Wednesday, October 29, 2025

মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান একটি শিরক মিশ্রিত গান

 “মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান” এই গানটির লেখক হলেন, মোহিনী চৌধুরী। এটি একটি বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গান, যা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল। তবে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এই গানটার মধ্যে বেশ কিছু শিরকি এবং শরিয়ত বিরোধী কথাবার্তা আছে।

সুতরাং মুসলিমদের জন্য এই গানটি গাওয়া হারাম। তবে হিন্দু বা অন্য ধর্ম/আদর্শে বিশ্বাসীরা যা ইচ্ছা গাইতে পারে। সেটা তাদের বিষয়।
যাহোক, প্রিয় বন্ধুগণ, মুসলিমদেরকে সতর্ক করার উদ্দেশ্য এই গানের কয়েকটি শরিয়ত বিরোধী, হিন্দুয়ানি বিশ্বাস এবং শিরকের উদাহরণ তুলে ধরা হল:
❂ ১. “মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান”-এই বাক্যটি ইসলামি ভাবধারা সম্পন্ন নয় বরং হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির সাথে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ।
কারণ-
ক. মন্দির: হিন্দুদের দেবালয় যেখানে দেব-দেবীর মূর্তি থাকে এবং তাদের নিকটে প্রার্থনা, উপাসনা ও অন্যান্য ধর্মীয় কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
খ. মন্দিরে বলিদান:
বলি অর্থ: বিশেষ পূজোপকরণ।
দান অর্থ: ত্যাগ। অর্থাৎ দেবতার উদ্দেশ্যে বিশেষ ভাবে কিছু দান করার নাম বলিদান বা দেবতার উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ।
আর এই কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘মন্দিরে বলিদান’ হিন্দুদের ধর্মীয় আচারের অন্তর্ভুক্ত যা ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ শিরক।
❂ ২. “যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা এখনও জানে স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি।”
এখানে কয়েকটি শরিয়ত বিরোধী কথা আছে।” যথা:
ক. যারা দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করে ইসলামের দৃষ্টিতে তাদেরকে সরাসরি ‘স্বর্গবাসী’ (জান্নাতবাসী) বলা জায়েজ নাই। বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। কোনও মুসলিম যদি রাষ্ট্রে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা কিংবা ইসলামি রাষ্ট্রকে শত্রুর কবল থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করতে গিয়ে শত্রুর হাতে নিহত হয় তাহলে সে শহিদি মর্যাদা লাভ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে ইনশাআল্লাহ। অন্যথায় নয়।
খ. মুসলিমদের নিকট স্বর্গ (জান্নাত)-এর থেকে দেশ বা অন্য কিছু প্রিয় নয়। বরং মুমিন জীবনের সবচেয়ে প্রিয় অভীষ্ট লক্ষ্য হল, জান্নাত প্রাপ্তি। আর সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সে তার সমস্ত অর্থ-সম্পদ, ভিটা-মাটি, সমাজ-দেশ এমনকি নিজের জীবনকেও উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে।
❂ ৩. “আজি রক্ত কমলে গাঁথা মাল্যখানি বিজয় লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরই গলে।”
কেউ যদি বিশ্বাস করে ‘বিজয়লক্ষ্মী’ বা বিজয় ও সৌভাগ্যের দেবী বিজয় দান করে তাহলে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মুরতাদে পরিণত হবে। কারণ তা আল্লাহর সাথে সরাসরি শিরক। এটি মূলত: হিন্দুয়ানি বিশ্বাস।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِندِ اللَّهِ
“বিজয় তো আসে একমাত্র আল্লাহর নিকট থেকে।” [সূরা আনফাল: ১০]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে নিয়তে ত্রুটি থাকলে তার পরিণতি খুবই ভয়ানক

 ইবাদতের প্রাণশক্তি হল, ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা। তা সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে ত্রুটি থাকলে তা আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত হবে।

দ্বীনের ইলম অর্জন নিঃসন্দেহে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এক্ষেত্রে যদি নিয়তের মধ্যে ত্রুটি থাকে তাহলে তা ইলম অন্বেষণকারীর জন্য আখিরাতে মহাবিপদের কারণ হবে। অর্থাৎ ইলম শেখার মূল উদ্দেশ্যই যদি হয়, অর্থ উপার্জন, পদমর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান সুসংহত করা, যশ ও খ্যাতি লাভ অথবা অন্য কোনও দুনিয়ার স্বার্থ তাহলে তা ইলম অন্বেষণকারীর জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে।
তাই ইলম শিক্ষা অর্জনের পূর্বে নিয়তের বিশুদ্ধতা অপরিহার্য। আর তা হল, আল্লাহর দ্বীন জানা, মানা এবং সমাজে তার প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
❑ নিম্নে এ বিষয়ে কয়েকটি হাদিস পেশ করা হল:
◈ ১. রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنْ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَعْنِي رِيحَهَا “
“আল্লাহর তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যে ইলম অর্জন করতে হয় তা যদি কোন মানুষ শুধুমাত্র দুনিয়ার সম্পদ উপার্জনের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তবে সে কিয়ামত দিবসে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।” [সুনান আবু দাউদ, হা/৩৩৬৪,, সহিহহুত তারগিব: ১০৫]
◈ ২. আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُبَاهِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ لِيَصْرِفَ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ فَهُوَ فِي النَّارِ
“যে ব্যক্তি ইলম (জ্ঞান) শিক্ষা করে এই উদ্দেশ্যে যে, সে এর দ্বারা আলিমদের (জ্ঞানীদের) সাথে গর্ব করবে অথবা মূর্খদের সাথে ঝগড়া করবে অথবা মানুষের দৃষ্টি তার দিকে আকৃষ্ট করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।”
[সহীহুল জামি’: ৬১৫৮, আলবানি এটিকে সহিহ বলেছেন]
◈ ৩. অপর একটি হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
، ورجلٌ تعلَّمَ العِلْمَ وعلَّمَهُ ، وقَرَأَ القُرآنَ ، فأُتِيَ بهِ فعَرَّفَهُ نِعمَهُ ، فعَرَفَها ، قال : فما عمِلْتَ فيها ؟ قال : تعلَّمْتُ العِلْمَ وعلَّمْتُهُ ، وقَرَأْتُ فِيكَ القُرآنَ ، قال : كذبْتَ، ولكنَّكَ تعلَّمْتَ العِلْمَ لِيُقالَ عالِمٌ ، وقرأْتَ القُرآنَ لِيُقالَ : هو قارِئٌ فقدْ قِيلَ ، ثمَّ أُمِرَ بهِ فسُحِبَ على وجْهِهِ حتى أُلْقِيَ في النارِ
“আর এক ব্যক্তি যে ইলম (জ্ঞান) শিখেছিল ও অপরকে শিখিয়েছিল এবং কুরআন পাঠ করেছিল। তাকে আনা হবে, অতঃপর আল্লাহ তাকে তাঁর নিয়ামতসমূহ চেনাবেন, আর সে তা চিনতে পারবে।
আল্লাহ বলবেন: তুমি এই নিয়ামতসমূহের দ্বারা কী করেছ?
সে বলবে: আমি ইলম শিখেছি ও শিখিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি।
আল্লাহ বলবেন: তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি ইলম শিখেছিলে, যেন তোমাকে ‘আলিম’ বলা হয় এবং কুরআন পাঠ করেছিলে, যেন তোমাকে ‘কারী’ বলা হয়। (দুনিয়াতে) তো তা বলা হয়েই গেছে।
অতঃপর তার সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হবে তখন তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
[সহিহ মুসলিম, হা/১৯০৫। এটি সেই বিখ্যাত হাদিসের অংশ যা অনুযায়ী কিয়ামতের দিন প্রথম যাদের দ্বারা জাহান্নামের আগুন জ্বালানো হবে।তারা হল, একজন শহিদ, একজন আলিম/ক্বারী এবং একজন দানশীল ব্যক্তি যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে (রিয়া) তাদের কাজ করেছিল] আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিয়তের পরিশুদ্ধতা দান করুন এবং তাঁর অসন্তোষ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

পিতামাতা ও স্বামী-সন্তানের জন্য দুআ করলে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে এর দ্বারা উপকৃত হয়

 প্রশ্ন: আমি আমার পিতামাতা ও স্বামীর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের অনেক অনেক দোয়া করি। এই দোয়ার কারণে কী তারা কিয়ামতে উপকৃত হবে?

উত্তর: জি, অবশ্যই হবে। আপনার এই দোয়ার কারণে আপনার পিতামাতা ও স্বামী কিয়ামতের দিন উপকৃত হবেন, ইনশা আল্লাহ।
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الإنْسَانُ انْقَطَعَ عنْه عَمَلُهُ إِلَّا مِن ثَلَاثَةٍ: إِلَّا مِن صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو له
“যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার তিনটি আমল ছাড়া সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়:
১. সাদকায়ে জারিয়া,
২. এমন ইলম যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং
৩. এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।”
[সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১]
এমনকি যে কোন মুসলিম অপর মুসলিমের জন্য দোয়া করলে তারাও উপকৃত হবেন ইনশাআল্লাহ চাই তাদের সাথে রক্তের সম্পর্ক থাকুক অথবা না থাকুক। সুতরাং আপনি যথাসাধ্য অধিক পরিমাণে আপনার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি,স্বামী এবং অপরাপর অন্যান্য মুসলিমদের জন্য দোয়া করুন। আপনার দোয়া তাদের জন্য আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ, কবরের আজাব থেকে মুক্তি, আখেরাতে মর্যাদা বৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যম হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করুন এবং তাদের উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে :
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

দাঈর অপরিহার্য গুণাবলি

 দাওয়াহ ইল্লাল্লাহ বা আল্লাহর পথে আহবান করা হল, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং মর্যাদা পূর্ণ কাজ। এটিই ছিল যুগে যুগে সকল নবী-রসুলের মূল দায়িত্ব এবং মিশন। এটি সরাসরি মহান আল্লাহর নির্দেশ। সে কারণে দাওয়াতের কাজ করা সাধ্য অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ। যার যতটুকু সামর্থ্য ও যোগ্যতা আছে সে তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে দাওয়াতের পথে অবদান রাখবে। আল্লাহর পথে আহ্বানকারী (দাঈ) তিনি সেই সম্মানিত ব্যক্তি, যিনি মানবতাকে সত্যের পথে আহ্বান করেন, সৎকাজের আদেশ দেন ও অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শুধু মানুষকে আহ্বান করেন না নিজেও হন সেই আহ্বানের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তার দাওয়াত মুখে শুধু নয়, চরিত্র ও আচরণে প্রতিফলিত হয়। দাঈ মানে শুধু বক্তা বা লেখক নন। তিনি সেই মানুষ, যার প্রতিটি কথা, আচরণ ও হাসিতেও দাওয়াতের আলো ঝলমল করে। সে কারণে তার মধ্যে কিছু গুণাবলী থাকা অপরিহার্য। নিম্নে একজন দাঈর মধ্যে যে সকল গুনাবলী থাকা অত্যন্ত জরুরি সেগুলো কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:

১. আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক: আল্লাহর পথের আহ্বানকারী তাকওয়া বা আল্লাহভীতি, হারাম থেকে দূরে থাকা, আমলে সালেহ বা সৎকর্ম এবং অধিক পরিমাণে দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন।
২. মানুষের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক: এক জন দাঈ মানুষের সাথে আন্তরিকতা পূর্ণ আচরণ, সাহায্য, সহানুভূতি এবং ভালোবাসার মাধ্যমে হৃদয়ের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন।
৩. উদার ও প্রশস্ত দৃষ্টিভঙ্গি: দাঈর জন্য সংকীর্ণতা মুক্ত ও সচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সর্বক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকে ন্যায়-নীতি ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করবেন।
৪. যাদেরকে দাওয়াত দেওয়া হবে তাদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা: তিনি যাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাবেন তাদের সংস্কৃতি, মানসিকতা ও প্রয়োজন সম্পর্কে জ্ঞান রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের সাথে কথা বলা এবং আচরণের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
৫. সহনশীলতা ও ক্ষমা: দাওয়াতের বিরোধিতা বা শত্রুতার মুখোমুখি হলে কিংবা কেউ কথা ও আচরণে কষ্ট দিলে সে ক্ষেত্রে সহনশীলতা এবং ক্ষমার মনোভাব বজায় রেখে সংযম পূর্ণ কোমল আচরণ করবে‌।
৬. কথা ও কাজের মিল: একজন দাঈর কথা এবং কাজের মিল থাকা অপরিহার্য।
৭. সত্যের ওপর অবিচলতা ও একাগ্রতা: দাঈ চাপ, ভয় বা প্রলোভনের মুখেও হক থেকে সরবে‌ না।
৮. বিনয় ও নম্রতা: যে ব্যক্তি দাওয়াতের পথে কাজ করবে সে অহংকার মুক্ত জীবন গঠন করবে‌। অহংকার শুধু হারাম নয় বরং কবিরা গুনাহ। তার কর্তব্য, সবার সঙ্গে ভদ্রতা ও নম্রতা পূর্ণ আচরণ করা। বিনয় ও নম্রতা মানুষকে কাছে টানে এবং অহংকার ও উগ্রতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়।
৯. সাহস ও দৃঢ়তা: একজন দাঈ হবে সাহসী এবং নির্ভীক। সে হবে সত্যের পক্ষে ইস্পাত কঠিন চিত্তের অধিকারী। সে কখনো ভীরু ও কাপুরুষতার পরিচয় দিবে না। প্রয়োজনে সে ত্যাগ স্বীকার করার জন্যও প্রস্তুত থাকবে।
১০. ইখলাস বা আন্তরিকতা: সকল দাওয়াতি কাজ শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তিগত যশ-খ্যাতি, অর্থ উপার্জন কিংবা দুনিয়াবি স্বার্থচিন্তা থাকবে না।
১১. সবর বা ধৈর্য: দাওয়াতের ফলাফল বিলম্বিত হলেও সে আশা না হারিয়ে অবিচলভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। কেননা ধৈর্য সফলতার চাবিকাঠি।
১২. লেবাস-পোশাক এবং ব্যক্তিত্বে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকা: আল্লাহর প্রতি আহ্বানকারী পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরিধান করবেন, দাওয়াতের মর্যাদার সাথে মানানসই ব্যক্তিত্ব বজায় রাখবেন এবং সম্মানজনকভাবে নিজেকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করবেন।
১৩. জ্ঞানের উপরে ভিত্তি করে দাওয়াত দেওয়া: দাঈর জন্য আবশ্যক হচ্ছে, তিনি যে বিষয়ের দিকে মানুষকে আহ্বান করবেন সেই বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন ও পড়াশোনা করা এবং সমসাময়িক বিষয়াদির দিকে নজর রাখা। জ্ঞান হল, আলো। জ্ঞান হল, শক্তি। জ্ঞান মানুষকে শক্তি এবং সাহসিকতার সাথে পথ চলতে সাহায্য করে। একজন দাঈ এই সকল গুনাবলী অর্জন করে তিনি নিজের জীবনকে দাওয়াতের ময়দানে জীবন্ত উদাহরণে পরিণত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। মহান আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

ফেরেশতাগণের নাম এবং তাঁদের প্রধান দায়িত্বসমূহ

 ফেরেশতাগণ হলেন, আল্লাহ তাআলার অত্যন্ত পুত-পবিত্র এবং সম্মানিত সৃষ্টি। তাঁরা কখনও আল্লাহর আদেশ অমান্য করেন না। কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম ও কাজ জানা যায়। সেগুলো হলো:

❐ ১. প্রধান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ:
১. জিবরিল (আলাইহিস সালাম): তার দায়িত্ব, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নবি-রসুলগণের নিকট ওহি পৌঁছে দেওয়া। তাঁকে “রূহুল কুদস” (পবিত্র আত্মা) বা “রূহুল আমিন” (বিশ্বস্ত আত্মা)ও বলা হয়।
২. মিকাইল (আলাইহিস সালাম): তিনি বৃষ্টি বর্ষণ এবং উদ্ভিদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত।
৩. ইসরাফিল (আলাইহিস সালাম): তিনি শিঙ্গায় (صور) ফুঁক দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত।
প্রথম ফুঁকে সব কিছু ধ্বংস হবে এবং দ্বিতীয় ফুঁকে সবাই জীবিত হয়ে উঠবে।
৪. মালাকুল মউত (আলাইহিস সালাম): তিনি রূহ কবজ (প্রাণ সংহার) করার দায়িত্বে নিয়োজিত।
(দ্রষ্টব্য: কুরআন ও হাদিসে তাঁর নাম ‘আজরাঈল’ হিসেবে আসেনি। বরং ‘মালাকুল মউত’ বা মৃত্যুর ফেরেশতা হিসেবে এসেছে।)
❐ ২. আমল সংরক্ষণ ও হিসাব-নিকাশের ফেরেশতাগণ:
৫. কিরামান কাতিবীন: মানুষের ভালো ও মন্দ সকল আমল লিপিবদ্ধ কারী ফেরেশতা মণ্ডলী।
(ডান পাশের জন নেকি বা সৎ কাজ এবং বাম পাশের জন গুনাহ বা খারাপ কাজ লেখেন)।
৬. হাফাযাহ (সংরক্ষক): বান্দাকে তার ঘুম, জাগরণ ও সকল অবস্থায় রক্ষা করা।
৭. মুনকার ও নাকির (আলাইহিমাস সালাম): কবরে মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা ও তার ইমানের পরীক্ষা নেওয়া।
❐ ৩. জান্নাত ও জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক:
৮. রিদওয়ান (আলাইহিস সালাম): জান্নাতের রক্ষক বা প্রধান তত্ত্বাবধায়ক। (তবে এ নামটি অধিক বিশুদ্ধ মতে প্রমাণিত নয়)
৯. মালিক (আলাইহিস সালাম): জাহান্নামের রক্ষক বা প্রধান তত্ত্বাবধায়ক।
❐ ৪. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব:
১০. আরশ বহনকারী ফেরেশতাগণ: আল্লাহ তাআলার আরশ বহন করার দায়িত্বে নিয়োজিত।
১১. সাইয়াহুন (ভ্রমণকারী) ফেরেশতাগণ: তাঁরা জিকির ও দ্বীনি মজলিসসমূহ খুঁজে বেড়ান এবং তাতে উপস্থিত হন।
১২. দিন ও রাতে পর্যায়ক্রমে দুনিয়ার বুকে আগমনকারী ফেরেশতাগণ: তারা দিনে ও রাতে মানুষের কাছে পালাক্রমে আসেন এবং তাদের আমল আল্লাহর কাছে নিয়ে যান।
আল্লাহ আমাদের সকলকে ফেরেশতাদের ওপর যথাযথভাবে ইমান আনার তৌফিক দিন। আমিন।
সূত্র: ইসলাম ওয়েব
❖❖ প্রশ্ন: জান্নাতের রক্ষক ‘রিদওয়ান’ কি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত?
উত্তর:
জান্নাতের রক্ষকের (খাজিন) নাম, রিদওয়ান (رِضوانُ) বলে ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ। তবে আলেমদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই নামটি কুরআন এবং সহীহ সুন্নাহতে সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়নি।
জান্নাতের রক্ষক ‘রিদওয়ান’ সম্পর্কে আলেমদের অভিমত:
✪ ১. সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: রিদওয়ান কি জান্নাতের রক্ষক? এবং তাঁর নাম কোথায় উল্লেখ হয়েছে?
তারা উত্তরে বলেন,
لمشهورُ عند العُلَماءِ: أنَّ اسمَ خازِنِ الجَنَّةِ رِضْوانُ، وجاء ذِكْرُه في بعضِ الأحاديثِ التي في ثبوتِها نَظَرٌ. واللهُ أعلَمُ
“আলেমদের মাঝে প্রসিদ্ধ হল, জান্নাতের রক্ষকের নাম রিদওয়ান। কিছু হাদিসে এটি উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু সেগুলো প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে পর্যালোচনা করার অবকাশ আছে।। আল্লাহু আলাম-আল্লাহই ভালো জানেন।”
[ফাতাওয়ায়ে লাজনাহ দায়িমা, দ্বিতীয় পর্ব, ২/৩৫৩]
✪ ২. শাইখ ইবনে উসাইমিন ফতোয়া:
বিখ্যাত আলেম শাইখ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে বলেছেন:
أمَّا رِضْوانُ فمُوَكَّلٌ بالجنَّةِ، واسمُه هذا ليس ثابتًا ثبوتًا واضِحًا كثُبوتِ مالِكٍ خازِنِ النَّارِ، لكِنَّه مشهورٌ عند أهلِ العِلمِ بهذا الاسمِ. واللهُ أعلَمُ
“তবে রিদওয়ান জান্নাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত। আর তাঁর এই নামটি জাহান্নামের রক্ষক মালিকের নামের সুস্পষ্ট প্রমাণের মতো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়। তবে এই নামেই তিনি আলেমদের মধ্যে সুপরিচিত। । আল্লাহু আলাম-আল্লাহই ভালো জানেন।”
[মাজমূ’ ফাতাওয়া ওয়ার রাসাইল-শাইখ আল উসাইমিন, ৩/১৬১]
উভয় ফতোয়ার সারমর্ম হলো, ‘রিদওয়ান’ নামটি আলেম সমাজে বহুল পরিচিত ও প্রসিদ্ধ হলেও জাহান্নামের রক্ষক ‘মালিকের’ নামের মতো এর সপক্ষে সহিহ দলিলের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। বরং কিছু হাদিসে এর উল্লেখ পাওয়া যায় যার সত্যতার ভিত্তি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate