Friday, March 27, 2026

ইসলামি শরীয়তে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতার বাইরে অন্য কাউকে আব্বা বা আম্মা বলা কি জায়েজ

 প্রশ্ন: ইসলামি শরীয়তে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতার বাইরে অন্য কাউকে ‘আব্বা’ বা ‘আম্মা’ বলা কি জায়েজ?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের অধিকার ও মর্যাদা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে, নিজের জন্মদাতা পিতা–মাতার বাইরে অন্য কাউকে; যেমন চাচা, শিক্ষক, সম্মানিত আলেম, শ্বশুর-শাশুড়ি, খালা প্রমুখকে সম্মান, মর্যাদা ও সৌজন্যের খাতিরে ‘পিতা’ বা ‘মাতা’ বলে সম্বোধন করাতে কোনো দোষ নেই। কারণ এতে প্রকৃত বংশগত পিতৃত্বের দাবি করা হয় না; বরং এটি কেবল সম্মান ও ভক্তি প্রকাশের একটি ভদ্র সম্বোধন মাত্র।তবে ইসলাম যে বিষয়টিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, তা হলো—নিজের প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করে নিজেকে অন্য কারও সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। অর্থাৎ কেউ যদি জেনেশুনে নিজের আসল পিতাকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তবে সে গুরুতর গুনাহে লিপ্ত হবে। হাদিসে এসেছে, প্রখ্যাত সাহাবী সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস ও আবূ বাকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حرَام”যে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম। “(সহীহ বুখারী হা/৬৭৬৬, সহীহ মুসলিম হা/৬৩) অপর বর্ননায় আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:لَا تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ أَبِيهِ فقد كفر”তোমরা তোমাদের পিতৃ-পরিচয়কে অস্বীকৃতি জানিও না। যে স্বীয় পিতৃ পরিচয়ে অস্বীকার করল, সে কুফরী করল।”(সহীহ বুখারী হা/৬৭৬৮; সহীহনমুসলিম হা/৬২) তিরমিজির আরেক বর্ননায় রাসূল (ﷺ) আরও বলেছেন; “যে ব্যক্তি নিজের বাবাকে পরিত্যাগ করে অন্যজনকে বাবা বলে পরিচয় দেয় অথবা যে গোলাম নিজ মনিবকে পরিত্যাগ করে অন্য মনিবের পরিচয় দেয় তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত….”।(ইবনু মা-জাহ হা/২৭১২; তিরমিযী হা/২১২১; সহীহুত তারগীব হা/১৯৮৬) এছাড়াও অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,كُفْرٌ بِامْرِئٍ ادِّعَاءُ نَسَبٍ لاَ يَعْرِفُهُ أَوْ جَحْدُهُ وَإِنْ دَقَّ ‏”‏ ‏.‏ “এমন লোককে নিজ বংশীয় দাবি করা কুফরী যাকে লোকে চিনে না, অথবা সামান্য সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নিজের বংশের লোককে অস্বীকার করাও কুফরী।”(ইবনে মাজাহ হা/২৭৪৪; মুসনাদে আহমাদ হা/৬৯৮০)
.
উপরোক্ত হাদীসগুলোর উদ্দেশ্য হলো— যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে ও ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের প্রকৃত বংশপরিচয় পরিবর্তন করে, অর্থাৎ নিজের আসল পিতাকে বাদ দিয়ে নিজেকে অন্য কারো দিকে সম্পৃক্ত করে, সে গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হয়।জাহিলিয়্যাত বা অন্ধকার যুগে কোনো ব্যক্তি অন্যের সন্তানকে নিজের পুত্ররূপে গ্রহণ করলে তাতে আপত্তি করা হতো না। তখন সেই সন্তানকে তার দত্তক গ্রহণকারী ব্যক্তির দিকেই সম্পৃক্ত করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা এ প্রথা বাতিল করে দেন এবং কুরআনে নির্দেশ দেন:اُدۡعُوۡهُمۡ لِاٰبَآئِهِمۡ هُوَ اَقۡسَطُ عِنۡدَ اللّٰهِ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ تَعۡلَمُوۡۤا اٰبَآءَهُمۡ فَاِخۡوَانُكُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَ مَوَالِیۡكُمۡ ؕ وَ لَیۡسَ عَلَیۡكُمۡ جُنَاحٌ فِیۡمَاۤ اَخۡطَاۡتُمۡ بِهٖ ۙ وَ لٰكِنۡ مَّا تَعَمَّدَتۡ قُلُوۡبُكُمۡ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا“তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক; আল্লাহ্‌র নিকট এটাই বেশী ন্যায়সংগত। অতঃপর যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই এবং বন্ধু। আর এ ব্যাপারে তোমরা কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তোমাদের কোন অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা স্বেচ্ছায় করেছে (তা অপরাধ), আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা আল-আহযাব: ৫) অপর আয়াতে আরও বলা হয়েছে:وَ مَا جَعَلَ اَدۡعِیَآءَكُمۡ اَبۡنَآءَكُمۡ “আল্লাহ তোমাদের পালকপুত্রদেরকে তোমাদের প্রকৃত পুত্র বানাননি।”(সূরা আল-আহযাব: ৪) এই আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার পর সাহাবিগণ নিজেদের প্রকৃত পিতার নামেই পরিচিত হতে শুরু করেন এবং যারা তাদের দত্তক নিয়েছিল, তাদের দিকে সম্পৃক্ত করা পরিত্যাগ করেন। তবে এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন, যারা দীর্ঘদিন অন্য কারো দিকে সম্পৃক্ত হয়ে পরিচিত হয়ে যাওয়ায় পরিচয়ের সুবিধার্থে সেই নামেই পরিচিত থাকেন। কিন্তু তা বংশ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ছিল না।এর উদাহরণ হলো মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ। তাঁর প্রকৃত পিতার নাম ছিল আমর ইবনু সা‘লাবাহ্। কিন্তু ‘আসওয়াদ’ নামের ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তিনি ‘মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান।এছাড়াও হাদীসে এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আমরা যায়েদ ইবনে হারেসাকে যায়েদ ইবন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে সম্বোধন করতাম।(সহীহ বুখারী হা/৪৭৮২; সহীহ মুসলিম হা/২৪২৫) কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পালক ছেলেরূপে গ্ৰহণ করেছিলেন।
.
ইমাম ইবনুস সালাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ফাতাওয়া ইবনুস সালাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন— তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: কুরআনুল কারীম বা সহীহ হাদীসে কি এমন কাউকে ‘পিতা’ বলা বৈধ, যিনি প্রকৃত পিতা (জন্মদাতা) নন? তিনি এর উত্তরে বলেন:
قال الله تبارك وتعالى: ( قالوا نعبد إلهك وإله آباءك إبراهيم وإسماعيل )، وإسماعيل من أعمامه لا من آبائه .وقال سبحانه وتعالى : ( ورفع أبويه على العرش ) ، وأمه كان قد تقدم وفاتها، قالوا: والمراد خالته، ففي هذه استعمال الأبوين من غير ولادة حقيقية وهو مجاز صحيح في اللسان العربي. وإجراء ذلك من النبي صلى الله عليه وسلم والعالم والشيخ سائغ من حيث اللغة والمعنى ، وأما من حيث الشرع ، فقد قال الله سبحانه وتعالى: ( ما كان محمد أبا أحد من رجالكم )، وفي الحديث الثابت عنه صلى الله عليه وسلم : ( إنما أنا لكم بمنزلة الوالد أعلمكم ).
فذهب لهذا بعض علمائنا إلى أنه لا يقال فيه صلى الله عليه وسلم أنه أب المؤمنين، وإن كان يقال في أزواجه أمهات المؤمنين، وحجته ما ذكرت، فعلى هذا يقال هو مثل الأب أو كالأب أو بمنزلة أبينا، ولا يقال هو أبونا أو والدنا، ومن علمائنا من جوز وأطلق هذا أيضا، وفي ذلك للمحقق مجال بحث يطول ، والأحوط التورع والتحرز عن ذلك …..)
“আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ইরশাদ করেছেন: “তারা বলল, আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসমাইলের ইলাহ-এর ইবাদত করব।”(সূরা বাকারা: ১৩৩) অথচ ইসমাইল (আলাইহিস সালাম) ছিলেন তাঁর চাচাদের অন্তর্ভুক্ত, সরাসরি পিতা নন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরও ইরশাদ করেছেন: “আর তিনি (ইউসুফ আ:) তাঁর মাতাপিতাকে সিংহাসনে বসালেন।”(সূরা ইউসুফ: ১০০) অথচ তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছিল আগেই; তাই মুফাসসিরগণ বলেন, এখানে ‘মাতাপিতা’ বলতে তাঁর খালাকে বোঝানো হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সরাসরি জন্মদাতা না হওয়া সত্ত্বেও ‘পিতা-মাতা’ শব্দটির ব্যবহার বিদ্যমান এবং এটি আরবি ভাষায় একটি শুদ্ধ রূপক (Majaz) ব্যবহার। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), আলিম বা শায়খের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবহার ভাষাগত ও অর্থগত দিক থেকে বৈধ। তবে শরীয়তের দিক থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইরশাদ করেছেন: “মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন।” আবার সহিহ হাদিসে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়েছে: “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য পিতৃতুল্য, তোমাদেরকে আমি দ্বীন শিক্ষা দিয়ে থাকি।”(আবু দাউদ হা/৮) এ কারণে আমাদের কোনো কোনো আলিম এই মত পোষণ করেছেন যে— নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে ‘মুমিনদের পিতা’ বলা যাবে না, যদিও তাঁর স্ত্রীদের ‘মুমিনদের মাতা’ বলা হয়। তাঁদের দলিল হলো উপরে বর্ণিত আয়াতটি। এই মত অনুযায়ী বলতে হবে: তিনি ‘পিতার মতো’ বা ‘পিতার ন্যায়’ অথবা ‘আমাদের পিতার মর্যাদাসীন’; কিন্তু সরাসরি ‘আমাদের পিতা’ বা ‘আমাদের জন্মদাতা’ বলা যাবে না। আবার আমাদের আলিমদের মধ্যে কেউ কেউ এটি (পিতা বলা) ঢালাওভাবে জায়েজ বলেছেন। এ বিষয়ে গবেষক মহলে দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ রয়েছে, তবে সতর্কতা ও পরহেজগারির দাবি হলো এমন সম্বোধন থেকে বিরত থাকা। (সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)।”(ফাতাওয়া ইবনুস সালাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৮৬)-
.
ইমাম শাফিঈ (রহিমাহুল্লাহ) স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, তাঁকে (নবিজিকে) ‘মুমিনদের পিতা’ বলা জায়েজ— অর্থাৎ সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে।(দ্রষ্টব্য: আল-গুরার আল-বাহিয়্যাহ শারহুল বাহজাতিল ওয়ারদিয়্যাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৯১)
.
ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:والصحيح : أنه يجوز أن يقال إنه أب للمؤمنين ، أي في الحرمة ، وقوله تعالى ( ما كان محمد أبا أحد من رجالكم ) أي في النسب “সঠিক অভিমত হলো—এটি বলা জায়েজ যে, তিনি (ﷺ) মুমিনদের পিতা; অর্থাৎ সম্মানের দিক থেকে। আর মহান আল্লাহর বাণী: ‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন’ (সূরা আহজাব: ৪০), এর অর্থ হলো—বংশগত সম্পর্কের দিক থেকে।” (উদ্ধৃতি সমাপ্ত) কাজেই নবী করীম (ﷺ)-এর ক্ষেত্রে ‘পিতা’ শব্দটি ব্যবহার করায় কোনো বাধা নেই। খ্রিস্টানরাও এই শব্দটি ব্যবহার করে—এটি কোনো ক্ষতির কারণ হবে না। কারণ, তাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ (তাশাব্বুহ) কেবল তখনই নিষিদ্ধ হয়, যখন তা তাদের একান্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এই সম্বোধনটি আরব ও অনারবসহ সকল মানুষের মধ্যেই প্রচলিত একটি সাধারণ বিষয়; এমনকি খ্রিস্টানদের অস্তিত্বের পূর্ব থেকেই এটি চলে আসছে। যেমনটি মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-এর ক্ষেত্রে বলেছেন: “তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের আদর্শ; তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম।” (সূরা হাজ্জ: ৭৮)। এখানে আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে মুমিনদের ‘পিতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
.
​ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে বলেন: وإبراهيم هو أبو العرب قاطبة . وقيل : الخطاب لجميع المسلمين ، وإن لم يكن الكل من ولده ، لأن حرمة إبراهيم على المسلمين كحرمة الوالد على الولد “ইব্রাহিম (আ.) হলেন সমগ্র আরব জাতির পিতা। আর কেউ কেউ বলেছেন—এই সম্বোধন সকল মুসলিমের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, যদিও তারা সবাই তাঁর সরাসরি বংশধর নন। কারণ, মুসলিমদের নিকট ইব্রাহিম (আ.)-এর সম্মান ঠিক তেমন, যেমন সন্তানের কাছে পিতার সম্মান।” (তাফসিরে কুরতুবী; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৯১)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: “বর্তমান সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রাজ্ঞ এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন আলেমদের ক্ষেত্রে ‘ওয়ালিদ’ (পিতা বা আব্বাজান) উপাধিটি ব্যবহারের প্রচলন দেখা যাচ্ছে। এই শব্দটি ব্যবহার করা কি বৈধ? নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে উত্তরটি প্রত্যাশা করছি। ১. খ্রিস্টানরা তাদের বড় ধর্মীয় নেতাদের ‘পোপ’ (বাবা) বলে সম্বোধন করে। ২. রাসুলুল্লাহ (ﷺ),সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন বা সালফে সালেহীনদের থেকে আলেমদের ক্ষেত্রে ‘ওয়ালিদ’ বা ‘আব্বা’ শব্দ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় না। ৩. যদি কাউকে ‘পিতা’ উপাধি দিতেই হতো, তবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর চেয়ে বড় হকদার আর কেউ হতেন না। অথচ মহান আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: “মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।” [সূরা আহযাব: ৪০]
তিনি (হাফিজাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন:
الحمد لله، لا نعلم أن أحداً من العلماء قد صار لفظ الوالد لقباً له، لكن جرت العادة في بعض المجتمعات أن يعبروا عن كبير السن بالوالد ، سواء كان عالماً أو غير عالم، فيذكر هذا اللفظ في مخاطبته يقال: يا والدي أو يا والد أو في الخبر عنه. فلم يصل الأمر إلى أن يكون فيه شبه من المصطلح النصراني، فالنصارى يجعلون ذلك لقباً لكبير أهل ملتهم، وأما قولك إن الرسول صلى الله عليه وسلم مع علو قدره وفضله وعظيم حقه على أمته ليس أباً استدلالاً بقوله تعالى: ( ما كان محمد أبا أحد من رجالكم ) الأحزاب/40 ، فالأبوة المنفية هي أبوة النسب، وأما الأبوة أبوة المنزلة والاحترام فهي ثابتة له صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كما جاء في بعض القراءات ( النبي أولى بالمؤمنين من أنفسهم وأزواجه أمهاتهم وهو أبٌ لهم ) الأحزاب/ 6 ، فهذه الأبوة والأمومة أبوة منزلة واحترام وإكرام ، ولقد قال صلى الله عليه وسلم : ( إنما أنا لكم بمنزلة الوالد ) وهو فوق ذلك صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فحقه على أمته أعظم من حق الوالدين وجميع الناس كما قال صلى الله عليه وسلم: ( لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من ولده ووالده والناس أجمعين ) البخاري (14)، ومسلم (44) والله أعلم “
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমাদের জানা মতে, কোনো আলেমকে নির্দিষ্ট করে স্থায়ী উপাধি হিসেবে ওয়ালিদ’ (পিতা) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে এমনটি ঘটেনি। তবে কোনো কোনো সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠ (মুরুব্বী) ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ‘ওয়ালিদ’ বা ‘আব্বাজান’ ডাকার প্রচলন রয়েছে—চাই তিনি আলেম হোন বা বা সাধারণ মানুষ। তাকে সম্বোধন করার সময় বলা হয়: ‘ইয়া ওয়ালিদী (হে আমার পিতা)’, বা ‘ইয়া ওয়ালিদ’, অথবা তার সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার সময়ও এটি ব্যবহৃত হয়। এটি খ্রিস্টানদের পরিভাষার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কারণ, খ্রিস্টানরা একে তাদের ধর্মীয় প্রধানের একটি বিশেষ উপাধি (Title) হিসেবে ব্যবহার করে।আর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শ্রেষ্ঠত্ব,সুউচ্চ মর্যাদা ও উম্মতের ওপর তাঁর বিশাল অধিকার থাকা সত্ত্বেও তিনি ‘পিতা’ নন বলে আপনি যে দলিল (সূরা আহযাব: ৪০) পেশ করেছেন,”মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন।”তার ব্যাখ্যা হলো: আয়াতে যে পিতৃত্ব অস্বীকার করা হয়েছে, তা হলো রক্ত বা বংশীয় সম্পর্কের পিতৃত্ব (Biological Fatherhood)। আর সম্মান ও সুউচ্চ মর্যাদার দিক থেকে যে পিতৃত্ব, তা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য সাব্যস্ত। যেমনটি কুরআনের কোনো কোনো কেরাতে এসেছে: (নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ, এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মা এবং তিনি (নবী) তাদের পিতা) [সূরা আহযাব: ৬]।এখানে পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব বলতে বোঝানো হয়েছে মর্যাদা, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের দিক থেকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও বলেছেন: “আমি তোমাদের জন্য পিতার সমতুল্য।” এমনকি তাঁর মর্যাদা এর চেয়েও ঊর্ধ্বে। উম্মতের ওপর তাঁর অধিকার বাবা-মা এবং দুনিয়ার সকল মানুষের চেয়েও বেশি। যেমনটি তিনি ﷺ বলেছেন: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না,যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, তার পিতা এবং সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।”(সহীহ বুখারি: ১৪; মুসলিম: ৪৪; আল্লাহই ভালো জানেন।”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০০৩২৯)
.
এছাড়াও ইসলামের দৃষ্টিতে খালা, মায়ের সমতুল্য আর চাচা, বাবার সমতুল্য। এ বিষয়ে একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। যেমন রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,«يَا أَيُّهَا النَّاسُ! مَنْ آذَى عَمِّي فَقَدْ آذَانِي، فَإِنَّمَا عَمُّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ»”হে লোকসকল! যে ব্যক্তি আমার চাচাকে কষ্ট দিল সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। কেননা চাচা বাবারই সমতুল্য।”( সহীহুল জামে হা/৭০৮৭) অপর বর্ননায় আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: «يَا عُمَرُ، أَمَا شَعَرْتَ أَنَّ عَمَّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ؟» “হে ওমর! তুমি কি জানো না যে, ব্যক্তির চাচা তার বাবারই সমতুল্য?”(সহীহ মুসলিম হা/৯৮৩; মিশকাত হা/১৭৭৮) হাদিসটির ব্যাখ্যায় ইমাম আল-মানাভী (রাহিমাহুল্লাহ) ফাইযুল কাদীর-এ বলেছেন:(العم والد) أي هو نازل منزلته في وجوب الاحترام والإعظام لتفرعهما عن أصل واحد، وهذا خرج مخرج الزجر عن عقوقه”চাচা পিতার মতো‌ এর অর্থ হলো, তিনি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে পিতার মর্যাদার ন্যায়। কারণ তারা উভয়েই একই মূল (বংশ) থেকে উৎসারিত। আর এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো—চাচার অবাধ্যতা করা বা তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে মানুষকে সতর্ক করা।
.
খালা মায়ের সমতুল্য-সংক্রান্ত একটি হাদিস:আলি (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন, الْخَالَةُ بِمَنْزِلَةِ الْأُمِّ”খালা মায়ের মর্যাদার।”(আবু দাউদ হা/২২৮০; শাইখ আলবানি হাদিসটি সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন) এ হাদিসের মর্মার্থ সম্পর্কে বলা হয়: খালা প্রতিপালনের ক্ষেত্রে মায়ের সমান অধিকার রাখেন। কারণ হাদিসটি সে প্রসঙ্গে উদ্ধৃত হয়েছে।”(ফাতহুল বারী;খণ্ড;৭;পৃষ্ঠা;৫০৬) কারো কারো মতে, প্রতিপালন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে খালা মায়ের সমান। ইমাম যাহাবী “আল-কাবায়ের” গ্রন্থে বলেন:أي : في البر والإكرام والصلة” অর্থাৎ সদ্ব্যবহার, সম্মান করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে।”আরও দেখুন শাইখ উছাইমীনের “শারহু বুলুগুল মারাম”; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২০৩)
.
তবে মনে রাখা উচিত, চাচা বা খালা প্রকৃত অর্থে পিতা-মাতার সমমর্যাদায় পৌঁছান না। অর্থাৎ শরিয়তে পিতা-মাতার প্রতি যে আনুগত্য, সম্মান ও সদ্ব্যবহার ফরজ করা হয়েছে এবং তাঁদের অবাধ্যতা যেভাবে হারাম গণ্য করা হয়েছে—সে বিধান চাচা বা খালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই চাচা বা খালার আনুগত্য করা সন্তানের উপর শরয়ি বাধ্যবাধকতা নয়, এবং পিতা-মাতার মতো সেই পর্যায়ের খেদমত না করলে গুনাহও হবে না। তবে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা, সম্মান প্রদর্শন করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা নিঃসন্দেহে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ।
.
ইবনু হাজর আল-হাইতামী (রাহিমাহুল্লাহ) আজ-জাওয়াজির আন ইকতিরাফিল কাবায়ির-এ বলেছেন:
وظاهر أن الأولاد والأعمام من الأرحام وكذا الخالة فيأتي فيهم وفيها ما تقرر من الفرق بين قطعهم وعقوق الوالدين. وأما قول الزركشي صح في الحديث: أن الخالة بمنزلة الأم وأن عم الرجل صنو أبيه. وقضيتهما أنهما مثل الأب والأم حتى في العقوق فبعيد جدا وليس قضيتهما ذلك, إذ لا عموم فيهما ولا تعرض لخصوص العقوق فيكفي تشابههما في أمر ما كالحضانة تثبت للخالة كما تثبت للأم وكذا المحرمية وتأكد الرعاية وكالإكرام في العم والمحرمية وغيرهما مما ذكر. وأما إلحاقهما بهما في أن عقوقهما كعقوقهما فهو مع كونه غير مصرح به في الحديث مناف لكلام أئمتنا فلا معول عليه, بل الذي دلت عليه الآيات والأحاديث أن الوالدين اختصا من الرعاية والاحترام والطواعية والإحسان بأمر عظيم جدا وغاية رفيعة لم يصل إليها أحد من بقية الأقارب, ويلزم من ذلك أنه يكتفى في عقوقهما وكونه فسقا بما لا يكتفى به في عقوق غيرهما.
“এটি স্পষ্ট যে, সন্তান ও চাচারা ‘আরহাম’ (রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়)-দের অন্তর্ভুক্ত এবং খালাও অনুরূপ। সুতরাং তাদের ক্ষেত্রেও (বিচ্ছিন্নের পরিণাম হিসেবে) তা-ই প্রযোজ্য হবে যা ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা’ (কাত’উর রাহিম) এবং ‘পিতা-মাতার অবাধ্যতা’ (উকূকুল ওয়ালিদাইন)-এর মধ্যকার পার্থক্যের আলোচনায় নির্ধারিত হয়েছে।আর ইমাম যারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) যে বলেছেন—হাদীসে সহীহভাবে প্রমাণিত আছে যে:”খালা মায়ের স্থলাভিষিক্ত’ এবং ‘ব্যক্তির চাচা তার পিতার সমতুল্য”; এর দ্বারা এটা বোঝায় না যে তারা পিতা-মাতার মতোই‌ অবাধ্যতার ক্ষেত্রে একই বিধানের অধীন। এটি অত্যন্ত দূরবর্তী ব্যাখ্যা।কারণ এই হাদীসগুলোতে সাধারণভাবে সেই অর্থ নেই এবং অবাধ্যতার বিশেষ বিধান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট আলোচনাও নেই।বরং এ দুটির মধ্যে কোনো একটি বিষয়ে সাদৃশ্য থাকলেই যথেষ্ট। যেমন: হেফাজত (লালন-পালন)-এর ক্ষেত্রে খালার অধিকার মায়ের মতো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, মাহরাম হওয়া, বিশেষ যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন,এবং চাচার ক্ষেত্রে সম্মান প্রদর্শন, মাহরাম হওয়া ইত্যাদি,এ ধরনের বিষয়গুলো বোঝানো হয়েছে। চাচা বা খালাকে পিতা-মাতার সাথে এভাবে যুক্ত করা যে, তাদের অবাধ্যতা পিতা-মাতার অবাধ্যতার মতোই,,এ কথা হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাছাড়া এটি আমাদের শাফি’ঈ মাজহাবের) ইমামদের বক্তব্যের সাথেও সাংঘর্ষিক। তাই এ মতের উপর নির্ভর করা যায় না।বরং কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হলো: পিতা-মাতা বিশেষভাবে এমন যত্ন, সম্মান, আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের অধিকারী, যা অত্যন্ত মহান ও উচ্চ মর্যাদার; এবং আত্মীয়দের মধ্যে অন্য কেউ সেই মর্যাদায় পৌঁছায় না।এর থেকে এটাও বোঝা যায় যে, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (উকূক) ও তা ফাসিক হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য হওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো যথেষ্ট, সেগুলো অন্য আত্মীয়দের অবাধ্যতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ধরা হয় না।আর চাচার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) আপনার উপর কর্তব্য, তবে তা আপনার দেশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী হবেযেমনটি আমরা আগে উল্লেখ করেছি।(ফাতহুল বারী” খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৫০৬; গৃহীত: ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-১৩৪৩৮৩)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

No comments:

Post a Comment

Translate