Friday, March 27, 2026

যাকাতুল ফিতর কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আদায় করা বৈধ

 প্রশ্ন: যাকাতুল ফিতর কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আদায় করা বৈধ এবং কোনগুলো দিয়ে আদায় করা বৈধ নয়?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬

​উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যাকাতুল ফিতরকে ফরয করে তা গরীব-মিসকীনের প্রাপ্য হক হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাই প্রশ্ন আসে কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত এবং কোনগুলো দ্বারা নয়? এ বিষয়ে আমরা দলিলভিত্তিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থাপন করব।

.

▪️প্রথমত: কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত?

.

যাকাতুল ফিতরের মূলনীতি হলো প্রত্যেক ব্যক্তি তার অবস্থানরত দেশের মানুষের প্রচলিত প্রধান খাদ্যদ্রব্য থেকেই ফিতরা আদায় করবে। অর্থাৎ, মানুষ যে সকল খাদ্যকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের মূল আহার হিসেবে গ্রহণ করে, সেসব খাদ্য দ্বারা ফিতরা প্রদান করা বৈধ। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হলো চাল; তাই চালের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা উত্তম ও সুন্নতসম্মত। এছাড়াও আলেমগণ হাদিসে বর্ণিত খাদ্যদ্রব্যের আলোকে এবং বিভিন্ন দেশের প্রধান খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করে সেসকল দেশের জন্য আরও কিছু খাদ্যের উল্লেখ করেছেন—যেমন: গম, ভুট্টা, চাল, শিমের বীজ, ডাল, ছোলা, ফূল (এক প্রকার ডাল), নুডলস, গোশত ইত্যাদি। এগুলো যেসব দেশের প্রধান খাদ্য তারা এগুলো দিয়ে ফিতরা প্রদান করতে পারে। কারন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিতরা হিসেবে এক স্বা’ খাবার প্রদান করা ফরয করেছেন। যেসব খাবার সাহাবীগণের প্রধান খাদ্য ছিল তাঁরা সেটা দিয়ে ফিতরা আদায় করতেন।সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু সা‘ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেন: “আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় ঈদের দিনএক স্বা খাদ্যদ্রব্য (ফিতরা) হিসেবে প্রদান করতাম। আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন: তখন আমাদের খাদ্য ছিল— যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।” অপর এক বর্ণনায় তিনি বলেন: “যখন আমাদের মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন তখন আমরা ছোট-বড়, স্বাধীন-ক্রীতদাস সবার পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) হিসেবে এক স্বা’ খাদ্য কিংবা এক স্বা’ পনির কিংবা এক স্বা’ যব কিংবা এক স্বা’ খেজুর কিংবা এক স্বা’ কিসমিস আদায় করতাম।”(সহিহ বুখারী হা/১৫১০; ও সহিহ মুসলিমে হা/৯৮৫) অনেক আলেম হাদিসে উল্লেখিত ‘খাদ্যদ্রব্য’ এর ব্যাখ্যা করেছেন: গম। আবার কোন কোন আলেম বলেন: ‘খাদ্যদ্রব্য’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: কোন এলাকার মানুষ যে খাদ্য খেয়ে অভ্যস্ত; সেটা গম হোক, যব হোক কিংবা অন্য কিছু হোক। আর এটাই অধিক সঠিক অভিমত। কারণ ফিতরা হচ্ছে- ধনীদের পক্ষ থেকে গরীবদের প্রতি সহমর্মিতার প্রকাশ। স্থানীয় খাদ্য ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করা মুসলমানের উপর ফরয নয়। বর্তমানে হারামাইনের দেশে ভাত হচ্ছে- প্রধান খাদ্য এবং এটি দামী ও ভাল খাদ্য। তাই যব এর চেয়ে চাউল দিয়ে ফিতরা দেয়া উত্তম; যদিও যব দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েয মর্মে দলিলে উল্লেখিত হয়েছে। এভাবে জানা গেল যে, চাউল দিয়ে ফিতরা আদায় করতে কোন অসুবিধা নেই।

.

শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] তাঁর আল মাজমু গ্রন্থে বলেন:ذكرنا أن الأصح عندنا وجوب الفطرة من غالب قوت البلد، وبه قال مالك، وقال أبو حنيفة: هو مخير، وعن أحمد رواية أنه لا يجزئ إلا الأجناس الخمسة المنصوص عليها: التمر والزبيب والبر والشعير والأقط. والله أعلم”আমরা উল্লেখ করেছি যে,আমাদের মতে সবচেয়ে সহীহ মত হলো যাকাতুল ফিতর ওই দেশের প্রধান খাদ্যদ্রব্য থেকেই ওয়াজিব। এ মতই ইমাম মালেক রহ. এরও। আর ইমাম আবু হানিফা বলেন: এতে মানুষকে পছন্দের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আর ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে একটি বর্ণনা রয়েছে যে, নির্দিষ্ট পাঁচ প্রকার খাদ্য ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আদায় করা যথেষ্ট নয় সেগুলো হলো: খেজুর, কিশমিশ, গম, যব এবং শুকনো দুধজাত খাদ্য। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।”(ইমাম নববী আল-মাজমু খন্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১১২)

.

অপরদিকে মালিকি মাযহাবে যাকাতুল ফিতর সাধারণত দেশের প্রধান খাদ্য থেকে আদায় করা হয় যা নয়টি জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ: গম, যব, সুলত (এক ধরনের যব), ভুট্টা, বাজরা, খেজুর, কিশমিশ, চাল এবং শুকনো দুধজাত খাদ্য। তবে যদি মানুষের প্রধান খাদ্য এগুলো ছাড়া অন্য কিছু হয়, তাহলে তা থেকেও আদায় করা যাবে। আদ দাসূকি তাঁর হাশিয়া আলা শারহিল কাবীর (খলীলের মুখতাসার এর ব্যাখ্যায়) বলেন:والذي يظهر من عبارات أهل المذهب أن غير التسعة إذا كان غالبا لا يخرج منه، وإنما يخرج منه إذا كان عيشهم دون غيره من التسعة كما في المدونة وغيرها، ولذا قال المصنف إلا أن يقتات غيره أي إلا أن ينفرد غيره بالاقتيات فيخرج منه حينئذ”মালিকি আলেমদের বক্তব্য থেকে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো উক্ত নয়টি জিনিস ছাড়া অন্য কিছু যদি প্রধান খাদ্যও হয়, তবুও তা থেকে আদায় করা হবে না বরং তখনই তা থেকে আদায় করা হবে, যখন মানুষের জীবিকা শুধুমাত্র সেটির উপর নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং ওই নয়টির কোনোটিই প্রচলিত না থাকে যেমন ‘আল‌ মুদাওয়ানা’ প্রভৃতি গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এ কারণেই মুসান্নিফ বলেছেন: তবে যদি অন্য কিছু প্রধান খাদ্য হয় অর্থাৎ যখন শুধুমাত্র সেটিই মানুষের প্রধান খাদ্য হয়ে যায়, তখন তা থেকেই যাকাতুল ফিতর আদায় করা হবে।

.

ইমাম কারাফি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:يخرج أهل كل بلد من غالب عيشهم ذلك الوقت”প্রত্যেক দেশের মানুষ তাদের সেই সময়কার প্রধান খাদ্য থেকেই (যাকাতুল ফিতর) প্রদান করবে। (আয-যাখীরা; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৬৯)

.

খতীব আশ-শিরবিনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:ويجب الصاع من غالب قوت بلده، إن كان بلدياً. وفي غيره: من غالب قوت محله؛ لأن ذلك يختلف باختلاف النواحي”নিজ দেশের বাসিন্দা হলে তার দেশের প্রধান খাদ্য থেকে এক ‘সা’ (পরিমাণ) প্রদান করা ওয়াজিব। আর যদি অন্য কোথাও থাকে, তাহলে সে স্থানের প্রধান খাদ্য থেকে দিবে; কারণ অঞ্চলভেদে (খাদ্যের ধরন) ভিন্ন হয়ে থাকে।”(মুগনী আল-মুহতাজ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১১৭)

.

হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:

أَمَّا إذَا كَانَ أَهْلُ الْبَلَدِ يَقْتَاتُونَ أَحَدَ هَذِهِ الْأَصْنَافِ جَازَ الْإِخْرَاجُ مِنْ قُوتِهِمْ بِلَا رَيْبٍ. وَهَلْ لَهُمْ أَنْ يُخْرِجُوا مَا يَقْتَاتُونَ مِنْ غَيْرِهَا ؟ مِثْلُ أَنْ يَكُونُوا يَقْتَاتُونَ الْأُرْزَ وَالذرة فَهَلْ عَلَيْهِمْ أَنْ يُخْرِجُوا حِنْطَةً أَوْ شَعِيرًا أَوْ يُجْزِئُهُمْ الْأُرْزُ وَالذُّرَةُ ؟ فِيهِ نِزَاعٌ مَشْهُورٌ، وأصح الأقوال: أنه يُخْرِجُ مَا يَقْتَاتُهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ مِنْ هَذِهِ الْأَصْنَافِ، وَهُوَ قَوْلُ أَكْثَرِ الْعُلَمَاءِ: كَالشَّافِعِيِّ وَغَيْرِهِ ؛ فَإِنَّ الْأَصْلَ فِي الصَّدَقَاتِ أَنَّهَا تَجِبُ عَلَى وَجْهِ الْمُواساة لِلْفُقَرَاءِ، كَمَا قَالَ تَعَالَى: مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ، وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَضَ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ ؛ لِأَنَّ هَذَا كَانَ قُوتَ أَهْلِ الْمَدِينَةِ، وَلَوْ كَانَ هَذَا لَيْسَ قُوتَهُمْ بَلْ يَقْتَاتُونَ غَيْرَهُ لَمْ يُكَلِّفْهُمْ أَنْ يُخْرِجُوا مِمَّا لَا يَقْتَاتُونَهُ، كَمَا لَمْ يَأْمُرِ اللَّهُ بِذَلِكَ فِي الْكَفَّارَاتِ

“উল্লেখিত খাদ্যসমূহের কোনটি যদি কোন এলাকার মানুষের প্রধান খাদ্য হয়ে থাকে তাহলে সন্দেহাতীতভাবে সে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েয। প্রশ্ন হচ্ছে- তারা অন্য যেসব খাদ্য গ্রহণ করে থাকে সেটা দিয়ে কি ফিতরা দেয়া যাবে? যেমন কারো প্রধান খাদ্য যদি হয় ভাত কিংবা ভূট্টা তারা গম কিংবা যব দিয়ে কি ফিতরা আদায় করতে পারবে? নাকি চাউল বা ভূট্টা দিতে হবে? এ বিষয়ে বিশাল মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে শুদ্ধ অভিমত হচ্ছে- হাদিসে উল্লেখিত শ্রেণীর মধ্যে না থাকলেও যেটা তাদের খাদ্য সেটা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে পারবে। এটি অধিকাংশ আলেমের অভিমত, যেমন- ইমাম শাফেয়ি ও অন্যান্য আলেম। কারণ ফিতরা ফরয করা হয়েছে দরিদ্রদের প্রতি সহমর্মিতাস্বরূপ। আল্লাহ তাআলা বলেন: “মধ্যম মানের খাদ্য যা তোমরা তোমাদের স্ত্রী-পরিবারকে খাইয়ে থাক”[সূরা মায়িদা: ৮৯] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) হিসেবে এক স্বা’ খেজুর কিংবা এক স্বা’ যব ফরয করেছেন। কারণ তখন এগুলো ছিল মদিনাবাসীর খাদ্য। যদি এগুলো তাদের খাদ্য না হয়ে অন্য কিছু হত; তাহলে তাদেরকে তাদের খাদ্যদ্রব্য ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ফিতরা আদায় করার দায়িত্ব দিতেন না; যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা কাফফারার ক্ষেত্রে নির্দেশ দেননি।”(কিছুটা পরিমার্জিতভাবে সমাপ্ত;ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড:২৫; পৃষ্ঠা: ৬৮)

.

আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন, وهذه كانت غالب أقواتهم بالمدينة فأما أهل بلد أو محلة قوتهم غير ذلك فإنما عليهم صاع من قوتهم كمن قوتهم الذرة أو الأرز أو التين أو غير ذلك من الحبوب، فإن كان قوتهم من غير الحبوب، كاللبن واللحم والسمك أخرجوا فطرتهم من قوتهم كائنا ما كان، هذا قول جمهور العلماء، وهو الصواب الذي لا يقال بغيره، إذ المقصود سد حاجة المساكين يوم العيد ومواساتهم من جنس ما يقتاته أهل بلدهم، وعلى هذا فيجزئ إخراج الدقيق وإن لم يصح فيه الحديث “মদিনাতে এগুলো ছিল তাদের প্রধান খাদ্য। পক্ষান্তরে, কোন দেশের কিংবা এলাকার প্রধান খাদ্য যদি অন্য কিছু হয় তাহলে তাদের উপর তাদের খাদ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা ফরয। যেমন- যাদের খাদ্য ভুট্টা কিংবা ভাত কিংবা ত্বীন কিংবা অন্য কোন শস্যদানা (তারা সেটা দিয়ে ফিতরা দিবে)। আর তাদের খাদ্য যদি শস্যদানা না হয়ে অন্য কিছু হয়; যেমন- দুধ, গোশত, কিংবা মাছ ইত্যাদি তাহলে তারা তাদের প্রকৃতিগত খাদ্য দিয়ে ফিতরা দিবে সেটা যেমনি হোক না কেন। এটা জমহুর আলেমের অভিমত। এটাই সঠিক মত; অন্য মত প্রকাশ করার সুযোগ নেই। কারণ ফিতরা দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে- ঈদের দিন মিসকীনের প্রয়োজন পূরণ করা এবং সবাই যেমন খাবার খায় সে জাতীয় খাবার দিয়ে তাদের সহমর্মী হওয়া। এর আলোকে বলা যায় আটা বা ময়দা দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েয হবে; যদিও কোন সহিহ হাদিসে এর কথা আসেনি।”(ইবনু কাইয়্যেম; ইলামুল মুওয়াক্কিয়ীন’ খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১২)

.

বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আশ-শারহুল মুমতি’ গ্রন্থে বলেন:والصحيح أن كل ما كان قوتاً من حب وثمر ولحم ونحوها فهو مجزئ”সঠিক মতানুযায়ী, যেটা খাদ্য হিসেবে প্রচলিত সেটা শস্যদানা হোক, ফল-ফলাদি হোক কিংবা গোশত হোক সেটা দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েয।”(আশ-শারহুল মুমতি আলা যায়দুল মুস্তাকনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৮৩)

.

▪️দ্বিতীয়ত: কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়?

.

যাকাতুল ফিতর এমন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা আদায় করতে হয়, যা কোনো সমাজে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রধান খাদ্য (قوت غالب) হিসেবে বিবেচিত। এই মূলনীতির ভিত্তিতে যেসব বস্তু সাধারণ খাদ্য নয়, বরং কেবল সহায়ক উপাদান বা পার্শ্ব উপকরণ—সেগুলো দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়।

অতএব, সেমাই, চিনি, লবণ, মসলা, রান্না করা ভাত, দুধ, জুস, তেল, মাছ ইত্যাদি—যেগুলো মূল খাদ্য নয় এসব দিয়ে ফিতরা আদায় শুদ্ধ হবে না। অনুরূপভাবে পচা, নষ্ট বা নিম্নমানের এমন খাদ্য, যা মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে চায় না, তা দিয়েও ফিতরা দেওয়া বৈধ নয়। তদ্রূপ, জামা-কাপড়, আসবাবপত্র বা অনুরূপ অখাদ্য বস্তু দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করলে তা সহীহ হবে না।

.

আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ,গ্রন্থে এসেছে; والأشياءالمقتاتة : ‌هي ‌التي ‌تَصلح ‌أن ‌تكون ‌قوتا ‌تغذى ‌به ‌الأجسام ‌على ‌الدوام، بخلاف ما يكون قواما للأجسام لا على الدوام“যেসব জিনিস ‘খাদ্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়, তা হলো সেই সমস্ত বস্তু যা নিয়মিতভাবে দেহকে পুষ্টি দেয় এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগায়। এর বিপরীতে, এমন কিছু বস্তু আছে যা দেহকে সংরক্ষণ বা স্থিতিশীল রাখে, কিন্তু নিয়মিত বা প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।”(আল-মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৪)

.

যেমন; মালিকি মাযহাবে যাকাতুল ফিতর সাধারণত দেশের প্রধান খাদ্য থেকে আদায় করা হয় যা নয়টি জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ: গম, যব, সুলত (এক ধরনের যব), ভুট্টা, বাজরা, খেজুর, কিশমিশ, চাল এবং শুকনো দুধজাত খাদ্য। তবে যদি মানুষের প্রধান খাদ্য এগুলো ছাড়া অন্য কিছু হয়, তাহলে তা থেকেও আদায় করা যাবে। এই বক্তব্য উল্লেখ করে আদ দাসূকি তাঁর হাশিয়া আলা শারহিল কাবীর (খলীলের মুখতাসার এর ব্যাখ্যায়) বলেন:والذي يظهر من عبارات أهل المذهب أن غير التسعة إذا كان غالبا لا يخرج منه، وإنما يخرج منه إذا كان عيشهم دون غيره من التسعة كما في المدونة وغيرها، ولذا قال المصنف إلا أن يقتات غيره أي إلا أن ينفرد غيره بالاقتيات فيخرج منه حينئذ”মালিকি আলেমদের বক্তব্য থেকে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো উক্ত নয়টি জিনিস ছাড়া অন্য কিছু যদি প্রধান খাদ্যও হয়, তবুও তা থেকে আদায় করা হবে না বরং তখনই তা থেকে আদায় করা হবে, যখন মানুষের জীবিকা শুধুমাত্র সেটির উপর নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং ওই নয়টির কোনোটিই প্রচলিত না থাকে যেমন ‘আল‌ মুদাওয়ানা’ প্রভৃতি গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এ কারণেই মুসান্নিফ বলেছেন: তবে যদি অন্য কিছু প্রধান খাদ্য হয় অর্থাৎ যখন শুধুমাত্র সেটিই মানুষের প্রধান খাদ্য হয়ে যায়, তখন তা থেকেই যাকাতুল ফিতর আদায় করা হবে।

.

সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেনإذا لم تكن هذه الأنواع أو بعضها قوتا: فالصحيح أنها لا تجزئ. ولهذا ورد عن الإمام أحمد: الأقط لا يجزئ، إلا إذا كان قوتا. وإنما نص عليها في الحديث؛ لأنها كانت طعاما، فيكون ذكرها على سبيل التمثيل، لا التعيين. لما ثبت في صحيح البخاري عن أبي سعيد الخدري ـ رضي الله عنه ـ قال: “كنا نخرجها في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم صاعا من طعام، وكان طعامنا يومئذ التمر والزبيب والشعير والأقط”যদি এই (নির্দিষ্ট কয়েক) ধরনের খাদ্যদ্রব্য বা এর কোনো অংশ কোনো অঞ্চলের প্রধান আহার্য না হয়, তাহলে সঠিক মত হলো যে এসব দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় যথেষ্ট হবে না। এ কারণেই ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত হয়েছে: ‘আকিত (শুকনো দুধজাত খাবার) যথেষ্ট নয়, তবে যদি তা প্রধান খাদ্য হয়, তাহলে যথেষ্ট হবে।’ হাদীসে এসব জিনিসের উল্লেখ এসেছে এজন্য যে, এগুলো সে সময়ে খাদ্য ছিল। সুতরাং এগুলোর উল্লেখ নির্দিষ্ট করে বাধ্যতামূলক করার জন্য নয়; বরং উদাহরণ হিসেবে এসেছে।কারণ সহীহ বুখারীতে আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে এক ‘সা’ পরিমাণ খাদ্য (যাকাতুল ফিতর) আদায় করতাম। আর সে সময় আমাদের খাদ্য ছিল খেজুর, কিশমিশ, যব এবং আকিত।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি আলা যায়দুল মুস্তাকনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৮১)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।

▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬

উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

No comments:

Post a Comment

Translate