Friday, June 20, 2025

গর্ভবতী পশু কোরবানী করা কি বৈধ এবং কোরবানির পশু জবাইয়ের আগে মারা গেলে হুকুম কি

 প্রশ্ন: গর্ভবতী পশু কোরবানী করা কি  বৈধ? কোরবানির পশু জবাইয়ের আগে মারা গেলে হুকুম কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর স্বাভাবিক ভাবে গর্ভবতী নয় এমন পশু দ্বারা কুরবানী দেওয়া উত্তম। তবে গর্ভবতী পশু বাহিমাতুল আনআম (উট, গরু ও ছাগল/বকরী) ইত্যাদি দ্বারা কোরবানী করা জায়েজ কিনা এ সম্পর্কে আলেমগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেম ও ফিকহী মাযহাবের মতে, যদি পশুটি কোরবানীর জন্য নির্ধারিত বয়স ও শর্ত পূরণ করে, তবে গর্ভবতী পশু দ্বারা কোরবানী করা জায়েয। কারণ ইসলামী শরীয়তে যে দোষ-ত্রুটির কারণে কোনো পশুকে কোরবানীর অনুপযুক্ত বলা হয়েছে, তার মধ্যে গর্ভধারণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে শাফেয়ি মাযহাবের আলেমগণ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, গর্ভবতী পশু দিয়ে কোরবানী করা মাকরূহ বা অনুচিত, এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ একে নিষিদ্ধও বলেছেন। তাদের যুক্তি হলো এতে গর্ভে থাকা ভ্রূণের জীবনহানি ঘটার সম্ভাবনা থাকে, যা কোরবানীর মূল উদ্দেশ্যপশু জবাই করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি কিছু কিছু আলেম চিকিৎসাগত দিক বিবেচনা করে গর্ভস্থিত পশু খাওয়াকে মাকরূহ বলেছেন।
.
আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা’ গ্রন্থে এসেছে: ولم يذكر جمهور الفقهاء الحمل عيبا في الأضحية ، خلافا للشافعية ، حيث صرحوا بعدم إجزائها في الأضحية ؛ لأن الحمل يفسد الجوف ويصير اللحم رديئا “অধিকাংশ ফিকাহবিদ আলেম গর্ভধারণকে কোরবানীর পশুর ত্রুটির মধ্যে উল্লেখ করেননি; তবে শাফেয়ি মাযহাবের আলেমগণ ব্যতীত। তারা পরিস্কারভাবে জায়েয না হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা গর্ভধারণের ফলে পেট নষ্ট হয়ে যায় এবং গোশত ভাল হয় না।”(আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা’ খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ২৮১) শাফেয়ি মাযহাবের কিতাব ‘হাশিয়াতুল বুজাইরিমি আলাল খত্বীব’ এ এসেছে: والحامل لا تجزئ, وهو المعتمد [ يعني : في المذهب ] ؛ لأن الحمل ينقص لحمها وإنما عدوها كاملة في الزكاة ، لأن القصد فيها النسل دون طيب اللحم“গর্ভবতী পশু কোরবানীর পশু হিসেবে যথেষ্ট নয়। এটাই (মাযহাবের) প্রতিষ্ঠিত অভিমত। কেননা গর্ভধারণের ফলে গোশত কমে যায়। আর যাকাতের ক্ষেত্রে গর্ভবতী পশুকে পূর্ণ উপযুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয় যেহেতু যাকাতের ক্ষেত্রে বংশবৃদ্ধির বিষয়টি উদ্দেশ্য; গোশত ভাল হওয়া নয়।” (পরিমার্জিতরূপে সমাপ্ত; দেখুন: হাশিয়াতুল বুজাইরিমি আলাল খত্বীব’ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৩৫) অগ্রগণ্য অভিমত হলো: কোরবানীর পশু হিসেবে গর্ভবতী বাহিমাতুল আনআম (উট, গরু ও বকরী) উপযুক্ত; যদি তার ক্ষেত্রে অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে। সৌদি আরবের প্রথম গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:يصح التضحية بالشاة الحامل ، كما يصح بالحائل ، إذا كانت سليمة من العيوب المنصوصة في الأضاحي ” ا“গর্ভবতী বকরী দিয়ে কোরবানী করা সঠিক; যেমনিভাবে অ-গর্ভবতী বকরী দিয়েও সঠিক; যদি পশুটি কোরবানীর ক্ষেত্রে দোষণীয় দোষগুলো থেকে মুক্ত হয়।”(ইমাম ইবনু ইব্রাহিম; ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িলিস; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৪৬)
.
যদি গর্ভস্থ বাচ্চাটি জীবিত অবস্থায় বের হয়,তাহলে তাকে শরিয়তের বিধান অনুসারে জবাই করে খাওয়া বৈধ। আর যদি মৃত অবস্থায় বের করা হয়, তবুও জমহুর (অধিকাংশ) আলেমের মতে,সেটিও খাওয়া যাবে। কেননা মাকে জবাই করার মাধ্যমে সেটাকেও জবাই করা হয়েছে বলে গণ্য হয়। এটি হানাফী মাযহাব ছাড়া অধিকাংশ মাযহাবের আলেমদের অভিমত। ইমাম আবু হানিফার মতে,বের হওয়ার পর জবাই করা ছাড়া সেটা হালাল হবে না।দলিল হচ্ছে, প্রখ্যাত সাহাবী আবু সাঈদ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (ﷺ) বলেন: ذَكَاةُ الْجَنِينِ ذَكَاةُ أُمِّهِ “মায়ের জবাই গর্ভস্থিত পশুর জবাই”।(সুনানে আবু দাউদ হা/২৮২৮; সুনানে তিরমিযি হা/১৪৭৬; সুনানে ইবনে মাজাহ হা/৩১৯৯ ও মুসনাদে আহমাদ হা/১০৯৫০; বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘সহিহুল জামে’ হা/৩৪৩১; হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন) তালখিস গ্রন্থে বলা হয়েছে, যে যাবাহ দ্বারা মা হালাল হয়ে যাবে সেই যাবাহ দ্বারাই তার ভ্রূণও হালাল হয়ে যাবে ভ্রূণ তার মায়ের অনুসারী হওয়ার কারণে। কেননা ভ্রূণ তার মায়ের একটি অংশ। সুতরাং তার মাকে যাবাহ করার দ্বারা তার পুরা অঙ্কন যাবাহ হয়ে যাবে।(শারহে মিশকাতুল মাসাবিহ হা/৪০৯১-এর টিকা)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,فَإِنْ خَرَجَ حَيًّا حَيَاةً مُسْتَقِرَّةً , يُمْكِنُ أَنْ يُذَكَّى , فَلَمْ يُذَكِّهِ حَتَّى مَاتَ , فَلَيْسَ بِذَكِيٍّ ، قَالَ أَحْمَدُ : إنْ خَرَجَ حَيًّا , فَلَا بُدَّ مِنْ ذَكَاتِهِ ; لِأَنَّهُ نَفْسٌ أُخْرَى “যদি স্থিতিশীল জীবন নিয়ে জীবিত অবস্থায় বের হয় এবং জবাই করার সুযোগ পায়; কিন্তু জবাই না করে এক পর্যায়ে মারা যায়; তাহলে সে পশুটি জবাইকৃত হিসেবে গণ্য হবে না। ইমাম আহমাদ বলেন: যদি জীবিত অবস্থায় বের হয় তাহলে অবশ্যই জবাই করতে হবে। কেননা সেটি অন্য একটি প্রাণ।”(ইমাম ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩২১) হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:والأضحية بالحامل جائزة , فإذا خرج ولدها ميتا فذكاته ذكاة أمه عند الشافعي وأحمد وغيرهما , سواء أشعر أو لم يشعر, وإن خرج حيا ذبح .ومذهب مالك : إن أشعر حل ، وإلا فلا .وعند أبي حنيفة لا يحل حتى يذكى بعد خروجه“গর্ভবতী পশু দিয়ে কোরবানী করা জায়েয। যদি কোরবানীর পশুর গর্ভস্থিত সন্তান মৃত অবস্থায় বের হয় তাহলে ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমাদ ও অন্যন্য আলেমদের নিকট তার মায়ের জবাই করাটাই তার জবাই; চাই তার চুল গজিয়ে থাকুক; কিংবা না গজিয়ে থাকুক। আর যদি জীবিত অবস্থায় বের হয় তাহলে জবাই করতে হবে।ইমাম মালেকের মাযহাব হচ্ছে: চুল গজালে হালাল; অন্যথায় নয়। ইমাম আবু হানিফার মতে, বের হওয়ার পর জবাই করা ছাড়া সেটা হালাল হবে না।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২৬; পৃষ্ঠা: ৩০৭)
.
▪️জবাই করার আগে কোরবানির পশু মারা গেলে কি হুকুম:
.
কোরবানির জন্য নির্ধারিত পশুর জবাই করার পূর্বে মারা গেলে দুটি অবস্থা হতে পারে।
(১)। কোনো ব্যক্তি যদি কোরবানির জন্য একটি পশু নির্ধারণ করেন, এরপর তাঁর কোনো অবহেলা ছাড়াই সেই পশুটি মারা যায়, সেক্ষেত্রে কোরবানি দাতার ওপর কোনো গোনাহ বা দায়িত্ব বর্তাবে না। এমনকি ঐ অবস্থায় তাঁর ওপর নতুন করে আরেকটি পশু কোরবানি করাও আবশ্যক নয়। কারণ, তা তার হাতে এক প্রকার আমানত,যা যত্ন করা সত্ত্বেও বিনষ্ট হলে তার যামানত নেই। হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,فَإِنْ تَلِفَتْ الْأُضْحِيَّةُ فِي يَدِهِ بِغَيْرِ تَفْرِيطٍ , أَوْ سُرِقَتْ , أَوْ ضَلَّتْ , فَلَا شَيْءَ عَلَيْهِ ; لِأَنَّهَا أَمَانَةٌ فِي يَدِهِ , فَلَمْ يَضْمَنْهَا إذَا لَمْ يُفَرِّطْ كَالْوَدِيعَةِ “যদি কোনো অবহেলা ব্যতিরেকে তার হাত থেকে কোরবানির পশুটি ধ্বংস হয়ে যায় কিংবা চুরি হয়ে যায় কিংবা হারিয়ে যায় সেক্ষেত্রে তার উপর কোন কিছু বর্তাবে না। কেননা পশুটি তার হাতে আমানত। যদি তার অবহেলা না থাকে সেক্ষেত্রে গচ্ছিত-রাখা সম্পদের মতো তাকে এটার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না”।(ইবনে কুদামা আল-মুগনি’ খন্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৫৩; অনুরূপ ফাতওয়া দেখুন: মিরদাওয়ি এর ‘আল-ইনসাফ’ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৭১) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:والْإِرَادَةُ الْجَازِمَةُ إذَا فَعَلَ مَعَهَا الْإِنْسَانُ مَا يَقْدِرُ عَلَيْهِ كَانَ فِي الشَّرْعِ بِمَنْزِلَةِ الْفَاعِلِ التَّامِّ : لَهُ ثَوَابُ الْفَاعِلِ التَّامِّ وَعِقَابُ الْفَاعِلِ التَّامِّ الَّذِي فَعَلَ جَمِيعَ الْفِعْلِ الْمُرَادِ حَتَّى يُثَابَ وَيُعَاقَبَ عَلَى مَا هُوَ خَارِجٌ عَنْ مَحَلِّ قُدْرَتِهِ مِثْلَ الْمُشْتَرِكِينَ والمتعاونين عَلَى أَفْعَالِ الْبِرِّ “কোন মানুষ যদি সুদৃঢ় সংকল্পের সাথে তার সাধ্যে যা কিছু করার ক্ষমতা রয়েছে তা করে তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সে ব্যক্তি পরিপূর্ণ কার্য সম্পাদনকারী ব্যক্তির সমান: পরিপূর্ণ কার্য সম্পাদনকারীর সওয়াব কিংবা শাস্তি সে ব্যক্তি পাবে; এমনকি যা তার সাধ্যের বাইরে এর জন্যেও সে ব্যক্তি সওয়াব কিংবা শাস্তি পাবে। উদাহরণস্বরূপ নেক কাজে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতাকারী ব্যক্তিবর্গ”।(ইবনু তাইমিয়াহ; মাজমুউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ৭২২-৭২৩; আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: মাজমুউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৩; পৃষ্ঠা: ২৩৬)
.
(২)। যদি কোনো ব্যক্তি কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা পশুটি নিজে ধ্বংস করে কিংবা অন্য কেউ ধ্বংস করে থাকে তাহলে যে ব্যক্তি ধ্বংসের কারণ সে এর মূল্য কিংবা সমমানের পশু ক্ষতিপূরণ স্বরূপ প্রদান করবেন। অর্থাৎ নিজ অবহেলায় পশুটি মৃত্যুবরণ করার কারণে তার পরিবর্তে অন্য একটি পশু কোরবানী করা জরুরী হবে। ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন: إذَا أَتْلَفَ الْأُضْحِيَّةَ الْوَاجِبَةَ , فَعَلَيْهِ قِيمَتُهَا ; لِأَنَّهَا مِنْ الْمُتَقَوِّمَاتِ , وَتُعْتَبَرُ الْقِيمَةُ يَوْمَ أَتْلَفَهَا “যদি কেউ কোন ওয়াজিব কোরবানির পশু ধ্বংস করে তাহলে তাকে মূল্য জরিমানা দিতে হবে। কেননা পশু এমন শ্রেণীর যেটার মূল্য অনুমানযোগ্য। যেদিন পশুটিকে ধ্বংস করেছে সেই দিনের মূল্য ধর্তব্য হবে”।(ইবনে কুদামা আল-মুগনি’ খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৫২; বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৭৮৫২৪)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কুরবানির পশু সংক্রান্ত যে বিষয়গুলো আমাদের জানা উচিত

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর কুরবানী আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সুন্নাত আদায়ের সাথে সাথে প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সুন্নাতও পালন করা হয়। কেননা তিনি নিজে কুরবানী করেছেন এবং তাঁর উম্মতের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হিসাবে অবশিষ্ট রেখে গেছেন। ফলে ক্বিয়ামত পর্যন্ত কুরবানীর বিধান বলবৎ থাকবে ইনশাআল্লাহ। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যাধিক। তাই এর হুকুম-আহকাম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একান্ত দায়িত্ব। আজ আমরা কুরবানির পশুর সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়গুলো সংক্ষেপে বাংলায় উল্লেখ করার চেষ্টা করব।

❑ [১] কুরবানির সংজ্ঞা:
.
কুরবানী: ঈদুল আযহার দিনগুলোতে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আনআম শ্রেণীর (উট, গরু, ভেড়া বা ছাগল) প্রাণী জবাই করাকে ‘কুরবানী’ বলা হয়’। সকালে রক্তিম সূর্য উপরে ওঠার সময়ে ‘কুরবানী’ করা হয় বলে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল আযহা’ বলা হয়ে থাকে। কুরবানী ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও তাকওয়ার প্রতীক, যা আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষা বহন করে। কুরবানীর বিধান আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাহ ও মুসলিমদের ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত।(বিস্তারিত দেখুন; সূরা কাউছার, আয়াত: ২; সূরা আনআম, আয়াত: ১৬২; সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৩৪; সহিহ বুখারী হা/৫৫৫৮; ও সহিহ মুসলিমে হা/১৯৬৬; মুসনাদে আহমাদ হা/৪৯৩৫; সুনানে তিরমিযি হা/১৫০৭; সহিহ বুখারী হা/৫৫৪৫)
.
❑ [১] কুরবনীর হুকুম:
.
আলেমগণ কুরবানীর হুকুম নিয়ে মতভেদ করেছেন: কুরবানী করা কি ওয়াজিব যা পালন না করলে গুনাহ হবে; নাকি সুন্নতে মুয়াক্কাদা যা বর্জন করাটা নিন্দনীয়? বিশুদ্ধ মতানুযায়ী কুরবানী করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।তবে যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের তাদের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিয়মিত কোরবানি করা। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, اَلْأُضْحِيَّةُ سُنَّةٌ وَلَيْسَتْ بِوَاجِبَةٍ ‘কুরবানী করা সুন্নাত, ওয়াজিব নয়’।ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, الضَّحَايَا سُنَّةٌ لَا أُحِبُّ تَرْكَهَا ‘কুরবানী সুন্নাত’ এই সুন্নাত ত্যাগ করা আমি পসন্দ করি না”। হানাফী মাযহারেব ইমাম আবু ইউসুফ, মালিকী মাযহাবের ইমাম আশহাব এবং অধিকাংশ আলিমের মতে, তা সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা।ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আহলে ইলম বা কুরআন-হাদীসের জ্ঞানীদের আমল ছিল এই যে, কুরবানী ওয়াজিব নয়, বরং নবী করীম (ﷺ)-এর সুন্নাতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। কারো জন্য কুরবানী ওয়াজিব হওয়া কিংবা সুন্নত হওয়ার জন্য কুরবানীকারীকে ধনী হওয়া শর্ত। অর্থাৎ তার নিজের খরচপাতি ও সে যাদের খরচ চালায় তাদের খরচপাতির অতিরিক্ত তার কাছে কুরবানী করার অর্থ থাকা। অতএব, কোন মুসলমানের যদি মাসিক বেতন বা আয় থাকে এবং এ বেতন দিয়ে তার খরচ চলে যায়, এর অতিরিক্ত তার কাছে কুরবানীর পশু কেনার অর্থ থাকে তাহলে সে ব্যক্তি কর্তৃক কুরবানী দেয়ার শরয়ি বিধান রয়েছে। কুরবানী করার জন্য ধনী হওয়া শর্ত মর্মে দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে অথচ সে কুরবানী করেনি সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়”(সুনানে ইবনে মাজাহ হা/৩১২৩; এখানে সামর্থ্য দ্বারা উদ্দেশ্য ধনী হওয়া। এ বিধানের ক্ষেত্রে পুরুষ বা নারীর কোন ভেদ নেই।(বিস্তারিত দেখুন; ফাৎহুল বারী শারহু সহীহিল বুখারী, ১০ম খণ্ড,পৃষ্ঠা: ৩; মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালিক, পৃষ্ঠা: ১৮৯; শাফেঈ, আল-উম্ম; ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৪৩; আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা; খণ্ড:৫; পৃষ্ঠা: ৭৯-৮১; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭০২৯১)
.
❑ [২] কুরবানীর পশুর শর্তাবলি:
.
কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে ৬ টি শর্ত রয়েছে:
.
এক: পশুটি ‘আনআম’ শ্রেণীর চতুষ্পদ জন্তু হওয়া। আনআম হচ্ছে উট, গরু, ভেড়া ও ছাগল। দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বাণী: “আর আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য ‘মানসাক’ এর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ ‘আনআম’ শ্রেণীর যে চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সে সবের উপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।”[সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৩৪] আয়াতে بهيمة الأنعام (বাহিমাতুল আনআম) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে উট, গরু, ভেড়া ও ছাগল। আরবদের কাছে بهيمة الأنعام এর এ অর্থই পরিচিত। এটি হাসান, কাতাদা ও আরও অনেকের অভিমত।এগুলোর বাইরে অন্য পশু দিয়ে কুরবানী করার প্রমাণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে পাওয়া যায় না। তবে অনেক বিদ্বান মহিষকে গরুর অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয বলেছেন।(মির‘আতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাসাবীহ, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮১)
.
দুই: পশুটি শরিয়ত নির্ধারিত বয়সে পৌঁছা। ভেড়া হলে ‘জাযআ’ হওয়া (অর্থাৎ ছয়মাস পূর্ণ হওয়া)। আর অন্য শ্রেণীর হলে ‘সানিয়্যা’ হওয়া (অর্থাৎ এক বছর পূর্ণ হওয়া)। দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “তোমরা মুসিন্না (পূর্ণ বয়স্ক) হওয়া ছাড়া কোন প্রাণী জবাই করবে না। তবে তোমাদের জন্য কঠিন হয়ে গেলে ছয় মাস বয়সী ভেড়া জবাই করতে পারো”।[সহিহ মুসলিম] মুসিন্না (পূর্ণ বয়স্ক) হচ্ছে- ‘সানিয়্যা’ ও ‘সানিয়্যা’ এর চেয়ে বেশি বয়স্ক পশু। আর ‘জাযআ’ হচ্ছে- ‘সানিয়্যা’ চেয়ে কম বয়স্ক পশু। উটের ক্ষেত্রে ‘সানিয়্যা’ হচ্ছে- যে উটের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। গরুর ক্ষেত্রে ‘সানিয়্যা’ হচ্ছে- যে গরুর দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। ভেড়া ও ছাগলের ক্ষেত্রে ‘সানিয়্যা’ হচ্ছে- যার এক বছর পূর্ণ হয়েছে।আর ‘জাযআ’ হচ্ছে- যে পশুর ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। সুতরাং উট, গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে ‘সানিয়্যা’ এর চেয়ে কম বয়সী পশু দিয়ে কুরবানী শুদ্ধ হবে না। আর ভেড়ার ক্ষেত্রে ‘জাযআ’ এর চেয়ে কম বয়সী পশু দিয়ে কুরবানী হবে না।শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন: “কুরবানির নির্ধারিত বয়স অনুসরণ করা শরিয়তের দাবি। ইমামগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো, শরিয়ত কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করেছে, যার কম বয়সী পশু জবেহ করা বৈধ নয়। যে ব্যক্তি এর চেয়ে কম বয়সী পশু কুরবানি করবে, তার কুরবানি সহীহ হবে না।”(নববী আল-মাজমু‘ খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৭৬) ইমাম কাসানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “আমরা যে নির্দিষ্ট বয়সের কথা উল্লেখ করেছি,তা মূলত কম বয়সী পশুকে কুরবানির অনুপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য।কিন্তু বেশি হলে বাধা নেই।অর্থাৎ কেউ যদি নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সী পশু কুরবানি করে, তাহলে তা বৈধ নয়। কিন্তু যদি বেশি বয়সের পশু কুরবানি করে, তাহলে তা বৈধ এবং উত্তম হবে।এ কারণে কুরবানিতে ভেড়ার বাচ্চা (حمل), ছাগলের বাচ্চা (جدي), বাছুর (عجل) বা উটছানা (فصيل) কোরবানি করা বৈধ নয়;কারণ শরিয়তের নির্দেশনা যে নির্দিষ্ট বয়সের কথা বলেছে, এসব প্রাণী সেই বয়সে পড়ে না। দুই বছরের কম বয়সী গরু কুরবানি করা ইমামদের মধ্যে কারো নিকটেও বৈধ নয়।” (বদায়েউস সানায়ি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৭০) আরো বিস্তারিত দেখুন; আল-বাহরুর রায়েক; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠ: ২০২; আত-তাজ ওয়াল ইকীল; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬৩; শরহে মুখতাসার খলিল; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৪ নববী আল-মাজমু‘ খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৬৫ ইবনু কুদামাহ; আল মুগনী; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৬৮; ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩৭৭)
.
তিন: কুরবানীর পশু ঐ সব দোষ-ত্রুটি মুক্ত হওয়া যেগুলোর কারণে কুরবানী আদায় হয় না; এমন ত্রুটি ৪টি: (১)। চোখে স্পষ্ট ত্রুটি থাকা: যেমন চোখ একেবারে কোটরের ভেতরে ঢুকে যাওয়া কিংবা বোতামের মত বের হয়ে থাকা কিংবা এমন সাদা হয়ে যাওয়া যে, সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, চোখে সমস্যা আছে। (২)। সুস্পষ্ট রুগ্নতা: যে রোগের প্রতিক্রিয়া পশুর উপরে ফুটে উঠে। যেমন, এমন জ্বর হওয়া যার ফলে পশু চরতে বের হয় না ও খাবারে তৃপ্তি পায় না। এমন চর্মরোগ যা পশুর গোশত নষ্ট করে দেয় কিংবা স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। (৩)। স্পষ্ট খোঁড়া হওয়া: যার ফলে পশুর স্বাভাবিক হাঁটা-চলা ব্যাহত হয়। (৪)। এমন জীর্ণ-শীর্ণতা; যা অস্থির মজ্জা নিঃশেষ করে দেয়। এ চারটি ত্রুটি থাকলে সে পশু দিয়ে কুরবানী দেয়া জায়েয হবে না। এ ত্রুটিগুলোর সমপর্যায়ের কিংবা এগুলোর চেয়ে মারাত্মক অন্য ত্রুটিসমূহকেও এ ত্রুটিগুলোর অধিভুক্ত করা হবে।সে রকম কিছু ত্রুটি নিম্নরূপ: (১)। অন্ধ পশু; যে তার দুই চোখে কিছুই দেখে না।(২)। যে পশু তার সাধ্যের অতিরিক্ত খাবার খেয়েছে; যতক্ষণ না তার তরল পায়খানা হয়ে সে আশংকামুক্ত হয়।(৩)। যে পশু গর্ভবতী; কিন্তু পশুটি শংকার মধ্যে রয়েছে; যতক্ষণ না তার শংকা দূরীভূত হয়।(৪)। গলায় ফাঁস লেগে কিংবা উপর থেকে পড়ে যে পশু আহত হয়ে মৃত্যুপথ-যাত্রী যতক্ষণ না সে পশু শংকামুক্ত হয়।(৫)। যে পশু কোন রোগজনিত কারণে হাঁটতে অক্ষম।(৬)। সামনের এক পা কিংবা পিছনের এক পা কর্তিত পশু।এ ত্রুটিগুলো যদি পূর্বে হাদিসে উল্লেখিত ত্রুটিগুলোর সাথে একত্রিত করা হয় তাহলে সর্বমোট ১০ টি ত্রুটি হবে; যেগুলোর কারণে কোন পশুকে কুরবানী করা জায়েয হবে না। উল্লেখিত ৬ টি এবং ইতিপূর্বে উল্লেখিত ৪ টি। এ সংক্রান্ত দলিল দেখুন;মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/১৭৫৭; মিশকাত, হা/১৪৬৫; ইমাম আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’ হা/১১৪৮)
.
চার: পশুটি কুরবানীকারীর মালিকানাধীন হতে হবে। কিংবা শরিয়তের পক্ষ থেকে সে অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হবে কিংবা মালিকের পক্ষ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হবে। অতএব, যে ব্যক্তি যে পশুর মালিক নয় তার জন্য সে পশু দিয়ে কুরবানী দেয়া জায়েয হবে না। যেমন ছিনতাইকৃত পশু, চুরিকৃত পশু কিংবা অন্যায় মামলা দিয়ে প্রাপ্ত পশু ইত্যাদি। কেননা কোনো পাপ দিয়ে আল্লাহ্‌র নৈকট্য হাসিল করা শুদ্ধ নয়।ইয়াতিমের অভিভাবক যদি প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ইয়াতিমের সম্পদ থেকে কুরবানী করে তাহলে সে কুরবানী সহিহ হবে; যদিও কুরবানী করতে না পারার কারণে ইতিপূর্বে সে ছিল ভগ্নহৃদয়। কোন প্রতিনিধি তার নিয়োগকারীর পক্ষ থেকে কুরবানী করলে সেটা সহিহ হবে।(ইবনু উসাইমীন; আহকামুল উদহিয়্যাহ; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৬৫১)।
.
পাঁচ: কুরবানীর পশুর সাথে অন্য কারো অধিকার যেন সম্পৃক্ত না থাকে; এ কারণে বন্ধককৃত পশু দিয়ে কুরবানী করা জায়েয হবে না।
.
ছয়: শরিয়ত নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পশুটিকে কুরবানী দিতে হবে। এ সময়সীমা হচ্ছে ঈদের দিন ঈদের নামাযের পর থেকে তাশরিকের দিনগুলোর সর্বশেষ দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তাশরিকের সর্বশেষ দিন হচ্ছে ১৩ ই যিলহজ্জ। সুতরাং কোরবানী দেয়ার সর্বমোট দিন সংখ্যা হচ্ছে ৪ দিন। ঈদের দিন ঈদের নামাযের পর থেকে পরবর্তী ৩ দিন। তাই কেউ যদি ঈদের নামাযের আগে কিংবা ১৩ ই যিলহজ্জের সূর্যাস্তের পরে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী শুদ্ধ হবে না। কিন্তু, কোন ওজরের কারণে কারো যদি তাশরিকের দিনগুলোর চেয়ে বেশি বিলম্ব হয়ে যায় এতে কোনো অসুবিধা হবে না; যেমন- অবহেলা না করা সত্ত্বেও কারো কুরবানীর পশুটি পালিয়ে গেল এবং কুরবানীর সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে পশুটি পাওয়া গেল। কিংবা যাকে কুরবানী করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তিনি ভুলে গেলেন এবং এর মধ্যে কুরবানী করার সময় পার হয়ে গেল সেক্ষেত্রে সময়ের পরে জবাই করতে কোন অসুবিধা নেই। এ মাসয়ালাটিকে কিয়াস করা হয়েছে ঐ মাসয়ালার উপর: যে ব্যক্তি সলাত না আদায় করেই ঘুমিয়ে পড়েছে কিংবা সলাতের কথা ভুলে গিয়েছে সে ব্যক্তি যখন জেগে উঠে কিংবা তার স্মরণে পড়ে তখনি সে সলাত আদায় করে। নির্ধারিত দিনগুলোতে রাতে কিংবা দিনে কুরবানীর পশু জবাই করা জায়েয হবে। তবে, দিনে জবাই করা শ্রেয়। আর ঈদের দিন খুঁতবার পর পর জবাই করা উত্তম। আগের দিনে জবাই করা পরের দিনে জবাই করার চেয়ে উত্তম। যেহেতু এতে নেকীর কাজে দ্রুত সাড়া দেওয়া হয়।” কুরবানীর পশু যবহ করার জন্য নারী-পুরুষের মাঝে কোন পার্থক্য বা শর্তারোপ করা হয়নি। যবহ করা কাজটি সাহসের ব্যাপার। কোনো নারী যদি কুরবানীর পশু যবহ করার সাহস রাখে, তাহলে সে করতে পারবে। ইমাম বুখারী ইবনু রাফি‘ থেকে বর্ণনা করেছেন যে,সাহাবী আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর মেয়েদেরকে নিজ হাতে তাদের কুরবানীর পশু যব্হ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।উক্ত হাদীস প্রমাণ করে মেয়েরাও নিজ হাতে কুরবানী করতে পারে।(সহীহ বুখারী, পৃ. ৮৩৩; ফাৎহুল বারী শারহু সহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯; বিস্তারিত দেখুন; ইবনু উসাইমীন; আহকামুল উদহিয়্যাহ; ইবনুল কাইয়্যেম তাঁর ‘যাদুল মাআদ খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯; ফাতাওয়াল লাজনা দায়িমা’ খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৪০৬; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৬৫১)
.
❑ [৩] কোরবানির সর্বোত্তম পশু:
.
কুরবানী করার সর্বোত্তম পশু হচ্ছে: উট। এরপর গরু। এরপর ভেড়া ও ছাগল। এরপর গরুতে ভাগ দিয়ে কুরবানী করা। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফেয়ি এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়াওমুল জুমু’আর ক্ষেত্রে বলেছেন: “যে ব্যক্তি প্রথম ঘণ্টায় (মসজিদে) গেল সে যেন একটি উট কুরবানী করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় ঘণ্টায় গেল সে যেন একটি গরু কুরবানী করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় ঘণ্টায় গেল সে যেন একটি শিং ওয়ালা প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়া (কাবশ) দিয়ে কুরবানী করল। যে ব্যক্তি চতুর্থ ঘণ্টায় গেল সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। আর যে ব্যক্তি পঞ্চম ঘণ্টায় গেল সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল।”(সহিহ বুখারী হা/৮৮১; ও সহিহ মুসলিম হা/৮৫০) এবং যেহেতু এটি আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনমূলক জবাই। তাই এক্ষেত্রে হাদির ন্যায় উটই উত্তম। আর উটের মধ্যে ভাগ দেয়ার চেয়ে ভেড়া বা ছাগল দিয়ে কুরবানী করা উত্তম। কেননা কুরবানীতে রক্তপাতটাই উদ্দিষ্ট। আর একাকী কুরবানীকারী (একটি পশুর) সম্পূর্ণ রক্তপাত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করেন। গানাম (ভেড়া-ছাগল) শ্রেণীর প্রাণীর মধ্যে কাবশ (প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়া) সর্বোত্তম। যেহেতু ‘কাবশ’ ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরবানীর পশু। এবং কাবশ এর গোশতও ভাল।”(আল-মুগনী খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৬৬; আরো দেখুন; ফাতাওয়াল লাজনাদ দায়িমাহ; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩৯৮; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪৫৭৬৭)
.
❑ [৪] কোরবানির একটি পশু কয়জনের পক্ষ থেকে বৈধ হবে?
.
সামর্থ্যবান প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়ার বিধান রয়েছে। দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “প্রতিটি (সামর্থ্যবান) পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর একটি কুরবানী দেয়া ওয়াজিব”(মুসনাদে আহমাদ হা/২০২০৭) ইবনে হাজার ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বলেন: হাদিসটির সনদ মজবুত। আলবানী ‘সহিহ সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে হা/২৭৮৮) হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন) কুরবানীর পশু হিসেবে একটি মেষ ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে, তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে এবং যত মুসলিমের পক্ষ থেকে নিয়ত করে সবার পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে। এটি সর্বজনবিদিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ছাগলে কুরবানিতে শরিক হওয়া বৈধ নয়। তবে উট ও গরুর কুরবানিতে একাধিক ব্যক্তি শরিক হওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য। এর পক্ষে নবী করিম ﷺ -এর একাধিক সহিহ হাদীস রয়েছে, এবং বিশুদ্ধ আকীদাভিত্তিক সালাফে সালেহীনদের মূল্যবান বাণী ও নির্ভরযোগ্য ফতোয়াসমূহ দ্বারা তা সুপ্রমাণিত। অতএব, কোনো লোক যদি একটি ছাগল কিংবা একটি ভেড়া দিয়ে কোরবানী দেয় তাহলে সেটা তার নিজের পক্ষ থেকে, তার পরিবারের মৃত বা জীবিত যত সদস্যদের পক্ষ থেকে নিয়ত করে সকলের পক্ষ থেকে জায়েয হবে। যদি আমভাবে বা খাসভাবে কোনো নিয়ত না করে তাহলে ‘আহলে বাইত’ বা পরিবার বলতে মানুষের ব্যবহারে যাদেরকে বুঝায় কিংবা ভাষাগতভাবে যাদেরকে বুঝায় তারা সকলে এর অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রথাগতভাবে ব্যক্তি যাদের ভরণপোষণ করে স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজন তাদেরকে পরিবার বলে। আভিধানিক অর্থে পরিবার বলতে ব্যক্তির সেসব আত্মীয়দেরকে বুঝায় যারা তার নিজের বংশধর, তার পিতার বংশধর, তার দাদার বংশধর কিংবা তার প্রপিতামহের বংশধর। একটি মেষ দিয়ে যাদের যাদের পক্ষ থেকে কোরবানী করা জায়েয একটি উটের সপ্তমাংশ কিংবা একটি গরুর এক সপ্তমাংশ দিয়ে তাদের সবার পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। তাই, কেউ যদি এক সপ্তমাংশ উট দিয়ে কিংবা এক সপ্তমাংশ গরু দিয়ে তার পক্ষ থেকে, তার পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয় সেটা জায়েয হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম হাদির পশুর ক্ষেত্রে এক সপ্তমাংশ উট ও এক সপ্তমাংশ গরুকে একটি ছাগলের স্থলাভিষিক্ত করেছেন। অনুরূপ বিধান কুরবানীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। যেহেতু এক্ষেত্রে কুরবানী ও হাদির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।সুতরাং যারা বলেন যে, কুরবানিতে শরিক হওয়া সফর ও হজের সাথে খাস (নির্দিষ্ট) তাদের এই খাসকরণের পিছনে কোনো দলিল নেই। এই খাসকরণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, উদ্ভট এবং দলিলবিহীন।(বিস্তারিত দেখুন; তিরমিযি হা/১২১৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৩১৮; ইমাম ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনী; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৬৩-৩৬৪; ইমাম নববী; কিতাবুল মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব লিশ শীরাযী; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৭১; ইবনু উসাইমীন;আশ-শারহুল মুমতি‘ ‘আলা যাদিল মুস্তাক্বনি‘; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৪২৮; ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৪০১-৪০২; ফাতওয়া নং: ২৪১৬;এবং ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৩৮৭)
.
জেনে রাখা ভালো যে, দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একটি মেষ ক্রয়ে অংশীদার হয়ে সবার পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া জায়েয নয়। কেননা কুরআন-সুন্নাতে এই মর্মে কিছু উদ্ধৃত হয়নি। অনুরূপভাবে আট বা ততোধিক ব্যক্তি একটি উট কিংবা একটি গরুতে অংশীদার হওয়া জায়েয নেই (তবে সাতজনের একটি উটে কিংবা গরুতে অংশীদার হওয়া জায়েয আছে)। কেননা ইবাদতগুলো তাওকিফিয়্যা (দলিলের সীমায় বিধান সীমাবদ্ধ এমন)। এগুলোর ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না; সেটা সংখ্যাগত সীমা হোক কিংবা পদ্ধতিগত সীমা হোক। তবে, সওয়াবের ক্ষেত্রে অংশীদার করা যেতে পারে। যেমন সওয়াবের ক্ষেত্রে অগণিত মানুষকে অংশীদার করার কথা উল্লেখ আছে।(বিস্তারিত দেখুন: ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৩৮৭)।
.
❑ [৫] কুরবানির পশু জবাই করার পদ্ধতি:
.
নিজের কুরবানীর পশুকে ব্যক্তির নিজেই জবাই করাটা উত্তম। যদি কোরবানিদাতা তা করতে না পারে কিংবা করতে না চায় তাহলে অন্যকে দায়িত্ব দিয়ে নিজে জবাই-এ উপস্থিত থাকায় কোনো অসুবিধা নাই। যদি সেটা করতে না পারে কিংবা করতে না চায় তাহলে জবাই অনুষ্ঠানে না থাকলেও কোনো অসুবিধা নাই। কেননা কুরবানীর পশু অন্যকে জবাই করার দায়িত্ব দেয়া জায়েয এতে আলেমদের কোন মতভেদ নেই। আর জবাই এর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। কুরবানীর পশু কুরবানীর নিয়তে জবাই করা শর্ত। গোশতের জন্য জবাই করলে জায়েয হবে না। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কুরবানী শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত।”(আল-মাজমু; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৮০) যে ব্যক্তি কুরবানীর পশু জবাই করতে চান তার জন্য পশু জবাইয়ের নিয়ম হচ্ছে, উট দাঁড়ানো অবস্থায় এর ‘হলক্বূম’ বা কণ্ঠনালীর গোড়ায় কুরবানীর নিয়তে ‘বিসমিল্লা-হি ওয়াল্লাহু আকবার’ বলে তীক্ষ্ণ অস্ত্রাঘাতের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করে ‘নহর’ করতে হয় এবং গরু বা ছাগলের মাথা দক্ষিণ দিকে রেখে বাম কাতে ফেলে গলা এবং ঠোঁটের মাঝে ধারালো ছুরি দিয়ে প্রাণীটিকে জবাই করা। আর গর্দান বা পূর্ণ মাথা বিচ্ছিন্ন না করা। হারাম মস্তিষ্ক পর্যন্ত কাটাও উচিত নয়। শ্বাসনালি ,খাদ্যনালি ও দুইি শাহরগের অন্তত একটি কেটে রক্ত প্রবাহিত করে জবাই সম্পন্ন করা। তবে বাম কাতে ফেলতে ভুলে গেলে দোষের কিছু হবে না। কুরবানী দাতা ধারালো ছুরি নিয়ে ক্বিবলামুখী হয়ে দো‘আ পড়ে নিজ হাতে খুব জলদি যবহের কাজ সমাধা করবেন, যেন পশুর কষ্ট কম হয়। কুরবানির পশু অন্যের দ্বারাও যবহ করানো জায়েয আছে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি নিজ হাতে করা অথবা যবহের সময় স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা উত্তম যেমনটি প্রথমে উল্লেখ করেছি।পশু জবাই এর সময় নিম্নোক্ত দোয়া পড়া সুন্নত:بسم الله ، والله أكبر اللهم هذا منك ولك ، هذا عني اللهم تقبل من فلان وآل فلان”(বিসমিল্লাহ্‌ ওয়াল্লাহু আকবার। আল্লাহুম্মা হাযা মিনকা, ওয়া লাকা। হাযা আন্নি। আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন …ওয়া আলি…)[ডট দেয়া স্থানদ্বয়ে কোরবানীকারীর নাম উল্লেখ করবে](অর্থ- আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি। আল্লাহ্‌ই মহান। হে আল্লাহ্‌, এটি আপনার পক্ষ থেকে; আপনারই জন্য। এটি আমার পক্ষ থেকে উৎসর্গিত (আর অপরের পক্ষ থেকে হলে বলবে: অমুকের পক্ষ থেকে)। হে আল্লাহ্‌, অমুকের ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কবুল করুন।) এই দোয়ার মধ্যে শুধু ‘বিসমিল্লাহ্‌’ বলা ওয়াজিব। বিসমিল্লাহ্‌ এর অতিরিক্ত যে কথাগুলো আছে সেগুলো বলা মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটো ভেড়া দিয়ে কুরবানী করেছেন। দুটোকে তিনি নিজ হাতে জবাই করেছেন; বিসমিল্লাহ্‌ বলেছেন এবং তাকবীর বলেছেন।”(সহিহ বুখারী হা/৫৫৫৪ ও সহিহ মুসলিম হা/১৯৬৬) তবে “হে আল্লাহ্‌! এটি আমার বাবার কুরবানী” এই কথা বলতে কোন বাধা নেই। এটি নিয়ত উচ্চারণ করা নয়।(বিস্তারিত দেখুন: মির‘আতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাসাবীহ, ৫ম খণ্ড: পৃষ্ঠা: ৭৪-৭৫)
.
❑ [৬] কুরবানির গোশত খাওয়া এবং বন্টন করা:
.
কুরবানিকারী কুরবানির গোশত নিজে খেতে পারেন, হাদিয়া দিতে পারেন এবং সদকা করতে পারেন এটি উত্তম তবে ওয়াজিব নয়। দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বাণী: “অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুঃস্থ অভাবীকে আহার করাও”।(সূরা হাজ্জ, আয়াত: ২৮) আল্লাহ্‌ আরও বলেন:“তখন তোমরা তা থেকে খাও এবং আহার করাও এমন দরিদ্রকে যে ভিক্ষা করে এবং এমন দরিদ্রকে যে ভিক্ষা করে না। এভাবে আমরা সেগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর”।(সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৩৬) সালামা বিন আকওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমরা খাও, খাওয়াও এবং সংরক্ষণ করে রাখ”।(সহিহ বুখারী) হাদিসে ‘খাওয়াও’ কথাটি ধনীদেরকে হাদিয়া দেয়া এবং দরিদ্রদেরকে দান করাকে অন্তর্ভুক্ত করবে। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমরা খাও, সংরক্ষণ করে রাখ এবং দান করো”।(সহিহ মুসলিম হা/২৮০৪) কুরবানির গোশত কতটুকু খাওয়া যাবে, কতটুকু হাদিয়া দেওয়া হবে এবং কতটুকু সদকা করা হবে এ ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশস্ততা রয়েছে। অগ্রগণ্য অভিমত হচ্ছে এক তৃতীয়াংশ খাওয়া, এক তৃতীয়াংশ হাদিয়া দেওয়া এবং এক তৃতীয়াংশ সদকা করা। যে অংশটুকু খাওয়া জায়েয সে অংশটুকু সংরক্ষণ করে রাখাও জায়েয; এমন কি সেটা দীর্ঘ দিন পর্যন্ত হলেও যতদিন পর্যন্ত রাখলে এটি খাওয়া ক্ষতিকর পর্যায়ে পৌঁছবে না। কিন্তু যদি দুর্ভিক্ষের বছর হয় তাহলে তিনদিনের বেশি সংরক্ষণ করা জায়েয নয়।ওয়াজিব কুরবানি হোক কিংবা নফল কুরবানি হোক; গোশত খাওয়া কিংবা হাদিয়া দেয়ার হুকুমের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অনুরূপভাবে কোন জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা হোক কিংবা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা হোক কিংবা কোন ওসিয়তের প্রেক্ষিতে কুরবানি করা হোক এ বিধানের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেননা ওসিয়ত পূর্ণকারী ব্যক্তি ওসিয়তকারীর স্থলাভিষিক্ত হন। ওসিয়তকারী খেতে পারেন, হাদিয়া দিতে পারেন এবং সদকা করতে পারেন। কেননা এটাই তো মানুষের মাঝে প্রথাগতভাবে প্রচলিত। আর যেটা প্রথাগতভাবে প্রচলিত সেটা শব্দ দিয়ে উচ্চারণ করার সমতুল্য। প্রতিনিধিকে যদি তার নিয়োগকর্তা খাওয়া, হাদিয়া দেওয়া ও সদকা করার অনুমতি দেন কিংবা বিশেষ কারণ বা প্রথা অনুমতি দেয়াকে নির্দেশ করে তাহলে তিনি সেটা করতে পারেন। নচেৎ তিনি নিয়োগকর্তাকে হস্তান্তর করবেন। নিয়োগকর্তা নিজে বণ্টনের দায়িত্ব পালন করবেন। কুরবানির পশুর গোশত, চামড়া ইত্যাদি কোন কিছুই বিক্রি করা হারাম। কসাইকে তার পারিশ্রমিক কিংবা পারিশ্রমিকের অংশ বিশেষ কুরবানির পশুর গোশত থেকে দেওয়া যাবে না। কেননা এটা বেচা-বিক্রির অধিভুক্ত। আর যাকে কুরবানির পশুর হাদিয়া দেওয়া হলো কিংবা সদকা দেওয়া হলো তিনি এ গোশত বিক্রি করা কিংবা অন্য যা ইচ্ছা তা করতে পারবেন। তবে, তাকে যিনি হাদিয়া দিয়েছেন কিংবা সদকা দিয়েছেন তার কাছে বিক্রি করতে পারবেন না।(বিস্তারিত দেখুন ইমাম আলবানী, ইরওয়াউল গালীল, হা/১১৬০; মির‘আত, হা/১৪৯৩, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১২০ ও ৯ম খণ্ড, পৃ. ২৪৪; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, ১১তম খণ্ড, পৃ. ১০৮-০৯; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৫৩২)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ফরজ সিয়ামের কাযা এবং জিলহজ্জের প্রথম নয় দিনের নফল সিয়াম একই নিয়তে একত্রে রাখা কি শরিয়ত সম্মত

 প্রশ্ন: ফরজ সিয়ামের কাযা এবং জিলহজ্জের প্রথম নয় দিনের নফল সিয়াম এই দুই সিয়াম একই নিয়তে একত্রে রাখা কি শরিয়ত সম্মত?

▬▬▬▬▬▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর: যিলহজ্জ হল হিজরি চন্দ্রবছরের দ্বাদশ ও সর্বশেষ মাস, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। এই মাসের প্রথম দশ দিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ,কারণ এই সময়েই ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজের মূল কার্যাবলি সম্পন্ন হয়। আল্লাহ তা’আলা মানবজাতির জন্য কিছু নির্দিষ্ট দিন, মাস ও সময় নির্ধারণ করেছেন, যেগুলোতে ইবাদত-বন্দেগি করার ফযীলত অনেক বেশি। তেমনই একটি মহান মাস হলো যিলহজ্জ। এটি কুরবানির স্মৃতি বিজড়িত মাস, যা আমাদের নবী ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর ত্যাগ ও আনুগত্যের অনন্য দৃষ্টান্তকে স্মরণ করিয়ে দেয়।এই মাসের সবচেয়ে গুরুত্ববহ দিকগুলো হল—হজ, কুরবানী, এবং আরাফার দিনের মর্যাদা। বিশেষ করে প্রথম দশ দিনকে ইসলামের ইতিহাসে অতুলনীয় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। হাদীসে এসেছে, জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:”أَفْضَلُ أَيَّامِ الدُّنْيَا أَيَّامُ الْعَشْرِ”দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ দিনসমূহ হলো যিলহজ্জের প্রথম দশ দিন।” (সহীহুল জামে হা/১১৩৩) এই দশ দিন ইবাদতের বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। এর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো—প্রথম দিন থেকে নবম দিন পর্যন্ত সিয়াম রাখা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে এই দিনগুলোতে সিয়াম রাখতেন এবং তাঁর উম্মাহকেও তা পালনের প্রতি উৎসাহ দিতেন।সুতরাং,যিলহজ্জ মাসের এই মূল্যবান দিনগুলোকে হেলায় হারানো উচিত নয়। বরং ইবাদত, তওবা, দান-সদকা, যিকির, তিলাওয়াত এবং সিয়ামের মাধ্যমে আমরা যেন এই দিনগুলোকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারি—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।জিলহজ মাসের প্রথম দশকের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য হলো, এতে সকল মৌলিক ইবাদতের সন্নিবেশ ঘটে। যথা: সলাত, সিয়াম, সাদাকাহ (কুরবানি), হজ ইত্যাদি। অন্যান্য সময়ে একসাথে এতগুলো ইবাদতের সন্নিবেশ ঘটে না।(ইমাম ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি:খণ্ড;২;পৃষ্ঠা;৪৬০) বিখ্যাত তাবিয়ি সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাহ.)-এর অভ্যাস ছিলো, তিনি জিলহজ মাসের প্রথম দশকে ইবাদতের জন্য কঠোরভাবে সাধনা করতেন।(সুনান দারিমি; হাসান সনদ)
.
▪️এখন প্রশ্ন হচ্ছে ফরজ সিয়ামের কাযা এবং জিলহজ্জের প্রথম নয় দিনের নফল সিয়াম এই দুই সিয়াম একই নিয়তে একত্রে রাখা কি শরিয়ত সম্মত?
.
এ বিষয়ে আহালুল আলেমদের গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো যদি ইবাদতের প্রকার ভিন্ন হয়, (ফরজ এবং নফল) তাহলে তা আলাদা নিয়ত ও পৃথকভাবে পালন করা আবশ্যক। অর্থাৎ, ফরজ ও নফল ইবাদত একত্রে এক নিয়তে আদায় করা শরিয়তসম্মত নয়। তাই একাধিক সিয়াম যদি ভিন্ন শ্রেণির হয় যেমন ফরজ ও নফল একই নিয়তে একত্রে পালন করা যাবে না। সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,لا يجوز صيام التطوع بنيتين ، نية القضاء ونية السنة “দুটি নিয়তে নফল সিয়াম রাখা জায়েয নেই, একটি কাযা সিয়ামের নিয়ত এবং একটি সুন্নত সিয়ামের রাখার নিয়ত।”…! (ফাতাওয়া লাজনা আদ-দায়েমাহ, ১০তম খণ্ড: ৩৮৩)
.
যাদের ওপর এক বা একাধিক দিনের রমযানের ফরজ সিয়াম কিংবা অন্য কোন ফরজ সিয়ামের কাযা রয়েছে, তাঁদের জন্য সর্বোত্তম হলো প্রথমেই সেই কাযা সিয়ামগুলো আদায় করে ফেলা। ইসলামি শরীআতে ফরজ ইবাদত সবসময় নফল ইবাদতের ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত; কারণ রমযানের রোযা ইসলামের অন্যতম মূল ভিত্তি পঞ্চ স্তম্ভের একটি। আর ফরজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়াকে অন্য মুস্তাহাব আমলের উপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।সুতরাং ফরজ সিয়াম আদায় না করে নফল সিয়াম রাখা উচিত নয়।তবে এর অর্থ এই নয় যে, রমযানের কাযা সিয়াম কিংবা অন্য কোন ফরজ সিয়ামের কাযা থাকলে নফল সিয়াম রাখা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।বরং অধিকাংশ আলেমের অভিমত অনুযায়ী, যদি কারো সামনে কাযা সিয়াম আদায়ের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে এবং পরবর্তী রমযানের আগে তা আদায় করা সম্ভব হয়—তাহলে সে গুরুত্বপূর্ণ নফল সিয়ামও রাখতে পারে। এ অবস্থায় নফল সিয়াম পালন বৈধ ও সহিহ হবে। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: রমযানের কাযা আদায় না করে শাওয়ালের ছয় সিয়াম পালন করা সম্পর্কে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অনেক ফকীহের মতে, শাওয়ালের ছয় সিয়ামের রাখার পূর্বে রমযানের কাযা সিয়াম আদায় করাই উত্তম ও সুন্নাতের আদর্শের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৯২৪২৩)
.
▪️এখন যাঁদের ওপর একাধিক ফরজ সিয়াম আদায় করা বাকি আছে, তাঁদের জন্য জিলহজ মাসের প্রথম নয় দিনের নফল সিয়াম রাখার সঠিক পদ্ধতি কী?
.
এই বিষয়ে সবচেয়ে নিরাপদ মতামত হচ্ছে, যাদের ওপর ফরজ সিয়াম অনেকগুলো কাযা রয়েছে, তারা জিলহজ্জের প্রথম ৯ দিনে ওই কাযা সিয়ামের নিয়তেই সিয়ামগুলো রাখবেন। এতে করে আশা করা যায় জিলহজ্জর সিয়াম রাখার আকাঙ্ক্ষা থাকার কারণে আপনি একদিকে কাজা আদায় করবেন, অন্যদিকে জিলহজ্জের এই মহান দিনের সিয়ামের ফজিলতও অর্জন করবেন ইন শা আল্লাহ। বান্দা যেসব আমল করে সেগুলোর সওয়াবের পরিমাণ নির্ধারণ করার দায়িত্ব আল্লাহ্‌র উপরে। বান্দা যদি আল্লাহ্‌র কাছে প্রতিদান প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহ্‌র আনুগত্যের পথে অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তার প্রতিদান নষ্ট করবেন না। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন:اِنَّ اللّٰهَ لَا یُضِیۡعُ اَجۡرَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ“নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সৎ কর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।”(সূরা তওবাহ; আয়াত: ১২০)
.
“আবূ উবাইদ (ইবন কুতাইবা) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: আমাকে বর্ণনা করেছেন ‘আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী; তিনি বর্ণনা করেছেন সুফইয়ান আস-সাওরী থেকে; তিনি বর্ণনা করেছেন আসওয়াদ ইবনু কায়েস থেকে; আর তিনি বর্ণনা করেছেন তাঁর পিতা কায়েস আল-আব্দী থেকে তিনি বলেন: প্রখ্যাত সাহাবী ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ২৩ হি.] সম্পর্কে এসেছে যে,عنه أنه كان يستحب قضاء رمضان في عشر ذي الحجة، وقال: ” ما من أيامٍ أقضى فيهن رمضان أحب إلي منها”তিনি রমজানের কাজা সিয়াম জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে রাখা পছন্দ করতেন এবং বলতেন:এই দিনগুলোর চেয়ে উত্তম কোনো দিন নেই, যেগুলিতে আমি রমজানের সিয়াম কাযা করি, এ দিনগুলো আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়।”(গারিবুল হাদীস; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৮৮-২৮৯; বাইহাক্বী সুনানুল কুবরা হা/৮৩৯৫; সনদ বিশুদ্ধ) একই বক্তব্য ভিন্ন বর্ণনায়ও এসেছে। ইবনু আবী শায়বা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুসান্নাফ-এ এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, যেখানে বর্ণিত হয়েছে: শারীক আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, তিনি আসওয়াদ ইবনু কাইস থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে এবং তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন—তিনি বলেছেন:لاَ بَأْسَ بِقَضَاءِ رَمَضَانَ فِي الْعَشْرِ “জিলহজের প্রথম দশ দিনে রমজানের কাযা সিয়াম রাখা দোষের কিছু নয়।”(মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ,খণ্ড;৬;পৃষ্ঠা; ৬০ হা/১০৭৬;আল-মুসান্নাফ-এর গবেষকগণ এই রেওয়ায়েতকে হাসান (ভালো মানের) হিসেবে অভিহিত করেছেন। অপরদিকে ইমাম ইবনু হাজার আল-আসকালানি (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ফাতহুল বারী ফী শারহিল বুখারী, খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৮৯-তে উক্ত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)
.
বর্ণনাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আবু উবাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:معناه: أنَّه لا يتحرَّى التأخير إلى العَشر، ولكنه كان يَستحب صيام العَشر، فإذا دخل على مَن عليه قضاء صام قضاء، لئلاَّ يكون قد تطوَّع وعليه قضاء فيجتمع له الأمران.”এর অর্থ হলো, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনে সিয়াম রাখার জন্য দেরি করতেন না, বরং তিনি এই দশ দিনে সিয়াম রাখতে পছন্দ করতেন। অতএব, যদি কারো উপর কাযা সিয়াম থাকত, সে এই দিনে কাযা সিয়াম রাখত, যাতে এমন না হয় যে, নফল সিয়াম রাখছে অথচ ফরয (কাযা) বাকি আছে। এতে করে উভয়টিই (ফরয এবং নফল) একসাথে আদায় হয়ে যেত।”(ইবনু কাসীর; মুসনাদে আল ফারুক খণ্ড; ১; পৃষ্ঠা; ৪২৭)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত: ৮৫২ হি:] বলেন:قيس العبدي، والد الأسود.عن: علي في الإمارة، وعنه: ابنه الأسود… وروى عن عمر بن الخطاب أيضا.قال النسائي: ثقة.قلت: وقال ابن سعد: قيس أبو الأسود العبدي شهد صلح الحيرة مع خالد بن الوليد، وروى عن عمر حديثا في الجمعة.وذكره ابن حبان في الثقات “কাইস আল-আব্দী, যিনি আসওয়াদের পিতা তিনি ‘ইমারাত’ (শাসনব্যবস্থা) সম্পর্কে আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন তাঁর পুত্র আসওয়াদ। তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন।ইমাম নাসাঈ বলেছেন: তিনি (ثقة) বিশ্বস্ত বর্ননাকারী। আমি (ইবনু হাজার) বলি: ইবনু সা‘দ বলেছেন: কাইস আবু আসওয়াদ আল-আব্দী যিনি খালিদ ইবনুল ওলিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে হীরা যুদ্ধচুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন,এবং উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে জুমআ বিষয়ক হাদীস বর্ণনা করেছেন ইবনু হিব্বান তাঁকে বিশ্বস্ত রাবিদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।”(হাফেজ ইবন হাজার “তাহযীবুত তাহযীব”;খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪৫৪-৪৫৫)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: যদি ফরয রোযা ও নফল সিয়াম একসাথে পড়ে, তাহলে কি কেউ নফল সিয়াম রাখতে পারবে এবং ফরয সিয়াম পরে কাজা করে নিতে পারবে? যেমন: আশুরা বা আরাফার সিয়াম এবং রমজানের কাযা।
উত্তরে শাইখ বলেন:
بالنسبة للصيام الفريضة والنافلة لا شك أنه من المشروع والمعقول أن يبدأ بالفريضة قبل النافلة ، لأن الفريضة دَيْنٌ واجب عليه ، والنافلة تطوع إن تيسرت وإلا فلا حرج ، وعلى هذا فنقول لمن عليه قضاء من رمضان : اقض ما عليك قبل أن تتطوع ، فإن تطوع قبل أن يقضي ما عليه فالصحيح أن صيامه التطوع صحيح مادام في الوقت سعة ، لأن قضاء رمضان يمتد إلى أن يكون بين الرجل وبين رمضان الثاني مقدار ما عليه ، فمادام الأمر موسعا فالنفل جائز ، كصلاة الفريضة مثلا إذا صلى الإنسان تطوعا قبل الفريضة مع سعة الوقت كان جائزا ، فمن صام يوم عرفة ، أو يوم عاشوراء وعليه قضاء من رمضان فصيامه صحيح ، لكن لو نوى أن يصوم هذا اليوم عن قضاء رمضان حصل له الأجران : أجر يوم عرفة ، وأجر يوم عاشوراء مع أجر القضاء ، هذا بالنسبة لصوم التطوع المطلق الذي لا يرتبط برمضان ، أما صيام ستة أيام من شوال فإنها مرتبطة برمضان ولا تكون إلا بعد قضائه ، فلو صامها قبل القضاء لم يحصل على أجرها ، لقول النبي صلى الله عليه وسلم : من صام رمضان ثم أتبعه بست من شوال فكأنما صام الدهر ومعلوم أن من عليه قضاء فإنه لا يعد صائما رمضان حتى يكمل القضاء ، وهذه مسألة يظن بعض الناس أنه إذا خاف خروج شوال قبل صوم الست فإنه يصومها ولو بقي عليه القضاء ، وهذا غلط فإن هذه الستة لا تصام إلا إذا أكمل الإنسان ما عليه من رمضان “
“ফরয ও নফল সিয়ামের মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই যে, শরীয়ত ও সাধারণ বোধদৃষ্টিতে ফরয সিয়াম আদায় করাই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ফরয সিয়াম হলো একটি ওয়াজিব দায় একটি ঋণ, যা আদায় করতেই হবে। অন্যদিকে, নফল সিয়াম ইচ্ছাকৃত; যা সম্ভব হলে রাখা উত্তম,না রাখলেও দোষ নেই। তাই আমরা বলি: যার ওপর রমজানের সিয়াম বাকি আছে, সে যেন তা আদায় করে নেয়, তারপর নফল সিয়াম পালন করে।তবে যদি কেউ আগে নফল সিয়াম রেখে পরে কাযা সিয়াম আদায় করে, তাহলে অধিকতর সঠিক মত হলো, তার সেই নফল সিয়ামও শুদ্ধ হবে, যতক্ষণ না রমজানের কাযা সিয়াম রাখার সময় ফুরিয়ে যায়। কারণ, রমজানের কাজা আদায়ের জন্য এক পূর্ণ বছর সময় থাকে পরবর্তী রমজান শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত।সুতরাং এই সময়সীমা থাকাকালীন নফল সিয়াম রাখা জায়েয। এটি নামাযের বিধানের মতোই: যদি কেউ ওয়াক্ত থাকা অবস্থায় নফল নামায আগে পড়ে এবং পরে ফরয নামায পড়ে, তবে তা বৈধ হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আরাফাতের দিন অথবা আশুরার দিনে সিয়াম পালন করে এবং তার উপর রমজানের কাযা সিয়াম অনাদায় থাকে তবে তার সিয়াম রাখাটা সহিহ। তবে তিনি যদি এই সিয়ামের মাধ্যমে রমজানের কাযা সিয়াম পালনেরও নিয়্যত করেন তবে তার দুটি সওয়াব হবে। আরাফাতের দিন অথবা আশুরার দিন সিয়াম পালনের সওয়াব ও কাযা সিয়াম আদায়ের সওয়াব। এটি সাধারণ নফল সিয়ামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রমজানের সিয়ামের সাথে যে নফল সিয়ামের কোন সম্পর্ক নেই। তবে শাওয়ালের ছয় সিয়াম রমজানের সাথে সম্পৃক্ত। সে সিয়াম রমজানের কাযা সিয়াম আদায়ের পরেই রাখতে হবে। তাই যদি কেউ কাযা আদায়ের আগে তা পালন করে তবে তিনি এর সওয়াব পাবেন না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেছেন :من صام رمضان ثم أتبعه بست من شوال فكأنما صام الدهر “যে ব্যক্তি রমজান মাসে সিয়াম পালন করল, সে সিয়ামের পর শাওয়াল মাসেও ছয়দিন সিয়াম পালন করল, সে যেন গোটা বছর সিয়াম রাখল।”আর এটি জানা বিষয় যে, যার উপর কাযা সিয়াম রয়ে গেছে সে রমজান মাসে সিয়াম পালন করেছে বলে ধরা হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার কাযা সিয়াম আদায় সম্পূর্ণ করে।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৪৩৮) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬▬✪✪✪▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

যিলহজ্জের দশ দিনে রাসূলুল্লাহ্ সিয়াম রাখেননি ও ছাড়েননি এ দুটো হাদীসের মধ্যে সমন্বয়

 প্রশ্ন: একটি হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কখনো যিলহজ্জের দশ দিনে সিয়াম রাখেননি” আবার আরেকটি হাদিসে এসেছে, তিনি (ﷺ) যিলহজ্জের দশ দিনের সিয়াম কখনো ছাড়েননি এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ দুটো হাদীসের মধ্যে সমন্বয় কিভাবে হবে? একটা দলিল ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর  মুসলিমদের জন্য মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কিছু দিন, মাস এবং সময় রয়েছে, সেইদিন বা সেই সময়ের আমল বা কাজের মধ্যে রয়েছে অনেক ফযীলত। এরূপ একটি মাস হলো মুসলিম ঐতিহ্য কুরবানীর স্মৃতি বিজড়িত যিলহজ্জ মাস। এ মাসের মধ্যে অন্যতম বিষয় হলো হজ্জ, কুরবানী এবং আরাফার দিনের মর্যাদা। সব মিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস হল যিলহজ্জ মাস। যিলহজ্জ মাসের আগমনের সাথে সাথে মুসলিমগণ তাওহীদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়। বনু আদমের সন্তানগণ স্মরণ করে মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর চেতনাকে। যে চেতনার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সংস্কার ও সংশোধন করার শিক্ষা গ্রহণ করে। পাশাপাশি এই মাসের ফযীলত ও তাৎপর্য উপলব্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। যিলহজ্জ মাসে অনেক আমল রয়েছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার ফযীলতও অত্যধিক।যিলহজ্জের প্রথম দশদিন ইবাদতের মহান মৌসুম। আল্লাহ তাআলা বছরের অন্যসব দিনের উপর এ দিনগুলোকে মর্যাদা দিয়েছেন। প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: “অন্য যে কোন সময়ের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে এ দিনগুলোর তথা দশদিনের নেক আমল অধিক প্রিয়। তারা (সাহাবীরা) বলেন: আল্লাহর পথে জিহাদও নয়!! তিনি বলেন: আল্লাহর পথে জিহাদও নয়; তবে কোনো লোক যদি তার জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং কোন কিছু নিয়ে ফেরত না আসে সেটা ভিন্ন কথা।”(সহিহ বুখারী; ২/৪৫৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৭২৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৬৮; সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১২৪৮; ইরওয়াউল গালীল, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৯৭) তাঁর থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: “আল্লাহর কাছে ঈদুল আযহার দশদিনে পালনকৃত নেক আমলের চেয়ে অধিক পবিত্র ও অধিক সওয়াবের অন্য কোন আমল নেই। জিজ্ঞেস করা হল- আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়? তিনি বললেন: না; আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে কোনো লোক যদি তার জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং কোনো কিছু ছাড়া ফেরত আসে”।(সুনানে দারেমী হা/১৭৭৪; বায়হাক্বী-শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৪৭৬; সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১২৪৮; ইরওয়াউল গালীল,৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৯৮, সনদ হাসান) এ সকল দলিল ও অন্যান্য দলিল প্রমাণ করে যে, এ দশটি দিন বছরের অন্য দিনগুলোর চেয়ে উত্তম; এমনকি রমযানের শেষ দশ দিবসের চেয়েও উত্তম। তবে, রমযানের শেষ দশরাত্রি যিলহজ্জের দশরাত্রির চেয়ে উত্তম; যেহেতু ঐ রাতগুলোতে লাইলাতুল ক্বদর আছে, যে রাতটি হাজার রাতের চেয়ে উত্তম।”(দেখুন: তাফসীরে ইবনু কাসীর; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪১২) প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে- খাঁটি তওবা করার মাধ্যমে এ দিনগুলো শুরু করা। এ মাসের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো সিয়াম রাখা। যিলহজ্জ মাসের (প্রথম) ৯ দিন সিয়াম রাখা মুসলিমের জন্য সুন্নত।কেননা রাসূল (ﷺ) এ দশদিনে নেক কাজ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। সিয়াম রাখা নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত। সিয়ামকে আল্লাহ তাআলা নিজের জন্য নির্বাচন করেছেন। হাদিসে কুদসীতে এসেছে- “বনী আদমের সকল আমল তার নিজের জন্য শুধু সিয়াম ছাড়া। সিয়াম আমারই জন্য। তাই আমি এর প্রতিদান দেবো।”(সহিহ বুখারী হা/১৮০৫)
.
❑এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাসূল (ﷺ) নিজে কি জিলহজ্জ মাসের সিয়াম রেখেছেন? যদি রেখে থাকেন তাহলে যে হাদিসে রাখেননি বলা হয়েছে সেই হাদিস সম্পর্কে ব্যাখ্যা কি হবে?
.
প্রিয় পাঠক! প্রথমেই আমরা দুটি হাদিস দেখব তারপরে হাদিস সম্পর্কে সালাফদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেখব:
.
ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَائِمًا فِي الْعَشْرِ قَطُّ “আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে কখনো যিলহজ্জের দশ দিনে সিয়াম রাখতে দেখিনি।”(সহীহ মুসলিম, হা/ ১১৭৬; আবূ দাঊদ, হা/২৪৩৭: তিরমিযী হা/৭৫৩, ইবনু মাজাহ হা/৫৫২, মুসনাদে আহমাদ হা/২৫০৯৭) ।
.
পক্ষান্তরে উম্মুল মু’মিনীন হাফসাহ্ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: أربع لم يكن يدعهن رسول الله صلى الله عليه وسلم صيام يوم عاشوراء والعشر وثلاثة أيام من كل شهر والركعتين قبل الغداة “চারটি জিনিস রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কখনো ছাড়তেন না: আশুরার সিয়াম, যিলহজ্জের দশ দিনের সিয়াম, প্রতি মাসের তিন দিন সিয়াম এবং ফজরের পূর্বে দুই রাক‘আত সালাত।”(মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ২৮৭; হা/২৬৭৫২; নাসায়ী; আস-সুনান খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২০৫ হা/ ২৪১৬; ইবনু হিব্বান; আস-সহীহ খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৯৫ হা/৩৬৩৫; ইমাম বাইহাক্বী; আস-সুনানুল কুবরা খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৮৬ হা/৮১২৬; ত্বাবারাণী, আল-মু‘জামুল কাবীর খণ্ড: ২৩; পৃষ্ঠা: ৩১৩, হা/৭৪১; ইমাম আলবানী হাদীসটি সহীহ বলেছেন আবু দাউদ; খণ্ড:২; পৃষ্ঠা: ৪৬২)।
.
▪️এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ দুটো হাদীসের মধ্যে সমন্বয় কিভাবে হবে?
❑ প্রথমত: এ বিষয়ে ইমামগনের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে,যার মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: তবে বলা হয়, উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) যা জানতেন,সেটাই বর্ণনা করেছেন;”যিনি তার বিপরীত বর্ণনা করেছেন, সম্ভবত তিনি সেই বিষয়ে অবগত ছিলেন না।আর মূলনীতি হলো—জ্ঞাত ব্যক্তি অজ্ঞাত ব্যক্তির উপর প্রাধান্য লাভ করে, এবং প্রমাণ পেশকারী ব্যক্তির বক্তব্যই গ্রহণযোগ্য হয় অপ্রমাণকারীর তুলনায়।”
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:قال الإمام أحمد رحمه الله في التعارض بين هذين الحديثين: إن المثبت مقدم على النافي.”ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) যখন দুটি হাদীসের মধ্যে বিরোধ দেখতে পেতেন, তখন বলতেন:”প্রমাণকারী (হাদিস) অপ্রমাণকারী (হাদিসের) উপর অগ্রাধিকার পায়।”(ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৫৪)।
.
❑ দ্বিতীয়ত: কথাকে (বক্তব্যকে) কাজের (কর্মের) উপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস বক্তব্যভিত্তিক, আর আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীস কর্মভিত্তিক। সুতরাং বক্তব্যকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কারণ সম্ভবত সে কর্মটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য বিশেষভাবে নিদিষ্ট ছিল,অথবা কোনো নির্দিষ্ট ওজরের কারণে তিনি তা করেছেন।”
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:”القول الصادر من الرسول عليه السلام الموجه إلى الأمة هو شريعة عامة، أما الفعل الذي يفعله هو، فيمكن أن يكون شريعة عامة حينما لا يوجد معارض له، ويمكن أن يكون أمراً خاصاً به عليه الصلاة والسلام”নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বানীসমূহ উম্মতের উদ্দেশ্যে পেশ করেছেন, তা একটি সার্বজনীন শরিয়ত। আর তিনি যে কাজ নিজে করেছেন,তা তখনই সার্বজনীন শরিয়ত হয় যখন তার কোনো বিরোধী কিছু না থাকে; অন্যথায় তা শুধু তাঁর জন্য নির্দিষ্ট (খাস) একটি বিষয় হতে পারে।”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৯১৪১৮)
.
❑ তৃতীয়ত: এটা হতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো ওজর, যেমন সফর, অসুস্থতা, ব্যস্ততা ইত্যাদির কারণে এই দিনগুলোতে সিয়াম রাখেননি। তাই আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তিনি যা দেখেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,وَأَمَّا حَدِيثُ عَائِشَةَ قَالَتْ: “مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَائِمًا فِي الْعَشْرِ قَطُّ”، وَفِي رِوَايَةٍ “لَمْ يَصُمْ الْعَشْرَ ” رَوَاهُمَا مُسْلِمٌ فِي صَحِيحِهِ، فَقَالَ الْعُلَمَاءُ: وَهُوَ مُتَأَوِّلٌ عَلَى أَنَّهَا لَمْ تَرَهُ، وَلَمْ يَلْزَمْ مِنْهُ تَرْكُهُ فِي نَفْسِ الْأَمْرِ؛ لِأَنَّهُ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَكُونُ عِنْدَهَا فِي يَوْمٍ مِنْ تِسْعَةِ أَيَّامٍ؛ وَالْبَاقِي عِنْدَ بَاقِي أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ رضي الله عنهن، أَوْ لَعَلَّهُ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَصُومُ بَعْضَهُ فِي بَعْضِ الْأَوْقَاتِ، وَكُلَّهُ فِي بَعْضِهَا , وَيَتْرُكُهُ فِي بَعْضِهَا لِعَارِضِ سَفَرٍ أَوْ مَرَضٍ أَوْ غَيْرِهِمَا، وَبِهَذَا يُجْمَعُ بَيْنَ الْأَحَادِيثِ”আয়িশাহ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) থেকে বর্নিত হয়েছে,তিনি বলেছেন:”আমি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে কখনো যিলহজ্জের দশ দিনে সিয়াম রাখতে দেখিনি।”(সহীহ মুসলিম,হা/ ১১৭৬) অপর একটি বর্ণনায় আছে,”তিনি এই দশকে সিয়াম রাখতেন না।”এই দুটি হাদীস সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে আলেমগণ বলেন: এ হাদীসের ব্যাখ্যা হলো, আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) যা দেখেছেন তা-ই বলছেন; এর মানে এই নয় যে, বাস্তবে তিনি সিয়াম রাখেননি। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই নয় দিনের মধ্যে কেবল একদিন তার (আয়শা রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহার) কাছে থাকতেন, বাকি দিনগুলো অন্যান্য উম্মাহাতুল মু’মিনীনের নিকট থাকতেন। এছাড়াও হতে পারে, তিনি কখনো কখনো এই দিনগুলোতে সিয়াম রাখতেন,আবার কখনো পূর্ণ দশ দিনই রাখতেন, আবার কোনো বছর কোনো ওজরের কারণে যেমন সফর, অসুস্থতা ইত্যাদি — সিয়াম রাখতেন না। এইভাবে সব হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব। “(ইমাম নববী আল-মাজমু‘ খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৪১)
.
ইমাম শাওকানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:تَقَدَّمَت أَحَادِيثُ تَدُلُّ عَلَى فَضِيلَةِ الْعَمَلِ فِي عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ عَلَى الْعُمُومِ , وَالصَّوْمُ مُنْدَرِجٌ تَحْتِهَا. وَأَمَّا مَا أَخْرَجَهُ مُسْلِمٌ عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ: “مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَائِمًا فِي الْعَشْرِ قَطُّ” فَقَالَ الْعُلَمَاءُ: الْمُرَادُ أَنَّهُ لَمْ يَصُمْهَا لِعَارِضِ مَرَضٍ أَوْ سَفَرٍ أَوْ غَيْرِهِمَا، أَوْ أَنَّ عَدَمَ رُؤْيَتِهَا لَهُ صَائِمًا لَا يَسْتَلْزِمُ الْعَدَمَ، عَلَى أَنَّهُ قَدْ ثَبَتَ مِنْ قَوْلِهِ مَا يَدُلُّ عَلَى مَشْرُوعِيَّةِ صَوْمِهَا كَمَا فِي حَدِيثِ الْبَابِ فَلَا يَقْدَحُ فِي ذَلِكَ عَدَمُ الْفِعْلُ.” ا “আগে উল্লেখিত হাদীসসমূহ প্রমাণ করে যে, জিলহজের প্রথম দশ দিনে আমল করাকে সাধারণভাবে ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে, আর সিয়াম তার অন্তর্ভুক্ত।আর সহীহ মুসলিমে আয়েশা (রাযি.) হতে বর্ণিত হাদীস ,যেখানে তিনি বলেন,”আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনোই এই দশকে সিয়াম রাখতে দেখিনি, এর ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেন: এর অর্থ হলো, হয়তো কোনো অসুস্থতা, সফর বা অন্য কোনো ওজরের কারণে তিনি সিয়াম রাখেননি। অথবা, আয়েশা (রাযি.) তাঁর সিয়াম রাখা দেখেননি, তাই বলে এটি প্রমাণ করে না যে তিনি সিয়াম রাখেননি।এ ছাড়াও, তাঁর বক্তব্য থেকে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, এই দিনগুলোতে সিয়াম রাখা শরীয়তে প্রমাণিত এবং তা সুন্নাত। যেমন হাদীসের মর্মবাণী থেকে বোঝা যায়। সুতরাং কেবল কর্ম (সিয়াম রাখতে না দেখা) দিয়ে এই বিধান বাতিল হয়ে যায় না।”(ইমাম শাওকানী; নাইলুল আওতার; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৮৩)
.
❑ চতুর্থত: এটাও হতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কখনো এই দিনগুলোতে সিয়াম রাখতেন না; কারণ তিনি এমন অনেক আমল পছন্দ করতেন, যা তিনি নিজে করতেন আবার ছেড়েও দিতেন, এই আশঙ্কায় যে তা উম্মতের উপর ফরজ হয়ে যেতে পারে, যেমন তিনি রমজানে তারাবীহর সলাত জামাআতে পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন।তিনি কখনো কখনো কোনো আমল ছেড়ে দিতেন কেবল উম্মতের প্রতি মমতার কারণে সহজতা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে। সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে এ বর্ণিত হয়েছে: আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা.) বলেন, আমি কখনোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দোহা সলাত (সূবহাতুদ দোহা) আদায় করতে দেখিনি, যদিও আমি তা পড়ি। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন অনেক কাজ ছেড়ে দিতেন, যা তিনি করতে পছন্দ করতেন, এই আশঙ্কায় যে লোকেরা তা অনুসরণ করে বসবে এবং পরে তা তাদের উপর ফরজ হয়ে যাবে।”(সহীহ বুখারি হা/১১২৮; সহীহ মুসলিম হা/৭১৮)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৮৫২ হি:] বলেন:وَاسْتُدِلَّ بِهِ – أي بحديث ابن عباس – عَلَى فَضْلِ صِيَامِ عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ لِانْدِرَاجِ الصَّوْمِ فِي الْعَمَلِ، وَلَا يَرد عَلَى ذَلِكَ مَا رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَغَيْرُهُ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَائِمًا الْعَشْرَ قَطُّ؛ لِاحْتِمَالِ أَنْ يَكُونَ ذَلِكَ لِكَوْنِهِ كَانَ يَتْرُكُ الْعَمَلَ وَهُوَ يُحِبُّ أَنْ يَعْمَلَهُ خَشْيَةَ أَنْ يُفْرَضَ عَلَى أُمَّتِهِ “ইবন আব্বাস (রাদি.)-এর হাদীস থেকে জিলহজের প্রথম দশ দিন সিয়াম রাখার ফজিলতের প্রমাণ গ্রহণ করা হয়েছে, কারণ সিয়াম ‘সৎকর্মের’ অন্তর্ভুক্ত। আর আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা.)-এর হাদীস। যাতে তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনোই এই দশকে সিয়াম রাখতে দেখিনি’— তা এর বিরোধিতা করে না।কারণ হতে পারে, তিনি এমন কিছু আমল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ছেড়ে দিতেন, যাতে তা উম্মতের উপর ফরজ হয়ে না যায়।”(ফাতহুল বারী ফী শারহিল বুখারী, খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৬০)
.
❑ পঞ্চমত: এটাও বলা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিলহজের প্রথম নয় দিন সিয়াম রাখতেন’ এই হাদীসটি দুর্বল, এবং তা দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।এই হাদীসটি হুনাইদা থেকে ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে।কারো মতে, তিনি তার স্ত্রীর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোনো স্ত্রী হতে বর্ণনা করেছেন,আবার কারো মতে, তিনি হাফসা (রাদিয়াল্লাহু আনহা.) থেকে বর্ণনা করেছেন,আরেক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি তার মায়ের মাধ্যমে উম্মু সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা.) থেকে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছেন।(দেখুন: “নুসবুর রায়াহ” খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৫৭) সুতরাং,হাদীসটি যদি দুর্বলও ধরা হয়, তবুও ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু.)-এর হাদীসের সাধারণ বক্তব্য, যাতে এই দশ দিনে সৎকর্ম করার ফজিলত এসেছে, সেটাই এই দিনগুলোতে সিয়াম রাখার শরঈ প্রমাণ হিসেবে রয়ে যায়।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি জিলহজের পূর্ণ দশ দিন সিয়াম রাখার বিষয়ে কিছু বলেছেন বা করেছেন?
উত্তরে তিনি বলেন:
” ورد عن النبي صلى الله عليه وسلم ما هو أبلغ من أن يصومها، فقد حث على صيامها بقوله عليه الصلاة والسلام: (ما من أيام العمل الصالح فيهن أحب إلى الله من هذه الأيام العشر، قالوا: ولا الجهاد في سبيل الله؟ قال: ولا الجهاد في سبيل الله؛ إلا رجل خرج بنفسه وماله فلم يرجع من ذلك بشيء)، ومن المعلوم أن الصيام من أفضل الأعمال الصالحة.أما فعله هو بنفسه فقد جاء فيه حديثان: حديث عائشة، وحديث حفصة، أما حديث عائشة فقالت: “ما رأيت النبي صلى الله عليه وسلم صام العشر قط”، وأما حديث حفصة فإنها تقول: “إن النبي صلى الله عليه وسلم لم يكن يدع صيامها”، وإذا تعارض حديثان أحدهما يثبِت والثاني ينفي، فالمثبت مقدم على النافي، ولهذا قال الإمام أحمد: حديث حفصة مثبت، وحديث عائشة نافي، والمثبت مقدم على النافي.وأنا أريد أن أعطيك قاعدة:إذا جاءت السنة في اللفظ فخذ بما دل عليه اللفظ، أما العمل فليس في الشرط أن نعلم أن الرسول فعله أو فعله الصحابة، ولو أننا قلنا: لا نعمل بالدليل إلا إذا علمنا أن الصحابة عملوا به، لفات علينا كثير من العبادات، ولكن أمامنا لفظ وهو حجة بالغة واصل إلينا، يجب علينا أن نعمل بمدلوله، سواء علمنا أن الناس عملوا به فيما سبق، أم لم يعملوا به.”
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমন কিছু বর্নিত হয়েছে, যা সরাসরি তাঁর সিয়াম রাখার চেয়েও অধিক শক্তিশালী প্রমাণ বহন করে। তিনি এই দিনগুলোতে সিয়াম রাখার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন: “এই দশ দিনের মতো আর কোনো দিন নেই, যাতে নেক আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হয়।” সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন: “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও না?” তিনি বললেন: “আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও না, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া যে নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হয়ে যায় এবং কিছুই ফিরিয়ে আনে না।” এটা জানা কথা যে, সিয়াম হলো সর্বোত্তম সৎকর্মগুলোর একটি।আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সিয়াম রেখেছেন কি না—এ বিষয়ে দু’টি হাদীস এসেছে: একটি হাদীস আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা.) থেকে, তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনোই এই দশ দিনে সিয়াম রাখতে দেখিনি।”অপরটি হাফসা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে, তিনি বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনোই এই দশ দিনের সিয়াম ছাড়তেন না।” যখন দুটি হাদীসের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়—একটি কিছু ‘থাকার’ পক্ষে এবং অপরটি ‘না থাকার’ পক্ষে, তখন ‘থাকার’ পক্ষে যে হাদীস সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ কারণেই ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:“হাফসার হাদীসটি প্রমাণমূলক, আর আয়েশার হাদীসটি অস্বীকৃতিমূলক। তাই প্রমাণকারী হাদীসই অগ্রাধিকারযোগ্য।” আমি তোমাকে একটি মূলনীতি দিতে চাই: যখন কোনো সুন্নাহ বর্ণনামূলক (لفظي) অর্থাৎ স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়, তখন তা অনুযায়ী আমল করো। আমলের ক্ষেত্রে এটি শর্ত নয় যে, আমরা অবশ্যই জানব নবী ﷺ কিংবা সাহাবায়ে কেরাম তা আদায় করেছেন কি না। যদি আমরা বলি, আমরা শুধু তখনই কোনো হাদীস অনুযায়ী আমল করব, যখন নিশ্চিত হবো সাহাবায়ে কেরাম তা করেছেন—তাহলে বহু ইবাদত আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। অতএব, যখন কোনো সহীহ, নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট দলিল আমাদের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তা অনুযায়ী আমল করা আবশ্যক—সে ব্যাপারে পূর্ববর্তীরা আমল করেছেন কি না, তা আমাদের জানা থাক বা না থাক।”(ইবনু উসামীন;লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, ৯২তম পর্ব, প্রশ্ন: ১২) ।
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, যিলহজ্জ মাসের প্রথম থেকে নবম তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা সুন্নাত। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও এই বরকতময় দিনগুলোতে সিয়াম পালন করেছেন। সুতরাং যারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের আম্মাজান আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস উপস্থাপন করে দাবি করেন নবীজি (ﷺ) এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন না। এই ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ এবং মুজতাহিদ ইমামদের ফাতওয়া থেকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি রোজা রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে যিলহজ্জের এ পুণ্যময় দিনগুলোতে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন!! (আল্লাহই ভালো জানেন)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সোমবার, ২৮ই জিলক্বদ, ১৪৪৬ হিজরি।
২৬ই মে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।

সাত ধরনের নারীকে বিয়ে করা অপছন্দনীয়

 হাম্বলি মাযহাবের আলেম আল্লামা রুহাইবানী (রাহিমাহুল্লাহ) তার ‘মাতালিবু উলিন নুহা ফি শারহি গায়াতিল মুনতাহা’ ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, গ্রন্থকার তাঁর কিছু টীকায় ইমাম আল-মাওয়ার্দী ও আবু হামিদ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আল-গাজালীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা বলেন:

يكره نكاح الحنانة والمنانة والأنانة والحداقة والبراقة والشداقة والممراضة . فالحنانة التي لها ولد تحن إليه, والمنانة التي تمن على الزوج بما تفعله، والأنانة كثيرة الأنين, والحداقة التي تسرق كل شيء بحدقتها وتكلف الزوج, والبراقة التي تشتغل غالب أوقاتها ببريق وجهها وتحسينه. وقيل: هي التي يصيبها الغضب عند الطعام فلا تأكل إلا وحدها, والشداقة كثيرة الكلام , والممراضة التي تتمارض غالب أوقاتها من غير مرض.
“সাত ধরনের নারীকে বিয়ে করা অপছন্দনীয় (মাকরূহ):
.
(১).হান্নানা (الحنانة) – হলো সেই নারী যে তার আগের স্বামী বা সন্তানদের স্মরণ করে কাঁদে বা তাদের জন্য বিরহ প্রকাশ করে।
.
(২).মান্নানা (المنانة)–হলো সেই নারী যে তার স্বামীর ওপর অনুগ্রহ করে তা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়; যেন কৃতজ্ঞতা দাবি করে। (যেমন:আমি তোমার জন্যে এই করেছি, সেই করেছি।’ হেন করেছি, তেন করেছি,ইত্যাদি)
.
(৩).আন্নানা (الأنانة)– হলো সেই নারী যে সামান্য কারণেও বারবার অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে কাতর স্বরে অভিযোগ করে।
.
(৪).হাদ্দাকা (الحداقة) –হলো সেই নারী যে কোনো কিছুর উপর থেকেই লোভ সামলাতে পারে না। সব কিছুই পেতে চায়, এবং স্বামীকে তা ক্রয়ের জন্যে নিয়মিত চাপে রাখে।
.
(৫).বার্রাকা (البراقة)–হলো সেই নারী যে অধিকাংশ সময় সাজসজ্জা ও রূপচর্চায় ব্যস্ত থাকে;এই শব্দের অন্য একটি অর্থ হলো, যে নারী খেতে বসে রাগ করে চলে যায়। এবং পরে একা একা (খাবার) খায়।
.
(৬).শাদ্দাকা (الشداقة)– হলো সেই নারী যে অতিরিক্ত কথা বলে; ঝগড়াটে স্বভাবের।
.
(৭).মামার্রাদা (الممراضة) – হলো সেই নারী যে প্রকৃতপক্ষে অসুস্থ না হলেও সবসময় অসুস্থতার ভান করে।”(ইসলাম ওয়াবে ফাতওয়া নং-৭০৩৭৮)
.
অপর বর্ননায় আবু হামিদ মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আল-গাজালি আত-তুসি,(রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কিছু আরব বলতেন: لا تنكحوا من النساء ستة: لا أنانة، ولا منانة، ولا حنانة، ولا تنكحوا حداقة، ولا براقة، ولا شداقة. هذا ما وقفنا عليه في ذلك.“নারীদের মধ্যে ছয়জনকে বিবাহ করা থেকে বিরত থাকো – আন্নানা, মান্নানা, হান্নানা, হাদ্দাকা, বার্রাকা ও শাদ্দাকা।” (গাজালি; ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দিন খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩৮)।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
_________________________
✍️জুয়েল মাহমুদ সালাফি

Translate