Thursday, September 12, 2024

সফর মাসের করণীয় ও বর্জনীয়

 সফর মাস হলো, হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২য় মাস। এ মাসে কুরআন-সুন্নাহ কিংবা সালাফদের আমল থেকে বিশেষ কোনও ইবাদত-বন্দেগি সাব্যস্ত হয়নি।

সুতরাং এ মাসে অন্যান্য মাসের মতোই ইবাদত-বন্দেগি করার চেষ্টা করা কর্তব্য।
‌নিম্নে কিছু ইবাদত-বন্দেগির তালিকা উপস্থাপন করা হলো-যেগুলো সফর মাস সহ যে কোনও মাসের জন্য প্রযোজ্য:

১. পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত সময় হওয়ার সাথে সাথে ভয়-ভীতি, বিনয় নম্রতা ও আন্তরিকতার সহকারে আদায় করা। মহিলারা বাড়িতে এবং পুরুষেরা মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করবে।
২. দিনে-রাতে ১২ রাকাত সুন্নত আদায় করা।
৩. সূর্য উদিত হওয়ার কমপক্ষে ১৫ মিনিট পরে দু রাকাত ইশরাকের সালাত আদায় করা।
৪. সূর্যের কিরণ প্রখর হলে (অনুমানিক সকাল ১০-১১টা বা তার কিছু আগে-পরে) চাশত (যুহা/আওয়াবিন) এর দুই থেকে আট রাকাত নফল সালাত আদায় করা।
৫. অজু করার পরে ওজুর দুই রাকাত সালাত আদায় করা।
৬. মসজিদে প্রবেশ করলে বসার পূর্বে দুই রাকাত সালাত (দুখুলুল মাসজিদ/তাহিয়াতুল মাসজিদ) আদায় করা।
৭. মাগরিব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে যথাসাধ্য নফল সালাত আদায় করা।
৮. তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা।
৯. রমজান মাসে বিশেষভাবে তারাবিহর সালাত আদায় করা।
১০. দিনরাত যখন ইচ্ছা যতটুকু সম্ভব নফল সালাত আদায় করা (নিষিদ্ধ সময়গুলো ছাড়া)।

১১. রমজান মাসে ফরজ রোজা রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় যথাসাধ্য নফল রোজা রাখা। যেমন:
– প্রত্যেক সোমবার ও বৃহস্পতিবার দুটি নফল রোজা রাখা।
– প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩-১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়ামে বীজের তিনটি রোজা রাখা।
– কিংবা সারা মাসে সুবিধা জনক সময়ে তিনটি রোজা রাখা।
– সম্ভব হলে একদিন পর একদিন রোজা রাখা (নিষিদ্ধ দিনগুলো ছাড়া)।
– মৌসুম ভিত্তিক নফল রোজাগুলো রাখা। যেমন: আরাফার রোজা, মুহররমের ৯ ও ১০ কিংবা ১০ ও ১১ তারিখে দুটি রোজা রাখা, জিলহজ মাসের প্রথম দশকে রোজা রাখা ইত্যাদি।

১২. অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং কুরআনের তরজমা ও তাফসির জানার চেষ্টা করা।
১৩. কুরআন তিলাওয়াত শোনা।
১৪. সকাল সন্ধ্যা, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে এবং ঘুমের পূর্বের জিকির ও দুআগুলো নিয়মিত পাঠ করা।
১৫. দিনরাত কাজের ফাঁকে ফাঁকে, রাস্তায় চলার সময়, বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের সময়, যানবাহনে থাকা অবস্থায়, কারো জন্য অপেক্ষার সময় ইত্যাদি সময়গুলো অধিক পরিমাণে তাসবিহ, জিকির, দরুদ, ইস্তিগফার ইত্যাদি পাঠ করা।

১৬. ঘুমাতে যাওয়া, ঘুম থেকে ওঠা, টয়লেটে প্রবেশ করা, টয়লেট থেকে বের হওয়া, খাওয়ার আগে ও পরে, কাপড় পরার আগে, কাপড় খুলে রাখার সময়, স্ত্রী সহবাসের পূর্বে, বাড়ি থেকে বের হওয়া‌ অতঃপর বাড়িতে প্রবেশ করা, মসজিদে প্রবেশ করা ও বের হওয়া, যানবাহনে ওঠা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষ দুআগুলো পাঠ করা।

১৭. যে কোনও বৈধ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পাঠ করা।
১৮. জাকাত ফরজ হয়ে থাকলে তা আদায়ের পাশাপাশি গরিব-অসহায় মানুষ, বিশেষ করে নিকটাত্মীয়দেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা।
১৯. জনকল্যাণ কাজে অথবা মাদরাসা, মসজিদ, ইসলামি পাঠাগার, অফলাইন বা অনলাইনের মাধ্যমে দাওয়াতি কাজ ইত্যাদি জন্য অর্থ খরচ করা ইত্যাদি।
২০. পিতা-মাতা, ভাই-বোন এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
২১. স্ত্রী ও সন্তানদের হক আদায় করা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণে উদার হাতে খরচ করা।
২২. হজ ফরজ হলে তা অনতিবিলম্বে আদায় করা এবং যথাসাধ্য অধিক পরিমাণে ওমরা আদায় করা।
উল্লেখ্য যে, এই সকল ইবাদত বন্দেগি নির্দিষ্ট কোন মাসের সাথে সম্পৃক্ত নয় বরং বছর ব্যাপী যে কোন সময় এই সহজ ইবাদতগুলো করা যেতে পারে যথাসাধ্য অনুযায়ী। আল্লাহ তওফিক দান করুন।

❑ সফর মাসে যে সকল কাজ বর্জনীয়:

◈ ১.আখেরি চাহার শোম্বার নামাজ ও অন্যান্য বিদআতি আমল:

সফর মাসের শেষ বুধবারের কোনও প্রকার বিশেষত্ব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ দিনে কোনোরূপ ইবাদত, নামাজ, রোজা, জিকির, দুআ, দান-সদকা ইত্যাদি পালন করলে অন্য কোনও দিনের চেয়ে বেশি বা বিশেষ কোনও সোওয়াব বা বরকত লাভ করা যাবে বলে ধারণা করা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা।

তাযকিরাতুল আখিরাত, মকছুদুল মুমিনিন, বারো চান্দের আমল এজাতীয় কিছু বইয়ে আখেরি চাহার সোম্বার বিশেষ নামাজ ও কিছু বিশেষ আমলের উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আখেরি চাহার সোম্বার নামাজের নিয়ম হিসাবে বলা হয়ে থাকে, সফর মাসের শেষ বুধবার সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর ২ রাকাত নামাজ পড়তে হবে। সে নামাজের উভয় রাকাতে সূরা ইখলাস ১১ বার করে পড়তে হবে এবং নামাজ শেষে ৭০ বার বিশেষ দরূদ ও দুআ পড়তে হবে।

উক্ত নামাজ সম্পর্কে আল্লামা আব্দুল হাই লখনৌভি রাহ. লিখেছেন, “সফর মাসের শেষ বুধবারে যে বিশেষ নফল নামাজ বিশেষ কিছু সুরা, আয়াত ও দুআ পাঠের মাধ্যমে আদায় করা হয়, তা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এছাড়াও আখেরি চাহার সোম্বার দিন বিশেষ দুআ পড়ে পানিতে ভিজিয়ে পান করা ও সেই পানি দিয়ে গোসল করার একটি রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে। এটিও মনগড়া, বানোয়াট একটি রেওয়াজ।”

◈ ২. সফর মাসকে অশুভ ও বালা-মুসিবতের মাস মনে করা একটি জাহেলি কুসংস্কার:

কোনও স্থান, সময়, বস্তু বা কর্মকে অশুভ বা অমঙ্গলময় বলে মনে করা ইসলামি বিশ্বাসের পরিপন্থী একটি কুসংস্কার। আরবের মানুষরা জাহেলি যুগ থেকে সফর মাসকে অশুভ ও বিপদাপদের মাস বলে বিশ্বাস করত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এই ভুল ধারণা খণ্ডন করেছেন। হাদিসে আছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لاَ عَدْوَى وَلاَ صَفَرَ وَلاَ هَامَةَ

“রোগের কোনও সংক্রমণ নেই, সফরের কোনো কুলক্ষণ নেই, পেঁচার মধ্যেও কোনও কুলক্ষণ নেই। [সহীহ বুখারী, হাদিস/৫৭১৭]

আরেক হাদিসে আছে, জাহিলি যুগে লোকেরা সফর মাসকে অমঙ্গলের মাস হিসাবে বিবেচনা করত, এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “না, সফর মাস এরূপ নয়।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৯১৫]

অথচ এরপরও মুসলিম সমাজে অনেকের মধ্যে পূর্ববর্তী যুগের এ সকল কুসংস্কার থেকে যায়। শুধু তাই নয়, এ সকল কুসংস্কারকে উস্কে দেওয়ার জন্য অনেক বানোয়াট কথা বানিয়ে হাদিসের নামে সমাজে প্রচার করছেন অসতর্ক কতিপয় বক্তা।

তারা জালিয়াতি করে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বলছেন, এই মাস বালা-মুসিবতের মাস। এই মাসে এত লক্ষ এত হাজার বালা নাজিল হয়। এই মাসেই আদম আলাইহিস সালাম ফল খেয়েছিলেন। এ মাসেই হাবীল নিহত হন। এ মাসেই নূহ আলাইহিস সালামের কওম ধ্বংস হয়। এ মাসেই ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে আগুনে ফেলা হয়। এ মাসের আগমনে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যথিত হতেন। এই মাস চলে গেলে খুশি হতেন। তিনি বলতেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে সফর মাস অতিক্রান্ত হওয়ার সুসংবাদ প্রদান করবে, আমি তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করার সুসংবাদ প্রদান করব।’ এরকম অনেক কথা তারা বানিয়েছে।
আর অনেক সরলপ্রাণ মুসলিমগণ তাদের এ সকল জালিয়াতি বিশ্বাস করেছেন। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, সফর মাসের অশুভত্ব ও বালা মুসিবত বিষয়ক সকল কথাই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।

◈ ৩. সফর মাসের ১ম রাতের নামাজ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট আমল:

উপরোক্ত মিথ্যা কথাগুলোর ভিত্তিতেই একটি ভিত্তিহীন ‘নামাজের’ উদ্ভাবন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ যদি সফর মাসের ১ম রাতে মাগরিবের পরে বা ইশার পর চার রাকাত নামাজ আদায় করে, অমুক অমুক সূরা বা আয়াত এত বার পাঠ করে, তবে সে বিপদ থেকে রক্ষা পাবে, এত এত পুরস্কার পাবে ইত্যাদি। এগুলো সবই ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা-যদিও অনেক সরলপ্রাণ মানুষ এগুলি বিশ্বাস করেছেন এবং কেউ কেউ নিজেদের বইয়ে ও ওয়াজে উল্লেখ করেছেন।

◈ ৪. সফর মাসের শেষ বুধবার:

বিভিন্ন জাল হাদিসে বলা হয়েছে, বুধবার অশুভ এবং যেকোনো মাসের শেষ বুধবার সবচেয়ে অশুভ দিন। আর সফর মাস যেহেতু অশুভ, সেহেতু সফর মাসের শেষ বুধবার বছরের সবচেয়ে অশুভ দিন এবং এই দিনে সবচেয়ে বেশি বালা মুসিবত নাজিল হয়। এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তা অনেক সরলপ্রাণ মুসলমান বিশ্বাস করেছেন।

একজন লিখেছেন, “সফর মাসে এক লাখ বিশ হাজার বালা নাজিল হয় এবং সব দিনের চেয়ে বেশি আখেরি চাহার সোম্বা (সফর মাসের শেষ বুধবার) তে নাজিল হয়। সুতরাং ঐ দিনে যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত নিয়মে চার রাকআত নামাজ পড়বে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ঐ বালা হতে রক্ষা করবেন এবং পরবর্তী বছর পর্যন্ত তাঁকে হেফাজত রাখবেন…। [রাহাতুল কুলুব। পৃষ্ঠা নাম্বার: ১৩৯] এগুলো সবই ভিত্তিহীন কথা।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, সফর মাসের শেষ বুধবারের কোনও প্রকার বিশেষত্ব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এই দিনে ইবাদত, বন্দেগি, নামাজ, রোজা, জিকির, দুআ, দান-সদকা ইত্যাদি পালন করলে অন্য দিনের চেয়ে বেশি বা বিশেষ কোনও সওয়াব ও বরকত লাভ করা যাবে বলে ধারণা করা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। আল্লাহ আমাদের সকলকে সর্বপ্রকার বিদআত থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
[সফর মাসে বর্জনীয় অংশটি নেওয়া হয়েছে: muslimsday থেকে]। আল্লাহু আলাম।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি-

আখেরি চাহার শোম্বা কী এবং এ দিন কি বিশেষ কোনও ইবাদত বন্দেগি রয়েছে

 প্রশ্ন: ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ কী? এ দিন কি বিশেষ কোনও ইবাদত-বন্দেগি বা বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে?

উত্তর: নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা পেশ করা হলো: وبالله التوفيق

❑ ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ বলতে কী বুঝায়?

‘আখেরি চাহার শোম্বা’ একটি আরবি ও ফার্সি শব্দ যুগল। এর আরবি অংশ আখেরি। যার অর্থ, শেষ এবং ফার্সি অংশ চাহার শোম্বা। যার অর্থ, বুধবার। হিজরি সালের সফর মাসের শেষ বুধবারকে আমাদের ভারত উপমহাদেশে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’ হিসেবে পালন করা হয়।

মূলতঃ এ দিবসটি আমাদের দেশে ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসাবে পালিত হয়; যাতে সাধারণত গোসল করে দু রাকাত শোকরানা নফল নামাজ আদায় শেষে রোগ থেকে মুক্তির দোয়া ও দান-খয়রাত করা হয়। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, দরবার, খানকায় ওয়াজ-নসিহত, জিকির-আজকার, মিলাদ মাহফিল, দুআও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় এই দিনটি পালন উপলক্ষে। এদিন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে বন্ধ রাখার পাশাপাশি অফিস-আদালতে ঐচ্ছিকভাবে ছুটির দিন হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু এগুলো সব দ্বীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত ভিত্তিহীন বিদআতি কাজ যার পক্ষে কোনও বিশুদ্ধ হাদিস এবং সাহাবিদের আমল নেই।

➧ নিম্নে আমরা এ বিষয়ে বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও গবেষক শাইখ ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহ. এর একটি গবেষণা ধর্মী মূল্যবান লেখা তুলে ধরছি:

❑ ১. সফর মাসের শেষ বুধবার:

বিভিন্ন জাল হাদিসে বলা হয়েছে, বুধবার অশুভ এবং যে কোনো মাসের শেষ বুধবার সবচেয়ে অশুভ দিন। আর সফর মাস যেহেতু অশুভ, সেহেতু সফর মাসের শেষ বুধবার বছরের সবচেয়ে বেশি অশুভ দিন এবং এ দিনে সবচেয়ে বেশি বালা মুসিবত নাজিল হয়। এ সব ভিত্তিহীন কথাবার্তা অনেক সরলপ্রাণ বুযুর্গ বিশ্বাস করেছেন। যেমন: ‘‘সফর মাসে একলাখ বিশ হাজার ‘বালা’ নাজিল হয় এবং সবদিনের চেয়ে ‘আখেরি চাহার শোম্বা-’তে (সফর মাসে শেষ বুধবার) নাজিল হয় সবচেয়ে বেশি। সুতরাং ঐ দিনে যে ব্যক্তি নিম্নোক্ত নিয়মে চার রাকাত নামাজ পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে ঐ বালা থেকে রক্ষা করবেন এবং পরবর্তী বছর পর্যন্ত তাকে হেফাজতে রাখবেন…।’’[খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া, রাহাতিল কুলুব, পৃ. ১৩৯।]

এগুলো সবই ভিত্তিহীন কথা। তবে আমাদের দেশে ‘আখেরি চাহার শোম্বা’-র প্রসিদ্ধি এ কারণে নয়, অন্য কারণে।

প্রসিদ্ধ আছে যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফর মাসের শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি সফর মাসের শেষ বুধবারে কিছুটা সুস্থ হন এবং গোসল করেন। এরপর তিনি পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এ অসুস্থতাতেই তিনি পরের মাসে ইন্তিকাল করেন। এ জন্য মুসলিমগণ এ দিনে তাঁর সর্বশেষ সুস্থতা ও গোসলের স্মৃতি উদযাপন করেন।

এ বিষয়ক প্রচলিত কাহিনীর সার-সংক্ষেপ প্রচলিত একটি পুস্তক থেকে উদ্ধৃত করছি: ‘‘হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া হইতে বিদায় নিবার পূর্ববর্তী সফর মাসের শেষ সপ্তাহে ভীষণভাবে রোগে আক্রান্ত হইয়া ছিলেন। অতঃপর তিনি এই মাসের শেষ বুধবার দিন সুস্থ হইয়া গোসল করতঃ কিছু খানা খাইয়া মসজিদে নববীতে হাযির হইয়া নামাযের ইমামতী করিয়াছিলেন। ইহাতে উপস্থিত সাহাবিগণ অত্যধিক আনন্দিত হইয়াছিলেন। আর খুশীর কারণে অনেকে অনেক দান খয়রাত করিয়াছিলেন। বর্ণিত আছে, হযরত আবু বকর রা. খুশীতে ৭ সহস্র দীনার এবং হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রা. ৫ সহস্র দীনার, হযরত ওসমান রা. ১০ সহস্র দীনার, হযরত আলি রা. ৩ সহস্র দিনার এবং হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা. ১০০ উট ও ১০০ ঘোড়া আল্লাহর ওয়াস্তে দান করিয়াছিলেন।

তৎপর হইতে মুসলমানগণ সাহাবিগণের নীতি অনুকরণ ও অনুসরণ করিয়া আসিতেছে। হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই দিনের গোসলই জীবনের শেষ গোসল ছিল। ইহার পর আর তিনি জীবিতকালে গোসল করেন নাই।
তাই সকল মুসলমানের জন্য এই দিবসে ওজু-গোসল করতঃ ইবাদৎ বান্দেগী করা উচিৎ এবং হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করতঃ সাওয়াব রেছানী করা কর্তব্য…।’’[মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১৫]

উপরের এ কাহিনীটিই কমবেশি সমাজে প্রচলিত ও বিভিন্ন গ্রন্থে লেখা রয়েছে। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেও কোনো সহিহ বা যয়ীফ হাদিসে এ ঘটনার কোনো প্রকারের উল্লেখ পাই নি। হাদিস তো দূরের কথা কোনো ইতিহাস বা জীবনী গ্রন্থেও আমি এ ঘটনার কোনো উল্লেখ পাই নি। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়া অন্য কোনো মুসলিম সমাজে ‘সফর মাসের শেষ বুধবার’ পালনের রেওয়াজ বা এ কাহিনী প্রচলিত আছে বলে আমার জানা নেই।

❑ ২. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সর্বশেষ অসুস্থতা:

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফর বা রবিউল আউয়াল মাসের কত তারিখ থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কত তারিখে ইন্তিকাল করেন সে বিষয়ে হাদিস শরিফে কোনোরূপ উল্লেখ বা ইঙ্গিত নেই। অগণিত হাদিসে তাঁর অসুস্থতা, অসুস্থতা কালীন অবস্থা, কর্ম, উপদেশ, তাঁর ইন্তিকাল ইত্যাদির ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনো ভাবে কোনো দিন-তারিখ বলা হয়নি।

২য় হিজরী শতক থেকে আলিমগণ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনের ঘটনাবলি ঐতিহাসিক দিন-তারিখ সহকারে সাজাতে চেষ্টা করেন। তাঁর অসুস্থতার শুরু সম্পর্কে অনেক মত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক (১৫১ হি/৭৬৮ খৃ) বলেন,

اُبْتُدِئَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ بِشَكْوَاهُ الَّذِيْ قَبَضَهُ اللهُ فِيْهِ … فِيْ لَيَالٍ بَقِيْنَ مِنْ صَفَرٍ، أَوْ فِيْ أَوَّلِ شَهْرِ رَبِيْعِ الأَوَّلِ.

‘‘রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে অসুস্থতায় ইন্তিকাল করেন, সে অসুস্থতার শুরু হয়েছিল সফর মাসের শেষে কয়েক রাত থাকতে, অথবা রবিউল আউয়াল মাসের শুরু থেকে।’’[ইবনে হিশাম, আস-সীরাহ আন-নববিয়্যাহ ৪/২৮৯।]

কী বার থেকে তাঁর অসুস্থতার শুরু হয়েছিল, সে বিষয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন শনিবার, কেউ বলেছেন বুধবার এবং কেউ বলেছেন সোমবার তার অসুস্থতার শুরু হয়।[কাসতালানী, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ, আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া ৩/৩৭৩; যারকানী, শারহুল মাওয়াহিব ১২/৮৩]

কয়দিনের অসুস্থতার পরে তিনি ইন্তিকাল করেন, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, ১০ দিন, কেউ বলেছেন, ১২ দিন, কেউ বলেছেন ১৩ দিন, কেউ বলেছেন, ১৪ দিন অসুস্থ থাকার পরে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তিকাল করেন।[কাসতালানী, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ, আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া ৩/৩৭৩; যারকানী, শারহুল মাওয়াহিব ১২/৮৩]

পরবর্তী আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাব যে, তিনি কোন তারিখে ইন্তিকাল করেছিলেন, সে বিষয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন ১লা রবিউল আউয়াল, কেউ বলেছেন, ২রা রবিউল আউয়াল এবং কেউ বলেছেন, ১২ই রবিউল আউয়াল তিনি ইন্তিকাল করেন।

সর্বাবস্থায়, কেউ কোনোভাবে বলছেন না যে, অসুস্থতা শুরু হওয়ার পরে মাঝে কোনো দিন তিনি সুস্থ হয়েছিলেন। অসুস্থ অবস্থাতেই, ইন্তিকালের কয়েকদিন আগে তিনি গোসল করেছিলেন বলে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

বুখারী সংকলিত হাদিসে আয়েশা রা. বলেন,

إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ لَمَّا دَخَلَ بَيْتِي وَاشْتَدَّ بِهِ وَجَعُهُ قَالَ هَرِيقُوا عَلَيَّ مِنْ سَبْعِ قِرَبٍ … لَعَلِّي أَعْهَدُ إِلَى النَّاسِ (لَعَلِّى أَسْتَرِيحُ فَأَعْهَدُ إِلَى النَّاسِ) … ثُمَّ خَرَجَ إِلَى النَّاسِ ، فَصَلَّى لَهُمْ وَخَطَبَهُمْ

‘‘রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেল, তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার উপরে ৭ মশক পানি ঢাল…; যেন আমি আরাম বোধ করে লোকদের নির্দেশনা দিতে পারি। তখন আমরা এভাবে তাঁর দেহে পানি ঢাললাম…। এরপর তিনি মানুষদের কাছে বেরিয়ে যেয়ে তাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন এবং তাদেরকে খুতবা প্রদান করলেন বা ওয়াজ করলেন।’’[বুখারী, আস-সহিহ ১/৮৩, ৪/১৬১৪, ৫/২১৬০; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/২৪৩; ইবনে হিববান, আস-সহিহ ১৪/৫৬৬।]

এখানে সুস্পষ্ট যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর অসুস্থতার মধ্যেই অসুস্থতা ও জ্বরের প্রকোপ কমানোর জন্য এভাবে গোসল করেন, যেন কিছুটা আরাম বোধ করেন এবং মসজিদে গিয়ে সবাইকে প্রয়োজনীয় নসিহত করতে পারেন।
এ গোসল করার ঘটনাটি কত তারিখে বা কী বারে ঘটেছিল তা হাদিসের কোনো বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় নি। তবে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমের অন্যান্য হাদিসের সাথে এ হাদিসের সমন্বয় করে উল্লেখ করেছেন যে, এ গোসলের ঘটনাটি ঘটেছিল ইন্তিকালের আগের বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ ইন্তেকালের ৫ দিন আগে। [ইবনে হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১৪২] ১২ই রবিউল আউয়াল ইন্তিকাল হলে তা ঘটেছিল ৮ই রবিউল আউয়াল।

উপরের আলোচনা থেকে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, সফর মাসের শেষ বুধবারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুস্থ হওয়া, গোসল করা এবং এজন্য সাহাবিগণের আনন্দিত হওয়া ও দান-সাদকা করার এ সকল কাহিনীর কোনোরূপ ভিত্তি নেই। আল্লাহই ভাল জানেন।

যেহেতু মূল ঘটনাটিই প্রমাণিত নয়, সেহেতু সে ঘটনা উদযাপন করা বা পালন করার প্রশ্ন ওঠে না। এরপরেও আমাদের বুঝতে হবে যে, কোনো আনন্দের বা দুঃখের ঘটনায় আনন্দিত বা দুঃখিত হওয়া এক কথা, আর প্রতি বছর সে দিনে আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশ করা বা ‘আনন্দ দিবস’ বা ‘শোক দিবস’ উদযাপন করা সম্পূর্ণ অন্য কথা। উভয়ের মধ্যে আসমান-যমীনের পার্থক্য।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবনে অনেক আনন্দের দিন বা মুহূর্ত এসেছে, যখন তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন, শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য আল্লাহর দরবারে সেজদা করেছেন। কোনো কোনো ঘটনায় তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিগণও আনন্দিত হয়েছেন ও বিভিন্নভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পরের বছর বা পরবর্তী কোনো সময়ে সে দিন বা মুহূর্তকে তারা বাৎসরিক ‘আনন্দ দিবস’ হিসেবে উদযাপন করেননি। এজন্য রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ বা সাহাবিদের কর্ম ছাড়া এরূপ কোনো দিন বা মুহুর্ত পালন করা বা এগুলোতে বিশেষ ইবাদত বিশেষ সাওয়াবের কারণ বলে মনে করার সুযোগ নেই।

❑ ৩. আখেরি চাহার শোম্বার নামাজ:

উপরের আলোচনা থেকে আমার জানতে পেরেছি যে, সফর মাসের শেষ বুধবারের কোনো প্রকার বিশেষত্ব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ দিনে কোনোরূপ ইবাদত, সালাত, সিয়াম, জিকির, দুআ, দান, সদকা ইত্যাদি পালন করলে অন্য কোনো দিনের চেযে বেশি বা বিশেষ কোনো সাওয়াব বা বরকত লাভ করা যাবে বলে ধারণা করা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। এজন্য আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী লিখেছেন যে, সফর মাসের শেষ বুধবারে যে বিশেষ নফল সালাত বিশেষ কিছু সুরা, আয়াত ও দুআ পাঠের মাধ্যমে আদায় করা হয়, তা বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। [আব্দুল হাই লাখনবী, আল-আসার, পৃ. ১১১]
[সূত্র: ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. রচিত হাদিসের নামে জালিয়াতি, বার চাঁদের সালাত ও ফযীলত]

➧ মোটকথা, আখেরি চাহার শোম্বা বা সফর মাসের শেষ বুধবারকে ঘটা করে পালন করার ব্যাপারে হাদিসে কোন নির্দেশনা পাওয়া যায় না। এ দিন বিশেষ কোন নামাজ, রোজা, দান-সদকা, গোসল ইত্যাদি করার ব্যাপারে কোন সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। বরং বিভিন্ন বানোয়াট কথার উপরে ভিত্তি করে আমাদের সমাজে এ সকল বিদআত প্রচলিত হয়েছে। আর এ কথা প্রসিদ্ধ যে, প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি। আর প্রতিটি গোমরাহির পরিণতি জাহান্নাম। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আল্লাহু আলাম।
আব্দুল্লাহিল হাদি বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

অহংকারের পরিণতি ও পরিচয় এবং তার ২৮টি আলামত

 অহংকার এক মারাত্মক মানসিক ব্যাধি ও নিকৃষ্ট স্বভাব। এটি ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ এবং জাহান্নামে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

◆ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ

“অহংকার বশতঃ তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক-অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” [সূরা লোকমান: ১৮]
◆ হারিসা ইবনে ওয়াহাব রাহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি,

“‏ أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ ‏”‏ ‏. ‏ قَالُوا بَلَى ‏. ‏ قَالَ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعَّفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لأَبَرَّهُ ‏”‏ ‏. ‏ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ ‏”‏
قَالُوا بَلَى ‏. ‏ قَالَ ‏”‏ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ ‏

“আমি কি তোমদেরকে জান্নাতবাসীর সম্পর্কে অবহিত করব?
সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই।

তিনি বললেন, “তারা হবে দুর্বল এবং নম্র স্বভাবের লোক। যারা আল্লাহর নামে কসম করলে আল্লাহ তা পূরণ করেন।”

অতঃপর তিনি বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসী সম্পর্কে অবহিত করব?
সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই।

তিনি বললেন, “তারা হবে অত্যাচারী, দাম্ভিক ও অহংকারী লোক।”

[সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫৪/ জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামত ও জান্নাতবাসীদের বিবরণ, পরিচ্ছেদ: ১৩. দুর্দান্ত অহংকারী প্রতাপশালীরা জাহান্নামে এবং দুর্বল লোকেরা জান্নাতে যাবে]

❑ মানুষ কেন অহংকার করে?

একজন মানুষ নানা কারণে অহংকারী হয়ে উঠতে পারে। যেমন: অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যতা, ভালো চাকরি, উচ্চ বংশ বা বংশগত আভিজাত্য, পদমর্যাদা, নেতৃত্ব, দলীয় দাপট, হিংসা, শারীরিক সৌন্দর্য, নেক আমল ইত্যাদি। তবে এর পেছনে মূল কারণ হল, জ্ঞানের স্বল্পতা বা বিচার-বুদ্ধির ঘাটতি। কারণ প্রকৃত জ্ঞানী কখনো অহংকারী হয় না। বরং একজন মানুষ যত বেশি জ্ঞানী হয় সে তত বেশি বিনয়াবনত হয়। তার আচরণ ও কথাবার্তা হয় তত শালীন। সে হয় সহিষ্ণু। মানুষ সমাজেও একজন অহংকারী ব্যক্তি হয় অত্যন্ত ঘৃণিত। অহংকারী ব্যক্তি সর্বাবস্থায় প্রত্যাখ্যান যোগ্য।

❑ মানুষের কেন অহংকার করা উচিৎ নয়?

অহংকার করা মানুষের জন্য সমীচীন নয়। এটা তার জন্য সাজে না। কারণ মানুষ নিতান্ত দুর্বল সৃষ্টি। অসুস্থ হলে সে অচল হয়ে পড়ে, ক্ষুধা-পিপাসায় সে অস্থির হয়ে যায়। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বা গরম তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে। হঠাৎ প্রচণ্ড আওয়াজে সে বেহুশ হয়ে পড়ে, শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। শরীরে প্রচণ্ড আঘাত লাগলে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে সে দুশ্চিন্তায় পতিত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। প্রচণ্ড রাগের সময় তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সুতরাং এমন দুর্বল মানুষের জন্য অহংকার করা সাজে না। অহংকার হল, আল্লাহর চাদর। কারও যদি অহংকার করা সাজে তিনি হলেন, একমাত্র মহান রাজাধিরাজ, মহা শক্তিধর, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।

❑ হাদিসের ভাষায় অহংকারের দুটি মূলনীতি:

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অহংকারের করুন পরিণতি বর্ণনা পূর্বক তা চেনার দুটি মূলনীতি দিয়েছেন। সে দুটা যদি কারও মধ্য থাকে তাহলে সে নিশ্চিত অহংকারী। সে দুটি হলো:
১. সত্য প্রত্যাখ্যান করা।
২. মানুষকে খাটো নজরে দেখা বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।

যেমন নিম্নোক্ত হাদিসটি:

ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لاَ يَدْخُلُ الجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ فَقَالَ رَجُلٌ : إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَناً وَنَعْلُهُ حَسَنةً فَقَالَ إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الجَمَالَ الكِبْرُ : بَطَرُ الحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ

“যার অন্তরে অণু পরিমাণও অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (এ কথা শুনে) এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, “মানুষ তো পছন্দ করে যে, তার কাপড়-চোপড় সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, (তাহলে সেটাও কি অহংকারের মধ্যে গণ্য হবে?)।
তিনি বললেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালবাসেন। অহংকার হল, সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা ও মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা মানুষকে খাটো নজরে দেখা।”
[সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ১/ কিতাবুল ঈমান, পরিচ্ছেদ: ৩৯. অহংকারের বিবরণ ও তা হারাম হওয়া]

❑ অহংকারীর ২৮টি আলামত:

একজন মানুষ অহংকারী কিনা তার আচরণ ও কথাবার্তায় ফুটে উঠে। নিম্নে মানুষের এমন কিছু আচরণ ও স্বভাব তুলে ধরা হল যা তার অহংকারের প্রমাণ বহন করে। অর্থাৎ এগুলোর মাধ্যমেও কারো মাঝে অহংকার আছে কিনা তা সহজে নির্ণয় করা যায়।

১. ভুল করার পরও তা স্বীকার না করা। একজন অহংকারী ব্যক্তি কখনো ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়। বরং যে কোনও মূল্যে সে নিজের কথা ও কাজকে সঠিক প্রমাণ করতে তৎপর থাকে। সে যে কোনও মূল্যে নিজের জিদের উপর অটল থাকে। কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করলেও সে কখনো তার নিকট ক্ষমা চাইবে না। দুঃখিত, সরি, ক্ষমা করবেন, ভুল হয়ে গেছে এ কথাগুলো তার অভিধানে নেই।
৩. নিজের মতটাকে সবসময় সঠিক ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং অন্যের মতামতকে মূল্যায়ন না করা বা গুরুত্ব না দেওয়া।
৪. কথাবার্তা ও চলাফেরায় ঔদ্ধত্যভাব প্রকাশ করা।
৫. সামান্য কারণেই মানুষের প্রতি ক্রোধান্বিত হওয়া-এমনকি সম্পর্কচ্ছেদ করা।
৬. মানুষের অবদানকে খাটো করে দেখা।
৭. কেউ ভালো কাজ করলে তাকে ধন্যবাদ না দেওয়া বা কৃতজ্ঞতা না জানানো।
৮. কেউ তার উপকার করলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা। কেউ তার উপকার করলে সে মনে করে, এটা তার পাওনা ছিল।
৯. অন্যের উপদেশকে পাত্তা না দেওয়া। বরং এটাকে সে নিজের মান-সম্মানহানীকর মনে করে।

১০. সে চায়, মানুষ সবসময় তাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিক। প্রত্যাশিত গুরুত্ব না পেলে প্রচণ্ড ক্ষেপে যায়।
১১. অহংকারী নিজেকে অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য মিথ্যা কথা বলতে দ্বিধা করে না। সে অন্যদের সামনে তার নিজের এমন যোগ্যতা, অর্থ-সম্পদ, উচ্চপদস্থ লোকেদর সাথে তার সম্পর্ক ইত্যাদি তুলে ধরে যা আদতে সত্য নয়।
১২. স্ত্রী, সন্তান, কর্মচারী, কাজের মানুষ ইত্যাদি অধীনস্থদের সাথে দুর্ব্যবহার করা।
১৩. তার স্বভাবে ও আচরণে বিনয়-নম্রতা স্থান পায় না। বরং সে হয় উগ্র ও বদমেজাজি।
১৪. নিজের কার্যক্রমে খুব বেশি আত্মতৃপ্তিতে ভোগা।
১৫. অন্যের দোষত্রুটি বা দুর্বলতাকে নিয়ে হাসাহাসি করা বা তার সাথে কষ্টদায়ক আচরণ করা।
১৬. কেউ ভুল করার পর তার নিকট ক্ষমা চাইলেও সে তাকে ক্ষমা করে না।
১৭. সে তার পছন্দনীয় নয় এমন কোনও ব্যক্তির সাথে দেখা করতে চায় না বা সে তার সাথে কোথাও যাক, তার পাশে বসুক, তার বাড়িতে বেড়াতে আসুক-এটা সে চায় না।
১৮. মানুষ হিসেবে নয় বরং মানুষের পদমর্যাদা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, গায়ের রং, পোশাক, মেধা ইত্যাদি বিবেচনা করে মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখা।
১৯. সে নিজেকে অভাব মুক্ত মনে করে। তার দৃষ্টিতে সে স্বয়ং সম্পূর্ণ।

২০. অহংকারী ব্যক্তি বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে চায় না।
২১. সে কখনো চায় না, কেউ তার সামনে দিয়ে হাঁটুক বা চলুন বা বসুক। সে চায় সে সবসময় সবার সামনে থাকবে। কোনও মাহফিলে স্টেজে সামনে চেয়ার না পেলে ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে।
২২. পারিবারিক কাজে কাউকে সাহায্য করে না। এটা সে তার জন্য সম্মানহানি মনে করে।
২৩. সে নিজে অন্যের সেবা করতে রাজি নয় বরং সে চায়, সবসময় অন্যরা তার সেবা করুক। ফলে সে অন্যদেরকে শুধু কাজের বা সেবার আদেশ করে।
২৪. কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা এবং নিজেকে সংশোধনের পরিবর্তে উল্টা তার উপর রাগ করা।
২৫. ন্যায়-সঙ্গত, যৌক্তিক ও সত্য বিষয়কে জেনে-বুঝে প্রত্যাখ্যান করা।
২৬. মানুষের শারীরিক গঠন, দারিদ্রতা, বংশ মর্যাদা ইত্যাদি নিয়ে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।
২৭. সত্য জানার চেষ্টা না করা বা জ্ঞানার্জন করা থেকে মূখ ফিরিয়ে চলা।
২৮. তার থেকে থেকে বয়সে ছোট বা কম শিক্ষিত মানুষের পক্ষ থেকে কোন সংশধনী গ্রহণ না করা বা কোনও জ্ঞান না নেওয়া যাদিও তা উপকারী হয়।

এই লক্ষণগুলো আমাদের মধ্যে থাকলে ধ্বংস ও অধঃপতনের পূর্বে এখনই তওবা করে নিজেকে সংশোধন করা আবশ্যক। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬◢◯◣▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

একজন ইমামের যোগ্যতা ও গুণাবলী

 নিঃসন্দেহে তওহিদের পরে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হল সালাত। সুতরাং এই সালাতের ইমামতির দায়িত্বও অতি মর্যাদাপূর্ণ।

সে কারণে স্বভাবতই একজন ইমামের মধ্যে কিছু যোগ্যতা ও গুণাবলী থাকা জরুরি।
নিম্নে সেগুলো কতিপয় তুলে ধরা হল:

◈ যে ইমামতি করবে তার মধ্যে যে সকল আবশ্যকীয় যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন সেগুলো হল:

● ১. বিশুদ্ধ আকিদা ও মানহাজের অনুসারী হওয়া।
● ২. ইখলাস তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত থাকা।
● ৩. বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত করতে সক্ষম হওয়া।

ইসলামের দৃষ্টিতে ইমাম হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ওই ব্যক্তি যে কুরআন তিলাওয়াতে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ

“কওমের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি ভালো আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করতে পারে (যে শুদ্ধ উচ্চারণে তারতিলের সাথে সুন্দরভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে অথবা যার অধিক পরিমাণে কুরআন মুখস্থ রয়েছে) সেই ইমামতি করবে।” [সহীহ মুসলিম]

সুতরাং যার তিলাওয়াত শুদ্ধ নয় বা যার তিলাওয়াতে মারাত্মক ভুল (لحن جلي) রয়েছে তাকে ইমামতি বা খতিব হিসেবে কোথাও নিয়োগ দেওয়া উচিত নয় যদিও তার আকিদা-মানহাজ সঠিক হয়, যদিও সে নামিদামি বক্তা, লেখক গবেষক বা ওয়ায়েজ হয়।

বরং আকিদা মানহাজ বিশুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি যে তিলাওয়াতে অধিক পারদর্শী কিংবা কুরআন মজবুতভাবে মুখস্থ রাখে সেই মসজিদের ইমাম হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তি।

● ৪. সুন্নাহ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখা। কমপক্ষে সালাতের মৌলিক বিধিবিধানগুলো সম্পর্কে জানা যেন সুন্নাহ ভিত্তিক সঠিক নিয়মে সালাত পড়াতে সক্ষম হয়।

◈ তার মধ্যে আরও যে সকল গুণাবলী থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: (১০টি)

১. বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা ও মানুষের সাথে সুন্দর ব্যবহার।
২. অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও মিষ্টভাষী হওয়া।
৩. ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞান থাকা।
৪. তার ব্যক্তিগত জীবনে কথা ও কাজের মিল থাকা।
৫. পাপাচার থেকে দূরে থাকা।
৬. একজন ইমামের জন্য সময়ানুবর্তীতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সালাত নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পৃক্ত।
৭. আত্ম মর্যাদা সম্পন্ন হওয়া। অর্থাৎ তার থেকে এমন কোন নীচ ও হীন আচরণ প্রকাশিত না হওয়া যা এই দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির জন্য শোভনীয় নয়।
৮. মানুষের প্রতি কল্যাণকামী মনোভাব এবং মুসল্লিদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি সচেতন থাকা।
৯. ধৈর্য ও সহনশীলতা।
১০. মানুষের সম্পদের প্রতি লোভ সংবরণ করা…ইত্যাদি।
উল্লেখ্য যে, এ সকল গুণাবলী প্রত্যেক মুসলিমের মধ্যেই থাকা উচিৎ। তবে বিশেষভাবে ইমাম, দাঈ, আলেম প্রমুখ ব্যক্তিগণ- যাদের নিকট মানুষ দ্বীন ও চরিত্র শিখবে-তাদের মধ্যে থাকাটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ সকল সুন্দর গুণাবলীর অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬▬◢◯◣▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

শুকরিয়ার জন্য বিশেষ কোনও সালাত নেই আছে সেজদা

 যে কোনও সফলতা, বিজয়, অনন্ত দায়ক ঘটনা, সুসংবাদ লাভ কিংবা যে কোন দুশ্চিন্তা বা বিপদাপদ কেটে যাওয়ার কারণে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া হিসেবে একটি সেজদায়ে শোকর দেওয়া সুন্নত। এটি বিভিন্ন বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা সু প্রমাণিত। কিন্তু শুকরিয়া হিসেবে দুই বা ততোধিক রাকাত সালাত পড়ার ব্যাপারে ওলামাদের মাঝে কিছুটা দ্বিমত থাকলেও অধিক বিশুদ্ধ মতে তা সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।

এ বিষয়ে দু-একটি জয়িফ বা দুর্বল হাদিস পাওয়া যায়। উক্ত হাদিসগুলোর তাহকিক বা সনদ বিশ্লেষণ নিম্নরূপ:

1-ما رواه الحاكم عن كعب بن عجرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم أمر كعب بن مالك حين تيب عليه وعلى أصحابه أن يصلي ركعتين أو سجدتين . رواه الحاكم في “المستدرك على الصحيحين” (5/148).
إلا أن هذا الحديث لا يصح ؛ لأن في إسناده : يحيى بن المثنى .
قال العقيلي : “حديثه غير محفوظ ، ولا يعرف بالنقل” انتهى من “الضعفاء الكبير” (4/ 432).
2- ما رواه ابن ماجه (1391) من طريق سَلَمَة بْن رَجَاءٍ حَدَّثَتْنِي شَعْثَاءُ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى رضي الله عنه (أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى يَوْمَ بُشِّرَ بِرَأْسِ أَبِي جَهْلٍ رَكْعَتَيْنِ) .
وهذا الحديث حسنه بعض العلماء كابن حجر وابن الملقن . ينظر : “البدر المنير” (9 /106) ، تلخيص الحبير (4 /107) .
ولكن قال البوصيري : ” هذا إسنادٌ فيه مقال ، شَعْثَاء بنتُ عبد الله ، لَمْ أَرَ مَنْ تَكَلَّمَ فِيهَا لَا بِجُرْحٍ وَلَا بِتَوْثِيقٍ.
وَسَلَمَة بْن رَجَاء لَيَّنَهُ اِبْن مُعِين ، وَقَالَ اِبْن عَدِّي : حَدَّثَ بِأَحَادِيث لَا يُتَابَع عَلَيْهَا ، وَقَالَ النَّسَائِيُّ : ضَعِيف ، وَقَالَ الدَّارَقُطْنِيُّ : يَنْفَرِد عَنْ الثِّقَات بِأَحَادِيث ، وَقَالَ أَبُو زُرْعَة : صَدُوق ، وَقَالَ أَبُو حَاتِم : مَا بِحَدِيثِهِ بَأْس “. انتهى من “مصباح الزجاجة ” (1 / 211) .
وكذلك ضعفه الشيخ الألباني في ضعيف سنن ابن ماجه

আর মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে হানি রা. এর ঘরে ৮ রাকাত নফল সালাত পড়েছিলেন। অনেক মুহাদ্দিসের মতে তা ছিল তার নিয়মিত সালাতুয যুহা বা চাশতের সালাত। কেননা সহিহ মুসলিমের বর্ণায় আছে,

ثُمَّ صَلَّى ثَمَانَ رَكَعَاتٍ سُبْحَةَ الضُّحَى

“তারপর তিনি আট রাকআত চাশতের সালাত আদায় করলেন।”

আবার অনেকের মতে, তা ছিল শুকরিয়ার সালাত। কিন্তু তারা বলেন, তা কাফেরদের থেকে দেশ জয়ের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ যখন কোনও কাফের অধ্যুষিত দেশ মুসলিমদের করতলগত হবে তখন আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে দু বা ততোধিক রাকাত সালাত পড়া জায়েজ আছে। সাধারণভাবে যে কোনও সুসংবাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

এ কারণে মুহাক্কিক আলেমগণ বলেন, অধিক বিশুদ্ধ মতে সাধারণ আনন্দদায়ক সংবাদে শুকরিয়ার সালাত পড়া শরিয়ত সম্মত নয়।

❑ এ বিষয়ে নিম্নে কয়েকজন বিশ্ববরেণ্য আলেমের মতামত উপস্থাপন করা হলো:

✪ রামলি (শিহাব উদ্দিন মোহাম্মদ আর রামলি, মৃত্যু ১০০৪ হি.) বলেন,

لَيْسَ لَنَا صَلَاةٌ تُسَمَّى صَلَاةَ الشُّكْرِ ” . انتهى من ” تحفة المحتاج ” (3 / 208).

“আমাদের জানামতে, সালাতুশ‌ শোকর ‌(কৃতজ্ঞতার সালাত) নামে কোন সালাত নেই।” [তুহফাতুল মুহতাজ, ৩/২০৮]

✪ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. বলেন,

” لا أعلم أنه ورد شيء في صلاة الشكر ، وإنما الوارد في سجود الشكر “. انتهى “مجموع الفتاوى ” (11 /424)

“সালাতুস শোকর বা কৃতজ্ঞতার সালাত-এর ব্যাপারে কোন হাদিস এসেছে বলে জানা নেই। তবে সেজদায়ে শোকর বা কৃতজ্ঞতার সেজদার ব্যাপারে হাদিস এসেছে।” [মাজমুল ফাতাওয়া, ১/৪২৪]

✪ আল্লামা শাইখ উসাইমিন বলেন,

” لا أعلم في السنة صلاة تسمى : صلاة الشكر ، ولكن فيها سجوداً يسمى : سجود الشكر”. انتهى ” فتاوى نور على الدرب” (6 / 17)

“সুন্নায় (হাদিসে) বর্ণিত হয়েছে এমন কোন সালাতের কথা জানা নাই যাকে ‘সালাতুল শোকর বা কৃতজ্ঞতার’ সালাত বলা হয়। তবে এ জন্য সেজদা রয়েছে যাকে ‘সেজদায়ে শোকর’ বলা হয়।” [ফাতাওয়া নুরন আলাদ দারব, ৬/১৭]

✪ তিনি আরও বলেন,

” الشكر ليس له صلاة ذات ركوع وقيام ، وإنما له سجود فقط “. انتهى “فتاوى نور على الدرب” (6 / 18)

“শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতার জন্য কিয়াম ও‌ রুকু সম্বলিত কোন সালাত নেই। শুধু রয়েছে সেজদা।” [ফাতাওয়া নুরন আলাদ দারব, ৬/১৮] (sauce: islamqa-সংক্ষেপেয়িত)
আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Translate