Saturday, November 8, 2025

উমরাহ করার সুন্নত সম্মত পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ইসলামী শরীয়তে দুইটি শর্ত পূরণ হওয়া ছাড়া বান্দার কোন ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না:

.
(১).আল্লাহর জন্য মুখলিস (একনিষ্ঠ) হওয়া। অর্থাৎ সে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালকে উদ্দেশ্য করা; প্রদর্শনেচ্ছা বা প্রচারপ্রিয়তার উদ্দেশ্যে না করা অথবা অন্য কোন দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে না করা।আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “অথচ তাদেরকে এই আদেশই দেওয়া হয়েছিল যে, অন্য সব (ধর্ম) থেকে বিমুখ হয়ে দ্বীনকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে।”[সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫] ইখলাস (একনিষ্ঠতা) মানে হলো — বান্দার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সকল বচন ও কর্মের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ“তার কাছে কারো এমন কোনো অনুগ্রহ থাকে না, যার প্রতিদান দিতে হবে (অর্থাৎ, সে কারো কাছ থেকে এরূপ কোনো অনুগ্রহ পেতে চায় না); সে শুধু তার সুউচ্চ প্রভুর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে।”[সূরা আল-লাইল, আয়াত: ১৯–২০] তিনি আরও বলেনঃ“আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাদেরকে খাওয়াই; আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।”[সূরা আল-ইনসান, আয়াত: ৯] হাদিসে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃআমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি “আমলসমূহের শুদ্ধাশুদ্ধি কেবল নিয়তের উপরই নির্ভর করে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যা সে নিয়ত করে, তাই তার প্রাপ্য। সুতরাং যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে বা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে, তবে সে যে উদ্দেশ্যে হিজরত করেছে, সেটাই তার হিজরতের প্রতিফল হিসেবে গণ্য হবে।”(সহিহ বুখারী, ওহীর সূচনা অধ্যায় হা/১)
.
(২).কথা ও কাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ বা আদর্শ জানা ছাড়া তাঁকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি উমরা, হজ্ব বা অন্যকোন ইবাদত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চায় তার কর্তব্য হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ শিখে নেয়া; যাতে তার আমল রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক হয়।হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে:“যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে, যার উপর আমাদের নির্দেশনা (শরিয়ত) নেই—সেটা প্রত্যাখ্যাত।”(সহিহ মুসলিম হা/৩২৪৩)
.
মহান আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ)-এর প্রদত্ত পদ্ধতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট কার্যক্রম সম্পাদন করাকে ‘হজ্জ’ বলে। আর বায়তুল্লাহ সাফা-মারওয়া ত্বাওয়াফ এবং মাথার চুল চেঁছে ফেলা কিংবা খাটো করার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করাকে ‘উমরাহ’ বলে। নিম্নে আমরা রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাহর আলোকে উমরাহ আদায়ের পদ্ধতি সংক্ষেপে তুলে ধরব। শারঈ দৃষ্টিকোন থেকে চিন্তা ভাবনা করলে উমরার কাজ সর্বমোট চারটি:
.
(১).ইহরাম: ইহরাম মানে হচ্ছে- নুসুকে তথা হজ্ব বা উমরাতে প্রবেশের নিয়ত। কেউ যদি ইহরাম করতে চায় তখন সুন্নত হচ্ছে- সে ব্যক্তি কাপড়-চোপড় ছেড়ে ফরজ গোসলের মত গোসল করবে, মাথা বা দাঁড়িতে মিসক বা অন্য যে সুগন্ধি তার কাছে থাকে সেটা লাগাবে। সুগন্ধির আলামত যদি ইহরাম করার পরেও থেকে যায় তাতে কোন অসুবিধা নেই। যেহেতু সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইহরাম করতে চাইতেন তখন নিজের কাছে সবচেয়ে ভাল যে সুগন্ধিটা আছে সেটা ব্যবহার করতেন। ইহরাম করার পরে আমি তাঁর মাথা ও দাঁড়িতে সে সুগন্ধির ঝিলিকদেখতে পেতাম।”(সহিহ বুখারি হা/২৭১; ও সহিহ মুসলিম হা/১১৯০) নর-নারী উভয়ের ক্ষেত্রে ইহরামের জন্য গোসল করা সুন্নত। এমনকি হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত নারীদের ক্ষেত্রেও।কেননা আসমা বিনতে উমাইস (রাঃ) নিফাসগ্রস্ত ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইহরামের জন্য গোসল করার ও রক্ত প্রবাহের স্থান একটি কাপড় দিয়ে বেঁধে নিয়ে ইহরাম করার নির্দেশ দিয়েছেন।”(সহিহ মুসলিম হা/১২০৯)
.
গোসল ও সুগন্ধি ব্যবহারের পর ইহরামের কাপড় পরিধান করবে। এরপর ফরজ নামাযের ওয়াক্ত হলে ফরজ নামায আদায় করবে। ফরজ নামাযের ওয়াক্ত না হলে ওজুর সুন্নত হিসেবে দুই রাকাত নামায আদায় করবে। নামাযের পর কিবলামুখি হয়ে ইহরাম বাঁধবে। ইচ্ছা করলে বাহনে (গাড়ীতে) উঠে যাত্রার প্রাক্কালে ইহরাম করতে পারেন। তবে মীকাত থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার আগে ইহরাম করতে হবে।এরপর বলবেন:لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ بِعُمْرَةٍ “লাব্বাইকাল্লাহুম্মা বি উমরাতিন” (অর্থ- হে আল্লাহ! উমরাকারী হিসেবে আপনার দরবারে হাজির)। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে তালবিয়া পড়েছেন সেভাবে তালবিয়া পড়বে। সেই তালবিয়া হচ্ছে-لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لا شَرِيكَ لَكَ”লাব্বাইকাল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকালা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক। লা শারিকা লাক।”(অর্থ- হে আল্লাহ! আমি আপনার দরবারে হাজির। আমি আপনার দরবারে হাজির। আমি আপনার দরবারে হাজির। আপনি নিরঙ্কুশ। আমি আপনার দরবারে হাজির। নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা, যাবতীয় নেয়ামত আপনার-ই জন্য এবং রাজত্ব আপনার-ই জন্য। আপনি নিরঙ্কুশ।) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামআরও একটি তালবিয়া পড়তেন সেটা হচ্ছে-لَبَّيْكَ إِلَهَ الْحَقِّ “লাব্বাইকা ইলাহাল হাক্ব (অর্থ- ওগো সত্য উপাস্য! আপনার দরবারে হাজির)। ইবনে উমর (রাঃ) আরেকটু বাড়িয়ে বলতেন:لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ بِيَدَيْكَ وَالرَّغْبَاءُ إِلَيْكَ وَالْعَمَلُ”লাব্বাইকা ওয়া সাদাইক। ওয়াল খাইরু বি ইয়াদাইক। ওয়ার রাগবাউ ইলাইকা ওয়াল আমাল। (অর্থ- আমি আপনার দরবারে হাজির, আমি আপনার সৌজন্যে উপস্থিত। কল্যাণ আপনার-ই হাতে। আকাঙ্ক্ষা ও আমল আপনার প্রতি নিবেদিত)। পুরুষেরা উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়বে। দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: জিব্রাইল (আঃ) এসে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন আমি যেন আমাদের সাহাবীদেরকে ও আমার সঙ্গিদেরকে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়ার আদেশ দিই।[সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে হা/১৫৯৯) আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন] আরেকটি দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “উত্তম হজ্ব হচ্ছে আল-আজ্জ ও আল-সাজ্জ।”(সহিহুল জামে গ্রন্থে হা/১১১২) আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন] আল-আজ্জ (العَجّ) শব্দের অর্থ হচ্ছে- উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া। আর আল-সাজ্জ (الثَجّ) শব্দের অর্থ হচ্ছে- হাদির রক্ত প্রবাহিত করা।
.
আর নারী এতটুকু জোরে তালবিয়া পড়বে যাতে পাশের লোক শুনতে পায়। তবে পাশে যদি কোন বেগানা পুরুষ থাকে তাহলে তারা মনে মনে তালবিয়া পড়বে। যে ব্যক্তি ইহরাম করতে যাচ্ছেন তিনি যদি কোন প্রতিবন্ধকতা যেমন রোগ, শত্রু বা গ্রেফতার ইত্যাদি কারণে নুসুক তথা হজ্ব বা উমরা শেষ করতে না পারার আশংকা করেন তাহলে ইহরাম বাঁধার সময় শর্ত করে নেয়া বাঞ্ছনীয়। ইহরামকালে তিনি বলবেন:إِنْ حَبَسَنِيْ حَابِسٌ فَمَحِلِّيْ حَيْثُ حَبَسْتَنِيْ”ইন হাবাসানি হাবেস ফা মাহিল্লি হাইসু হাবাসতানি (অর্থ- যদি কোন প্রতিবন্ধকতা- যেমন রোগ, বিলম্ব ইত্যাদি আমার হজ্ব পালনে- বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে আমি যেখানে প্রতিবন্ধকতার শিকার হই সেখানে ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাব)। কেননা দুবাআ বিনতে যুবাইর (রাঃ) অসুস্থ থাকায় ইহরাম বাঁধাকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে শর্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন: “তুমি যে শর্ত করেছ সেটা তোমার রবের নিকট গ্রহণযোগ্য।”(সহিহ বুখারি হা/৫০৮৯) ও সহিহ মুসলিম হা/১২০৭) যদি ইহরামকারী শর্ত করে থাকে এবং নুসুক সম্পন্ন করণে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় তাহলে সে ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাবে। এতে করে তার উপর অন্য কোন দায়িত্ব আসবে না। আর যদি নুসুক সম্পন্ন করণে কোন প্রতিবন্ধকতার আশংকা না থাকে তাহলে শর্ত না করাই বাঞ্ছনীয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শর্ত করেননি এবং সাধারণভাবে সবাইকে শর্ত করার নির্দেশ দেননি।দুবাআ বিনতে যুবাইর (রাঃ) অসুস্থ হওয়ার কারণে শুধু তাকে শর্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইহরামকারীর উচিত অধিক তালবিয়া পাঠ করা। বিশেষতঃ সময় ও অবস্থার পরিবর্তনগুলোতে। যেমন উঁচুতে উঠার সময়। নীচুতে নামার সময়। রাত বা দিনের আগমনকালে। তালবিয়া পাঠের পর আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত প্রার্থনা করা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। উমরার ক্ষেত্রে ইহরামের শুরু থেকে তওয়াফ শুরু করার আগ পর্যন্ত তালবিয়া পড়া বিধান রয়েছে।তওয়াফ শুরু করলে তালবিয়া পড়া ছেড়ে দিবে। মক্কায় প্রবেশের জন্য গোসল: মক্কার কাছাকাছি পৌঁছলে সম্ভব হলে মক্কায় প্রবেশের জন্য গোসল করে নিবে। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা প্রবেশের সময় গোসল করেছিলেন।”(সহিহ মুসলিম হা/ ১২৫৯)
.
(২).তাওয়াফ: মসজিদে হারামে প্রবেশের সময় ডান পা আগে দিবে এবং বলবে:بِسْمِ اللهِ والصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ الَّلهُمَّ اغْفِرْ لِيْ ذُنُوْبِيْ وافْتَحْ لِى أَبْوَابَ رَحْمَتِكَأَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ”(অর্থ- আল্লাহর নামে শুরু করছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! আমার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আমার জন্য আপনার রহমতের দুয়ারগুলো খুলে দিন। আমি বিতাড়িত শয়তান হতে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর মহান চেহারারমাধ্যমে, তাঁর অনাদি রাজত্বেরমাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।) এরপর তওয়াফ শুরু করার জন্য হাজারে আসওয়াদের দিকে এগিয়ে যাবে। ডান হাত দিয়ে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করবে ও চুমু খাবে। যদি হাজারে আসওয়াদে চুমু খেতে না পারে হাত দিয়ে স্পর্শ করবে ও হাতে চুমু খাবে (স্পর্শ করার মানে হচ্ছে- হাত দিয়ে ছোঁয়া)। যদি হাত দিয়ে স্পর্শ করতে না পারে তাহলে হাজারে আসওয়াদের দিকে মুখ করে হাত দিয়ে ইশারা করবে এবং তাকবির বলবে; কিন্তু হাতে চুমু খাবে না। হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করার ফজিলত অনেক। দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “আল্লাহ তাআলা হাজার আসওয়াদকে পুনরুত্থিত করবেন। তার দুইটি চোখ থাকবে যে চোখ দিয়ে পাথরটি দেখতে পাবে।তার একটি জিহ্বা থাকবে যে জিহ্বা দিয়ে পাথরটি কথা বলতে পারবে। যে ব্যক্তি সঠিকভাবে পাথরটিকে স্পর্শ করেছে পাথরটি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে।(আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) আল-তারগীব ও আল-তারহীব (১১৪৪) গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)। তবে উত্তম হচ্ছে- ভিড় না করা। মানুষকে কষ্ট না দেয়া এবং নিজেও কষ্ট না পাওয়া। যেহেতু হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি উমরকে লক্ষ্য করে বলেছেন- “হে উমর! তুমি শক্তিশালী মানুষ। হাজারে আসওয়াদের নিকট ভিড় করে দুর্বল মানুষকে কষ্ট দিও না। যদি ফাঁকা পাও তবে স্পর্শ করবে; নচেৎ হাজারে আসওয়াদ মুখি হয়ে তাকবীর বলবে।(মুসনাদে আহমাদ হা/১৯১), আলবানী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ‘মানাসিকুল হাজ্জ ও উমরা’ গ্রন্থে হাদিসটিকে ‘কাওয়ি’ (শক্তিশালী) মন্তব্য করেছেন] এরপর ডানদিক ধরে চলতে থাকবে। বায়তুল্লাহকে বামদিকে রাখবে। যখন রুকনে ইয়ামেনীতে (হাজারে আসওয়াদের পর তৃতীয় কর্নার) পৌঁছবে তখন সে কর্নারটি চুমু ও তাকবীর ছাড়া শুধু স্পর্শ করবে। যদি স্পর্শ করা সম্ভব না হয় তাহলে কিছুই করতে হবে না বরং তওয়াফ চালিয়ে যাবে; ভিড় করবে না। রুকনে ইয়ামেনী ও হাজারে আসওয়াদের মাঝখানে এলে বলবেন:(رَبَّنَا آَتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآَخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ) (অর্থ- হে আমাদের রব! আমাদিগকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা করুন।)[সুনানে আবু দাউদ, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ ‘সহিহ আবু দাউদ’ গ্রন্থে হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন] যখনই হাজারে আসওয়াদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে তখনই হাজারে আসওয়াদ অভিমুখী হয়ে তাকবীর বলবে। তওয়াফের অন্য অংশে যা কিছু খুশি যিকির, দুআ ও কুরআন তেলাওয়াত করবে। বায়তুল্লাহতে তওয়াফের বিধান দেয়া হয়েছে আল্লাহর যিকিরকে সমুন্নত করার জন্য। তওয়াফের মধ্যে পুরুষকে দুইটি জিনিশ করতে হয়।
.
১. তওয়াফের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইজতেবা করা। ইজতেবা মানে- ডান কাঁধ খালি রেখে চাদরের মাঝের অংশ বগলের নীচ দিয়ে এনে চাদরের পার্শ্ব বাম কাঁধের উপর ফেলে দেয়া। তওয়াফ শেষ করার পর চাদর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিবে। কারণ ইজতেবা শুধু তওয়াফের মধ্যে করতে হয়।
২. তওয়াফের প্রথম তিন চক্করে রমল করা। রমল মানে হচ্ছে- ছোট ছোট পদক্ষেপে দ্রুত হাঁটা। আর বাকী চার চক্করে রমল নেই বিধায় স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবে। সাত চক্কর তওয়াফ শেষ করার পর ডান কাঁধ ঢেকে নিয়ে মাকামে ইব্রাহিমে আসবে এবং পড়বে-( وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِإِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ) (অর্থ- আর তোমরা মাকামে ইব্রাহিমকে তথা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও) (সূরা বাকারা: ১২৫)। অতঃপর মাকামে ইব্রাহিমের পিছনে দুই রাকাত নামায আদায় করবে। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরুন পড়বে। দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস পড়বে। নামায শেষ করার পর হাজারে আসওয়াদের নিকট এসে সম্ভব হলে হাজারে আসওয়াদ স্পর্শ করবে। এক্ষেত্রে শুধু স্পর্শ করা সুন্নত। যদি স্পর্শ করা সম্ভবপর না হয় তাহলে ফিরে আসবে; ইশারা করবে না।
.
(৩).সাঈ: ত্বাওয়াফ শেষ হলে এরপর মাসআ (সাঈস্থল) তে আসবে। যখন সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী হবে তখন পড়বে (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ) (অর্থ-“নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শনগুলোর অন্যতম”) (সূরা বাকারা: ১৫৮) এরপর বলবে: (نبدأ بما بدأ الله به)(অর্থ- আল্লাহ যা দিয়ে শুরু করেছেন আমরাও তা দিয়ে শুরু করছি) অতঃপর সাফা পাহাড়ে উঠবে যাতে করে কাবা শরিফ দেখতে পায়। কাবা নজরে আসলে কাবাকে সামনে রেখে দুই হাত তুলে দুআ করবে। দুআর মধ্যে আল্লাহর প্রশংসা করবে এবং যা ইচ্ছা দুআ করবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর মধ্যে ছিল-لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ.”লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ। লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহ, আনজাযা ওয়াদাহ, ওয়া নাসারা আবদাহ, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদা।(অর্থ- “নেই কোন উপাস্য এক আল্লাহ ব্যতীত। তিনি নিরঙ্কুশ। রাজত্ব তাঁর-ই জন্য। প্রশংসা তাঁর-ই জন্য। তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। নেই কোন উপাস্য এক আল্লাহ ছাড়া। তিনি প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সর্ব দলকে পরাজিত করেছেন)(সহিহ মুসলিম হা/১২১৮)। এই যিকিরটি তিনবার উচ্চারণ করবেন এবং এর মাঝে দুআ করবেন। একবার এই যিকিরটি বলবেনএরপর দোয়া করেন। দ্বিতীয়বার যিকিরটি বলবেন এবং এরপর দুআ করবেন। তৃতীয়বার যিকিরটি বলে মারওয়া পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যাবেন। তৃতীয়বারে আর দুআ করবেন না। যখন সবুজ কালার চিহ্নিত স্থানে পৌঁছবেন তখন যত জোরে সম্ভব দৌঁড়াবেন। কিন্তু কাউকে কষ্ট দিবেন না। দলিল হচ্ছে- হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা-মারওয়ার মাঝখানে সায়ী (প্রদক্ষিণ) করেছেন এবং বলেছেন: “আবতাহ দৌঁড়িয়ে পার হতে হবে।”(সুনানে ইবনে মাজাহ হা/২৪১৯), আলবানী হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন] আবতাহ হচ্ছে- বর্তমানে দুইটি সবুজ রঙে চিহ্নিত স্থান। দ্বিতীয় সবুজ রঙ চিহ্নিত স্থান থেকে স্বাভাবিক গতি হাঁটবে। এভাবে মারওয়াতে পৌঁছবে। মারওয়ার উপরে উঠে কিবলামুখি হয়ে হাত তুলে দুআ করবে। সাফা পাহাড়ের উপর যা যা পড়েছে ও বলেছে এখানে তা তা পড়বে ও বলবে। এরপর মারওয়া থেকে নেমে সাফার উদ্দেশ্যে হেঁটে যাবে। স্বাভাবিকভাবে হাঁটার স্থানে হেঁটে পার হবে; আর দৌঁড়াবার স্থানে দৌঁড়ে পার হবে। সাফাতে পৌঁছার পর পূর্বে যা যা করেছে তা তা করবে। মারওয়ার উপরেও আগের মত তা তা করবে। এভাবে সাত চক্কর শেষ করবে। সাফা থেকে মারওয়া গেলে এক চক্কর। মারওয়া থেকে সাফাতে এলে এক চক্কর। তার সায়ীর মধ্যে যা খুশি যিকির, দুআ, কুরআন তেলাতেয়াত করতে পারবে। জ্ঞাতব্যঃ(إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ) (অর্থ-“নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শনগুলোর অন্যতম”)[সূরা বাকারা: ১৫৮] এই আয়াতটি শুধু সায়ীর শুরুতে সাফার নিকটবর্তী হলে পড়বে। সাফা-মারওয়াতে প্রতিবার আয়াতটি পড়বে না যেমনটি কিছু কিছু মানুষ করে থাকে।
.
(৪): মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা: সাত চক্কর সায়ী শেষ করার পর পুরুষ হলে মাথা মুণ্ডন করবে অথবা মাথার চুল ছোট করবে। মুণ্ডন করলে মাথার সর্বাংশের চুল মুণ্ডন করতে হবে। অনুরূপভাবে চুল ছোট করলে মাথার সর্বাংশের চুল ছোট করতে হবে। মাথা মুণ্ডন করা চুল ছোট করার চেয়ে উত্তম। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য তিনবার দুআ করেছেন; আর চুল ছোটকারীদের জন্য একবার দুআ করেছেন।”(সহিহ মুসলিম হা/১৩০৩) পক্ষান্তরে নারীরা আঙ্গুলের এক কর পরিমাণ মাথার চুল কাটবে। এই আমলগুলোর মাধ্যমে উমরা সমাপ্ত হবে। অতএব, উমরার মধ্যে রয়েছে- ইহরাম, তওয়াফ, সায়ী, মাথা মুণ্ডণ বা মাথার চুল ছোট করা। আমরা আল্লাহ তাআলার প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে নেক আমল করার তাওফিক দেন। তিনি যেন আমাদের আমলগুলো কবুল করে নেন। নিশ্চয় তিনি নিকটবর্তী ও প্রার্থনা কবুলকারী। আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ‘মানাসিকুল হাজ্জ ওয়াল উমরা’ এবং ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এরন‘আল-মানহাজ লি মুরিদিল উমরা ওয়াল হাজ্ব): গৃহীত; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩১৮১৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

নারীরা হজ্জের দিনগুলোর শুরুতে মক্কায় প্রবেশ করার পূর্বে কিংবা হজ্জ উমরাহর মাঝখানে যদি মাসিক শুরু হয়ে যায় তাহলে কি করবেন

 প্রশ্ন: কোন নারী হজ্জের দিনগুলোর শুরুতে মক্কায় প্রবেশ করার পূর্বে কিংবা হজ্জ উমরাহর মাঝখানে যদি তার মাসিক শুরু হয়ে যায় তাহলে তিনি কি করবেন?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর যদি কোনো নারী হায়েয (ঋতুস্রাব) অবস্থায় মীকাত অতিক্রম করেন এবং হজ্ব বা উমরাহ করার নিয়ত করেন, তবে তার জন্য মীকাতেই ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে মক্কায় পৌঁছানোর পরে ইহরাম বাঁধা বা পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা তার জন্য জায়েজ নয়।আর ইহরাম হচ্ছে নুসুকে (হ্জ্জ-উমার কাজে) প্রবেশের নিয়ত করা; ইহরামের কাপড় পরিধান নয়।দুঃখজনক হলেও সত্যি, হজ্জ ও উমরার উদ্দেশ্য নিয়ে মিকাত পার হওয়ার সময় যদি কোনো নারী হায়েযগ্রস্ত হয়ে যান তখন কেউ কেউ এ ধারণা করে ইহরাম করেন না যে, পবিত্র অবস্থায় ইহরাম করা শর্ত। তাই ইহরাম ছাড়া তারা মিকাত অতিক্রম করেন। এটি স্পষ্ট ভুল। কারণ হায়েয ইহরামের প্রতিবন্ধক নয়। বরং হায়েযগ্রস্ত নারীও ইহরাম করবেন এবং অন্যেরা যা যা করে তিনিও তা তা করবেন শুধু বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করবেন না; সালাত আদায় করবেন না,পবিত্র হওয়ার পরে তাওয়াফ করবেন। যদি কোনো নারী ইহরাম না বেঁধে মিকাত পার হয়ে যান তাহলে তার উপর ওয়াজিব হল পুনরায় মিকাতে ফিরে আসা। যদি তিনি ফিরে না আসেন তাহলে একটি ওয়াজিব ছেড়ে দেয়ার কারণে তার উপর মক্কায় দম (পশু উৎসর্গ) দেয়া ওয়াজিব।সুতরাং নারী হায়েজগস্থ হলেও তিনি মীকাত থেকে ইহরাম বেধে এরপর তিনি মক্কায় এসে হজ্জের যাবতীয় আমল সম্পাদন করবেন;শুধুমাত্র বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাঈ (প্রদক্ষিণ) করা ব্যতীত।এই দুই আমল তিনি হায়েয (ঋতুস্রাব) থেকে পবিত্র হওয়ার পর পর্যন্ত স্থগিত রাখবেন।আর যদি কোনো নারীর ইহরাম গ্রহণের পর, কিন্তু তাওয়াফের আগে হায়েয শুরু হয়, তিনিও একইভাবে তাওয়াফ ও সাঈ বিলম্বিত করবেন যতক্ষণ না পবিত্র হন।কিন্তু যে নারী তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর হায়েযে আক্রান্ত হন, তিনি হায়েয অবস্থাতেই সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাঈ সম্পন্ন করবেন—এতে কোনো অসুবিধা নেই।কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং আলেমদের সর্বসম্মত ঐক্যমতের দ্বারা প্রমাণিত যে,হায়েজ (ঋতুস্রাব) যেমন ইহরামের পরিপন্থী নয়।তেমনি বিশুদ্ধ মতে সাঈর জন্যও পবিত্রতা শর্ত নয়। (বিস্তারিত জানতে দেখুন; ফাতওয়া ইসলামিয়্যা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২০২; ইবনু উসাইমীন আল-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৪৪১)
.
জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আসমা বিনতু ‘উমায়স (রাঃ) যুল হুলায়ফাহ্ নামক স্থানে সন্তান প্রসব করলে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ বাকর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি তদানুযায়ী তাকে গোসল করে ইহরাম বাঁধতে বললেন।”(সহিহ মুসলিম হা/২৭৯৯; ই.ফা. ২৭৭৬, ই.সে. ২৭৭৪) হাদিসটির ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “(نفست) অর্থ: তিনি প্রসব করলেন। এতে প্রমাণিত হয়: মাসিকগ্রস্ত (حائض) এবং প্রসূতি (نفساء) নারীর ইহরাম সঠিক, এবং ইহরামের জন্য তাদের গোসল করা মুস্তাহাব।”(গৃহীত; ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-৪৯৯৯২)
.
অপর বর্ননায় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহধর্মিণী ‘আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন, আমরা বিদায় হজ্জের সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বের হয়ে ‘উমরাহ’র নিয়্যাতে ইহ্‌রাম বেধেছিলাম….. এরপর আমি মক্কায় ঋতুবতী অবস্থায় পৌঁছলাম। কাজেই বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ার সা’য়ী কোনটিই আদায় করতে সমর্থ হলাম না। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমার অসুবিধার কথা জানালে তিনি বললেনঃ মাথার চুল খুলে নাও এবং তা আঁচড়িয়ে নাও এবং হজ্জের ইহ্‌রাম বহাল রাখ এবং ‘উমরাহ ছেড়ে দাও। আমি তাই করলাম..” (সহীহ বুখারী হা/১৫৫৬; সহীহ মুসলিম হা/১২১১) ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) এটি ‘মাসিকগ্রস্থ ও প্রসূতি নারী কীভাবে ইহরাম বাঁধবে’ (باب كيف تهل الحائض والنفساء) অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। সহীহ বুখারী: ২৫/৩১)
.
হাদিসটির ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:فِي هَذَا دَلِيل عَلَى أَنَّ الْحَائِض وَالنُّفَسَاء وَالْمُحْدِث وَالْجُنُب يَصِحّ مِنْهُمْ جَمِيع أَفْعَال الْحَجّ وَأَقْوَاله وَهَيْئَاته إِلا الطَّوَاف وَرَكْعَتَيْهِ , فَيَصِحّ الْوُقُوف بِعَرَفَاتٍ وَغَيْره كَمَا ذَكَرْنَا , وَكَذَلِكَ الأَغْسَال الْمَشْرُوعَة فِي الْحَجّ تُشْرَع لِلْحَائِضِ وَغَيْرهَا مِمَّنْ ذَكَرْنَا . وَفِيهِ دَلِيل عَلَى أَنَّ الطَّوَاف لا يَصِحّ مِنْ الْحَائِض , وَهَذَا مُجْمَع عَلَيْهِ اهـ“এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, মাসিকগ্রস্ত নারী (الحائض), প্রসূতি নারী (النُّفَسَاء), অযুবিহীন ব্যক্তি (المُحْدِث) এবং জুনুব (বড় নাপাক) ব্যক্তির তাওয়াফ ও তার দুই রাকাআত সালাত ব্যতীত হজ্জের যাবতীয় কথা,কাজ এবং অবস্থা সঠিক।সুতরাং,আরাফাতে অবস্থান করা ও হজ্জের অন্যান্য কাজ,যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, সবই তাদের পক্ষ থেকে সহীহ।তদ্রূপ,হজ্জের সময়ে শরীয়তে নির্ধারিত যেসব গোসল রয়েছে,তা হায়েজগ্রস্ত নারীসহ উপরোক্ত সকল ব্যক্তির জন্যও শরীয়তসম্মত। এছাড়া, এই হাদীস থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয় যে, মাসিকগ্রস্ত নারীর তাওয়াফ সহীহ নয় — এবং এ বিষয়ে আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্য (ইজমা) রয়েছে।”
ইবনু ‘আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,الْحَائِضُ وَالنُّفَسَاءُ إِذَا أَتَتَا عَلَى الْوَقْتِ تَغْتَسِلَانِ، وَتُحْرِمَانِ وَتَقْضِيَانِ الْمَنَاسِكَ كُلَّهَا غَيْرَ الطَّوَافِ بِالْبَيْتِ.”হায়িয ও নিফাসগ্রস্ত নারীরা মীকাত পৌঁছার পর গোসল করবে, ইহরাম বাঁধবে এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ছাড়া (হজ্জের) অন্যান্য সমস্ত কাজ সম্পন্ন করবে।”(আবু দাউদ হা/১৭৪৪; সনদ বিশুদ্ধ)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তার ফাতাওয়া আল-কুবরা-তে বলেছেন:الْحَائِضُ وَالنُّفَسَاءُ أَمَرَهُمَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِالإِحْرَامِ وَالتَّلْبِيَةِ , وَمَا فِيهِمَا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ , وَشُهُودِهِمَا عَرَفَةَ مَعَ الذِّكْرِ وَالدُّعَاءِ , وَرَمْيِ الْجِمَارِ , مَعَ ذِكْرِ اللَّهِ وَغَيْرِ ذَلِكَ , وَلا يُكْرَهُ لَهَا ذَلِكَ , بَلْ يَجِبُ عَلَيْهَا “হায়েজা (ঋতুমতী) নারী ও নেফাসগ্রস্ত (প্রসূতি) নারীকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম বাঁধতে ও তালবিয়া পাঠ করতে আদেশ দিয়েছেন, আর সেগুলোতে আল্লাহর যিকির রয়েছে, তিনি তাদেরকে আল্লাহর যিকর ও দু‘আর সঙ্গে আরাফাতে উপস্থিত হতে, এবং আল্লাহর যিকর সহকারে জামারায় পাথর নিক্ষেপ করতে ও এ-জাতীয় অন্যান্য ইবাদত সম্পাদনে নির্দেশ দিয়েছেন।এসব তাদের জন্য অপছন্দনীয় (মাকরূহ) নয়; বরং তা তাদের জন্য ওয়াজিব (অবশ্যকীয়)।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ ফাতাওয়া আল-কুবরা, খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৭)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: হায়েযগ্রস্ত নারীর হজ্জ করার হুকুম কী?
জবাবে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:
الحيض لايمنع من الحج، وعلى من تحرِم وهي حائض أن تأتي بأعمال الحج، غير أنها لاتطوف بالبيت إلا إذا انقطع حيضها واغتسلت، وهكذا النفساء، فإذا جاءت بأركان الحج فحجها صحيح. “
“হায়েয হজ্জ আদায়ে প্রতিবন্ধক নয়। হায়েয অবস্থায় যে নারী ইহরাম বাঁধেন তিনি হজ্জের সকল আমল সম্পাদন করবেন; শুধু বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ করা ব্যতীত। তাঁর হায়েয শেষ হওয়ার পর ও গোসল করার পর তিনি বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ করবেন। নিফাসগ্রস্ত নারীর হুকুমও একই রকম। যদি হায়েযগ্রস্ত নারী হজ্জের রুকনসমূহ আদায় করেন তাহলে তার হজ্জ সহিহ।”(ফাতাওয়াল লাজনাহ্‌ আদ্‌দায়িমা লিল বুহুস আল-ইলমিয়্যা ওয়াল ইফতা; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ১৭২, ১৭৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
والمرأة التي تريد العمرة لا يجوز لها مجاوزة الميقات إلا بإحرام حتى لو كانت حائضاً، فإنها تحرم وهي حائض وينعقد إحرامها ويصح، والدليل لذلك أن أسماء بنت عميس زوجة أبي بكر – رضي الله عنهما – ولدت والنبي صلى الله عليه وسلّم نازل في ذي الحليفة يريد حجة الوداع، فأرسلت إلى النبي صلى الله عليه وسلّم كيف أصنع؟ قال: اغتسلي واستثفري بثوب وأحرمي.
ودم الحيض كدم النفاس، فنقول للمرأة الحائض – إذا مرت بالميقات وهي تريد العمرة أو الحج نقول لها -: اغتسلي واستثفري بثوب وأحرمي، والاستثفار معناه: أنها تشد على فرجها خرقة وتربطها ثم تحرم سواء بالحج أو بالعمرة، ولكنها إذا أحرمت ووصلت إلى مكة لا تأتي إلى البيت ولا تطوف به حتى تطهر، ولهذا قال النبي صلى الله عليه وسلّم لعائشة حين حاضت في أثناء العمرة قال لها: افعلي ما يفعل الحاج غير أن لا تطوفي في البيت حتى تطهري هذه رواية البخاري ومسلم، وفي صحيح البخاري أيضاً ذكرت عائشة أنها لما طهرت طافت بالبيت وبالصفا والمروة، فدل هذا على أن المرأة إذا أحرمت بالحج أو العمرة وهي حائض أو أتاها الحيض قبل الطواف: فإنها لا تطوف ولا تسعى حتى تطهر وتغتسل، أما لو طافت وهي طاهرة وبعد أن انتهت من الطواف جاءها الحيض: فإنها تستمر وتسعى ولو كان عليها الحيض، وتقص من رأسها، وتنهي عمرتها؛ لأن السعي بين الصفا والمروة لا يشترط له الطهارة. “
“যে নারী হজ্জ আদায় করতে চান তার জন্যে ইহরাম না বেঁধে মীকাত অতিক্রম করা জায়েয হবে না; এমন কি সে নারী যদি হায়েযগ্রস্ত হন তবুও। কেননা তিনি হায়েযগ্রস্ত হলেও ইহরাম বাঁধবেন এবং তার ইহরাম বাঁধা শুদ্ধ হবে। দলিল হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিদায় হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে যুল হুলাইফাতে অবস্থান করছিলেন তখন আবু বকর (রাঃ) এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রাঃ) সন্তান প্রসব করলেন। তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লামের কাছে লোক পাঠালেন: তিনি কি করবেন? তখন তিনি বললেন: আপনি গোসল করে নিন, একটা কাপড় বেঁধে নিন এবং ইহরাম করুন।
নিফাসের রক্ত হায়েযের রক্তের ন্যায়। তাই যে ঋতুবতী নারী উমরা কিংবা হজ্জ পালনের উদ্দেশ্য নিয়ে মীকাত পার হচ্ছে আমরা তাকে বলব: আপনি গোসল করে নিন এবং একটা কাপড় বেঁধে নিন এবং ইহরাম করুন।হাদীছে উল্লেখিত استثفار শব্দটির অর্থ হচ্ছে- লজ্জাস্থানের উপরে একটা কাপড় বেঁধে নিবে। এরপর হজ্জ কিংবা উমরার ইহরাম করবে। কিন্তু, সে নারী মক্কায় পৌঁছার পর পবিত্র হওয়ার আগে বায়তুল্লাহ্‌তে আসবে না এবং তাওয়াফ করবে না। যেহেতু আয়েশা (রাঃ) যখন উমরা পালনকালে হায়েযগ্রস্ত হলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন: “একজন হাজী যা যা করে তুমিও তা তা করবে তবে, পবিত্র হওয়ার আগে বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ করবে না।” এটি সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের বর্ণনা। সহিহ বুখারীর অপর বর্ণনাতে আছে আয়েশা (রাঃ) বলেছেন: “তিনি যখন পবিত্র হয়েছেন তখন তিনি বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ করেছেন ও সাফা-মারওয়া সাঈ করেছেন”। এতে প্রমাণিত হয় যে, কোন নারী যদি হায়েয অবস্থায় ইহরাম বাঁধেন কিংবা তাওয়াফ করার আগে তার মাসিক শুরু হয় তাহলে তিনি পবিত্র হওয়া ও গোসল করার আগে তাওয়াফ করবেন না এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ (প্রদক্ষিণ) করবেন না। আর তিনি যদি পবিত্র অবস্থায় তাওয়াফ করে থাকেন, কিন্তু তাওয়াফ শেষ করার পর তার মাসিক শুরু হয় সেক্ষেত্রে তিনি উমরার আমল চালিয়ে যাবেন এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ করবেন; এমন কি হায়েয অবস্থা সত্ত্বেও। তিনি মাথার চুল ছোট করে উমরার কাজ সমাপ্ত করবেন। কেননা সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে সাঈ করার ক্ষেত্রে পবিত্রতা শর্ত নয়।”(সিত্তুনা সুআলান ফিল হায়যি (সুআল: ৫৪)
.
দ্বিতীয়ত: যে নারী উমরা সমাপ্ত করার আগে তার হায়েয শুরু হয়ে গেছে তিনি কি করবেন।
.
আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, হায়েযের কারণে হজ্জ বা উমরার ইহরাম বাঁধতে কোন বাধা নেই। কিন্তু হায়েযগ্রস্ত নারীর জন্যে পবিত্র হওয়ার আগে বায়তুল্লাহকে তাওয়াফ করা হারাম। কেননা আয়েশা (রাঃ) যখন মক্কাতে প্রবেশ করার আগে হায়েযগ্রস্ত হয়েছেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছেন:“একজন হাজী যা যা করে তুমিও তা তা কর। তবে, তুমি পবিত্র হওয়ার আগে তাওয়াফ করবে না।”(সহিহ বুখারী হা/১৬৬০) সহিহ বুখারীতে আরও সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি যখন পবিত্র হয়েছেন তখন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছেন এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ বা প্রদক্ষিণ করেছেন। এর থেকে জানা গেল যে, কোন নারী তাওয়াফ করার আগে হায়েযগ্রস্ত হলে তিনি পবিত্র হওয়ার আগে তাওয়াফ ও সাঈ করবেন না।
.
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, যদি কোন নারী হজ্জ-উমরাহ অবস্থায় হায়েজগ্রস্ত হয়ে যায় তাহলে তার কর্তব্য হচ্ছে- প্রথমে মাসিক শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। এরপর পবিত্র হলে তিনি গোসল করবেন, তারপর বায়তুল্লাহ তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন এবং সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ করবেন। এরপর চুল কাটবেন। এর মাধ্যমে তিনি তার উমরার কর্ম সমাপ্ত করলেন। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো— তিনি যেহেতু মিকাত থেকে ইহরাম বেঁধেছিলেন, তাই পবিত্র হওয়ার পর মক্কার অন্য কোনো স্থান থেকে নতুন করে ইহরাম বাঁধার প্রয়োজন নেই। বরং তাঁর অবস্থানস্থল থেকেই কাবার দিকে গিয়ে উমরাহর তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন। এছাড়া ইহরাম অবস্থায় মাসিক হওয়ায় তাঁর ওপর কোনো ফিদিয়া বা কাফফারা ওয়াজিব হবে না। হজ্জের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য; অর্থাৎ তিনি হায়েজ অবস্থায় হজ্জের যাবতীয় আমল সম্পূর্ণ করবেন শুধুমাত্র বাইতুল্লাহ তাওয়াফ ছাড়া।তাঁর হায়েয শেষ হওয়ার পর ও গোসল করার পর তিনি বায়তুল্লাহ্‌ তাওয়াফ করবেন। নিফাসগ্রস্ত নারীর হুকুমও একই রকম। যদি হায়েযগ্রস্ত নারী হজ্জের রুকনসমূহ আদায় করেন তাহলে তার হজ্জ সহিহ। পাশাপাশি জেনে রাখা ভাল যে, হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত নারীর উপর বিদায়ী তাওয়াফ নেই। এটি নারীদের জন্য ইসলামী শরিয়তের বিশেষ ছাড়। হায়েযগ্রস্ত নারীর জন্য বিদায়ী তাওয়াফ না করে তার ফ্যামিলির সাথে দেশে ফিরে যাওয়া বৈধ। সুতরাং হে মুসলিম বোন, এ সহজীকরণ ও এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন।(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৮২০১২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

হজ্জ ও ওমরাহ আদায়ের জন্য কিংবা রমাদান মাসে রোযা রাখার সুবিধার্থে ওষুধ খেয়ে নারীদের হায়েয বন্ধ রাখার বিধান

 প্রশ্ন: হজ্জ ও ওমরাহ আদায়ের জন্য কিংবা রমাদান মাসে রোযা রাখার সুবিধার্থে হায়েয (ঋতুস্রাব) বন্ধ রাখার উদ্দেশ্যে যদি কোনো নারী হায়েয-নিবারক ওষুধ বা ট্যাবলেট সেবন করেন, তবে কি এতে গুনাহ হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর স্বাভাবিক অবস্থায় হায়েযের সময় হায়েয-নিবারক ট্যাবলেট সেবন করে ঋতু বন্ধ রাখা উচিত নয়।বরং আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দীদের জন্য যে স্বাভাবিক নিয়ম ও বিধান নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকা এবং সেটাকেই মেনে নেওয়াই উত্তম। কেননা বান্দার প্রকৃত কল্যাণ নিহিত আছে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই। তবে আহালুল আলেমগনের মতে বিশেষ প্রয়োজনে—যেমন হজ্জ, উমরাহ,বা রমজানের শেষ দশক ইবাদত অথবা অন্য কোন জরুরি পরিস্থিতিতে—যদি কোনো অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসকের পরামর্শে এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়, এবং তাতে শারীরিক ক্ষতি বা সন্তান ধারণক্ষমতার কোনো বিপর্যয় না ঘটে, তাহলে শরিয়তে এর অনুমতি আছে। তবে এর দ্বারা ঋতু বন্ধ রাখলে গুনাহ হয়—এ মর্মে শরিয়তে কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই। তবুও একজন ঈমানদার নারীর জন্য উত্তম হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য যে স্বাভাবিক অবস্থার ফয়সালা নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ না করা।এছাড়া, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধরনের ওষুধ অনেক সময় নারীর ঋতুচক্রে অনিয়ম, ব্যথা বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন;لا ضرر ولا ضرار“কোনো ক্ষতি করা যাবে না, আর নিজের বা অন্যের ক্ষতির কারণও হওয়া যাবে না।”(ইবন মাজাহ হা/২৩৪১)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল রমজান মাসে মহিলারা কি মাসিক বন্ধ করার জন্য ওষুধ বা ট্যাবলেট গ্রহণ করতে পারবেন কি না ?
জবাবে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:يجوز أن تستعمل المرأة أدوية في رمضان لمنع الحيض إذا قرر أهل الخبرة الأمناء من الدكاترة ومن في حكمهم أن ذلك لا يضرها، ولا يؤثر على جهاز حملها، وخير لها أن تكف عن ذلك، وقد جعل الله لها رخصة في الفطر إذا جاءها الحيض في رمضان، وشرع لها قضاء الأيام التي أفطرتها ورضي لها بذلك دينا. وبالله التوفيق وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم.”মহিলা রমযান মাসে মাসিক (ঋতুস্রাব) বন্ধ রাখার উদ্দেশ্যে ওষুধ ব্যবহার করতে পারে, যদি বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ অথবা তাদের সমপর্যায়ের বিশেষজ্ঞগণ নিশ্চিত করেন যে এটি তার জন্য ক্ষতিকর নয়, এবং তার প্রজনন-অঙ্গ বা গর্ভধারণের ব্যবস্থায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। তবে তার জন্য উত্তম হলো এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার জন্য ছাড় (রুখসাহ) দিয়েছেন রোযা না রাখার, যখন রমযান মাসে তার মাসিক শুরু হয়। আর যে দিনগুলোতে সে রোজা রাখে না, সে দিনগুলোর কাজা আদায় করার বিধান দিয়েছেন এবং এটাকেই তার জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছেন। আর আল্লাহই তাওফীকদাতা। আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবীগণের উপর শান্তি ও দয়া বর্ষণ করুন।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ; খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ১৫১; ফাতওয়া নং-১২১৬; প্রশ্ন নং: ৫)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: মহিলার জন্য রমজান মাসে মাসিকের রক্ত নিরোধক ট্যাবলেট সেবন করার হুকুম কী, যাতে করে সে তার রোজা সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:لا حرج في ذلك أن تأخذ الحبوب لمنع الحيض حتى تصلي مع الناس وتصوم مع الناس بشرط أن يكون ذلك سليماً لا يضرها عن المشاورة للطبيب، وعن موافقة لزوجها حتى لا تضر نفسها، وحتى لا تعصي زوجها، فإذا كان عن تشاور وعن احتياط من جهة السلامة من الضرر فلا بأس، وهكذا في أيام الحج. “তার জন্য মাসিক নিবারক ট্যাবলেট সেবন করায় কোনো সমস্যা নেই, যাতে করে সে মানুষদের সঙ্গে সালাত পড়তে পারে এবং মানুষদের সঙ্গে রোজা রাখতে পারে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো এই ব্যবস্থাটি নিরাপদ হতে হবে, যা তার কোনো ক্ষতি করবে না।পাশাপাশি এই কাজ (অভিজ্ঞ) ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে এবং স্বামীর সম্মতি নিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। যাতে করে সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে এবং স্বীয় স্বামীর অবাধ্য না হয়। এটি যখন পরামর্শের ভিত্তিতে হবে এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ হওয়ার মতো সতর্কতার ভিত্তিতে হবে, তখন এতে কোনো সমস্যা নেই। অনুরূপভাবে হজের ক্ষেত্রেও একই বিধান।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১৮৬৯৬)
.
অপর একটি প্রশ্নে ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)-জিজ্ঞেস করা হয়েছিল; সবার সাথে যেন হজ্জের কাজ শেষ করা যায় সেজন্য মেয়েদের ট্যাবলেট খাওয়া কি জায়েয আছে?
উত্তরে ইমাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:لا حرج أن تأخذ المرأة حبوب منع الحمل تمنع الدورة الشهرية أيام رمضان حتى تصوم مع الناس ، وفي أيام الحج حتى تطوف مع الناس ولا تتعطل عن أعمال الحج ، وإن وجد غير الحبوب شيء يمنع من الدورة فلا بأس إذا لم يكن فيه محذور شرعاً أو مضرة ” انتهى كلام الشيخ عبد العزيز بن باز “রমজান মাসে মেয়েদের গর্ভ নিরোধক বড়ি খেতে অসুবিধা নেই; যাতে করে মাসিক বন্ধ থাকে ও সবার সাথে রোযা রাখতে পারে। এবং ওমরাহ ও হজ্জের দিনগুলোতে খেতে অসুবিধা নেই; যাতে করে সবার সাথে তাওয়াফ করতে পারে ও হজ্জের কাজ বিঘ্ন না হয়। ট্যাবলেট ছাড়া অন্য কিছু যদি পাওয়া যায়, যা মাসিক বন্ধ রাখে তাহলে সেটাতে তো কোন অসুবিধা নেই; যদি শরিয়ত নিষিদ্ধ কোন কিছু এতে না থাকে কিংবা ক্ষতিকর কিছু না থাকে।(শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায এর বক্তব্য থেকে সংকলিত ও সমাপ্ত; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ৬০; গৃহীত ইসলাম সাওয়াল জবাব ফতোয়া নং-৩৬৬০০)
.
পক্ষান্তরে, আমাদের ইমাম শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) নারীদেরকে এ ধরনের ওষুধ সেবন করে হায়েয বন্ধ রাখার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেছেন। তাঁর মতে, নারীর উচিত আল্লাহ তা‘আলার নির্ধারিত প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং সেটিকে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তনের চেষ্টা না করা। কেননা, যেমন কেউ যদি জোর করে প্রস্রাব বা পায়খানা আটকে রাখে, তাতে যেমন শরীরের ক্ষতি হয়—তেমনি মাসিকের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ রাখাও শারীরিক ক্ষতির কারণ এবং প্রাকৃতিক ব্যবস্থার পরিপন্থী। বরং যখন নারী হায়েজ গ্রস্থ হয়, তখন রোযা ও নামায থেকে বিরত থাকা—এ দুটোই আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী আনুগত্যেরই অংশ। এতে নারীর কোনো ঘাটতি বা দোষ নেই; বরং এটি আল্লাহর বিধানের প্রতি বিনয়, সন্তুষ্টি ও পূর্ণ সমর্পণের প্রতিফলন। আমরা এখানে শাইখের দুটি ফাতওয়া উল্লেখ করছি।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: কোন কোন নারী রমযান মাসে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্যাবলেট খেয়ে মাসিক (হায়েয) বন্ধ করে রাখেন। এ কাজ করার প্ররোচনা হচ্ছে যাতে করে রমযানের রোযা পরে কাযা পালন করতে না হয়। এটা করা কি জায়েয? এক্ষেত্রে কি বিশেষ কোন শর্ত রয়েছে যাতে করে এ নারীগণ এ কাজটি না করেন?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:الذي أراه في هذه المسألة ألا تفعله المرأة وتبقى على ما قدره الله عز وجل وكتبه على بنات آدم فإن هذه الدورة الشهرية لله تعالى حكمة في إيجادها ، هذه الحكمة تناسب طبيعة المرأة فإذا منعت هذه العادة فإنه لا شك يحدث منها رد فعل ضار على جسم المرأة وقد قال صلى الله عليه وسلم : ( لا ضرر ولا ضرار ) هذا بغض النظر عما تسببه هذه الحبوب من أضرار على الرحم كما ذكر ذلك الأطباء ، فالذي أرى في هذه المسألة أن النساء لا يستعملن هذه الحبوب والحمد لله على قدره وحكمته إذا أتاها الحيض تمسك عن الصوم والصلاة وإذا طهرت تستأنف الصيام والصلاة وإذا انتهى رمضان تقضي ما فاتها من الصوم “এ মাসয়ালায় আমার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে— কোন নারী যেন এ কাজটি না করেন। আল্লাহ্‌ যা নির্ধারণ করে রেখেছেন এবং নারী জাতির জন্য যা লিখে রেখেছেন সেটা সেভাবেই থাকুক। কারণ এ মাসিক দেয়ার মধ্যে আল্লাহ্‌র বিশেষ গূঢ় রহস্য রয়েছে। এই গূঢ় রহস্যটি নারীর প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি এই মাসিককে বাধাগ্রস্থ করা হয় নিঃসন্দেহে এর প্রতিক্রিয়ায় নারীর শরীরের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “ক্ষতি করা নয় এবং পাল্টাপাল্টি ক্ষতি করাও নয়”। তাছাড়া এই ট্যাবলেটগুলোর গর্ভাশয়ের উপর ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে যা ডাক্তারগণ উল্লেখ করে থাকেন। তাই এই মাসয়ালায় আমার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে নারীরা যেন এই ট্যাবলেটগুলো ব্যবহার না করেন। আল্লাহ্‌র তাকদীর ও হেকমতের জন্য তার প্রশংসা। যখন কোন নারীর হায়েয শুরু হবে তখন তিনি রোযা ও নামায থেকে বিরত থাকবেন। যখন পবিত্র হবেন তখন রোযা ও নামায পুনরায় শুরু করবেন। যখন রমযান শেষ হবে তিনি রমযানের ছুটে যাওয়া রোযাগুলোর কাযা পালন করবেন।”(ফাতওয়ায় ইসলামিয়া; গৃহীত ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-৭৪১৬)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: একজন মহিলার স্বাভাবিক মাসিকের সময়কাল পনের দিন। যার মধ্যে রমজানের শুরুতে তাঁর মাসিক হয় পাঁচ দিন, আর শেষ দশ দিনে হয় আরও দশ দিন। তিনি চাচ্ছেন রমজানের শেষ দশ দিন নামায, তাহাজ্জুদ ও ই‘তিকাফে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মাসিক বন্ধ রাখার ঔষধ গ্রহণ করবেন। এ অবস্থায় তাঁর জন্য এ ওষুধ গ্রহণের শর‘ঈ হুকুম কী? উল্লেখ্য, তাঁর উদ্দেশ্য রোযা কাযা করার কষ্ট এড়ানো নয়; বরং ইবাদতে অংশগ্রহণ করা।
জবাবে শাইখ বলেন:
بناءً على ما سمعتُ من أطباء ثقات أرى ألا تستعمل هذه الحبوب؛ لأنها ضارة على الرحم، وعلى دم المرأة، وعلى العادة، وعلى الجنين، يعني يقولون: من أسباب تشوُّه الأجنَّة الذي كثر في هذا الزمان تناول هذه العقاقير. فالذي أرى أن لا تستعملها، بل أرى أن ترضى بما قدَّر الله عزَّ وجلَّ من هذا الحيض، وليكن لها أسوة بأم المؤمنين عائشة رضي الله عنها، عائشة في حجة الوداع أحرمت بعمرة كسائر النساء، فأتاها الحيض في أثناء الطريق بـسرف، فدخل عليها النبي صلى الله عليه وسلم وهي تبكي، فقال: (ما لك؟ لعلك نفستِ! – يعني: حضتِ! – قالت: نعم يا رسول الله! قال: هذا شيء كتبه الله على بنات آدم).
ما هو عليك أنت وحدك كتبه الله كتابة شرعية أم كونية؟ كتابة كونية، قدر الله عزَّ وجلَّ بكتابته الأزلية التي كتبها في الأزل أن بنات آدم يحضن، فكأنه يقول: هذا شيء مكتوب، ولا فرار عن المكتوب، فاصبري.ثم أمرها عليه الصلاة والسلام أن تحرم بحج، وتدخل الحج على العمرة لتكون قارنة. الشاهد: أني أقول: لا تستعمل النساء هذه الحبوب؛ لما ثبت عندي من أضرارها، ولأن الرضا بما قدر الله على النساء من الحيض الذي فيه الامتناع عن الصوم وعن الصلاة خير من فعل الأسباب المانعة للحيض.ثم اعلم أيضاً أن كل شيء يكون بمقتضى الطبيعة التي جَبَلَ الله عليها الخلق إذا وجد ما يصادم هذا الشيء فإنه يكون ضرراً على البدن، هذا شيء يعرفه الإنسان، وإن لم يكن طبيباً.
شيء بمقتضى الطبيعة والجِبِلَّة لابد أن يخرج فإن حبسه لا شك أنه ضرر، واعتبر ذلك بما لو كان بولاً أو غائطاً، وأكلتَ حبوباً تمسكه، هل سيؤثر ذلك على البدن؟ نعم، سيؤثر على البدن لا شك، وإن كان ما جاءك بول، ولا غائط؛ لكن سيؤثر انحباسه في العروق، والعادة أنه يخرج، لا شك أنه ضرر، كذلك هذا الدم؛ دم الحيض.فالذي نرى أن النساء يتركنه، والحمد لله إذا أفطَرَت فقد أفطَرَت بأمر الله، وإذا ترَكَت الصلاة فقد ترَكَت الصلاة بأمر الله.
“বিশ্বস্ত চিকিৎসকদের কাছ থেকে যা শুনেছি, তার ভিত্তিতে আমার মত হলো—এই (মাসিক বন্ধের) ট্যাবলেটগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়; কারণ এগুলো জরায়ুর জন্য ক্ষতিকর, নারীর রক্তের জন্য ক্ষতিকর, স্বাভাবিক মাসিক চক্রের জন্য ক্ষতিকর, এমনকি ভ্রূণের জন্যও ক্ষতিকর। চিকিৎসকরা বলেন: বর্তমান যুগে ভ্রূণের বিকৃতি (জন্মগত ত্রুটি দেখা দেওয়ার) যে কারণগুলো বেড়ে গেছে, তার অন্যতম কারণ হলো এই ওষুধগুলো (মাসিক বন্ধের ট্যাবলেট) সেবন করা। অতএব আমার অভিমত হলো, নারী যেন এই ট্যাবলেটগুলো ব্যবহার না করে; বরং আল্লাহ তাআলা যেভাবে তার জন্য হায়েজ নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকে। আর তার উচিত উম্মুল মু’মিনীনা আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা)-এর আদর্শ গ্রহণ করা। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) বিদায়ী হজ্জের সময় অন্যান্য নারীর মতো ওমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন, কিন্তু সুরাফ নামক স্থানে পৌঁছানোর আগেই তার মাসিক শুরু হয়ে যায়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে প্রবেশ করলেন, আর তিনি কাঁদছিলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন: “তোমার কী হয়েছে? সম্ভবত: তুমি ঋতুবতী হয়েছো? তিনি বললেন: “হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!” তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: “এটি এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহ আদম-কন্যাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন।”সহীহ মুসলিম হা/২৮০৯) অর্থাৎ এখানে তিনি (ﷺ) বোঝাতে চেয়েছিলেন—এটি কি শুধুই তোমার জন্য নির্ধারিত কোনো শরীয়তগত বিধান? না, বরং এটি আল্লাহর কওনী (সৃষ্টিগত) বিধান। আল্লাহ তাআলা তার প্রাচীন (চিরন্তন) লেখায় এইভাবে নির্ধারণ করেছেন—যে আদমের কন্যারা (মহিলারা) হায়েজগ্রস্থ হবে। অর্থাৎ যেন নবী (ﷺ) বলছেন: “এটি এমন এক বিষয় যা লিখিত হয়ে গেছে, আর লিখিত বিষয় থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই। সুতরাং ধৈর্য ধারণ কর।” এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন হজের ইহরাম বেঁধে নেন এবং হজ্জকে ওমরার সঙ্গে মিলিয়ে নেন অর্থাৎ ক্বিরান হজ্জ (হজ ও ওমরা একসঙ্গে) সম্পন্ন করেন। মূল বক্তব্য হলো: আমি বলছি, নারীদের উচিত নয় এই ট্যাবলেটগুলো ব্যবহার করা; কারণ এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব আমার কাছে প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া আল্লাহ নারীদের জন্য যেভাবে হায়েজ নির্ধারণ করেছেন—যার কারণে তারা রোজা ও সালাত থেকে বিরত থাকে—তাতে সন্তুষ্ট থাকা, ঋতুস্রাব বন্ধ করার কৃত্রিম উপায় অবলম্বন করার চেয়ে উত্তম। আর এটাও জানা উচিত যে, যেকোনো বিষয়, যা আল্লাহ তার সৃষ্টিতে প্রাকৃতিকভাবে স্থাপন করেছেন, যদি কেউ সেই প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাহলে তা দেহের জন্য ক্ষতিকর হয়। এটি এমন বিষয়, যা মানুষ সহজেই বুঝতে পারে, যদিও সে চিকিৎসক না হয়। যে জিনিস প্রকৃতি ও স্বভাবগত নিয়ম অনুযায়ী দেহ থেকে বেরিয়ে আসার কথা, সেটিকে যদি কেউ আটকে রাখে, নিঃসন্দেহে তা ক্ষতির কারণ হয়।উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ মূত্র বা পায়খানা দেহে আটকে রাখে, অথবা এমন ওষুধ সেবন করে যা এগুলোর নির্গমন রোধ করে, তাহলে কি তা শরীরে প্রভাব ফেলবে না? নিশ্চয়ই ফেলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যদিও বাহ্যিকভাবে প্রস্রাব বা পায়খানা বের না হয়, তবুও এগুলোর আটকে থাকা শরীরের শিরা-উপশিরায় প্রভাব ফেলে। কারণ স্বাভাবিকভাবে এগুলোর নির্গমনই দেহের প্রকৃতি—সুতরাং তা বন্ধ করে রাখলে ক্ষতি হওয়াই স্বাভাবিক ও নিশ্চিত বিষয়। ঋতুস্রাবের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সুতরাং আমরা মনে করি, নারীদের উচিত মাসিককে স্বাভাবিকভাবে হতে দেওয়া। আলহামদুলিল্লাহ, যদি সে রোজা ভাঙে— তবে সে তা করেছে আল্লাহরই হুকুমে, আর যদি সে নামাজ ত্যাগ করে, তাও আল্লাহরই নির্দেশে করেছে।”(ইমাম উসাইমীন “মাজালিসু শাহরি রামাযান নামক পুস্তিকা)
.
♦️পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, মহিলাদের মাসিক চক্রকে কৃত্রিমভাবে থামানোর ওষুধ বা ট্যাবলেট ব্যবহার করা উচিত নয় কেননা এগুলো শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ তাআলা নারীদের জন্য যে প্রাকৃতিক নিয়ম নির্ধারণ করেছেন (মাসিকের মাধ্যমে রোজা ও নামাজ থেকে বিরত থাকা), সেটিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে চলাই উত্তম। এই নিয়ম মানবদেহের স্বাভাবিক সৃষ্টির অংশ, এবং তা পরিবর্তনের চেষ্টা করলে ক্ষতি হয়। তাই মহিলাদের উচিত মাসিককে স্বাভাবিকভাবে হতে দেওয়া, এবং আল্লাহর বিধান মেনে রোজা ও নামাজ থেকে বিরত থাকা ধৈর্যসহ্য করা। তবে প্রখ্যাত আলেমদের একটি বড় অংশের মতে, হজ্জ বা উমরার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি স্বাস্থ্যগত বা অন্যান্য গুরুতর কারণে ঋতুস্রাব কৃত্রিমভাবে বন্ধ রাখা প্রয়োজন হয়ে ওঠে, তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যদি এই ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও শারীরিক দিক থেকে কোনো সমস্যা থাকে না এবং এতে কোনো গুনাহ হবে না ইনশাআল্লাহ। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Friday, October 31, 2025

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম এবং তাঁর দাফনের স্থান কি কাবাঘরের চেয়ে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন

 প্রশ্ন: রাসূল (ﷺ) কি আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম এবং তাঁর দাফনের স্থান কি কাবাঘরের চেয়ে অধিক মর্যাদা সম্পন্ন?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর প্রথমেই বলা প্রয়োজন—এটি মূলত একটি অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর জানার মধ্যে কোনো শারঈ কল্যাণ বা বাস্তব উপকার নেই। বরং আমাদের কর্তব্য হলো এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন থেকে দূরে থাকা এবং পরিবর্তে দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহ—যেমন আকীদা, মানহাজ ও আমলের মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া।
.
দ্বিতীয়ত: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা, ফযীলত ও বিশেষ গুণাবলীর ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল স্পষ্টভাবে আমাদেরকে জানিয়েছেন, তা থেকে কোনো সুস্পষ্ট নস নেই যেখানে সরাসরি বলা হয়েছে যে তিনি আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বরং কুরআন সুন্নাহর দলিল দ্বারা যা পরিষ্কারভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা হলো—তিনি মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ, আদম সন্তানের নেতা এবং মানুষের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন রাসূল। যেমন আবু হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ ﷺ وَأَوَّلُ شَافِعٍ ، وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ) “কিয়ামতের দিন আমি হব বনী আদমের নেতা। আমার কবর প্রথম উন্মুক্ত করা হবে, আমিই হব প্রথম সুপারিশকারী ব্যক্তি এবং প্রথম যার সুপারিশ গৃহীত হবে”।(সহীহ মুসলিম হা/৫৮৩৪) একদল আলেম এই হাদিস এবং নবী (ﷺ)-এর ফযীলত সম্পর্কিত অন্যান্য প্রমাণাদি থেকে এটি ব্যাখ্যা করেছেন যে, তিনিই সৃষ্টির সেরা। উদাহরণস্বরূপ:
.
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর শরহে মুসলিম-এ ‘আমি আদম সন্তানের সরদার’ মর্মে বর্ণিত হাদীছের উপর এই নামে অধ্যায় রচনা করেছেন,باب تَفْضِيلِ نَبِيِّنَا صلى الله عليه وسلم عَلَى جَمِيعِ الْخَلاَئِقِ রাসূল (ﷺ) -এর সকল সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব’ অধ্যায়। এরপর হাদিসটির ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর “শারহু সহীহ মুসলিম” গ্রন্থে বলেন:وهذا الحديث دليل لتفضيله صلى الله عليه وسلم على الخلق كلهم ، لأن مذهب أهل السنة أن الآدميين أفضل من الملائكة ، وهو صلى الله عليه وسلم أفضل الآدميين وغيرهم”এই হাদীসটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমগ্র সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়ার প্রমাণ, কারণ আহলে সুন্নাহর মত হলো:মানুষ ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর মুহাম্মাদ (ﷺ) সকল মানুষ ও অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’।”(নববী শারহু সহীহ মুসলিম খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪১৩)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وقد اتفق المسلمون على أنه صلى الله عليه وسلم أعظم الخلق جاها عند الله، لا جاه لمخلوق أعظم من جاهه، ولا شفاعة أعظم من شفاعته”মুসলিমদের মধ্যে এ বিষয়ে সর্বসম্মত মত (ইজমা) রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর নিকট সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন। সৃষ্ট কোন কিছুর মর্যাদা তাঁর মর্যাদার ঊর্ধ্বে নয়, এবং কোন শাফাআত (সুপারিশ) তাঁর শাফাআতের চেয়ে মহান নয়।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৪৫)
.
একদল আহালুল আলেমদের কলম সর্বদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে “সৃষ্টির সেরা” বলে বর্ণনা করে আসছেন। আলোচনা দীর্ঘায়িত হবে বলে আমরা কেবল তাদের উক্তির কিছু নিদর্শনের দিকেই ইঙ্গিত করছি। উদাহরণস্বরূপ দেখুন: (১).ইমাম শাফিঈ,”আল-উম্ম” খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৬৭)। (২).ইমাম আব্দুর রাজ্জাক আল-সান’আনি, তাঁর “মুসান্নাফ” খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪১৯)। (৩).শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩১৩; এবং খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১২৭, ৪৬৮)। (৪).ইমাম ইবনু কাইয়িম,”তাহযীবুস সুনান” হাদীস নং ১৭৮৭?। (৫).হাফিয ইবনে হাজার,ফাতহুল বারী” হাদীস নং ৬২২৯)-এর ব্যাখ্যা। (৬).আল-মিরদাওয়ী ‘আল-ইনসাফ’ খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৪২২)। (৭).আল-আলূসী, রুহুল মা’আনী; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা; ২৮৪। (৮).শাইখ তাহির ইবনু ‘আশূর (রাহিমাহুল্লাহ) তার তাফসীর; আত-তাহরীর ওয়াত তানভীর, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪২০)। (৯).শাইখ আব্দুর রহমান আস-সা’দী;তাফসিরে সা’দী; পৃষ্ঠা: ৫১, ১৮৫, ৬৯৯)। (১০).শাইখ মুহাম্মদ আল-আমীন আস-শানক্বিতী; আযওয়াউল বায়ান; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ২১৫। (১১).ইমাম আব্দুল আযীয বিন বায, মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৭৬, ৩৮৩)।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে প্রশ্ন করা হয়েছিল:আমরা কি বলতে পারি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতির শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি, নাকি তিনি সমগ্র সৃষ্টির মধ্যেই শ্রেষ্ঠ? আর অনেকে যেমন বলেন:“তিনি সমগ্র সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ”—এই কথার কোনো শারঈ প্রমাণ কি রয়েছে?
জবাবে তারা বলেছেন:
:”جاء في نصوص كثيرة من الكتاب والسنة بيان عظم قـدر نبينا محمد صلى الله عليه وسلم ورفعة مكانته عند ربه تعالى من خلال الفضائل الجليلـة والخصائص الكريمة التي خصه الله بها ، مما يدل على أنه أفضل الخلق وأكرمهم على الله وأعظمهم جاها عنده سبحانه ، قال الله سبحانه : (وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا) النساء/113 ، وأجنـاس الفضل التي فضله الله بها يصعب استقصاؤها ؛ فمن ذلك : أن الله عز وجل اتخذه خليلا ، وجعله خاتم رسله ، وأنزل عليه أفضل كتبه ، وجعل رسالته عامة للثقلين إلى يوم القيامة ، وغفر له ما تقدم من ذنبه وما تأخر ، وأجرى على يديه من الآيات ما فاق به جميع الأنبياء قبله ، وهو سيد ولد آدم ، وأول من ينشق عنه القبر ، وأول شافع ، وأول مشفع ، وبيده لواء الحمد يوم القيامة ، وأول من يجوز الصراط، وأول من يقرع باب الجنة ، وأول مـن يدخلها . . . إلى غير ذلك مـن الخصائص والكرامات الواردة في الكتاب والسنة ، مما جعل العلماء يتفقون على أن النبي صلى الله عليه وسلم هو أعظم الخلق جاها عند الله تعالى ، قـال شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله تعالى : “وقد اتفق المسلمون على أنه صلى الله عليه وسلم أعظم الخلق جاها عند الله ، لا جاه لمخلوق أعظم من جاهه ، ولا شفاعة أعظم من شفاعته” .فمما ذُكر وغيره يتبين أن نبينا محمدا صلى الله عليه وسلم هو أفضل الأنبياء ، بل وأفضل الخلق ، وأعظمهم منزلة عند الله تعالى ، ولكن مع هذه الفضائل والخصائص العظيمة فإنه صلى الله عليه وسلم لا يرقى عن درجة البشرية ، فلا يجـوز دعاؤه والاستغاثة به من دون الله عز وجل ، كما قـال تعالى: ( قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا ) الكهف/110، وبالله التوفيق ، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم”
“কুরআন ও সুন্নাহর বহু নস (দলিল)-এ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান মর্যাদা ও তাঁর রবের নিকট তাঁর উচ্চ স্থান সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে—যে মর্যাদা প্রকাশ পেয়েছে মহান সব গুণাবলি ও সম্মানজনক বৈশিষ্ট্যসমূহের মাধ্যমে, যা আল্লাহ তাঁকে দান করেছেন।এসবই প্রমাণ করে যে, তিনি সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বোত্তম, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত এবং তাঁর নিকট সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।আল্লাহ তাআলা বলেন:”আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং আপনি যা জানতেন না তা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন, আপনার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে।”(সূরা আন-নিসা: ১১৩) অর্থাৎ:“আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং আপনাকে সে সমস্ত বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানতেন না। আর আপনার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ তো মহা অনুগ্রহ।”আল্লাহ তাঁকে যে সকল ফযীলত দ্বারা ভূষিত করেছেন, সেগুলোর সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এর মধ্যে রয়েছে—আল্লাহ তাঁকে তাঁর খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছেন,তাঁকে তাঁর রাসূলদের মধ্যে সর্বশেষ রাসূল বানিয়েছেন, তাঁর উপর তাঁর শ্রেষ্ঠ কিতাব (আল কুরআন) নাযিল করেছেন, তাঁর রিসালাতকে কিয়ামত পর্যন্ত জিন ও মানবজাতির জন্য সাধারণ করেছেন, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, এবং তাঁর হাতে এমন সব মু’জিযা প্রকাশ করেছেন যা তাঁর পূর্বের সমস্ত নবীকে ছাড়িয়ে গেছে। তিনি আদম-সন্তানদের নেতা, সর্বপ্রথম তাঁর থেকে কবর বিদীর্ণ হবে,তিনিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং সর্বপ্রথম যার সুপারিশ কবুল হবে। কিয়ামতের দিন তাঁর হাতে থাকবে প্রশংসার পতাকা (লিওয়াউল হামদ), সর্বপ্রথম তিনিই সিরাত (পুলসিরাত) পার হবেন, সর্বপ্রথম তিনিই জান্নাতের দরজায় কড়া নাড়বেন এবং সর্বপ্রথম তিনিই জান্নাতে প্রবেশ করবেন। …এছাড়াও কুরআন ও সুন্নাহতে তাঁর আরও বহু বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা উল্লেখিত হয়েছে।এসব প্রমাণের আলোকে আলেমগণ একমত হয়েছেন যে,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “সমস্ত মুসলমান এ বিষয়ে একমত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই আল্লাহর নিকট সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদাবান। কোনো মাখলুকের মর্যাদা তাঁর মর্যাদার চেয়ে বড় নয়, এবং কোনো শাফাআত (সুপারিশ) তাঁর শাফাআতের চেয়ে মহত্তর নয়।”অতএব, উপরোক্ত বিষয়াবলির দ্বারা এটি স্পষ্ট হয় যে—আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল নবীদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ নন, বরং সমগ্র সৃষ্টির মধ্যেই শ্রেষ্ঠতম এবং আল্লাহর নিকট সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।তবে এই মহান মর্যাদা ও অসংখ্য ফযীলত থাকা সত্ত্বেও তিনি মানুষই;তিনি মানবতার সীমানা অতিক্রম করেননি।সুতরাং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাঁকে ডাকা, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা কিংবা তাঁর উদ্দেশে ইবাদত করা জায়েয নয়।কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:”বলুন, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র সত্য ইলাহ। কাজেই যে তার রব-এর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রব-এর ইবাদাতে কাউকেও শরীক না করে।”(সূরা আল-কাহাফ: ১১০) অর্থাৎ:“বলুন: আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার প্রতি ওহি প্রেরিত হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল একজনই ইলাহ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে”।আল্লাহ্‌ই সবচেয়ে ভাল জানেন। আমাদের নবী মুহাম্মদ, তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সাহাবীবর্গের উপর আল্লাহ্‌র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ২৬; পৃষ্ঠা: ৩৫)স্বাক্ষরকারী আলেমগণ: শাইখ আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ্‌ আলে-শাইখ;শাইখ আব্দুল্লাহ্‌ বিন আব্দুর রহমান আল-গাদইয়ান,শাইখ সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান,শাইখ বকর বিন আব্দুল্লাহ্‌ আবু যাইদ (রাহিমাহুমুল্লাহ)।
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার যে,অধিকাংশ আলেমদের মত হচ্ছে, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম সর্বশ্রেষ্ঠ।তবে,কুরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি এমন কোনো প্রমাণ নেই যা আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করে। তাই এই মাসালায় সর্বোত্তম এবং নিরাপদ মত হচ্ছে—নবী (ﷺ) সৃষ্টির সেরা” বলা অনেক আলেমের কাছে প্রচলিত হলেও,এর পক্ষে স্পষ্ট দলিল না থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত কথা বলা নিরাপদ নয়। বরং দলিল অনুযায়ী বলা উচিত: “নবী ﷺ হচ্ছেন আদম সন্তানদের নেতা, নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মর্যাদাবান। যেমনটি আমাদের ইমাম সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন। যেমন:
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন;
“المشهور عند كثير من العلماء إطلاق أن محمداً صلى الله عليه وسلم أفضل الخلق ، كما قال الناظم :وأفضل الخلق على الإطلاق *** نبينا فمل عن الشقاقلكن الأحوط والأسلم أن نقول: محمد صلى الله عليه وسلم سيد ولد آدم، وأفضل البشر، وأفضل الأنبياء، أو ما أشبه ذلك اتباعا لما جاء به النص، ولم أعلم إلى ساعتي هذه أنه جاء أن النبي صلى الله عليه وسلم أفضل الخلق مطلقاً في كل شيء . . . فالأسلم أن الإنسان في هذه الأمور يتحرى ما جاء به النص. مثلاً لو قال قائل: هل فضل الله بني آدم عموماً على جميع المخلوقات؟ قلنا: لا؛ لأن الله تعالى قال: (وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً) الإسراء/70 ، لم يقل : على كل من خلقنا، فمثل هذه الإطلاقات ينبغي على الإنسان أن يتقيد فيها بما جاء به النص فقط ولا يتعدى . والحمد لله ، نحن نعلم أن محمداً صلى الله عليه وسلم خاتم النبيين ، وأشرف الرسل وأفضلهم وأكرمهم عند الله عز وجل ، وأدلة ذلك من القرآن والسنة الصحيحة معروفة مشهورة ، وأما ما لم يرد به دليل صحيح فإن الاحتياط أن نتورع عنه ، لكنه مشهور عند كثير من العلماء ، تجدهم يقولون : إن محمداً أشرف الخلق”
“অনেক আলেমের মধ্যে এটাই প্রসিদ্ধ যে,তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টির সেরা বলে আখ্যায়িত করেন, যেমন কবি বলেছেন: وأفضل الخلق على الإطلاق نبينا فمل عن الشقاق অর্থাৎ:”সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছেন আমাদের নবী, সুতরাং এ বিষয়ে মতবিরোধ করো না।” কিন্তু সতর্ক ও নিরাপদ অবস্থান হলো এই বলা: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদম-সন্তানদের নেতা, মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, অথবা এই জাতীয় কিছু বলা,যা স্পষ্ট দলিল দ্বারা প্রমাণিত।আমার জানা মতে, এই মুহূর্ত পর্যন্ত এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ আমার কাছে আসেনি যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিঃশর্তভাবে সব কিছুর মধ্যে সৃষ্টির সেরা…(অর্থাৎ, সব কিছু ও সব সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে সর্বোচ্চ) অতএব, এই বিষয়গুলিতে মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হলো কেবল নসে যা এসেছে তার অনুসরণ করা এবং এর বাইরে না যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ প্রশ্ন করে: আল্লাহ কি সাধারণভাবে সমগ্র মানবজাতিকে সব সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন?’ তাহলে আমরা বলব: না, কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন—“আর অবশ্যই আমরা আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সাগরে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; এবং তাদেরকে উত্তম রিযক দান করেছি এবং আমরা যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদেরকে শ্ৰেষ্ঠত্ব দিয়েছি।”(সূরা ইসরা ১৭: ৭০) এখানে আল্লাহ বলেননি,“আমার সমস্ত সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি”বরং বলেছেন,“অনেকের ওপর”।তাহলে বোঝা যায়, এই ধরনের সর্বজনীন বাক্য (মুতলাক বাক্য) ব্যবহার করার সময় মানুষকে অবশ্যই কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে যেমনভাবে এসেছে, তেমনভাবেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, তার বাইরে যাওয়া উচিত নয়।আর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য,আমরা জানি,মুহাম্মাদ (ﷺ) হচ্ছেন নবীদের সীলমোহর (শেষ নবী), রসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ,আল্লাহর নিকটে সবচেয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাবান। এর প্রমাণসমূহ কুরআন ও সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত ও সুবিদিত।কিন্তু যেসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ও সহীহ প্রমাণ নেই, সেখানে সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বনই উত্তম পথ। তবে এটি (অর্থাৎ “মুহাম্মাদ ﷺ সৃষ্টির সেরা”)—অনেক আলেমদের মাঝে প্রচলিত বা সুপরিচিত বিষয়, আপনি দেখবেন,তারা বলে থাকেন “মুহাম্মাদ ﷺ হচ্ছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম (অশরাফুল খলক)”।(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৫৩/১১)
.
পরিশেষে, আমরা আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর রাসূলের ভালোবাসা দান করেন, আমাদের কাছে তাঁকে সন্তানসন্ততি, পিতামাতা, পরিবার-পরিজন ও নিজেদের জানের চেয়ে বেশি প্রিয় করে দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও সর্বজ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

আম্মাজান খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহা কি কখনও সালাত আদায় করেননি

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর, আমি দুটি বিষয়ে স্পষ্টভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করব। প্রথমত, মিরাজের পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর সালাত আদায় ফরজ ছিল কি না এবং সে সময় তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ সালাত আদায় করতেন কি না; দ্বিতীয়ত, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর জীবদ্দশায় সালাত আদায় করতেন কি না।

.
▪️প্রথমত: রাসূলুল্লাহ ﷺ মিরাজে যাওয়ার পূর্বে তাঁর ওপর সালাত আদায় ফরজ ছিল কি না; রাসূল (ﷺ) এবং তার সাহাবীগন সালাত আদায় করেছেন কিনা:
.
আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন যে,রাসূল (ﷺ)-এর মিরাজ সংগঠিত হওয়ার পূর্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়নি। তবে কুরআন ও সুন্নাহর দলিল প্রমাণ করে যে,পুর্ববর্তী নবী-রাসূল ও তাঁদের উম্মতের উপর এবং একইভাবে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও তার উম্মতের উপর সালাত ফরয ছিল।যেমন আল্লাহ বলেন,”আর আমরা ইব্রাহীম ও ইসমাঈলের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিলাম এই মর্মে যে, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারীদের জন্য, এখানে অবস্থানকারীদের জন্য এবং রুকূকারী ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।”(সূরা বাক্বারাহ ২/১২৫)। তিনি মূসা (আঃ)-কে বলেন,”আমরা মূসা ও তার ভাইয়ের প্রতি নির্দেশ পাঠালাম যে, তোমরা তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য মিসরের মাটিতে বাসস্থান নির্মাণ কর এবং তোমাদের ঘরের মধ্যেই ক্বিবলা নির্ধারণ কর ও সেখানে ছালাত আদায় কর। আর তুমি মুমিনদের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও”(সূরা ইউনুস: ১০/৮৭)। তিনি ঈসা (আঃ)-এর মা মারিয়ামকে বলেন, ‘হে মারিয়াম! তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে রত হও এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ ও সিজদা কর’ (সূরা আলে ইমরান ৩/৪৩)। রাসূল (ﷺ) বলেন, আমরা নবীগণ আদিষ্ট হয়েছি যেন আমরা দ্রুত ইফতার করি, দেরীতে সাহারী করি এবং ছালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখি”।(ত্বাবারাণী কাবীর হা/১১৪৮৫; সহীহুল জামে‘ হা/২২৮৬)
.
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবিগণ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হওয়ার আগেও নামাজ আদায় করতেন। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই মুসলিমদের জন্য নামাজ একটি ফরজ ইবাদত ছিল।এর প্রমাণ সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে পাওয়া যায়— যখন বাদশাহ হিরাক্লিয়াস (Heraclius) আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তিনি (মুহাম্মাদ ﷺ) তোমাদের কী করতে নির্দেশ দেন?
জবাবে মুশরিক থাকা অবস্থায় আবু সুফিয়ান বলেন:তিনি বলেন:اعْبُدُوا اللَّهَ وَحْدَهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَاتْرُكُوا مَا يَقُولُ آبَاؤُكُمْ ؛ وَيَأْمُرُنَا بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَالصِّدْقِ وَالْعَفَافِ وَالصِّلَةِ”তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুর অংশীদার সাব্যস্ত করো না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা যা বলে তা ত্যাগ কর। আর তিনি আমাদের সালাত আদায়ের, সত্য বলার, চারিত্রিক নিষ্কলুষতার এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দেন।”(সহীহ বুখারী হা/৭; সহীহ মুসলিম হা/১৭৭৩) এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে,পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হওয়ার আগেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এবং অন্যদেরকেও ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাতেন।
.
হাদিসটির ব্যাখ্যায় হাফিয ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন:وهو يدل على أن النبي كان أهم ما يأمر به أمته الصلاة ، كما يأمرهم بالصدق والعفاف ، ، واشتُهر ذلك حتى شاع بين الملل المخالفين له في دينه ، فإن أبا سفيان كان حين قال ذلك مشركا ، وكان هرقل نصرانيا . ولم يزل منذ بُعث يأمر بالصدق والعفاف ، ولم يزل يصلي أيضا قبل أن تفرض الصلاة ​”আর এটি প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের প্রতি যেসব বিষয়ের আদেশ দিতেন,সেগুলোর মধ্যে সালাত (নামাজ) ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,যেমন তিনি তাদের সত্যবাদিতা ও সচ্চরিত্রতার (পবিত্রতার) আদেশ করতেন। এবং এই বিষয়টি এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, এটি তাঁর ধর্মের বিরোধী জাতিগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।কেননা, আবু সুফিয়ান যখন এ কথা বলেছিলেন,তখন তিনি ছিলেন একজন মুশরিক (বহু-ঈশ্বরবিশ্বাসী), আর হিরাক্লিয়াস ছিলেন একজন নাসারা (খ্রিস্টান)।আর তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রেরিত হওয়ার পর থেকেই মানুষকে সর্বদা সত্যবাদিতা ও সচ্চরিত্রতার (পবিত্রতার) নির্দেশ দিতেন, এবং সালাত ফরজ হওয়ার আগেও তিনি নিয়মিত সালাত আদায় করতেন।”​(ইবনু রজব আল-হাম্বালী, ফাতহুল বারী শারহু সাহীহিল বুখারী; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০১)
.
আহালুল আলেমগন বলেছেন, হিজরতের স্বল্পকাল পূর্বে মি‘রাজ সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফজর ও আসরের সালাত দুই রাকআত করে আদায় করার বিধান কার্যকর ছিল। আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) বর্ণনা করেন,”শুরুতে সালাত বাড়ীতে ও সফরে দু’ দু’ রাক‘আত করে ছিল।”(সহীহ মুসলিম হা/৬৮৫; আবূ দাঊদ হা/১১৯৮) অতঃপর মি‘রাজের রাত্রিতে চূড়ান্তভাবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হয়। হাদিসে এসেছে,আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত।তিনি বলেন, মিরাজের রাতে রাসূল (ﷺ)-এর উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়েছিল। অতঃপর তা কমাতে কমাতে পাঁচ ওয়াক্তে সীমাবদ্ধ করা হয়। অতঃপর ঘোষণা করা হল, হে মুহাম্মাদ! আমার নিকট কথার কোনো অদল বদল নাই। তোমার জন্য এই পাঁচ ওয়াক্তের মধ্যে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব রয়েছে।”(সহীহ বুখারী হা/৩২০৭; মুসলিম হা/১৬২) অতঃপর মিরাজে রাসূল (ﷺ) তাঁর উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পর সর্বপ্রথম যোহরের সালাত আদায় করেছিলেন।যেমন হাদীসে এসেছে,আবু বারাযাহ আসলামী (রাঃ)-কে রাসূল (ﷺ)-এর সালাতের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যোহরের সালাত যাকে তোমরা প্রথম সালাত বলে থাক,সূর্য ঢলে পড়লে আদায় করতেন।”(সহীম বুখারী হা/৫৪৭; মিশকাত হা/৫৮৭)
.
▪️দ্বিতীয়ত: আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর জীবদ্দশায় সালাত আদায় করতেন কি না!
.
আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন ইসলামের প্রথম মুমিনা নারী —আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নে সর্বাগ্রে যিনি সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নবী (ﷺ)-এর প্রথম স্ত্রী, তাঁর সন্তানদের জননী, এবং পূর্ণতার এক অনন্য প্রতীক। বুদ্ধিমত্তা, মহত্ত্ব, ধার্মিকতা ও মর্যাদার এক অসাধারণ সমন্বয় তাঁর চরিত্রে দীপ্তিমান ছিল।ইসলামের সূচনালগ্নে খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন নবী ﷺ-এর অকুতোভয় সহচর ও অবিচল সমর্থক। যখন নবী ﷺ প্রথম ওহি লাভ করে উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরে আসেন, তখন তিনিই ছিলেন তাঁর শান্তি ও সাহসের আশ্রয়স্থল। তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন— এমন মহৎ গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ কখনো অপমান বা কষ্ট বর্ষণ করবেন না। রাসূল ﷺ কে সান্তনা দানের ভাষা ছিল: وَاللهِ لاَيُخْزِيْكَ اللهُ اَبَدًا إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ وَتَقْرِى الضَّيْفَ وَتُعِيْنُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ-“কখনোই না। আল্লাহর কসম! তিনি কখনোই আপনাকে অপদস্থ করবেন না। আপনি আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করেন, দুস্থদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের কর্মসংস্থান করেন, অতিথিদের আপ্যায়ন করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন”।(সহীহ বুখারী হা/৩ সহীহ মুসলিম হা/১৬০; ইবনু হিশাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৭৩)।
.
নবী (ﷺ) খাদিজা (রা.)-কে জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও বারবার স্মরণ করতেন এবং তাঁর গুণাবলীর প্রশংসা করতেন।উদাহরণস্বরূপ; ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ গ্রন্থে একটি পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছেন: ‘খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবাহ ও তাঁর মর্যাদা’। উক্ত পরিচ্ছেদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: “আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী খাদীজার প্রতি যে ঈর্ষা করেছি অন্য কোন স্ত্রীর প্রতি তেমন ঈর্ষা করিনি। কেননা আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি। অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন।”[হাদীসটি বুখারী (৩৮১৫) বর্ণনা করেন] শুধু তাই নয়,আম্মাজান খাদিজা (রাদিআল্লাহু আনহা) ছিলেন বিশ্বসেরা চারজন সম্মানিতা মহিলার অন্যতম। রাসূল (ﷺ) বলেন,أَفْضَلُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ وَفَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَآسِيَةُ بِنْتُ مُزَاحِمٍ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ “জান্নাতী মহিলাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হ’লেন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ, মারিয়াম বিনতে ইমরান ও ফেরাঊনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম”। (মুসনাদে আহমাদ হা/২৬৬৮; তিরমিযী হা/৩৮৭৮) তিনি ছিলেন সেই মহীয়সী মহিলা যাকে জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) নিজের পক্ষ হতে ও আল্লাহর পক্ষ হতে রাসূল (ﷺ)-এর মাধ্যমে তাঁকে সালাম সালাম পাঠিয়েছিলেন” (বুখারী হা/১৭৯২, মুসলিম হা/২৪৩৩) পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতে এক মনোমোহন মতি দিয়ে তৈরি এমন একটি ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন যেখানে কোন শোরগোল থাকবে না এবং কোন প্রকার কষ্ট ক্লেশও থাকবে না— থাকবে শুধুই চিরন্তন শান্তি ও আনন্দ। অতঃপর, তিনি রাসূল (ﷺ)-এর নবুওয়াত শুরু হওয়ার সাত বছর পরে, অথবা বলা হয়েছে: দশ বছর পরে (এটিই অধিক সহিহ),পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং পর্দার বিধান ফরজ হওয়ার পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন।মৃত্যুর সময় আম্মাজানের বয়স ছিল পঁয়ষট্টি বছর। ​তাঁর জীবনী ও গুণাবলী সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ইবনে আব্দুল বার-এর আল ইস্তিজকার; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৮১৭; এবং ইমাম যাহাবী-এর সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০৯)
.
প্রিয় পাঠক, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর উপরোক্ত গুণাবলীর আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি ছিলেন একাধারে ধার্মিক, নৈতিকভাবে দৃঢ় ও চরিত্রে অনন্য এক তাকওয়াবান নারী। তাঁর এই মহৎ চরিত্র, ধর্মনিষ্ঠা ও আল্লাহভীতির প্রেক্ষিতে সহজেই অনুমান করা যায় যে,তিনি নিয়মিত সালাত আদায় করতেন। সীরাত ইবনে হিশাম ও তাফসির ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কায় প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা গোপনে ও ব্যক্তিগতভাবে সালাত আদায় করতেন; মদিনায় হিজরতের পরই তারা প্রকাশ্যে ও জামায়াতে সালাত আদায়ের প্রথা শুরু করেন। সুতরাং, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) মক্কা অবস্থাতেই নবী ﷺ-এর নির্দেশ অনুসারে নিয়মিত ইবাদত করতেন—যদিও সে সময় জামায়াতে সালাত আদায়ের প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য সীরাতগ্রন্থসমূহে তাঁর সালাত আদায়ের স্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায়। বহু বর্ণনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো—খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সেই সালাত আদায় করতেন যা তখন ফরজ ছিল; অর্থাৎ দিনের শুরুতে দুই রাকাআত ও দিনের শেষে দুই রাকাআত। এটি ছিল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হওয়ার আগের আমলের কথা।আমি আমার প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত এমনই একটি রেওয়ায়াত উল্লেখ করছি—যেখান থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হবে আম্মাজান খাদিজা সালাত আদায় করেছেন।
.
আমাদেরকে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমার পিতা (ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল) আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমাদেরকে ইয়াকুব ইবনু ইব্রাহিম আল-হানযলী (আবু ইউসুফ) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমাকে আমার পিতা ইব্রাহিম ইবনু সা‘দ বর্ণনা করেছেন।তিনি বলেন: আমাকে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক বর্ণনা করেছেন।তিনি বলেন: আমাকে ইয়াহইয়া ইবনু আল-আশ্য‘আত বর্ণনা করেছেন, তিনি ইসমাঈল ইবনু ইয়া‘স ইবনু আফিফ আল-কিন্দি থেকে বর্ণনা করেছেন,তিনি তার পিতা ইয়া‘স থেকে, আর তিনি তার দাদা আফিফ আল-কিন্দি থেকে বর্ণনা করেন—যিনি বলেছেন:
كنت امرأً تاجرًا، فقدمت الحج، فأتيت العباس بن عبد المطلب رضي الله عنه لأبتاع منه بعض التجارة، وكان امرأً تاجرًا، فوالله إني لعنده بمنى، إذ خرج رجل من خباء قريب منه، فنظر إلى الشمس، فلما رآها مالت -يعني قام يصلي- قال: ثم خرجت امرأةٌ من ذلك الخباء الذي خرج منه ذلك الرجل، فقامت خلفه تصلي، ثم خرج غلام حين راهق الحلم من ذلك الخباء، فقام معه يصلي. قال: فقلت للعباس: من هذا يا عباس؟ قال: هذا محمد بن عبد الله بن عبد المطلب ابن أخي، قال: فقلت: من هذه المرأة؟ قال: هذه امرأته خديجة ابنة خويلد. قال: قلت: من هذا الفتى؟ قال: هذا علي بن أبي طالب ابن عمه. قال: فقلت: فما هذا الذي يصنع؟ قال: يصلي، وهو يزعم أنه نبي، ولم يتبعه على أمره إلا امرأته، وابن عمه هذا الفتى، وهو يزعم أنه سيفتح عليه كنوز كسرى، وقيصر”. قال: فكان عفيف رضي الله عنه-وهو ابن عم الأشعث بن قيس رضي الله عنه- يقول -وأسلم بعد ذلك، فحسن إسلامه-: “لو كان الله رزقني الإسلام يومئذٍ، فأكون ثالثًا مع علي بن أبي طالب رضي الله عنه”
আমি একজন ব্যবসায়ী ছিলাম।একবার হজের উদ্দেশ্যে (মক্কায়) এসে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গেলাম, তাঁর কাছ থেকে কিছু বাণিজ্যিক সামগ্রী কিনবার জন্য। তিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। আল্লাহর কসম, আমি যখন মিনায় তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন তাঁর কাছের একটি তাঁবু থেকে একজন ব্যক্তি বেরিয়ে আসতে দেখলাম। সে সূর্যের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াল; যখন সে দেখল সূর্য হেলে পড়েছে, (অর্থাৎ দুপুরের ওয়াক্ত হয়েছে), তখন তিনি নামাজ পড়তে দাঁড়ালেন।এরপর সেই তাঁবু থেকে একজন নারী বেরিয়ে এল এবং তিনি তার পিছনে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন। এরপরে সেই তাঁবু থেকে এক যুবক বেরিয়ে এল,যে সবেমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কাছাকাছি (কিশোর) হয়েছে,এবং তিনি তাদের সাথে সালাত আদায় করতে লাগলেন। আমি আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম:‘এই ব্যক্তি কে?’ তিনি বললেন, ‘এটি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম: ‘আর এই মহিলাটি কে?’ তিনি বললেন: ‘ইনি তার স্ত্রী খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘আর এই কিশোরটি কে?’ তিনি বললেন: ‘ইনি তার চাচাতো ভাই আলী ইবনে আবী তালিব।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘এরা কী করছে?’ তিনি বললেন: ‘ইনি (মুহাম্মদ) নামাজ পড়ছেন এবং তিনি দাবী করেন যে তিনি একজন নবী। তার স্ত্রী এবং এই কিশোর চাচাতো ভাই ছাড়া আর কেউ তার অনুসারী হয়নি। আর তিনি (মুহাম্মদ) দাবী করেন যে খুব শীঘ্রই তার জন্য কিসরা (পারস্য সম্রাট) ও কাইসারের (রোম সম্রাট) ধনভান্ডার জয় হবে।” বর্ণনাকারী বলেন, পরে আফীফ (যিনি আশ’আস ইবনে কায়েসের চাচাতো ভাই) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার ইসলাম গ্রহণ ছিল অত্যন্ত চমৎকার। তিনি আফসোস করে বলতেন:”যদি আল্লাহ সেদিনই আমাকে ইসলামের সৌভাগ্য দিতেন, তবে আমি আলী ইবনে আবী তালিবের সাথে দ্বিতীয় অনুসারী হতাম।” (অন্য বর্ণনায়: তৃতীয় হতাম,কেননা খাদীজা রা: প্রথম)।(মুসনাদে আহমেদ হা/১৭৮৭;তাবারানি কাবীর খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ১০০ হা/১৮১; হাইছামী; ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১০২; ইমাম বুখারী; তারীখুল কাবীর; খণ্ড: ৭: পৃষ্ঠা: ৭৩)
তাহক্বীক: হাদীসটি সহীহ জয়ীফ নিয়ে কথা থাকলেও বহু ইমাম বিশুদ্ধ বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ: শাইখ আহমাদ শাকির (রাহিমাহুল্লাহ) শারহু মুসনাদ আহমাদ (হা/১৭৮৭) এ বলেছেন: “এই হাদিসের সনদ সহীহ। ইমাম হাকিম তার মুস্তাদরক হাকিমে খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮৩ হা/৪৮৪২ বর্ননা করে বুখারি মুসলিমের শর্তে হাদিসটি সহীহ বলেছেন।ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) তালখিস আল-মুস্তাদরক-এ সনদ সঠিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন; “এই হাদীসটি আবু ইয়ালা তাঁর মুসনাদে খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১১৭; হাদীস নং ১৫৪৭)-এ বর্ণনা করেছেন। শাইখ হুসাইন সালিম আসাদ, যিনি মুসনাদ আবু ইয়ালা-এর তাহকীক করেছেন, তিনি বলেছেন: ‘এর সনদ (ইসনাদ) হাসান। এবং ইমাম ইবনে আব্দিল বার আল ইস্তিজকার; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১২৪১-এ আফিফ আল-কিনদির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং এই হাদিসটি উল্লেখ করে বলেছেন:এই হাদিস অত্যন্ত উৎকৃষ্ট।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনার আলোকে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর জীবদ্দশায় নিয়মিত সালাত আদায় করতেন। অতএব, যারা বলেন যে তিনি জীবনে একবারও সালাত আদায় করেননি—তাদের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বোধ ও সঠিক উপলব্ধি দান করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও সর্বজ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate