Monday, October 14, 2024

মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেওয়ার বিধান

 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার খুতবায় আল্লাহর তারীফ করতেন, দরুদ পড়তেন, কুরআন থেকে তেলাওয়াত করতেন এবং কিছু ওয়াজ-নসিহত ও করতেন। নবীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ

“আমি সব নবীকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে।” [সূরা ইবরাহিম: ৪]

রাসুলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতৃভাষা যেহেতু আরবি ছিল এবং সাহাবিদেরও ভাষা আরবি ছিল, তাই তিনি আরবিতেই তাদেরকে নসিহত করতেন।

এখন যারা নবীজির নায়েব হয়ে জুমার খুতবা দিবেন তাদেরকেও উল্লেখিত আয়াত ও হাদীছ অনুসারে তাদের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে মাতৃভাষায় খুতবা দেওয়াটা শরিয়ত সম্মত এবং যুক্তি সংগত।

• এই কারণেই ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন: প্রত্যেক খতিবকে জুমার সময় তাঁর মাতৃভাষায় ওয়াজ করা ওয়াজিব বা অবশ্য কর্তব্য। [তানক্বীহুর রুওয়াত ১/২৬৪]

• আল্লামা তাহাভী হানাফী বলেন: জুমার খুতবা আরবি জানলেও ফারসি ভাষায়ও চলবে। [হাশিয়া তাহতাবী আলা মারাক্বিল ফালাহ ২৭]

• আল্লামা আব্দুল হাই লাখনভী হানাফী রহ. বলেন: শ্রোতাদেরকে তাদের মাতৃভাষায় খুতবা বুঝিয়ে দেওয়া জায়েজ। [মাজমূআহ ফাতাওয়া ১/২৪৫]

• হানাফি ফিক্বহ গ্রন্থ নিহায়া, মুজতাবা, ফাতাওয়া সিরাজিয়্যাহ, মুহীত প্রভৃতি গ্রন্থে আছে যে, ইমাম আবূ হানীফার মতে, ফারসি ভাষাতে জুমার খুতবা দেওয়া জায়েজ।

• হানাফি ফতোয়ার কিতাব শামীতে আছে, আরবি ভাষায় খুতবা দেওয়া শর্ত নয়।

• হানাফী ফিকহ গ্রন্থ হিদায়ায় আছে, প্রত্যেক ভাষায় খুতবার নছীহত চলতে পারে। (কিতাবুল জুমআহ ৫৫-৫৬) [আলোচনা দ্র: আইনী তোহফা সলাতে মুস্তফা ১/৯৮-৯৯]

❑ তবারা আগে ‘বয়ান’ একটি বিদআত:

নিজ ভাষায় খুতবা না দেওয়ার কারণে যেহেতু তা মানুষের বোধগম্য হয় না এজন্যই এই খুতবার আগে খতিবগণ বয়ানের ব্যবস্থা রেখেছেন, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি জঘন্যতম বিদআত। কারণ খুতবা দানের পূর্বে বয়ান দেওয়া এবং ইহাকে এভাবে স্থায়ী রূপ দেওয়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আদৌ প্রমাণিত নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুতবার পূর্বে কখনো এ ধরণের বয়ান দেন নি। দিতে বলেছেন বলে ও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এজন্যই এ সঊদি আরবের বরেণ্য মুফতি শাইখ ইবনে উসাইমিন রহ: কে মাতৃভাষায় খুতবা প্রদান সম্পর্কে সওয়াল করা হলে তিনি তা সরাসরি জায়েজ বলে মন্তব্য করেন এবং একথা স্পষ্ট ভাবে বলেন যে, খতিবকে নিজ ভাষায় খুতবা দিতে হবে। [দেখুন: শাইখ ইবনে উসাইমিনের ফাতাওয়া আরকানিল ইসলাম]

বর্তমানে আমাদের দেশের বেশ কিছু জামে মসজিদে মাতৃভাষায় খুতবা দেওয়া হয়ে থাকে। বস্তুত: এটাই সুন্নত। এর বিপরীত সুন্নত বিরোধী কাজ যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আল্লাহ আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক ইলম দান করুন এবং যাবতীয় বিদআত পরিত্যাগ করার তাওফিক দিন (আমিন)

❑ সংযুক্তি:

হাদিসে খুতবা (বক্তৃতা) কোন ভাষায় হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি বা এমন কোন নির্দেশ আসে নি যে, আরবি ভাষায় খুতবা দেওয়া আবশ্যক। সুতরাং মানুষ যে ভাষায় খুতবা শুনলে উপকৃত হবে সে ভাষায় হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

অত:এব, আল্লাহর প্রশংসা, নবীর প্রতি দুরুদ এবং কিছু আয়াত ও হাদিস আরবিতে বলার পর যদি সেগুলো বাংলা বা শ্রোতাদের ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাহলে খুতবার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়িত হবে।

কারণ হাদিসে এসেছে: সামুরা বিন জুনদুব রা. হতে বর্ণিত,

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يخطب قائماً ويجلس بين الخطبتين ويقرأ آيات ويذكر الناس.

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন এবং দু খুতবার মাঝে বসতেন। কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতেন এবং মানুষকে উপদেশ দিতেন।” [সহিহ নাসাঈ, হা/১৪১৭-সহিহ]

এখানে বুঝা যাচ্ছে, খতিব সাহেব শ্রোতাদেরকে খুতবার মধ্যে উপদেশ দিবেন ও তাদের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দিবেন।

আর এ কথা বলা বাহুল্য যে, তাদের অ বোধগম্য ভাষায় বক্তৃতা হলে তারা কিছুই বুঝতে পারবে না- যা খুতবার মূল উদ্দেশ্যে পরিপন্থী।

আরবিতে খুতবা দেওয়া আবশ্যক হলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুতবার মধ্যে যে সকল শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকত না। অর্থাৎ হাদিসে বর্ণিত ভাষা ছাড়া নিজে বানিয়ে আরবি বলার সুযোগ থাকত না-যেমন সালাতে নিজের মত করে আরবিতে কিরাআত পাঠ করা জায়েজ নয়।‍ অথচ যারা আরবিতে খুতবা দেন তারা কোন আলেমের লিখিত আরবি বক্তব্য পড়ে থাকেন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
লেখক:
শাইখ আখতারুল আমান বিস আব্দুস সালাম
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

নারীদের জন্য আলেমদের চেহারার দিকে তাকিয়ে বক্তৃতা শোনার বিধান

 প্রশ্ন: আল্লাহ তো বলেছেন মুমিন নারী এবং পুরুষ কে তাদের দৃষ্টি হেফাজত করতে। অনিচ্ছাকৃত চোখ পরে যাওয়া গুনাহ নয় তাহলে আমরা অনলাইনে আলেম ওলামাদের গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক লেকচার শোনার সময়,অনেক সময় এমন হয় যে,এক দৃষ্টিতে আলেমদের মুখের দিকে তাকিয়ে লেকচার শুনি। তখন শুধু উনারা কি বলছেন সেদিকেই মনোযোগ থাকে। এখন আমার জিজ্ঞাসা হলো, এতে কি একজন নারীর গুনাহ হবে?

উত্তর: আল্লাহ তায়ালা নারীদেরকে হিজাব বা পর্দার বিধান দিয়েছেন; পুরুষদেরকে নয়। তাই পুরুষেরা স্বাভাবিকভাবে মাঠে-ঘাটে কাজ করবে, বাইরে চলাফেরা করবে, উন্মুক্ত মাঠে আলেমগণ বক্তব্য দিবে, অনলাইন-অফলাইনে দ্বীন প্রচার করবে, মসজিদের ইমামতি করবে, ‌যুদ্ধ-জিহাদ করবে, বিচার আচার করবে, সামাজিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করবে-এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে প্রয়োজন বোধে নারীরা তাদেরকে দেখতে পারে। তবে যদি কোন পুরুষের চেহারা দেখে তার মধ্যে কুপ্রবৃত্তি জাগ্রত হয় বা ফিতনা সৃষ্টির আশঙ্কা সৃষ্টি হয় তাহলে অবশ্যই দৃষ্টি নত করে নেওয়া আবশ্যক। এমতবস্থায় তার চেহারার দিকে তাকিয়ে বক্তৃতা শোনাও জায়েজ নয়। এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে কোন মতবিরোধ নেই।
কিন্তু এমনটি না হলে পর পুরুষের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা জায়েজ আছে কিনা এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে দ্বিমত রয়েছে।

✪ একদল আলেমের মতে নারীদের জন্য আলেমদের চেহারার দিকে তাকিয়ে বক্তৃতা শোনায় কোন দোষ নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নারী সাহাবিগণ বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন, ইসলাম শিখতেন‌ এবং প্রয়োজনীয় কথা বলতেন। এক্ষেত্রে তারা তার চেহারার দিকে তাকাতেন।

আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, মা জননী আয়েশা ঈদের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে হাবশী বা নিগ্রো পুরুষদের সমরাস্ত্রের খেলা দেখেছেন। যেমন: উরওয়া আয়েশা রা. হতে বর্ণনা করেন যে,

كَانَ الْحَبَشُ يَلْعَبُونَ بِحِرَابِهِمْ فَسَتَرَنِي رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَأَنَا أَنْظُرُ فَمَا زِلْتُ أَنْظُرُ حَتّٰى كُنْتُ أَنَا أَنْصَرِفُ فَاقْدُرُوا قَدْرَ الْجَارِيَةِ الْحَدِيثَةِ السِّنِّ تَسْمَعُ اللَّهْوَ.

“একদিন হাবশিরা তাদের বর্শা নিয়ে খেলা করছিল। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে পর্দা করে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ছিলেন এবং আমি সেই খেলা দেখছিলাম। যতক্ষণ আমার ভাল লাগছিল ততক্ষণ আমি দেখছিলাম। এরপর আমি স্বেচ্ছায় সে স্থান ত্যাগ করলাম। সুতরাং তোমরা অনুমান করতে পার কোন্ বয়সের মেয়েরা আমোদ-প্রমোদ পছন্দ করে।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৬৭/ বিয়ে-শাদি, পরিচ্ছেদ: ৬৭/৮৩. পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উত্তমব্যবহার]

✪ আর কিছু আলেমের মতে, সাধারণ অবস্থাতেও নারীদের জন্য পর পুরুষের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা জায়েজ নেই। কেননা আল্লাহ যেভাবে পুরুষদেরকে আদেশ করেছেন নারীদের থেকে দৃষ্টি নত রাখতে ঠিক তেমনি ভাবে নারীদেরকেও আদেশ করেছেন পুরুষদের দিকে দৃষ্টি নত রাখতে। [সূরা নূর: ৩১]

যাহোক, সতর্কতার স্বার্থে আলেমদের বক্তৃতা শোনার ক্ষেত্রে যদি তাদের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে শুধু ভয়েস শ্রবণ করে উপকৃত হওয়া সম্ভব হয় তাহলে সেটাই যথেষ্ট। বিশেষ করে যুবতী নারীদের জন্য যুবক এবং সুদর্শন বক্তাদের দিকে না তাকানোর মধ্যেই মনের পবিত্রতা রয়েছে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সবসময় কল্যাণের উপরে প্রতিষ্ঠিত রাখুন এবং সব ধরনের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলম।

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার,
সৌদি আরব।

আল্লাহ আরশের উপরে রয়েছেন আবার তিনি নিচের আসমানেও নেমে আসেন সে সময় কি আরশ খালি হয়ে যায় এ বিষয়ে সঠিক আকিদা কী

 প্রশ্ন: আল্লাহ তাআলা বলেন, “রহমান (দয়াময় আল্লাহ্‌) আরশে সমুন্নত।” [সূরা ত্ব-হা: ৫]। সেই সাথে এটাও সত্য যে, আল্লাহ তাআলা প্রতি শেষ রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন, যা বহু সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

আমার প্রশ্ন হলো, আমার জিজ্ঞেস হলো, আল্লাহ আরশে আজিমে আছেন। তাহলে প্রতি রাতে তিনি প্রথম আসমানে নেমে আসেন। এ বিষয়ে আকিদা কী পোষণ করব? একটু বুঝিয়ে বলুন।
উত্তর:
✪ প্রথমত: প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জানা জরুরি যে, কুরআন ও হাদিসে আল্লাহ তাআলার যে সকল সিফাত (গুণ ও‌ বৈশিষ্ট্য ) বর্ণিত হয়েছে সেগুলো যেভাবে এসেছে হুবহু সেভাবে বিশ্বাস করা অপরিহার্য। এগুলোর কোন ধরনের আকার-আকৃতি, সাদৃশ্য, ধরণ ও প্রকৃতি বর্ণনা করা যাবে না। সেগুলোকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করাও যাবে না। বরং কুরআন ও হাদিসে যেভাবে এসেছে হুবহু সেভাবেই প্রকৃত অর্থে বিশ্বাস করতে হবে।

✪ দ্বিতীয়ত:

আল্লাহ তায়ালা সাত আসমানের উপরে সমুন্নত রয়েছেন-এটা যেমন কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য নস দ্বারা প্রমাণিত তেমনি তিনি রাতের শেষ প্রহরে নিচের আসমানে নেমে আসেন সেটাও বহু নস দ্বারা প্রমাণিত।
অতএব উভয়টির প্রতি বিশ্বাস করা আবশ্যক। আরও বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ তাআলা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান।

✪ তৃতীয়ত:

তিনি কীভাবে আরশের উপরে সমুন্নত, কীভাবে নিচের আসমানে নেমে আসেন,‌ এই সময় আরশ খালি হয়ে যায় কিনা, পৃথিবীর কোথাও রাতের শেষ প্রহর অথচ কোথাও দুপুর, কোথাও বিকেল, কোথাও বা রাতের প্রথম প্রহর তাহলে তিনি কোথায় কীভাবে নিচের আসমানে অবতরণ করেন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্ন করা জায়েজ নেই। এগুলো বিদআতি প্রশ্ন। কারণ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবিগণ কখনো এইসব প্রশ্ন করেননি। বরং তারা বিনা প্রশ্নে আল্লাহর এই সকল সিফাতের উপরে বিশ্বাস পোষণ করেছেন। সুতরাং তাদের মতই আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হতে হবে।

✪ চতুর্থত:

“আল্লাহ আরশ থেকে কীভাবে নিচের আসমানে নেমে আসেন?” এই জাতীয় প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়ার কারণ হল, আমরা আল্লাহর সিফাতগুলোকে মানবিক বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা বিচার করি। কিন্তু এটি সঠিক পদ্ধতি নয়। আল্লাহর সিফাতকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা অনুমান করা বা বিচার বিশ্লেষণ করা কখনো সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহর সিফাত বা গুণ-বৈশিষ্ট্য গুলো অবশ্যই তাঁর কোনো সৃষ্টি জীবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। ‌ আমাদের কার্যক্রম এবং গুণ-বৈশিষ্ট্য খুবই সীমিত ও দুর্বল কিন্তু আল্লাহ তাআলার গুণ বৈশিষ্ট্য অসীম অপার, অতুলনীয় ও অপরিমেয়।

সুতরাং আল্লাহর আরশে উপরে অবস্থান করা এবং দুনিয়ার জমিনে অবতরণ করা অবশ্যই সত্য কিন্তু তার ধরণ-প্রকৃতি আল্লাহর জন্য যেমনটা শোভনীয় ঠিক তেমনই। আমাদের কোন কিছুর সাথে তার সাদৃশ্য বা মিল নেই।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এই প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিয়েছেন।‌ তা হলো, “আল্লাহ তাআলা নিচের আসমানে অবতরণ করলে আরশ খালি হয়ে যাওয়া আবশ্যক নয়। যেভাবে মানুষ ঘুমালে তার আত্মা আল্লাহর নিকটে চলে যায় কিন্তু তা মানুষের দেহ থেকে পরিপূর্ণভাবে আলাদা হয় না।”
আল্লাহু আলম।

♦️আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল♦️

ইচ্ছাকৃত ভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে কাজে ফাঁকি দেওয়া বা ডিউটির সময় চুরি করা হারাম

 প্রশ্ন: আমি শুনেছি কেউ যদি অফিসের কাজে ফাঁকি দেয় তাহলে তার ওই সময়টুকুর ইনকাম হারাম হবে। এখন আমার দুলাভাই একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে।কিন্তু আমি শুনেছি, তিনি কাজে ফাঁকি দেন, কাজের সময় বাসায় এসে রেস্ট নেন।এখন তার ইনকাম খাওয়া কি আমার জন্য জায়েজ হবে?

উত্তর: কোন কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় কোন ব্যক্তি যখন চাকরির জন্য কন্ট্রাক্ট করে তখন লিখিতভাবে কিংবা মৌখিকভাবে কিছু শর্ত থাকে। যেমন: সপ্তাহে কত দিন কাজ, কত ঘণ্টা ডিউটি, বেতন-ভাতা, ছুটি ইত্যাদি।

এই ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের জন্য কৃত চুক্তি পালন করা ফরজ। আল্লাহ বলেন,

یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوۤا۟ أَوۡفُوا۟ بِٱلۡعُقُودِۚ

“হে মুমিনগণ, তোমরা চুক্তি পূর্ণ কর।” সূরা [মায়িদা: ১]

অতএব কোন কর্মচারী যদি নানা ছলচাতুরী করে ইচ্ছাকৃত ভাবে ডিউটির বাইরে সময় কাটায় অথবা ডিউটির মধ্যে কাজে ফাঁকি দেয় তাহলে সে শর্ত লঙ্ঘনকারী বলে বিবেচিত হবে। আর নিঃসন্দেহে তা গুনাহের কাজ। অনুরূপভাবে মালিক বা কর্তৃপক্ষ যদি কর্মচারীর সাথে কৃত চুক্তি লঙ্ঘন করে তাহলে সে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে। একদিকে আল্লাহর কাছে মানুষের হক নষ্ট করার অপরাধে দণ্ডিত হবে অন্যদিকে প্রচলিত আইনেও সে অন্যায়কারী হিসেবে গণ্য হবে।

যাহোক, কোন কর্মচারী ডিউটি রত অবস্থায় ইচ্ছাকৃত ভাবে যতটুকু ছলচাতুরী ও ফাঁকিবাজি করেছে ততটুকু উপার্জন হারাম বলে গণ্য হবে। অবশ্য বিশেষ প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের অনুমতির সাপেক্ষে বাইরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে বা কোন কাজ করার দরকার হলে সেটা ভিন্ন কথা।

আরও উল্লেখ্য যে, ডিউটি চলাকালীন সময়ে সামান্য কিছু বিশ্রাম নেওয়া বা কলিগের সাথে খোশ গল্প করা অথবা ব্যক্তিগত জরুরি কাজকর্ম করা, সালাত আদায় করা, খাওয়া-দাওয়া, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ ইত্যাদিতে কোন সমস্যা নেই। কেননা সাধারণ নিয়ম হিসেবে এই ধরনের কাজ-কারবার প্রতিটি কোম্পানি বা সংস্থায় অনুমোদিত।
কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে কাজে ফাঁকি দেওয়া বা ডিউটির সময় চুরি করা হারাম। কেউ তা করলে তার এই সময় কালীন উপার্জনও হারাম বলে গণ্য হবে।
আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।

মোটকথা, সর্বাবস্থায় মানুষের হক আদায়, আমানতদারিতা, সততা, স্বচ্ছতা এবং সত্যবাদিতা অপরিহার্য। মানব জীবনে এগুলো অসাধারণ গুণ ও বৈশিষ্ট্য। এগুলোর মাধ্যমে যেমন ভাবে তার উপার্জন হালাল হবে তেমনি সে হবে সবার কাছে প্রিয় পাত্র এবং মহান আল্লাহও তাকে ভালবাসবেন ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।

উত্তর প্রদানে :
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ঘরে খেলনার পুতুল থাকলে সালাত আদায়ের সময় করণীয় কী এবং এগুলো ঘরে থাকার দায় কার উপর বর্তাবে

 প্রশ্ন: আমার ছোট ভাই বোন তারা পুতুল দিয়ে খেলা করে কিন্তু পুতুল ঘরে থাকলে তো ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না। আমি চাইলেও পুতুল গুলো সরাতে পারবো না এক্ষেত্রে আমার কী করণীয়? আমি শুনেছি ফজর এবং মাগরিবের ওয়াক্তে রহমতের ফেরেশতা ঘরে প্রবেশ করে তাই ঐ সময়ে পুতুল গুলো লুকিয়ে রাখলে যথেষ্ট হবে কি?

আর যে ঘরে নামাজ পড়বো ঐ ঘরে পুতুল থাকলে কি কোনও সমস্যা আছে?
উত্তর: ঘরে কোন প্রাণীর ছবি, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদি রাখা জায়েজ নেই। ঠিক তদ্রূপ বাচ্চাদের খেলনা পুতুলও রাখা জায়েজ নেই। (অবশ্য যদি সেগুলোর নাক, চোখ, মুখ, কান ইত্যাদি অবয়বগুলো মুছে দেওয়া হয় তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ)।। হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে, আবু ত্বলহা রা. হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“‏ لاَ تَدْخُلُ الْمَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ تَصَاوِيرُ ‏”
“যে ঘরে কুকুর এবং প্রাণীর ছবি থাকে সেই ঘরে (আল্লাহর রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৭৭/ পোশাক, পরিচ্ছেদ: ৭৭/৮৮. ছবি সম্পর্কিত]
তাই অনতিবিলম্বে এগুলো থেকে ঘরবাড়িকে পরিষ্কার করা আবশ্যক। অন্যথায় বাড়ির প্রধান কর্তা ব্যক্তি এ জন্য গুনাহগার হবে। আপনার দ্বারা যদি সেগুলো ফেলে দেওয়া বা নষ্ট করা সম্ভব না হয় তাহলে এতে আপনি গুনাহগার হবেন না ইনশাআল্লাহ। কেননা তা আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। যে ঘরে প্রাণীর ছবি, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদি রয়েছে সে ঘরেও সালাত শুদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ। তবে উত্তম হলো, এসব থেকে মুক্ত অন্য কোনও ঘরে সালাত আদায় করা। কমপক্ষে সালাতের সময় এসব জিনিস কাপড় বা কোন কিছু দিয়ে ঢেকে রাখা।
আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate