Saturday, July 19, 2025

অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য চেয়ারে বসে সালাত আদায়ের নিয়ম

 প্রশ্ন: অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য চেয়ারে বসে সালাত আদায়ের নিয়ম নীতি কেমন হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আলোচনার শুরুতেই একটি জরুরি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই আজকাল মসজিদের ভেতরে চেয়ারে বসে সালাত আদায় যেন এক প্রায়-উৎসবমুখর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সুযোগ পেলেই কেউ না কেউ কোনো শারঈ বৈধতা যাচাই না করে চেয়ারে বসে পড়ছেন। সারাদিন দৌঁড়ঝাপ করে,বাইরের সব পাহাড় ভেঙে এসে মসজিদে প্রবেশ করা মাত্রই চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ে এ যেন অলিখিত রীতি। চেয়ারে বসে সালাত আদায় করার জন্য যেসব ওজর-আপত্তি থাকা লাগে, তা দেখার কোনোই প্রয়োজন নেই। অথচ শরিয়ত সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, চেয়ারে বসে সালাত আদায়ের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট ওজর ও শর্ত পূরণ আবশ্যক; এগুলো ছাড়া এ পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তবে দেখা যায় অনেকেই এসব শর্তের খোঁজ-খবর নেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেন না। তাদের ভাবনা ‘সালাতই তো পড়ছি আর কী এত জটিলতা!’ কিন্তু কঠিন সত্য হলো যারা আজকে চেয়ারে বসে সালাত আদায় করছেন তাদের অধিকাংশের সালাত বাতিল হয়ে যাচ্ছে।কারন চেয়ারে বসে সালাত আদায় করতে গিয়ে সালাতের একাধিক রুকন ও ওয়াজিব তরক করে চলেছেন তারা হরহামেশা। তবে হয়তো জাহালাত বা অজ্ঞতার কারণে আল্লাহ কবুল করছেন। এটি তাঁর অফুরন্ত করুণার বিষয়। তারপরও আমাদের দায়িত্ব হলো সালাত এমনভাবে আদায় করা, যা সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হয়, যেন ইবাদত শুদ্ধ থাকে এবং কবুল হওয়ার আশা বাঙ্ময় থাকে।
.
প্রথমত: মূলনীতি হল: কিয়াম, রুকু ও সেজদা সলাতে রুকন (আবশ্যকীয় কাঠামো)। যে ব্যক্তির সক্ষমতা আছে তার জন্য শরিয়তের বর্ণিত কাঠামো অনুযায়ী এগুলো পালন করা ওয়াজিব (আবশ্যকীয়)। শরিয়ত অনুমোদিত ওজর ছাড়া যে ব্যক্তি সলাতের তাকবীরে তাহরীমার শুরু থেকে সালাম ফেরানো পর্যন্ত দাঁড়াবে না তার সলাত বাতিল। দাঁড়ানোটা’ সলাতের রুকন হওয়া ফরয ও সলাতের জন্য খাস। দলিল হল: আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা আল্লাহ্‌র জন্য বিনয়াবনত হয়ে দাঁড়াও”(সূরা বাক্বারাহ: ২৩৮) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস: “তুমি দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করো”।(সহিহ বুখারী হা/১০৬৬) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সওয়ারীর ওপর নফল সলাত আদায় করতেন। যখন ফরয সলাত পড়তে চাইতেন তখন তিনি সওয়ারী থেকে নেমে যেতেন।(সহিহ বুখারী হা/৯৫৫) ও সহিহ মুসলিম হা/৭০০) তিনি (ﷺ) এটি করতেন দাঁড়ানোর রুকন আদায় করা ও কিবলামুখী হওয়ার জন্য। তবে নফল সলাতের দাঁড়ানো ওয়াজিব নয়। বরং নফলের ক্ষেত্রে বসে সলাত আদায় করা জায়েয।’ কারো দাঁড়ানোর সক্ষমতা থাকার পরেও সে যদি বসে নফল সলাত আদায় করে তাহলে সে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সলাত আদায়কারীর অর্ধেক সওয়াব পাবে। যেহেতু আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) এর হাদিসে এসেছে: “তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমাকে হাদিস বলা হয়েছে যে, আপনি বলেছেন বসে সলাত আদায়কারী অর্ধেক সওয়াব পাবে। কিন্তু আপনি তো বসে সলাত আদায় করেন। তিনি বললেন: ঠিকই। কিন্তু আমি তোমাদের কারো মত নই।”(ইমাম মুসলিম হা/৭৩৫; বর্ণিত হাদিসের অংশবিশেষ) উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে যেই ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও বসে সলাত আদায় করে তার সলাত বাতিল।
.
দ্বিতীয়ত: অসুস্থ ব্যক্তির সলাতের ক্ষেত্রে নীতি হল: সলাতের যে যে রুকন ও ওয়াজিব তার পক্ষে আদায় করা সম্ভবপর সেগুলো সে আদায় করবে। আর যেগুলো আদায় করা তার সাধ্যে নেই সেগুলো তার জন্য মওকুফ হবে। অতএব তিনি যদি দাঁড়িয়ে সলাত শুরু করতে সক্ষম হন তাহলে দাঁড়িয়ে সলাত শুরু করা তার উপর ওয়াজিব। এরপর যদি দাঁড়িয়ে থাকা তার জন্য কষ্টকর হয় তাহলে তিনি বসে পড়বেন। যেমন এমন একজন অসুস্থ ব্যক্তি, যিনি মেঝেতে বসে সালাত আদায় করলে সাজদাহ দিতে পারেন কিন্তু চেয়ার থেকে নেমে মেঝেতে বসতে পারেন না বা মেঝে থেকে উঠে চেয়ারে বসতে পারেন না এবং কিয়ামও করতে পারেন না। এমন অসুস্থ ব্যক্তিকে মেঝেতে বসেই সালাত আদায় করবেন। কারণ, সে কিয়ামের (দাঁড়িয়ে সালাত পড়ার) সামর্থ্য হারিয়েছে, তাই তার জন্য কিয়াম মাফ। তবে যেহেতু তিনি সাজদাহ দিতে পারেন এবং মেঝেতে বসে থাকতে পারেন তাই সাজদাহ, দুই সাজদাহর মাঝের বৈঠক, তাশাহহুদের বৈঠক তার জন্য ওয়াজিব ও রুকন। তিনি যদি চেয়ারে বসে সালাত আদায় করেন তবে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ এ অবস্থায় সে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন রুকনগুলো পরিত্যাগ করছে যেগুলো সে করতে সক্ষম ছিল যেমন সিজদা ও বৈঠক।
.
আবার যিনি সিজদাহ দিতে ও মেঝেতে বসতে অক্ষম; কিন্তু কিয়াম করতে সক্ষম এমন ব্যক্তি যদি চেয়ারে বসে সালাত আদায় করেন, তবে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ তিনি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিয়াম বাদ দিয়ে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ ধরুন চার রাকাআত বিশিষ্ট সালাতের দুই রাকাআত দাঁড়িয়ে পড়তে সক্ষম এমন ব্যক্তি যদি গোটা চার রাকাআতই বসে আদায় করে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। কারণ তিনি সক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও দুই রাকাআতের কিয়াম বাদ দিয়ে দিয়েছেন। সারসংক্ষেপে: সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের মূলনীতি হলো যে যতটুকু সক্ষম, ততটুকুই তাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নিজের পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়া বা অবহেলা করা বৈধ নয়। পূর্বোক্ত আলোচনার সপক্ষে শরয়ি দলিল হচ্ছে ফিকাহশাস্ত্রের দুটো সাধারণ নীতি; যে নীতিদ্বয়ের পক্ষে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর দশ দশ দলিলের সাক্ষ্য রয়েছে। প্রথম নীতিটি হচ্ছে: المشقة تجلب التيسير (কাঠিন্য সহজায়ন আনে)। এর সপক্ষে দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বাণী: لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا (আল্লাহ্‌ কারো উপর এমন কোন দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না যা তার সাধ্যাতীত)[সূরা বাক্বারা, আয়াত: ২৮৬] দ্বিতীয় নীতিটি হচ্ছে: الميسور لا يسقط بالمعسور (কষ্টসাধ্য সহজসাধ্যকে মওকুফ করে না)। এর দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বাণী: فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ (অনুবাদ: তোমরা সাধ্যমত আল্লাহ্‌কে ভয় কর)[সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১৬] এটি একটি মহান নীতি। এ নীতি সম্পর্কে আলেমগণ বলেন: “এটি এত ব্যাপক একটি নীতি; যতদিন শরিয়তের মৌলিক বিধানগুলো কায়েম থাকবে ততদিন এটি ভুলে যাওয়া যাবে না”(সূয়ূতী-এর ‘আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের’ পৃষ্ঠা-২৯৩) হাদিসেও এসেছে, ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “আমার অর্শ রোগ ছিল। সে প্রসঙ্গে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সলাতের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন: তুমি দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করবে; যদি দাঁড়াতে না পার তাহলে বসে পড়বে। যদি বসতে না পার তাহলে কাত হয়ে শুয়ে সলাত আদায় করবে ।”(সহিহ বুখারী হা/১০৬৬) শাওকানী বলেন:“ইমরান (রাঃ) এর হাদিস প্রমাণ করে যে, যে ব্যক্তির কোন ওজর ঘটেছে, যার কারণে সে দাঁড়াতে পারে না; তার জন্য বসে সলাত আদায় করা জায়েয এবং যে ব্যক্তির এমন কোন ওজর ঘটেছে যার কারণে সে বসতে পারে না; তার জন্য কাত হয়ে শুয়ে সলাত আদায় করা জায়েয।”(শাওকানী; নাইলুল আওতার; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৪৩)
.
তৃতীয়ত: যেসকল ব্যক্তি (নারী -পুরুষ) রোগের কারণে কিংবা বয়সের কারণে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে অক্ষম সেই সকল ব্যক্তিদের নিয়ে শারঈ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে চিন্তা ভাবনা করলে মাত্র তিন ক্ষেত্রে চেয়ারে বসে সালাত আদায়ের সুযোগ রয়েছে। যথা: (১).যিনি মেঝেতে বসে থাকতে পারেন না এবং দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না এমন ব্যক্তি চেয়ারে বসে সালাত আদায় করতে পারেন। (২).যিনি মেঝেতে বসে থাকতে পারেন না, তবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। তিনি কিয়ামের সময় দাঁড়িয়ে থাকবেন আর সাজদাহর সময় চেয়ারে বসে সাজদাহ দিতে পারবেন। (৩). দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, তবে চেয়ার থেকে নেমে মেঝেতে সাজদাহ দিতে পারেন। তিনি কিয়ামের সময় চেয়ারে বসতে পারবেন, তবে সাজদাহ অবশ্যই মেঝেতে দিতে হবে। মোটকথা এ বিষয়ে সতর্ক থাকা বাঞ্চনীয়। যেমন যে ব্যক্তি দাঁড়ানো ত্যাগ করার ক্ষেত্রে ওজরগ্রস্ত; তার এই ওজর তার জন্য রুকু-সেজদাকালে চেয়ারে বসাকে বৈধ করবে না। সলাতের ওয়াজিবসমূহের ক্ষেত্রে বিধি হলো: মুসল্লি যতটুকু করার সক্ষমতা রাখেন ততটুকু করা তার উপর ওয়াজিব। আর যা করতে অক্ষম ততটুকু তার উপর থেকে মওকুফ হবে।যে ব্যক্তি দাঁড়াতে অক্ষম তার জন্য দাঁড়ানোর সময় চেয়ারে বসা জায়েয হবে; সে রুকু-সিজদা সঠিক কাঠামোতে আদায় করবে। আর যদি দাঁড়াতে সক্ষম হয়; কিন্তু রুকু-সেজদা দিতে কষ্ট হয়; তাহলে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করবে, এরপর রুকু-সেজদাকালে চেয়ারে বসবে এবং সেজদাকালে মাথাকে রুকুর চেয়ে বেশি নোয়াবে।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেন:ومن قدر على القيام وعجز عن الركوع أو السجود : لم يسقط عنه القيام ، ويصلي قائماً فيومئ بالركوع ، ثم يجلس فيومئ بالسجود ، وبهذا قال الشافعي …لقول الله تعالى : ( وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ ) ، وقول النبي صلى الله عليه وسلم : ( صل قائماً ) ؛ ولأن القيام ركن لمن قدر عليه ، فلزمه الإتيان به كالقراءة ، والعجز عن غيره لا يقتضي سقوطه كما لو عجز عن القراءة“যে ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম, রুকু কিংবা সেজদা দিতে অক্ষম: তার জন্য দাঁড়ানো মওকুফ হবে না। সে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করবে । ইশারাতে রুকু করবে। এরপর বসবে এবং ইশারাতে সেজদা করবে। এটি ইমাম শাফেয়ি বলেছেন…। আল্লাহ্‌ তাআলার এ বাণী: “আর আল্লাহ্‌র প্রতি বিনয়বনত হয়ে দাঁড়াও”। এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “তুমি দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করবে”-র প্রেক্ষিতে। তাছাড়া যে ব্যক্তির দাঁড়ানোর সক্ষমতা আছে তার জন্য এটি রুকন (আবশ্যকীয় কাঠামো)। তাই তেলাওয়াতের মতো এটি পালন করা আবশ্যকীয়। অন্য কোনোটি পালনে অক্ষম হওয়া এটি মওকুফ হওয়াকে অনিবার্য করে না; যেমনিভাবে কেউ যদি তেলাওয়াত করতে অক্ষম হয়।”(ইবনু কুদামাহ,আল-মুগনী, খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪৪ থেকে সংক্ষেপে সমাপ্ত)।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেন:
” الشريعة طافحة بأن الأفعال المأمور بها مشروطة بالاستطاعة والقدرة ، كما قال النبي صلى الله عليه وسلم لعمران بن حصين : ( صَلِّ قَائِمًا ، فَإِن لَم تَستَطِع فَقَاعِدًا ، فَإِن لَم تَستَطِع فَعَلَى جَنبٍ ) رواه البخاري (1117) .وقد اتفق المسلمون على أن المصلي إذا عجز عن بعض واجباتها – كالقيام أو القراءة أو الركوع أو السجود أو ستر العورة أو استقبال القبلة أو غير ذلك – سقط عنه ما عجز عنه . وإنما يجب عليه ما إذا أراد فعله إرادة جازمة أمكنه فعله . بل مما ينبغي أن يعرف ، أن الاستطاعة الشرعية المشروطة في الأمر والنهي لم يكتف الشارع فيها بمجرد المكنة ولو مع الضرر ، بل متى كان العبد قادرا على الفعل مع ضرر يلحقه جُعل كالعاجز في مواضع كثيرة من الشريعة ، كالتطهر بالماء ، والصيام في المرض ، والقيام في الصلاة ، وغير ذلك ، تحقيقا لقوله تعالى : ( يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ اليُسرَ وَلا يُرِيدُ بِكُمُ العُسرَ ) ولقوله تعالى : ( مَا جَعَلَ عَلَيكُم فِي الدِّينِ مِن حَرَجٍ ) ولقوله تعالى : ( مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجعَلَ عَلَيكُم مِن حَرَجٍ ) . وفى الصحيح عن أنس عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ( إِنَّمَا بُعِثتُم مُيَسِّرِينَ وَلَم تُبعَثُوا مُعَسِّرِينَ )
“নির্দেশিত আমলগুলো সাধ্য ও সক্ষমতার শর্তযুক্ত এর উদাহরণ শরিয়তে ভরপুর। যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) কে বলেন: তুমি দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করো, যদি তা না পার তাহলে বসে বসে আদায় কর, যদি সেটাও না পার তাহলে শুয়ে শুয়ে আদায় কর।”[সহিহ বুখারী (১১১৭) মুসলিমগণ এ মর্মে একমত যে, সলাত আদায়কারী যদি সলাতের কিছু ওয়াজিব পালনে অক্ষম হন; যেমন- দাঁড়ানো, ক্বিরাত পড়া, রুকু করা, সিজদা করা, সতর ঢাকা, কিবলামুখী হওয়া কিংবা অন্য কোন ওয়াজিব তাহলে সে যা পালন করতে অক্ষম সেটা তার উপর থেকে মওকুফ হবে। তার উপর সেটা পালন করা ওয়াজিব যেটা পালন করার সে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেটা পালন করার সাধ্য তার রয়েছে। বরং জেনে রাখা উচিত যে, শরয়ি নির্দেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে সামর্থ্য থাকার যে শর্ত রয়েছে সে ক্ষেত্রে শরিয়তপ্রণেতা ক্ষতিসমেত সামর্থ্য থাকাকে বুঝাননি। বরং বান্দার যদি আমল করার সক্ষমতা থাকে; কিন্তু এতে তার কিছু ক্ষতি সাধিত হয়; এমন সক্ষমতাকে শরিয়তের অনেক আমলের ক্ষেত্রে অক্ষমতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে; উদাহরণত: পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা, রোগ নিয়ে রোযা রাখা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়া ইত্যাদি। সেটা আল্লাহ তাআলার এ বাণী বাস্তবায়নার্থে: “আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তিনি তোমাদের জন্য কঠিন করতে চান না” এবং তাঁর এ বাণীর বাস্তবায়নার্থে: “দ্বীনি ক্ষেত্রে তিনি তোমাদের ওপর কাঠিন্য আরোপ করেননি”। এবং তাঁর এ বাণীরও বাস্তবায়নার্থে: “আল্লাহ্‌ তোমাদের ওপর কাঠিন্য আরোপ করতে চান না”। এবং সহিহ বুখারীতে আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা সহজকারীরূপে প্রেরিত হয়েছ; কাঠিন্য আরোপকারী হিসেবে নয়।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪৩৮-৪৩৯)
.
শাইখ মুহাম্মদ মুখতার আল-শানক্বিতি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “ওজরগ্রস্ত ব্যক্তি যিনি দাঁড়াতে পারেন না তিনি বসে বসে সলাত আদায় করবেন। যদি কেউ দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলতে সক্ষম হয় তাহলে সে এসে সরাসরি বসে পড়ে তাকবীরে তাহরীমা বলবে না; বরং দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলবে। কেননা তার পক্ষে দাঁড়িয়ে তাকবীরে তাহরীমা বলা সম্ভব। এরপর তার দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হলে বসে পড়বে। যদি তার পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভবপর না হয় কিংবা কঠিন হয় যেমন পক্ষাঘাত গ্রস্তের অবস্থা তাহলে সেক্ষেত্রে সে ব্যক্তি বসে বসে তাকবীরে তাহরীমা বলবে। আর যদি তার পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভবপর হয় তাহলে সে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করবে এবং চেয়ারটিকে তার পিছনেই রাখবে; এতে কোন অসুবিধা নেই। যদি তার কষ্ট হয় তাহলে সে ব্যক্তি বসে পড়বে। যেহেতু ফিকাহ-এর একটি সূত্র হচ্ছে— أن الضرورة تقدر بقدرها” (জরুরী অবস্থা বা অনন্যোপায় অবস্থাকে তার সীমায় সীমিত রাখা হবে)। এই সূত্রের আরেকটি উপ-সূত্র হচ্ছে— ما أبيح للحاجة يُقَدَّر بقدْرِها (প্রয়োজনের তাগিদে যা বৈধ করা হয়েছে সেটা তার সীমাতে সীমাবদ্ধ থাকবে) সুতরাং তার জরুরী অবস্থা হচ্ছে— দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হওয়া; তাই আমরা বলব: আপনি দাঁড়িয়ে তাকবীর দিয়ে বসে পড়ুন। যদি কারো জরুরী অবস্থা এমন হয় যে, তিনি দাঁড়াতেই পারেন না; তাহলে আমরা বলব: আপনি বসে বসেই তাকবীর দিন; কোন অসুবিধা নেই। এটির বিধান এর অবস্থাভেদে। ওটির বিধান সেটির অবস্থাভেদে। এ ব্যাপারে মানুষকে সাবধান করতে হবে। কেননা কখনও কখনও আপনি দেখবেন যে, যে ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম তিনি বসে বসে তাকবীর দিচ্ছেন। অথচ তিনি দাঁড়াতে পারেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে চেয়ার নিতে পারেন, চেয়ার বহন করে বের হতে পারেন এমন ব্যক্তির পক্ষে তাকবীরে তাহরীমার রুকনটি বসে বসে পালন করার রুখসত (ছাড়) দেয়া যায় না। তাকে এ বিষয়ে সাবধান করতে হবে। যদি কেউ দাঁড়াতেই না পারে আমরা বলব: তিনি বসে পড়ুন।”(শারহু যাদিল মুস্তাকনি; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৯১; শামেলার নম্বর অনুযায়ী)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন:الواجب على من صلى جالسا على الأرض ، أو على الكرسي ، أن يجعل سجوده أخفض من ركوعه ، والسنة له أن يجعل يديه على ركبتيه في حال الركوع ، أما في حال السجود فالواجب أن يجعلهما على الأرض إن استطاع ، فإن لم يستطع جعلهما على ركبتيه ، لما ثبت عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال : ( أمرت أن أسجد على سبعة أعظم : الجبهة – وأشار إلى أنفه – واليدين ، والركبتين ، وأطراف القدمين ) .ومن عجز عن ذلك وصلى على الكرسي فلا حرج في ذلك ، لقول الله سبحانه : ( فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ) وقول النبي صلى الله عليه وسلم : ( إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ ) متفق على صحته”যে ব্যক্তি ভূমিতে বসে বা চেয়ার বসে সলাত আদায় করে তার উপর আবশ্যক হলো: তার সেজদাকে রুকুর চেয়ে নীচু করা। সুন্নাহ হলো রুকুর সময় সে তার হাতদ্বয় তার হাঁটুর উপর রাখবে। আর সেজদা অবস্থায় ওয়াজিব হলো: সক্ষম হলে হাতদ্বয় ভূমিতে রাখা। আর সক্ষম না হলে হাতদ্বয় হাঁটুর উপর রাখা। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে সাতটি হাড্ডির উপর সেজদা করতে: কপাল, তিনি নাকের দিকে ইশারা করেন, হাতদ্বয়, হাঁটুদ্বয় এবং পায়ের আঙ্গুলের উপর।”যে ব্যক্তি এভাবে করতে অক্ষম হওয়ায় চেয়ারে বসে সলাত আদায় করে তাতে কোনো আপত্তি নেই। দলিল হলো আল্লাহ্‌ তাআলার বাণী: “তোমরা আল্লাহকে সাধ্যানুযায়ী ভয় কর”। এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “আমি যখন তোমাদেরকে কোনো আদেশ করি তখন তোমরা সাধ্যানুযায়ী সেটি পালন করো।”(সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম; বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ১৪৫, ১৪৬)
.
চতুর্থত: জামআতে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে চেয়ার কাতারে রাখা: আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে, যে ব্যক্তি বসে সলাত আদায় করে তার ক্ষেত্রে ধর্তব্য হলো: তার নিতম্ব কাতারের সমান্তরালে হওয়া; কাতার থেকে আগে বা পিছে না হওয়া। কেননা এটাই হলো সেই স্থান যেখানে তার দেহ স্থিতিশীল হয়। দেখুন আসনাল মাতালিব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২২২; তুহফাতুল মুহতাজ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৫৭ এবং শারহু মুনতাহাল ইরাদাত; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৭৯)।
.
আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যাতে এসেছে:يُشْتَرَطُ لِصِحَّةِ الاقْتِدَاءِ (أي اقتداء المأموم بالإمام) أَلا يَتَقَدَّمَ الْمُقْتَدِي إمَامَهُ فِي الْمَوْقِفِ عِنْدَ جُمْهُورِ الْفُقَهَاءِ ( الْحَنَفِيَّةِ وَالشَّافِعِيَّةِ وَالْحَنَابِلَةِ ) . . .وَالاعْتِبَارُ فِي التَّقَدُّمِ وَعَدَمِهِ لِلْقَائِمِ بِالْعَقِبِ , وَهُوَ مُؤْخِرُ الْقَدَمِ لا الْكَعْبِ , فَلَوْ تَسَاوَيَا فِي الْعَقِبِ وَتَقَدَّمَتْ أَصَابِعُ الْمَأْمُومِ لِطُولِ قَدَمِهِ لَمْ يَضُرَّ . . . . . وَالْعِبْرَةُ فِي التَّقَدُّمِ بِالأَلْيَةِ لِلْقَاعِدِينَ , وَبِالْجَنْبِ لِلْمُضْطَجِعِينَ “ইক্বতিদা শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো (অর্থাৎ ইমামের পেছনে মোক্তাদির ইক্বতিদা): মোক্তাদি দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ইমামের অগ্রবর্তী না হওয়া; এটি জমহুর ফিকাহবিদ (হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) এর অভিমত।অগ্রবর্তী হওয়া বা না হওয়ার ক্ষেত্রে ধর্তব্য হলো: দণ্ডায়মান ব্যক্তির পায়ের গোড়ালি; আর তা হলো পায়ের পাতার পশ্চাদ্ভাগ; টাখনু নয়। যদি পায়ের গোড়ালি সমান্তরালে হয়; কিন্তু মোক্তাদির আঙ্গুল লম্বা হওয়ায় সামনে চলে যায়; এতে অসুবিধা নেই। আর উপবিষ্টের ক্ষেত্রে ধর্তব্য হলো নিতম্ব। আর শয়নরত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার পার্শ্বদেশ।”(আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যাতে; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২১) তাই মুসল্লি যদি সলাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চেয়ারে বসে সলাত আদায় করেন তাহলে তিনি তার বসার স্থানকে কাতারের সমান্তরাল করবেন। যদি তিনি দাঁড়িয়ে সলাত দায় করেন ; কিন্তু রুকু ও সেজদাকালে বসেন; এ সম্পর্কে আমরা ফাযিলাতুশ শাইখ আব্দুর রহমান আল-বার্‌রাককে জিজ্ঞেস করেছি: তিনি বলেন:عن هذا فأفاد بأن العبرة بالقيام . فيحاذي الصف عند قيامه, وعلى هذا سيكون الكرسي خلف الصف ، فينبغي أن يكون في موضع بحيث لا يتأذى به من خلفه من المصلين .والله تعالى أعلم .”ধর্তব্য হবে দাঁড়ানো অবস্থা। অতএব সেই ব্যক্তি দাঁড়ানো অবস্থাকে কাতারের সমান্তরাল করবেন। এই অভিমতের ভিত্তিতে তখন চেয়ার কাতারের পেছনে থাকবে। তবে এমন স্থানে হওয়া উচিত যাতে করে পেছনের মুসল্লিরা কষ্ট না পায়। আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫০৬৮৪)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

অসুস্থ ব্যক্তি কিভাবে সালাত আদায় করবেন

 প্রশ্ন: অসুস্থ ব্যক্তি (নারী পুরুষ) কিভাবে সালাত আদায় করবেন?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আলোচনার শুরুতেই আমরা একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই আর তা হচ্ছে, ঈমানের স্তম্ভগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাকদীরের প্রতি ঈমান। কোন মুসলিমের ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে জানবে যে, সে যাতে আক্রান্ত হয়েছে সেটা তাকে ভুল করে যাওয়ার ছিল না। আর যাতে সে আক্রান্ত হয়নি সেটাতে সে আক্রান্ত হওয়ার ছিল না। আল্লাহ্‌ তাআলা কোন মুমিনের তাকদীরে যে রোগবালাই, বিপদ-মুসিবত রেখেছেন সেগুলোর ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া তার সাধ্যে আর কিছু নেই। ধৈর্য ধরা তার পূর্ণাঙ্গ ঈমানের আলামত। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তাকে বেহিসাব পুরস্কার দিবেন। সুতরাং অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন বিপদ আপদে একজন মুসলিমের মনে এ চিন্তা আসা অনুচিত যে, আল্লাহ্‌ তার তাকদীরে যা রেখেছেন সেটা নিরেট অকল্যাণ। কেননা আল্লাহ্‌র কর্মে নিরেট অকল্যাণ নেই। বান্দার উপর আল্লাহ্‌ যা তাকদীর করেন (নির্ধারণ করেন) এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র প্রজ্ঞাপূর্ণ গূঢ় রহস্য রয়েছে।ব্যক্তি যে অবস্থার মধ্যে আছেন হতে পারে এর মধ্যে প্রভুত কল্যাণ রয়েছে; যা তিনি জানেন না। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “এমনও হতে পারে যে, তোমরা একটা জিনিস অপছন্দ করছ অথচ আল্লাহ্‌ তার মধ্যে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।”(সূরা নিসা, আয়াত: ১৯) প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ্‌ যার কল্যাণ চান তাকে বিপদগ্রস্ত করেন।”(সহিহ বুখারী হা/৫৬৪৫) বিপদগ্রস্ত করেন: অর্থাৎ বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন যাতে করে এই বিপদের বিনিময়ে তাকে সওয়াব দিতে পারেন।
.
অতএব এই প্রতিবন্ধত্বের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ ব্যক্তিকে পরীক্ষা করার অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ্‌ তাকে ভালবাসেন না। বরং হতে পারে এর বিপরীতটাই ঠিক। প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয় বিপদ যত বড় প্রতিদান তত বড়। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ কোন কওমকে ভালবাসলে তাদেরকে পরীক্ষা করেন।অতএব, যে সন্তুষ্ট হয় তার জন্য রয়েছে সন্তুষ্টি। আর যে অসন্তুষ্ট হয় তার জন্য রয়েছে অসন্তুষ্টি।”(সুনানে তিরমিযি হা/২৩৯৬; সুনানে ইবনে মাজাহ হা/৪০৩১)
ধৈর্যশীল সওয়াবপ্রত্যাশী বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি সর্বাধিক বড় উপকার যেটা পাবে সেটা হল তার রবের সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করা যে, তার কোন গুনাহ নেই। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“মুমিন নর ও নারীর নিজের জান, সন্তান ও সম্পদের উপর বিপদ আসতেই থাকে; এক পর্যায়ে সে এমন অবস্থায় আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাত করে যে, তার কোন গুনাহ নেই।”(সুনানে তিরমিযি হা/২৩৯৯) এ কারণে ধৈর্যশীল সওয়াবপ্রত্যাশী বিপদগ্রস্ত মানুষেরা কিয়ামতের দিন মহান মর্যাদার অধিকারী হবেন। এমনকি দুনিয়াতে যারা সুস্থ ছিল তারা কামনা করবে যদি তারাও তাদের মত হত। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “কিয়ামতের দিন পরীক্ষার শিকার লোকদেরকে যখন পুরস্কার দেয়া হবে তখন সুস্থ লোকেরা কামনা করবে যদি দুনিয়াতে তাদের চামড়াগুলো কাঁচি দিয়ে কাটা হত।(সুনানে তিরমিযি হা/২৪০২) আমরা মহান আল্লাহর নিকট দুনিয়াবি যাবতীয় রোগ-বালাই ও বিপদ-মুসিবত থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।
.
.
দ্বিতীয়ত: এ বিষয়টি জানা জরুরি যে, রোগী হওয়া সত্ত্বেও নামাজ কখনোই মাফ নয়। বরং, ইসলামে নামাজ সর্বাবস্থায়ই ফরজ স্বাস্থ্যবান হোক বা অসুস্থ, প্রত্যেক মুমিন নারী-পুরুষের জন্য তা আদায় করা আবশ্যক। যতক্ষণ পর্যন্ত তার বোধশক্তি অক্ষুণ্ন থাকে, ততক্ষণ অবশ্যই তাকে নামাজ পড়তে হবে, সে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন।যদি তার ওযু বা গোসলের সামর্থ্য না থাকে, তবে তায়াম্মুম করতে হবে। আর যদি তায়াম্মুমও করা সম্ভব না হয়, তাহলেও নামাজ পড়তে হবে বিনা ওযু, বিনা তায়াম্মুম, এমনকি অপবিত্র অবস্থাতেও। আবার পবিত্র জায়গায় নামাজ আদায় করা আবশ্যক কিন্তু পবিত্র জায়গা না পেলে অপবিত্র স্থানেই নামাজ আদায় করতে হবে, কারণ ইসলামে নামাজ বর্জনের কোনো অনুমতি নেই। রোগী যদি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে না পারে, তাহলে বসে নামাজ পড়বে। বসার ক্ষেত্রে হাঁটু গেড়ে বাবুর মতো বসা উত্তম, যেমনটি কোনো কোনো সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও করেছেন (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৮২৭)। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) অসুস্থ অবস্থায় এভাবেই নামাজ আদায় করতেন। কেউ চাইলে তাশাহহুদের বৈঠকের ভঙ্গিতে বসেও নামাজ পড়তে পারে
(ফিকহুস সুন্নাহ্ আরবী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৪৩) আবার বসে নামাজ পড়া সম্ভব না হলে ডান পার্শ্বে শুয়ে সালাত আদায় করবে, তাও সম্ভব না হলে চিৎ হয়ে শুয়ে মাথা কিছুটা উঁচু করে কেবলার দিকে মুখ ও পা রেখে নামাজ পড়বে। আবার এমনও হতে পারে ব্যাক্তি দাঁড়াতে সক্ষম কিন্তু বসতে অপারগ তাহলে দাঁড়িয়েই নামাজ আদায় করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:“তোমরা দাঁড়িয়ে, বসে এবং পার্শ্বে শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ কর।”(সূরা আন-নিসা: ১০৩) তিনি আরও বলেন: “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী।”(সূরা আত-তাগাবুন: ১৬)
ইমরান ইবনু হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,”আমার অর্শরোগ ছিল। তাই আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর খিদমতে ছালাত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম, তিনি বললেন, দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে, তা না পারলে বসে; যদি তাও না পার তাহলে শুয়ে”।(সহীহ বুখারী, হা/১১১৭)।
.
কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যদি রোগী বসে না পড়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়ে, তাহলে তার জন্য রয়েছে ডবল সওয়াব। একদা একদল লোকের নিকট মহানবী (ﷺ) বের হয়ে দেখলেন, তারা অসুস্থতার কারণে বসে বসে নামায পড়ছে। তা দেখে তিনি বললেন, “বসে নামায পড়ার সওয়াব দাঁড়িয়ে নামায পড়ার সওয়াবের অর্ধেক।” অনুরুপ বসে নামায পড়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি আরামনেওয়ার জন্য রোগী শুয়ে নামায পড়ে তাহলে তার জন্য রয়েছে অর্ধেক সওয়াব। (সহীহ বুখারী হা/১১১৫) যতটা সম্ভব দাঁড়িয়ে এবং যতটা প্রয়োজন বসেও নামায পড়তে পারে। বৃদ্ধ বয়সে মহানবী (ﷺ) রাতের নামাযে বসে ক্বিরাআত করতেন। অতঃপর ৩০/৪০ আয়াত ক্বিরাআত বাকী থাকলে তিনি উঠে তা পাঠ করে রুকূ করতেন। (সহীহ বুখারী হা/১১১৮) রোগী সাধ্যমত রুকূ-সিজদাহ করবে। না পারলে মস্তক দ্বারা ইঙ্গিত করবে। রুকূর চাইতে সিজদার সময় অধিক ঝুঁকবে। তা সম্ভব না হলে চোখের ইশারায় রুকূ-সিজদাহ করবে। রুকূর চাইতে সিজদার ক্ষেত্রে চক্ষুকে অধিকতর নিমীলিত করবে। হাত বা আঙ্গুল দ্বারা ইশারা বিধিসম্মত নয়। কারণ, অনুরুপ নির্দেশ শরীয়তে আসেনি।চক্ষু দ্বারা ইশারা সম্ভব না হলে অন্তরে (কল্পনায়) কিয়াম, রুকূ ও সিজদা আদির নিয়ত করে তকবীর, কিরাআত ও দুআ-দরুদ পাঠ করবে।আত্মাকে কষ্ট দিয়ে সাধ্যের অতীত আমল করা শরীয়তে পছন্দনীয় নয়। সিজদাহ মাটিতে না করতে পারলে কোন জিনিস উঁচু করে বা তুলে তাতে সিজদাহ করা বৈধ নয়। একদা মহানবী (ﷺ) এক রোগীকে দেখা করতে গিয়ে দেখলেন, সে বালিশের উপর সিজদাহ করছে। তিনি তা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। সে একটি কাঠ নিলে কাঠটাকেও ছুঁড়ে ফেললেন। অতঃপর বললেন, “যদি ক্ষমতা থাকে তাহলে মাটিতে নামায পড় (সিজদাহ কর)। তা না পারলে কেবল ইশারা কর। আর তোমার রুকূর তুলনায় সিজদাকে অধিক নিচু কর।” (ত্বাবারানী, মু’জাম, বাযযার, বায়হাকী, সিলসিলাহ সহীহাহ হা/৩২৩) অবশ্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পড়ে যাওয়ার ভয় হলে দেওয়াল বা খুঁটিতে ভর করে দাঁড়াতে পারে। মহানবী (ﷺ) যখন বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন এবং স্বাস্থ্য মোটা হয়ে গেল, তখন তাঁর নামাযের জায়গায় একটি খুঁটি বানানো হয়েছিল; যাতে তিনি ভর করে নামায পড়তেন। (আবূ দাঊদ,সিলসিলাহ সহীহাহ হা/ ৩১৯) রোগী হলেও প্রত্যেক নামায যথাসময়ে পড়বে। না পারলে জমা করার নিয়ম অনুযায়ী ২ ওয়াক্তের নামায জমা করে পড়বে। অসুস্থ অবস্থায় পূর্ণরুপে নামায আদায় করতে সক্ষম না হলেও সুস্থ অবস্থার মত পূর্ণ সওয়াব লাভ হয়ে থাকে রোগীর। মহানবী (ﷺ) বলেন, “বান্দা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে অথবা সফর করে, তখন আল্লাহ তাআলা তার জন্য সেই সওয়াবই লিখে থাকেন, যে সওয়াব সে সুস্থ ও ঘরে থাকা অবস্থায় আমল করে লাভ করত।”(মুসনাদে আহমেদ, সহীহুল জামে হা/৭৯৯) অসুস্থতার সময় রোগীর বেকার বসে বা শুয়ে থাকার সময়। এ সময়কে মূল্যবান জেনে আল্লাহর যিকির করা উচিৎ রোগীর। কষ্টের সময়ে কেবল তাঁরই সকাশে আকূল আবেদনের সাথে নফল নামায ও খাস মুনাজাত করার এটি একটি সুবর্ণ সময়। রাত্রে বহু রোগীর ঘুম আসে না। এমন অনিদ্রায় ফালতু রাত্রি অতিবাহিত না করে তাহাজ্জুদ পড়ে রোগী তার পরপারের জন্য সম্বল বৃদ্ধি করতে পারে। (বিস্তারিত জানতে সালাতে মুবাশ্বির বইটি পড়তে পারেন)।
.
অসুস্থ ব্যক্তি (নারী পুরুষ) কিভাবে সালাত আদায় করবেন? এমনকি একটি প্রশ্ন:সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:
.
জবাবে তারা বলেছেন:
.
(১)- অসুস্থ ব্যক্তির উপর তার সাধ্যমত দাঁড়িয়ে নামায পড়া ওয়াজিব।
.
(২)- যে ব্যক্তি দাঁড়াতে পারবে না সে বসে বসে নামায পড়বে। উত্তম হলো দাঁড়ানোর সকল স্থানে চারজানু হয়ে বসবে।
.
(৩)- যদি বসে নামায পড়তে অক্ষম হয় তাহলে শোয়া অবস্থায় কাত হয়ে কিবলামুখী হয়ে। ডান কাত হয়ে পড়া মুস্তাহাব।
.
(৪)- যদি কাত হয়ে নামায পড়তে অক্ষম হয় তাহলে চিৎ হয়ে শুয়ে দুই পা কিবলামুখী করে নামায পড়বে।
.
(৫)- যে ব্যক্তি দাঁড়াতে সক্ষম, কিন্তু রুকু-সিজদা করতে পারে না, তার দাঁড়ানো মওকূফ হয়ে যাবে না। বরং সে দাঁড়িয়ে নামায পড়বে। ইশারায় রুকু দিবে। এরপর বসবে এবং ইশারায় সিজদা দিবে।
.
(৬)- তার চোখে যদি কোনো রোগ থাকে এবং কোন নির্ভরযোগ্য ডাক্তার বলেন: আপনি চিৎ হয়ে শুয়ে নামায পড়লে আপনার চিকিৎসা করা সম্ভব; অন্যথায় নয় তাহলে সে চিৎ হয়ে শুয়ে নামায পড়তে পারবে।
.
(৭)- যে ব্যক্তি রুকু-সিজদা করতে অক্ষম সে ইশারায় রুকু-সিজদা করবে। সিজদায় রুকুর চেয়ে বেশি নিচু হবে।
.
(৮)- যে ব্যক্তি শুধু সিজদা দিতে অক্ষম সে রুকু দেওয়ার পর ইশারা-ইঙ্গিতে সিজদা দিবে।
.
(৯)- যে ব্যক্তির জন্য পিঠ বাঁকা করা সম্ভব নয় সে ঘাড় নিচু করবে। যার পিঠ বাঁকা হয়ে রুকুকারীর মতো অবস্থা হয়ে গিয়েছে সে যখন রুকু করতে চাইবে তখন আরেকটু বেশি নোয়াবে। আর সিজদায় সে তার চেহারাকে যতটুকু সম্ভব যমীনের কাছে নিয়ে যাবে।
.
(১০)- যদি সে মাথা দিয়ে ইশারা করতে না পারে তাহলে তাকবীর দিয়ে ক্বিরাত পড়বে এবং মনে মনে দাঁড়ানো, রুকু করা, রুকু থেকে ওঠা, সিজদা করা, সিজদা থেকে ওঠা, দুই সিজদার মাঝে বসা, তাশাহ্‌হুদের জন্য বসার নিয়ত করবে এবং এই অবস্থাগুলোর যিকিরসমূহ পড়বে। কিছু অসুস্থ লোক আঙুল দিয়ে ইশারা করে নামায পড়ে এর কোনো ভিত্তি নেই।
.
(১১)- অসুস্থ ব্যক্তি নামাযরত অবস্থায় কোনো অক্ষমতা থেকে সক্ষম হলে; যেমন: দাঁড়ানো, বসা, রুকু দেওয়া, সিজদাহ করা বা ইঙ্গিত করার সক্ষমতা অর্জন করলে সে উক্ত সক্ষমতার অবস্থায় স্থানান্তরিত হবে এবং নামাযের বাকি অংশ সেভাবে পূর্ণ করবে।
.
(১২)- অসুস্থ ব্যক্তি অথবা অন্য কোন ব্যক্তি কোন নামায না পড়ে ঘুমিয়ে গেলে অথবা নামায পড়তে ভুলে গেলে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া কিংবা স্মরণে আসার সাথে সাথে তার জন্য সেই নামায পড়া ওয়াজিব। এই নামায পড়ার জন্য অনুরূপ নামাযের ওয়াক্ত প্রবেশ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা তার জন্য জায়েয নেই।
.
(১৩)- কোনো অবস্থাতেই নামায ছেড়ে দেওয়া জায়েয নেই। বরং শরয়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সর্বাবস্থায় নামাযের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে; সেটা সুস্থ-অসুস্থ উভয় অবস্থায়। কারণ এটি ইসলামের খুঁটি এবং শাহাদাতাইনের (সাক্ষ্যদ্বয়ের) পরে সবচেয়ে বড় ফরয। তাই কোনো মুসলিম অসুস্থ হলেও তার যদি আকল-বুদ্ধি ঠিক থাকে তাহলে তার জন্য নামায ছেড়ে দেওয়া জায়েয নাই যে, এক পর্যায়ে ওয়াক্ত পার হয়ে যাবে। বরং তার উপর ওয়াজিব পূর্বের প্রদত্ত বিবরণ অনুসারে সাধ্যমত যথাসময়ে নামায পড়া। কিছু কিছু রোগী সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নামায পেছাতে থাকে। এটা জায়েয নেই। পবিত্র শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই।
.
(১৪)- অসুস্থ ব্যক্তির জন্য প্রত্যেক ওয়াক্তের নামায স্ব স্ব ওয়াক্তে পড়া কষ্টকর হয়ে গেলে তিনি যোহর ও আসর একত্রে পড়তে পারেন এবং মাগরিব ও এশা একত্রে পড়তে পারেন। তার সুবিধামত অগ্রিম একত্রিতকরণ বা বিলম্বে একত্রিতকরণ করতে পারেন। তিনি চাইলে যোহরের সাথে আসরকে অগ্রিম পড়তে পারেন। আবার যোহরকে পিছিয়ে আসরের সাথে পড়তে পারেন। তিনি চাইলে মাগরিবের সাথে এশাকে অগ্রিম পড়তে পারেন। আবার মাগরিবকে পিছিয়ে এশার সাথেও পড়তে পারেন। আর ফজরকে আগের অথবা পরের কোনো নামাযের সাথে একত্রে পড়তে পারবেন না। কারণ ফজরের ওয়াক্ত এর আগের ও পরের কোনো ওয়াক্ত থেকে বিচ্ছিন্ন।আল্লাহই তৌফিকদাতা। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবীদের উপর।ফতুয়া প্রদানকারী;শাইখ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, শাইখ আব্দুল আযীয আলুশ শাইখ,শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনে গুদাইয়্যান,শাইখ সালেহ আল-ফাউযান এবং শাইখ বকর আবু যাইদ। (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ৪০৫; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০৫৩৫৬)।
.
পরিশেষে আমরা আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন অসুস্থ মুসলমানদেরকে সুস্থ করে দেন, তাদেরকে ধৈর্য রাখা ও সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দেন এবং তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করেন। আমীন! (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

সুস্থ সবল নারী-পুরুষের জন্য দুই কিংবা চার রাকআত সালাত আদায়ের সুন্নতি পদ্ধতি

 প্রশ্ন: প্রত্যেক সুস্থ-সবল নারী-পুরুষের জন্য দুই কিংবা চার রাকআত বিশিষ্ট সালাত আদায়ের সুন্নতি পদ্ধতি কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুরুষ-নারী, ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলের জন্যই বলেছেন, صَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ ‘তোমরা ঠিক সেভাবেই সালাত কর,যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ।’(সহীহ বুখারী হা/৬৩১) উক্ত হাদীসের আলোকে আমরা রাসূল (ﷺ)-এর সালাত আদায়ের সঠিক পদ্ধতি তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
.
সর্বপ্রথম সালাতের জন্য ওযু-গোসল করে পবিত্র হয়ে পরিচ্ছন্ন পোষাক ও দেহ-মন নিয়ে কা‘বা গৃহ পানে মুখ ফিরিয়ে মনে মনে সালাতের দৃঢ় সংকল্প করে স্বীয় প্রভুর সন্তুষ্টি কামনায় তাঁর সম্মুখে বিনম্রচিত্তে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। এরপর একজন ব্যক্তি (নারী-পুরুষ) প্রথমে অন্তরে নামাজের নিয়ত করে কিবলামুখী হবেন। এরপর সক্ষমতা থাকলে দাঁড়িয়ে তাকবিরাতুল ইহরাম তথা নামাজ আরম্ভের তাকবির বলবেন; অর্থাৎ ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন। তাকবিরাতুল ইহরাম বলার সময় দুই হাত কাঁধ বরাবর উত্তোলন করবেন; হাতের তালুদ্বয়কে কিবলামুখী রাখবেন এবং আঙুলগুলোর মাঝে কোনো ফাঁক রাখবেন না। এরপর স্বীয় ডান হাতকে তার বাম হাতের ওপর রাখবেন (অর্থাৎ বাম কব্জির উঁচু হাঁড়কে ডান হাতের তালু দিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করবেন এবং দু হাত বুকের উপরে রাখবেন এবং দৃষ্টি সিজদার স্থানে রাখবেন; (তাশাহহুদের সময় ব্যতীত নামাজের সর্বাবস্থায় সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখবেন); আর তাশাহহুদের সময় দৃষ্টি রাখবেন তর্জনী আঙুলের দিকে। এরপর চুপে চুপে নামাজের (সানা) পাঠ করবেন। বলবেন-سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ”উচ্চারণ: সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা। অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার প্রশংসাসহ আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি, আপনার নাম বড়োই বরকতময়, আপনার প্রতিপত্তি সমুচ্চ। আর আপনি ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই। নামাজের মুখবন্ধ হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে এমন যেকোনো ‘দোয়া-জিকির’ দিয়েই সানা পাঠ করা বৈধ। এরপর চুপে চুপে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। বলবেন,«أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ».”উচ্চারণ: আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজিম। অর্থ: আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। “এরপর চুপিসারে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ পাঠ করবেন। তারপর কোনো বিরতি না দিয়ে ধারাবাহিকভাবে সুরা ফাতিহা পাঠ করবেন। সুরা ফাতিহা পড়া হয়ে গেলে শেষে বলবেন, ‘আমিন’ ‘আমিন’ অর্থ: হে আল্লাহ, কবুল করুন। সরব তথা জেহেরি কেরাতের নামাজে ইমাম ও মুক্তাদি উভয়েই আওয়াজ উঁচু করে আমিন বলবেন।এরপর চুপিসারে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ বলবেন। তারপর পছন্দ অনুযায়ী একটি পূর্ণ সুরা পাঠ করবেন। শুধু একটি আয়াত পাঠ করলেও কেরাত হিসেবে যথেষ্ট হবে। যিনি সুরা ফাতিহা এবং কুরআনের অন্য কোনো সুরার অংশবিশেষও সঠিকভাবে বলতে পারেন না, তার জন্য এসব বলা অত্যাবশ্যক সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার।
.
.
এরপর প্রথমবার হাত ওঠানোর মতো হস্তদ্বয় উত্তোলন (রফউল ইয়াদাইন) করে একবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে বলতে রুকুতে যাবেন। রুকুতে দু হাতের আঙুলগুলো ফাঁকাফাঁকা করে দু হাত রাখবেন নিজের দুই হাঁটুর ওপরে, আর প্রত্যেক হাত দিয়ে হাঁটুকে আঁকড়ে ধরবেন। এছাড়াও পিঠকে সোজা করে সটান করে দেবেন এবং মাথাকে করবেন পিঠ বরাবর, পিঠ থেকে উঁচুও করবেন না, আবার নিচুও করবেন না। আর রুকুরত অবস্থায় কনুইদ্বয়কে নিজের দুই পার্শ্ব থেকে দূরে রাখবেন। রুকুতে গিয়ে তিনবার বলবেন,«سُبْحَانَ رَبِّي العظيم.”উচ্চারণ: সুবহানা রব্বিয়াল আজিম। অর্থ: আমার সুমহান রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি। এরপর মাথা উত্তোলন করবেন এবং প্রথমবার হস্তদ্বয় উত্তোলন করার মতো তাঁর দু হাত উত্তোলন (রফউল ইয়াদাইন) করে ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারী বলবেন,سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ». “উচ্চারণ: সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ। অর্থ: আল্লাহ তার দোয়া কবুল করুন, যে তাঁর প্রশংসা করে। আর জামাতে ইমামের অনুসরণকারী মুক্তাদি ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলবেন না।” তারপর পুরোপুরি দাঁড়িয়ে গেলে বলবেন,رَبَّنَا وَلَكَ الحَمْدُ.”উচ্চারণ: রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ। অর্থ: হে আমাদের রব,আপনার নিমিত্তেই সমস্ত প্রশংসা নিবেদিত। চাইলে আরও একটু বৃদ্ধি করে বলতে পারেন হাম্দান কাসীরান ত্বাইয়েবাম মুবা-রাকান ফীহি’। এরপর তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলবেন, সিজদাবনত হবেন এবং (সিজদায় গমনের পূর্বমুহূর্তে) তাঁর দু হাত ওঠাবেন না। অর্থাৎ (রফউল ইয়াদাইন করবেন না) সুতরাং তিনি (সিজদাবনত হওয়ার সময়) মাটিতে আগে তাঁর দুই হাত রাখবেন কিংবা দুই হাঁটু রাখবেন, তারপর তাঁর মুখমণ্ডল রাখবেন। আর তাঁর কপাল, নাক ও দুই হাতের তালু জমিনে লাগাবেন; এবং দুই পায়ের আঙুলগুলোর শীর্ষভাগের (সামনের অংশের) ওপর ভর দিয়ে সেগুলোকে কিবলামুখী করে রাখবেন। দুই হাতের তালু দিয়ে সরাসরি নামাজের স্থান স্পর্শ করা এবং দুই হাতের কনুই (জমিন থেকে) ওপরে উত্তোলিত রেখে, দুই হাতের আঙুলগুলোকে কব্জা না করে বিছিয়ে দিয়ে, চেপে চেপে রেখে (ফাঁকাফাঁকা না করে) সেগুলোকে কিবলামুখী করা মুস্তাহাব। সিজদাকারীর জন্য স্বীয় বাহুদ্বয়কে নিজের দুই পার্শ্ব থেকে, পেটকে নিজের দুই উরু থেকে এবং উরুদ্বয়কে নিজের দুই নলা (পায়ের গোছা) থেকে দূরে রাখা মুস্তাহাব। মুসল্লি (সিজদায়) তাঁর হস্তদ্বয়কে দুই কাঁধ বরাবর রাখবেন এবং দুই হাঁটু ও দুই পায়ের মাঝে ব্যবধান রাখবেন (লাগিয়ে দেবেন না)। সিজদাবনত অবস্থায় তিনবার বলবেন,«سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى».”উচ্চারণ: সুবহানা রব্বিয়াল আলা। অর্থ: আমার সমুচ্চ রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।সাথে অন্যান্য দোয়াও পড়া যায়। এরপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে মাথা ওঠাবেন এবং ‘ইফতিরাশ’ করে বসবেন; অর্থাৎ বাম পা বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর বসবেন এবং ডান পা খাঁড়া করে রাখবেন। আর ডান পায়ের আঙুলসমূহের তালু তথা নিম্নভাগকে জমিনমুখী করবেন; যাতে করে আঙুলগুলোর শীর্ষভাগ কিবলামুখী হয়ে যায়। এভাবে বসার সময় হাতদুটোকে নিজের দুই উরুর ওপরে রাখবেন, হাতের আঙুলগুলোকে চাপাচাপি করে (অর্থাৎ আঙুলগুলোর মাঝে ফাঁক রাখবেন না)।আর দুইবার বলবেন,رَبِّ اغْفِرْ لِي».”উচ্চারণ: রব্বিগফিরলি। অর্থ: প্রভুগো, আমায় ক্ষমা করুন। তারপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে প্রথম সিজদার মতো দ্বিতীয় সিজদা দেবেন।
.
.
তারপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে দ্বিতীয় সিজদা থেকে মাথা ওঠাবেন। পরবর্তী রাকাতের জন্য দ্বিতীয় সিজদা থেকে ওঠার সময় হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে ওঠবেন। প্রথম রাকাতের মতোই দ্বিতীয় রাকাত আদায় করবেন; কেবল তাকবিরাতুল ইহরাম ও সানা পাঠ করবেন না এবং প্রথম রাকাতে ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজিম’ বলে থাকলে দ্বিতীয় রাকাতে পুনরায় বলবেন না।দ্বিতীয় রাকাতের সিজদা শেষে তাশাহহুদের জন্য বসবেন; দু সিজদার মাঝে ‘ইফতিরাশ’ করে বসার মতো। তবে এ সময় বাম হাতের আঙুলগুলো কিবলামুখী করে বাম উরুর ওপর বিছিয়ে রাখলেও ডান হাতের অনামিকা ও কনিষ্ঠা আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করবেন এবং মধ্যমা আঙুল ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে গোলাকার আংটার মতো বানাবেন, আর তর্জনী আঙুল দিয়ে ইশারা (নাড়াছাড়া) করবেন কেবল ‘আল্লাহ’ শব্দ উচ্চারণের সময়। তাশাহহুদে মোট চার জায়গায় ‘আল্লাহ’ শব্দ এসেছে। নামাজ যদি দুই রাকাতবিশিষ্ট হয়, তাহলে তাশাহহুদের পরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য দরুদ পাঠ করবেন। দরুদ পাঠের পর এই দোয়া পড়বেন-اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَاوَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ».”উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আজাবিল কবর, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শারি ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জাল। অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাইছি জাহান্নামের শাস্তি থেকে, কবরের শাস্তি থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা (পরীক্ষা) থেকে এবং মাসিহুদ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে। এই দোয়া ছাড়াও নামাজে দরুদের পরে পড়ার জন্য যেসব দোয়া বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো পড়া যাবে সালাম ফেরানোর আগে। তারপর নামাজ সমাপ্তের নিয়ত করে ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সালাম ফেরাবে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বলে, এরপর বাম দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সালাম ফেরাবে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বলে। নামাজ যদি দুই রাকাতের বেশি হয়, তাহলে দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহহুদ পড়ার পরে পরবর্তী রাকাতের জন্য উঠে দাঁড়াবেন এবং যথারীতি উপরোক্ত নিয়মে বাকি নামাজ সম্পন্ন করবেন।
অর্থাৎ প্রথম তাশাহহুদের বৈঠক থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতিহা পাঠের আগে কাঁধ বরাবর হস্তদ্বয় উত্তোলন (রফউল ইয়াদাইন) করবেন। আর প্রথম দু রাকাত ছাড়া বাকি (তৃতীয় চতুর্থ) রাকাতগুলোতে সুরা ফাতিহার পরে অন্য কোনো সুরা পড়বেন না। যেসব নামাজে দুটো ‘তাশাহহুদের বৈঠক’ থাকে, সেসব নামাজের দ্বিতীয় বৈঠকে ‘তাওয়াররুক’ করে বসবেন; অর্থাৎ ডান পা খাঁড়া রেখে দুই নিতম্বের ওপর ভর দিয়ে বসবেন, আর বাম পা বের করে দেবেন ডান পায়ের নিচ দিয়ে। এরপর যথারীতি নামাজ শেষ করবেন, যেভাবে ইতিপূর্বে বর্ণনা দেওয়া হলো। আলহামদুলিল্লাহ সমাপ্ত।
.
নোট: প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত প্রতিটি বিষয়ের ভিত্তি রয়েছে রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাহাবাদের সুন্নাহতে। এক্ষেত্রে নারী পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আর্টিকেলটি সংক্ষিপ্ততার স্বার্থে এখানে দলিলসমূহ উল্লেখ করা হয়নি, যাতে প্রবন্ধটি অতিরিক্ত দীর্ঘ না হয়। তবে আগ্রহী পাঠকগণ ইচ্ছা করলে সংশ্লিষ্ট হাদীসসমূহের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন। ইনশাআল্লাহ, সব কিছুই সহীহ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। সালাত বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব আত-তামিমি আন-নাজদি (রাহিমাহুল্লাহ) রচিত সালাতের শর্তাবলি, ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ, শাইখ আব্দুল হামিদ ফাইজি আল-মাদানী (হাফিজাহুল্লাহ) প্রণীত সালাতে মুবাশ্বির এবং ড.আসাদুল্লাহ আল-গালিব (হাফিজাহুল্লাহ) কর্তৃক সংকলিত সালাতে রাসূল (ﷺ) এই গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই পাঠের সময় যদি কোনো বিষয় স্পষ্ট না হয় বা সংশয়ের সৃষ্টি হয়, তাহলে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য কোনো সালাফি আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

অজুর অঙ্গসমূহের কোন একটিতে যদি আঘাত বা জখম বা ব্যান্ডেজ থাকে তখন অজুর সঠিক পদ্ধতি

 প্রশ্ন: যদি অজুর অঙ্গসমূহের কোন একটিতে যদি আঘাত, জখম বা ব্যান্ডেজ থাকে তখন অজুর সঠিক পদ্ধতি কী হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর যদি ওজুর কোনো অঙ্গে আঘাত বা জখম থাকে, তাহলে সেটি দুই অবস্থায় থাকতে পারে (১).জখম খোলা থাকবে, অথবা (২).জখমের ওপর ব্যান্ডেজ, কাপড় বা কোনো পট্টি পেঁচানো থাকবে। যদি জখমের ওপর ব্যান্ডেজ বা কাপড় পেঁচানো থাকে, তবে ওজুর সময় যা করতে হবে তা হলো: প্রথমে সেই অঙ্গের সুস্থ (অজখম) অংশগুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।এরপর জখমযুক্ত অঙ্গটি ধোয়ার পালা যখন আসবে তখন পানি দিয়ে সেটি মাসেহ করবে। যদি পানি দিয়ে মাসেহ করা কষ্টকর হয় অথবা করলে ক্ষতি হয় তাহলে তায়াম্মুম করবে এবং তার জন্য এটাই যথেষ্ট হবে।যদিও ব্যান্ডেজের ওপর মাসেহ করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর পক্ষ থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো দুর্বল, তবে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর থেকে এটি সহিহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে।
.
ইমাম বায়হাকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: وَلَا يَثْبُتُ فِي هَذَا الْبَابِ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم شَيْءٌ . . . وَإِنَّمَا فِيهِ قَوْلُ الْفُقَهَاءِ مِنْ التَّابِعِينَ فَمَنْ بَعْدَهُمْ مَعَ مَا رُوِّينَاهُ عَنْ ابْنِ عُمَرَ . فَذَكَر بِإِسْنَادِهِ أَنَّ ابْنَ عُمَرَ رضي الله عنهما تَوَضَّأَ وَكَفُّهُ مَعْصُوبَةٌ فَمَسَحَ عَلَيْهَا وَعَلَى الْعِصَابَةِ وَغَسَلَ مَا سِوَى ذَلِكَ . قَالَ : وَهَذَا عَنْ ابْنِ عُمَرَ صَحِيحٌ “এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি। তবে তাবিয়ীগণ এবং তাঁদের পরবর্তী যুগের ফকীহদের কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়। আমরা যে ঘটনা ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছি, তাতে তিনি তাঁর সনদে উল্লেখ করেন ইবনু উমর (রাঃ) অজু করেছিলেন, অথচ তাঁর হাত কাপড়ে বাঁধা ছিল। তিনি সেই কাপড়সহ উক্ত স্থানে মাসেহ (চুলে হাত বুলানো) করেন এবং অন্যান্য অংশগুলো ধুয়ে ফেলেন। বায়হাকী বলেন: এটি ইবনু উমর (রাঃ) থেকে সহীহ সনদে প্রমাণিত।” (আল-মাজমু; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৬৮)
.
যদি ক্ষতস্থান খোলা থাকে এবং পানি ব্যবহারে ক্ষতি না হয়, তবে তা ধুতে হবে।পক্ষান্তরে যদি পানি ব্যবহার ক্ষতিকর হয় কিংবা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তবে সে স্থানটুকু মাসেহ করতে হবে। আর যদি মাসেহও সম্ভব না হয় তাহলে ঐ স্থানটি ধোয়া বা মাসেহ ছাড়া রেখে দিতে হবে। এরপর ওজু শেষ হলে তায়াম্মুম করতে হবে, যেন পূর্ণ পবিত্রতা অর্জিত হয়।”
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
” قال العلماء رحمهم الله تعالى : إن الجرح ونحوه إما أن يكون مكشوفاً أو مستوراً .فإن كان مكشوفاً فالواجب غسله بالماء , فإن تعذر غسله بالماء فالمسح للجرح , فإن تعذر المسح فالتيمم , وهذا على الترتيب .وإن كان مستوراً بما يسوغ ستره به , فليس فيه إلا المسح فقط ، فإن ضره المسح مع كونه مستوراً فيعدل إلى التيمم , كما لو كان مكشوفاً , هذا ما ذكره الفقهاء رحمهم الله “
“আলেমগণ (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেছেন:যখন কোনো জখম বা এজাতীয় কিছু থাকে, তখন তা হয় প্রকাশ্য (খোলা), নয়তো আবৃত (ঢাকা) থাকে। যদি তা খোলা থাকে তাহলে সেটিকে পানি দ্বারা ধোয়া ওয়াজিব।যদি পানি দিয়ে ধোয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ঐ জখমের উপর মাসেহ করতে হবে। আর যদি মাসেহ করাও সম্ভব না হয়, তাহলে তায়াম্মুম করতে হবে। এগুলো একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতার (ترتيب) ভিত্তিতে করা হবে।আর যদি জখমটি এমন কোনো বস্তু দিয়ে ঢাকা থাকে, যা দ্বারা ঢেকে রাখা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ, তাহলে এক্ষেত্রে কেবল মাসেহ করাই যথেষ্ট।কিন্তু যদি মাসেহ করাও ক্ষতির কারণ হয়, এমনকি সেটা ঢাকা অবস্থাতেও, তখন তায়াম্মুম করেই সন্তুষ্ট হতে হবে—যেমনটা খোলা থাকলে করতাম। এটাই ফুকাহাগণ (রহিমাহুমুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬৯)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:إن كان عليه جبيرة مسح عليها ، وإن كان مكشوفاً تيمم عنه “যদি সেখানে ব্যান্ডেজ বা প্লাস্টার থাকে, তাহলে তার ওপর মাসেহ করতে হবে।আর যদি খোলা থাকে (এবং ধোয়া/মাসেহ সম্ভব না হয়), তাহলে সেই অংশের জন্য তায়াম্মুম করতে হবে।”(ইমাম বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ১১৮)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.]–কে জিজ্ঞাসা করা হয়:”ডাক্তার যখন আমার চিকিৎসা করছিলেন, তখন ইনজেকশন দেওয়ার পর আমার হাত থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। তাই তিনি একটি গজ (ব্যান্ডেজ) দিয়ে তা বেঁধে দেন। কিন্তু গজ খুললেই আবার রক্ত ঝরতে থাকে, এবং তা রাতভর বন্ধ হয় না। ফলে গজটি (ব্যান্ডেজ) হাতেই থেকে যায়। এখন আমার প্রশ্ন হলো, ওজুর সময় আমি কি এই ব্যান্ডেজের ওপর মাসেহ করতে পারবো? যদিও যখন এটি পরানো হয়েছিল, তখন আমি অযু অবস্থায় ছিলাম না; এবং কখনো কখনো ব্যান্ডেজের নিচে রক্তও লেগে থাকে। মাসেহ করার পদ্ধতিও জানতে চাই।
উত্তরে শাইখ বলেন:
” لا تنزع الشاشة التي ربطت على الجرح ، لا سيما إذا كان نزعها يَضُرُّ بك وينزف الدم ، ولا يجوز لك نزعها في هذه الحالة ؛ لأن في ذلك خطراً عليك ، فأَبْقها على وضعها ، وإذا توضأتَ تغسل الذي ليس عليه رباط من اليد ، وأما ما عليه رباط فيكفي أن تمسح على ظاهره بأن تبل يدك بالماء وتديرها على ظاهر الشاشة ، ويكفيك هذا عن غسل ما تحتها مدة بقائها لحاجة ولو عدة أوقات أو عدة أيام ، ولا يشترط أن توضع الشاشة على طهارة بل تمسح عليها على الصحيح ، ولو لم تكن عند وضعها على طهارة ، ولو كان تحتها دم على موضع الإبرة أو الجرح .‏
فالحاصل : أنه لا حرج عليك في أن تبقي الشاشة ، بل يتعين أن تبقيها للمصلحة ، وتمسح على ظاهرها عندما تغسل ما ظهر منها من اليد
“তুমি যেই পট্টি (ব্যান্ডেজ) জখমের ওপর বেঁধেছ, তা খুলবে না। বিশেষ করে যখন তা খোলা তোমার জন্য ক্ষতিকর এবং রক্ত ঝরার কারণ হয়। এই অবস্থায় তা খোলা তোমার জন্য বৈধ নয়, কেননা এতে তোমার জন্য ক্ষতি ও ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। অতএব,ব্যান্ডেজটি যেমন আছে, তেমনই রেখে দাও। যখন তুমি ওজু করবে, তখন হাতের যে অংশে ব্যান্ডেজ নেই, তা ভালোভাবে ধুয়ে ফেলবে। আর যে অংশে ব্যান্ডেজ রয়েছে, তার ওপর ভেজা হাতে মাসেহ করাই যথেষ্ট হবে অর্থাৎ, হাত পানিতে ভিজিয়ে ব্যান্ডেজের ওপর হালকাভাবে হাত বুলিয়ে দেবে। এটাই যথেষ্ট হবে, এবং যতদিন প্রয়োজনবশত ব্যান্ডেজটি থাকবে, ততদিন এর ওপর মাসেহ করাই যথেষ্ট হবে—তা একাধিক ওজুর সময় হোক কিংবা একাধিক দিনের জন্য হোক।এক্ষেত্রে শর্ত নয় যে ব্যান্ডেজটি অবশ্যই ওজু অবস্থায় পরতে হবে। বরং বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, ব্যান্ডেজ পরার সময় তুমি অযু অবস্থায় না থাকলেও তার ওপর মাসেহ বৈধ হবে এমনকি যদি ইনজেকশন বা জখমের স্থানে রক্ত লেগে থাকে।
সারসংক্ষেপ হল: তোমার জন্য ব্যান্ডেজ খোলা জরুরি নয়, বরং তা খোলা উচিতও নয়, কারণ তা তোমার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বরং তা রেখে দেওয়াই কর্তব্য। এরপর ওজুর সময় হাতের যে অংশ খোলা, তা ধুয়ে ফেলবে এবং ব্যান্ডেজে ঢাকা অংশে শুধু মাসেহ করবে।”(আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালিহ আল-ফাওযান: খন্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৫)
.
জেনে রাখা ভালো, অনেক মানুষই হাত-পা হারানোর কারণে কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করেন। ওযুর সময় এসব কৃত্রিম অঙ্গ ধোয়া আবশ্যক নয়, কেননা সেগুলো শরীরের প্রকৃত অংশ নয়।এ বিষয়ে ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.]–কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:আমার পা কেটে ফেলা হয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ্‌। আমি এর বদলে একটি কৃত্রিম পা সংযোজন করেছি। এ পা ধৌত করা এবং মোজা পরা থাকলে এ পা মাসেহ করা কি আমার উপর আবশ্যক?
জবাবে শাইখ বলেন: “হাঁটু থেকে যদি পা কেটে ফেলা হয়, যার ফলে টাকনু ও পায়ের পাতা চলে যায় এর বদলে কৃত্রিম পায়ের পাতা লাগানো হয় সেক্ষেত্রে এ কৃত্রিম পা ধৌত করা আপনার উপর আবশ্যকীয় নয়। কর্তিত পা ধৌত করার দায়িত্ব আপনার থেকে রহিত। কৃত্রিম পায়ের উপর আপনি মাসেহ করবেন না। কিন্তু, যদি পায়ের টাকনুর নীচে কিছু অংশ অবশিষ্ট থাকে তাহলে সে অবশিষ্ট অংশ ধৌত করা আপনার উপর আবশ্যক। আপনি যদি সে অবশিষ্ট অংশের উপর কোন আচ্ছাদন যেমন চামড়ার মোজা বা কাপড়ের মোজা পরেন তাহলে আপনি সে অবশিষ্টাংশের উপর যে পরিধেয় রয়েছে সেটার উপর মাসেহ করবেন।”(শাইখ সালেহ আল-ফাওযানের ফতোয়াসমগ্র থেকে নির্বাচিত; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৬)।
▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

যারা অনবরত বায়ু বের হওয়া এবং ওয়াসওয়াসা রোগে আক্রান্ত তাদের অযুর পদ্ধতি

 প্রশ্ন: যে সকল নারী পুরুষ অনবরত বায়ু বের হওয়ার রোগে আক্রান্ত এবং যারা ওয়াসওয়াসা তথা সন্দেহের রোগে আক্রান্ত তাদের অযুর পদ্ধতি কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর যে ব্যক্তি (নারী-পুরুষ)-এর অপবিত্রতা স্থায়ী ও চলমান যেমন: পেশাব-ঝরা রোগী কিংবা অনবরত বায়ু ত্যাগের রোগী, তারা প্রত্যেক ওয়াক্তের সলাতের জন্য অযু করবেন। এই অযু দিয়ে তিনি যত রাকাত ইচ্ছা ফরয ও নফল সলাত আদায় করবেন; যতক্ষণ না আরেক সলাতের ওয়াক্ত শুরু হয়। দলিল হলো মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আল্লাহ তোমাদের জন্য দ্বীনে কোনো রূপ সংকীর্ণতা রাখেননি।” তিনি আরো বলেন: “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, তোমাদের জন্য কঠিন চান না।”সহিহ বুখারী ও মুসলিমে আছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন: ফাতেমা বিনতে আবু হুবাইশ রাদিয়াল্লাহু আনহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! আমি ইস্তেহাযাগ্রস্ত হই। তারপর আর পবিত্র হই না। আমি কি সলাত ছেড়ে দিব?” তিনি বললেন: সেটি শিরা (থেকে রক্তক্ষরণ); হায়েযের স্রাব নয়। যখন তোমার হায়েযের স্রাব শুরু হবে তখন সলাত ছেড়ে দেবে। যখন হায়েযের স্রাব থেমে যাবে তখন তুমি রক্ত ধৌত করবে এবং পুনরায় সলাত আদায় করবে। এরপর প্রত্যেক সলাতের ওয়াক্ত এলে সেটির জন্য অযু করবে।”(সহীহ বুখারী হা/২২৬; সহীহ মুসলিম হা/৩৩৩)
.
ইমাম বুহূতী (রাহিমাহুল্লাহ) আর-রাওদুর মুরবি গ্রন্থে বলেন: (والمستحاضة ونحوها) ممن به سلس بول أو مذي أو ريح … (تتوضأ لـ) دخول (وقت كل صلاة) إن خرج شيء (وتصلي) ما دام الوقت (فروضا ونوافل)، فإن لم يخرج شيء لم يجب الوضوء“ইস্তেহাযাগ্রস্ত নারী এবং তার অনুরূপ যাদের অনবরত পেশাব ঝরে, অনবরত কামরস বের হয় কিংবা বায়ু নির্গত হয়…তারা প্রত্যেক সলাতের ওয়াক্ত প্রবেশ করলে অযু করবে, যদি কোনো কিছু বের হয়। আর যতক্ষণ ওয়াক্ত আছে ততক্ষণ ফরয ও নফল সলাত আদায় করবে। আর যদি কোনো কিছু বের না হয় তাহলে অযু করা ওয়াজিব হবে না।”(বুহূতী; আর-রাওদুর মুরবি; পৃষ্ঠা: ৫৭)
.
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
فمن لم يمكنه حفظ الطهارة مقدار الصلاة ، فإنه يتوضأ ويصلي ، ولا يضره ما خرج منه في الصلاة، ولا ينتقض وضوؤه بذلك باتفاق الأئمة، وأكثر ما عليه أن يتوضأ لكل صلاة ” ا
“যে ব্যক্তি সলাতের সময়কাল পর্যন্ত পবিত্রতা ধরে রাখতে সক্ষম নয়, সে (প্রত্যেক সলাতের সময়) ওজু করবে এবং সলাত আদায় করবে। সলাতের মাঝে তার শরীর থেকে কিছু নিঃসরণ হলেও তাতে তার কোনো ক্ষতি নেই এবং এর মাধ্যমে তার ওজু ভঙ্গ হবে না—এ বিষয়ে ইমামগণের ঐক্যমত রয়েছে। তার জন্য সর্বোচ্চ করণীয় হলো—প্রত্যেক সলাতের সময় নতুন করে ওজু করা।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২১; পৃষ্ঠা: ২২১)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
الأصل أن خروج الريح ينقض الوضوء، لكن إذا كان يخرج من شخص باستمرار وجب عليه أن يتوضأ لكل صلاة عند إرادة الصلاة، ثم إذا خرج منه وهو في الصلاة لا يبطلها وعليه أن يستمر في صلاته حتى يتمها، تيسراً من الله تعالى لعباده ورفعاً للحرج عنهم، كما قال تعالى: يريد الله بكم اليسر وقال: ما جعل عليكم في الدين من حرج اللجنة الدائمة للبحوث
“মূলনীতি হচ্ছে—বাতাস (বায়ু) নির্গত হলে ওযু ভঙ্গ হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি অনবরত বাতাস নির্গমনের সমস্যায় ভোগে, তার উপর বিধান হচ্ছে প্রতিটি ফরজ সালাতের ইচ্ছা করার সময় নতুন করে ওযু করবে। এরপর সালাতের মধ্যে যদি আবার বাতাস বের হয়, তাহলেও তার সালাত ভঙ্গ হবে না। বরং সে সালাত সম্পন্ন করবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের প্রতি দয়া ও সহজীকরণের নিদর্শন, যেমন তিনি বলেন: আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, এবং তিনি তোমাদের উপর দ্বীনের বিষয়ে কোন কষ্ট চাপিয়ে দেননি।(সূরা আল-বাকারা: ১৮৫ ও সূরা আল-হজ্জ: ৭৮; ফাতওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল বুহূস আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪১১)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে যার থেকে নিয়মিতভাবে বাতাস নির্গত হয় তার ওযু এবং সলাত কীভাবে হবে? স্থায়ী কমিটির আলেমগন উত্তরে বলেন:
إذا كان حالك ما ذكر وأن الغازات مستمرة معك ، فعليك الوضوء لكل صلاة بعد دخول الوقت، ولا يضرك ما يخرج منك بعد ذلك .وأما الجمعة فتتوضأ لها قبل دخول الخطيب ، في الوقت الذي يمكنك من سماع الخطبة وأداء الصلاة “
“যদি তোমার অবস্থা এমনই হয়ে থাকে, যেমন তুমি বর্ণনা করেছো অর্থাৎ বাতাস (বায়ু) নিরবিচ্ছিন্নভাবে বের হতে থাকে তাহলে প্রত্যেক সলাতের সময় শুরু হলে ওযু করবে, এরপরে শরীর থেকে যা-ই বের হোক না কেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে না। জুমু’আর ক্ষেত্রে, ইমাম মিম্বারে ওঠার আগে ওযু করে নাও, যাতে তুমি খুৎবা শুনে সলাত আদায় করতে পারো।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪১২)
.
দ্বিতীয়ত: ওযু করার সময় বা পরে যদি সন্দেহ হয় যে, বায়ু নির্গত হয়েছে। এমতাবস্থায় করণীয় কী?
.
যেকোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে সন্দেহ নয়, বরং নিশ্চিত জ্ঞানকে ভিত্তি করতে হয়। শুধুমাত্র ধারণা বা সন্দেহের ওপর শরিয়তের কোনো বিধান প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সুতরাং, পায়ুপথ দিয়ে গ্যাস/বাতাস নির্গত হয়েছে কি না এ নিয়ে যদি শুধু সন্দেহ থাকে, তবে তা ওযু ভঙ্গের জন্য যথেষ্ট নয়, যতক্ষণ না ব্যক্তি নিশ্চিত হয় যে সত্যিই তা ঘটেছে। সুতরাং ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য উত্তম পরামর্শ হলো তারা সলাতে বা সলাতের বাইরে কোনো ধরনের সন্দেহের প্রতি বিন্দুমাত্র মনোযোগ দেবে না। বরং তারা একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করবে, এতে তারা দ্বিধান্বিত হবে না কিংবা মনঃকষ্টেও ভুগবে না। তারা এই বিশ্বাসে অবিচল থাকবে যে, তারা সঠিক ও হকের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এবং তার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের অনুসারী। এরই সমর্থনে একটি সহীহ হাদীসে এসেছে তামীম আদ-দারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,شُكِىَ إِلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلُ يَجِدُ فِى الصَّلَاةِ شَيْئًا أَيَقْطَعُ الصَّلَاةَ قَالَ لَا حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيْحًا “নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এক ব্যক্তি সম্পর্কে অভিযোগ করা হল যে, সে সালাতে এমন কিছু অনুভব করে যাতে সে সন্দেহ করে সলাত ছেড়ে দিবে কি-না? তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, না যতক্ষণ সে কোন শব্দ বা গন্ধ অনুভব না করবে, ততক্ষণ ছেড়ে দেবে না”।(সহীহ বুখারী, হা/২০৫৬) এ কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হল- ওযু ভাঙ্গার ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিশ্চিত হওয়া ছাড়া (সলাত না ছাড়া)। অতএব, সন্দেহ কিংবা কল্পনা ধর্তব্য নয়। পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া ছাড়া সলাত ছাড়া যাবে না।এটাই রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ।তবে,কোনো মুসলিম যদি পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত হয় যে, সে সালাতের মধ্যে বায়ু নির্গমন করেছে তাহলে তিনি সালাত ছেড়ে দিবেন পরে অযু করে পুনরায় সালাত আদায় করবেন।কারন সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা শর্ত রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্রতা ব্যতীত কোনো সালাত কবুল করেন না এবং অবৈধভাবে অর্জিত মালের সদকা গ্রহণ করেন না।(সুনানে আন-নাসায়ী হা/১৩৯)
.
ইবনে হাজার হাইতামীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “শুচিবায়ুর কি কোন চিকিৎসা আছে?
তিনি এই বলে জবাব দেন: এর কার্যকরী ঔষধ একটাই সেটা হচ্ছে শুচিবায়ুকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাওয়া; এমনকি মনের মধ্যে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও। কেননা কেউ যদি সেটাকে ভ্রুক্ষেপ না করে তাহলে সেটা স্থির হবে না। কিছু সময় পর চলে যাবে; যেমনটি তাওফিকপ্রাপ্ত লোকেরা যাচাই করে পেয়েছেন। আর যে ব্যক্তি শুচিবায়ুকে পাত্তা দিবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করবে সে ব্যক্তির শুচিবায়ু বাড়তেই থাকবে; এক পর্যায়ে তাকে পাগলের কাতারে নিয়ে পৌঁছাবে কিংবা পাগলের চেয়েও নিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌঁছাবে। যেমনটি আমরা অনেক মানুষের মাঝে দেখেছি, যারা শুচিবায়ুতে আক্রান্ত হয়ে এতে কান দিয়েছেন এবং এর শয়তানের কথা শুনেছেন। যে শয়তানের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাবধান করে বলেছেন: “তোমরা পানি ব্যবহারে কুমন্ত্রণাদাতা (শয়তান) থেকে বেঁচে থাক, যাকে ‘ওয়ালাহান’ ডাকা হয়”। অর্থাৎ অহেতুক কাজ করানো ও বাড়াবাড়ির কুমন্ত্রণা দেয়ার কারণে তাকে এই নামে ডাকা হয়। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে আমি যে পরামর্শ দিয়েছি এর সমর্থনমূলক বর্ণনা এসেছে যে, যে ব্যক্তি শুচিবায়ুতে আক্রান্ত হয়েছে সে যেন ‘আউযুবিল্লাহ্‌’ পড়ে এবং (দুঃশ্চিন্তাকে বাড়তে না দিয়ে) থেমে যায়। আপনি এ উপকারী ঔষধটি একটু ভেবে দেখুন; যে ঔষধটি তার উম্মতকে শিখিয়েছেন এমন ব্যক্তি যিনি মনগড়া কোনো কথা বলেন না। জেনে রাখুন, যে ব্যক্তি এই ঔষধ অবলম্বন করা থেকে বঞ্চিত হলো সে প্রভুত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। কেননা, সর্বসম্মতিক্রমে শুচিবায়ু শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। আর এই লানতপ্রাপ্ত শয়তানের সর্বাত্মক উদ্দেশ্য হচ্ছে­ মুমিনকে বিভ্রান্তির ডোবাতে ফেলে দেয়া, পেরেশান করে রাখা, জীবনকে ভারাক্রান্ত করে তোলা, অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিষাদময় করে ফেলা; যাতে এক পর্যায়ে তাকে ইসলাম থেকে এমনভাবে বের করে ফেলতে পারে যে সে টেরও পাবে না। (নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু; সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ কর।”[সূরা ফাতির, আয়াত: ৬][আল-ফাতাওয়াল ফিকহিয়্যাল কুবরা (১/১৪৯)]
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] জনৈক আলেম থেকে বর্ণনা করেন যে, যে ব্যক্তি ওযু কিংবা সলাতে শুচিবায়ু রোগে আক্রান্ত তার জন্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা মুস্তাহাব। কেননা শয়তান যিকির শুনলে দূরে চলে যায়। আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌’ হচ্ছে–প্রধান যিকির। শুচিবায়ু দূর করার উত্তম মহাষৌধ হচ্ছে বেশি বেশি আল্লাহ্‌র যিকিরে মশগুল থাকা।(ইবনে হাজার হাইতামি এর বক্তব্য সমাপ্ত; ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং ৬২৮৩৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate