Sunday, July 9, 2023

কুরবানি দাতার জন্য ঈদের দিন কোন কিছু না খেয়ে ঈদের মাঠে যাওয়া তারপর সর্বপ্রথম কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত

 প্রশ্ন: কুরবানির দিন কুরবানির পশু জবাই করার আগ পর্যন্ত না খেয়ে থাকার কি কোনো নিয়ম আছে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: কুরবানি দাতার জন্য কুরবানির দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কোন কিছু না খাওয়া সুন্নত। বরং ঈদের সালাত শেষে খাওয়া উত্তম। বিশেষ করে যদি ঈদের সালাত শেষে কুরবানির গোশত খাওয়া হয় তাহলে তা অধিক উত্তম।

– হাদিসে এসেছে, বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত,
كان النبي صلى الله عليه وسلم لا يخرج يوم الفطر حتى يأكل، ولا يأكل يوم الأضحى حتى يرجع فيأكل من أضحيته
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিনে না খেয়ে বের হতেন না আর ঈদুল আজহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে খেতেন না। সালাত থেকে ফিরে এসে কুরবানির গোশত খেতেন।” [শাইখ আলবানী রচিত, সহীহ ইবনে মাজাহ]

– অন্য বর্ণনায় এসেছে, বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ النَّبِيُّ صلَّى الله عليه وسلَّم لَا يَخْرُجُ يَوْمَ الفِطْرِ حَتَّى يَطْعَمَ، وَلَا يَطْعَمُ يَوْمَ الأَضْحَى حَتَّى يُصَلِّيَ

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে বের হতে না। আর ঈদুল আজহার দিন খেতেন না সালাত শেষ করার আগে।” [সহিহ মিশকাতুল মাসাবিহ,‌ হা/১৪৪০]

– অন্য বর্ণনায় এসেছে,
وَكَانَ لَا يَأْكُلُ يَوْمَ النَّحْرِ حَتَّى يَرْجِعَ
“তিনি কোন কিছু খেতেন না (ঈদগাহ থেকে) থেকে ফিরে আসার পূর্বে।” [সহিহ ইবনে মাজাহ]

🔷 “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম কুরবানির কলিজা খেতেন” মর্মে বর্ণিত হাদিসটি সহিহ নয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের মাঠ থেকে ফিরে এসে সর্বপ্রথম কুরবানির কলিজা খেতেন-মর্মে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে তা সনদগতভাবে দুর্বল। যেমনটি শাইখ আলবানি সহ অনেক মুহাদ্দিস বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।
وَكَانَ إِذَا رَجَعَ أَكَلَ مِنْ كَبِدِ أُضْحِيَتِهِ
ضعَّف الألبانيُّ هذه الزيادةَ كما في «سُبُل السلام» بتعليقاته عليه (٢/ ٢٠٠) حيث قال: «هذه الزيادةُ ضعيفةٌ؛ لأنها مِنْ رواية عقبة بنِ الأصمِّ عن ابنِ بريدة؛ وهو عقبة بنُ عبد الله الأصمِّ: ضعيفٌ، كما في «التقريب»».

🔷 ঈদের মাঠ থেকে ফিরে আসার পর কুরবানি গোশত খাওয়ার হেকমত কী?

বিজ্ঞ আলেমগণ বলেন, এর একটি কারণ হতে পারে, গরিব-অসহায় মানুষের সাথে একাত্মতা প্রকাশ। কারণ অনেক গরিব মানুষের বাড়িতে কোন খাবার থাকে না। অতঃপর ঈদের সালাতের পরে মানুষ তাদেরকে কিছু কুরবানির গোশত দান করলে তারা সেখান থেকে খেতে পারে। পক্ষান্তরে ঈদুল ফিতরের বিষয়টি ভিন্ন। ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের আগেই তারা জাকাতুল ফিতর হিসেবে প্রাপ্ত খাদ্যদ্রব্য থেকে খাবার গ্রহণ করতে পারত। অথবা এর কারণ, আল্লাহ তাআলা যেহেতু কুরবানি করার তৌফিক দান করেছেন তার শুকরিয়া হিসেবে এবং আল্লাহ কুরবানির গোশত খাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তিনি সর্বপ্রথম কুরবানির গোশত খেতেন। যেমন: আল্লাহ বলেন,
فَكُلُواْ مِنۡهَا وَأَطۡعِمُواْ ٱلۡبَآئِسَ ٱلۡفَقِيرَ
“অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও।” [সূরা হজ ২৮] (আল্লামা ফারকুশ এর রচনা থেকে)

🔸প্রশ্ন: যে কুরবানি দিবে তার জন্য নাকি পরিবারের সবার জন্য এটা সুন্নত?
🔸উত্তর: যে ব্যক্তি কুরবানি করবে তার জন্য এই বিধান প্রযোজ্য। হাদিসের ভাষা থেকে এটাই স্পষ্ট হয়।

সুতরাং যে ব্যক্তি কুরবানি করবে না সে ঈদের পূর্বে খেতে পারে। ইমাম যাইলাঈ তাবঈনুল হাকায়েক গ্রন্থে, আল্লামা মোবারক পূরী তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে এবং আরও একদল আলেম হাদিসের আলোকে উপরোক্ত মত ব্যক্ত করেছেন।)
তাদের বক্তব্যগুলো নিম্নরূপ:
قال الزيلعي في تبيين الحقائق: هذا في حق من يضحي ليأكل من أضحيته، أما في حق غيره فلا..
وفي تحفة الأحوذي: وقد خصص أحمد بن حنبل استحباب تأخير الأكل في عيد الأضحى

وقال في كشاف القناع: وكان لا يأكل يوم النحر حتى يرجع، فيأكل من أضحيته، وإذا لم يكن له ذبح لم يبال أن يأكل
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।প্রশ্ন: কুরবানির দিন কুরবানির পশু জবাই করার আগ পর্যন্ত না খেয়ে থাকার কি কোনো নিয়ম আছে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: কুরবানি দাতার জন্য কুরবানির দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কোন কিছু না খাওয়া সুন্নত। বরং ঈদের সালাত শেষে খাওয়া উত্তম। বিশেষ করে যদি ঈদের সালাত শেষে কুরবানির গোশত খাওয়া হয় তাহলে তা অধিক উত্তম।

– হাদিসে এসেছে, বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত,
كان النبي صلى الله عليه وسلم لا يخرج يوم الفطر حتى يأكل، ولا يأكل يوم الأضحى حتى يرجع فيأكل من أضحيته
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিনে না খেয়ে বের হতেন না আর ঈদুল আজহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে খেতেন না। সালাত থেকে ফিরে এসে কুরবানির গোশত খেতেন।” [শাইখ আলবানী রচিত, সহীহ ইবনে মাজাহ]

– অন্য বর্ণনায় এসেছে, বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«كَانَ النَّبِيُّ صلَّى الله عليه وسلَّم لَا يَخْرُجُ يَوْمَ الفِطْرِ حَتَّى يَطْعَمَ، وَلَا يَطْعَمُ يَوْمَ الأَضْحَى حَتَّى يُصَلِّيَ

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন না খেয়ে বের হতে না। আর ঈদুল আজহার দিন খেতেন না সালাত শেষ করার আগে।” [সহিহ মিশকাতুল মাসাবিহ,‌ হা/১৪৪০]

– অন্য বর্ণনায় এসেছে,
وَكَانَ لَا يَأْكُلُ يَوْمَ النَّحْرِ حَتَّى يَرْجِعَ
“তিনি কোন কিছু খেতেন না (ঈদগাহ থেকে) থেকে ফিরে আসার পূর্বে।” [সহিহ ইবনে মাজাহ]

🔷 “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম কুরবানির কলিজা খেতেন” মর্মে বর্ণিত হাদিসটি সহিহ নয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের মাঠ থেকে ফিরে এসে সর্বপ্রথম কুরবানির কলিজা খেতেন-মর্মে যে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে তা সনদগতভাবে দুর্বল। যেমনটি শাইখ আলবানি সহ অনেক মুহাদ্দিস বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।
وَكَانَ إِذَا رَجَعَ أَكَلَ مِنْ كَبِدِ أُضْحِيَتِهِ
ضعَّف الألبانيُّ هذه الزيادةَ كما في «سُبُل السلام» بتعليقاته عليه (٢/ ٢٠٠) حيث قال: «هذه الزيادةُ ضعيفةٌ؛ لأنها مِنْ رواية عقبة بنِ الأصمِّ عن ابنِ بريدة؛ وهو عقبة بنُ عبد الله الأصمِّ: ضعيفٌ، كما في «التقريب»».

🔷 ঈদের মাঠ থেকে ফিরে আসার পর কুরবানি গোশত খাওয়ার হেকমত কী?

বিজ্ঞ আলেমগণ বলেন, এর একটি কারণ হতে পারে, গরিব-অসহায় মানুষের সাথে একাত্মতা প্রকাশ। কারণ অনেক গরিব মানুষের বাড়িতে কোন খাবার থাকে না। অতঃপর ঈদের সালাতের পরে মানুষ তাদেরকে কিছু কুরবানির গোশত দান করলে তারা সেখান থেকে খেতে পারে। পক্ষান্তরে ঈদুল ফিতরের বিষয়টি ভিন্ন। ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের আগেই তারা জাকাতুল ফিতর হিসেবে প্রাপ্ত খাদ্যদ্রব্য থেকে খাবার গ্রহণ করতে পারত। অথবা এর কারণ, আল্লাহ তাআলা যেহেতু কুরবানি করার তৌফিক দান করেছেন তার শুকরিয়া হিসেবে এবং আল্লাহ কুরবানির গোশত খাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তিনি সর্বপ্রথম কুরবানির গোশত খেতেন। যেমন: আল্লাহ বলেন,
فَكُلُواْ مِنۡهَا وَأَطۡعِمُواْ ٱلۡبَآئِسَ ٱلۡفَقِيرَ
“অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও।” [সূরা হজ ২৮] (আল্লামা ফারকুশ এর রচনা থেকে)

🔸প্রশ্ন: যে কুরবানি দিবে তার জন্য নাকি পরিবারের সবার জন্য এটা সুন্নত?
🔸উত্তর: যে ব্যক্তি কুরবানি করবে তার জন্য এই বিধান প্রযোজ্য। হাদিসের ভাষা থেকে এটাই স্পষ্ট হয়।

সুতরাং যে ব্যক্তি কুরবানি করবে না সে ঈদের পূর্বে খেতে পারে। ইমাম যাইলাঈ তাবঈনুল হাকায়েক গ্রন্থে, আল্লামা মোবারক পূরী তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে এবং আরও একদল আলেম হাদিসের আলোকে উপরোক্ত মত ব্যক্ত করেছেন।)
তাদের বক্তব্যগুলো নিম্নরূপ:
قال الزيلعي في تبيين الحقائق: هذا في حق من يضحي ليأكل من أضحيته، أما في حق غيره فلا..
وفي تحفة الأحوذي: وقد خصص أحمد بن حنبل استحباب تأخير الأكل في عيد الأضحى

وقال في كشاف القناع: وكان لا يأكل يوم النحر حتى يرجع، فيأكل من أضحيته، وإذا لم يكن له ذبح لم يبال أن يأكل
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ঈদের রাতের ফজিলত এবং এই রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার বিধান

 প্রশ্ন: ঈদের রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার ব্যাপারে ইসলামে কী দিকনির্দেশনা রয়েছে বা এ রাতের ফজিলত কী?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ঈদ মানেই প্রাণে প্রাণে আনন্দের হিল্লোল। ঈদ মানেই ঘরে ঘরে খুশির আমেজ। ঈদের আগমনে মুমিন হৃদয়গুলো আনন্দে উদ্বেলিত হয়। ঈমানদারগণ আল্লাহর প্রতি প্রফুল্ল চিত্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তাকবির ধ্বনির মাধ্যমে তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের ঘোষণা দেয়। বিশেষ করে ঈদের রাত থেকেই শুরু হয় আগামীকাল একটি সুন্দর সকালে ঈদকে বরণ করার প্রস্তুতি। কিন্তু ঈদের রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার ব্যাপারে কোন হাদিস বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। বরং এই রাতে বিশেষভাবে কিয়ামুল লাইল করা সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসকে অনেক আলেম বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলেছেন। অনুরূপভাবে দুই ঈদের রাতে দুআ কবুল হওয়া প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসটিও বানোয়াট।

তাই এ রাতে তাকবির পাঠ ছাড়া বিশেষ কোনও নামাজ, ইবাদত-বন্দেগি বা অন্য কোনও আমল নেই। তবে যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত তারা যথারীতি তা পড়তে পারে।

শাইখ উসাইমিন রহ. বলেন, “দু ঈদের রাত জেগে ইবাদত করার ফজিলতের হাদিসগুলো জঈফ (দুর্বল)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো এ দু রাত জেগে ইবাদত করতেন না। তিনি সারা রাত জেগে ইবাদত করেছেন কেবল রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর (শবে কদর) পাওয়ার আশায়। যখনই শেষ দশক শুরু হত, তিনি সবগুলো রাত জেগে ইবাদত করতেন।”

◍ ঈদের রাতের ফজিলতে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ জাল/জঈফ বর্ণনা:

ঈদের রাত জেগে ইবাদতের ব্যাপারে যেসব হাদিস পেশ করা হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল,
مَنْ قَامَ لَيْلَتَيْ الْعِيدَيْنِ مُحْتَسِبًا لِلَّهِ لَمْ يَمُتْ قَلْبُهُ يَوْمَ تَمُوتُ الْقُلُوبُ
“যে ব্যক্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দু ঈদের রাত জেগে ইবাদত করবে তার হৃদয় মারা যাবে না যেদিন সব হৃদয় মারা যাবে।” [ইবনে মাজাহ, হা/১৭৮২]

এ হাদিসটি সহিহ নয়।

● নওবী রহ. এ হাদিসটিকে মারফু ও মাওকুফ উভয় সূত্রে জইফ বলেছেন।

● হাফেজ ইরাকি, ইবনে হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিসগণও এটিকে জইফ বলেছেন।
وقال الحافظ ابن حجر : هذا حديث غريب مضطرب الإِسناد . انظر : “الفتوحات الربانية” (4/235) .
● আলবানি এটিকে মাউযু (বানোয়াট) হাদিস বলে আখ্যায়িত করেছেন। [জইফ ইবনে মাজাহ]

◈ শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ. বলেন,
” الأَحَادِيثُ الَّتِي تُذْكَرُ فِي لَيْلَةِ الْعِيدَيْنِ كَذِبٌ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم” انتهى .
“দু ঈদের রাতের ব্যাপারে যে সব হাদিস পেশ করা সেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর মিথ্যাচার।”

মোটকথা, দু ঈদে সারা রাত জেগে বিশেষ কোনও সালাত, জিকির-আজকার, মিলাদ, করব জিয়ারত ইত্যাদি করার ব্যাপার শরিয়তে বিশুদ্ধ সূত্রে কোনও নির্দেশনা আসে নি। তবে অন্যান্য সময় যেমন ইবাদত-বন্দেগি, দুআ-জিকির, কবর জিয়ারত, কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ সালাত আদায় ইত্যাদি করা জায়েজ তেমনি এ দু রাতেও সেগুলো জায়েজ। কিন্তু তা এ রাতের বিশেষ ফজিলত মনে করে করা শরিয়ত সম্মত নয়। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

বাড়ির বাইরে বোরকা পরলেও বাড়িতে মাহরাম-নন মাহরাম মেইনটেইন করা এবং পর্দা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না এখন কী করণীয়

 প্রশ্ন: দ্বীনের বুঝ আসার পর থেকেই পর্দা করি আলহামদুলিল্লাহ।‌ তবে আমি বাড়িতে কোনভাবেই নন মাহরাম মেইনটেই করতে পারছি না।‌ আব্বু বা পরিবারের অন্য সদস্যরা পর্দার ব্যাপারে অতটা গুরুত্ব দেয় না। তারা বাইরে বোরকা পরে বের হওয়াকেই পরিপূর্ণ পর্দা মনে করে। তবে আমি চেষ্টা করি, মাহরাম-নন মাহরাম মেইনটেইন করার। কিন্তু বাড়িতে চাচাতো, ফুফাতো,‌ দুলাভাইদের প্রায়ই যাতায়াত করার কারণে কোনো মতেই তা সম্ভব হচ্ছে না। আমার প্রশ্ন হলো, আমি বাড়িতে নন মাহরাম মেইনটেইন না করতে পারলেও কোথাও বেড়াতে গিয়ে কি তা করতে পারব? যদি কোনো নন মাহরাম আমাকে দেখতে চায়, তাহলে তার সামনে যাওয়া কি আমার জায়েজ হবে যদিও আমি বাড়িতে নন মাহরাম মেইন টেইন করতে পারছি না?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: আপনি আল্লাহর দ্বীনের জ্ঞান পেয়ে তা পালন করছেন এই জন্য আপনাকে অভিনন্দন। দুআ করি, তিনি যেন আপনাকে মৃত্যু অবধি দ্বীনকে বুকে ধারণ করে জীবন পরিচালনা করার তওফিক দান করেন। আমিন।
অতঃপর ইসলামে মাহরাম-নন মাহরাম-এর মাঝে সম্পর্কের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষ নারী সকলের ক্ষেত্রে ঘরে-বাইরে সর্বত্র এই বিধান মেনে চলা ফরজ।

একজন নারীর জন্য তার পিতা, ভাই, ভাতিজা (ভাইয়ের ছেলে), ভাগিনা (বোনের ছেলে), দাদা, চাচা, মামা, নিজের শশুর, দাদা শ্বশুর, নানা শ্বশুর প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ মাহারম (যাদের সাথে চিরতরে বিবাহ নিষিদ্ধ)।‌ সুতরাং তাদের সাথে পর্দা করা আবশ্যক নয়। কিন্তু সর্বাবস্থায় তাদের সামনেও পোশাক-আশাক ও চলাফেরায় শালীনতা বজায় রাখা অপরিহার্য।

অপরপক্ষে, চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো ও খালাতো ভাই, দুলাভাই বা ভগ্নিপতি, দেবর, ভাসুর এবং তাদের ছেলেগণ ইত্যাদি সবাই নন মাহরাম‌ (যাদের সাথে বিয়ে বৈধ)। তাদের সামনে পরিপূর্ণ পর্দা করা ফরজ। অর্থাৎ তাদের সামনে মুখমণ্ডল এবং দুই হাতের কব্জি সহ পূর্ণাঙ্গ শরীর পর্দাবৃত করতে হবে। তাদের কারো সাথে নির্জনতা অবলম্বন করা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তাদের কারো শরীর স্পর্শ করা, তাদের সামনে বেপর্দা হওয়া, তাদের সাথে হাসি-মজাক ও খোশ গল্প করা, নিষ্প্রয়োজনীয় চ্যাটিং, অডিও-ভিডিও কল ইত্যাদি জায়েজ নেই। এগুলো উভয়ের জন্য ফিতনা এবং গুনাহের কারণ। তবে একান্ত দরকারে পর্দা সহকারে নন মাহরাম ব্যক্তির সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলা জায়েজ আছে।‌ কিন্তু কথা বলার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে নারী সুলভ কোমল কন্ঠ পরিহার করতে হবে। (এ বিষয়ে সূরা আহযাব-এর ৩২ নাম্বার আয়াতের তাফসির পড়ুন)। প্রয়োজন বোধে পর্দা সহকারে তাদের সামনেও যাওয়া যাবে। তবে নির্জনতা অবলম্বন করা যাবে না এবং যেন কোন ধরনের ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এই বিষয়গুলো বাড়ির বাইরে যেমন মেনে চলা আবশ্যক তেমনি বাড়িতে থাকা অবস্থাতেও আবশ্যক।‌ এ ক্ষেত্রে ঢিল দেওয়ার কোন সুযোগ নেই।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক মেয়ে আছে, যারা বাড়ির বাইরে বোরকা পরিধান করে কিন্তু বাড়িতে থাকা অবস্থায় পর্দার প্রয়োজন অনুভব করে না অথবা মাহরাম নন-মাহরাম মেনটেইন করে না। এটি মারাত্মক ভুল। বরং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সর্বত্রই তাকে পর্দার বিধান মেনে চলতে হবে। এতে আল্লাহ তাকে আখিরাতে মহাপুরষ্কারে ভূষিত করবেন ইনশাআল্লাহ।

বাড়িতে থাকা অবস্থায় পরিবারের সদস্যগণ যদি পর্দা করার ক্ষেত্রে সাহায্য না করে তারপরেও নিজে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে পর্দা রক্ষা করার। যে আল্লাহকে ভয় করে অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। অতএব বাড়ির বাইরে যেভাবে পর্দা এবং মাহরাম-নন‌ মাহরাম মেনটেইন করেন ঠিক একইভাবে বাড়িতে থাকা অবস্থাতেও তা করার চেষ্টা করবেন। কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। সম্ভব হলে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদেরকে পর্দা করা এবং মাহরাম-নন মাহরামের বিষয়ে মহান আল্লাহর বিধানগুলো বোঝানোর চেষ্টা করবেন পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দুআ করবেন, তিনি যেন ইসলামের বিধানগুলো সঠিকভাবে মেনে চলতে সাহায্য করেন এবং সব ধরনের ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে হেফাজত করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকওয়াবান, সত্যবাদী ও একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে সাহায্য করে থাকেন। আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

জুমার দিন বিয়ে করা কি সুন্নত

 প্রশ্ন: জুমার দিন বিয়ে করা কি সুন্নত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: নিঃসন্দেহে জুমার দিন একটি অত্যন্ত বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ দিন কিন্তু এই দিন বিয়ে করা সুন্নত হওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন মৌখিক বা কর্মগত সুন্নত প্রমাণিত নয়। সাহাবিদের থেকেও এমন কোন মতামত বা আমল সাব্যস্ত হয়নি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক বিয়ে করেছেন কিন্তু তিনি কখনো নির্দিষ্টভাবে জুমার দিনের জন্য অপেক্ষা করেননি। সাহাবিগণও কখনো এমন করেছেন বলেও প্রমাণিত নয়। সুতরাং একজন মানুষ তার সুবিধা অনুযায়ী বছরের যে কোন মাস, যে কোন দিন, যেকোনো সময় বিয়ে করতে পারে। বিশেষভাবে জুমার দিনে বিয়ে করাকে সুন্নত বলার সুযোগ নেই।

🔹কতিপয় আলেম জুমার দিন বিয়ে করাকে মুস্তাহাব বলেছেন-এ বিষয়ে বিশ্লেষণ:

পূর্ববর্তী কতিপয় আলেম তাদের ইজতিহাদের ভিত্তিতে জুমার দিন বিয়ে করাকে মুস্তাহাব (উত্তম) বলেছেন; সুন্নত নয়। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে, বিশিষ্ট রাবী (হাদিস বর্ণনাকারী) যমরা বিন হাবিব, (মৃত্যু ১২০ হিজরি), রাশেদ বিন‌ সাদ (মৃত্যু: ১০৮ বা ১১৩) এবং হাবিব বিন উতবা থেকে। এর উপরে ভিত্তি করে কতিপয় ফকিহও তা মুস্তাহাব বলেছেন। যেমন: বিশিষ্ট হাম্বলি ফকিহ ইবনে কুদামা বলেন,
يستحب عقد النكاح يوم الجمعة
“জুমার দিন বিয়ের আকদ করা মুস্তাহাব।” [আল মুগনি, ৭/৬৪] এছাড়াও অন্যান্য কিছু ফকিহ-এর অভিমত পাওয়া যায়।

তাদের মতে জুমার দিন বিয়ে করা উত্তম হওয়ার কারণ হলো, এটি একটি বরকত ময় দিন‌। সুতরাং এই দিনে বিয়ে হলে বরকতের আশা করা যায়।

এই দিক বিবেচনায় তারা এটিকে মুস্তাহাব (উত্তম) বলেছেন।‌ কিন্তু তারা কেউই সুন্নত বলেননি। কারণ এটি সুন্নত হওয়ার পক্ষে কোন দলিল নেই।

▪️জুমার দিন সন্ধ্যার সময় বিয়ের আকদ করার ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসটি প্রমাণিত নয়:

যারা জুমার দিনের কথা বলেছেন তারা জুমার দিনের শেষাংশে তা মুস্তাহাব হওয়ার কথা বলেছেন। কারণ জুমার দিনের শেষাংশ দুআ কবুলের সময়।‌ এ বিষয়ে তারা একটি মারফু হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেছেন। হাদিসটি হলো, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أَمْسُوا بِالْأَمْلَاكِ، فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْبَرَكَةِ
“তোমরা সন্ধ্যার সময় বিয়ের আকদ কর। কারণ এটি অধিক বরকতের সময়।” [হাম্বলি মাজহাবের বিখ্যাত ফকিহ আবু হাফস আল আবকারি (মৃত্যু ৪১৭ হিজরি) এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন]

– এই হাদিসের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি বলেন,
لم أقف على إسناده -، وعليه فلا يقال باستحبابه يوم الجمعة ولا بتخصيصه في مسائها لعدم ثبوت الحديث. ا. هـ
“এই হাদিসের কোন সনদ খুঁজে পাইনি। অতএব হাদিসটি প্রমাণিত না হওয়ায় জুমার দিন বিয়ে করা মুস্তাহাব বলা যাবে না এবং এই জন্য জুমার দিন সন্ধ্যাকেও নির্দিষ্ট করা যাবে না।” [ইরওয়াউল গালিল, হা/১৮২০]

🔹 এই প্রসঙ্গে বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রহ. বলেন,

” لا أعلم في هذا سنة، وقد علَّلوا ذلك بأن يوم الجمعة آخره فيه ساعة الإجابة، فيرجى إجابة الدعاء الذي يكون عادة بين الزوج ومن يبرِّكون عليه، بارك الله لك وعليك.
ولكن يقال: هل النبي ـ عليه الصلاة والسلام ـ من هديه وسنته أنه يتحرى هذا الوقت ؟
إذا ثبت هذا فالقول بالاستحباب ظاهر، وأما إذا لم يثبت فلا ينبغي أن تُسن سنة، ولهذا كان النبي صلّى الله عليه وسلّم يزوج في أي وقت، ويتزوج في أي وقت، ولم يثبت أنه اختار شيئاً معيناً.
نعم لو صادف هذا الوقت لقلنا: هذا ـ إن شاء الله ـ مصادفة طيبة، وأما تقصُّد هذا الوقت ففيه نظر، حتى يقوم دليل على ذلك

“এই বিষয়ে (জুমার দিন বিয়ে করা) কোনো সুন্নত সম্পর্কে জানি না। (যারা তা মুস্তাহাব বলেছেন) তারা এর কারণ বলেছেন যে, জুমার দিনের শেষাংশে দুআ কবুলের সম্ভাবনাময় একটি সময় রয়েছে। আর সাধারণত লোকজন যখন “বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া আলাইকা” (بارك الله لك وعليك) পড়ে নব দম্পতির জন্য বরকতের দুআ করবে তখন তা কবুলের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর উত্তরে বলা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে এই সময়টা অনুসন্ধান করার জন্য কি কোন দিক-নির্দেশনা বা সুন্নত রয়েছে? যদি তা প্রমাণিত হয় তাহলে মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টি‌ সুস্পষ্ট। ‌কিন্তু যেহেতু তা প্রমাণিত নয়‌ সেহেতু এটিকে সুন্নত হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
তাইতো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সুবিধাজনক) যেকোনো সময়ে অন্যদেরকে বিয়ে দিতেন এবং নিজেও বিয়ে করতেন। তিনি নির্দিষ্ট কোন সময় নির্বাচন করেছেন তা প্রমাণিত নয়। হ্যাঁ, ঘটনা চক্রে যদি শুক্রবারে বিয়ের তারিখ নির্ধারিত হয়ে যায় তাহলে আমরা বলবো, ইনশাআল্লাহ এটি ভালো। কিন্তু এই দিনকে উদ্দেশ্য করে বিয়ে করার বিষয়টি প্রশ্নবোধক যতক্ষণ না এ ব্যাপারে দলিল পাওয়া যাবে।” [Islamqa]।
মোটকথা, শুক্রবারে বিয়ে করা সুন্নত হওয়া ব্যাপারে কোন দলিল নেই। তাই এটিকে সুন্নাত বলা যাবে না। বরং বর ও কনে উভয় পক্ষের আলোচনা সাপেক্ষে তাদের জন্য সুবিধা জনক যেকোনো দিন যেকোনো সময় বিয়ের আয়োজন করা যেতে পারে। শরিয়তে নির্দিষ্ট কোন মাস, দিন বা ক্ষণে বিয়ের জন্য উৎসাহ প্রদান করা হয়নি বা তাতে বিয়ে করাকে বিশেষ মর্যাদার কথা বলা হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবির থেকেও এমন কিছু প্রমাণিত নয়। তবে ঘটনাচক্রে যদি তা জুমার দিন হয় তাহলে তা অবশ্যই ভালো।
الله اعلم
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

বেনামাজি কি কাফের এবং তার কুরবানি কি বাতিল

 বিংশ শতকের অন্যতম যুগশ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.-এর ফতোয়া এবং তার ব্যাখ্যা:

বেনামাজির কুরবানি প্রসঙ্গে শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. বলেন,
فإذا أراد تارك الصلاة أن يضحي فعليه أن يتوب إلى الله أولاً من تركه الصلاة ، فإن لم يفعل وأصر على ما هو عليه ، فإنه لا يثاب على تلك الأضحية ، ولا تقبل منه ، وإذا تولى ذبحها بنفسه فهي ميتة ، لا يجوز الأكل منها ، لأن ذبيحة المرتد ميتة حرام

“অতএব যদি সালাত পরিত্যাগকারী কুরবানি করার ইচ্ছা পোষণ করে তাহলে তার উচিত হলো, সালাত পরিত্যাগ করার জন্য প্রথমত আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা করা। যদি সে তওবা না করে এবং তার উপরেই সে অটল থাকে অর্থাৎ সালাত আদায় না করে তাহলে তার ওই কুরবানিতে নেকি হবে না এবং কুরবানি কবুলও হবে না। যদি সে সালাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেই জবাই করে তাহলে তা হবে মৃত প্রাণির ন্যায়। আর মৃত প্রাণি খাওয়া হালাল নয়। কারণ মুরতাদ (ইসলাম থেকে বিচ্যুত) কর্তৃক জবাই করা গোশত খাওয়া হারাম।” [সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক রেডিও প্রোগ্রাম ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ৩২/১২৪]।

শাইখের সালাত পরিত্যাগ করার বিধান এবং তার কুরবানি বাতিল হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া অনেকেই ভুল বুঝেছেন। যার কারনে তারা শাইখের ফতোয়া উল্লেখ পূর্বক তার সঠিক ব্যাখ্যা ছাড়াই সালাত পরিত্যাগকারীকে কাফের-মুরতাদ এবং তার কুরবানি বাতিল বলে ফতোয়া দিচ্ছেন!

তাহলে আসুন, শাইখের ফতোয়ার সঠিক ব্যাখ্যা জানা যাক।

শাইখের এ ফতোয়াটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। তা হল, কুরবানি বাতিল হওয়া-না হওয়া নির্ভর করছে সালাত পরিত্যাগকারীর হুকুমের উপর যে, সে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত কাফির-মুরতাদ কি না। যদি সে কাফের-মুরতাদ হয় তাহলে তার কুরবানি বাতিল।‌ আর কাফের-মুরতাদ না হলে বাতিল নয়।

মূলত তিনি ঐ সালাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বলেছেন যে মোটেও সালাত পড়ে না। অর্থাৎ শাইখের মতে পরিপূর্ণভাবে সালাত পরিত্যাগকারী কাফের। সুতরাং এমন ব্যক্তি যদি কুরবানি দেয় তাহলে তার কুরবানি বাতিল‌ বলে গণ্য হবে এবং তার জবাই করা প্রাণির গোশত খাওয়াও জায়েজ নেই। কেননা সে মুসলিম নয়।
কিন্তু যে যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত আদায় করে আর মাঝেমধ্যে ছাড়ে তাকে তিনি কাফের বলেননি বরং ফাসেক (পাপিষ্ঠ) ও কবিরা গুনাহকারী বলেছেন। আর ফাসেক (পাপিষ্ঠ) ও কাবিরা গুনাহকারী ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের-মুরতাদ নয়। এটাই শাইখের ফতোয়ার সঠিক ব্যাখ্যা। সুতরাং তার জবাই কৃত পশুর গোশত খাওয়াকে হারাম বলা যাবে না।

প্রকৃতপক্ষে এটাই অধিক নির্ভরযোগ্য ও মধ্যমপন্থী অবস্থান।

▪️যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত পরিত্যাগ করে তার ব্যাপারে শাইখের ফতোয়া নিম্নরূপ:
الذي يظهر لي أنه لا يكفر إلا بالترك المطلق بحيث لا يصلي أبداً ، وأما من يصلي أحيانا فإنه لا يكفر لقول الرسول صلى الله عليه وسلم : ( بين الرجل وبين الشرك والكفر ترك الصلاة ) ولم يقل ترك صلاة ، بل قال : ” ترك الصلاة ” ، وهذا يقتضي أن يكون الترك المطلق ، وكذلك قال : ( العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها ـ أي الصلاة ـ فقد كفر ) ، وبناء على هذا نقول : إن الذي يصلي أحيانا ويدع أحيانا ليس بكافر ” انتهى من “مجموع فتاوى ابن عثيمين ” ( 12 / 55 )
“আমার নিকট যেটা স্পষ্ট হয় তা হলো,‌ যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে সালাত পরিত্যাগ করে অর্থাৎ কখনোই সালাত আদায় করে‌ না কেবল তাকেই কাফের বলা যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত পড়ে তাকে কাফের বলা যাবে না। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‏ إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ
“বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত পরিত্যাগ করা।” তিনি বলেননি যে, “এক ওয়াক্ত সালাত পরিত্যাগ করা করা” বরং বলেছেন, “সালাত পরিত্যাগ করা।” এ শব্দ প্রয়োগের দাবী হলো, পরিপূর্ণভাবে সালাত ত্যাগ করা। অনুরূপভাবে তিনি বলেছেন,
«العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها فقد كفر»
“আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে যে পার্থক্য হলো সালাত। অতএব, যে তা পরিত্যাগ করবে সে কুফুরি করবে।” এর উপর ভিত্তি করে আমরা বলব, যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত আদায় করে আর মাঝেমধ্যে ছাড়ে সে কাফের (ইসলাম থেকে পরিপূর্ণ বহিষ্কৃত কাফের-মুরতাদ) নয়।” [মাজমু ফাতাওয়া উসাইমিন ১২/৫৫]।

▪️তাকে আরো প্রশ্ন করা হয় যে, যে ব্যক্তি ফজর সালাতকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত করে তাকে কি কাফের হিসেবে গণ্য করা যাবে?

তিনি উত্তরে বলেন,
هذا لا يكفر لأنه لم يترك الصلاة لكن تهاون بها ولا يحل له أن يفعل ذلك
“তাকে কাফের বলা যাবে না। কারণ সে সালাত পরিত্যাগ করেনি। বরং সালাতে অবহেলা করেছে। এমনটি করা তার জন্য বৈধ নয়।” [ফাতাওয়া উসাইমিন ১২/৩১]

▪️অন্যত্র তিনি সালাত পরিত্যাগ কারী কাফের কিনা এ বিষয়ে দলিল ভিত্তিক আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,
الأصل بقاء الإسلام ، فلا نخرجه منه إلا بيقين ؛ لأن ما ثبت بيقين لا يرتفع إلا بيقين ” انتهى من ” الشرح الممتع لابن عثيمين ” ( 2 / 27 – 28 ) .
“মূল হচ্ছে ইসলাম অবশিষ্ট থাকা। আমরা সুনিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া তাকে ইসলাম থেকে বের করব না। কেননা যা সুনিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে সুনিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া তা উঠবে না।” [শারহুল মুমতাজ ২/২৭-২৮]।

উল্লেখ্য যে, শাইখ আলবানি রাহ. যে সব হাদিসে সালাত পরিত্যাগ করাকে কুফরি বলা হয়েছে সেগুলোকে কর্মগত কুফরি (ছোট কুফরি) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (বিশ্বাসগত বা কুফরি বড় নয়)। যেমন: গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া, কোনও মুসলিমের সাথে লড়াই করা, মনিব থেকে গোলামের পলায়ন করা ইত্যাদি বিষয়কে হাদিসে কুফরি বলা হয়েছে। কিন্তু এগুলো বিশ্বাসগত (বড়) কুফরি নয় বরং কর্মগত (ছোট) কুফরি) যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। সালাতের বিষয়টিও অনুরূপ। তবে সালাত পরিত্যাগ করার বিষয়টি আরো ভয়ানক। এর ফলে বড় কুফরিতে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে সালাত পরিত্যাগ করাকে হালাল মনে না করলে বা সালাতকে অস্বীকার না করলে তাকে ইসলাম থেকে বহিস্কৃকত কাফের-মুরতাদ বলা যাবে না।” [শাইখের ফতোয়ার সারসংক্ষেপ]
মূলত এটি ইসলামের সাধারণ মূলনীতির আলোকে খুবই যৌক্তিক ও চমৎকার ব্যাখ্যা।
তবে অনেক আলেমের মতে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত সালাত পরিত্যাগ করে তারা ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত কাফের-মুরতাদ। কিন্তু দলিলের আলোকে আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন এবং শায়খ আলবানির অভিমত অধিক শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়। আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate