Friday, March 27, 2026

ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার সালাতের আগে বা পরে অতিরিক্ত কোনো সালাত আছে কি

 প্রশ্ন: ঈদুল ফিতর/ঈদুল আযহার সালাতের আগে বা পরে অতিরিক্ত কোনো সালাত আছে কি?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ঈদের দিন ইমাম মুসল্লিদেরকে নিয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করবেন। উমর (রাঃ) বলেন: ঈদুল ফিতর এর সালাত হচ্ছে- দুই রাকাত এবং ঈদুল আযহার সালাত হচ্ছে- দুই রাকাত। আপনাদের নবীর বাণী অনুযায়ী এটাই পরিপূর্ণ সালাত ; কসর (রাকাত-সংখ্যা হ্রাসকৃত) নয়। যে ব্যক্তি মিথ্যা বলবে সে ব্যর্থ হবে।”(সুনানে নাসাঈ হা/১৪২০), সহিহ ইবনে খুযাইমা এবং আলবানী ‘সহিহুন নাসাঈ’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন) আবু সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহের উদ্দেশ্য বের হতেন। তিনি সর্বপ্রথম যা দিয়ে শুরু করতেন সেটা হচ্ছে সালাত ।(সহিহ বুখারী হা/৯৫৬) সুতরাং ঈদগাহ ময়দানে ঈদের সালাতের পূর্বে অথবা পরে কোন নফল সালাত নেই। প্রখ্যাত সাহাবী ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল (রাযি.)-কে সঙ্গে নিয়ে ‘ঈদুল ফিতরের দিন বের হয়ে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করেন। তিনি এর পূর্বে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি।'(সহীহ বুখারী হা/৯৮৯; সহীহ মুসলিম হা/৮৮৪)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;যে ব্যক্তি ঈদগাহে ঈদের সালাত পড়তে এসেছে তার জন্যে কি তাহিয়্যাতুল মাসজিদের দুই রাকাত সালাত পড়া জায়েয আছে?
জবাবে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেছেন;لا يصلي من دخل المصلى لصلاة العيد ركعتين تحية قبل أن يجلس ؛ لأن صلاة التحية بالمصلى مخالف لما كان عليه العمل من النبي صلى الله عليه وسلم وأصحابه رضي الله عنهم .وبالله التوفيق وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم .”যে ব্যক্তি ঈদের সালাত আদায় করার জন্য ঈদগাহে এসেছেন তিনি বসার আগে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মাসজিদের সালাত পড়বেন না। কেননা ঈদগাহে তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমল ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের আমলের বিপরীত।আল্লাহ্‌ই তাওফিকদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সাথীবর্গের উপর আল্লাহ্‌র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ২৭৪)
.
তবে ঈদের সালাত শরীয়ত সম্মত কোন কারনে মসজিদে আদায় করা হলে সেখানে বসার পূর্বে দুই রাকাআত তাহিয়াতুল মসজিদ পড়তে হবে। কেননা আবূ ক্বাতাদা সালামী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يَجْلِسَ”তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন বসার পূর্বে দুই রাকআত সালাত আদায় করবে”।(সহীহ বুখারী, হা/৪৩৩; সহীহ মুসলিম,হা/৭১৪; মিশকাত, হা/৭০৪)। ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই হাদীসে মসজিদে প্রবেশকারীকে বসার আগে দুই রাকা‘আত পড়ার নির্দেশ আছে। তবে এই নির্দেশ সর্বসম্মতভাবে সুন্নাতের জন্য, ওয়াজিব নয়। শুধু কিছু যাহিরির থেকে ওয়াজিব বলার কথা এসেছে।(ফাৎহুল বারী; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৬২-৪৬৩) ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,”তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করা মুস্তাহাব (সুন্নাত) হওয়ার ব্যাপারে আলিমদের সর্বসম্মতি রয়েছে। কোন ওজর ছাড়া তা আদায় না করে বসে পড়া অপসন্দনী। “(নববী; আল-মাজমূঊ: খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৫৪৪)
.
পাশাপাশি এ কথা জেনে রাখা ভালো যে, ঈদের সালাতের আগে বা পরে কোনো নফল সালাত নেই—এ বিধানটি মূলত ঈদগাহ ময়দানের সাথে সংশ্লিষ্ট। তবে ঈদের সালাত আদায় করে বাড়িতে ফিরে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করা জায়েজ। কারণ, যে হাদিসে ঈদের সালাতের আগে-পরে নফল সালাত না থাকার কথা বলা হয়েছে, সেখানে ঘরে বা ঈদগাহ থেকে দূরে অন্য কোথাও নফল নামাজ আদায়ের নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করা হয়নি (অর্থাৎ তা নিষিদ্ধ নয়)। বরং এ বিষয়ে প্রমাণ রয়েছে—আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আকীল, আতা ইবনে ইয়াসার থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত সাহাবী আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। প্রখ্যাত সাহাবী আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, كَانَ- رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ لاَ يُصَلِّي قَبْلَ الْعِيدِ شَيْئًا فَإِذَا رَجَعَ إِلَى مَنْزِلِهِ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ ‏.‏”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের সালাতের আগে কোন সালাত আদায় করতে না। তবে তিনি তাঁর বাড়িতে ফিরে আসার পর দু রাকআত সালাত আদায় করতেন।” (মুসনাদে আহমেদ হা/১০৮৪২, ১০৯৬২; ইবনু মাজাহ হা/১২৯৩; সহীহুল জামে হা/৪৮৫৯) তাহক্কীক; হাদিস সহিহ জয়ীফ হওয়া নিয়ে আলেমগনের মাঝে মতানৈক রয়েছে।একদল আলেম এর সনদ যঈফ বলেছেন কারণ আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আকীল রয়েছে যিনি বিতর্কিত যাকে ইমাম মালেক বিন আনাস এবং ইমাম ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-কাত্তান যঈফ বলেছেন,অপরদিকে ইমাম আলবানী,ইমাম হাকেম,ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীসটির সনদ বিশুদ্ধ বলেছেন।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন, أخرجه ابن ماجه (1293)، وأحمد (3/28 و40) نحوه ، والحاكم (1/297) وعنه البيهقي الشطر الثاني منه، وقال الحاكم: ” صحيح الإسناد ” ووافقه الذهبي.قلت: إنما هو حسن فقط، فإن ابن عقيل فيه كلام من قبل حفظه؛ ولذلك قال الحافظ في ” بلوغ المرام ” والبوصيري في ” الزوائد “: ” هذا إسناد حسن”.والتوفيق بين هذا الحديث ، وبين الأحاديث المتقدمة النافية للصلاة بعد العيد، بأن النفي إنما وقع على الصلاة في المصلي، كما أفاد الحافظ في “التلخيص”. والله أعلم”এটি বর্ণনা করেছেন ইবনে মাজাহ (১২৯৩), আহমাদ (৩/২৮ ও ৪০) এবং হাকেম (১/২৯৭); আর হাকেম থেকে বর্ণনা করেছেন বায়হাকী—এর শেষাংশটুকু। ইমাম হাকেম বলেছেন: ‘এটির সনদ সহীহ এবং ইমাম যাহাবী তাঁর সাথে একমত পোষণ করেছেন। আমি (আলবানী) বলছি: এটি বড়জোর ‘হাসান’ (স্তরের হাদিস)। কারণ (রাবী) ইবনে আকীলের হেফজ বা স্মরণশক্তির বিষয়ে কিছু সমালোচনা রয়েছে। আর একারণেই হাফেজ (ইবনে হাজার) ‘বুলুগুল মারাম’-এ এবং বুসিরী ‘আয-যাওয়ায়েদ’-এ বলেছেন: ‘এই সনদটি হাসান’। এই হাদিস এবং পূর্বোক্ত সেই হাদিসগুলো—যেগুলোতে ঈদের পরে সালাত নেই বলে নফি (অস্বীকৃতি) এসেছে—এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় হলো: এই নিষেধাজ্ঞা মূলত ঈদগাহে (সালাত আদায়ের) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; যেমনটি হাফেজ (ইবনে হাজার) ‘আত-তালখীস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।”(ইমাম আলবানী; ইরওয়াউল গালীল, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১০০ হা/৩৯৯ এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)
.
ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন,فأما الإمام: فلا نعلم في كراهة الصلاة له خلافاً ، قبلها وبعدها.وكل هذا في الصلاة في موضع صلاة العيد.فأما الصلاة في غير موضع صلاة العيد، كالصلاة في البيت أو في المسجد، إذا صليت العيد في المصلى، فقال أكثرهم: لا تكره الصلاة فيه قبلها وبعدها.روي ذلك عن بريدة، ورافع بن خديج. وذكره عباس بن سهل، عن أصحاب النبي صلَّى اللهُ عليه وسلَّم، أنهم كانوا يفعلونه. “ইমামের ব্যাপারে ঈদের সালাতের আগে ও পরে (নফল) সালাত পড়া মাকরূহ এ বিষয়ে কোনো মতভেদ আমরা জানি না। এ সমস্ত আলোচনা ঈদের সালাতের স্থানে সালাত আদায় করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু যদি ঈদের সালাত মুসাল্লায় আদায় করা হয়, আর অন্য কোনো স্থানে যেমন ঘরে বা মসজিদে সালাত পড়া হয়, তাহলে অধিকাংশ আলেমের মতে সেখানে ঈদের আগে বা পরে সালাত পড়া অপছন্দনীয় নয়। এ মতটি বর্ণিত হয়েছে বুরাইদা ইবনুল হুসাইব এবং রাফি ইবন খুদাইজ রা. থেকে। আর আব্বাস ইবনে সাহল রহ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা এভাবেই আমল করতেন।”(ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৯৩)।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত: ৮৫২ হি:] বলেন:أن النفي إنما وقع على الصلاة في المصلى “নিষেধাজ্ঞার (নফল সালাত না পড়ার) বিষয়টি কেবল মুসাল্লায় সালাত পড়ার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।”(আত তালখীসুল হাবীর; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১০৮৩) ঈদের দিনের সকালে (সুবহে সাদিকের পর) নফল সালাত পড়ার মূল বিষয়টি এ ব্যাপারে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা জানা যায় না।
.
ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الصلاة مباحة في كل يوم وفي كل وقت إلا في الأوقات التي نهى النبي صلى الله عليه وسلم عن الصلاة فيها وهي وقت طلوع الشمس، ووقت غروبها، ووقت الزوال، وقد كان تطوع رسول الله صلى الله عليه وسلم في عامة الأوقات في بيته، ولم يزل الناس يتطوعون في مساجدهم، فالصلاة جائزة قبل صلاة العيد وبعده، ليس لأحد أن يحظر منه شيئا.وليس في ترك النبي صلى الله عليه وسلم أن يصلي قبلها وبعدها : دليل على كراهية الصلاة في ذلك الوقت؛ لأن ما هو مباح لا يجوز حظره إلا بنهي يأتي عنه، ولا نعلم خبرا يدل على النهي عن الصلاة قبل صلاة العيد وبعده، وصلاة التطوع في يوم العيد ، وفي سائر الأيام ، في البيوت : أحب إلينا للأخبار الدالة على ذلك “প্রতিদিন এবং প্রতিটি সময়ে সালাত পড়া বৈধ, তবে সে সময়গুলো ছাড়া যেগুলোতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত পড়তে নিষেধ করেছেন। আর সেগুলো হলো সূর্যোদয়ের সময়, সূর্যাস্তের সময় এবং সূর্য ঠিক মাথার উপরে অবস্থায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় তাঁর ঘরে নফল সালাত আদায় করতেন। আর মানুষও সর্বদা তাদের মসজিদগুলোতে নফল সালাত আদায় করে আসছে। অতএব, ঈদের সালাতের আগে ও পরে সালাত পড়া বৈধ। এ ব্যাপারে কাউকে নিষেধ করার অধিকার কারো নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের আগে বা পরে সালাত পড়েননি এটা এ সময়ে সালাত পড়া মাকরূহ হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ, যা বৈধ তা নিষিদ্ধ করা যায় না, যতক্ষণ না এ ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আসে। আমরা এমন কোনো হাদিস জানি না যা ঈদের সালাতের আগে বা পরে সালাত পড়া নিষিদ্ধ করে। আর ঈদের দিনসহ অন্যান্য দিনগুলোতে নফল সালাত ঘরে আদায় করা আমাদের কাছে বেশি পছন্দনীয় কারণ এ ব্যাপারে প্রমাণসমূহ রয়েছে।”(আল আওসাত; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৭০)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

যাকাতুল ফিতর কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আদায় করা বৈধ

 প্রশ্ন: যাকাতুল ফিতর কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আদায় করা বৈধ এবং কোনগুলো দিয়ে আদায় করা বৈধ নয়?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬

​উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আল্লাহ তাআলা যাকাতুল ফিতরকে ফরয করে তা গরীব-মিসকীনের প্রাপ্য হক হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাই প্রশ্ন আসে কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত এবং কোনগুলো দ্বারা নয়? এ বিষয়ে আমরা দলিলভিত্তিক সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থাপন করব।

.

▪️প্রথমত: কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত?

.

যাকাতুল ফিতরের মূলনীতি হলো প্রত্যেক ব্যক্তি তার অবস্থানরত দেশের মানুষের প্রচলিত প্রধান খাদ্যদ্রব্য থেকেই ফিতরা আদায় করবে। অর্থাৎ, মানুষ যে সকল খাদ্যকে তাদের দৈনন্দিন জীবনের মূল আহার হিসেবে গ্রহণ করে, সেসব খাদ্য দ্বারা ফিতরা প্রদান করা বৈধ। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হলো চাল; তাই চালের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করা উত্তম ও সুন্নতসম্মত। এছাড়াও আলেমগণ হাদিসে বর্ণিত খাদ্যদ্রব্যের আলোকে এবং বিভিন্ন দেশের প্রধান খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করে সেসকল দেশের জন্য আরও কিছু খাদ্যের উল্লেখ করেছেন—যেমন: গম, ভুট্টা, চাল, শিমের বীজ, ডাল, ছোলা, ফূল (এক প্রকার ডাল), নুডলস, গোশত ইত্যাদি। এগুলো যেসব দেশের প্রধান খাদ্য তারা এগুলো দিয়ে ফিতরা প্রদান করতে পারে। কারন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিতরা হিসেবে এক স্বা’ খাবার প্রদান করা ফরয করেছেন। যেসব খাবার সাহাবীগণের প্রধান খাদ্য ছিল তাঁরা সেটা দিয়ে ফিতরা আদায় করতেন।সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আবু সা‘ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেন: “আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় ঈদের দিনএক স্বা খাদ্যদ্রব্য (ফিতরা) হিসেবে প্রদান করতাম। আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন: তখন আমাদের খাদ্য ছিল— যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।” অপর এক বর্ণনায় তিনি বলেন: “যখন আমাদের মাঝে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন তখন আমরা ছোট-বড়, স্বাধীন-ক্রীতদাস সবার পক্ষ থেকে যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) হিসেবে এক স্বা’ খাদ্য কিংবা এক স্বা’ পনির কিংবা এক স্বা’ যব কিংবা এক স্বা’ খেজুর কিংবা এক স্বা’ কিসমিস আদায় করতাম।”(সহিহ বুখারী হা/১৫১০; ও সহিহ মুসলিমে হা/৯৮৫) অনেক আলেম হাদিসে উল্লেখিত ‘খাদ্যদ্রব্য’ এর ব্যাখ্যা করেছেন: গম। আবার কোন কোন আলেম বলেন: ‘খাদ্যদ্রব্য’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে: কোন এলাকার মানুষ যে খাদ্য খেয়ে অভ্যস্ত; সেটা গম হোক, যব হোক কিংবা অন্য কিছু হোক। আর এটাই অধিক সঠিক অভিমত। কারণ ফিতরা হচ্ছে- ধনীদের পক্ষ থেকে গরীবদের প্রতি সহমর্মিতার প্রকাশ। স্থানীয় খাদ্য ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করা মুসলমানের উপর ফরয নয়। বর্তমানে হারামাইনের দেশে ভাত হচ্ছে- প্রধান খাদ্য এবং এটি দামী ও ভাল খাদ্য। তাই যব এর চেয়ে চাউল দিয়ে ফিতরা দেয়া উত্তম; যদিও যব দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েয মর্মে দলিলে উল্লেখিত হয়েছে। এভাবে জানা গেল যে, চাউল দিয়ে ফিতরা আদায় করতে কোন অসুবিধা নেই।

.

শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] তাঁর আল মাজমু গ্রন্থে বলেন:ذكرنا أن الأصح عندنا وجوب الفطرة من غالب قوت البلد، وبه قال مالك، وقال أبو حنيفة: هو مخير، وعن أحمد رواية أنه لا يجزئ إلا الأجناس الخمسة المنصوص عليها: التمر والزبيب والبر والشعير والأقط. والله أعلم”আমরা উল্লেখ করেছি যে,আমাদের মতে সবচেয়ে সহীহ মত হলো যাকাতুল ফিতর ওই দেশের প্রধান খাদ্যদ্রব্য থেকেই ওয়াজিব। এ মতই ইমাম মালেক রহ. এরও। আর ইমাম আবু হানিফা বলেন: এতে মানুষকে পছন্দের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আর ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে একটি বর্ণনা রয়েছে যে, নির্দিষ্ট পাঁচ প্রকার খাদ্য ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আদায় করা যথেষ্ট নয় সেগুলো হলো: খেজুর, কিশমিশ, গম, যব এবং শুকনো দুধজাত খাদ্য। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।”(ইমাম নববী আল-মাজমু খন্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১১২)

.

অপরদিকে মালিকি মাযহাবে যাকাতুল ফিতর সাধারণত দেশের প্রধান খাদ্য থেকে আদায় করা হয় যা নয়টি জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ: গম, যব, সুলত (এক ধরনের যব), ভুট্টা, বাজরা, খেজুর, কিশমিশ, চাল এবং শুকনো দুধজাত খাদ্য। তবে যদি মানুষের প্রধান খাদ্য এগুলো ছাড়া অন্য কিছু হয়, তাহলে তা থেকেও আদায় করা যাবে। আদ দাসূকি তাঁর হাশিয়া আলা শারহিল কাবীর (খলীলের মুখতাসার এর ব্যাখ্যায়) বলেন:والذي يظهر من عبارات أهل المذهب أن غير التسعة إذا كان غالبا لا يخرج منه، وإنما يخرج منه إذا كان عيشهم دون غيره من التسعة كما في المدونة وغيرها، ولذا قال المصنف إلا أن يقتات غيره أي إلا أن ينفرد غيره بالاقتيات فيخرج منه حينئذ”মালিকি আলেমদের বক্তব্য থেকে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো উক্ত নয়টি জিনিস ছাড়া অন্য কিছু যদি প্রধান খাদ্যও হয়, তবুও তা থেকে আদায় করা হবে না বরং তখনই তা থেকে আদায় করা হবে, যখন মানুষের জীবিকা শুধুমাত্র সেটির উপর নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং ওই নয়টির কোনোটিই প্রচলিত না থাকে যেমন ‘আল‌ মুদাওয়ানা’ প্রভৃতি গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এ কারণেই মুসান্নিফ বলেছেন: তবে যদি অন্য কিছু প্রধান খাদ্য হয় অর্থাৎ যখন শুধুমাত্র সেটিই মানুষের প্রধান খাদ্য হয়ে যায়, তখন তা থেকেই যাকাতুল ফিতর আদায় করা হবে।

.

ইমাম কারাফি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:يخرج أهل كل بلد من غالب عيشهم ذلك الوقت”প্রত্যেক দেশের মানুষ তাদের সেই সময়কার প্রধান খাদ্য থেকেই (যাকাতুল ফিতর) প্রদান করবে। (আয-যাখীরা; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৬৯)

.

খতীব আশ-শিরবিনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:ويجب الصاع من غالب قوت بلده، إن كان بلدياً. وفي غيره: من غالب قوت محله؛ لأن ذلك يختلف باختلاف النواحي”নিজ দেশের বাসিন্দা হলে তার দেশের প্রধান খাদ্য থেকে এক ‘সা’ (পরিমাণ) প্রদান করা ওয়াজিব। আর যদি অন্য কোথাও থাকে, তাহলে সে স্থানের প্রধান খাদ্য থেকে দিবে; কারণ অঞ্চলভেদে (খাদ্যের ধরন) ভিন্ন হয়ে থাকে।”(মুগনী আল-মুহতাজ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১১৭)

.

হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:

أَمَّا إذَا كَانَ أَهْلُ الْبَلَدِ يَقْتَاتُونَ أَحَدَ هَذِهِ الْأَصْنَافِ جَازَ الْإِخْرَاجُ مِنْ قُوتِهِمْ بِلَا رَيْبٍ. وَهَلْ لَهُمْ أَنْ يُخْرِجُوا مَا يَقْتَاتُونَ مِنْ غَيْرِهَا ؟ مِثْلُ أَنْ يَكُونُوا يَقْتَاتُونَ الْأُرْزَ وَالذرة فَهَلْ عَلَيْهِمْ أَنْ يُخْرِجُوا حِنْطَةً أَوْ شَعِيرًا أَوْ يُجْزِئُهُمْ الْأُرْزُ وَالذُّرَةُ ؟ فِيهِ نِزَاعٌ مَشْهُورٌ، وأصح الأقوال: أنه يُخْرِجُ مَا يَقْتَاتُهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ مِنْ هَذِهِ الْأَصْنَافِ، وَهُوَ قَوْلُ أَكْثَرِ الْعُلَمَاءِ: كَالشَّافِعِيِّ وَغَيْرِهِ ؛ فَإِنَّ الْأَصْلَ فِي الصَّدَقَاتِ أَنَّهَا تَجِبُ عَلَى وَجْهِ الْمُواساة لِلْفُقَرَاءِ، كَمَا قَالَ تَعَالَى: مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ، وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرَضَ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ ؛ لِأَنَّ هَذَا كَانَ قُوتَ أَهْلِ الْمَدِينَةِ، وَلَوْ كَانَ هَذَا لَيْسَ قُوتَهُمْ بَلْ يَقْتَاتُونَ غَيْرَهُ لَمْ يُكَلِّفْهُمْ أَنْ يُخْرِجُوا مِمَّا لَا يَقْتَاتُونَهُ، كَمَا لَمْ يَأْمُرِ اللَّهُ بِذَلِكَ فِي الْكَفَّارَاتِ

“উল্লেখিত খাদ্যসমূহের কোনটি যদি কোন এলাকার মানুষের প্রধান খাদ্য হয়ে থাকে তাহলে সন্দেহাতীতভাবে সে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা জায়েয। প্রশ্ন হচ্ছে- তারা অন্য যেসব খাদ্য গ্রহণ করে থাকে সেটা দিয়ে কি ফিতরা দেয়া যাবে? যেমন কারো প্রধান খাদ্য যদি হয় ভাত কিংবা ভূট্টা তারা গম কিংবা যব দিয়ে কি ফিতরা আদায় করতে পারবে? নাকি চাউল বা ভূট্টা দিতে হবে? এ বিষয়ে বিশাল মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে শুদ্ধ অভিমত হচ্ছে- হাদিসে উল্লেখিত শ্রেণীর মধ্যে না থাকলেও যেটা তাদের খাদ্য সেটা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে পারবে। এটি অধিকাংশ আলেমের অভিমত, যেমন- ইমাম শাফেয়ি ও অন্যান্য আলেম। কারণ ফিতরা ফরয করা হয়েছে দরিদ্রদের প্রতি সহমর্মিতাস্বরূপ। আল্লাহ তাআলা বলেন: “মধ্যম মানের খাদ্য যা তোমরা তোমাদের স্ত্রী-পরিবারকে খাইয়ে থাক”[সূরা মায়িদা: ৮৯] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) হিসেবে এক স্বা’ খেজুর কিংবা এক স্বা’ যব ফরয করেছেন। কারণ তখন এগুলো ছিল মদিনাবাসীর খাদ্য। যদি এগুলো তাদের খাদ্য না হয়ে অন্য কিছু হত; তাহলে তাদেরকে তাদের খাদ্যদ্রব্য ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ফিতরা আদায় করার দায়িত্ব দিতেন না; যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা কাফফারার ক্ষেত্রে নির্দেশ দেননি।”(কিছুটা পরিমার্জিতভাবে সমাপ্ত;ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড:২৫; পৃষ্ঠা: ৬৮)

.

আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন, وهذه كانت غالب أقواتهم بالمدينة فأما أهل بلد أو محلة قوتهم غير ذلك فإنما عليهم صاع من قوتهم كمن قوتهم الذرة أو الأرز أو التين أو غير ذلك من الحبوب، فإن كان قوتهم من غير الحبوب، كاللبن واللحم والسمك أخرجوا فطرتهم من قوتهم كائنا ما كان، هذا قول جمهور العلماء، وهو الصواب الذي لا يقال بغيره، إذ المقصود سد حاجة المساكين يوم العيد ومواساتهم من جنس ما يقتاته أهل بلدهم، وعلى هذا فيجزئ إخراج الدقيق وإن لم يصح فيه الحديث “মদিনাতে এগুলো ছিল তাদের প্রধান খাদ্য। পক্ষান্তরে, কোন দেশের কিংবা এলাকার প্রধান খাদ্য যদি অন্য কিছু হয় তাহলে তাদের উপর তাদের খাদ্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা ফরয। যেমন- যাদের খাদ্য ভুট্টা কিংবা ভাত কিংবা ত্বীন কিংবা অন্য কোন শস্যদানা (তারা সেটা দিয়ে ফিতরা দিবে)। আর তাদের খাদ্য যদি শস্যদানা না হয়ে অন্য কিছু হয়; যেমন- দুধ, গোশত, কিংবা মাছ ইত্যাদি তাহলে তারা তাদের প্রকৃতিগত খাদ্য দিয়ে ফিতরা দিবে সেটা যেমনি হোক না কেন। এটা জমহুর আলেমের অভিমত। এটাই সঠিক মত; অন্য মত প্রকাশ করার সুযোগ নেই। কারণ ফিতরা দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে- ঈদের দিন মিসকীনের প্রয়োজন পূরণ করা এবং সবাই যেমন খাবার খায় সে জাতীয় খাবার দিয়ে তাদের সহমর্মী হওয়া। এর আলোকে বলা যায় আটা বা ময়দা দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েয হবে; যদিও কোন সহিহ হাদিসে এর কথা আসেনি।”(ইবনু কাইয়্যেম; ইলামুল মুওয়াক্কিয়ীন’ খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১২)

.

বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আশ-শারহুল মুমতি’ গ্রন্থে বলেন:والصحيح أن كل ما كان قوتاً من حب وثمر ولحم ونحوها فهو مجزئ”সঠিক মতানুযায়ী, যেটা খাদ্য হিসেবে প্রচলিত সেটা শস্যদানা হোক, ফল-ফলাদি হোক কিংবা গোশত হোক সেটা দিয়ে ফিতরা দেয়া জায়েয।”(আশ-শারহুল মুমতি আলা যায়দুল মুস্তাকনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৮৩)

.

▪️দ্বিতীয়ত: কোন কোন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়?

.

যাকাতুল ফিতর এমন খাদ্যদ্রব্য দ্বারা আদায় করতে হয়, যা কোনো সমাজে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রধান খাদ্য (قوت غالب) হিসেবে বিবেচিত। এই মূলনীতির ভিত্তিতে যেসব বস্তু সাধারণ খাদ্য নয়, বরং কেবল সহায়ক উপাদান বা পার্শ্ব উপকরণ—সেগুলো দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়।

অতএব, সেমাই, চিনি, লবণ, মসলা, রান্না করা ভাত, দুধ, জুস, তেল, মাছ ইত্যাদি—যেগুলো মূল খাদ্য নয় এসব দিয়ে ফিতরা আদায় শুদ্ধ হবে না। অনুরূপভাবে পচা, নষ্ট বা নিম্নমানের এমন খাদ্য, যা মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে চায় না, তা দিয়েও ফিতরা দেওয়া বৈধ নয়। তদ্রূপ, জামা-কাপড়, আসবাবপত্র বা অনুরূপ অখাদ্য বস্তু দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করলে তা সহীহ হবে না।

.

আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ,গ্রন্থে এসেছে; والأشياءالمقتاتة : ‌هي ‌التي ‌تَصلح ‌أن ‌تكون ‌قوتا ‌تغذى ‌به ‌الأجسام ‌على ‌الدوام، بخلاف ما يكون قواما للأجسام لا على الدوام“যেসব জিনিস ‘খাদ্য’ হিসেবে গণ্য করা হয়, তা হলো সেই সমস্ত বস্তু যা নিয়মিতভাবে দেহকে পুষ্টি দেয় এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি যোগায়। এর বিপরীতে, এমন কিছু বস্তু আছে যা দেহকে সংরক্ষণ বা স্থিতিশীল রাখে, কিন্তু নিয়মিত বা প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।”(আল-মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৪)

.

যেমন; মালিকি মাযহাবে যাকাতুল ফিতর সাধারণত দেশের প্রধান খাদ্য থেকে আদায় করা হয় যা নয়টি জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ: গম, যব, সুলত (এক ধরনের যব), ভুট্টা, বাজরা, খেজুর, কিশমিশ, চাল এবং শুকনো দুধজাত খাদ্য। তবে যদি মানুষের প্রধান খাদ্য এগুলো ছাড়া অন্য কিছু হয়, তাহলে তা থেকেও আদায় করা যাবে। এই বক্তব্য উল্লেখ করে আদ দাসূকি তাঁর হাশিয়া আলা শারহিল কাবীর (খলীলের মুখতাসার এর ব্যাখ্যায়) বলেন:والذي يظهر من عبارات أهل المذهب أن غير التسعة إذا كان غالبا لا يخرج منه، وإنما يخرج منه إذا كان عيشهم دون غيره من التسعة كما في المدونة وغيرها، ولذا قال المصنف إلا أن يقتات غيره أي إلا أن ينفرد غيره بالاقتيات فيخرج منه حينئذ”মালিকি আলেমদের বক্তব্য থেকে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো উক্ত নয়টি জিনিস ছাড়া অন্য কিছু যদি প্রধান খাদ্যও হয়, তবুও তা থেকে আদায় করা হবে না বরং তখনই তা থেকে আদায় করা হবে, যখন মানুষের জীবিকা শুধুমাত্র সেটির উপর নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং ওই নয়টির কোনোটিই প্রচলিত না থাকে যেমন ‘আল‌ মুদাওয়ানা’ প্রভৃতি গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এ কারণেই মুসান্নিফ বলেছেন: তবে যদি অন্য কিছু প্রধান খাদ্য হয় অর্থাৎ যখন শুধুমাত্র সেটিই মানুষের প্রধান খাদ্য হয়ে যায়, তখন তা থেকেই যাকাতুল ফিতর আদায় করা হবে।

.

সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেনإذا لم تكن هذه الأنواع أو بعضها قوتا: فالصحيح أنها لا تجزئ. ولهذا ورد عن الإمام أحمد: الأقط لا يجزئ، إلا إذا كان قوتا. وإنما نص عليها في الحديث؛ لأنها كانت طعاما، فيكون ذكرها على سبيل التمثيل، لا التعيين. لما ثبت في صحيح البخاري عن أبي سعيد الخدري ـ رضي الله عنه ـ قال: “كنا نخرجها في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم صاعا من طعام، وكان طعامنا يومئذ التمر والزبيب والشعير والأقط”যদি এই (নির্দিষ্ট কয়েক) ধরনের খাদ্যদ্রব্য বা এর কোনো অংশ কোনো অঞ্চলের প্রধান আহার্য না হয়, তাহলে সঠিক মত হলো যে এসব দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় যথেষ্ট হবে না। এ কারণেই ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত হয়েছে: ‘আকিত (শুকনো দুধজাত খাবার) যথেষ্ট নয়, তবে যদি তা প্রধান খাদ্য হয়, তাহলে যথেষ্ট হবে।’ হাদীসে এসব জিনিসের উল্লেখ এসেছে এজন্য যে, এগুলো সে সময়ে খাদ্য ছিল। সুতরাং এগুলোর উল্লেখ নির্দিষ্ট করে বাধ্যতামূলক করার জন্য নয়; বরং উদাহরণ হিসেবে এসেছে।কারণ সহীহ বুখারীতে আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে এক ‘সা’ পরিমাণ খাদ্য (যাকাতুল ফিতর) আদায় করতাম। আর সে সময় আমাদের খাদ্য ছিল খেজুর, কিশমিশ, যব এবং আকিত।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি আলা যায়দুল মুস্তাকনি; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৮১)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।

▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬

উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

শাশুড়িকে ফিতরা দেওয়ার বিধান কী এবং ফিতরা গ্রহণের পর তাঁর ঘরে মেহমান হিসেবে খাবার গ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ আছে কি

 প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে শাশুড়িকে ফিতরা দেওয়ার বিধান কী? এবং ফিতরা গ্রহণের পর তাঁর ঘরে মেহমান হিসেবে খাবার গ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ আছে কি?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
▪️প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর প্রথমত আমাদের জানা উচিত; যাকাতুল ফিতরের প্রকৃত হকদার কারা এটি শুধুমাত্র ফকির-মিসকীনকে দিতে হবে নাকি কুরআনে সূরা তওবায় উল্লেখিত আট শ্রেণীর মাঝে কি ফিতরা বণ্টন করা যাবে, এই মাসালায় আলেমের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিক বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, ফিতরা গ্রহণের যোগ্য একমাত্র ফকির ও মিসকীন। অর্থাৎ, এটি যাকাতের মতো আট শ্রেণিতে বিভক্ত হবে না। কারণ, ফিতরা যাকাতের অনুরূপ নয়; বরং এটি ফরজ করা হয়েছে মূলত মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থা হিসেবে। সুতরাং এটি গরীব-মিসকীনদের জন্য খাস। দলিলের আলোকে এটিই বিশুদ্ধ মত। এই মতের পক্ষে রয়েছেন,মালেকি মাযহাবের ইমাম আহমেদ ইবনে হাম্বলের দুটি মতের একটি মত, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া ও প্রিয় ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম,বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম বিন বায,ইবনু উসাইমীন, ইমাম আলবানী, শাইখ সালেহ আল ফাওযানসহ বহু বিশিষ্ট ফকিহ এ মতকে সমর্থন করেছেন। এই মতটি গ্রহণযোগ্য তার কারন হচ্ছে, রাসূল ﷺ মিসকীনদের খাদ্যস্বরূপ ফিতরাকে ফরজ করেছেন। তিনি অন্য কোনো খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য ফিতরাকে ফরজ করেননি। ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন,فَرَضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ زَكَاةَ الفِطرِ طُهرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعمَةً لِلمَسَاكِينِ.“আল্লাহ’র রাসূল ﷺ রোজা অবস্থায় কৃত অনর্থক কথাবার্তা ও অশালীন আচরণ থেকে রোজাদারকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং মিসকীনদের আহারের সংস্থান করার জন্য ফিতরাকে ফরজ করেছেন।”(আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭; হাদিসটি হাসান) সুতরাং এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ফিতরা কেবল ফকির-মিসকীনকে দিতে হবে, অন্য কোনো খাতে দেওয়া যাবে না।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,ومصرفها الفقراء والمساكين. لما ثبت عن ابن عباس رضي الله عنهما قال: «فرض رسول الله ﷺ زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين». “ফিতরা বণ্টনের খাত হচ্ছে গরীব, মিসকীন। যেহেতু ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিতরা ফরয করেছেন অনর্থক কথা-কাজ ও যৌনালাপ থেকে রোযাদারকে পবিত্র করাস্বরূপ এবং মিসকীনদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থাস্বরূপ।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড;১৪ পৃষ্ঠা: ২০২) বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে ফিতরা বণ্টনের খাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,ليس لها إلا مصرف واحد وهم الفقراء، كما في حديث ابن عباس رضي الله عنهما قال: «فرض رسول الله ﷺ زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين».”ফিতরার কেবল একটি মাত্র খাত রয়েছে, আর তা হচ্ছে,ফকির ব্যক্তিবর্গ। যেমন ইবনু ‘আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা)-এর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:‘আল্লাহর রাসূল ﷺ রোজাদারের অনর্থক কথা ও অশালীন আচরণ থেকে তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং অভাবগ্রস্তদের খাদ্যের সংস্থান করার জন্য ফিতরা সদকা ফরজ করেছেন।’”(আবু দাউদ,হা/১৬০৯; ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন, মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৫৯)
.
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা একথা পরিস্কার যে, ফিতরা শুধুমাত্র ফকির মিসকিন এই দুই শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের জন্য। অতএব, স্ত্রীর পরিবার যদি দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাদেরকে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে কোনো বাধা নেই; বরং অন্যদের তুলনায় তাদেরকেই অগ্রাধিকার দেওয়া অধিক উত্তম। কেননা, শ্বশুরালয়ের আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সহমর্মিতা ও যত্ন প্রদর্শন করা একদিকে যেমন সাদাকাহর সওয়াব অর্জনের মাধ্যম, তেমনি তা স্ত্রীর সম্মান রক্ষা এবং তার প্রতি উত্তম আচরণেরও।
.
বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন:ولا شك أن الأصهار لهم حق ليس لأحد سواهم ممن ليس بصهر “নিশ্চয়ই শ্বশুরালয়ের আত্মীয়দের এমন একটি অধিকার রয়েছে, যা অন্য কারো নেই,যারা শ্বশুরালয়ের আত্মীয় নয়।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব,পৃষ্ঠা: ৬৮২) সুতরাং আমরা আশা করি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আপনাকে সদকার সওয়াব এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও স্ত্রীর পরিবারের প্রতি সদাচরণের সওয়াব দান করবেন। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
.
▪️দ্বিতীয়ত: শাশুড়িকে ফিতরা প্রদান করার পর, তাঁর ঘরে অতিথি হিসেবে খাবার গ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ রয়েছে কি?
.
ফিতরা গ্রহণ করা ব্যক্তির উপর কোনো বিশেষ বিধিনিষেধ নেই। একবার শাশুড়ি ফিতরা গ্রহণ করলে, তার সাধারণভাবে খাওয়া-দাওয়া বা অতিথি আপ্যায়ন করার স্বাধীনতা থাকে। অতএব, আপনি যদি আপনার শ্বশুরবাড়িতে অতিথি হিসেবে যান, তাহলে তারা ফিতরা গ্রহণ করেছেন—এ কারণে তাদের ঘরে আহার গ্রহণে কোনো ধরনের হালাল-হারামের বাধা নেই। সুতরাং সেখানে স্বাভাবিকভাবেই খাবার খাওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। কারণ আলেমগণের কাছে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি মৌলিক (কায়দা) মূলনীতি হলো:أن الشيء يتغير حُكْمُه بتغير سبب مُلكه “কোনো বস্তুর মালিকানার কারণ পরিবর্তিত হলে, তার বিধান (হুকুম) ও সেই অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়ে যায়।”
.
এর সপক্ষে অন্যতম দলিল হচ্ছে, বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন: রাসূল ﷺ) ঘরে প্রবেশ করলেন, তখন একটি হাঁড়িতে গোশত ফুটছিল। এরপর তাঁর সামনে রুটি এবং ঘরের সাধারণ কিছু তরকারি পেশ করা হলো। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: “আমি কি হাঁড়িতে গোশত ফুটতে দেখিনি? তাঁরা বললেন: “হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল! কিন্তু এই গোশত বারীরাহকে সদকা হিসেবে দেওয়া হয়েছে, আর আপনি তো সদকা খান না। তখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন:(هُوَ عَلَيْهَا صَدَقَةٌ وَهُوَ لَنَا هَدِيَّةٌ ) “এটি তার (বারীরার) জন্য সদকা, কিন্তু আমাদের জন্য উপহার (হাদিয়া)।”(সহীহ বুখারী হ/৫২৭৯;ও মুসলিম হা/১০৭৪) রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এখানে মালিকানার কারণ পরিবর্তন হওয়াকে খোদ বস্তুটি পরিবর্তন হওয়ার স্থলাভিষিক্ত করেছেন। অর্থাৎ, সদকা যখন কোনো গরিব ব্যক্তি গ্রহণ করে, তখন সেটি তার মালিকানায় চলে আসে এবং তা থেকে ‘সদকা’ হওয়ার বৈশিষ্ট্য দূর হয়ে যায়।এরপর সে ইচ্ছামতো তা ব্যবহার করতে পারে, বিক্রি করতে পারে কিংবা কাউকে (হিবা) উপহার দিতে পারে।
.
উপরোক্ত হাদিসের আলোকে শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,فيه دَلِيل عَلَى أَنَّهُ إِذَا تَغَيَّرَتْ الصِّفَة تَغَيَّرَ حُكْمُهَا ، فَيَجُوز لِلْغَنِيِّ شِرَاؤُهَا مِنْ الْفَقِير ، وَأَكْلهَا إِذَا أَهْدَاهَا إِلَيْهِ ، وَلِلْهَاشِمِيِّ ، وَلِغَيْرِهِ مِمَّنْ لَا تَحِلّ لَهُ الزَّكَاة اِبْتِدَاءً “এতে প্রমাণ রয়েছে যে, যখন কোনো বস্তুর গুণাবলি (অবস্থা) পরিবর্তিত হয়, তখন তার হুকুমও পরিবর্তিত হয়। সুতরাং ধনী ব্যক্তির জন্য গরিবের কাছ থেকে তা ক্রয় করা বৈধ, এবং যদি গরিব ব্যক্তি তা তাকে উপহার দেয় তবে তা খাওয়াও বৈধ। একইভাবে হাশেমী এবং অন্য যাদের জন্য শুরুতেই যাকাত গ্রহণ করা বৈধ নয়, তাদের জন্যও (এই অবস্থায়) তা বৈধ।”(ইমাম নববী, শারহু সহীহ মুসলিম, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৭৪)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত: ৮৫২ হি:] বলেন:فيؤخذ منه أن التحريم إنما هو على الصفة ، لا على العين “এ থেকে বোঝা যায় যে নিষেধাজ্ঞা মূলত বস্তুর উপর নয়, বরং তার গুণ (অবস্থা)-এর উপর।”(ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২০৪)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন,وفى أكله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِن اللحم الذي تُصدِّقَ به على برَيرة .. دليلٌ على جواز أكل الغني ، وبني هاشم ، وكل من تحرم عليه الصدقة مما يُهديه إليه الفقير من الصدقة ؛ لاختلاف جهة المأكول ” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বারীরাহ (রাঃ)-এর উপর সদকা করা গোশত থেকে খাওয়ার মধ্যে প্রমাণ রয়েছে যে, ধনী ব্যক্তি, বানী হাশেম এবং যাদের জন্য সদকা গ্রহণ করা হারাম, তাদের জন্যও গরিব ব্যক্তি থেকে প্রাপ্ত (সদকার বস্তু) উপহার হিসেবে পেলে তা খাওয়া বৈধ; কারণ ভক্ষণ করার দিক (উৎস/প্রেক্ষাপট) ভিন্ন হয়ে গেছে।”(ইবনু ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৭৫)
.
বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন:دل ذلك على أن الإنسان إذا قبض الشيء بحق ، فإنه لا يَحرم على غيره ممن لو قبضه من المعطي الأول لم يحل.ونظير ذلك الفقير يأخذ الزكاة ، ويجوز أن يصنع به طعاماً يدعو إليه الأغنياء ، فيأكلون منها ؛ لأن الغني لم ينتفع به على أنه زكاة ، بل على أنه من هذا الفقير الذي ملكه بحق “এটি প্রমাণ করে যে, কোনো ব্যক্তি যখন কোনো বস্তু বৈধভাবে গ্রহণ করে, তখন তা অন্য কারো জন্য হারাম হয় না,যদিও সে ব্যক্তি যদি প্রথম দাতার কাছ থেকে সরাসরি তা গ্রহণ করত, তবে তার জন্য তা বৈধ হতো না। এর উদাহরণ হলো: গরিব ব্যক্তি যাকাত গ্রহণ করে, তারপর সে তা দিয়ে খাবার তৈরি করে এবং ধনীদের দাওয়াত দেয়, তারা তা খেতে পারে; কারণ ধনী ব্যক্তি তা যাকাত হিসেবে গ্রহণ করছে না, বরং সেই গরিব ব্যক্তির পক্ষ থেকে, যে তা বৈধভাবে মালিক হয়েছে।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, পৃষ্ঠা: ২৩৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইসলামি শরীয়তে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতার বাইরে অন্য কাউকে আব্বা বা আম্মা বলা কি জায়েজ

 প্রশ্ন: ইসলামি শরীয়তে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতার বাইরে অন্য কাউকে ‘আব্বা’ বা ‘আম্মা’ বলা কি জায়েজ?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের অধিকার ও মর্যাদা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে, নিজের জন্মদাতা পিতা–মাতার বাইরে অন্য কাউকে; যেমন চাচা, শিক্ষক, সম্মানিত আলেম, শ্বশুর-শাশুড়ি, খালা প্রমুখকে সম্মান, মর্যাদা ও সৌজন্যের খাতিরে ‘পিতা’ বা ‘মাতা’ বলে সম্বোধন করাতে কোনো দোষ নেই। কারণ এতে প্রকৃত বংশগত পিতৃত্বের দাবি করা হয় না; বরং এটি কেবল সম্মান ও ভক্তি প্রকাশের একটি ভদ্র সম্বোধন মাত্র।তবে ইসলাম যে বিষয়টিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, তা হলো—নিজের প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করে নিজেকে অন্য কারও সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। অর্থাৎ কেউ যদি জেনেশুনে নিজের আসল পিতাকে বাদ দিয়ে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তবে সে গুরুতর গুনাহে লিপ্ত হবে। হাদিসে এসেছে, প্রখ্যাত সাহাবী সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস ও আবূ বাকরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তাঁরা উভয়ে বলেন,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حرَام”যে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম। “(সহীহ বুখারী হা/৬৭৬৬, সহীহ মুসলিম হা/৬৩) অপর বর্ননায় আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:لَا تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ أَبِيهِ فقد كفر”তোমরা তোমাদের পিতৃ-পরিচয়কে অস্বীকৃতি জানিও না। যে স্বীয় পিতৃ পরিচয়ে অস্বীকার করল, সে কুফরী করল।”(সহীহ বুখারী হা/৬৭৬৮; সহীহনমুসলিম হা/৬২) তিরমিজির আরেক বর্ননায় রাসূল (ﷺ) আরও বলেছেন; “যে ব্যক্তি নিজের বাবাকে পরিত্যাগ করে অন্যজনকে বাবা বলে পরিচয় দেয় অথবা যে গোলাম নিজ মনিবকে পরিত্যাগ করে অন্য মনিবের পরিচয় দেয় তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত….”।(ইবনু মা-জাহ হা/২৭১২; তিরমিযী হা/২১২১; সহীহুত তারগীব হা/১৯৮৬) এছাড়াও অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,كُفْرٌ بِامْرِئٍ ادِّعَاءُ نَسَبٍ لاَ يَعْرِفُهُ أَوْ جَحْدُهُ وَإِنْ دَقَّ ‏”‏ ‏.‏ “এমন লোককে নিজ বংশীয় দাবি করা কুফরী যাকে লোকে চিনে না, অথবা সামান্য সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নিজের বংশের লোককে অস্বীকার করাও কুফরী।”(ইবনে মাজাহ হা/২৭৪৪; মুসনাদে আহমাদ হা/৬৯৮০)
.
উপরোক্ত হাদীসগুলোর উদ্দেশ্য হলো— যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে ও ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের প্রকৃত বংশপরিচয় পরিবর্তন করে, অর্থাৎ নিজের আসল পিতাকে বাদ দিয়ে নিজেকে অন্য কারো দিকে সম্পৃক্ত করে, সে গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হয়।জাহিলিয়্যাত বা অন্ধকার যুগে কোনো ব্যক্তি অন্যের সন্তানকে নিজের পুত্ররূপে গ্রহণ করলে তাতে আপত্তি করা হতো না। তখন সেই সন্তানকে তার দত্তক গ্রহণকারী ব্যক্তির দিকেই সম্পৃক্ত করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা এ প্রথা বাতিল করে দেন এবং কুরআনে নির্দেশ দেন:اُدۡعُوۡهُمۡ لِاٰبَآئِهِمۡ هُوَ اَقۡسَطُ عِنۡدَ اللّٰهِ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ تَعۡلَمُوۡۤا اٰبَآءَهُمۡ فَاِخۡوَانُكُمۡ فِی الدِّیۡنِ وَ مَوَالِیۡكُمۡ ؕ وَ لَیۡسَ عَلَیۡكُمۡ جُنَاحٌ فِیۡمَاۤ اَخۡطَاۡتُمۡ بِهٖ ۙ وَ لٰكِنۡ مَّا تَعَمَّدَتۡ قُلُوۡبُكُمۡ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا“তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক; আল্লাহ্‌র নিকট এটাই বেশী ন্যায়সংগত। অতঃপর যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই এবং বন্ধু। আর এ ব্যাপারে তোমরা কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল করলে তোমাদের কোন অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা স্বেচ্ছায় করেছে (তা অপরাধ), আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”(সূরা আল-আহযাব: ৫) অপর আয়াতে আরও বলা হয়েছে:وَ مَا جَعَلَ اَدۡعِیَآءَكُمۡ اَبۡنَآءَكُمۡ “আল্লাহ তোমাদের পালকপুত্রদেরকে তোমাদের প্রকৃত পুত্র বানাননি।”(সূরা আল-আহযাব: ৪) এই আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার পর সাহাবিগণ নিজেদের প্রকৃত পিতার নামেই পরিচিত হতে শুরু করেন এবং যারা তাদের দত্তক নিয়েছিল, তাদের দিকে সম্পৃক্ত করা পরিত্যাগ করেন। তবে এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন, যারা দীর্ঘদিন অন্য কারো দিকে সম্পৃক্ত হয়ে পরিচিত হয়ে যাওয়ায় পরিচয়ের সুবিধার্থে সেই নামেই পরিচিত থাকেন। কিন্তু তা বংশ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ছিল না।এর উদাহরণ হলো মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ। তাঁর প্রকৃত পিতার নাম ছিল আমর ইবনু সা‘লাবাহ্। কিন্তু ‘আসওয়াদ’ নামের ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তিনি ‘মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ’ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান।এছাড়াও হাদীসে এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে আমরা যায়েদ ইবনে হারেসাকে যায়েদ ইবন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে সম্বোধন করতাম।(সহীহ বুখারী হা/৪৭৮২; সহীহ মুসলিম হা/২৪২৫) কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে পালক ছেলেরূপে গ্ৰহণ করেছিলেন।
.
ইমাম ইবনুস সালাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ফাতাওয়া ইবনুস সালাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন— তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: কুরআনুল কারীম বা সহীহ হাদীসে কি এমন কাউকে ‘পিতা’ বলা বৈধ, যিনি প্রকৃত পিতা (জন্মদাতা) নন? তিনি এর উত্তরে বলেন:
قال الله تبارك وتعالى: ( قالوا نعبد إلهك وإله آباءك إبراهيم وإسماعيل )، وإسماعيل من أعمامه لا من آبائه .وقال سبحانه وتعالى : ( ورفع أبويه على العرش ) ، وأمه كان قد تقدم وفاتها، قالوا: والمراد خالته، ففي هذه استعمال الأبوين من غير ولادة حقيقية وهو مجاز صحيح في اللسان العربي. وإجراء ذلك من النبي صلى الله عليه وسلم والعالم والشيخ سائغ من حيث اللغة والمعنى ، وأما من حيث الشرع ، فقد قال الله سبحانه وتعالى: ( ما كان محمد أبا أحد من رجالكم )، وفي الحديث الثابت عنه صلى الله عليه وسلم : ( إنما أنا لكم بمنزلة الوالد أعلمكم ).
فذهب لهذا بعض علمائنا إلى أنه لا يقال فيه صلى الله عليه وسلم أنه أب المؤمنين، وإن كان يقال في أزواجه أمهات المؤمنين، وحجته ما ذكرت، فعلى هذا يقال هو مثل الأب أو كالأب أو بمنزلة أبينا، ولا يقال هو أبونا أو والدنا، ومن علمائنا من جوز وأطلق هذا أيضا، وفي ذلك للمحقق مجال بحث يطول ، والأحوط التورع والتحرز عن ذلك …..)
“আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ইরশাদ করেছেন: “তারা বলল, আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসমাইলের ইলাহ-এর ইবাদত করব।”(সূরা বাকারা: ১৩৩) অথচ ইসমাইল (আলাইহিস সালাম) ছিলেন তাঁর চাচাদের অন্তর্ভুক্ত, সরাসরি পিতা নন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরও ইরশাদ করেছেন: “আর তিনি (ইউসুফ আ:) তাঁর মাতাপিতাকে সিংহাসনে বসালেন।”(সূরা ইউসুফ: ১০০) অথচ তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছিল আগেই; তাই মুফাসসিরগণ বলেন, এখানে ‘মাতাপিতা’ বলতে তাঁর খালাকে বোঝানো হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সরাসরি জন্মদাতা না হওয়া সত্ত্বেও ‘পিতা-মাতা’ শব্দটির ব্যবহার বিদ্যমান এবং এটি আরবি ভাষায় একটি শুদ্ধ রূপক (Majaz) ব্যবহার। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), আলিম বা শায়খের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবহার ভাষাগত ও অর্থগত দিক থেকে বৈধ। তবে শরীয়তের দিক থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ইরশাদ করেছেন: “মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন।” আবার সহিহ হাদিসে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়েছে: “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য পিতৃতুল্য, তোমাদেরকে আমি দ্বীন শিক্ষা দিয়ে থাকি।”(আবু দাউদ হা/৮) এ কারণে আমাদের কোনো কোনো আলিম এই মত পোষণ করেছেন যে— নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে ‘মুমিনদের পিতা’ বলা যাবে না, যদিও তাঁর স্ত্রীদের ‘মুমিনদের মাতা’ বলা হয়। তাঁদের দলিল হলো উপরে বর্ণিত আয়াতটি। এই মত অনুযায়ী বলতে হবে: তিনি ‘পিতার মতো’ বা ‘পিতার ন্যায়’ অথবা ‘আমাদের পিতার মর্যাদাসীন’; কিন্তু সরাসরি ‘আমাদের পিতা’ বা ‘আমাদের জন্মদাতা’ বলা যাবে না। আবার আমাদের আলিমদের মধ্যে কেউ কেউ এটি (পিতা বলা) ঢালাওভাবে জায়েজ বলেছেন। এ বিষয়ে গবেষক মহলে দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ রয়েছে, তবে সতর্কতা ও পরহেজগারির দাবি হলো এমন সম্বোধন থেকে বিরত থাকা। (সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)।”(ফাতাওয়া ইবনুস সালাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৮৬)-
.
ইমাম শাফিঈ (রহিমাহুল্লাহ) স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, তাঁকে (নবিজিকে) ‘মুমিনদের পিতা’ বলা জায়েজ— অর্থাৎ সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে।(দ্রষ্টব্য: আল-গুরার আল-বাহিয়্যাহ শারহুল বাহজাতিল ওয়ারদিয়্যাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৯১)
.
ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:والصحيح : أنه يجوز أن يقال إنه أب للمؤمنين ، أي في الحرمة ، وقوله تعالى ( ما كان محمد أبا أحد من رجالكم ) أي في النسب “সঠিক অভিমত হলো—এটি বলা জায়েজ যে, তিনি (ﷺ) মুমিনদের পিতা; অর্থাৎ সম্মানের দিক থেকে। আর মহান আল্লাহর বাণী: ‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন’ (সূরা আহজাব: ৪০), এর অর্থ হলো—বংশগত সম্পর্কের দিক থেকে।” (উদ্ধৃতি সমাপ্ত) কাজেই নবী করীম (ﷺ)-এর ক্ষেত্রে ‘পিতা’ শব্দটি ব্যবহার করায় কোনো বাধা নেই। খ্রিস্টানরাও এই শব্দটি ব্যবহার করে—এটি কোনো ক্ষতির কারণ হবে না। কারণ, তাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ (তাশাব্বুহ) কেবল তখনই নিষিদ্ধ হয়, যখন তা তাদের একান্ত নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এই সম্বোধনটি আরব ও অনারবসহ সকল মানুষের মধ্যেই প্রচলিত একটি সাধারণ বিষয়; এমনকি খ্রিস্টানদের অস্তিত্বের পূর্ব থেকেই এটি চলে আসছে। যেমনটি মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-এর ক্ষেত্রে বলেছেন: “তোমাদের পিতা ইব্রাহিমের আদর্শ; তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন মুসলিম।” (সূরা হাজ্জ: ৭৮)। এখানে আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আ.)-কে মুমিনদের ‘পিতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
.
​ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে বলেন: وإبراهيم هو أبو العرب قاطبة . وقيل : الخطاب لجميع المسلمين ، وإن لم يكن الكل من ولده ، لأن حرمة إبراهيم على المسلمين كحرمة الوالد على الولد “ইব্রাহিম (আ.) হলেন সমগ্র আরব জাতির পিতা। আর কেউ কেউ বলেছেন—এই সম্বোধন সকল মুসলিমের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, যদিও তারা সবাই তাঁর সরাসরি বংশধর নন। কারণ, মুসলিমদের নিকট ইব্রাহিম (আ.)-এর সম্মান ঠিক তেমন, যেমন সন্তানের কাছে পিতার সম্মান।” (তাফসিরে কুরতুবী; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৯১)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: “বর্তমান সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রাজ্ঞ এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন আলেমদের ক্ষেত্রে ‘ওয়ালিদ’ (পিতা বা আব্বাজান) উপাধিটি ব্যবহারের প্রচলন দেখা যাচ্ছে। এই শব্দটি ব্যবহার করা কি বৈধ? নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে উত্তরটি প্রত্যাশা করছি। ১. খ্রিস্টানরা তাদের বড় ধর্মীয় নেতাদের ‘পোপ’ (বাবা) বলে সম্বোধন করে। ২. রাসুলুল্লাহ (ﷺ),সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন বা সালফে সালেহীনদের থেকে আলেমদের ক্ষেত্রে ‘ওয়ালিদ’ বা ‘আব্বা’ শব্দ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় না। ৩. যদি কাউকে ‘পিতা’ উপাধি দিতেই হতো, তবে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর চেয়ে বড় হকদার আর কেউ হতেন না। অথচ মহান আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: “মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।” [সূরা আহযাব: ৪০]
তিনি (হাফিজাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন:
الحمد لله، لا نعلم أن أحداً من العلماء قد صار لفظ الوالد لقباً له، لكن جرت العادة في بعض المجتمعات أن يعبروا عن كبير السن بالوالد ، سواء كان عالماً أو غير عالم، فيذكر هذا اللفظ في مخاطبته يقال: يا والدي أو يا والد أو في الخبر عنه. فلم يصل الأمر إلى أن يكون فيه شبه من المصطلح النصراني، فالنصارى يجعلون ذلك لقباً لكبير أهل ملتهم، وأما قولك إن الرسول صلى الله عليه وسلم مع علو قدره وفضله وعظيم حقه على أمته ليس أباً استدلالاً بقوله تعالى: ( ما كان محمد أبا أحد من رجالكم ) الأحزاب/40 ، فالأبوة المنفية هي أبوة النسب، وأما الأبوة أبوة المنزلة والاحترام فهي ثابتة له صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كما جاء في بعض القراءات ( النبي أولى بالمؤمنين من أنفسهم وأزواجه أمهاتهم وهو أبٌ لهم ) الأحزاب/ 6 ، فهذه الأبوة والأمومة أبوة منزلة واحترام وإكرام ، ولقد قال صلى الله عليه وسلم : ( إنما أنا لكم بمنزلة الوالد ) وهو فوق ذلك صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فحقه على أمته أعظم من حق الوالدين وجميع الناس كما قال صلى الله عليه وسلم: ( لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من ولده ووالده والناس أجمعين ) البخاري (14)، ومسلم (44) والله أعلم “
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমাদের জানা মতে, কোনো আলেমকে নির্দিষ্ট করে স্থায়ী উপাধি হিসেবে ওয়ালিদ’ (পিতা) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে এমনটি ঘটেনি। তবে কোনো কোনো সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠ (মুরুব্বী) ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ‘ওয়ালিদ’ বা ‘আব্বাজান’ ডাকার প্রচলন রয়েছে—চাই তিনি আলেম হোন বা বা সাধারণ মানুষ। তাকে সম্বোধন করার সময় বলা হয়: ‘ইয়া ওয়ালিদী (হে আমার পিতা)’, বা ‘ইয়া ওয়ালিদ’, অথবা তার সম্পর্কে সংবাদ দেওয়ার সময়ও এটি ব্যবহৃত হয়। এটি খ্রিস্টানদের পরিভাষার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কারণ, খ্রিস্টানরা একে তাদের ধর্মীয় প্রধানের একটি বিশেষ উপাধি (Title) হিসেবে ব্যবহার করে।আর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শ্রেষ্ঠত্ব,সুউচ্চ মর্যাদা ও উম্মতের ওপর তাঁর বিশাল অধিকার থাকা সত্ত্বেও তিনি ‘পিতা’ নন বলে আপনি যে দলিল (সূরা আহযাব: ৪০) পেশ করেছেন,”মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন।”তার ব্যাখ্যা হলো: আয়াতে যে পিতৃত্ব অস্বীকার করা হয়েছে, তা হলো রক্ত বা বংশীয় সম্পর্কের পিতৃত্ব (Biological Fatherhood)। আর সম্মান ও সুউচ্চ মর্যাদার দিক থেকে যে পিতৃত্ব, তা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য সাব্যস্ত। যেমনটি কুরআনের কোনো কোনো কেরাতে এসেছে: (নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ, এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মা এবং তিনি (নবী) তাদের পিতা) [সূরা আহযাব: ৬]।এখানে পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব বলতে বোঝানো হয়েছে মর্যাদা, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের দিক থেকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও বলেছেন: “আমি তোমাদের জন্য পিতার সমতুল্য।” এমনকি তাঁর মর্যাদা এর চেয়েও ঊর্ধ্বে। উম্মতের ওপর তাঁর অধিকার বাবা-মা এবং দুনিয়ার সকল মানুষের চেয়েও বেশি। যেমনটি তিনি ﷺ বলেছেন: “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না,যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, তার পিতা এবং সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।”(সহীহ বুখারি: ১৪; মুসলিম: ৪৪; আল্লাহই ভালো জানেন।”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০০৩২৯)
.
এছাড়াও ইসলামের দৃষ্টিতে খালা, মায়ের সমতুল্য আর চাচা, বাবার সমতুল্য। এ বিষয়ে একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। যেমন রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,«يَا أَيُّهَا النَّاسُ! مَنْ آذَى عَمِّي فَقَدْ آذَانِي، فَإِنَّمَا عَمُّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ»”হে লোকসকল! যে ব্যক্তি আমার চাচাকে কষ্ট দিল সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। কেননা চাচা বাবারই সমতুল্য।”( সহীহুল জামে হা/৭০৮৭) অপর বর্ননায় আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: «يَا عُمَرُ، أَمَا شَعَرْتَ أَنَّ عَمَّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ؟» “হে ওমর! তুমি কি জানো না যে, ব্যক্তির চাচা তার বাবারই সমতুল্য?”(সহীহ মুসলিম হা/৯৮৩; মিশকাত হা/১৭৭৮) হাদিসটির ব্যাখ্যায় ইমাম আল-মানাভী (রাহিমাহুল্লাহ) ফাইযুল কাদীর-এ বলেছেন:(العم والد) أي هو نازل منزلته في وجوب الاحترام والإعظام لتفرعهما عن أصل واحد، وهذا خرج مخرج الزجر عن عقوقه”চাচা পিতার মতো‌ এর অর্থ হলো, তিনি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে পিতার মর্যাদার ন্যায়। কারণ তারা উভয়েই একই মূল (বংশ) থেকে উৎসারিত। আর এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো—চাচার অবাধ্যতা করা বা তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে মানুষকে সতর্ক করা।
.
খালা মায়ের সমতুল্য-সংক্রান্ত একটি হাদিস:আলি (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন, الْخَالَةُ بِمَنْزِلَةِ الْأُمِّ”খালা মায়ের মর্যাদার।”(আবু দাউদ হা/২২৮০; শাইখ আলবানি হাদিসটি সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে সহিহ আখ্যায়িত করেছেন) এ হাদিসের মর্মার্থ সম্পর্কে বলা হয়: খালা প্রতিপালনের ক্ষেত্রে মায়ের সমান অধিকার রাখেন। কারণ হাদিসটি সে প্রসঙ্গে উদ্ধৃত হয়েছে।”(ফাতহুল বারী;খণ্ড;৭;পৃষ্ঠা;৫০৬) কারো কারো মতে, প্রতিপালন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে খালা মায়ের সমান। ইমাম যাহাবী “আল-কাবায়ের” গ্রন্থে বলেন:أي : في البر والإكرام والصلة” অর্থাৎ সদ্ব্যবহার, সম্মান করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে।”আরও দেখুন শাইখ উছাইমীনের “শারহু বুলুগুল মারাম”; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২০৩)
.
তবে মনে রাখা উচিত, চাচা বা খালা প্রকৃত অর্থে পিতা-মাতার সমমর্যাদায় পৌঁছান না। অর্থাৎ শরিয়তে পিতা-মাতার প্রতি যে আনুগত্য, সম্মান ও সদ্ব্যবহার ফরজ করা হয়েছে এবং তাঁদের অবাধ্যতা যেভাবে হারাম গণ্য করা হয়েছে—সে বিধান চাচা বা খালার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই চাচা বা খালার আনুগত্য করা সন্তানের উপর শরয়ি বাধ্যবাধকতা নয়, এবং পিতা-মাতার মতো সেই পর্যায়ের খেদমত না করলে গুনাহও হবে না। তবে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা, সম্মান প্রদর্শন করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা নিঃসন্দেহে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ।
.
ইবনু হাজর আল-হাইতামী (রাহিমাহুল্লাহ) আজ-জাওয়াজির আন ইকতিরাফিল কাবায়ির-এ বলেছেন:
وظاهر أن الأولاد والأعمام من الأرحام وكذا الخالة فيأتي فيهم وفيها ما تقرر من الفرق بين قطعهم وعقوق الوالدين. وأما قول الزركشي صح في الحديث: أن الخالة بمنزلة الأم وأن عم الرجل صنو أبيه. وقضيتهما أنهما مثل الأب والأم حتى في العقوق فبعيد جدا وليس قضيتهما ذلك, إذ لا عموم فيهما ولا تعرض لخصوص العقوق فيكفي تشابههما في أمر ما كالحضانة تثبت للخالة كما تثبت للأم وكذا المحرمية وتأكد الرعاية وكالإكرام في العم والمحرمية وغيرهما مما ذكر. وأما إلحاقهما بهما في أن عقوقهما كعقوقهما فهو مع كونه غير مصرح به في الحديث مناف لكلام أئمتنا فلا معول عليه, بل الذي دلت عليه الآيات والأحاديث أن الوالدين اختصا من الرعاية والاحترام والطواعية والإحسان بأمر عظيم جدا وغاية رفيعة لم يصل إليها أحد من بقية الأقارب, ويلزم من ذلك أنه يكتفى في عقوقهما وكونه فسقا بما لا يكتفى به في عقوق غيرهما.
“এটি স্পষ্ট যে, সন্তান ও চাচারা ‘আরহাম’ (রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়)-দের অন্তর্ভুক্ত এবং খালাও অনুরূপ। সুতরাং তাদের ক্ষেত্রেও (বিচ্ছিন্নের পরিণাম হিসেবে) তা-ই প্রযোজ্য হবে যা ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা’ (কাত’উর রাহিম) এবং ‘পিতা-মাতার অবাধ্যতা’ (উকূকুল ওয়ালিদাইন)-এর মধ্যকার পার্থক্যের আলোচনায় নির্ধারিত হয়েছে।আর ইমাম যারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ) যে বলেছেন—হাদীসে সহীহভাবে প্রমাণিত আছে যে:”খালা মায়ের স্থলাভিষিক্ত’ এবং ‘ব্যক্তির চাচা তার পিতার সমতুল্য”; এর দ্বারা এটা বোঝায় না যে তারা পিতা-মাতার মতোই‌ অবাধ্যতার ক্ষেত্রে একই বিধানের অধীন। এটি অত্যন্ত দূরবর্তী ব্যাখ্যা।কারণ এই হাদীসগুলোতে সাধারণভাবে সেই অর্থ নেই এবং অবাধ্যতার বিশেষ বিধান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট আলোচনাও নেই।বরং এ দুটির মধ্যে কোনো একটি বিষয়ে সাদৃশ্য থাকলেই যথেষ্ট। যেমন: হেফাজত (লালন-পালন)-এর ক্ষেত্রে খালার অধিকার মায়ের মতো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, মাহরাম হওয়া, বিশেষ যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন,এবং চাচার ক্ষেত্রে সম্মান প্রদর্শন, মাহরাম হওয়া ইত্যাদি,এ ধরনের বিষয়গুলো বোঝানো হয়েছে। চাচা বা খালাকে পিতা-মাতার সাথে এভাবে যুক্ত করা যে, তাদের অবাধ্যতা পিতা-মাতার অবাধ্যতার মতোই,,এ কথা হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাছাড়া এটি আমাদের শাফি’ঈ মাজহাবের) ইমামদের বক্তব্যের সাথেও সাংঘর্ষিক। তাই এ মতের উপর নির্ভর করা যায় না।বরং কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হলো: পিতা-মাতা বিশেষভাবে এমন যত্ন, সম্মান, আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের অধিকারী, যা অত্যন্ত মহান ও উচ্চ মর্যাদার; এবং আত্মীয়দের মধ্যে অন্য কেউ সেই মর্যাদায় পৌঁছায় না।এর থেকে এটাও বোঝা যায় যে, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (উকূক) ও তা ফাসিক হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য হওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো যথেষ্ট, সেগুলো অন্য আত্মীয়দের অবাধ্যতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ধরা হয় না।আর চাচার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) আপনার উপর কর্তব্য, তবে তা আপনার দেশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী হবেযেমনটি আমরা আগে উল্লেখ করেছি।(ফাতহুল বারী” খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৫০৬; গৃহীত: ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-১৩৪৩৮৩)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ফেরেশতাদের সংখ্যা কত এবং প্রত্যেক মানুষের সাথে কতজন ফেরেশতা থাকেন

 প্রশ্ন: ফেরেশতাদের সংখ্যা কত? প্রত্যেক মানুষের সাথে কতজন ফেরেশতা থাকেন এবং তাদের দায়িত্ব কী?

▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ঈমানের ছয়টি রুকনের অন্যতম হচ্ছে ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান; যে রুকনগুলো ছাড়া ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয় না। যে ব্যক্তি এ ছয়টির কোনটির প্রতি ঈমান আনবে না সে ব্যক্তি মুমিন নয়। সে ছয়টি বিষয় হচ্ছে: আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান, শেষ দিনের প্রতি ঈমান এবং ভালমন্দের তাকদির আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে এর প্রতি ঈমান। ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ্‌ নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারা গায়েবী (অদৃশ্য) জগতের অন্তর্ভুক্ত; যে জগতকে আমরা দেখতে পাই না। তবে আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর কিতাবের মাধ্যমে এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর মাধ্যমে তাদের সম্পর্কিত অনেক সংবাদ আমাদেরকে জানিয়েছেন। কুরআন ও সুন্নাহর দলিল থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে,ফেরেশতাদের সংখ্যা অসংখ্য। তাদের প্রকৃত সংখ্যা একমাত্র আল্লাহ্‌ তাআলাই জানেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সপ্তম আকাশে অবস্থিত বাইতুল মা‘মূরের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: “অতঃপর আমাকে বাইতুল মা’মুরের দিকে উত্তোলন করা হয়। তখন আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন: এটি আল-বাইতুল মা’মুর। এখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতারা নামায আদায় করেন। একবার যারা বেরিয়ে যায় তারা আর ফিরে আসে না। অপর দল একই আমল করে।”(সহিহ বুখারী হা/৩২০৭) অপর বর্ননায় আব্দুল্লাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সেই দিন জাহান্নামকে এমতাবস্থায় আনা হবে যে, তার রয়েছে সত্তর হাজার লাগাম। প্রতিটি লাগামের সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা; যারা জাহান্নামকে টেনে নিয়ে যাবে।”(সহিহ মুসলিম হা/২৮৪২)
.
দ্বিতীয়ত: সম্মানিত ফেরেশতাগণ বনী আদমকে (মানুষকে) তাদের মাতৃগর্ভে সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি সঙ্গ দিয়ে থাকেন। এমনকি কবরে এবং পরকালেও তারা মানুষকে সঙ্গ দিয়ে থাকেন।দুনিয়াতে মানুষের সাথে তাদের অবস্থান নিম্নরূপ:
.
​(১). গর্ভকালীন তদারকি:
.
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেনঃ আল্লাহ্‌ রেহেমে (মাতৃগর্ভে) একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, হে প্রতিপালক! এটি বীর্য। হে প্রতিপালক! এটি রক্তপিণ্ড। হে প্রতিপালক! এটি গোশ্‌তপিণ্ড। আল্লাহ্‌ যখন তার সৃষ্টি পূর্ণ করতে চান, তখন ফেরেশতা বলে, হে প্রতিপালক! এটি নর হবে, না নারী? এটি দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান? তার রিযক কী পরিমাণ হবে? তার জীবনকাল কী হবে? তখন (আল্লাহ্‌র নির্দেশমত) তার মায়ের পেটে থাকাকালে ঐ রকমই লিখে দেয়া হয়।”(সহীহ বুখারী হা/৬৫৯৫; সহীহ মুসলিম হা/২৬৪৬)।
.
​(২). মানুষকে সুরক্ষা প্রদান:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:سوآءٌ منكم مَن أسرَّ القول ومَن جهر به ومَن هو مستخف بالليل وسارب بالنهار . له معقِّبات مِن بين يديه ومِن خلفه يحفظونه من أمر الله “তোমাদের মধ্যে যে কথা গোপন রাখে বা যে তা প্রকাশ করে, রাতে যে আত্মগোপন করে এবং দিনে যে প্রকাশ্যে বিচরণ করে, তারা সবাই আল্লাহর নিকট সমান। আর মানুষের জন্য রয়েছে তাঁর সামনে ও পিছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী (ফেরেশতা); তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে”।(সূরা আর রদ: ১০-১১)
.
​উক্ত আয়াতের তাফসিরে যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] বলেছেন; أن المعقبات مِن الله هم الملائكة جعلهم الله ليحفظوا الإنسان من أمامه ومن ورائه ، فإذا جاء قدر الله – الذي قدّر عليه أن يقع به من حادث ومصاب ونحوه – تخلوا عنه .”আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘মুয়াক্কিবাত’ (পর্যায়ক্রমে আগমনকারী) হলেন মূলত ফেরেশতা। আল্লাহ তাঁদেরকে মানুষের সামনে এবং পেছন থেকে তাকে রক্ষা করার জন্য নিযুক্ত করেছেন। তবে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফয়সালা (তকদির) চলে আসে—অর্থাৎ কোনো দুর্ঘটনা বা বিপদ যা তাঁর ওপর ঘটার কথা—তখন তাঁরা তাঁর পাশ থেকে সরে যান।”
মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:ما من عبد إلا له ملَك موكل بحفظه في نومه ويقظته من الجن والإنس والهوام ، فما منها شيء يأتيه إلا قال له الملك : وراءك ، إلا شيء أذن الله فيه فيصيبه .”এমন কোনো বান্দা নেই যার জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত নেই। ওই ফেরেশতা তাকে ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায় জিন, মানুষ এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ থেকে রক্ষা করেন। এর মধ্যে যা কিছুই তার কাছে (ক্ষতি করতে) আসে, ফেরেশতা তাকে বলেন: ‘পিছনে হটো!’ তবে আল্লাহ যার অনুমতি দেন, কেবল সেটিই তাকে স্পর্শ করে।”
.
জনৈক ব্যক্তি আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-কে বললেন: “মুরাদ গোত্রের একদল লোক আপনাকে হত্যা করতে চায়।” তখন আলী (রা.) বললেন:أي : علي – : إن مع كل رجل ملكين يحفظانه مما لم يُقدَّر ، فإذا جاء القدر خليا بينه وبينه ، إن الأجل جُنَّة حصينة .”প্রত্যেক মানুষের সাথে দুইজন ফেরেশতা থাকেন, যারা তাকে অনাগত (তাকদিরে নেই এমন) বিপদ থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু যখন তাকদির (নির্ধারিত সময়) চলে আসে, তখন তারা বান্দা ও তকদিরের মাঝখান থেকে সরে দাঁড়ান। নিশ্চয়ই ‘আজল’ বা নির্ধারিত আয়ু একটি সুরক্ষিত ঢাল।” (বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনে হাজার; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৭২)
.
এছাড়াও সূরা আর-রা’দ-এ উল্লেখিত ‘মুয়াক্কিবাত’ (পিছনে এবং সামনে থেকে অনুসরণকারী ফেরেশতা) দ্বারা মূলত সেইসব ফেরেশতাদেরই বোঝানো হয়েছে, যাদের কথা অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:وَ هُوَ الۡقَاهِرُ فَوۡقَ عِبَادِهٖ وَ یُرۡسِلُ عَلَیۡكُمۡ حَفَظَۃً ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءَ اَحَدَكُمُ الۡمَوۡتُ تَوَفَّتۡهُ رُسُلُنَا وَ هُمۡ لَا یُفَرِّطُوۡنَ”আর তিনি তাঁর বান্দাদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধিকারী এবং তিনি তোমাদের উপর প্রেরণ করেন হেফাযতকারীদেরকে। অবশেষে তোমাদের কারও যখন মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন আমাদের রাসূল (ফিরিশতা) গণ তার মৃত্যু ঘটায় এবং তারা কোন ক্রটি করে না।”(সূরা আনআম: ৬১) অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা যে রক্ষক ফেরেশতাদের পাঠান, তারা বান্দাকে তার জন্য নির্ধারিত সময় (মরণ) না আসা পর্যন্ত সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন।
.
(৩).আমল লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাগণ:
প্রত্যেক মানুষের সাথেই দুইজন ফেরেশতা থাকেন যারা তার ভালো-মন্দ, ছোট-বড় সব কাজ লিখে রাখেন।এরাই হচ্ছে ‘কিরামান কাতেবীন’ (সম্মানিত লেখক ফেরেশতারা)। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তবে তোমাদের ওপর অবশ্যই তত্ত্বাবধায়করা আছে (অর্থাৎ তোমাদের কাজকর্মের ওপর নজর রাখার জন্য ফেরেশতারা নিয়োজিত আছে); সম্মানিত লেখকেরা;”[সূরা আল-ইনফিতার: ১০-১১] তিনি আরও বলেন:“স্মরণ করুন, দুই গ্রহণকারী (ফেরেশতা) (একজন) ডানে ও (একজন) বামে বসে (তার আমল) গ্রহণ করছে। সে যে কথাই উচ্চারণ করুক (তা গ্রহণ করার জন্য) তার কাছে একজন সদাপ্রস্তুত প্রহরী রয়েছে”।[সূরা ক্বাফ: ১৭-১৮] ডান দিকের ফেরেশতা নেকি লেখেন এবং বাম দিকের ফেরেশতা গুনাহ লেখেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : إن صاحب الشمال ليرفع القلم ست ساعات عن العبد المسلم المخطئ ، فإن ندم واستغفر الله منها ألقاها ، وإلا كتبت واحدة “বান্দা যখন কোনো ভুল (গুনাহ) করে, তখন বাম দিকের ফেরেশতা কলমটি ছয় ঘণ্টা উঁচিয়ে রাখেন। যদি সে অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তবে তিনি তা আর লেখেন না। অন্যথায় সেটি একটি গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।”(তাবারানী, আল-মু’জামুল কবীর: ৮/১৫৮; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি সহীহ বলেছেন;সহিহ আল-জামি’ (২/২১২)
.
​সারসংক্ষেপ:মানুষের সাথে সার্বক্ষণিক কতজন ফেরেশতা থাকেন?
.
যদিও কুরআন ও সুন্নাহতে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে দৈনিক কতজন ফেরেশতা থাকে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই, তবে কুরআন সুন্নাহর নস এবং আলেমদের ব্যাখ্যা থেকে জানা যায় যে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে চারজন ফেরেশতা থাকে—দুইজন তার সমস্ত আমল ও কাজ লিপিবদ্ধ করে রাখে, আর অন্য দুইজন তার রক্ষা ও হেফাজতের দায়িত্ব পালন করে।ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মানুষের সাথে সাধারণত চারজন ফেরেশতা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقوله : له معقبات من بين يديه ومن خلفه يحفظونه من أمر الله أي : للعبد ملائكة يتعاقبون عليه حرس بالليل وحرس بالنهار ، يحفظونه من الأسواء والحادثات ، كما يتعاقب ملائكة آخرون لحفظ الأعمال من خير أو شر ملائكة بالليل وملائكة بالنهار .فاثنان عن اليمين والشمال يكتبان الأعمال صاحب اليمين يكتب الحسنات وصاحب الشمال يكتب السيئات .وملكان آخران يحفظانه ويحرسانه ، واحد من ورائه وآخر من قدامه .فهو بين أربعة أملاك بالنهار وأربعة آخرين بالليل “আল্লাহর বাণী: ‘তার (মানুষের) জন্য রয়েছে তাঁর সামনে ও পিছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরী (ফেরেশতা); তারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে”।(সূরা আর রদ: ১১) অর্থাৎ: বান্দার জন্য এমন কিছু ফেরেশতা রয়েছেন যারা পালাবদল করে তার পাহারায় নিয়োজিত থাকেন—একদল রাতে এবং একদল দিনে; তারা তাকে যাবতীয় অনিষ্ট ও দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করেন; ঠিক যেভাবে অন্য একদল ফেরেশতা মানুষের ভালো বা মন্দ আমলসমূহ সংরক্ষণের জন্য পর্যায়ক্রমে আগমন করেন; একদল রাতে এবং একদল দিনে।সুতরাং (আমল লেখক) দুইজন ডানে ও বামে থেকে আমলসমূহ লিখতে থাকেন; ডান পাশের জন নেক আমলগুলো লেখেন এবং বাম পাশের জন গুনাহসমূহ লেখেন। আর অন্য দুইজন ফেরেশতা তাকে হেফাজত ও পাহারা দেন; একজন তার পেছন থেকে এবং অন্যজন তার সামনে থেকে।অতএব, মানুষ দিনের বেলা চারজন ফেরেশতার (বেষ্টনীতে) থাকে এবং রাতে অন্য চারজন ফেরেশতার (বেষ্টনীতে) থাকে।”(তাফসিরে ইবনু কাসীর: খণ্ড; ২: পৃষ্ঠা: ৫০৪; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৬৫২৩) ইমাম ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মানুষের সাথে প্রতি মুহূর্তে ৪ জন ফেরেশতা থাকেন (২ জন আমল লেখার জন্য এবং ২ জন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার জন্য)। যেহেতু তারা দিন ও রাতে শিফট পরিবর্তন করেন, তাই ২৪ ঘণ্টায় মোট ৮ জন ফেরেশতা একজন মানুষের সেবায় বা দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate