ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর:
Saturday, August 30, 2025
যারা নামে মুসলিম কিন্তু কাজে শিরক ও কুফরে নিমজ্জিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তাদের জানাযার নামাজ আদায়ের শরয়ি হুকুম কি
প্রথমত: মুশরিক, কাফির অথবা এমন মুনাফিক, যে গুরুতর আকীদাগত নিফাকের মাধ্যমে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় তার জানাযার নামাজ আদায় করা বৈধ নয়। কারন যদি কারো কুফর বা নিফাক সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ থাকে, তবে তার জানাযা পড়া, মৃত্যুর পর তার জন্য দোয়া করা কিংবা ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ সে আত্মীয় হোক বা অপরিচিত যে-ই হোক না কেন।
আবু ইসহাক আশ-শিরাযী (রহিমাহুল্লাহ) আল-মুহাযযাব-এ বলেন:
” وإن مات كافر لم يصل عليه ، لقوله عز وجل: (وَلا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَداً وَلا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ) التوبة/84، ولأن الصلاة لطلب المغفرة ، والكافر لا يغفر له، فلا معنى للصلاة عليه “
“যদি কোনো কাফের মারা যায়, তবে তার উপর জানাজার নামাজ পড়া যাবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আর (হে মুহাম্মাদ ﷺ) তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তুমি কখনও তার উপর জানাজার নামাজ পড়ো না এবং তার কবরের সামনে দাঁড়াবে না।”(সূরা আত-তাওবা: ৮৪) কেননা জানাজার নামাজের উদ্দেশ্য হলো মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা; আর কাফেরের জন্য আল্লাহ তাআলা ক্ষমা ঘোষণা করেননি। সুতরাং তার জন্য জানাজার নামাজের কোনো প্রয়োজন বা তাৎপর্য নেই।”(আল-মুহায্যাব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৫০)
.
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,فإن الاستغفار للكفار لا يجوز بالكتاب والسنَّة والإجماع “নিশ্চয় কাফিরদের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মত অনুযায়ী নাজায়েয।”(মাজমুঊল ফাতাওয়া; খন্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৪৮৯)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:وَأَجْمَعُوا عَلَى تَحْرِيمِ الصَّلَاةِ عَلَى الْكَافِرِ “তাঁরা সর্বসম্মতভাবে একমত যে, কাফের ব্যক্তির জন্য জানাজার সালাত পড়া হারাম।”(নববী আল-মাজমু’ খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৫৮)
.
মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ,কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ-এ বলা হয়েছে:
” كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّي عَلَى الْمُنَافِقِينَ وَيَسْتَغْفِرُ لَهُمْ، حَتَّى نَزَل قَوْل اللَّهِ تَعَالَى: (اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لاَ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ) . فَلَمْ يَكُنْ يُصَلِّي عَلَيْهِمْ بَعْدَ ذَلِكَ ، وَلاَ يَسْتَغْفِرُ لَهُمْ. وَكَانَ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ صَلَّى عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ الَّذِينَ لاَ يَعْلَمُونَ أَنَّهُ مُنَافِقٌ ، وَمَنْ عُلِمَ أَنَّهُ مُنَافِقٌ لَمْ يُصَل عَلَيْهِ.وَكَانَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ إِذَا مَاتَ مَيِّتٌ لَمْ يُصَل عَلَيْهِ ، حَتَّى يُصَلِّيَ عَلَيْهِ حُذَيْفَةُ ؛ لأِنَّ حُذَيْفَةَ كَانَ قَدْ عَلِمَ أَعْيَانَ الْمُنَافِقِينَ “
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের জানাযার সালাত আদায় করেছিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন যতক্ষণ না নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়,আল্লাহ বলেন,”(হে মুহাম্মাদ) আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করুন একই কথা; আপনি সত্তর বার তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না”।(সূরা তওবা: ৮০) এরপর থেকে আর তাদের জানাযার সালাত আদায় করেননি এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। আর যে সকল মুনাফিকদের ওপর মুসলিমরা জানাযার সালাত আদায় করেছেন মূলত তারা জানতেন না যে সে মুনাফিক। আর যার ব্যাপারে তারা জানতেন যে, সে মুনাফিক, তার জানাযার সালাত আদায় করেননি। কেউ মারা গেলে প্রখ্যাত সাহাবী ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) তার জানাযা পড়াতেন না যতক্ষণ না হুজাইফা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) তার জানাযা পড়তেন, কারণ হুজাইফা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) জানতেন কারা মুনাফিক।”(মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ; খণ্ড: ৪১; পৃষ্ঠা: ২১)
.
আবূ ত্বালিব মৃত্যুবরণ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাঁকে তা করতে নিষেধ করলেন এবং এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন:“নবী এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের পক্ষে এটা মোটেই সমীচীন নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে যদিও তারা আত্মীয়স্বজন হয় যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী (অর্থাৎ তারা কুফরের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে)। আর ইবরাহীম (আলাইহিস্ সালাম)-এর পক্ষ থেকে তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কেবল সেই অঙ্গীকারের কারণে ছিল, যা তিনি তাঁর সাথে করেছিলেন। কিন্তু যখন তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে সে আল্লাহর শত্রু, তখন তিনি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। নিশ্চয়ই ইবরাহীম (আলাইহিস্ সালাম) ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের, আল্লাহর দরবারে বিনয়াভরে কান্নাকাটি করতেন এবং ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল। (সূরা তাওবা ৯: ১১৩-১১৪] এ একই বিধান প্রযোজ্য সেই জাদুকরের ক্ষেত্রেও, যে জাদু করার জন্য জিনদের সাহায্য গ্রহণ করে। সে কাফির, এবং তার জানাযার নামাজ পড়া বৈধ নয়।
.
সৌদি আরবের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ আলুশ শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৬২ হি./১৯৪৩ খ্রি.] বলেছেন, “এটা সুবিদিত যে, কাফিরের জন্য দোয়া করা যাবে না,ক্ষমাপ্রার্থনাও করা যাবে না। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘নাবী ও মুমিনদের জন্য শোভনীয় নয়, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে; যদিও মুশরিকরা তাদের জ্ঞাতিবর্গ হয়ে থাকে।’ (সূরা তাওবা: ১১৩) সুতরাং যে গাইরুল্লাহর ইবাদত করে, আল্লাহর সাথে অন্যের শরিক স্থাপন করে, তার প্রতি আমি রহমতের দোয়া করব না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির বিদ‘আত ‘কাফির সাব্যস্তকারী বিদআত’ নয়, আর তার বিদ‘আত তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়নি, সে একজন পাপী মুসলিম। আমি আল্লাহর কাছে তার জন্য মুক্তি চাইব।” [গৃহীত: আল-আথারি (alathary) ডট নেট]
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে একজন যাদুকরের জানাজার সালাত পড়া এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর মুসলিম কবরস্থানে দাফনের বিধান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি উত্তর দেন:
إذا قتل لا يصلى عليه ، ولا يدفن في مقابر المسلمين ، يدفن في مقابر الكفرة ، ولا يدفن في مقابر المسلمين ، ولا يصلى عليه ، ولا يغسل ولا يكفن
“যদি কোনো ব্যক্তি (যেমন যাদুকর) মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হয়, তবে তার জন্য জানাজার নামাজ পড়া হারাম, এবং তাকে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না। বরং তাকে কাফেরদের কবরস্থানে দাফন করতে হবে, তাকে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না, তার জানাজার নামাজ পড়া অনুমোদিত নয়, এবং তাকে গোসল দেওয়া বা কাফন দেওয়াও বৈধ নয়।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ১১১)
.
দ্বিতীয়ত: একটি বিষয় সবার জানা উচিত যে তাকফিরের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা যাবে না।কারন আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা‘আহ-এর উলামাগণ সর্বসম্মত যে—যে ব্যক্তি এ দু’টি সাক্ষ্য উচ্চারণ করে—“আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই” এবং “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল” তার মূল বা প্রাথমিক হুকুম হলো: সে মুসলিম। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।অতএব, যার ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে সে মুসলিম, স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া তার কাছ থেকে মুসলিম পরিচয় ছিনিয়ে নেওয়া বৈধ নয়। যদি কারও ব্যাপারে সংশয় দেখা দেয়, তবে তার মৌলিক অবস্থা (অর্থাৎ মুসলিম হওয়া)-কেই ভিত্তি ধরা হবে, সন্দেহকে দূর করা হবে, তাকফীর (কাফির বলে রায় দেওয়া) থেকে বিরত থাকতে হবে, এবং বাহ্যিকভাবে মুসলিম পরিচয়ে পরিচিত ব্যক্তির সাথে মুসলিমদের মতো করেই আচরণ করতে হবে।এ কারণেই উলামাগণ সর্বসম্মত হয়েছেন যে, মুসলিমদের দেশে যদি কোনো মৃতদেহ জানাজার নামাজের জন্য পেশ করা হয়, তবে তার জানাজার নামাজ পড়া আবশ্যক। অথচ কিছু লোকের অবস্থান হলো—মুসলিমদের মসজিদে কাউকে জানাজার জন্য আনা হলে তারা তার জানাজা পড়ে না; কেবলমাত্র যাকে ব্যক্তিগতভাবে মুসলিম বলে জানে, তারই জানাজা পড়ে। তাদের এ ধরনের কাজ বিদআত হিসেবে গণ্য।একইভাবে, এ যুগের কিছু বিদআতীরা আরেকটি ভ্রান্ত মত প্রচার করেছে—তাদের মতে, মুসলিমদের জবাই বৈধ নয়, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে যে, জবাইকারী মুসলিম। এমনকি, “মুহাম্মাদ” নামের কেউ পশু জবাই করলেও তারা সেই মাংস খায় না, যতক্ষণ না যাচাই করে নিতে পারে যে, সে প্রকৃতপক্ষে মুসলিম।কারণ, তাদের নিকট মৌলিক অবস্থা হলো—সন্দেহ। বিধানগত বিচারে তাদের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তির ইসলাম নিয়ে সন্দেহ করা মানে তাকে কাফির গণ্য করে ফেলা! আর এটি হলো বিদআত ও বিভ্রান্তি। এ ধরনের চিন্তাধারা মানুষকে শুধু অকল্যাণ ও ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দেয়।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইমাম নববী, শরহু মুসলিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৪৮-১৪৯; রাওদাতুত ত্বালিবীন, খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৮২; ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ঈমান, পৃষ্ঠা: ২৮৩, ৩২৪; জামিউল-মাসায়িল, পৃষ্ঠা: ২০১)
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মানহাজ বর্ণনা করে বলেছেন:
وَلَيْسَ لِأَحَدِ أَنْ يُكَفِّرَ أَحَدًا مِنْ الْمُسْلِمِينَ وَإِنْ أَخْطَأَ وَغَلِطَ حَتَّى تُقَامَ عَلَيْهِ الْحُجَّةُ وَتُبَيَّنَ لَهُ الْمَحَجَّةُ وَمَنْ ثَبَتَ إِسْلَامُهُ بِيَقِينِ لَمْ يُزَلْ ذَلِكَ عَنْهُ بِالشَّكْ؛ بَلْ لَا يَزُولُ إِلَّا بَعْدَ إِقَامَةِ الْحُجَّةِ وَإِزَالَةِ الشَّبْهَةِ».
“মুসলিমদের কেউ ভুল ও ত্রুটি করলেও তাকে কাফির আখ্যা দেওয়া কারও জন্য বৈধ নয়, যতক্ষণ না তার বিরুদ্ধে হুজ্জাহ (দলিল) প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এবং দলিল স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে। যে ব্যক্তি সুনিশ্চিতভাবে মুসলিম সাব্যস্ত হয়েছে, সন্দেহ-সংশয়ের ভিত্তিতে তার থেকে এই পরিচয় অপসারণ করা যাবে না। বরং দলিলপ্রতিষ্ঠা ও সংশয়-দূরীকরণ না করা হলে উক্ত পরিচয় তার থেকে অপসৃত হবে না।”(মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৪৬৬) তিনি আরও বলেছেন,
وَمَنْ ثَبَتَ إِيمَانُهُ بِيَقِينِ لَمْ يُزَلْ ذَلِكَ عَنْهُ بِالشَّكُ».
“যে ব্যক্তি সুনিশ্চিতভাবে মুমিন সাব্যস্ত হয়েছে, সন্দেহ-সংশয়ের ভিত্তিতে তার থেকে এই পরিচয় অপসারণ করা যাবে না।”(মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১২,পৃষ্ঠা: ৫০১)
ইমাম ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন:وَهَذَا أَصْلٌ مُسْتَعْمَلْ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنْ لَا تَزُولَ عَنْ أَصْلٍ أَنْتَ عَلَيْهِ إِلَّا بِيَقِينِ مِثْلِهِ وَأَنْ لَا يترك اليقين بِالشَّكْ”উলামাগণের নিকটে এটি একটি সুব্যবহৃত মূলনীতি যে, আপনি যেই মৌলিক অবস্থার ওপরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন, অনুরূপ সুনিশ্চিত বিষয় ব্যতিরেকে আপনি উক্ত মৌলিক অবস্থা থেকে অপসৃত হয়ে যাবেন না; আর সন্দেহ-সংশয়ের দরুন সুনিশ্চিত বিষয়কে পরিত্যাগ করা যাবে না।”(আত-তামহিদ খন্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ৩৩৯-৩৪০) তিনি রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেছেন:وَمِنْ جِهَةِ النَّظَرِ الصَّحِيحِ الَّذِي لَا مِدْفَعَ لَهُ أَنْ كُلَّ مَنْ ثَبَتَ لَهُ عَقْدُ الْإِسْلَامَ فِي وَقْتِ بِإِجْمَاعِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ثُمَّ أَذْنَبَ ذَنْبًا أَوْ تَأَوَّلَ تَأْوِيلًا فَاخْتَلَفُوا بَعْدُ فِي خُرُوجِهِ مِنَ الْإِسْلَامِ لَمْ يَكُنْ لِاخْتِلَافِهِمْ بَعْدَ إِجْمَاعِهِمْ مَعْنَى يُوجِبُ حُجَّةً وَلَا يُخْرِجُ مِنَ الْإِسْلَامِ الْمُتَّفَقِ عَلَيْهِ إِلَّا بِاتِّفَاقِ آخَرَ أَوْ سُنَّةٍ ثَابِتَةٍ لَا مُعَارِضَ لَهَا “প্রতিহত করা যায় না এমন বিশুদ্ধ গবেষণা বা অভিমত অনুযায়ী মুসলিমদের সর্বসম্মতিক্রমে যে ব্যক্তির মুসলিম পরিচয় সাব্যস্ত হয়ে যায়, এরপর সে কোনো পাপকাজ করে কিংবা কোনো তাবিল তথা ভিন্ন ব্যাখ্যা করে, ফলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে গেছে কিনা তা নিয়ে তারা মতভেদ করে, তাহলে তাদের নিজেদের ইজমা সংঘটিত হয়ে যাওয়ার পরে তাদের দ্বারা সংঘটিত এই মতভেদের এমন কোনো অর্থ নেই, যা কিনা দলিল হওয়াকে আবশ্যক করে (অর্থাৎ উক্ত মতভেদের এমন কোনো অর্থ নেই, যা বিষয়টিকে দলিল হওয়ার যোগ্য করে তোলে)। সর্ববাদিসম্মতিক্রমে সাব্যস্ত মুসলিমকে অনুরূপ সর্ববাদিসম্মত মত কিংবা অপ্রতিরোধ্য প্রমাণিত সুন্নাহ ছাড়া ইসলাম থেকে বের করা যাবে না।”(আত-তামহিদ, খণ্ড: ১৭, পৃষ্ঠা: ২১) কিংবা প্রমাণিত সুন্নাহ মানে: বিশুদ্ধ সুস্পষ্ট দলিল। তিনি (ইবনু আব্দিল বার) উলামাগণের আদর্শকে স্পষ্ট করে আরও বলেছেন,
فَالْوَاجِبُ فِي النَّظَرِ أَنْ لَا يُكَفِّرَ إلَّا مَن اتفق الجميع على تكفيره أوقام عَلَى تَكْفِيرِهِ دَلِيلٌ لَا مِدْفَعَ لَهُ مِنْ كِتَابٍ أَوَسُنَّةٍ”
গবেষণা অনুযায়ী এটি একটি অত্যাবশ্যক বিষয় যে, কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে সবাই একমত না হলে, অথবা কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে কিতাব বা সুন্নাহ থেকে অপ্রতিরোধ্য দলিল প্রতিষ্ঠিত না হলে, তাকে কাফির বলা যাবে না।”(আত-তামহিদ খণ্ড;১৭,পৃষ্ঠা:২২)
ইবনু নুজাইম আল-হানাফি তাঁর ‘আল-বাহরুর রায়িক’ গ্রন্থে বলেছেন,وَمَا يَشُكُ أَنَّهُ رِدَّةٌ لَا يَحْكُمُ بِهَا إِذْ الْإِسْلَامُ الثَّابِتُ لَا يَزُولُ بِشَكٍّ”কোনো বিষয় ‘রিদ্দাহ (মুরতাদ কাফির হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়)’ কিনা এমন সন্দেহ হলে, সেটাকে রিদ্দাহ বলে হুকুম দেওয়া যাবে না। কেননা সন্দেহ-সংশয়ের দরুন কারও সাব্যস্ত মুসলিম পরিচয় বিলীন হয়ে যায় না।”(আল-বাহরুর রায়িক খষ্ঠা: ৫, পৃষ্ঠা: ১৩৪)
এ বিষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো এই হাদিস- উসামাহ ইবনু যায়িদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমরা প্রত্যুষে গোত্রটির উপর আক্রমণ করি এবং তাদেরকে পরাজিত করি। এ সময়ে আনসারদের এক ব্যক্তি ও আমি তাদের (হুরকাদের) একজনের পিছু ধাওয়া করলাম। আমরা যখন তাকে ঘিরে ফেললাম তখন সে বলে উঠল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। এ বাক্য শুনে আনসারী তার অস্ত্র সামনে নিলেন। কিন্তু আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। আমরা মদিনায় ফিরার পর এ সংবাদ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত পৌঁছালে তিনি বললেন, হে উসামাহ! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ? আমি বললাম, সে তো জান বাঁচানোর জন্য কালিমা পড়েছিল। এর পরেও তিনি এ কথাটি ‘হে উসামাহ! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ’ বারবার বলতে থাকলেন। এতে আমার মন চাছিল যে, হায়, যদি সেই দিনটির পূর্বে আমি ইসলামই গ্রহণ না করতাম!(সহীহ বুখারী হা/৬৮৭২; মুসলিম ১/৪১, হাঃ ৯৬, আহমাদ ২১৮০৪] (আ.প্র. ৩৯৩৬, ই.ফা. ৩৯৪০) এই হাদীসে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠকারী ব্যক্তিকেও হত্যা করার ফলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত ব্যথিত হন। তাই উসামা (রাঃ) চরম অনুতপ্ত হয়ে এ কথা বলেছিলেন। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, ঐদিনের পর ইসলাম গ্রহণ করলে এত বড় কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো না আর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও এত কষ্ট পেতেন না।
.
পাশাপাশি কোনো মুসলিমের মধ্যে যদি মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, তবুও তাকে কাফের বলা যাবে না; কারণ মুনাফিকির দুই প্রকার আছে— বড় (ই‘তিকাদী) মুনাফিকি ও ছোট (আমলী) মুনাফিকি।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
” النفاق نوعان: نفاق اعتقادي، ونفاق عملي، فالنفاق الاعتقادي محله القلب ، ولا يعلم به إلا الله، ولهذا بعض الصحابة الذين حصل منهم المخالفة، فقال عمر: إنه نافق، فعارضه الرسول صلى الله عليه وسلم.فالنفاق الاعتقادي محله القلب، ولا يجوز أن يرمي الإنسان به أحداً من المسلمين، وأهل الولاء لله ورسوله إلا ببينة واضحة.والنفاق العملي: أن يأتي الإنسان خصلة من خصال المنافقين، فلا بأس أن تقول: هذا منافق لهذا الفعل، فإذا رأينا الرجل يحدث ويكذب؛ قلنا: هذا منافق نفاقاً عملياً في هذه المسألة، وإذا رأيناه قام إلى الصلاة وهو كسلان؛ نقول: هذا فيه خصلة من خصال المنافقين؛ لأنه أشبه بالمنافقين في قيامه إلى الصلاة على وجه الكسل، فالنفاق العملي واسع؛ فكل من وافق المنافقين في خصلة من خصالهم ، فإنه منافق في هذا العمل خاصة، وكما قال الرسول صلى الله عليه وسلم: (آية المنافق ثلاث: إذا حدث كذب، وإذا وعد أخلف، وإذا اؤتمن خان) .هذه علامة المنافق، لكن هذه العلامات قد يقوم بها أناس من المسلمين؛ فنقول: هو منافق في هذه المسألة
মুনাফিকি দুই প্রকার:
১. আকীদাগত (বিশ্বাসের) মুনাফিকি,
২. আমলগত (কর্মের) মুনাফিকি,
প্রথমত: আকীদাগত মুনাফিকি: এটি অন্তরের সাথে সম্পর্কিত, এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তা জানে না। এজন্যই যখন এক সাহাবী কোনো ভুল করেছিলেন এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছিলেন: “সে একজন মুনাফিক”, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর এই কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন।অতএব, কোনো মুসলিম যে প্রকাশ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য প্রদর্শন করে—তার উপর স্পষ্ট প্রমাণ ব্যতীত আক্বীদাগত মুনাফিকির অভিযোগ আনা কখনো বৈধ নয়।
দ্বিতীয়ত: আমলগত মুনাফিকি কোনো ব্যক্তি যদি মুনাফিকদের কোনো বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটায়, তবে সে কর্মের দিক থেকে মুনাফিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যেমন, আমরা যদি কাউকে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলতে দেখি, তাহলে বলা যায়: “সে কাজে মুনাফিকি করছে”।আবার,আমরা যদি কাউকে অলসভাবে সালাতে দাঁড়াতে দেখি, তাহলে বলা যায়: “তার মধ্যে মুনাফিকদের একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে; কারণ সে মুনাফিকদের মতো অলসভাবে নামাজে দাঁড়িয়েছে। আমলগত মুনাফিকির ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। তাই যে ব্যক্তি মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্যের কোনো একটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, তাকে সুনির্দিষ্টভাবে ওই কাজের কারণে মুনাফিক বলা যায়। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “মুনাফিকের তিনটি লক্ষণ রয়েছে: (১) যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা বলে ।(২) যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তখন তা ভঙ্গ করে। (৩) আর যখন তার উপর আমানত রাখা হয় তখন সে খিয়ানত করে।”এগুলো মুনাফিকদের লক্ষণ। তবে এই বৈশিষ্ট্যগুলো যেকোনো মুসলিমের মধ্যেও দেখা যেতে পারে। সুতরাং আমরা বলব, যে ব্যক্তি এ বৈশিষ্ট্যের কোনো একটি প্রদর্শন করেছে—সে শুধু ওই দিকেই মুনাফিক,পূর্ণাঙ্গ অর্থে নয়।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৩২/২১)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
সুরা ফাতিহা ও সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের বিশাল মর্যাদা এবং এ সংক্রান্ত হাদিসটির সঠিক ব্যাখ্যা
প্রশ্ন: সুরা ফাতিহা ও সুরা বাকারার শেষ ২ আয়াত পড়ে যে কোন দু’আ করলে তা কবুল হয়-এ কথাটি কতটুকু সঠিক?
ফেসবুকে এমন একটা পোস্ট দেখা যাচ্ছে যেখানে বলা এভাবে বলা হয়েছে: দুআ কবুল হচ্ছে না? তাহলে সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে দুআ করুন আল্লাহ তা’য়ালার কাছে আপনি যা কিছু প্রার্থনা করবেন তা প্রদান করা হবে ইনশাআল্লাহ।” এটা কতটুকু সত্য? দয়া করে জানাবেন ইনশাআল্লাহ।
উত্তর: এখানে হাদিসটির যেভাবে অর্থ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। নিম্নে মূল হাদিসটি এবং তার সঠিক অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হল। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
❑ মূল হাদিসটি নিম্নরূপ:
সহিহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন:
بَيْنَمَا جِبْرِيلُ قَاعِدٌ عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، سَمِعَ نَقِيضًا مِنْ فَوْقِهِ، فَرَفَعَ رَأْسَهُ فَقَالَ: هَذَا بَابٌ مِنَ السَّمَاءِ فُتِحَ الْيَوْمَ لَمْ يُفْتَحْ قَطُّ إِلَّا الْيَوْمَ، فَنَزَلَ مِنْهُ مَلَكٌ، فَقَالَ: هَذَا مَلَكٌ نَزَلَ إِلَى الأَرْضِ لَمْ يَنْزِلْ قَطُّ إِلَّا الْيَوْمَ، فَسَلَّمَ وَقَالَ: أَبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤْتَهُمَا نَبِيٌّ قَبْلَكَ: فَاتِحَةُ الْكِتَابِ وَخَوَاتِيمُ سُورَةِ الْبَقَرَةِ، لَنْ تَقْرَأَ بِحَرْفٍ مِنْهُمَا إِلَّا أُعْطِيتَهُ
“একদা জিবরিল আলাইহিস সালাম রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বসা ছিলেন। হঠাৎ তিনি ওপর থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি মাথা তুলে বললেন, ‘এটা আকাশের একটি দরজা যা আজই খোলা হল। এর আগে আর কখনো খোলা হয়নি।”
ওই দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা নিচে নেমে এলেন। তখন জিবরিল আলাইহিস সালাম বললেন, “এই ফেরেশতা আজই প্রথম পৃথিবীতে এলেন। এর আগে তিনি কখনো আসেননি।” উক্ত ফেরেশতা সালাম দিয়ে বললেন, “আপনি দুটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন যা আপনার আগে কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি। এর একটি হল সূরা ফাতিহা এবং অন্যটি হল, সূরা বাকারা-এর শেষাংশ। এই দুটি থেকে আপনি যা-ই তেলাওয়াত করবেন তার প্রতিটি হরফ পাঠ করলে আপনাকে তা দেওয়া হবে।” [সহিহ মুসলিম]
❑ “…তার প্রতিটি হরফ পাঠ করলে আপনাকে তা দেওয়া হবে।’” কথাটির ব্যাখ্যায় বিজ্ঞ আলেমদের মতামত:
হাদিসের এই অংশটির ব্যাখ্যায় উলামাগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নিচে সম্মানিত আলেমদের মত তুলে ধরা হল:
✪ সিন্দি তার তাঁর সুনানে নাসাঈ-এর ওপর লেখা টীকায় (হাশিয়ায়ে সিন্দি) বলেন:
أي مما فيه من الدعاء إلا أعطيته أي أعطيت مقتضاه
“এর অর্থ হল, এই আয়াতগুলোর মধ্যে যে দুআগুলো রয়েছে তা পড়লে আপনাকে সেই দুআর ফল দেওয়া হবে।”
✪ মোল্লা আলি কারী মিশকাতুল মাসাবিহ গ্রন্থের ব্যাখ্যা ‘মিরকাতুল মাফাতিহ’ গ্রন্থে বলেন:
أي أعطيت ما اشتملت عليه تلك الجملة من المسألة كقوله: اهدنا الصراط المستقيم ـ وكقوله: غفرانك ربنا ـ ونظائر ذلك، وفي غير المسألة فيما هو حمد وثناء أعطيت ثوابه.
“এর মানে হল, এই বাক্যগুলোর মধ্যে যে প্রার্থনা রয়েছে, তা আপনাকে দেওয়া হবে। যেমন: اهدنا الصراط المستقيم ‘আমাদেরকে সরল পথ দেখান’ এবং غفرانك ربنا ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের ক্ষমা করুন’—এর মতো অন্যান্য দুআ। আর যেখানে কোনও দুআ নেই বরং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান রয়েছে সেখানে তার সওয়াব বা প্রতিদান দেওয়া হবে।”
✪ ইবনুল আল্লান তাঁর ‘দালিলুল ফালিহিন শারহু রিয়াদিস সালিহিন’ গ্রন্থে বলেছেন:
والمراد ثوابه الأعظم من ثواب نظيره في غير هذين، أو المراد بالحرف معناه اللغوي وهو الطرف، وكنى به كل جملة مستقلة بنفسها: أي أعطيت ما تضمنته إن كانت دعائية ـ كاهدنا ـ وغفرانك ـ الآيتين، وثوابهما إن لم يتضمن ذلك كالمشتملة على الثناء والتمجيد.
“এর উদ্দেশ্য হল, এই দুটি সূরার সওয়াব অন্য সূরার তুলনায় অনেক বেশি। অথবা ‘হরফ’ বলতে প্রতিটি স্বতন্ত্র বাক্যকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ আয়াতগুলোতে যদি দুআ থাকে (যেমন: اهدنا ‘আমাদেরকে সরল পথ দেখান’ এবং وغفرانك ”হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার ক্ষমা চাই”) তাহলে আপনি যা চেয়েছেন তা আপনাকে দেওয়া হবে। আর যদি তাতে আল্লাহর প্রশংসা বা মহিমা থাকে তবে তার সওয়াব দেওয়া হবে।” [সোর্স: ইসলাম ওয়েব]
❑ সারসংক্ষেপ: হাদিসের এই অংশের মূল মর্মার্থ হল, আল্লাহ তাআলা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন দুটি বিশেষ অনুগ্রহ দান করেছেন, যা তাঁর আগে আর কোনও নবীকে দেওয়া হয়নি। এই দুটি অনুগ্রহ হল সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারা-এর শেষাংশ।
যখন কোনও মুসলিম এই সূরাটি ও আয়াতদ্বয় পাঠ করে তখন আল্লাহ তাকে বিশেষ প্রতিদান দেন। এই প্রতিদান দুই ধরনের:
◆ ১. আয়াতের মধ্যে যে সব দুআ রয়েছে, (যেমন: ”আমাদেরকে সরল পথ দেখান”, আমাদেরকে ক্ষমা করুন ইত্যাদি) আল্লাহ সেগুলো কবুল করেন। (যে কোনও দুআ কবুল করা হয় মর্মে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি সঠিক নয়।)
◆ ২. উক্ত সূরা ও আয়াতদ্বয়ে আল্লাহর যেসব প্রশংসা ও গুণগান আছে সেগুলোর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা অন্যান্য সূরার তুলনায় অনেক বেশি সওয়াব বা প্রতিদান দান করেন। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মর্যাদাপূর্ণ সহজ আমলটি বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
ইসলামে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে শোয়ার বিধান
ইসলামে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে শোয়ার বিধান (লজ্জাস্থান প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে জায়েজ। অন্যথায় নয়)
প্রশ্ন: জাযাকুমুল্লাহু খাইরান। (আল্লাহ আপনাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন)। আমি একটি হাদিস সম্পর্কে বারবার শুনেছি। কিন্তু এর পুরোটা কখনোই জানা হয়নি। হাদিসটির সারমর্ম হলো, শোয়া বা বসার সময় এক পায়ের ওপর অন্য পা রাখা নিষেধ। আমি এই হাদিসের কিছু অংশ ইসলামিক রেডিও চ্যানেল, যেমন: সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেডিওতে শুনেছি। অনুগ্রহ করে এ বিষয়ে আমাকে বিস্তারিত জানাবেন। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর: সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের ওপর। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস থেকে প্রমাণিত যে, আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মসজিদে এমন অবস্থায় দেখা গেছে যে, তিনি শুয়ে আছেন এবং এক পায়ের ওপর অন্য পা রেখেছেন। যেমনটি উবাদ বিন তামিমের তার চাচার সূত্রে বর্ণিত হাদিসে এসেছে।
তিনি বলেন:
”رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم في المسجد واضعا إحدى رجليه على الأخرى.”
“আমি আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মসজিদে এক পা অন্য পায়ের ওপর রাখা অবস্থায় (শুয়ে থাকতে) দেখেছি।” [বুখারি ও মুসলিম] আবার সহিহ মুসলিমের অন্য একটি হাদিসে এক পা অন্য পায়ের ওপর রেখে চিৎ হয়ে শোয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যেমন:
জাবের (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে আছে:
”أن رسول الله صلى الله عليه وسلم نهى عن اشتمال الصماء وأن يرفع الرجل إحدى رجليه على الأخرى وهو مستلق على ظهره.”
“আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ইশতিমালুস সাম্মা’ (এমনভাবে কাপড় পরা যাতে হাত বের করার কোনও সুযোগ থাকে না) এবং এক পা অন্য পায়ের ওপর রেখে চিত হয়ে শোয়া থেকে নিষেধ করেছেন।”
বিজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন, যে হাদিসগুলোতে এই ধরনের শোয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা এমন অবস্থার জন্য প্রযোজ্য, যেখানে সতর বা লজ্জাস্থান প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে অবস্থায় এটি করেছেন তাতে তার কোনও অংশই প্রকাশ পায়নি। তাই এই অবস্থায় এমনভাবে শোয়া বা বসা জায়েজ এবং এতে কোনও সমস্যা নেই।
– সহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার নওয়াবি রহ. এ সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন:
“قال العلماء: أحاديث النهي عن الاستلقاء رافعا إحدى رجليه على الأخرى، محمولة على حالة تظهر فيها العورة أو شيء منها، وأما فعله صلى الله عليه وسلم فكان على وجه لا يظهر منها شيء، وهذا لا بأس به ولا كراهة فيه على هذه الصفة.”
” আলেমগণ বলেছেন, যে হাদিসগুলোতে এক পায়ের উপর অন্য পা রেখে চিত হয়ে শোয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা এমন অবস্থার জন্য প্রযোজ্য যখন সতর বা গোপনাঙ্গ প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে অবস্থায় তা করেছেন তাতে তার কোনও অংশই প্রকাশ পায়নি। এই অবস্থায় এমনভাবে শোয়া বা বসা জায়েজ এবং এতে কোনও সমস্যা নেই।”
✪ হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.):
হাফিজ ইবনে হাজার রহ. ইমাম খাত্তাবি (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন:
قال الخطابي: إن النهي الوارد عن ذلك (الاستلقاء مع وضع الرجل على الأخرى) منسوخ، أو يحمل النهي حيث يخشى أن تبدو العورة والجواز حيث يؤمن ذلك، قلت (الحافظ) الثاني أولى من النسخ… انتهى.”
“খাত্তাবি (রহ.) বলেছেন, এ ব্যাপারে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা হয় রহিত হয়ে গেছে। অথবা এই নিষেধাজ্ঞা তখন প্রযোজ্য যখন সতর প্রকাশ পাওয়ার ভয় থাকে। আর তা তখনই জায়েজ যখন এই ধরনের কোনও আশঙ্কা থাকে না।”
– হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.) বলেন: “আমার মতে, দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি (যেখানে সতর প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কার সাথে নিষেধাজ্ঞা জড়িত) রহিত হওয়ার মতের চেয়ে বেশি সঠিক।”
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
[ইসলাম ওয়েব]
✪ ইমাম নওয়াবি রচিত বিখ্যাত রিয়াদুস সালেহীন কিতাবের একটি অধ্যায় হল:
باب جواز الاستلقاء عَلَى القفا ووضع إحدى الرِّجلين عَلَى الأخرى إِذَا لم يَخف انكشاف العورة
“অধ্যায়: চিৎ হয়ে শুয়ে এক পায়ের উপর অন্য পা রাখার বৈধতা, যদি সতর (লজ্জাস্থান) উন্মুক্ত হওয়ার ভয় না থাকে।”
অতঃপর তিনি পূর্বোক্ত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মসজিদে এক পায়ের উপরে আরেক পা উঠিয়ে শোয়ার হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।
❑ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.:
উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায বলেন, “একজন মানুষের জন্য মসজিদ, বাড়ি বা অন্য যেকোনো উপযুক্ত স্থানে চিৎ হয়ে শোয়ায় কোনও সমস্যা নেই। যদি সতর (লজ্জাস্থান) সুরক্ষিত থাকে, তাহলে এক পায়ের উপর অন্য পা রাখাও জায়েজ। যেসব হাদিসে এই কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে সেগুলোকে এমন পরিস্থিতির জন্য ধরা হয়, যেখানে সতর (লজ্জাস্থান) সুরক্ষিত থাকে না। যদি সতর ঢাকা থাকে তাহলে চিৎ হয়ে শোয়া এবং এক পায়ের উপর অন্য পা রাখায় কোনও ক্ষতি নেই। কারণ মানুষ এই ভঙ্গিতে আরাম অনুভব করতে পারে। তাই এতে কোনও অসুবিধা নেই।” [উৎস: binbaz]
মোটকথা, একজন মানুষ মসজিদে কিংবা নিজ গৃহে লুঙ্গি বা এই জাতীয় কাপড় পরিধান করে আরামের জন্য চিত হয়ে এক পায়ের উপরে আরেক পা তুলে শুয়ে থাকতে পারে। শরিয়তে দৃষ্টিতে নাজায়েজ নয়। তবে সতর্ক থাকতে হবে যেন, লুঙ্গি সরে গিয়ে লজ্জাস্থান প্রকাশিত না হয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামানায় সাধারণত মানুষ লুঙ্গি পরিধান করতেন। সে কারণে নবী আল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তবে লুঙ্গির ভেতরে আন্ডার ওয়ার থাকলে কিংবা পায়জামা পরিহিত অবস্থায় এভাবে শোয়াতে লজ্জাস্থান প্রকাশিত হওয়ার কোন আশঙ্কা থাকে না। সে ক্ষেত্রেও তা বৈধ।
❑ শিক্ষা:
একজন সচেতন মুসলিম সর্বদা ইসলামি শিষ্টাচার রক্ষা করে সতর্কতার সাথে জীবন যাপন করবে এবং তার নিজের ইজ্জতের হেফাজত করবে। এমনভাবে শোবে না বা বসবে না যাতে তার গোপনাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে যায়। এটি একজন সুস্থ রুচি সম্পন্ন এবং সভ্য মানুষের বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদও গ্রন্থনা:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
ইসলাম এবং মৌলবাদ একটি ভুল ধারণার অপনোদন
প্রশ্ন: মৌলবাদী কাদেরকে বলা হয়? আমরা নিজেদেরকে ‘মৌলবাদী মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে গর্ববোধ করতে পারি কি? দয়া করে জানাবেন ইনশাআল্লাহ।
উত্তর: প্রশ্নের আলোকে মৌলবাদ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:
❑ মৌলবাদ কী?
মৌলবাদ (Fundamentalism) হলো, একটি মতাদর্শ যেখানে কোনও (মানব রচিত বা বিকৃত) ধর্ম, বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতবাদের আদি বা মূল নীতিগুলোকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরা হয়। এই মতাদর্শীরা সাধারণত নিজেদের বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য মনে করে এবং তা জোর করে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে চরম পন্থা গ্রহণে, এমনকি রক্তের বন্য বইয়ে দিতে পিছুপা হয় না।
❑ মৌলবাদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো:
১. আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বিরোধিতা: মৌলবাদীরা প্রায়শই নতুন জ্ঞান, বিজ্ঞান বা যুক্তিবাদী চিন্তাধারার বিরোধিতা করে।
২. নিজ বিশ্বাসে প্রচণ্ড গোঁড়ামি: তারা নিজেদের বিশ্বাসে এতটাই অবিচল থাকে যে, অন্য কোনও দৃষ্টিভঙ্গি বা মতকে গ্রহণ করতে চায় না।
৩. হিংস্রতা ও উগ্রতার আশ্রয়: নিজ বিশ্বাস ও ধারণাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে তারা কখনো কখনো হিংস্রতা বা উগ্রতার আশ্রয় নেয়।
সুতরাং এই অর্থে মৌলবাদ অবশ্যই নিন্দনীয়।
❑ মৌলবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: খ্রিস্টধর্মের সাথে সম্পর্ক।
ঐতিহাসিকভাবে, মৌলবাদ শব্দটি খ্রিস্টধর্মের সাথে প্রাথমিকভাবে সম্পর্কিত। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪৫৩ সালে তুর্কিরা গ্রিক-রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল দখলের পর ইউরোপে রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়। গ্রিক পণ্ডিতরা ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাবে আলোকিত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েন এবং এর ফলেই পাশ্চাত্যে বিজ্ঞানমনস্ক এক নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। এই জাগরণের যারা বিরোধিতা করেছিল, যারা বিজ্ঞান বিরোধী অন্ধ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল, তাদেরকেই তখন “মৌলবাদী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সে সময় পাদ্রিদের দেওয়া আজগুবি ও বিজ্ঞান বিরোধী বক্তব্য প্রকট হয়ে ধরা পড়তো। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওদের মতো বহু বিজ্ঞানীকে এই বিজ্ঞান বিরোধী মৌলবাদীদের হাতে শাস্তি পেতে হয়েছে। এরাই তখন বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতদের কাছে “Fundamentalism” এর ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে মৌলবাদ কেবল ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস (যেমন: ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ইত্যাদি), রাজনৈতিক মতবাদ (যেমন: Communism বা সমাজতন্ত্র, Secularism বা ধর্মনিরপেক্ষতা, Nationalism বা জাতীয়তাবাদ, Racism বা বর্ণবাদ ইত্যাদি) এবং অন্যান্য আদর্শিক ক্ষেত্রেও দেখা যেতে পারে।
❑ ইসলাম ও মৌলবাদ: একটি ভুল ধারণা।
বর্তমানে যারা প্রকৃত ইসলামকে দৃঢ়ভাবে মেনে চলেন, তাদেরকে অনেকে “মৌলবাদী” বলে আখ্যায়িত করে থাকে, যা সম্পূর্ণ ভুল। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের সাথে মৌলবাদের কোনও সম্পর্ক নেই। প্রকৃত মুসলিম বা কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী কখনো মৌলবাদী হতে পারে না।
কারণ- ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, সচল, উদার এবং আধুনিক জীবন বিধান। এটি মহান স্রষ্টা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত একটি মহান দ্বীন (জীবনাদর্শ) এবং মানব জীবনের সকল সমস্যার সমাধান এতে বিদ্যমান। ইসলাম সর্বকালে পৃথিবীর সকল জাতি-গোষ্ঠীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য এবং এটি মানুষের ইচ্ছামতো পরিবর্তন-পরিবর্ধন গ্রহণ করে না।
✪ ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শের মূল ভিত্তিগুলো মৌলবাদের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক:
১. জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহ: ইসলাম আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে সর্বদা উৎসাহিত করে। এখানে মূর্খতা ও অজ্ঞতা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
২. উদার দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলাম অন্য ধর্ম ও আদর্শের ব্যাপারে উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। ইসলামে জোর করে কারো ওপর ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ।
৩. অমুসলিমদের অধিকার: ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা (কিছু শর্ত সাপেক্ষে) স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের সুবিধা পায়।
৪. উগ্রতা ও সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতা: যারা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জিহাদের নামে অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করে বা নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করে, ইসলাম তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর। খারেজি সম্প্রদায়ের কার্যক্রম এর একটি উদাহরণ।
৫. ক্ষমা ও সহনশীলতা: ইসলাম প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমার নীতিকে উৎসাহিত করে।
৬. সামাজিক সহাবস্থান: ইসলাম সমাজের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক সহাবস্থানে উৎসাহিত করে। পরিবার, সমাজ থেকে পালিয়ে বৈরাগ্য বাদ গ্রহণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
৭. মানবিক জীবন ব্যবস্থা: ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (প্রাইভেসি), প্রয়োজন এবং জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দিয়েছে। বিয়ে-শাদি, খাদ্য-পানীয়, পোশাক, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চমৎকার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
৮. উগ্রতা ও নির্মমতার নিন্দা: ইসলামে উগ্রতা, কঠোরতা, নির্মমতা, প্রতিহিংসা ইত্যাদি অত্যন্ত নিন্দনীয়।
৯. কুসংস্কার বর্জন: ইসলাম জ্ঞান-প্রজ্ঞা, যুক্তি ইত্যাদিকে মূল্যায়ন করে এবং কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত অন্ধ বিশ্বাসকে পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
১০. মানবতা ও পরোপকার: ইসলাম পরোপকার, অসহায় মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, মানবিক কাজ ইত্যাদিকে অত্যন্ত মহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে আখ্যা দেয়।
১১. যুদ্ধের মানবিক বিধান: ইসলাম যুদ্ধের ক্ষেত্রেও মানবিক বিধান দিয়েছে। যুদ্ধরত নয় এমন বৃদ্ধ, নারী ও শিশুকে হত্যা না করা, ফসল ও ফলের গাছ নষ্ট না করা, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ইত্যাদির ক্ষতি সাধন না করা ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত।
মোটকথা, ইসলাম মৌলবাদী ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা প্রকৃত ইসলাম পালন মানুষকে আরও মানবিক, উদার, সৃজনশীল, সভ্য, শালীন এবং উন্নত করে তোলে। এবং ইসলামের নামে বাড়াবাড়ি, সীমা লঙ্ঘন এবং অজ্ঞতা সুলভ কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
Tuesday, August 19, 2025
আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে কেবল সম্মান প্রদর্শনের জন্য সিজদা করা কি শিরক হিসেবে গণ্য হবে
প্রশ্ন: আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে যেমন কবরের উপর, পীরকে, শিক্ষককে, অথবা কেবল সম্মান প্রদর্শনের জন্য কাউকে সিজদা করা কি শিরক হিসেবে গণ্য হবে?
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর;আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে সিজদা করা শিরক হবে কিনা বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষে। আমরা বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে আলোচনার মাধ্যমে উদঘাটন করার চেষ্টা করব।
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তাভাবনা করলে রুকু-সিজদা প্রধানত দুই প্রকার:
.
প্রথমত: সিজদায়ে ইবাদত (عبادة السجود):এটি হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সামনে সর্বোচ্চ বিনয়, পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও ইবাদতের নিয়তে করা সিজদা। এই সিজদা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই বৈধ ও শোভনীয়। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে ইবাদতের নিয়তে সিজদা করবে, সে মহা শিরকের (শিরকে আকবরের) মধ্যে পতিত হবে।
.
দ্বিতীয়ত: সিজদায়ে তাহিয়্যা (التحية السجود): এটি করা হয় সম্মান, সম্ভাষণ বা কারো মর্যাদা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। ইসলামের আগের কিছু শরিয়তে এটি বৈধ ছিল। কিন্তু ইসলাম আগমনের পর একে চূড়ান্তভাবে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে কেবল সম্মানের জন্য সিজদা করে, তবে সে অবশ্যই হারাম কাজ করল, কিন্তু এতে তার ঈমান নষ্ট হবে না এবং সে শিরক বা কুফরে লিপ্ত হবে না।
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:السُّجُودُ عَلَى ضَرْبَيْنِ : سُجُودُ عِبَادَةٍ مَحْضَةٍ ، وَسُجُودُ تَشْرِيفٍ ، فَأَمَّا الْأَوَّلُ فَلَا يَكُونُ إلَّا لِلَّهِ“সিজদা দুই প্রকার: (এক) ইবাদতের সিজদা, এবং (দুই) সম্মানসূচক সিজদা। ইবাদতের সিজদা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬১) তিনি আরও বলেছেন:وَأَجْمَعَ الْمُسْلِمُونَ عَلَى: أَنَّ السُّجُودَ لِغَيْرِ اللَّهِ مُحَرَّمٌ “. ا “মুসলিমগণ সর্বসম্মত যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করা হারাম।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৫৮) তিনি (রাহিমাহুল্লাহ)
আরও বলেছেন:” فإن نصوص السنة ، وإجماع الأمة : تُحرِّم السجودَ لغير الله في شريعتنا ، تحيةً أو عبادةً ، كنهيه لمعاذ بن جبل أن يسجد لما قدمَ من الشام وسجدَ له سجود تحية”.
“হাদিসের স্পষ্ট দলিল এবং সমগ্র উম্মাহর ইজমা প্রমাণ করে যে, আমাদের শরিয়তে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করা সম্পূর্ণরূপে হারাম; তা ইবাদতের উদ্দেশ্যে হোক কিংবা কেবল সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে হোক। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়েমেন সফর থেকে ফেরার পর মু‘আয ইবনু জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁর জন্য সিজদা করা থেকে নিষেধ করেছিলেন; অথচ মু‘আয (রাঃ) তা করেছিলেন কেবল অভিবাদনের সিজদা হিসেবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ, জামিউল মাসায়েল; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৫)
.
ইমাম কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃوَهَذَا السُّجُودُ الْمَنْهِيُّ عَنْهُ : قَدِ اتَّخَذَهُ جُهَّالُ الْمُتَصَوِّفَةِ عَادَةً فِي سَمَاعِهِمْ، وَعِنْدَ دُخُولِهِمْ عَلَى مَشَايِخِهِمْ وَاسْتِغْفَارِهِمْ ، فَيُرَى الْوَاحِدُ مِنْهُمْ إِذَا أَخَذَهُ الْحَالُ ـ بِزَعْمِهِ ـ يَسْجُدُ لِلْأَقْدَامِ ، لِجَهْلِهِ ؛ سَوَاءٌ أَكَانَ لِلْقِبْلَةِ أَمْ غَيْرِهَا ، جَهَالَةً مِنْهُ ، ضَلَّ سَعْيُهُمْ وَخَابَ عَمَلُهُمْ”এই সিজদা, যা আমাদের শরিয়তে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, দুর্ভাগ্যবশত কিছু অজ্ঞ সুফী নিজেদের মধ্যে প্রচলিত করেছে। তারা তাদের ‘সামা‘’ (সঙ্গীতানুষ্ঠান)-এর সময়, অথবা শায়খদের সামনে প্রবেশকালে কিংবা তাদের কাছে ইস্তিগফার প্রার্থনার সময় একে অভ্যাসে পরিণত করেছে। দেখা যায়, তাদের মধ্যে কেউ যখন তথাকথিত ‘হাল’ (আধ্যাত্মিক আবেশ)-এ পড়ে, তখন সে শায়খের পায়ের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে তা সে কাবার দিকেই হোক বা অন্যদিকে। নিঃসন্দেহে এটি তার জাহিলি অজ্ঞতার ফল। তারা অজ্ঞতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে, যার পরিণতিতে তাদের সাধনা ব্যর্থ হলো এবং তাদের কর্ম ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো।”(তাফসির কুরতুবী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৯৪)
.
দ্বিতীয়তঃ যারা বলেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা সর্বাবস্থায় শিরক কারণ সিজদা মূলত ইবাদত, আর তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা যায় না” তাদের এই বক্তব্য দুর্বল। এর খণ্ডনে প্রমাণ হলো:
.
(১).ফেরেশতাদের আদমকে সিজদার নির্দেশ:
.
আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদম (আলাইহিস সালাম) কে সিজদা করার জন্য। যদি সিজদা করা সর্বদাই শিরক হতো, তবে আল্লাহ কখনোই তাদেরকে এমন নির্দেশ দিতেন না। ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:“(فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ) অর্থাৎ—এটি ছিল সম্মান ও মর্যাদার সিজদা,ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয়।”(তাফসীরে তাবারী,খণ্ড;১৪;পৃষ্ঠা;৬৫) ইবনুল আরাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:اتَّفَقَتْ الْأُمَّةُ عَلَى أَنَّ السُّجُودَ لِآدَمَ ، لَمْ يَكُنْ سُجُودَ عِبَادَةٍ“সমগ্র উম্মতের এ ব্যাপারে ঐক্যমত হয়েছে যে, আদমের প্রতি সিজদা ইবাদতের সিজদা ছিল না।”(আহকামুল কুরআন,খণ্ড;১;পৃষ্ঠা;২৭) ইবনে হাযম আয-যাহিরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَلَا خلاف بَين أحد من أهل الْإِسْلَام فِي أَن سجودهم لله تَعَالَى سُجُود عبَادَة ، ولآدم سُجُود تَحِيَّة وإكرام“মুসলিমদের মধ্যে এবিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে,ফেরেশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে সিজদা করেছিলেন ইবাদতের সিজদা হিসেবে, আর আদমের উদ্দেশ্যে করেছিলেন তা ছিল অভিবাদন ও সম্মান প্রদর্শনের সিজদা।”(আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১২৯)
.
(২).ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সন্তানদের ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-কে সিজদা:
.
আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সন্তানরা ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি সিজদা করেছিলেন। যদি সিজদা সর্বাবস্থায় শিরক হতো, তবে আল্লাহর মনোনীত নবীগণ কখনোই তা করতেন না। আর এটাও বলা যাবে না যে, এটি ছিল পূর্ববর্তী শরিয়তের কোনো বিশেষ বিধান; কারণ শিরক তো কোনো যুগের শরিয়তেই বৈধ ছিল না। তাওহীদ সর্বদাই অবিচল ও চিরস্থায়ী আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে শুরু করে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ পর্যন্ত সকল নবীর দাওয়াত ও শরিয়তে তাওহীদ-ই ছিল মূল ভিত্তি।
.
ইমাম তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قَالَ ابْنُ زَيْدٍ فِي قَوْلِهِ: ( وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا): ذَلِكَ السُّجُودُ تَشْرِفَة ، كَمَا سَجَدَتِ الْمَلَائِكَةُ لِآدَمَ تَشْرِفَةً ، لَيْسَ بِسُجُودِ عِبَادَةٍ.وَإِنَّمَا عَنَى مَنْ ذَكَرَ بِقَوْلِهِ: إِنَّ السُّجُودَ كَانَ تَحِيَّةً بَيْنَهُمْ ، أَنَّ ذَلِكَ كَانَ مِنْهُمْ عَلَى الْخُلُقِ ، لَا عَلَى وَجْهِ الْعِبَادَةِ مِنْ بَعْضِهِمْ لِبَعْضٍ ، وَمِمَّا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ لَمْ يَزَلْ مِنْ أَخْلَاقِ النَّاسِ قَدِيمًا ، عَلَى غَيْرِ وَجْهِ الْعِبَادَةِ مِنْ بَعْضِهِمْ لِبَعْضٍ، قَوْلُ أَعْشَى بَنِي ثَعْلَبَةَ:فَلَمَّا أَتَانَا بُعَيْدَ الْكَرَى ** سَجَدْنَا لَهُ وَرَفَعْنَا الْعَمَارَا“ইবনে জায়েদ তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন,এটি ছিল মর্যাদা প্রদর্শনের সিজদা,যেমন ফেরেশতারা আদম (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য সিজদা করেছিল; এটি আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয়। এবং যে ব্যক্তি বলেছেন, ‘এটি ছিল তাদের মধ্যে অভিবাদনের জন্য,তাদের বক্তব্যের অর্থও এই যে, এটি ছিল ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের নিদর্শন, ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয়। এর প্রমাণ হলো, প্রাচীন যুগ থেকে মানুষ এভাবে সিজদার মাধ্যমে পরস্পরকে সম্মান করতো, যা ইবাদতের জন্য নয়। যেমন কবি ‘আশা বানু সা‘লাবাহ’ বলেছেন:“যখন সে আমাদের কাছে নিদ্রার পর এলো, আমরা তাকে সিজদা করলাম এবং উঁচু আসনে বসালাম।”(তাফসীরে তাবারী, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৬)
হাফিয ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَقَدْ كَانَ هَذَا سَائِغًا فِي شَرَائِعِهِمْ ؛ إِذَا سلَّموا عَلَى الْكَبِيرِ يَسْجُدُونَ لَهُ ، وَلَمْ يَزَلْ هَذَا جَائِزًا مِنْ لَدُنْ آدَمَ إِلَى شَرِيعَةِ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ ، فَحُرِّمَ هَذَا فِي هَذِهِ الْمِلَّةِ ، وجُعل السُّجُودُ مُخْتَصًّا بِجَنَابِ الرَّبِّ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى”তাদের শরিয়তে বৈধ ছিল যে, তারা বড়কে সালাম জানাতে সিজদা করতো। এই রীতি আদম (আ.)-এর যুগ থেকে ঈসা (আ.)-এর শরিয়ত পর্যন্ত চলমান ছিল। পরে আমাদের শরিয়তে তা হারাম করা হয়েছে, এবং সিজদাকে একমাত্র মহান রব্বুল আলামীন-এর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।”(তাফসীরুল কুরআনিল আযীম,খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪১২) কাসেমী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “নিঃসন্দেহে এটি ইবাদতের সিজদা বা দাসত্বের সিজদা ছিল না; বরং কেবল সম্মান প্রদর্শনের সিজদা ছিল এ ব্যাপারে কোনো দ্বিধা নেই।”(মাহাসিনুত-তাওয়ীল, ৬/২৫০
.
(৩).মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেছিলেন। যদি এটা শিরক হত, তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতেন, কিন্তু এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ছিল যে তিনি তাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে তাকে সিজদা করা জায়েজ নয়। দলিল হচ্ছে; আব্দুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রা.) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু‘আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত”।(ইবনু মাজাহ হা/১৮৫৩; সিলসিলা সহীহা হা/১২০৩)
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
وَمَعْلُومٌ أَنَّهُ لَمْ يَقُلْ: لَوْ كُنْت آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَعْبُدَ”.
“এটা সর্বজনবিদিত যে তিনি বলেননি: “যদি আমি কাউকে ইবাদত করার আদেশ দিই।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬০)
.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৪৮) বলেন:
أَلا ترى الصحابة في فرط حبهم للنبي صلى الله عليه وسلم ، قالوا ألا نسجد لك ، فقال: لا ، فلو أذن لهم لسجدوا له سجود إجلال وتوقير ، لا سجود عبادة ، كما قد سجد إخوة يوسف عليه السلام ليوسف .وكذلك القول في سجود المسلم لقبر النبي صلى الله عليه وسلم على سبيل التعظيم والتبجيل : لا يكفر به أصلاً ، بل يكون عاصياً ، فليعرَّفْ أن هذا منهي عنه ، وكذلك الصلاة إلى القبر
“তুমি কি দেখো না যে সাহাবাগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন: ‘আমরা কি আপনাকে সিজদা করব না?’ তিনি বললেন, ‘না।’ যদি তিনি অনুমতি দিতেন, তবে তারা তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য সিজদা করত, ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয় যেমন ইউসুফ আলাইহি সালাম-এর ভাইরা ইউসুফকে সিজদা করেছিল। অনুরূপভাবে, সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের প্রতি সিজদা করার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে: এর মাধ্যমে সে কুফরী করে না; বরং সে পাপ করছে। তাই তাকে বলা উচিত যে, এটি জায়েজ নয়। একই নিয়ম প্রযোজ্য কবরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রেও।”(মুজাম আল-শুয়ুখুল কাবীর; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৭৩)
.
(৪).কিছু হাদিসে প্রমাণিত হয়েছে যে কিছু প্রাণী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সিজদা করেছিল। যদি কেবল সিজদা করা শিরক হত, তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে এটি ঘটত না।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
أمَّا الْخُضُوعُ وَالْقُنُوتُ بِالْقُلُوبِ ، وَالِاعْتِرَافُ بِالرُّبُوبِيَّةِ وَالْعُبُودِيَّةِ : فَهَذَا لَا يَكُونُ عَلَى الْإِطْلَاقِ إلَّا لِلَّهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى وَحْدَهُ ، وَهُوَ فِي غَيْرِهِ مُمْتَنِعٌ بَاطِلٌ.وَأَمَّا السُّجُودُ : فَشَرِيعَةٌ مِنْ الشَّرَائِعِ ؛ إذْ أَمَرَنَا اللَّهُ تَعَالَى أَنْ نَسْجُدَ لَهُ ، وَلَوْ أَمَرَنَا أَنْ نَسْجُدَ لِأَحَدٍ مِنْ خَلْقِهِ غَيْرِهِ : لَسَجَدْنَا لِذَلِكَ الْغَيْرِ ، طَاعَةً لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ، إذْ أَحَبَّ أَنْ نُعَظِّمَ مَنْ سَجَدْنَا لَهُ،. وَلَوْ لَمْ يَفْرِضْ عَلَيْنَا السُّجُودَ لَمْ يَجِبْ أَلْبَتَّةَ فِعْلُهُ .فَسُجُودُ الْمَلَائِكَةِ لِآدَمَ : عِبَادَةٌ لِلَّهِ ، وَطَاعَةٌ لَهُ وَقُرْبَةٌ يَتَقَرَّبُونَ بِهَا إلَيْهِ ، وَهُوَ لِآدَمَ تَشْرِيفٌ وَتَكْرِيمٌ وَتَعْظِيمٌ.
وَسُجُودُ إخْوَةِ يُوسُفَ لَهُ : تَحِيَّةٌ وَسَلَامٌ ؛ أَلَا تَرَى أَنَّ يُوسُفَ لَوْ سَجَدَ لِأَبَوَيْهِ تَحِيَّةً ، لَمْ يُكْرَهْ لَهُ”
“অন্তরে বিনয় ও ভক্তি, প্রভুত্ব স্বীকার এবং দাসত্বের স্বীকৃতি—এগুলো কখনো একমাত্র আল্লাহর বাইরে অন্য কারও জন্য হতে পারে না। তিনি মহান এবং মহিমাময়। যদি এটি আল্লাহর ব্যতীত অন্য কারো প্রতি প্রকাশিত হয়, তবে তা নিষিদ্ধ এবং অবৈধ। সিজদার বিষয়টি বিশেষত শারঈ আইন এবং হুকুমের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন কেবল তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা করতে। যদি তিনি আমাদেরকে তাঁর সৃষ্টির অন্য কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতেন, তাহলে আমরা তার আনুগত্যে সেই অন্যকে সিজদা করতাম, কারণ সিজদা হল সম্মান প্রদর্শনের একটি মাধ্যম,এবং যদি তিনি চাইতেন যে আমরা যার প্রতি সিজদা করেছি তাকে সম্মান করি। যদি আল্লাহ সিজদা করার আদেশ না দিতেন, তবে এটি কখনোই বাধ্যতামূলক হতো না। আদম (আ.) কে ফেরেশতাদের দ্বারা সিজদা করা আল্লাহর ইবাদতের অংশ ছিল, তার প্রতি আনুগত্য এবং নৈকট্য লাভের জন্য। এটি আদমের জন্য সম্মান ও শ্রদ্ধার নিদর্শন।ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের তাকে সিজদা করা ছিল কেবল একটি অভিবাদনের রূপ। তুমি কি দেখো না, যদি ইউসুফ তার পিতামাতাকে সালামের মাধ্যমে সিজদা করত, তাহলে তা মাকরুহ (অপছন্দনীয়) হত না।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬০)
.
(৬)। বিভিন্ন মাযহাবের অধিকাংশ আলেমদের মত অনুযায়ী, সিজদা এবং ইবাদতের উদ্দেশ্যে করা সিজদার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফখরুদ্দীন আয-জায়লা’ই (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:وَمَا يَفْعَلُونَ مِنْ تَقْبِيلِ الْأَرْضِ بَيْنَ يَدَيْ الْعُلَمَاءِ : فَحَرَامٌ ، وَالْفَاعِلُ وَالرَّاضِي بِهِ : آثِمَانِ ؛ لِأَنَّهُ يُشْبِهُ عِبَادَةَ الْوَثَنِ .وَذَكَرَ الصَّدْرُ الشَّهِيدُ : أَنَّهُ لَا يَكْفُرُ بِهَذَا السُّجُودِ ؛ لِأَنَّهُ يُرِيدُ بِهِ التَّحِيَّةَ “যা তারা করে থাকে অর্থাৎ আলেমদের সামনে গিয়ে মাটিতে চুমু খাওয়া এটি হারাম। যে এটা করে এবং যে এতে সন্তুষ্ট হয়, উভয়েই গুনাহগার; কারণ এর মধ্যে মূর্তিপূজার সাদৃশ্য রয়েছে।আর সাদরুশ শহীদ উল্লেখ করেছেন: এ ধরনের সিজদার মাধ্যমে সে কাফের হবে না; কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হয় কেবল সম্ভাষণ (অভিবাদন), ইবাদত নয়।”(যাইলায়ী,‘তাবইনুল হাকায়েক; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৫) ইবনে নুজাইম হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَالسُّجُودُ لِلْجَبَابِرَةِ : كُفْرٌ ، إنْ أَرَادَ بِهِ الْعِبَادَةَ ؛ لَا إِنْ أَرَادَ بِهِ التَّحِيَّةَ ، عَلَى قَوْلِ الْأَكْثَرِ“জালিম শাসকদের উদ্দেশ্যে সিজদা করা কুফর,যদি সে এর দ্বারা ইবাদত উদ্দেশ্য করে। কিন্তু যদি এর দ্বারা কেবল অভিবাদন (সম্মান প্রদর্শন) উদ্দেশ্য করে, তবে অধিকাংশ আলিমদের মতে তা কুফর নয়।”(আল-বাহরুর রায়েক খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৩৪)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:مَا يَفْعَلُهُ كَثِيرٌ مِنْ الْجَهَلَةِ مِنْ السُّجُودِ بَيْنَ يَدَيْ الْمَشَايِخِ .. ذَلِكَ حَرَامٌ قَطْعًا ، بِكُلِّ حَالٍ ، سَوَاءٌ كَانَ إلَى الْقِبْلَةِ أَوْ غَيْرِهَا ، وَسَوَاءٌ قَصَدَ السُّجُودَ لِلَّهِ تَعَالَى ، أَوْ غَفَلَ ، وَفِي بَعْضِ صُوَرِهِ مَا يَقْتَضِي الْكُفْرَ ، أَوْ يُقَارِبُهُ ، عَافَانَا اللَّهُ الْكَرِيمُ “অনেক জাহেল লোক শাইখদের সামনে সিজদা করার মাধ্যমে যেসব কাজ করে থাকে এটি অবশ্যই হারাম, কোন অবস্থাতেই তা জায়েয নয়। কিবলামুখী হয়ে হোক কিংবা অন্যদিকে হয়ে হোক, উদ্দেশ্য যদি আল্লাহ তাআলার জন্য সিজদা করাও হয়, অথবা অসাবধানতাবশত হয় সব ক্ষেত্রেই তা নিষিদ্ধ। বরং এর কিছু কিছু রূপ এমন আছে যা কুফরের দাবি রাখে বা কুফরের কাছাকাছি নিয়ে যায়। আল্লাহ মহান আমাদের হেফাযত করুন।”(ইমাম নববী আল-মাজমু‘ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৬৯)। শিহাবুদ্দীন আর-রামলি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:مُجَرَّد السُّجُودِ بَيْنَ يَدَيْ الْمَشَايِخِ : لَا يَقْتَضِي تَعْظِيمَ الشَّيْخِ كَتَعْظِيمِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ، بِحَيْثُ يَكُونُ مَعْبُودًا، وَالْكُفْرُ إنَّمَا يَكُونُ إذَا قَصَدَ ذَلِكَ “শায়খদের সামনে কেবল সিজদা করা মানে এই নয় যে শায়খকে এমনভাবে সম্মান করা যাক যেন আল্লাহকে করা হয় যিনি মহিমান্বিত ও প্রশংসার যোগ্য। যদি উদ্দেশ্য হয় যে শায়খকে সেইরকম উপাসনার মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে, তখনই এটি কুফরী হিসেবে গণ্য হবে।(নিহায়াতুল মুহতাজ ইলা শারহুল মিনহাজ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১২২)
আর-রুহাইবানি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:السُّجُودُ لِلْحُكَّامِ وَالْمَوْتَى بِقَصْدِ الْعِبَادَةِ : كَفْرٌ ، قَوْلًا وَاحِدًا ، بِاتِّفَاقِ الْمُسْلِمِينَ .
وَالتَّحِيَّةُ لِمَخْلُوقٍ بِالسُّجُودِ لَهُ : كَبِيرَةٌ مِنْ الْكَبَائِرِ الْعِظَامِ
ইবাদতের উদ্দেশ্যে শাসক বা মৃতদের সিজদা করা কুফর, এবং এই বিষয়ে মুসলিমরা সর্বসম্মতভাবে একমত।আর কোনো সৃষ্ট জীবকে অভিবাদন (সালাম) জানানোর উদ্দেশ্যে তাকে সিজদা করা এটি গুরুতর বড় বড় কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।”(মাতালিব উলি নুহা; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৭৮)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন ‘আলী আশ-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১২৫০ হি.] বলেছেন:
فلا بد من تقييده بأن يكون سجوده هذا قاصدا لربوبية من سجد له ، فإنه بهذا السجود قد أشرك بالله عز وجل ، وأثبت معه إلهًا آخر .وأما إذا لم يقصد إلا مجرد التعظيم ، كما يقع كثيرا لمن دخل على ملوك الأعاجم : أنه يقبل الأرض تعظيما له ، فليس هذا من الكفر في شيء ، وقد علم كل من كان من الأعلام ، أن التكفير بالإلزام ، من أعظم مزالق الأقدام ؛ فمن أراد المخاطرة بدينه ، فعلى نفسه تَجَنَّى”.
“এটি স্পষ্টভাবে বলা অত্যন্ত জরুরি যে, যদি কোনো সিজদা সেই প্রভুর প্রতি উৎসর্গিত হয় যাঁকে সিজদা করা হচ্ছে, অর্থাৎ তাঁর প্রভুত্ব স্বীকার করে,তাহলে এইভাবে সিজদা করার মাধ্যমে সে আল্লাহর সাথে একজনকে অংশীদার সাব্যস্ত করেছে, এবং নিশ্চিত করেছে যে তাঁর সাথে অন্য একজন উপাস্য আছে।কিন্তু যদি তার উদ্দেশ্য কেবল সম্মান প্রদর্শন করা হয়, যেমনটি প্রায়শই ঘটে থাকে যারা বিদেশী (অ-আরব) রাজাদের কাছে প্রবেশ করে, যেখানে তারা রাজার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাটি চুম্বন করে, তাহলে এটি মোটেও কুফরী নয়। সমস্ত আলেম একমত যে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফের হিসাবে চিহ্নিত করা একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয় এবং এটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।”(ইমাম শাওকানী; আস-সাইলুল জাররার; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫৮০)
সৌদি আরবের প্রথম গ্র্যান্ড মুফতি ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:الانحناء عند السلام حرام ، إذا قصد به التحية ، وأَما إن قصد به العبادة فكفر”অভিবাদন জানাতে গিয়ে রুকু করা হারাম, যদি এটি শুধুমাত্র অভিবাদনের উদ্দেশ্যে করা হয়। আর যদি এটি ইবাদতের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে তা কুফরী হিসেবে গণ্য হবে।” (ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল,ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১০৯)
.
শায়খ আব্দুল আজিজ আব্দুল লতিফ বলেছেন:فمن المعلوم أن سجود العبادة ، القائم على الخضوع والذل والتسليم والإجلال لله وحده : هو من التوحيد الذي اتفقت عليه دعوة الرسل، وإن صرف لغيره فهو شرك وتنديد .ولكن لو سجد أحدهم لأب أو عالم ونحوهما ، وقصده التحية والإكرام : فهذه من المحرمات التي دون الشرك ، أما إن قصد الخضوع والقربة والذل له فهذا من الشرك”এটা সর্বজনবিদিত যে,একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিনয়, আত্মসমর্পণ ও শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে ইবাদতের উদ্দেশ্যে সিজদা করা তাওহীদের (আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতির) অন্তর্ভুক্ত; আর সকল রাসূল এ দিকেই মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। অতএব, যদি এ সিজদা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা হয়, তবে তা হবে শিরক এবং আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বীদের শরীক করা। কিন্তু কেউ যদি তার পিতা বা আলেম প্রমুখের জন্য সিজদা করে এবং উদ্দেশ্য হয় কেবল সালাম প্রদান ও সম্মান প্রদর্শন, তবে এটি এমন এক নিষিদ্ধ কাজ যা শিরকের চেয়ে নিচু পর্যায়ের। তবে যদি উদ্দেশ্য হয় আত্মসমর্পণ ও বিনয় প্রদর্শন, তবে নিঃসন্দেহে তা শিরক।”(নাওয়াকিদুল ঈমান আল-কাওলিয়্যাহ ওয়াল আমালিয়্যাহ” পৃষ্ঠা: ২৭৮)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনার পরিসমাপ্তি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহ্ তাআলার ব্যতীত কারো উদ্দেশ্যে যেমন কবর, পীর, শিক্ষক বা কেবল সম্মান প্রদর্শনের জন্য সিজদা করা এই উম্মতের জন্য সরাসরি হারাম এবং কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আর যদি নিয়তে গরমিল থাকে, যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদতের উদ্দেশ্যে সিজদা করা হয় তবে এটি শিরক হবে। সুতরাং কারো উদ্দেশ্যে সিজদা করা শিরক সম্পর্কিত হুকুম লাগানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ দলিল উপস্থাপন এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা প্রয়োজন, যেমনটি আমরা উপরের আলোচনায় করেছি। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
Subscribe to:
Posts (Atom)