Friday, April 1, 2022

মানুষকে গাধা, কুকুর ইত্যাদি বলে সম্বোধনের ব্যাপারে সাবধান বাণী

 ◈ ১. আলা ইবনুল মুসাইয়েব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা (মুসাইয়েব) বলেছেন,

لاتقل لصاحبك يا حمار يا كلب يا خنزير فيقول لك يوم القيامة : أتراني خلقت كلبا أو حمارا أو خنزيرا
“তোমার সঙ্গী-সাথীকে হে গাধা, হে কুকুর, ওহে শুয়োর বলে সম্বোধন করবে না। অন্যথায় কিয়ামতের দিন সে তোমাকে বলবে, “তুমি কি মনে করতে যে, আমাকে কুকুর, গাধা বা শুয়োর রূপে সৃষ্টি করা হয়েছিল?” [মুসান্নিফে ইবনে আবি শায়বাহ, ৫/২৮২]

◈ ২. অনুরূপ কথা বর্ণিত হয়েছে, ইবরাহিম নাখঈ রাহ. থেকেও। [মুসান্নিফে ইবনে আবি শায়বাহ, ৫/২৮৩]

◈ ৩. ইমাম নওবী রাহ. বলেন,
“ومن الألفاظ المذمومة المستعملة في العادة قوله لمن يخاصمه: يا حمار، يا تيس، ياكلب، ونحو ذلك، فهذا قبيح لوجهين: أحدهما: أنه كذب. والآخر: أنه إيذاء
“নিন্দনীয় যে সব শব্দ সচরাচর ব্যবহৃত হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল, ঝগড়াঝাঁটিতে প্রতিপক্ষকে বলা: হে গাধা, হে পাঠা/ছাগল, কুকুর ইত্যাদি। তা দুটি কারণে কুৎসিত:
এক: তা মিথ্যা, অন্যটি হল, কষ্টদায়ক।” [আল আযকার, পৃষ্ঠা নং ৩৬৫]

◈ ৪. আল্লামা শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায বলেন, কোন মুমিন ব্যক্তির জন্য কাউকে গাধা, কুকুর, শুয়োর, খচ্চর, গরু-ছাগল ইত্যাদি বলে ডাকা শোভনীয় নয়। বরং সবচেয়ে সুন্দর নামে সম্বোধন করা উচিত।

এ সব উপাধি দিয়ে মানুষকে সম্বোধন করা হলে পারস্পারিক বিদ্বেষ সৃষ্টি, মন-কষাকষি, ঝগড়াঝাঁটি বা মারামারি হতে পারে।” [শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট]

◈ ৫. আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন বলেন, “মানুষকে জীবজন্তু বা পশুর উপাধি দিয়ে ডাকা হারাম।”

বিন বায, উসাইমিন রাহ. উভয়েই নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করেন:

আল্লাহ তা’আলা বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا يَسۡخَرۡ قَوۡمٞ مِّن قَوۡمٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُونُواْ خَيۡرٗا مِّنۡهُمۡ وَلَا نِسَآءٞ مِّن نِّسَآءٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُنَّ خَيۡرٗا مِّنۡهُنَّۖ وَلَا تَلۡمِزُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَلَا تَنَابَزُواْ بِٱلۡأَلۡقَٰبِۖ بِئۡسَ ٱلِٱسۡمُ ٱلۡفُسُوقُ بَعۡدَ ٱلۡإِيمَٰنِۚ وَمَن لَّمۡ يَتُبۡ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ

“হে ইমানদারগণ! কোনও মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোনও মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরাও যেন অন্য নারীদেরকে উপহাস না করে। কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারিনীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্ৰতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। ইমানের পর মন্দ উপাধি অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম।” [সূরা হুজুরাত: ১১]

ইমাম ইবনে কাসির রাহ. উক্ত আয়াতে ولا تنابزوا بالألقاب “আর তোমরা একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডাকিও না” এর ব্যাখ্যায় বলেন,
أي : لا تتداعوا بالألقاب ، وهي التي يسوء الشخص سماعها
“অর্থাৎ তোমারা একে অপরকে এমন সব উপাধি দ্বারা ডাকাডাকি করো না যা সে শুনতে অপছন্দ করে।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]
আল্লাহ আমাদেরকে জন্তু-জানোয়ারের নামে মানুষকে সম্বোধনের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬ ❂◯❂▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

সহিহ, হাসান ও জইফ হাদিসের পরিচয়

 ❑ ক. প্রশ্ন: সহিহ হাদিস কাকে বলে?

সহিহ শব্দের অর্থ: শুদ্ধ, নির্ভুল, সুস্থ, সঠিক, সত্য, প্রকৃত ইত্যাদি।
আর পারিভাষিক সংজ্ঞা প্রসঙ্গে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন,
هو ما نقله العدل تام الضبط متصل السند غيرمعلل ولا شاذ
“যে হাদিস মুত্তাসিল (অবিচ্ছিন্ন) সনদ পরম্পরায় বর্ণিত হয়, রাবী (বর্ণনাকারী) আদিল (সততা ও ন্যায়-নীতিমান) ও পূর্ণ আয়ত্ত শক্তির অধিকারী হয় এবং সনদটি শায (অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত নয়) কিংবা মুআল্লাল (হাদিসের মূল মতন গোপন ত্রুটি যুক্ত) নয়-এমন হাদিস কে সহিহ বলে।

মোটকথা, হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য ৫টি শর্ত থাকা আবশ্যক। যথা:

◍ ১. অবিচ্ছিন্ন সনদ পরম্পরায় বর্ণিত হওয়া। অর্থাৎ এমন অবিচ্ছিন্ন বর্ণনা সূত্রে বর্ণিত হওয়া যে বর্ণনা সূত্রের কোথাও একজন বর্ণনাকারীও বাদ পড়ে নি।
◍ ২. বর্ণনা সূত্রের প্রত্যেক বর্ণনাকারী সততা, আদর্শ ও ন্যায়-নীতিতে প্রশ্নাতীত থাকা।
◍ ৩. বর্ণনাকারী পূর্ণ আয়ত্ত শক্তির অধিকারী হওয়া অর্থাৎ হাদিস আয়ত্ত বা সংরক্ষণের কোনও ত্রুটি না থাকা- চাই তা মুখস্থ রাখার ক্ষেত্রে হোক বা লিখে রাখার ক্ষেত্রে হোক।
◍ ৪. শায না হওয়া অর্থাৎ হাদিস বর্ণনাকারীর বর্ণনা তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীর বিপরীত না হওয়া।
◍ ৫. হাদিস বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে হাদিসের মতনে কোন ধরণের সূক্ষ্ম ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা না পড়া।

❑ খ. প্রশ্ন: হাসান হাদিস কাকে বলে?
উত্তর:
হাসান শব্দের অর্থ: সুন্দর, ভালো, চমৎকার, উত্তম ইত্যাদি।
এর পারিভাষিক অর্থ হল, যে হাদিসের মধ্যে সহিহ হাদিসের সকল শর্ত যথাযথভাবে পাওয়া যাবে একটি শর্ত ছাড়া। তা হল, হাদিস সংরক্ষণ। অর্থাৎ বর্ণনাকারীর হাদিস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সহিহ হাদিসের তুলনায় কিছুটা ঘাটতি থাকবে।
الحديث الحسَن لذاته هو: “ما اتَّصل إسنادُه، بنَقل عدلٍ، قَلَّ ضبطه، غير شاذٍّ، ولا معلولٍ
ইবনে হাজার আসকালানি বলেন,
هو والصحيح سواء، إلَّا في تفاوت الضَّبط؛ فراوي الصَّحيح يشترط أن يكون مَوصوفًا بالضَّبط الكامِل، وراوي الحسن لا يُشترط أن يَبلغ تلك الدَّرجة
“হাসান এবং সহিহ হাদিস সমপর্যায়ের স্মৃতিশক্তি বা হাদিস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পার্থক্য ছাড়া। সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিশক্তি বা হাদিস সংরক্ষণের বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত হওয়া শর্ত কিন্তু হাসান হাদিসের বর্ণনাকারী সে স্তরে পৌঁছা‌ শর্ত নয়।” [আল আসইলাতুল ফাইকা, হা/৬৪-alukah]
মর্যাদার দিক দিয়ে হাসান হাদিস সহিহ হাদিস থেকে একটু কম মর্যাদা সম্পন্ন তবে গ্রহণযোগ্য। অন্য ভাষায়, হাসান হাদিস সহিহ ও জইফের মাঝামাঝি পর্যায়ের হাদিস।

❑ গ. প্রশ্ন: জঈফ হাদিস কাকে বলে?
উত্তর:
জইফ শব্দের অর্থ: দুর্বল, ক্ষীণ, অপারগ, অক্ষম ইত্যাদি।
الحَدِيثُ الضَّعِيفُ: مَا فَقَدَ أَحَدَ شُرُوطِ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ: أي: كل حديث لم تجتمع فيه شروط الحديث الصحيح، وكذا لم تجتمع فيه شروط الحديث الحسن، فهو ضعيف
“যে হাদিসে সহিহ হাদিসের কোনও একটি শর্ত অনুপস্থিত।” অর্থাৎ যে হাদিসে সহিহ হাদিসের শর্তাবলী একসাথে পাওয়া যায় না, অনুরূপভাবে যাতে হাসান হাদিসের শর্তাবলী একসাথে পাওয়া যায় না তাকেই জইফ (দুর্বল) হাদিস বলে।” [মুকাদ্দামায়ে ইবনুস সালাহ, ৪১ পৃষ্ঠা]
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Thursday, March 24, 2022

দুআ কবুল হওয়ার উদ্দেশ্যে সুরা ইয়াসিন খতম করার আমল কি হাদিস সম্মত

 দুআ কবুল বা মনের ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসিন খতম করার বিধান এবং সূরা ইয়াসিনের ফজিলতে বর্ণিত হাদিসগুলোর অবস্থা

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
প্রশ্ন: দুআ কবুল হওয়ার উদ্দেশ্যে সুরা ইয়াসিন খতম করার আমল কি হাদিস সম্মত?
আরও জানতে চাই, হাদিসের আলোকে সূরা ইয়াসিনের ফজিলত কতটুকু?
উত্তর:
প্রচলিত আছে যে, “সূরাটি ৪১ বার পাঠ করার পর দুআ করার পূর্বে ১১ বার দরুদে ইবরাহিম পাঠ করতে হয়। তারপর দুআ করলে আল্লাহ দুআ কবুল করেন।” কিন্তু এটা দলিল বহির্ভূত ও বানোয়াট কথা। এটি বিদআতিদের তৈরি করা ওজিফা।

প্রকৃতপক্ষে দুআ কবুল বা মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য সূরা ইয়াসিন খতম করার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনও হাদিস নেই। কোনও সাহাবি থেকেও তা প্রমাণিত হয় নি। তাই তো বিশ্ববিখ্যাত আলেমে দীন সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,
أن قراءة سورة يس لقضاء الأعمال بدعة
“কার্যসিদ্ধির উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসিন পাঠ করা বিদআত।”

❑ বানোয়াট হাদিস দ্বারা দলিল পেশ!

ইচ্ছা পূরণ, জীবনের নানা সঙ্কট নিরসন বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সহজ করণের ক্ষেত্রে সূরা ইয়াসিন খতম করার ব্যাপারে নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করা হয়:
يس لما قرئت له
“যে উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসিন পাঠ করা হবে তা পূরণ করা হয়।” বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে মিথ্যাচার। এটি আদতে কোনও হাদিস নয়।

✪ ইমাম সাখাবি বলেন, لا أصل له بهذا اللفظ “এই শব্দে বর্ণিত হাদিসটির কোনও ভিত্তি নেই।” [আল মাকাসিদুল হাসানা, হা/৭৪১]-
✪ কাজি যাকারিয়া বায়যাবির হাশিয়াতে বলেন, “এটি বানোয়াট।” [যেমনটি রয়েছে কাশফুল খাফা গ্রন্থে ২/২২১৫]
✪ মোল্লা আলি কারি হানাফি রহ বলেন, قيل لا أصل له أو بأصله موضوع “বলা হয়েছে, এর কোনও ভিত্তি নাই বা মূলত: এটি বানোয়াট।” [আল আসরুল মারফুআহ, ৩৭৭]
✪ শাইখ আলবানি বলেন, এটি বানোয়াট হাদিস। [যাইফুত তারগীব, ৮৮৫]

◯ ইবনে কাসির রাহ. বলেন, কতিপয় আহলে ইলম বলেছেন,
” أنَّ مِن خصائص هذه السورة أنها لا تُقرَأ عند أمر عسير إلا يسره الله تعالى
এই সূরা (সূরা ইয়াসিন) এর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে এটি পাঠ করা হবে আল্লাহ তা সহজ করে দিবেন।” [তাফসিরে ইবনে কাসির, ৩/৭৪২] কিন্তু এ কথার পক্ষেও কোনও হাদিস বা সাহাবিদের বক্তব্য কিংবা আমল নেই। এভাবে যদি দীনের বিষয়ে দলিল ছাড়া মানুষের মতামত, ফতোয়া, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি গ্রহণ করা হয় তাহলে ইসলামের প্রকৃত রূপ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। (আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।)

❑ সূরা ইয়াসিন এর ফজিলতে বর্ণিত কোনও হাদিসই সহিহ নয়:

প্রকৃতপক্ষে সূরা ইয়াসিনের ফজিলতে যে সব হাদিস বর্ণিত হয়েছে বিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে সেগুলো একটিও সহিহ নয়।

এ বিষয়ে যে সকল হাদিস আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত আছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:
১. إن لكل شيء قلبا ، وقلب القرآن يس
“প্রতিটি বস্তুর অন্তর আছে। আর কুরআনের অন্তর হল সূরা ইয়াসিন।”
২. من قرأها فكأنما قرأ القرآن عشر مرات
“যে সূরা ইয়াসিন একবার পাঠ করল সে যেন সমস্ত কুরআন দশবার পাঠ করল।”
৩. من قرأ سورة ( يس ) في ليلة أصبح مغفورا له
“যে ব্যক্তি রাতে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করবে সে ভোরে উঠবে ক্ষমা প্রাপ্ত অবস্থায়।”
৪. من داوم على قراءتها كل ليلة ثم مات مات شهيدا
“যে ব্যক্তি প্রতিনিয়ত সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে অতপর মৃত্যু বরণ করবে যাবে সে শহিদ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে ।”
৫. من دخل المقابر فقرأ سورة ( يس ) ، خفف عنهم يومئذ ، وكان له بعدد من فيها حسنات
“যে ব্যক্তি গোরস্তানে প্রবেশ করে সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে সে দিন কবর বাসীদের শাস্তি লাঘব করা হবে এবং পাঠকারীর জন্য কবরে যত লাশ আছে তাদের সমপরিমাণ সওয়াব লেখা হবে।”
বিজ্ঞ হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে এ হাদিসগুলো একটিও সহিহ নয়।
[দ্রষ্টব্য: ইবনুল জাওযী রচিত বিখ্যাত বানোয়াট হাদিস সংকলন আল মাউযুআত ২/৩১৩, শাওকানি রচিত আল ফাওয়ায়েদুল মাজমূআহ, হা/ ৯৭৯, ৯৪২]

মনে রাখতে হবে, যদি এ সূরা খতম করে দুআ করলে তা কবুলের নিশ্চয়তা থাকতো তাহলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতকে এই মর্যাদা পূর্ণ এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আমলটি থেকে বঞ্চিত করতেন না।

সুতরাং আমাদেরকে এ সব বানোয়াট ও বিদআতি
আমল থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা তৌফিক দান করুন। আমিন।

❑ দুআ কবুলের জন্য বিশুদ্ধ হাদিস সম্মত আমল:

আপনি কুরআনের যেখান থেকে সুবিধা হয় পাঠ করে অথবা নফল নামাজ, রোজা, দান-সদকা ইত্যাদি নেক আমল করার পর এসকল নেক আমলের ওসিলা ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারেন। নেক আমলের ওসিলায় দুআ করলে তা কবুলের সম্ভাবনা থাকে। যেমন: এভাবে বলা, হে আল্লাহ আমার কুরআন খতম, কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ, রোজা ও দান-সদকার ওসিলায় আমার দুআ কবুল করো, আমার সমস্যা দূর করে দাও, আমাকে সুস্থতা দান করো, আমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করো ইত্যাদি।

এছাড়াও দুআর শর্তাবলি ঠিক রেখে দুআ কবুলের অধিক সম্ভাবনাময় সময় ও ক্ষেত্রগুলোর প্রতি লক্ষ্য রেখে দুআ করবেন। যেমন: ভোর রাতে, যে কোনও সালাতে সেজদা অবস্থায়, রোজা অবস্থায়, ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে, সফর অবস্থায়, আজান ও একামতের মাঝামাঝি সময়, জুমার দিন আসরের পর থেকে মাগরিবের মাঝামাঝি সময় ইত্যাদি। অনুরূপভাবে পিতামাতা ও নেককার-পরহেজগার ব্যক্তিদের দুআ নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহর রাব্বুল আলামিন দুআ কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

রমযানের দিনের বেলায় স্ত্রীর সাথে যা কিছু করা জায়েয

 প্রশ্ন: রমযানের দিনের বেলায় স্ত্রীর পাশে ঘুমানো কি স্বামীর জন্য জায়েয?

উত্তর:

আলহামদুলিল্লাহ।

হ্যাঁ; এটি জায়েয। বরঞ্চ স্বামীর জন্য সহবাস ব্যতীত বা বীর্যপাত ব্যতীত নিজের স্ত্রীকে উপভোগ করা জায়েয আছে।

ইমাম বুখারি (১৯২৭) ও মুসলিম (১১০৬) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযা রেখে স্ত্রীকে চুম্বন করতেন; স্ত্রীর সাথে মুবাশারা (আলিঙ্গন) করতেন। এবং তিনি ছিলেন তাঁর যৌনাকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সক্ষম ব্যক্তি।

সিন্দি বলেন:

তাঁর কথা: ইউবাশিরু (يباشر) বা মুবাশারা করতেন এ কথার অর্থ হচ্ছে- স্ত্রীর চামড়ার সাথে তার চামড়া ছোঁয়ানো। যেমন- গালের উপর গাল রাখা এবং এ জাতীয় কিছু।

উদ্দেশ্য হচ্ছে- চামড়ার সাথে চামড়া লাগানো। এখানে মুবাশারা দ্বারা- সহবাস উদ্দেশ্য নয়।

শাইখ উছাইমীনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:

রোযাদার স্বামীর জন্য রোযাদার স্ত্রীর সাথে কি কি করা জায়েয?

উত্তরে তিনি বলেন:

ফরজ রোযা পালনকারী স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর সাথে এমন কিছু করা জায়েয হবে না; যাতে করে তার বীর্যপাত হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সব মানুষ এক রকম নয়। কারো বীর্যপাত দ্রুত হয়ে যায়; আবার কারো ধীরে ধীরে হয় এবং সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা রাখে। যেমনটি আয়েশা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি ছিলেন স্বীয় যৌন চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সক্ষম ব্যক্তি।

আবার কিছু লোক আছে যারা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; তার বীর্যপাত দ্রুত হয়ে যায়। এমন ব্যক্তি ফরজ রোযা পালনকালে তার স্ত্রীকে চুম্বন করা, আলিঙ্গন করা ইত্যাদির মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ হওয়া থেকে তাকে সাবধান থাকতে হবে। আর যদি ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে জানে যে, সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাহলে তার জন্য স্ত্রীকে চুম্বন করা ও জড়িয়ে ধরা জায়েয আছে; এমনকি ফরয রোযার মধ্যেও। তবে, সাবধান! সহবাসের ব্যাপারে সাবধান! রমযান মাসে যার উপর রোযা রাখা ফরজ সে যদি সহবাসে লিপ্ত হয় তাহলে তার উপর পাঁচটি বিষয় অবধারিত হবে:

এক: গুনাহ।

দুই: রোযা ভেঙ্গে যাওয়া।

তিন: দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকা ফরজ। যে কোন ব্যক্তি কোন শরয়ি ওজর ছাড়া রমযানের রোযা ভঙ্গ করবে তার উপর বিরত থাকা ও সেদিনের রোযা কাযা করা ফরজ।

চার: সেদিনের রোযা কাযা করা ফরয। কারণ সে ব্যক্তি একটি ফরয ইবাদত নষ্ট করেছে; যার কারণ তার উপর এ ইবাদত কাযা করা ফরজ।

পাঁচ: কাফফারা দেয়া। এ কাফফারা হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কাফফারা: একজন কৃতদাস আযাদ করা। কৃতদাস না পেলে লাগাতর দুইমাস রোযা রাখা। সেটাও করতে না পারলে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়ানো।

আর যদি রোযাটি ফরজ রোযা হয় তবে রমযান ছাড়া অন্য কোন মাসে; যেমন যে ব্যক্তি রমযানের কাযা রোযা পালন করছে; এমন রোযা ভঙ্গ করলে দুইটি বিষয় অবধারিত হবে: গুনাহ ও রোযাটি কাযা করা। আর যদি রোযাটি নফল রোযা হয় তাহলে কোন কিছু আবশ্যক হবে না। সমাপ্ত

https://islamqa.info/bn/49614

যে সব কারণে সিয়াম বিনষ্ট হয় না (১২টি)

 নিম্নে যে সব কারণে সিয়াম ভঙ্গ হয় না সেগুলো উল্লেখ করা হল:

◍ ১. ভুলক্রমে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করে ফেললে সিয়াম ভঙ্গ হয় না। এরূপ কারো ঘটলে মনে পড়ার সাথে সাথে বিরত হবে এবং সিয়ামে বহাল থাকবে। তার জন্য কাযা ও কাফফারা কিছুই নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إِذَا نَسِيَ فَأَكَلَ وَشَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ

“যে ব্যক্তি সিয়াম অবস্থায় ভুলক্রমে কিছু খেয়ে বা পান করে ফেলে সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে। কেননা আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।” [বুখারি হাদিস নং ১৯৩৩, মুসলিম, হাদিস নং ১১৫৫]

সূর্য অস্তমিত গেছে এই ধারণা করে ভুলক্রমে কেউ যদি ইফতার করে ফেলে, পরে বুঝতে পারে যে, সূর্য ডুবে নি, তাহলে সে তাৎক্ষণিক পানাহার থেকে বিরত হবে। অত:পর সূর্য অস্ত গেলে ইফতার করবে। তার রোযা বিশুদ্ধ হবে। কোন অসুবিধা হবে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন,

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا

“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা যদি ভুল করে ফেলি বা করতে ভুলে যাই, তবে আমাদের পাকড়াও করো না”। [সূরা বাকারা: ২৮৬]

◍ ২. যেসব ইনজেকশন দ্বারা খাদ্য ও পানীয়ের কাজ হয়না-যেমন: জ্বর, ব্যথা, কাটা-পোড়া, ক্ষুধার কারণে নয় এমন দুর্বলতা ইত্যাদি রোগের জন্য যেসব ইনজেকশন করা হয় (পেশী, চামড়া বা শিরার ইনজেকশন) তাতে সিয়ামের কোন ত্রুটি হবে না, কারণ তা খাদ্য ও পানীয় কাজ করে না।

অনুরূপভাবে ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন ইনজেকশন, দাঁতের চিকিৎসার জন্য অবশ করার ইনজেকশন প্রভৃতির কারণেও সিয়ামের ক্ষতি হবে না।

◍ ৩. মিলনের মাধ্যমে জুনবী হোক বা স্বপ্নদোষের মাধ্যমে-উভয় অবস্থায় গোসল না করেই সিয়ামের নিয়ত ও সাহুর গ্রহণ করতে পারবে, এতে সিয়ামের কোন ত্রুটি হবেনা। তবে ফজরের সালাতের পূর্বে অবশ্যই গোসল করে নিবে। আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নদোষের মাধ্যমে নয়, স্ত্রী সঙ্গমের মাধ্যমে জানাবত (নাপাক) অবস্থায় ফজর করতেন। অতঃপর গোসল করতেন ও সিয়াম পূর্ণ করতেন। [বুখারি হাদিস নং ১৯২৬]

◍ ৪. রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে, রোগ, ভয়-ভীতি বা মানসিক দুর্বলতার কারণে (জাগ্রত অবস্থায় উত্তেজনা ব্যতীত) বীর্যপাত হলে সিয়ামের কোন অসুবিধা হবে না। কেননা এতে তার কোন হাত নেই।

◍ ৫. ইচ্ছাকৃত নয় রোগের কারণে বমি হলে সিয়ামের কোন ত্রুটি হবে না। [দলিল ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে]

◍ ৬. শরীর থেকে রক্ত বের হলে বা শিঙ্গা লাগালে সিয়াম নষ্ট হবে না। সিয়াম অবস্থায় শিঙ্গা লাগানো ও অপারেশন করা যায়। উক্ত অবস্থায় অধিক দুর্বলতার কারণে সিয়াম ভাঙ্গার অনুমতি থাকার কথা ভিন্ন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহরাম অবস্থায় ও সিয়াম রত অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। [বুখারি হাদিস নং ১৯৩৮ ও ১৯৩৯] কিন্তু একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগায় এবং যাকে লাগানো হয় উভয়েরই সিয়াম ভেঙ্গে যায়। উহা বুখারির উপরোক্ত হাদিস এবং দারাকুতনী, বায়হাকী ও ত্বাবরানীর বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে মনসুখ হয়ে গেছে। [দেখুন: মুহাল্লা ৬/২০৫ পৃঃ ইরয়াউল গালীল ৪/৭২-৭৫, আছসিয়াম ওয়া রমাযান ২২৪-২২৬ পৃঃ।]

অনুরূপভাবে জখমের কারণে রক্ত বের হওয়া, ব্লাড টেস্টের জন্য রক্ত দেয়া, দাঁত থেকে রক্ত বের হওয়া বা দাঁত উঠানোর সময় রক্ত বের হলে সিয়ামের ক্ষতি হবে না।

◍ ৭. স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া ও হাল্কা বিনোদন করার অনুমতি আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিনা স্বতন্ত্রতার সহিত এ সবের বৈধতা সাব্যস্ত হয়েছে। তবে ঐ লোকদের জন্য যারা কামপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। [বুখারি হাদিস নং ১৯২৭, ১৯২৮, ১৯২৯ ও আস সিয়াম ২২৮-২২৯ পৃঃ। শেষোক্ত গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।]

◍ ৮. মলদ্বার, লিঙ্গের ছিদ্র দিয়ে ঔষধ প্রবেশ করালে সিয়াম নষ্ট হবে না। এমনিভাবে পেটের ভিতর পাকস্থলীর বাইরে, মাথা ফেটে গেলে, মাথার ভিতর ওষুধ প্রবেশ করালে সিয়াম ভঙ্গ হবে না। [আস সিয়াম ২৩১-২৩৪ পৃঃ।]

◍ ৯. চোখে কাজল ব্যবহার করলে, চোখে-কানে ওষুধের ফোটা দিলে, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের জন্য নাকে ভাপ নেয়া, ইনহেলার বা অক্সিজেন গ্রহণ করা, নারীদের মেকআপ ব্যবহার প্রভৃতিতে সিয়াম নষ্ট হবে না।

◍ ১০. পানি দ্বারা কুলি করা ও নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করাতে সিয়ামের ত্রুটি হয়না। তবে বেশী করে গড়গড়া করে কুলি করবে না। এসব করতে যেয়ে নাক বা গলা দিয়ে ভুলক্রমে কিছু প্রবেশ করলে সিয়াম নষ্ট বা মাকরূহ হবে না। বিভিন্ন সাহাবি ও তাবেঈ থেকে এরূপ সাব্যস্ত হয়েছে। [আস সিয়াম ২৩৪-২৩৬ পৃঃ]

◍ ১১. পানি দ্বারা বেশী বেশী গোসল করলে, বা গরমের কারণে মাথায় বেশী বেশী পানি ঢাললে, সাঁতার কাটলে, পানিতে ডুব দিলে কোন অসুবিধা নেই। আতর ও ফুলের সুগন্ধি নিলে বা মাখলে, তৈল, ক্রিম ইত্যাদি ব্যবহার করলে, সিঁথি করলে সিয়ামের কোন অসুবিধা হয় না।

গড়গড়া করার জন্য ঔষধ ব্যবহার করলে, মিসওয়াক ও টুথপেস্ট ব্যবহার করলে, থুথু বা কফ গিলে ফেললে সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না।

◍ ১২. মহিলারা খানা পাকানোর সময় তরকারীর বিভিন্ন অবস্থা যাচায়ের জন্য প্রয়োজন থাকলে জিহ্বা দ্বারা পরীক্ষা করতে পারে। বিভিন্ন সাহাবি ও তাবেঈ থেকে এসবের বৈধতা সাব্যস্ত হয়েছে বিষয়গুলি [দলিলসহ দেখুন: আস সিয়াম ২৩৪- ২৩৭পৃঃ]
▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬
উৎস:
রমজান ও সিয়াম কোর্স
মুহা আবদুল্লাহ আল কাফী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
[দাঈ, দক্ষিণ জেদ্দা ইসলামী দাওয়া সেন্টার-সৌদি আরব]।
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
[দাঈ, জুবাইল দাওয়অ এন্ড গাইডন্সে সেন্টার, সৌদি আরব]।

Translate