Friday, October 31, 2025

আম্মাজান খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহা কি কখনও সালাত আদায় করেননি

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর, আমি দুটি বিষয়ে স্পষ্টভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করব। প্রথমত, মিরাজের পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর সালাত আদায় ফরজ ছিল কি না এবং সে সময় তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ সালাত আদায় করতেন কি না; দ্বিতীয়ত, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর জীবদ্দশায় সালাত আদায় করতেন কি না।

.
▪️প্রথমত: রাসূলুল্লাহ ﷺ মিরাজে যাওয়ার পূর্বে তাঁর ওপর সালাত আদায় ফরজ ছিল কি না; রাসূল (ﷺ) এবং তার সাহাবীগন সালাত আদায় করেছেন কিনা:
.
আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন যে,রাসূল (ﷺ)-এর মিরাজ সংগঠিত হওয়ার পূর্বে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়নি। তবে কুরআন ও সুন্নাহর দলিল প্রমাণ করে যে,পুর্ববর্তী নবী-রাসূল ও তাঁদের উম্মতের উপর এবং একইভাবে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (ﷺ) ও তার উম্মতের উপর সালাত ফরয ছিল।যেমন আল্লাহ বলেন,”আর আমরা ইব্রাহীম ও ইসমাঈলের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিলাম এই মর্মে যে, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারীদের জন্য, এখানে অবস্থানকারীদের জন্য এবং রুকূকারী ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।”(সূরা বাক্বারাহ ২/১২৫)। তিনি মূসা (আঃ)-কে বলেন,”আমরা মূসা ও তার ভাইয়ের প্রতি নির্দেশ পাঠালাম যে, তোমরা তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্য মিসরের মাটিতে বাসস্থান নির্মাণ কর এবং তোমাদের ঘরের মধ্যেই ক্বিবলা নির্ধারণ কর ও সেখানে ছালাত আদায় কর। আর তুমি মুমিনদের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও”(সূরা ইউনুস: ১০/৮৭)। তিনি ঈসা (আঃ)-এর মা মারিয়ামকে বলেন, ‘হে মারিয়াম! তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে রত হও এবং রুকূকারীদের সাথে রুকূ ও সিজদা কর’ (সূরা আলে ইমরান ৩/৪৩)। রাসূল (ﷺ) বলেন, আমরা নবীগণ আদিষ্ট হয়েছি যেন আমরা দ্রুত ইফতার করি, দেরীতে সাহারী করি এবং ছালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখি”।(ত্বাবারাণী কাবীর হা/১১৪৮৫; সহীহুল জামে‘ হা/২২৮৬)
.
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবিগণ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হওয়ার আগেও নামাজ আদায় করতেন। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই মুসলিমদের জন্য নামাজ একটি ফরজ ইবাদত ছিল।এর প্রমাণ সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে পাওয়া যায়— যখন বাদশাহ হিরাক্লিয়াস (Heraclius) আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “তিনি (মুহাম্মাদ ﷺ) তোমাদের কী করতে নির্দেশ দেন?
জবাবে মুশরিক থাকা অবস্থায় আবু সুফিয়ান বলেন:তিনি বলেন:اعْبُدُوا اللَّهَ وَحْدَهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَاتْرُكُوا مَا يَقُولُ آبَاؤُكُمْ ؛ وَيَأْمُرُنَا بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَالصِّدْقِ وَالْعَفَافِ وَالصِّلَةِ”তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুর অংশীদার সাব্যস্ত করো না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা যা বলে তা ত্যাগ কর। আর তিনি আমাদের সালাত আদায়ের, সত্য বলার, চারিত্রিক নিষ্কলুষতার এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দেন।”(সহীহ বুখারী হা/৭; সহীহ মুসলিম হা/১৭৭৩) এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে,পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হওয়ার আগেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন এবং অন্যদেরকেও ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাতেন।
.
হাদিসটির ব্যাখ্যায় হাফিয ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন:وهو يدل على أن النبي كان أهم ما يأمر به أمته الصلاة ، كما يأمرهم بالصدق والعفاف ، ، واشتُهر ذلك حتى شاع بين الملل المخالفين له في دينه ، فإن أبا سفيان كان حين قال ذلك مشركا ، وكان هرقل نصرانيا . ولم يزل منذ بُعث يأمر بالصدق والعفاف ، ولم يزل يصلي أيضا قبل أن تفرض الصلاة ​”আর এটি প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতের প্রতি যেসব বিষয়ের আদেশ দিতেন,সেগুলোর মধ্যে সালাত (নামাজ) ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,যেমন তিনি তাদের সত্যবাদিতা ও সচ্চরিত্রতার (পবিত্রতার) আদেশ করতেন। এবং এই বিষয়টি এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, এটি তাঁর ধর্মের বিরোধী জাতিগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।কেননা, আবু সুফিয়ান যখন এ কথা বলেছিলেন,তখন তিনি ছিলেন একজন মুশরিক (বহু-ঈশ্বরবিশ্বাসী), আর হিরাক্লিয়াস ছিলেন একজন নাসারা (খ্রিস্টান)।আর তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রেরিত হওয়ার পর থেকেই মানুষকে সর্বদা সত্যবাদিতা ও সচ্চরিত্রতার (পবিত্রতার) নির্দেশ দিতেন, এবং সালাত ফরজ হওয়ার আগেও তিনি নিয়মিত সালাত আদায় করতেন।”​(ইবনু রজব আল-হাম্বালী, ফাতহুল বারী শারহু সাহীহিল বুখারী; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০১)
.
আহালুল আলেমগন বলেছেন, হিজরতের স্বল্পকাল পূর্বে মি‘রাজ সংঘটিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফজর ও আসরের সালাত দুই রাকআত করে আদায় করার বিধান কার্যকর ছিল। আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) বর্ণনা করেন,”শুরুতে সালাত বাড়ীতে ও সফরে দু’ দু’ রাক‘আত করে ছিল।”(সহীহ মুসলিম হা/৬৮৫; আবূ দাঊদ হা/১১৯৮) অতঃপর মি‘রাজের রাত্রিতে চূড়ান্তভাবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হয়। হাদিসে এসেছে,আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত।তিনি বলেন, মিরাজের রাতে রাসূল (ﷺ)-এর উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়েছিল। অতঃপর তা কমাতে কমাতে পাঁচ ওয়াক্তে সীমাবদ্ধ করা হয়। অতঃপর ঘোষণা করা হল, হে মুহাম্মাদ! আমার নিকট কথার কোনো অদল বদল নাই। তোমার জন্য এই পাঁচ ওয়াক্তের মধ্যে পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব রয়েছে।”(সহীহ বুখারী হা/৩২০৭; মুসলিম হা/১৬২) অতঃপর মিরাজে রাসূল (ﷺ) তাঁর উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পর সর্বপ্রথম যোহরের সালাত আদায় করেছিলেন।যেমন হাদীসে এসেছে,আবু বারাযাহ আসলামী (রাঃ)-কে রাসূল (ﷺ)-এর সালাতের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যোহরের সালাত যাকে তোমরা প্রথম সালাত বলে থাক,সূর্য ঢলে পড়লে আদায় করতেন।”(সহীম বুখারী হা/৫৪৭; মিশকাত হা/৫৮৭)
.
▪️দ্বিতীয়ত: আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর জীবদ্দশায় সালাত আদায় করতেন কি না!
.
আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন ইসলামের প্রথম মুমিনা নারী —আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান আনয়নে সর্বাগ্রে যিনি সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নবী (ﷺ)-এর প্রথম স্ত্রী, তাঁর সন্তানদের জননী, এবং পূর্ণতার এক অনন্য প্রতীক। বুদ্ধিমত্তা, মহত্ত্ব, ধার্মিকতা ও মর্যাদার এক অসাধারণ সমন্বয় তাঁর চরিত্রে দীপ্তিমান ছিল।ইসলামের সূচনালগ্নে খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন নবী ﷺ-এর অকুতোভয় সহচর ও অবিচল সমর্থক। যখন নবী ﷺ প্রথম ওহি লাভ করে উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরে আসেন, তখন তিনিই ছিলেন তাঁর শান্তি ও সাহসের আশ্রয়স্থল। তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন— এমন মহৎ গুণাবলীর অধিকারী ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ কখনো অপমান বা কষ্ট বর্ষণ করবেন না। রাসূল ﷺ কে সান্তনা দানের ভাষা ছিল: وَاللهِ لاَيُخْزِيْكَ اللهُ اَبَدًا إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ وَتَحْمِلُ الْكَلَّ وَتَكْسِبُ الْمَعْدُوْمَ وَتَقْرِى الضَّيْفَ وَتُعِيْنُ عَلَى نَوَائِبِ الْحَقِّ-“কখনোই না। আল্লাহর কসম! তিনি কখনোই আপনাকে অপদস্থ করবেন না। আপনি আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করেন, দুস্থদের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের কর্মসংস্থান করেন, অতিথিদের আপ্যায়ন করেন এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন”।(সহীহ বুখারী হা/৩ সহীহ মুসলিম হা/১৬০; ইবনু হিশাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৭৩)।
.
নবী (ﷺ) খাদিজা (রা.)-কে জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও বারবার স্মরণ করতেন এবং তাঁর গুণাবলীর প্রশংসা করতেন।উদাহরণস্বরূপ; ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ গ্রন্থে একটি পরিচ্ছেদের নাম দিয়েছেন: ‘খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিবাহ ও তাঁর মর্যাদা’। উক্ত পরিচ্ছেদে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: “আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী খাদীজার প্রতি যে ঈর্ষা করেছি অন্য কোন স্ত্রীর প্রতি তেমন ঈর্ষা করিনি। কেননা আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি। অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন।”[হাদীসটি বুখারী (৩৮১৫) বর্ণনা করেন] শুধু তাই নয়,আম্মাজান খাদিজা (রাদিআল্লাহু আনহা) ছিলেন বিশ্বসেরা চারজন সম্মানিতা মহিলার অন্যতম। রাসূল (ﷺ) বলেন,أَفْضَلُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ وَفَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَآسِيَةُ بِنْتُ مُزَاحِمٍ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ “জান্নাতী মহিলাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হ’লেন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ, মারিয়াম বিনতে ইমরান ও ফেরাঊনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম”। (মুসনাদে আহমাদ হা/২৬৬৮; তিরমিযী হা/৩৮৭৮) তিনি ছিলেন সেই মহীয়সী মহিলা যাকে জিব্রীল (আলাইহিস সালাম) নিজের পক্ষ হতে ও আল্লাহর পক্ষ হতে রাসূল (ﷺ)-এর মাধ্যমে তাঁকে সালাম সালাম পাঠিয়েছিলেন” (বুখারী হা/১৭৯২, মুসলিম হা/২৪৩৩) পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতে এক মনোমোহন মতি দিয়ে তৈরি এমন একটি ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন যেখানে কোন শোরগোল থাকবে না এবং কোন প্রকার কষ্ট ক্লেশও থাকবে না— থাকবে শুধুই চিরন্তন শান্তি ও আনন্দ। অতঃপর, তিনি রাসূল (ﷺ)-এর নবুওয়াত শুরু হওয়ার সাত বছর পরে, অথবা বলা হয়েছে: দশ বছর পরে (এটিই অধিক সহিহ),পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং পর্দার বিধান ফরজ হওয়ার পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন।মৃত্যুর সময় আম্মাজানের বয়স ছিল পঁয়ষট্টি বছর। ​তাঁর জীবনী ও গুণাবলী সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ইবনে আব্দুল বার-এর আল ইস্তিজকার; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৮১৭; এবং ইমাম যাহাবী-এর সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০৯)
.
প্রিয় পাঠক, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর উপরোক্ত গুণাবলীর আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি ছিলেন একাধারে ধার্মিক, নৈতিকভাবে দৃঢ় ও চরিত্রে অনন্য এক তাকওয়াবান নারী। তাঁর এই মহৎ চরিত্র, ধর্মনিষ্ঠা ও আল্লাহভীতির প্রেক্ষিতে সহজেই অনুমান করা যায় যে,তিনি নিয়মিত সালাত আদায় করতেন। সীরাত ইবনে হিশাম ও তাফসির ইবনে কাসীরের বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কায় প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা গোপনে ও ব্যক্তিগতভাবে সালাত আদায় করতেন; মদিনায় হিজরতের পরই তারা প্রকাশ্যে ও জামায়াতে সালাত আদায়ের প্রথা শুরু করেন। সুতরাং, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) মক্কা অবস্থাতেই নবী ﷺ-এর নির্দেশ অনুসারে নিয়মিত ইবাদত করতেন—যদিও সে সময় জামায়াতে সালাত আদায়ের প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য সীরাতগ্রন্থসমূহে তাঁর সালাত আদায়ের স্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায়। বহু বর্ণনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো—খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সেই সালাত আদায় করতেন যা তখন ফরজ ছিল; অর্থাৎ দিনের শুরুতে দুই রাকাআত ও দিনের শেষে দুই রাকাআত। এটি ছিল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হওয়ার আগের আমলের কথা।আমি আমার প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত এমনই একটি রেওয়ায়াত উল্লেখ করছি—যেখান থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হবে আম্মাজান খাদিজা সালাত আদায় করেছেন।
.
আমাদেরকে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমার পিতা (ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল) আমাকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমাদেরকে ইয়াকুব ইবনু ইব্রাহিম আল-হানযলী (আবু ইউসুফ) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমাকে আমার পিতা ইব্রাহিম ইবনু সা‘দ বর্ণনা করেছেন।তিনি বলেন: আমাকে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক বর্ণনা করেছেন।তিনি বলেন: আমাকে ইয়াহইয়া ইবনু আল-আশ্য‘আত বর্ণনা করেছেন, তিনি ইসমাঈল ইবনু ইয়া‘স ইবনু আফিফ আল-কিন্দি থেকে বর্ণনা করেছেন,তিনি তার পিতা ইয়া‘স থেকে, আর তিনি তার দাদা আফিফ আল-কিন্দি থেকে বর্ণনা করেন—যিনি বলেছেন:
كنت امرأً تاجرًا، فقدمت الحج، فأتيت العباس بن عبد المطلب رضي الله عنه لأبتاع منه بعض التجارة، وكان امرأً تاجرًا، فوالله إني لعنده بمنى، إذ خرج رجل من خباء قريب منه، فنظر إلى الشمس، فلما رآها مالت -يعني قام يصلي- قال: ثم خرجت امرأةٌ من ذلك الخباء الذي خرج منه ذلك الرجل، فقامت خلفه تصلي، ثم خرج غلام حين راهق الحلم من ذلك الخباء، فقام معه يصلي. قال: فقلت للعباس: من هذا يا عباس؟ قال: هذا محمد بن عبد الله بن عبد المطلب ابن أخي، قال: فقلت: من هذه المرأة؟ قال: هذه امرأته خديجة ابنة خويلد. قال: قلت: من هذا الفتى؟ قال: هذا علي بن أبي طالب ابن عمه. قال: فقلت: فما هذا الذي يصنع؟ قال: يصلي، وهو يزعم أنه نبي، ولم يتبعه على أمره إلا امرأته، وابن عمه هذا الفتى، وهو يزعم أنه سيفتح عليه كنوز كسرى، وقيصر”. قال: فكان عفيف رضي الله عنه-وهو ابن عم الأشعث بن قيس رضي الله عنه- يقول -وأسلم بعد ذلك، فحسن إسلامه-: “لو كان الله رزقني الإسلام يومئذٍ، فأكون ثالثًا مع علي بن أبي طالب رضي الله عنه”
আমি একজন ব্যবসায়ী ছিলাম।একবার হজের উদ্দেশ্যে (মক্কায়) এসে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গেলাম, তাঁর কাছ থেকে কিছু বাণিজ্যিক সামগ্রী কিনবার জন্য। তিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। আল্লাহর কসম, আমি যখন মিনায় তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম, তখন তাঁর কাছের একটি তাঁবু থেকে একজন ব্যক্তি বেরিয়ে আসতে দেখলাম। সে সূর্যের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াল; যখন সে দেখল সূর্য হেলে পড়েছে, (অর্থাৎ দুপুরের ওয়াক্ত হয়েছে), তখন তিনি নামাজ পড়তে দাঁড়ালেন।এরপর সেই তাঁবু থেকে একজন নারী বেরিয়ে এল এবং তিনি তার পিছনে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন। এরপরে সেই তাঁবু থেকে এক যুবক বেরিয়ে এল,যে সবেমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কাছাকাছি (কিশোর) হয়েছে,এবং তিনি তাদের সাথে সালাত আদায় করতে লাগলেন। আমি আব্বাসকে জিজ্ঞেস করলাম:‘এই ব্যক্তি কে?’ তিনি বললেন, ‘এটি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম: ‘আর এই মহিলাটি কে?’ তিনি বললেন: ‘ইনি তার স্ত্রী খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘আর এই কিশোরটি কে?’ তিনি বললেন: ‘ইনি তার চাচাতো ভাই আলী ইবনে আবী তালিব।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম: ‘এরা কী করছে?’ তিনি বললেন: ‘ইনি (মুহাম্মদ) নামাজ পড়ছেন এবং তিনি দাবী করেন যে তিনি একজন নবী। তার স্ত্রী এবং এই কিশোর চাচাতো ভাই ছাড়া আর কেউ তার অনুসারী হয়নি। আর তিনি (মুহাম্মদ) দাবী করেন যে খুব শীঘ্রই তার জন্য কিসরা (পারস্য সম্রাট) ও কাইসারের (রোম সম্রাট) ধনভান্ডার জয় হবে।” বর্ণনাকারী বলেন, পরে আফীফ (যিনি আশ’আস ইবনে কায়েসের চাচাতো ভাই) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার ইসলাম গ্রহণ ছিল অত্যন্ত চমৎকার। তিনি আফসোস করে বলতেন:”যদি আল্লাহ সেদিনই আমাকে ইসলামের সৌভাগ্য দিতেন, তবে আমি আলী ইবনে আবী তালিবের সাথে দ্বিতীয় অনুসারী হতাম।” (অন্য বর্ণনায়: তৃতীয় হতাম,কেননা খাদীজা রা: প্রথম)।(মুসনাদে আহমেদ হা/১৭৮৭;তাবারানি কাবীর খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ১০০ হা/১৮১; হাইছামী; ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১০২; ইমাম বুখারী; তারীখুল কাবীর; খণ্ড: ৭: পৃষ্ঠা: ৭৩)
তাহক্বীক: হাদীসটি সহীহ জয়ীফ নিয়ে কথা থাকলেও বহু ইমাম বিশুদ্ধ বলেছেন। উদাহরণস্বরূপ: শাইখ আহমাদ শাকির (রাহিমাহুল্লাহ) শারহু মুসনাদ আহমাদ (হা/১৭৮৭) এ বলেছেন: “এই হাদিসের সনদ সহীহ। ইমাম হাকিম তার মুস্তাদরক হাকিমে খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮৩ হা/৪৮৪২ বর্ননা করে বুখারি মুসলিমের শর্তে হাদিসটি সহীহ বলেছেন।ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) তালখিস আল-মুস্তাদরক-এ সনদ সঠিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন; “এই হাদীসটি আবু ইয়ালা তাঁর মুসনাদে খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১১৭; হাদীস নং ১৫৪৭)-এ বর্ণনা করেছেন। শাইখ হুসাইন সালিম আসাদ, যিনি মুসনাদ আবু ইয়ালা-এর তাহকীক করেছেন, তিনি বলেছেন: ‘এর সনদ (ইসনাদ) হাসান। এবং ইমাম ইবনে আব্দিল বার আল ইস্তিজকার; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১২৪১-এ আফিফ আল-কিনদির জীবনী উল্লেখ করেছেন এবং এই হাদিসটি উল্লেখ করে বলেছেন:এই হাদিস অত্যন্ত উৎকৃষ্ট।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনার আলোকে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, আম্মাজান খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর জীবদ্দশায় নিয়মিত সালাত আদায় করতেন। অতএব, যারা বলেন যে তিনি জীবনে একবারও সালাত আদায় করেননি—তাদের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভিত্তিহীন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বোধ ও সঠিক উপলব্ধি দান করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও সর্বজ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের বিবরণ এবং মৃতের সম্পদে জীবিতদের করণীয়

 মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের বিবরণ, মৃতের সম্পদে জীবিতদের করণীয় এবং তিনি যদি বিশেষ কোনও ব্যক্তিকে তার সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার ঘোষণা দিয়ে যান তাহলে সে ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান।

প্রশ্ন: পবিত্র কুরআনের আলোকে মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ কারা? একজন মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বণ্টনের দায়িত্ব পরিবারের কার উপর বর্তায়? জীবিত থাকাকালীন যদি সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির কোনও নিষেধাজ্ঞা থাকে তবে কি তার মৃত্যুর পর তা দায়িত্ব পালনকৃত ব্যক্তি পালন করতে বাধ্য? ইসলামের আলোকে এর বিধি-বিধান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। দয়া করে জানাবেন ইনশাআল্লাহ।
উত্তর: আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে পয়েন্ট আকারে এর উত্তর দেওয়া হল:
❑ কুরআনের আলোকে মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ কারা?
পবিত্র কুরআনের সূরা নিসা এর ১১, ১২ এবং ১৭৬ নং আয়াতে মৃত ব্যক্তির প্রধান ওয়ারিশ এবং তাদের প্রাপ্য অংশের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মূলতঃ মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ব্যক্তিরা উত্তরাধিকারী হন:
✪ ১. স্বামী বা স্ত্রী:
ক. স্বামী: মৃত স্ত্রীর যদি কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান না থাকে তবে স্বামী সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবেন। সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে স্বামী এক-চতুর্থাংশ (১/৪) পাবেন।
খ. স্ত্রী: মৃত স্বামীর যদি কোনো সন্তান বা পুত্রের সন্তান না থাকে। তবে স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ (১/৪) পাবেন। সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ (১/৮) পাবেন।
[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২]
✪ ২. সন্তান-সন্ততি:
মৃত ব্যক্তির পুত্র ও কন্যা উভয়ই ওয়ারিশ হবে।
বণ্টনের ক্ষেত্রে পুরুষ (পুত্র) নারীর (কন্যা) দ্বিগুণ অংশ লাভ করবে।
[সূরা আন-নিসা: ১১]
✪ ৩. পিতা-মাতা:
ক. মৃত ব্যক্তির যদি সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকে তবে পিতা ও মাতা প্রত্যেকেই এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) করে পাবেন।
খ. যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকে এবং তার পিতা-মাতাই ওয়ারিশ হন তবে মাতা এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পাবেন এবং বাকি অংশ পিতা পাবেন।
গ. মৃতের যদি ভাই বা বোন থাকে তবে মাতা এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) পাবেন।
[সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১]
✪ ৪. অন্যান্য দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজন:
উপরে উল্লিখিত প্রধান ওয়ারিশদের অনুপস্থিতিতে কিংবা অংশ দেওয়ার পরে বাকি সম্পদের জন্য অন্য নিকটাত্মীয়রা ওয়ারিশ হন। যেমন: দাদা-দাদি, নানা-নানি, ভাই-বোন (আংশিক বা সম্পূর্ণ), ভাতিজা-ভাতিজি চাচা-ফুফু প্রমূখগণ।
(চাচা-ফুফু এবং চাচাতো ভাই-বোনেরা কখন কীভাব মিরাস পায় তা টিকা থেকে দেখুন)
দ্রষ্টব্য: ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, ওয়ারিশ নির্বাচনের একটি সুনির্দিষ্ট ক্রম ও পদ্ধতি (ফারাইয বা মিরাস) রয়েছে। নিকটতম ওয়ারিশের উপস্থিতিতে দূরবর্তী ওয়ারিশরা অনেক সময় সম্পদ থেকে বঞ্চিত হন।
❑ মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের দায়িত্ব কার?
মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ বণ্টনের দায়িত্ব পরিবারের কারো উপর এককভাবে বর্তায় না। বরং মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ বণ্টন করার পূর্বে সেই সম্পদের উপর নিম্নলিখিত চারটি ক্রমানুসারে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কাজগুলো সম্পাদনের দায়িত্ব সাধারণত পরিবারের দায়িত্বশীল ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি (যেমন: পুত্র, স্বামী/স্ত্রী, বা নিকটাত্মীয়) ও এলাকার বিজ্ঞ ইসলামি স্কলার বা বিচারক যৌথভাবে পালন করবেন:
◈ ১. দাফন-কাফনের খরচ:
মৃত ব্যক্তিকে শরিয়ত মোতাবেক দাফন-কাফন করার জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তিসঙ্গত খরচ প্রথমেই মৃত ব্যক্তির মোট সম্পত্তি থেকে আলাদা করতে হবে।
◈ ২. ঋণ পরিশোধ:
মৃত ব্যক্তির যদি কোনও ঋণ (আল্লাহর হক যেমন: কাফফারার ঋণ অথবা বান্দার হক্ব যেমন: মানুষের পাওনা ঋণ, স্ত্রী অপরিশোধিত মোহর ইত্যাদি ) থাকে, তবে তা দাফন-কাফনের খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে অবিলম্বে পরিশোধ করতে হবে। ঋণ পরিশোধে কোনও ধরনের বিলম্ব করা যাবে না।
◈ ৩. উইল বা অসিয়ত (যদি থাকে):
ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত সম্পদ থেকে মৃত ব্যক্তির বৈধ অসিয়ত (উইল) কার্যকর করতে হবে। তবে
– উইল বা অসিয়ত অবশ্যই শরিয়ত বিরোধী হওয়া যাবে না। শরিয়ত বিরোধী ওসিয়ত হলে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি নয়।
অনুরূপভাবে ওয়ারিশদের জন্য কোনও অসিয়ত করা যাবে না। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ
“আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়েছেন, সুতরাং ওয়ারিশের জন্য কোনও অসিয়ত নেই।” [সহিহ সুনানে আবু দাউদ]
◈ ৪. ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন:
উপরে উল্লিখিত তিনটি কাজ সম্পন্ন করার পর যে সম্পদ অবশিষ্ট থাকবে, তা কুরআনের আইন (ফারাইয) অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে তাদের নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে।
❑ জীবিত থাকাকালীন সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা:
আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তি জীবিত থাকাকালীন যদি কোনও বৈধ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যান তবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিকে তা পালন করতে হবে কি না:
◆ ১. বৈধ অসিয়তের ক্ষেত্রে: মৃত ব্যক্তি যদি তার মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) এর মধ্যে কোনও বৈধ অসিয়ত করে থাকেন (যেমন: কোনও দরিদ্রকে দান করা বা কোনও মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা, দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ইত্যাদি ) তবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি সেই অসিয়ত পালন করতে বাধ্য। এটি একটি ঋণ পরিশোধের মতোই গণ্য হবে।
◆ ২. ওয়ারিশদের সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে: যদি কোনও ব্যক্তি তার জীবিতাবস্থায় কোনও ওয়ারিশকে তার প্রাপ্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার জন্য নিষেধাজ্ঞা বা অসিয়ত করে যান তবে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী সেই নিষেধাজ্ঞা অবৈধ ও বাতিল বলে গণ্য হবে।
কারণ ওয়ারিশের অধিকার আল্লাহ তা’আলা নিজেই পবিত্র কুরআনে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কোনও মানুষের পক্ষে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত এই অধিকার বাতিল করার বা পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই। দায়িত্বশীল ব্যক্তি এই ধরনের অবৈধ নিষেধাজ্ঞা পালন করতে বাধ্য নন। বরং তিনি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ওয়ারিশদের প্রাপ্য অংশ বণ্টন করতে বাধ্য।
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীও এই নিষেধাজ্ঞা বাতিল।
মোটকথা, ওয়ারিশদের অংশ কমিয়ে দেওয়া বা সম্পূর্ণ বঞ্চিত করার নিষেধাজ্ঞা মৃত্যুর পর বাতিল হয়ে যাবে। তবে যদি তিনি দান বা জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ১/৩ অংশের মধ্যে অসিয়ত করে যান তা অবশ্যই পালন করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর বিধান মেনে চলার তৌফিক দিন। আমিন।
————–
টিকা: মিরাসে চাচা ফুফু এবং তাদের ছেলে-মেয়েরা কখন অংশ পাবে?
আমাদের জানা দরকার যে, ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে ওয়ারিশদের দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। যথা:
✪ ১. আসহাবুল ফুরুজ (নির্দিষ্ট অংশের অংশীদারগণ): এরা হলেন, যারা কুরআনে নির্ধারিত নির্দিষ্ট অংশ পাবেন (যেমন: আপনার স্ত্রী, সন্তান, বাবা, মা)।
✪ ২. আসাবা (অবশিষ্টভোগী): এরা নির্দিষ্ট অংশের অংশীদারদের অংশ দেওয়ার পর বাকি সম্পত্তি পান। এরাই মূলত মৃত ব্যক্তির বংশের পুরুষ আত্মীয়, যেমন: আপনার ছেলে, বাবা, দাদা, ভাই, চাচা ইত্যাদি।
◈ ১. আপনার চাচা (পিতার আপন ভাই) কখন মিরাস পাবেন?
আমরা জেনেছি যে, চাচা হলেন আসাবা (অবশিষ্টভোগী) শ্রেণীর ওয়ারিশ।
মৃত ব্যক্তির ছেলে বা ছেলের ঘরের ছেলে (নাতি) জীবিত থাকলে আপনার চাচা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হবেন এবং কোনো অংশ পাবেন না।
কিন্তু যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে বা ছেলের ঘরের ছেলে জীবিত না থাকে তাহলে আসহাবুল ফুরুজদের (যেমন: আপনার মা, মেয়ে বা স্ত্রী) নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে তা আপনার চাচা (পিতার আপন ভাই) পাবেন।
◈ ২. আপনার ফুফু (পিতার আপন বোন) কখন মিরাস পাবেন?
ফুফুরা হলেন “জাবিল আরহাম” বা রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের অন্তর্ভুক্ত।
প্রথম স্তরের ওয়ারিশগণ তথা আপনার বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, দাদা, দাদী, চাচা এদের মধ্যে কেউ জীবিত থাকলে সাধারণত ফুফু মিরাস থেকে বঞ্চিত হন।
কিন্তু যদি প্রথম স্তরের কোনো ওয়ারিশ তথা আসহাবুল ফুরুজ বা আসাবা শ্রেণীর কোনো ওয়ারিশ (অর্থাৎ, ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, বাবা, মা, চাচা, ভাই) জীবিত না থাকে তখন কেবলমাত্র সে ক্ষেত্রেই ফুফুরা নিকটতম রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় হিসেবে মিরাস পাবেন।
◈ ৩. চাচাতো ভাই/বোন এবং ফুফাতো ভাই/বোন (তাদের ছেলে-মেয়েরা) কখন মিরাস পাবেন?
মৃত ব্যক্তির ছেলে, মেয়ে বা চাচা জীবিত থাকলে চাচাতো ভাই/বোন বা ফুফাতো ভাই/বোনেরা সম্পত্তি থেকে কোনো অংশই পান না। কিন্তু যখন আসহাবুল ফুরুজ বা আসাবা কেউই জীবিত না থাকে কেবল তখনই কেবল ফুফাতো ভাই/বোন হলো জাবিল আরহাম। তারা ফুফুর মতোই অংশ পাবে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে পাকা চুলের মর্যাদা এবং এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা

 পাকা চুল হল, মুমিন ব্যক্তির জীবনে গৌরব, সৌন্দর্য এবং বিশেষ মর্যাদার প্রতীক। এই শুভ্রতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ নিয়ামত যা একজন মুসলিমের জীবনে এনে দেয় স্থিরতা ও গাম্ভীর্য। এটি মানুষের জীবনের পরিণত বয়সে উপনীত হওয়ার আলামত। এছাড়া সামাজিকভাবেও বয়স্ক মানুষ আমাদের মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র। আর ইসলামেও এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসের আলোকে কোনও মুসলিম যদি ইসলামের উপর জীবন পরিচালিত করে এবং এ অবস্থায় তার চুল পেকে যায় অর্থাৎ পরিণত বয়সে উপনীত হয় তাহলে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। আর তা হল, প্রতিটি পাকা চুলের বিনিময়ে তার আমলনামায় একটি করে নেকি লেখা হয়, একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একটি করে গুনাহ মোচন করা হয়। নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় অনুগ্রহ শীল, পরম দয়ালু ও ক্ষমাপরায়ন।

নিম্নে পাকা চুলের মর্যাদা প্রসঙ্গে দুটি হাদিস উল্লেখ করা হল:
✪ ১. প্রথম হাদিস:
আমর ইবনে শুআইব রা. তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
الشَّيْبُ نُورُ المُؤْمِنِ، لاَ يَشِيبُ رَجُلٌ شَيْبَةً فِي الإِسْلاَمِ إِلاَّ كَانَتْ لَهُ بِكُلِّ شَيْبَةٍ حَسَنَةٌ، ورُفِعَ بِهَا دَرَجَةً
“পাকা চুল (বা বার্ধক্যের শুভ্রতা) হল, মুমিনের নূর (জ্যোতি)। ইসলামের মধ্যে থেকে কোনও ব্যক্তি যে একটিও চুল পাকায় তার প্রতিটি পাকা চুলের বিনিময়ে তার জন্য একটি করে নেকি লেখা হয় এবং এর দ্বারা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।”
[সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং ৩১১]
✪ ২. দ্বিতীয় হাদিস:
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
: لاَ تَنْتِفُوا الشَّيْبَ، فَإِنَّهُ نُورٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ شَابَ شَيْبَةً فِي الْإِسْلاَمِ كُتِبَ لَهُ بِهَا حَسَنَةٌ، وَحُطَّ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ، وَرُفِعَ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ
“তোমরা পাকা চুল উপড়ে ফেলো না। কারণ এটি কিয়ামতের দিন নূর (জ্যোতি)। আর যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে থেকে একটিও চুল পাকায়, তার জন্য এর বিনিময়ে একটি নেকি লেখা হয়, একটি গুনাহ মোচন করা হয় এবং এর দ্বারা তার মর্যাদা এক ধাপ উন্নীত করা হয়।” [বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, ৫/২০৫, হাদিস নং ৬৩৮৭, এবং ইমাম আলবানি এটিকে হাসান বলেছেন, সিলসিলা সাহীহা, হাদিস নং ১২৪৩। আবু দাউদও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন, কিতাবুত তারাজ্জুল, বাব ফী নাতিফিশ শাইব, ৪/৮৫, হাদিস নং ৪২০২]। উক্ত হাদিস থেকে আমরা আরেকটি বিষয় পাই্। তা হল, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সম্মানিত প্রতীককে সম্মান করতে শিখিয়েছেন। তিনি উক্ত মাথা বা দাড়ি থেকে পাকা চুল তুলে ফেলতে নিষেধ করেছেন। অন্য হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই শুভ্রতাকে লুকিয়ে না রেখে বরং সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে এর প্রতি যত্ন নিতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি হেনা (মেহেদি) এবং কাতাম (এক ধরনের প্রাকৃতিক হলুদ রং) এর মতো উপাদান ব্যবহার করে পাকা চুল পরিবর্তন বা রং করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তিনি কালো রং ব্যবহার করে চুল রং করতে নিষেধ করেছেন। এর মূল কারণ হল, কালো রং বার্ধক্যকে সম্পূর্ণরূপে গোপন করে ফেলে যা অন্যকে ধোঁকা দেওয়া বা প্রতারণার শামিল। হাদিসের এসব নির্দেশনার মাধ্যমে মূলত বার্ধক্যকে যথাযোগ্য সম্মান জানাতে এবং যারা ইসলামের পথে অবিচল থেকে পরিণত বয়সে পৌঁছেছেন তাদের উচ্চ মর্যাদার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। আল্লাহ আমাদেরকে মৃত্যু অবধি ইসলামের উপর জীবন পরিচালনার তওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Wednesday, October 29, 2025

জীবনে সফল হতে চাইলে সবাইকে খুশি করার চেষ্টা বন্ধ করুন

 আমরা সবাই জীবনে সফলতা অর্জন করতে চাই। কিন্তু অনেক মানুষ আছে, যারা অন্যের সমালোচনার ভয়ে বা কেউ অসন্তুষ্ট হতে পারে এমন আশঙ্কায় সঠিক, যৌক্তিক ও উপকারী কাজ থেকেও পিছিয়ে আসে।

“পাছে লোকে কিছু বলে”— এই ধারণা থেকে আমাদেরকে ভয়, সংকোচ ও এক প্রকার লাজুকতা চেপে ধরে। ফলে আমাদের সংকল্পগুলো টালমাটাল করে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা একমত যে, এ ধরনের মানসিকতা জীবনে সফলতা অর্জনের জন্য এক বিশাল অন্তরায়। তাই আপনি যদি জীবনে বড় কিছু করতে চান এবং সফল হতে চান তবে আজই সবাইকে খুশি করার এই চেষ্টা বন্ধ করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সাহসিকতার সাথে সঠিক কাজটি সঠিক পদ্ধতিতে করতে শুরু করুন। সেই সাথে ইস্তিখারা করুন এবং বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষের সাথে পরামর্শ করুন।
◈ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
اِحْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجِزْ
“যা তোমার জন্য কল্যাণকর তা গুরুত্ব সহকারে করো এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো। অক্ষম হয়ো না।” [সহিহ মুসলিম, হা: ২৬৬৪]
◈ শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ. বলেন, “সে ব্যক্তি অনুতপ্ত হবে না যে স্রষ্টার নিকট ইস্তিখারা করে এবং মানুষের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেয় এবং তার উপর অটল থাকে।”
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَشَاوِرْهُمْ فِي الأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللّهِ إِنَّ اللّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
“আর তুমি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের সাথে পরামর্শ কর। অত:পর আল্লাহর উপর ভরসা করে (সিদ্ধান্তে অটল থাক)। আল্লাহ ভরসা কারীদেরকে পছন্দ করেন।“ [সূরা আলে ইমরান: ১৫৯]
◈ কাতাদা রহ. বলেন, “মানুষ যখন আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরে পরামর্শ করে তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সব চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার তওফিক দেন।”
◈ ইমাম নওয়াবি রহ. বলেন, “আল্লাহ তাআলার নিকট ইস্তেখারা করার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ভাল লোকদের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার। কারণ মানুষের জ্ঞান-গরিমা অপূর্ণ। সমষ্টিগতভাবে সে দুর্বল। তাই যখন তার সামনে একাধিক বিষয় উপস্থিত হয় তখন কী করবে না করবে বা কী সিদ্ধান্ত নিবে তাতে দ্বিধায় পড়ে যায়।”
মনে রাখবেন, আপনার এই উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় হয়তো সব মানুষ খুশি হবে না কিন্তু অনেক মানুষ উপকৃত হবে। আর এই সাফল্যে আপনি নিজে অর্জন করবেন এক অপূর্ব আত্মতৃপ্তি ও অদম্য আত্মবিশ্বাস।
সুতরাং সিদ্ধান্ত নিন, সবাইকে খুশি করা নয় বরং নিজের লক্ষ্যই আপনার প্রথম অগ্রাধিকার যদি হয় তা সঠিক, যৌক্তিক ও উপকারী।
❑ জীবনে সফলতা অর্জনের জন্য নির্দেশনাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
মনে রাখবেন—
১. সবাইকে খুশি করা অসম্ভব: প্রত্যেক মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অভিজ্ঞতা এবং চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন। তাই আপনি কখনোই সবাইকে একসাথে খুশি করতে পারবেন না।
২. সমালোচনা নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন: লোকে কী বলবে বা ভাববে, তা নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করবেন না। আপনার নিজের উন্নতি ও লক্ষ্যের দিকে মনোযোগ দিন।
৩. নিজের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দেবেন না: অন্যের জন্য বা অন্যকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের দীর্ঘদিনের লালিত কল্যাণমুখী স্বপ্নগুলোকে ত্যাগ করবেন না।
৪. সমালোচকদের উপেক্ষা করুন: আপনার কাজে সবাই একমত হবে না-এটা স্বাভাবিক। সুতরাং যারা নেতিবাচক সমালোচনা করে তাদের কথায় কান না দিয়ে এগিয়ে চলুন।
৫. আপনার কাছে যা সঠিক তা অন্যের কাছে ভুল মনে হতে পারে। সবার কথা মেনে চলার দরকার নেই। কারণ প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন।
৬. সবাই আপনাকে বুঝবে না: আপনার জীবনের পথ, সংগ্রাম ও উদ্দেশ্য সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। যারা বোঝে না তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করবেন না।
৭. নেতিবাচক চিন্তাভাবনার মানুষ থেকে দূরে থাকুন: যারা নেতিবাচক কথা বলে বা অন্যের উপকারের জন্য কাজ করেও উৎসাহের পরিবর্তে নেতিবাচক ও হতাশা জনক মন্তব্য বা অনর্থক সমালোচনা করে তাদের এড়িয়ে চলুন।
৮. অন্যের ব্যর্থতায় আনন্দ পাওয়া মানুষদের এড়িয়ে চলুন: এমন কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের ব্যর্থতা দেখে খুশি হয়। অনতিবিলম্বে এদের সঙ্গ ত্যাগ করুন।
৯. পরিবর্তনকে সবাই গ্রহণ করে না: বিষয়টা সঠিক কিন্তু অনেকের কাছে তা হয়ত নতুন বা অপরিচিত। তাই তা করতে গেলে সবাই আপনাকে সমর্থন করবে না, অথবা অনেকেই ভয় দেখাবে-এটাই স্বাভাবিক। তাই সঠিক কাজে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকুন।
১০. সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করলে আপনার নিজের ভেতরেই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাড়বে এবং আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। নিজের মানসিক শান্তি ও সুস্থতার জন্য এই চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন।
১১. নিজের মৌলিকত্ব ধরে রাখুন: অন্যকে খুশি করার জন্য যদি আপনি নিজের আসল স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব বদলে ফেলেন তবে ভবিষ্যতে আপনাকে অনুতাপ করতে হতে পারে।
তাই জীবনে নিজের মৌলিকত্ব ও স্বাভাবিকতা ধরে রাখুন।
জনৈক মনিষী বলেন, “সাফল্যের মূল রহস্য কী তা জানি না। কিন্তু ব্যর্থতার মূল রহস্য হল, সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করা।”
মোটকথা, আপনি যত সুন্দর করেই কাজ করেন না কেন তা সব মানুষের নিকট পছন্দ হবে না-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন আপনি সকলকে খুশি রাখতে চাইবেন তখন তা হবে আপনার জীবনের জন্য ব্যর্থতার মূল কারণ। সুতরাং সবাইকে খুশি করার উদ্দেশ্যে নয় বরং যেটা করা প্রয়োজন বা উপকারী সেটাই আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং আল্লাহর নিকট সাহায্য চেয়ে সুন্দরভাবে সম্পাদন করার চেষ্টা করুন এবং তা অব্যাহত রাখুন। আল্লাহর অনুগ্রহে আপনি একদিন অবশ্যই সফল হবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানদেরকে বঞ্চিত করে সকল সম্পদ আল্লাহর পথে দান করার বিধান

 প্রশ্ন: মোটামুটি সচ্ছল ৫ পুত্র সন্তানের এক পিতা তার সন্তানদেরকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে তার একমাত্র পাঁচতলা বিশিষ্ট বিল্ডিংটি পাঞ্জেগানা মসজিদ হিসেবে দান করেন। এটা কি জায়েজ? ইসলামের দৃষ্টিতে কি এর জন্য তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে? দয়া করে জানাবেন ইনশাআল্লাহ।

উত্তর: কোনও মানুষ তার সকল সম্পদ আল্লাহর পথে দান করতে চাইলে সে ক্ষেত্রে তার অবস্থার আলোকে দু ধরণের বিধান রয়েছে। যথা:
❂ এক. সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় দান:
একজন মানুষ তার সকল সম্পদের উপরে পূর্ণ কর্তৃত্ব শীল। সুতরাং একজন সুস্থ বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় তার সম্পদকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোনও বৈধ কাজে ব্যয় করার অধিকার রাখে তার অধীনস্থ যারা আছে যেমন: তার স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা বা যাদের ভরণ-পোষণ করা তার কাঁধে অর্পিত (ফরজ) তাদের জীবন-জীবিকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ছাড়া।
সুতরাং সর্বনিম্ন এতটুকু সম্পদ রেখে সে যদি চায় সে তার বাকি সম্পদ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মসজিদ-মাদরাসা, এতিমখানা কিংবা যে কোনও জনকল্যাণকর কাজে ব্যয় করতে পারে। ইসলাম তাতে বাধা দেয় না। কিন্তু যদি তার অধীনস্থদের ভরণ-পোষণ সমপরিমাণ সম্পদ না রাখে তাহলে তা হারাম। কেননা ফরজ বাদ দিয়ে নফল কাজ করা শরিয়ত সম্মত নয়।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
كفى بالمرء إثما أن يضيع من يمون
“কোনও ব্যক্তির গুনাহগার (পাপী) হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার পোষ্যদের (যাদের ভরণপোষণ তার দায়িত্বে) অবহেলা করে।” [সহিহ মুসলিম হা: ৯৯৬]
❂ দুই: মূমুর্ষ অবস্থায় দান:
মুমূর্ষু অবস্থায় (মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায়) সম্পদ দান করার ব্যাপারে ইসলাম একটা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর তা হল, সর্বোচ্চ এক তৃতীয়াংশ। তবে এর থেকে কম হওয়া আরও ভালো।
হাদিসে এসেছে−
প্রখ্যাত সাহাবি সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, বিদায় হজের সময় আমি এমন এক মারাত্মক ব্যথায় আক্রান্ত হয়েছিলাম যে, মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। তখন আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে দেখতে এলেন।
আমি বললাম: ‘হে আল্লাহর রসুল, আপনি আমার যে মারাত্মক অসুস্থতা দেখছেন তা তো দেখছেনই। আমার অনেক সম্পদ আছে। আর আমার একমাত্র মেয়ে ছাড়া আর কোনও ওয়ারিশ নেই। আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদকা (ওসিয়ত) করে দেব?’
[বুখারির অপর এক বর্ণনায় এসেছে: ‘তিনি বললেন: হে আল্লাহর রসুল, আমি কি আমার সমস্ত সম্পদ ওসিয়ত করে যাব?]
তিনি বললেন: ‘না’।
আমি বললাম: ‘তাহলে কি আমি অর্ধেক সদকা করব?’
তিনি বললেন:
لَا، الثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ ، إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ، وَلَسْتَ تُنْفِقُ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللهِ، إِلَّا أُجِرْتَ بِهَا، حَتَّى اللُّقْمَةُ تَجْعَلُهَا فِي فِي امْرَأَتِكَ
‘না, এক-তৃতীয়াংশ। আর এক-তৃতীয়াংশই অনেক বেশি। তুমি যদি তোমার ওয়ারিশদেরকে অভাব মুক্ত অবস্থায় রেখে যাও তবে তা মানুষকে হাত পাতার জন্য অভাবী অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।”
[সহীহ বুখারী হা/২৭৪২), সহীহ মুসলিম, হা/ ১৬২৮]
মোটকথা,
১. সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় দান:
ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ (যা ফরজ) রেখে বাকি পুরোটা দান করা জায়েজ, যদি না তা পোষ্যদের আবশ্যকীয় হক নষ্ট করে। পোষ্যদের হক রক্ষা করা ফরজ। ফরজ বাদ দিয়ে নফল (সদকা) করা জায়েজ নয়।
২. মুমূর্ষু অবস্থায় (মৃত্যুশয্যায়) দান/ওসিয়ত:
সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ ওসিয়ত করা জায়েজ; এর বেশি নয়।
সুতরাং আপনার প্রশ্নের আলোকে বলব, উক্ত দানকারী পূর্বোল্লেখিত শরিয়তের বিধান মেনে তার সম্পদ দান করতে পারে।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate