنَّهَا لَوْ كَانَتْ مَكْرُمَةً فِي الدُّنْيَا، أَوْ تَقْوَى عِنْدَ اللَّهِ لَكَانَ أَوْلَاكُمْ بِهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا أَصْدَقَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ امْرَأَةً مِنْ نِسَائِهِ، وَلَا أُصْدِقَتْ امْرَأَةٌ مِنْ بَنَاتِهِ أَكْثَرَ مِنْ ثِنْتَيْ عَشْرَةَ أُوقِيَّةً”সতর্ক হও! তোমরা নারীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কারণ মোহরানা যদি দুনিয়ার মর্যাদার বস্তু হতো এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার নিদর্শন হতো,তবে তোমাদের চেয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতেন এর যোগ্যতম ব্যক্তি। অথচ তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারো মোহর এবং তাঁর কন্যাদের কারো মোহর বারো ঊকিয়ার (প্রায় ৪৮০ দিরহাম) অধিক ধার্য করেননি।”(আবু দাউদ হা/২১০৬; সনদ হাসান) আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, কন্যাদের মোহরানা আত্মসাৎ করা বা তা থেকে লাভের চেষ্টা করা সমাজে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার বিস্তারের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.
(৬).পাপ ও অশ্লীলতা থেকে সমাজকে রক্ষা করার অন্যতম শক্তিশালী উপায় হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিক ভালোবাসা ও স্নেহের পরিবেশ গড়ে তোলা। প্রেম, সম্মান, সততা, বিশ্বস্ততা এবং পরস্পরের অধিকার ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে পারিবারিক সুখ নিশ্চিত করা গেলে, পরিবারে বোঝাপড়া ও আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়। একটি সুখী ও পরিপূর্ণ দম্পতি সমাজে বিভ্রান্তিকর সুখের সন্ধানে অশ্লীলতার পথে চলা ও পতনের ঝুঁকি কমিয়ে দেয় এবং সমাজের জন্য এক প্রকার নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে কাজ করে। মাবাহিসুল ফালসাফাহ নামক গ্রন্থে ইতিহাসের এক পর্যায়ে পাশ্চাত্য সমাজে অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়ার কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এর একটি কারণ ছিল এই যে, কিছু পিতা, যারা তাঁদের কন্যাদের প্রতি অত্যধিক স্নেহশীল ছিলেন, তাঁরা তাঁদের সতীত্বের বিনিময়ে অতিরিক্ত মোহর দাবি করতেন যখন বিবাহকে প্রকাশ্যে এক প্রকার ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয় হিসেবে দেখা হতো। সমাজকে ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, মমতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করা, ভালোবাসা, সম্মান, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, এবং পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে পারিবারিক সুখ বজায় রাখা। কারণ, সুখী পরিবার এবং পরস্পরকে বুঝে চলা স্বামী-স্ত্রী সমাজকে বিপথগামিতা ও কল্পিত সুখের আশায় ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
.
(৭).সবশেষে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সান্নিধ্যে এমন এক রক্ষণশীল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পরিবেশ গঠন করা, যেখানে ইচ্ছাকৃত উন্মুক্ততা ও শরীর প্রদর্শনের প্রকাশ্য রূপ বিলুপ্ত হয়ে যায়, সতর্কতার সাথে শরীর আবৃত থাকে,এবং মদ্যপান ও বাদ্যযন্ত্র—যা ব্যভিচারের আহ্বান সৃষ্টি করে তা নিষিদ্ধ থাকবে। কারণ এই সমস্ত বিষয়ই অশ্লীলতার আগুনের জ্বালানি। তাই যখন সমাজ এই সমস্ত থেকে মুক্ত হবে, তখন সে সেই আগুন থেকে যুবক-যুবতী নিরাপদ থাকবে।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।

অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব। 

পবিত্র কুরআনসহ শরীয়তের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে হাসি-ঠাট্টার বিধান

 প্রশ্ন: পবিত্র কুরআনসহ শরীয়তের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে হাসি-ঠাট্টার বিধান কী? এ সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তে বর্ণিত সকল হুকুম-আহকাম নিয়ে বিস্তারিত।

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর পবিত্র কুরআনের অন্যতম মাহাত্ম্য হল যে, কুরআন আল্লাহ তা‘আলার কালাম। আল্লাহ তা‘আলা তা বলেছেন, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তা শুনেছেন এবং আল্লাহর নির্দেশে জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তা নিয়ে শেষনবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট অবতীর্ণ হয়েছেন। শেষনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর নিকট থেকে শুনেছেন এবং স্মৃতিস্থ করেছেন। এই কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া সম্পৃক্ত ব্যক্তির জন্য সম্মান ও মর্যাদাকর; সেটা লিখনগত, লিপিগত, উচ্চারণগত, মুখস্তগত, তেলাওয়াতগত, জ্ঞানগত বা আমলগত যেই ধরণের সম্পৃক্ততা হোক না কেন। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র কিতাবের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক তৈরী করা ও তাতে নিয়োজিত হওয়া সম্পর্ককারী ব্যক্তির জন্য সম্মানজনক এবং সম্পর্কের অনুপাতে উভয় জাহানে তার জন্য মর্যাদাবৃদ্ধিকর। আল্লাহ্‌ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে রেখেছেন। কুরআন মক্কাতে নাযিল হওয়া সম্মানিত শহর মক্কার জন্য সম্মানের, রমযানে কুরআন নাযিল হওয়া রমযানের জন্য সম্মানের, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে কুরআন নাযিল হওয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য সম্মানের, যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাঁকে সম্মানিত করেছেন এবং আসমান থেকে, রাব্বুল আলামীনের কাছ থেকে কুরআন বহন করা বহনকারী ফেরেশতা জিব্রাইল আলাইহিস সালামের জন্য সম্মানের—যেহেতু কুরআনুল কারীম সমগ্র সৃষ্টি জগতের রব, মহান আল্লাহ্‌র বাণী এবং সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানিত কালাম — সুতরাং এ বাণীর সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, উপহাস করা, অপবিত্র স্থানে নিক্ষেপ করা কিংবা এর কোনো পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলে অপমান করা নিঃসন্দেহে এক মহা গুনাহ, বরং তা প্রকাশ্য বড় কুফরি ও ঈমান নষ্টকারী কাজ।সুতরাং যে ব্যক্তি এ ধরনের জঘন্য কর্মে লিপ্ত হবে, সে কঠোর শাস্তির যোগ্য এবং আল্লাহ্‌র ক্রোধের অধিকারী হবে। কারণ,আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো— কুফরির মাধ্যমে রসিকতা করাও কুফরি।নিশ্চয়ই কুরআনুল কারীম নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ কেবল সেইসব নির্বোধ, সীমালঙ্ঘনকারী ও আল্লাহভীতিহীন ব্যক্তিরাই করে থাকে—যারা দাবী করে যে, আমরা কৌতুক ও বিনোদন করছিলাম; ঠিক ঐ সমস্ত লোকদের মত যাদের সম্পর্কে নিন্মত্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিল।
.
মহান আল্লাহ বলেন,یَحۡذَرُ الۡمُنٰفِقُوۡنَ اَنۡ تُنَزَّلَ عَلَیۡهِمۡ سُوۡرَۃٌ تُنَبِّئُهُمۡ بِمَا فِیۡ قُلُوۡبِهِمۡ ؕ قُلِ اسۡتَهۡزِءُوۡا ۚ اِنَّ اللّٰهَ مُخۡرِجٌ مَّا تَحۡذَرُوۡنَ وَ لَئِنۡ سَاَلۡتَهُمۡ لَیَقُوۡلُنَّ اِنَّمَا کُنَّا نَخُوۡضُ وَ نَلۡعَبُ ؕ قُلۡ اَ بِاللّٰهِ وَ اٰیٰتِهٖ وَ رَسُوۡلِهٖ کُنۡتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُوۡنَ, وَ لَئِنۡ سَاَلۡتَهُمۡ لَیَقُوۡلُنَّ اِنَّمَا کُنَّا نَخُوۡضُ وَ نَلۡعَبُ ؕ قُلۡ اَ بِاللّٰهِ وَ اٰیٰتِهٖ وَ رَسُوۡلِهٖ کُنۡتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُوۡنَ “মুনাফেকরা ভয় করে তাদের সম্পর্কে এমন এক সূরা না জানি নাযিল হয়, যা ওদের অন্তরের কথা ব্যক্ত করে দেবে! বলুন, ‘তোমরা বিদ্রূপ করতে থাক; তোমরা যে ভয় করছ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তা বের করে দেবেন। আর আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম।’ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্‌, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে? ওজর পেশ করো না। ঈমান আনার পর তোমরা কুফরী করেছ। আমরা তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেব। কারণ তারা অপরাধী।”[সূরা তাওবা: ৬৪-৬৬]
.
উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ)
তাঁর তাফসির গ্রন্থে সাদ থেকে, তিনি যায়েদ বিন আসলাম থেকে বর্ণনা করেন যে:أن رجلاً مِن المنافقين قال لعوف بن مالك في غزوة تَبوك: ما لقُرَّائنا هؤلاء؛ أرغبنا بطونًا وأكذبنا ألسنةً، وأجبننا عند اللقاء؟! فقال له عوف: كذبتَ، ولكنك منافقٌ، لأُخْبِرَنَّ رسول الله صلى الله عليه وسلم، فذهب عوفٌ إلى رسول الله ليُخبره، فوجد القرآن قد سبَقه، قال زيد: قال عبدالله بن عمر: فنظرتُ إليه مُتعلقًا بحَقَب ناقة رسول الله صلى الله عليه وسلم تنكبُهُ الحجارة، يقول: ( إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ) [التوبة: 65]، فيقول له النبيُّ صلى الله عليه وسلم: ( أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ) [التوبة: 65].”তাবুক যুদ্ধের সময় মুনাফিকদের এক লোক আউফ বিন মালেক (রাঃ) কে বলেন: আমাদের এ সব ক্বারীদের একি অবস্থা তারা পেটের ব্যাপারে আমাদের সকলের চেয়ে বেশি আগ্রহী, আমাদের মধ্যে বেশি মিথ্যাবাদী এবং যুদ্ধের ময়দানে তারা বেশি ভীরু? তখন আউফ তাকে বললেন: তুমি মিথ্যা বলেছ; বরং তুমি মুনাফিক। অবশ্যই আমি তোমার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানাব। তখনি আউফ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানোর জন্য চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন যে, তার আগেই কুরআন নাযিল হয়ে গেছে। যায়েদ বলেন: আব্দুল্লাহ্‌ বিন উমর (রাঃ) বলেন: আমি দেখলাম সে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উটের রশির সাথে লটকানো অবস্থায় পাথরের আঘাত খাচ্ছে আর বলছে: ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম।’ আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বলছিলেন: “তোমরা কি আল্লাহ্‌, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে?”।(তাফসিরে তাবারি; খন্ড: ১৪ পৃষ্ঠা: ৩৩৩)
.
ইমাম আবু বকর ইবনুল আরাবী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসির গ্রন্থে বলেন: “لا يخلو أن يكون ما قالوه من ذلك جدا أو هزلا، وهو كيفما كان : كفر؛ فإن الهزل بالكفر : كفر، لا خُلْف فيه بين الأمة، فإن التحقيق أخو الحق والعلم، والهزل أخو الباطل والجهل “তারা যা বলেছিল তা হয়তো মন থেকে বলেছিল কিংবা ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিল। যেভাবেই বলুক না কেন: এটা কুফরি। কেননা কুফরি দিয়ে ঠাট্টা করাও কুফরি– এ নিয়ে উম্মতের মাঝে কোন মতভেদ নেই। আর বাস্তব তথ্য হচ্ছে হক্ক ও জ্ঞানের ভাই। আর ঠাট্টা-মশকরা হচ্ছে- বাতিল ও অজ্ঞতার ভাই।(দেখুন আবু বকর ইবনুল আরাবীর তাফসির গ্রন্থে খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৪৩)
.
ইসহাক বিন রাহুইয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وَقَدْ أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ أَنَّ مَنْ سَبَّ الله عز وجل أَوْ سَبْ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَوْ دَفَعَ شَيْئًا أَنْزَلَهُ اللهُ أَوْ قَتَلَ نَبِيًّا مِنْ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ وَهُوَ مَعَ ذَلِكَ مُقِرٌّ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ أَنَّهُ كَافِرُ”উলামাগণ একমত পোষণ করেছেন, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহকে কিংবা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়, অথবা আল্লাহর নাজিলকৃত কোনো বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করে, কিংবা আল্লাহর কোনো একজন নবিকে হত্যা করে, তাহলে সে আল্লাহর নাজিলকৃত বিষয়কে স্বীকার করে নিলেও একজন কাফির।”(ইবনু আব্দিল বার, আত-তামহিদ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২২৬; মুহাম্মাদ বিন নাসর আল-মারওয়াজি, তাজিমু কদরিস সালাত; খণ্ড: ২: পৃষ্ঠা: ৯২৯)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:وأجمعت الأمة على وجوب تعظيم القرآن على الإطلاق وتنزيهه وصيانته، وأجمعوا على أن من استخف بالقرآن، أو بشيء منه، أو بالمصحف، أو ألقاه في قاذورة، أو كذَّب بشيء مما جاء به من حكم أو خبر، أو نفى ما أثبته، أو أثبت ما نفاه، أو شك في شيء من ذلك، وهو عالم به: كفر “উম্মতের মধ্যে এ বিষয়ে সর্বসম্মত ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, কুরআনকে সর্বপ্রকারে সম্মান করা, তার মর্যাদা রক্ষা করা এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে রাখা ফরজ। তাঁরা এ ব্যাপারেও একমত হয়েছেন যে—যে ব্যক্তি কুরআনকে, কুরআনের কোনো অংশকে, কিংবা মুসহাফকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, অথবা তাকে অপবিত্র স্থানে নিক্ষেপ করে, কিংবা কুরআনের কোনো বিধান বা তথ্যকে অস্বীকার করে, অথবা কুরআন যা সত্য বলে প্রমাণ করেছে তা অস্বীকার করে, কিংবা যা অস্বীকার করেছে তা সত্য বলে প্রমাণ করে, অথবা এসব বিষয়ের কোনো একটিতে (সচেতনভাবে) জেনে শুনে সন্দেহ পোষণ করে— সে নিঃসন্দেহে কাফির।”(নববী আল-মাজমূ; খণ্ড:  ২: পৃষ্ঠা: ১৭০)
.
খতীব শারবিনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “الفعل المكفر ما تعمده استهزاء صريحاً بالدين، أو جحوداً له: كإلقاء مصحف بقاذورة، وسجود لصنم”যে কাজ ধর্মকে উপহাস করার উদ্দেশ্যে করা হয়, বা তাকে অস্বীকার করার মানে রাখে যেমন মুসহাফকে অপবিত্র স্থানে ফেলা, অথবা মূর্তির সামনে সেজদা করা এসবই কুফরি।”(মুগনীল মুহতাজ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা; ১৭৬)
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:وقد اتفق المسلمون على أن من استخف بالمصحف، مثل أن يلقيه في الحش أو يركضه برجله إهانة له: أنه كافر”মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে যে,যে ব্যক্তি মুসহাফকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে,যেমন তা পায়খানায় নিক্ষেপ করা বা পায়ে মাড়ানো ইত্যাদি অপমানসূচক কাজ করে,সে কাফির।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪২৫)
ইমাম ইবনে হাজম আল-যাহেরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন:صَحَّ بِالنَّصِّ أَن كل من اسْتَهْزَأَ بِاللَّه تَعَالَى ، أَو بِملك من الْمَلَائِكَة ، أَو بِنَبِي من الْأَنْبِيَاء عَلَيْهِم السَّلَام ، أَو بِآيَة من الْقُرْآن ، أَو بفريضة من فَرَائض الدّين بعد بُلُوغ الْحجَّة إِلَيْهِ ، فَهُوَ كَافِر”প্রত্যক্ষ দলিলের ভিত্তিতে বিশুদ্ধভাবে সাব্যস্ত: যে ব্যক্তির নিকট দলিল পৌঁছার পরও সে ব্যক্তি যদি মহান আল্লাহকে কিংবা কোন ফেরেশতাকে কিংবা কোন নবীকে কিংবা কুরআনের কোন আয়াতকে কিংবা ইসলামের কোন একটি ফরজ বিধানকে বিদ্রূপ করে সে ব্যক্তি কাফের।[আল-ফাসল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৪২)
শাইখ সুলাইমান আলে-শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:من استهزأ بالله ، أو بكتابه ، أو برسوله ، أو بدينه : كفر ، ولو لم يقصد حقيقة الاستهزاء ، إجماعاً”যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে, কিংবা আল্লাহর কিতাবের সাথে কিংবা তাঁর রাসূলের সাথে, কিংবা তাঁর ধর্মের সাথে বিদ্রূপ করে: সকল আলেমের ইজমার ভিত্তিতে সে কাফের। যদিও সে এর দ্বারা প্রকৃতপক্ষে বিদ্রূপ করা উদ্দেশ্য না করে থাকুক।[তাইসীরুল আযিযিল হামিদ, পৃষ্ঠা: ৬১৭]
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] ‘আল-মাজমুউস সামীন’ বইয়ে বলেন: فجانب الربوبية والرسالة والوحي والدين جانب محترم لا يجوز لأحد أن يبعث فيه لا باستهزاء بإضحاك ، ولا بسخرية ، فإن فعل فإنه كافر ، لأنه يدل على استهانته بالله عز وجل ورسله وكتبه وشرعه ، وعلى من فعل هذا أن يتوب إلى الله عز وجل مما صنع ، لأن هذا من النفاق ، فعليه أن يتوب إلى الله ويستغفر ويصلح عمله ويجعل في قلبه خشية من الله عز وجل وتعظيمه وخوفه ومحبته ، والله ولي التوفيق .”‘আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, রিসালাত,ওহী এবং দ্বীন সম্মানিত বিষয়। কারো জন্য এগুলো নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা জায়েয নেই। কেউ এমনটি করলে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ ঠাট্টা-মশকরা করা প্রমাণ করে যে, সে আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কিতাবাদি এবং শরীয়তকে হেয় করে, তাচ্ছিল্য করে। যে ব্যক্তি এমনটি করবে তাকে তার কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। কারণ এটি নিফাক। তাকে আল্লাহর কাছে তাওবা করে ক্ষমা চাইতে হবে, আমল ঠিক করতে হবে এবং হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি শঙ্কা, সম্মান, ভয় ও ভালোবাসা পয়দা করতে হবে। আল্লাহই তৌফিকদাতা।”।(ইবনু উসাইমীন ‘আল-মাজমুউস সামীন; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৩)
.
প্রকৃতপক্ষে নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দেওয়া অনেকেই এমন সব কথা বলেন, কাজ করেন, কিংবা এমন বিশ্বাস পোষণ করেন—যা সাধারণ মানুষের চোখে হয়তো নিছক রসিকতা, হালকা মন্তব্য বা তুচ্ছ কাজ মনে হয়; কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সেগুলো ইমান নষ্টকারী ভয়াবহ অপরাধ।অনেকেই অজান্তে ঈমান হারিয়ে ফেলেন—তারপরও নামাজ পড়েন, দান-সদকা করেন, হজ ও ওমরায় অংশ নেন; অথচ তারা জানেনই না যে, কুফরির গহ্বরে পড়ে তাঁদের মুসলমানিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গেছে।অঢেল সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করলেও, প্রতি বছর হজ ও ওমরা করলেও—তাদের কোনো সওয়াব হবে না; কারণ ইমান নষ্ট হয়ে গেলে সব আমলই বৃথা হয়ে যায়।ইমান ভঙ্গের কারণগুলো আসলে একেকটি মারাত্মক ফাঁদ। অনেকেই জানেন না, কোন ফাঁদটি তাঁর পায়ের নিচে লুকিয়ে আছে!এই কারণেই যুগে যুগে আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ ইমান ভঙ্গের কারণসমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষকে সতর্ক ও সাবধান করেছেন। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার,মহান আল্লাহ,তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে কিংবা দ্বীনের মৌলিক কোনো বিধি বিধানকে নিয়ে ঠাট্টা করা এমন কুফরী যার মাধ্যমে ব্যক্তি ঈমান আনার পরে কাফের হয়ে যায়।অনুরূপভাবে কিছু সুন্নতকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করাও কুফরি। যেমন দাড়ি রাখা, হিজাব পরা বা টাকনুর উপরে জামা পরা ইত্যাদি সুন্নাহ গুলো নিয়ে হাসি ঠাট্টা করাও ঈমান ভঙ্গের কারণ।শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الاستهزاء بالله وآياته ورسوله كفر يكفر به صاحبه بعد إيمانه “আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করা এমন কুফরী যার মাধ্যমে ব্যক্তি ঈমান আনার পরে কাফের হয়ে যায়।”(ইবনু তাইমিয়া আল-ঈমান; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৮৪)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

হাত পায়ের নখ কাটা কিংবা চুল ফেলার পর সেগুলো দাফন করা কি আবশ্যক

 প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর হাত পায়ের নখ কাটা প্রকৃতিগত একটি সুন্নাত।পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে নারী-পুরুষের নখ বড় করে রাখা শরিয়তসম্মত নয়। কেননা মানুষ আল্লাহর প্রদত্ত মর্যাদাসম্পন্ন এক সভ্য সৃষ্টিজীব — কোনো মুসলিমের পক্ষে অসভ্য ও পশুসদৃশ আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।অতএব, নারী-পুরুষ উভয়েরই উচিত এ বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, চল্লিশ দিনের বেশি সময় ধরে হাত-পায়ের নখ, গোঁফ, নাভির নিচের লোম ও বগলের লোম অপসারণে বিলম্ব করা বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,”মানুষের স্বভাবগত আমল হলো: ৫টি। যথা- (১).নাভীর নিচের লোম সাফ করা (২).খাৎনা করা (৩). গোফ ছেঁটে ফেলা (৪).বগলের লোম সাফ করা (৫).নখ কাটা।”(সহীহ বুখারী হা/১২৫৭,৫৮৮৯, ৫৮৯০)। অপর বর্ননায় আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, মোচ কাটা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা ও নখ কাটার ব্যাপারে আমাদের চল্লিশ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। আমরা যেন তা বেশি সময় ছেড়ে না দেই।”(সহীহ মুসলিম হা/২৫৮,তিরমিযী হা/২৭৫৮;আবু দাঊদ হা/ ৪২০০)

.
দ্বিতীয়ত: শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ব্যক্তি—নারী বা পুরুষ—হাত-পায়ের নখ বা শরীরের লোম কর্তন করার পর তা দাফন করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে যদি কেউ দাফন করে, তা উত্তম ও প্রশংসনীয় কাজ হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি দাফন না করে, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই, ইনশাআল্লাহ।কারণ প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)সহ কিছু সাহাবির কাছে থেকে কিছু আসার বর্নিত হয়েছে।তবে এ বিষয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে কোনো সহীহ হাদীস প্রমাণিত হয়নি। চুল ও নখ দাফনের প্রসঙ্গে যে বর্ণনাগুলো উল্লেখ পাওয়া যায়, সেগুলোর কোনোটি সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
.
ইমাম বাইহাক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থে বলেছেন—وقد روي حديث دفن الشعر والأظفار من أوجه، كلُّها ضعيفة“নখ ও চুল মাটিতে পুঁতে ফেলা সম্পর্কে একটি হাদিস একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু সবগুলো সূত্র দুর্বল।”(নাসবুর রায়াহ ফি তাখরিজি আহাদিসিল হিদায়াহ,খণ্ড: ১,পৃষ্ঠা: ১৮৯)
.
হাত-পায়ের নখ কাটার পর সেগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম। এই মর্মে ইমাম খাল্লাল তার আত তরাজ্জুল কিতাবে বর্ণনা করেছেন যে,আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমাম,শাইখুল ইসলাম আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানী (রাহিমাহুল্লাহ) মৃত্যু ২৪১ হি./৮৫৫ খ্রি.] বলেছেন,” يَدفن الشعر والأظفار ، وإن لم يفعل : لم نَرَ به بأساً “চুল ও নখ মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। তবে না পুঁতলেও আমরা তাকে কোন সমস্যা মনে করি না।”(খাল্লাল ‘আত-তারাজ্জুল’ পৃষ্ঠা: ১৯)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,يستحب دفن ما أخذ من هذه الشعور والاظفار ومواراته في الارض نقل ذلك عن ابن عمر رضي الله عنهما واتفق عليه اصحابنا” চুল ও নখ যা কাটা হয়,তা মাটিতে দাফন করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)। এই বিষয়টি ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এবং আমাদের সাথীরা (অর্থাৎ শাফি‘ঈ মাযহাবের ফকীহগণ) এই বিষয়ে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন।” (ইমাম নববী আল-মাজমু; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৮৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,وَيُسَنُّ دَفْنُ مَا يُزِيلُهُ مِنْ شَعْرٍ وَظُفْرٍ وَدَمٍ“শরীর থেকে অপসারিত চুল, নখ ও রক্ত—এসব দাফন করা সুন্নত।”(আল-শারহুল কাবীর; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১০৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “চুল ও নখ কাটার পর সেগুলো দাফন করার হুকুম কী?
.
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন:
ذَكر أهل العلم أن دفن الشعر والأظافر أحسن وأولى ، وقد أُثر ذلك عن بعض الصحابة رضي الله عنهم ، وأما كون بقائه في العراء ، أو إلقائه في مكان يوجب إثماً : فليس كذلك “
“আহলুল ইলমগণ উল্লেখ করেছেন যে, চুল ও নখ দাফন করা উত্তম এবং অধিকতর উপযুক্ত। এ বিষয়ে সাহাবা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর কাছ থেকে কিছু আসার (সাহাবিদের মতামত ও কর্ম) বর্নিত হয়েছে। পক্ষান্তরে এগুলো (চুল বা নখ) খোলা জায়গায় ফেলে রাখলে কিংবা কোন স্থানে ছুঁড়ে ফেললে গুনাহ হবে এমনটি নয়।”(ইবনু উসাইমীন মাজমুউ ফাতাওয়া: খণ্ড: ১১; প্রশ্নোত্তর নং ৬০ ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৭৭৪০)। (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)।
▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

অবৈধ বিবাহের মাধ্যমে কি আত্মীয়তার নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত হয়

 প্রশ্ন: অবৈধ বিবাহের মাধ্যমে কি আত্মীয়তার (“হুরমাতে মুসাহারাত” বা “মাহরাম সম্পর্কের) নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত হয়?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
▪️ প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর আমাদের জানা উচিত যে,বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে চারজনের সাথে বিবাহ হারাম হয়,তারা হলেন:
(১).পিতার স্ত্রী, আল্লাহ তাআলা বলেন:وَ لَا تَنۡكِحُوۡا مَا نَكَحَ اٰبَآؤُكُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ اِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَۃً وَّ مَقۡتًا ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا “নারীদের মধ্যে তোমাদের পিতৃ পুরুষ যাদেরকে বিয়ে করেছে, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করো না,তবে পূর্বে যা সংঘটিত হয়েছে (সেটা ক্ষমা করা হলো) নিশ্চয় তা ছিল অশ্লীল, মারাত্মক ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট পন্থা।”(সূরা নিসা: ২২) জাহেলিয়াত যুগে পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে পুত্ররা বিনাদ্বিধায় বিয়ে করে নিত।(দেখুন,সহীহ বুখারী হা/৪৫৭৯) এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা এই নির্লজ্জ কাজটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন এবং একে ‘আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলে অভিহিত করেছেন।ফলে আলেমগণ বলেন, পিতা কোন নারীকে বিয়ে করার সাথে সাথেই সন্তানদের জন্য সে নারী হারাম হয়ে যাবে। চাই তার সাথে পিতার সহবাস হোক বা না হোক। অনুরূপভাবে যে নারীকে পুত্র বিয়ে করেছে সেও পিতার জন্য হারাম হয়ে যাবে, তার সাথে পুত্রের সহবাস হোক বা না হোক।
.
(২). স্ত্রীর মা, যদি স্বামী স্ত্রীর সাথে বিবাহ চুক্তি সম্পন্ন করে, অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে বিবাহের চুক্তির সাথে সাথেই স্ত্রীর মা হারাম হয়ে যায়, সহবাসের প্রয়োজন নেই; আল্লাহ তাআলা বলেন:” وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْا”আর তোমাদের স্ত্রীদের মাতাগণ (শ্বাশুড়ী)…”(সূরা আন-নিসা: ২৩) এই আয়াতে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে স্ত্রীর মা অর্থাৎ, শাশুড়ীকে। (স্ত্রীর নানী-দাদীও এর অন্তর্ভুক্ত হবে) চিরতরে হারাম করা হয়েছে, সুতরাং যদি কোন মহিলাকে বিবাহ করার পরে পরেই সহবাস না করেই তালাক দিয়ে দেয়, তবুও তার মায়ের (শাশুড়ীর) সাথে বিবাহ হারাম হবে। তবে যদি কোন মহিলাকে বিয়ের পর সহবাস না করেই তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তার মেয়েকে বিবাহ করা জায়েয হবে।
.
(৩). স্ত্রীর মেয়ে, যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়; দলিল আল্লাহ তাআলার বাণী:وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ”এবং তোমাদের স্ত্রীদের ঐ সকল কন্যা, যারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে আছে, যাদের সাথে তোমরা সহবাস করেছ। যদি তোমরা তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে (তাদের কন্যাদেরকে বিবাহ করলে) তোমাদের কোনো পাপ নেই।” (সূরা আন-নিসা: ২৩) আয়াতে رَبِيْبة ‘রাবীবা’ (সৎ কন্যা) অর্থাৎ স্ত্রীর আগের স্বামীর মেয়ে। এটা শর্তের ভিত্তিতে হারাম হয়। যেমন, যদি সৎ কন্যার মায়ের সাথে সহবাস করে নেয় তবেই সে হারাম হবে, অন্যথা তার সাথে বিয়ে হালাল। فِي حُجُوْرِكُمْ (যারা তোমাদের অভিভাবকত্বে আছে) এটা অধিকাংশ অবস্থার দিকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, শর্ত হিসাবে বলা হয়নি। অতএব এই মেয়ে যদি কোন অন্য কারো অভিভাবকত্বে বা অন্য স্থানে লালিতা-পালিতা হয় বা অন্য জায়গায় বসবাস করে থাকে, তবুও তার সাথে বিবাহ হারাম।
.
(৪). একই সাথে দুই বোন, অথবা স্ত্রী এবং তার ফুফু, অথবা স্ত্রী এবং তার খালাকে বিবাহ করা হারাম: কেননা আল্লাহ তা‘আলা পুরুষদের জন্য মহিলাদের মধ্যে হারাম করা বিষয়গুলোর তালিকা দিতে গিয়ে বলেছেন,”আর দুই বোনকে একত্রে (বিবাহ বন্ধনে) জমা করাও (তোমাদের জন্য হারাম), তবে যা অতীত হয়ে গেছে, হয়ে গেছে।”(সূরা আন-নিসা: ২৩)। এবং আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন;لا تُنكَحُ المرأةُ على عَمَّتِها، ولا على خالتِها أخرجه”কোন নারীকে তার ফুফু অথবা তার খালার সাথে বিবাহ করা যাবে না।”(সহীহ বুখারী হা/৫১০৯, সহীহ মুসলিম হা/১৪০৮)। অন্যত্র তিনি বলেন,”ভাতিজীর সাথে তার ফুফুকে বিবাহ করা যাবে না। অনুরূপভাবে খালার সাথে ভাগ্নিকে বিবাহ করা যাবে না”।(সহীহ মুসলিম হা/১৪০৮ (৩৫)।নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বিধানের হেতু (কারণ) বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:فإنَّكُنَّ إذا فَعَلْتُنَّ ذلك قَطَّعْتُنَّ أَرْحَامَكُنَّ“যদি তোমরা এটি কর তাহলে আত্মীয়তার সম্পর্কগুলোকে ছিন্ন করবে”।(সহীহ ইবনু হিব্বান হা/৪১১৬) আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো এ কারণে ছিন্ন হবে যেহেতু সতীনদের মাঝে ঈর্ষা থাকে। তাই যদি সতীনদের একজন অন্যদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়া হয়; তাদের মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন ঘটবে। তবে যদি একজনকে তালাক্ব দিয়ে দেয়া হয় এবং তার ইদ্দত শেষ হয়ে যায় তখন তার বোন, ফুফু বা খালাকে বিয়ে করা জায়েয; সেই অনিষ্টটি অটুট না থাকার কারণে।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,”একই চুক্তিতে দুই বোনকে বিবাহ করা কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট দলীল দ্বারা হারাম। তা তারা সহোদরা হোক, অথবা শুধু পিতৃসূত্রে বা মাতৃসূত্রে বোন হোক, অথবা তারা রক্তের সম্পর্কের হোক কিংবা দুধের সম্পর্কের, তারা স্বাধীন নারী হোক বা দাসী হোক, কিংবা একজন স্বাধীন নারী ও অন্যজন দাসী হোক- সব ক্ষেত্রেই এটি হারাম। এ ব্যাপারে ছাহাবীগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম), তাবিঈগণ এবং সমগ্র সালাফ সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন।ইবনু মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) ও এ ব্যাপারে ইজমা বর্ণনা করেছেন”।(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৩৫)।
.
▪️ দ্বিতীয়ত: আলেমগণ সর্বসম্মত যে—বৈধ (সঠিক) বিবাহ, ত্রুটিপূর্ণ (ফাসিদ) বিবাহ এবং সন্দেহজনক সহবাস—এই তিন অবস্থার যেকোনোটির মাধ্যমেই হুরমাতে মুসাহারাত (আত্মীয়তার নিষেধাজ্ঞা) প্রতিষ্ঠিত হয়।তবে তারা মতভেদ করেছেন এমন ক্ষেত্রে, যখন সম্পর্কটি সম্পূর্ণ অবৈধ হয়—যেমন শরিয়ত স্বীকৃত নয় এমন বিবাহ বা প্রকাশ্য ব্যভিচার। অর্থাৎ, কেউ যদি কোনো নারীকে মুতআ (অস্থায়ী) বিবাহে গ্রহণ করে, অথবা তার সঙ্গে ব্যভিচার করে—তাহলে ঐ নারীর কন্যা তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যাবে কি না—এই বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান। এক্ষেত্রে আলেমগন দুটি ভাগে বিভক্ত।
.
(১).হানাফি ও হাম্বলি মাজহাবের আলেমগণ বলেন, যদি কেউ কোনো নারীর মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করে, তাহলে ঐ নারীর মেয়ে তার জন্য হারাম হয়ে যায়। কারণ, তাদের মতে অবৈধ সহবাসও (জিনা) মুসাহারার ক্ষেত্রে বৈধ সহবাসের মতোই প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, যেমন কেউ কোনো নারীর সঙ্গে বৈধভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সহবাস করলে ঐ নারীর কন্যা তার জন্য সর্বসম্মতভাবে হারাম হয়ে যায়, তেমনি অবৈধভাবে সহবাসের মাধ্যমেও একই নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। এর দলিল হলো আল্লাহ তাআলার বাণী:( وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ )
“আর তোমাদের সৎ কন্যারা যারা তোমাদের গৃহে লালিত হয়েছে, তোমাদের সেই স্ত্রীদের থেকে, যাদের সঙ্গে তোমরা সহবাস করেছ; কিন্তু যদি তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস না করে থাকো, তবে তাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই।”(সূরা আন-নিসা: ২৩)
.
(২).অপরদিকে মালিকি ও শাফেয়ি মাজহাবের আলেমদের মতে, ব্যভিচারের কারণে স্ত্রী হারাম হয়ে যায় না। অর্থাৎ, কেউ যদি কোনো নারীর মায়ের (শাশুড়ীর) সঙ্গে ব্যভিচার করে, তবে সেই নারীর (স্ত্রীর) সঙ্গে তার বিবাহ নিষিদ্ধ হবে না।তাদের বক্তব্য হলো—হারাম কাজ কোনো হালাল বিষয়কে হারাম করে না। আর দলিলের আলোকে এটাই বিশুদ্ধ মত।কারণ শরিয়ত সম্মতভাবে বৈধ পন্থায় বিবাহের মত হালাল এবং সুদৃঢ় সম্পর্ক তৃতীয় পক্ষের কারো অপরাধের কারণে নিমিষেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে না। তালাক ব্যতিরেকে কখনোই বিবাহ বিচ্ছেদ হয় না। ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই। তাছাড়া হাদিসে এসেছে,প্রখ্যাত সাহাবী,‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] বলেছেন:أنَّ وطءَ الحرامِ لا يُحرِّمُ”যিনা বৈবাহিক বন্ধনকে হারাম করে না”।(মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, বায়হাক্বী হা/১৩৯৯১; ইমাম আলবানী, ইরওয়া; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৮৭; হা/১৮৮১)। অন্য বর্ণনায় এসেছে,”এক লোক তার শাশুড়ীর সাথে যেনা করলে ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘তারা পাপী। কিন্তু এ পাপ তার স্ত্রীকে তার জন্য হারাম করে না”।(বায়হাক্বী, ইমাম আলবানী, ইরওয়া; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৮৮) প্রখ্যাত সাহাবী,আলী (রাঃ) বলেন, যেনা বৈধ বিবাহ বন্ধনকে হারাম করতে পারে না।”(ইমাম আলবানী;ইরওয়া ৬/২৮৮ পৃঃ,তা‘লীক্ব বুখারী) বিশিষ্ট তাফসিরকারক শাইখ মুহাম্মদ আল-আমীন আস-শানক্বিতী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
الخلاف في هذه المسألة مشهور معروف ، وأرجح القولين دليلا فيما يظهر أن الزنى لا يحرُم به حلال”এই বিষয়ে মতভেদ প্রসিদ্ধ ও পরিচিত। কিন্তু প্রমাণের দিক থেকে যে মতটি অধিক শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হয় তা হলো ব্যভিচার (জিনা) দ্বারা কোনো বৈধ সম্পর্ক হারাম হয়ে যায় না।”(আযওয়াউল বায়ান, খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৩৪১)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,”ولو وطئ أم امرأته أو بنتها حرمت عليه امرأته نص أحمد على هذا في رواية جماعةٍ ، وروي نحو ذلك عن عمران بن حصين ، وبه قال الحسن وعطاء وطاوس ومجاهد والشعبي والنخعي والثوري وإسحاق وأصحاب الرأي .وروى ابن عباس أن الوطء الحرام لا يحرِّم ، وبه قال سعيد بن المسيب ويحيى بن يعمر وعروة والزهري ومالك والشافعي وأبو ثور وابن المنذر”যদি কেউ নিজের স্ত্রীর মায়ের সঙ্গে অথবা স্ত্রীর মেয়ের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তার বর্তমান স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে।এ বিষয়ে ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়; যা একাধিক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে।একই মত বর্ণিত হয়েছে সাহাবি ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ)-এর থেকেও।এ মতের পক্ষাবলম্বন করেছেন—হাসান বাসরী,আতা, তাওস, মুজাহিদ,শা‘বী, নাখাঈ,ইমাম সাওরী, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ এবং আসহাবুর রা’য় (অর্থাৎ হানাফি ফকীহগণ)। অপরদিকে, ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর থেকে বর্ণিত আছে যে,“হারাম যৌন সম্পর্ক (ব্যভিচার) কোনো স্থায়ী হারামত্ব সৃষ্টি করে না।”এই মত গ্রহণ করেছেন— সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামার, উরওয়া ইবনু যুবাইর, যুহরী, ইমাম মালিক, ইমাম আশ-শাফেঈ, আবু সাওর এবং ইবনুল মুনযির (রহিমাহুমুল্লাহ)।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী, খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৯০)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
“لو زنى رجل بامرأة فهل يحرم عليها أصله وفرعه ، وهل يحرم عليه أصلها وفرعها ؟ الجواب :لا يحرم ، لأنه لا يدخل في الآية ، قال تعالى : وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَإِنْ لَمْ تَكُونُوا دَخَلْتُمْ بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ ) قال ( مَا نَكَحَ آبَاؤُكُمْ ) والزانية لا تدخل في هذا … ومع هذا فمذهب الحنابلة أن الزنى كالنكاح ، فإذا زنى بامرأة حرم عليه أصولها وفروعها ، وحرم عليها أصوله وفروعه تحريما مؤبدا ، بل من غرائب العلم أن يجعل السفاح كالنكاح ، بل من أغرب ما يكون ، وهو من أضعف الأقوال … والصواب أنه لا أثر في تحريم المصاهرة لغير عقد صحيح ؛ وذلك لأن العقود إذا أطلقت في الشرع حملت على الصحيح ، فالصواب في هذه المسألة أن كل ما كان طريقه محرما فإنه لا أثر له في التحريم والمصاهرة “
“যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করে, তবে কি ঐ নারীর মা ও মেয়েরা তার জন্য হারাম হয়ে যাবে? অথবা ঐ পুরুষের বংশীয় নারীসমূহ (মা, দাদি
মেয়ে ইত্যাদি) ঐ নারীর জন্য হারাম হয়ে যাবে?
উত্তর: না, হারাম হবে না। কারণ এ ব্যাপারটি কুরআনের ঐ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:”তোমাদের স্ত্রীদের মায়েরা, আর তোমাদের তত্ত্বাবধানে থাকা সেসব সৎকন্যারা যারা তোমাদের সেই স্ত্রীদের সন্তান যাদের সঙ্গে তোমরা সহবাস করেছ—অতএব যদি তোমরা তাদের সঙ্গে সহবাস না করে থাকো, তবে তাতে তোমাদের কোনো গোনাহ নেই—এবং তোমাদের পুত্রদের স্ত্রীগণ…”(সূরা আন-নিসা: ২৩) এবং তিনি আরও বলেনঃ “তোমাদের পিতারা যাদের বিবাহ করেছেন, তোমরা তাদের বিবাহ করো না।”(সূরা আন-নিসা: ২২) অতএব, ব্যভিচারিণী (যার সঙ্গে জিনা করা হয়েছে) এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে, হাম্বলি ফকীহদের মতে, ব্যভিচার (জিনা) কে বিবাহের সমতুল্য ধরা হয়।তাদের মতে, যদি কেউ কোনো নারীর সঙ্গে জিনা করে, তাহলে ঐ নারীর মা ও মেয়েরা তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যাবে, এবং একইভাবে ঐ নারীর জন্যও ঐ পুরুষের মা, দাদি, মেয়ে ইত্যাদি হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু এটি ‘বিদ্যা’ বা জ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে আশ্চর্যজনক বিষয় যে ব্যভিচারকে বিবাহের সমতুল্য গণ্য করা হয়েছে! বরং এটি সবচেয়ে বিস্ময়কর মতগুলোর একটি, এবং নিঃসন্দেহে এটি দুর্বলতম মতগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আর সঠিক কথা হলো: যে সম্পর্ক বা কাজ অবৈধ (হারাম) পথে সংঘটিত হয়েছে, তার দ্বারা মাহরাম সম্পর্ক বা হারামত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ শরীয়তে যখন কোনো চুক্তি বা সম্পর্কের কথা বলা হয়, তা কেবল সহীহ (বৈধ) চুক্তিকেই নির্দেশ করে।‌ অতএব এই মাস’আলায় সঠিক মত হলো যে, কোনো সম্পর্ক যদি হারাম পথে গঠিত হয় (যেমন ব্যভিচার, অবৈধ সহবাস), তবে তার দ্বারা মাহরামত্ব বা হারামত্বের কোনো প্রভাব পড়ে না।”(ইবনু উসাইমীন; আশ শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২০৩)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

বিতিরের সালাত আদায়ের সর্বোত্তম পদ্ধতি

 প্রশ্ন: বিতিরের সালাত আদায়ের সর্বোত্তম পদ্ধতি কী? বিতিরের সালাত সম্পর্কে A To Z জানতে চাই।

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর,আল্লাহ তা‘আলার একান্ত সান্নিধ্য লাভের জন্য ফরয ইবাদত যেমন যরূরী, তেমনি ফরয ইবাদতের ঘাটতি পূরণ করার জন্য নফল ইবাদত যরূরী। আমাদের অনেকের বিভিন্ন সময়ে ফরয সালাতে ঘাটতি হয়ে যায়। এক্ষেত্রে হাশরের ময়দানে ফরয সালাতের ঘাটতি পূরণ হবে নফল সালাত দ্বারা। আর নফল সালাতসমূহের মধ্যে বিতির একটি। এই সিরিজে আমরা বিতিরের নামাযের পদ্ধতি সম্পর্কে নিম্নোক্ত পয়েন্টে সংক্ষেপে কথা বলতে পারি:
.
বিতিরের সালাতের ফযীলত:
.
বিতিরের নামায আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এমনকি কিছু আলেম তথা হানাফী আলেমগণ মনে করে এটা ওয়াজিব। কিন্তু বিশুদ্ধ মত হচ্ছে এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। যে নামায প্রতিটি মুসলিমের নিয়মিত আদায় করা ও পরিহার না করা বাঞ্চনীয়।
.
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মহান ইমাম,শাইখুল ইসলাম আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানী (রাহিমাহুল্লাহ)[ মৃত্যু:২৪১ হি.] বলেন:من ترك الوتر فهو رجل سوء لا ينبغي أن تقبل له شهادة”যে ব্যক্তি বিতিরের নামায পড়ে না সে মন্দ ব্যক্তি। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা উচিত নয়।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী খণ্ড:২ পৃষ্ঠা;১১৮) এর থেকে বিতিরের নামাযের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।
.
বিতিরের সালাত আদায়ের হুকুম:
.
আলেমগণ বিতিরের নামায ওয়াজিব কি ওয়াজিব নয়— এ বিষয়ে মতপার্থক্য করেছেন।তবে শারঈ দলিলের আলোকে সুপ্রসিদ্ধ তিনটি মাযহাব;মালেকি,শাফেয়ি এবং হাম্বলী মাযহাবের শক্তিশালী মত এবং হানাফি মাজহাবের অন্যতম ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ বিন আল-হাসানসহ অধিকাংশ আলেমগনের অধিক বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, বিতির (বেজোড়) নামায সুন্নতে মুয়াক্কাদা (তাগিদপূর্ণ সুন্নত)। যদিও কোন কোন ফিকাহবিদ আলেমের মতে, বিতির নামায ওয়াজিব। বিতির নামায ওয়াজিব না হওয়ার পক্ষে দলিল হচ্ছে: মহান আল্লাহ বলেন,حٰفِظُوۡا عَلَی الصَّلَوٰتِ وَ الصَّلٰوۃِ الۡوُسۡطٰی ٭ وَ قُوۡمُوۡا لِلّٰهِ قٰنِتِیۡنَ “তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাতের এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা দাঁড়াবে বিনীতভাবে;(সূরা বাকারাহ;২৩৮) এই আয়াতে অধিকাংশ আলেমের মতে মধ্যবর্তী সালাতের অর্থ হচ্ছে আসরের সালাত। কেননা, এর একদিকে দিনের দুটি সালাত – ফজর ও যোহর এবং অপরদিকে রাতের দুটি সালাত – মাগরিব ও এশা রয়েছে। আর মাঝে মাঝখানে আসর। এখন বিতরের সালাত যদি ফরজ হয় তাহলে সালাতের ওয়াক্ত সংখ্যা হয় ছয় কিন্তু সবাই একমত সালাতের ওয়াক্ত হচ্ছে পাঁচ সুতরাং এক্ষেত্রে বিতর মধ্যবর্তী হওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া বিতর ওয়াজিব নয় তার আর একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে,সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম এর হাদিস: প্রখ্যাত সাহাবী তালহা বিন উবাইদুল্লাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: এক লোক রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আল্লাহ্‌ আমার উপর কী কী নামায ফরয করেছেন আমাকে তা অবহিত করুন। তখন তিনি বললেন: (الصَّلَوَاتِ الْخَمْسَ إِلا أَنْ تَطَّوَّعَ شَيْئًا ) ولفظ مسلم : ( خَمْسُ صَلَوَاتٍ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ . فَقَالَ : هَلْ عَلَيَّ غَيْرُهَا ؟ قَالَ : لا ، إِلا أَنْ تَطَوَّعَ ) “পাঁচ ওয়াক্ত নামায; তবে আপনি কোন নফল নামায আদায় করতে চাইলে সেটা আলাদা” আর সহিহ মুসলিমের ভাষ্যে এসেছে “দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায। সে বলল: আমার উপর এগুলো ছাড়া আর কিছু আছে? তিনি বললেন: না। তবে, আপনি নফল আদায় করতে পারেন”।(সহিহ বুখারী হা/১৮৯১; ও সহিহ মুসলিম;হা/১১)
.
উক্ত হাদীসের আলোকে শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,فِيهِ :أَنَّ صَلاة الْوِتْر لَيْسَتْ بِوَاجِبَةٍ “এই হাদিসে প্রমাণ রয়েছে যে, বিতির নামায ওয়াজিব নয়।(ইমাম নববী, শারহু ছহীহ মুসলিম,খন্ড:১ পৃষ্ঠা;১৬৯)
.
হাফিয ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] তার ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন:فيه : أَنَّهُ لا يَجِب شَيْء مِنْ الصَّلَوَات فِي كُلّ يَوْم وَلَيْلَة غَيْر الْخَمْس , خِلافًا لِمَنْ أَوْجَبَ الْوِتْر أَوْ رَكْعَتَيْ الْفَجْر “এই হাদিসে প্রমাণ রয়েছে যে, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায ছাড়া আর কোন নামায ওয়াজিব নয়; এর বিপরীতে কেউ কেউ বিতির নামাযকে ও ফজরের দুই রাকাত সুন্নতকে ওয়াজিব বলেছেন।(ফাতহুল বারী ফী শারহিল বুখারী, খন্ড: ১ পৃষ্ঠা: ১০৭)
.
এছাড়াও বিতর ওয়াজিব নয় এর পক্ষে আরো একটি দলিল হচ্ছে,নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মু’আয (রাঃ)-কে ইয়ামান দেশে (শাসক হিসেবে) প্রেরণ করেন। অতঃপর বললেন, সেখানকার অধিবাসীদেরকে অবগত কর যে, أَنَّ اللَّهَ قَدِ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، “আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর প্রতি দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন”।(সহিহ বুখারী হা/ ১৩৯৫) .
.
ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতে বিতিরের নামায আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু বিশুদ্ধ মত সেটাই যা আমি উল্লেখ করেছি;অর্থাৎ বিতির নামায আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।পাশাপাশি এটাও বলবো বিতির ওয়াজিব না হলেও এ নামায সবচেয়ে তাগিদপূর্ণ সুন্নত নামায।নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক হাদিসে এ নামায আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। এবং তিনি নিজেও বাড়িতে ও সফরে কোনো সময়ই ছাড়তেন না, যা একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তাই জেনে বুঝে ইচ্ছাকৃত এ সালাত ত্যাগ করা উচিত নয়। কিন্তু কখনো আয়াত করতে ভুলে গেলে কিংবা দুই একবার ত্যাগ করলে গুনাহ হবেনা ইনশাআল্লাহ।
.
সহীহ মুসলিমে এসেছে, আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:( أَوْتِرُوا قَبْلَ أَنْ تُصْبِحُوا ) “তোমরা ভোর হওয়ার আগে বিতির নামায আদায় কর”(সহিহ মুসলিম হা;৭৫৪) সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে এসেছে- আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ( يَا أَهْلَ الْقُرْآنِ ، أَوْتِرُوا ، فَإِنَّ اللَّهَ وِتْرٌ يُحِبُّ الْوِتْرَ ),“ওহে আহলে কুরআন, তোমরা বিতির (বেজোড়) নামায আদায় কর। কারণ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ হচ্ছেন- বেজোড়। তিনি বেজোড়কে পছন্দ করেন”।(ইমাম আলবানী ‘সহিহ সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে’ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন;আবু দাউদ হা/৪১১৬) তাই নিজ গৃহে অবস্থানকালে কিংবা সফরে থাকাকালেও এ নামায নিয়মিত আদায় করা উচিত; যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদায় করতেন। সহীহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন:( كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي فِي السَّفَرِ عَلَى رَاحِلَتِهِ حَيْثُ تَوَجَّهَتْ بِهِ يُومِئُ إِيمَاءً صَلاةَ اللَّيْلِ إِلا الْفَرَائِضَ وَيُوتِرُ عَلَى رَاحِلَتِهِ ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরে অবস্থায় বাহনের পিঠে ইশারা করে রাত্রিকালীন নামায আদায় করতেন; বাহন যেই দিকে মুখ করে চলুক না কেন। তবে, ফরয নামায ছাড়া। আর তিনি বাহনের পিঠেই বিতির নামায আদায় করতেন”।(সহীহ বুখারী হা/১০০০;ও সহীহ মুসলিম হা/ ৭০০)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন, ” الوتر غير واجب وبهذا قال مالك والشافعي . وقال أبو حنيفة : هو واجب ” . ثم قال : ” قال أحمد : من ترك الوتر عمدا فهو رجل سوء ، ولا ينبغي أن تقبل له شهادة ، وأراد المبالغة في تأكيده لما قد ورد فيه من الأحاديث في الأمر به ، والحث عليه “বিতিরের নামায ওয়াজিব নয়। এটি মালেক ও শাফেয়ির অভিমত। আবু হানিফা বলেছেন: ওয়াজিব”। এরপর তিনি বলেন: আহমাদ বলেছেন: যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে বিতিরের নামায পড়ে না সে একজন খারাপ লোক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা উচিত নয়। এ বিষয়ে অনেক হাদিস বর্ণিত হওয়ার কারণে তিনি এর উপর জোর তাগিদ দিতে ও উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন”।(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী,খন্ড: ১ পৃষ্ঠা: ৮২৭ কিছুটা পরিমার্জিত ও সমাপ্ত]
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: বিতিরের নামায কি ওয়াজিব? যে ব্যক্তি একদিন বিতির নামায পড়ে অন্যদিন পড়ে না তাকে কি শাস্তি পেতে হবে?
জবাবে তাঁরা বলেন:
صلاة الوتر سنة مؤكدة ، ينبغي أن يحافظ المؤمن عليها ، ومن يصليها يوما ويتركها يوما لا يؤاخذ ، لكن ينصح بالمحافظة على صلاة الوتر ثم يشرع له أن يصلي بدلها من النهار ما فاته شفعا ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم كان يفعل ذلك ، كما ثبت عن عائشة رضي الله عنها قالت : كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا شغله نوم أو مرض عن صلاة الليل صلى من النهار ثنتي عشرة ركعة . خرجه مسلم في صحيحه ، وكان صلى الله عليه وسلم يصلي من الليل غالبا إحدى عشرة ركعة ، يسلم من كل اثنتين ويوتر بواحدة ، فإذا شغل عن ذلك بنوم أو مرض صلى من النهار اثنتي عشرة ركعة ، كما ذكرت ذلك رضي الله عنها ، وعلى هذا إذا كانت عادة المؤمن في الليل خمس ركعات فنام عنها أو شغل عنها بشيء شُرع له أن يصلي من النهار ست ركعات يسلم من كل اثنتين ، وهكذا إذا كانت عادته ثلاثا صلى أربعا بتسليمتين ، وإذا كانت عادته سبعا صلى ثمان يسلم من كل اثنتين
বিতিরের নামায সুন্নতে মুয়াক্কাদা। মুমিনের উচিত এ নামায নিয়মিত আদায় করা। যে ব্যক্তি এ নামায একদিন আদায় করে, অন্যদিন আদায় করে না তাকে শাস্তি পেতে হবে না। কিন্তু, তাকে এ নামায নিয়মিত আদায় করার উপদেশ দেয়া হবে। তাছাড়া বিতির বা বেজোড় নামায ছুটে গেলে সে ব্যক্তি এর বদলে দিনের বেলায় জোড় নামায আদায় করে নিতে পারেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে করতেন। যেমনটি আয়েশা (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি ঘুমের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাতের নামায আদায় করতে না পারতেন তাহলে তিনি দিনের বেলায় ১২ রাকাত নামায আদায় করতেন।[সহিহ মুসলিম] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সময় রাতের নামায ১১ রাকাত আদায় করতেন। প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফিরাতেন। এবং এক রাকাত বিতির আদায় করতেন। যদি তিনি ঘুমের কারণে কিংবা রোগের কারণে এ নামায আদায় করতে না পারতেন তখন তিনি দিনের বেলায় ১২ রাকাত নামায আদায় করতেন; যেমনটি আয়েশা (রাঃ) উল্লেখ করেছেন। এর ভিত্তিতে বলা যায় কোন ব্যক্তির স্বভাব যদি হয় তিনি প্রতি রাতে ৫ রাকাত নামায আদায় করেন, কিন্তু কোনদিন ঘুমের কারণে কিংবা অন্য কোন ব্যস্ততার কারণে আদায় করতে না পারেন তাহলে দিনের বেলা তার জন্য ৬ রাকাত নামায আদায় করার বিধান রয়েছে। তিনি প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফিরাবেন। অনুরূপভাবে তার অভ্যাস যদি হয় ৩ রাকাত নামায আদায় করা তাহলে তিনি দুই সালামে ৪ রাকাত আদায় করবেন। যদি তার অভ্যাস হয় ৭ রাকাত আদায় করা তাহলে তিনি ৮ রাকাত আদায় করবেন; প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফিরাবেন।”(ফাতাওয়াল লাজনাহ্‌ আল-দায়িমা; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১৭২)।
.
▪️বিতিরের সালাতের ওয়াক্ত:
.
এশার নামায পড়ার পর থেকে বিতিরের নামাযের সময় শুরু হয়। এমনকি কেউ যদি এশার নামাযকে মাগরিবের নামাযের সাথে একত্রে পড়ে তার ক্ষেত্রেও।অতঃপর ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত এর সময় অবশিষ্ট থাকে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:(إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَمَدَّكُمْ بِصَلاةٍ وهي الْوِتْرُ جَعَلَهُ اللَّهُ لَكُمْ فِيمَا بَيْنَ صَلاةِ الْعِشَاءِ إِلَى أَنْ يَطْلُعَ الْفَجْرُ) “নিশ্চয়ই আল্লাহ একটি নামায দ্বারা তোমাদের সাহায্য করেছেন। তা হচ্ছে বিতিরের নামায। আল্লাহ তোমাদের জন্য এর সময়কে এশার নামাযের পর থেকে ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিয়েছেন।”(তিরমিযী হা/৪২৫) ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহুত তিরমিযীতে এ হাদিসকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الوتر من صلاة الليل ، وهو سنة ، وهو ختامها ، ركعة واحدة يختم بها صلاة الليل في آخر الليل ، أو في وسط الليل ، أو في أول الليل بعد صلاة العشاء ، يصلي ما تيسر ثم يختم بواحدة”বিতিরের নামায একপ্রকার রাতের নামায, এটি আদায় করা সুন্নত এবং এটি রাতের নামাযের সর্বশেষ নামায। বিতিরের নামায এক রাকাত; যে একরাকাত নামায দিয়ে রাতের নামাযের সমাপ্তি টানা হয়। এটি রাতের শেষাংশে কিংবা মধ্যরাতে কিংবা এশার পর রাতের প্রথমাংশে আদায় করা হয়। যত রাকাত ইচ্ছা রাতের নামায পড়ার পর এক রাকাত বিতিরের নামায দিয়ে শেষ করা হয়”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩০৯)
.
▪️বিতিরের সালাত ওয়াক্তের শুরুতে পড়া উত্তম;নাকি বিলম্বে পড়া:
.
সুন্নাহ প্রমাণ করে যে, কোনো ব্যক্তি যদি শেষ রাতে ঘুম থেকে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী হয় তাহলে তার জন্য শেষ রাত পর্যন্ত বিলম্ব করে বিতিরের নামায পড়া উত্তম। কারণ শেষ রাতের নামায উত্তম। এই নামাযে অনেক (ফেরেশতা) উপস্থিত থাকে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:(مَنْ خَافَ أَنْ لا يَقُومَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ فَلْيُوتِرْ أَوَّلَهُ وَمَنْ طَمِعَ أَنْ يَقُومَ آخِرَهُ فَلْيُوتِرْ آخِرَ اللَّيْلِ فَإِنَّ صَلاةَ آخِرِ اللَّيْلِ مَشْهُودَةٌ وَذَلِكَ أَفْضَلُ) “যে ব্যক্তি শেষ রাতে উঠতে না পারার আশঙ্কা করবে সে যেন রাতের শুরুতেই বিতির পড়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি রাতের শেষ ভাগে নামায পড়ার ইচ্ছা রাখে সে যেন রাতের শেষ ভাগেই বিতির পড়ে। কারণ রাতের শেষ ভাগের নামাযে ফেরেশতারা হাজির হন। সেটাই অধিক উত্তম।”(সহীহ মুসলিম হা/৭৫৫)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেন:وهذا هو الصواب، ويُحمل باقي الأحاديث المطلقة على هذا التفضيل الصحيح الصريح، فمن ذلك حديث: (أوصاني خليلي أن لا أنام إلا على وتر). وهو محمول على من لا يثق بالاستيقاظ “এ অভিমতই সঠিক। অন্য সাধারণ হাদীসগুলোকে এই স্পষ্ট সহিহ উত্তমতার অর্থে ব্যাখ্যা করতে হবে। যেমন এক হাদীসে এসেছে: ‘আমার খলিল (প্রিয় ব্যক্তিত্ব) আমাকে উপদেশ দিয়েছেন আমি যেন বিতিরের নামায না পড়ে না ঘুমাই।’ এই হাদীসটি এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যে ঘুম থেকে উঠতে পারার ব্যাপারে নিশ্চিত নয়।”(ইমাম নববী শরহে মুসলিম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৭৭)
.
▪️একই রাতে কি দুইবার বিতির পড়া যাবে কি? যদি কেউ ইমামের সাথে বিতির সালাত পড়ার পর শেষ রাতে আবার সালাত পড়ে?
.
কোন মুসলিম যদি বিতির নামায পড়ে ফেলার পরেও শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়তে চান তাহলে তিনি দুই রাকাআত দুই রাকাআত করে সালাত আদায় করবেন। রাসূল (ﷺ) বিতর সালাত আদায়ের পরও দু’রাক‘আত সালাত পড়তেন।(তিরমিযী, হা/৪৭১;মিশকাত হা/১২৮৪) তবে পরে আর বিতির পড়তে হবে না।কারন রাসূল (ﷺ) বলেন,”এক রাতে দু’বার বিতর সালাত নেই”(আবু দাউদ হা/১৪৩৯;সহীহুল জামে হা/৭৫৬৭) তবে যিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেন তিনি প্রথম রাতে বিতির আদায় না করে চেষ্টা করবেন শেষ রাতে তাহাজ্জুদ শেষে বিতির আদায় করতে কেননা রাতের সর্বশেষ সালাত হিসেবে বিতির আদায় করা মুস্তাহাব কিন্তু যে ব্যক্তি শেষ রাতে জাগ্রত না হওয়ার আশংকা করবে সে প্রথমাংশে বিতির আদায় করে নিবেন।(দেখুন সহীহ মুসলিম হা/৭৫৫; মিশকাত হা/১২৬০) এছাড়াও কেউ যদি বিশেষ করে রমাদান মাসে ইমামের পিছনে তারাবি পড়ে অতঃপর শেষে ইমাম যখন বিতির পড়েন আর মুত্তাদী যদি শেষ রাতের জন্য বিতির রেখে দিতে চায় তাহলে তিনি ইমাম যখন বিতিরের সালাত আদায় শেষে সালাম ফিরাবেন তখন তিনি সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন এবং অতিরিক্ত এক রাকাআত যোগ করবেন যাতে শেষ রাতে তিনি বিতির আদায় করতে পারেন।
.
বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ,সৌদি ফাতাওয়া বোর্ডের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী,শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: আমি যদি রাতের প্রথমভাগে বিতির সালাত পড়ে ফেলি; এরপর রাতের শেষভাগে কিয়ামুল লাইল পড়ি সেক্ষেত্রে আমি কি পদ্ধতিতে সালাত পড়ব?
উত্তরে তিনি বলেন: যদি আপনি বিতির নামায পড়ে ফেলেন এরপর রাতের শেষভাগে আল্লাহ আপনাকে কিয়ামুল লাইল পড়ার তাওফিক দেন তাহলে আপনি জোড় সংখ্যক অর্থাৎ দুই রাকাআত দুই রাকাআত করে নামায আদায় করবেন; বিতির বা বেজোড় সংখ্যক নয়। দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী “এক রাতে দুইবার বিতির নেই”। আয়েশা (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিতির নামায পড়ে ফেলার পর বসে বসে দুই রাকাআত নামায আদায় করতেন। এ দুই রাকাআত নামায আদায় করার হেকমত আল্লাহই ভাল জানেন- উম্মতকে এ বিষয়ে অবহিত করা যে, বিতির নামাযের পর নামায পড়া জায়েয আছে।(সুনানে তিরমিযী, হা/৪৭১; মিশকাত, হা/১২৮৪; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩১১; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৮৪০০)
.
ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:ইমাম বিতিরের সালাত আদায় শেষ করলে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে যায় এবং অতিরিক্ত এক রাকাত যোগ করে যাতেশেষ রাতে তিনি বিতির পড়তে পারেন। এই আমলের হুকুম কি? এতে কি তিনি “ইমামের সাথে সালাত সম্পন্ন করেছেন” ধরা যাবে?
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন: “আমরা এতে কোন দোষ দেখি না। আলেমগণএটা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন।তিনি এটা করেন যেন বিতির (বেজোড়) নামাযটা শেষ রাতেই আদায় করতে পারেন। তাঁর ক্ষেত্রে এ কথা বলাও সত্য হবে যে, “ইমাম শেষ করা পর্যন্ত তিনি ইমামের সাথে নামায আদায় করেছেন”। কারণ ইমাম নামায শেষ করা পর্যন্ত তিনি তো ইমামের সাথে ক্বিয়াম করেছেন এবং এরপর তিনি এক রাকাত যোগ করেছেনঅন্য একটি শরয়ি কল্যাণের কারণে। সেটা হলো-বিতির (বেজোড়) নামাযটা যাতে শেষ রাতেআদায় করা যায়। তাই এতে কোন সমস্যা নেই। অতিরিক্ত এ রাকাতেরকারণে এ ব্যক্তি ‘যারা ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত নামায পড়েছেন’ তাদের দল থেকে বের হয়ে যাবে না। বরং তিনি তো ইমামের সাথে সম্পূর্ণ নামায আদায় করেছেন। তবে ইমামের সাথে নামায শেষ করেননি;কিছুটা বিলম্বে শেষ করেছেন।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩১২)
.
▪️বিতিরের সালাতেরপদ্ধতি:
.
বিতিরের নামায আদায়ের সর্বনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে এক রাকাআত।কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘বিতির হচ্ছে শেষ রাতের এক রাকাআত।’(সহীহ মুসলিম হা/৭৫২) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন: ‘রাতের নামায দুই রাকাত দুই রাকাআত করে। তোমাদের কেউ যদি ভোর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে তাহলে সে যেন এক রাকাআত নামায পড়ে নেয়। এই রাকাআত তার পূর্বের আদায়কৃত নামাযকে বেজোড় করে দিবে।” কেউ যদি এক রাকাআতে সীমিত থাকে তাহলে সে সুন্নত আদায় করল। … তিন, পাঁচ, সাত ও নয়… ইত্যাদি রাকাআত বিতির নামায পড়াও জায়েয।
.
তিন রাকাআত বিতির পড়লে এর দুটি রূপ। উভয়টি শরিয়তসম্মত:
.
এক: এক তাশাহহুদের মাধ্যমে টানা তিন রাকাআত পড়া। কারণ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীস আছে, তিনি বলেন: “كان النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لا يسلّم في ركعتي الوتر”، وفي لفظ: “كان يوتر بثلاث لا يقعد إلا في آخرهن”নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতিরের দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন না।’ অন্য বর্ণনায় আছে: ‘তিনি তিন রাকাত বিতির পড়তেন, সর্বশেষ রাকাতে ছাড়া বসতেন না।”(হাদীসটি নাসাঈ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৩৪; ও ইমাম বাইহাকী; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১; হা/৪৮০৩; মুস্তাদরাক হাকেম, হা/১১৪০ বর্ণনা করেন। ইমাম নববী ‘মাজমূ গ্রন্থে: খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৭ তে বলেন: ইমাম নাসাঈ হাদীসটি হাসান সনদে এবং বাইহাকী সহিহ সনদে বর্ণনা করেছেন] অপর বর্ননায় উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিন রাক‘আত বিতর পড়তেন। প্রথম রাক‘আতে ‘সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আ‘লা’ দ্বিতীয় রাক‘আতে ‘কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফেরূন’ এবং তৃতীয় রাক‘আতে ‘কুল হুওয়াল্লা-হুল আহাদ’ পড়তেন এবং তিনি রুকূর পূর্বে কুনূত পড়তেন। অতঃপর যখন তিনি শেষ করতেন তখন শেষে তিনবার বলতেন ‘সুবহা-নাল মালিকিল কুদ্দূস’।শেষবার টেনে বলতেন (নাসাঈ খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯১ হা/১৬৯৯,সনদ সহীহ)।
.
দুই: দুই রাকাআত পড়ে সালাম ফিরিয়ে ফেলা। এরপর এক রাকাআত পৃথকভাবে পড়া। দলিল হলো আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত,তিনি বিতরের দুই রাক‘আত এবং এক রাক‘আতের মাঝে সালাম ফিরাতেন এবং তিনি বলেছেন,রাসূল (ﷺ) এমনটি করেছেন (সহীহ ইবনু হিব্বান,হা/২৪৩৫; হাফিয ইবনু হাজার ফাতহুল বারী গ্রন্থে বলেন: হাদীসটির সনদ শক্তিশালী; দেখুন; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৮২) ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা), ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমাদ, ইসহাক (রাহিমাহুমুল্লাহ) প্রমুখ এভাবেই বিতর পড়তেন।(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা; ৫৮৮)
.
আর যদি পাঁচ অথবা সাত রাকাআত পড়ে তাহলে নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়বে, কেবল শেষ রাকাআতের বৈঠকে বসে তাশাহহুদ পড়বেন এবং সালাম ফেরাবেন। দলিল হলো আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে তেরো রাকাত নামায পড়তেন। এর মধ্যে পাঁচ রাকাত বিতির পড়তেন, যার শেষ রাকাত ছাড়া কোনো রাকাতে তিনি বসতেন না।”(সহীহ মুসলিম হা/৭৩৭) অপর বর্ননায় উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন: ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচ এবং সাত রাকাত বিতির পড়তেন। এর মাঝে সালাম বা কথার মাধ্যমে কোনো বিরতি দিতেন না।”(মুসনাদে আহমদ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৯০; ও নাসাঈ হা/১৭১৪) বর্ণনা করেন।ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) আল-ফাতহুর রাব্বানী গ্রন্থে বলেন: হাদীসটির সনদ উত্তম। আল-ফাতহুর রাব্বানী: ২/২৯৭; ইমাম আলবানী সহীহুন নাসাঈতে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)
.
আর যদি নয় রাকাআত বিতির পড়েন তাহলে নিরবচ্ছিন্ন পড়বেন, যার মধ্যে কেবল অষ্টম রাকাআতে তাশাহহুদের জন্য বসবেন। তারপর সালাম না ফিরিয়ে উঠে যাবেন এবং নবম রাকাআতে তাশাহহুদ পড়ে সালাম ফেরাবেন। এর সপক্ষে দলীল হচ্ছে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীস, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন: ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নয় রাকাত নামায পড়তেন। অষ্টম রাকাত ছাড়া কোনো রাকাতে তিনি (তাশাহহুদের জন্য) বসতেন না। বসে আল্লাহর যিকির করতেন, তাঁর প্রশংসা করতেন, তাঁর নিকট দোয়া করতেন (অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু পাঠ করতেন)। তারপর সালাম না ফিরিয়ে নবম রাকাতের জন্যে দাঁড়িয়ে যেতেন। নবম রাকাত শেষ করে তাশাহহুদ পাঠ করার জন্য বসতেন। বসে আল্লাহর যিকির করতেন, তার প্রশংসা করতেন ও তাঁর নিকট দোয়া করতেন (অর্থাৎ তাশাহহুদ পড়তেন)। এরপর আমাদেরকে শুনিয়ে সশব্দে সালাম ফিরাতেন।”(সহীহ সহিহ মুসলিমে হা/৭৪৬)
.
আর যদি এগারো রাকাআত বিতির পড়েন, তাহলে প্রত্যেক দুই রাকাআত পড়ার পরে সালাম ফেরাবেন এবং শেষে এক রাকাআত বিতির পড়বেন।বিতিরের নামাযের এই রূপগুলোর বিবরণ সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে। সর্বোত্তম হচ্ছে একজন মুসলিম সবসময় একই পদ্ধতিতে বিতির পড়বেন না। বরং কখনো এই পদ্ধতি, আবার কখনো ঐ পদ্ধতিতে বিতির পড়বেন; যাতে করে সে সকল সুন্নত আদায় করতে সক্ষম হয়।
.
▪️মাগরিবের মতো করে বিতির পড়া যাবে?
.
তিন রাকাআত বিতরের সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে উপরোক্ত দুইটি পদ্ধতির বাইরে আমাদের সমাজে আরেকটি পদ্ধতি প্রচলিত আছে। তা হলো— বিতরকে মাগরিবের নামাযের মতো আদায় করা; অর্থাৎ দুই রাকাআত পড়ে তাশাহুদ শেষে সালাম না ফিরিয়ে তৃতীয় রাকাআতের জন্য দাঁড়ানো। দুঃখজনক হলেও সত্য, মাযহাবী অনুগামিতা ও গোঁড়ামির কারণে এই পদ্ধতিই বহু সমাজে ব্যাপকভাবে চালু রয়েছে। অথচ এ রূপে বিতর আদায়ের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে কোনো সহীহ হাদীস প্রমাণিত নয়; বরং নবী ﷺ স্পষ্টভাবে বিতরকে মাগরিবের মতো পড়তে নিষেধ করেছেন।যেমন;আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, لاَ تُوْتِرُوْا بِثَلاَثٍ أَوْتِرُوْا بِخَمْسٍ أَوْ سَبْعٍ وَلاَ تُشَبِّهُوْا بِصَلاَة الْمَغْرِبِ.”তোমরা (মাগরিবের সালাতের ন্যায়) তিন রাক‘আত বিতর পড় না, পাঁচ, সাত রাক‘আত পড়। আর মাগরিবের সালাতের ন্যায় আদায় কর না”।(সহীহ ইবনে হিব্বান হা/২৪২০,মুস্তাদরাক হাকিম,১/৩০৪, বায়হাকী ৩/৩১, ইমাম দারাক্বুত্বনী,হা/১৬৩৪; ইমাম দারাক্বুত্বনী উক্ত হাদীসকে সহীহ বলেছেন (দারাক্বুত্বনী;খণ্ড;২;পৃষ্ঠা;২৪ হা/১৬৩৪) আর মাগরিবের মত পড়ার আরো যত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সবগুলোই যঈফ।(ইমাম আলবানী ইওয়াউল গালীল; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৫০ হা/৪২১; মুসনাদে আহমাদ হা/২৫২৬৪)
.
প্রচলিত হানাফিরা যে বর্ননাটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে সেটি হলো: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, রাতের বিতর তিন রাকাত, উহা হল দিনের বিতর মাগরিবের মত।”(দারাকুৎনী হা/১৬৩৭,বায়হাকী হা/৪৮১২) তাহক্কীক: এ হাদীসটি ইমাম দারাকুতনী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি সহীহ নয় সনদ যঈফ।কারন উক্ত বর্ণনাতে ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া কূফী ইবনু আবিল হাওয়াজিব নামে দুর্বল রাবী আছেন। ইমাম বাইহাক্বী বলেন,হাদীসটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত হলেও তা মূলতঃ ইবনে মাসউদের নিজস্ব কথা হিসেবে প্রমাণিত।(নাসবুর রায়া ২/১১৬)। ভারতবর্ষে হাদীসশাস্ত্রের দিকপাল, মিশকাতুল মাসাবীহ’র বিখ্যাত ভাষ্যগ্রন্থ মির‘আতুল মাফাতীহ’র সম্মানিত মুসান্নিফ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, আল-আল্লামাহ, ইমাম উবাইদুল্লাহ আব্দুস সালাম মুবারকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪১৪ হি./১৯৯৪ খ্রি.] বলেছেন, عِنْدَ الْإِيْتَارِ بِثَلاَثٍ ‘তিন রাক‘আত বিতরে দ্বিতীয় রাক‘আতে বৈঠক করার পক্ষে আমি কোন মারফূ সহীহ দলীল পাইনি।(মির‘আতুল মাফাতীহ হা/১২৬২-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)
.
বিতিরের সালাতের পূর্ণতার ন্যূনতম রূপ:
বিতিরের নামাযে পূর্ণতার ন্যূনতম পদ্ধতি হচ্ছে দুই রাকাআত পড়ে সালাম ফেরাবেন। তারপর আরও এক রাকাআত পড়ে সালাম ফেরাবেন। এক সালামে তিন রাকাআত পড়া জায়েয। তবে সেক্ষেত্রে একবার তাশাহহুদ পড়তে হবে, দুইবার নয়; যেমনটি ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
.
▪️বিতিরের সালাতে কী পড়বেন?
.
বিতিরের নামাযে সূরা ফাতিহার পর যে কোন সূরা পড়া যায়। তবে মুস্তাহাব হল,তিন রাকাআত বিতির নামাযের মধ্যে প্রথম রাকাআতে গোটা সূরা আ’লা, দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাআতে সূরা ইখলাস পড়বেন।কারণ ইমাম নাসাঈ বর্ণনা করেন: উবাই ইবনে কা’ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতিরের নামাযে سَبِّحْ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى (সূরা আ’লা),قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ (সূরা কাফিরুন) এবং قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ (সূরা ইখলাস) পড়তেন।(ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহুন নাসাঈতে এ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন নাসাঈ হা/১৭২৯) অপর বর্ননা থেকে জানা যায়, মহানবী (ﷺ) কখনো কখনো তৃতীয় রাকআতে সূরা ইখলাসের সাথে সূরা নাস ও ফালাকও পাঠ করতেন।যেমন আবদুল আযীয ইবনু জুরাইজ (রহ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আয়িশাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের সালাতে কি (সূরা) পড়তেন? তিনি বলেন,كَانَ يَقْرَأُ فِي الرَّكْعَةِ الأُولَى بِـ ‏(سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى)‏ وَفِي الثَّانِيَةِ ‏(قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ)‏ وَفِي الثَّالِثَةِ ‏(قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ)‏ وَالْمُعَوِّذَتَيْنِ”তিনি প্রথম রাকাআতে সূরাহ সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা,দ্বিতীয় রাকআতে সূরাহ কাফিরূন, তৃতীয় রাকআতে সূরা ইখলাস ও মুআব্বিযাতাইন (সূরা ফালাক ও নাস) পড়তেন।”(সুনানে তিরমিযী হা/৪৬৩, আবূ দাঊদ হা/১৪২৩ সনদ সহীহ) এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে তিন রাক‘আত বিতর নামায এক সালামে আদায় করতে হবে। আল্লামাহ যায়লা‘ঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই হাদীস প্রমাণ করে যে তৃতীয় রাক‘আতটি পূর্বের দুই রাক‘আতের সঙ্গে সংযুক্ত—এটি তাদের থেকে পৃথক কোনো নামায নয় (অর্থাৎ দুই রাক‘আত শেষে বসে সালাম ফিরিয়ে আবার এক রাক‘আত আলাদা করে নয়)। কারণ, যদি এটি আলাদা হতো, তবে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অবশ্যই বলতেন: “وفي ركعة الوتر أو الركعة المفردة…”অর্থাৎ, বিতর সালাতের রাক্‘আতে কিংবা আলাদা রাক্‘আত কিংবা আরো অনুরূপ কথা বলতেন”।(আন-নাসবুর রায়াহ্; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩০৫)এছাড়া, এই হাদীস থেকে আরও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বিতরের তৃতীয় রাকআতে পরপর সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক এবং সূরা আন-নাস একসাথে তিলাওয়াত করা শরিয়তসম্মত বা সুন্নাত। তবে, অধিকাংশ আলেমের মতে,শুধু সূরা আল-ইখলাস পড়াই উত্তম ও পছন্দনীয়।
.
▪️বিতিরের সালাতে দু’আয় কুনূত পড়ার স্থান কোনটি?
.
বিতরের নামাজে দু‘আয় কুনুত পড়া মুস্তাহাব (সুন্নতে মুস্তাহাবা)। মাঝে মধ্যে তা ছেড়ে দিলেও কোনো সমস্যা নেই।কুনুত পাঠের স্থান সম্পর্কে দু’টি পদ্ধতি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত—একটি হলো রুকুতে যাওয়ার আগে পড়া,অন্যটি হলো রুকু থেকে উঠার পর দাঁড়িয়ে পড়া।তবে উত্তম ও অধিক অনুসরণযোগ্য পদ্ধতি হলো—রুকু থেকে উঠার পর দাঁড়িয়ে কুনুত পড়া, তারপর সিজদায় যাওয়া।এর প্রমাণ হলো—হুমায়দ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে কুনুত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রুকুর পর দু‘আ কুনুত পড়তেন।” অন্য একটি বর্ণনায় আছে— “তিনি (ﷺ) কখনো রুকুর আগে, আবার কখনো রুকুর পর কুনুত পড়তেন।”(সহীহ বুখারী হা/১০০২, ৪০৯৬) অপর হাদিসে প্রখ্যাত সাহাবী উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন বিতর পড়তেন তখন রুকূর পূর্বে কুনূত পড়তেন।”(ইবনু মাজাহ হা/১১৮২) তবে সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীস এবং জমহুর ওলামাদের মতে রুকূ‘র পরে কুনূত পড়া উত্তম।
.
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ আল-হার্রানী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] কুনুত সম্পর্কে বলেন:
وَأَمَّا الْقُنُوتُ: فَالنَّاسُ فِيهِ طَرَفَانِ وَوَسَطٌ: مِنْهُمْ مَنْ لا يَرَى الْقُنُوتَ إلا قَبْلَ الرُّكُوعِ، وَمِنْهُمْ مَنْ لا يَرَاهُ إلا بَعْدَهُ. وَأَمَّا فُقَهَاءُ أَهْلِ الْحَدِيثِ كَأَحْمَدَ وَغَيْرِهِ فَيُجَوِّزُونَ كِلا الأَمْرَيْنِ لِمَجِيءِ السُّنَّةِ الصَّحِيحَةِ بِهِمَا. وَإِنْ اخْتَارُوا الْقُنُوتَ بَعْدَهُ ; لأَنَّهُ أَكْثَرُ وَأَقْيَسُ
“আর কুনুত সম্পর্কে দুটি চরম দৃষ্টিভঙ্গি এবং একটি মধ্যম দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।কেউ বলেন যে,কুনূত শুধুমাত্র রুকু করার আগে পড়তে হবে। আবার কেউ বলেন যে এটি শুধুমাত্র রুকু করার পরে পড়তে হবে।আর আহলুল হাদীসের ফকীহগণ,যেমন ইমাম আহমদ ও অন্যরা উভয় পদ্ধতিকেই বৈধ মনে করেন,কারণ উভয়ই সহীহ সুন্নাহতে উল্লেখ আছে,তবে তারা (ইমাম আহমদ ও আহলুল হাদীসের ফকীহগণ) রুকুর পরে কুনুত পড়াকে অগ্রাধিকার দিতেন,কারণ সেটিই অধিক (হাদীস দ্বারা) প্রমাণিত ও অধিক কিয়াসসম্মত”(ইবনু তাইমিয়্যাহ;মাজমূঊল ফাতাওয়া খন্ড: ২৩; পৃষ্ঠা: ১০০)
.
সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:বিতির নামাযে কুনুতের দো‘আ রুকুর আগে পড়া উত্তম, নাকি রুকুর পরে?
জবাবে শাইখ বলেন;أكثر الأحاديث والذي عليه أكثر أهل العلم: أن القنوت بعد الركوع، وإن قنت قبل الركوع فلا حرج، فهو مُخير بين أن يركع إذا أكمل القراءة، فإذا رفع وقال: ربنا ولك الحمد قنت… وبين أن يقنت إذا أتم القراءة ثم يُكبر ويركع، كل هذا جاءت به السنة “অধিকাংশ হাদীস অনুযায়ী এবং জমহুর আলেমের মতানুযায়ী কুনূত রুকু’র পরে পড়া উচিত, কিন্তু কেউ যদি রুকু’র পূর্বে তা পাঠ করে তাতেও কোনো দোষ নেই এক্ষেত্রে তার ইখতিয়ার হয়েছে।(অর্থাৎ সে দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারে) তিনি চাইলে কিরাআত সম্পূর্ণ করার পর রুকু করতে পারেন; তারপর রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে “রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ” বলে তারপর তিনি কুনূত পাঠ করতে পারেন, অথবা তিনি চাইলে সালাতে কিরাআত শেষ করার পর প্রথমে কুনুত পাঠ করে,তারপর আল্লাহু আকবার বলে রুকু করতে পারেন।উভয় পদ্ধতিই সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।”(ইবনে উসাইমিন আল-শারহুল মুমতি; খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৫)
.
▪️বিতির সালাতে দু’আয় কুনুত কোনটি পড়া উচিত? মুখস্থ না থাকলে কি পড়বে?
.
বিতরের প্রসিদ্ধ কুনুত হচ্ছে,ইমাম আবু দাউদ কর্তৃক হাসান বিন আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিস তিনি বলেন: রাসূলুল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে কিছু বাণী শিখিয়ে দিয়েছেন সেগুলো আমি বিতিরের নামায দোয়ায়ে কুনুত হিসেবে পড়ি:اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ ، وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ ، إِنَّكَ تَقْضِي وَلَا يُقْضَى عَلَيْكَ ، وَإِنَّهُ لَا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ ، وَلَا يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ(বাংলা উচ্চারণ:-আল্লা-হুম্মাহ্ দিনী ফীমান হাদাইতা, ওয়া ‘আ-ফিনী ফীমান ‘আ-ফাইতা, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইতা, ওয়া বা-রিক লী ফীমা- আ’অ্‌তাইতা, ওয়া ক্বিনী শার্‌রা মা- ক্বাদ্বাইতা, ফাইন্নাকা তাক্বদ্বী, ওয়ালা- ইউক্বদ্বা ‘আলাইকা, ওয়া ইন্নাহু লা- ইয়াযিল্লু মান ওয়া-লাইতা, ওয়ালা- ইয়া’ইঝ-ঝু মান ‘আ-দাইতা, তাবা-রাক্‌তা রাব্বানা- ওয়া তা’আ-লাইতা। অর্থ:”হে আল্লাহ আপনি যাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন, আমাকে তাদের সাথে হেদায়েত করুন। আপনি যাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন, আমাকেও তাদের সাথে নিরাপত্তা দান করুন। আপনি যাদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের সাথে আমার দায়িত্বও গ্রহণ করুন। আপনি আমাকে যা কিছু দান করেছেন, তাতে বরকত দান করুন। আপনি যে (তাক্বদীর) নির্ধারণ করেছেন, তার অকল্যাণ থেকে আমাকে বাঁচান। কেননা আপনিই নির্ধারণ করেন, আপনার নির্ধারণের বিরুদ্ধে কোন আপত্তি নেই। নিশ্চয় আপনি যাকে নৈকট্য দান করেন, কেউ তাকে অপমানিত করতে পারে না। আপনি যার সাথে শত্রুতা করেন, সে সম্মানিত হতে পারে না। আপনার কল্যাণ অবারিত হোক এবং আপনার মর্যাদা সমুন্নত হোক।”(আবু দাউদ হা/১৪২৫ সনদ বিশুদ্ধ)
.
উক্ত কুনুত মুখস্থ না থাকলে বিতিরের নামাযে কোন একটি কাগজ কিংবা পুস্তিকা থেকে দেখে দেখে দোয়ায়ে কুনুত পড়তে কোন অসুবিধা নেই; যাতে করে আপনি দোয়াটি মুখস্ত করে নিতে পারেন। মুখস্থ হয়ে গেলে আর বই দেখা লাগবে না; আপনি মুখস্থ থেকে দোয়া করতে পারবেন; যেমন যে ব্যক্তির কুরআনের বেশি কিছু মুখস্থ নেই নফল নামাযে তার জন্য কুরআনুল কারিম দেখে পড়া জায়েয আছে।এমনকি বিতিরের নামাযে দোয়ায়ে কুনুত হুবহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত শব্দে হওয়া ওয়াজিব নয়। বরং মুসল্লি অন্য কোন দোয়াও করতে পারেন এবং হাদিসের শব্দের বাইরে কিছু বাড়াতেও পারেন। এমনকি যদি কুরআনের যেসব আয়াতে দোয়া আছে এমন কিছু আয়াত পড়েন সেটাও জায়েয আছে। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: জেনে রাখুন, অগ্রগণ্য মাযহাব মতে, কুনুতের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন দোয়া নেই। তাই যে কোন দোয়া পড়লে এর দ্বারা কুনুত হয়ে যাবে; এমনকি দোয়া সম্বলিত এক বা একাধিক কুরআনের আয়াত পড়লেও কুনুতের উদ্দেশ্য হাছিল হয়ে যাবে। তবে, হাদিসে যে দোয়া এসেছে সেটা পড়া উত্তম।”(ইমাম নববীর ‘আল-আযকার; পৃষ্ঠা: ৫০)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]- কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রমযান মাসে বিতিরের নামাযে দোয়ায়ে কুনুত পড়ার হুকুম কি? দোয়ায়ে কুনুত বাদ দেয়া কি জায়েয? জবাবে তিনি বলেন:القنوت سنة في الوتر وإذا تركه في بعض الأحيان : فلا بأس “বিতির নামাযে দোয়ায়ে কুনুত পড়া সুন্নত। যদি কখনও কখনও বাদ দেয় এতে কোন অসুবিধা নেই।
.
ইমাম (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়: যে ব্যক্তি প্রতি রাতে বিতিরের নামাযে দোয়ায়ে কুনুত পড়ে; এ আমল কি সলফে সালেহীন থেকে বর্ণিত আছে?
উত্তরে তিনি বলেন:لا حرج في ذلك بل هو سنة لأن النبي صلى الله عليه وسلم لما علم الحسين بن علي رضي الله عنهما القنوت في الوتر لم يأمر بتركه بعض الأحيان ولا بالمداومة عليه فدل ذلك على جواز الأمرين ، ولذا ثبت عن أبي ابن كعب رضي الله عنه حين كان يصلي بالصحابة رضي الله عنهم في مسجد رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه كان يترك القنوت بعض الليالي ولعل ذلك ليعلم الناس أنه ليس بواجب . والله ولي التوفيق “এতে কোন অসুবিধা নেই। বরং এটি পালন করা সুন্নত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুসাইন বিন আলী (রাঃ) কে বিতিরের নামাযের ‘দোয়ায়ে কুনুত’ শিখাতেন। তিনি দোয়ায়ে কুনুত কখনও কখনও বাদ দেয়া কিংবা নিয়মিত পড়া কোন নির্দেশ দেননি। এতে প্রমাণিত হয় যে, উভয়টি করা জায়েয। উবাই বিন কাব (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি যখন মসজিদে নববীতে সাহাবীদের ইমামতি করতেন তখন তিনি কোন কোন রাতে দোয়ায়ে কুনুত পড়তেন না; সম্ভবত তিনি এটা এ জন্য করতেন যাতে করে মানুষ জানতে পারে যে, দোয়ায়ে কুনুত পড়া ওয়াজিব নয়। আল্লাহই তাওফিকদাতা।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৫৯)
.
▪️বিতিরে কুনুত পড়ার সময় হাত তোলা যাবে কি?
.
বিতর নামাযে কুনূত দো‘আর সময় হাত তোলা বা না তোলা—উভয় আমলই সালাফে সালেহীনের কাছ থেকে প্রমাণিত রয়েছে।”(দেখুন; তুহফাতুল আহওয়াযী খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৬৪) যেমন,খলিফায়ে রাশিদ ওমর ইবনুল খাত্তাব, প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ, আনাস ইবনে মালিক ও আবূ হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) প্রমুখ সাহাবী থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তাঁরা কুনূতের সময় বক্ষসমান উচ্চতায় হাত উঠিয়ে দো‘আ করতেন।মুহাদ্দিসগণ এর দ্বারা বিতিরের কুনূত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।(দলিলসূত্র: আস-সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাক্বী ২/২১১-২১২; মির‘আতুল মাফাতীহ ৪/৩০০; তুহফাতুল আহওয়াযী ২/৫৬৭; ইরওয়াউল গালীল ২/১৮১)
.
ইমাম বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)বলেন,”বিতরের কুনূতে হাত উত্তোলন করা শরী‘আত সম্মত। কেননা তা কুনূতে নাযেলার মতই (মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ৩০; পৃষ্ঠা: ৫১)।ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ওমর (রাঃ) হ’তে সহীহ সূত্রে বিতরের সালাতে হাত উঠানোর বর্ণনা রয়েছে (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা; ৮১)।তবে হাত তুলে দু’আ করার পরে মুখে হাত বুলানো সুন্নাত নয়। কারণ,এ ব্যাপারে যত হাদীস এসেছে সবগুলোই দুর্বল। (দেখুন আবুদাঊদ হা/১৪৮৫; বায়হাকী, মিশকাত হা/২২৫৫; ইরওয়া হা/৪৩৩; ইবনু উসাইমীন আশ শারহুল মুমতে খন্ড: ৪/৫৫)
.
বিতিরের কাযা কিভাবে আদায় করার নিয়ম:
.
কেউ যদি রাতে বিতর না পড়ে ঘুমিয়ে যায় এবং ঘুম থেকে উঠে দেখে ফজরের সময় হয়ে গেছে তাহলে ও বিতিরের সালাতের কাযা পড়া যায়। প্রিয় নবী (ﷺ) বলেন,“যে ব্যক্তি বিতির না পড়ে ঘুমিয়ে যায় অথবা পড়তে ভুলে যায় সে ব্যক্তি যেন স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেয়।”(মুসনাদে আহমাদ,সহীহুল জামে হা/৬৫৬২) তিনি আরো বলেন,“যে ব্যক্তি ঘুমিয়ে থেকে বিতির না পড়তে পারে সে ব্যক্তি যেন ফজরের সময় তা পড়ে নেয়।(সুনানে তিরমিযী হা/৪২২;সহীহুল জামে ৬৫৬৩) খোদ রাসূল ﷺ)-এর কোন রাত্রে বিত্‌র না পড়ে ফজর হয়ে গেলে তখনই বিত্‌র পড়ে নিতেন।(মুসনাদে আহমাদ, ৬/২৪৩, বায়হাকী ১/৪৭৯) একদা এক ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)-এর দরবারে এসে বলল,”হে আল্লাহর নবী! ফজর হয়ে গেছে অথচ আমি বিতির পড়তে পারিনি।’ তিনি বললেন, “বিতির তো রাত্রেই পড়তে হয়।” লোকটি পুনরায় বলল, ‘হে আল্লাহর নবী! ফজর হয়ে গেছে অথচ আমি বিতির পড়তে পারিনি।’এবারে তিনি বললেন,“এখন পড়ে নাও।”(ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহহা/১৭১২) এ হাদীস থেকে স্পষ্ট হয় যে, ফজর হয়ে গেলেও বিতর নামায বিতরের মতই কাযা পড়া যাবে।(সিলসিলাহ সহীহাহ, ৪/২৮৯ দ্র:)
.
যদি বিতরের নামাজের সময় আপনি নামাজে থাকেন এবং ফজরের আযান হয়ে যায়,তখন করনীয় কি এই সম্পর্কে বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,المشروع لكل مؤمن ومؤمنة الإيتار في كل ليلة ، ووقته ما بين صلاة العشاء إلى طلوع الفجر ، لما ثبت في الصحيحين عن ابن عمر رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُما عن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أنه قال : (صَلاة اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى ، فَإِذَا خَشِيَ الصُّبْحَ صَلَّى رَكعةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا صَلَّى ) . . . .والأحاديث في هذا الباب كثيرة ، وهي دالة على أن الوتر ينتهي بطلوع الفجر ، وإذا لم يعلم المصلي طلوع الفجر اعتمد على المؤذن المعروف بتحري الوقت ، فإذا أذن المؤن الذي يتحرى وقت الفجر فاته الوتر ، أما من أذن قبل الفجر فإنه لا يفوت بأذانه الوتر ، ولا يحرم به على الصائم الأكل والشرب ، ولا يدخل به وقت صلاة الفجر . . . .وبما ذكرنا يتضح أن وقت الوتر ينتهي بأول الأذان إذا كان المؤذن يتحرى الصبح في أذانه ، لكن إذا أذن المؤذن والمسلم في الركعة الأخيرة أكملها لعدم اليقين بطلوع الفجر بمجرد الأذان ، ولا حرج في ذلك إن شاء الله”প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য প্রতি রাতে বিতির নামায আদায় করা সুন্নত। এর সময় শুরু হয় এশার নামাজের পর থেকে এবং শেষ হয় ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত। কেননা,সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:”রাতের সালাত দু’ দু’ (রাক’আত) করে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ফজর হবার আশঙ্কা করে, সে যেন এক রাক’আত সালাত আদায় করে নেয়। আর সে যে সালাত আদায় করলো, তা তার জন্য বিতর হয়ে যাবে।”(সহিহ বুখারী হা/৯৯০) এই বিষয়ে আরও বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ফজর উদিত হওয়ার সাথে সাথেই বিতিরের সময় শেষ হয়ে যায়।আর কেউ যদি নিশ্চিতভাবে না জানে যে ফজরের সময় প্রবেশ করেছে কি না, তাহলে সে সেই মুয়াজ্জিনের আযানের ওপর নির্ভর করতে পারে—যিনি ফজরের সময় নির্ধারণে সতর্ক ও নির্ভরযোগ্য। সুতরাং,যদি সেই মুয়াজ্জিন ফজরের সময় প্রবেশের ভিত্তিতে আযান দেন,তবে এর অর্থ হচ্ছে বিতিরের সময় শেষ হয়ে গেছে।কিন্তু কেউ যদি বিতিরের নামাজে থাকে এবং ঠিক তখনই আযান হয়ে যায়, সে তার বিতিরের নামাজ সম্পন্ন করতে পারে; কেননা শুধু মাত্র আযান হওয়াতে ফজরের সময় প্রবেশ নিশ্চিত হয় না।ইনশাআল্লাহ এতে কোনো দোষ নেই।”(বিন বায;মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১২৫; পৃষ্ঠা: ৩০৫).
.
এছাড়াও সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]–কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: একজন ব্যক্তি বিতরের নামাজ পড়ছিল,আর ঐ সময় ফজরের আযান শুরু হয়ে গেল, এখন সে কি তার নামাজ সম্পূর্ণ করবে? উত্তরে শাইখ বলেন:”نعم ، إذا أذن وهو أثناء الوتر فإنه يتم صلاته ولا حرج عليه“হ্যাঁ, যদি আযান শুরু হয় এবং সে বিতরের মধ্যে থাকে, তাহলে সে নামাজ শেষ করবে। এতে কোনো সমস্যা নেই।”(ইবনু উসাইমীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৪: পৃষ্ঠা: ১১৫) সুতরাং ফজরের আযানের আগে পর্যন্ত বিতির নামাযের সময় থাকে। যদি আযান শুরু হওয়ার সময় আপনি বিতির নামাযে লিপ্ত থাকেন, তাহলে নামায সম্পন্ন করতে পারেন। আর যদি পর্যাপ্ত সময় থাকে, তবে কুনুত পড়া জায়েয; কিন্তু সময় সংকট হলে কুনুত বাদ দিয়ে বিতির নামায শেষ করাই উত্তম।
.
উল্লেখ্য যে, রাতে ঘুমের কারনে বিতর ক্বাযা হয়ে গেলে এবং সূর্য উঠার পরে বিতর সালাত পড়লে জোড় পড়তে হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে করতেন। যেমনটি আয়েশা (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং বিতির এক রাক‘আত পড়ার অভ্যাস থাকলে এক সঙ্গে দুই রাক‘আত পড়বেন এবং সালাম ফিরাবেন। তিন রাক‘আত পড়ার অভ্যাস থাকলে দুই সালামে (২+২) চার রাক‘আত পড়বেন। আর পাঁচ রাক‘আত পড়ার অভ্যাস থাকলে তিন সালামে (২+২+২) ছয় রাক‘আত পড়বেন। আরো অতিরিক্ত পড়তে হলে এভাবেই পড়তে হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবেই পড়তেন। প্রায় সময় রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতের ছালাত ১১ রাক‘আত আদায় করতেন। কোন কারণে রাত্রে আদায় করতে না পারলে দিনের বেলায় বারো রাক‘আত পড়তেন”।(সহীহ মুসলিম হা/১৬২৮ মিশকাত হা/১৫২৭) তাই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসরণ হিসাবে এটাই উম্মাহর জন্য করণীয়”।(বিন বায,মাজমূঊ ফাতাওয়া; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩০০; ইবনু তায়মিয়াহ মাজমূঊল ফাতাওয়া; খণ্ড; ২৩; পৃষ্ঠা: ৯০; ইবনে উসাইমীন; মাজমূ ফাতাওয়া; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১১৪) আর যদি কেউ ওযর ছাড়াও বিতর সালাত ত্যাগ করে তাহ’লে ক্বাযা আদায় করা যরূরী নয় তবে অবশ্যই নিয়মিত পড়া উচিত। (ইবনু হাযার ফাৎহুল বারী; খণ্ড; ২; পৃষ্ঠা: ৪৮০; ইবনু আব্দিল বার্র; আল-ইস্তিযকার; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১২২-১২৩)
.
দিনের বেলা বিতিরের কাযা আদায় সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
ثم يشرع له أن يصلي بدلها من النهار ما فاته شفعا ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم كان يفعل ذلك ، كما ثبت عن عائشة رضي الله عنها قالت : كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا شغله نوم أو مرض عن صلاة الليل صلى من النهار ثنتي عشرة ركعة . خرجه مسلم في صحيحه ، وكان صلى الله عليه وسلم يصلي من الليل غالبا إحدى عشرة ركعة ، يسلم من كل اثنتين ويوتر بواحدة ، فإذا شغل عن ذلك بنوم أو مرض صلى من النهار اثنتي عشرة ركعة ، كما ذكرت ذلك رضي الله عنها ، وعلى هذا إذا كانت عادة المؤمن في الليل خمس ركعات فنام عنها أو شغل عنها بشيء شُرع له أن يصلي من النهار ست ركعات يسلم من كل اثنتين ، وهكذا إذا كانت عادته ثلاثا صلى أربعا بتسليمتين ، وإذا كانت عادته سبعا صلى ثمان يسلم من كل اثنتين
“অতঃপর বিতির বা বেজোড় নামায ছুটে গেলে সে ব্যক্তি এর বদলে দিনের বেলায় জোড় নামায আদায় করে নিতে পারেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে করতেন। যেমনটি আয়েশা (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি ঘুমের কারণে কিংবা রোগের কারণে রাতের নামায আদায় করতে না পারতেন তাহলে তিনি দিনের বেলায় ১২ রাকাত নামায আদায় করতেন।[সহিহ মুসলিম] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সময় রাতের নামায ১১ রাকাত আদায় করতেন। প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফিরাতেন। এবং এক রাকাত বিতির আদায় করতেন। যদি তিনি ঘুমের কারণে কিংবা রোগের কারণে এ নামায আদায় করতে না পারতেন তখন তিনি দিনের বেলায় ১২ রাকাত নামায আদায় করতেন; যেমনটি আয়েশা (রাঃ) উল্লেখ করেছেন। এর ভিত্তিতে বলা যায় কোন ব্যক্তির স্বভাব যদি হয় তিনি প্রতি রাতে ৫ রাকাত নামায আদায় করেন, কিন্তু কোনদিন ঘুমের কারণে কিংবা অন্য কোন ব্যস্ততার কারণে আদায় করতে না পারেন তাহলে দিনের বেলা তার জন্য ৬ রাকাত নামায আদায় করার বিধান রয়েছে। তিনি প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফিরাবেন। অনুরূপভাবে তার অভ্যাস যদি হয় ৩ রাকাত নামায আদায় করা তাহলে তিনি দুই সালামে ৪ রাকাত আদায় করবেন। যদি তার অভ্যাস হয় ৭ রাকাত আদায় করা তাহলে তিনি ৮ রাকাত আদায় করবেন; প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফিরাবেন।”(ফাতাওয়াল লাজনাহ্‌ আল-দায়িমা; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১৭২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate