Monday, April 21, 2025

ফিতরা পাওয়ার হকদার কারা

 প্রশ্ন: ফিতরা পাওয়ার হকদার কারা? অনেকে বলেন হাদীসে তো শুধু মিসকীনদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সুতরাং এর বাহিরে ফকিরকেও ফিতরা দেওয়া যাবে না! এই বক্তব্য কতটুকু সঠিক?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর যাকাতুল ফিতরের প্রকৃত হকদার কারা এটি শুধুমাত্র ফকির -মিসকীনকে দিতে হবে নাকি কুরআনে উল্লেখিত আট শ্রেণীর মাঝে কি ফিতরা বণ্টন করা যাবে, এই মাসালায় আলেমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এক্ষেত্রে দুটি প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়।
.
(১). জমহুর আলেমদের মতে ফিতরা বণ্টন করার খাত ও সম্পদের যাকাত বণ্টন করার খাত অভিন্ন।অর্থাৎ ফিতরা যাকাতের মতোই আট শ্রেণির প্রাপ্যদের মধ্যে বণ্টিত হবে এ মতের পক্ষে দলিল হলো সূরা আত-তাওবাহ’র ৬০ নং আয়াত। এতে বলা হয়েছে যে সাদাকাহ, অর্থাৎ যাকাত, নির্দিষ্ট আট শ্রেণির মানুষের জন্য নির্ধারিত। যেহেতু ফিতরাও এক প্রকার সাদাকাহ বা দান এবং যেহেতু এটি যাকাতের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই এটিও যাকাতের মতো ওই আট শ্রেণির মধ্যে বিতরণ করা হবে।এটি হানাফী, শাফি‘ঈ ও হাম্বালী মাযহাবসহ অধিকাংশ ওলামাদের মত।(আসনাল মাতালিব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪০২ এবং কিতাবুল ফিক্বহি ‘আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আহ, পৃষ্ঠা: ৩৩৯)।
.
(২). ফিতরা গ্রহণের যোগ্য একমাত্র ফকির ও মিসকীন। অর্থাৎ এটি যাকাতের মতো আট শ্রেণিতে বিভক্ত হবে না। কারণ, ফিতরা যাকাতের অনুরূপ নয়; বরং এটি ফরজ করা হয়েছে মূলত মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থা হিসেবে। সুতরাং এটি গরীব-মিসকীনদের জন্য খাস। দলিলের আলোকে এটিই বিশুদ্ধ মত। এই মতের পক্ষে রয়েছেন, মালেকি মাযহাবের ইমাম আহমেদ ইবনে হাম্বলের দুটি মতের একটি মত, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া ও প্রিয় ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম বিন বায,ইবনু উসাইমীন, ইমাম আলবানী, শাইখ সালেহ আল ফাওযানসহ বহু বিশিষ্ট ফকিহ এ মতকে সমর্থন করেছেন। এই মতটি গ্রহণযোগ্য তার কারন হচ্ছে,রাসূল ﷺ মিসকীনদের খাদ্যস্বরূপ ফিতরাকে ফরজ করেছেন। তিনি অন্য কোনো খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য ফিতরাকে ফরজ করেননি। ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন,فَرَضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ زَكَاةَ الفِطرِ طُهرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعمَةً لِلمَسَاكِينِ.“আল্লাহ’র রাসূল ﷺ রোজা অবস্থায় কৃত অনর্থক কথাবার্তা ও অশালীন আচরণ থেকে রোজাদারকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং মিসকীনদের আহারের সংস্থান করার জন্য ফিতরাকে ফরজ করেছেন।”(আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭; হাদিসটি হাসান) সুতরাং এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ফিতরা কেবল ফকির-মিসকীনকে দিতে হবে, অন্য কোনো খাতে দেওয়া যাবে না। এছাড়াও ফিতরা অনেকটা কাফ্ফারার মতোই এক প্রকার পবিত্রতা দানকারী ইবাদত। রাসূল ﷺ এটি ফরজ করেছেন, যেন রোজাদার রোজা রাখার সময় যদি কোনো অনর্থক কথা বা অশালীন আচরণ করে থাকে, তাহলে ফিতরার মাধ্যমে তা পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং ফিতরার খাদ্য কেবল তাদেরই দেওয়া উচিত, যারা কাফফারা গ্রহণের অধিকারী। আর এটি সুস্পষ্ট যে, কাফফারা গ্রহণের অধিকার কেবল ফকির ও মিসকীনেরই রয়েছে।(সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ,খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮৫] এমনকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ছিল এ সদকাটা মিসকীনদেরকে দেওয়া। তিনি মুটে মুটে আট শ্রেণীর মাঝে ভাগ করতেন না এবং সে নির্দেশও দেননি। এবং কোন সাহাবীও এমন কাজ করেননি। সাহাবীদের পরেও কেউ করেননি। বরং আমাদের কাছে দুটো অভিমতের একটি হচ্ছে মিসকীন ছাড়া অন্যদের মাঝে ফিতরা বণ্টন করা নাজায়েয। এ অভিমতটি আট শ্রেণীর মাঝে ভাগ করে দেওয়ার অভিমতের চেয়ে অগ্রগণ্য।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনু ক্বাইয়্যিম; যাদুল মা‘আদ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২১)।
.
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন,وَلَا يَجُوزُ دَفْعُ زَكَاةِ الفِطْرِ إِلَّا لِمَن يَسْتَحِقُّ الكَفَّارَةُ، وَهُو مَن يَأْخُذُ لِحَاجَتِهِ لَا فِي الرِّقَابِ وَالمُؤَلَّفَةِ وَغَيرِ ذَلِكَ.“ফিতরার যাকাত কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিকে দেওয়া বৈধ, যে কাফফারা গ্রহণের উপযুক্ত (অর্থাৎ ফকির ও মিসকীন)। আর সে-ই তো মিসকীন, যে তার নিজের প্রয়োজনের কারণে (ফিতরা) গ্রহণ করে। এটি দাস মুক্তকরণ, মুআল্লাফাতুল কুলূব (যাদের হৃদয় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়) ও অন্যান্য খাতে প্রদান করা যাবে না।”
(ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-ইখতিয়ারাত; পৃষ্ঠা: ২৮২) বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,ومصرفها الفقراء والمساكين. لما ثبت عن ابن عباس
رضي الله عنهما قال: «فرض رسول الله ﷺ زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين».
“ফিতরা বণ্টনের খাত হচ্ছে গরীব, মিসকীন। যেহেতু ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিতরা ফরয করেছেন অনর্থক কথা-কাজ ও যৌনালাপ থেকে রোযাদারকে পবিত্র করাস্বরূপ এবং মিসকীনদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থাস্বরূপ।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ২০২) বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে ফিতরা বণ্টনের খাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,ليس لها إلا مصرف واحد وهم الفقراء، كما في حديث ابن عباس رضي الله عنهما قال: «فرض رسول الله ﷺ زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين».”ফিতরার কেবল একটি মাত্র খাত রয়েছে, আর তা হচ্ছে,ফকির ব্যক্তিবর্গ। যেমন ইবনু ‘আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা)-এর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:‘আল্লাহর রাসূল ﷺ রোজাদারের অনর্থক কথা ও অশালীন আচরণ থেকে তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং অভাবগ্রস্তদের খাদ্যের সংস্থান করার জন্য ফিতরা সদকা ফরজ করেছেন।’”(আবু দাউদ, হা/১৬০৯; ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন, মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৫৯) সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা একথা পরিস্কার যে, ফিতরা শুধুমাত্র ফকির মিসকিন এই দুই শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের জন্য।
.
এবার দেখবো যারা ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত হাদিসের ভিত্তিতে বলেন, ফিৎরা একমাত্র মিসকিনকে দিতে হবে। এর বাইরে ফকিরকেও দেয়া যাবেনা তাদের বক্তব্য কতটুকু সঠিক!
.
যারা বলেন ফিতরা শুধুমাত্র মিসকিনদের জন্য ফকির কে দেওয়া যাবে না তাদের ফাতওয়া সঠিক নয়। বরং বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে ফিতরা ফকির ও মিসকীন উভয় শ্রেনীর মধ্যেই বন্টন করা জায়েজ। আলেমগন বলেছেন; যখন কেবল “ফকির” শব্দটি উল্লেখ করা হয়, তখন সেটি “মিসকিন”-কেও অন্তর্ভুক্ত করে। আবার যখন কেবল “মিসকিন” শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি “ফকির”-কেও শামিল করে। তবে যখন উভয় শব্দ একত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন তাদের অর্থ পৃথক হয়। সেক্ষেত্রে “ফকির” দ্বারা বোঝানো হয় সেই ব্যক্তি, যিনি “মিসকিন”-এর তুলনায় আরও বেশি অভাবগ্রস্ত। ফকির ও মিসকীনেরর মধ্যে পার্থক্য হলো: ফকির বেশি দরিদ্র। ফকির হলো এমন ব্যক্তি যার কাছে তার নিজের ও তার পরিবারের অর্ধেক বছর চলার মত সম্পদ নাই। আর মিসকীনের অবস্থা ফকিরের চেয়ে ভাল। মিসকীনের কাছে তাদের প্রয়োজনের অর্ধেক বা ততোর্ধ অংশ পূরণ করার মত সম্পদ আছে; তবে সম্পূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করার মত সম্পদ নাই। তাদেরকে তাদের প্রয়োজন নিবারণের জন্য যাকাত বা যাকাতুল ফিতর দেয়া হবে।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: ফকির ও মিসকিন এর মাঝে পার্থক্য কী?

জবাবে শাইখ বলেন:

لفرق بين الفقير والمسكين إذا ذكرا جميعاً هو أن الفقير أشد حاجة من المسكين ، لأن الفقير مأخوذ من الفقر وهو الخلو ، ومنه قولهم : هذه أرض قفر ، أي ليس فيها نبات ، فالفقير هو الذي لا يجد شيئاً أو يجد من كفايته دون النصف ، والمسكين من هو فوق ذلك لا يجد الكفاية التامة ولكنه يجد النصف فأكثر ، مأخوذ من سكن يسكن ، لأن هذا المسكين عنده من الذل لسبب قلة ذات يده ، فإذا ذكرا جميعاً كان هذا هو الفرق بينهما ، أما إذا ذكر أحدهما دون الآخر فإن معناهما واحد ، فتقول مثلاً : تصدق على الفقراء وتصدق على المساكين ، ويكون المعنى واحداً ، ويفسر هنا الفقير بأنه من لا يجد كفايته وكفاية عائلته لمدة سنة ، والمسكين يفسر بذلك أيضاً ، ولهذا نقول في هاتين الكلمتين وأمثالهما إنهما كلمتان إذا اجتمعتا افترقتا وإذا افترقتا اجتمعتا ، ومثل ذلك الإسلام والإيمان فإذا ذكرا جميعاً صار الإيمان ما في القلب والإسلام في الجوارح ، وإذا قيل الإسلام عموماً دخل فيه أعمال الجوارح وأعمال القلوب ، وكذلك إذا قيل هذا مؤمن كما في قوله : (( فتحرير رقبة مؤمنة )) شمل الإسلام والإيمان ، ولهذا نظائر في اللغة العربية أن الكلمتين تطلقان فيكون لهما معنى عند الانفراد ومعنى عند الاجتماع .

“যদি “ফকির” ও “মিসকিন” একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, তখন ফকিরের অবস্থা মিসকিনের চেয়ে আরও করুণ বুঝায়। “ফকির” শব্দটি “ফাকর” থেকে এসেছে, যার অর্থ সম্পূর্ণ শূন্য থাকা। যেমন বলা হয়, “এটি একটি অনুর্বর জমি” অর্থাৎ সেখানে কোনো উদ্ভিদ জন্মায় না। তাই ফকির এমন ব্যক্তি, যার কিছুই নেই বা যার প্রয়োজনীয় চাহিদার অর্ধেকেরও কম আছে। অন্যদিকে, মিসকিন হলো সেই ব্যক্তি, যার কিছুটা আছে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়, বরং অর্ধেক বা তার থেকে বেশি পরিমাণে আছে। “মিসকিন” শব্দটি এসেছে “সাকানা ইয়াসকুনু” থেকে, যা শান্ত বা স্থির অবস্থাকে বোঝায়। এর অর্থ হলো, এই ব্যক্তি দারিদ্র্যের কারণে বিনয়ের সাথে থাকে, কারণ তার সম্পদের পরিমাণ খুবই সীমিত। যদি “ফকির” ও “মিসকিন” একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, তবে তাদের মধ্যে এই পার্থক্য থাকে। কিন্তু যদি একটিমাত্র শব্দ ব্যবহার করা হয়, তাহলে উভয়ই দরিদ্র ব্যক্তিকে বোঝায়। যেমন: “গরীবদের দান করুন”বা “মিসকীনদের সাহায্য করুন”এখানে উভয় ক্ষেত্রেই অর্থ অভাবগ্রস্ত মানুষ। সুতরাং গরিব হলো সেই ব্যক্তি যে নিজের ও তার পরিবারের এক বছরের জীবিকা অর্জনে অক্ষম।এ ধরনের শব্দের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা একসঙ্গে থাকলে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে, কিন্তু আলাদাভাবে ব্যবহৃত হলে একই অর্থ বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ, “ইসলাম” ও “ঈমান” একসঙ্গে উল্লেখ করলে, ঈমান অন্তরের বিশ্বাস বোঝায় এবং ইসলাম বাহ্যিক কর্মসমূহ বোঝায়। কিন্তু যদি কেবল “ইসলাম” বলা হয়, তবে তাতে অন্তরের বিশ্বাস ও বাহ্যিক কর্ম- উভয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়। ঠিক তেমনিভাবে, কুরআনে বলা হয়েছে: – فتحرير رقبة مؤمنة (অর্থাৎ একজন মুমিন দাস মুক্ত করা), যেখানে “মুমিন” শব্দটি ইসলাম ও ঈমান উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।এ ধরনের অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে দুটি শব্দ আলাদাভাবে থাকলে একে অপরের অর্থ ধারণ করে, কিন্তু একসঙ্গে থাকলে তাদের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য দেখা যায়।”(ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন;ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব; ও ফাতহু যিল জালালি ওয়াল ইকরাম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৯৫)।
.
আর ফকির মিসকীনের পরিচয় দিতে সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] ফকির ও মিসকীনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন:”ফকির হল সেই ব্যক্তি, যার সারা বছরের প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্পদ নেই, অথবা থাকলেও তা খুব অল্প পরিমাণে রয়েছে। সুতরাং, তাকে সম্পূর্ণ বছরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যাকাত দেওয়া হবে। আর মিসকীন হল সেই ব্যক্তি, যার কাছে সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় রসদের অর্ধেক বা অর্ধেকের কিছু বেশি আছে, অর্থাৎ তার অবস্থা ফকিরের তুলনায় কিছুটা ভালো। সুতরাং, তাকে তার পুরো বছরের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাকাত দেওয়া হবে।” [শারহু যাদিল মুস্তাকনি‘,খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়:শাইখ মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ মাদানী (হাফি.)। লিসান্স মাদীনা বিশ্ববিদ্যালয়,সৌদি আরব।

মানুষ যখন সালাত আদায় করে তখন তার সামনের দিকে আল্লাহ্‌ থাকেন এই হাদিসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা

 প্রশ্ন: মানুষ যখন সালাত আদায় করে তখন তার সামনের দিকে আল্লাহ্‌ থাকেন।”(সহিহ বুখারি হা/৪০৬) এই হাদিসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা কি? এটি দ্বারা কি আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান প্রমাণিত হয়?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তরের সারাংশ: আল্লাহ, তিনি তাঁর আরশের উপর আছেন এবং তিনি যথার্থভাবে কোনো অপব্যাখ্যা ছাড়াই সালাত আদায়কারী ব্যক্তির চেহারার দিকে মুখ করে আছেন। যেভাবে তাঁর মর্যাদা ও পরিপূর্ণতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সেইভাবে। বিস্তারিত জানতে পুরো আর্টিকেলটি পড়ুন।
.
বিস্তারিত উত্তর: প্রথমত: সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর একথা সবার জানা আবশ্যক যে, মহান আল্লাহর আসমা ও সিফাত তথা নাম ও গুণাবলির প্রতি বিশ্বাস পোষণ করা ইমানের একটি অন্যতম মৌলিক বিষয়। ব্যক্তির ‘আক্বীদাহর শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণীত হয় এই মৌলিক বিষয়ের মাধ্যমে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদাহ হল, আল্লাহ কুরআন মজীদে নিজেকে যেসমস্ত গুণে গুণাম্বিত করেছেন এবং যেসমস্ত নামে নিজেকে নামকরণ করেছেন তাঁর ওপর ঈমান আনয়ন করা আমাদের ওপর ওয়াজিব। এমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর যে সমস্ত নাম ও গুণাবলী বর্ণনা করেছেন কোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন অস্বীকৃতি, পরিচয়ের জন্য ধরণ নির্ধারণ করা বা উপমা পেশ করা ব্যতীত তার উপর ঈমান আনা আবশ্যক। পরিবর্তন সাধারণত হয়ে থাকে আয়াত ও হাদীসসমূহে। আর অস্বীকার হয়ে থাকে আকীদার ভিতরে, পদ্ধতি ও উপমা বর্ণনা করা হয় সিফাত তথা গুণের ভিতরে। সুতরাং উপরোক্ত চারটি দোষ হতে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিস্কার করতে হবে। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে কেন, কেমন,কিভাবে? এ ধরণের প্রশ্ন করা যাবে না। এমনিভাবে আল্লাহর গুণাবলীর ব্যাপারে ধরণ বর্ণনার চিন্তা করা থেকে মানুষ সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। এ পদ্ধতি অবলম্বন করলে অনেক বিষয় সহজ হয়ে যাবে। এটাই ছিল সালাফে সালেহীনের আদর্শ। ইমাম মালেকের (রাহিমাহুল্লাহ) কাছে এক লোক এসে বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহ তো ‘আরশের উপরে আছেন, তবে কীভাবে? উত্তরে ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, ‘আরশের উপরে থাকার বিষয়টি জ্ঞাত আছে। কীভাবে আছেন তা আমাদের জানার বাইরে। এ বিষয়ে ঈমান রাখা ওয়াজিব। আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদ‘আত। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] আল্লাহ্‌র আসমা ওয়াস সিফাতের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আকীদাহ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,الْإِيمَانُ بِمَا وَصَفَ بِهِ نَفْسَهُ فِي كِتَابِهِ وَبِمَا وَصَفَهُ بِهِ رَسُولُهُ مُحَمَّدٌ ﷺ مِنْ غَيْرِ تَحْرِيفٍ وَلَا تَعْطِيلٍ، وَمِنْ غَيْرِ: تَكْيِيفٍ وَلَا تَمْثِيلٍ“আল্লাহ্ স্বীয় কিতাবে তাঁর যেসব গুণ ও নামসমূহের দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করেছেন এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) যা দ্বারা তাঁকে গুণান্বিত করেছেন কোন প্রকার তাহরীফ (تَحْرِيْف) তথা বিকৃতি করা, তা‘তীল (تَعْطِيْل) তথা নিষ্ক্রিয় বা নাকচ করা, তাকয়ীফ (تَكْيِيْف) তথা ধরণ নির্ধারণ ও তামসীল (تَمْثِيْل) তথা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা ছাড়াই তার প্রতি ঈমান আনয়ন।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ, আকীদাতুল ওয়াসিতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৫৭)
.
দ্বিতীয়ত: একটি হাদিস দিয়ে জাহমিয়া ফিরকাসহ অন্যান্য বাতিল ফিরকার লোকেরা দাবি করে আল্লাহ তা’আলা যমীনে তার সৃষ্টির সঙ্গে আছেন’ এই মিথ্যা দাবির মাধ্যমে তারা আল্লাহ তা’আলার সর্বোর্ধ্বে থাকা এবং ‘আরশের উপরে থাকাকে নাকচ করে দেন। অথচ কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তিবুদ্ধি, স্বচ্ছ মানবপ্রকৃতি ও সালাফদের ইজমার দ্বারা একথা প্রমাণিত যে আল্লাহ তা‘আলা সর্বোচ্চে ও সর্বোর্ধ্বে। তাঁর জ্ঞানে, কুদরতে, শ্রবণে, দর্শনে, নিয়ন্ত্রণে এবং রুবুবিয়াতের অন্যান্য অর্থে সকল মাখলুকের ঊর্ধ্বে আরশের ওপর থাকা সত্ত্বেও সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন। জাহামিয়ারা আল্লাহর আরশের উপর থাকাকে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে যেসকল দলিলের অপব্যাখ্যা করে তার মধ্যে একটি হচ্ছে, প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৭৩ হি.] থেকে বর্ণিত: আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ يُصَلِّي، فَلاَ يَبْصُقْ قِبَلَ وَجْهِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ قِبَلَ وَجْهِهِ إِذَا صَلَّى ‏”‏‏.‏ “যখন তোমাদের কেউ সালাত আদায় করে সে যেন তার সামনের দিকে থুথু না ফেলে। কেননা, সে যখন সালাত আদায় করে তখন তার সামনের দিকে আল্লাহ্‌ তা’আলা থাকেন।”(সহীহ বুখারি: ৪০৬, ৪০৮ ও ৪০৯; সহীহ মুসলিম: ৫৪৭) এই হাদীসটি উল্লেখ করে তারা দাবি করে আল্লাহ আরশের উপর নয়; বরং আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান।(লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ) আসুন হাদীসটির প্রকৃত অর্থ ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে বিশিষ্ট ইমামগণ কী বলেছেন তা পর্যালোচনা করি।
.
হাদিসটির বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা: মহিমান্বিত, সর্বশক্তিমান আল্লাহ, তিনি তাঁর আরশের উপর আছেন এবং তিনি যথার্থভাবে কোনো অপব্যাখ্যা ছাড়াই সালাত আদায়কারী ব্যক্তির চেহারার দিকে মুখ করে আছেন। যেভাবে তাঁর মর্যাদা ও পরিপূর্ণতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সেইভাবে তিনি সালাত আদায়কারী ব্যক্তির সামনে আছেন। তবে সেটার ধরন আমাদের জ্ঞানের বাইরে, যেমন তাঁর সত্তা ও গুণাবলিও মানুষের কল্পনার ঊর্ধ্বে। সালাফে সালেহীন বলেন, আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক বান্দার ‘সঙ্গে থাকা’র বিষয়টি তার যে প্রকৃত অর্থ সে অর্থেই সত্য। তবে তা এমন ‘সঙ্গে থাকা’ যা আল্লাহর জন্য উপযোগী এবং যা এক মাখলুক কর্তৃক অন্য মাখলুকের সঙ্গে থাকার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়; কেননা আল্লাহ তা’আলা তাঁর নিজ সম্পর্কে বলেছেন: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ “তাঁর মত কিছুই নেই,তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”[সূরা শুরা, আয়াত: ১১) সুতরাং উক্ত হাদীস দ্বারা কোন অবস্থাতেই আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান প্রমাণিত হয় না। বরং যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান’ তাদের আক্বীদা বাতিল। আল্লাহর সত্তা সর্বত্র বিরাজমান নয়। বরং তাঁর ইলম ও কুদরত অর্থাৎ জ্ঞান ও ক্ষমতা সর্বত্র বিরাজমান। তিনি সপ্তম আসমানের উপরে তাঁর আরশের উপর উঠেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পরিচয় দিয়ে বলেন,الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ‘দয়াময় (আল্লাহ) আরশের উপর উঠেছেন” (সূরা ত্ব-হা:৫)।
..
হাদিসটি সম্পর্কে হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:قَوْلُهُ صلى الله عليه وسلم : ( إذَا قَامَ أَحَدُكُمْ إلَى الصَّلَاةِ فَإِنَّ اللَّهَ قِبَلَ وَجْهِهِ فَلا يَبْصُقْ قِبَلَ وَجْهِهِ ) حَقٌّ عَلَى ظَاهِرِهِ ، وَهُوَ سُبْحَانَهُ فَوْقَ الْعَرْشِ وَهُوَ قِبَلَ وَجْهِ الْمُصَلِّي ; بَلْ هَذَا الْوَصْفُ يَثْبُتُ لِلْمَخْلُوقَاتِ . فَإِنَّ الإِنْسَانَ لَوْ أَنَّهُ يُنَاجِي السَّمَاءَ أَوْ يُنَاجِي الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَكَانَتْ السَّمَاءُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ فَوْقَهُ وَكَانَتْ أَيْضًا قِبَلَ وَجْهِهِ اهـ “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বাণী (যখন তোমাদের কেউ সালাতের জন্য দাঁড়ায়, তখন আল্লাহ তার মুখমণ্ডলের সামনে থাকেন, সুতরাং সে যেন তার মুখের দিকে থুতু না ফেলে) এই কথাটি তার বাহ্যিক অর্থে সত্য, আল্লাহ তাঁর আরশের উপরে আছেন এবং তিনি মুসল্লির মুখমণ্ডলের সামনের দিকেও আছেন; বরং এই উভয় বিষয়টি সৃষ্টজীবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য (একত্র) হতে পারে। যদি কোনো মানুষ আকাশের দিকে অথবা সূর্য ও চাঁদের দিকে কিছু বলার জন্য মুখ তুলে ধরে,তাহলে আকাশ, সূর্য এবং চাঁদ তার ঊর্ধ্বে থাকবে এবং একই সঙ্গে এগুলো তার মুখমণ্ডলের সম্মুখেও থাকবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১০১) শাইখুল ইসলাম আরো বলেছেন:وَمِنْ الْمَعْلُومِ أَنَّ مَنْ تَوَجَّهَ إلَى الْقَمَرِ وَخَاطَبَهُ – إذَا قُدِّرَ أَنْ يُخَاطِبَهُ – لا يَتَوَجَّهُ إلَيْهِ إلا بِوَجْهِهِ مَعَ كَوْنِهِ فَوْقَهُ ، فَهُوَ مُسْتَقْبِلٌ لَهُ بِوَجْهِهِ مَعَ كَوْنِهِ فَوْقَهُ . . . فَكَذَلِكَ الْعَبْدُ إذَا قَامَ إلَى الصَّلاةِ فَإِنَّهُ يَسْتَقْبِلُ رَبَّهُ وَهُوَ فَوْقَهُ ، فَيَدْعُوهُ مِنْ تِلْقَائِهِ لا مِنْ يَمِينِهِ وَلا مِنْ شِمَالِهِ ، وَيَدْعُوهُ مِنْ الْعُلُوِّ لا مِنْ السُّفْلِ “এটি জানা কথা যে, যখন কেউ চাঁদের দিকে মুখ করে কথা বলে, যদি তা সম্ভব হয় তখন সে তার মুখটি চাঁদের দিকে ফিরিয়ে কথা বলে, কারণ চাঁদ তার উপরে থাকে। সুতরাং সে তার মুখ দিয়ে চাঁদের দিকে মুখ করে থাকে। তেমনিভাবে একজন মুসল্লি যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের দিকে মুখ করে থাকে, যিনি তার উপরে রয়েছেন। সে তার রবকে তার সম্মুখ থেকে আহ্বান করে, ডান দিক থেকে নয়, বাম দিক থেকেও নয়, এবং নিম্ন দিক থেকেও নয়; বরং সে তাঁকে ঊর্ধ্ব দিক থেকে আহ্বান করে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৬৭২)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেম:فَلَا تَنَافِيَ بَيْنَ الْأَمْرَيْنِ ، فَأَيْنَمَا وَلَّى الْمُصَلِّي فَهِيَ قِبْلَةُ اللَّهِ ، وَهُوَ مُسْتَقْبِلٌ وَجْهَ رَبِّهِ ; لِأَنَّهُ وَاسِعٌ ، وَالْعَبْدُ إِذَا قَامَ إِلَى الصَّلَاةِ فَإِنَّهُ يَسْتَقْبِلُ رَبَّهُ تَعَالَى ، وَاللَّهُ مُقْبِلٌ عَلَى كُلِّ مُصَلٍّ بِوَجْهِهِ ، كَمَا تَوَاتَرَتْ بِذَلِكَ الْأَحَادِيثُ الصَّحِيحَةُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ …. فَإِنَّهُ قَدْ دَلَّ الْعَقْلُ وَالْفِطْرَةُ وَجَمِيعُ كُتُبِ اللَّهِ السَّمَاوِيَّةِ : عَلَى أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى عَالٍ عَلَى خَلْقِهِ فَوْقَ جَمِيعِ الْمَخْلُوقَاتِ ، وَهُوَ مُسْتَوٍ عَلَى عَرْشِهِ ، وَعَرْشُهُ فَوْقَ السَّمَاوَاتِ كُلِّهَا ، فَهُوَ سُبْحَانَهُ مُحِيطٌ بِالْعَوَالِمِ كُلِّهَا “আর (আল্লাহ আরশের উপর রয়েছেন এবং সালাত আদায় কারীর সামনে) এই দুইটি বিষয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, কারণ যেখানেই মুসল্লি (সালাত আদায়কারী) মুখ ফিরাবে, সেটাই আল্লাহর কিবলা, আর সে (সালাতের সময়) তার রবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে; কারণ তিনি অসীম এবং বান্দা যখন সালাতের জন্য দাঁড়ায় তখন যেন সে তার রবকে সম্মুখে করে নিলো, আর আল্লাহ প্রত্যেক মুসল্লির দিকে তাঁর মুখোমুখি হয়ে তাকিয়ে থাকেন, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ হাদিসের মাধ্যমে পরম্পরাগতভাবে বর্ণিত হয়েছে। বুদ্ধি (আকিল), প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি (ফিতরাত) এবং আল্লাহর সকল আসমানী কিতাব থেকে প্রমাণিত যে আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল সৃষ্টির উপরে আছেন এবং তিনি তাঁর আরশের উপর রয়েছেন, আর তাঁর আরশ সমস্ত আসমানসমূহের ঊর্ধ্বে রয়েছে। তিনিই সুবহানাহু ওয়া তাআলা সমস্ত জগতকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” (ইবনুল ক্বাইয়িম, মুখতাসার সাওয়ায়েকুল মুরসালাহ, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪১৭)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:

يمكن الجمع بين ما ثبت من علو الله بذاته ، وكونه قِبَل المصلي من وجوه :

الأول: أن النصوص جمعت بينهما ، والنصوص لا تأتي بالمحال .

الثاني: أنه لا منافاة بين معنى العلو والمقابلة ، فقد يكون الشيء عالياً وهو مقابل ، لأن المقابلة لا تستلزم المحاذاة ، ألا ترى أن الرجل ينظر إلى الشمس حال بزوغها فيقول : إنها قبل وجهي , مع أنها في السماء ، ولا يعد ذلك تناقضاً في اللفظ ولا في المعنى ، فإذا جاز هذا في حق المخلوق ، ففي حق الخالق أولى .

الثالث : أنه لو فُرض أن بين معنى العلو والمقابلة تناقضاً وتعارضاً في حق المخلوق ؛ فإن ذلك لا يلزم في حق الخالق ، لأن الله تعالى ليس كمثله شيء في جميع صفاته ، فلا يقتضي كونه قِبل وجه المصلي ، أن يكون في المكان أو الحائط الذي يصلي إليه ، لوجوب علوه بذاته ، ولأنه لا يحيط به شيء من المخلوقات ، بل هو بكل شيء محيط ” .

“নিম্নোক্ত উপায়ে আল্লাহ কর্তৃক সালাত আদায়কারীর সামনে থাকা এবং তাঁর সত্তা আরশের উপরে থাকার বিষয়ে যা প্রমাণিত হয়েছে তা একত্রিত করা সম্ভব:

প্রথম: হাদীসের ভাষাসমূহ আল্লাহর উপরে থাকা ও মুসল্লির সামনে থাকার বিষয়টি একত্রিত করেছে। আর জানা কথা যে সহীহ হাদীস কখনো অসম্ভব কিছু সরবরাহ করে না।
.
দ্বিতীয়: (এটি বোঝা জরুরি যে) উচ্চতায় থাকা এবং চেহারার বিপরীতে থাকার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কখনো কখনো কোনো কিছু একই সাথে উচ্চতায় থাকা এবং বিপরীত থাকতে পারে, কারণ বিপরীতে থাকার জন্য সারিবদ্ধতার প্রয়োজন হয় না। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যে একজন মানুষ সূর্য উদিত হওয়ার সাথে সাথে সূর্যের দিকে তাকায় এবং বলে: এটা আমার মুখের সামনে? যদিও এটি আকাশে রয়েছে, এটি শব্দ বা অর্থের দ্বন্দ্ব হিসাবে বিবেচিত হয় না, যদি এটি একটি সৃষ্ট সত্তার ক্ষেত্রে জায়েয হয় তবে স্রষ্টার ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি উপযুক্ত।
.
তৃতীয়: যদি আমরা ধরে নিই যে, কোনো সৃষ্ট সত্তার ক্ষেত্রে উচ্চতা ও সামনা-সামনি গুণ দুটি বিরোধপূর্ণ, তাহলেও তা স্রষ্টার জন্য বিরোধপূর্ণ হওয়া আবশ্যক করে না। কারণ আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল গুণের দিক দিয়েই বান্দার মতো নয়। তাই তিনি সালাত আদায়কারীর সামনে থাকা এটা দাবী করে না যে তাঁর সত্তা সে মুসল্লির সামনে থাকা কোনো স্থান বা প্রাচীরের মধ্যে থাকবেন, কারণ তাঁর জন্য সত্তাগতভাবে উপরে থাকার বিষয়টি বহু (নকলী, আকলী, ফিতরী) দলীল বাধ্যতামূলকভাবে সাব্যস্ত করে। তাছাড়া কোনো প্রাণীই তাঁকে ঘিরে নেই বা পরিবেষ্টন করে নেই, বরং তিনি সবকিছুকে (তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে) পরিবেষ্টন করে আছেন।”ইবনু উসাইমীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫১)
.
অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, আল্লাহ তা‘আলার বরত্ব ও মর্যাদার সাথে যেভাবে উপযোগী সেভাবে তিনি সালাত আদায়কারীর সামনে থাকেন, এ কথার সঙ্গে,আল্লাহ তা‘আলা আরশের ওপরে আছেন, এর কোনো সংঘর্ষ নেই। তবে এর ধরন আমাদের জানা নেই,বিষয়টিকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে হবে যিনি এ ব্যাপারে সুপরিজ্ঞাত।আমাদের মহান রব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি সালাত আদায়কারীর সামনে থাকেন, যদিও তিনি আরশের ওপরে আছেন। সুতরাং ঊর্ধ্বতা এবং সালাত আদায়কারীর সামনে থাকা এই উভয় সত্যের মাঝে কোনো বিরোধ নেই। অতএব মাখলুকের সঙ্গে থাকা আল্লাহ তা‘আলার ঊর্ধ্বতাকে বাতিল করে দেয় না। বরং উভয়টিই সত্য।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: উস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফি.।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

মহান আল্লাহ আরশের উপর উঠেছেন এই আক্বীদা কি নবী মূসা আলাইহিস সালাম এর ছিল

 প্রশ্ন: মহান আল্লাহ আরশের উপর উঠেছেন এই আক্বীদা কি নবী মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর  ছিল নাকি মহাপাপিষ্ঠ ফেরাউনের ছিল?” (জাহমিয়াদের বাতিল আক্বীদা ও মিথ্যা যুক্তি খন্ডন)।

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তরের সারাংশ: মহান আল্লাহ আরশের উপর উঠেছেন এই আক্বীদা নবী মূসা (আলাইহিস সালাম) সহ সমস্ত নবী-রাসূলের ছিল, মহাপাপিষ্ঠ ফেরাউনের নয়। বিস্তারিত জানতে পুরো আর্টিকেলটি পড়ুন।
.
দলিলসহ বিস্তারিত উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর বঙ্গীয় জাহমি মতাদর্শের অন্যতম প্রচারক এবং দেওবন্দি আক্বীদার প্রতিনিধি বিলাল বিন আলী, যিনি জাহমিয়া ফিরকার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এই ব্যক্তি দিনের পর দিন ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য প্রচার করে সাধারণ মানুষের ঈমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার কথাবার্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টতই কুফরি আক্বীদার দিকে ইঙ্গিত করে, সে বিদআতি আক্বীদার প্রচারক এবং বাতিল বক্তব্যের মাধ্যমে সাধারন মানুষের ঈমান নষ্ট করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা সচেতন সাধারণ মুসলিমদেরকে বলবো বাংলাদেশি জাহমিদের পাতি নেতা বেলাল বিন আলী এবং গরিবের আবু হানিফা খ্যাত জনাব রেজাউল করিম আবরার এই দুই আক্বীদায় মিসকিন বক্তার আক্বিদা সংক্রান্ত মিথ্যা তথ্যের পোস্ট এবং ভিডিও গুলো দেখা ও বিশ্বাস করা থেকে সাবধান থাকবেন। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। “আর-রাহমান আরশের উপর উঠেছেন” এটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আক্বিদা, যা নাজাতপ্রাপ্ত একমাত্র দলের আক্বীদা। অপরদিকে “আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান” এই বাতিল আক্বিদাটি কেবল মুসলিম নামধারী বিদআতি ফিরকাগুলোর নয় বরং অনেক কাফের, মুশরিক, ই-হু-দি, খ্রি-ষ্টা-ন, হিন্দু ও অন্যান্য বিভ্রান্ত সম্প্রদায়েরও প্রচলিত আক্বীদা। কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি বঙ্গীয় বাতিল ফিরকার লোকেরা দীর্ঘদিন ধরে সালাফি মানহাজের বিশুদ্ধ দাওয়াতকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সূরা কাসাসের ৩৮ নং আয়াত এবং সূরা গাফিরের ৩৬-৩৭ নং আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা করে এক ভয়ংকর বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা মিথ্যাভাবে দাবি করে “আল্লাহ আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত” এই আক্বিদা নাকি আহলে সুন্নাহর নয়, বরং ফেরাউনের আক্বিদা! (লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ) এ এক চরম বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা এবং ধ্বংসাত্মক বক্তব্য! এবার তাদের নিজস্বভাবে ব্যাখ্যা করা সূরা গাফিরের ৩৬-৩৭ নম্বর আয়াতের সঠিক তাফসির তুলে ধরব এবং তাদের এই ভিত্তিহীন দাবি চিরতরে মাটিচাপা দেব ইনশাআল্লাহ।
.
পবিত্র কুরআনে দুটি স্থানে ফেরাউন এবং তার মন্ত্রী হামানের সাথে আসমানে আল্লাহ দেখার জন্য প্রাসাদ নির্মাণের কথোপকথন উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথমত: আল্লাহর বানী: وَ قَالَ فِرۡعَوۡنُ یٰۤاَیُّهَا الۡمَلَاُ مَا عَلِمۡتُ لَكُمۡ مِّنۡ اِلٰهٍ غَیۡرِیۡ ۚ فَاَوۡقِدۡ لِیۡ یٰهَامٰنُ عَلَی الطِّیۡنِ فَاجۡعَلۡ لِّیۡ صَرۡحًا لَّعَلِّیۡۤ اَطَّلِعُ اِلٰۤی اِلٰهِ مُوۡسٰی ۙ وَ اِنِّیۡ لَاَظُنُّهٗ مِنَ الۡكٰذِبِیۡنَ “আর ফিরআউন বলল, হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ আছে বলে জানি না! অতএব হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর; হয়ত আমি সেটাতে উঠে মূসার ইলাহকে দেখতে পারি। আর আমি তো মনে করি, সে অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।”(সূরা কাসাস: ২৮/৩৮)
দ্বিতীয়ত: আল্লাহর বাণী: وَ قَالَ فِرۡعَوۡنُ یٰهَامٰنُ ابۡنِ لِیۡ صَرۡحًا لَّعَلِّیۡۤ اَبۡلُغُ الۡاَسۡبَابَ, اَسۡبَابَ السَّمٰوٰتِ فَاَطَّلِعَ اِلٰۤی اِلٰهِ مُوۡسٰی وَ اِنِّیۡ لَاَظُنُّهٗ كَاذِبًا ؕ وَ كَذٰلِكَ زُیِّنَ لِفِرۡعَوۡنَ سُوۡٓءُ عَمَلِهٖ وَ صُدَّ عَنِ السَّبِیۡلِ ؕ وَ مَا كَیۡدُ فِرۡعَوۡنَ اِلَّا فِیۡ تَبَابٍ “ফিরআউন আরও বলল,হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ করো এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পাই,আসমানে আরোহনের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। আর এভাবে ফিরআউনের কাছে শোভনীয় করা হয়েছিল তার মন্দ কাজকে এবং তাকে নিবৃত্ত করা হয়েছিল সরল পথ থেকে এবং ফিরআউনের ষড়যন্ত্র কেবল ব্যর্থই ছিল।”(সূরা গাফির: ৩৭-৩৮)
.
এই আয়াতগুলো থেকে সহজেই বোঝা যায় যে নিশ্চয়ই মূসা (আলাইহিস সালাম) মহাপাপিষ্ঠ ফিরআউনকে জানিয়েছিলেন যে আল্লাহ আসমানে আছেন ।আসমানে গিয়ে পরীক্ষা করতে চেয়েছিল। অতঃপর ফিরাউন, মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করার জন্য তার অনুসারীদের সামনে আসমানে গিয়ে পরীক্ষা করতে চেয়েছেন। নিঃসন্দেহে যুক্তির দিক থেকে ফেরাউন তার অনুসারীদের বোঝাতে চেয়েছিল যে নবী মূসা (আলাইহিস সালাম) ভুল বলেছেন বরং তার (ফেরাউনের) চেয়ে বড় আর কোনো ইলাহ নেই। তাই ফেরাউন তার অনুসারীদের বলেছিল যে, নবী মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর এই দাবিকে সে মিথ্যা মনে করে যে তার (অর্থাৎ ফেরাউনের) অন্য কোনো ইলাহ আছে। এজন্য সে তার মন্ত্রী হামানকে একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করতে বলেছিল, যাতে তার অনুসারীদের কাছে প্রমাণ করতে পারে যে মূসার প্রভুর অস্তিত্ব নেই। যদি ফেরাউনের এই কাজ তার নিজের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে হতো যে আল্লাহ তাআলা কোথায় আছেন, তাহলে তার যুক্তি বাতিল হয়ে যেত। কারণ মূসার দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য তার নিজের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে যুক্তি দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়! বরং তা মূসার বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে, আর তা হলো আল্লাহ তাআলা আসমানে আছেন। তাই সে সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করতে বলেছিল, যাতে সে আসমানের দরজায় পৌঁছাতে পারে এবং তার অনুসারীদের কাছে প্রমাণ করতে পারে যে মূসা (আলাইহিস সালাম) তার দাবিতে মিথ্যাবাদী যে তার অন্য কোনো ইলাহ আছে; বরং এটি কেবল মূসার নিছক দাবি মাত্র। এছাড়াও, যদি ফেরাউনের এ কাজ মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর আক্বিদার (বিশ্বাসের) বিপরীত হতো, তাহলে তিনি (মূসা আলাইহিস সালাম ) এর জবাব দিতেন যে আকাশে তার ইলাহ নেই এবং এ-ও বলতেন যে মূসার ইলাহর অস্তিত্ব নেই তা প্রমাণ করার জন্য তোমার এই কর্ম (সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ) কোনো কাজে আসবে না। কারণ আমি (মূসা) কখনো দাবি করিনি যে আমার ইলাহ আসমানে। কিন্তু মূসা (আলাইহিস সালাম) এমন কিছু বলেননি। বরং তিনি নীরব ছিলেন। তার নীরবতা প্রমাণ করে যে তিনি (মূসা) বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহ আকাশে আছেন, যেমনটি অন্যান্য নবী ও রাসূলগণও তাদের উম্মতকে সংবাদ দিয়েছেন।
.
এবার চলুন দেখি ইতিহাসখ্যাত ইসলামি বিদ্বানগণ “নিশ্চয় আমি তাকে (মূসাকে) মিথ্যাবাদী মনে করি” এই আয়াতের বিশুদ্ধ তাফসির সম্পর্কে কী বলেছেন।
..
(১). ইয়াহইয়া ইবনে সালাম (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ২০০ হি.] দ্বিতীয় আয়াতটির ব্যাখ্যায় বলেন: (لعلي أبلغ الأسباب) “আমি যেন কারণসমূহে পৌঁছাতে পারি।” অর্থাৎ দরজাসমূহে। (فأطلع إلى إله موسى) “যাতে আমি মুসার ইলাহ’কে দেখতে পায়” অর্থাৎ যে দাবি সে করে। ( وإني لأظنه كاذبا) “ নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি” অর্থাৎ আসমানে কেউ নেই সে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলছে।”(তাফসিরুল কুরআনিল আযীয; ইবনে আবি যমনীন; ৪র্থ খণ্ড,পৃষ্ঠা: ১৩৪)।
(২). হারিস আল-মুহাসিবি (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ২৪৩ হি.]
বলেন: (وإني لأظنه كاذبا فيما قال لي إنه في السماء، فطَلَبَه حيث قال له موسى مع الظن منه بموسى عليه السلام أنه كاذب، ولو أن موسى عليه السلام أخبره أنه في كل مكان بذاته لطلبَه في الأرض أو في بيته وبدنه ولم يتعز ببنيان الصرح)
“নিশ্চয় আমি তাকে (মূসাকে) মিথ্যাবাদী মনে করি, যেহেতু সে আমাকে বলেছিল যে, আল্লাহ আসমানে আছেন। অতএব, সে তাকে সেখানেই খুঁজেছিল যেখানে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে বলেছিলেন। তবে সে মূসা (আলাইহিস সালাম) কে মিথ্যাবাদী মনে করছিল। যদি মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে বলতেন যে, আল্লাহ তা’আলা সত্তাগতভাবে সর্বত্র আছেন, তাহলে সে তাকে পৃথিবীতে বা তার নিজের ঘরে বা দেহে খুঁজত, এবং উচ্চ প্রাসাদ নির্মাণের প্রয়োজন হত না।” (ফাহমুল কুরআন ওয়া মা’আনিহ; মুহাসাবি কর্তৃক লিখিত; চতুর্থ খণ্ড)।
.
(৩). উসমান আদ-দারিমি (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:২৮০ হি.] বলেন:(ففي هذه الآية بيان بَيِّن ودلالة ظاهرة أن موسى كان يدعو فرعون إلى معرفة الله بأنه فوق السماء، فمن أجل ذلك أمر ببناء الصرح، ورام الاطلاع إليه) এই আয়াতে সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে যে, মূসা (আলাইহিস সালাম) ফেরাউনকে আল্লাহর পরিচয় দিতে ডাকতেন এই বলে যে, আল্লাহ আসমানের উপর আছেন। এজন্যই ফেরাউন সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিল এবং তা থেকে আল্লাহকে দেখার চেষ্টা করেছিল।”(আর-রাদ্দু ‘আলাল জাহমিয়্যাহ; আদ-দারিমি; পৃষ্ঠা: ৩৭)।
.
(৪). ইবনে জারির আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৩১০ হি.] বলেন: {وَإِنِّي لأظُنُّهُ} فيما يقول من أن له معبودًا يعبده في السماء، وأنه هو الذي يؤيده وينصره، وهو الذي أرسله إلينا {من الكاذبين}.(নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি, সে যা বলে – ‘যে তার প্রভু আসমানে আছেন, তিনিই তাকে সাহায্য করেন এবং সমর্থন করেন এবং তিনিই তাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন’।” (জামি’উল-বায়ান ফি তা’বীলিল-কুরআন; ইমাম তাবারী; ১৯তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৮১)। তিনি দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: (وإني لأظنه كاذبا) “নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি” অর্থাৎ আমি মনে করি মুসা মিথ্যা বলছে যে, তার আসমানে একজন রব আছেন যে তাকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।”(জামি’উল -বায়ান, ইমাম তাবারী; (২১তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৭)।
.
(৫). ইবনে খুযাইমাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৩১১ হি.] বলেন: (وفي قوله وإني لأظنه كاذبا دلالة على أن موسى قد كان أعلمه أن ربه جلا وعلا أعلى وفوق.)“নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি” এই বাক্যে ইঙ্গিত আছে যে মুসা (আলাইহিস সালাম) তাকে জানিয়েছিল যে,তার রব সুবহানাহু ওয়া তাআলা উপরে ও ঊর্ধ্বে আছেন।”(ইবনু খুযাইমাহ, কিতাবুত তাওহীদ, ১ম খণ্ড,পৃষ্ঠা: ২৬৪)।
.
(৬). ইমাম আবুল হাসান আশআ’রী রহিমাহুল্লাহ [মৃ: ৩২৪ হি.] বলেন : كُذِّبَ مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي قَوْلِهِ: إِنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ فَوْقَ السَّمَاوَاتِ.”ফেরাউন মূসা আলাইহিস সালামের এই কথা (আক্বীদা)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল যে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আসমানের উপরে আছেন।”(আল-ইবানাহ আন উসূলিদ দিআনাহ: পৃষ্ঠা: ১০৫)।
.
(৭). আবু আহমদ আল-কারজি (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৩৬০ হি.] বলেন: ফেরাউনের বক্তব্য :وَ قَالَ فِرۡعَوۡنُ یٰۤاَیُّهَا الۡمَلَاُ مَا عَلِمۡتُ لَکُمۡ مِّنۡ اِلٰهٍ غَیۡرِیۡ ۚ فَاَوۡقِدۡ لِیۡ یٰهَامٰنُ عَلَی الطِّیۡنِ فَاجۡعَلۡ لِّیۡ صَرۡحًا لَّعَلِّیۡۤ اَطَّلِعُ اِلٰۤی اِلٰهِ مُوۡسٰی অর্থ: “আর ফিরআউন বলল, হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে জানি না! অতএব হে হামান! তুমি আমার জন্য ইট পোড়াও এবং একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরী কর; হয়ত আমি সেটাতে উঠে মূসার ইলাহকে দেখতে পারি।” অতঃপর তিনি বলেন: حجة على من يزعم أن الله بنفسه في الأرض؛ حال في كل مكان، وينكر كينونته بنفسه في السماء وعلمه في الأرض. إذ محال أ، يقول فرعون هذا القول إلا وقد دلّـلَه موسى -صلى الله عليه- أن إلهه في السماء دون الأرض. فإن كان فرعون أنكر كينونته في السماء وثبته في الأرض فقد وافق القوم فرعون في قوله. وإن كان أنكره في السماء والأرض معًا فقد خالفوا موسى -صلى الله عليه – مع خلافهم لجميع الأنبياء والناس، وأهل الملل كافة سواهم. ولا أعلم في الأرض باطلا إلا وهذا أوحش منه، نعوذ بالله من الضلالة.) “এটি তাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী দলিল, যারা দাবি করে যে আল্লাহ নিজ সত্তায় পৃথিবীতে অবস্থান করেন; তিনি সর্বত্র বিরাজমান, আর তারা আসমানে তাঁর সত্তাগত অবস্থান ও পৃথিবীতে কেবল তাঁর জ্ঞানের উপস্থিতি অস্বীকার করে। কারণ ফেরাউন এই দাবি কখনোই করত না যদি না মুসা (আলাইহিস সালাম) তাকে প্রমাণ করে দিতেন যে তার ইলাহ আসমানে, পৃথিবীতে নয়। যদি ফেরাউন শুধু আসমানে আল্লাহর সত্তা অস্বীকার করে পৃথিবীতে তা স্বীকার করে থাকে, তাহলে এই দলটি ফেরাউনের কথারই সমর্থন করছে। আর যদি সে (ফেরাউন) আসমানে ও পৃথিবী উভয় স্থানেই আল্লাহর সত্তা অস্বীকার করে থাকে তাহলে তারা (জাহামিয়ারা) মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর বিপরীত মত পোষণের পাশাপাশি সকল নবী, সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথেও বিরোধ করছে। পৃথিবীতে এর চেয়ে ভয়াবহ ভ্রষ্টতা ও মিথ্যা আর নেই। আল্লাহ আমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন।”(আবু লাইস আস-সমরকান্দি; বাহরুল উলুম; ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬০৯)।
.
(৮). আবুল লাইস আস-সামারকান্দি (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৩৭৫ হি.] তার তাফসির ‘বাহরুল উলুম’-এ বলেন:
আল্লাহ তাআলা বলেন:{وَإِنّى لاظُنُّهُ مِنَ الكاذبين} أي: أحسب موسى بما يقول أن في السماء إلهاً من الكاذبين) “নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদীদের মধ্যে গণ্য করি” অর্থাৎ আমি মনে করি মুসা (আলাইহিস সালাম) যে বলে আসমানে একজন ইলাহ আছেন সে মিথ্যাবাদী।”(ইবনে আবি যামানীন; তাফসিরুল কুরআনিল আযীয, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৪)।
.
(৯). আবু সুলায়মান আল-খাত্তাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৩৮৮ হি.] তার বই শিআর আদ-দীন-এ বলেন: (وقال حكاية عن فرعون أنه قال {يا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ * أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى} فوقع قصد الكافر إلى الجهة التي أخبره موسى عنها ولذلك لم يطلبه في طول الأرض ولا عرضها ولم ينزل إلى طبقات الأرض السفلى. فدل ما تلوناه من هذه الآي على أن الله سبحانه في السماء مستو على العرش، ولو كان بكل مكان لم يكن لهذا التخصيص معنى ولا فيه فائدة، *وقد جرت عادة المسلمين خاصتهم وعامتهم بأن يدعو ربهم عند الابتهال والرغبة إليه ويرفعوا أيديهم إلى السماء وذلك لاستفاضة العلم عندهم بأن ربهم المدعو في السماء سبحانه) “ফিরাউন যখন বলল, ‘হামান, আমার জন্য একটি সুউচ্চ প্রাসাদ তৈরি করো, যেন আমি আসমানের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি এবং মুসার ঈলাহকে দেখতে পারি,’ তখন সে মূলত সেই দিকেই মনোনিবেশ করেছিল, যা সম্পর্কে মুসা (আলাইহিস সালাম) তাকে জানিয়েছিলেন। তাই সে কখনো মাটির গভীরে বা পৃথিবীর বিস্তৃত স্থানে তাকে খোঁজেনি। এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আসমানে আরশের ওপরে সমুন্নত আছেন। যদি তিনি সর্বত্রই থাকতেন, তবে আসমানের উল্লেখ করার কোনো অর্থ থাকতো না, এবং এতে কোনো উপকারও থাকতো না। এছাড়া,মুসলিমদের সাধারণ অভ্যাস হলো, যখন তারা আন্তরিকভাবে দোয়া করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, তখন তারা তাদের হাত আসমানের দিকে তোলে। এর কারণ হলো, তারা সুস্পষ্টভাবে জানে যে, তাদের রব, যাকে তারা ডাকছে, তিনি আসমানে আছেন।”(হাফিজ ইবনে আল-কাইয়িম আল-জাওযিয়াহ; শরহে সুনানে আবি দাউদ; খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা: ৩৫-৩৬)
.
(১০). আবু উসমান আস-সাবুনি (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৪৪৯ হি.] উল্লেখ করেছেন: (وأخبر الله سبحانه عن فرعون اللعين أنه قال لهامان: {ابن لي صرحا لعلي أبلغ الأسباب * أسباب السموات فأطلع إلى إله موسى وإني لأظنه كاذبا} . وإنما قال ذلك لأنه سمع موسى عليه السلام يذكر أن ربه في السماء، ألا ترى إلى قوله {وإني لأظنه كاذبا} يعني في قوله: إن في السماء إلهًا، وعلماء الأمة وأعيان الأئمة من السلف رحمهم الله لم يختلفوا في أن الله تعالى على عرشه، وعرشه فوق سماواته.)
“পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অভিশপ্ত ফিরাউনের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন: “হামান, আমার জন্য একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর, যাতে আমি আসমানের পথসমূহে আরোহণ করতে পারি। সেখানে পৌঁছে মুসার ইলাহ’কে দেখে আসব। নিঃসন্দেহে আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।” ফিরাউন এ কথা এজন্যই বলেছিল যে, সে মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে তার প্রতিপালক সম্পর্কে বলতে শুনেছিল, ‘তিনি আসমানে আছেন। লক্ষ্য করো, ফিরাউন বলেছে, “আমি নিশ্চিতভাবেই তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।” অর্থাৎ মুসার এই দাবির প্রতি সন্দেহ পোষণ করে যে, আসমানে কোনো সত্যিকার ইলাহ আছেন। অথচ উম্মাহর বিশিষ্ট আলিমগণ ও সালাফে সালিহীনের নেতৃস্থানীয় ইমামদের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই যে, আল্লাহ তাআলা স্বীয় আরশের উপর সমুন্নত, আর তাঁর আরশ সমস্ত আসমানের ঊর্ধ্বে।”(আকীদাতুস সালাফ ওয়া আসহাবিল হাদিস,আবু উসমান আস-সাবুনি; তাহকীক: নাসির আল-জাদী’; পৃষ্ঠা: ১৭৬)।
.
(১১). ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র আল-মালিকি (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত: ৪৬৩ হি.) বলেন: (فَدَلَّ على أن موسى عليه السلام كان يقول: إلهي في السماء، وفرعون يظنه كاذبا.) “এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, মুসা আলাইহিস সালাম বলতেন, “আমার ইলাহ আসমানে আছেন, আর ফিরাউন এ দাবিকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।”(ইবনে আব্দিল বার; আত-তামহিদ লিমা ফিল মুআত্তা মিনাল মা’আনি ওয়াল আসানিদ ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৩)। তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেছেন: ولم يزل المسلمون إذا دهمهم أمر يقلقهم فزعوا إلى ربهم فرفعوا أيديهم وأوجههم نحو السماء يدعونه ومخالفونا ينسبونا في ذلك إلى التشبيه والله المستعان ومن قال بما نطق به القرآن فلا عيب عليه عند ذوي الألباب“আর মুসলিমরা সর্বদাই এ আমলের ওপরই ছিল তারা অকস্মাৎ কোনো বিপদে আক্রান্ত হলে তাদের রবের কাছে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে যায়, আকাশের দিকে নিজেদের হাত উঠিয়ে ও চেহারা তুলে তাকিয়ে দোয়া করতে থাকে। পক্ষান্তরে আমাদের বিরোধীরা এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে তাশবিহ তথা সাদৃশ্যবাদের দিকে সম্পৃক্ত করে (অর্থাৎ আল্লাহ ওপরে আছেন বলে আমরা তাদের মতে সাদৃশ্যবাদী মুশাব্বিহা হয়ে গেছি)! আল্লাহুল মুস্তাআন। যাদের বুদ্ধি আছে, তাদের নিকটে সে ব্যক্তির কোনোই দোষ নেই, যে কুরআনের কথা অনুযায়ী কথা বলেছে।” [বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: ইবনু আব্দিল বার্র কৃত আল-ইস্তিজকার, খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৩৩৭; দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা (বৈরুত) কর্তৃক প্রকাশিত; প্রকাশকাল: ১৪২১ হি./২০০০ খ্রি. (১ম প্রকাশ)।
.
(১২). সাদ বিন আলী যাঞ্জানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:৪৭১ হি.] তার সুন্নাহ বিষয়ক কবিতার ব্যাখ্যায় বলেন: (وأخبر عن فرعون أنه قال: {يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ * أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا} وكان فرعون قد فهِم عن موسى أنه يُثبت إلهًا فوق السماء حتى رام بصرحه أن يطلع إليه، واتهم موسى بالكذب في ذلك، ومُخالفنا ليس يعلم أن الله فوقه بوجود ذاته فهو أعجز فهمًا من فرعون.) “ফেরাউন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: “ফিরআউন আরও বলল, হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পায়। আসমানে আরোহনের অবলম্বন, যেন দেখতে পায় মুসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।”ফেরাউন বুঝেছিল যে, মুসা আলাইহিস সালাম. আসমানের উপরে একজন স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করছেন। তাই সে এই প্রাসাদ বানিয়ে সেখানে পৌঁছতে চাইল এবং মুসাকে এ বিষয়ে মিথ্যাবাদী ভাবল। অথচ আমাদের বিরোধীরা (যারা আল্লাহর স্থান নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে) ফেরাউনের চেয়েও জ্ঞানহীন তারা স্বীকার করে না যে আল্লাহ তার সত্তাগতভাবে আসমানের উপরে আছেন।”(ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যাহ, “ইজতিমাউল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ আলা গাজয়ীল মু‘আত্তিলা ওয়াল জাহমিয়্যাহ” পৃষ্ঠা: ১৯৭-১৯৮)-তে এটি উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থটি আওয়াদ আব্দুল্লাহ আল-মুতিক কর্তৃক তাহকীক এবং এটি প্রথম সংস্করণ।
.
(১৩). আবুল কাসেম ইসমাঈল আল-আসবাহানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৫৩৫ হি.] বলেন: (وأخبر عن فرعون أنه قال:{يَاهَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا} فكان فرعون قد فهِم عن موسى أنه يثبت إلهًا فوق السماء حتى رام بصرحه أن يطلع إليه،واتّهم موسى بالكذب في ذلك)ফেরাউন সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: “ফিরআউন আরও বলল, হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ করো এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পায়। আসমানে আরোহনের অবলম্বন, যেন দেখতে পায় মুসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।” ফেরাউন বুঝেছিল যে, মুসা আলাইহিস সালাম আসমানের উপরে একজন স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করছেন। তাই সে এই প্রাসাদ বানিয়ে সেখানে পৌঁছতে চাইল এবং মুসা আলাইহিস সালাম এর দাবিকে মিথ্যা বলে সন্দেহ করল।”(আল-হুজ্জাহ ফি বায়ানিল মাহাজ্জাহ ইসমাইল আল-আসবাহানি; ২য় খণ্ড)।
.
(১৪). হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] এই আয়াতের তাফসিরে বলেন: يعني أظن موسى كاذبا في أن الله إلهه في السماء، والمخالف في هذه المسألة قد أنكر هذا، يزعم أن موسى كاذب في هذا بطريق القطع واليقين، مع مخالفته لرب العالمين، وتخطئته لنبيه الصادق الأمين، وتركه منهج الصحابة والتابعين، والأئمة السابقين، وسائر الخلق أجمعين. ونسأل الله تعالى أن يعصمنا من البدع برحمته، ويوفقنا لاتباع سنته.”আমি মনে করি মুসা মিথ্যা বলছে যে আল্লাহ আসমানে আছেন।” কিন্তু যে ব্যক্তি এই বিষয়ে (আল্লাহর অবস্থান সংক্রান্ত) ভিন্ন মত পোষণ করে, সে মূলত এটা অস্বীকার করে। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে মুসা আলাইহিস সালাম এ ব্যাপারে মিথ্যাবাদী- অথচ এভাবে সে বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর বিরোধিতা করে, সত্যবাদী ও আমানতদার নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে ভুল বলে আখ্যা দেয় এবং সাহাবা, তাবেঈন, পূর্ববর্তী ইমামগণ ও সমগ্র উম্মতের অনুসৃত পথ থেকে সরে যায়। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তার রহমতে আমাদেরকে বিদ‘আত থেকে রক্ষা করেন এবং তার সুন্নাহ অনুসরণের তাওফিক দেন।”(ইবন কুদামার “ইসবাতু সিফাতিল উলুয়্যী” পৃষ্ঠা: ৬৫)।
.
(১৫). হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন: ومن اعتقد أنه ليس فوق السماوات إله يعبد، ولا على العرش رب يصلى له ويسجد، وأن محمدا لم يعرج به إلى ربه، ولا نزل القرآن من عنده فهو معطل فرعوني ضال مبتدع؛ فإن فرعون كذب موسى في أن ربه فوق السماوات، وقال: يا هامان ابن لي صرحا لعلي أبلغ الأسباب أسباب السماوات فأطلع إلى إله موسى وإني لأظنه كاذبا .ومحمد – صلى الله عليه وسلم – صدق موسى في أن ربه في السماوات، فلما كان ليلة المعراج وعرج به إلى الله تعالى وفرض عليه ربه خمسين صلاة، ذكر أنه لما رجع إلى موسى قال له: ارجع إلى ربك فاسأله التخفيف لأمتك، فإن أمتك لا تطيق ذلك، فرجع إلى ربه فخفف عنه عشرا، ثم رجع إلى موسى فأخبره بذلك، فقال: ارجع إلى ربك فاسأله التخفيف لأمتك. وهذا الحديث في الصحاح .فمن وافق فرعون وخالف موسى ومحمدا فهو ضال، ومن مثل الله بخلقه فهو ضال. قال نعيم بن حماد: من شبه الله بخلقه فقد كفر، ومن جحد ما وصف الله به نفسه فقد كفر. وليس ما وصف الله به نفسه ولا رسوله تشبيها.
“যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে,(১).আসমানের উপরে কোনো ইলাহ নেই, যার ইবাদত করা যায়,(২).আরশের উপর কোনো রব নেই, যার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করা যায় এবং যাকে সিজদা করা যায়,(৩).মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মি‘রাজের মাধ্যমে তার রবের কাছে উঠানো হয়নি,(৪).এবং কুরআন আল্লাহর কাছ থেকে অবতীর্ণ হয়নি, সে একজন ফেরাউনী পথভ্রষ্ট মু‘আত্তিল (আল্লাহর গুণাবলী বা সত্তাকে অস্বীকারকারী) ও বিদ‘আতী। কারণ ফেরাউন মুসা আলাইহিস সালাম-কে এই বিষয়ে মিথ্যাবাদী বলেছিল যে, তার রব আসমানের উপরে রয়েছেন। ফেরাউন বলেছিল: “ফিরআউন আরও বলল, হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পায়। আসমানে আরোহনের অবলম্বন, যেন দেখতে পায় মুসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।”অথচ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসা আলাইহিস সালাম-এর এই সত্যতা স্বীকার করেছেন যে, তার রব আসমানের উপরে আছেন। মি‘রাজের রাতে যখন তাকে আল্লাহর দিকে উঠানো হয়েছিল এবং তার রব তার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছিলেন, তখন তিনি (মুসা আলাইহিস্ সালাম এর সাথে সাক্ষাতের ঘটনা) বর্ণনা করেছেন:মুসা আলাইহিস সালাম আমাকে বললেন: “আপনার রবের কাছে ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য সালাত হ্রাসের আবেদন করুন। কেননা তারা এটা পালন করতে সক্ষম হবে না।” আমি ফিরে গেলে আল্লাহ দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি মুসা আলাইহিস সালাম এর কাছে ফিরে এসে এটা জানালেন। আবার মুসা আলাইহিস সালাম নবী করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললেন: আপনার রবের কাছে ফিরে যান এবং এবং আপনার উম্মতের জন্য সালাত হ্রাসের আবেদন করুন…( সহিহ হাদীস) সুতরাং,যে ব্যক্তি ফেরাউনের সাথে একমত হয়ে মুসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতা করে, সে পথভ্রষ্ট।যে আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য দেয়, সেও পথভ্রষ্ট।ইমাম নু‘আইম ইবনে হাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, যে আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করে, সে কাফির । আর যে আল্লাহ নিজেকে যেসব গুণে বর্ণনা করেছেন তা অস্বীকার করে ,সেও কাফির । অথচ ,আল্লাহ ও তাঁর রসূল যেসব গুণ বর্ণনা করেছেন , তা কোনো সাদৃশ্য ( তাশবীহ) নয়। (ইবনু তাইমিয়াহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৯৯-২০০)।
.
১৬). ইমাম শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৪৮) বলেন:يعني: أظن موسى كاذبا أن إلهه في السماء، ولو لم يكن موسى عليه السلام يدعوه إلى إله في السماء لما قال هذا؛ إذ لو كان موسى قال له: إن الإله الذي أدعوك إليه، ليس في السماء/ لكان هذا القول من فرعون عبثًا، ولكان بناؤه القصر جنونًا.)“(ফেরাউন বলেন)”আমি মনে করি মুসা মিথ্যা বলছে যে তার রব আসমানে রয়েছেন।’ যদি মুসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনকে বলতেন, ‘যে রবের দিকে আমি আহবান করি, তিনি আসমানে নেই,’ তাহলে ফেরাউনের এই কথা অর্থহীন হতো এবং তার প্রাসাদ নির্মাণ পাগলামি ছাড়া কিছুই হতো না!”(ইমাম যাহাবীর “কিতাবুল আরশ”খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা:১৭)।
..
(১৭). আল্লামাহ ইবন আবীল ইয্ আল-হানাফি রহিমাহুল্লাহ [মৃ: ৭৯২ হি.] বলেন:مَنْ نَفَى الْعُلُوَّ مِنَ الْجَهْمِيَّةِ فَهُوَ فِرْعَوْنِي ، وَمَنْ أَثْبَتَهُ فَهُوَ مُوسَوِيٌّ مُحَمَّدِي.”যে ব্যক্তি জাহমিয়াদের মধ্যে থেকে আল্লাহ তাআলার সুউচ্চ সত্তাকে অস্বীকার করবে, সে একজন ফেরাউনি।আর যে ব্যক্তি এটিকে স্বীকার করবে, সে মূসার অনুসারী এবং মুহাম্মদী।”(শারহুল আক্বীদাতিত ত্বহাভিয়াহ: পৃষ্ঠা: ১৮৬)
.
(১৮). সৌদি আরবের প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.] বলেছেন,” (وَقَالَ فِرْعَوْنُ) متجرئا على ربه، ومموها على قومه السفهاء، أخِفاء العقول: (يَا أَيُّهَا الْمَلأ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرِي) أي: أنا وحدي، إلهكم ومعبودكم، ولو كان ثَمَّ إله غيري، لعلمته، فانظر إلى هذا الورع التام من فرعون!، حيث لم يقل ” ما لكم من إله غيري ” بل تورع وقال: (مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرِي) وهذا، لأنه عندهم، العالم الفاضل، الذي مهما قال ؛ فهو الحق، ومهما أمر أطاعوه.فلما قال هذه المقالة، التي قد تحتمل أن ثَمَّ إلها غيره، أراد أن يحقق النفي، الذي جعل فيه ذلك الاحتمال، فقال لـ ” هامان ” (فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ) ليجعل له لبنا من فخار. (فَاجْعَلْ لِي صَرْحًا) أي: بناء (لَعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لأظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ) ولكن سنحقق هذا الظن، ونريكم كذب موسى.فانظر هذه الجراءة العظيمة على الله، التي ما بلغها آدمي، كذب موسى، وادَّعى أنه إله، ونفى أن يكون له علم بالإله الحق، وفعل الأسباب، ليتوصل إلى إله موسى، وكل هذا ترويج!!ولكن العجب من هؤلاء الملأ الذين يزعمون أنهم كبار المملكة، المدبرون لشئونها، كيف لعب هذا الرجل بعقولهم، واستخف أحلامهم، وهذا لفسقهم الذي صار صفة راسخة فيهم.فسد دينهم، ثم تبع ذلك فساد عقولهم، فنسألك اللهم الثبات على الإيمان، وأن لا تزيغ قلوبنا بعد إذ هديتنا، وتهب لنا من لدنك رحمة إنك أنت الوهاب”.
“ফেরাউন তার প্রভুর প্রতি ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে এবং তার বোকা জনগণকে ধোঁকা দিয়ে বলল ‘যাদের বুদ্ধি-বিবেক লোপ পেয়েছিল’-“হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে জানি না!” অর্থাৎ, আমিই একমাত্র তোমাদের মাবুদ ও ইলাহ। যদি আমার অন্য কোনো ইলাহ থাকত, তবে আমি অবশ্যই তা জানতাম। দেখো, ফেরাউন এর পরিপূর্ণ সতর্কতা! সে সরাসরি বলেনি, “তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই,” বরং “আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ আছে বলে জানি না” বলে সংযত ভাষা ব্যবহার করেছে। কারণ, সে তাদের নিকট ছিল জ্ঞানী ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। সে যা-ই বলুক, তা সত্য বলে গণ্য হত। সে যা আদেশ করত, তারা তা মেনে নিত।যখন সে এই কথাটি বলল-যাতে অন্যান্য ইলাহ থাকার সম্ভাবনা থেকে যায়- তখন সে সেই সম্ভাবনা দূর করতে চাইল। তাই সে হামানকে বলল, ‘হে হামান! আমার জন্য কাদা পোড়াও’ (যাতে করে ইট তৈরি করা যায়) এবং “আমার জন্য একটি উচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর, যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পায়। নিশ্চয় আমি মনে করি, মুসা মিথ্যাবাদী।” অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে এই ধারণাটাই নিশ্চিত করবো এবং মুসার দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করব।দেখো,আল্লাহর প্রতি এই চরম ধৃষ্টতা! কোনো মানুষ এতদূর যায়নি। অতঃপর সে মুসাকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দিল, নিজেকে ইলাহ দাবি করল, সত্য ইলাহ’কে নাকচ করল এবং মুসার ইলাহকে খুঁজে বের করার জন্য নানান উপায় অবলম্বন করল। এ সবই ছিল প্রতারণা!কিন্তু আশ্চর্য হলো সেই প্রধানদের বিষয়, যারা রাজ্যের বড় নেতা ও শাসনকর্তা বলে দাবি করত। কীভাবে এই ব্যক্তি তাদের বুদ্ধি-বিবেক নিয়ে খেলা করল এবং তাদের জ্ঞানকে হেয় করল! এটি তাদের পাপাচারের ফল, যা তাদের চরিত্রে গেঁথে গিয়েছিল। তাদের দ্বীন নষ্ট হওয়ার পর তাদের বিবেকও নষ্ট হয়ে গেল। হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট প্রার্থনা করি, আমাদের ঈমানের উপর অবিচল থাকার তাওফিক দিন।আমাদের হৃদয়কে সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করবেন না। যেহেতু আপনি আমাদের হিদায়াত দান করেছেন। আমাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা।”(আত-তাহরীর ওয়াত-তানবীর; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ১২১-১২৪ পৃ.; তাফসীর আস-সাদী পৃষ্ঠা: ৬১৬)
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, মহান আল্লাহ আরশের উপর উঠেছেন যারা দাবি করে এটি মহাপাপিষ্ট ফেরাউনের আক্বীদা ছিল তাদের দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। বরং রহমান আরশের উপর উঠেছেন এটি নবী মূসা (আলাইহিস সালাম) সহ সকল নবী-রাসূলদের আক্বীদা এবং এটি এই উম্মতের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আক্বীদা। অপরদিকে “আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান” এই বাতিল আক্বিদাটি কেবল মুসলিম নামধারি বিদআতি ফিরকাগুলোর নয় বরং অনেক কাফের, মুশরিক, ই-হু-দি, খ্রি-ষ্টা-ন, হিন্দু ও অন্যান্য বিভ্রান্ত সম্প্রদায়েরও প্রচলিত আক্বীদা। আল্লাহ আমাদেরকে বাতিল ফিরকাদের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমীন!!(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
✍️জুয়েল মাহমুদ সালাফি
বৃহস্পতিবার, ২৭ই রমাদান ১৪৪৬ হিজরি।
২৭ই মার্স ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।
সম্পাদনায়: শাইখ মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ মাদানী (হাফি.)।
লিসান্স মাদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।

মহিলারা কি শখ করে বাসা বাড়িতে স্বামীর কিংবা পুরুষদের পোশাক পরিধান করতে পারবে

 প্রশ্ন: মহিলারা কি শখ করে বাসা বাড়িতে স্বামীর পাঞ্জাবি-টুপি কিংবা পুরুষদের পোশাক পরিধান করতে পারবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তরের সারাংশ: শারঈ নির্দেশনা অনুযায়ী পুরুষের জন্য নারীদের এবং নারীর জন্য পুরুষদের (খাস) নিদিষ্ট পোশাক পরিধান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ যা কবিরা গুনাহ। এমনকি স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সামনেও তা পরিধান করতে পারবে না। কেননা এতে পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করা হয় যা নিষিদ্ধ। তবে যা নারী-পুরুষের জন্য স্বতন্ত্র নয়; বরং উভয়ের জন্য সাধারণ হয় যেমন কিছু পোশাক (যেমন টি-শার্ট, চাদর, এক ধরনের শীতের জেকেট) যা পুরুষ ও নারী উভয়েই সমানভাবে পরিধান করে তাহলে শারঈ বিধিবিধান অনুসরণ করে পরিধান করলে এতে কোনো আপত্তি নেই।
.
দলিল সহকরে বিস্তারিত উত্তর: সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত বিধান হচ্ছে পুরুষের জন্য নারীদের পোশাক পরিধান করা এবং নারীদের জন্য পুরুষদের পোশাক পরিধান করা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। অতএব, যদি কোনো নারী এমন পোশাক পরিধান করেন যা বিশেষভাবে পুরুষদের জন্য (খাস) নির্ধারিত, যেমন: ট্রাউজার, পায়জামা-পাঞ্জাবি, প্যান্ট-শার্ট, টুপি ইত্যাদি তা ঘরে হোক বা বাইরে, স্বামীকে খুশি করার উদ্দেশ্যে হোক বা ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে হোক, বোরকার ভিতরে হোক আর বাহিরে, এমনকি সালাতের ভিতর হোক বা বাইরে যে কোনো অবস্থাতেই তা হারাম ও নাজায়েজ। অনুরূপভাবে ছোট বালিকার জন্য বালকের পোশাক পরিধান করাও নাজায়েয। একই রকম পুত্রের জন্য কন্যার বস্ত্র পরিধান করাও অবৈধ। কেননা এটাও সাদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত। আলেমগণ বলেন পোশাকের ক্ষেত্রে ছোট-বড় সকলের জন্য একই বিধান।(এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: বাহজাতু কুলুবিল আবরার, পৃষ্ঠা: ১৪৫; বিন বায; ফাতাওয়া নূর আলা দারব,খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ১৮৮-১৯১)
.
নারীরা পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে না। দলিল হচ্ছে: আবু হুরাইরা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ. রাসূল (ﷺ) যে পুরুষ নারীদের বেশভূষা অবলম্বন করে তাদের অভিশাপ করেছেন আবার যে সব নারীরা পুরুষদের বেশভূষা অবলম্বন করে তাদের অভিশাপ করেছেন”।(আবু দাউদ হা/৪০৯৮; মিশকাত হা/৪৪৬৯) অপর বর্ননায় আব্দুল্লাহ্‌ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন:لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِالرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ وَلاَ مَنْ تَشَبَّهَ بِالنِّسَاءِ مِنَ الرِّجَالِ ‘যে নারী পুরুষের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং যেসব পুরুষ নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়”।(মুসনাদে আহমাদ হা/৬৮৭৫; সহীহুল জামে হা/৫৪৩৩) অপর বর্ননায় রাসূল (ﷺ) আরও বলেন, ثَلاَثٌ لاَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلاَ يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُّ وَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ وَالدَّيُّوثُ. وَثَلاَثَةٌ لاَ يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُّ وَالِدَيْهِ وَالْمُدْمِنُ الْخَمْرَ وَالْمَنَّانُ بِمَا أَعْطَى. ‘তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ রাববুল আলামীন তাদের প্রতি কোনো করুণা করবেন না। এক. যে মাতা-পিতার অবাধ্য হয়, দুই. যে নারী পুরুষের আকৃতি অবলম্বন করে, তিন. দাইয়ূস (এমন ব্যক্তি যার পরিবারের মেয়েরা অশ্লীল কাজে লিপ্ত অথচ সে তাতে বিন্দুমাত্র বাঁধা দেয় না)। আর তিন ব্যক্তির দিকে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ রাববুল আলামীন ভ্রুক্ষেপ করবেন না। এক. যে মাতা-পিতার অবাধ্য হয়, দুই. মদ্যপ, তিন. খোঁটাদানকারী দাতা”।(মুসনাদে আহমাদ হা/৬১৮০; নাসাঈ হা/২৫৬২)
.
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:
لعن النبي صلى الله عليه وسلم المخنثين من الرجال والمترجلات من النساء، وقال: أخرجوهم من بُيُوتِكُمْ ، وقال: فأخرج النبي صلى الله عليه وسلم فلاناً، وأخرج عمر فلاناً”
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীর রূপ ধারণকারী পুরুষ ও পুরুষের রূপ ধারণকারী নারীদেরকে লানত করেছেন”। তিনি আরও বলেছেন: “তাদেরকে তোমাদের গৃহ থেকে বের করে দাও”। ইবনে আব্বাস আরও বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অমুক অমুককে বের করে দিয়েছেন এবং উমর (রাঃ) অমুক অমুককে বের করে দিয়েছেন।”(সহীহ বুখারী হা/৫৮৮৬) ইবনে আবু মুলাইকা (তাঁর নাম হচ্ছে আব্দুল্লাহ্‌ বিন উবাইদুল্লাহ্‌) বলেন: আয়েশা (রাঃ) কে বলা হল: কোন নারী কি (পুরুষের) স্যান্ডেল পরতে পারে? তিনি বললেন: “لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم الرجلة من النساء “রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষের সাথে সাদৃশ্য-গ্রহণকারী নারীদের উপর লানত করেছেন।”(আবু দাউদ হা/৪০৯৯; ইমাম বায়হাকী “শু’আবুল ঈমান” হা/৭৮০৪)
.
উপরোক্ত হাদীসগুলো উল্লেখ করে সৌদি আরবের প্রখ্যাত ‘আলিমে দ্বীন, শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:وفي هذه الأحاديث دلالة واضحة على تحريم تشبه النساء بالرجال، وعلى العكس، وهي عادة تشمل اللباس وغيره إلا الحديث الأول فهو نص في اللباس وحده
“এই হাদিসগুলোতে নারীদের জন্য পুরুষের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করা এবং পুরুষদের জন্য নারীদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করা হারাম হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এই সাদৃশ্য গ্রহণ পোশাক-পরিচ্ছদকে এবং অন্যান্য বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে; শুধু প্রথম হাদিসটি ছাড়া। সে হাদিসটি এককভাবে পোশাকের ব্যাপারে।”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৬৯৯১)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন: فالفارق بين لباس الرجال والنساء يعود إلى ما يصلح للرجال وما يصلح للنساء، وهو ما يناسب ما يؤمر به الرجال وما تؤمر به النساء، فالنساء مأمورات بالاستتار والاحتجاب دون التبرج والظهور؛ “পুরুষ ও নারীর পোশাকে ব্যবধান সৃষ্টিকারী বস্তু তা-ই যা তাদের প্রত্যেকের সাথে যথাযথ ও সামঞ্জস্য। পুরুষের জন্য শোভনীয় পোশাক পুরুষরা পরিধান করবে এবং নারীদের জন্য শোভনীয় পোশাক নারীরা পরিধান করবে এটিই শরী‘আতের নির্দেশ। নারীদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে তারা ঢেকে থাকবে ও পর্দা করবে, প্রকাশ্যে আশা ও সৌন্দর্য প্রকাশ করা তাদের পক্ষে বৈধ নয়।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২২; পৃষ্ঠা:১৪৮)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যদি কোনো মহিলা তার স্বামীর পোশাক পরিধান করে এবং এরপর সেই পোশাকের উপর নিজের বা অন্য কোনো পোশাক পরে, তবে কি তা বৈধ হবে, নাকি নিষিদ্ধ?

শাইখ উত্তরে বলেন:ليس للمرأة أن تلبس لبسة الرجل لا زوجها ولا غيره، في الحديث الصحيح يقول النبي ﷺ: لعن الله المرأة تلبس لبسة الرجل، ولعن الله الرجل يلبس لبسة المرأة، فالواجب عليها أن تلبس لباسها الخاص والرجل كذلك لباسه الخاص، أما أن تلبس لباسه الخاص ولو تحت ثيابها ما يجوز، وهكذا الرجل ليس له أن يلبس لباس المرأة ولو تحت ثيابه. نعم.المقدم: جزاكم الله خيراً.
“একজন নারীর জন্য পুরুষের পোশাক পরিধান করা বৈধ নয়, তা সে তার স্বামীর হোক বা অন্য কারও হোক। সহীহ হাদিসে নবী ﷺ বলেছেন: “আল্লাহ সেই নারীকে অভিশাপ করেছেন, যে পুরুষের পোশাক পরিধান করে, এবং আল্লাহ সেই পুরুষকেও অভিশাপ করেছেন, যে নারীর পোশাক পরিধান করে।” সুতরাং, একজন নারীর জন্য তার নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করা আবশ্যক, এবং একইভাবে একজন পুরুষের জন্যও তার নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করা আবশ্যক। কোনো নারীর জন্য পুরুষের বিশেষ পোশাক পরিধান করা জায়েজ নয়, এমনকি যদি তা তার নিজস্ব পোশাকের নিচেও হয়। একইভাবে, একজন পুরুষের জন্যও নারীর পোশাক পরিধান করা বৈধ নয়, এমনকি যদি তা তার নিজস্ব পোশাকের নিচেও হয়। উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-৮৭৬৭)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:الثياب تنقسم إلى ثلاثة أقسام: قسم خاص بالرجال، وقسم خاص بالنساء، ولا يختلف الناس فيه، وقسم ‌مشترك، فأما الأول والثاني فأمرهما ظاهر، يعني: لا يلبس ‌الرجل لبسة ‌المرأة ولا ‌المرأة لبسة ‌الرجل.وأما الثالث فلا بأس إذا كان مشتركًا بين الطرفين مثل بعض الفنايل يلبسها الرجال والنساء على حدٍّ سواء”পোশাক তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত: পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট একটি শ্রেণী, মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট একটি শ্রেণী এবং এটি নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। আর একটি হলো উভয়ের জন্য সাধারণ।প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের ব্যাপারে বিষয়টি স্পষ্ট অর্থাৎ, একজন পুরুষ নারীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করবে না এবং একজন নারীও পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করবে না। আর তৃতীয় ভাগের ক্ষেত্রে, যদি তা উভয়ের জন্য সাধারণ হয় যেমন কিছু পোশাক (যেমন টি-শার্ট) যা পুরুষ ও নারী উভয়েই সমানভাবে পরিধান করে তাহলে এতে কোনো আপত্তি নেই।”(ইবনু উসাইমিন, ফাতহু জিল জালালি ওয়াল ইকরাম বি শারহি বুলুগিল মারাম: খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৬৭)
.
সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুল মুহসিন আল-‘আব্বাদ আল-বাদর (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৩ হি./১৯৩৪ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:কিছু দেশে পুরুষ ও নারীদের পোশাকের মধ্যে তেমন পার্থক্য থাকে না; কেবল নারীরা নিজেদের ঢেকে রাখেন, এটাই মূল পার্থক্য। এ বিষয়ে তিনি উত্তরে বলেন:إذا وجد هذا الشيء، وكان هذا هو الواقع فيكون التشبه في الأمور الأخرى، يعني: من ناحية الثوب إذا كان اللون الفلاني من خصائص الرجال أو من خصائص النساء وتعارف عليه أهل البلد؛ فلا يقدم الرجل على أن يلبس شيئاً عرف بأنه من خصائص المرأة أو اشتهر بأنه من خصائص المرأة، وكذلك العكس”যদি বাস্তবিকভাবে এমন কিছু বিদ্যমান থাকে, তবে এটি শুধু পোশাকের সাদৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্যান্য বিষয়েও সাদৃশ্য অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ, যদি কোনো নির্দিষ্ট রং বা পোশাকের ধরন কোনো জাতির মধ্যে পুরুষদের জন্য বিশেষভাবে স্বতন্ত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে থাকে, কিংবা নারীদের জন্য স্বতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃত হয়ে থাকে, এবং সেটি সে অঞ্চলের লোকদের কাছে প্রচলিত হয়ে থাকে তাহলে একজন পুরুষের জন্য জায়েজ নয় এমন কিছু পরিধান করা, যা নারীদের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত বা নারীদের জন্য প্রসিদ্ধ। একইভাবে একজন নারীরও উচিত নয় এমন কিছু পরিধান করা যা পুরুষদের জন্য নির্ধারিত বা পুরুষদের মধ্যে প্রসিদ্ধ।”(শারহে সুনানে আবি দাউদ, আল-ইবাদ, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৪৬০ আল-শামিলাহ সংখ্যা অনুযায়ী)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ,শাইখ আব্দুল করিম আল-খুদাইর (হাফিযাহুল্লাহ)[জন্ম:১৩৭৪ হি:] বলেছেন: وفي الملابس التي قد لا يُفرَّق فيها بين كونه للرجال أو للنساء، فمثل هذه الحالة ينبغي أن يحصل التمايز بين الرجال والنساء، لكن هناك أنواع خفيفة بحيث إذا رأيتَ اللابس ما تقول: هذا رجل أو امرأة! فمثل هذا يُتسامح فيه”এমন কিছু পোশাক রয়েছে যেগুলোর মধ্যে পুরুষ এবং মহিলার পোশাকের মাঝে পার্থক্য করা সম্ভব নয়। সুতরাং এ ধরনের অবস্থায় পুরুষ ও মহিলার মধ্যে পার্থক্য করা উচিত। তবে কিছু হালকা ধরনের পোশাক রয়েছে, যা পরিধানকারীকে দেখে আপনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না, এটি একজন পুরুষ নাকি একজন মহিলা! এ রকম বিষয়ে কিছুটা (ছাড়) নমনীয়তা প্রদর্শন করা হয়।”(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪৭১৪২৩)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের উচিত ইসলামী আদর্শ, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে আগ্রহী হওয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আনন্দ, উৎসব, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য ও পানীয়সহ সকল বিষয়ে ইসলামী রীতি-নীতি অনুসরণ করা। বিশেষ করে নারীদের জন্য এমন পোশাক পরিহার করা আবশ্যক যা পুরুষদের জন্য (খাস) নিদিষ্ট এবং এমন পোশাক যা শরীরের গোপনাঙ্গ স্পষ্ট করে বা কাফিরদের অনুকরণ করে। কারণ এটি শরীয়তসম্মত নয়। আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করছি তিনি যেন মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করে দেন। তাদের সকলকে যেন সঠিক পথে পরিচালিত করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী ও দুআ কবুলকারী।
____________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
মঙ্গলবার।
২৫ই রমাদান ১৪৪৬ হিজরি।
২৫ই মার্চ ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।

নির্দিষ্ট করে কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামী বলা যাবে কি

 প্রশ্ন: নির্দিষ্ট করে কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামী বলা যাবে কি? এই বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আক্বীদা কি?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর নিদিষ্ট করে কাউকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বক্তব্য বা মূলনীতি হলো, মহান আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (ﷺ) যাদের সম্পর্কে জান্নাতী অথবা জাহান্নামী হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ঘোষণা করেছেন শুধু তাদেরকেই জান্নাতী অথবা জাহান্নামী বলা যাবে, এর বাহিরে অন্য কাউকে নয়। কারন এগুলো আক্বীদার বিষয় যা কুরআন সুন্নাহর দলিল নির্ভর হতে হবে, এ ব্যাপারে কোনো যুক্তি বা ইজতিহাদের অবকাশ নেই। তাছাড়া কেউ জান্নাতের কাজ করলেই তাকে জান্নাতী এবং জাহান্নামের কাজ করলেই তাকে জাহান্নামী মনে করা ঠিক নয়। হতে পারে সে মরণের পূর্বে অথবা আল্লাহর কাছে তার বিপরীত হতে পারে যার একাধিক প্রমাণ হাদিসে রয়েছে। সুতরাং ইসলামি শরীয়তের (কুরআন ও সুন্নাহ) দলিলের ভিত্তিতে যাদের জান্নাতী বা জাহান্নামী বলে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, আমরা কেবল তাদের ক্ষেত্রেই সে রকম সিদ্ধান্ত দিতে পারি। এর বাইরে সাধারণ মানুষ সম্পর্কে নিশ্চিত করে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা আমাদের জন্য জায়েজ নয়। বরং যারা ঈমান ও সৎকর্মে জীবনযাপন করে তাদের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে জান্নাতের আশা রাখি ইন শাহ্ আল্লাহ। আর যারা পাপে নিমগ্ন তাদের ব্যাপারে আল্লাহর শাস্তির ভয় করি। কেননা সকল মানুষের শেষ পরিণতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: বিন বায: মাজমূঊ ফাতাওয়া: খণ্ড: ২৫; পৃষ্ঠা: ১২১; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব,ফাতওয়া নং-৭৩১)।
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কাউকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলে ঘোষণা করা দু-ধরনের হয়ে থাকে।

(১) সাধারণ গুণ বা কর্মের ভিত্তিতে সাধারণভাবে জান্নাতি কিংবা জাহান্নামী বলা: এ ধরনের বর্ণনায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য না করে সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে। যেমন “যে ব্যক্তি ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে,সে জান্নাতের অধিকারী হবে” অথবা “যে ব্যক্তি কুফরি বা শিরক করে, তার পরিণতি জাহান্নাম” অর্থাৎ যে ব্যক্তি বড় শিরকে জড়িয়ে পড়ে, সে নিঃসন্দেহে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে কাফের হিসেবে গণ্য হয়। ফলে তওবা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করলে কুরআন ও সুন্নাহের অকাট্য প্রমাণ অনুযায়ী তার গন্তব্যস্থল হবে জাহান্নাম। অনুরূপভাবে আমরা জানি যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমাদান মাসে রোযা রাখে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়। আবার যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্জ সম্পাদন করে তার জন্য প্রতিদান হলো জান্নাত। সুতরাং নির্দিষ্ট কিছু বিশ্বাস ও কর্মের উপর ভিত্তি করে কুরআন ও সুন্নাহয় এমন বহু প্রমাণ রয়েছে, যা জান্নাত ও জাহান্নামের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে।

উদাহরণস্বরূপ: যদি কেউ প্রশ্ন করে এক ব্যক্তি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কারো নিকট দোয়া করে, সাহায্য চায়, তাহলে সে জান্নাতী নাকি জাহান্নামী? উত্তরে বলা হবে কেউ যদি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কারো নিকট দোয়া করে বা সাহায্য প্রার্থনা করে তাহলে সে এক মহাপাপে লিপ্ত হয়েছে, যা তাওহীদের স্পষ্ট বিরোধিতা। যদি সে এই শিরক থেকে তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে কুফরীর অবস্থায় মারা যাবে এবং তার পরিণাম ভয়াবহ জাহান্নাম। কারণ, সে আল্লাহর একত্ববাদের পরিপন্থী এক গুরুতর গোনাহে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অটল ছিল। অন্যদিকে, যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্ব পালন করে এবং হজের সময় নিজেকে অশ্লীলতা, গুনাহ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, অতঃপর সে মৃত্যু বরণ করে ইন শাহ্ আল্লাহ তাহলে আমরা আমভাবে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে জান্নাতের আশা করতে পারি এবং তাদের জন্য জান্নাত লাভের দোয়া করতে পারি। অথবা যে ব্যক্তি মৃত্যুর সময় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” উচ্চারণ করে তাওহীদের সাক্ষ্য দিয়ে বিদায় নেয়, তার জন্যেও জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। এসব বক্তব্য ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়, বরং তাদের কর্ম, আকীদা ও শেষ অবস্থার ভিত্তিতে সাধারণ নীতির আলোকে বলা হয়। কেবল আল্লাহই নির্ধারিত ভাবে জানেন কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী।
.

(২) নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা: এই ধরণের ঘোষণা কেবলমাত্র যাদের ব্যাপারে কুরআন বা সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা হয়েছে, শুধু তাদের ক্ষেত্রেই করা যায়। যেমন কুরআন সুন্নাহের বিভিন্ন বর্ননায় রাসূল (ﷺ) যাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন তাদেরকে “জান্নাতী” বলা যাবে। আবার যেসব কাফিরদের সম্পর্কে কুরআনে কিংবা সহীহ হাদিসে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাদেরকে “জাহান্নামী” বলা যাবে।
.
উদাহরণস্বরূপ: দুনিয়াতেই যারা জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন, তাঁদেরকে জান্নাতী বলে সম্বোধন করতে কোন সমস্যা নেই। রাসূল (ﷺ), একটি হাদীসে আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী, ত্বালহা, যুবায়র ইবনুল আওয়াম, সা‘দ ইবনু মালিক, আব্দুর রাহমান ইবনু আওফ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁরা সকলেই জান্নাতী বলে ঘোষণা দিয়েছেন (আবূ দাঊদ, হা/৪৬৪৯; তিরমিযী, হা/৩৭৪৭, ৩৭৪৮, ৩৭৫৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৩ সহীহুল জামি‘, হা/৫০, ৪০১০)। এছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে আরো বহু সাহাবীকে রাসূল ﷺ দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাদের মাঝে আছেন (১) উক্কাশাহ বিন মিহশান (রা.) (বু. মু. মিশকাত হা/৫২৯৬)। (২) ইয়াসির (৩) ‘আম্মার (৪) সুমাইয়া (হাকেম হা/৫৬৬৬) (৫) বেলাল বিন রাবাহ (তিরমিযী হা/৩৬৮৯) (৬) উসায়রিম ‘আমর বিন সাবেত (আহমাদ হা/২৩৬৮৪) (৭) সাবেত বিন ক্বায়েস (মুসলিম হা/১১৯) (৮) হারেসাহ বিন সুরাক্বাহ (বুখারী হা/২৮০৯) (৯) হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (মুসলিম হা/১৭৮৮) (১০) যায়েদ বিন হারেসাহ (১১) আব্দুল্লাহ বিন রওয়াহা (আহমাদ হা/২২৬০৪; ইবনু হিববান হা/৭০৪৮) (১২) সা‘দ বিন মু‘আয (মুসলিম হা/২৪৬৮) (১৩) সালমান ফারেসী (তিরমিযী হা/৩৭৯৭) (১৪) আব্দুল্লাহ বিন সালাম (বুখারী হা/৩৮১২) (১৫) জাবের (রা.)-এর পিতা আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর (তিরমিযী হা/৩০১০) (১৬) আবুদ্দাহদাহ আনসারী (মুসলিম হা/৯৬৫) (১৭) রুমায়সা বিনতে মিলহান (বুখারী হা/৩৬৭৯) (১৮) উম্মে যুমার হাবাশীয়া (বুখারী হা/৫৬৫২; মুসলিম হা/২৫৭৬) প্রমুখ।
.
পক্ষান্তরে যারা দুনিয়াতেই জাহান্নামের দুঃসংবাদ পেয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে যেমন: (১) ফিরআউন। মহান আল্লাহ তার সম্বন্ধে বলেছেন,يَقْدُمُ قَوْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَوْرَدَهُمُ النَّارَ ۖ وَبِئْسَ الْوِرْدُ الْمَوْرُودُ অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে, অতঃপর তাদেরকে উপনীত করবে দোযখে। আর তা অতি নিকৃষ্ট স্থান যাতে তারা উপনীত হবে। (সূরা হূদ ৯৮) (২) নূহ ও লূত (আলাইহিমাস সালাম)-এর স্ত্রী ও মহান আল্লাহ তাদের সম্বন্ধে বলেন, আর আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য নূহ ও লুতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছেন। তারা ছিল আমার দাসদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ দাসের অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ফলে তারা (নূহ ও লূত) তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হল, ‘জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ কর। (সূরা তাহরীম ১০) এখানে খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা বলতে দাম্পত্যের খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা উদ্দেশ্য নয়। কেননা, এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, কোনো নবীর স্ত্রী ব্যভিচারিণী ছিলেন না। (ফাতহুল কাদীর) খিয়ানত বলতে বুঝানো হয়েছে, এরা তাদের স্বামীদের উপর ঈমান আনেনি। তারা মুনাফিক্বী ও কপটতায় লিপ্ত ছিল এবং নিজেদের কাফের জাতির প্রতি তারা সমবেদনা পোষণ করত। যেমন, নূহ (আ.)-এর স্ত্রী নূহ (আ.)-এর ব্যাপারে লোকদেরকে বলে বেড়াত যে, এ একজন পাগল। আর লূত (আ.)-এর স্ত্রী তার গোত্রের লোকদেরকে নিজ বাড়ীতে আগত অতিথির সংবাদ পৌছে দিত। কেউ কেউ বলেন, এরা উভয়ই তাদের জাতির লোকদের মাঝে নিজ নিজ স্বামীর চুগলি করে বেড়াত। নূহ (আ.) এবং লূত (আ.) তাঁরা উভয়েই ছিলেন আল্লাহর পয়গম্বর, আর পয়গম্বররা আল্লাহর অতি নিকটতম বান্দাদের মধ্যে গণ্য হন, তা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদের স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে পারবেন না।

(৩) আবূ লাহাব ও তার স্ত্রী। মহান আল্লাহ বলেন, ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন উপকারে আসবে না। অচিরেই সে শিখা বিশিষ্ট (জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে এবং তার স্ত্রীও; যে ইন্ধন বহন করে। তার গলদেশে থাকবে খেজুর আঁশের পাকানো রশি (সূরা আল-লাহাব ৩-৪)।

(৪) আমর বিন আমের আল-খুযায়ী। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমি ‘আম্‌র ইব্‌নু ‘আমির খুয‘আইকে তার বহির্গত নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেলা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সাইবা উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে। (বুখারী পর্ব ৬১ অধ্যায় ৯ হাদীস নং ৩৫২১; মুসলিম ২৮৫৬ আর লুলু ওয়াল মারজান হা/১৮১৬)
(৫) আবূ ত্বালিব, আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত:‘আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রা.) বলেন, আমি একদিন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আপনার চাচা আবূ ত্বালিবের কী উপকার করলেন অথচ তিনি আপনাকে দুশমনের সকল আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তিনি খুব ক্ষুব্ধ হতেন। তিনি বললেন, সে জাহান্নামে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আগুনে আছে। যদি আমি না হতাম তাহলে সে জাহান্নামের একেবারে নিম্ন স্তরে থাকত। (সহীহ বুখারী পর্ব ৬৩ /৪০ হা. ৩৮৮৩, মুসলিম ১/৯০, হা. নং ২০৯ আল লু’লু ওয়াল মারজান,হা/ ১২৫) (৬) আম্মার (রা.)-এর ঘাতক ও তার ব্যাপারে মহানবী (ﷺ) বলেছেন,“সে জাহান্নামী।”(সহীহুল জামে’ ৪১৭০) কিন্তু যাদের ব্যাপারে ঘোষণা নেই, তাদেরকে নিশ্চিতরূপে জান্নাতী অথবা জাহান্নামী বলা জায়েয নয় (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনু বায, ২৫/১২১ পৃ. ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৭৩১)। যেমন, সাহ্‌ল ইবনু সা‘দ আস্ সা‘ইদী (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের সামনে প্রকাশিত ‘আমলের বিবেচনায় জান্নাতীদের ‘আমলের ন্যায় ‘আমল করবে; অথচ সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভূক্ত। আর কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের সামনে প্রকাশিত ‘আমলের বিবেচনায় জাহান্নামীদের ‘আমলের ন্যায় ‘আমল করবে, অথচ সে জান্নাতীদের অন্তর্ভূক্ত। (সহিহ মুসলিম হা/ ৬৬৩৪ ই.ফা হা/ ৬৫০০)।
.
অতএব কুরআন-সুন্নাহ সুস্পষ্ট দলিলের বাহিরে কোনো ব্যক্তিকে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী বলে সার্টিফিকেট দেওয়া যাবে না, এমন কি কোনো মুসলিম ব্যাক্তি মারা গেলেও তার ক্ষেত্রে রহমতপ্রাপ্ত বেহেশতবাসী’ উদ্দেশ্য করে মরহুম শব্দ ব্যবহার করাও জায়েয নয়। এবার একজন মুসলিম সে যত সৎকর্মই করুক না কেন তাকে যেমন জান্নাতী বলে ঘোষণা দিতে পারি না। অনুরূপভাবে কোন মুসলিম যত মন্দ কাজই করুক না কেন তাকে জাহান্নামী বলেও ঘোষণা দিতে পারি না। কারণ কাউকে জান্নাতী বা জাহান্নামী সাব্যস্ত করা একমাত্র আল্লাহরই কর্তৃত্বাধীন।আমরা যদি কয়েকটি উদাহরণ লক্ষ করি তাহলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। যেমন:

(১) আম্মিজান ‘আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) [মৃত: ৫৭/৫৮ হি.] থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, একদা একজন আনসারীর বাচ্চার জানাযার সলাত আদায়ের জন্য রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ডাকা হল। আমি (‘আয়েশা) বললাম, হে আল্লাহর রসূল! এ বাচ্চার কি সৌভাগ্য, সে তো জান্নাতের চড়ুই পাখিদের মধ্যে একটি চড়ুই। সে তো কোন গুনাহ করেনি বা গুনাহ করার বয়সও পায়নি। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এছাড়া অন্য কিছু কি হতে পারে না হে ‘আয়েশা! আল্লাহ তা’আলা একদল লোককে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন, যখন তারা তাদের পিতার মেরুদণ্ডে ছিল। এভাবে জাহান্নামের জন্যেও একদল লোক সৃষ্টি করে রেখেছেন অথচ তখন তারা তাদের পিতার মেরুদণ্ডে ছিল।(সহীহ মুসলিম ২৬৬২, নাসায়ী ১৯৪৭,ইবনু মাজাহ ৮২,আহমাদ ২৫৭৪২, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৭৩)। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘যদি কেউ কাউকে কাফের বলে, আর সে যদি কাফের না হয়, তাহ’লে কথাটি তার উপরেই ফিরে আসবে।(সহীহ বুখারী হা/৬০৪৫; মিশকাত হা/৪৮১৬)। অপর আরেকটি বর্ননায় এসেছে খারিজাহ ইবনু যায়দ ইবনু সাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,…উম্মুল ‘আলা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, অতঃপর উসমান ইবনু মায‘উন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের এখানে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি তাঁর সেবা শুশ্রাষা করলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়ে গেল। আমরা কাফনের কাপড় পরিয়ে দিলাম। তারপর নবী (ﷺ) আমাদের এখানে আসলেন। ঐ সময় আমি ‘উসমান ইবনু মাযউন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে লক্ষ্য করে বলছিলাম। হে আবূ সায়িব! তোমার উপর আল্লাহ রহম করুন। তোমার সম্পর্কে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ নিশ্চয় তোমাকে সম্মানিত করেছেন। তখন নবী (ﷺ) আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কেমন করে জানলে যে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, আমার মাতা-পিতা আপনার উপর কুরবান হোক হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি তো জানি না। তাহলে আপনি বলে দিন কাকে আল্লাহ সম্মানিত করবেন? নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহর শপথ! ‘উসমানের মৃত্যু হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! আমি তার সম্পর্কে কল্যাণের আশা পোষণ করছি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না আল্লাহ আমার সাথে কী ব্যবহার করবেন। উম্মুল ‘আলা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি এ কথা শুনার পর আর কাউকে পূত-পবিত্র বলব না…(সহীহ বুখারী, হা/১২৪৩)।
.
কাউকে জাহান্নামী সাব্যস্ত করার শাস্তি কতটা ভয়াবহ হ’তে পারে নিম্নোক্ত হাদীসটি তার বাস্তব উদাহরণ। আবূ হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, বনী ইসরাঈলের মধ্যে দু’জন ব্যক্তি ছিল। তাদের একজন পাপ কাজ করত এবং অন্যজন সর্বদা ইবাদতে লিপ্ত থাকত। যখনই ইবাদতরত ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে দেখত, তখনই তাকে খারাপ কাজ পরিহার করতে বলত। একদিন সে তাকে পাপ কাজে লিপ্ত দেখে বলল, তুমি এমন কাজ থেকে বিরত থাক। পাপী ব্যক্তি বলল, আমাকে আমার রবের উপর ছেড়ে দাও! তোমাকে কি আমার উপর পাহারাদার করে পাঠানো হয়েছে? সে বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না, অথবা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।অতঃপর দু’জনকেই মৃত্যু দিয়ে আল্লাহর নিকট উপস্থিত করা হ’ল। আল্লাহ ইবাদতগুযার ব্যক্তিকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি আমার সম্পর্কে জানতে? অথবা তুমি কি আমার হাতে যা আছে তার উপর ক্ষমতাবান ছিলে? আর পাপীকে বললেন, তুমি চলে যাও এবং আমার রহমতে জান্নাতে প্রবেশ কর। আর অপর ব্যক্তির ব্যাপারে তিনি বললেন, তোমরা একে জাহান্নামে নিয়ে যাও। আবূ হুরায়রাহ (রা.) বলেন, সেই মহান সত্তার কসম! যার হাতে আমার জীবন! সে (ইবাদতগুযার ব্যক্তি) এমন উক্তি করেছে, যার ফলে তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়েই বরবাদ হয়ে গেছে’ (আবূ দাঊদ হা/৪৯০১; সহীহুল জামে‘ হা/৪৪৫৫; সনদ সহীহ)। এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, কাউকে সরাসরি জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা যাবে না। কেননা কে জান্নাতে যাবে, আর কে জাহান্নামে যাবে, আল্লাহ কাকে ক্ষমা করবেন এবং কাকে ক্ষমা করবেন না- সেটা কেবল আল্লাহই জানেন। কেননা তিনিই কেবল অদৃশ্যের খবর রাখেন। তিনিই ‘আলিমুল গায়েব। সুতরাং ইলমুল গায়েবের দাবী করা সীমালংঘন ও কুফরী। এজন্য আল্লাহ সেই ইবাদতগুযার বান্দাকে বলেছেন, তুমি কি আমার হাতে যা আছে তার উপর ক্ষমতাবান ছিলে? আল্লাহ বলেন, ‘আর গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই রয়েছে। তিনি ব্যতীত কেউই তা জানে না। স্থলভাগে ও সমুদ্রভাগে যা কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। গাছের একটি পাতা ঝরলেও সেটা তিনি জানেন। মাটিতে লুক্কায়িত এমন কোন শস্যদানা নেই বা সেখানে পতিত এমন কোন সরস বা শুষ্ক ফল নেই, যা (আল্লাহর) সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই’ (সূরা আন‘আম ৬/৫৯)। আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল। তিনি অনেক বড় পাপীকেও ক্ষমা করে জান্নাত প্রদান করতে পারেন। আবার তিনি শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর। ফলে ইবাদতগুযারকেও কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করতে পারেন।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:كل إنسان يشهد له النبي صلى الله عليه وسلم بأنه في الجنة فهو في الجنة، وكل إنسان يشهد أنه في النار فهو في النار، وأما من لم يشهد له الرسول فنشهد له بالعموم، نقول: كل مؤمن في الجنة، وكل كافر في النار، ولا نشهد لشخص معين بأنه من أهل النار، أو من أهل الجنة، إلا بما شهد له الله ورسوله”যেসব ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতী বলেছেন, তারা জান্নাতী। আর যাদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে তারা জাহান্নামী, তারা হবে জাহান্নামী। তবে যাদের সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট দলিল নেই, তাদের ব্যাপারে আমরা বলি—সকল ঈমানদার জান্নাতের অধিকারী এবং সকল কাফির জাহান্নামের অধিবাসী। কিন্তু কাউকে নির্দিষ্ট করে জান্নাতী বা জাহান্নামী‌ বলবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের ব্যাপারে তা নির্ধারণ করে দেন।”(ইবনু উসাইমীন,তাফসীর সূরা আল-হুজরাত; পৃষ্ঠা: ১৮)।
.
অপর ফাতওয়ায় সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ ও মুহাদ্দিস, শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:মৃতদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দাবলির বিশুদ্ধতা কী? যেমন আমরা এরকম কথা শুনে থাকি যে, অমুক ‘মাগফূর লাহু’ অথবা ‘মরহুম’। এই পরিভাষাগুলো কি বিশুদ্ধ? আপনি এ ব্যাপারে মানুষকে কীভাবে দিকনির্দেশনা দিবেন?”

উত্তরে শাইখ বলেন:
الواجب في هذا أن يقال: غفر الله له، رحمه الله، ولا يجزم بالمغفور له والمرحوم، هذا هو الذي ذكره أهل العلم، وكان أهل السنة والجماعة يقولون: لا يجوز الشهادة لمعين بجنة أو نار، إلا من شهد له الرسول ﷺ، أو شهد الله له في كتابه وإلا فلا، فممن شهد الله له في الكتاب العزيز بالنار أبو لهب ، شهد الله له بالنار، وهكذا من شهد له الرسول ﷺ بالجنة كـأبي بكر الصديق وعمر وعثمان وعلي وبقية العشرة وغيرهم ممن شهد لهم الرسول ﷺ، أو بالنار، هذا يشهد له.أما من لم يشهد له الله ولا رسوله لا بجنة ولا بنار فإنا لا نشهد له بذلك لا هذا ولا هذا، ولكن أهل السنة يرجون للمحسن ويخافون على المسيء.
والذي يظهر أن قول القائل: المرحوم فلان، والمغفور له فلان في معنى الشهادة، في معنى الشهادة بالجنة والنار؛ لأن المرحوم والمغفور له معناه أنه في الجنة؛ لأن كل إنسان مرحوم ومغفور له فهو من أهل الجنة، هذا فيه جرأة وعدم تورع، فالذي ينبغي في مثل هذا أن يقول: رحمه الله، غفر الله له، هذا هو الذي ينبغي في هذا المقام. نعم.
“এই বিষয়ে যা করণীয় তা হলো ‘গাফারাল্লাহু লাহু (আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন)’, ‘রাহিমাহুল্লাহ (আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন)’ প্রভৃতি বলা জরুরি। দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ‘মাগফূর লাহু (ক্ষমাপ্রাপ্ত)’, ‘মরহুম (রহমতপ্রাপ্ত)’ প্রভৃতি বলা যাবে না। ‘আলিমগণ এমনটিই বলেছেন।আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বলে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে জান্নাতি বা জাহান্নামী হওয়ার সাক্ষ্য দেওয়া বৈধ নয়, শুধুমাত্র যাদের ব্যাপারে রাসূল ﷺ সাক্ষ্য দিয়েছেন, অথবা যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর কিতাবে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে করা যাবে। যেমন আল্লাহ যাকে কুরআনে জাহান্নামী বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের একজন হলো আবূ লাহাব। আল্লাহ তাকে জাহান্নামী বলেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। একইভাবে যাদের ব্যাপারে রাসূল ﷺ জান্নাতি বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যেমন আবূ বকর আস-সিদ্দীক, ‘উমার, ‘উসমান, ‘আলী এবং আশারায়ে মুবাশশারাহ-র অন্যান্য সাহাবীগণ, অথবা যাদেরকে রাসূল ﷺ জাহান্নামী বলেছেন তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে। কিন্তু যাদের ব্যাপারে না আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন, না রাসূল ﷺ, তাদের ব্যাপারে আমরা জান্নাতি বা জাহান্নামী বলে কোনো সাক্ষ্য দেব না।কিন্তু আহলুস সুন্নাহ সৎকর্মশীল বান্দার জন্য কল্যাণের আশা করে, আর পাপী বান্দার ব্যাপারে অকল্যাণের আশঙ্কা করে।আর মানুষের বলা অমুক ‘মরহুম’, অমুক ‘মাগফূর লাহু’ এই কথাগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের সার্টিফিকেট দেওয়ার নামান্তর। কেননা মরহুম (রহমতপ্রাপ্ত), মাগফূর লাহু (ক্ষমাপ্রাপ্ত) কথা দুটির অর্থ হলো, উক্ত ব্যক্তি জান্নাতে রয়েছে। কেননা প্রত্যেক মরহুম ও মাগফূর লাহু ব্যক্তি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত। এই কথার মধ্যে রয়েছে স্পর্ধা ও তাক্বওয়া-শূন্যতা। তাই এসব ক্ষেত্রে ‘রাহিমাহুল্লাহ’, ‘গাফারাল্লাহু লাহু’ প্রভৃতি বলাই বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে এটাই বাঞ্ছনীয়। না‘আম।”(ইমাম ইবনু বাযের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এর আর্টিকেল নং-৬৪৭১) তবে হা!কেউ যদি মরহুম বলার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য রহমতের দু‘আ উদ্দেশ্য করে, তাহলে মরহুম বলা জায়েজ। উল্লেখ্য যে, ‘রহমতপ্রাপ্ত’ হলো মরহুম শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ। কিন্তু মরহুম শব্দের আরেকটি প্রসিদ্ধ অর্থ আছে। আর তা হলো মৃত, প্রয়াত, লোকান্তরিত, পরলোকগত প্রভৃতি। যেমনটি বিভিন্ন আরবি অভিধানে এসেছে।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথাই পরিষ্কার যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আকিদা হলো তারা কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে জান্নাতী বা জাহান্নামী ঘোষণা করে না, যতক্ষণ না তার সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কুরআন বা হাদীসে সুস্পষ্ট দলিল থাকে। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের জান্নাতী বা জাহান্নামী ঘোষণা করেছেন, তারা তা-ই। তবে এ ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলেন না। তবে তারা নেককার ও আনুগত্যশীল ব্যক্তিদের জন্য জান্নাতের আশা পোষণ করে এবং গোনাহগার ও অবাধ্য ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নামের আশঙ্কা করে। এভাবে তারা সাধারণভাবে বলে আল্লাহর আনুগত্যশীলরা জান্নাতের উপযুক্ত এবং তাঁর অবাধ্যরা জাহান্নামের উপযুক্ত, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে নাম ধরে নির্দিষ্ট করে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলে না।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান (হাফিযাহুল্লাহ)
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate