Thursday, September 12, 2024

দান-সাদকা করার ফজিলত এবং কাকে দান করা যায় ও দানের পরিমাণ সর্বোচ্চ কত হওয়া কর্তব্য

 প্রশ্ন: দান-সাদকা করার ফজিলত কী? কাকে দান করা যায় এবং দানের পরিমাণ সর্বোচ্চ কত হওয়া কর্তব্য?

উত্তর: নিম্নে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল: و بالله التوفيق

▪ দান-সাদকা করার ফজিলত:

কুরআন-সুন্নায় দান-সাদকা করার ব্যাপারে পর্যাপ্ত ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে এ প্রসঙ্গে কয়েকটি আয়াত ও হাদিস তুলে ধরা হলো:

✪ আল্লাহ তাআলা আল্লাহর রাস্তায় দানের প্রতিদান সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন:

ক. মহাগ্রন্থ কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

“যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে তার উদাহরণ হচ্ছে সেই বীজের মত যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। আর প্রতিটি শীষে একশতটি করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত সুবিজ্ঞ।” [সূরা বাকারা: ২৬১]

খ. রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَنْ أَنْفَقَ نَفَقَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَانَتْ لَهُ بِسَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ

“যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোন কিছু ব্যয় করবে তাকে সাতশত গুণ সওয়াব প্রদান করা হবে।” [আহমদ, তিরমিজি, নাসাঈ-সহিহ]

অর্থাৎ যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় অর্থ খরচ করবে, চাই তা জিহাদের প্রয়োজনে খরচ করুক, অথবা গরিব-অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে কিংবা ইসলামের কোনও প্রয়োজনে খরচ করুক কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বিনিময়ে তার দানকে সাতশো গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে প্রতিদান দিবেন।

✪ আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান-সাদকা করা আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার মত:

মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَقْرِضُوا اللَّـهَ قَرْضًا حَسَنًا ۚ وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُم مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّـهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا ۚ

“তোমরা নামাজ কায়েম কর, জাকাত দাও এবং আল্লাহকে কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্যে যা কিছু অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে উত্তম আকারে এবং পুরস্কার হিসেবে বর্ধিত রূপে পাবে।” [সূরা মুযযাম্মিল: ২০]

উক্ত আয়াত সমূহে উল্লেখিত ’আল্লাহকে কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ’ দেওয়ার অর্থ, “আল্লাহর পথে খরচ করা।” [তাফসীর ইবনে কাসির, তাফসিরে বিন সাদি ইত্যাদি]
বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে জায়েদ বলেন, “জাকাত দেওয়া ছাড়াও নিজের অর্থ-সম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করা। এ খরচ আল্লাহর পথে জিহাদ করা, আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য করা, জনকল্যাণমূলক কাজ করা কিংবা অন্যান্য কল্যাণকর কাজেও হতে পারে।”
এভাবে অর্থ ব্যয় করলে আল্লাহ তাকে নিজের জন্য ঋণ বলে গণ্য করেন। তাই তিনি এক্ষেত্রে কেবল আসলটি নয় বরং তার ওপর কয়েকগুণ বেশি দেওয়ার ওয়াদা করেছেন।

✪ দানকারীর জন্য ফেরেশতাদের দুআ আর ব্যয়কুণ্ঠের জন্য বদদুআ:

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

– ما من يومٍ يُصبحُ العبادُ فيه إلا وملَكانِ ينزلانِ ، فيقولُ أحدُهما : اللهمَّ أعطِ مُنفقًا خلفًا ، ويقولُ الآخرُ : اللهمَّ أعطِ مُمْسكًا تَلفًا

“প্রতিদিন সকালে দু জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন দানকারীর জন্য দুআ করেন। বলেন, হে আল্লাহ দানকারীকে দানের বিনিময় দান কর। (তার সম্পদ বৃদ্ধি কর) আর দ্বিতীয়জন কৃপণের জন্য বদ দুআ করে বলেন, হে আল্লাহ কৃপণের মালে ধ্বংস দাও।” [বুখারি ও মুসলিম]

✪ ৪. দান-সাদকা করলে সম্পদ কমে না:

আবু কাবশা আল আনমারী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন যে,

مَا نَقَصَ مَالُ عَبْدٍ مِنْ صَدَقَةٍ

“সদকা করলে কোন মানুষের সম্পদ কমে না।” [সহিহ মুসলিম, হা/২৫৮৮]

✪ ৫. দান-সাদকা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার মাধ্যম:

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মর্মে বলেছেন,

«اتَّقُوْا النَّارَ وَ لَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ»

‘‘তোমরা খেজুরের অর্ধেক দান করে হলেও আগুন থেকে বাঁচ।’’[বুখারী, অধ্যায়: জাকাত, অনুচ্ছেদ: খেজুরের একাংশ দান করে হলেও আগুন থেকে বাঁচ]

✪ ৬. সাদকায়ে জারিয়ার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে:

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ »

“মানুষ মৃত্যু বরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায় তবে তিনটি ছাড়া।(সেগুলো হলো)
– সাদকায়ে জারিয়া (এমন দান যা দ্বারা মানুষ দীর্ঘদিন উপকৃত হয়),
– এমন ইলম (শরিয়ত বিষয়ক জ্ঞান) যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়
– এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।” [সহিহ মুসলিম, হা/৪৩১০]

কুরআন-হাদিসের দান-সাদকার আরও অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

▪ কাদেরকে দান করব?

সাধারণভাবে গরিব-অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে, জন কল্যাণকর কাজে এবং দ্বীনের প্রয়োজনে সাহায্য করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে নিজ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে গরিব, এতিম ও অসহায় মানুষের উদ্দেশ্যে দান করা অধিক উত্তম। এদেরকে দান করলে দু ধরণের সওয়াবের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِيْنِ صَدَقَةٌ وَهِىَ عَلَى ذِى الْقَرَابَةِ اثْنَتَانِ صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ

“দরিদ্রকে দান করলে কেবল সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। আর আত্মীয়কে দান করলে সদকার সওয়াব এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার সওয়াব উভয়ই পাওয়া যায়।” [তিরমিজি, হা/৬৫৮ ও ইবনে মাজাহ, হা/১৮৪৪, সনদ সহীহ]

এ মর্মে আরও একাধিক হাদিস রয়েছে।

▪ কী পরিমাণ দান করা যায়?

আল্লাহ তাআলা যাকে অর্থ-সম্পদ দান করেছেন সে যত বেশি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে গরিব-অসহায় মানুষ, জনকল্যাণকর কাজ অথবা দ্বীনের সেবায় অর্থ দান করবেন আল্লাহ তাআলা তাকে তত বেশি সওয়াব দান করবেন। কেউ সুস্থ-সবল ও স্বাভাবিক অবস্থায় চাইলে তার জীবন পরিচালনা এবং তার স্ত্রী-পরিবারের অত্যাবশ্যকীয় খরচ ছাড়া তার সমূদয় সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে দেওয়ার অধিকার রাখে। এতটা দান উচিত নয় যে, সব কিছু দান করার পর সে নিঃস্ব হয়ে যায়। তবে যদি সে শারীরিকভাবে অর্থ-উপার্জনে সক্ষম হয় তাহলে ভিন্ন কথা।

সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয় যে, প্রশ্ন: এক তৃতীয়াংশ সম্পদ দান করা উত্তম নাকি সম্পূর্ণ সম্পদ?
তিনি বলেন,

لا بدّ أن يُبقي له ما ينفعه ولا يتصدّق به كله، مثلما قال ﷺ لكعبٍ: أمسك عليك بعض مالك فهو خيرٌ لك، فيتصدّق بما تيسَّر، ويُبقي ما يُعينه على طاعة الله، ويُنفق على أهله.

“যা তার উপকারে আসবে তা তাকে অবশ্যই রাখবে; সব সম্পদ দান করবে না, যেমনটি তিনি কাব রা. কে বলেছিলেন,

أَمْسِكْ عَلَيْكَ بَعْضَ مَالِكَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ

“তুমি তোমার মালের কিছু অংশ রেখে দাও; তা তোমার জন্য উত্তম হবে।”
[সুনানে নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৩৫/ মানত ও কসম, পরিচ্ছেদ: ৩৬. মানত হিসেবে হাদিয়া দেওয়া]

অতএব যথাটা সম্ভব দান করবে এবং এতটুকু রেখে দিবে যা দ্বারা সে আল্লাহর আনুগত্য করতে পারবে এবং তার পরিবারের জন্য ব্যয় করতে পারবে।”

তবে মৃত্যুর পূর্বক্ষণে মুমূর্ষু অবস্থায় দান (ওসিয়ত) করতে চাইলে ইসলাম একটি পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। আর তা হল, সর্বোচ্চ এক তৃতীয়াংশ। এর চেয়ে বেশি দান করা জায়েজ নাই। বরং এর চেয়ে কম হলেই ভালো। মুমূর্ষু অবস্থায় দানের ক্ষেত্রে কেউ যদি তার ধন-সম্পদ সব কিছু দানের ওসিয়ত করে যায় তাহলে তার মধ্যে কেবল এক তৃতীয়াংশ কার্যকর হবে। বাকিটা তার ওয়ারিশদের মাঝে যথানিয়মে বণ্টিত হবে।

🔸 সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বিদায় হজের সময় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। পথিমধ্যে আমি প্রচণ্ড রোগে আক্রান্ত হলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার সেবা-শুশ্রূষা করতে এলে আমি তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রসূল, আমার অনেক সম্পত্তি। কিন্তু আমার ওয়ারিশ হওয়ার মত কেউ নাই একমাত্র মেয়ে ছাড়া। আমি আমার সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগ ওসিয়ত করব?
তিনি বললেন, না।
আমি বললাম, অর্ধেক?
তিনি বললেন, না।
আমি বললাম, তবে তিন ভাগের একভাগ?
তিনি বললেন, “তিন ভাগের একভাগ! তিন ভাগের একভাগই তো বেশি। সাদ, তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে দরিদ্র অবস্থায় রেখে যাবে আর তারা মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে বেড়াবে এর চেয়ে তাদেরকে সম্পদশালী করে রেখে যাওয়াই উত্তম।” [বুখারী ও মুসলিম]

– এক তৃতীয়াংশের চেয়ে কম করা উত্তম। ইবনে আব্বাস রা. বলেন,

لَوْ غَضَّ النَّاسُ إِلَى الرُّبْعِ ، لأَنَّ رَسُولَ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – قَالَ « الثُّلُثُ ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ أَوْ كَبِيرٌ »

“মানুষ যদি (সম্পত্তি ওসিয়ত করার ক্ষেত্রে) এক তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশে নেমে আসত তবে উত্তম হত। কেননা, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তিন ভাগের একভাগ! তিন ভাগের একভাগই তো বেশি।” [বুখারি ও মুসলিম] আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬ উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল। (লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

বন্যা-জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং সর্বপ্রকার বিপাদাপদ ও ক্ষয়-ক্ষতি থেকে মুক্তির জন্য অতি জরুরি ১০টি দুআ

 নিম্নে বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং সর্বপ্রকার বিপাদাপদ ও ক্ষয়-ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য হাদিসে বর্ণিত অতি জরুরি ১০টি দুআর আরবি টেক্স, সেগুলোর বাংলা উচ্চারণ এবং অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

❂ ১. এমন বৃষ্টির জন্য দুআ যা হবে উপকারী; কোনও ক্ষতির কারণ হবে না:

اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مَرِيئًا مَرِيعًا طَبَقًا عَاجِلاً غَيْرَ رَائِثٍ نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ

উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা আসক্বিনা গাইসান মারীআন, মারীআ’ন, তবাকান, আ-জিলান গাইরা রা-ইসিন, নাফিআন, গাইরা দ্ব-র।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদেরকে এমন বৃষ্টির পানি দান করুন যা সুপেয়, ফসল উৎপাদক, পর্যাপ্ত, শীঘ্রই; বিলম্বে নয়, উপকারী; ক্ষতিকর নয়।” [মুসনাদে আহমদ, হা/২৭৬৮৯-ইরওয়াহ, হা/১৪৫-সহীহ]

❂ ২. অতিবৃষ্টি বন্ধের জন্য দুআ:

اَللّٰهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اَللّٰهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالظِّرَابِ، وَبُطُوْنِ الْأَوْدِيَةِ، وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা ‘আলাইনা। আল্লা-হুম্মা আলাল-আ-কা-মি ওয়ায্যিরা-বি ওয়াবুতূনিল আওদিয়াতি ওয়ামানা-বিতিশ শাজারি।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় (বৃষ্টি বর্ষণ করুন); আমাদের উপর নয়। এবং (বৃষ্টি বর্ষণ করুন) উঁচু ভূমিতে, পাহাড়ে, উপত্যকার কোলে ও বনাঞ্চলে। [বুখারী, হ/৯৩৩; মুসলিম, হা/৮৯৭]

❂ ৩. ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বায়ু প্রবাহের সময় দুআ:

لاللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ الرِّيحِ، وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيحِ، وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ

উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস্আলুকা খায়রাহা ওয়া খায়রা মা ফীহা ওয়া খায়রা মা উরসিলাত বিহী; ওয়া আ‘ঊযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা ফীহা ওয়া মিন শাররি মা উরসিলাত বিহী।”

অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট এই বায়ুর কল্যাণ, এর মধ্যে যে কল্যাণ নিহিত আছে এবং যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এই বায়ুর অনিষ্ট, এর মধ্যে যে অনিষ্ট নিহিত রয়েছে এবং যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে তার অনিষ্ট থেকে।”
[সুনান তিরমিজি, অনুচ্ছেদ: বাতাসকে গালি দেওয়া নিষেধ, হা/২১৭৮, সহীহ-আলবানী]

❂ ৪. আল্লাহর আজাব-গজব থেকে মুক্তির জন্য দুআ:

اللَّهُمَّ لاَ تَقْتُلْنَا بِغَضَبِكَ وَلاَ تُهْلِكْنَا بِعَذَابِكَ وَعَافِنَا قَبْلَ ذَلِكَ

উচ্চারণ: “আল্ল-হুম্মা লা তাক্বতুলনা বিগাযাবিকা, ওয়া লা তুহলিকনা বিআযাবিকা ওয়া আ’ফিনা ক্ববলা যা-লিকা।”

অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার গজব (ক্রোধ) দ্বারা হত্যা করবেন না এবং আপনার আজাব (শাস্তি) দ্বারা ধ্বংস করে দেবেন না। এসবের আগেই আপনি আমাকে পরিত্রাণ দিন। [তিরমিজি, হা/৩৪৫০ [আল মাদানী প্রকাশনী], আল কালিমুত তাইয়্যিব ১৫৮/১১১, সিলসিলা যঈফা, হা/১০৪২।

উল্লেখ্য যে, মেঘের ও বজ্রের আওয়াজ শুনে এ দুআ পড়ার হাদিসটি দুর্বল হলেও সাধারণভাবে আল্লাহর আজাব-গজব থেকে মুক্তির জন্য পড়তে বাধা নেই ইনশাআল্লাহ।

❑ সাধারণভাবে আল্লাহর নিকট কল্যাণ প্রার্থনা এবং সবধরনের ক্ষয়-ক্ষতি ও বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য কতিপয় দুআ:

❂ ৫. দুআ:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنَ الْخَيْرِ كُلِّهِ ، عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ ، مَا عَلِمْتُ مِنْهُ وَمَا لَمْ أَعْلَمْ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الشَّرِّ كُلِّهِ عَاجِلِهِ وَآجِلِهِ ، مَا عَلِمْتُ مِنْهُ وَمَا لَمْ أَعْلَمُ

উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিনাল খাইরি কুল্লিহী, আ’-জিলিহি ওয়া আ-জিলিহি মা আলিমতু মিনহু ওয়ামা লাম আলাম। ওয়া আউযুবিকা মিনাশ শাররি কুল্লিহী আ’-জিলিহি ওয়া আ-জিলিহি মা আলিমতু মিনহু ওয়ামা লাম আলাম।

অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে সব ধরণের কল্যাণ প্রার্থনা করছি। বর্তমানের কল্যাণ চাই ও ভবিষ্যতের কল্যাণ চাই। যে কল্যাণ সম্পর্কে আমি জানি তা চাই এবং যে কল্যাণ সম্পর্কে আমি জানি না সেটাও চাই। আপনার কাছে সব ধরনের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চাই।” [সুনান ইবনে মাজাহ, অধ্যায়: ২৮/ দুআ, পরিচ্ছেদ: ২৮/৪. দুআর সমষ্টি, আল-আদাবুল মুফরাদ দুআ-দরুদ-পরিচ্ছেদ: ২৭৯- বিবিধ। সিলসিলা সহীহাহ, হা/১৫৪২]

❂ ৬. দুআ:

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ التَّرَدِّيْ وَالْهَدْمِ وَالْغَرَقِ وَالْحَرِيْقِ وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ يَتَخَبَّطَنِيَ الشَّيْطَانُ عِنْدَ الْمَوْتِ وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَمُوْتَ فِيْ سَبِيْلِكَ مُدْبِرًا وَأَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَمُوْتَ لَدِيْغًا».

উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাত তারাদ্দি ওয়াল হাদমি ওয়াল গারাক্বি ওয়াল হারীক্বি। ওয়া আউযুবিকা আইঁ ইয়াতাখাব্বাত্বানিয়াশ শায়ত্বানু ইংদাল মাওতি, ওয়া আউযুবিকা আন আমূতা ফী সাবীলিকা মুদবিরা। ওয়া আ’উযুবিকা আন আমুতা লাদীগা।

অর্থ: হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই, উঁচু স্থান থেকে পতিত হওয়া, কোনও কিছুর নিচে চাপা পড়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া এবং পানি ডুবে যাওয়া থেকে। আর আপনার কাছে আশ্রয় চাই, মৃত্যুকালে শয়তান যেন আমাকে বিপথগামী করতে না পারে।
এবং আপনার কাছে আশ্রয় চাই, আপনার পথে জিহাদ করার সময় যেন পালিয়ে মৃত্যুবরণ না করি। এবং আপনার কাছে আশ্রয় চাই, যেন সাপ-বিচ্ছুর দংশনে মৃত্যুবরণ না করি।
[আবু দাউদ ১৫৫২, নাসায়ী ৫৫৩৩, আহমদ ১৫৫২৩, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩৮১, মুসতাদারাক লিল হাকিম ১৯৪৮, আদ্ দা‘ওয়াতুল কাবীর ৩০৯-সহিহ]

❂ ৭. দুআ:

اللَّهُمَّ إنّي أعُوذُ بِكَ مِنْ يَوْمِ السُّوءِ، وَمِنْ لَيْلَةِ السُّوءِ، وَمِنْ سَاعَةِ السُّوءِ، وَمِنْ صَاحِبِ السُّوءِ، وَمِنْ جَارِ السُّوءِ في دَارِ الْمُقامَةِ

উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নী আউযু বিকা মিন ইয়াউমিস সূ, ওয়া মিন লাইলাতিস সূ, ওয়া মিন সা-আতিস সূ, ওয়া মিন স্বা-হিবিস সূ, ওয়া মিন জা-রিস সূ, ফী দা-রিল মুক্বা-মাহ।

অর্থ: হে আল্লাহ, অবশ্যই আমি তোমার নিকট মন্দ দিন, মন্দ রাত, মন্দ সময়, অসৎ সঙ্গী এবং স্থায়ী আবাসস্থলে অসৎ প্রতিবেশী হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। [মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ১০/১৪৪, সহিহুল জামে, হা/১২৯৯]

❂ ৮. দুআ:

‏ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ‏.‏ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي دِينِي وَدُنْيَايَ، وَأَهْلِي وَمَالِي‏.‏ اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِي، وَآمِنْ رَوْعَاتِي‏.‏ اللَّهُمَّ احْفَظْنِي مِنْ بَيْنِ يَدَيَّ وَمِنْ خَلْفِي، وَعَنْ يَمِينِي وَعَنْ شِمَالِي، وَمِنْ فَوْقِي، وَأَعُوذُ بِعَظَمَتِكَ مِنْ أَنْ أُغْتَالَ مِنْ تَحْتِي‏.‏

উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফিদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাহ। আল্ল-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফী দ্বীনী ওয়া দুনয়ায়া ওয়া আহলী ওয়া মালী।
আল্ল-হুম্মাসতুর আওরাতী ওয়া ওয়া মিন রাওআতী। আল্ল-হুম্মাহ ফাযনী মিন বাইনি ইয়াদাইয়া ওয়া মিন খলফী, ওয়া আন ইয়ামীনী ওয়া আন শিমালী ওয়া মিন ফাওক্বী।
ওয়া আউযু বিআযামাতিকা মিন আন উগতালা মিন তাহতী।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই এবং দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা চাই।
হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই এবং আমার দ্বীন, আমার দুনিয়া, আমার পরিবার-পরিজন এবং আমার ধন-সম্পদের ব্যাপারে নিরাপত্তা চাই। হে আল্লাহ, আমার সব গোপন দোষগুলোকে তুমি ঢেকে রাখ এবং আমার সব ভয়ের স্থানে তুমি আমাকে নিরাপত্তা দান কর। হে আল্লাহ, তুমি আমাকে সামনে-পেছনে, ডানে-বামে ও উপরে সর্বদিক দিয়ে রক্ষা কর। হে আল্লাহ, তোমার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের ওসিলায় আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, আমি যেন আমার নিচের দিক দিয়ে মাটিতে দেবে না যাই। [আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, নাসাঈ, আহমাদ, হাকিম, ইবনে হিব্বান, আল-আদাবুল মুফরাদ, অধ্যায়: ঘুমানোর আদব-কায়দা, পরিচ্ছেদ: ৫৭৪- ভোরে উপনীত হয়ে যে দুআ পড়বে-সহিহ]

❂ ৯. দুআ:

«اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ جَهْدِ الْبَلَاءِ وَدَرَكِ الشَّقَاءِ وَسُوْءِ الْقَضَاءِ وَشَمَاتَةِ الأَعْدَاءِ»

উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন জাহদিল বালা-ই, ওয়া দারাকিশ শাক্বা-ই, ওয়া সু-ইল ক্বদা-ই, ওয়া শামাতাতিল আ’দা-ই।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই, কঠিন বিপদ, দুর্ভাগ্যে পতিত হওয়া, ভাগ্যের অশুভ পরিণতি এবং শত্রুর আনন্দিত হওয়া থেকে। [বুখারি, হা/৬৩৪৭]

❂ ১০. দুআ:

اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ وَفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ وَجَمِيْعِ سَخَطِكَ

উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিন যাওয়ালি নি’মাতিকা ওয়া তাহাওউলি আ-ফিয়াতিকা ওয়া ফুজআতি নিক্বমাতিকা ওয়া জামিয়ি সাখত্বিকা।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, তোমার নিয়ামত চলে যাওয়া যাওয়া থেকে, তোমার দেওয়া সুস্থতা পরিবর্তন হয়ে যাওয়া থেকে, তোমার পক্ষ থেকে হঠাৎ শাস্তি আসা থেকে এবং তোমার কাছে সব ধরণে অসন্তুষ্টি থেকে। [মুসলিম, হা/ ২৭৩৯]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর নিয়ামতরাজি দ্বারা সিক্ত করুন, তাঁর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখুন এবং সব ধরণের বিপদাপদ, ক্ষয়-ক্ষতি ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির হাত থেকে রক্ষা করুন। আমিন।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার। সৌদি আরব।

যেসব টি-শার্ট বা জামা-কাপড়ে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর নাম ইত্যাদি লেখা আছে সেগুলো পরিধান করা জায়েজ নাই

 প্রশ্ন: যে সব T-shirt-এর উপর আরবিতে আল্লাহর নাম, দুআ, জিকির ইত্যাদি বিভিন্ন ইসলামিক শব্দ গুলো লেখা আছে (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আল হামদুলিল্লাহ ইত্যাদি) সেগুলো কি ব্যবহার করা জায়েজ? কারণ মানুষ এগুলো পরে তো বাথরুমেও যায়।

উত্তর: নিঃসন্দেহে মুসলিমদের নিকট আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত, দুআ-জিকির ইত্যাদি অত্যন্ত মর্যাদার পাত্র। সর্বাবস্থায় এগুলোর যথাযোগ্য সম্মান বজায় রাখা আবশ্যক। তাই তা এমন কোনও ক্ষেত্রে ব্যবহার করা বৈধ নয় যাতে তার সম্মানহানি ঘটে। আর তাই যে সব টি-শার্ট বা জামা-কাপড়ে আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত, তাসবিহ, জিকির-যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লাই-লা-হা ইল্লাহ ইত্যাদি লেখা আছে সেগুলো পরিধান করা জায়েজ নয়। চাই আরবিতে লেখা থাক কিংবা বাংলা অথবা অন্য কোনও ভাষায় লেখা থাক। কেননা এর মাধ্যমে আল্লাহর নামের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়। যেহেতু এই কাপড়গুলো নোংরা হতে পারে, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হতে পারে বা অন্য কোনও অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হতে পারে।
➤ একই কারণে টয়লেটের মধ্যে মুখে উচ্চারণ করে কুরআন তিলাওয়াত করা, আজানের জবাব দেওয়া, আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা বা অন্য কোনও দুআ-জিকির ইত্যাদি পাঠ করা জায়েজ নয়।
➤ মহিলাদের লকেট বা চেইনে যদি এমন কিছু লেখা থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।
➤ তবে সেগুলোতে যদি সাধারণ ইসলামি শব্দাবলী লেখা থাকে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই-চাই তা আরবিতে হোক অথবা অন্য কোনও ভাষায় হোক। যেমন: সবর, ইসলাম, ইমান, ইহসান, মুমিন, মুসলিম, মুসাফির, ইনসাফ, সালাত, সালাম, আসসালামু আলাইকুম ইত্যাদি।

❑ বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়া:

নিম্নে উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তরে দু জন বিজ্ঞ আলেমের ফতোয়া উল্লেখ করা হলো:

✪ ১. আল্লামা শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)

সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. এ সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন,

الثياب التي يكون فيها أسماء الله أو آيات لا يجوز لبسها؛ لأنها وسيلة إلى أن تمتهن أو يصيبها النجاسة من حيض أو غيره، أو تلقى فيطأ عليها الناس أو يجلس عليها الناس؛ فلهذا حرم لبسها وحرم جعلها وسائد أو بسط؛ لأن هذا يفضي إلى امتهانها بالقعود عليها والوطء عليها ونحو ذلك

“যেসব কাপড়ে আল্লাহর নাম বা কোরআনের আয়াত লেখা থাকে, সেগুলো পরিধান করা বা বালিশ, চাদর ইত্যাদি হিসেবে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। কারণ, এতে আল্লাহর নাম ও আল্লাহর কালামের অবমাননা হতে পারে কিংবা হায়েজের রক্ত বা অন্যান্য নাপাক জিনিস লাগতে পারে। অথবা এগুলো এমন জায়গায় পড়ে থাকতে পারে যেখানে মানুষ এগুলোর উপরে বসবে বা সেগুলোকে পদদলিত করবে…ইত্যাদি।” [binbaz]

✪ ২. আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ)

বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়, “যেসব কাপড়ে আল্লাহর নাম বা ‘আল্লাহু আকবার’ লেখা থাকে সেগুলো পরা জায়েজ কিনা?

উত্তরে তিনি বলেন,

هذا لا يجوز؛ لأن فيه امتهانا لذكر الله عز وجل، فكتابة اسم الله ولفظِ الجلالة على الملابس لا يجوز لما فيه من الاستهانة باسم الله سبحانه وتعالى ؛ لأن هذه الملابس تكون على الأطفال الذين لا يتحرزون من النجاسة وتكون على الإنسان وهو يدخل بيت الخلاء وقضاء الحاجة وقد يخلع هذا الثوب ويداس أو يمتهن، وأسماء الله جل وعلا تعظم وذكره يعظم من الامتهان

“এ ধরনের কাপড় পরা জায়েজ নয়। কারণ এতে আল্লাহর নামের অবমাননা হয়। আল্লাহর নাম বা ‘আল্লাহু আকবার’ লেখা কাপড় পরা মানে আল্লাহর নামের প্রতি অবহেলা করা। কারণ এই কাপড়গুলো শিশুরা পরতে পারে, যারা নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে না। মানুষ এই কাপড় পরেই বাথরুমে যেতে পারে। এই কাপড়গুলো খুলে ফেলা হতে পারে এবং পদদলিত হতে পারে। আল্লাহর নাম অত্যন্ত মহান এবং এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা জরুরি।” [শাইখের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল-العلامة الدكتور صالح الفوزان]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার। সৌদি আরব।

গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র কী এবং তা কি ইসলাম অনুমোদিত

 গ্রাফিতি ইটালিয়ান শব্দ “Grafitiato” থেকে আসে, যার অর্থ “খচিত”। গ্রাফিতি শব্দটি শিলালিপি, চিত্র অঙ্কন এবং এই ধরণের শিল্প বুজায়।

গ্রাফিতি হলো, সাধারণ কোনো চিত্রকর্ম বা দেয়াল লিখন, যাতে শিল্পীর সূক্ষ্ম বার্তা লুকানো থাকে। দেশে দেশে সামাজিক অবিচার, সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা যুদ্ধের বিরুদ্ধে শিল্পীরা গ্রাফিতির মাধ্যমে তাদের বার্তা সমাজে পৌঁছে দিয়ে থাকেন। শান্তির পক্ষে অবস্থান নেয়ার আহ্বান ফুটে ওঠে কোনো কোনো দেয়ালচিত্রে। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক চিত্রের মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতাও শিল্পী তার তুলির আঁচড়ে নিখুঁতভাবে তুলে আনেন।” [roar.media]

গ্রাফিতি বিষয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে,

“গ্রাফিতি হল বিনা অনুমতিতে জনসাধারণের অভিমতে শিল্পীয় উপায়ে দেয়ালের উপরে লেখনী কিংবা অঙ্কনের মাধ্যমে তুলে ধরা। [American Heritage Dictionary] স্প্রে পেইন্ট বা মার্কার পেন সাধারণত গ্রাফিতি তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গ্রাফিতি একটি বিতর্কিত বিষয়। অধিকাংশ দেশে গ্রাফিতিকে বিকৃত ও ধ্বংসাত্মক শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয় কারণ অনেক সময় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের সক্রিয়তা গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রচার করে।” [উন্মুক্ত বিশ্বকোষ বাংলা উইকিপিডিয়া]

প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সারা পৃথিবীতেই গ্রাফিতি নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের কাছে সমাদৃত হচ্ছে। তাই দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা বড় থেকে ছোট বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদে সুস্থ ধারার আন্দোলনের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হিসাবেই মনে করেন প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মানুষেরা। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলেরা গ্রাফিতিকে ভয় পায়। গ্রাফিতিতে শিল্পবোধ থাকে। চিন্তার খোরাক থাকে।

❑ ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রাফিতি করা কি জায়েজ?

হ্যাঁ, কতিপয় শর্তসাপেক্ষে তা জায়েজ। যথা:

◆ ১. অন্যের বাড়ি বা কোনও প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে গ্রাফিতি করতে হলে, অবশ্যই মালিক বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া তা করার সুযোগ নেই। ইসলাম, প্রচলিত আইন এবং সামাজিক ইত্যাদি সকল দৃষ্টিকোণ থেকে তা অগ্রহণযোগ্য।
কারো বাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে চিকা মারা, পোস্টার লাগানো ও হাল-জামানার নেতা বন্দনার প্যানোফ্ল্যাক্স, ফেস্টুন বসানো ইত্যাদি ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

পাবলিক প্লেসে করতে হলেও তা অনুমোদিত স্থান হওয়া আবশ্যক।

◆ ২. গ্রাফিতি হতে হবে এমন বিষয়ে যা সর্বস্তরের মানুষের জন্য কল্যাণকর। যা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে বা সামাজিক অসঙ্গতির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

◆ ৩. গ্রাফিতিতে এমন কোনও বিষয় থাকতে পারবে না যা ইসলামে নিষিদ্ধ। যেমন: অশ্লীল বা অশালীন শব্দ কিংবা বাক্য, শরিয়ত বিরোধী ও খারাপ ইঙ্গিত বাহী কোনও চিহ্ন, মানুষ ও জীব-জন্তুর স্পষ্ট আকৃতি ইত্যাদি।

◆ ৪. এমন গ্রাফিতি অঙ্কন থেকে বিরত থাকা উচিৎ, যা দৃষ্টিকটু বা পরিবেশের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করে।
◆ ৫. গ্রাফিতি এমন বিষয়ে হওয়া যাবে না যা প্রচলিত সুস্থ, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সামাজিক ট্যাবু, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ইত্যাদি ভেঙ্গে ফেলার আহ্বান জানায়।
◆ ৬. দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে বা বিশৃঙ্খলার দিকে আহ্বান জানায় এমন কোনও গ্রাফিতি করা যাবে না।
◆ ৭. এমন স্থানে কুরআনের আয়াত এবং আল্লাহ-রসুলের নামের গ্রাফিতি করা জায়েজ নয় যেখানে সেগুলোর সম্মানহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
◆ নারী-পুরুষ একাকার হয়ে গ্রাফিতি অংকন করা ইসলাম সমর্থন করে না।
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

মৃতদের স্মরণে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানো জঘন্য হারাম এবং নিরেট অজ্ঞতা পূর্ণ কুসংস্কার

 মৃতদের স্মরণে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো জঘন্য হারাম এবং নিরেট অজ্ঞতা পূর্ণ কুসংস্কার: এর ৭ কারণ।

মানুষ অন্ধকারে আলো জ্বালাবে-এটা স্বাভাবিক। একসময় বিদ্যুৎ ছিল না। তখন মানুষ অন্ধকারে চেরাগ/কুপি, হারিকেন বা মোমবাতি জ্বালাত। প্রয়োজনে এখনো জ্বালাবে। তাতে কোনও সমস্যা নাই। তবে বর্তমানে আধুনিক যুগে বৈদ্যুতিক বাতির আলোর ঝলকানিতে বিশ্ব আলোকিত। কিন্তু এই উজ্জ্বল আলোর নিচে দাঁড়িয়ে কেউ যখন মৃত/শহিদদের স্মরণে বা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে কিংবা তাদের আত্মার শান্তির প্রত্যাশায় ঘটা করে মোমবাতি জ্বালাবে, মোমবাতির সামনে নীরবতা পালন করবে অথবা মোমবাতির সামনে মৃতদের ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তখন সুস্থ বিবেকের সামনে তার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তৎসঙ্গে একজন মুসলিম হিসেবে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ তা কতটুকু সঠিক বা কতটুকু ইসলাম সমর্থিত তা বিচার-বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।

নিম্নে ইসলাম ও যুক্তির নিরিখে মৃতদের স্মরণে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো বিষয়টি ৭টি পয়েন্টে উপস্থাপন করা হলো:

❂ ১. ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো বিদআত (ইসলামে নব সংযোজন বা ধর্মের নামে অধর্ম):

প্রকৃতপক্ষে মানুষ মারা গেলে তার প্রতি জীবিতদের কী করণীয় সে ব্যাপারে ইসলামে বিস্তর দিকনির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ইসলামে মৃতদের উদ্দেশ্য অগ্নি প্রজ্বলন, মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো এবং তার সামনে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন সম্পর্কে কোনও নির্দেশনা নেই। এবং ইসলামের সোনালী যুগ তথা সাহাবি ও তাবেয়ীদের যুগে মুসলিমদের মধ্যে এ ধরণের কাজের কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে তা জঘন্য বিদআত-তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর বিদআত মানেই ভ্রষ্টতা। আর প্রতিটি ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।

❖ আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

“যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করল যে ব্যাপারে আমার নির্দেশনা নেই তা আল্লাহর কাছে পরিত্যাজ্য।” [বুখারী ও মুসলিম]

❖ অন্য বর্ণনায় এসেছে:

مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ

“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।” [বুখারী ও মুসলিম]

❖ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক খুতবায় বলেছেন,
إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُوْرِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ وَكُلُّ ضَلاَلَةٍ فِي النَّارِ. رواه مسلم والنسائى واللفظ للنسائى.
‘‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদের আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল (দ্বীনের মধ্যে) নব উদ্ভাবিত বিষয়। আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক বিষয় বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত হল ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৩৫ ও সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস নং ১৫৬০, হাদিসের শব্দ চয়ন নাসায়ী থেকে।]

❂ ২. অন্ধ অনুসরণ:

মৃতদের স্মরণে মোমবাতি বা প্রদীপ প্রজ্বলন করা খৃ*ষ্টা*ন, অগ্নি*পূজক ইত্যাদি অমুসলিমদের সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। কেননা খ্রি**স্টান ধর্মাবলম্বীরা তাদের কবরস্থানে মোমবাতি জ্বালিয়ে মৃতদের উদ্দেশ্যে বিশেষ প্রার্থনা করে থাকে। “অগ্নি উপাসকরা তাদের সকল পূজার সময় বা পূজার প্রারম্ভে অগ্নিকে সাক্ষী রেখে কাজ শুরু করে এবং অগ্নিকে সর্বাধিক পবিত্র বলেই মেনে থাকে।” [অশোক চক্রবর্তী-মহাভারতের জানা অজানা FB page] আর ইসলামে অমুসলিমদের ‘সাদৃশ্য অবলম্বন’ কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।

❖ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

“যে ব্যক্তি অন্য সম্প্রদায়ের (বিধর্মীদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতির ক্ষেত্রে) সাদৃশ্য অবলম্বন করে সে তাদেরই দলভুক্ত।“ [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৪০৩১, সহীহুল জামে-আলবানী, হা/২৮৩১]

❖ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا فِي جُحْرِ ضَبٍّ لاَتَّبَعْتُمُوهُمْ ‏”‏ ‏.‏ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ آلْيَهُودَ وَالنَّصَارَى قَالَ ‏”‏ فَمَنْ

“তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের নীতি-পদ্ধতি পুরাপুরি ভাবে অনুসরণ করবে, বিঘতে বিঘতে ও হাতে হাতে, এমনকি তারা যদি তিনি দব (গুই সাপ সদৃশ মরুভূমিতে থাকা এক প্রকার হালাল প্রাণী) এর গর্তে প্রবেশ করে থাকে তাহলেও তোমরা তাদের অনুসরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসুল, পূর্ববর্তী উম্মত বলতে কি ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাই উদ্দেশ্য?
তিনি বললেন, তাহলে আর কারা?”
[সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৪৯/ ইলম (জ্ঞান), পরিচ্ছেদ: ৩. ইহুদি ও খৃষ্টানদের রীতি-নীতি অনুসরণ]

অথচ আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ বানরের মত অনুকরণপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা ভালো-মন্দ বাছ-বিচার ছাড়াই বিধর্মীদের অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত হতে এতটুকু দ্বিধা করে না!
সত্য বলতে, বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম ইসলামের মহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অমুসলিমদের অন্ধ অনুসরণের ফলেই মুসলিম জাতি অধঃপতনের অতল তলে নিপতিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে এই অন্ধ অনুকরণের মোহ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

❂ ৩. অগ্নিপূজক/শিরক:

মৃতদের উদ্দেশ্যে অগ্নি প্রজ্বলন, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সৈনিকদের স্মৃতির উদ্দেশ্য শিখা অনির্বাণ স্তম্ভ, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে ভাষণ প্রদান করেছিলেন সে স্থানে নির্মিত শিখা চিরন্তন স্তম্ভ ইত্যাদি অগ্নিপূজার শামিল। আগুনকে অনির্বাণ (যা কখনো নিভে না) বা চিরন্তন বিশ্বাস করা যেমন একদিক থেকে শিরক তেমনি তার সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা ও সেখানে নীরবতা পালন করা এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক স্যালুটের মাধ্যমে সম্মান জানানো ইত্যাদি কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে শিরক। এরূপ কাজ যারা করে তাদেরকে বলা হয় মাজুস বা অগ্নিপূজক। তওবা না করে মৃত্যুবরণ করলে তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে। কেননা আল্লাহ শিরক কারীকে ক্ষমা করবেন না।

❖ আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। কিন্তু এর নিম্ন পর্যায়ের পাপরাশী ক্ষমা করেন যাকে ইচ্ছা। যে আল্লাহর সাথে শিরক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়।” [সূরা নিসা: ৪৮]

❖ তিনি আরও বলেন,

وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ

“এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করল সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর (মৃতভোজী) পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।” [সূরা হাজ্জ: ৩১]

❂ ৪. অনর্থক কাজ:

এই মোমবাতি প্রজ্বলনে মৃতদের বিন্দুমাত্র উপকার হয় না। সুতরাং নিতান্ত অনর্থক ও অহেতুক কাজ।

❖ আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

“যারা অনর্থক কার্যক্রম থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে।” [সূরা মুমিনুন: ৩]

❖ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا

“এবং যারা ভ্রান্ত কর্মে যোগদান করে না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন সেখান থেকে সসম্মানে প্রস্থান করে।” [সূরা ফুরকান: ৭২]

❖ আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مِنْ حُسْنِ إسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ

“অনর্থক বিষয় ত্যাগ করাই একজন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য।” [তিরমিযী: ২৩১৮, ইবনে মাজাহ: ৩৯৭৬-হাদিসটি হাসান।
মৃত মানুষের উদ্দেশ্য বাতি জ্বালানো মূর্খতা সুলভ অহেতুক মিথ্যা আবেগ ছাড়া কিছু নয়।

❂ ৫. অর্থ অপচয়:

মৃতদের উদ্দেশ্যে অগ্নি প্রজ্বলন করা, মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো অর্থ অপচয়ের শামিল। আমাদের সমাজে বিভিন্ন উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে বা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনার্থে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। যেমন: খবরে প্রকাশ, নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে ‘একুশের আলো’ সংগঠনের উদ্যোগে ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রজ্বলন করা হয় এক লাখ মোমবাতি! [২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭]

এই অনর্থক কাজে তা অর্থ অপচয় ও আল্লাহ নিয়ামতের অপব্যবহার ছাড়া কিছু নয়। কারণ এতে না জীবিত মানুষের কোনও উপকার হয়, না মৃতদের উপকার হয়।

আর ইসলামের দৃষ্টিতে অনর্থক কাজে অর্থ অপচয় করা নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ।

❖ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

“তোমরা খাও এবং পান করো তবে অপচয় করো না। তিনি অপচয় কারীদের ভালোবাসেন না।” [সূরা আরাফ: ৩১]

❖ তিনি আরও বলেন,

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

“নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” [সূরা বনী ইসরাইল: ২৭]

আমাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় যে, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন মানুষের অর্থ-সম্পদ তথা তার যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব নিবেন।

অথচ এই অর্থ যদি সেই নিহতের পরিবারের জন্য খরচ করা হতো তাহলে তারা কতই না উপকৃত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, দরিদ্রের ঘরে বাতি জ্বলে না কিন্তু বৈদ্যুতিক লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে মূর্খরা প্রদীপ জ্বালায়!

❂ ৬. কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস:

মৃতদের উদ্দেশ্যে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালালে তাদের আত্মা শান্তি পাবে-এমনটা মনে করা নিতান্তই ভ্রান্ত অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কার।
অন্ধ বিশ্বাস থেকেই তারা জন্মদিনে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়। আর বিশ্বাস করে, মোমবাতি নিভানোর পর হালকা একটা ধোঁয়া উপরের দিকে উড়ে যায়। সেই ধোঁয়ার সাথে জন্মদিনের করা সব ইচ্ছেগুলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তিনি সে সব প্রার্থনা পূর্ণ করবেন। অথবা এ বিশ্বাস করা হয় যে, ধোঁয়ার অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথে, জীবনের সমস্ত নেতিবাচক বিষয়গুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে।

প্রকৃতপক্ষে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানো বা নিভানোর সাথে মানুষের জীবনের কল্যাণ-অকল্যাণ বা আত্মার সুখ-শান্তির বা কারও প্রতি শ্রদ্ধা-অশ্রদ্ধার ন্যূনতম কোনও সম্পর্ক নেই। থাকতে পারে না।

সুতরাং মোমবাতি জ্বালালে মৃত ব্যক্তির আত্মা শান্তি পাবে-এহেন ভ্রান্ত কথা কোনও সুস্থ বিবেক গ্রহণ করতে পারে না।
তথাকথিত মুক্তমনা ও বিজ্ঞান মনস্করা এমন অবৈজ্ঞানিক ও অন্ধবিশ্বাসকে কীভাবে গ্রহণ করে তা সত্যি বিস্ময়কর। অথচ তারাই কথায় কথায় ইসলামের বিধিবিধানকে নানাভাবে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ইত্যাদি বলে কটূক্তি করে থাকে। এসব শিক্ষিত মূর্খদেরকে আল্লাহ দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞান দান করুন। আমিন।

❂ ৭. মনোবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হারাম/শিরক:

মনোবাসনা পূরণের জন্য মাজারে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হারাম। কখনো তা এটা শিরক পর্যায়ের অপরাধ। কেননা সব মনোবাসনা পূরণ করার ক্ষমতা রাখেন কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। মৃত ব্যক্তি কখনো কিছু দিতে পারেন না। মৃতের কাছে কিছু চাওয়া মানে আল্লাহর সাথে বড় শিরক। আর শিরক হলো, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ও ক্ষমাহীন অপরাধ। মহান আল্লাহ আমাদের দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞান দান করুন। ভ্রষ্টতা, মূর্খতা, অন্ধ অনুকরণ এবং মিথ্যা আবেগ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate