Thursday, January 8, 2026

নাস্তিকতা কেন মানবজাতির জন্য একটি ভ্রান্ত ও ব্যর্থ মতাদর্শ

 ◈ নাস্তিক হলে নীতি-নৈতিকতা ও ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়। কারণ কোনটা নৈতিক আর কোনটা অনৈতিক, কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায় এই মানদণ্ড কে নির্ধারণ করবে? যেটা আপনার কাছে নৈতিক সেটা আরেকজনের কাছে নাও হতে পারে।

যেমন: একজনের সম্পদ জোর করে কেড়ে নেওয়া।
নাস্তিক্যবাদের দৃষ্টিতে কেউ একে ‘বিবর্তনীয় টিকে থাকার লড়াই’ (Evolutionary Struggle for Survival) বলে বৈধতা দিতে পারে-যেভাবে পশু-পাখিরা একজনের খাবার আরেকজন কেড়ে খায়। কারণ তাদের নীতি-নৈতিকতা ও ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নাই। অথচ আরেকজনের কাছে, অন্য মানুষের সম্পদ কেড়ে নেওয়া অন্যায় ও অনৈতিক।
◈ নাস্তিক হলে যুক্তির উপর নির্ভরশীল থাকার সুযোগ নাই। কারণ একজনের কাছে যেটা যৌক্তিক অন্য জনের কাছে সেটাই অযৌক্তিক। যেহেতু মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তি তার পারিপার্শ্বিকতা, আবেগ এবং সীমিত জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। তাই একজনের কাছে যা যুক্তিযুক্ত, অন্যজনের কাছে তা পাগলামি মনে হতে পারে।
যেমন: সুদ। একজন নাস্তিক পুঁজিবাদীর যুক্তিতে সুদ হল, অর্থ উপার্জনের সেরা মাধ্যম। কিন্তু অন্য জনের যুক্তিতে এটি ‘শোষণের হাতিয়ার।’
◈ নাস্তিক হলে বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে থাকার সুযোগ নাই। কারণ বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বৈজ্ঞানিক অনেক তথ্যই পরিবর্তিত হচ্ছে। এক বিজ্ঞানী এক কথা বলেন। কিন্তু অন্য বিজ্ঞানী তার বিপরীত বলেন। যেমন: সূর্য ও পৃথিবী ঘোরা সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক মতবাদ, বিবর্তন সংক্রান্ত মতবাদ ইত্যাদি।
◈ এছাড়া বিজ্ঞানে মানব জীবনের প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া লক্ষ লক্ষ সমস্যার কোন সমাধান নেই। যেমন: বিজ্ঞান ক্যান্সার নিরাময় বা রকেট ইঞ্জিনের ফর্মুলা দিতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান আমাদের বলতে পারে না, কেন পিতামাতার সেবা করা উচিত, কেন বড়দেরকে শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ করা উচিত। পারিবারিক কলহ, একাকীত্ব বা আত্মিক প্রশান্তির সমাধান ল্যাবরেটরিতে পাওয়া সম্ভব নয়;
সুতরাং বিজ্ঞান কখনো ‘জীবন বিধান’ হতে পারে না।
➧ তাহলে সমাধান কী?
এসব কিছুর একমাত্র ও চূড়ান্ত সমাধান, এই বিশ্বচরাচরের একচ্ছত্র স্রষ্টা মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর নির্দেশিত পন্থা বা তাঁর দেওয়া জীবন বিধান অনুযায়ী জীবনের সব কিছু পরিচালনা করা। কারণ তিনি যেহেতু সব কিছু সৃষ্টি করেছেন সেহেতু তাঁর সৃষ্টির জন্য কোনটা কল্যাণকর আর কোনটা ক্ষতিকর, কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়, কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল ইত্যাদি তিনিই সবচেয়ে বেশি জানেন। সুতরাং সন্দেহাতীতভাবে তাঁর দেওয়া জীবন বিধানই মানব জাতির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এবং কল্যাণকর। আল হামদুলিল্লাহ-সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

অন্যায়-পাপ কর্মে আল্লাহর নামে কসম খেলে কসম ভঙ্গ করে কাফফারা দেয়া আবশ্যক

 প্রশ্ন: কাজের মেয়েরা সারাক্ষণ স্টার জলসা ইত্যাদি চ্যানেলগুলো দেখতেই থাকে। কেউ যদি প্রচণ্ড রাগের মাথায় বলে ফেলে, ‘আল্লাহর কসম, আবার যদি রিমোট ধরিস, তোর হাত কেটে ফেলব।’ এখন এই মেয়েরা এসব চ্যানেল দেখবেই-দেখছেই। ওরা এসব দেখা বাদ দেবে না। এই কসমের জন্য কি গুনাহ হবে?

উত্তর: এটি নি:সন্দেহে হারাম বিষয়ের উপর কসম করা হয়েছে। কারণ ইসলামে কারো অঙ্গহানী বা ক্ষয়-ক্ষতি করা অথবা কোন অন্যায়-পাপাচার কাজের জন্য কসম করা হারাম। কেউ এমন কসম করলে তা পুরণ করা বৈধ নয়। এ ক্ষেত্রে কসম ভঙ্গ করা জরুরি। তবে কসমের কাফফারা আদায় করতে হবে। কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لأَنْ يَلَجَّ أَحَدُكُمْ فِي يَمِينِهِ فِي أَهْلِهِ آثَمُ لَهُ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى مِنْ أَنْ يُعْطِي كَفَّارَتَهُ الَّتي فَرَضَ اللهُ عَلَيْهِ
‘‘যে ব্যক্তি আপন পরিবার পরিজনের ব্যাপারে কসম খায় ও [তার চেয়ে উত্তম অন্য কিছুতে জেনেও] তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহর নিকট এই কর্মটি বেশি গোনাহর কারণ হবে এই কর্ম থেকে যে, সে [কসম ভেঙ্গে] সেই কাফফারা আদায় করবে, যা আল্লাহ তার উপর ফরয করেছেন।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
◼ কসম ভঙ্গের কাফফারা:
কেউ যদি আল্লাহর নামে কোন কিছু করার কসম করে কিন্তু পরে কসম ভঙ্গ করে তাহলে ইসলাম এ সুযোগ দিয়েছে যে, সে কসম ভঙ্গের কাফফারা আদায় করবে। আর তা হল:
🔹 দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরণের খাবার খাবার খাওয়ানো,
🔹 অথবা ১০ জন মিসকিনকে পোশাক দেয়া
🔹 অথবা একজন গোলাম আযাদ করা।
🔸 এ তিনটি কোনটি সম্ভব না হলে তিনটি রোযা রাখা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّـهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَـٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্যে; কিন্তু পাকড়াও করেন ঐ শপথের জন্যে যা তোমরা মজবুত করে বাধ। অতএব, এর কাফফরা এই যে, দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেনীর খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাক। অথবা, তাদেরকে বস্তু প্রদান করবে অথবা, একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দিবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফরা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা কর এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।” সূরা মায়িদাহ: ৮৯)
🔻 কতিপয় লক্ষ্যণীয় বিষয়:
⚫ কোন ব্যক্তি যদি এমন রাগের অবস্থায় কসম খায় যে, সে সময় তার হিতাহিত জ্ঞান ঠিক ছিল না তাহলে তার জন্য কাফফারার দেয়ার বিধান প্রযোজ্য হবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে সে পাগল বা মস্তিস্ক বিকৃত হিসেবে গণ্য হবে। আর পাগল বা মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তির কসম গ্রহণযোগ্য নয়।
⚫ ১০জন মিসকিন কে একবেলা তৃপ্ত সহকারে মধ্যম মানের খাবার খাওয়াতে হবে। তবে এর পরিবর্তে খাদ্যদ্রব্য দান করাও দেয়া জায়েয রয়েছে। খাদ্যদ্রব্য দানের পরিমান হল, জন প্রতি অর্ধ সা’ বা প্রায় সোয়া কেজি চাল (প্রধান খাবার)।
খাদ্য খাওয়ানো বা খাদ্যদ্রব্য দানের পরিবর্তে টাকা দেয়া বা অন্য কিছু ক্রয় করে দিলে কাফফারা আদায় হবে না। কারণ কুরআনে স্পষ্টভাবে খাদ্যের কথা বলা হয়েছে।
দশজন মিসকিনকে পোশাক দেয়া ক্ষেত্রে কথা হল, এমন পোশাক দিবে যে, তা পড়ে যেন সুন্দরভাবে সালাত আদায় করা যায়। যেমন একটি লুঙ্গি ও একটি জামা বা একটি লম্বা কুর্তা ইত্যাদি।
——————————
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী।
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

আল্লাহর নাম ও গুণাবলী ব্যতীত অন্য কিছুর কসম খাওয়ার বিধান

 মানুষ সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে কোনো বিষয়কে দৃঢ়ভাবে উপস্থাপনের জন্য কসম বা শপথ করে থাকে। কিন্তু ইসলামের সঠিক জ্ঞান না থাকা অথবা নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে এমনভাবে কসম করা হয়, যা একজন মুমিনকে ভয়াবহ গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়। তাই ইমান রক্ষার্থে কসমের সঠিক পদ্ধতি ও শরয়ি বিধান জানা আমাদের জন্য অপরিহার্য।

❑ কসমের সঠিক ও ভুল পদ্ধতি:
ইসলামের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তাআলার নামে অথবা তাঁর কোনো গুণবাচক নামের মাধ্যমেই কসম করা বৈধ। কসমের মূল উদ্দেশ্য হল, যাকে সাক্ষী রেখে কসম করা হচ্ছে বা যার নামে কসম করা হচ্ছে, তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা। আর সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা একমাত্র মহান আল্লাহরই প্রাপ্য।
উদাহরণ: “আল্লাহর কসম”, “আল্লাহর জাতের কসম”, “কাবার রবের কসম”, “যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম” ইত্যাদি।
আল্লাহর গুণাবলীর কসম: “আল্লাহর ইজ্জতের কসম”, ”আল্লাহর কুদরতের কসম”, “আল্লাহর কালামের কসম” ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ তাঁর বিশাল সৃষ্টিজগতের মধ্য থেকে যা ইচ্ছা তার কসম করতে পারেন, এটি একান্তই তাঁর অধিকার। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সূর্য, চন্দ্র, রাত, দিন, ফজর ও আসর ইত্যাদির কসম খেয়েছেন। কিন্তু সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুর নামে কসম খাওয়ার অধিকার মানুষের নেই। কিন্তু মানুষের জন্য মাখলুক বা সৃষ্টির নামে কসম খাওয়া কুফরি বা শিরক পর্যায়ের গুনাহ। আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল কসম হলো:
❂ মাটির কসম, মা-বাবার কসম, ছেলে-মেয়ের কসম।
❂ পীরের কসম, কাবার কসম, মসজিদের কসম।
❂ শহিদের রক্তের কসম, আগুনের কসম, নিজের চোখের কসম ইত্যাদি।
এই প্রকার কসমগুলো সাধারণ কোনো হারাম কাজ নয় বরং তা সরাসরি শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
এর ভয়াবহতা দুই ধরনের হতে পারে:
◈ ক. ছোট শিরক: যদি কেউ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস অবিচল রেখে এবং সৃষ্টিকে আল্লাহর সমমর্যাদার মনে না করে অভ্যাসবশত বা আবেগে এসব নামে কসম খায় তবে তা ‘শিরকে আসগর’ বা ছোট শিরক হবে। এটি কবিরা গুনাহের চেয়েও ভয়াবহ। তবে এর কারণে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না।
◈ খ. বড় শিরক: যদি কেউ কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর মতো বা আল্লাহর চেয়েও বেশি সম্মানিত মনে করে অথবা অলৌকিক কোনো ক্ষমতার অধিকারী ভেবে তার নামে কসম খায় তবে তা ‘শিরকে আকবার’ বা বড় শিরক হবে। এই প্রকার শিরক মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ اللَّـهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে শরীক করে। আর যাকে ইচ্ছা এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ ক্ষমা করেন।” [সূরা নিসা: ৪৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ
“নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক (অংশীদার) স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়িদা: ৭২]
মোটকথা, সর্বাবস্থায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম খাওয়া শিরক। আর ইসলামের দৃষ্টিতে আসমানের নিচে ও জমিনের উপরে শিরকের চেয়ে বড় ও ভয়াবহ কোনো অপরাধ নেই। তাই আমাদের উচিত জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং কসম করতে হলে কেবল আল্লাহর নামেই করা।
❑ গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনও কিছুর কসম খাওয়ার ব্যাপারে কতিপয় হাদিস:
◈ ১. আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
من حلفَ بغيرِ اللهِ فقد كفرَ أو أشركَ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর কসম খেল সে কুফরি করল (অথবা বলেছেন, সে শিরক করল)।” [আবু দাউদ: ৩২৫১, তিরমিজি: ১৫৩৫, ইরওয়াউল গালীল, ২৫৬১]
◈ ২. ইবনে উমর রা. ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর দেখা পেলেন যখন তিনি একটি কাফেলার মধ্যে ছিলেন এবং নিজের পিতার নামে শপথ করছিলেন। তখন রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের ডেকে বললেন:
ألَا إنَّ اللَّهَ يَنْهَاكُمْ أنْ تَحْلِفُوا بآبَائِكُمْ، فمَن كانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ باللَّهِ، وإلَّا فَلْيَصْمُتْ
“জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের তোমাদের পিতৃপুরুষদের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি শপথ করতে চায় সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা চুপ থাকে।”
[সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬১০৮ ও মুসলিম, হাদিস নং ১৬৪৬]
◈ ৩. ইবনে ওমর রা. থেকে আরও বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
لا تحلِفوا بآبائِكُم مَن حلفَ باللَّهِ فليصدُقْ ومَن حُلِفَ لَه باللَّهِ فليرضَ ومَن لم يرضَ باللَّهِ فليسَ منَ اللَّهِ
“তোমরা তোমাদের পিতাদের নামে কসম কর না। যে আল্লাহর নামে কসম করে তার উচিত সত্য বলা আর যার জন্য আল্লাহর নামে কসম করা হল তার উচিত সন্তুষ্টি প্রকাশ করা। আর যে আল্লাহর নামে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল না তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক নেই।”
[সহিহ ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৭২১]
◈ ৪. আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ
“যার কসম করতে হয় সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে অথবা চুপ থাকে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬১০৮ ও মুসলিম, হাদিস নং ১৬৪৬]
◈ ৫. ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন:
لأَنْ أَحْلِفَ بِاللَّهِ كَاذِبًا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَحْلِفَ بِغَيْرِهِ صَادِقًا
“গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে সত্য কসম অপেক্ষা আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করব━ এটা আমার নিকট অধিক প্রিয়।” [মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক: ১৫৯২৯, ইরওয়াউল গালীল: ২৫৬২]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন,
لأنَّ الحلفَ باللهِ كاذبًا فيه توحيدٌ، والحلفَ بغيرِ اللهِ صادقًا شِرْكٌ، وحسنةُ التّوحيدِ أعظمُ من حسنةِ الصّدقِ وسيِّئةُ الشركِ أشدُّ من سيِّئةِ الكذبِ.
“কেননা আল্লাহর নামে মিথ্যা শপথ করার মধ্যেও তাওহিদ বিদ্যমান আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে সত্য শপথ করাও শিরক। আর তাওহিদের নেকি সত্যবাদিতার নেকির চেয়ে অনেক বড় এবং শিরকের গুনাহ মিথ্যাচারের গুনাহের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।” [জামিউল মাসাইল-ইবনে তাইমিয়া)]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মহিলাদের জন্য জানাজার সালাতে অংশ গ্রহণ এবং জানাজার অনুগমনে করবস্থান পর্যন্ত যাওয়ার বিধান

 একজন মুসলিম মৃত্যু বরণ করলে তার জানাজা ও কাফন-দাফন সম্পন্ন করা মুসলিমদের জন্য ফরজে কেফায়া। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মুসলিম এটি সম্পন্ন করলে সকলের পক্ষ থেকে তা যথেষ্ট হবে।

আর এতে বিশাল সওয়াব রয়েছে। যেমন আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
« مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّىَ عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ ، وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قِيرَاطَانِ » . قِيلَ وَمَا الْقِيرَاطَانِ قَالَ « مِثْلُ الْجَبَلَيْنِ الْعَظِيمَيْنِ »
“যে ব্যক্তি জানাজার সালাতে উপস্থিত হবে তার জন্য রয়েছে এক কীরাত সমপরিমাণ সওয়াব আর যে দাফনেও উপস্থিত হবে তার জন্য দু কীরাত সমপরিমাণ সওয়াব। জিজ্ঞাসা করা হল, কিরাত কী? তিনি বললেন: দুটি বড় বড় পাহাড় সমপরিমাণ।“ [বুখারি ও মুসলিম]
❑ পুরুষ-নারী সকলের জন্য জানাজার সালাতে অংশ গ্রহণ করা শরিয়ত সম্মত। তবে মহিলাদের জন্য দূরবর্তী স্থানে না যাওয়াই উত্তম:
ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষ-নারী সকলের জন্য জানাজার সালাতে অংশ গ্রহণ করা শরিয়ত সম্মত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণ এবং মহিলা সাহাবিগণ পড়েছেন বলে হাদিসে প্রমাণিত। বর্তমান যুগেও মক্কা-মদিনায় প্রতি দিন প্রায় ৫ ওয়াক্ত নামাজ শেষে নারী-পুরুষ সহ সকলেই জানাজার সালাত আদায় করে। পৃথিবীর সর্বত্র একই বিধান। সুতরাং যদি বাড়ির আশেপাশে মসজিদ বা মসজিদের বর্হিঃচত্বরে, খোলা মাঠে, স্থানীয় ইদগাহ ময়দানে জানাজার সালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং পর্দার সাথে মহিলাদের অংশ গ্রহণের সুযোগ থাকে তাহলে তাতে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারে। তবে শর্ত হল, তারা পর্দা লঙ্ঘন করা, পরপুরুষের ভিড়ে প্রবেশ করা, আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা, বিলাপ বা চিৎকার করে কান্নাকাটি ইত্যাদি থেকে বিরত থাকবে এবং এমন কোনও আচরণ করবে না যা ফিতনার কারণ হয়। তবে জানাজার জন্য দূরে কোথাও না যাওয়াই ভালো। কারণ মনে রাখতে হবে, নারীদের জন্য ফরজ সালাতও তার নিজ গৃহে পড়া উত্তম। এমনকি দু হারাম তথা কাবা শরিফ ও মসজিদে নব্বীর থেকেও। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম আহমদ (রহ.) উম্মে হুমাইদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন:
يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي أُحِبُّ الصَّلَاةَ مَعَكَ. قَالَ: “قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ تُحِبِّينَ الصَّلَاةَ مَعِي، وَصَلَاتُكِ فِي بَيْتِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي دَارِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِي
“হে আল্লাহর রসুল! আমি আপনার সাথে নামাজ পড়তে ভালোবাসি।”
তিনি বললেন: ‘আমি জানি যে তুমি আমার সাথে নামাজ পড়তে ভালোবাসো। তবে তোমার ঘরের ভেতরের অংশে (অন্তঃপুরে) নামাজ পড়া তোমার কামরায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। তোমার কামরায় নামাজ পড়া তোমার বাড়ির আঙিনায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। তোমার বাড়ির আঙিনায় নামাজ পড়া তোমার গোত্রের মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। আর তোমার গোত্রের মসজিদে নামাজ পড়া আমার মসজিদে (মসজিদে নববী) নামাজ পড়ার চেয়েও উত্তম।’
ইবনুল মুনজির (রহ.) ‘আল-আওসাত’ গ্রন্থে এই হাদিসের কিছু অংশ বর্ণনা করেছেন এবং এরপর বলেছেন:
“فَإِذَا كَانَ هَذَا سَبِيلَهَا فِي الصَّلَاةِ، وَقَدْ أُمِرْنَ بِالسِّتْرِ، فَالْقُعُودُ عَنِ الْجَنَائِزِ أَوْلَى بِهِنَّ وَأَسْتَرُ.”
“সাধারণ নামাজের ক্ষেত্রে যদি নারীদে অবস্থা এই হয়—যেখানে তাদের পর্দার মধ্যে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তবে জানাজায় শরিক না হওয়া তাদের জন্য আরও বেশি উপযুক্ত এবং অধিকতর পর্দা রক্ষাকারী’।”
তাই জানাজার মত ফরজে কেফায়া সালাতে অংশ গ্রহণ করার জন্য দূরবর্তী স্থানে তাদেরকে যাওয়ার জন্য মহিলাদেরকে উৎসাহিত করা ঠিক নয়। তবে বাড়ির আশেপাশে উপরোক্ত শর্ত সাপেক্ষে অংশ গ্রহণ করতে পারে।
❑ ফতওয়ায়ে বিন বায:
সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি এবং বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. কে এক নারী নারীদের জন্য জানাজার নামাজে অংশ গ্রহণের হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন,
الصلاة على الجنازة مشروعة للجميع للرجال والنساء، تصلي على الجنازة في البيت أو في المسجد، كل ذلك لا بأس به، وقد صلت عائشة والنساء على سعد بن أبي وقاص لما توفي.
فالمقصود: أن الصلاة على الجنائز مشروعة للجميع، وإنما المنهي عنه ذهابها للقبور، اتباع الجنائز إلى المقبرة، وزيارة القبور، أما صلاتها على الميت في مسجد أو في مصلى أو في بيت أهله فلا بأس بذلك
“জানাজার নামাজ পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই শরিয়ত সম্মত। আপনি বাড়িতে বা মসজিদে যেকোনো স্থানে জানাজার নামাজ আদায় করতে পারেন। এতে কোনও অসুবিধা নেই। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) এবং অন্যান্য নারীরা সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করেছিলেন।
মোটকথা, জানাজার নামাজ সবার জন্য শরিয়ত সম্মত। তবে নারীদের জন্য যা নিষিদ্ধ হল, মৃত লাশের পেছনে পেছনে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়া এবং কবর জিয়ারত করা। (অবশ্য এ ব্যাপারেও দ্বিমত আছে-অনুবাদক)
কিন্তু কোনও নারী যদি মসজিদে, ঈদগাহে বা মৃতের পরিবারের ঘরে জানাজার নামাজ আদায় করেন তবে তাতে কোনও সমস্যা নেই।”
✪ তিনি আরও বলেন,
“জানাজার নামাজ পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্যই শরিয়ত সম্মত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“من شهد الجنازة حتى يصلى عليها، فله قيراط، ومن شهدها حتى تدفن، فله قيراطان، قيل يا رسول الله: وما القيراطان؟ قال: مثل الجبلين العظيمين”
“যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে তার জন্য এক কীরাত পরিমাণ সওয়াব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে তার জন্য দু কীরাত পরিমাণ সওয়াব রয়েছে। প্রশ্ন করা হল, “ইয়া রসুলুল্লাহ, দু কীরাত কী?” তিনি বললেন, “দুটি বিশাল পাহাড়ের মতো।” [সহিহ বুখারি, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ১৩২৫; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ৯৪৫]
তবে নারীদের জন্য কবরস্থান পর্যন্ত জানাজা অনুসরণ করে যাওয়া অনুমোদিত নয়। কারণ তাদেরকে এটি থেকে নিষেধ করা হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম-এ বর্ণিত উম্মে আতিয়্যাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদিসে এর প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেন:
نُهِينَا عَنْ اتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ وَلَمْ يُعْزَمْ عَلَيْنَا
“আমাদেরকে (নারীদেরকে) জানাজার অনুগমন করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এতে কঠোরতা করা হয়নি।” [সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ১২৭৮; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয, হাদিস: ৯৩৮]
কিন্তু মৃতের জানাজার নামাজ আদায় করা থেকে নারীদের নিষেধ করা হয়নি। এই নামাজ মসজিদে হোক, বাড়িতে হোক বা ঈদগাহে হোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মসজিদে তাঁর জীবদ্দশাতে এবং তাঁর পরে নারীরা জানাজার নামাজ আদায় করতেন। আর কবর জিয়ারতের বিষয়টিও শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। ঠিক যেমন কবরস্থান পর্যন্ত জানাজা অনুসরণ করা পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট। কারণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর জিয়ারতকারী নারীদেরকে অভিশাপ (লানত) দিয়েছেন।” [মাজমূ’ ফাতাওয়া ইবনে বায (১৩/১৩৪)]
❑ মহিলাদের জানাজার অনুগমনে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়া:
পর্বোক্ত উম্মে আতিয়্যাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর কর্তৃক বর্ণিত হাদিস-যেখানে বলা হয়েছে “আমাদেরকে (নারীদেরকে) জানাজার অনুগমন করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এতে কঠোরতা করা হয়নি।”
❂ এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাষ্যকার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন:
أي ولم يؤكد علينا في المنع كما أكد علينا في غيره من المنهيات، فكأنها قالت: كره لنا اتباع الجنائز من غير تحريم
“অর্থাৎ অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আমাদের ওপর যেভাবে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। পুরুষদের সাথে জানাজার অনুগমনে সেভাবে জোর দেওয়া হয়নি। যেন তিনি বলতে চেয়েছেন যে,—আমাদের জন্য জানাজার অনুসরণ করাকে ‘মাকরুহ’ (অ পছন্দনীয়) করা হয়েছে। তবে তা ‘হারাম’ (পুরোপুরি নিষিদ্ধ) করা হয়নি।”
❂ ইমাম কুরতুবি (র.) বলেন:
ظاهر سياق أم عطية أن النهي نهي تنزيه
“উম্মে আতিয়্যাহ (রা.)-এর বর্ণনার ধরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এই নিষেধটি হল ‘নাহি তানজিহি’ (তথা অ পছন্দনীয় বা অনুত্তম কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য নিষেধ)।” আর জমহুর (অধিকাংশ) আলেমগণও এই মতটিই পোষণ করেছেন।”
মোটকথা, জানাজায় অংশগ্রহণ করা আর জানাজার অনুগমনে কবরস্থানে যাওয়া দুটি ভিন্ন বিষয়। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, নারীদের জানাজার সালাতে অংশগ্রহণ হারাম নয়। তবে জানাজার অনুগমনে কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

শুকরিয়ার জন্য বিশেষ কোনও নামাজ নেই আছে সেজদা

 যে কোনও সফলতা, বিজয়, আনন্দ দায়ক ঘটনা, সুসংবাদ লাভ কিংবা যে কোন দুশ্চিন্তা বা বিপদাপদ কেটে যাওয়ার কারণে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া হিসেবে একটি সেজদায়ে শোকর দেওয়া সুন্নত। এটি বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা সু প্রমাণিত। কিন্তু শুকরিয়া হিসেবে দুই বা ততোধিক রাকাত নামাজ পড়ার ব্যাপারে ওলামাদের মাঝে কিছুটা দ্বিমত থাকলেও অধিক বিশুদ্ধ মতে তা সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।

এ বিষয়ে দু-একটি জয়িফ বা দুর্বল হাদিস পাওয়া যায়। উক্ত হাদিসগুলোর তাহকিক বা সনদ বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:
✪ ১ নং হাদিস: প্রখ্যাত সাহাবি কাব ইবনে মালেক (রা.)-এর তাওবা কবুল হওয়ার পর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাঁর সঙ্গীদেরকে দুই রাকাত সালাত করার অথবা দুটি করে সিজদা করার নির্দেশ দেন।
أن رسول الله صلى الله عليه وسلم أمر كعب بن مالك حين تيب عليه وعلى أصحابه أن يصلي ركعتين أو سجدتين
এই হাদিসটি ইমাম হাকিম তাঁর আল-মুস্তাদরাক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। তবে এর সনদ দুর্বল। ইমাম উকাইলি এই হাদিসের একজন বর্ণনাকারী। ইয়াহইয়া ইবনুল মুসান্না তার সম্পর্কে বলেছেন যে, তাঁর হাদিস অসংরক্ষিত (غير محفوظ) এবং তাঁকে হাদিস বর্ণনাকারী হিসেবে চেনা যায় না। সুতরাং এই হাদিসটি সহিহ নয়। [আয যুয়াফাউল কাবির ৪/৪৩২]
✪ ২ নং হাদিস: সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বদর যুদ্ধে কুরাইশ নেতা আবু জাহেলের খণ্ডিত মস্তক পাওয়ার সুসংবাদ পান তখন দুই রাকাত সালাত আদায় করেন।
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى يَوْمَ بُشِّرَ بِرَأْسِ أَبِي جَهْلٍ رَكْعَتَيْنِ
এই হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তাঁর সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন (হাদিস নং ১৩৯১)। কিছু আলেম যেমন: ইবনে হাজার ও ইবনুল মুলাক্কিন এটিকে হাসান বলেছেন। তবে ইমাম বুসিরি এই সনদে দুর্বলতা উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাকারী শা’ছা বিনত আব্দুল্লাহ সম্পর্কে কেউ জারহ বা তাদিল (দোষ বা প্রশংসা) করেননি এবং সালামা ইবনে রাজা সম্পর্কেও দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। শাইখ আলবানিও এটিকে ‘যঈফ সুনান ইবনে মাজাহ’-এ দুর্বল বলেছেন।
1-ما رواه الحاكم عن كعب بن عجرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم أمر كعب بن مالك حين تيب عليه وعلى أصحابه أن يصلي ركعتين أو سجدتين . رواه الحاكم في “المستدرك على الصحيحين” (5/148).
إلا أن هذا الحديث لا يصح ؛ لأن في إسناده : يحيى بن المثنى .
قال العقيلي : “حديثه غير محفوظ ، ولا يعرف بالنقل” انتهى من “الضعفاء الكبير” (4/ 432).
2- ما رواه ابن ماجه (1391) من طريق سَلَمَة بْن رَجَاءٍ حَدَّثَتْنِي شَعْثَاءُ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى رضي الله عنه (أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى يَوْمَ بُشِّرَ بِرَأْسِ أَبِي جَهْلٍ رَكْعَتَيْنِ) .
وهذا الحديث حسنه بعض العلماء كابن حجر وابن الملقن . ينظر : “البدر المنير” (9 /106) ، تلخيص الحبير (4 /107) .
ولكن قال البوصيري : ” هذا إسنادٌ فيه مقال ، شَعْثَاء بنتُ عبد الله ، لَمْ أَرَ مَنْ تَكَلَّمَ فِيهَا لَا بِجُرْحٍ وَلَا بِتَوْثِيقٍ.
وَسَلَمَة بْن رَجَاء لَيَّنَهُ اِبْن مُعِين ، وَقَالَ اِبْن عَدِّي : حَدَّثَ بِأَحَادِيث لَا يُتَابَع عَلَيْهَا ، وَقَالَ النَّسَائِيُّ : ضَعِيف ، وَقَالَ الدَّارَقُطْنِيُّ : يَنْفَرِد عَنْ الثِّقَات بِأَحَادِيث ، وَقَالَ أَبُو زُرْعَة : صَدُوق ، وَقَالَ أَبُو حَاتِم : مَا بِحَدِيثِهِ بَأْس “. انتهى من “مصباح الزجاجة ” (1 / 211) .
وكذلك ضعفه الشيخ الألباني في ضعيف سنن ابن ماجه
উল্লেখ্য যে, মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হানি রা. এর ঘরে ৮ রাকাত নফল সালাত পড়েছিলেন। অনেক মুহাদ্দিসের মতে তা ছিল তার নিয়মিত সালাতুয যুহা বা চাশতের সালাত। কেননা সহিহ মুসলিমের বর্ণায় আছে,
ثُمَّ صَلَّى ثَمَانَ رَكَعَاتٍ سُبْحَةَ الضُّحَى
“তারপর তিনি আট রাকআত চাশতের সালাত আদায় করলেন।” আবার অনেকের মতে, তা ছিল শুকরিয়ার নামাজ। কিন্তু তারা বলেন, তা কা**ফেরদের থেকে দেশ জয়ের সাথে সম্পৃক্ত।
অর্থাৎ যখন কোনও কা**ফের অধ্যুষিত দেশ মুসলিমদের করতলগত হবে তখন আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে দু বা ততোধিক রাকাত নামাজ পড়া জায়েজ আছে। সাধারণভাবে যে কোনও সুসংবাদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এ কারণে মুহাক্কিক আলেমগণ বলেন, অধিক বিশুদ্ধ মতে সাধারণ আনন্দদায়ক সংবাদে শুকরিয়ার নামাজ পড়া শরিয়ত সম্মত নয়।
❑ এ বিষয়ে নিম্নে কয়েকজন বিশ্ববরেণ্য আলেমের মতামত উপস্থাপন করা হলো:
✪ রামলি (শিহাব উদ্দিন মোহাম্মদ আর রামলি, মৃত্যু ১০০৪ হি.) বলেন,
لَيْسَ لَنَا صَلَاةٌ تُسَمَّى صَلَاةَ الشُّكْرِ ” . انتهى من ” تحفة المحتاج ” (3 / 208).
“আমাদের জানামতে, সালাতুশ শোকর ‌(কৃতজ্ঞতার সালাত) নামে কোন সালাত নেই।” [তুহফাতুল মুহতাজ, ৩/২০৮]
✪ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. বলেন,
” لا أعلم أنه ورد شيء في صلاة الشكر ، وإنما الوارد في سجود الشكر “. انتهى “مجموع الفتاوى ” (11 /424)
“সালাতুশ শোকর বা কৃতজ্ঞতার সালাত-এর ব্যাপারে কোন হাদিস এসেছে বলে জানা নেই। তবে সেজদায়ে শোকর বা কৃতজ্ঞতার সেজদার ব্যাপারে হাদিস এসেছে।” [মাজমুল ফাতাওয়া, ১/৪২৪]
✪ আল্লামা শাইখ উসাইমিন বলেন,
” لا أعلم في السنة صلاة تسمى : صلاة الشكر ، ولكن فيها سجوداً يسمى : سجود الشكر”. انتهى ” فتاوى نور على الدرب” (6 / 17)
“সুন্নাহয় (হাদিসে) বর্ণিত হয়েছে এমন কোন নামাজের কথা জানা নাই যাকে ‘সালাতুশ শোকর বা কৃতজ্ঞতার’ সালাত বলা হয়। তবে এ জন্য সেজদা রয়েছে যাকে ‘সেজদায়ে শোকর’ বলা হয়।” [ফাতাওয়া নুরন আলাদ দারব, ৬/১৭]
✪ তিনি আরও বলেন,
” الشكر ليس له صلاة ذات ركوع وقيام ، وإنما له سجود فقط “. انتهى “فتاوى نور على الدرب” (6 / 18)
“শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতার জন্য কিয়াম ও‌ রুকু সম্বলিত কোন সালাত নেই। শুধু রয়েছে সেজদা।” [ফাতাওয়া নুরন আলাদ দারব, ৬/১৮] (Source: islamqa-সংক্ষেপেয়িত)। আল্লাহু আলম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

Translate