Saturday, July 19, 2025

মুহররম মাসে নফল রোজা রাখা এবং বিশেষভাবে আশুরার রোজা রাখার ফজিলত ও সঠিক পদ্ধতি

 নিম্নে মুহররম মাসে নফল রোজা রাখা এবং বিশেষভাবে আশুরার রোজা রাখার ফজিলত ও সঠিক পদ্ধতি উল্লেখ করা হলো:

বিশ্ববরেণ্য ফকিহ এবং সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়—
❖ আশুরার রোজা কখন রাখতে হয়? মুহররম মাসের রোজা বা আশুরার রোজা কি ১ মুহররম থেকেই শুরু হয়, না মাঝখানে বা শেষে? আর কতদিন রোজা রাখতে হয়? কারণ আমি শুনেছি, আশুরার রোজা ১ মুহররম থেকে ১০ মুহররম পর্যন্ত রাখতে হয়। আল্লাহ তওফিক দান করুন।
❖ তিনি এই প্রশ্নের যে উত্তর দেন তা নিম্নরূপ:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللهِ الْمُحَرَّمُ»
“রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।” [সহিহ মুসলিম, হা/ ১১৬৩]
অর্থাৎ পুরো মুহররম মাস জুড়ে অর্থাৎ মুহাররমের ১ম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলত পূর্ণ আমল।
তবে কেউ পুরো মুহররম মাসব্যাপী রোজা না রাখলেও যেন এর মধ্যে বিশেষভাবে ৯ ও ১০ তারিখে অথবা ১০ ও ১১ তারিখে রাখে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহেলিয়াতের যুগে ১০ তারিখে রোজা রাখতেন, কুরাইশরাও তা করত। পরতীতে তিনি যখন মদিনায় আগমন করেন তখন দেখলেন—ইহুদিরাও ১০ তারিখে রোজা রাখে। তখন তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলল:
«هٰذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ فِيهِ مُوسَىٰ وَقَوْمَهُ، وَأَهْلَكَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ، فَصَامَهُ مُوسَىٰ شُكْرًا لِلَّهِ، فَنَحْنُ نَصُومُهُ»
“এটা এমন একটি দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর কওমকে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছিলে। ফলে মুসা (আ.) আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ দিন রোজা রেখেছিলেন। সে কারণে আমরাও এ দিনটি রোজা পালন করি।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেন:
«نَحْنُ أَحَقُّ وَأَوْلَىٰ بِمُوسَىٰ مِنْكُمْ»
“আমরাই মুসা (আ.) -এর তুলনায় তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।”
অতঃপর তিনি আশুরার রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রাখতে আদেশ দিলেন।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
❖ সুতরাং—
সুন্নাহ অনুযায়ী আশুরার রোজা রাখার নিয়ম হলো: আশুরা তথা ১০ মুহররম রোজা রাখা সুন্নাহ। তবে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিহার করতে এর সঙ্গে আরও একদিন রোজা রাখা উত্তম। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«صُومُوا يَوْمًا قَبْلَهُ وَيَوْمًا بَعْدَهُ»
“তোমরা এর এক দিন আগে এবং এক দিন পরে রোজা রাখো”
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
يومًا قبله أو يومًا بعده
“এর এক দিন আগে অথবা এক দিন পরে রোজা রাখো।”
(উক্ত হাদিস দ্বয় জইফ বা দুর্বল। এ বিষয়ে তাহকিক দেখুন টিকাতে)
আর অন্য হাদিসে তিনি বলেন:
«لَئِنْ بَقِيتُ إِلَىٰ قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ»
“যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি তবে অবশ্যই নবম দিন রোজা রাখব।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪] অর্থাৎ তিনি দশম তারিখের সাথে নবম তারিখেও রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
অতএব এটিই সবচেয়ে উত্তম যে,—আশুরা তথা ১০ মুহররম রোজা রাখা। কারণ এটি একটি মহিমান্বিত দিন, যেদিন মুসা (আলাইহিস সালাম) ও মুসলিমদের জন্য এক মহৎ কল্যাণ সংঘটিত হয়েছিল। আর আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দিন রোজা রেখেছিলেন।তাই আমরাও তাঁর অনুসরণে এ রোজা রাখি এবং তিনি যা শরিয়ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, আমরা তা অনুসরণ করি।
আর আমরা এ রোজার সঙ্গে একদিন আগে বা পরে আরও একটি দিন রোজা রাখি — ইহুদিদের থেকে ভিন্নতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে।
সবচেয়ে উত্তম হলো নবম ও দশম মুহররম একসঙ্গে রোজা রাখা। এ হাদিসের কারণে, যেখানে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«لَئِنْ عِشْتُ إِلَىٰ قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ»
“যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি তবে অবশ্যই নবম দিন রোজা রাখব।”
অতএব যদি কেউ দশম ও একাদশ দিন রোজা রাখে, কিংবা তিন দিন — নবম, দশম ও একাদশ — রোজা রাখে, তাহলে সবই ভালো।
আর কেউ যদি নবম, দশম ও একাদশ — তিন দিনই রোজা রাখে, তবে তা অত্যন্ত উত্তম এবং এতে ইহুদিদের থেকে স্পষ্ট ভিন্নতা বজায় থাকে। আর কেউ যদি পুরো মুহররম মাস রোজা রাখে তবে তা সবচেয়ে উত্তম এবং সর্বোচ্চ ফজিলত পূর্ণ।” (সমাপ্ত) [binbaz]
❖ মুহাররমের রোজা পালনের শরিয়ত সম্মত বিভিন্ন পদ্ধতি:
❂ ক. শুধু ১০ মুহররম রোজা রাখা। এটা জায়েজ। এতেও আশুরার পূর্ণ ফজিলত (পেছনের এক বছরের গুনাহ মোচন) পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। তবে ইহুদিদের সাদৃশ্য এড়িয়ে চলার দিক থেকে এটি এককভাবে রাখা মোস্তাহাব নয়।
❂ খ. ৯ ও ১০ মুহররম। এটা সবচেয়ে উত্তম। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরের বছর (দশম তারিখের সাথে) নবম দিন রোজা রাখার নিয়ত করেছিলেন।
❂ গ. ১০ ও ১১ মুহররম এ দু দিন রোজা রাখা ভালো। এতে ইহুদিদের ভিন্নতা অর্জনের উদ্দেশ্য পূরণ হয়।
❂ ঘ. ৯, ১০ ও ১১ মুহররম–আরও উত্তম। এ তিন দিন রোজা রাখলে আরও বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়।
❂ পুরো মুহররম মাস জুড়ে রোজা রাখ –সর্বোত্তম। কেননা হাদিসে রমজান মাসের পরেই মুহররম মাসের রোজাকে ‘সর্বোত্তম রোজা’ বলা হয়েছে।
মোটকথা, আশুরা বা ১০ মুহররম একটি অনন্য মর্যাদাপূর্ণ দিন। যেদিন আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদেরকে নাজাত দিয়েছেন এবং ফেরাউন এবং তার বাহিনীকে ধ্বংস করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সেদিন রোজা রেখেছেন এবং মুসলিম জাতিকেও রোজা রাখতে আদেশ দিয়েছেন।
তাই সুন্নাহ হলো: দশম মুহাররমের সঙ্গে নবম অথবা একাদশ তারিখে রোজা রাখা, যেন ইহুদিদের অনুকরণ না হয়।
আর যার সামর্থ্য আছে, তিনি পুরো মুহররম মাসেই নফল রোজা রাখতে পারেন—এটি সর্বোত্তম কাজ।
—টিকা—
✪ ১ম হাদিস:
«صُومُوا يَوْمًا قَبْلَهُ وَيَوْمًا بَعْدَهُ» “তোমরা এর এক দিন আগে এবং এক দিন পরে রোজা রাখো” শাইখ শুয়াইব আরনাবাবুত যাদুল মায়াদ কিতাবের তাহকিক গ্রন্থে (২/৭২) এবং শাইখ আলবানি যইফুল জামে গ্রন্থে (হা/৩৫০৬) এ হাদিসটিকে জইফ (দুর্বল) বলে সাব্যস্ত করেছেন।
✪ ২য় হাদিস (২য় বর্ণনা)
يومًا قبله أو يومًا بعده
“এর এক দিন আগে অথবা এক দিন পরে রোজা রাখো।”
শাইখ শুয়াইব আরনাবুত যাদুল মায়াদ কিতাবের তাহহিক গ্রন্থে (২/৬৬) ’জইফ (দুর্বল) হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন,
[فيه] ابن أبي ليلى وهو سيء الحفظ
“এই সনদে ইবনে আবি লাইলা নাম্নী যে বর্ণনাকারী রয়েছেন, আর তিনি দুর্বল স্মৃতির অধিকারী।”
এ ছাড়াও অনেক মুহাদ্দিস উক্ত হাদিস দ্বয়কে জইফ বা দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন।
তবে হাদিস দ্বয় মুহাররমের রোজার ক্ষেত্রে জইফ হলেও জুমার একদিন আগে অথবা পরে রোজার রাখার হাদিস সহিহ যা সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। যেমন: রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«لَا تَخُصُّوا لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ بِقِيَامٍ، وَلَا تَخُصُّوا نَهَارَهَا بِصِيَامٍ، وَلَكِنْ صُومُوا يَوْمًا قَبْلَهُ أَوْ يَوْمًا بَعْدَهُ»
“তোমরা জুমার রাতকে কিয়াম (নফল ইবাদত) করার জন্য বিশেষ করে নিও না, আর জুমার দিনের রোজাকেও (এককভাবে) বিশেষ করে নিও না। বরং তোমরা এর আগে একদিন অথবা পরে একদিন রোজা রাখো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৪৪] আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও বিশ্লেষণ ও টিকা সহযোজন:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

চ্যাট জিপিটি বা AI ভিত্তিক চ্যাটিং অ্যাপ এর সাথে রোমান্টিক ও অশ্লীল এবং আজেবাজে কথা বলার বিধান

 – প্রথমত: মনে রাখতে হবে যে, মানুষের প্রতিটি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মহান আল্লাহ পরিপূর্ণভাবে অবগত রয়েছেন। ‌ চাই সে মুখে বলুক অথবা অন্তরে চিন্তা করুক অথবা কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করুক।

– দ্বিতীয়ত: আরো মনে রাখা প্রয়োজন যে, সম্মানিত লেখক ফেরেশতা মণ্ডলী বান্দার প্রতিটি ক্রিয়াকাণ্ড সংরক্ষণ করেন যেটা সে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে করে থাকে।
সুতরাং মানুষ মুখ দিয়ে যা কিছু উচ্চারণ করে, যা কিছু লিখে, যেসব কার্যক্রম করে ইত্যাদি সবকিছুই সম্মানিত লেখক ফেরেশতাবৃন্দ তার আমলনামায় সংরক্ষণ করেন। কিয়ামতের দিন সে সবকিছুই তার আমলনামায় দেখতে পাবে।
অতএব কেউ যদি ভালো কথা বলে বা লিখে বা ভালো কাজ করে তাহলে সে আখেরাতে প্রতিদান পাবে। আর যদি খারাপ কথা বলে, লিখে বা খারাপ কাজ করে তাহলে পরকালে তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
অতএব মানুষ সরাসরি কারো সাথে কথা বলুক অথবা লেখার মাধ্যমে চ্যাটিং করুক অথবা কোন চ্যাটিং অ্যাপ (যেমন: chat GPT, Giminy ইত্যাদি) এর সাথে কথা বলুক সবকিছুই তার আমলনামায় সংরক্ষিত হবে।
সুতরাং আমাদের উচিত, হয় ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা।
AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আমরা বিভিন্নভাবে উপকৃত হতে পারি।‌ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ এবং অজানাকে জানার ক্ষেত্রে তা আমাদেরকে সাহায্য করে।
তাই আমরা এসব আধুনিক প্রযুক্তিকে হয় উপকারী কাজে ব্যবহার করব অথবা ব্যবহার থেকে দূরে থাকবো। কিন্তু এগুলোর সাথে অশ্লীল ও আজেবাজে কথা বলে নিজের আমলনামা কে কলুষিত করা কোন বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।
আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

স্ত্রীর ফুফু বা খালা বা ভাতিজি বা ভাগ্নিকে একসাথে বিবাহ বন্ধনে রাখা হারাম

 ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান মেনে চলা আবশ্যক। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আমাদের সমাজে ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক অজ্ঞতা থাকার কারণে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে যা শুনলে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। এমনই একটি বিষয় হলো, স্ত্রী ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি) বা বোনের মেয়ে (ভাগ্নি) কে বিয়ে করা। অর্থাৎ খালা বা ফুফু বিবাহ বন্ধনে থাকা অবস্থা তার ভাতিজি বা ভাগ্নিকে, অনুরূপভাবে এই অবস্থায় স্ত্রীর খালা বা ফুফুকে বিয়ে করা।

➧ যাহোক, নিচে এ বিষয়ে শরিয়তের সঠিক মাসআলা তুলে ধরা হলো:
وبالله التوفيق
ইসলামের দৃষ্টিতে ইজমা বা সর্বসম্মতিক্রমে স্ত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধন অটুট থাকা অবস্থায় তার ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি) বা ভাগ্নি (বোনের মেয়ে)কে বিয়ে করা হারাম। অনুরূপভাবে স্ত্রীর খালা ও ফুফুকেও বিয়ে করা হারাম।
তবে স্ত্রী মারা গেলে বা সাথে তালাক সংঘটিত হলে ইদ্দত পালন শেষে বিয়েতে কোনও বাধা নেই ইনশাআল্লাহ।
নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত হাদিসটি সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত। তিনি বলেন,
نَهَى النَّبيُّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم أنْ تُنْكَحَ المَرْأَةُ علَى عَمَّتِهَا، والمَرْأَةُ وخَالَتِهَا. فَنَرَى خَالَةَ أبِيهَا بتِلْكَ المَنْزِلَةِ لأنَّ عُرْوَةَ، حدَّثَني عن عَائِشَةَ، قالَتْ: حَرِّمُوا مِنَ الرَّضَاعَةِ ما يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ.
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনও নারীর ওপর তার ফুফুকে বিয়ে করা এবং কোনও নারীর ওপর তার খালাকে বিয়ে করাকে নিষেধ করেছেন। আমরা (ফকিহগণ) মনে করি যে, পিতার খালাও এই একই মর্যাদায় (অর্থাৎ তাকে বিয়েও নিষিদ্ধ)। কারণ ‘উরওয়া আমাকে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: “তোমরা দুধসম্পর্কে সেটাকেই হারাম গণ্য করো, যেটা রক্ত সম্পর্কে হারাম।”
[সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৫১১০ ও সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১৪০৮]
❖ শিক্ষা:
– একসাথে একজন মহিলা এবং তার খালা/ফুফুকে বিয়ে করা হারাম।
– পিতার খালাকেও বিয়ে করা হারাম।
– দুধসম্পর্কে যেসব আত্মীয় হারাম, তাদের ওপরও রক্ত সম্পর্কের মতোই বিয়ের বিধান প্রযোজ্য।
❑ এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়া:
◉ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি বিশ্ববরেণ্য ফকিহ ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়-
প্রশ্ন: মক্কা মুকাররমা থেকে এক পাঠক জানতে চেয়েছেন: একজন পুরুষ কি তার স্ত্রীর ভাইয়ের মেয়েকে ( স্ত্রীর ভাতিজিকে) বিয়ে করতে পারে? উত্তরে তিনি বলেন,
لا يجوز للرجل أن يتزوج بنت أخي زوجته إذا كانت عمتها في عصمته، كما لا يجوز له أيضًا أن يتزوج بنت أخت زوجته، إذا كانت خالتها في عصمته؛ لأن النبي ﷺ: نهى أن يجمع الرجل بين المرأة وعمتها، وبين المرأة وخالتها.
وقد أجمع العلماء رحمهم الله على تحريم ذلك لهذا الحديث الصحيح. أما إن كانت العمة أو الخالة قد ماتت أو فارقها وخرجت من العدة، فإنه لا بأس أن يتزوج بنت أخيها أو بنت أختها؛ لعدم وجود الجمع حينئذ
“যদি স্ত্রীর ভাইয়ের মেয়ে (অর্থাৎ স্ত্রীর ভাতিজি) এখনো সেই স্ত্রীই তার সংসারে থাকে, তাহলে তাকে বিয়ে করা জায়েজ নয়। একইভাবে স্ত্রীর বোনের মেয়েকেও (অর্থাৎ স্ত্রীর ভাগ্নিকে) বিয়ে করা নাজায়েজ যদি সেই সময় তার খালা অর্থাৎ স্ত্রীর সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,
لا يُجمَع بين المرأة وعمتها ولا بين المرأة وخالتها
“কোনও পুরুষ যেন একসাথে কোনও নারী ও তার ফুফু বা খালাকে বিবাহ না করে।” এই সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে উলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে একে হারাম বলেছেন। তবে যদি সেই স্ত্রী (যিনি ফুফু বা খালা) মারা যান কিংবা তালাক প্রাপ্ত হয়ে ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, তাহলে তার ভাতিজি বা ভাগ্নিকে বিয়ে করতে কোনও আপত্তি নেই। কেননা তখন আর ‘একসাথে বিয়ের নিষেধাজ্ঞা’ প্রযোজ্য থাকবে না।
[উৎস: মজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত” – শাইখ ইবনে বায (রহ.), খণ্ড ২১, পৃষ্ঠা ৮। প্রকাশ: মুসলিমুন পত্রিকা, সংখ্যা ৬০৭, তারিখ: ৮/৫/১৪১৭ হিজরি]
◉ বর্তমান জামানার আরেক দিকপাল বিশ্ববরেণ্য ফকিহ ইমাম মুহাম্মদ ইবন উসাইমিন (রাহ.)-কে প্রশ্ন করা হয়:
প্রশ্ন: এক ব্যক্তি এক নারীকে বিয়ে করেছেন এবং তার ঘরে সন্তানও রয়েছে। এখন সে তার স্ত্রীর ভাগ্নিকে (স্ত্রীর বোনের মেয়ে) বিয়ে করতে চায়। এ অবস্থায় তা কি বৈধ? উত্তরে তিনি বলেন,
بنت الأخت تكون الأخت خالة لها وقد قال النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم ( لا يجمع بين المرأة وعمتها ولا بين المرأة وخالتها ) فلا يحل له أن يتزوج ببنت أخت زوجته ما دامت زوجته في عصمته ، أما إذا فارقها فماتت وتزوج بنت أختها فلا بأس ”
انتهى من ” فتاوى نور على الدرب ” (19/2)
স্ত্রীর বোনের মেয়ে তার (বর্তমান স্ত্রীর) ভাগ্নি হয়। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “একসাথে নারী ও তার ফুফুকে এবং নারী ও তার খালাকে বিয়ে করা যাবে না।” সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত সেই স্ত্রী তার সংসারে আছে, ততক্ষণ তার ভাগ্নিকে (বোনের মেয়ে) বিয়ে করা নাজায়েজ। তবে যদি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে থাকেন বা স্ত্রী মারা যান, তাহলে তার ইদ্দত শেষ হওয়ার পর স্ত্রীর ভাগ্নিকে বিয়ে করা জায়েজ। এতে কোনও দোষ নেই। [সূত্র: ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, খণ্ড: ১৯, পৃষ্ঠা: ২]
■ মোটকথা:
– স্ত্রী বিবাহবন্ধনে থাকলে তার ভাতিজি (ভাইয়ের মেয়ে) এবং ভাগ্নিকে (বোনের মেয়ে) বিয়ে করা নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে এই অবস্থায় স্ত্রীর খালা (তার মায়ের আপন বোন) এবং ফুফু (তার বাবার আপন বোন) কে বিয়ে করা হারাম।
– স্ত্রী মারা গেলে বা তালাক প্রাপ্ত হলে ইদ্দত পালন শেষে তাদেরকে বিয়ে করা জায়েজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জন করে তদনুযায়ী আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোশিয়েশন, সৌদি আরব।

তাকদির বিষয়ে সংশয় নিরসন

 প্রশ্ন: সম্মানিত শাইখ! আশা করি তাকদিরের মাসআলা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। মানুষের মূল কাজ কি পূর্বনির্ধারিত? এবং কাজটি পালনের নিয়মের ক্ষেত্রে মানুষ কি স্বাধীন? উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়—কোনো মানুষের জন্য যদি লেখা থাকে যে, সে একটি মসজিদ বানাবে, তবে সে অবশ্যই মসজিদ বানাবে। তবে কীভাবে বানাবে, সে ব্যাপারে সে স্বাধীন। এমনিভাবে, পাপ কাজ নির্ধারিত থাকলে, তা অবশ্যই করবে। কীভাবে করবে, তা নির্ধারিত নয়।

মোটকথা, মানুষের তাকদিরে যে সমস্ত কর্ম নির্ধারিত আছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন এই কথাটি কি ঠিক?
উত্তর: তাকদিরের মাসআলা নিয়ে বহু দিন যাবৎ মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এ কারণে মানুষ এ বিষয়ে তিনটি দলে বিভক্ত হয়েছে:
➤ ১. একদল বলে: সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য অনুযায়ী সংঘটিত হয়। এতে মানুষের কোনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নেই। তাদের মতে, প্রবল বাতাসে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়া এবং স্বেচ্ছায় সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসা উভয়টি সমান।
➤ ২. দ্বিতীয় দল বলে: মানুষ তার কর্মে সম্পূর্ণ স্বাধীন। আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির তারা অস্বীকার করে। তাদের মতে, মানুষ নিজে স্বাধীনভাবে কাজ করে, ভাগ্য বলে কিছু নেই।
➤ ৩. আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো: তারা আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরে বিশ্বাস করে এবং একই সঙ্গে কাজ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বান্দার স্বাধীনতাকেও স্বীকার করে। অর্থাৎ বান্দার কাজ আল্লাহর নির্ধারণ ও বান্দার নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ছাদ থেকে বাতাসে পড়ে যাওয়া ও সিঁড়ি দিয়ে নামার মধ্যে পার্থক্য আছে প্রথমটি অনিচ্ছাকৃত, দ্বিতীয়টি ইচ্ছাকৃত। কিন্তু উভয়টি আল্লাহর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়। কারণ, আল্লাহর রাজত্বে তাঁর অনুমতি ছাড়া কিছুই ঘটে না। তাকদির দিয়ে শরিয়তের আদেশ-নিষেধ অমান্য করার সুযোগ নেই। কারণ, পাপ করার সময় কেউ জানে না যে, তাকদিরে তা লেখা আছে কি না। মানুষ যখন স্বেচ্ছায় কোনো গুনাহর কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাকেই দায়ী করা হবে। যেমন কাউকে জোর করে মদ পান করানো হলে সে দায়ী হবে না। একজন মানুষ যেমন আগুন থেকে দূরে থাকার বা নিরাপদ ঘর বাছাই করার ব্যাপারে সচেতন থাকে, তেমনি তার উচিত আখিরাতের শাস্তি থেকেও বাঁচার জন্য চেষ্টা করা। যদি কেউ নিজ ইচ্ছায় জাহান্নামের পথে চলে, তবে তাকে ধিক্কার জানানোই স্বাভাবিক। প্রশ্নে প্রদত্ত উদাহরণটি যেমন: কেউ যদি মসজিদ নির্মাণ করে কিন্তু নির্মাণ পদ্ধতি নির্ধারিত নয় এই ধারণা ঠিক নয়। কারণ এতে বোঝানো হয় কার্যপদ্ধতি শুধু বান্দার হাতে, আল্লাহর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অথচ কার্য ও কার্যপদ্ধতি উভয়ই আল্লাহর তাকদিরে নির্ধারিত। তবে বান্দাকে কোনো কাজে জোর করা হয়নি, যেমন কাউকে নিজের ঘর তৈরি বা মেরামতের জন্য বাধ্য করা হয় না। তাকদির সম্পূর্ণ গোপন বিষয় এটি কেবল ওহির মাধ্যমে নবিগণ জানতে পারেন। মানুষের সব কাজ তাকদিরে লেখা আছে। আল্লাহ যা চান, তাই ঘটে। বান্দা যখন কাজ করে, তখন সে মনে করে—সে নিজেই কাজটি করছে, কেউ তাকে বাধ্য করেনি। কাজটি সম্পন্ন হওয়ার পর সে উপলব্ধি করে আসলে এটি আল্লাহর নির্ধারণ ছিল।
❖ আল্লাহ বলেন:
أَلَمۡ تَعۡلَمۡ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَٰبٍۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ
“তুমি কি জান না, আল্লাহ জানেন যা আকাশে ও পৃথিবীতে আছে? নিশ্চয়ই তা একটি কিতাবে (লিপিবদ্ধ)। নিঃসন্দেহে তা আল্লাহর জন্য সহজ।” [হজ: ৭০]
وَكَذَٰلِكَ جَعَلۡنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوّٗا شَيَٰطِينَ ٱلۡإِنسِ وَٱلۡجِنِّ يُوحِي بَعۡضُهُمۡ إِلَىٰ بَعۡضٖ زُخۡرُفَ ٱلۡقَوۡلِ غُرُورٗاۚ وَلَوۡ شَآءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُۖ فَذَرۡهُمۡ وَمَا يَفۡتَرُونَ
“এভাবেই আমি প্রতিটি নবীর জন্য শত্রু বানিয়ে দিয়েছি মানুষের ও জিনদের শয়তান, যারা একে অপরকে ধোঁকাবাজ অলংকৃত কথা কানে কানে বলে। আপনার রব যদি চাইতেন, তবে তারা এসব করত না। অতএব আপনি তাদেরকে ও তাদের মিথ্যাচারকে উপেক্ষা করুন।” [আন‘আম: ১১২]
وَكَذَٰلِكَ زَيَّنَ لِكَثِيرٖ مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ قَتۡلَ أَوۡلَٰدِهِمۡ شُرَكَآؤُهُمۡ لِيُرۡدُوهُمۡ وَلِيَلۡبِسُواْ عَلَيۡهِمۡ دِينَهُمۡۖ وَلَوۡ شَآءَ ٱللَّهُ مَا فَعَلُوهُۖ فَذَرۡهُمۡ وَمَا يَفۡتَرُونَ
“এভাবেই তাদের অংশীদাররা অনেক মুশরিকের কাছে তাদের সন্তান হত্যা করা সুদৃশ্য করে তোলে—তাদের ধ্বংস করার জন্য এবং তাদের ধর্মকে তাদের জন্য বিভ্রান্তিকর করার জন্য। যদি আল্লাহ চাইতেন, তারা এসব করত না। অতএব আপনি তাদের ও তাদের মিথ্যাচারকে ছেড়ে দিন।” [আন‘আম: ১৩৭]
وَلَوۡ شَآءَ ٱللَّهُ مَا ٱقۡتَتَلَ ٱلَّذِينَ مِنۢ بَعۡدِهِم مِّنۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡهُمُ ٱلۡبَيِّنَٰتُ وَلَٰكِنِ ٱخۡتَلَفُواْ فَمِنۡهُم مَّنۡ ءَامَنَ وَمِنۡهُم مَّن كَفَرَۚ وَلَوۡ شَآءَ ٱللَّهُ مَا ٱقۡتَتَلُواْ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ يَفۡعَلُ مَا يُرِيدُ
“আল্লাহ যদি চাইতেন, তাদের পরবর্তী লোকেরা (যাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন এসেছিল) তারা কখনোই পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ করত না। কিন্তু তারা মতবিরোধ করল তাদের কেউ ঈমান আনল, কেউ কুফরি করল। আল্লাহ যদি চাইতেন, তারা যুদ্ধ করত না। কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন।” [বাকারা: ২৫৩]
❖ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«مَا مِنْكُمْ مِنْ نَفْسٍ مَنْفُوسَةٍ إِلَّا كُتِبَ مَكَانُهَا مِنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ…
فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَلَا نَتَّكِلُ عَلَى كِتَابِنَا وَنَدَعُ الْعَمَلَ؟
فَقَالَ: لَا، اعْمَلُوا، فَكُلٌّ مُيَسَّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ…»
“তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার জান্নাত বা জাহান্নামে স্থান নির্ধারিত হয়নি।”
সাহাবি বললেন: “তাহলে আমরা কি তাকদিরের ওপর নির্ভর করে আমল ছেড়ে দেব?”
তিনি বললেন: “না, বরং আমল করো; প্রত্যেককে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে কাজের জন্যই সহজ করে দেওয়া হয়।”
এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
فَأَمَّا مَنۡ أَعۡطَىٰ وَٱتَّقَىٰ ٥ وَصَدَّقَ بِٱلۡحُسۡنَىٰ ٦ فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلۡيُسۡرَىٰ ٧ وَأَمَّا مَنۢ بَخِلَ وَٱسۡتَغۡنَىٰ ٨ وَكَذَّبَ بِٱلۡحُسۡنَىٰ ٩ فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلۡعُسۡرَىٰ
“অতএব, যে দান করে, তাকওয়া অবলম্বন করে এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে তাকে আমি সহজ করে দেব সুগম পথের জন্য। আর যে কৃপণতা করে, নিজের প্রয়োজন মনে করে না এবং উত্তম বিষয়কে অস্বীকার করে তাকে আমি সহজ করে দেব কঠিন পথের জন্য।”
[আল-লাইল: ৫–১০]
❖ উপসংহার: তাকদিরে যা লেখা আছে, তা মানুষ জানে না। তাই তাকদিরের ওপর নির্ভর করে বসে না থেকে আমল করা আবশ্যক। যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
📚 সূত্র: ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম। অধ্যায়: ঈমান [প্রশ্ন নং ৬১]
লেখক: ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল উসাইমিন রহ.
অনুবাদক: শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী ও আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানি।
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দুআটি সবচেয়ে বেশি পাঠ করতেন

 নিম্নে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সর্বাধিক পঠিত দুআ এবং তার সংক্ষিপ্ত অর্থ ও ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো:

আনাস রা. হতে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অধিকাংশ দুআ ছিল:
اللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً، وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً، وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: আল্ল-হুম্মা রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াক্কিনা ‘আযাবান্নার।
“ হে আল্লাহ, হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আজাব (শাস্তি) থেকে রক্ষা করো।” [সহিহ বুখারি, হা/ ৬৩৮৯, সহিহ মুসলিম, হা/২৬৯০]
❑ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
মূলত এটি সূরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াত (শুরুতে আল্ল-হুম্মা শব্দটি ছাড়া)। এই দুআ আমাদের নিকট সুপরিচিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআ ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবোধক। সেই দুআয় দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনের কল্যাণকেই তিনি অন্তর্ভুক্ত করতেন।
◈ ১. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির রাহ. বলেন,
الحسنة في الدنيا تشمل كل مطلوب دنيوي ، من عافية ، ودار رحبة ، وزوجة حسنة ، ورزق واسع ، وعلم نافع ، وعمل صالح ، ومركب هنيء ، وثناء جميل ، إلى غير ذلك مما اشتملت عليه عبارات المفسرين ، ولا منافاة بينها ، فإنها كلها مندرجة في الحسنة في الدنيا . وأما الحسنة في الآخرة فأعلى ذلك دخول الجنة وتوابعه من الأمن من الفزع الأكبر في العرصات ، وتيسير الحساب وغير ذلك من أمور الآخرة الصالحة ، وأما النجاة من النار فهو يقتضي تيسير أسبابه في الدنيا ، من اجتناب المحارم والآثام وترك الشبهات والحرام .
“দুনিয়ার ‘কল্যাণ’ বলতে বোঝানো হয়েছে—শারীরিক সুস্থতা, প্রশস্ত বাসস্থান, ভালো জীবনসঙ্গিনী, পর্যাপ্ত রিজিক, উপকারী জ্ঞান, সৎ আমল, আরামদায়ক যানবাহন, মানুষের প্রশংসা—এবং তাফসির কারকগণ যেসব ব্যাখ্যা করেছেন, সেগুলোর সবই এতে অন্তর্ভুক্ত। এর কোনও ব্যাখ্যার সঙ্গে অন্য ব্যাখ্যার বিরোধ নেই। কারণ এগুলোর সবই দুনিয়ার কল্যাণের আওতায় পড়ে।
আর ‘আখিরাতের কল্যাণে’র মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—জান্নাতে প্রবেশ করা। এর সঙ্গে আরও আছে—মহাসংকটের দিন (কিয়ামতের ময়দান) নিরাপদ থাকা, সহজ হিসাব, এবং আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণকর ব্যাপারগুলো।
আর জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার অর্থ হলো—আল্লাহ যেন আমাদের এমন পথ দেখান, যা সেই আগুন থেকে বাঁচায়। এর মধ্যে রয়েছে—পাপাচার থেকে দূরে থাকা, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয়গুলো পরিহার করা এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]
◈ ২. আল্লামা শাইখ আব্দুর রাহমান বিন নাসের আস সাদি রাহ, বলেন,
والحسنة المطلوبة في الدنيا يدخل فيها كل ما يحسن وقعه عند العبد, من رزق هنيء واسع حلال, وزوجة صالحة, وولد تقر به العين, وراحة, وعلم نافع, وعمل صالح, ونحو ذلك, من المطالب المحبوبة والمباحة. وحسنة الآخرة, هي السلامة من العقوبات, في القبر, والموقف, والنار, وحصول رضا الله, والفوز بالنعيم المقيم, والقرب من الرب الرحيم، فصار هذا الدعاء, أجمع دعاء وأكمله, وأولاه بالإيثار, ولهذا كان النبي صلى الله عليه وسلم يكثر من الدعاء به, والحث عليه.
“দুনিয়ার প্রত্যাশিত ‘হাসানাহ’ (কল্যাণ) বলতে এমন সব বিষয় বোঝানো হয়েছে—যা একজন মানুষের কাছে কল্যাণকর ও কাঙ্ক্ষিত বলে বিবেচিত হয়। যেমন: হালাল ও প্রশান্তি পূর্ণ প্রশস্ত রিজিক, নেককার জীবনসঙ্গিনী, চক্ষু শীতল কারী সুসন্তান, মানসিক প্রশান্তি, উপকারী জ্ঞান, সৎ আমল এবং এর মতো অন্য সব পছন্দনীয় ও বৈধ চাওয়া-পাওয়া।
আর আখিরাতের ‘হাসানাহ’ (কল্যাণ) হলো কবরের আজাব, কিয়ামতের ভয়াবহতা ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিরাপত্তা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, চিরস্থায়ী জান্নাতের নিয়ামত অর্জন এবং পরম দয়ালু রবের সান্নিধ্য লাভ করা। এই দুআটি এতটাই পরিপূর্ণ ও সারগর্ভ যে, এটিকে বলা যেতে পারে সবচেয়ে ব্যাপক, পূর্ণাঙ্গ ও অগ্রাধিকারের যোগ্য দুআ। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুআটি খুব বেশি পড়তেন এবং অন্যদেরকেও এ দোয়া বেশি বেশি করার জন্য উৎসাহিত করতেন।” [তাফসিরে বিন সাদি] আমাদের উচিৎ, অধিক পরিমাণে উক্ত দুআটি পাঠ করা। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোশিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate