Thursday, January 8, 2026

মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সদকা করার বিধান এবং একটি সদকায় একাধিক মৃত ব্যক্তিকে শামিল করার বিধান

 মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সদকা করার বিধান এবং একটি সদকায় একাধিক মৃত ব্যক্তি বা দুনিয়ার সকল মৃত ব্যক্তিকে শামিল করার বিধান:

হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সদকা করা হলে সে কবরে তার দ্বারা উপকৃত হবে এবং তার আমলনামায় সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ عَائِشَةَ – رضى الله عنها – أَنَّ رَجُلاً قَالَ لِلنَّبِىِّ – صلى الله عليه وسلم إِنَّ أُمِّى افْتُلِتَتْ نَفْسُهَا ، وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ ، فَهَلْ لَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করল যে, আমার মা হঠাৎ মৃত্যু বরণ করেছে। আমার ধারণা, মৃত্যুর আগে কথা বলতে পারলে তিনি দান করতেন। এখন আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করি তবে কি তিনি সওয়াব পাবেন? তিনি বলেন: “হ্যাঁ।” [সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ২৩/ জানাজা, অনুচ্ছেদ: হঠাৎ মৃত্যু। সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: ১৩/ জাকাত, পরিচ্ছেদ: ১০. মৃত ব্যক্তির পক্ষ হতে সদকা করা এবং করলে এর সওয়াব তার কাছে পৌঁছা] এ হাদিসে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান-সদকা করা হলে তিনি কবরে এর সওয়াব লাভ করবেন বলে প্রমাণিত হয়।
❑ একটি সদকায় একাধিক মাইয়েত বা দুনিয়ার সকল মাইয়েতকে শরিক করা যায় কি?
প্রশ্ন: আমি কি আমার মৃত দাদার জন্য আমার নিজস্ব অর্থ দিয়ে সদকা জারি করতে পারি? এবং আমি কি একই সময়ে আমার দাদা এবং দাদির জন্য একসাথে সদকা জারি করতে পারি?
উত্তর: হাঁ, সদকা মৃতের জন্য উপকারি এবং তার কাছে পৌঁছায়-এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ. এর মতে, সমস্ত আলেম এ বিষয়ে একমত যে, সদকা মৃতের কাছে পৌঁছায়। তেমনি আর্থিক ইবাদত (যেমন: দাস মুক্তি) মৃতের উপকারে আসে। ইমাম নওয়াবি রাহ. তার মাজমু গ্রন্থে এই ঐক্যমত্য উল্লেখ করেছেন। মুসলিম শরিফের একটি বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.) বলেছেন,
ليس في الصدقة اختلاف
“সদকায় কোনো ভিন্ন মত নেই।”
অতএব আপনি যদি আপনার দাদা অথবা দাদির জন্য সদকা জারি করতে চান তাহলে সেটি তাদের জন্য নিঃসন্দেহে উপকারি হবে। অনুরূপভাবে আপনি যদি একই সময়ে দুই জনের জন্য একসাথে সদকা জারি করেন তাও তাদের জন্য উপকারি হবে এবং আপনি তার জন্য প্রতিদান পাবেন ইনশাআল্লাহ।
[Islamweb]
❑ শাইখ বিন বায রাহ.-এর ফতোয়া:
দান-সদকা কি পিতামাতা ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে করা যায়?
জর্দান থেকে একজন মহিলা আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায. রহ. কে প্রশ্ন করেন: আমি আমার মৃত খালার জন্য সাদাকা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু লোক আমাকে বলেছে যে, আপনি কেবল আপনার পিতামাতার মৃত্যুর পরেই তাদের পক্ষ থেকে সদকা করতে পারেন। চাচা বা খালার মতো অন্যদের জন্য সদকা করলে তা তাদের কাছে পৌঁছাবে না। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী, হে শায়খ?
জবাব: যিনি এই কথা বলেছে, সে জাহেল এবং ভ্রান্ত। বরং আল্লাহর অনুগ্রহে পিতা-মাতা এবং অন্য সকলের পক্ষ থেকেই দান-সদকা গ্রহণযোগ্য ও উপকারী। মৃত ব্যক্তির জন্য দান-সদকা যেমন উপকারে আসে তেমনি তা জন্য দু’আ করাও উপকারে আসে।
সুতরাং আপনি যদি আপনার চাচা, ভাই অথবা অন্য কারও পক্ষ থেকে দান-সদকা করেন তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই। এটি ভালো কাজ।
✪ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِذَا مَاتَ ابْنُ آدَمَ؛ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٌ جَارِيَةٌ أَوْ عِلْمٌ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٌ صَالِحٌ يَدْعُو لَهُ
“যখন কোনো আদম সন্তান মারা যায়, তখন তিনটি জিনিস ছাড়া তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়াহ (চলমান দান), এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেককার সন্তান যে তার জন্য দু’আ করে।” [সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ওয়াসিয়্যাহ, হাদিস নং-১৬৩১] এই হাদিসটি একটি সাধারণ বা ব্যাপকার্থ বোধক (عام) নির্দেশ।
✪ এছাড়াও একজন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন:
إِنَّ أُمِّي تُوُفِّيَتْ، وَلَمْ تُوصِ، أَفَلَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا؟ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: نَعَمْ
“হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন এবং তিনি কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি তবে কি তিনি এর সওয়াব পাবেন?” নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “হ্যাঁ।” [সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হাদীস নং-১৩৮৮; সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: জাকাত, হাদিস নং-১০০৪]
➧ বি. দ্র. কিছু আলেমের মতে, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দান-সাদকা করার সময় নিয়তের মধ্যে দুনিয়ার সকল মুসলিমকে শরিক করা অধিক উত্তম।
হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ হাশিয়া ইবনে আবদিন (২/৩৫৭) এ বলা হয়েছে:
الأفضل لمن يتصدق نفلا أن ينوي لجميع المؤمنين والمؤمنات؛ لأنها تصل إليهم ولا ينقص من أجره شيء
“যে কেউ নফল সদকা করে তার জন্য সবচেয়ে উত্তম হল, তিনি সকল মুমিন-মুমিনাদের জন্য নি:স্বার্থভাবে সদকা করার নিয়ত করবেন। তাতে তাদেরও উপকার হবে এবং তার নিজস্ব সওয়াবের কোনো কমতি হবে না।” [Islamqa] আল্লাহু আলাম। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Tuesday, December 2, 2025

অবৈধ পন্থায় প্রবাসে বসবাস করা এবং কাজ করার বিধান

 প্রশ্ন: অবৈধ হিসাবে প্রবাসে বসবাসকারী অনেক ঋণগ্রস্ত ভাই রয়েছেন যাদের দেশে এসে জীবন ধারণের কোন ব্যবস্থা নেই। তাদের ক্ষেত্রে অবৈধভাবে প্রবাসে থেকে অর্থ উপার্জন করা কি হালাল হবে?

উত্তর: একজন মানুষ যখন প্রবাসে যাওয়ার জন্য ভিসা গ্রহণ করে তখন সে দেশে গিয়ে সেখানকার আইন-কানুন মেনে চলার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বলে পরিগণিত হয়‌। অতএব সে আইন ও শরিয়ত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে উক্ত দেশের প্রচলিত আইন-কানুন মেনে চলতে বাধ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।” [সূরা মায়েদা: ১]
আর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
المسلمونَ على شروطِهم
“মুসলিমগণ তাদের শর্তের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।” [সহীহ আবু দাউদ, হা/৩৫৯৫] অর্থাৎ মুসলিমগণ তাদের সাথে কৃত শর্ত লঙ্ঘন করবে না।
সুতরাং প্রবাসীদের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সে দেশের কোনো আইন লঙ্ঘন করা জায়েজ নেই। (যদি শরিয়ত বিরোধী কোন আইন না হয়। তবে শরিয়ত বিরোধী আইন হলে তা মানা জায়েজ নয়)।
অতএব কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ ভাবে প্রবাসে বসবাস করে তাহলে সে দেশের আইনের দৃষ্টিতে যেমন অপরাধী বলে গণ্য হবে তেমনি শরিয়তের দৃষ্টিতেও সে গুনাহগার হবে।
তবে হ্যাঁ, কোন ব্যক্তি যদি তার ইচ্ছার বাইরে কোন কারণে ‘অবৈধ’ হয়ে যায় তাহলে সে দেশে ফিরে আসার জন্য আইনানুগ পন্থায় চেষ্টা করবে। এ সময় তার জীবন ধারণ এবং দেশে ফেরত আসার খরচ যোগানের জন্য সে যেকোনো হালাল কাজ করতে পারে। কেননা এটা অপারগ অবস্থা। অপারগ অবস্থায় শরিয়তের ছাড় রয়েছে। ইসলামি ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো,
الضرورة تبيح المحظورات
“জরুরত নিষিদ্ধ জিনিসকে বৈধ করে দেয়।” যেমন প্রচণ্ড ক্ষুধায় মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য শূকর বা মরা প্রাণীর গোস্ত খাওয়া।
উল্লেখ্য যে, কোন অমুসলিম দেশে যাওয়ার আগে সেখানে কোন শরিয়ত বিরোধী কোন আইন মানার ব্যাপারে সে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। এমনটি হলে (বিশেষ কারণ ছাড়া) সে দেশে ভ্রমণ করা বা গমন করা জায়েজ নেই। অজ্ঞতাবশত সেখানে যাওয়ার পরে শরিয়ত বিরোধী আইন মানতে বাধ্য হতে হলে যথাসম্ভব দ্রুত সেখান থেকে দেশে ফিরে আসা অপরিহার্য। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মাইজভান্ডারি দরবার শরীফ এই গুলো কি সহীহ

 প্রশ্ন: “মাইজভান্ডারি দরবার শরীফ” এই গুলো কি সহীহ ?

উত্তর: পাক-ভারত উপমহাদেশ সহ পৃথিবীতে এমন কোন পীরের দরবার বা খানকা নেই যেখানে বিদআতি বা শিরকি কার্যক্রম সংঘটিত না হয়। কোথাও কম কোথাও বেশি। বরং এগুলোই শিরক, বিদআত, কুসংস্কার, জাল-জয়ীফ হাদিস, আজগুবি কিচ্ছা-কাহিনী ইত্যাদির উৎপাদন ও পরিচর্যা কেন্দ্র। এরাই সমাজে ধর্মের নামে অধর্ম বিস্তারের কাজ করে থাকে। এরাই অজ্ঞ ও ধর্মভীরু মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে দ্বীনের অপব্যাখ্যা ও বিকৃতি সাধনের পাশাপাশি মানুষের অর্থ সম্পদ লুণ্ঠন এবং ধর্ম ব্যবসা পরিচালনা করে। এই সকল শয়তানের আখড়াগুলোর বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের সচেতন হওয়া আবশ্যক। এগুলোর পরিবর্তে আমাদের উচিত, তাওহিদ ও সুন্নাহর জ্ঞান সমৃদ্ধ ও বিশুদ্ধ আকিদার ধারক ও বাহক বিজ্ঞ আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া, তাদের নিকট থেকে কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক সঠিক জ্ঞান অর্জন করে আমল করার পথ নির্দেশনা লাভ করা, দ্বীন সম্পর্কে কোন কিছু না জানলে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করে সঠিক করণীয় বর্জনীয় সম্পর্কে জেনে নেওয়া।
মহান আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

পুরুষের অনুপস্থিতে কি মহিলা নবজাতক শিশুর কানে আযান দিতে পারে

 আসলে নব জাতকের কানে আজান দেয়া বৈধ না কি অবৈধ -এ বিষয়টিই দ্বিমত পূর্ণ। কেননা এ মর্মে হাদিসগুলো সহিহ-জঈফ হওয়ার ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের মাঝে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়।

যাহোক, তবে আযান দেয়ার হাদিসগুলোকে অনেক মুহাদ্দিস সহীহ বলেছেন আর যুগে যুগে মুসলিমদের মাঝে এই আমল চলে আসছে। সুতরাং নব জাতক শিশুর কানে আযান দেয়া জায়েজ রয়েছে-এটাই অধিক গ্রহণযোগ্য মত। তবে এ আজান দিবে পুরুষ। পুরুষের অনুপস্থিতিতে মহিলা আযান দিতে পারবে কি না এ বিষয়টিও মতানৈক্য পূর্ণ। এ মতানৈক্যের কারণ হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবীদের যুগে মহিলা কর্তৃক শিশুর নিকট আযান দেয়ার ব্যাপারে কোন হাদিস পাওয়া যায় না। এই কারণে অনেক আলেম বলেন, মহিলারা আযান দিতে পারবে না। তারা আরেকটি কারণ বলেন, আযান মূলত: পুরুষদের বৈশিষ্ট্য। চাই তা নামাযের জন্য হোক অথবা অন্য কারণে হোক, কেবল পুরুষরাই আজান দিবে; মহিলারা নয়। আরেকদল আলেম বলেন, এখানে আজান দেয়ার উদ্দেশ্য, শিশুর কানে আল্লাহর বড়ত্ব ও তাওহিদের বাণী পৌঁছে দেয়া। সুতরাং নারী বা পুরুষ যেই হোক আজান দিলে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়ে যায়। সুতরাং কোন কারণে পুরুষের আজান দেয়া অসম্ভব হলে যদি মহিলা নবজাতক শিশুর কানে আজান দেয় তাহলে তা যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। তবে এ আজান দিতে হবে নিচু স্বরে যেন তার আওয়াজ পরপুরুষ না শুনে। আল্লাহু আলাম।
-الله أعلم بالصواب
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

দুধ দিয়ে গোসল নিছক কুসংস্কার পূর্ণ কাজ এবং অপচয়ের শামিল

 আমাদের দেশে কেউ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে, কেউ রোগ থেকে মুক্ত হয়ে আর কেউ ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে দুধ দিয়ে গোসল করে করে। কেউ নতুন বিয়ে করে দুধ দিয়ে গোসল করে, আবার কেউ বউ তালাকের পরে দুধ দিয়ে গোসল করে। কেউ নির্বাচনে জয়লাভ করে আবার কেউ বা কেউ রাজনীতি থেকে ইস্তফা দিয়ে দুধ দিয়ে গোসল করে!! এরকম নানা ধরণের সংবাদ আমরা প্রায়শই দেখি। এসব খবরে নেট দুনিয়া সয়লাব। কিন্তু এসব কারণে-অকারণে দুধ দিয়ে গোসল করার আদৌ কি কোনও ভিত্তি আছে নাকি এটা শুধুই আবেগ? প্রকৃতপক্ষে দুধ দিয়ে গোসল করার রীতি হিন্দুদের থেকে এসেছে। কিন্তু দুঃখ জনক বিষয় হল, দ্বীনের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে এবং বিধর্মীদের অন্ধ অনুকরণে ফলে এই জঘন্য প্রথা মুসলিমদের মধ্যেও প্রবেশ করেছে এবং অনেক নামধারী মুসলিম দেখাদেখি এই প্রথা পালন করে চলেছে।

❑ দুধ দিয়ে গোসল করার প্রথা কোথা থেকে এলো?
ভারতীয় উপমহাদেশে দুধকে পবিত্র উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। বৈদিক যুগ থেকেই এটি নানা আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হিন্দু ধর্মের মন্দির চর্চায় দেবমূর্তি বা প্রতীককে পবিত্র তরল (দুধ, পানি, ঘি, মধু ইত্যাদি) দিয়ে স্নান করানো বা ‘অভিষেক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় রীতি। বিশেষত শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা পুণ্যলাভের উদ্দেশ্যে করা হয়। দুধকে ‘সত্ত্ব’ গুণ বা শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। জন্মাষ্টমী, মহা শিবরাত্রি, উপনয়ন, বিবাহ বা রাজ্যাভিষেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে দুধ দিয়ে স্নান করানো হতো। এটি পাপমোচন, আত্মশুদ্ধি এবং রাজাকে ‘দেব-মানব’ হিসেবে তুলে ধরার প্রতীক ছিল।
❑ দুধের পুষ্টিগুণ এবং দুধ দিয়ে গোসল করার ব্যাপারে ইসলামের বিধান:
নিঃসন্দেহে দুধ আল্লাহ তাআলার একটি বড় নেয়ামত। এটি মানব দেহের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর একটি খাদ্য এবং পানীয় দ্রব্য। এতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং পানি—এই ছয়টি উপাদানের প্রায় সঠিক অনুপাত থাকে। তাই একে একটি সুষম এবং আদর্শ খাদ্য বলা হয়ে থাকে। সুতরাং সঠিক নিয়মে তা গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা শারীরিকভাবে অনেক উপকৃত হতে পারি। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সৌন্দর্য চর্চা ছাড়া বিশেষ কোনো উপলক্ষে দুধ দিয়ে গোসল করার কোনও ভিত্তি নাই। বরং তা অত্যন্ত জঘন্য কুসংস্কার ও মূর্খতা সুলভ কাজ বলে বিবেচিত। পাশাপাশি এটি অকাজে সম্পদ নষ্ট করা এবং আল্লাহর নেয়ামতের অপচয় হিসেবে পরিগণিত। অমুসলিমদের অন্ধ অনুকরণ তো বটেই যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সুতরাং কোনও মুসলিমের জন্য এমন কাজ করা জায়েজ নাই।
🔹নিম্নে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দুধ দিয়ে গোসল করার বিধান তুলে ধরা হল:
পূর্বোল্লিখিত উদ্দেশ্যে দুধ দিয়ে গোসল করা অর্থ অপচয়ের শামিল। আর কুরআনে একাধিক স্থানে অর্থ অপচয়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা কঠিন এসেছে। যেমন:
✪ ১. আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“তোমরা খাও ও পান করো। তবে অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয় কারীদের ভালোবাসেন না।”[সুরা আরাফ: ৩১]
✪ ২. আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا
“আর আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকে। আর কোনোভাবেই অপব্যয় করো না।” [সুরা বনি ইসরাইল: ২৬]
✪ ৩. অপচয় কারী শয়তানের ভাই: আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই যারা অপচয় করে, তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রবের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” [সুরা বনি ইসরাইল: ২৭]
❑ ইসলামের দৃষ্টিতে পাপ মোচন, আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং জীবনের দুঃখ-কষ্টের অবসান কিংবা আনন্দময় পরিস্থিতিতে কী করণীয়?
ইসলাম পাপ মোচন, আত্মশুদ্ধি অর্জন এবং জীবনের দুঃখ-কষ্টের অবসান কিংবা আনন্দঘন আবেগময় পরিস্থিতিতে কী করণীয় তার সঠিক নির্দেশনা প্রদান করেছে। আমাদের কর্তব্য, ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় কাজ করা এবং সব ধরনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও মূর্খতা সুলভ কার্যক্রম এবং অন্য ধর্মের অন্ধ অনুকরণ থেকে দূরে থাকা।
❁ ১. মানুষ শয়তানের প্ররোচনা, কু প্রবৃত্তির তাড়না বা অজ্ঞতা বশত ভুল কাজ করতে পারে। কিন্তু যখন সে ভুল বুঝতে পারবে তখন তার জন্য করণীয় হল উক্ত পাপ বা ভুল কাজটি ছেড়ে দেওয়া। অতঃপর লজ্জিত অন্তরে আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তিগফার করা বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এমন কর্মে লিপ্ত না হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করা। তৎসঙ্গে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
কেউ যদি গুনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি মূলক কর্ম পরিত্যাগ পূর্বক খাঁটি অন্তরে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা না করে তাহলে এক মণ দুধ কেন দুধের নদীতে ডুব দিয়ে গোসল করলেও তার গুনাহ মোচন হবে না।
❁ ২. অনুরূপভাবে জীবনে আনন্দ দায়ক কোনও কিছু ঘটলে করণীয় হল, আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা আদায় করা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
“তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও তবে আমি তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।” [সূরা ইবরাহিম: ৭]
কৃতজ্ঞতা আদায়ের অন্তর্ভুক্ত হল, মুখে আল হামদুলিল্লাহ (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য) পাঠ করার পাশাপাশি একটি সেজদায়ে শোকর দেওয়া। এটাই সুন্নত সম্মত আমল। (শুকরিয়ার দু রাকাত নামাজ পড়ার ভিত্তি নাই)।
❑ সৌন্দর্য চর্চায় দুধের ব্যবহার কি জায়েজ?
কেউ যদি কেবল সৌন্দর্য চর্চার উদ্দেশ্যে দুধ ব্যবহার করে তাহলে তাতে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনও সমস্যা নেই। কেননা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে দুধ ত্বকের জন্য উপকারী। দুধে থাকা প্রোটিন, ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘ডি’ ত্বককে মসৃণ করে এবং রোদে পোড়া ভাব দূর করতে সাহায্য করে। দুধ ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে সাহায্য করে। প্রাচীনকালে রোমানরা ত্বক কোমল রাখতে দুধ মিশ্রিত পানিতে গোসল করতেন এবং মিশরের রানি ক্লিওপেট্রাও এর জন্য বিখ্যাত ছিলেন। অ্যালোভেরা মিশিয়ে গোসল করলে আরও বেশি উপকার পাওয়া যায়। আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের কুসংস্কার ও অজ্ঞতা সুলভ কার্যক্রম এবং অন্ধ অনুকরণ থেকে হেফাজত করুন এবং ইসলাম নির্দেশিত পথে চলার তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate