Friday, December 17, 2021

আকীকা এবং এ সংক্রান্ত বিধানাবলি

 আকীকা এবং এ সংক্রান্ত বিধানাবলি

==================================================================

যে সুন্নতগুলোর তাৎপর্য অনেক কিন্তু আমরা তার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেই না আকীকা তার অন্যতম। ইসলাম পূর্বকাল থেকে চলে আসা এই আমলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তিনি একে অনুমোদন করেছেন, নিজে করেছেন এবং অন্যদের করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কিন্তু এ সুন্নতটি আজ বিস্মৃতপ্রায়। মুসলিমগণ এর আমল বাদ দিয়ে এর স্থলে চালু করেছেন নানা বিজাতীয় ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন রীতিনীতি।

অথচ ইসলামী মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় আকীকার গুরুত্ব অপরিসীম। এর প্রতি আমরা উন্নাসিকতা দেখিয়ে নিজেদেরই বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছি। হাদীসের ইঙ্গিত থেকে যেমন অনুমিত হয়, এর সঙ্গে শিশুর পার্থিব ও অপার্থিব কল্যাণ জড়িত। আমরা দেখি নব জাতকের এটা-সেটা রোগ-বালাই লেগেই থাকে। রোজই তার চিকিৎসার পেছনে, পথ্য ও ওষুধ কিনতে গিয়ে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। হাজার হাজার টাকা আমরা অসন্তুষ্টি আর অভিযোগ নিয়ে শিশুর অসুখ-বিসুখের পেছনে ব্যয় করতে পারি অথচ আকীকার মতো চমৎকার একটি আমল করতে পারি না, একটি বা দু’টি ছাগল জবাইয়ের মাধ্যমে।
যার মাধ্যমে অনেক বিপদাপদ থেকেই বেঁচে যেতে পারে আমাদের প্রিয় আত্মজ।

সাধারণ মুসলিম তো নস্যি মোটামুটি দীনদার ও ইসলামের আদর্শ চর্চাকারী ভাইয়েরাও এ সুন্নতটিকে বড় অযত্ন অনাদরে উপেক্ষা করেন। হয়তো গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে না জানার কারণে অথবা যাপিত জীবনে হাজারো সুন্নতের প্রতি উদাসীনতারই অংশ হিসেবে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।

এ নিবন্ধের মাধ্যমে আমি আমাদের অনাদর ও উপেক্ষায় অনালোচিত ও অচর্চিত এই সুন্নতের কথাই সবাইকে স্মরণ করে দেবার প্রয়াস পেতে চাই। নিচের বিন্যাসে আমি এ সংক্রান্ত বেশ-কিছু বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছি। এ ক্ষেত্রে আমি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছি। বিশেষভাবে যে কিতাবটির কথা না বললে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়া হয়, তা হলো- ড. হিসামুদ্দীন আফফানা কর্তৃক সংকলিত ‘আহকামুল আকীকা’ নামক গ্রন্থ। এবার চলুন মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যাক :

আকীকা কাকে বলে :
**********************

আকীকা শব্দের অর্থ কাটা, সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে যে প্রাণীকে জবাই করা হয় তাকে আকীকা বলে। চাই তা ছেলে হোক বা মেয়ে। কেননা, এ প্রাণীর হলক তথা গলা কাটা করা হয়।

প্রাক-ইসলামী যুগে আকীকা
**************************

আকীকার প্রথা জাহেলী যুগ থেকেই চালু ছিল। মাওয়ারদী বলেন, ‘আকীকা বলা হয় ওই ছাগলকে ইসলাম পূর্বযুগে আরবা যা সন্তান ভূমিষ্ট হলে জবাই করত।’

অলীউল্লাহ দেহলভী রহ. বলেন, ‘জেনে রাখুন, আরবরা তাদের সন্তানের আকীকা করতো। আকীকা তাদের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় বিষয় এবং সুন্নতে মুয়াক্কাদা ছিল। এতে ছিল ধর্মীয়, নাগরিক ও আত্মিক অনেক উপকারী দিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই তা অব্যাহত রাখেন এবং মানুষকে এতে উদ্বুদ্ধ করেন। এর প্রমাণ আমরা দেখতে আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণিত হাদীসে।

আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, আমার বাবা বুরাইদাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

«كُنَّا فِي الْجَاهِلِيَّةِ إِذَا وُلِدَ لِأَحَدِنَا غُلاَمٌ ذَبَحَ شَاةً وَلَطَخَ رَأْسَهُ بِدَمِهَا ، فَلَمَّا جَاءَ اللَّهُ بِالإِسْلاَمِ كُنَّا نَذْبَحُ شَاةً ، وَنَحْلِقُ رَأْسَهُ وَنُلَطِّخُهُ بِزَعْفَرَانٍ».

‘জাহেলী যুগে আমাদের নিয়ম ছিল, যখন আমাদের কারো পুত্র সন্তান জন্ম নিতো, সে একটি ছাগল জবাই করতো এবং এর রক্ত তার মাথায় লাগিয়ে দিতো। কিন্তু আল্লাহ যখন ইসলাম নিয়ে আসলেন, তখন আমরা একটি ছাগল জবাই করতাম এবং তার মাথা নেড়ে করতাম আর তার তাকে জাফরান দিয়ে মাখিয়ে দিতাম।’ [আবূ দাউদ : ২৮৪৩; বাইহাকী : ১৯৭৬৬; মুস্তাদরাক : ৭৫৯৪]

মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা আকীকা সংক্রান্ত যে হাদীস বর্ণনা করেন, তা থেকেও এমনটি প্রতিভাত হয়। তিনি বলেন,

«وَكَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَةِ يَجْعَلُونَ قُطْنَةً فِى دَمِ الْعَقِيقَةِ وَيَجْعَلُونَهُ عَلَى رَأْسِ الصَّبِىِّ فَأَمَرَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- أَنْ يُجْعَلَ مَكَانَ الدَّمِ خَلُوقًا».

‘জাহেলী যুগের লোকেরা আকীকার রক্তে তুলা ভেজাতো এবং তা শিশুর মাথায় রাখতো। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন তুলার স্থলে জাফরান তথা সুগন্ধি রাখা হয়।’ [বাইহাকী, সুনান আল-কুবরা : ১৯৭৬৭]

আল্লামা সুয়ূতী রহ. উল্লেখ করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের সপ্তম দিনে তাঁর আকীকা করেন। তিনি বলেন, ‘ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে ইবন আসাকির বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুবলেন,

لما ولد النبي صلى الله عليه و سلم عق عنه عبد المطلب وسماه محمدا فقيل له ما حملك على أن سميته محمدا ولم تسمه باسم آبائه فقال أردت أن يحمده الله في السماء ويحمده الناس في الأرض

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জন্মগ্রহণ করেন, আব্দুল মুত্তালিব তার আকীকা করেন এবং তার নাম রাখেন মুহাম্মদ। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো কিসে আপনাকে তাঁর নাম বাবা-দাদার নামের সঙ্গে না মিলিয়ে রেখে মুহাম্মদ রাখতে? তিনি বললেন, আমি চেয়েছি যাতে তার প্রশংসা আল্লাহ করেন আসমানে আর মানুষে করে যমীনে।’ [শাহরহুয যারকানী আলা মুয়াত্তা মালেক, পৃ. ৫৫৮; ইবন আব্দিল বার, আল-ইস্তিয়াব।]

তেমনি মূসা আলাইহিমুস সালামের শরীয়তেও আকীকার প্রচলন ছিল। হাদীসে যেমন বর্ণিত হয়েছে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«إِنَّ الْيَهُودَ تَعُقُّ عَنِ الْغُلاَمِ وَلاَ تَعُقُّ عَنِ الْجَارِيَةِ فَعُقُّوا عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَيْنِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ»

‘ইহুদীরা পুত্র সন্তানের আকীকা করতো কিন্তু কন্যা সন্তান হলে তার আকীকা করতো না। অতএব তোমরা পুত্র সন্তানের জন্য দু’টি ছাগল এবং কন্যা সন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে আকীকা করো।’ [বাইহাকী, সুনান আল-কুবরা : ১৯৭৬০; মুসনাদ বাযযার : ৮৮৫৭।]

ইসলামে আকীকা
*****************

আকীকার বিধান প্রবর্তিত হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্ম ও উক্তি- উভয়প্রকার হাদীসের মাধ্যমে। এ সম্পর্কে অনেক ‘আছার’ও বর্ণিত হয়েছে অনেক। নিচে এর কিছু তুলে ধরা হচ্ছে :

প্রথমত. সুন্নাহ কাওলী বা মৌখিক হাদীস :
***************************************

১. সালমান বিন আমের দাব্বী রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

«مَعَ الْغُلَامِ عَقِيقَةٌ فَأَهْرِيقُوا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيطُوا عَنْهُ الْأَذَى»

‘পুত্র সন্তানের সঙ্গে আকীকা রয়েছে। সুতরাং তার পক্ষে রক্ত প্রবাহিত করো এবং তার থেকে কষ্ট দূর করো।’ [বুখারী : ৫০৪৯; তিরমিযী : ১৫১৫; মুসনাদ আহমদ : ১৭৯০৭।]

২. সামুরা বিন জুনদুব রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«كُلُّ غُلاَمٍ رَهِينَةٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ سَابِعِهِ وَيُحْلَقُ وَيُسَمَّى»

‘প্রত্যেক শিশুই তার আকীকা জরুরী। জন্মের সপ্তম দিনে তার জন্য জবাই করা হবে এবং তার মাথা নেড়ে করা হবে আর নাম রাখা হবে। [আবূ দাউদ : ২৮৪০; মুসনাদ আহমদ : ২০০৯৫।]

৩. উম্মে কুরয আল-কা‘বিয়া রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি,

«عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ».

‘ছেলে সন্তানের পক্ষে সমবয়সী দু’টি ছাগল এবং মেয়ে সন্তানের পক্ষে একটি ছাগল (দিয়ে আকীকা করা যাবে)।’ [আবূ দাউদ : ২৮৩৬; মুসনাদ আহমদ : ২৭৪০৯।]

৪. উম্মে কুরয আল-কা‘বিয়া রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আকীকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, উত্তরে তিনি বলেন,
«عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ وَاحِدَةٌ وَلاَ يَضُرُّكُمْ ذُكْرَانًا كُنَّ أَمْ إِنَاثًا».

‘ছেলে সন্তানের পক্ষে সমবয়সী দু’টি ছাগল এবং মেয়ে সন্তানের পক্ষে একটি ছাগল (দিয়ে আকীকা দেয়া যাবে) আর ওই ছাগলগুলো পাঠা হোক বা পাঠ তাতে তোমাদের কোনো অসুবিধা নাই।’ [তিরমিযী : ১৫৯৯; মুসনাদ আহমদ : ২৭৩৭৩।]

৫. হাফসা বিনতে আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা তাঁকে অবহিত করেছেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«عَنِ الْغُلامِ شَاتَانِ ، وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ»

‘পুত্র সন্তানের জন্য দু’টি ছাগল এবং কন্যা সন্তানের জন্য একটি ছাগল।’ [ইবন হিব্বান : ৫৩১০; ইবন আবী শাইবা : ২৪৭২৯।]

৬. একই হাদীসের অপর এক বর্ণনায় রয়েছে,

«عَنْ يُوسُفَ بْنِ مَاهَكَ ، أَنَّهُمْ دَخَلُوا عَلَى حَفْصَةَ بِنْتِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ فَسَأَلُوهَا عَنِ العَقِيقَةِ ، فَأَخْبَرَتْهُمْ أَنَّ عَائِشَةَ أَخْبَرَتْهَا ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَهُمْ عَنِ الغُلاَمِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ ، وَعَنِ الجَارِيَةِ شَاةٌ».

‘ইউসুফ বিন মাহাক থেকে বর্ণিত যে, তিনি হাফসা বিনতে আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার কাছে গেলেন এবং তাঁকে আকীকা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে জানালেন যে, তিনি তাঁকে এ মর্মে অবহিত করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ছেলে হলে সমবয়সী দু’টি ছাগল ও মেয়ে হলে একটি ছাগল দিয়ে আকীকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।’ [তিরমিযী : ১৫১৩।]

৭. আসমা বিনতে ইয়াযীদ রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«الْعَقِيقَةُ حَقٌّ ، عَنِ الْغُلامِ : شَاتَانِ ، وَعَنِ الْجَارِيَةِ : شَاةٌ».

‘পুত্র সন্তানের পক্ষ থেকে প্রায় সমবয়সী দু’টি ছাগল হক এবং কন্যা সন্তানের পক্ষ থেকে একটি।’ [আল-আদাদ ওয়াল-মাছানী : ৩৩৫৩; মুসনাদ আহমদ : ২৭৫৮২।]

৮. ইয়াযীদ বিন আব্দুল্লাহ মুযানী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«يُعَقُّ عَنِ الْغُلاَمِ ، وَلاَ يُمَسُّ رَأْسُهُ بِدَمٍ».

‘পুত্র সন্তানের পক্ষে আকীকা করা হবে আর তার মাথায় রক্ত স্পর্শ করা হবে না।’ [ইবন মাজা : ৩১৬৬; আল-আদাদ ওয়াল-মাছানী : ১১০৮।]

৯. আমর বিন শুয়াইব তার বাবা আর বাবা তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন যে,

«أَنَّ النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- أَمَرَ بِتَسْمِيَةِ الْمَوْلُودِ يَوْمَ سَابِعِهِ وَوَضْعِ الأَذَى عَنْهُ وَالْعَقِّ».

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মের সপ্তম দিবসে নবজাতকের নাম রাখা, তার আবর্জনা দূর করা (তথা নেড়ে করা) ও আকীকার নির্দেশ দিয়েছেন।’ [তিরমিযী : ২৮৩২।
]
১০. ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إذا كان يوم سابعه فأهريقوا عنه دما وأميطوا عنه الأذى وسموه».

‘যখন তার (নবজাতকের জন্মের) সপ্তম দিন আসবে, তখন তার পক্ষে রক্ত প্রবাহিত করো আর তার আবর্জনা (মাথার চুল) দূর করো এবং তার নাম রাখো।’ [তাবরানী, আল-মু‘জামুল আওসাত : ১৮৮৩।]

১১. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা আকীকা সংক্রান্ত যে হাদীস বর্ণনা করেন, তা থেকেও এমনটি প্রতিভাত হয়। তিনি বলেন,

«وَكَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَةِ يَجْعَلُونَ قُطْنَةً فِى دَمِ الْعَقِيقَةِ وَيَجْعَلُونَهُ عَلَى رَأْسِ الصَّبِىِّ فَأَمَرَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- أَنْ يُجْعَلَ مَكَانَ الدَّمِ خَلُوقًا.

‘জাহেলী যুগের লোকেরা আকীকার রক্তে তুলা ভেজাতো এবং তা শিশুর মাথায় রাখতো। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন তুলার স্থলে জাফরান তথা সুগন্ধি রাখা হয়।’ [বাইহাকী, সুনান আল-কুবরা : ১৯৭৬৭।]

১২. হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«إِنَّ الْيَهُودَ تَعُقُّ عَنِ الْغُلاَمِ وَلاَ تَعُقُّ عَنِ الْجَارِيَةِ فَعُقُّوا عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَيْنِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ».

‘ইহুদীরা পুত্র সন্তানের আকীকা করতো কিন্তু কন্যা সন্তান হলে তার আকীকা করতো না। অতএব তোমরা পুত্র সন্তানের জন্য দু’টি ছাগল এবং কন্যা সন্তানের জন্য একটি ছাগল দিয়ে আকীকা করো।’ [বাইহাকী, সুনান আল-কুবরা : ১৯৭৬০; মুসনাদ বাযযার : ৮৮৫৭।]

দ্বিতীয়ত. সুন্নাহ ফি‘লী বা কর্মগত হাদীস :
*******************************************

১. ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَقَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْحَسَنِ ، وَالْحُسَيْنِ بِكَبْشَيْنِ كَبْشَيْنِ.

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমার জন্য দু’টি দু’টি করে ভেড়া দিয়ে আকীকা করেন।’ [নাসায়ী : ১২১৯।]

২. আব্দুল্লাহ বিন বুরাইদা থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُمَا.

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য আকীকা করেছেন।’ [মু‘জামুল কাবীর : ২৫১০; নাসায়ী : ৪২১৩; মুসনাদ আহমদ : ২৩০৫১।]

৩. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ يَوْمَ السَّابِعِ وَسَمَّاهُمَا وَأَمَرَ أَنْ يُمَاطَ عَنْ رَأْسِهِمَا الأَذَى.

‘(জন্মের) সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইনের আকীকা দিয়েছেন, তাঁদের নাম রেখেছেন এবং তাঁদের মাথা থেকে কষ্ট (চুল) দূর করেছেন।’ [বাইহাকী : ১৯০৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৩১১।]

৪. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ شَاتَيْنِ يَوْمَ السَّابِعِ وَأَمَرَ أَنْ يُمَاطَ عَنْ رَأْسِهِ الأَذَى. وَقَالَ« : اذْبَحُوا عَلَى اسْمِهِ وَقُولُوا بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُمَّ لَكَ وَإِلَيْكَ هَذِهِ عَقِيقَةُ فُلاَنٍ.

‘হাসান ও হুসাইনের (জন্মের) সপ্তম দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি ছাগল দিয়ে আকীকা দেন এবং তার মাথার কষ্ট দূর করার নির্দেশ দেন। আর তিনি বলেন, ‘তাঁর (আল্লাহর) নামে জবাই করো এবং বলো, বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, হে আল্লাহ, আপনার কাছে অমুকের জন্য এ আকীকা।’ [বাইহাকী : ১৯৭৭২; মুসনাদ আবী ইয়া‘লা : ৪৫২১।]

৫. আব্দুল্লাহ ইবন উমরা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَّ عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ عَنْ كُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا كَبْشَيْنِ اثْنَيْنِ مِثْلَيْنِ مُتَكَافِئَيْنِ.

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন- উভয়ের প্রত্যেকের জন্যই প্রায় একইরকম সমবয়সী দুটি করে ভেড়া দিয়ে আকীকা দেন।’ [হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৫৯০।]

৬. আলী বিন আবী তালেব রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنِ الْحَسَنِ بِشَاةٍ وَقَالَ « يَا فَاطِمَةُ احْلِقِى رَأْسَهُ وَتَصَدَّقِى بِزِنَةِ شَعْرِهِ فِضَّةً . قَالَ فَوَزَنَتْهُ فَكَانَ وَزْنُهُ دِرْهَمًا أَوْ بَعْضَ دِرْهَمٍ.

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ছাগল দিয়ে হাসানের আকীকা দিলেন এবং বললেন, ‘হে ফাতেমা, এর তার মাথার চুল ফেলে দাও এবং তার চুলের ওজনে রুপা সদকা করো। তিনি বলেন, অতপর ফাতেমা তা পরিমাপ করলো, এর ওজন হলো এক দিরহাম বা এক দিরহামের কিছু পরিমাণ।’ [তিরমিযী : ১৬০২; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৫৮৯।]

নেড়ে করতে হবে, কাযা‘ করা যাবে না
************************************

উপরের হাদীসগুলোতে থেকে আমরা যেমন জানলাম, শিশু জন্মের সপ্তম দিনে তার মাথা নেড়ে করতে বলা হয়েছে। তবে কাযা‘ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর তা হলো, ‘বাচ্চার মাথা এমনভাবে নেড়ে করা যে তার মাথার বিভিন্ন স্থান অমুণ্ডিত থাকে’। [ইবনুল আছীর, নিহায়া : কাযা‘ অধ্যায়।]

ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- نَهَى عَنِ الْقَزَعِ. قَالَ قُلْتُ لِنَافِعٍ وَمَا الْقَزَعُ قَالَ يُحْلَقُ بَعْضُ رَأْسِ الصَّبِىِّ وَيُتْرَكُ بَعْضٌ».

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাযা‘ থেকে বারণ করেছেন। তিনি বলেন, নাফে‘কে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কাযা‘ কী? তিনি বললেন, বাচ্চার মাথার কিছু অংশ মুণ্ডানো আর কিছু অমুণ্ডিত রাখা’। [মুসলিম : ৩৯৫৯; বুখারী : ৫৪৬৫; ইবন মাজা : ৩৬২৭; আহমদ : ৪৯২৮।]

উদ্দেশ্য, নেড়ে করতে হবে পুরো মাথা জুড়ে। কারণ, মাথার কিছু অংশ নেড়ে করা আর কিছু না করা ইসলামী ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী, যার মাধ্যমে একজন মুসলিম অন্য জাতি-গোষ্ঠী থেকে এবং বিজাতীয় সংস্কৃতি থেকে স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী হয়। এই কাযা‘র মাধ্যমে মূলত কাফেরদের সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন হয়। আর তাদের সাদৃশ্য ধারণ জায়িয নয়।

হুমাইদ বিন আব্দুর রহমান বিন আউফ থেকে বর্ণিত, মুয়াবিয়া বিন সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু যে বছর হজ করেন, তিনি মিম্বরে বসলেন, আমার ভৃত্যের হাতে থাকা চুল থেকে একগুচ্ছ চুল নিলেন এবং বললেন,

يَا أَهْلَ الْمَدِينَةِ أَيْنَ عُلَمَاؤُكُمْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَنْهَى عَنْ مِثْلِ هَذِهِ وَيَقُولُ «إِنَّمَا هَلَكَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ حِينَ اتَّخَذَ هَذِهِ نِسَاؤُهُمْ».

হে মদীনাবাসী, কোথায় তোমাদের আলিমগণ? (তিনি কি তোমাদের বারণ করেন নি?) আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এমন করা থেকে নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, ‘বনী ইসরাঈল ধ্বংস হয়েছিল যখন তাদের নারীরা এটাকে (কাযা‘) ধারণ করেছিল।’ [মুসলিম : ৫৭০০; বুখারী : ৩৪৬৮; আবূ দাউদ : ৪১৬৯।]

(এ থেকে বুঝা যায়, মাথার চুল কিছু মুণ্ডানো আর কিছু রেখে দেওয়া তাদের শরীয়তে হারাম ছিল।)

ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى صَبِيًّا قَدْ حُلِقَ بَعْضُ شَعَرِهِ وَتُرِكَ بَعْضُهُ فَنَهَى عَنْ ذَلِكَ وَقَالَ : « احْلِقُوا كُلَّهُ ، أَوِ اتْرُكُوا كُلَّهُ».

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শিশুকে দেখলেন তার (মাথার) কিছু চুল নেড়ে করা হয়েছে আর কিছু অবশিষ্ট রাখা হয়েছে। তাকে দেখে তিনি এ থেকে বারণ করলেন এবং বললেন, তোমরা (মাথা) পুরোটাই মুণ্ডাও অথবা পুরোটাই অমুণ্ডিত রাখো।’ [মুসনাদ আহমদ : ৫৬১৫; আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ : ১৯৫৬৪১।]

কেন এই আকীকার বিধান
***************************

সন্দেহ নেই আকীকার রয়েছে নানা তাৎপর্য ও কল্যাণময় দিক। যেমন :
এক. অলীউল্লাহ দেহলভী রহ. বলেন, ‘এতে আছে ধর্মীয়, নাগরিক ও আত্মিক অনেক উপকারী দিক। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা বহাল রাখেন, এর আমল করেন এবং মানুষকে এতে উদ্বুদ্ধ করেন। এসব কল্যাণময় দিকের মধ্যে রয়েছে, যেমন :

ক. ভদ্রোচিত পন্থায় সন্তানের বংশ পরিচয় প্রকাশ করা। কারণ বংশ পরিচয় প্রকাশ না করলেই নয়। যাতে অনভিপ্রেত কথা না শুনতে হয়। আর এমনটি কখনো সুন্দর দেখায় না যে কেউ পথে পথে ঘুরে মানুষকে বলে বেড়াবেন যে এ আমার সন্তান।

খ. খ্রিস্টানদের যখন কোনো সন্তান হতো, তারা তাকে হলুদ পানি দিয়ে হরিদ্রা বানিয়ে দিত। তারা এর নাম দিয়েছিল ‘মা‘মুদিয়া’। তারা বলতো, এর মধ্য দিয়ে শিশুটি খ্রিস্টান হয়ে যাবে। এ নামের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখেই নাযিল হয়েছিল

﴿ صِبۡغَةَ ٱللَّهِ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ صِبۡغَةٗۖ وَنَحۡنُ لَهُۥ عَٰبِدُونَ ﴾ [البقرة :138]

‘(বল,) আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করলাম। আর রং এর দিক দিয়ে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক সুন্দর? আর আমরা তাঁরই ইবাদাতকারী।’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৩৮}

অতএব তাদের ওই রীতির বিপরীতে হানীফীদেরও কোনো কাজ থাকা বাঞ্ছনীয়। যে থেকে বুঝা যাবে শিশুটি হানীফী তথা ইসমাঈল ও ইবরাহীম আলাইহিমাস সালামের অনুসারী। আর তাঁদের সন্তানদের মধ্যে বংশানুক্রমে আগত কাজগুলোর মধ্যে সবচে প্রসিদ্ধ পুত্র কুরবানীর বিষয়টি। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আপন পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করেন।
আর আল্লাহ তা‘আলাও তাঁকে নিয়ামতে ভূষিত করেন। তাঁর সন্তানকে মহান যবেহের মাধ্যমে মুক্ত করেন এবং তাঁদের বিধান হজকে দেন কিয়ামতাবধির জন্য স্থায়িত্ব, যার মধ্যে রয়েছে মাথা নেড়ে করা এবং পশু যবেহ করা। ফলে এই আকীকা ও মাথা মুণ্ডনের মধ্য দিয়ে তাঁদের সঙ্গে সাদৃশ্য গ্রহণ হবে। হানীফী মিল্লতের প্রতি ইঙ্গিতও হবে আবার ঘোষণাও হবে যে সন্তানটির সঙ্গে এ উম্মতের কাজই করা হয়েছে।

গ. এ কাজ তাকে শিশুটির জন্মের পর মুহূর্তেই তাকে এ কল্পনায় নিয়ে যাবে যে সে তার সন্তানকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দিল, যেমন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম করেছিলেন তাঁর পুত্র ইসমাঈলকে।

দুই. সন্তান দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া জ্ঞাপন করা। কেননা, সন্তানই অন্যতম সেরা নেয়ামত। আর এ সন্তান হলো পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ٱلۡمَالُ وَٱلۡبَنُونَ زِينَةُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ ﴾ [الكهف :46]

‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা…।’ {সূরা আল-কাহফ, আয়াত : ৪৬}

আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে এ প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে সে সন্তান ভূমিষ্ট হলে আনন্দিত হয়। তাই মানুষের কাছে তার স্রষ্টা ও দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশই কাম্য। এ জন্যই হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে সদ্য সন্তানের পিতা হওয়া ব্যক্তিকে অভিবাদন জানিয়ে এমন বলার কথা বর্ণিত হয়েছে,

باركَ اللّه لكَ في الموهوب لك وشكرتَ الواهبَ وبلغَ أشدَّه ورُزقت برّه.

‘তোমাকে যা দান করা হয়েছে আল্লাহ তাতে বরকত দিন। তুমি দানকারীর শুকরিয়া আদায় করো, সে তার বয়স পুরো করুক এবং তোমাকে তার পুণ্য প্রদান করা হোক।’ [মুসনাদ ইবনুল জা‘দ : ১৪৪৮; ইবন আদী, আল-কামেল : ৭/১০১; ইনব আবিদ্দুনইয়া, আল-ইয়াল : ১/২০১।][1]

( উল্লেখ্য, এর সবগুলো সূত্রই দুর্বল। এটি হাদীস নয়; একটি আছর, যা হাসান রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। এটা হাদীস মনে না করে কেবল একটি দু‘আ হিসেবে পড়া যাবে। (নাববী, আল-আযকার : ১/৬৪৮) )

অতএব বুঝা গেল, আকীকা হলো আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও তাঁর নৈকট্য লাভের একটি উত্তম উপায়।

তিন. এতে আছে সন্তানের মুক্তি এবং তার বিনিময় প্রদান। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইসমাঈল যবীহের বিনিময়ে ভেড়া কুরবানী দিয়ে দেন। জাহেলী যুগের লোকেরাও এটা করত এবং তারা এটাকে আকীকা বলত। আর শিশুর মাথায় তারা রক্ত লাগিয়ে দিত। ইসলাম সেই নিয়মটিকে সমর্থন করে এবং নবজাতকের মাথায় রক্ত লাগানো নিষিদ্ধ করে দেয়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জানিয়ে দেন যে, নবজাতকের জন্য যা-ই যবেহ করা হবে তা হতে হবে কুরবানী ও হজের হাদীর মতো ইবাদত হিসেবে। তিনি বলেন,

«مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَنْسُكَ عَنْ وَلَدِهِ فَلْيَنْسُكْ عَنْهُ عَنِ الْغُلاَمِ شَاتَانِ مُكَافَأَتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ».

‘যে তার সন্তানের জন্য কোনো কুরবানী দিতে চায়, তবে যেন পুত্র হলে দুটি সমবয়সী ছাগল এবং কন্যা হলে একটি ছাগল গিয়ে ইবাদত (তথা আকীকা) করে।’ [নাসায়ী : ৪২২৯; শরহু মা‘আনিল আছার : ১০১৫।]

অর্থাৎ তিনি এটাকে কুরবানী হিসেবে করতে বললেন, আল্লাহ তা‘আলা যেটাকে ইসমাঈল আলাইহিস সালামের জন্য কুরবানী ও বিনিময় হিসেবে দিয়েছিলেন। আর আল্লাহ তা‘আলার পক্ষে অসম্ভব নয় যে তিনি সন্তানের জন্য, তার সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘায়ু জন্য এ বিধান দিয়েছেন। যাতে ওই যবেহকৃত পশুর প্রতিটি অঙ্গ এ শিশুর বিনিময় হয়।

চতুর্থ. এ কথার সংবাদ ও ঘোষণা দেয়া যে এ ব্যক্তি সন্তানের পিতা হয়েছে এবং সন্তানের নাম অমুক রেখেছে। ফলে তার পরিজন, প্রতিবেশি ও বন্ধ-বান্ধব এ সংবাদ জানবে এবং তাকে মোকারকবাদ দিতে আকীকায় উপস্থিত হবে। এতে করে মুসলিম ভাইদের মাঝে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় হবে।

পঞ্চম. এতে ইসলামের সামাজিক দায়িত্বগুলোর একটি প্রকারের চর্চা হয়। কেননা, যিনি তার সন্তানের জন্য আকীকা হিসেবে পশু জবাই করেন এবং তা বন্ধ-বান্ধব, প্রতিবেশি ও গরীব-মিসকীনদের জন্য পাঠিয়ে দেন বা তাদের দাওয়াত করেন। আর এটি গরীবদের অভাব মোচন ও দারিদ্র হ্রাসে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে।

পশু যবেহ করা তার মূল্য দান করার চেয়ে উত্তম যদিও তা বেশি হয়
**************************************************************

এসব তাৎপর্য ও উপকারিতার কারণেই আকীকা হিসেবে পশু যবেহ করা এর মূল্য দান করার চেয়ে উত্তম যদিও তা পরিমাণে বেশি হয়। কারণ তা একটি সুন্নত এবং প্রবর্তিত ইবাদত, যা পিতামাতার ওপর আল্লাহর নতুন নিয়ামতের ওপর শুকরিয়া স্বরূপ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানী করার মতো অনুপম তাৎপর্য নিহিত রয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা যার বদলে ভেড়া কুরবানী করে দেন। আকীকা যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেবার মধ্য দিয়ে সন্তানকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর হিকমতও রয়েছে, যেমন সে গর্ভে আসার সময় (স্বামী-স্ত্রীর মিলনকালে দু‘আ পড়ার মাধ্যমে) শয়তানের দুষ্ট প্রভাব থেকে নিরাপদ হয়।

আকীকা সংক্রান্ত করণীয়
***************************

প্রথম. আকীকার গোশত ব্যবহার
আকীকার পশু যবেহ করার পর এর ব্যবহার ঠিক কুরবানীর পশুর মতোই। ফলে তা তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একভাগ পরিবার, একভাগ সাদাকা ও একভাগ হাদিয়ার জন্য।

ইমাম নাববী রহ. বলেন,
[ ويستحب أن يأكل منها ويتصدق ويهدي كما قلنا في الأضحية ]

‘মুস্তাহাব হলো আকীকার গোশত থেকে (নিজেরা) খাওয়া, (গরীবদের মাঝে) সদকা করা এবং (বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে) হাদিয়া পাঠানো। যেমন আমরা বলেছি এসেছি কুরবানীর পশুর ক্ষেত্রে।’ [নাসায়ী : ৪২২৯; শরহু মা‘আনিল আছার : ১০১৫।]

অধিকাংশ আলেম আবার আকীকার গোশত কাঁচা সদকা না করে তা রান্না করে সদকা করা এবং রান্নার তা গরীবদের কাছে তা পাঠিয়ে দেয়াকে মুস্তাহাব বলেছেন। তবে যদি না পাঠিয়ে তাদেরকে বাড়িতে এনে দাওয়াত করে খাওয়ানো তাহলে সেটা আরও উত্তম। যদি আকীকার গোশত দিয়ে দাওয়াতের আয়োজন করা হয়, তাহলে তাতে ধনী-গরীব, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-প্রতিবেশী সবাইকে শরীক করতে যাবে। এক কথায় তিনি যেভাবে চান এটাকে কাজে লাগাবেন।

প্রখ্যাত তাবেয়ী ইবন সীরীন রহ. বলেন,
[ إصنع بلحمها كيف شئت ]

‘আকীকার গোশত যেভাবে ইচ্ছে কাজে লাগাতে পারেন।’ [আল-মাজমূ‘ : ৮/৪৩০।]

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর সঙ্গে রান্নার কথাও যোগ করেন।

[ فقد قيل له : تطبخ العقيقة ؟ قال : نعم . قيل له : يشتد عليهم طبخها . قال : يتحملون ذلك ].

তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, আকীকার গোশত কি রান্না করা হবে? তিনি বললেন, ‘হ্যা’। তাকে বলা হলো, তাদের জন্য এটা রান্না করা কঠিন হবে। তিনি বললেন, ‘তারা সেটা সহ্য করবে।’

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন,

[وهذا لأنه إذا طبخها فقد كفى المساكين والجيران مؤنة الطبخ وهو زيادة في الإحسان وفي شكر هذه النعمة ، ويتمتع الجيران والأولاد والمساكين بها هنيئة مكفية المؤنة فإن من أهدي إليه لحم مطبوخ مهيأ للأكل مطيب كان فرحه وسروره به أتم من فرحه بلحم نيء يحتاج إلى كلفة وتعب ].

‘এটা এজন্য যে, তিনি যখন গোশত রান্না করে দেবেন, গরীব, মিসকিন ও প্রতিবেশিদের আর রান্নার কষ্ট ও খরচটুকু বহন করতে হবে না। একটি ভালো কাজে তা নতুন মাত্রা যোগ করবে। নিয়ামতের শুকরিয়ায় এটি অতিরিক্ত হিসেবে বরিত হবে। প্রতিবেশি, সন্তানাদি ও অভাবীরা এর মাধ্যমে আরও বেশি আনন্দিত হবে। কারণ যদি কাউকে রান্না করা এবং খাবারের জন্য একেবারে প্রস্তুত কোনো গোশত কাউকে দেওয়া হয় তবে তিনি ওই গোশত পাওয়া থেকে অবশ্যই অধিক খুশি হবেন, যাতে পাকানো ও রান্নার কষ্ট সহ্য করার প্রয়োজন রয়েছে।’ [তুহফাতুল মাওদূদ : ৫৯-৬০।]

ইমাম মালিক রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তার সন্তানের আকীকা করেন। তিনি আকীকা কীভাবে করেছেন আমাদের জন্য তার বিবরণ দিয়েছেন। তদীয় ‘মাবসূত’ গ্রন্থে তিনি লিখেন,

عققت عن ولدي وذبحت ما أريد أن أدعو إليه إخواني وغيرهم ، وهيأت طعامهم ، ثم ذبحت شاة العقيقة فأهديت منها للجيران ، وأكل منها أهل البيت ، وكسروا ما بقي من عظامها فطبخت ، فدعونا إليها الجيران فأكلوا وأكلنا ، قال مالك : فمن وجد سعة فأحب له أن يفعل هذا ومن لم يجد فليذبح عقيقة ثم ليأكل وليطعم منها

‘আমি আমার সন্তানের আকীকা দিয়েছি। প্রথমে যেসব ভাই ও অন্যদের দাওয়াত দিয়েছি তাদের যা খাওয়াবার ইচ্ছে করেছি তা জবাই করলাম। তারপর তাদের খাবার প্রস্তুত করলাম। এরপর আকীকার ছাগল জবাই করলাম। তা থেকে প্রতিবেশিদের হাদিয়া দিলাম। পরিবারের লোকেরা গোশত খেল। হাড়-হাড্ডি যা অবশিষ্ট ছিল সেগুলো টুকরো করে রান্না করলাম। তারপর প্রতিবেশিদের আবার সেগুলো খাওয়ার দাওয়াত দিলাম। তারা খেল আর আমরাও খেলাম। মালিক রহ. বলেন, অতএব যার অর্থের প্রাচুর্য রয়েছে, আমি চাই তিনি এমন করবেন। আর যার নাই, তিনি আকীকা জবাই করবেন এবং সেখান থেকে খাবেন ও খাওয়াবেন।’ [আল-মুনতাকা : ৩/১০৪।]

দ্বিতীয়. আকীকার চামড়া ও এর বর্জ্যসংক্রান্ত বিধান
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ.-এর মতে আকীকার চামড়া, মাথা এবং ইত্যাকার অংশগুলো বিক্রি করা হবে তারপর তার মূল্য সাদাকা করা হবে। আকীকার বর্জ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
الجلد والرأس والسقط يباع ويتصدق به

‘চামড়া, মাথা এবং বর্জ্য বিক্রি করা হবে এবং তা সদকা করা হবে।’ [তুহফাতুল মাওদূদ : ৭০; কাশশাফুল কিনা‌ : ৩/৩১।]

এদিকে ইমাম মালিক রহ.-এর যে কোনো অংশ বিক্রির বিপক্ষে। তিনি বলেন,

ولا يباع من لحمها شيء ولا جلدها

‘আকীকার গোশত বা চামড়ার কোনো অংশই বিক্রি করা হবে না।’ [আল-মুয়াত্তা বিহামিশিল মুনতাকা : ৩/১০৩।]

ইবন রুশদ বলেন,
وأما حكم لحمها وجلدها وسائر أجزائها فحكم لحم الضحايا في الأكل والصدقة ومن البيع

‘আকীকার গোশত, চামড়া এবং এর যাবতীয় অংশের বিধান খাওয়া, সদকা করা ও বেচার দিক থেকে কুরবানীর পশুর মতোই।’ [বিদায়াতুল মুজতাহিদ : ১৩৭৭।]
এককথায় আকীকার গোশত ও এর অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার তেমনি যেমন কুরবানীর পশুর গোশত ও তার অন্যান্য অংশের ব্যবহার করতে হয়।

আকীকা সংক্রান্ত আরও কিছু মাসআলা

# অধিকাংশ আলিমের মতে আকীকা সুন্নত। তবে কেউ কেউ আকীকা ওয়াজিব বলেছেন।

# জন্মের সপ্তম দিনে আকীকা দেয়াটাই সুন্নতের পূর্ণ আনুগত্যের দাবী। তবে এরপরেও যে কোনো সময় আকীকা দেয়া যাবে। কারণ, হাদীসে সপ্তম দিনের কথা বলা হয়েছে, তবে তা হবে না- এমন কিছু বলা হয়নি।

# ছেলের আকীকা হিসেবে দুটি এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল জবাই করা সুন্নত। তবে কষ্টসাধ্য হলে একটি ছাগল দিয়েও ছেলের আকীকা দেয়া যাবে। কারণ, উভয় ধরনের হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের জীবনের প্রতিটি পর্বকে তাঁর রাসূলের সুন্নতের রঙ্গে রাঙাবার এবং সকল অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকবার তাওফীক দিন। আমীন।

লেখক : আলী হাসান তৈয়ব
সম্পাদনা : ড. মো: আব্দুল কাদের
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব।

সৌভাগ্যময় ঘর

 সৌভাগ্যময় ঘর

=================================================================

* পরিবার গঠন ও দাম্পত্য জীবনে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গুরুত্ব
* পরিবারের অবকাঠামোর খুঁটিসমূহ
১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও তাঁকে ভয় করা
২. পরস্পর সদ্ব্যবহার করা
* দাম্পত্য জীবন তথা পরিবার সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বামীর ভূমিকা
* দাম্পত্য জীবন বা পরিবার সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্ত্রীর ভূমিকা
উপসংহার

(সৌভাগ্যময় ঘর)
***************************************************************************************************

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে ইসলামের পথে পরিচালিত করেছেন এবং আমাদেরকে তার অনুসারী বানিয়েছেন; আল্লাহ যদি আমাদেরকে হেদায়াত না করতেন, তাহলে আমরা হেদায়াত পেতাম না; আমি আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলার প্রশংসা করছি এবং তাঁর নি‘য়ামতের ব্যাপারে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি; আর তাঁর নিকট তাঁর অনুগ্রহ ও করুনা বৃদ্ধির আবেদন করছি; আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, যিনি একক, যাঁর কোনো শরীক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, যাঁকে তিনি হেদায়েত ও সত্য দীনসহ সুসংবাদ বাহক ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন; তিনি সত্যের দিকে আহ্বান করেছেন এবং কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেছেন; আল্লাহ তাঁর উপর এবং তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবীগণ ও কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যে ব্যক্তি তাঁর হেদায়েতের অনুসরণ করবে তার উপর রহমত, শান্তি ও বরকত বর্ষণ করুন।

অতঃপর

হে মুসলিমগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, তোমাদের রবের নির্দেশকে সমীহ কর, তোমাদের দীন ও আমানতসমূহকে হেফাযত (সংরক্ষণ) কর এবং তোমরা তোমাদের দায়িত্বসমূহ পালন কর; আর তোমরা তোমাদের নিজেদের ব্যাপারে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করে নাও।

অনেক মানুষ সৌভাগ্যের অনুসন্ধান করে; আর অন্বেষণ করে শান্তি, স্থিতি এবং দেহ ও মনের প্রশান্তি; যেমনিভাবে সে দুর্ভাগ্য ও অস্থিরতার কারণসমূহ, দুশ্চিন্তার উদ্দীপকসমূহ এবং বিশেষ করে পারিবারিক কলহ থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে চেষ্টাসাধনা করে।
তবে তাদের জানা উচিত যে, এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর উপর ভরসা এবং সকল বিষয় তাঁর প্রতি সোপর্দ করা ব্যতীত এসব বাস্তবায়ন করা যাবে না, আর সাথে সাথে তিনি যেসব নিয়মনীতি ও উপায় প্রণয়ন করেছেন, সেগুলোকে গ্রহণ করতে হবে।

· পরিবার গঠন ও দাম্পত্য জীবনে সৌহার্দ্যের গুরুত্ব:
এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উপর যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে তা হলো পরিবার গঠন ও তাকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর প্রজ্ঞায় পরিবারকে পুরুষ ও নারী নির্বিশেষ সকল মানুষের জন্য তৈরি করেছেন প্রত্যাবর্তনস্থল হিসেবে; যাতে সে অবস্থান করবে এবং সেখানে প্রশান্তি অনুভব করবে;

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি এ অনুগ্রহ প্রকাশ করে বলেন:

﴿ وَمِنۡ ءَايَٰتِهِۦٓ أَنۡ خَلَقَ لَكُم مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ أَزۡوَٰجٗا لِّتَسۡكُنُوٓاْ إِلَيۡهَا وَجَعَلَ بَيۡنَكُم مَّوَدَّةٗ وَرَحۡمَةًۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّقَوۡمٖ يَتَفَكَّرُونَ ٢١ ﴾ [الروم: ٢١]
“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া; যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং সৃজন করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও সহমর্মিতা। নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।” – (সূরা আর-রূম, আয়াত: ২১ )।

হ্যাঁ, আল্লাহ বলেছেন: ‘যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়’; তিনি বলেন নি: ‘যাতে সে তার সাথে বাস করে’, সুতরাং আল্লাহর এ বাণীর দাবী হচ্ছে যে, পরিবারের আচার-আচরণ হবে স্থিতিশীল আর অনুভূতি হবে প্রশান্তির কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে সর্বোচ্চ অর্থে শান্তি ও নিশ্চিন্ততা প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকেই তার সঙ্গীর মধ্যে অস্থিরতার সময় প্রশান্তি এবং সঙ্কটময় মুহূর্তে আনন্দ অনুভব করবে।

দাম্পত্য জীবনের সম্পর্কের মূলভিত্তি হল: ভালোবাসা, ঘনিষ্টতা ও সখ্যতার উপর প্রতিষ্ঠিত সাহচর্য ও মিলন। এ সম্পর্কের শিকড় অনেক গভীরে, বিস্তৃতি অনেক দূর ব্যপ্ত, স্বয়ং ব্যক্তির সাথে তার আত্মার যে সম্পর্ক, এটা তার সাথে খুব চমৎকারভাবে তুলনাযোগ্য, যা আমাদের প্রতিপালকের কিতাব বর্ণনা করেছে, তিনি বলেছেন:

﴿ هُنَّ لِبَاسٞ لَّكُمۡ وَأَنتُمۡ لِبَاسٞ لَّهُنَّۗ ﴾ [البقرة: ١٨٧]

“তারা তোমাদের পোষাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের পোষাকস্বরূপ।” – ( সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭ )।

তাছাড়া এই সম্পর্ক ছেলে ও মেয়েদের শিক্ষা এবং লালনপালন দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে যা গঠন করে, তা স্নেহপূর্ণ মাতৃত্ব ও শ্রমনির্ভর পিতৃত্বের ছায়াতল ছাড়া হতে পারে না।
এ সম্মানিত পারিবারিক পরিবেশের চেয়ে আর কোন পরিবেশ অধিক পবিত্র হতে পারে?
* * *

মুসলিম পরিবার প্রতিষ্ঠার খুঁটিসমূহ
*********************************

সম্মানিত পাঠক:

এমন অনেক বিষয় রয়েছে যার উপর মুসলিম পরিবারের অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে; যার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক এবং যা মেনে চললে তা থেকে দূরে থাকে বিচ্ছিন্নতার ঝড়ো হাওয়া ও ভঙ্গ ও কর্তিত হওয়ার তুফান। সে সব খুঁটিসমূহের অন্যতম হচ্ছে:

১. আল্লাহর উপর পূর্ণ ঈমান ও তাঁর তাকওয়া অবলম্বন:

যে সব খুঁটির উপর মুসলিম পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে, তন্মধ্যে সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: ঈমানের রশিকে শক্তভাবে আকড়ে ধরা … আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান; অন্তর যা লুকিয়ে রাখে, সে বস্তু সম্পর্কে যিনি জানেন তাকে ভয় করা; তাকওয়া ও আত্মপর্যবেক্ষণকে অপরিহার্য করে নেয়া; আর যুলুম থেকে এবং সত্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে অন্যায়ের আশ্রয় নেওয়া থেকে দূরে থাকা। আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿ … ذَٰلِكُمۡ يُوعَظُ بِهِۦ مَن كَانَ يُؤۡمِنُ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا ٢ وَيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُۚ وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ … ٣ ﴾ [الطلاق: ٢، ٣]

“ … এর দ্বারা তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে, তাকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর যে কেউ আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য (উত্তরণের) পথ করে দেবেন, আর তিনি তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিযিক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। …” – (সূরা আত-তালাক, আয়াত: ২ – ৩)।

আর এই ঈমানকে শক্তিশালী করবে: আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের ব্যাপারে চেষ্টা করা, তার ব্যাপারে যত্নবান থাকা এবং সে ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরস্পরকে উপদেশ দেওয়ার ব্যবস্থা করা; তোমরা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীটি নিয়ে ভেবে দেখ, তিনি বলেছেন:

« رحم الله رجلا قام من الليل فصلى وأيقظ امرأته فصلت , فإن أبت نضح في وجهها الماء ( يعني : رش عليها الماء رشا رفيقا ) , ورحم الله امرأة قامت من الليل فصلت وأيقظت زوجها فصلى , فإن أبى نضحت في وجهه الماء » . (رواه أحمد و أبو داود و النسائي و ابن ماجه ) .

“আল্লাহ রহম করুন এমন পুরুষ ব্যক্তির প্রতি, যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে উঠে, অতঃপর সালাত আদায় করে এবং সে তার স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয়, তারপর সেও সালাত আদায় করে; অতঃপর সে (স্ত্রী) যদি ঘুম থেকে উঠতে আপত্তি করে, তাহলে তার মুখমণ্ডলের উপর হালকাভাবে পানি ছিটিয়ে দেয়। আর আল্লাহ রহম করুন এমন নারীর প্রতি, যে রাতে ঘুম থেকে উঠে, অতঃপর সালাত আদায় করে এবং সে তার স্বামীকে জাগিয়ে দেয়, তারপর সেও সালাত আদায় করে; অতঃপর সে (স্বামী) যদি ঘুম থেকে উঠতে আপত্তি করে, তাহলে তার মুখমণ্ডলের উপর হালকাভাবে পানি ছিটিয়ে দেয়।”[1]

স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কটি পার্থিব ও বস্তুগত কোনো সম্পর্ক নয়; নয় চতুষ্পদ জন্তুর প্রবৃত্তির মত কোনো সম্পর্ক; বরং তা হল আত্মীক ও সম্মানজনক একটি সম্পর্ক; আর যখন এই সম্পর্কটি নির্ভেজাল ও যথাযথ হবে, তখন তা মৃত্যুর পর পরকালীন জীবন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে; আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿جَنَّٰتُ عَدۡنٖ يَدۡخُلُونَهَا وَمَن صَلَحَ مِنۡ ءَابَآئِهِمۡ وَأَزۡوَٰجِهِمۡ وَذُرِّيَّٰتِهِمۡۖ ﴾ [الرعد: ٢٣]

“স্থায়ী জান্নাত, তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকাজ করেছে তারাও।” – ( সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ২৩ )।
২. সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন-যাপন করা:

যে জিনিসটি এ পবিত্র দাম্পত্য সম্পর্ককে হেফাযত ও তত্ত্বাবধান করে, তা হল পরস্পর সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন-যাপন করা; আর এটা ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তবে পরিণত হবে না, যতক্ষণ না প্রত্যেক পক্ষ তার ভাল-মন্দ সম্পর্কে বুঝতে পারবে। বস্তুত ঘর ও পরিবারের ব্যাপারে সার্বিক পূর্ণতার বিষয়টি সুদূর পরাহত, তাই পরিবারের সদস্য কিংবা অন্যদের মধ্যে সকল বৈশিষ্ট্যের পরিপূর্ণতা লাভ করার আশা করাটা মানব স্বভাবে নাগালের বাইরের বিষয়।

· দাম্পত্য জীবন তথা পরিবার সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সুন্দর জীবন যাপনে স্বামীর ভূমিকা:

সুস্থ বিবেক এবং পরিপক্ক চিন্তার দাবী হচ্ছে, কতিপয় অসহিষ্ণুতাকে গ্রহণ করা এবং অসুখকর বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখার ব্যাপারে মনকে তৈরী করে রাখা। কারণ, পুরুষ হল পরিবারের কর্তা, তার নিজের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা নারীর চেয়ে অধিক হবে এটাই দাবি। কেননা, পুরুষ জানে যে, নারী তার সৃষ্টিগত ও স্বভাব-প্রকৃতির দিক থেকে দুর্বল; যখন তাকে প্রত্যেক বিষয়ে জবাবদিহির সম্মুখীন করা হবে, তখন সে সব বিষয়ে জবাব দিতে অক্ষম হয়ে পড়বে; আর তাকে সোজা করার ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করার বিষয়টি তাকে ভেঙ্গে ফেলার দিকে নিয়ে যাবে, আর তার ভেঙ্গে যাওয়া মানে তাকে তালাক দেওয়া; নবী মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে কোনো কথা বলেন না, (বরং যা বলেন আল্লাহর পক্ষ থেকেই বলেন) তিনি বলেন,

« استوصوا بالنساء فإن المرأة خلقت من ضلع وإن أعوج شيء في الضلع أعلاه , فإن ذهبت تقيمه كسرته , وإن تركته لم يزل أعوج فاستوصوا بالنساء » . ( رواه البخاري و مسلم ) .

“তোমরা নারীদের ব্যাপারে উত্তম উপদেশ গ্রহণ কর। কারণ, নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে; আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে উপরের হাড়টি অধিক বাঁকা; সুতরাং তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে ফেলবে; আর যদি এমনি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থেকে যাবে; কাজেই নারীদের সাথে কল্যাণমূলক কাজ করার উপদেশ গ্রহণ কর।”[2]

সুতরাং নারীর মধ্যে বক্রতার বিষয়টি মৌলিকভাবেই সৃষ্টিগত; অতএব, আবশ্যক হলো সহজসুলভ আচরণ করা এবং ধৈর্য ধারণ করা।

তাই পুরুষের উপর কর্তব্য হল, তার পরিবারের পক্ষ থেকে যে অসহিষ্ণু আচরণের প্রকাশ ঘটবে, সে ক্ষেত্রে তার সাথে দীর্ঘ বিতর্কে জড়িয়ে না পড়া; আর সে যেন তাদের মধ্যকার বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকসমূহ থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে চলে এবং তার কর্তব্য হল তাদের মধ্যকার ভাল দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা, আর এর মধ্যে সে অনেক ভালো কিছু পাবে।

অনুরূপ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

« لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً ( أي : لا يبغض و لا يكره ) إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِىَ مِنْهَا آخَرَ » . ( رواه مسلم ) .

“কোন মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা ও অপছন্দ করবে না; যদি সে তার কোনো স্বভাবকে অপছন্দ করেও, তাহলে সে তার অপর একটি স্বভাবকে পছন্দ করবে।”[3]
আর সে যেন এ ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে ধীর-স্থিরতা অবলম্বন করে; সে যদি তার অপছন্দনীয় কোনো কিছু দেখে, তাহলে এটাই শেষ কথা হিসেবে গ্রহণ না করে, কারণ সে জানে না কোথায় রয়েছে কল্যাণের মাধ্যম ও ভালোর উৎস।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ … وَعَاشِرُوهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ فَإِن كَرِهۡتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰٓ أَن تَكۡرَهُواْ شَيۡ‍ٔٗا وَيَجۡعَلَ ٱللَّهُ فِيهِ خَيۡرٗا كَثِيرٗا ١٩ ﴾ [النساء: ١٩]
“ … আর তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করবে; তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।” – (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৯ )।

আর শান্তি কিভাবে হবে? আর প্রশান্তি ও হৃদ্যতা কোত্থেকে আসবে? যখন পরিবারের কর্তা কঠোর প্রকৃতির, দুর্ব্যবহারকারী ও সংকীর্ণমনা হন; যখন তাকে নির্বুদ্ধিতা পরাভূত করে; আর তাড়াহুড়া, সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে ধীরতা ও রাগের ক্ষেত্রে দ্রুততার বিষয়টি তাকে অন্ধ করে তুলে; যখন সে প্রবেশ করে, তখন বেশি বেশি খোটা দেয়; আর যখন বের হয়, তখন সে কুধারণা করে? অথচ এটা জানা কথা যে, উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন-যাপন এবং সৌভাগ্যের উপায়-উপকরণসমূহ কেবল উদারতা এবং ভিত্তিহীন যাবতীয় ধ্যানধারণা ও সন্দেহ থেকে দূরে থাকার মধ্য দিয়েই অর্জিত হতে পারে। আর আত্মমর্যাদা বা ব্যক্তিত্বের অহংবোধ কখনও কখনও কিছু সংখ্যক মানুষকে কুধারণা পোষণ করার দিকে নিয়ে যায়… তাকে নিয়ে যায় বিভিন্ন কথাবার্তার অপব্যাখ্যা কিংবা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সন্দেহ তৈরী করতে। আর তখন তা কোনো নির্ভরযোগ্য কারণ ছাড়াই ব্যক্তির জীবনকে বিস্বাদ করে দেয় এবং মনকে অস্থির করে তুলে। আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿ وَلَا تُضَآرُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُواْ عَلَيۡهِنَّۚ ﴾ [الطلاق: ٦]

“আর তাদেরকে উত্যক্ত করবে না সংকটে ফেলার জন্য।” – (সূরা আত-তালাক, আয়াত: ৬)।

আর কিভাবে এ কাজটি একজন লোক তার স্ত্রী সম্পর্কে করতে পারে, অথচ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

« خيركم خيركم لأهله وأنا خيركم لأهلي » . ( رواه الترمذي و ابن ماجه ) .

“তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম, তোমাদের মধ্যে যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম; আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীর নিকট উত্তম।”[4]

· দাম্পত্য জীবন তথা পরিবার সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সুন্দর জীবন যাপনে স্ত্রীর ভূমিকা:

মুসলিম নারীর জেনে রাখা উচিত যে, সৌভাগ্য, ভালোবাসা ও অনুকম্পা তখনই পরিপূর্ণতা লাভ করবে, যখন সে সচ্চরিত্রবান ও দ্বীনদার হবে; সে তার নিজের জন্য উপকারী ইতিবাচক দিকগুলো জেনে নিবে; যাতে সে তার সীমা অতিক্রম ও লঙ্ঘন না করে; সে তার স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিবে;

কারণ, তাকে পরিচালনার ব্যাপারে স্বামীর উপর দায়িত্ব রয়েছে, স্বামী তাকে হেফাযত করবে, সংরক্ষণ করবে এবং তার জন্য ব্যয় করবে; সুতরাং স্ত্রীর উপর আবশ্যক হলো, স্বামীর আনুগত্য করা, স্বামীর জন্য সে তার নিজকে সংরক্ষণের নিশ্চয়তা বিধান করা এবং স্বামীর সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করা;

আর স্ত্রী তার নিজের কাজ-কর্ম সুন্দরভাবে আঞ্জাম দিবে ও তা যথাযথভাবে পালন করবে এবং সে তার নিজের ও সংসারের প্রতি যত্নবান হবে; সে হবে পবিত্রা স্ত্রী, মমতাময়ী মাতা, তার স্বামীর সংসারের রক্ষণাবেক্ষণকারিনী দায়িত্বশীলা, যে দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহী করতে হবে।

সে তার স্বামীর ভালো ও সৌন্দর্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি দিবে, তার অবদান ও উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন-যাপনের বিষয়টিকে অবজ্ঞা ও অস্বীকার করবে না; এই ধরনের অবজ্ঞা প্রদর্শন ও অস্বীকার করার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন, তিনি বলেছেন:

« أريت النار فإذا أكثر أهلها النساء يكفرن » . قيل : أيكفرن بالله ؟ قال : « يكفرن العشير ويكفرن الإحسان ؛ لو أحسنت إلى إحداهن الدهر ثم رأت منك شيئا قالت : ما رأيت منك خير قط » . ( رواه البخاري ) .

“আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়; (তখন আমি দেখি) তার অধিবাসীদের অধিকাংশই স্ত্রীলোক, যারা কুফরী করে। জিজ্ঞাসা করা হল: তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে? তিনি বললেন: “তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং ইহসান (সদ্ব্যবহার) অস্বীকার করে; তুমি যদি দীর্ঘকাল তাদের কারও প্রতি ইহসান করে থাক, এরপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখলেই বলে, আমি কখনও তোমার কাছ থেকে ভাল ব্যবহার পাইনি।”[5]

সুতরাং আবশ্যক হল ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করা এবং অপরাধ বা ভুল-ভ্রান্তির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা … স্বামী উপস্থিত থাকলে তার প্রতি দুর্ব্যবহার করবে না, আর স্বামী অনুপস্থিত থাকলে, স্বামীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।

এর মাধ্যমেই পারস্পরিক সন্তুষ্টি অর্জিত হবে, সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব স্থায়ী হবে এবং আন্তরিকতা, ভালবাসা ও সহমর্মিতা প্রাধান্য বিস্তার করবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায়:

« أيما امرأة ماتت وزوجها عنها راض دخلت الجنة » . (رواه الترمذي و ابن ماجه) .

“যে নারীই তার প্রতি তার স্বামী সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় মারা যাবে, সে নারী জান্নাতে প্রবেশ করবে।”[6]

সুতরাং হে মুসলিম জাতি! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখ যে, পারস্পরিক সহযোগিতা ও একতা অর্জন করার মাধ্যমে সৌভাগ্য পরিপূর্ণতা লাভ করবে, শিক্ষার যথাযথ পরিবেশ তৈরি হবে এবং তরুণ সমাজ বেড়ে উঠবে এমন এক মর্যাদাবান ঘরে, যা ভালাবাসার দ্বারা পরিপূর্ণ, পারস্পরিক বুঝাপড়ার দ্বারা সমৃদ্ধ … মাতৃত্বের সহানুভূতিশীলতা ও পিতৃত্বের করুণার মাঝে (বিদ্যমান) … তারা অবস্থান করবে অনেক দূরে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও বিতর্কের শোরগোল এবং একে অন্যের সাথে বাড়াবাড়ি থেকে; যাতে করে সেখানে থাকবে না কোনো প্রকার অনৈক্য, মতবিরোধ ও দুর্ব্যবহার, কাছে কিংবা দূরে। আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿… رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ أَزۡوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعۡيُنٖ وَٱجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِينَ إِمَامًا ٧٤ ﴾ [الفرقان: ٧4]

“ … হে আমাদের রব! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করুন, যারা হবে আমাদের জন্য চোখজুড়ানো। আর আপনি আমাদেরকে করুন মুত্তাকীদের জন্য অনুসরণযোগ্য।”- (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)।

* * *

উপসংহার
পরিশেষে- আমার মুসলিম ভাই ও বোন! আল্লাহ তোমাদেরকে তাওফীক দিন:
নিশ্চয়ই পরিবারের সংস্কার হল গোটা সমাজের নিরাপত্তার উপায়; এমন সমাজকে সংস্কার করা অসম্ভব, যাতে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়েছে; কিভাবেই বা সম্ভব, অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা পারিবারকে নিয়ামত হিসেবে আমাদের কাছে অনুগ্রহ হিসেবে তুলে ধরেছেন। যে নেয়ামতটি হচ্ছে পরিবারের পরস্পর বন্ধন, মিলন ও চিরাচয়িত সম্পর্ক ..।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:

﴿ وَٱللَّهُ جَعَلَ لَكُم مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ أَزۡوَٰجٗا وَجَعَلَ لَكُم مِّنۡ أَزۡوَٰجِكُم بَنِينَ وَحَفَدَةٗ وَرَزَقَكُم مِّنَ ٱلطَّيِّبَٰتِۚ أَفَبِٱلۡبَٰطِلِ يُؤۡمِنُونَ وَبِنِعۡمَتِ ٱللَّهِ هُمۡ يَكۡفُرُونَ ٧٢ ﴾ [النحل: ٧٢]
“আর আল্লাহ তোমাদের থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন; আর তোমাদের যুগল থেকে তোমাদের জন্য পুত্র-পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম জীবণোপকরণ দান করেছেন। তবুও কি ওরা মিথ্যাতে বিশ্বাস করবে এবং ওরা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?” – ( সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৭২ )।

নিশ্চয়ই স্বামী-স্ত্রী ও তাদের মধ্যকার মজবুত সম্পর্ক এবং পিতা-মাতা ও তাদের কোলে বেড়ে উঠা সন্তান-সন্ততি- এ বিষয় দু’টি বর্তমান জাতি ও ভবিষ্যৎ জাতি হিসেবে বিবেচ্য। তাই এটা বলা যায় যে, শয়তান যখন পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন করার ব্যাপারে সফল হবে, তখন এর মাধ্যমে সে কেবল একটি সংসারকেই ধ্বংস করবে না, কোনো সীমাবদ্ধ অনিষ্টতাই সংঘটিত করবে না বরং তা গোটা জাতিকে বড় ধরনের ক্ষতি ও দ্রুততর অনিষ্টতার মধ্যে নিক্ষেপ করবে। আর বর্তমান বাস্তবতা তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সুতরাং আল্লাহ ঐ পুরুষ ব্যক্তিকে রহম করুন, যিনি প্রশংসনীয় চরিত্র ও উৎকৃষ্ট মনের অধিকারী, উদার, কোমল, দয়ালু, তার পরিবারের প্রতি স্নেহপরায়ণ এবং তার কাজের ব্যাপারে বিচক্ষণ; যিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না, কঠোরতা আরোপ করে যুলুম করেন না এবং দায়িত্বের ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দেন না।

আর আল্লাহ ঐ নারীর প্রতি রহম করুন, যিনি ভুল-ত্রুটি খোঁজে বেড়ান না, বেশি শোরগোল করেন না, সততাপরায়ণা, আনুগত্যপরায়ণা এবং অদৃশ্য অংশের হেফাজতকারিনী, যেভাবে আল্লাহ হেফাজত করেছেন।

সুতরাং হে স্বামী ও স্ত্রীগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; আর হে মুসলিমগণ! তোমরাও আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করবে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দিবেন।

(আল্লাহ রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণের প্রতি; আরও রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন তাঁর সাহাবীগণ এবং কিয়ামতের দিন পর্যন্ত যারা তাঁদেরকে উত্তমভাবে অনুসরণ করবে তাদের প্রতি)।

سبحانك اللهم و بحمدك , أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك .

(হে আল্লাহ! তোমার প্রশংসাসহ তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি; আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তোমার নিকট তাওবা করছি)।

————————————————————

[1] হাদিসটি সহীহ, যা বর্ণনা করেছেন: আহমদ, আল-মুসনাদ: ২/২৫০, ৪৩৬; আবূ দাউদ: ১৩০৮; নাসায়ী: ৩/২০৫; ইবনু মাজাহ: ১৩৩৬; আর ইবনু খুযাইমা হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন (১১৪৮); হাকেম: ১/৩০৯; আর যাহাবী র. তা সমর্থন করেছেন।

[2] বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ (৫১৮৬); মুসলিম, আস-সহীহ (১৪৬৮)

[3] মুসলিম, আস-সহীহ (১৪৬৯);
ফায়দা: হাফেয ইবনু হাজার র. যা বলেছেন, তার সারকথা হল: হাদীসের মধ্যে সহানুভূতির মাধ্যমে স্ত্রীকে পুনর্গঠনের ইঙ্গিত রয়েছে; সুতরাং সে তাতে অতিরঞ্জন করবে না, যাতে সংসার ভেঙ্গে যায়; আর সে তাকে একেবারে ছেড়ে দেবে না; যাতে সে তার বক্রতার উপরেই চলতে থাকবে। আর এর বিধিবদ্ধ নিয়ম হল: যখন স্ত্রী তার স্বভাবগত ত্রুটিটি বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, আর তা তাকে সরাসরি অবাধ্যতাকে গ্রহণ করার দিকে অথবা আবশ্যকীয় বিষয় বর্জন করার দিকে নিয়ে যাবে; এমতাবস্থায় সে তাকে বক্রতার উপর ছেড়ে দেবে না। পক্ষান্তরে যখন তার বক্রতাটি কোনো বৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে হয়, তখন সে তাকে তার উপর ছেড়ে দেবে। – দেখুন: ফাতহুল বারী, ৯/২৫৪।

[4] হাদিসটি সহীহ; তা বর্ণনা করেছেন তিরমিযী (৩৮৯২); ইবনু মাজাহ (১৯৭৭); ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ (১৩১২)

[5] বুখারী, আল-জামে‘উস সহীহ (৫১৯৭)

[6] হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তিরমিযী (১১৬১) এবং তিনি তাকে ‘হাসান’ বলেছেন; ইবনু মাজাহ (১৮৫৪); হাকেম, ৪/১৭৩ এবং তিনি বলেছেন: হাদিসটির সনদ সহীহ (বিশুদ্ধ)।

সংকলন: ড. সালেহ ইবন আবদিল্লাহ ইবন হুমাইদ
অনুবাদক: মোঃ আমিনুল ইসলাম
সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সূত্র: ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব।

Translate