Thursday, September 12, 2024

যেসব টি-শার্ট বা জামা-কাপড়ে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর নাম ইত্যাদি লেখা আছে সেগুলো পরিধান করা জায়েজ নাই

 প্রশ্ন: যে সব T-shirt-এর উপর আরবিতে আল্লাহর নাম, দুআ, জিকির ইত্যাদি বিভিন্ন ইসলামিক শব্দ গুলো লেখা আছে (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আল হামদুলিল্লাহ ইত্যাদি) সেগুলো কি ব্যবহার করা জায়েজ? কারণ মানুষ এগুলো পরে তো বাথরুমেও যায়।

উত্তর: নিঃসন্দেহে মুসলিমদের নিকট আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত, দুআ-জিকির ইত্যাদি অত্যন্ত মর্যাদার পাত্র। সর্বাবস্থায় এগুলোর যথাযোগ্য সম্মান বজায় রাখা আবশ্যক। তাই তা এমন কোনও ক্ষেত্রে ব্যবহার করা বৈধ নয় যাতে তার সম্মানহানি ঘটে। আর তাই যে সব টি-শার্ট বা জামা-কাপড়ে আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত, তাসবিহ, জিকির-যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লাই-লা-হা ইল্লাহ ইত্যাদি লেখা আছে সেগুলো পরিধান করা জায়েজ নয়। চাই আরবিতে লেখা থাক কিংবা বাংলা অথবা অন্য কোনও ভাষায় লেখা থাক। কেননা এর মাধ্যমে আল্লাহর নামের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়। যেহেতু এই কাপড়গুলো নোংরা হতে পারে, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হতে পারে বা অন্য কোনও অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হতে পারে।
➤ একই কারণে টয়লেটের মধ্যে মুখে উচ্চারণ করে কুরআন তিলাওয়াত করা, আজানের জবাব দেওয়া, আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা বা অন্য কোনও দুআ-জিকির ইত্যাদি পাঠ করা জায়েজ নয়।
➤ মহিলাদের লকেট বা চেইনে যদি এমন কিছু লেখা থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।
➤ তবে সেগুলোতে যদি সাধারণ ইসলামি শব্দাবলী লেখা থাকে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই-চাই তা আরবিতে হোক অথবা অন্য কোনও ভাষায় হোক। যেমন: সবর, ইসলাম, ইমান, ইহসান, মুমিন, মুসলিম, মুসাফির, ইনসাফ, সালাত, সালাম, আসসালামু আলাইকুম ইত্যাদি।

❑ বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়া:

নিম্নে উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তরে দু জন বিজ্ঞ আলেমের ফতোয়া উল্লেখ করা হলো:

✪ ১. আল্লামা শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)

সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. এ সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন,

الثياب التي يكون فيها أسماء الله أو آيات لا يجوز لبسها؛ لأنها وسيلة إلى أن تمتهن أو يصيبها النجاسة من حيض أو غيره، أو تلقى فيطأ عليها الناس أو يجلس عليها الناس؛ فلهذا حرم لبسها وحرم جعلها وسائد أو بسط؛ لأن هذا يفضي إلى امتهانها بالقعود عليها والوطء عليها ونحو ذلك

“যেসব কাপড়ে আল্লাহর নাম বা কোরআনের আয়াত লেখা থাকে, সেগুলো পরিধান করা বা বালিশ, চাদর ইত্যাদি হিসেবে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। কারণ, এতে আল্লাহর নাম ও আল্লাহর কালামের অবমাননা হতে পারে কিংবা হায়েজের রক্ত বা অন্যান্য নাপাক জিনিস লাগতে পারে। অথবা এগুলো এমন জায়গায় পড়ে থাকতে পারে যেখানে মানুষ এগুলোর উপরে বসবে বা সেগুলোকে পদদলিত করবে…ইত্যাদি।” [binbaz]

✪ ২. আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ)

বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউজান (হাফিযাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়, “যেসব কাপড়ে আল্লাহর নাম বা ‘আল্লাহু আকবার’ লেখা থাকে সেগুলো পরা জায়েজ কিনা?

উত্তরে তিনি বলেন,

هذا لا يجوز؛ لأن فيه امتهانا لذكر الله عز وجل، فكتابة اسم الله ولفظِ الجلالة على الملابس لا يجوز لما فيه من الاستهانة باسم الله سبحانه وتعالى ؛ لأن هذه الملابس تكون على الأطفال الذين لا يتحرزون من النجاسة وتكون على الإنسان وهو يدخل بيت الخلاء وقضاء الحاجة وقد يخلع هذا الثوب ويداس أو يمتهن، وأسماء الله جل وعلا تعظم وذكره يعظم من الامتهان

“এ ধরনের কাপড় পরা জায়েজ নয়। কারণ এতে আল্লাহর নামের অবমাননা হয়। আল্লাহর নাম বা ‘আল্লাহু আকবার’ লেখা কাপড় পরা মানে আল্লাহর নামের প্রতি অবহেলা করা। কারণ এই কাপড়গুলো শিশুরা পরতে পারে, যারা নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে না। মানুষ এই কাপড় পরেই বাথরুমে যেতে পারে। এই কাপড়গুলো খুলে ফেলা হতে পারে এবং পদদলিত হতে পারে। আল্লাহর নাম অত্যন্ত মহান এবং এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা জরুরি।” [শাইখের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল-العلامة الدكتور صالح الفوزان]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার। সৌদি আরব।

গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র কী এবং তা কি ইসলাম অনুমোদিত

 গ্রাফিতি ইটালিয়ান শব্দ “Grafitiato” থেকে আসে, যার অর্থ “খচিত”। গ্রাফিতি শব্দটি শিলালিপি, চিত্র অঙ্কন এবং এই ধরণের শিল্প বুজায়।

গ্রাফিতি হলো, সাধারণ কোনো চিত্রকর্ম বা দেয়াল লিখন, যাতে শিল্পীর সূক্ষ্ম বার্তা লুকানো থাকে। দেশে দেশে সামাজিক অবিচার, সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা যুদ্ধের বিরুদ্ধে শিল্পীরা গ্রাফিতির মাধ্যমে তাদের বার্তা সমাজে পৌঁছে দিয়ে থাকেন। শান্তির পক্ষে অবস্থান নেয়ার আহ্বান ফুটে ওঠে কোনো কোনো দেয়ালচিত্রে। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক চিত্রের মাধ্যমে সমাজের বাস্তবতাও শিল্পী তার তুলির আঁচড়ে নিখুঁতভাবে তুলে আনেন।” [roar.media]

গ্রাফিতি বিষয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে,

“গ্রাফিতি হল বিনা অনুমতিতে জনসাধারণের অভিমতে শিল্পীয় উপায়ে দেয়ালের উপরে লেখনী কিংবা অঙ্কনের মাধ্যমে তুলে ধরা। [American Heritage Dictionary] স্প্রে পেইন্ট বা মার্কার পেন সাধারণত গ্রাফিতি তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গ্রাফিতি একটি বিতর্কিত বিষয়। অধিকাংশ দেশে গ্রাফিতিকে বিকৃত ও ধ্বংসাত্মক শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয় কারণ অনেক সময় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের সক্রিয়তা গ্রাফিতির মাধ্যমে প্রচার করে।” [উন্মুক্ত বিশ্বকোষ বাংলা উইকিপিডিয়া]

প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সারা পৃথিবীতেই গ্রাফিতি নির্যাতিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের কাছে সমাদৃত হচ্ছে। তাই দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা বড় থেকে ছোট বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদে সুস্থ ধারার আন্দোলনের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হিসাবেই মনে করেন প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মানুষেরা। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলেরা গ্রাফিতিকে ভয় পায়। গ্রাফিতিতে শিল্পবোধ থাকে। চিন্তার খোরাক থাকে।

❑ ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রাফিতি করা কি জায়েজ?

হ্যাঁ, কতিপয় শর্তসাপেক্ষে তা জায়েজ। যথা:

◆ ১. অন্যের বাড়ি বা কোনও প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে গ্রাফিতি করতে হলে, অবশ্যই মালিক বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া তা করার সুযোগ নেই। ইসলাম, প্রচলিত আইন এবং সামাজিক ইত্যাদি সকল দৃষ্টিকোণ থেকে তা অগ্রহণযোগ্য।
কারো বাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে চিকা মারা, পোস্টার লাগানো ও হাল-জামানার নেতা বন্দনার প্যানোফ্ল্যাক্স, ফেস্টুন বসানো ইত্যাদি ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

পাবলিক প্লেসে করতে হলেও তা অনুমোদিত স্থান হওয়া আবশ্যক।

◆ ২. গ্রাফিতি হতে হবে এমন বিষয়ে যা সর্বস্তরের মানুষের জন্য কল্যাণকর। যা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে বা সামাজিক অসঙ্গতির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

◆ ৩. গ্রাফিতিতে এমন কোনও বিষয় থাকতে পারবে না যা ইসলামে নিষিদ্ধ। যেমন: অশ্লীল বা অশালীন শব্দ কিংবা বাক্য, শরিয়ত বিরোধী ও খারাপ ইঙ্গিত বাহী কোনও চিহ্ন, মানুষ ও জীব-জন্তুর স্পষ্ট আকৃতি ইত্যাদি।

◆ ৪. এমন গ্রাফিতি অঙ্কন থেকে বিরত থাকা উচিৎ, যা দৃষ্টিকটু বা পরিবেশের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করে।
◆ ৫. গ্রাফিতি এমন বিষয়ে হওয়া যাবে না যা প্রচলিত সুস্থ, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সামাজিক ট্যাবু, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ইত্যাদি ভেঙ্গে ফেলার আহ্বান জানায়।
◆ ৬. দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে বা বিশৃঙ্খলার দিকে আহ্বান জানায় এমন কোনও গ্রাফিতি করা যাবে না।
◆ ৭. এমন স্থানে কুরআনের আয়াত এবং আল্লাহ-রসুলের নামের গ্রাফিতি করা জায়েজ নয় যেখানে সেগুলোর সম্মানহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
◆ নারী-পুরুষ একাকার হয়ে গ্রাফিতি অংকন করা ইসলাম সমর্থন করে না।
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

মৃতদের স্মরণে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানো জঘন্য হারাম এবং নিরেট অজ্ঞতা পূর্ণ কুসংস্কার

 মৃতদের স্মরণে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো জঘন্য হারাম এবং নিরেট অজ্ঞতা পূর্ণ কুসংস্কার: এর ৭ কারণ।

মানুষ অন্ধকারে আলো জ্বালাবে-এটা স্বাভাবিক। একসময় বিদ্যুৎ ছিল না। তখন মানুষ অন্ধকারে চেরাগ/কুপি, হারিকেন বা মোমবাতি জ্বালাত। প্রয়োজনে এখনো জ্বালাবে। তাতে কোনও সমস্যা নাই। তবে বর্তমানে আধুনিক যুগে বৈদ্যুতিক বাতির আলোর ঝলকানিতে বিশ্ব আলোকিত। কিন্তু এই উজ্জ্বল আলোর নিচে দাঁড়িয়ে কেউ যখন মৃত/শহিদদের স্মরণে বা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে কিংবা তাদের আত্মার শান্তির প্রত্যাশায় ঘটা করে মোমবাতি জ্বালাবে, মোমবাতির সামনে নীরবতা পালন করবে অথবা মোমবাতির সামনে মৃতদের ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তখন সুস্থ বিবেকের সামনে তার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তৎসঙ্গে একজন মুসলিম হিসেবে ইসলামিক দৃষ্টিকোণ তা কতটুকু সঠিক বা কতটুকু ইসলাম সমর্থিত তা বিচার-বিশ্লেষণ করা আবশ্যক।

নিম্নে ইসলাম ও যুক্তির নিরিখে মৃতদের স্মরণে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো বিষয়টি ৭টি পয়েন্টে উপস্থাপন করা হলো:

❂ ১. ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে অগ্নি প্রজ্বলন বা মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো বিদআত (ইসলামে নব সংযোজন বা ধর্মের নামে অধর্ম):

প্রকৃতপক্ষে মানুষ মারা গেলে তার প্রতি জীবিতদের কী করণীয় সে ব্যাপারে ইসলামে বিস্তর দিকনির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু ইসলামে মৃতদের উদ্দেশ্য অগ্নি প্রজ্বলন, মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো এবং তার সামনে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন সম্পর্কে কোনও নির্দেশনা নেই। এবং ইসলামের সোনালী যুগ তথা সাহাবি ও তাবেয়ীদের যুগে মুসলিমদের মধ্যে এ ধরণের কাজের কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
অতএব ইসলামের দৃষ্টিতে তা জঘন্য বিদআত-তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর বিদআত মানেই ভ্রষ্টতা। আর প্রতিটি ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।

❖ আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

“যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করল যে ব্যাপারে আমার নির্দেশনা নেই তা আল্লাহর কাছে পরিত্যাজ্য।” [বুখারী ও মুসলিম]

❖ অন্য বর্ণনায় এসেছে:

مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ

“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।” [বুখারী ও মুসলিম]

❖ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক খুতবায় বলেছেন,
إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الأُمُوْرِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ وَكُلُّ ضَلاَلَةٍ فِي النَّارِ. رواه مسلم والنسائى واللفظ للنسائى.
‘‘নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম আদর্শ মুহাম্মদের আদর্শ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল (দ্বীনের মধ্যে) নব উদ্ভাবিত বিষয়। আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক বিষয় বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত হল ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৩৫ ও সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস নং ১৫৬০, হাদিসের শব্দ চয়ন নাসায়ী থেকে।]

❂ ২. অন্ধ অনুসরণ:

মৃতদের স্মরণে মোমবাতি বা প্রদীপ প্রজ্বলন করা খৃ*ষ্টা*ন, অগ্নি*পূজক ইত্যাদি অমুসলিমদের সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। কেননা খ্রি**স্টান ধর্মাবলম্বীরা তাদের কবরস্থানে মোমবাতি জ্বালিয়ে মৃতদের উদ্দেশ্যে বিশেষ প্রার্থনা করে থাকে। “অগ্নি উপাসকরা তাদের সকল পূজার সময় বা পূজার প্রারম্ভে অগ্নিকে সাক্ষী রেখে কাজ শুরু করে এবং অগ্নিকে সর্বাধিক পবিত্র বলেই মেনে থাকে।” [অশোক চক্রবর্তী-মহাভারতের জানা অজানা FB page] আর ইসলামে অমুসলিমদের ‘সাদৃশ্য অবলম্বন’ কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।

❖ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

“যে ব্যক্তি অন্য সম্প্রদায়ের (বিধর্মীদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতির ক্ষেত্রে) সাদৃশ্য অবলম্বন করে সে তাদেরই দলভুক্ত।“ [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৪০৩১, সহীহুল জামে-আলবানী, হা/২৮৩১]

❖ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا فِي جُحْرِ ضَبٍّ لاَتَّبَعْتُمُوهُمْ ‏”‏ ‏.‏ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ آلْيَهُودَ وَالنَّصَارَى قَالَ ‏”‏ فَمَنْ

“তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের নীতি-পদ্ধতি পুরাপুরি ভাবে অনুসরণ করবে, বিঘতে বিঘতে ও হাতে হাতে, এমনকি তারা যদি তিনি দব (গুই সাপ সদৃশ মরুভূমিতে থাকা এক প্রকার হালাল প্রাণী) এর গর্তে প্রবেশ করে থাকে তাহলেও তোমরা তাদের অনুসরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসুল, পূর্ববর্তী উম্মত বলতে কি ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাই উদ্দেশ্য?
তিনি বললেন, তাহলে আর কারা?”
[সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৪৯/ ইলম (জ্ঞান), পরিচ্ছেদ: ৩. ইহুদি ও খৃষ্টানদের রীতি-নীতি অনুসরণ]

অথচ আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ বানরের মত অনুকরণপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা ভালো-মন্দ বাছ-বিচার ছাড়াই বিধর্মীদের অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত হতে এতটুকু দ্বিধা করে না!
সত্য বলতে, বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম ইসলামের মহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অমুসলিমদের অন্ধ অনুসরণের ফলেই মুসলিম জাতি অধঃপতনের অতল তলে নিপতিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে এই অন্ধ অনুকরণের মোহ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

❂ ৩. অগ্নিপূজক/শিরক:

মৃতদের উদ্দেশ্যে অগ্নি প্রজ্বলন, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সৈনিকদের স্মৃতির উদ্দেশ্য শিখা অনির্বাণ স্তম্ভ, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে ভাষণ প্রদান করেছিলেন সে স্থানে নির্মিত শিখা চিরন্তন স্তম্ভ ইত্যাদি অগ্নিপূজার শামিল। আগুনকে অনির্বাণ (যা কখনো নিভে না) বা চিরন্তন বিশ্বাস করা যেমন একদিক থেকে শিরক তেমনি তার সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা ও সেখানে নীরবতা পালন করা এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক স্যালুটের মাধ্যমে সম্মান জানানো ইত্যাদি কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে শিরক। এরূপ কাজ যারা করে তাদেরকে বলা হয় মাজুস বা অগ্নিপূজক। তওবা না করে মৃত্যুবরণ করলে তারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে। কেননা আল্লাহ শিরক কারীকে ক্ষমা করবেন না।

❖ আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। কিন্তু এর নিম্ন পর্যায়ের পাপরাশী ক্ষমা করেন যাকে ইচ্ছা। যে আল্লাহর সাথে শিরক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়।” [সূরা নিসা: ৪৮]

❖ তিনি আরও বলেন,

وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ

“এবং যে কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করল সে যেন আকাশ থেকে ছিটকে পড়ল, অতঃপর (মৃতভোজী) পাখী তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোন দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।” [সূরা হাজ্জ: ৩১]

❂ ৪. অনর্থক কাজ:

এই মোমবাতি প্রজ্বলনে মৃতদের বিন্দুমাত্র উপকার হয় না। সুতরাং নিতান্ত অনর্থক ও অহেতুক কাজ।

❖ আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

“যারা অনর্থক কার্যক্রম থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে।” [সূরা মুমিনুন: ৩]

❖ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا

“এবং যারা ভ্রান্ত কর্মে যোগদান করে না এবং যখন অসার ক্রিয়াকর্মের সম্মুখীন হয়, তখন সেখান থেকে সসম্মানে প্রস্থান করে।” [সূরা ফুরকান: ৭২]

❖ আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مِنْ حُسْنِ إسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ

“অনর্থক বিষয় ত্যাগ করাই একজন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য।” [তিরমিযী: ২৩১৮, ইবনে মাজাহ: ৩৯৭৬-হাদিসটি হাসান।
মৃত মানুষের উদ্দেশ্য বাতি জ্বালানো মূর্খতা সুলভ অহেতুক মিথ্যা আবেগ ছাড়া কিছু নয়।

❂ ৫. অর্থ অপচয়:

মৃতদের উদ্দেশ্যে অগ্নি প্রজ্বলন করা, মোমবাতি/প্রদীপ জ্বালানো অর্থ অপচয়ের শামিল। আমাদের সমাজে বিভিন্ন উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে বা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনার্থে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। যেমন: খবরে প্রকাশ, নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে ‘একুশের আলো’ সংগঠনের উদ্যোগে ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রজ্বলন করা হয় এক লাখ মোমবাতি! [২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭]

এই অনর্থক কাজে তা অর্থ অপচয় ও আল্লাহ নিয়ামতের অপব্যবহার ছাড়া কিছু নয়। কারণ এতে না জীবিত মানুষের কোনও উপকার হয়, না মৃতদের উপকার হয়।

আর ইসলামের দৃষ্টিতে অনর্থক কাজে অর্থ অপচয় করা নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ।

❖ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

“তোমরা খাও এবং পান করো তবে অপচয় করো না। তিনি অপচয় কারীদের ভালোবাসেন না।” [সূরা আরাফ: ৩১]

❖ তিনি আরও বলেন,

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

“নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” [সূরা বনী ইসরাইল: ২৭]

আমাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় যে, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন মানুষের অর্থ-সম্পদ তথা তার যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব নিবেন।

অথচ এই অর্থ যদি সেই নিহতের পরিবারের জন্য খরচ করা হতো তাহলে তারা কতই না উপকৃত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, দরিদ্রের ঘরে বাতি জ্বলে না কিন্তু বৈদ্যুতিক লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে মূর্খরা প্রদীপ জ্বালায়!

❂ ৬. কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস:

মৃতদের উদ্দেশ্যে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালালে তাদের আত্মা শান্তি পাবে-এমনটা মনে করা নিতান্তই ভ্রান্ত অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কার।
অন্ধ বিশ্বাস থেকেই তারা জন্মদিনে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়। আর বিশ্বাস করে, মোমবাতি নিভানোর পর হালকা একটা ধোঁয়া উপরের দিকে উড়ে যায়। সেই ধোঁয়ার সাথে জন্মদিনের করা সব ইচ্ছেগুলো ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে তিনি সে সব প্রার্থনা পূর্ণ করবেন। অথবা এ বিশ্বাস করা হয় যে, ধোঁয়ার অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথে, জীবনের সমস্ত নেতিবাচক বিষয়গুলো অদৃশ্য হয়ে যাবে।

প্রকৃতপক্ষে মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালানো বা নিভানোর সাথে মানুষের জীবনের কল্যাণ-অকল্যাণ বা আত্মার সুখ-শান্তির বা কারও প্রতি শ্রদ্ধা-অশ্রদ্ধার ন্যূনতম কোনও সম্পর্ক নেই। থাকতে পারে না।

সুতরাং মোমবাতি জ্বালালে মৃত ব্যক্তির আত্মা শান্তি পাবে-এহেন ভ্রান্ত কথা কোনও সুস্থ বিবেক গ্রহণ করতে পারে না।
তথাকথিত মুক্তমনা ও বিজ্ঞান মনস্করা এমন অবৈজ্ঞানিক ও অন্ধবিশ্বাসকে কীভাবে গ্রহণ করে তা সত্যি বিস্ময়কর। অথচ তারাই কথায় কথায় ইসলামের বিধিবিধানকে নানাভাবে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ইত্যাদি বলে কটূক্তি করে থাকে। এসব শিক্ষিত মূর্খদেরকে আল্লাহ দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞান দান করুন। আমিন।

❂ ৭. মনোবাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হারাম/শিরক:

মনোবাসনা পূরণের জন্য মাজারে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে মোমবাতি জ্বালানো হারাম। কখনো তা এটা শিরক পর্যায়ের অপরাধ। কেননা সব মনোবাসনা পূরণ করার ক্ষমতা রাখেন কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। মৃত ব্যক্তি কখনো কিছু দিতে পারেন না। মৃতের কাছে কিছু চাওয়া মানে আল্লাহর সাথে বড় শিরক। আর শিরক হলো, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ও ক্ষমাহীন অপরাধ। মহান আল্লাহ আমাদের দ্বীনের প্রকৃত জ্ঞান দান করুন। ভ্রষ্টতা, মূর্খতা, অন্ধ অনুকরণ এবং মিথ্যা আবেগ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Friday, August 16, 2024

সালাতে মনস্থির রাখার কার্যকরী ১২ টি উপায়

 প্রশ্ন: সালাতে মনে বিনয়-নম্রতা ও ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং মনস্থির রাখার উপায় গুলো কী কী?

উত্তর: ভয়ভীতি ও বিনয়-নম্রতা সহকারে স্থিরচিত্তে সালাত আদায় করা মুমিনের চূড়ান্ত সাফল্যের সোপান। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ- الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ
“মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে যারা ভয়ভীতি সহকারে বিনম্র চিত্তে সালাত আদায় করে।” [সূরা মুমিনূন: ১ ও ২]

নিম্নে সালাতরত অবস্থায় মনে ভয়ভীতি সৃষ্টি ও মনস্থির রাখার কতিপয় উপায় তুলে ধরা হল:

◈ ১. সালাতের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশান্ত মনে আগেভাগে মসজিদে আসা।
◈ ২. সালাতে মৃত্যুর কথা স্মরণ করা।
আনাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
اذكرِ الموتَ في صلاتِك، فإنَّ الرجلَ إذا ذَكر الموتَ في صلاتِه لحريٌّ أن يُحسنَ صلاتَه
“সালাতে মৃত্যুর কথা স্মরণ কর। কেননা মানুষ যখন সালাতে মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তখন সে তার সালাতকে সুন্দর ভাবে আদায় করতে সক্ষম হয়। ” [সনদ হাসান, সিলসিলা সহীহাহ/২৮৩৯]
◈ ৩. “আমি আল্লাহকে দেখছি বা তিনি আমাকে দেখছেন” এই অনুভূতি মনে
জাগ্রত রাখা।
◈ ৪. এ কথা স্মরণ করা যে, আল্লাহ তাআলা সালাতে বান্দার প্রতিউত্তর করে থাকেন।
◈ ৫. এ কথা স্মরণ রাখা যে, সালাতে মূলত: আল্লাহর সাথে চুপিসারে কথা বলা হয়।
◈ ৬. সালাতে পঠিত দুআ-তাসবিহ ও সূরা-কিরাতের অর্থ অনুধাবন করা।
◈ ৭. খাবার উপস্থিত রেখে বা পেশাব- পায়খানা চেপে সালাত আদায় না করা। কেননা‌ এতে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়।
◈ ৮. সেজদায় বেশি বেশি আল্লাহর নিকট দুআ করা।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أقربُ مَا يَكونُ العبْدُ مِن ربِّهِ وَهَو ساجدٌ، فَأَكثِرُوا الدُّعاءَ
“বান্দা যখন সেজদায় থাকে তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে সন্নিকটে থাকে। অত:এব তোমরা (সিজদা অবস্থায়) অধিক পরিমাণে দুআ কর।” [সহীহ মুসলিম]
তবে একাকী সালাত, নফল, সুন্নত, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সিজদায় অধিক পরিমাণে দুআ করা ভালো। কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দুয়া সমূহ অধিক হারে পড়ার চেষ্টা করতে হবে।

◈ ৯. হাই আসলে মুখে হাত দিয়ে যথা সম্ভব তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা।
◈ ১০. সিজদার স্থানে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা এবং অন্য দিকে দৃষ্টিপাত না করা।
◈ ১১. ভয়-ভীতি ও ধীর-স্থিরতা সহকারে সালাত আদায় করা।
◈ ১২. শয়তানের উপস্থিতি টের পেলে শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা তথা চুপি স্বরে আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম “বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি” পাঠ করা ও বাম দিকে অতি হালকা ভাবে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করা।
যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
عن عُثْمَانَ بْن أَبِي الْعَاصِ رضي الله عنه أنه أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ حَالَ بَيْنِي وَبَيْنَ صَلَاتِي وَقِرَاءَتِي يَلْبِسُهَا عَلَيَّ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ذَاكَ شَيْطَانٌ يُقَالُ لَهُ خَنْزَبٌ ، فَإِذَا أَحْسَسْتَهُ فَتَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْهُ وَاتْفِلْ عَلَى يَسَارِكَ ثَلَاثًا قَالَ : فَفَعَلْتُ ذَلِكَ فَأَذْهَبَهُ اللَّهُ عَنِّي
উসমান ইবনুল আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসুল, শয়তান আমার সালাত ও কিরাআতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
তিনি বললেন: এটি হল শয়তান। যার নাম খিনযাব। তুমি যদি এমনটি অনুভব কর, তবে “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম পাঠ কর এবং তোমার বাম পাশে তিনবার হালকা ভাবে থুথু নিক্ষেপ কর।”
তিনি বলেন: আমি এমনটি করায় আল্লাহ তাআলা আমার এ সমস্যা দূর করে দিয়েছেন। [সহীহ মুসলিম]
উল্লেখ্য যে, শরীর বা কাঁধ বাম দিকে ঘুরার প্রয়োজন নাই। কেবল মাথাটা সামান্য বাম দিকে নিয়ে খুব হালকা ভাবে থুথু ফেলার মত করবে। (এতে মুখ থেকে পানি নির্গত হবে না।) এমনটি করলে শয়তান লাঞ্ছিত অবস্থায় পলায়ন করবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার। সৌদি আরব।

কুরআনের আয়াত বা সাধারণ আরবি অক্ষর দ্বারা ক্যালিগ্রাফি সংক্রান্ত জরুরি কয়েকটি বিধান

 প্রশ্ন: কুরআনের আয়াত কিংবা আরবি হরফ দ্বারা রাস্তার দেওয়ালে ক্যালিগ্রাফি করার বিধান কী? অনুরূপভাবে ঘর ডেকোরেশনের উদ্দেশ্যে কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি কৃত ফলক বা ক্যালেন্ডার ঝুলানোর বিধান কী?

উত্তর: রাস্তা, মসজিদ বা বাড়ির দেওয়াল, প্রাচীর ইত্যাদির সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্দেশ্যে কুরআনের আয়াত দ্বারা ক্যালিগ্রাফি করা জায়েজ নেই। অনুরূপভাবে ঘর ডেকোরেশনের উদ্দেশ্যে কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি সম্বলিত ফলক ঝুলানোও জায়েজ নয়। সর্বনিম্ন তা অ পছন্দনীয় কাজ। কারণ আল্লাহ তাআলা ঘরবাড়ি বা দেওয়ালের ডেকোরেশন বা শোভা বর্ধনের উদ্দেশ্যে কুরআন নাজিল করেননি। সুতরাং তা কুরআনকে অপাত্রে ব্যবহার করার অন্তর্ভুক্ত।

❑ কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য:

কুরআন হলো, মানবজাতির গাইডবুক ও সংবিধান। মহান আল্লাহ তা নাজিল করেছেন এ জন্য যে, মানুষ কুরআন তিলাওয়াত করবে, কুরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করবে, কুরআন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং তদনুযায়ী আমল করবে। তৎসঙ্গে কুরআনের বিধানাবলীকে মানুষ তাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনীতি ইত্যাদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ ঘটাবে।

এ মর্মে কুরআন-হাদিসে পর্যাপ্ত বক্তব্য এসেছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি আয়াত ও হাদিস পেশ করা হলো:

✪ এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, (হে নবি আপনি বলুন যে),

وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ-‏ وَأَنْ أَتْلُوَ الْقُرْآنَ

“আমি আরও আদিষ্ট হয়েছি যেন আমি মুসলিমদের (আল্লাহর উদ্দেশ্যে আত্মসমর্পণকারীদের) দলভুক্ত হই এবং যেন আমি কুরআন তিলাওয়াত করি।” [সূরা নামল: ৯১-৯২]

✪ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

“আর আপনার নিকট পাঠিয়েছি উপদেশ গ্রন্থ (কুরআন) যেন আপনি মানুষের কাছে সুস্পষ্টভাবে তা বিবৃত করে দেন, যা তাদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ করা হয়েছে। হয়ত এতে তারা চিন্তা-ভাবনা করবে।” [সূরা আনআম: ৪৪]

✪ তিনি আরও বলেন,

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ٱلۡقُرۡءَانَ أَمۡ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقۡفَالُهَآ

“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?” [সূরা মোহাম্মাদ: ২৪]

তিনি আরও বলেন,

‏ وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ

“আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব কোন চিন্তাশীল আছে কি? ” [সূরা কামার: ১৭]

✪ কুরআনের পরিচয় বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدىً لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
‘রমজান মাস; যে মাসে মানুষের পথ নির্দেশনা এবং সঠিক পথের স্পষ্ট নিদর্শন ও (সত্য-মিথ্যার মাঝে) পার্থক্য নিরূপণকারী হিসেবে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।” [সূরা বাকরা: ১৮৫]

✪ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

«تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ ».

“আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি, তোমরা বিভ্রান্ত হবে না যতদিন এ দুটি আঁকড়ে থাকবে। আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর নবির সুন্নাহ (হাদিস)।” [মুয়াত্তা মালিক : ৩৩৩৮]

এ ছাড়া বহু আয়াত ও হাদিসে কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য বিবৃত হয়েছে। তাই আমাদের কর্তব্য, কুরআনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া এবং কুরআনকে অপাত্রে ব্যবহার থেকে বিরত থাকা।

❑ কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা আবশ্যক কেন?

আমাদের অজানা নয় যে, কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি করতে কুরআনের অক্ষরগুলোকে আঁকাবাঁকা করে বিভিন্ন ফন্ট ব্যবহার করে উপর-নিচ করে সাজানো হয়। একটা অক্ষর আরেক অক্ষরের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। তাতে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার করে ডিজাইন করা হয়। ফলে কুরআনের অক্ষরগুলো স্পষ্টভাবে বুঝা যায় না। ফলে মানুষের তা ভুল পড়ার আশঙ্কা থাকে। অথবা আদৌ পড়া সম্ভব হয় না। কারণ এখানে মানুষকে কুরআন শেখানো বা কুরআনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য থাকে না। বরং উদ্দেশ্য থাকে শৈল্পিক ভাবে ঘর বা দেওয়ালের শোভা বর্দ্ধন।

অনেকেই কুরআনের আয়াত দ্বারা ডিজাইন কৃত ক্যালিগ্রাফির ফলক বা ক্যালেন্ডার ঘরে ঝুলিয়ে রাখে অথবা সাধারণভাবে বিশেষ কোনও সূরা বা আয়াত সম্বলিত ফলক ঘরে ঝুলিয়ে রাখে ডেকোরেশনের উদ্দেশ্য নয় বরং বরকতের আশায় বা বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে। কেউ আবার জিন-শয়তানেরে উপদ্রব, জাদু, বদনজর, অসুখ-বিসুখ, চুরি-ডাকাতি, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে। এমন উদ্দেশ্য থাকলে তা হবে জঘন্য বিদআত। কেননা, ঘরে কুরআন-হাদিসে এমন কোনও নির্দেশনা আসেনি। আ সালাফ তথা সাহাবি ও তাদের একনিষ্ঠ অনুসারী তাবেয়ীদের থেকে এমন কোনও বিষয় পাওয়া যায় না।

আবার অনেকে কুরআনের আয়াতকে এমনভাবে ডিজাইন করে যা দেখতে কোনও মানুষ, ঘোড়া, বা বিভিন্ন পশু-পাখির সাদৃশ্য মনে হয়। এমনটি করা আরও বেশি গর্হিত কাজ ও হারাম।
এগুলো সব নিঃসন্দেহে কুরআন নাজিলের উদ্দেশ্য পরিপন্থী কাজ। সুতরাং আল্লাহর কালামকে এহেন কাজে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।

❑ এ বিষয়ে কতিপয় বিজ্ঞ আলেমের ফতোয়া:

◆ হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত আলেম আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রাহ. বিখ্যাত ফতোয়ে শামীতে লিখেছেন,

“وتُكره كتابة القرآن، وأسماء الله تعالى على الدرهم، والمحاريب، والجدران، وما يُفرش، والله تعالى أعلم”

“কুরআনের আয়াত এবং আল্লাহর নামসমূহ দেরহাম, মেহরাব, দেওয়ালে ও আসবাব-পত্রের উপর লেখা মাকরুহ বা অ পছন্দনীয় কাজ। আল্লাহ ভালো জানেন। ” [ফাতাওয়ে শামী: ১/১৭৯]

◆ শাফেয়ী মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম শরফুদ্দিন আন নওয়াবি রাহ. বলেছেন,

مذهبنا أنه يُكره نقش الحيطان والثياب بالقرآن، وبأسماء الله تعالى”

“আমাদের মাজহাব হল, কুরআনের আয়াত বা আল্লাহ তায়ালার নাম দ্বারা দেওয়াল বা কাপড়ের উপর নকশা করা মাকরূহ।” [তিবইয়ান: ৮৯ ও ৯৭]

◆ কুরআনের আয়াত দিয়ে ডেকোরেশন করার বিধান প্রসঙ্গে ইমাম নাসির উদ্দিন আলবানি রাহ. বলেন,

هذا التعليق (الديكورات في البيوت بآيات قرآنية) غير مشروع -أما الذين يصنعونها فهم لا يعملون عمالاً مشروعا ، لأن القرآن ما نزل لتزيين الجدر ، وإنما لتعمير القلوب لما فيها من الحكمة والموعظة الحسنة

“ডেকোরেশন বা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য কুরআনের আয়াত লটকানো শরিয়ত সিদ্ধ নয়। যারা এমন কাজ করে তারা শরিয়ত সম্মত কাজ করে না। কারণ কুরআন দেওয়াল সাজানোর জন্য অবতীর্ণ হয়নি; বরং কুরআনে যে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশ আছে তার মাধ্যমে সুসংহত অন্তর নির্মাণ করার জন্য এসেছে।” [তুরাসুল আলবানী ফিল ফিকহ, ১৭/৭১৬, ফাতাওয়ায়ে আলবানী ৪৩৫, al-fatawa]

❑ কুরআন ও আল্লাহর নাম ছাড়া কেবল আরবি অক্ষর বা আরবি সাধারণ আরবি বাক্য দ্বারা ক্যালিগ্রাফি:

কুরআনের আয়াত ছাড়া সাধারণ আরবি অক্ষর, আরবি কবিতা, প্রবাদ বাক্য, কারো উক্তি, এমনকি হাদিস দ্বারা ক্যালিগ্রাফি করতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু সতর্ক হতে হবে, হাদিস বা আল্লাহ-রসুলের নাম সম্বলিত কোন বাক্য এমন স্থানে ক্যালিগ্রাফি করা জায়েজ নেই যেখানে তাদের সম্মানহানি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রাস্তাঘাটে করা হলে, তা নানাভাবে সম্মানহানি ঘটে।
পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে, অন্যের ঘরের দেওয়ালে এসব ক্যালিগ্রাফি করতে হলে মালিকের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অনুমতি ছাড়া করা বৈধ নয়।

➤ উল্লেখ্য যে, কুরআনে বিশেষ কোনও আয়াত বা হাদিস যদি বৈঠকখানা, ঘর, অফিস, ব্যাংক, সম্মানহানি ঘটবে না এমন নিরাপদ স্থানে দেওয়ালে স্পষ্টভাবে লেখা হয় মানুষের কাছে কুরআন-হাদিসের মর্মবাণীকে পৌঁছিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই। অনুরূপ বাড়িতে বাচ্চাদেরকে শেখানোর উদ্দেশ্য থাকে তাহলে তাতেও কোনও সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate