Thursday, January 23, 2025

মানুষের জীবনে তার নামের প্রভাব পড়ে একথা কতটুকু সত্য

 “মানুষের জীবনে তার নামের প্রভাব পড়ে।” কতটুকু সত্যি? ইসলামের দৃষ্টিতে মানব জীবনে ইতিবাচ শব্দ প্রয়োগের গুরুত্ব।

প্রশ্ন: ‘মানুষের জীবনে তার নামের প্রভাব পড়ে’ এ কথা কি সত্য?
উত্তর: প্রকৃতপক্ষে মানুষ কেমন হবে, সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা, তার আচার-আচরণ ও কার্যক্রম কী হবে ইত্যাদি সব কিছুই আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির পূর্বেই তার তকদিরে লিপিবদ্ধ করেছেন। সে আলোকেই সব কিছু সংঘটিত হয়। শুধু নাম কারও জীবন পরিবর্তন করে না।
ইসলাম ওয়েবে প্রশ্ন করা হয় যে, কারো নাম কি তার ভাগ্য ও ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলে?
উত্তরে তারা বলেন,
فإن أمر حظ الإنسان ومستقبله قد كتبه الله وقدره قبل خلقه للإنسان، ولا أثر لمجرد التسمية عليه فكل شيء مقدور ومكتوب في الأزل كما في حديث مسلم: كل شيء بقدر حتى العجز والكيس .

ومحاولة تعرف الشخص على مستقبله عن طريق اسمه أو بأية وسيلة أخرى يدخل في باب الكهانة. وبالتالي فهو حرام.

ولكن الشرع رغب في الأسماء الحسنة من باب التفاؤل، وكان النبي صلى الله عليه وسلم يتفاءل بالأسماء الحسنة، ويغير الاسم المشتمل على محظور شرعي أو ما لا يستحسن، وقد أثبتت الدراسات النفسية أن للاسم السيئ تأثيرا سلبيا على صاحبه

“মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যতের বিষয় আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টি করার আগেই নির্ধারণ ও লিখে রেখেছেন। শুধুমাত্র নামকরণের কারণে এর কোনও প্রভাব পড়ে না। প্রতিটি বিষয় পূর্বনির্ধারিত ও লিখিত রয়েছে। যেমনটি সহিস মুসলিম একটি হাদিসে বলা হয়েছে:
كُلُّ شَىْءٍ بِقَدَرٍ حَتَّى الْعَجْزُ وَالْكَيْسُ

“প্রত্যেক বিষয়ই তকদির দ্বারা নির্ধারিত, এমনকি অক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তাও।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ৪৮/ তকদির, পরিচ্ছেদ: ৪. সকল তকদির অনুযায়ী (সৃষ্ট)]
কিন্তু কারো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার নাম বা অন্য কোনও মাধ্যম দিয়ে জানা বা অনুমান করার চেষ্টা করা জ্যোতিষশাস্ত্রের (কাহানাহ) মধ্যে পড়ে, যা ইসলামে হারাম। তবে ইসলাম ভালো নাম রাখার প্রতি উৎসাহ দিয়েছে সৌভাগ্যের আশা করা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার জন্য। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভালো নাম দ্বারা শুভ লক্ষণ গ্রহণ করতেন এবং এমন নাম পরিবর্তন করতেন যা শরিয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ বা অ পছন্দনীয়।
বস্তুত, মনোবিজ্ঞান গবেষণাগুলো প্রমাণ করেছে যে, খারাপ নামের মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।” [islamweb]

➧ খারাপ নামের মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে” এ কথার পক্ষে আলেমগণ নিম্নোক্ত হাদিসটি দ্বারা দলিল গ্রহণ করেছেন:

ইবনুল মুসাইয়্যাব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তার দাদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন: “তোমার নাম কী?”
তিনি উত্তর দিলেন: “হাজন” (কঠিন বা কঠোর)।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “তুমি ‘সাহল’ (সহজ বা নমনীয়)।”
তিনি বললেন: “আমি সেই নাম পরিবর্তন করব না, যা আমার পিতা আমাকে দিয়েছেন।”
ইবনুল মুসাইয়্যাব বলেন: “এরপর থেকে আমাদের মধ্যে কঠোরতা (হাজন) থেকে গেল।” [সহিহুল বুখারি]

➧ শিক্ষণীয় বিষয়:

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ভালো ও ইতিবাচক নাম রাখা ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে। খারাপ নামের প্রভাব চরিত্র ও পরিবারের উপর পড়তে পারে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনেক ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তন করতেন, যা নেতিবাচক বা অপ্রীতিকর অর্থ বহন করে।
জীবনে নামের প্রভাব পড়তে পারে। তবে তা আবশ্যক নয়। অর্থাৎ অনেক সময় মানুষেরে নাম খুব সুন্দর হয় কিন্তু বাস্তব জীবনে সে অনেক খারাপ মানুষ হয়। আবার কআরও নাম হয়ত এতটা সুন্দর নয় কিন্তু বাস্তব জীবনে সে ভালো হয়। এখানে কেবল সম্ভাব্যের বিষয়টি বলা উদ্দেশ্য।

❑ শুধু নাম নয় বরং ইতিবাচক শব্দ মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে:

প্রকৃতপক্ষে শুধু নাম নয় বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে শব্দের প্রভাব পড়তে পারে।
তাই তো রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তি, বস্তু এমনকি জায়গার নামও পরিবর্তন করে দিতেন।

এ মর্মে কায়েকটি হাদিস পেশ করা হলো:

❂ আবু উমামা ইবনে সাহল ইবনে হুনাইফ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেন না বলে,

لاَ يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ خَبُثَتْ نَفْسِي وَلْيَقُلْ لَقِسَتْ نَفْسِي

“আমার মন বা আত্মা খারাপ বা দুর্বিষহ হয়ে গেছে’ (খবুসাত নাফসি); বরং তার বলা উচিত, “আমার মন বা আত্মা অবসাদগ্রস্ত ও ভারাক্রান্ত হয়েছে” (লাকিসাত নাফসি)।”

[সুনান আউ দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৩৬/ আদব, পরিচ্ছেদ: ৮২. নিজের নাফসকে খাবিস (খারাপ) না বলা সম্পর্কে]

এই হাদিসে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শেখাচ্ছেন ভাষার ব্যবহার ও ইতিবাচক শব্দ চয়নের গুরুত্ব। “খবুসা” (খারাপ বা দুর্বিষহ) শব্দটি নেতিবাচক এবং আত্মার প্রতি খারাপ ধারণা তৈরি করতে পারে। আর “লাকিসা” (ভারাক্রান্ত বা ক্লান্ত) শব্দটি বেশি নমনীয় এবং ইতিবাচক। এটি ইসলামের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির একটি শিক্ষা।

ইমাম ইবনুল কাইয়েম রাহ. বলেন,

فكره رسول الله ﷺ لفظ الخبث؛ لبشاعته، وأرشدهم إلى العدول إلى لفظ هو أحسن منه

“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “খুবস” (দুর্বিষহ, খারাপ বা অপবিত্র) শব্দকে অপছন্দ করেছেন, কারণ এটি অসুন্দর। তিনি তাদের এমন একটি শব্দ ব্যবহারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, যা এর চেয়ে উত্তম।” [আত তুরুকুল হাকিমাহ, পৃষ্ঠা নং ৪১]

❂ ইবনে উমর রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “আসিয়া” عاصية (পপিষ্ঠ বা অবাধ্য নারী) নাম পরিবর্তন করেন এবং বলেন, তুমি জামীলা (সুন্দরী)।” [আল-আদাবুল মুফরাদ, অধ্যায়: অর্থপূর্ণ নাম রাখা এবং কদর্য নাম পরিবর্তন, পরিচ্ছেদ: ৩৬১- আছিয়া নাম পরিবর্তন করা-সহিহ]

❂ ইমাম আবু দাউদ বলেন,

“وغيّر رسول الله اسم العاص، وعزيز، وعتلة، وشيطان، والحكم، وغراب، وشهاب، وحباب، فسماه هاشماً، وسمى حرباً سلماً، وسمى المضطجع المنبعث، وأرضاً يقال لها: عفرة خضرة، وشعب الضلالة سماه شعب الهدى، وبنو الزينة سماهم بني الرشدة، وسمي بني مغوية بني رشدة”] سنن أبي داود (2/ 707 [.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আস (অবাধ্য), আযীয (পরাক্রমশালী), আতলাহ (কর্কশ), শয়তান, হাকাম (বিচারক), গুরাব (কাক), হুবাব (সাপ) ও শিহাব (উল্কা) নামকে পরিবর্তন করে রেখেছেন যথাক্রমে হিশাম (বিধ্বস্তকারী)। তিনি হারব (যুদ্ধ)-এর পরিবর্তে সালাম (শান্তি), মুনবাইছ (জাগ্রত)-কে মুযতাজি‘ (শয়নকারী), আফিরাহ (অনুর্বর) নামক এলাকাকে খাযিরাহ (সবুজ-শ্যামল), দ্বালালাহ (বিপথ ও ভ্রষ্টতা) উপত্যকাকে আল-হুদা (সুপথ), বনু যানিয়াহ (জারজ সন্তান)-এর নাম বনুর-রিশদাহ (নির্মল সন্তান) এবং বনু মুগবিয়াহ (বিপথগামী নারীর সন্তান)-এর বনু রিশদা (হিদায়াতপ্রাপ্ত নারীর সন্তান) নামকরণ করেছেন। [আবুদাউদ, ২/৭০৭]

এমন আরও অনেক হাদিস রয়েছে যেগুলোতে দেখা যায়, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খারাপ অর্থ বোধক বা নেতিবাচক ইঙ্গিত বাহী নামগুলোকে ভালো ও সুন্দর অর্থ বোধক শব্দ দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন।

তাই আমাদের কর্তব্য, সবসময় ইতিবাচক ও সুন্দর শব্দ প্রয়োগ করা।

❑ নেতিবচক শব্দের পরিবর্তে ইতিবাচক শব্দ প্রয়োগের আরও কয়েকটি উদাহরণ:

◆ আরবিতে শূন্য ও বিরান মরুভূমিকে বলা হয় মাফায المَفَاز)ُ)। প্রকৃতপক্ষে এই শব্দটির অর্থ: সাফল্য বা বিপদ মুক্তি । এটা এ কার‍ণ বিরাণ মরুভূমি শব্দটি মনের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে। পক্ষান্তরে মাফায শব্দটি ভয় কাটিয়ে সফলতা, বিপদ মুক্তি ও কল্যাণের বার্তা দেয়।
◆ বিষাক্ত প্রাণী দংশন করলে দংশিত ব্যক্তিকে আরবি ভাষায় সালীম سليم (সুস্থ ও নিরাপদ) বলে অবিহিত করা হয় সুস্থতা আশায়।
◆ আধুনিক ইংরেজিতে রোগীকে বলা হয়, Patient (প্যাশেন্ট) এর অর্থ: ধৈর্যধারণ কারী। এগুলো ইতিবাচক শব্দ প্রয়োগের উদাহরণ।

প্রকৃতপক্ষে ভালো ও ইতিবাচক শব্দ শুনলে মানুষ মানসিকভাবে ভালো অনুভব করে ও প্রশান্তি পায়। আর খারাপ ও নেতিবচাক শুনলে মনের মধ্যে বাজে ফিলিংস তৈরি হয় এবং মানসিকভাবে অশস্তি অনুভব করে। এটা মানবিক স্বভাবগত বিষয়।

তাই আমাদের কর্তব্য, নাম রাখা, কাউকে সম্বোধন করা বা দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে যথাসম্ভব ইতিবাচক শব্দ এবং সুন্দর ভাষা প্রয়োগে কথা বলা এবং নেতিবাচক ও খারাপ শব্দের ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কেউ যদি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী পার্টিকে সাপোর্ট করে সে কি মুসলিম থাকবে

 প্রশ্ন: কেউ যদি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী পার্টিকে সাপোর্ট করে সে কি মুসলিম থাকবে?

উত্তর: কেউ যদি জেনে-বুঝে বিশ্বাস করে যে, ইসলাম কেবল নামাজ, রোজা, হজ-উমরা, দুআ, তাসবিহ, জিকির, গরুর গোশত খাওয়া, খতনা, বিয়ে,‌ তালাক ইত্যাদি ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইসলামের সাথে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, রাষ্ট্র, সংবিধান, বিচার কার্য ইত্যাদির কোনও সম্পর্ক নাই অথবা যদি সে মনে করে, এ সব বিষয়ে ইসলামের বিধান গ্রহণযোগ্য নয় কিংবা বর্তমান যুগে অচল অথবা বিশ্বাস করে যে, এ সব বিষয়ে অন্য কোনও মতবাদ ইসলাম থেকে উন্নত তাহলে সে সর্বসম্মতভাবে কাফির-মুরতাদ (ইসলাম থেকে বিচ্যুত)। চাই সে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম দল, সমাজবাদী/কম্যুনিস্ট পার্টি ইত্যাদি যে দলের সাথেই সম্পৃক্ত থাকুক না কেন।

কেননা কেউ যদি কুরআনের কিছু অংশ মানে আর কিছু অংশ অস্বীকার করে সে কাফির বলে গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّـهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

“তবে কি তোমরা কিতাবের (কুরআনের) কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোন প্রাপ্য নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেওয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।” [সূরা বাকারা: ২৫]

আর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন।

তিনি বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

“হে ইমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ‌ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না। নিশ্চিত রূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” [সূরা বাকারা: ২০৮]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ
“তবে কি তারা জাহেলিয়াতের বিধি-বিধান কামনা করে ? আর দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠতর?”
[সূরা মায়েদা: ৫০]

সুতরাং ব্যক্তিগত বা পারিবারিক টুকিটাকি কিছু বিষয়ে ইসলাম মানবেন আর অন্যান্য সব বিষয়ে শয়তানের অনুসরণ করবেন এতে করে ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে থাকার সম্ভাবনা নাই। (আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমিন)

– ইসলামই একমাত্র চূড়ান্ত সত্য আল্লাহর মনোনীত দ্বীন (জীবন আদর্শ বা জীবন ব্যবস্থা):

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য একমাত্র জীবনাদর্শ হিসেবে ইসলাম দান করেছেন। এটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চূড়ান্ত জীবন ব্যবস্থা। তাই ইসলাম ছাড়া অন্য যত মতবাদ, মতাদর্শ, আইডোলজি এবং থিয়োলজি রয়েছে সবই বাতিল, অগ্রহণযোগ্য ও জাহেলিয়াত হিসেবে প্রত্যাখ্যাত। যেমন: ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, কম্যুনিজম বা সমাজতন্ত্র ইত্যাদি। কোন মুসলিমের জন্য এ সকল মতবাদে বিশ্বাস রাখা জায়েজ নাই। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু (ধর্ম বা মতাদর্শ) অনুসন্ধান করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থ।” [সূরা আলে ইমরান: ৮৫]
ইসলাম হচ্ছে, বিশ্ব মানবতার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট একমাত্র মনোনীত ও গ্রহণীয় জীবন ব্যবস্থার নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّـهِ الْإِسْلَامُ
“আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা বা জীবন আদর্শ) ইসলাম।” [সূরা আলে ইমরান: ১৯]

কিন্তু বাস্তবতা হল, বর্তমানে যারা ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি মতবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে বা এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত তারা অধিকাংশই তাদের মূল আকিদা-বিশ্বাস এবং আদর্শ সম্পর্কে না জেনেই করে থাকে। হয়ত দলের কোন এক নেতার প্রতি ভালবাসা ও অন্ধভক্তি, বিশেষ স্বার্থ উদ্ধার, অর্থকড়ি বা নেতৃত্বের লোভ-লালসা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অনেক সময় পরিস্থিতির চাপে পড়ে এসব দলকে সমর্থন করে। তাই তো দেখা যায়, স্বার্থ সিদ্ধি না হলে বা প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা না পেলে নতুন সুযোগের প্রত্যাশায় এরা একদল থেকে অন্য দলে নাম লেখায়। এদের সমর্থন কোন আদর্শিক পরিচয় বা আকিদা-বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এ জাতীয় লোকরা ইসলাম থেকে বের হবে না। তবে যারা সবকিছু জেনেবুঝে এই সকল ভ্রান্ত রাজনৈতিক মতাদর্শকে মনে-প্রাণে লালন করবে তারা অবশ্যই ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মুরতাদ-কাফের।

– বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য:

আমাদের কর্তব্য, সকল রাজনৈতিক ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীর উর্দ্ধে উঠে এবং সব ধরনের বস্তাপচা জাহেলিয়াত পূর্ণ থিওরি ও মতবাদের বিপরীতে একমাত্র ইসলামকে জীবন আদর্শ হিসেবে মেনে চলার এবং মহান স্রষ্টা আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান জানানো।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ ۖ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
“আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহবান করুন হেকমত (প্রজ্ঞা) ও উপদেশপূর্ণ নম্র কথার মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন সবচেয়ে উত্তম পন্থায়। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তাই ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষ ভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভাল জানেন তাদেরকে, যারা সঠিক পথে আছে।” [সূরা নাহল: ১২৫]

তিনি আরও বলেন,

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّن دَعَا إِلَى اللَّـهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
“যে আল্লাহর দিকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ-মুসলিম তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার হতে পারে?” [সূরা ফুসসিলাত: ৩৩]
এ সম্পর্কে অনেক কুরআনের আয়াত ও হাদিস বিদ্যমান রয়েছে।

🛑 জরুরি সতর্কবার্তা: বর্তমানে কিছু মানুষ ইসলামের নামে রাজনীতি করতে গিয়ে আপাদমস্তক পাশ্চাত্য গণতন্ত্রে হাবুডুবু খায়, ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেও ইসলামি আদর্শকে তেমন একটা অনুসরণ করার প্রয়োজন মনে করে না অথবা জোড়াতালি দিয়ে আইওয়াশ মার্কা কিছু ইসলামি ভাবধারা প্রদর্শন করে করে, কিছু মানুষ আবার নিজেদেরকে তথাকথিত মডারেট মুসলিম ভাবে।‌ এরা ইসলামের নামে সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতি ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থসিদ্ধিতে লিপ্ত রয়েছে। এদের কাছে ইসলাম মুখ্য বিষয় নয়।‌ মুখ্য বিষয় হলো ক্ষমতা দখল এবং বৈষয়িক স্বার্থ। এই সকল ধর্মব্যবসায়ী এবং ধান্দাবাজদের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা অপরিহার্য।

আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামি শরিয়ার সাথে সাঙ্ঘর্ষিক সকল মতবাদ ও মতাদর্শ থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামি আদর্শে জীবন গঠনের মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক আল্লাহর দাসত্বকে বরণ করার পাশাপাশি তাঁর অবারিত সত্য, সুন্দর ও আলোকিত রাজপথের দিকে মানুষকে আহ্বান করার তাওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম। আল্লাহ সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার ও এ জাতীয় ভিডিও শেয়ার এবং অন্যের ভিডিও কনটেন্ট তার অনুমতি ছাড়া নিজের চ্যানেলে আপলোড করার বিধান

 প্রশ্ন: প্রথমত: আমরা ইসলামিক ভিডিওগুলো এডিট করে তাতে ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক ব্যবহার করি। আবার অনেকে মিউজিকের মত ভোকাল সাউন্ড ব্যবহার করে। এগুলো কি জায়েজ হবে? যদি নাজায়েজ হয় তাহলে আমাদের এতো দিনের ভিডিওগুলো কি ডিলিট করতে হবে?

দ্বিতীয়ত: মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ড সহ ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করার বিধান কী?
তৃতীয়ত: আমরা কারো ইউটিউব বা ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিও নিয়ে এডিট করে তাদের লোগো কেটে আমাদের নিজস্ব লোগো ব্যবহার করি। এতে কি বান্দার হক নষ্ট হবে? উত্তরগুলো দিলে অনেক মানুষের উপকার হবে আশা করি।
উত্তর: নিম্নেে এ তিনটি প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া হলো:

❑ ১. ইসলামের দৃষ্টিতে মিউজিক সর্বাবস্থায় হারাম। চাই তা ইসলামি ভিডিও হোক বা সাধারণ কোনও ভিডিও হোক। চাই তাতে সরাসরি মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট বা বাদ্যযন্ত্র, সফটওয়্যার, মোবাইল অ্যাপ ইত্যাদি ব্যবহার করে সাউন্ড ইফেক্ট দেওয়া হোক কিংবা ভোকাল সাউন্ড ব্যবহার করে মিউজিক সাদৃশ্য সাউন্ড দেওয়া করা হোক।

শাইখ ড. আব্দুল্লাহ বিন জিবরিন রাহ. (মৃত্যু: ২০০৯ খৃষ্টাব্দ) কে প্রশ্ন করা হয় যে, মুখ থেকে এমন শব্দ বের করার বিধান কী যা বাদ্যযন্ত্রের শব্দের মতো শোনায়?

উত্তরে তিনি বলেন,
نرى أنه يحرم لأنه يقوم مقام آلات اللهو وهي آلات محرمة تصد عن ذكر الله وما قام مقامها فهو محرم . والله أعلم .
“আমরা মনে করি, এটি হারাম। কারণ এটি বাদ্যযন্ত্রের ভূমিকা পালন করে। আর বাদ্যযন্ত্র এমন এক মাধ্যম যা আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষকে বিরত রাখে এবং যা এর ভূমিকা পালন করে তা-ও হারাম। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।” [islamqa]

মোটকথা, ভিডিওর মধ্যে মিউজিকের ব্যবহার গর্হিত কাজ। আর তা যদি কোন ইসলামিক কনটেন্টে ব্যবহার করা হয় তাহলে তা আরও বেশি গর্হিত কাজ। সুতরাং তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। তবে প্রয়োজন বোধে পশুপাখির ডাক, নদীর শব্দ, সাগর তরঙ্গ, ঝর্ণা পতন, ঝড়ো হাওয়া ইত্যাদি সাউন্ড ইফেক্ট (যেগুলো কোনও মিউজিকের অনুরূপ নয় সেগুলো) ব্যবহারে কোন দোষ নেই ইনশাআল্লাহ ।
সুতরাং ইতোপূর্বে যদি কোন ভিডিওতে মিউজিক বা গান-বাজনা ইত্যাদি ব্যবহার করে ইউটিউব ফেসবুক, টিকটক ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা হয়ে থাকে তাহলে সেগুলো অনতিবিলম্বে ডিলিট করতঃ মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরি। তৎসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা প্রচার করে দিতে হবে যে, তার মিউজিক সম্বলিত ভিডিওগুলো অন্য কেউ আপলোড দিয়ে থাকলে সেও যেন ডিলিট করে দেয়। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহ ক্ষমা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল।

❑ ২. মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ড সহ ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করার বিধান কী?

প্রশ্ন: কিছু ব্লগ বা ফোরামে মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ড সহ ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করা কি বৈধ যদি সেটি সম্পর্কে সতর্ক করা হয় বা শব্দ কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়? এটি কি যথেষ্ট?
উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ। কোনও ওয়েবসাইটের মালিক বা ভিজিটরের জন্য এমন কোনও ভিডিও বা অডিও ক্লিপ শেয়ার করা বৈধ নয়, যাতে মিউজিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে। কারণ এটি পাপ প্রচারে সহায়তার শামিল। ওয়েবসাইটের ভিজিটরদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করা যথেষ্ট নয়। কারণ এটি জানা কথা যে, যারা এই ক্লিপটি ডাউনলোড করবে, তাদের সবাই এই সতর্কতা মেনে চলবে না। ফলে পোস্ট কারী তাদের পাপ করার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

তিরমিজি (৩৫২৯) তার সুনানে বর্ণনা করেছেন এবং এটি আলবানির মতে সহীহ যেখানে আবু বকর সিদ্দিক রা. বলেছেন, “হে আল্লাহর রসুল! আমাকে শিখিয়ে দিন যে আমি সকালে ও সন্ধ্যায় কী বলব।”
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হে আবু বকর, বলো:

اللَّهُمَّ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ ، عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ ، رَبَّ كُلِّ شَيْءٍ وَمَلِيكَهُ ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِي ، وَمِنْ شَرِّ الشَّيْطَانِ وَشِرْكِهِ ، وَأَنْ أَقْتَرِفَ عَلَى نَفْسِي سُوءًا ، أَوْ أَجُرَّهُ إِلَى مُسْلِمٍ

উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা ফাতিরাস-সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্ব, আ-লিমাল-গাইবি ওয়াশ-শাহা-দাহ, লা ইলা-হা ইল্লা-আনত, রাব্বা কুল্লি শাই’য়িন ওয়ামালীকাহু। আউযুবিকা মিন শাররী নাফসী, ওয়া মিন শাররিশ-শায়ত্বানি ওয়া শিরকিহি, ওয়া আন আক্বতারিফা ‘আলা নাফসি সু’আ, আও আজুররাহু ইলা মুসলিম।”
অর্থ: হে আল্লাহ! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা, অদৃশ্য ও প্রকাশ্য বিষয়ের জ্ঞানী। তুমি ছাড়া কোনও উপাস্য নেই। তুমি সবকিছুর প্রভু ও মালিক। আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার নিজের মন্দ থেকে, শয়তানের মন্দ থেকে এবং তার ফাঁদ থেকে। আর আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যেন আমি নিজের উপর কোনও ক্ষতি না করি বা তা কোনও মুসলিমের প্রতি নিয়ে না যাই।” [মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি। সহিহ। দ্রষ্টব্য: সহিহুল জামে। হা/৭৮১৩]

আর নিঃসন্দেহে এই ধরনের ক্লিপ শেয়ার করা অন্যান্য মুসলিমদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়।
আল্লাহু আলাম। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
[এই ফতোয়াটি islamqa থেকে অনুবাদ করা হয়েছে]

❑ ৩. যদি কোনও ভিডিওতে কপিরাইট দেওয়া থাকে বা তাদের ভিডিও কপি করা নিষেধ এমন কোনও নির্দেশনা থাকে তাহলে অবশ্যই কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সেগুলো ব্যবহার করা বৈধ হবে না। অন্যথায় তা হবে অন্যের অধিকার লঙ্ঘন। তবে এমন কপিরাইট বা নিষেধাজ্ঞা না থাকলে তা নিয়ে বৈধ কাজে নিজের প্রয়োজনে কিংবা ইসলামিক কিংবা অন্য যেকোনো উপকারী কনটেন্ট হলে সেগুলো ইসলাম প্রচার বা মানুষের কল্যাণের স্বার্থে প্রচার বা ব্যবহার করতে কোনও আপত্তি নাই ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

দাঁড়িয়ে পানাহার করা কি হারাম বা মাকরূহ

 প্রশ্ন: আমি জানতে চাই, দাঁড়িয়ে বা হেঁটে খানা খাওয়া এবং পান করার ব্যাপার ইসলামের বিধান কী?

উত্তর: দাঁড়িয়ে খাওয়া বা পান করা জায়েজ তবে বসে করা উত্তম। অনেকে মনে করে, দাঁড়িয়ে খাওয়া বা পান করা হারাম (নিষেধ) অথবা মকরুহ (অপছন্দনীয়)। এ ধারণা ঠিক নয়। নিন্মে এ বিষয়ে কতিপয় হাদিস, সেগুলোর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা এবং আলেমদের বক্তব্য তুলে ধরা হল:
❖ দাঁড়িয়ে পানাহার করা জায়েজ। এটিকে মাকরূহ বলা ঠিক নয়:

দলিল নিন্মোক্ত হাদিসগুলো:

❐ ১. আলি রা. হতে বর্ণিত। তিনি দাঁড়িয়ে পান করলেন। অত:পর বললেন,

إِنَّ نَاسًا يَكْرَهُ أَحَدُهُمْ أَنْ يَشْرَبَ وَهُوَ قَائِمٌ ، وَإِنِّي رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَلَ كَمَا رَأَيْتُمُونِي فَعَلْتُ

“কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে পান করাকে অপছন্দ করে। কিন্তু আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঠিক এইভাবে পান করতে দেখেছি, যেভাবে তোমরা আমাকে পান করতে দেখলে।” [সহিহুল বুখারি: ৫৬১৫]

❐ ২. মুসনাদে আহমদে আলি রা. হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি দাঁড়িয়ে পানি পান করলেন:

فَنَظَرَ إِلَيْهِ النَّاسُ كَأَنَّهُمْ أَنْكَرُوهُ فَقَالَ : مَا تَنْظُرُونَ ! إِنْ أَشْرَبْ قَائِمًا فَقَدْ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَشْرَبُ قَائِمًا ، وَإِنْ أَشْرَبْ قَاعِدًا فَقَدْ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَشْرَبُ قَاعِدًا

“তখন কিছু মানুষ তাঁর দিকে এমনভাবে তাকাল যে, বুঝা গেল, তারা যেন এটাকে গর্হিত কাজ মনে করে। তখন তিনি বললেন, তোমরা কী দেখছ? আমি যদি দাঁড়িয়ে পান করি তাহলে (জেনে রাখো যে,) আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দাঁড়িয়ে পান করতে দেখেছি আর আমি যদি বসে পান করি তাহলেও (জেনে রাখ) যে, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বসে পান করতে দেখেছি।” [মুসনাদ আহমদ, হা/৭৯৭, আহমদ শাকের তাহকীক মুসনাদ আহমদে বলেন, এর সনদ সহীহ]

❐ ৩. দাঁড়িয়ে পানি পান করা জায়েজ হওয়ার আরেকটি দলিল:

নাযযাল ইবনে সাবরা হতে বর্ণিত। তিনি আলী ইবনে আবু তালিব রা.-এর সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে,
أَنَّه“ صَلّٰى الظُّهْرَ ثُمَّ قَعَدَ فِي حَوَائِجِ النَّاسِ فِي رَحَبَةِ الْكُوفَةِ حَتّٰى حَضَرَتْ صَلاَةُ الْعَصْرِ ثُمَّ أُتِيَ بِمَاءٍ فَشَرِبَ وَغَسَلَ وَجْهَه“ وَيَدَيْهِ وَذَكَرَ رَأْسَه“ وَرِجْلَيْهِ ثُمَّ قَامَ فَشَرِبَ فَضْلَه“ وَهُوَ قَائِمٌ ثُمَّ قَالَ إِنَّ نَاسًا يَكْرَهُونَ الشُّرْبَ قِيَامًا وَإِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم صَنَعَ مِثْلَ مَا صَنَعْتُ.
“তিনি জোহরের সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি মানুষের নানান প্রয়োজনে কুফা মসজিদের চত্বরে বসে পড়লেন। অবশেষে আসরের সালাত আদায়ের সময় হয়ে গেল। তখন পানি আনা হল। তিনি পানি পান করলেন এবং নিজের মুখমণ্ডল ও উভয় হাত ধৌত করলেন। বর্ণনাকারী আদম এখানে তাঁর মাথা ও দু পায়ের কথা উল্লেখ করেন। অতঃপর বর্ণনাকারী বলেন এরপর আলী রা. দাঁড়ালেন এবং তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় ওজুর উদ্বৃত্ত পানি পান করলেন। এরপর তিনি বললেন, লোকজন দাঁড়িয়ে পান করাকে ঘৃণা করে অথচ আমি যেমন করেছি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তেমন করেছেন।” [সহিহ বুখারি, অধ্যায়: ৭৪/ পানীয়, পরিচ্ছেদ: ৭৪/১৬. দাঁড়ানো অবস্থায় পান করা]
ورواه أحمد (943) عن عبد خير عن عليّ وفيه : … ” ثُمَّ شَرِبَ فَضْلَ وَضُوئِهِ وَهُوَ قَائِمٌ ، ثُمَّ قَالَ: ” أَيْنَ الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُ لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ أَنْ يَشْرَبَ قَائِمًا ؟ ”
وحسنه محققو المسند
ইমাম আহমদ আব্দে খায়র থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন, আলি আ. থেকে। সেখানে রয়েছে:
“এরপর আলী রা. দাঁড়ালেন এবং তিনি দাঁড়ানো অবস্থায় ওজুর উদ্বৃত্ত পানি পান করলেন…।” অতঃপর তিনি বললেন, তারা কোথায় যারা মনে করে যে, দাঁড়িয়ে পান করা উচিৎ নয়?” [মুসনাদে আহমদ, হা/৯৪৩, হাসান]

❐ ৪. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

كُنَّا نَأْكُلُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ نَمْشِي ، وَنَشْرَبُ وَنَحْنُ قِيَامٌ

“রাসুলুল্লাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে আমরা চলতে চলতে আহার করতাম এবং দাঁড়িয়ে পান করতাম।” [সুনান তিরমিযী, হাদিস নাম্বার ১৮৮১, সহীহ-আলবানি]

এ সব হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, রাসুলুল্লাহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবিগণ দাঁড়িয়ে ও হাঁটা অবস্থায় পানাহার করতেন। সুতরাং এটি জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ রইল না।

❖ দাঁড়িয়ে পান করার নিষেধাজ্ঞা:

কিছু হাদিসে দাঁড়িয়ে পান করা ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যেমন আনাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদেরকে দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। [মুসলিম ২০২৪, তিরমিযী ১৮৭৯, আবু দাউদ ৩৭১৭, ইবনে মাজাহ ৩৪২৩, আহমদ ১১৭৭৫] এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। এ মর্মে আরও কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

❖ দাঁড়িয়ে পান করার নিষেধাজ্ঞা এবং বৈধতার হাদিসের মাঝে সমন্বয়:

এই হাদিসগুলোর সমন্বয় সাধান করতে গিয়ে ইমাম নববী রহ. বলেন, “বসে পানাহার করা উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ কিন্তু দাঁড়িয়ে পানাহার করা জায়েজ। দাঁড়িয়ে খাওয়া পান করাকে মাকরূহ বলা ঠিক নয়। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এবং তাঁর সম্মানিত সাহাবিগণ দাঁড়িয়ে ও চলা অবস্থায় পানাহার করেছেন। সুতরাং তারা যে কাজ করেছেন সেটাকে মাকরূহ বা অ পছন্দনীয় বলা মোটেই ঠিক হবে না।”

❑ দাঁড়িয়ে পান করলে বমি করে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ সংক্রান্ত হাদিসটি রহিত:

সৌদি আবরের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. বলেন,

الشرب قاعدًا أفضل، والشرب قائمًا لا بأس به، والحديث الذي فيه الاستقاء منسوخ؛ لأن الأحاديث الصحيحة دلت على أنه ﷺ كان يشرب قائمًا وقاعدًا، من حديث ابن عباس، ومن حديث علي رضي الله عنه فلا بأس أن يشرب قاعدًا وقائمًا، والقعود أفضل، أما: فليستقيء

“বসে পান করা উত্তম। দাঁড়িয়ে পান করায় কোনও অসুবিধা নেই। আর যে হাদিসে বমি করার কথা এসেছে তা মানসুখ (রহিত)। কারণ ইবনে আব্বাস রা. ও আলি রা থেকে একাধিক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে ও বসে পানি পান করেছেন। সুতরাং দাঁড়িয়ে ও বসে পান করতে কোনও অসুবিধা নেই। বসা উত্তম। আর যে হাদিসে বলা হয়েছে যে, فليستقيء (যেন বমি করে দেয়) তা রহিত।” [binbaz]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মাটির তৈরি বিস্কুট বা ছিকর খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা এবং এ সংক্রান্ত ইসলামি বিধান

 প্রশ্ন: ইদানীং ফেসবুকে মাটির তৈরি বিস্কুট খাওয়ার ভিডিও চোখে ‌‌‌‌পড়ছে।কুরআন-হাদিসের আলোকে এই বিস্কুট খাওয়া জায়েজ কি?

উত্তর: নিম্নে মাটির তৈরি বিস্কুট কী এবং তা কোথায় কীভাবে তৈরি করা হয়, এটি খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা এবং এ সংক্রান্ত ইসলামের বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো: وبالله التوفيق

❑ মাটির তৈরি বিস্কুট কী? তা কোথায় এবং কীভাবে তৈরি করা হয়?

বিস্কুট বলতে কেউ বিশ্বাস করবে না যে, মাটি দিয়ে বিস্কুট তৈরি করা হয় এখনো। শুনতে অবাক লাগলেও বিষয়টি কিন্তু সত্য। সত্তর কি আশির দশকে খিদে মেটাতে তৈরি হত পোড়া মাটির বিস্কুট।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার যোগিবিল গ্রামের শব্দকর সম্প্রদায়ের ময়না রানী শব্দকর উন্নজুলী শব্দকর, রত্না শব্দকর ও ছায়া রানী শব্দকরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়: (যাদের পেশা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বাদ্য বাজানো তাদেরকে শব্দকর বলা হয়)

টিলার ভেতরে গর্ত করে বা নদীর বালি সরিয়ে নিচ থেকে সংগ্রহ করা হয় মিহি নরম মাটি। তাকে জলে ভিজিয়ে প্রথমে তৈরি করা হয় মণ্ড। স্বাদের ভিন্নতার জন্য মাটির মিশ্রণ তৈরির সময় গোলাপজল, আদার রস ও ক্ষেত্র বিশেষে অল্প পরিমাণ চিনি ইত্যাদি মেশানো হয়। এই মণ্ড থেকেই বিভিন্ন আকারের কাটার পর কাঁচা বিস্কুটগুলো রোদে দেওয়া হয়। দু-এক দিন শুকানোর পর একটি মাটির হাঁড়ির নিচের অংশ ভেঙে সেখানে লোহার শিক দিয়ে তৈরি চালুনি বসানো হয়। বিস্কুট ও ছিকরগুলো ওই চালুনির ওপর বসানো হয়। তারপর হাঁড়িটি রাখা হয় চুলার উপরে। ধানের তুষ দিয়ে আগুন জ্বালানো হয় গর্তে। সতর্কতার সঙ্গে বর্গাকার বিস্কুট, আবার কখনো লজেন্সের মতো ছিকরের গায়ে শুধু ধোঁয়া লাগানো হয়। দুই ঘণ্টা পর কালচে রং ধারণ করে। সুঘ্রাণ তৈরি হয়।

রমেন্ড শব্দকর বলেন, দরিদ্র মানুষজন মাটির বিস্কুট খেয়েও তাদের পেট ভরাত। মাটি পোড়া মাটির বিস্কুট তৈরি করে বাজারজাত করতেন। কারণ সন্তানসম্ভবা মহিলাদের কাছে বেশ মুখরোচক বলে জনপ্রিয় ছিল।” [desh.tv]

এই মাটির তৈরি বিস্কুটকে ছিকরও বলা হয়। ছিকর শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ ছিয়া অর্থ কালো এবং কর মানে মাটি থেকে। ছিয়াকর শব্দটিই পরে ছিকর হিসেবে পরিচিতি পায়। [bbarta24]

শুধু বাংলাদেশের সিলেট, মৌলবি বাজার, হবিগঞ্জ ইত্যাদি এলাকা নয় বরং আমেরিকার হাইতি এবং আফ্রিকার বহু দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই মাটি খেয়ে জীবন ধারণ করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাইতির ছোটবড় সবাই মাটির বিস্কুট খায়। দেশটির প্লাতেও এলাকায় মেলে এক প্রকার হলুদ মাটি। এই মাটি দিয়ে তৈরি হয় বিস্কুট। তাদের ধারণা এই মাটিতে ক্যালসিয়াম রয়েছে। ফলে কয়েক বছর ধরে সে দেশের গর্ভবতী মহিলাদেরও এই মাটি খাওয়ানো হচ্ছে।

বিশেষ এই হলুদ মাটির সঙ্গে কেউবা সামান্য লবণ, আবার কেউ তেল ও লবণ দিয়ে এক ধরনের মণ্ড তৈরি করে। সেই মণ্ড দিয়ে বিস্কুটের মতো বানিয়ে রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর সেগুলো খাওয়া হয়। [risingb]

❑ মাটির বিস্কুট খাওয়া কি স্বাস্থ্য সম্মত?

প্রচলিত ধারণা ছিল, মাটির বিস্কুট বা ছিকর রক্তশূন্যতা দূর করে, খনিজের যোগান দেয়। গর্ভাবস্থায় যথেষ্ট প্রয়োজন হয় খনিজের। তাই অনেকে বিশ্বাস করত মাটির তৈরি বিস্কুট ছিকর খেলে রোগ-বালাই থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এই কারণেই অনেক ছোট্ট বাচ্চাদের খাওয়ানো হয় এই বিস্কুট।

কিন্তু এসব ধারণার পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক বা আধুনিক চিকিৎসার ব্যাখ্যার মিল নেই।

মাটির এই বিস্কুট খাওয়া স্বাস্থ্যকর কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন বলেন, “মাটি যত উন্নত মানের হোক না কেন, এতে ভাইরাস বা কৃমির ডিম থাকতে পারে। এই মাটির বিস্কুট খাওয়া ক্ষতিকর কি না, তা নিয়ে কোনো পরীক্ষামূলক তথ্য নেই। অনেক এলাকায় অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এই বিস্কুট খান। এতে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা হতে পারে।” [প্রথম আলো]

চিকিৎসকরা আরও বলেন, এতে অপুষ্টি জনিত সমস্যা হতে পারে। মাটিতে হেলমিথ নামক ব্যাকটেরিয়া জন্মে যা অপুষ্টির কারণ। কয়েক বছর আগে এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদক প্রতিবেদন তৈরির সময় খেয়েছিলেন এই বিস্কুট। তিনি লিখেছেন, মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এটি গলে যায়। কিন্তু একটা দীর্ঘসময় শরীর ও জিহ্বায় অস্বস্তিকর অনুভূতি লেগে থাকে। [risingbd]

❑ ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মাটি খাওয়ার বিধান:

মাটি খাওয়ার উদ্দেশ্য ভেদে তার বিধান ভিন্ন ভিন্ন হবে। যথা:

❂ ১. যদি বিশেষ কোনও রোগের ক্ষেত্রে কাদা-মাটি, ধুলোবালি ইত্যাদি খেলে উপকার হবে বলে স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বা বাস্তব অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত হয় তাহলে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সতর্কতার সাথে এগুলো কেবল যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু খেতে কোন বাধা নেই। এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নাই।

❂ ২. অনুরূপভাবে এছাড়া যদি জীবনধারণের বিকল্প কিছু না থাকে এবং এগুলো খেয়ে সাময়িকভাবে জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয় তাহলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে কোন আপত্তি নেই। কারণ তা জরুরত বা অপারগ অবস্থা।

❂ ৩. অন্যথায় খাওয়া মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। কেননা এগুলো কোন উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য নয়। কোন সুস্থ রুচি সম্পন্ন মানুষ এসব জিনিস কে সাধারণ খাবার হিসেবে গ্রহণ করে না।

❂ ৪. কিন্তু যদি এসব খেলে শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি হয় বা শরীরে রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হয় তাহলে তা খাওয়া হারাম। কেননা ইসলামে এমন কোন কিছু খাওয়া শরিয়তসম্মত নয় যা মানব দেহের ক্ষতি সাধন করে বা জীবন নাশ করে।

কিন্তু সরাসরি হারাম বলা যাবে না এ কারণে যে, এ ব্যাপারে কোন বিশুদ্ধ দলিল নেই। আর ইসলামের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো,
الأصل في الأشياء الإباحة حتى يدل الدليل على التحريم
“দুনিয়ার সব কিছুই হালাল যতক্ষণ পর্যন্ত হারাম হওয়ার পক্ষে সুস্পষ্ট দলিল না থাকে।”

এই মূলনীতির পক্ষে দলিল হলো, ইবনে আব্বাস রা. সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলি যুগের লোকেরা কিছু জিনিস খেতো এবং ঘৃণাবশত কিছু জিনিস পরিহার করতো। এ অবস্থায় আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করলেন ও তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করে তাতে কিছু জিনিস হালাল করলেন ও কিছু জিনিস হারাম করলেন।

فَمَا أَحَلَّ فَهُوَ حَلَالٌ، وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ، وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْوٌ ”

“অতএ তিনি যা হালাল করেছেন তা হালাল এবং যা হারাম করেছেন তা হারাম। আর যেগুলো সম্পর্কে নীরব থেকেছেন এগুলোতে ছাড় দেওয়া হয়েছে।” (অর্থাৎ সেগুলো খাওয়া-না খাওয়া ইচ্ছাধীন বিষয়) অতঃপর ইবনে আব্বাস রা. তিলাওয়াত করেন:
قُلْ لَا أَجِدُ فِيمَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا..
’’আপনি বলুন, আমার নিকট যে ওহি এসেছে তাতে এমন কোনো জিনিস পাইনি যা আহার করা কারো জন্য হারাম…।’’ আয়াতের শেষ পর্যন্ত। [সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত), অধ্যায়: ২২/ খাদ্যদ্রব্য, পরিচ্ছেদ: ৩১. যেসব জিনিসের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আসেনি]

অতএব মাটি কিংবা মাটি দ্বারা বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরিকৃত বিস্কুট খাওয়ার ক্ষেত্রে উপরোক্ত ব্যাখ্যা প্রযোজ্য।

হাম্বলি মাজহাবের বিখ্যাত ফকিহ ইমাম ইবনে কুদামা রাহ. বলেন,

” قال أحمد: أكره أكل الطين، ولا يصح فيه حديث، إلا أنه يضر بالبدن، ويقال : إنه رديء ، وتركه خير من أكله

“ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেছেন, মাটি খাওয়াকে আমি মাকরুহ বা অপছন্দনীয় মনে করি। তবে এ বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস বর্ণিত না হলেও তা দেহের জন্য ক্ষতিকর।
অথবা বলা যেতে পারে, এটা একটা বাজে জিনিস। তাই তা খাওয়ার থেকে না খাওয়াই ভালো।” [আল মুগনি ৯/৪২৯]

সুতরাং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সখের বশবর্তী হয়ে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই মাটি (মাটির তৈরি বিস্কুট বা ছিকর) খাওয়া থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate