সম্প্রতি বাংলাদেশে কতিপয় উগ্রপন্থী দেওবন্দী ও ব্রেলভি (কথিত সুন্নি) গোষ্ঠীর সম্মিলিত আক্রমণে আহলে হাদিস বা সালাফি মতাদর্শের মসজিদ, মাদরাসা, লাইব্রেরি ও অন্যান্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, এবং প্রতিষ্ঠান উদ্বোধনে বাধা প্রদান বা তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে, নিজেদের জান-মাল এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ হেফাজতের জন্য আহলে হাদিস অনুসারীদের জরুরি ভিত্তিতে চিন্তাভাবনা এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সময়ের দাবি। নিম্নে উগ্রপন্থী আক্রমণের মুখে নিজেদের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠান রক্ষা এবং দাওয়াতের মানোন্নয়নের জন্য কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা পেশ করা হলো:
Thursday, January 8, 2026
আহলে হাদিস ও সালাফি প্রতিষ্ঠানসমূহের সুরক্ষা ও সমস্যা মোকাবেলায় জরুরি নির্দেশনা
❑ এক. চরম ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা:
তাওহিদ ও সুন্নাহর পথে চিরকালই বাধা এসেছে। নবি-রসুলগণ এবং তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারীরা সর্বদা কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়েছেন। তাই তাওহিদ ও সুন্নাহর বিরোধীরা এর বিরোধিতা করবে। এটাই স্বাভাবিক।
• এই অবস্থায় মাথা গরম না করে চরম ধৈর্য ও সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাহায্য করেন।
• ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। আবেগতাড়িত হয়ে প্রতিশোধ বা পাল্টা সহিংসতার পথে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে এবং তা কখনোই কল্যাণ বয়ে আনে না।
❑ দুই. নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরণ:
১. মসজিদ, মাদরাসা ও অন্যান্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করুন। প্রয়োজনে গার্ড নিয়োগ বা বিশ্বাসী স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী পাহারা টিম গঠন করে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করুন।
২. যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের উদ্বোধন, ওয়াজ মাহফিল বা বড় অনুষ্ঠানের আগে স্থানীয় প্রশাসনকে (যেমন: থানা, ইউএনও অফিস) বিস্তারিত অবহিত করুন এবং অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করুন।
❑ তিন. আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ:
১. কোথাও হামলা বা গণ্ডগোল হওয়ার সামান্যতম আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আগে থেকেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে রাখুন।
২. যেকোনো হামলার ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে খবর দিন। এটি নিরাপত্তার জন্য সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
৩. লুটপাট, অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে দ্রুততম সময়ে সেই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণসহ এজাহার (FIR) দায়ের করুন।
৪. স্থানীয় জেলা প্রশাসন (ডিসি, এসপি) ও উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও)-এর কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য লিখিত আবেদন পেশ করুন।
৫. আক্রমণের ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করে রাখুন। এগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।
৬. মসজিদ, মাদরাসা বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আইনি কাগজপত্র, ট্রাস্ট ডিড এবং ভূমির মালিকানার নথি সবসময় হালনাগাদ ও নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করুন।
❑ চার. সাংগঠনিক ও সামাজিক উদ্যোগ:
১. আহলে হাদিস সংগঠনগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করুন। বিচ্ছিন্নতা বা ‘একলা চলো’ নীতি পরিহার করে সম্মিলিতভাবে কাজ করুন।
২. ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মসজিদ-মাদরাসার দায়িত্বশীলদের নিয়ে একটি ‘নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করুন। এই কমিটি প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল করবে।
৩. স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, সমাজের নেতৃবৃন্দ এবং শান্তিকামী আলেমদের সাথে আলোচনা বৈঠক বা সংলাপের উদ্যোগ নিন। ভুল বোঝাবুঝি দূর করার জন্য তাঁদের সামনে নিজেদের কার্যক্রম, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।
৪. এলাকার সাধারণ জনগণ এবং ভিন্ন মতাদর্শের শান্তিকামী আলেমদের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি করুন। তাঁদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান, আলোচনা করুন এবং সম্মান প্রদর্শন করুন।
৫. প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে যথাসম্ভব শিক্ষিত, প্রজ্ঞাবান ও সচেতন দায়িত্বশীলদের নিয়োগ দিন, যেন তাঁরা যেকোনো পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
❑ পাঁচ. শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি:
১. প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে আক্রমণের ঘটনার সঠিক ও বাস্তবসম্মত বিবরণ তুলে ধরুন, যাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জনমত গড়ে ওঠে।
২. সভা, সেমিনার এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করুন।
৩. যেকোনো পরিস্থিতিতে সহিংসতা বা প্রতিশোধের পথ পরিহার করতে হবে। একমাত্র শান্তিপূর্ণ, আইনি এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতিই জান-মাল ও প্রতিষ্ঠান রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
৪. আক্রমণের ঘটনা ঘটলে ভিডিও বার্তা বা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে বাস্তবতা তুলে ধরুন এবং আইনি প্রতিকার দাবি করুন। তবে কারো প্রতি উসকানিমূলক বা আক্রমণাত্মক কথা বলা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকুন।
❑ ছয়. দাওয়াত ও বক্তৃতা পদ্ধতির পরামর্শ:
১. জুমার খুতবা, বক্তৃতা বা ওয়াজ মাহফিলগুলোতে উসকানিমূলক ও উগ্রতাপূর্ণ বক্তব্য পরিহার করা জরুরি। শিরক, বিদআত বা ইসলাম বিরোধিতার কথা বললেও কোনো ব্যক্তির সম্মানহানি হয় এমন কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
২. শিরক, বিদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় কেবল দলিল ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্য উপস্থাপন করুন। বিরোধী পক্ষের কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৩. উগ্র মেজাজ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তৃতা প্রদানে পরিচিত এবং ইলমের দিক থেকে দুর্বল বক্তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এর পরিবর্তে মিষ্টভাষী, যোগ্য ও অভিজ্ঞ বক্তা বা আলেমদেরকে আমন্ত্রণ জানান।
৪. মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে উত্তম চরিত্র সম্পন্ন, মিষ্টভাষী ও যোগ্য আলেমকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. সমাজসেবা ও সামাজিক সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম (যেমন: বৃক্ষরোপণ, মাদক প্রতিরোধ, যৌতুক, সন্ত্রাস, অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সেমিনার ইত্যাদি) বাস্তবায়ন করুন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ আপনাদেরকে তাদের শত্রু না ভেবে বরং দেশপ্রেমিক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে গণ্য করবে এবং কোনো গুপ্ত সংগঠন বলে ভুল করবে না।
৬. দাওয়াতের ক্ষেত্রে যেটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ সেটিকে প্রাধান্য দিন। তাওহিদ ও সুন্নাহর প্রচার এবং শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা উচিত। সুন্নত, নফল, মাকরুহ বা ঐচ্ছিক বিষয়গুলো নিয়ে সমাজে ঝগড়া ও মারামারির মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. সমাজ সংস্কার ও শিরক-বিদআত মূলোৎপাটনে তাড়াহুড়ো করবেন না। দীর্ঘদিনের জমে থাকা আবর্জনা সরাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। তাই ফলাফল লাভের ব্যাপারে ধীর স্থিরতা অবলম্বন করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়ে কাজ করুন।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে দাওয়াতের পদ্ধতি শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন,
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
“তোমার পালনকর্তার পথের প্রতি আহবান কর হিকমত (প্রজ্ঞা) ও উপদেশপূর্ণ কথার মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন সুন্দরতম পন্থায়।” [সূরা আন-নাহল: ১২৫]
৮. মসজিদ, মাদরাসা ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, দায়িত্বশীল এবং দাঈগণ তাঁদের পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ ও কথাবার্তা ইসলামের আলোকে ঢেলে সাজাবেন। ইলম, আখলাক ও তাকওয়ায় তাঁরা হবেন অন্যদের জন্য আদর্শ। যেন তাঁরা আল্লাহর প্রিয় পাত্র হওয়ার পাশাপাশি মানুষের কাছেও অনুসরণীয় মানুষ হিসেবে পরিগণিত হন।
৯. নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর অনুসরণে ইখলাসের সাথে সত্যের দাওয়াত অব্যাহত রাখুন। যত বাধাই আসুক, দাওয়াত থামিয়ে দেওয়া যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সাহায্যকারী।
❑ সাত. আল্লাহর নিকট অধিক পরিমাণে দু‘আ করা:
ভুলে গেলে চলবে না যে, মজলুমের দু‘আ এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা নিপীড়িত মানুষের দু‘আ দ্রুত কবুল করেন।
আল্লাহর সাহায্যের জন্য এবং জালিমদের জুলুম থেকে পরিত্রাণের জন্য অসহায় হৃদয়ের দু‘আ আল্লাহর সাহায্য নাজিলকে তরান্বিত করবে এবং জালেমের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিবে।
❖ সংকটকালে পঠিত দু’আসমূহ:
◆ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন: ইবরাহিম (আ.)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন তিনি বলেছিলেন: حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
(উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল)।
অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট আর তিনি কতই না উত্তম কর্ম বিধায়ক।
◆ যখন কাফেররা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিদেরকে শত্রু বাহিনী জমায়েত হয়েছে বলে তাদের মাঝে আতংক সৃষ্টি করছিল, তখন তিনিও বলেছিলেন: حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
(উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল)।
অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট আর তিনি কতই না উত্তম কর্ম বিধায়ক।” [দেখুন: আলে ইমরান-এর ১৭৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যা]
◆ আবু মূসা আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো সম্প্রদায় দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করতেন, তখন বলতেন:
اَللّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِيْ نُحُوْرِهِمْ وَنَعُوْذُ بِكَ مِنْ شُرُوْرِهِمْ
(উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাজ‘আলুকা ফী নুহূরিহিম ওয়া না‘ঊযুবিকা মিন শুরূরিহিম)।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমরা আপনাকে তাদের কণ্ঠনালীতে রাখছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
➧ শেষকথা: এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, তাওহিদ ও সুন্নাহর শত্রুরা এবং জ্ঞানহীন ব্যক্তিরা দাওয়াত ও দাঈদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবেই। এটাই চিরন্তন সত্য। কারণ নবি-রসুলগণ এবং তাঁদের নিষ্ঠাবান অনুসারীরা দাওয়াতের ময়দানে অজ্ঞ, হিংসুক ও ইসলামের দুশমনদের দ্বারা যুগে যুগে নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা কখনো হতাশ হননি কিংবা থেমে যাননি। সুতরাং পথে যত বাধাই আসুক, আল্লাহর পথে দাওয়াত থামিয়ে দেওয়া যাবে না। অবুঝ মানুষগুলো হয়তো আজ সত্যের আলোর সন্ধান পাচ্ছে না তবে মহান আল্লাহ চাইলে একদিন এই আলোর বিকিরণে আলোকিত হবে প্রতিটি ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র। নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাহায্যকারী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার সমস্যার কারণে স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর বিছানা ত্যাগ করার বিধান
প্রশ্ন: যদি স্বামীর মধ্যে কিছু পাপাচার থাকে, (যেমন: মদ পান করা অথবা কিছু সালাতে অবহেলা করা ইত্যাদি) তাহলে কি তাকে সংশোধন করার উদ্দেশ্যে স্ত্রী তার বিছানা থেকে আলাদা থাকতে পারবে?
উত্তর: আমার কাছে যা স্পষ্ট মনে হয়— আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন—তা হল, এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য তালাক চাওয়া উচিত। কারণ যে ব্যক্তি প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত থাকে তার সাথে বসবাস করাটা বিরাট ক্ষতিকর। বিশেষত মদ পানকারী স্বামী তার ক্ষতি করতে পারে, এমনকি বেহুঁশ অবস্থায় তাকে হত্যাও করে ফেলতে পারে।
➧ বিছানা আলাদা করার ব্যাপারে কথা হল, স্ত্রী স্বামী থেকে বিছানা আলাদা করবে না যদি না সে নিজের জীবনের বড় কোনও ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা করে। তবে এ অবস্থায় তার জন্য তালাক চাওয়া বৈধ।
➧ আর সালাত ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে কথা হল, সালাত ছেড়ে দেওয়াটা কুফরি। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, যদি স্বামী সালাত ছেড়ে দেয় তবে স্ত্রীর জন্য তার কাছ থেকে দূরে থাকা ওয়াজিব। তাকে অবশ্যই তার পরিবারের কাছে চলে যেতে হবে। কারণ সালাত ছেড়ে দেওয়া কুফরি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا هُنَّ حِلٌّ لَهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ
“তারা (স্ত্রীগণ) তাদের জন্য হালাল নয় এবং তারাও (স্বামীগণ) এদের জন্য হালাল নয়।” [সূরা মুমতাহিনা: ১০]
সুতরাং যদি স্বামী সালাত পরিত্যাগ করে তবে বিশুদ্ধ মতানুসারে তা কুফরে আকবর বা বড় কুফরি। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব হল, স্বামীকে নিজের ওপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ না দেওয়া এবং স্বামী তওবা না করা পর্যন্ত তার সঙ্গ ত্যাগ করে নিজ পরিবারের কাছে অবস্থান করা।
❑ এ সংক্রান্ত অতিরিক্ত কিছু প্রশ্নোত্তর:
✪ প্রশ্ন: ইয়া শায়খ, আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন। এই বিছানা আলাদা করার বিষয়টি কি শুধু রাতের বেলায় প্রযোজ্য নাকি রাতদিন উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?
শায়খ: যা মনে হয় তা হল, এটি রাতদিন উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কিন্তু রতের বিষয়টা বিশেষভাবে বলা হয়েছে এ কারণে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা রাতে ঘরে থাকার সময়ই ঘটে থাকে। তবে এটা দিনের বেলায় বা সকালেও হতে পারে।
✪ প্রশ্ন: যদি স্ত্রী স্বামীকে তার চরিত্রগত সমস্যার কারণে ঘৃণা করে?
উত্তর: এ ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা আছে। যদি সে খারাপ চরিত্রের হয়— মানে কম হাসে (বা রুক্ষ মেজাজের হয়)— তবে এটা সহনীয়। কিন্তু যদি সে তার চারিত্রগত কারণে স্ত্রীকে মারধর করে বা কষ্ট দেয় অথবা তার উপর জুলুম-নির্যাতন করে তবে স্ত্রীর জন্য স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া বৈধ।
✪ প্রশ্ন: ইয়া শায়খ, আল্লাহ আপনাকে নিরাপদ রাখুন। স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে পরিত্যাগ করার বিধান কী হবে? যেমনটি ঘটেছিলে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে তাঁর স্ত্রীদের সাথে?
শায়খ: স্ত্রী কোনও আইনসংগত কারণ ছাড়া স্বামীকে পরিত্যাগ করতে পারবে না। বৈধ ক্ষেত্রে তার ওপর স্বামীর কথা শোনা এবং মেনে চলা ওয়াজিব। তবে যদি স্বামী তার হক আদায় না করে তাহলে ভিন্ন কথা।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.
সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব।
অনু্বাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর একে অপরকে দেখা বা স্পর্শ করা বা গোসল দেওয়া বা কাফন পড়ানো ইত্যাদির বিধান
স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর একে অপরকে দেখা, স্পর্শ, গোসল, কাফন ইত্যাদির বিধান: দূর হোক সমাজের বিভ্রান্তি।
প্রশ্ন: মৃত্যুর পর কি স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যান? মৃত্যুর পর একে অপরকে দেখা, স্পর্শ করা, গোসল দেওয়া, কাফন পরানো ইত্যাদির বিধান কী?
উত্তর: আমাদের সমাজে এটি একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা যে, স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তারা একে অপরের জন্য হারাম হয়ে যান। এর ফলে অনেককেই দেখা যায় যে, মৃত স্বামীকে গোসল করানো বা কবরে নামানোর মতো চূড়ান্ত কাজে স্বামী বা স্ত্রীকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। মূলত এটি আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরি প্রমুখ সহ রায় পন্থীদের অভিমত। তাদের যুক্তি হল, স্বামী স্ত্রীকে এ কারণে গোসল দিতে পারবে না যে, মৃত্যুর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ তারা এখন আর স্বামী-স্ত্রী নয়। কারণ স্বামী এখন চাইলে তার মৃত স্ত্রীর বোনকে বিয়ে করতে পারবে এবং আরও চার জন নারীকে বিয়ে করার অধিকার লাভ করবে। কিন্তু যুক্তি চেয়ে দলিল অগ্রগামী। বহু সংখ্যক দলিলের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পবিত্র সম্পর্ক মৃত্যুর কারণে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না বরং মৃত্যুর পরও স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরকে দেখা, স্পর্শ করা, গোসল করানোর বা কাফন পরানো ইত্যাদির বৈধতা বিদ্যমান থাকে। বরং স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একে অপরকে গোসল দেওয়ার জন্য অন্য সকলের চেয়ে বেশি হকদার। কারণ মৃত্যুর পরও স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য অন্যের চেয়ে বেশি আপন থাকেন। তাই তাঁদের মধ্যে পর্দার জটিলতা থাকে না এবং গভীর ভালোবাসার কারণে তাঁরা মৃত সঙ্গীর যত্নও সবচেয়ে ভালোভাবে নিতে পারেন। তবে এই বৈধতা ইদ্দত (অপেক্ষা কাল)-এর সাথে শর্তযুক্ত। এ মর্মে দলিল উল্লেখ পূর্বক আলেমদের ফতোয়া সহ বিষয়টি সংক্ষেপে আলোচনা করা হল:
✪ ১. আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাকী’ কবরস্থান থেকে ফিরলেন। এসে তিনি আমাকে এমন অবস্থায় পেলেন যে, আমি মাথাব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিলাম এবং আমি বলছিলাম, ওহ! কী প্রচণ্ড মাথা ব্যথা! তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “বরং আমি, হে আয়েশা! হায়! আমারও মাথা!”
এরপর তিনি বললেন:
ما ضرَّكِ لَو مِتِّ قَبلي فقُمتُ علَيكِ فغسَّلتُكِ وَكفَّنتُكِ وصلَّيتُ عليكِ ودفنتُكِ
“যদি তুমি আমার আগে মারা যেতে তবে তাতে তোমার কী ক্ষতি হতো? আমিই তো তোমার দায়িত্ব নিতাম, তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন দিতাম, তোমার জানাজার সালাত আদায় করতাম এবং তোমাকে দাফন করতাম।” [সহিহ ইবনে মাজাহ: ১২০৬। এ হাদিসটিকে কিছু মুহাদ্দিস জইফ (দুর্বল) বললেও অধিক বিশুদ্ধ মতে তা সহিহ। ইমাম ইবনে হিব্বান, শাওকানি, আলবানি, শুয়াইব আরনাবুত প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এটিকে সহিহ/হাসান বলেছেন]
✪ ২. আসমা বিনতে উমাইস রা. দৃষ্টান্ত: ইমাম মালিক রাহ. তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
أَنَّ أَسْمَاءَ بِنْتَ عُمَيْسٍ امْرَأَةَ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ غَسَّلَتْ أَبَا بَكْرٍ حِينَ تُوُفِّيَ، ثُمَّ خَرَجَتْ فَسَأَلَتْ مَنْ حَضَرَهَا مِنَ الْمُهَاجِرِينَ فَقَالَتْ: إِنَّ هَذَا يَوْمٌ شَدِيدُ الْبَرْدِ وَأَنَا صَائِمَةٌ فَهَلْ عَلَيَّ مِنْ غُسْلٍ قَالَوا: لَا.
“আসমা বিনতে উমাইস রা. তাঁর স্বামী আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর ইন্তেকালের পর তাঁকে গোসল করিয়েছিলেন। গোসল করানোর পর তিনি বাইরে এসে উপস্থিত মুহাজির সাহাবিদের বললেন, আমি রোজা অবস্থায় আছি এবং আজকের দিনটাও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। আমার জন্য কি গোসল জরুরি? তাঁরা বললেন: “না।” [জানাইয/৪৬৬] আল মুনতাকা আলা শারহিল মুওয়াত্তা গ্রন্থে এই হাদিস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: “এটি প্রমাণ করে যে, স্ত্রীর জন্য স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে গোসল করানো বৈধ। কারণ এটি অনেক সাহাবির উপস্থিতিতে হয়েছিল। বিশেষত আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজেই এই বিষয়ে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন এবং কোনও সাহাবি এর বিরোধিতা করেননি। সুতরাং এটি ইজমা (সাহাবিদের ঐক্যমত্য) দ্বারা প্রমাণিত।”
✪ ৩. দারাকুতনি আসমা বিনতে উমাইস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
أَنَّ فَاطِمَةَ عَلَيْهَا السَّلَامُ أَوْصَتْ أَنْ يُغَسِّلَهَا عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ
“ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর স্বামী আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁকে গোসল করানোর জন্য অসিয়ত করে গিয়েছিলেন।” [বুলুগুল মারাম পর্ব-৩, অধ্যায়: জানাজা, সনদ হাসান]
এতে প্রমাণিত হয় যে, স্বামী তার স্ত্রীকে গোসল দিতে পারবে। উপরোক্ত আসারের আলোকে জুমহুর তথা উলামায়ে কেরামের বৃহৎ অংশ যেমন: আহমদ, মালিক, শাফেঈ, ইসহাক, আতা এবং দাউদ এ মত ব্যক্ত করেছেন। শাওকানি তাঁর ‘নায়লুল আওতার’ গ্রন্থে বলেছেন,
ولم يقع من الصحابة إنكار على علي حينما غسل فاطمة، ولا على أسماء حينما غسلت أبا بكر فكان إجماع
“আর যখন আলি রা. ফাতিমা রা. কে গোসল করালেন, তখন সাহাবিদের পক্ষ থেকে কোনও আপত্তি আসেনি। আর যখন আসমা আবু বকরকে গোসল করালেন তখনও (কোনও আপত্তি আসেনি)। সুতরাং এটি ছিল ‘ইজমা’ (সাহাবিদের ঐকমত্য)।”
✪ ৪. আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “যখন তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে গোসল দেওয়ার ইচ্ছা করলেন তখন তাঁরা বললেন: ‘আল্লাহর কসম! আমরা জানি না যে আমরা কি আমাদের অন্যান্য মৃতদের মতো রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাপড় খুলে ফেলব, নাকি তাঁর কাপড় সহই তাঁকে গোসল দেব?’ যখন তাঁরা এই বিষয়ে মতভেদ করলেন তখন আল্লাহ তাঁদের উপর নিদ্রা চাপিয়ে দিলেন। ফলে উপস্থিত সকলের দাড়ি (থুতনি) তাদের বুকের উপর এল (অর্থাৎ তাঁরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলেন)। এরপর ঘরের এক পাশ থেকে কে যেন তাঁদেরকে বললেন (কে এ কথা বলল তাঁরা তাকে চিনতে পারেননি) : “তোমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাঁর কাপড় সহই গোসল দাও।” তখন তাঁরা উঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলেন এবং তাঁর গায়ে তাঁর জামা থাকা অবস্থাতেই তাঁকে গোসল দিলেন। তাঁরা জামার উপর দিয়ে পানি ঢালছিলেন এবং তাঁদের হাত ব্যবহার না করে জামার উপর দিয়েই তাঁকে মর্দন করছিলেন।
আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলতেন:
لو استَقبلتُ من أمري ما استدبرتُ ، ما غسَلَهُ إلَّا نساؤُهُ
“যদি আমি আমার ভবিষ্যতের বিষয়টি আগে জানতাম যা পরে জেনেছি তাহলে তাঁর স্ত্রীগণ ব্যতীত আর কেউ তাঁকে গোসল করাতেন না।” [সহিহ ইবনে মাজাহ, হা/ ১১৯৬ ও সহিহ আবু দাউদ, হা/৩১৪১]
আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর এ কথাটি প্রমাণ করে যে, তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে গোসল করানোর সবচেয়ে বেশি অধিকার ছিল তাঁর স্ত্রীগণের। যদিও অন্য পুরুষ সাহাবিগণও এই মহৎ কাজটি করেছিলেন তবুও স্ত্রীদের অধিকারকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন।
❑ বিজ্ঞ ফকিগগণের ফতওয়া:
◈ ১. বিশিষ্ট ফকিহ ইবনে কুদামাহ তাঁর ‘আল-মুগনি’ (২/৩৯০) গ্রন্থে বলেন:
قَالَ ابْنُ الْمُنْذِرِ: أَجْمَعَ أَهْلُ الْعِلْمِ عَلَى أَنَّ الْمَرْأَةَ تَغْسِلُ زَوْجَهَا إذَا مَاتَ. قَالَتْ عَائِشَةُ: لَوْ اسْتَقْبَلْنَا مِنْ أَمْرِنَا مَا اسْتَدْبَرْنَا مَا غَسَلَ رَسُولُ اللَّهِ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – إلَّا نِسَاؤُهُ رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ. وَأَوْصَى أَبُو بَكْرٍ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ – أَنْ تَغْسِلَهُ امْرَأَتُهُ أَسْمَاءُ بِنْتُ عُمَيْسٍ، وَكَانَتْ صَائِمَةً، فَعَزَمَ عَلَيْهَا أَنْ تُفْطِرَ، فَلَمَّا فَرَغَتْ مِنْ غُسْلِهِ ذَكَرَتْ يَمِينَهُ، فَقَالَتْ: لَا أَتْبَعُهُ الْيَوْمَ حِنْثًا. فَدَعَتْ بِمَاءٍ فَشَرِبَتْ. وَغَسَلَ أَبَا مُوسَى امْرَأَتُهُ أُمُّ عَبْدِ اللَّهِ، وَأَوْصَى جَابِرُ بْنُ زَيْدٍ أَنْ تَغْسِلَهُ امْرَأَتُهُ. قَالَ أَحْمَدُ لَيْسَ فِيهِ اخْتِلَافٌ بَيْنَ النَّاسِ. انْتَهَى”
“ইবনুল মুনযির বলেছেন: ‘উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, স্ত্রী মারা গেলে তাঁর স্বামী তাঁকে গোসল করাতে পারেন।
আয়েশা বলেছেন: ‘যদি আমরা আমাদের ভবিষ্যতের বিষয়টি আগে জানতাম, যা আমরা পরে জানতে পেরেছি, তাহলে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাঁর স্ত্রীগণ ব্যতীত আর কেউ গোসল করাতেন না।’ এটি আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। আর আবু বকর অসিয়ত করে গিয়েছিলেন যে, তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস যেন তাঁকে গোসল করান। আসমা তখন রোজা রেখেছিলেন। আবু বকর রা. (মৃত্যুর আগে) দৃঢ়ভাবে চেয়েছিলেন যে, আসমা যেন রোজা ভেঙে ফেলেন। যখন আসমা তাঁকে গোসল করানো শেষ করলেন তখন তিনি আবু বকর রা. এর কসমের কথা স্মরণ করলেন এবং বললেন: ‘আজ আমি তাঁর সাথে কসম ভঙ্গ যুক্ত করব না।’ (অর্থাৎ, রোজা ভাঙার কসম পূর্ণ করার জন্য) তিনি পানি আনালেন এবং পান করলেন। এছাড়াও আবু মুসা-কেও তাঁর স্ত্রী উম্মে আব্দুল্লাহ গোসল করিয়েছিলেন এবং জাবির ইবনে যায়েদও অসিয়ত করে গিয়েছিলেন যেন, তাঁর স্ত্রী তাঁকে গোসল করান। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেছেন: ‘এই বিষয়ে মানুষের মধ্যে কোনও মতপার্থক্য নেই।”
◈ ২. সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা বিন বায রাহ. বলেন,
قد دلَّت الأدلة الشرعية على أنه لا حرج على الزوجة أن تغسل زوجها وأن تنظر إليه، ولا حرج عليه أن يغسلها وينظر إليها، وقد غسلت أسماء بنت عميس زوجها أبا بكر الصديق رضي الله عنهما، وأوصت فاطمة أن يغسلها علي رضي الله عنهما، والله ولي التوفيق.
“শরিয়তের দলিল প্রমাণাদি এটাই নির্দেশ করে যে, স্ত্রীর জন্য তার মৃত স্বামীকে গোসল করানো ও তাকে দেখা বৈধ। একইভাবে স্বামীর জন্যও তার মৃত স্ত্রীকে গোসল করানো এবং তাকে দেখা বৈধ। এতে কোনও সমস্যা বা বাধা নেই। এ বিষয়ে একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে:
১. আসমা বিনতে উমাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁর স্বামী আবু বকর আস সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে গোসল করিয়েছিলেন।
২. ফাতেমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর স্বামী আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁকে গোসল করানোর জন্য ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তৌফিক দান কারী।” [উৎস: শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ.-এর ফতোয়া ও প্রবন্ধ সমূহের সংকলন, ত্রয়োদশ খণ্ড]
❐ মৃত স্ত্রীকে স্বামী কর্তৃক গোসল দেওয়ার বৈধতার বিশেষ শর্ত: ইদ্দত
মৃত স্ত্রীকে স্বামী কর্তৃক গোসল দেওয়ার বৈধতা বিশেষ একটি শর্তের সাথে সম্পর্কিত, আর তা হল ইদ্দত (অপেক্ষা কাল) অর্থাৎ এই বৈধতা তখনই প্রযোজ্য যখন স্ত্রী ইদ্দত (অপেক্ষা কাল) অবস্থায় থাকেন। ইদ্দত হল, স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট অপেক্ষার সময় (সাধারণত ৪ মাস ১০ দিন বা গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া। কিন্তু যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, তবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে ছিন্ন হয়ে যায়। শাইখ ইবনে উসাইমিন রাহ. বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর যদি স্ত্রী সন্তান প্রসব করেন তবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে তাঁকে আর গোসল করানো বৈধ নয়। কারণ তিনি এখন তাঁর স্ত্রী নন।”
[শাইখ ইবনে উসাইমিনের ১০০টি ফায়দা (উপকারী বিষয়) সংক্রান্ত ক্যাসেট থেকে] [সূত্র: Islamqa]
মোটকথা, মৃত্যুর পরও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয় না (ইদ্দত চলাকালীন)। তাই স্বামী তার মৃত স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তার মৃত স্বামীকে প্রয়োজনে স্পর্শ করতে পারেন, দেখতে পারেন, গোসল ও কাফন পরাতে পারেন। ইসলামি শরিয়তে এতে কোনও বাধা নেই। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
ইসলামে কুকুর হত্যা সংক্রান্ত বিধান একটি ফিকহি পর্যালোচনা
কুকুর হত্যার ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত বিধান হল, কুকুর হত্যা সংক্রান্ত ইসলামি বিধানকে নিম্নোক্ত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
◆ ১. আক্রমণকারী, পাগলা বা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কুকুরকে হত্যা করা সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ। এ ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নাই। কারণ এ ব্যাপারে হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
◆ ২. কালো রঙের (বিশেষত চোখের উপরে দুটি ফোঁটাযুক্ত) কুকুরকে হত্যা করার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অর্থাৎ তবে অধিক বিশুদ্ধ মতে তাও নিষিদ্ধ যদি তা আক্রমণাত্মক বা ক্ষতিকর না হয়।
◆ ৩. এ ছাড়া সাধারণভাবে কুকুর হত্যা করা নিষিদ্ধ। প্রয়োজন বশত এক সময় সাধারণ ভাবে কুকুর হত্যার নির্দেশ জারি করার পরে তা মনসুখ বা রহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ আগের বিধান বাতিল।
সুতরাং সর্বশেষ বিধান অনুযায়ী হিংস্র আক্রমণকারী ও ক্ষতি সাধন করে এমন কুকুর ছাড়া সকল প্রকার কুকুর হত্যা করা হারাম।
মোটকথা, ইসলামি শরিয়তের সর্বশেষ ও প্রাধান্য প্রাপ্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, আক্রমণকারী বা মারাত্মক ক্ষতিকর কুকুর ছাড়া অন্য কোনও সাধারণ কুকুরকে বিনা কারণে হত্যা করা নিষিদ্ধ (হারাম)।
╾╾╾╾╾╾╾╾╾╾╾╾╾╾╾╾
✪ নিম্নে কুকুর হত্যা সম্পর্কে আলেমদের মতামত সহ দলিল ভিত্তিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থাপন করা হল:
কুকুর হত্যা সংক্রান্ত ইসলামি বিধানকে নিম্নোক্ত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
❑ ১. আক্রমণকারী বা ক্ষতিকর কুকুর হত্যা: সর্বসম্মত অনুমতি।
আক্রমণকারী, পাগলা বা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কুকুরকে হত্যা করা সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ, ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান সহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আক্রমণকারী বা ক্ষতিকর কুকুর হত্যা অনুমোদিত। এই অনুমতি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষতিকর প্রাণীদের মধ্যে ‘আক্রমণকারী কুকুরকে চিহ্নিত করেছেন, যা মক্কার হারাম এলাকা এবং তার বাইরে উভয় স্থানেই হত্যা করা যায়। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
خَمْسٌ مِنَ الدَّوَابِّ يُقْتَلْنَ فِي الْحِلِّ وَالْحَرَمِ – فَذَكَرَ مِنْهَا الْكَلْبَ الْعَقُورَ
“পাঁচ প্রকার ক্ষতিকর প্রাণী রয়েছে, সেগুলোকে মক্কার হারাম এলাকা কিংবা এর বাইরে অন্যত্র সবজায়গাতেই হত্যা করা যাবে। সেগুলোর মধ্যে একটি হল, আক্রমণকারী কুকুর।” [বুখারি, হাদিস নং ৩১৩৬; মুসলিম, হাদিস নং ১১৯৮] ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “যা কিছু মানুষকে আক্রমণ করে বা তাদের উপর চড়াও হয় এবং তাদের ভীত করে— যেমন: সিংহ, চিতাবাঘ, বাঘ, নেকড়ে—এই সবই ‘আক্রমণকারী কুকুর’-প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত।” [উৎস: আল-মুয়াত্তা, ১/৪৪৬]
❑ ২. কালো কুকুর হত্যা: মতবিরোধ ও রহিত করণের বিধান।
কালো রঙের (বিশেষত চোখের উপরে দুটি ফোঁটাযুক্ত) কুকুরকে হত্যা করার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। এই মতবিরোধের কারণ হল, কিছু হাদিসে কালো রঙ্গের কুকুর হত্যার নির্দেশ এসেছে। যেমন:
১. আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَوْلاَ أَنَّ الكِلاَبَ أمَّةٌ مِنَ الأمَمِ لأمَرْتُ بِقَتْلِهَا فَاقْتُلُوا كُلَّ أسْوَدَ بَهِيمٍ
“যদি কুকুরগুলো আল্লাহর সৃষ্ট একটি জাতি না হতো তবে আমি সেগুলোকে হত্যা করার নির্দেশ দিতাম। সুতরাং তোমরা কেবল কালো রঙের নির্বিশেষ কুকুরগুলোকে হত্যা করো।” [হাদিসটি বর্ণনা করেছেন: তিরমিজি হাদিস নং ১৪৮৬; আবু দাউদ, হাদিস নং ২৮৪৫; নাসাঈ, হাদিস নং ৪২৮০; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩২০৫, আলবানি সহিহ তিরমিজি গ্রন্থে একে সহিহ বলেছেন]
২. জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে কুকুর হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে কোনও নারী তার কুকুর নিয়ে গ্রাম থেকে আসলে আমরা তাকেও হত্যা করতাম। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেগুলোকে হত্যা করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন:
عَلَيْكُمْ بِالأسْوَدِ البَهِيمِ ذِي النُّقْطَتَيْنِ فَإنَّهُ شَيْطَانٌ
‘তোমরা কালো রঙের নির্বিশেষ কুকুর যার চোখের উপরে দুটি সাদা ফোঁটা আছে সেটার দিকে মনোযোগী হও। কেননা এটি হল শয়তান’।” [মুসলিম, হাদিস নং ১৫৭২] (অর্থাৎ এগুলো কুকুর রূপী শয়তান বা ক্ষতিকর)
➧ কুকুর হত্যা সম্পর্কে ইবনে কুতাইবা (রহিমাহুল্লাহ) মুখতালাফুল হাদিস গ্রন্থে বলেন, আমরা সাধারণত কুকুরকে যেমন দেখি, এর বাইরেও কুকুর হয়তো হিংস্র প্রাণীদের একটি অংশ অথবা তারা জিনদের একটি অংশ হতে পারে। আমাদের বিবেক বা বুদ্ধি দিয়ে এটি জানা যাবে না। বরং রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন, সেটাই আমাদের মেনে নিতে হবে। তিনি কালো কুকুর হত্যার নির্দেশ সম্পর্কিত হাদিসের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল কালো কুকুর মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং সেটিকে “শয়তান” বলেছেন।
ইবনে কুতাইবা এর কয়েকটি কারণ দেখিয়েছেন। যেমন:
❖ ১. ক্ষতিকর স্বভাবের কারণে:
ক. কালো নির্বিশেষ কুকুরগুলো অন্যান্য কুকুরের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও আক্রমণাত্মক।
খ. জলাতঙ্ক রোগ তাদের মধ্যে দ্রুত ছড়ায়।
গ. এগুলো কম কাজের— ভালো পাহারা দিতে পারে না, শিকারেও ভালো নয় এবং বেশি ঘুমায়।
❖ ২. শয়তান বলার কারণ:
কালো কুকুরকে “শয়তান” বলার অর্থ হল, এটি তার জাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুষ্ট (খবিস)। যেমন আমরা বলি, “অমুক লোকটা শয়তান”, যার মানে সে লোকটির স্বভাব খুব খারাপ। এখানেও সেটিকে স্বভাবের দিক থেকে শয়তানের মতো বলা হয়েছে।
❖ ৩. যদি তারা জিন হয়ে থাকে:
যদি কুকুর জিন বা জিন থেকে রূপান্তরিত প্রাণীও হয় তাহলেও কালো কুকুরগুলো তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর বা উগ্র শয়তান। তাই তাদের ক্ষতি থেকে বাঁচতে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মোটকথা, ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর মতে, কালো কুকুর স্বভাবে সবচেয়ে খারাপ, বেশি আক্রমণাত্মক এবং বেশি রোগ ছড়ায়— এই কারণেই রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেগুলোকে মারার নির্দেশ দিয়েছেন।
➧ ইবনে আব্দুল বার রাহ. তার আল ইস্তিযকার গ্রন্থে বলেন, আলিমদের একটি দল বলেছেন:
কুকুর হত্যার নির্দেশটি মনসুখ (রহিত বা বাতিল) হয়ে গেছে। তবে কালো নির্বিশেষ কুকুর ব্যতীত। সুতরাং তা হত্যা করতে হবে।
এই মতের অনুসারী কেউ কেউ বলেছেন: কালো রঙের নির্বিশেষ কুকুর হল অন্যান্য কুকুরের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর এবং উপকার নেওয়ার অনুপযোগী।
তাঁরা বলেন যে, হাদিসে এসেছে, কালো কুকুর হল ‘শয়তান’। এর অর্থ হল: এটি কল্যাণ ও উপকার থেকে অনেক দূরে এবং ক্ষতি ও কষ্ট দেওয়ার দিক থেকে খুবই কাছাকাছি।মানুষ এবং জিনের মধ্যেকার শয়তানদেরও একই বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে অন্য একদল আলেমের মতে কালো কুকুর হত্যার প্রাথমিক নির্দেশটি পরবর্তী নির্দেশনা দ্বারা মনসুখ (রহিত বা বাতিল) হয়ে গেছে। অর্থাৎ আক্রমণকারী ও ক্ষতিকর না হলে কালো বা অন্য কোনও রঙের কুকুরকে হত্যা করা যাবে না।
✪ এই মতের পক্ষে দলিল সমূহ নিম্নরূপ:
◆ ১. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا تَتَّخِذُوا شَيْئًا فِيهِ الرُّوحُ غَرَضًا
“তোমরা আত্মা বিশিষ্ট কোনও কিছুকে (অস্ত্রের) লক্ষ্যবস্তু বানাবে না।” [সহীহ মুসলিম, ১৯৫৭] এই নিষেধাজ্ঞা কুকুরসহ সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কুকুরের রং যেমনই হোক না কেন।
◆ ২. তাছাড়া রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাত্র পাঁচ প্রকারের ক্ষতিকর প্রাণীকে হত্যা করার অনুমতি দিয়েছেন। যার মধ্যে একটি হল, “আক্রমণকারী কুকুর”।
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
خَمْسٌ مِنَ الدَّوَابِّ يُقْتَلْنَ فِي الْحِلِّ وَالْحَرَمِ – فَذَكَرَ مِنْهَا الْكَلْبَ الْعَقُورَ
“পাঁচ প্রকারের প্রাণী হিল্ল এবং হারাম তথা মক্কার হারাম এলাকা এবং তার বাইরে উভয় স্থানেই হত্যা করা যায়”। এর মধ্যে তিনি কেবল আক্রমণকারী কুকুরের কথা উল্লেখ করেছেন। [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শুধুমাত্র ক্ষতিকর কুকুরকেই হত্যা করা যাবে। কুকুরের গায়ের রঙ্গের উপর ভিত্তি করে কুকুর হত্যা করা যাবে না।
◆ ৩. হাদিসে এসেছে যে, একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর মাধ্যমে একজন বেশ্যা নারী আল্লাহর ক্ষমা লাভ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ
“প্রতিটি তাজা প্রাণেই (অর্থাৎ প্রাণীর প্রতি দয়া করার মধ্যে) প্রতিদান রয়েছে।” [সহিহ বুখারি] এ হাদিসের আলোকে এই মতের আলেমদের যুক্তি হল, যার প্রতি দয়া করলে পুরস্কার পাওয়া যায় তাকে হত্যা করা যায় না।
◆ ৫. কালো কুকুরকে ‘শয়তান’ বলা হয়েছে। তাই বলে কি তাকে হত্যা করা যায়?
এ মতের আলেমদের মতে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী “কালো রঙের কুকুর শয়তান” দ্বারা সেটিকে হত্যা করার নির্দেশ আসে না। কারণ আল্লাহ তাআলা কিছু জিন এবং কিছু মানুষকেও ‘শয়তান’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু তাই বলে মানুষরূপী শয়তানদেরকে হত্যা করার নির্দেশ নেই। কালো কুকুর কে শয়তান বলার উদ্দেশ্য হল, এ প্রজাতির কুকুর স্বভাবগতভাবে বেশি হিংস্র ও ক্ষতিকর।
ইমাম ইবনে আব্দুল বার রাহ, তাঁর ‘কিতাবুত তামহীদ’ গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আরও বলেন: “এই বিষয়ে আমি যা পছন্দ করি তা হল, কুকুর যদি কারো ক্ষতি না করে এবং কাউকে আক্রমণ না করে তাহলে সেগুলোর কোনটিই হত্যা করা যাবে না।” মোটকথা, এই মত অনুযায়ী, যদি কোনও কালো কুকুর আক্রমণাত্মক বা ক্ষতিকর না হয় তবে তাকেও হত্যা করা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ রঙের ভিত্তিতে হত্যা করার বিধানটি আর কার্যকর নয়।
দলিল ও যুক্তির নিরিখে এটি অধিক বিশুদ্ধ ও প্রাধান্য প্রাপ্ত মত বলে বিবেচিত হয়। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
❑ ৩. সাধারণ কুকুর হত্যা: সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা:
আক্রমণকারী বা ক্ষতিকর নয়— এমন যেকোনো সাধারণ কুকুরকে (তা যে রঙেরই হোক না কেন) হত্যা করা হারাম। মদিনায় একবার কুকুর হত্যার যে সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যাহার করে নেন (মনসুখ)। এছাড়াও শিকারি কুকুর, গবাদি পশু ও ক্ষেত-খামার পাহারার জন্য প্রশিক্ষিত কুকুর ছাড়া সব ধরণের কুকুর হত্যার নির্দেশ সংক্রান্ত হাদিসগুলো এখানে উল্লেখ্য। কিন্তু হত্যার বিধান সম্বলিত হাদিসগুলো মনসুখ বা রহিত হয়ে গেছে। যেমনটি পূর্বে এ সংক্রান্ত হাদিসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও পূর্বোল্লিখিত, সৃষ্টির প্রতি দয়া বা পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর মর্যাদা এবং সব ধরণের প্রাণীকে অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু বানানোর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত হাদিসগুলো প্রযোজ্য। আরেকটা যুক্তি হল, যদি কুকুর হত্যার নির্দেশ রহিত না হতো তাহলে হত্যা করা ওয়াজিব হত।
কিন্তু যুগে যুগে বিভিন্ন মুসলিম দেশে এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায় না যে, মানুষ কুকুর হত্যা না করার কারণে তৎকালীন কাজি বা বিচারকগণ তাদের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন এ কারণে যে, তারা কুকুর হত্যার ব্যাপারে আল্লাহর রসুলের নির্দেশ মানেনি। মোটকথা, সর্বশেষ ও প্রাধান্য প্রাপ্ত মত অনুযায়ী, হিংস্র, আক্রমণকারী ও ক্ষতি সাধন করে এমন কুকুর ছাড়া অন্য সব ধরনের সাধারণ কুকুর বিনা কারণে হত্যা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। কেননা ইসলামি নীতি অনুসারে, প্রতিটি প্রাণীর প্রতি দয়া ও করুণা প্রদর্শন করার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহু আলাম (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সদকা করার বিধান এবং একটি সদকায় একাধিক মৃত ব্যক্তিকে শামিল করার বিধান
মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সদকা করার বিধান এবং একটি সদকায় একাধিক মৃত ব্যক্তি বা দুনিয়ার সকল মৃত ব্যক্তিকে শামিল করার বিধান:
হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সদকা করা হলে সে কবরে তার দ্বারা উপকৃত হবে এবং তার আমলনামায় সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ عَائِشَةَ – رضى الله عنها – أَنَّ رَجُلاً قَالَ لِلنَّبِىِّ – صلى الله عليه وسلم إِنَّ أُمِّى افْتُلِتَتْ نَفْسُهَا ، وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ ، فَهَلْ لَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করল যে, আমার মা হঠাৎ মৃত্যু বরণ করেছে। আমার ধারণা, মৃত্যুর আগে কথা বলতে পারলে তিনি দান করতেন। এখন আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করি তবে কি তিনি সওয়াব পাবেন? তিনি বলেন: “হ্যাঁ।” [সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ২৩/ জানাজা, অনুচ্ছেদ: হঠাৎ মৃত্যু। সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: ১৩/ জাকাত, পরিচ্ছেদ: ১০. মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে সদকা করা এবং করলে এর সওয়াব তার কাছে পৌঁছা] এ হাদিসে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা হলে তিনি কবরে এর সওয়াব লাভ করবেন বলে প্রমাণিত হয়।
❑ একটি সদকায় একাধিক মাইয়েত বা দুনিয়ার সকল মাইয়েতকে শরিক করা যায় কি?
প্রশ্ন: আমি কি আমার মৃত দাদার জন্য আমার নিজস্ব অর্থ দিয়ে সদকা জারি করতে পারি? এবং আমি কি একই সময়ে আমার দাদা এবং দাদির জন্য একসাথে সদকা জারি করতে পারি?
উত্তর: হাঁ, সদকা মৃতের জন্য উপকারি এবং তার কাছে পৌঁছায়-এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ. এর মতে, সমস্ত আলেম এ বিষয়ে একমত যে, সদকা মৃতের কাছে পৌঁছায়। তেমনি আর্থিক ইবাদত (যেমন: দাস মুক্তি) মৃতের উপকারে আসে। ইমাম নওয়াবি রাহ. তার মাজমু গ্রন্থে এই ঐক্যমত্য উল্লেখ করেছেন। মুসলিম শরিফের একটি বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.) বলেছেন,
ليس في الصدقة اختلاف
“সদকায় কোনো ভিন্ন মত নেই।”
অতএব আপনি যদি আপনার দাদা অথবা দাদির জন্য সদকা জারি করতে চান তাহলে সেটি তাদের জন্য নিঃসন্দেহে উপকারি হবে। অনুরূপভাবে আপনি যদি একই সময়ে দুই জনের জন্য একসাথে সদকা জারি করেন তাও তাদের জন্য উপকারি হবে এবং আপনি তার জন্য প্রতিদান পাবেন ইনশাআল্লাহ।
[Islamweb]
❑ শাইখ বিন বায রাহ.-এর ফতোয়া:
দান-সদকা কি পিতামাতা ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে করা যায়?
জর্দান থেকে একজন মহিলা আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায. রহ. কে প্রশ্ন করেন: আমি আমার মৃত খালার জন্য সাদাকা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু লোক আমাকে বলেছে যে, আপনি কেবল আপনার পিতামাতার মৃত্যুর পরেই তাদের পক্ষ থেকে সদকা করতে পারেন। চাচা বা খালার মতো অন্যদের জন্য সদকা করলে তা তাদের কাছে পৌঁছাবে না। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী, হে শায়খ?
জবাব: যিনি এই কথা বলেছে, সে জাহেল এবং ভ্রান্ত। বরং আল্লাহর অনুগ্রহে পিতা-মাতা এবং অন্য সকলের পক্ষ থেকেই দান-সদকা গ্রহণযোগ্য ও উপকারী। মৃত ব্যক্তির জন্য দান-সদকা যেমন উপকারে আসে তেমনি তা জন্য দু’আ করাও উপকারে আসে।
সুতরাং আপনি যদি আপনার চাচা, ভাই অথবা অন্য কারও পক্ষ থেকে দান-সদকা করেন তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই। এটি ভালো কাজ।
✪ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِذَا مَاتَ ابْنُ آدَمَ؛ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٌ جَارِيَةٌ أَوْ عِلْمٌ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٌ صَالِحٌ يَدْعُو لَهُ
“যখন কোনো আদম সন্তান মারা যায়, তখন তিনটি জিনিস ছাড়া তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়াহ (চলমান দান), এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেককার সন্তান যে তার জন্য দু’আ করে।” [সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ওয়াসিয়্যাহ, হাদিস নং-১৬৩১] এই হাদিসটি একটি সাধারণ বা ব্যাপকার্থ বোধক (عام) নির্দেশ।
✪ এছাড়াও একজন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন:
إِنَّ أُمِّي تُوُفِّيَتْ، وَلَمْ تُوصِ، أَفَلَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا؟ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: نَعَمْ
“হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন এবং তিনি কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি তবে কি তিনি এর সওয়াব পাবেন?” নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “হ্যাঁ।” [সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হাদীস নং-১৩৮৮; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: জাকাত, হাদিস নং-১০০৪]
➧ বি. দ্র. কিছু আলেমের মতে, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সাদকা করার সময় নিয়তের মধ্যে দুনিয়ার সকল মুসলিমকে শরিক করা অধিক উত্তম।
হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ হাশিয়া ইবনে আবদিন (২/৩৫৭) এ বলা হয়েছে:
الأفضل لمن يتصدق نفلا أن ينوي لجميع المؤمنين والمؤمنات؛ لأنها تصل إليهم ولا ينقص من أجره شيء
“যে কেউ নফল সদকা করে তার জন্য সবচেয়ে উত্তম হল, তিনি সকল মুমিন-মুমিনাদের জন্য নি:স্বার্থভাবে সদকা করার নিয়ত করবেন। তাতে তাদেরও উপকার হবে এবং তার নিজস্ব সওয়াবের কোনো কমতি হবে না।” [Islamqa] আল্লাহু আলাম। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।
Subscribe to:
Posts (Atom)