প্রশ্ন: ফেরেশতাদের সংখ্যা কত? প্রত্যেক মানুষের সাথে কতজন ফেরেশতা থাকেন এবং তাদের দায়িত্ব কী?
▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ঈমানের ছয়টি রুকনের অন্যতম হচ্ছে ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান; যে রুকনগুলো ছাড়া ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয় না। যে ব্যক্তি এ ছয়টির কোনটির প্রতি ঈমান আনবে না সে ব্যক্তি মুমিন নয়। সে ছয়টি বিষয় হচ্ছে: আল্লাহ্র প্রতি ঈমান, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান, শেষ দিনের প্রতি ঈমান এবং ভালমন্দের তাকদির আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এর প্রতি ঈমান। ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ্ নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারা গায়েবী (অদৃশ্য) জগতের অন্তর্ভুক্ত; যে জগতকে আমরা দেখতে পাই না। তবে আল্লাহ্ তাআলা তাঁর কিতাবের মাধ্যমে এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর মাধ্যমে তাদের সম্পর্কিত অনেক সংবাদ আমাদেরকে জানিয়েছেন। কুরআন ও সুন্নাহর দলিল থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে,ফেরেশতাদের সংখ্যা অসংখ্য। তাদের প্রকৃত সংখ্যা একমাত্র আল্লাহ্ তাআলাই জানেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সপ্তম আকাশে অবস্থিত বাইতুল মা‘মূরের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: “অতঃপর আমাকে বাইতুল মা’মুরের দিকে উত্তোলন করা হয়। তখন আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন: এটি আল-বাইতুল মা’মুর। এখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতারা নামায আদায় করেন। একবার যারা বেরিয়ে যায় তারা আর ফিরে আসে না। অপর দল একই আমল করে।”(সহিহ বুখারী হা/৩২০৭) অপর বর্ননায় আব্দুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সেই দিন জাহান্নামকে এমতাবস্থায় আনা হবে যে, তার রয়েছে সত্তর হাজার লাগাম। প্রতিটি লাগামের সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা; যারা জাহান্নামকে টেনে নিয়ে যাবে।”(সহিহ মুসলিম হা/২৮৪২)
.
দ্বিতীয়ত: সম্মানিত ফেরেশতাগণ বনী আদমকে (মানুষকে) তাদের মাতৃগর্ভে সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি সঙ্গ দিয়ে থাকেন। এমনকি কবরে এবং পরকালেও তারা মানুষকে সঙ্গ দিয়ে থাকেন।দুনিয়াতে মানুষের সাথে তাদের অবস্থান নিম্নরূপ:
.
(১). গর্ভকালীন তদারকি:
.
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেনঃ আল্লাহ্ রেহেমে (মাতৃগর্ভে) একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, হে প্রতিপালক! এটি বীর্য। হে প্রতিপালক! এটি রক্তপিণ্ড। হে প্রতিপালক! এটি গোশ্তপিণ্ড। আল্লাহ্ যখন তার সৃষ্টি পূর্ণ করতে চান, তখন ফেরেশতা বলে, হে প্রতিপালক! এটি নর হবে, না নারী? এটি দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান? তার রিযক কী পরিমাণ হবে? তার জীবনকাল কী হবে? তখন (আল্লাহ্র নির্দেশমত) তার মায়ের পেটে থাকাকালে ঐ রকমই লিখে দেয়া হয়।”(সহীহ বুখারী হা/৬৫৯৫; সহীহ মুসলিম হা/২৬৪৬)।
.
(২). মানুষকে সুরক্ষা প্রদান:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:سوآءٌ منكم مَن أسرَّ القول ومَن جهر به ومَن هو مستخف بالليل وسارب بالنهار . له معقِّبات مِن بين يديه ومِن خلفه يحفظونه من أمر الله “তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন রাখে বা যে তা প্রকাশ করে, রাতে যে আত্মগোপন করে এবং দিনে যে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা সবাই আল্লাহর নিকট সমান। আর মানুষের জন্য রয়েছে তাঁর সামনে ও পিছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী (ফেরেশতা); তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে”।(সূরা আর রদ: ১০-১১)
.
উক্ত আয়াতের তাফসিরে যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] বলেছেন; أن المعقبات مِن الله هم الملائكة جعلهم الله ليحفظوا الإنسان من أمامه ومن ورائه ، فإذا جاء قدر الله – الذي قدّر عليه أن يقع به من حادث ومصاب ونحوه – تخلوا عنه .”আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘মুয়াক্কিবাত’ (পর্যায়ক্রমে আগমনকারী) হলেন মূলত ফেরেশতা। আল্লাহ তাঁদেরকে মানুষের সামনে এবং পেছন থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য নিযুক্ত করেছেন। তবে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফয়সালা (তকদির) চলে আসে—অর্থাৎ কোনো দুর্ঘটনা বা বিপদ যা তাঁর ওপর ঘটার কথা—তখন তাঁরা তাঁর পাশ থেকে সরে যান।”
মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:ما من عبد إلا له ملَك موكل بحفظه في نومه ويقظته من الجن والإنس والهوام ، فما منها شيء يأتيه إلا قال له الملك : وراءك ، إلا شيء أذن الله فيه فيصيبه .”এমন কোনো বান্দা নেই যার জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত নেই। ওই ফেরেশতা তাকে ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় জিন, মানুষ এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ থেকে রক্ষা করেন। এর মধ্যে যা কিছুই তার কাছে (ক্ষতি করতে) আসে, ফেরেশতা তাকে বলেন: ‘পিছনে হটো!’ তবে আল্লাহ যার অনুমতি দেন, কেবল সেটিই তাকে স্পর্শ করে।”
.
জনৈক ব্যক্তি আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-কে বললেন: “মুরাদ গোত্রের একদল লোক আপনাকে হত্যা করতে চায়।” তখন আলী (রা.) বললেন:أي : علي – : إن مع كل رجل ملكين يحفظانه مما لم يُقدَّر ، فإذا جاء القدر خليا بينه وبينه ، إن الأجل جُنَّة حصينة .”প্রত্যেক মানুষের সাথে দুইজন ফেরেশতা থাকেন, যারা তাকে অনাগত (তাকদিরে নেই এমন) বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু যখন তাকদির (নির্ধারিত সময়) চলে আসে, তখন তারা বান্দা ও তকদিরের মাঝখান থেকে সরে দাঁড়ান। নিশ্চয়ই ‘আজল’ বা নির্ধারিত আয়ু একটি সুরক্ষিত ঢাল।” (বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনে হাজার; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৭২)
.
এছাড়াও সূরা আর-রা’দ-এ উল্লেখিত ‘মুয়াক্কিবাত’ (পিছনে এবং সামনে থেকে অনুসরণকারী ফেরেশতা) দ্বারা মূলত সেইসব ফেরেশতাদেরই বোঝানো হয়েছে, যাদের কথা অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:وَ هُوَ الۡقَاهِرُ فَوۡقَ عِبَادِهٖ وَ یُرۡسِلُ عَلَیۡكُمۡ حَفَظَۃً ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءَ اَحَدَكُمُ الۡمَوۡتُ تَوَفَّتۡهُ رُسُلُنَا وَ هُمۡ لَا یُفَرِّطُوۡنَ”আর তিনি তাঁর বান্দাদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধিকারী এবং তিনি তোমাদের উপর প্রেরণ করেন হেফাযতকারীদেরকে। অবশেষে তোমাদের কারও যখন মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন আমাদের রাসূল (ফিরিশতা) গণ তার মৃত্যু ঘটায় এবং তারা কোন ক্রটি করে না।”(সূরা আনআম: ৬১) অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা যে রক্ষক ফেরেশতাদের পাঠান, তারা বান্দাকে তার জন্য নির্ধারিত সময় (মরণ) না আসা পর্যন্ত সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন।
.
(৩).আমল লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাগণ:
প্রত্যেক মানুষের সাথেই দুইজন ফেরেশতা থাকেন যারা তার ভালো-মন্দ, ছোট-বড় সব কাজ লিখে রাখেন।এরাই হচ্ছে ‘কিরামান কাতেবীন’ (সম্মানিত লেখক ফেরেশতারা)। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তবে তোমাদের ওপর অবশ্যই তত্ত্বাবধায়করা আছে (অর্থাৎ তোমাদের কাজকর্মের ওপর নজর রাখার জন্য ফেরেশতারা নিয়োজিত আছে); সম্মানিত লেখকেরা;”[সূরা আল-ইনফিতার: ১০-১১] তিনি আরও বলেন:“স্মরণ করুন, দুই গ্রহণকারী (ফেরেশতা) (একজন) ডানে ও (একজন) বামে বসে (তার আমল) গ্রহণ করছে। সে যে কথাই উচ্চারণ করুক (তা গ্রহণ করার জন্য) তার কাছে একজন সদাপ্রস্তুত প্রহরী রয়েছে”।[সূরা ক্বাফ: ১৭-১৮] ডান দিকের ফেরেশতা নেকি লেখেন এবং বাম দিকের ফেরেশতা গুনাহ লেখেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : إن صاحب الشمال ليرفع القلم ست ساعات عن العبد المسلم المخطئ ، فإن ندم واستغفر الله منها ألقاها ، وإلا كتبت واحدة “বান্দা যখন কোনো ভুল (গুনাহ) করে, তখন বাম দিকের ফেরেশতা কলমটি ছয় ঘণ্টা উঁচিয়ে রাখেন। যদি সে অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তবে তিনি তা আর লেখেন না। অন্যথায় সেটি একটি গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।”(তাবারানী, আল-মু’জামুল কবীর: ৮/১৫৮; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি সহীহ বলেছেন;সহিহ আল-জামি’ (২/২১২)
.
সারসংক্ষেপ:মানুষের সাথে সার্বক্ষণিক কতজন ফেরেশতা থাকেন?
.
যদিও কুরআন ও সুন্নাহতে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে দৈনিক কতজন ফেরেশতা থাকে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই, তবে কুরআন সুন্নাহর নস এবং আলেমদের ব্যাখ্যা থেকে জানা যায় যে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে চারজন ফেরেশতা থাকে—দুইজন তার সমস্ত আমল ও কাজ লিপিবদ্ধ করে রাখে, আর অন্য দুইজন তার রক্ষা ও হেফাজতের দায়িত্ব পালন করে।ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মানুষের সাথে সাধারণত চারজন ফেরেশতা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقوله : له معقبات من بين يديه ومن خلفه يحفظونه من أمر الله أي : للعبد ملائكة يتعاقبون عليه حرس بالليل وحرس بالنهار ، يحفظونه من الأسواء والحادثات ، كما يتعاقب ملائكة آخرون لحفظ الأعمال من خير أو شر ملائكة بالليل وملائكة بالنهار .فاثنان عن اليمين والشمال يكتبان الأعمال صاحب اليمين يكتب الحسنات وصاحب الشمال يكتب السيئات .وملكان آخران يحفظانه ويحرسانه ، واحد من ورائه وآخر من قدامه .فهو بين أربعة أملاك بالنهار وأربعة آخرين بالليل “আল্লাহর বাণী: ‘তার (মানুষের) জন্য রয়েছে তাঁর সামনে ও পিছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী (ফেরেশতা); তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে”।(সূরা আর রদ: ১১) অর্থাৎ: বান্দার জন্য এমন কিছু ফেরেশতা রয়েছেন যারা পালাবদল করে তার পাহারায় নিয়োজিত থাকেন—একদল রাতে এবং একদল দিনে; তারা তাকে যাবতীয় অনিষ্ট ও দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করেন; ঠিক যেভাবে অন্য একদল ফেরেশতা মানুষের ভালো বা মন্দ আমলসমূহ সংরক্ষণের জন্য পর্যায়ক্রমে আগমন করেন; একদল রাতে এবং একদল দিনে।সুতরাং (আমল লেখক) দুইজন ডানে ও বামে থেকে আমলসমূহ লিখতে থাকেন; ডান পাশের জন নেক আমলগুলো লেখেন এবং বাম পাশের জন গুনাহসমূহ লেখেন। আর অন্য দুইজন ফেরেশতা তাকে হেফাজত ও পাহারা দেন; একজন তার পেছন থেকে এবং অন্যজন তার সামনে থেকে।অতএব, মানুষ দিনের বেলা চারজন ফেরেশতার (বেষ্টনীতে) থাকে এবং রাতে অন্য চারজন ফেরেশতার (বেষ্টনীতে) থাকে।”(তাফসিরে ইবনু কাসীর: খণ্ড; ২: পৃষ্ঠা: ৫০৪; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৬৫২৩) ইমাম ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মানুষের সাথে প্রতি মুহূর্তে ৪ জন ফেরেশতা থাকেন (২ জন আমল লেখার জন্য এবং ২ জন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার জন্য)। যেহেতু তারা দিন ও রাতে শিফট পরিবর্তন করেন, তাই ২৪ ঘণ্টায় মোট ৮ জন ফেরেশতা একজন মানুষের সেবায় বা দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
No comments:
Post a Comment