Wednesday, March 3, 2021

হযরত হুদ আঃ এর জীবনী

 



হযরত হূদ (আ:) জীবনি. হযরত হূদ(আলাইহিস সালাম)1.হূদ (আঃ)-এর পরিচয়2.হূদ (আঃ)-এর দাওয়াত3.কওমে ‘আদ-এর প্রতিহূদ (আঃ)-এর দাওয়াতের সারমর্ম1.হূদ (আঃ)-এর দাওয়াতের ফলশ্রুতি2.কওমে ‘আদ-এর উপরেআপতিত গযব-এর বিবরণ3.কওমে ‘আদ-এর ধ্বংসের প্রধান কারণ সমূহ4.শিক্ষণীয় বিষয় সমূহহূদ(আঃ)-এর পরিচয় :হযরত হূদ (আঃ) দুর্ধর্ষ ও শক্তিশালী ‘আদ জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন।আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ-এর পরে কওমে‘আদ ছিল দ্বিতীয় জাতি। হূদ (আঃ) ছিলেন এদেরই বংশধর। ‘আদ ও ছামূদ ছিল নূহ (আঃ)-এর পুত্রসামের বংশধর এবং নূহের পঞ্চম অথবা অষ্টম অধঃস্তনপুরুষ। ইরামপুত্র ‘আদ-এর বংশধরগণ ‘আদঊলা’ বা প্রথম ‘আদ এবংঅপর পুত্রের সন্তান ছামূদ-এর বংশধরগণ ‘আদ ছানী বা দ্বিতীয় ‘আদবলে খ্যাত।[1]‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রই ইরাম-এর দু’টি শাখা। সেকারণ ‘ইরাম’ কথাটি ‘আদ ওছামূদ উভয় গোত্রের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এজন্য কুরআনে কোথাও ‘আদঊলা’(নাজম ৫০)এবং কোথাও ‘ইরাম যাতিল ‘ইমাদ’(ফজর ৭)শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।‘আদসম্প্রদায়ের ১৩টি পরিবার বা গোত্র ছিল। আম্মান হ’তে শুরু করেহাযারামাউত ও ইয়ামন পর্যন্ততাদের বসতি ছিল।[2]তাদের ক্ষেত-খামারগুলো ছিল অত্যন্ত সজীব ও শস্যশ্যামল। তাদেরপ্রায় সব ধরনের বাগ-বাগিচা ছিল। তারা ছিল সুঠামদেহী ও বিরাট বপু সম্পন্ন।আল্লাহ তা‘আলাতাদের প্রতি অনুগ্রহের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু বক্রবুদ্ধিরকারণে এসব নে‘মতইতাদের কাল হয়ে দাঁড়ালো। তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়েছিল ও অন্যকে পথভ্রষ্ট করেছিল।তারা শক্তি মদমত্ত হয়ে ‘আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে’(ফুছছিলাত/হামীমসাজদাহ ১৫)বলে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে শুরু করেছিল। তারা আল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করেনূহ (আঃ)-এর আমলে ফেলে আসা মূর্তিপূজার শিরক-এর পুনরায় প্রচলন ঘটালো। মাত্র কয়েকপুরুষ আগে ঘটে যাওয়া নূহের সর্বগ্রাসী প্লাবনের কথা তারা বেমালুম ভুলে গেল। ফলেআল্লাহ পাক তাদের হেদায়াতের জন্য তাদেরই মধ্য হ’তে হূদ (আঃ)-কে নবী হিসাবেপ্রেরণ করলেন। উল্লেখ্য যে, নূহের প্লাবনের পরে এরাই সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা শুরুকরে।হযরত হূদ (আঃ) ও কওমে ‘আদ সম্পর্কেপবিত্র কুরআনের ১৭টি সূরায় ৭৩টিআয়াতেবর্ণিত হয়েছে।[3]হূদ (আঃ)-এর দাওয়াত :সূরা আ‘রাফ ৬৫-৭২ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﻟَﻰ ﻋَﺎﺩٍﺃَﺧَﺎﻫُﻢْ ﻫُﻮْﺩﺍً ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍ ﺍﻟﻠﻪَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَـﻪٍ ﻏَﻴْﺮُﻩُ ﺃَﻓَﻼَ ﺗَﺘَّﻘُﻮْﻥَ؟ ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻸُ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻛَﻔَﺮُﻭْﺍ ﻣِﻦْﻗَﻮْﻣِﻪِ ﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﺮَﺍﻙَ ﻓِﻲْ ﺳَﻔَﺎﻫَﺔٍ ﻭِﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﻈُﻨُّﻚَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻜَﺎﺫِﺑِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻴْﺲَ ﺑِﻲْ ﺳَﻔَﺎﻫَﺔٌ ﻭَﻟَﻜِﻨِّﻲْ ﺭَﺳُﻮﻝٌ ﻣِّﻦﺭَّﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ، ﺃُﺑَﻠِّﻐُﻜُﻢْ ﺭِﺳَﺎﻻﺕِ ﺭَﺑِّﻲْ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻟَﻜُﻢْ ﻧَﺎﺻِﺢٌ ﺃَﻣِﻴْﻦٌ، ﺃَﻭَﻋَﺠِﺒْﺘُﻢْ ﺃَﻥْ ﺟَﺎﺀَﻛُﻢْ ﺫِﻛْﺮٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﻋَﻠَﻰﺭَﺟُﻞٍ ﻣِّﻨْﻜُﻢْ ﻟِﻴُﻨْﺬِﺭَﻛُﻢْ ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭْﺍ ﺇِﺫْ ﺟَﻌَﻠَﻜُﻢْ ﺧُﻠَﻔَﺎﺀَ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﻗَﻮْﻡِ ﻧُﻮْﺡٍ ﻭَﺯَﺍﺩَﻛُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺨَﻠْﻖِ ﺑَﺴْﻄَﺔً ﻓَﺎﺫْﻛُﺮُﻭْﺍﺁﻵﺀَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗُﻔْﻠِﺤُﻮْﻥَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺃَﺟِﺌْﺘَﻨَﺎ ﻟِﻨَﻌْﺒُﺪَ ﺍﻟﻠّﻪَ ﻭَﺣْﺪَﻩُ ﻭَﻧَﺬَﺭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﻌْﺒُﺪُ ﺁﺑَﺎﺅُﻧَﺎ ﻓَﺄْﺗِﻨَﺎ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌِﺪُﻧَﺎ ﺇِﻥْﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻝَ ﻗَﺪْ ﻭَﻗَﻊَ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﺭِﺟْﺲٌ ﻭَﻏَﻀَﺐٌ ﺃَﺗُﺠَﺎﺩِﻟُﻮْﻧَﻨِﻲْ ﻓِﻲْ ﺃَﺳْﻤَﺎﺀٍ ﺳَﻤَّﻴْﺘُﻤُﻮْﻫَﺎﺃَﻧﺘُﻢْ ﻭَﺁﺑَﺂﺅﻛُﻢ ﻣَّﺎ ﻧَﺰَّﻝَ ﺍﻟﻠﻪ ُﺑِﻬَﺎ ﻣِﻦْ ﺳُﻠْﻄَﺎﻥٍ ﻓَﺎﻧﺘَﻈِﺮُﻭْﺍ ﺇِﻧِّﻲْ ﻣَﻌَﻜُﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻤُﻨْﺘَﻈِﺮِﻳْﻦَ، ﻓَﺄَﻧﺠَﻴْﻨَﺎﻩُ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻣَﻌَﻪُﺑِﺮَﺣْﻤَﺔٍ ﻣِّﻨَّﺎ ﻭَﻗَﻄَﻌْﻨَﺎ ﺩَﺍﺑِﺮَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻛَﺬَّﺑُﻮْﺍ ﺑِﺂﻳَﺎﺗِﻨَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻣُﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৬৫-৭২)-অনুবাদঃ আর ‘আদসম্প্রদায়ের নিকটে (আমরা প্রেরণ করেছিলাম) তাদের ভাই হূদকে। সে বলল, হে আমারসম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই।অতঃপর তোমরা কি আল্লাহভীরু হবে না?(আ‘রাফ ৭/৬৫)।‘তার সম্প্রদায়ের কাফের নেতারাবলল, আমরা তোমাকে নির্বুদ্ধিতায়লিপ্ত দেখতে পাচ্ছি এবং আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদীদেরঅন্তর্ভুক্ত মনে করি’ (৬৬)। ‘হূদ বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার মধ্যে কোন নির্বুদ্ধিতানেই। বরং আমি বিশ্বপালকের প্রেরিত একজন রাসূল মাত্র’ (৬৭)। ‘আমি তোমাদের নিকটেপ্রতিপালকের পয়গাম সমূহ পৌঁছে দেই এবং আমি তোমাদের হিতাকাংখী ও বিশ্বস্ত’ (৬৮)।‘তোমরা কি আশ্চর্য বোধ করছ যে, তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষহ’তে তোমাদের থেকেই একজনের নিকটে অহী (যিকর) এসেছে, যাতে সেতোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে? তোমরা স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকেকওমে নূহের পরে নেতৃত্বে অভিষিক্ত করলেন ও তোমাদেরকে বিশালবপু করেসৃষ্টিকরলেন। অতএব তোমরা আল্লাহর নে‘মত সমূহ স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকামহও’ (৬৯)। ‘তারাবলল, তুমি কি আমাদের কাছে কেবল এজন্য এসেছ যে, আমরা শুধুমাত্রআল্লাহর ইবাদত করি, আর আমাদের বাপ-দাদারা যাদের পূজা করত, তাদেরকে পরিত্যাগ করি?তাহ’লে নিয়ে এস আমাদের কাছে (সেই আযাব), যার দুঃসংবাদ তুমি আমাদের শুনাচ্ছ, যদি তুমিসত্যবাদী হও’ (৭০)। ‘হূদ বলল, তোমাদের উপরে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তেশাস্তি ও ক্রোধ অবধারিত হয়ে গেছে। তোমরা কেন আমার সাথে ঐসব নাম সম্পর্কেবিতর্ক করছ, যেগুলোর নামকরণ তোমরা ও তোমাদেরবাপ-দাদারা করেছ? ঐসবউপাস্যদেরসম্পর্কে আল্লাহ কোন প্রমাণ (সুলতান) নাযিল করেননি। অতএব অপেক্ষা কর,আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি’ (৭১)। ‘অনন্তর আমরা তাকে ও তার সাথীদেরকেস্বীয় অনুগ্রহে রক্ষা করলাম এবং যারা আমাদের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করেছিল, তাদেরমূলোৎপাটন করে দিলাম। বস্ত্ততঃ তারা বিশ্বাসী ছিল না’(আ‘রাফ ৭/৬৫-৭২)।অতঃপর সূরা হূদ ৫০-৬০আয়াতে আল্লাহ উক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেননিম্নরূপেঃ ﻭَﺇِﻟَﻰ ﻋَﺎﺩٍ ﺃَﺧَﺎﻫُﻢْ ﻫُﻮﺩًﺍ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍ ﺍﻟﻠﻪَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَﻪٍ ﻏَﻴْﺮُﻩُ ﺇِﻥْ ﺃَﻧﺘُﻢْ ﺇِﻻَّ ﻣُﻔْﺘَﺮُﻭْﻥَ، ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻻَ ﺃَﺳْﺄَﻟُﻜُﻢْ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺃَﺟْﺮًﺍﺇِﻥْ ﺃَﺟْﺮِﻱَ ﺇِﻻَّ ﻋَﻠَﻰﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻓَﻄَﺮَﻧِﻲْ ﺃَﻓَﻼَ ﺗَﻌْﻘِﻠُﻮْﻥَ؟ ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﺳْﺘَﻐْﻔِﺮُﻭْﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢْ ﺛُﻢَّ ﺗُﻮْﺑُﻮْﺍ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻳُﺮْﺳِﻞِ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀَ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢ ﻣِّﺪْﺭَﺍﺭًﺍﻭَﻳَﺰِﺩْﻛُﻢْ ﻗُﻮَّﺓًﺇِﻟَﻰ ﻗُﻮَّﺗِﻜُﻢْ ﻭَﻻَ ﺗَﺘَﻮَﻟَّﻮْﺍ ﻣُﺠْﺮِﻣِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻳَﺎ ﻫُﻮْﺩُ ﻣَﺎ ﺟِﺌْﺘَﻨَﺎ ﺑِﺒَﻴِّﻨَﺔٍ ﻭَّﻣَﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺑِﺘَﺎﺭِﻛِﻲْ ﺁﻟِﻬَﺘِﻨَﺎ ﻋَﻦْﻗَﻮْﻟِﻚَ ﻭَﻣَﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﻟَﻚَ ﺑِﻤُﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ، ﺇِﻥ ﻧَّﻘُﻮْﻝُ ﺇِﻻَّ ﺍﻋْﺘَﺮَﺍﻙَ ﺑَﻌْﺾُ ﺁﻟِﻬَﺘِﻨَﺎ ﺑِﺴُﻮْﺀٍ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻧِّﻲْ ﺃُﺷْﻬِﺪُ ﺍﻟﻠّﻪَ ﻭَﺍﺷْﻬَﺪُﻭْﺍﺃَﻧِّﻲْ ﺑَﺮِﻱْﺀٌ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗُﺸْﺮِﻛُﻮْﻥَ، ﻣِﻦْ ﺩُﻭْﻧِﻪِ ﻓَﻜِﻴْﺪُﻭﻧِﻲْ ﺟَﻤِﻴْﻌًﺎ ﺛُﻢَّ ﻻَ ﺗُﻨْﻈِﺮُﻭْﻥِ، ﺇِﻧِّﻲْ ﺗَﻮَﻛَّﻠْﺖُ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﺭَﺑِّﻲْﻭَﺭَﺑِّﻜُﻢ ﻣَّﺎ ﻣِﻦْ ﺩَﺁﺑَّﺔٍ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺁﺧِﺬٌ ﺑِﻨَﺎﺻِﻴَﺘِﻬَﺎ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲْ ﻋَﻠَﻰ ﺻِﺮَﺍﻁٍ ﻣُّﺴْﺘَﻘِﻴْﻢٍ، ﻓَﺈِﻥْ ﺗَﻮَﻟَّﻮْﺍ ﻓَﻘَﺪْ ﺃَﺑْﻠَﻐْﺘُﻜُﻤﻤَّﺎﺃُﺭْﺳِﻠْﺖُ ﺑِﻪِ ﺇِﻟَﻴْﻜُﻢْ ﻭَﻳَﺴْﺘَﺨْﻠِﻒُ ﺭَﺑِّﻲْ ﻗَﻮْﻣًﺎ ﻏَﻴْﺮَﻛُﻢْ ﻭَﻻَ ﺗَﻀُﺮُّﻭْﻧَﻪُ ﺷَﻴْﺌًﺎ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲْ ﻋَﻠَﻰَ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﺣَﻔِﻴْﻆٌ، ﻭَﻟَﻤَّﺎﺟَﺎﺀَ ﺃَﻣْﺮُﻧَﺎ ﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎ ﻫُﻮْﺩًﺍ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻣَﻌَﻪُ ﺑِﺮَﺣْﻤَﺔٍ ﻣِّﻨَّﺎ ﻭَﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎﻫُﻢ ﻣِّﻦْ ﻋَﺬَﺍﺏٍ ﻏَﻠِﻴْﻆٍ، ﻭَﺗِﻠْﻚَ ﻋَﺎﺩٌ ﺟَﺤَﺪُﻭْﺍﺑِﺂﻳَﺎﺕِ ﺭَﺑِّﻬِﻤْﻮَﻋَﺼَﻮْﺍ ﺭُﺳُﻠَﻪُ ﻭَﺍﺗَّﺒَﻌُﻮْﺍ ﺃَﻣْﺮَ ﻛُﻞِّ ﺟَﺒَّﺎﺭٍ ﻋَﻨِﻴْﺪٍ، ﻭَﺃُﺗْﺒِﻌُﻮْﺍ ﻓِﻲْ ﻫَﺬِﻩِ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﻟَﻌْﻨَﺔً ﻭَﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺃَﻵﺇِﻥَّ ﻋَﺎﺩًﺍ ﻛَﻔَﺮُﻭْﺍ ﺭَﺑَّﻬُﻢْ ﺃَﻵ ﺑُﻌْﺪًﺍ ﻟِّﻌَﺎﺩٍ ﻗَﻮْﻡِ ﻫُﻮْﺩٍ- ‏)ﻫﻮﺩ ৫০-৬০(-অনুবাদঃ আর ‘আদ জাতির প্রতি (আমরা)তাদের ভাই হূদকে (প্রেরণ করেছিলাম)। সে তাদেরকে বলল, হে আমার জাতি! তোমরাআল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন মা‘বূদ নেই। বস্ত্ততঃ তোমরা সবাই এব্যাপারে মিথ্যারোপ করছ’(হূদ ১১/৫০)। ‘হে আমার জাতি! (আমার এ দাওয়াতের জন্য) আমিতোমাদের কাছে কোনরূপ বিনিময় চাই না। আমার পারিতোষিক তাঁরই কাছে রয়েছে, যিনিআমাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমরা কি বুঝ না’?(৫১)। ‘হে আমার কওম! তোমরাতোমাদের পালনকর্তার নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁরই দিকে ফিরে যাও। তিনি আসমানথেকে তোমাদের উপর বারিধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধিকরবেন। তোমরা অপরাধীদের ন্যায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না’(৫২)। ‘তারা বলল, হে হূদ! তুমিআমাদের কাছে কোন প্রমাণ নিয়ে আসনি, আর আমরাও তোমার কথা মত আমাদেরউপাস্যদের বর্জন করতেপারি না। বস্ত্ততঃ আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাসী নই’(৫৩)। ‘বরং আমরাতো একথাই বলতে চাই যে, আমাদের কোন উপাস্য-দেবতা (তোমার অবিশ্বাসের ফলেক্রুদ্ধ হয়ে) তোমার উপরে অশুভ আছর করেছেন। হূদ বলল, আমি আল্লাহকে সাক্ষীরাখছি, আর তোমরাও সাক্ষী থাক যে, তাদের থেকে আমি সম্পূর্ণ মুক্ত, যাদেরকেতোমরা শরীক করে থাক’(৫৪)‘তাঁকে ছাড়া। অতঃপর তোমরা সবাই মিলে আমার অনিষ্ট করারপ্রয়াস চালাও এবং আমাকে কোনরূপ অবকাশ দিয়ো না’(৫৫)। ‘আমি আল্লাহর উপরে ভরসাকরেছি। যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা। ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোন প্রাণীনেই, যা তাঁর আয়ত্তাধীন নয়। আমার পালনকর্তা সরল পথে আছেন’ (অর্থাৎসরল পথেরপথিকগণের সাথে আছেন)’(৫৬)। ‘এরপরেও যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে (জেনেরেখ যে,) আমি তোমাদের নিকটে পৌঁছে দিয়েছিযা নিয়ে আমি তোমাদের নিকটেপ্রেরিত হয়েছি। আমার প্রভু অন্যকোন জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন, তখনতোমরা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা প্রতিটি বস্ত্তরহেফাযতকারী’(৫৭)। ‘অতঃপর যখন আমাদের আদেশ (গযব) উপস্থিত হ’ল, তখন আমরা নিজঅনুগ্রহে হূদ ও তার সাথী ঈমানদারগণকে মুক্ত করি এবং তাদেরকে এক কঠিন আযাব থেকেরক্ষা করি’(৫৮)। ‘এরা ছিল ‘আদ জাতি। যারা তাদের পালনকর্তার আয়াত সমূহকে (নিদর্শন সমূহকে)অস্বীকার করেছিল ও তাদের নিকটে প্রেরিত রাসূলগণের অবাধ্যতা করেছিল এবং তারাউদ্ধত ও হঠকারী ব্যক্তিদের আদেশ পালন করেছিল’(৫৯)। ‘এ দুনিয়ায় তাদের পিছেপিছেঅভিসম্পাৎ রয়েছে এবং রয়েছে ক্বিয়ামতের দিনেও। জেনে রেখ ‘আদ জাতিতাদের পালনকর্তার সাথে কুফরী করেছে। জেনে রেখ হূদের কওম ‘আদ জাতির জন্যঅভিসম্পাৎ’(হূদ ১১/৫০-৬০)।হূদ (আঃ) তাঁর জাতিকে তাদের বিলাসোপকরণ ও অন্যায় আচরণসম্পর্কে সতর্ক করেন এবং এতদসত্ত্বেও তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ সমূহস্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যেমন সূরা শো‘আরায় ১২৮-১৩৯ আয়াতে বর্ণিতহয়েছে, ﺃَﺗَﺒْﻨُﻮْﻥَ ﺑِﻜُﻞِّ ﺭِﻳْﻊٍ ﺁﻳَﺔً ﺗَﻌْﺒَﺜُﻮْﻥَ، ﻭَﺗَﺘَّﺨِﺬُﻭْﻥَ ﻣَﺼَﺎﻧِﻊَ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺨْﻠُﺪُﻭْﻥَ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺑَﻄَﺸْﺘُﻢْ ﺑَﻄَﺸْﺘُﻢْﺟَﺒَّﺎﺭِﻳْﻦَ، ﻓَﺎﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟﻠﻪَ ﻭَﺃَﻃِﻴْﻌُﻮْﻥِ، ﻭَﺍﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﺃَﻣَﺪَّﻛُﻢْ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ، ﺃَﻣَﺪَّﻛُﻢْ ﺑِﺄَﻧْﻌَﺎﻡٍ ﻭَّﺑَﻨِﻴْﻦَ، ﻭَﺟَﻨَّﺎﺕٍﻭَّﻋُﻴُﻮْﻥٍ، ﺇِﻧِّﻲْ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏَ ﻳَﻮْﻡٍ ﻋَﻈِﻴْﻢٍ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺳَﻮَﺍﺀٌ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺃَﻭَﻋَﻈْﺖَ ﺃَﻡْ ﻟَﻢْ ﺗَﻜُﻦ ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻮَﺍﻋِﻈِﻴْﻦَ،ﺇِﻥْ ﻫَﺬَﺍ ﺇِﻻَّ ﺧُﻠُﻖُ ﺍﻟْﺄَﻭَّﻟِﻴْﻦَ، ﻭَﻣَﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺑِﻤُﻌَﺬَّﺑِﻴْﻦَ، ﻓَﻜَﺬَّﺑُﻮْﻩُ ﻓَﺄَﻫْﻠَﻜْﻨَﺎﻫُﻢْ ﺇِﻥَّ ﻓِﻲْ ﺫَﻟِﻚَ ﻟَﺂﻳَﺔً ﻭَّﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﺃَﻛْﺜَﺮُﻫُﻢﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ – ‏) ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ১২৮-১৩৯(-অনুবাদঃ ‘তোমরা কি প্রতিটি উঁচু স্থানে অযথা নিদর্শন নির্মাণ করছ(২৬/১২৮)? (যেমন সুউচ্চ টাওয়ার, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি)। ‘এবং তোমরা বড় বড় প্রাসাদসমূহ নির্মাণ করছ, যেন তোমরা সেখানে চিরকাল বসবাস করবে’ (১২৯)? (যেমন ধনীব্যক্তিরা দেশে ও বিদেশে বিনা প্রয়োজনে বড় বড় বাড়ী করে থাকে)। ‘এছাড়া যখনতোমরা কাউকে আঘাত হানো, তখন নিষ্ঠুর-যালেমদের মত আঘাত হেনে থাক(১৩০)’ (বিভিন্ন দেশে পুলিশী নির্যাতনের বিষয়টি স্মরণযোগ্য)। ‘অতএব তোমরাআল্লাহ্কে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর (১৩১)’। ‘তোমরা ভয় কর সেই মহান সত্তাকে, যিনিতোমাদেরকে সাহায্য করেছেন ঐসব বস্ত্ত দ্বারা যা তোমরা জানো’ (১৩২)। ‘তিনিতোমাদের সাহায্য করেছেন গবাদি পশু ও সন্তানাদি দ্বারা (১৩৩)’ ‘এবং উদ্যান ও ঝরণা সমূহ দ্বারা(১৩৪)’। (অতঃপর হূদ (আঃ) কঠিন আযাবের ভয় দেখিয়ে বললেন,) ‘আমি তোমাদের জন্যমহাদিবসের শাস্তির আশংকা করছি’ (১৩৫)। জবাবে কওমের নেতারা বলল, ‘তুমি উপদেশ দাও বা নাদাও সবই আমাদের জন্য সমান’ (১৩৬)। ‘তোমার এসব কথাবার্তা পূর্ববর্তী লোকদেররীতি-অভ্যাস বৈ কিছু নয়’ (১৩৭)। ‘আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না’ (১৩৮)। (আল্লাহ বলেন,) ‘অতঃপর(এভাবে) তারা তাদের নবীকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করল। ফলে আমরাও তাদেরকে ধ্বংস করেদিলাম। এর মধ্যে (শিক্ষণীয়) নিদর্শন রয়েছে। বস্ত্ততঃ তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী ছিলনা’(শো‘আরা ২৬/১২৮-১৩৯)।সূরা হা-মীম সাজদার ১৪-১৬ আয়াতে ‘আদ জাতির অলীক দাবী,অযথা দম্ভ ও তাদের উপরে আপতিত শাস্তির বর্ণনা সমূহ এসেছে এভাবে,… ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻟَﻮْ ﺷَﺂﺀَ ﺭَﺑُّﻨَﺎﻟَﺄَﻧْﺰَﻝَ ﻣَﻶﺋِﻜَﺔً ﻓَﺈِﻧَّﺎ ﺑِﻤَﺎ ﺃُﺭْﺳِﻠْﺘُﻢْ ﺑِﻪِ ﻛَﺎﻓِﺮُﻭْﻥَ، ﻓَﺄَﻣَّﺎ ﻋَﺎﺩٌ ﻓَﺎﺳْﺘَﻜْﺒَﺮُﻭْﺍ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺍﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻣَﻦْ ﺃَﺷَﺪُّﻣِﻨَّﺎ ﻗُﻮَّﺓً ﺃَﻭَﻟَﻢْ ﻳَﺮَﻭْﺍ ﺃَﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﺧَﻠَﻘَﻬُﻢْ ﻫُﻮَ ﺃَﺷَﺪُّ ﻣِﻨْﻬُﻢْ ﻗُﻮَّﺓً ﻭَﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﺑِﺂﻳَﺎﺗِﻨَﺎﻳَﺠْﺤَﺪُﻭْﻥَ، ﻓَﺄَﺭْﺳَﻠْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْﺭِﻳْﺤًﺎ ﺻَﺮْﺻَﺮًﺍ ﻓِﻲْ ﺃَﻳَّﺎﻡٍ ﻧَّﺤِﺴَﺎﺕٍ ﻟِّﻨُﺬِﻳْﻘَﻬُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏَ ﺍﻟْﺨِﺰْﻱِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺓِ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﻭَﻟَﻌَﺬَﺍﺏُ ﺍﻟْﺂﺧِﺮَﺓِ ﺃَﺧْﺰَﻯ ﻭَﻫُﻢْ ﻻَﻳُﻨْﺼَﺮُﻭْﻥَ – ‏)ﺣﻢ ﺍﻟﺴﺠﺪﺓ ১৪-১৬(-‘…তারা (‘আদ ও ছামূদের লোকেরা) বলেছিল, আমাদের প্রভুইচ্ছা করলে অবশ্যই ফেরেশতা পাঠাতেন। অতএব আমরা তোমাদের আনীত বিষয় অমান্যকরলাম’ (৪১/১৪)। ‘অতঃপর ‘আদ-এর লোকেরা পৃথিবীতে অযথা অহংকার করল এবং বলল,আমাদের চেয়েঅধিক শক্তিধর কে আছে? তারা কি লক্ষ্য করেনি যে, যে আল্লাহতাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাদের অপেক্ষা অধিক শক্তিধর? বস্ত্ততঃ তারা আমাদের নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করত’ (১৫)। ‘অতঃপর আমরা তাদের উপরে প্রেরণ করলাম ঝঞ্ঝাবায়ু বেশকয়েকটি অশুভ দিনে, যাতে তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনার কিছু আযাব আস্বাদনকরানো যায়। আর পরকালের আযাব তো আরও লাঞ্ছনাকর। যেদিন তারা কোনরূপসাহায্যপ্রাপ্ত হবে না’(ফুছছিলাত/হা-মীম সাজদাহ ৪১/১৪-১৬)।সূরা আহক্বাফ ২১-২৬ আয়াতে উক্তআযাবের ধরন বর্ণিত হয়েছে এভাবে, যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﺃَﺧَﺎ ﻋَﺎﺩٍ ﺇِﺫْ ﺃَﻧﺬَﺭَ ﻗَﻮْﻣَﻪُﺑِﺎﻟْﺄَﺣْﻘَﺎﻑِ ﻭَﻗَﺪْ ﺧَﻠَﺖْ ﺍﻟﻨُّﺬُﺭُ ﻣِﻦ ﺑَﻴْﻦِ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﻭَﻣِﻦْ ﺧَﻠْﻔِﻪِ ﺃَﻻَّ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭْﺍ ﺇِﻻَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺇِﻧِّﻲْ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏَﻳَﻮْﻣٍﻌَﻈِﻴْﻢٍ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺃَﺟِﺌْﺘَﻨَﺎ ﻟِﺘَﺄْﻓِﻜَﻨَﺎ ﻋَﻦْ ﺁﻟِﻬَﺘِﻨَﺎ ﻓَﺄْﺗِﻨَﺎ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌِﺪُﻧَﺎ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻟَﺈِﻧَّﻤَﺎ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢُ ﻋِﻨﺪَﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺃُﺑَﻠِّﻐُﻜُﻢ ﻣَّﺎ ﺃُﺭْﺳِﻠْﺖُ ﺑِﻪِ ﻭَﻟَﻜِﻨِّﻲْ ﺃَﺭَﺍﻛُﻢْ ﻗَﻮْﻣﺎً ﺗَﺠْﻬَﻠُﻮْﻥَ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺭَﺃَﻭْﻩُ ﻋَﺎﺭِﺿﺎً ﻣُّﺴْﺘَﻘْﺒِﻞَ ﺃَﻭْﺩِﻳَﺘِﻬِﻢْ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻫَﺬَﺍﻋَﺎﺭِﺽٌ ﻣُّﻤْﻄِﺮُﻧَﺎ ﺑَﻞْ ﻫُﻮَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻌْﺠَﻠْﺘُﻢْ ﺑِﻪِ ﺭِﻳْﺢٌ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﺃَﻟِﻴْﻢٌ، ﺗُﺪَﻣِّﺮُ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﺑِﺄَﻣْﺮِ ﺭَﺑِّﻬَﺎ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤُﻮْﺍ ﻻَﻳُﺮَﻯ ﺇِﻻَّ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨُﻬُﻢْ ﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻤُﺠْﺮِﻣِﻴْﻦَ، ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻣَﻜَّﻨَّﺎﻫُﻢْ ﻓِﻴْﻤَﺎ ﺇِﻥ ﻣَّﻜَّﻨَّﺎﻛُﻢْ ﻓِﻴْﻪِ ﻭَﺟَﻌَﻠْﻨَﺎ ﻟَﻬُﻢْ ﺳَﻤْﻌﺎًﻭَّﺃَﺑْﺼَﺎﺭﺍً ﻭَّﺃَﻓْﺌِﺪَﺓً ﻓَﻤَﺎ ﺃَﻏْﻨَﻰ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﺳَﻤْﻌُﻬُﻢْ ﻭَﻻَ ﺃَﺑْﺼَﺎﺭُﻫُﻢْ ﻭَﻻَ ﺃَﻓْﺌِﺪَﺗُﻬُﻢ ﻣِّﻦْ ﺷَﻲْﺀٍ ﺇِﺫْ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﺠْﺤَﺪُﻭﻥَ ﺑِﺂﻳَﺎﺕِﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺣَﺎﻕَ ﺑِﻬِﻢ ﻣَّﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﺑِﻪِ ﻳَﺴْﺘَﻬْﺰِﺀُﻭْﻥَ – ‏)ﺍﻷﺣﻘﺎﻑ ২১-২৬(-‘আর তুমি ‘আদ-এর ভাই (হূদ)-এর কথাবর্ণনা কর, যখন সে তার কওমকে বালুকাময় উঁচু উপত্যকায় সতর্ক করে বলেছিল, অথচ তারপূর্বে ও পরে অনেক সতর্ককারী গত হয়েছিল, (এই মর্মে যে,) তোমরা আল্লাহব্যতীত অন্য কারু ইবাদত কর না। আমি তোমাদের জন্য এক মহাদিবসের শাস্তির আশংকাকরছি’(আহক্বাফ ৪৬/২১)। ‘তারা বলল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্য সমূহ থেকেফিরিয়ে রাখতে আগমন করেছ? তুমি যদি সত্যবাদী হয়ে থাক, তবে আমাদেরকে যেশাস্তির ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে আস দেখি?’(২২)। হূদ বলল, এ জ্ঞান তো স্রেফ আল্লাহরকাছেই রয়েছে। আমি যে বিষয় নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েথাকি। কিন্তু আমি দেখছি তোমরা এক মূর্খ সম্প্রদায়’(২৩)। অতঃপর তারা যখন শাস্তিকেমেঘরূপে তাদের উপত্যকা সমূহের অভিমুখী দেখল, তখন বলল, এতো মেঘ,আমাদেরকেবৃষ্টি দেবে। (হূদ বললেন) বরং এটা সেই বস্ত্ত, যা তোমরা তাড়াতাড়িচেয়েছিলে। এটা এমন বায়ু, যার মধ্যে রয়েছে মর্মন্তুদ আযাব’(২৪)। ‘সে তার প্রভুরআদেশে সবকিছুকে ধ্বংস করে দেবে। অতঃপর ভোর বেলায় তারাএমন অবস্থা প্রাপ্তহ’ল যে, শূন্য বাস্ত্তভিটাগুলি ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হ’ল না। আমরা অপরাধী সম্প্রদায়কেএমনি করেই শাস্তি দিয়ে থাকি’(২৫)। ‘আমরা তাদেরকে এমন সব বিষয়ে ক্ষমতা দিয়েছিলাম,যেসব বিষয়ে তোমাদের ক্ষমতা দেইনি। আমরা তাদের দিয়েছিলাম কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয়।কিন্তু সেসব কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় তাদের কোন কাজে আসল না, যখন তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করল এবং সেই শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করল, যা নিয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রুপকরত’(আহক্বাফ ৪৬/২১-২৬)।উক্ত বিষয়ে সূরা হা-ক্বক্বাহ ৭-৮আয়াতে আল্লাহ বলেন, ﺳَﺨَّﺮَﻫَﺎﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺳَﺒْﻊَ ﻟَﻴَﺎﻝٍ ﻭَﺛَﻤَﺎﻧِﻴَﺔَ ﺃَﻳَّﺎﻡٍ ﺣُﺴُﻮْﻣًﺎ ﻓَﺘَﺮَﻯ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡَ ﻓِﻴْﻬَﺎ ﺻَﺮْﻋَﻰ ﻛَﺄَﻧَّﻬُﻢْ ﺃَﻋْﺠَﺎﺯُ ﻧَﺨْﻞٍ ﺧَﺎﻭِﻳَﺔٍ- ﻓَﻬَﻞْ ﺗَﺮَﻯﻟَﻬُﻤﻤِّﻦ ﺑَﺎﻗِﻴَﺔ؟- ‏) ﺍﻟﺤﺎﻗﺔ ৭-৮(-‘তাদের উপরে প্রচন্ড ঝঞ্ঝাবায়ু প্রবাহিত হয়েছিল সাত রাত্রি ওআট দিবস ব্যাপী অবিরতভাবে। (হে মুহাম্মাদ!) তুমি দেখলে দেখতে পেতে যে, তারাঅসার খর্জুর কান্ডের ন্যায় ভূপাতিত হয়ে রয়েছে’ (৭)। ‘তুমি (এখন) তাদের কোন অস্তিত্বদেখতে পাও কি’?(হা-ক্বক্বাহ ৬৯/৭-৮)।সূরা ফাজ্র ৬-৮ আয়াতে ‘আদ বংশের শৌর্য-বীর্যসম্বন্ধে আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে শুনিয়ে বলেন, ﺍَﻟَﻢْ ﺗَﺮَﻛَﻴْﻒَ ﻓَﻌَﻞَ ﺭَﺑُّﻚَ ﺑِﻌَﺎﺩٍ، ﺍِﺭَﻡَ ﺫَﺍﺕِﺍﻟْﻌِﻤَﺎﺩِ، ﺍﻟَّﺘِﻰْ ﻟَﻢْ ﻳُﺨْﻠَﻖْ ﻣِﺜْﻠُﻬَﺎ ﻓِﻰ ﺍﻟْﺒِﻼَﺩِ -‘আপনি কি জানেন না আপনার প্রভু কিরূপ আচরণকরেছিলেন ‘আদে ইরম (প্রথম ‘আদ) গোত্রের সাথে’?(ফজর ৬)‘যারা ছিল উঁচুস্তম্ভসমূহের মালিক (৭)। ‘এবং যাদের সমান কাউকে জনপদ সমূহে সৃষ্টি করা হয়নি’(ফাজ্র৮৯/৬-৮)।কওমে ‘আদ-এর প্রতি হূদ (আঃ)-এর দাওয়াতের সারমর্ম :কওমে নূহের প্রতি হযরতনূহ (আঃ)-এর দাওয়াতের সারমর্ম এবং কওমে ‘আদ-এর প্রতি হযরত হূদ (আঃ)-এর দাওয়াতেরসারমর্ম প্রায় একই। হযরত হূদ (আঃ)-এর দাওয়াতের সারকথাগুলি সূরা হূদ-এর ৫০, ৫১ ও ৫২ আয়াতেআল্লাহ বর্ণনা করেছেন, যা এক কথায় বলা যায়- তাওহীদ, তাবলীগ ও ইস্তেগফার। প্রথমেতিনি নিজ কওমকে তাদের কল্পিত উপাস্যদের ছেড়ে একক উপাস্য আল্লাহর দিকে ফিরেআসার ও একনিষ্ঠভাবে তাঁর প্রতি ইবাদতের আহবান জানান, যাকে বলা হয় ‘তাওহীদে ইবাদত’।অতঃপর তিনি জনজীবনকে শিরকের আবিলতা ও নানাবিধ কুসংস্কারের পংকিলতা হ’তে মুক্ত করারজন্য নিঃস্বার্থভাবে দাওয়াত দিতে থাকেন এবং তাদের নিকট আল্লাহর বিধানসমূহ পৌঁছে দিতেথাকেন। তাঁর এই দাওয়াত ও তাবলীগ ছিল নিরন্তর ও অবিরত ধারায় এবং যাবতীয় বস্ত্তগতস্বার্থের ঊর্ধ্বে। অতঃপর তিনি জনগণকে নিজেদের কুফরী, শেরেকী ও অন্যান্যকবীরা গোনাহ সমূহ হ’তে তওবা করার ও আল্লাহর নিকটে একান্তভাবে ক্ষমা প্রার্থনারআহবান জানান।উপরোক্ত তিনটি বিষয়ে সকল নবীই দাওয়াত দিয়েছেন। মূলতঃ উপরোক্ততিনটি বিষয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছেমানুষের ইহকালীন মঙ্গল ও পরকালীন মুক্তি। মানুষযখনই নিজেদের কল্পিত দেব-দেবী ও মূর্তি-প্রতিমাসহ বিভিন্ন উপাস্যের নিকটে মাথা নতকরবে ও তাদেরকেই মুক্তির অসীলা কিংবা সরাসরি মুক্তিদাতা ভাববে, তখনই তার শ্রেষ্ঠত্বভূলুণ্ঠিত হবে। নিকৃষ্ট সৃষ্টি সাপ ও তুলসী গাছ পর্যন্ত তার পূজা পাবে। মানুষেরদুঃখ-দুর্দশা লাঘবও তার সেবা বাদ দিয়ে সে নির্জীব মূর্তির সেবায় লিপ্ত হবে। একজন ক্ষুধার্ত ভাইকে বাএকটি অসহায় প্রাণীকে খাদ্য না দিয়ে সে নিজেদের হাতে গড়া অক্ষম-অনড় মূর্তিকে দুধ-কলার নৈবেদ্য পেশ করবে ও পুষ্পাঞ্জলী নিবেদন করবে। এমনকি কল্পিত দেবতাকেখুশী করার জন্য সে নরবলি বা সতীদাহ করতেও কুণ্ঠিত হবে না। পক্ষান্তরে যখনইএকজন মানুষ সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবলমাত্র আল্লাহ্কে তার সৃষ্টিকর্তা, রূযীদাতা,বিপদহন্তা, বিধানদাতা, জীবন ও মরণদাতা হিসাবে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবে, তখনই সে অন্যসকল সৃষ্টির প্রতি মিথ্যা আনুগত্য হ’তে মুক্তি পাবে। আল্লাহর গোলামীর অধীনেনিজেকে স্বাধীন ওসৃষ্টির সেরা হিসাবে ভাবতে শুরুকরবে। তার সেবার জন্য সৃষ্ট জলে-স্থলে ও অন্তরীক্ষের সবকিছুর উপরে স্বীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় সে উদ্বুদ্ধহবে। তার জ্ঞান ও উপলব্ধি যত বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ভক্তি ততই বৃদ্ধিপাবে। মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টজীবের প্রতি তার দায়িত্ববোধ তত উচ্চকিত হবে।দ্বিতীয়তঃবস্ত্তগত কোন স্বার্থ ছাড়াই মানুষ যখন কাউকে সৎ পথের দাওয়াত দেয়, তখন তা অন্যেরমনে প্রভাব বিস্তার করে।ঐ দাওয়াত যদি তার হৃদয় উৎসারিত হয় এবং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ প্রেরিতঅভ্রান্ত সত্যের পথের দাওয়াত হয়, তাহ’লে তা অন্যের হৃদয়ে রেখাপাত করে। সংশোধনমূলকদাওয়াত প্রথমে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও তা অবশেষে কল্যাণময় ফলাফল নিয়ে আসে।নবীগণের দাওয়াতে স্ব স্ব যুগের ধর্মনেতা ও সমাজ নেতাদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়াসৃষ্টি হ’লেওদুনিয়া চিরদিন নবীগণকেই সম্মান করেছে, ঐসব দুষ্টমতি ধর্মনেতা ও সমাজনেতাদের নয়।তৃতীয়তঃ মানুষ যখন অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে ও আল্লাহর নিকটেক্ষমাপ্রার্থী হয়, তখন তার দুনিয়াবী জীবনে যেমন কল্যাণ প্রভাব বিস্তার করে, তেমনিতার পরকালীন জীবন সুখময় হয় এবং সে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভে ধন্য হয়। হূদ (আঃ)স্বীয় জাতিকে বিশেষভাবে বলেছিলেন, ‘হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর নিকটেক্ষমাপ্রার্থনা কর ও তাঁর দিকে ফিরে যাও। তাহ’লে তিনি আসমান থেকে তোমাদের জন্যবৃষ্টিধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন’(হূদ ১১/৫২)।এখানে ‘শক্তি’ বলতে দৈহিক বল, জনবল ও ধনবল সবই বুঝানো হয়েছে। তওবা ওইস্তেগফারের ফলে এসবই লাভ করা সম্ভব, এটাই অত্র আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।হূদ (আঃ)-এর দাওয়াতের ফলশ্রুতি :হযরত হূদ (আঃ) স্বীয় কওমে ‘আদকে শিরক পরিত্যাগ করে সার্বিকজীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার আহবান জানান। তিনি তাদেরকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করার এবং যুলুম ওঅত্যাচার পরিহার করে ন্যায় ও সুবিচারের পথে চলার উদাত্ত আহবান জানান। কিন্তু নিজেদেরধনৈশ্বর্যের মোহে এবং দুনিয়াবী শক্তির অহংকারে মদমত্ত হয়ে তারা নবীর দাওয়াতকেপ্রত্যাখ্যান করে। তারা বলল, তোমার ঘোষিত আযাব কিংবা তোমার কোন মু‘জেযা নাদেখে কেবল তোমার মুখের কথায় আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসাউপাস্য দেব-দেবীদের বর্জন করতে পারি না। বরং আমরা সন্দেহ করছি যে, আমাদেরদেবতাদের নিন্দাবাদ করার কারণে তাদের অভিশাপে তোমাকে ভূতে ধরেছে ও মস্তিষ্কবিকৃত হয়ে তুমি উন্মাদের মত কথাবার্তা বলছ। তাদের এসব কথার উত্তরে হযরত হূদ (আঃ)পয়গম্বর সূলভ নির্ভীক কণ্ঠে জবাব দেন যে,তোমরা যদি আমার কথা না মানো, তবেতোমরা সাক্ষী থাক যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া তোমাদের ঐসব অলীক উপাস্যদের আমিমানি না। তোমরা ও তোমাদের দেবতারা সবাই মিলে আমারঅনিষ্ট সাধনের চেষ্টা কর। তাতেআমার কিছুই হবে না আল্লাহর হুকুম ছাড়া। তিনিই আমার পালনকর্তা। তাঁর উপরেই আমি ভরসারাখি। যারাসরল পথে চলে, আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন।অহংকারী ও শক্তি মদমত্ত জাতির বিরুদ্ধেএকাকী এমন নির্ভীক ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও তারা তাঁরকেশাগ্র স্পর্শ করার সাহসকরেনি। বস্ত্ততঃ এটা ছিল তাঁর একটি মু‘জেযা বিশেষ। এর দ্বারা তিনি দেখিয়ে দিলেন যে,তাদের কল্পিত দেব-দেবীদের কোন ক্ষমতা নেই। অতঃপর তিনি বললেন, আমাকেযেসত্য পৌঁছানোর দায়িত্ব আল্লাহ পাক দিয়েছেন, সে সত্য আমি তোমাদের নিকটেপৌঁছে দিয়েছি। এক্ষণে যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করতেই থাক এবং হঠকারিতার উপরে যিদকরতে থাক, তাহ’লে জেনে রেখ এর অনিবার্য পরিণতি হিসাবে তোমাদের উপরেআল্লাহর সেই কঠিন শাস্তি নেমে আসবে, যার আবেদন তোমরা আমার নিকটে বারবারকরেছ। অতএব তোমরা সাবধান হও। এখনো তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এসো।কিন্তু হতভাগার দল হযরত হূদ (আঃ)-এর কোন কথায় কর্ণপাত করল না।তারা বরং অহংকারে স্ফীতহয়ে বলে উঠলো, ‘আমাদের চেয়ে বড় শক্তিধর (এ পৃথিবীতে) আর কে আছে’?(হা-মীম সাজদাহ ৪১/১৫)। ফলে তাদের উপরে এলাহী গযব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো।কওমে ‘আদ-এর উপরে আপতিত গযব-এর বিবরণ :মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক বলেন, কওমে ‘আদ-এর অমার্জনীয় হঠকারিতার ফলে প্রাথমিক গযব হিসাবে উপর্যুপরি তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধথাকে। তাদের শস্যক্ষেত সমূহ শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়। বাগ-বাগিচাজ্বলে-পুড়েছারখার হয়ে যায়। এতদসত্ত্বেও তারা শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেনি। কিন্তু অবশেষে তারাবাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে। তখন আসমানে সাদা, কালো ও লাল মেঘদেখা দেয় এবং গায়েবী আওয়ায আসে যে, তোমরা কোনটি পসন্দকরো? লোকেরাকালো মেঘ কামনা করল। তখন কালো মেঘ এলো। লোকেরা তাকে স্বাগত জানিয়েবলল, ﻫَﺬَﺍ ﻋَﺎﺭِﺽٌ ﻣُّﻤْﻄِﺮُﻧَﺎ ‘এটি আমাদের বৃষ্টি দেবে’। জবাবে তাদের নবী হূদ (আঃ)বললেন, ﺑَﻞْ ﻫُﻮَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻌْﺠَﻠْﺘُﻢْ ﺑِﻪِ ﺭِﻳْﺢٌ ﻓِﻴْﻬَﺎ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﺍَﻟِﻴْﻢٌ، ﺗُﺪَﻣِّﺮُ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﺑِﺄَﻣْﺮِﺭَﺑِّﻬَﺎ … ‏)ﺍﻷﺣﻘﺎﻑ২৪-২৫(-‘বরং এটা সেই বস্ত্ত যা তোমরা তাড়াতাড়ি চেয়েছিলে। এটা এমন বায়ু যার মধ্যেরয়েছে মর্মন্তুদআযাব’। ‘সে তার প্রভুর আদেশে সবাইকে ধ্বংস করে দেবে…’।[4]ফলে অবশেষে পরদিন ভোরে আল্লাহর চূড়ান্ত গযব নেমে আসে। সাত রাত্রি ও আটদিন ব্যাপী অনবরত ঝড়-তুফান বইতে থাকে। মেঘের বিকট গর্জন ও বজ্রাঘাতে বাড়ী-ঘরসব ধ্বসে যায়, প্রবল ঘুর্ণিঝড়ে গাছ-পালা সব উপড়ে যায়, মানুষ ও জীবজন্তু শূন্যে উত্থিতহয়ে সজোরে যমীনে পতিত হয়(ক্বামার ৫৪/২০; হাক্বক্বাহ ৬৯/৬-৮)এবং এভাবেইশক্তিশালী ও সুঠাম দেহেরঅধিকারী বিশালবপু ‘আদ জাতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়েযায়। আল্লাহ বলেন, এছাড়াও তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী অভিসম্পাৎ দুনিয়া ও আখেরাতে(হূদ ১১/৬০)।আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন মেঘ বা ঝড় দেখতেন, তখন তাঁরচেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত এবং বলতেন হে আয়েশা! এই মেঘ ও তার মধ্যকার ঝঞ্ঝাবায়ুদিয়েই একটি সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছে। যারা মেঘ দেখে খুশী হয়ে বলেছিল,‘এটি আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করবে’।[5]রাসূলের এই ভয়ের তাৎপর্য ছিল এই যে, কিছুলোকের অন্যায়ের কারণে সকলের উপর এই ব্যাপক গযব নেমে আসতে পারে।যেমন ওহোদ যুদ্ধের দিন কয়েকজনেরভুলের কারণে সকলের উপর বিপদ নেমেআসে। যেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺗَّﻘُﻮْﺍ ﻓِﺘْﻨَﺔً ﻻَّﺗُﺼِﻴْﺒَﻦَّ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﺧَﺎﺻَّﺔًﻭَﺍﻋْﻠَﻤُﻮْﺁ ﺃَﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﺷَﺪِﻳْﺪُ ﺍﻟْﻌِﻘَﺎﺏِ – ‏)ﺍﻷﻧﻔﺎﻝ ২৫(-‘আর তোমরা ঐসব ফেৎনা থেকে বেঁচে থাক, যাবিশেষভাবে কেবল তাদের উপর পতিত হবে না, যারা তোমাদের মধ্যে যালেম। আরজেনে রাখো যে, আল্লাহর শাস্তি অত্যন্ত কঠোর’(আনফাল ৮/২৫)।উল্লেখ্য যে, গযবনাযিলের প্রাক্কালেই আল্লাহ স্বীয় নবী হূদ ও তাঁর ঈমানদার সাথীদের উক্ত এলাকাছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন ও তাঁরা উক্ত আযাব থেকে রক্ষা পান(হূদ ১১/৫৮)। অতঃপরতিনি মক্কায় চলে যান ও সেখানেই ওফাত পান।[6]তবে ইবনু কাছীর হযরত আলী (রাঃ)থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, হূদ (আঃ) ইয়ামনেই কবরস্থ হয়েছেন।[7]আল্লাহসর্বাধিক অবগত।কওমে ‘আদ-এর ধ্বংসের প্রধান কারণসমূহ :১. মনস্তাত্ত্বিক কারণ সমূহ :(ক)তারা আল্লাহর অনুগ্রহ সমূহের অবমূল্যায়ন করেছিল। যার ফলে তারা আল্লাহর আনুগত্য হ’তেমুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং শয়তানেরআনুগত্য বরণ করে স্বেচ্ছাচারী হয়ে গিয়েছিল (খ)আল্লাহর নে‘মত সমূহকে তাদের জন্য চিরস্থায়ী ভেবেছিল (গ) আল্লাহর গযব থেকেবাঁচার জন্য বিভিন্ন কল্পিত উপাস্যের অসীলা পূজা শুরু করেছিল (ঘ) তারা আল্লাহর নবীকেমিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল (ঙ) তারা আল্লাহর গযব থেকে নির্ভীক হয়ে গিয়েছিল। যদিও তারাআল্লাহকে বিশ্বাস করত।২. বস্ত্তগত কারণসমূহ : প্রধানত:তিনটি :(ক) তারা অযথা উঁচু স্থান সমূহেসুউচ্চ টাওয়ার ও নিদর্শন সমূহ নির্মাণ করত। যা স্রেফ অপচয় ব্যতীত কিছুই ছিল না(শো‘আরা১২৮)।(খ) তারা অহেতুক মযবূত প্রাসাদ রাজি তৈরী করত এবং ভাবত যেন তারাসেখানে চিরকালবসবাস করবে(ঐ, ১২৯)।(গ) তারা দুর্বলদের উপর নিষ্ঠুরভাবে আঘাত হানতো এবং মানুষেরউপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতো(ঐ, ১৩০)।শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :উপরোক্ত বিষয়গুলিরমধ্যে বর্তমান যুগের অত্যাচারী সমাজনেতা ও যালেম সরকার সমূহ এবং সভ্যতাগর্বীমানুষের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ নিহিত রয়েছে। যেমন:(১) অহি-র বিধানকে অস্বীকারকরা এবং অন্যায়ের উপর যিদ ও অহংকার প্রদর্শন করাই হ’ল পৃথিবীতে আল্লাহর গযব নাযিলেরপ্রধান কারণ।(২) আল্লাহ প্রেরিত গযবের ধরন বিভিন্ন রূপ হ’তে পারে। কিন্তু সেই গযবকেঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের থাকে না।(৩) বিলাসী, অপচয়কারী ও অত্যাচারী নেতাদেরকারণেই জাতি আল্লাহর গযবের শিকার হয়ে থাকে।(৪) আল্লাহর গযব যাদের উপর আপতিত হয়,তারা সকল যুগে নিন্দিত হয় এবং কখনোই তারা আর মাথা উঁচু করেদাঁড়াতে পারে না।(৫) আল্লাহরবিধান লংঘনকারী ব্যক্তি বা সম্প্রদায় চূড়ান্ত বিচারে দুনিয়াতেই আল্লাহর গযবের শিকার হয়।উপরন্তু আখেরাতের আযাব তো থাকেই এবং তা হয় আরো কঠোর(ক্বলম ৬৮/৩৩)।[1].ইবনু কাছীর, সূরা আ‘রাফ ৬৫, ৭৩।[2]. কুরতুবী, আ‘রাফ ৬৫।[3]. যথাক্রমে: (১) আ‘রাফ৭/৬৫-৭২, (২) তওবা ৯/৭০, (৩) হূদ ১১/৫০-৬০, ৮৯, (৪) ইবরাহীম ১৪/৯, (৫) হজ্জ ২২/৪২, (৬)ফুরক্বান ২৫/৩৮, ৩৯, (৭) শো‘আরা ২৬/১২৩-১৪০, (৮) আনকাবূত ২৯/৩৮, (৯) ছোয়াদ ৩৮/১২,(১০) গাফের/মুমিন ৪০/৩১, (১১) ফুছছিলাত/হামীম সাজদাহ ৪১/১৩-১৬, (১২) আহক্বাফ ৪৬/২১-২৬,(১৩) ক্বাফ ৫০/১৩, (১৪) যারিয়াত ৫১/৪১, ৪২, (১৫) ক্বামার ৫৪/১৮-২২, (১৬) হা-ক্বক্বাহ ৬৯/৪-৮,(১৭) ফাজ্র ৮৯/৬-৮। সর্বমোট ৭৩।[4]. আহক্বাফ ৪৬/২৪, ২৫; ইবনু কাছীর, সূরা আ‘রাফ ৭১।[5]. বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা/১৫১৩‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘ঝঞ্ঝা-বায়ু’ অনুচ্ছেদ।[6]. তাফসীরকুরতুবী, আ‘রাফ ৬৫।[7]. তাফসীর ইবনে কাছীর, সূরা আ‘রাফ ৬৫।

হযরত সুলাইমান আঃ এর জীবনী

 




হযরত সোলায়মান (আ:)১৮. হযরত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)সূচীপত্র♦বাল্যকালে সুলায়মান♦সুলায়মানের বৈশিষ্ট্যসমূহ♦দু’টি সূক্ষ্মতত্ত্ব♦সুলায়মানের জীবনে উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী(১) ন্যায়বিচারের ঘটনা(২) পিপীলিকার ঘটনা(৩) ‘হুদহুদ’ পাখির ঘটনা(৪) রাণী বিলক্বীসের ঘটনা(৫) অশ্বকুরবানীর ঘটনা♦সিংহাসনের উপরে একটি নিষ্প্রাণ দেহ প্রাপ্তির ঘটনা(৭) ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলারফল(৮) হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়ের ঘটনা(৯) বায়তুল মুক্বাদ্দাস নির্মাণ ও সুলায়মান (আঃ)-এরমৃত্যুর বিস্ময়কর ঘটনা♦মৃত্যু কাহিনীর মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ♦সংশয় নিরসন♦সুলায়মান(আঃ)-এর জীবনী থেকে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ♦সুলায়মানের মৃত্যু ও রাজত্বকালহযরতদাঊদ (আঃ)-এর মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র সুলায়মান তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আবির্ভাবের ন্যূনাধিক দেড় হাযার বছর পূর্বে তিনি নবী হন। সুলায়মান ছিলেন পিতার ১৯জনপুত্রের অন্যতম। আল্লাহ পাক তাকে জ্ঞানে, প্রজ্ঞায় ও নবুঅতের সম্পদে সমৃদ্ধকরেন। এছাড়াও তাঁকে এমন কিছু নে‘মত দান করেন, যা অন্য কোন নবীকে দান করেননি।ইমাম বাগাভী ইতিহাসবিদগণের বরাতে বলেন, সুলায়মান (আঃ)-এর মোট বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর।তের বছর বয়সে রাজকার্য হাতে নেন এবং শাসনের চতুর্থ বছরে বায়তুলমুক্বাদ্দাসেরনির্মাণ কাজ শুরু করেন। তিনি ৪০ বছর কাল রাজত্ব করেন (মাযহারী, কুরতুবী)।তবে তিনি কতবছর বয়সে নবী হয়েছিলেন সে বিষয়ে কিছু জানা যায় না। শাম ও ইরাক অঞ্চলে পিতাররেখে যাওয়া রাজ্যের তিনিবাদশাহ ছিলেন। তাঁর রাজ্য তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সুখীওশক্তিশালী রাজ্য ছিল। কুরআনে তাঁর সম্পর্কে ৭টি সূরায় ৫১টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।[1]আমরা সেগুলিকে একত্রিত করে কাহিনীরূপে পেশ করার চেষ্টা পাবইনশাআল্লাহ।বাল্যকালেসুলায়মান :(১) আল্লাহ পাক সুলায়মানকে তার বাল্যকালেই গভীর প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি দানকরেছিলেন। ছাগপালের মালিক ও শস্যক্ষেতের মালিকের মধ্যে পিতা হযরত দাঊদ (আঃ)যেভাবে বিরোধ মীমাংসা করেছিলেন, বালক সুলায়মান তার চাইতে উত্তম ফায়ছালা পেশকরেছিলেন। ফলে হযরত দাঊদ (আঃ) নিজের পূর্বের রায় বাতিল করে পুত্রের দেওয়াপ্রস্তাব গ্রহণ করেন ও সে মোতাবেক রায় দান করেন।উক্ত ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেআললাহ বলেন, ﻭَﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﻭَﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﺇِﺫْ ﻳَﺤْﻜُﻤَﺎﻥِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺤَﺮْﺙِ ﺇِﺫْ ﻧَﻔَﺸَﺖْ ﻓِﻴْﻪِ ﻏَﻨَﻢُ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻟِﺤُﻜْﻤِﻬِﻢْﺷَﺎﻫِﺪِﻳْﻦَ- ﻓَﻔَﻬَّﻤْﻨَﺎﻫَﺎ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻭَﻛُﻼًّ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎ ﺣُﻜْﻤﺎً ﻭَّﻋِﻠْﻤﺎً ‏(ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ৭৮-৭৯)-‘আর স্মরণ কর দাঊদ ওসুলায়মানকে,যখন তারা একটি শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করছিল, যাতে রাত্রিকালে কারুমেষপাল ঢুকে পড়েছিল। আর তাদের বিচারকার্য আমাদের সম্মুখেই হচ্ছিল’। ‘অতঃপর আমরাসুলায়মানকে মোকদ্দমাটির ফায়ছালা বুঝিয়ে দিলাম এবং আমরা উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দানকরেছিলাম’ (আম্বিয়া২১/৭৮-৭৯)।ছোটবেলা থেকেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় ভূষিত সুলায়মানকেপরবর্তীতে যথার্থভাবেই পিতার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন,ﻭَﻭَﺭِﺙَ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥُ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ‘সুলায়মান দাঊদেরউত্তরাধিকারী হয়েছিলেন’ (নমল ২৭/১৬)। অন্যত্রআল্লাহ বলেন, ﻭَﻭَﻫَﺒْﻨَﺎ ﻟِﺪَﺍﻭُﻭﺩَ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻧِﻌْﻢَ ﺍﻟْﻌَﺒْﺪُ ﺇِﻧَّﻪُ ﺃَﻭَّﺍﺏٌ ‏( ﺹ ৩০)- ‘আমরা দাঊদেরজন্যসুলায়মানকে দান করেছিলাম। কতই না সুন্দর বান্দা সে এবং সে ছিল (আমার প্রতি) সদাপ্রত্যাবর্তনশীল’ (ছোয়াদ ৩৮/৩০)।(২) আরেকটি ঘটনা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, যানিম্নরূপ: ‘দু’জন মহিলার দু’টি বাচ্চা ছিল। একদিন নেকড়ে বাঘ এসে একটি বাচ্চাকে নিয়ে যায়।তখন প্রত্যেকে বলল যে, তোমার বাচ্চা নিয়ে গেছে। যেটি আছে ওটি আমার বাচ্চা।বিষয়টি ফায়ছালার জন্য দুই মহিলা খলীফা দাঊদের কাছে এলো। তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারপক্ষে রায় দিলেন। তখন তারা বেরিয়ে সুলায়মানের কাছে এলো এবং সবকথাখুলে বলল।সুলায়মান তখন একটি ছুরি আনতে বললেন এবং বাচ্চাটাকেদু’টুকরা করে দু’মহিলাকে দিতেচাইলেন। তখন বয়োকনিষ্ঠ মহিলাটি বলল, ইয়ারহামুকাল্লাহু ‘আল্লাহ আপনাকে অনুগ্রহ করুন’বাচ্চাটি ঐ মহিলার। তখন সুলায়মান কনিষ্ঠমহিলার পক্ষে রায় দিলেন’।[2]সুলায়মানের বৈশিষ্ট্য সমূহ:দাঊদ (আঃ)-এর ন্যায় সুলায়ামন (আঃ)-কেও আল্লাহ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, যা আরকাউকে দান করেননি। যেমন: (১) বায়ু প্রবাহ অনুগত হওয়া (২) তামাকে তরল ধাতুতে পরিণত করা(৩) জিনকে অধীনস্ত করা (৪) পক্ষীকূলকে অনুগত করা (৫) পিপীলিকার ভাষা বুঝা (৬)অতুলনীয় সাম্রাজ্য দান করা (৭) প্রাপ্ত অনুগ্রহ রাজির হিসাব নারাখার অনুমতি পাওয়া। নিম্নেবিস্তারিতভাবে বর্ণিত হ’ল:১. বায়ু প্রবাহকে তাঁর অনুগত করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর হুকুমমত বায়ুতাঁকে তাঁর ইচ্ছামত স্থানে বহন করে নিয়ে যেত। তিনি সদলবলে বায়ুর পিঠে নিজ সিংহাসনেসওয়ার হয়ে দু’মাসের পথ একদিনে পৌঁছে যেতেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟِﺴُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَﺍﻟﺮِّﻳﺢَ ﻏُﺪُﻭُّﻫَﺎ ﺷَﻬْﺮٌ ﻭَﺭَﻭَﺍﺣُﻬَﺎ ﺷَﻬْﺮٌ -… ‏( ﺳﺒﺎ ৩৪)-‘এবং আমরা সুলায়মানের অধীন করে দিয়েছিলামবায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ ও বিকালে এক মাসের পথ অতিক্রম করত…’ (সাবা ৩৪/১২)।উল্লেখ্য যে, ইবনু আববাস (রাঃ)-এরনামে যে কথা বর্ণিত হয়েছে যে, মানুষ ও জিনের চারলক্ষ আসন বিশিষ্ট বিশাল বহর নিয়ে সুলায়মান বায়ু প্রবাহে যাত্রা করতেন এবং সারা পথ ছালাতে রতথাকতেন ও এই মহা নে‘মত প্রদানের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। এত দ্রুতচলাসত্ত্বেও বায়ু তরঙ্গে তাঁদের উপরে কোনরূপ চাপ সৃষ্টি হ’ত না এবং রোদ বৃষ্টি থেকেরক্ষার জন্য মাথার উপর দিয়ে লাখ লাখ পাখি তাদেরকে ছায়া করে যেত’ ইত্যাদি যেসব কথাতাফসীরের কেতাব সমূহে বর্ণিত হয়েছে তার সবই ভিত্তিহীন ইস্রাঈলী উপকথা মাত্র।আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟِﺴُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﺍﻟﺮِّﻳﺢَ ﻋَﺎﺻِﻔَﺔً ﺗَﺠْﺮِﻱْ ﺑِﺄَﻣْﺮِﻩِ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺍﻟَّﺘِﻲْ ﺑَﺎﺭَﻛْﻨَﺎ ﻓِﻴْﻬَﺎ ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﺑِﻜُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍﻋَﺎﻟِﻤِﻴْﻦَ – ‏(ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ৮১)-‘আর আমরা সুলায়মানের অধীন করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে। যা তারআদেশে প্রবাহিত হ’ত ঐ দেশের দিকে, যেখানে আমরা কল্যাণ রেখেছি। আর আমরাসকল বিষয়ে সম্যক অবগত রয়েছি’ (আম্বিয়া ২১/৮১)। অন্যত্র আল্লাহ উক্ত বায়ুকে ﺭُﺧَﺎﺀবলেছেন (ছোয়াদ ৩৮/৩৬)। যার অর্থ মৃদু বায়ু, যা শূন্যে তরঙ্গ-সংঘাত সৃষ্টি করে না। ﻋَﺎﺻِﻔَﺔٌও ﺭُﺧَﺎﺀ দু’টি বিশেষণের সমন্বয় এভাবে হ’তে পারে যে, কোনরূপ তরঙ্গ সংঘাত সৃষ্টি নাকরে তীব্র বেগে বায়ু প্রবাহিত হওয়াটা ছিল আল্লাহর বিশেষ রহমতএবং সুলায়মানের অন্যতমমু‘জেযা।উল্লেখ্য যে, হাসান বাছরীর নামে যেকথা বলা হয়ে থাকে যে, একদিন ঘোড়াতদারকি করতে গিয়ে সুলায়মানের আছরের ছালাত ক্বাযা হয়ে যায়। সেই ক্ষোভে তিনি সবঘোড়া যবেহ করে দেন। ফলেতার বিনিময়ে আল্লাহ তাঁকে পুরস্কার স্বরূপ বায়ু প্রবাহকেঅনুগত করে দেন বলে যেকথা তাফসীরের কেতাবসমূহে চালু আছে, তার কোন ভিত্তিনেই। এগুলি হিংসুক ইহুদীদের রটনা মাত্র।[3]২. তামার ন্যায় শক্ত পদার্থকে আল্লাহ সুলায়মানেরজন্য তরল ধাতুতে পরিণত করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﺳَﻠْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻋَﻴْﻦَ ﺍﻟْﻘِﻄْﺮِ … ‘আমরাতার জন্য গলিত তামার একটি ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম…’ (সাবা ৩৪/১২)। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ঐগলিত ধাতু উত্তপ্ত ছিল না। বরং তা দিয়ে অতি সহজে পাত্রাদি তৈরী করা যেত। সুলায়মানের পরথেকেই তামা গলিয়ে পাত্রাদি তৈরী করা শুরু হয় বলে কুরতুবী বর্ণনা করেছেন। পিতাদাঊদের জন্য ছিল লোহা গলানোর মু‘জেযা এবং পুত্র সুলায়মানের জন্য ছিল তামা গলানোরমু‘জেযা। আর এজন্যেই আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেন, ﺇِﻋْﻤَﻠُﻮﺍ ﺁﻝَ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﺷُﻜْﺮﺍً ﻭَﻗَﻠِﻴﻞٌ ﻣِّﻦْﻋِﺒَﺎﺩِﻱَ ﺍﻟﺸَّﻜُﻮﺭُ ‘হে দাঊদ পরিবার! কৃতজ্ঞতা সহকারে তোমরা কাজ করে যাও। বস্ত্ততঃ আমারবান্দাদের মধ্যে অল্প সংখ্যকই কৃতজ্ঞ’ (সাবা ৩৪/১৩)।দু’টি সূক্ষ্মতত্ত্ব :(ক) দাঊদ (আঃ)-এরজন্য আল্লাহ তা‘আলা সর্বাধিক শক্ত ও ঘন পদার্থ লোহাকে নরম ও সুউচ্চ পর্বতমালাকেঅনুগত করে দিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে সুলায়মান (আঃ)-এর জন্য আল্লাহ শক্ত তামাকেগলানো এবং বায়ু, জিন ইত্যাদি এমন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বস্ত্তকে অনুগত করে দিয়েছিলেন, যাচোখেও দেখা যায় না। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর শক্তি বড়-ছোট সবকিছুরমধ্যে পরিব্যাপ্ত।(খ) এখানে আরেকটি বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহরতাক্বওয়াশীল অনুগত বান্দারা আল্লাহর হুকুমে বিশ্বচরাচরের সকল সৃষ্টির উপরে আধিপত্যকরতে পারে এবং সবকিছুকে বশীভূত করে তা থেকে খিদমত নিতে পারে।৩. জিনকে তাঁরঅধীন করে দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﻣِﻦَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﻣَﻦ ﻳَّﻌْﻤَﻞُ ﺑَﻴْﻦَ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﺑِﺈِﺫْﻥِ ﺭَﺑِّﻪِ …‏( ﺳﺒﺎ ১২)- ‘আর জিনের মধ্যে কিছুসংখ্যক তার (সুলায়মানের) সম্মুখে কাজ করত তারপালনকর্তার (আল্লাহর) আদেশে…’ (সাবা ৩৪/১২)।অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﻭَﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﻴَﺎﻃِﻴْﻦِ ﻣَﻦْﻳَّﻐُﻮْﺻُﻮْﻥَ ﻟَﻪُ ﻭَﻳَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ ﻋَﻤَﻼً ﺩُﻭْﻥَ ﺫَﻟِﻚَ ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻟَﻬُﻢْ ﺣَﺎﻓِﻈِﻴْﻦَ- ‏(ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ৮২)-‘এবং আমরা তার অধীনকরে দিয়েছিলাম শয়তানদের কতককে, যারা তার জন্য ডুবুরীর কাজ করত এবং এছাড়া অন্যআরও কাজ করত। আমরা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতাম’(আম্বিয়া ২১/৮২)।অন্যত্র বলাহয়েছে, ﻭَﺍﻟﺸَّﻴَﺎﻃِﻴْﻦَ ﻛُﻞَّ ﺑَﻨَّﺎﺀٍ ﻭَّﻏَﻮَّﺍﺹٍ- ﻭَﺁﺧَﺮِﻳْﻦَ ﻣُﻘَﺮَّﻧِﻴْﻦَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺻْﻔَﺎﺩِ- ‏(ﺹ ৩৭-৩৮)-‘আর সকলশয়তানকে তার অধীন করে দিলাম, যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী’। ‘এবং অন্য আরওঅনেককে অধীন করে দিলাম,যারা আবদ্ধ থাকত শৃংখলে’ (ছোয়াদ৩৮/৩৭-৩৮)।বস্ত্ততঃজিনেরা সাগরে ডুব দিয়ে তলদেশ থেকে মূল্যবান মণি-মুক্তা, হীরা-জহরত তুলে আনত এবংসুলায়মানের হুকুমে নির্মাণ কাজ সহ যেকোন কাজ করার জন্য সদা প্রস্ত্তত থাকত। ঈমানদারজিনেরা তো ছওয়াবের নিয়তে স্বেচ্ছায় আনুগত্য করত। কিন্তু দুষ্ট জিনগুলোবেড়ীবদ্ধ অবস্থায় সুলায়মানের ভয়ে কাজ করত। এই অদৃশ্য শৃংখল কেমন ছিল, তা কল্পনাকরার দরকার নেই। আদেশ পালনে সদাপ্রস্ত্তত থাকাটাও এক প্রকার শৃংখলবদ্ধ থাকা বৈ কি!‘শয়তান’হচ্ছে আগুন দ্বারা সৃষ্ট বুদ্ধি ও চেতনা সম্পন্ন এক প্রকার সূক্ষ্ম দেহধারী জীব।জিনেরমধ্যকার অবাধ্য ও কাফির জিনগুলিকেই মূলতঃ ‘শয়তান’ নামে অভিহিত করা হয়। আয়াতে ‘শৃংখলবদ্ধ’কথাটি এদের জন্যেই বলা হয়েছে। আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকায় এরা সুলায়মানের কোনক্ষতি করতে পারত না। বরং সর্বদা তাঁর হুকুম পালনের জন্য প্রস্ত্তত থাকত। তাদের বিভিন্নকাজের মধ্যে আল্লাহ নিজেই কয়েকটি কাজের কথাউল্লেখ করেছেন। যেমন, ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَﻟَﻪُ ﻣَﺎ ﻳَﺸَﺂﺀُ ﻣِﻦْ ﻣَّﺤَﺎﺭِﻳْﺐَ ﻭَﺗَﻤَﺎﺛِﻴْﻞَ ﻭَﺟِﻔَﺎﻥٍ ﻛَﺎﻟْﺠَﻮَﺍﺏِ ﻭَﻗُﺪُﻭْﺭٍ ﺭَّﺍﺳِﻴَﺎﺕٍ … ‏( ﺳﺒﺎ ১৩)-‘তারা সুলায়মানেরইচ্ছানুযায়ী দুর্গ, ভাষ্কর্য, হাউয সদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লীর উপরে স্থাপিত বিশালডেগনির্মাণ করত…’ (সাবা ৩৪/১৩)। উল্লেখ্য যে, ﺗﻤﺎﺛﻴﻞ তথা ভাষ্কর্য কিংবা চিত্র ও প্রতিকৃতিঅংকন বা স্থাপন যদি গাছ বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের হয়, তাহ’লে ইসলামে তা জায়েয রয়েছে। কিন্তুযদি তা প্রাণীদেহের হয়, তবে তা নিষিদ্ধ।৪. পক্ষীকুলকে সুলায়মানের অনুগত করেদেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তাদের ভাষা বুঝতেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﻭَﺭِﺙَ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥُ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَﻭَﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﻋُﻠِّﻤْﻨَﺎ ﻣَﻨﻄِﻖَ ﺍﻟﻄَّﻴْﺮِ ﻭَﺃُﻭﺗِﻴﻨَﺎﻣِﻦ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﻟَﻬُﻮَ ﺍﻟْﻔَﻀْﻞُ ﺍﻟْﻤُﺒِﻴْﻦُ ু ‏( ﻧﻤﻞ১৬)-‘সুলায়মান দাঊদের উত্তরাধিকারী হয়েছিল এবং বলেছিল, হে লোক সকল!আমাদেরকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সবকিছু দেওয়াহয়েছে। নিশ্চয়ই এটি একটি সুস্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব’ (নমল ২৭/১৬)।পক্ষীকুল তাঁর হুকুমে বিভিন্নকাজ করত। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পত্র তিনি হুদহুদ পাখির মাধ্যমেপার্শ্ববর্তী ‘সাবা’ রাজ্যের রাণী বিলক্বীসের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। এ ঘটনাপরে বিবৃত হবে।৫. পিপীলিকার ভাষাও তিনি বুঝতেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﺣَﺘَّﻰ ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺗَﻮْﺍ ﻋَﻠَﻰﻭَﺍﺩِﻱ ﺍﻟﻨَّﻤْﻞِ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﻧَﻤْﻠَﺔٌ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﻤْﻞُ ﺍﺩْﺧُﻠُﻮْﺍ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨَﻜُﻢْ ﻻَ ﻳَﺤْﻄِﻤَﻨَّﻜُﻢْ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥُ ﻭَﺟُﻨُﻮﺩُﻩُ ﻭَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭْﻥَ-ﻓَﺘَﺒَﺴَّﻢَ ﺿَﺎﺣِﻜﺎً ﻣِّﻦ ﻗَﻮْﻟِﻬَﺎ -… ‏( ﻧﻤﻞ ১৮-১৯)-‘অবশেষে সুলায়মান তার সৈন্যদল নিয়ে পিপীলিকাঅধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছল। তখন পিপীলিকা (নেতা) বলল, হে পিপীলিকা দল! তোমরা স্ব স্বগৃহে প্রবেশ কর। অন্যথায় সুলায়মান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষ্ট করেফেলবে’। ‘তার এই কথা শুনে সুলায়মান মুচকি হাসল… (নমল ২৭/১৮-১৯)।৬. তাঁকে এমন সাম্রাজ্যদান করা হয়েছিল, যা পৃথিবীতে আর কাউকে দান করা হয়নি। এজন্য আল্লাহর হুকুমে তিনিআল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّ ﺍﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲْ ﻭَﻫَﺐْ ﻟِﻲْ ﻣُﻠْﻜﺎًﻻَّ ﻳَﻨْﺒَﻐِﻲ ﻟِﺄَﺣَﺪٍ ﻣِّﻦْ ﺑَﻌْﺪِﻱْ ﺇِﻧَّﻚَ ﺃَﻧْﺖَ ﺍﻟْﻮَﻫَّﺎﺏُ- ‏(ﺹ ৩৫)-‘সুলায়মান বলল, হে আমার পালনকর্তা!আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে এমন এক সাম্রাজ্য দান কর, যা আমার পরে আর কেউ যেন নাপায়। নিশ্চয়ই তুমি মহান দাতা’ (ছোয়াদ ৩৮/৩৫)।উল্লেখ্য যে, পয়গম্বরগণের কোন দো‘আআল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে হয় না। সে হিসাবে হযরত সুলায়মান (আঃ) এ দো‘আটিও আল্লাহতা‘আলার অনুমতিক্রমেই করেছিলেন। কেবল ক্ষমতা লাভ এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং এরপিছনে আল্লাহর বিধানাবলী বাস্তবায়ন করা এবং তাওহীদের ঝান্ডাকে সমুন্নত করাই মূলউদ্দেশ্য ছিল।কেননা আল্লাহ জানতেন যে, রাজত্ব লাভের পর সুলায়মান তাওহীদ ও ইনছাফপ্রতিষ্ঠার জন্যই কাজ করবেন এবং তিনি কখনোই অহংকারের বশীভূত হবেন না। তাই তাঁকেএরূপ দো‘আর অনুমতি দেওয়া হয় এবং সে দো‘আ সর্বাংশে কবুল হয়।ইসলামে নেতৃত্ব ওশাসন ক্ষমতা চেয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ। আল্লামা জুবাঈ বলেন, আল্লাহর অনুমতিক্রমেই তিনি এটাচেয়েছিলেন। কেননা নবীগণ আল্লাহর হুকুম ব্যতীত কোন সুফারিশ করতে পারেন না।তাছাড়াএটা বলাও সঙ্গত হবে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেনযে, বর্তমানে(জাদু দ্বারা বিপর্যস্ত এই দেশে) তুমি ব্যতীত দ্বীনের জন্য কল্যাণকর এবং যথার্থশাসনের যোগ্যতা অন্য কারু মধ্যে নেই। অতএব তুমি প্রার্থনা করলে আমি তোমাকে তাদান করব।’ সেমতে তিনি দো‘আ করেন ও আল্লাহ তাকে তা প্রদান করেন।[4]৭. প্রাপ্তঅনুগ্রহরাজির হিসাব রাখা বা না রাখার অনুমতি প্রদান। আল্লাহ পাক হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর রাজত্বলাভের দো‘আ কবুল করার পরে তার প্রতি বায়ু, জিন, পক্ষীকুল ও জীব-জন্তু সমূহকেঅনুগত করে দেন। অতঃপর বলেন, ﻫَﺬَﺍ ﻋَﻄَﺎﺅُﻧَﺎ ﻓَﺎﻣْﻨُﻦْ ﺃَﻭْ ﺃَﻣْﺴِﻚْ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺣِﺴَﺎﺏٍ، ﻭَﺇِﻥَّ ﻟَﻪُ ﻋِﻨْﺪَﻧَﺎﻟَﺰُﻟْﻔَﻰ ﻭَﺣُﺴْﻦَ ﻣَﺂﺏٍ- ‏(ﺹ ৩৯-৪০)-‘এসবই আমার অনুগ্রহ। অতএব এগুলো তুমি কাউকে দাও অথবানিজে রেখে দাও, তার কোন হিসাব দিতে হবে না’। ‘নিশ্চয়ই তার (সুলায়মানের) জন্য আমারকাছে রয়েছে নৈকট্য ও শুভ পরিণতি’ (ছোয়াদ ৩৮/৩৯-৪০)।বস্ত্ততঃ এটি ছিল সুলায়মানেরআমানতদারী ও বিশ্বস্ততার প্রতি আল্লাহর পক্ষ হ’তে প্রদত্ত একপ্রকার সনদপত্র। পৃথিবীরকোন ব্যক্তির জন্য সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ধরনের কোন সত্যায়নপত্র নাযিলহয়েছে বলে জানা যায় না। অথচ এই মহান নবী সম্পর্কে ইহুদী-নাছারা বিদ্বানরা বাজে কথারটনা করে থাকে।সুলায়মানের জীবনে উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী :(১) ন্যায় বিচারের ঘটনা: ছাগপালের মালিক ও শস্যক্ষেতের মালিকের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসায় তাঁর দেওয়া প্রস্তাববাদশাহ দাঊদ (আঃ) গ্রহণকরেন ও নিজের দেওয়া পূর্বের রায় বাতিল করে পুত্র সুলায়মানেরদেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী রায় দেন ও তা কার্যকর করেন। এটি ছিল সুলায়মানের বাল্যকালেরঘটনা, যা আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন (দ্র: আম্বিয়া ২১/৭৮-৭৯)। এ ঘটনা আমরাদাঊদ (আঃ)-এর কাহিনীতে বলে এসেছি।(২) পিপীলিকার ঘটনা : হযরত সুলায়মান (আঃ) একদা তাঁরবিশাল সেনাবাহিনী সহ একটি এলাকা অতিক্রম করছিলেন। ঐ সময় তাঁর সাথে জিন, মানুষপক্ষীকুল ছিল। যে এলাকা দিয়ে তাঁরা যাচ্ছিলেনসে এলাকায় বালির ঢিবি সদৃশ পিপীলিকাদের বহুবসতঘর ছিল। সুলায়মান বাহিনীকে আসতে দেখে পিপীলিকাদের সর্দার তাদেরকে বলল,তোমরা শীঘ্র পালাও। নইলে পাদপিষ্ট হয়ে শেষ হয়ে যাবে। সুলায়মান (আঃ)পিপীলিকাদের এই বক্তব্য শুনতে পেলেন। এ বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা নিম্নরূপ: ﻭَﻭَﺭِﺙَﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥُ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﻋُﻠِّﻤْﻨَﺎ ﻣَﻨﻄِﻖَ ﺍﻟﻄَّﻴْﺮِ ﻭَﺃُﻭﺗِﻴﻨَﺎﻣِﻦ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﻟَﻬُﻮَ ﺍﻟْﻔَﻀْﻞُﺍﻟْﻤُﺒِﻴﻦُ- ﻭَﺣُﺸِﺮَ ﻟِﺴُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﺟُﻨُﻮﺩُﻩُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﻭَﺍﻟْﺈِﻧﺲِ ﻭَﺍﻟﻄَّﻴْﺮِ ﻓَﻬُﻢْ ﻳُﻮﺯَﻋُﻮﻥَ – ﺣَﺘَّﻰ ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺗَﻮْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﻭَﺍﺩِﻱﺍﻟﻨَّﻤْﻞِ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﻧَﻤْﻠَﺔٌ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﻤْﻞُ ﺍﺩْﺧُﻠُﻮﺍ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨَﻜُﻢْ ﻻَ ﻳَﺤْﻄِﻤَﻨَّﻜُﻢْ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥُ ﻭَﺟُﻨُﻮﺩُﻩُ ﻭَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭﻥَ-ﻓَﺘَﺒَﺴَّﻢَ ﺿَﺎﺣِﻜﺎً ﻣِّﻦ ﻗَﻮْﻟِﻬَﺎ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّ ﺃَﻭْﺯِﻋْﻨِﻲ ﺃَﻥْ ﺃَﺷْﻜُﺮَ ﻧِﻌْﻤَﺘَﻚَ ﺍﻟَّﺘِﻲ ﺃَﻧْﻌَﻤْﺘَﻌَﻠَﻲَّ ﻭَﻋَﻠَﻰ ﻭَﺍﻟِﺪَﻱَّ ﻭَﺃَﻥْ ﺃَﻋْﻤَﻞَﺻَﺎﻟِﺤﺎً ﺗَﺮْﺿَﺎﻩُ ﻭَﺃَﺩْﺧِﻠْﻨِﻲ ﺑِﺮَﺣْﻤَﺘِﻚَ ﻓِﻲ ﻋِﺒَﺎﺩِﻙَ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴﻦَ – ‏( ﻧﻤﻞ ১৬-১৯)-‘সুলায়মান দাঊদেরস্থলাভিষিক্ত হ’ল এবং বলল, হে লোকসকল! আমাদেরকে পক্ষীকুলের ভাষা শিক্ষা দেওয়াহয়েছে এবং আমাদেরকে সবকিছু দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এটি একটি সুস্পষ্টশ্রেষ্ঠত্ব’ (নমল ১৬)। ‘অতঃপর সুলায়মানের সম্মুখে তারসোনাবাহিনীকে সমবেত করা হ’লজিন, মানুষ ও পক্ষীকুলকে। তারপর তাদেরকে বিভিন্ন ব্যুহে বিভক্ত করা হ’ল’ (১৭)। ‘অতঃপরযখন তারা একটি পিপীলিকা অধ্যুষিত এলাকায় উপনীত হ’ল, তখন এক পিপীলিকা বলল, ‘হেপিপীলিকা দল! তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর। অন্যথায় সুলায়মান ও তার বাহিনীঅজ্ঞাতসারে তোমদেরকে পিষ্ট করে ফেলবে’ (১৮)। ‘তার কথা শুনে সুলায়মান মুচকিহাসল এবং বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমাকে ক্ষমতা দাও, যেন আমি তোমারনে‘মতেরশুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছ এবং যাতে আমিতোমার পসন্দনীয় সৎকর্মাদি করতে পারি এবং তুমি আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমারসৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর’ (নমল ২৭/১৬-১৯)।উপরোক্ত আয়াতগুলিতেপ্রমাণিত হয় যে, সুলায়মান (আঃ) কেবল পাখির ভাষা নয়, বরং সকল জীবজন্তু এমনকি ক্ষুদ্রপিঁপড়ার কথাও বুঝতেন। এজন্য তিনি মোটেই গর্ববোধ না করে বরং আল্লাহর অনুগ্রহেরপ্রতি শুকরিয়া আদায় করেন এবং নিজেকে যাতে আল্লাহ অন্যান্য সৎকর্মশীলদেরঅন্তর্ভুক্ত করেন সে প্রার্থনা করেন। এখানে আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, তিনিকেবল জিন-ইনসানের নয় বরং তাঁর সময়কার সকল জীবজন্তুরও নবী ছিলেন। তাঁর নবুঅতকেসবাই স্বীকার করত এবং সকলে তাঁর প্রতি আনুগত্য পোষণ করত। যদিও জিন ও ইনসানব্যতীত অন্য প্রাণী শরী‘আত পালনের হকদার নয়।(৩) ‘হুদহুদ’ পাখির ঘটনা : হযরত সুলায়মান(আঃ) আল্লাহর হুকুমে পক্ষীকুলের আনুগত্য লাভ করেন। একদিন তিনি পক্ষীকুলকেডেকে একত্রিত করেন ও তাদের ভাল-মন্দ খোঁজ-খবর নেন। তখন দেখতে পেলেনযে, ‘হুদহুদ’ পাখিটা নেই। তিনি অনতিবিলম্বে তাকে ধরে আনার জন্যকড়া নির্দেশ জারিকরলেন। সাথে তার অনুপস্থিতির উপযুক্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করলেন। উক্ত ঘটনাকুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ: ﻭَﺗَﻔَﻘَّﺪَ ﺍﻟﻄَّﻴْﺮَ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﻣَﺎ ﻟِﻲَ ﻻَ ﺃَﺭَﻯ ﺍﻟْﻬُﺪْﻫُﺪَ ﺃَﻡْ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻐَﺎﺋِﺒِﻴﻦَ- ﻟَﺄُﻋَﺬِّﺑَﻨَّﻪُﻋَﺬَﺍﺑﺎً ﺷَﺪِﻳﺪﺍً ﺃَﻭْ ﻟَﺄَﺫْﺑَﺤَﻨَّﻪُ ﺃَﻭْ ﻟَﻴَﺄْﺗِﻴَﻨِّﻲ ﺑِﺴُﻠْﻄَﺎﻥٍ ﻣُّﺒِﻴﻦٍ – ﻓَﻤَﻜَﺚَ ﻏَﻴْﺮَ ﺑَﻌِﻴﺪٍ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺃَﺣَﻄْﺖُ ﺑِﻤَﺎ ﻟَﻢْ ﺗُﺤِﻂْ ﺑِﻪِﻭَﺟِﺌْﺘُﻚَ ﻣِﻦْ ﺳَﺒَﺈٍ ﺑِﻨَﺒَﺈٍ ﻳَّﻘِﻴﻦٍ – ‏( ﻧﻤﻞ ২০-২২)-‘সুলায়মান পক্ষীকুলের খোঁজ-খবরনিল। অতঃপর বলল,কি হ’ল হুদহুদকে দেখছি না যে? না-কি সে অনুপস্থিত’(নমল ২০)। সে বলল, ‘আমি অবশ্যইতাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা যবহ করব অথবা সে উপস্থিত করবে উপযুক্ত কারণ’ (২১)।‘কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ এসে হাযির হয়ে বলল,(হে বাদশাহ!) আপনি যে বিষয়ে অবগতনন, আমিতা অবগত হয়েছি। আমি আপনার নিকটে ‘সাবা’ থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি’ (নমল২৭/২০-২২)।এ পর্যন্ত বলেই সে তার নতুন আনীতসংবাদের রিপোর্ট পেশ করল।হুদহুদের মাধ্যমে একথা বলানোর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে একথা জানিয়ে দিলেনযে, নবীগণ গায়েবের খবর রাখেন না। তাঁরা কেবল অতটুকুই জানেন, যতটুকু আল্লাহতাদেরকে অবহিত করেন।উল্লেখ্য যে, ‘হুদহুদ’ এক জাতীয় ছোট্ট পাখির নাম। যাপক্ষীকুলেরমধ্যে অতীব ক্ষুদ্র ও দুর্বল এবং যার সংখ্যাও দুনিয়াতে খুবইকম। বর্ণিতআছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) একদা নও মুসলিম ইহুদী পন্ডিত আব্দুল্লাহ বিনসালাম (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন, এতসব পাখী থাকতে বিশেষভাবে ‘হুদহুদ’ পাখির খোঁজনেওয়ার কারণ কি ছিল? জওয়াবে তিনি বলেন, সুলায়মান (আঃ) তাঁর বিশাল বাহিনীসহ ঐসময় এমনএক অঞ্চলে ছিলেন, যেখানে পানি ছিল না। আল্লাহ তা‘আলা হুদহুদ পাখিকে এই বৈশিষ্ট্য দানকরেছেনযে, সে ভূগর্ভের বস্ত্ত সমূহকে এবং ভূগর্ভে প্রবাহিত পানি উপর থেকেদেখতে পায়। হযরত সুলায়মান (আঃ) হুদহুদকে এজন্যেই বিশেষভাবে খোঁজ করছিলেনযে, এতদঞ্চলে কোথায় মরুগর্ভে পানি লুক্কায়িত আছে, সেটা জেনে নিয়ে সেখানেজিন দ্বারা খনন করে যাতে দ্রুত পানি উত্তোলনের ব্যবস্থা করা যায়’। একদা হযরত আব্দুল্লাহইবনে আববাস (রাঃ) ‘হুদহুদ’ পাখি সম্পর্কে বর্ণনা করছিলেন। তখন নাফে‘ ইবনুল আযরক্বতাঁকে বলেন, ﻗِﻒْ ﻳﺎ ﻭَﻗَّﺎﻑُ ! ﻛﻴﻒ ﻳَﺮَﻯ ﺍﻟﻬﺪﻫﺪُ ﺑﺎﻃﻦَ ﺍﻷﺭﺽِ ﻭﻫﻮ ﻻ ﻳَﺮَﻯ ﺍﻟْﻔَﺦَّ ﺣِﻴْﻦَ ﻳَﻘَﻊُﻓﻴﻪ-‘জেনে নিন হে মহা জ্ঞানী! হুদহুদ পাখি মাটির গভীরে দেখতে পায়। কিন্তু (তাকেধরার জন্য) মাটির উপরে বিস্তৃত জাল সে দেখতে পায় না। যখন সে তাতে পতিত হয়’।জবাবেইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ﺇﺫﺍ ﺟﺎﺀ ﺍﻟﻘَﺪَﺭُﻋَﻤِﻰَ ﺍﻟﺒَﺼَﺮُ ‘যখন তাক্বদীর এসে যায়, চক্ষুঅন্ধ হয়ে যায়’। চমৎকার এ জবাবে মুগ্ধ হয়ে ইবনুল ‘আরাবী বলেন, ﻻﻳَﻘْﺪِﺭُ ﻋﻠﻰ ﻫﺬﺍﺍﻟﺠﻮﺍﺏِ ﺇﻻ ﻋﺎﻟِﻢُ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥِ ‘এরূপ জওয়াব দিতে কেউ সক্ষম হয় না, কুরআনের আলেমব্যতীত’।[5](৪) রাণী বিলক্বীসের ঘটনা : হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর শাম ও ইরাক সাম্রাজ্যেরপার্শ্ববর্তী ইয়ামন তথা ‘সাবা’ রাজ্যের রাণী ছিলেন বিলক্বীস বিনতুস সারাহ বিন হাদাহিদ বিনশারাহীল। তিনি ছিলেন সাম বিন নূহ (আঃ)-এর ১৮তম অধঃস্তন বংশধর। তাঁর ঊর্ধ্বতন ৯ম পিতামহেরনাম ছিল ‘সাবা’।[6] সম্ভবতঃ তাঁর নামেই ‘সাবা’ সাম্রাজ্যের নামকরণ হয়।আল্লাহ তাদের সামনেজীবনোপকরণের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং নবীগণের মাধ্যমে এসবনে‘মতের শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তারা ভোগ-বিলাসে মত্তহয়ে আল্লাহর অবাধ্য হয় এবং ‘সূর্য পূজারী’ হয়ে যায়। ফলে তাদের উপরে প্লাবণেরআযাব প্রেরিত হয় ও সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহসূরা সাবা ১৫ হ’তে ১৭ আয়াতে এইসম্প্রদায় সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।দুনিয়াবী দিক দিয়ে এই ‘সাবা’ সাম্রাজ্য খুবইসমৃদ্ধ এবং শান-শওকতে পূর্ণ ছিল। তাদের সম্পর্কে হযরত সুলায়মানের কিছু জানা ছিল নাবলেই কুরআনী বর্ণনায় প্রতীয়মান হয়। তাঁর এই না জানাটা বিস্ময়কর কিছু ছিল না। ইয়াকূব (আঃ)তাঁর বাড়ীর অনতিদূরে তাঁর সন্তান ইউসুফকে কূয়ায় নিক্ষেপের ঘটনা জানতে পারেননি।স্ত্রী আয়েশার গলার হারটি হারিয়ে গেল। অথচ স্বামী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তা জানতে পারেননি।বস্ত্ততঃ আল্লাহ যতটুকু ইল্ম বান্দাকে দেন, তার বেশী জানার ক্ষমতা কারু নেই।পার্শ্ববর্তী ‘সাবা’ সাম্রাজ্য সম্পর্কে পূর্বে না জানা এবং পরে জানার মধ্যে যে কি মঙ্গলনিহিত ছিল, তা পরবর্তী ঘটনাতেই প্রমাণিত হয়েছে এবং রাণী বিলক্বীস মুসলমান হয়ে যান।বস্ত্ততঃ হুদহুদ পাখি তাদের সম্পর্কে হযরত সুলায়মানের নিকটে এসে প্রথম খবর দেয়। তারবর্ণিত প্রতিবেদনটি ছিল কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ : ﺇِﻧِّﻲ ﻭَﺟَﺪﺕُّ ﺍﻣْﺮَﺃَﺓً ﺗَﻤْﻠِﻜُﻬُﻢْ ﻭَﺃُﻭﺗِﻴَﺖْ ﻣِﻨﻜُﻞِّﺷَﻲْﺀٍ ﻭَﻟَﻬَﺎ ﻋَﺮْﺵٌ ﻋَﻈِﻴﻢٌ – ﻭَﺟَﺪْﺗُﻬَﺎ ﻭَﻗَﻮْﻣَﻬَﺎ ﻳَﺴْﺠُﺪُﻭﻥَ ﻟِﻠﺸَّﻤْﺲِ ﻣِﻦ ﺩُﻭﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺯَﻳَّﻦَ ﻟَﻬُﻢُ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﺃَﻋْﻤَﺎﻟَﻬُﻢْﻓَﺼَﺪَّﻫُﻢْ ﻋَﻦِ ﺍﻟﺴَّﺒِﻴﻞِ ﻓَﻬُﻢْ ﻻَ ﻳَﻬْﺘَﺪُﻭﻥَ – ‏( ﻧﻤﻞ ২৩-২৪)-‘আমি এক মহিলাকে সাবা বাসীদের উপরেরাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেওয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসনআছে’ (২৩)। ‘আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকেসিজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলীকে সুশোভিত করেছে। অতঃপরতাদেরকে সত্যপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। ফলে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হয় না’ (নমল২৭/২৩-২৪)।সুলায়মান বলল, ﻗَﺎﻝَ ﺳَﻨَﻨْﻈُﺮُ ﺃَﺻَﺪَﻗْﺖَ ﺃَﻡْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻜَﺎﺫِﺑِﻴْﻦَ ‏( 27 ‏) ﺍﺫْﻫَﺐْ ﺑِﻜِﺘَﺎﺑِﻲْ ﻫَﺬَﺍ ﻓَﺄَﻟْﻘِﻪْﺇِﻟَﻴْﻬِﻢْ ﺛُﻢَّ ﺗَﻮَﻝَّ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﻓَﺎﻧْﻈُﺮْ ﻣَﺎﺫَﺍ ﻳَﺮْﺟِﻌُﻮْﻥَ ‏(28 ‏) ﻗَﺎﻟَﺖْ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟْﻤَﻠَﺄُﺇِﻧِّﻲ ﺃُﻟْﻘِﻲَ ﺇِﻟَﻲَّ ﻛِﺘَﺎﺏٌ ﻛَﺮِﻳْﻢٌ ‏( 29 ‏) ﺇِﻧَّﻪُﻣِﻦْ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻭَﺇِﻧَّﻪُ ﺑِﺴْﻢِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤٰﻨِﺎﻟﺮَّﺣِﻴْﻢِ ‏(30 ‏) ﺃَﻻَّ ﺗَﻌْﻠُﻮﺍ ﻋَﻠَﻲَّ ﻭَﺃْﺗُﻮْﻧِﻲ ﻣُﺴْﻠِﻤِﻴْﻦَ ‏( 31 ‏) ﻗَﺎﻟَﺖْ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎﺍﻟْﻤَﻠَﺄُ ﺃَﻓْﺘُﻮْﻧِﻲْ ﻓِﻲْ ﺃَﻣْﺮِﻱْ ﻣَﺎ ﻛُﻨْﺖُ ﻗَﺎﻃِﻌَﺔً ﺃَﻣْﺮًﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﺗَﺸْﻬَﺪُﻭْﻥِ ‏(32 ‏) ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﻧَﺤْﻦُ ﺃُﻭْﻟُﻮْ ﻗُﻮَّﺓٍ ﻭَﺃُﻭْﻟُﻮْ ﺑَﺄْﺱٍﺷَﺪِﻳْﺪٍ ﻭَﺍﻟْﺄَﻣْﺮُ ﺇِﻟَﻴْﻚِ ﻓَﺎﻧْﻈُﺮِﻱْ ﻣَﺎﺫَﺍ ﺗَﺄْﻣُﺮِﻳْﻦَ ‏( 33 ‏) ﻗَﺎﻟَﺖْ ﺇِﻥَّ ﺍﻟْﻤُﻠُﻮْﻙَ ﺇِﺫَﺍ ﺩَﺧَﻠُﻮْﺍ ﻗَﺮْﻳَﺔً ﺃَﻓْﺴَﺪُﻭْﻫَﺎ ﻭَﺟَﻌَﻠُﻮﺍ ﺃَﻋِﺰَّﺓَﺃَﻫْﻠِﻬَﺎ ﺃَﺫِﻟَّﺔً ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻳَﻔْﻌَﻠُﻮْﻥَ ‏(34 ‏) ﻭَﺇِﻧِّﻲ ﻣُﺮْﺳِﻠَﺔٌ ﺇِﻟَﻴْﻬِﻢْ ﺑِﻬَﺪِﻳَّﺔٍ ﻓَﻨَﺎﻇِﺮَﺓٌ ﺑِﻢَ ﻳَﺮْﺟِﻊُ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠُﻮْﻥَ ‏( 35 ‏) ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺗُﻤِﺪُّﻭْﻧَﻦِ ﺑِﻤَﺎﻝٍ ﻓَﻤَﺎ ﺁﺗَﺎﻧِﻲَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺧَﻴْﺮٌ ﻣِﻤَّﺎ ﺁﺗَﺎﻛُﻢْ ﺑَﻞْ ﺃَﻧْﺘُﻢْ ﺑِﻬَﺪِﻳَّﺘِﻜُﻢْ ﺗَﻔْﺮَﺣُﻮْﻥَ ‏(36 ‏) ﺍﺭْﺟِﻊْﺇِﻟَﻴْﻬِﻢْ ﻓَﻠَﻨَﺄْﺗِﻴَﻨَّﻬُﻢْ ﺑِﺠُﻨُﻮْﺩٍ ﻻَ ﻗِﺒَﻞَ ﻟَﻬُﻢْ ﺑِﻬَﺎ ﻭَﻟَﻨُﺨْﺮِﺟَﻨَّﻬُﻢْ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﺃَﺫِﻟَّﺔً ﻭَﻫُﻢْ ﺻَﺎﻏِﺮُﻭْﻥَ ‏( 37 ‏) ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟْﻤَﻠَﺄُﺃَﻳُّﻜُﻢْ ﻳَﺄْﺗِﻴْﻨِﻲْ ﺑِﻌَﺮْﺷِﻬَﺎ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﻳَﺄْﺗُﻮﻧِﻲ ﻣُﺴْﻠِﻤِﻴْﻦَ ‏(38 ‏) ﻗَﺎﻝَ ﻋِﻔْﺮِﻳْﺖٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﺃَﻧَﺎ ﺁﺗِﻴْﻚَ ﺑِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮْﻡَﻣِﻦ ﻣَّﻘَﺎﻣِﻚَ ﻭَﺇِﻧِّﻲ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻟَﻘَﻮِﻱٌّ ﺃَﻣِﻴْﻦٌ ‏( 39 ‏) ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻋِﻨْﺪَﻩُ ﻋِﻠْﻢٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏِ ﺃَﻧَﺎ ﺁﺗِﻴْﻚَ ﺑِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥ ﻳَّﺮْﺗَﺪَّﺇِﻟَﻴْﻚَ ﻃَﺮْﻓُﻚَ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺭَﺁﻩُ ﻣُﺴْﺘَﻘِﺮًّﺍﻋِﻨْﺪَﻩُ ﻗَﺎﻝَ ﻫَﺬَﺍ ﻣِﻦْ ﻓَﻀْﻞِ ﺭَﺑِّﻲ ﻟِﻴَﺒْﻠُﻮَﻧِﻲ ﺃَﺃَﺷْﻜُﺮُ ﺃَﻡْ ﺃَﻛْﻔُﺮُ ﻭَﻣَﻦْ ﺷَﻜَﺮَ ﻓَﺈِﻧَّﻤَﺎﻳَﺸْﻜُﺮُ ﻟِﻨَﻔْﺴِﻪِ ﻭَﻣَﻦْ ﻛَﻔَﺮَ ﻓَﺈِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲ ﻏَﻨِﻲٌّ ﻛَﺮِﻳْﻢٌ ‏( 40 ‏) ﻗَﺎﻝَ ﻧَﻜِّﺮُﻭﺍ ﻟَﻬَﺎ ﻋَﺮْﺷَﻬَﺎ ﻧَﻨْﻈُﺮْ ﺃَﺗَﻬْﺘَﺪِﻱ ﺃَﻡْ ﺗَﻜُﻮﻥُﻣِﻨَﺎﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻻَ ﻳَﻬْﺘَﺪُﻭﻥَ ‏(41 ‏) ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَﺕْ ﻗِﻴْﻞَ ﺃَﻫَﻜَﺬَﺍ ﻋَﺮْﺷُﻚِ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﻛَﺄَﻧَّﻪُ ﻫُﻮَ ﻭَﺃُﻭﺗِﻴﻨَﺎ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢَ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻠِﻬَﺎ ﻭَﻛُﻨَّﺎﻣُﺴْﻠِﻤِﻴﻦَ ‏(42 ‏) ﻭَﺻَﺪَّﻫَﺎ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﺗَﻌْﺒُﺪُ ﻣِﻦْ ﺩُﻭْﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺇِﻧَّﻬَﺎ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﻣِﻦْ ﻗَﻮْﻡٍ ﻛَﺎﻓِﺮِﻳْﻦَ ‏( 43 ‏) ﻗِﻴْﻞَ ﻟَﻬَﺎ ﺍﺩْﺧُﻠِﻲْﺍﻟﺼَّﺮْﺣَﻔَﻠَﻤَّﺎ ﺭَﺃَﺗْﻪُ ﺣَﺴِﺒَﺘْﻪُ ﻟُﺠَّﺔً ﻭَﻛَﺸَﻔَﺖْ ﻋَﻦْ ﺳَﺎﻗَﻴْﻬَﺎ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻧَّﻪُ ﺻَﺮْﺡٌ ﻣُﻤَﺮَّﺩٌ ﻣِﻦْ ﻗَﻮَﺍﺭِﻳْﺮَ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﺭَﺏِّ ﺇِﻧِّﻲﻇَﻠَﻤْﺖُ ﻧَﻔْﺴِﻴﻮَﺃَﺳْﻠَﻤْﺖُ ﻣَﻊَ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ِﻟﻠﻪِ ﺭَﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴﻦَ- ‏( ﻧﻤﻞ 44-27 )-‘এখন আমরা দেখব তুমি সত্যবলছ, না তুমি মিথ্যাবাদীদের একজন’ (২৭)। ‘তুমি আমার এই পত্র নিয়ে যাও এবংএটা তাদেরকাছে অর্পণ কর। অতঃপর তাদের কাছ থেকে সরে পড় এবং দেখ, তারা কি জওয়াবদেয়’ (২৮)। ‘বিলক্বীস বলল, হে সভাসদ বর্গ! আমাকে একটি মহিমান্বিত পত্র দেওয়াহয়েছে’ (২৯)। ‘সেই পত্র সুলায়মানের পক্ষ হ’তে এবং তা হ’লএই: করুণাময় কৃপানিধানআল্লাহরনামে (শুরু করছি)’ (৩০)। ‘আমার মোকাবেলায় তোমরা শক্তি প্রদর্শন করো না এবংবশ্যতা স্বীকার করে আমার নিকটে উপস্থিতহও’ (৩১)। ‘বিলক্বীস বলল, হে আমার পারিষদবর্গ! আমাকে আমার কাজে পরামর্শ দিন। আপনাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোনকাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না’ (৩২)। ‘তারা বলল, আমরা শক্তিশালী এবং কঠোর যোদ্ধা। এখনসিদ্ধান্ত আপনার হাতে। অতএব ভেবে দেখুন আপনি আমাদের কি আদেশকরবেন’ (৩৩)।‘রাণী বলল, রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে, তখন তাকেবিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার সম্ভ্রান্ত লোকদের অপদস্থ করে। তারাও এরূপকরবে’ (৩৪)। ‘অতএব আমি তাঁর নিকটে কিছু উপঢৌকন পাঠাই। দেখি, প্রেরিত লোকেরা কিজওয়াব নিয়ে আসে’ (৩৫)। ‘অতঃপর যখন দূত সুলায়মানের কাছে আগমন করল, তখন সুলায়মানবলল, তোমরা কি ধন-সম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন,তা তোমাদের দেওয়া বস্ত্ত থেকে অনেক উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকননিয়ে সুখে থাক’ (৩৬)। ‘ফিরে যাও তাদের কাছে। এখন অবশ্যই আমরা তাদের বিরুদ্ধেসেনাবাহিনী সহ আগমন করব, যার মোকাবেলা করার শক্তি তাদের নেই। আমরা অবশ্যইতাদেরকেঅপদস্থ করে সেখান থেকে বহিষ্কারকরব এবং তারা হবে লাঞ্ছিত’ (৩৭)। ‘অতঃপরসুলায়মান বলল, হে আমার পারিষদবর্গ! তারা আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কেআছবিলক্বীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে?’ (৩৮) ‘জনৈক দৈত্য-জ্বিন বলল, আপনিআপনার স্থান থেকে ওঠারপূর্বেই আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিবান ওবিশ্বস্ত’ (৩৯)। ‘(কিন্তু) কিতাবের জ্ঞান যার ছিল সে বলল, তোমার চোখের পলক ফেলারপূর্বেই আমি তা এনে দিব। অতঃপর সুলায়মান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখল, তখন বলল, এটাআমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি শুকরিয়া আদায় করি, নাঅকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্য তাকরে থাকে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্তও কৃপাময়’(নমল ৪০)।‘সুলায়মান বলল, বিলক্বীসের সিংহাসনের আকৃতি বদলিয়ে দাও, দেখব সেসঠিক বস্ত্ত চিনতে পারে,না সে তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা সঠিক পথ খুঁজে পায় না?’ (৪১)‘অতঃপর যখন বিলক্বীস এসে গেল, তখনতাকে জিজ্ঞেস করা হ’ল: আপনার সিংহাসন কিএরূপই? সে বলল, মনে হয় এটা সেটিই হবে। আমরা পূর্বেই সবকিছু অবগত হয়েছি এবংআমরাআজ্ঞাবহ হয়ে গেছি’ (৪২)। ‘বস্ত্ততঃ আল্লাহর পরিবর্তে সে যার উপাসনা করত, সেই-ইতাকে ঈমান থেকে বিরত রেখেছিল। নিশ্চয়ই সেকাফের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তছিল’ (৪৩)। ‘তাকে বলা হ’ল, প্রাসাদে প্রবেশ করুন। অতঃপর যখন সে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করল,তখন ধারণা করল যে, এটা স্বচ্ছ গভীর জলাশয়। ফলেসে তার পায়ের গোছা খুলেফেলল। সুলায়মান বলল, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ। বিলক্বীস বলল, হে আমারপালনকর্তা! আমি তো নিজের প্রতি যুলুম করেছি। আমি সুলায়মানের সাথে বিশ্বজাহানেরপালনকর্তা আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণ করলাম’ (নমল ২৭/২৭-৪৪)।সূরা নমল ২২ হ’তে ৪৪আয়াত পর্যন্ত উপরে বর্ণিত ২৩টি আয়াতে রাণী বিলক্বীসের কাহিনী শেষ হয়েছে।এর মধ্যে ৪০তম আয়াতে ‘যার কাছে কিতাবের জ্ঞান ছিল’ বলে কাকে বুঝানো হয়েছে,এ বিষয়ে তাফসীরবিদগণ মতভেদ করেছেন। তার মধ্যে প্রবল মত হ’ল এই যে, তিনিছিলেন স্বয়ং হযরত সুলায়মান (আঃ)। কেননা আল্লাহর কিতাবের সর্বাধিক জ্ঞান তাঁরই ছিল। তিনি এরদ্বারা উপস্থিত জিন ও মানুষ পারিষদ বর্গকে বুঝিয়ে দিলেন যে, তোমাদের সাহায্য ছাড়াওআল্লাহ অন্যের মাধ্যমে অর্থাৎ ফেরেশতাদের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করে থাকেন।‘আর এটি হ’ল আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ’ (নমল ৪০)। দ্বিতীয়তঃ গোটা ব্যাপারটাই ছিল একটামু‘জেযা এবং রাণী বিলক্বীসকে আল্লাহর সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদর্শন করাই ছিল তাঁরউদ্দেশ্য। বস্ত্ততঃ এতে তিনি সফল হয়েছিলেন এবং সুদূর ইয়ামনথেকে বায়তুল মুক্বাদ্দাসেবিলক্বীস তার সিংহাসনের আগাম উপস্থিতি দেখে অতঃপর স্ফটিক স্বচ্ছ প্রাসাদেপ্রবেশকালে অনন্য কারুকার্য দেখে এবং তার তুলনায় নিজের ক্ষমতা ও প্রাসাদের দীনতাবুঝে লজ্জিত ও অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর তিনি আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণকরে মুসলমান হয়ে যান। মূলতঃ এটাই ছিল হযরত সুলায়মানের মূল উদ্দেশ্য, যা শতভাগ সফলহয়েছিল।এর পরবর্তী ঘটনাবলী, যা বিভিন্ন তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে যেমন সুলায়মানেরসাথে বিলক্বীসের বিবাহ হয়েছিল। সুলায়মান তার রাজত্ব বহাল রেখে ইয়ামনে পাঠিয়েদেন। প্রতি মাসে সুলায়মান একবার করে সেখানে যেতেন ও তিনদিন করে থাকতেন। তিনিসেখানে বিলক্বীসের জন্য তিনটি নযীরবিহীন প্রাসাদ নির্মাণ করে দেন- ইত্যাদি সবকথাইধারণা প্রসূত। যার কোন বিশুদ্ধ ভিত্তি নেই।জনৈক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উৎবাকেজিজ্ঞেস করেন, সুলায়মান (আঃ)-এর সাথে বিলক্বীসের বিয়ে হয়েছিল কি? জওয়াবে তিনিবলেন, বিলক্বীসের বক্তব্য ﻭَﺃَﺳْﻠَﻤْﺖُ ﻣَﻊَ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ِﻟﻠﻬِﺮَﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ ‘আমি সুলায়মানের সাথেবিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণ করলাম’ (নমল ৪৪)-এ পর্যন্তই শেষহয়ে গেছে। কুরআন এর পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চুপ রয়েছে। অতএব আমাদেরএ বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন নেই (তাফসীর বাগাভী)।(৫) অশ্ব কুরবানীর ঘটনা:পিতা দাঊদের ন্যায় পুত্র সুলায়মানকেও আল্লাহ বারবার পরীক্ষায় ফেলেছেন তাকে সর্বদাআল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনশীল রাখার জন্য। ফলে তাঁর জীবনের এক একটি পরীক্ষা একএকটি ঘটনার জন্ম দিয়েছে। কুরআন সেগুলির সামান্য কিছু উল্লেখ করেছে, যতটুকুআমাদের উপদেশ হাছিলের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু পথভ্রষ্ট ইহুদী-নাছারা পন্ডিতগণ সেইসব ঘটনার উপরে রং চড়িয়ে এবং নিজেদের পক্ষ থেকে উদ্ভট সব গল্পের অবতারণাকরে তাদেরই স্বগোত্র বনু ইস্রাঈলের এইসব মহান নবীগণের চরিত্র হনন করেছে।মুসলিম উম্মাহ বিগত সকল নবীকে সমানভাবে সম্মান করে। তাইইহুদী-নাছারাদের অপপ্রচারথেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখে এবং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বর্ণনারউপরে নির্ভর করে। সেখানে যতটুকু পাওয়া যায়, তার উপরেই তারা বাক সংযত রাখে।আলোচ্যঅশ্ব কুরবানীর ঘটনাটি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বর্ণনা নিম্নরূপ : ﺇِﺫْ ﻋُﺮِﺽَ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺑِﺎﻟْﻌَﺸِﻲِّﺍﻟﺼَّﺎﻓِﻨَﺎﺕُ ﺍﻟْﺠِﻴَﺎﺩُ- ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺇِﻧِّﻲْ ﺃَﺣْﺒَﺒْﺖُ ﺣُﺐَّ ﺍﻟْﺨَﻴْﺮِ ﻋَﻦْ ﺫِﻛْﺮِ ﺭَﺑِّﻲْ ﺣَﺘَّﻰ ﺗَﻮَﺍﺭَﺕْ ﺑِﺎﻟْﺤِﺠَﺎﺏِ – ﺭُﺩُّﻭْﻫَﺎ ﻋَﻠَﻲَّﻓَﻄَﻔِﻖَ ﻣَﺴْﺤﺎً ﺑِﺎﻟﺴُّﻮْﻕِ ﻭَﺍﻟْﺄَﻋْﻨَﺎﻕِ – ‏( ﺹ ৩১-৩৩)-‘যখন তার সামনে অপরাহ্নে উৎকৃষ্ট অশ্বরাজিপেশ করা হ’ল’ (ছোয়াদ ৩১)। ‘তখন সে বলল, আমি তো আমার প্রভুর স্মরণের জন্যইঘোড়াগুলিকে মহববত করে থাকি (কেননা এর দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ হয়ে থাকে।অতঃপর সে ঘোড়াগুলিকে দৌড়িয়ে দিল,) এমনকি সেগুলি দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেল’ (৩২)।‘(অতঃপর সে বলল,) ঘোড়াগুলিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো। অতঃপর সে তাদের গলায়ও পায়ে (আদর করে) হাত বুলাতে লাগল’ (ছোয়াদ ৩৮/৩১-৩৩)।উপরোক্ত তরজমাটি ইবনুআববাস (রাঃ)-এর ব্যাখ্যার অনুসরণে ইবনুজারীরের গৃহীত ব্যাখ্যার অনুকূলে করা হয়েছে।অনেকে উপরোক্ত তাফসীরের সাথে বিভিন্ন কথা যোগ করেছেন। যেমন ঘোড়াপরিদর্শনে মগ্ন হওয়ার কারণে হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর আছরের ছালাত ক্বাযা হয়ে যায়। তাতেতিনি ক্ষু্ব্ধ হয়ে সব ঘোড়া কুরবানী করে দেন। কেউ বলেছেন, তিনি আল্লাহর নিকটেসূর্যকে ফিরিয়ে দেবার আবেদন করেন। সেমতে সূর্যকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং তিনিআছরের ছালাত আদায় করে নেন। তারপর সূর্য অস্তমিত হয়। বস্ত্ততঃ এইসব কথার পক্ষেকুরআন ও ছহীহ হাদীছের কোন দলীল নেই। অতএব এসব থেকে বিরত থাকাইউত্তম।(৬) সিংহাসনের উপরে একটি নিষ্প্রাণ দেহ প্রাপ্তির ঘটনা :আল্লাহ বলেন- ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻓَﺘَﻨَّﺎﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻭَﺃَﻟْﻘَﻴْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻛُﺮْﺳِﻴِّﻪِ ﺟَﺴَﺪﺍً ﺛُﻢَّ ﺃَﻧَﺎﺏَ ‏(ﺹ ৩৪) ‘আমরা সুলায়মানকে পরীক্ষা করলাম এবংরেখে দিলাম তার সিংহাসনের উপর একটি নিষ্প্রাণ দেহ। অতঃপর সে রুজু হ’ল’ (ছোয়াদ৩৮/৩৪)। এ বিষয়ে কুরআনের বর্ণনা কেবল এতটুকুই। এক্ষণে সেই নিষ্প্রাণ দেহটিকিসের ছিল, একে সিংহাসনের উপর রাখার হেতু কি ছিল, এর মাধ্যমে কি ধরনের পরীক্ষা হ’ল-এসব বিবরণ কুরআন বা ছহীহ হাদীছে কিছুই বর্ণিত হয়নি। অতএব এ বিষয়ে কেবল এতটুকুঈমান রাখা কর্তব্য যে, সুলায়মান (আঃ) এভাবে পরীক্ষায় পতিত হয়েছিলেন। যার ফলে তিনিআল্লাহর প্রতি আরো বেশী রুজু হন ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যা সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতিতাঁর অটুট আনুগত্যের পরিচয় বহনকরে।উক্ত ঘটনাকে রং চড়িয়ে ইস্রাঈলী রেওয়ায়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, সুলায়মানের রাজত্বের গুঢ় রহস্য তার আংটির মধ্যে নিহিত ছিল।একদিন এক শয়তান তাঁর আংটিটা হাতিয়ে নেয় এবং নিজেই সুলায়মান সেজে সিংহাসনে বসে।এদিকে আংটি হারা সুলায়মান (আঃ) সিংহাসন হারিয়ে পথে পথে ঘুরতে থাকেন। একদিন ঘটনাক্রমেএকটি মাছের পেট থেকে সুলায়মান উক্ত আংটি উদ্ধার করেন ও চল্লিশ দিন পর পুনরায় সিংহাসনলাভ করেন’। সিংহাসনে বসা ঐ শয়তানের রাখা কোন বস্ত্তকে এখানে আল্লাহ নিষ্প্রাণ দেহবলেছেন।বস্ত্ততঃ এসবই বানোয়াট কাহিনী। ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, আহলে কিতাবেরএকটি দল হযরত সুলায়মান (আঃ)-কে নবী বলেই স্বীকার করে না। বাহ্যতঃ এসব কাহিনীতাদেরই অপকীর্তি’।(৭) ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার ফল :ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে এ বিষয়েবর্ণিত ঘটনার সারমর্ম এই যে, একবার হযরত সুলায়মান (আঃ) এ মনোভাব ব্যক্ত করলেন যে,রাত্রিতে আমি (আমার ৯০ বা ১০০) সকল স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হব। যাতে প্রত্যেকের গর্ভথেকে একটিকরে পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেও পরে তারা আল্লাহর পথে ঘোড় সওয়ারহয়ে জিহাদ করবে। কিন্তুএ সময় তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ (অর্থঃ ‘যদি আল্লাহ চান’) বলতে ভুলেগেলেন। নবীর এ ত্রুটি আল্লাহ পসন্দ করলেন না। ফলে মাত্র একজন স্ত্রীর গর্ভথেকে একটি অপূর্ণাঙ্গ ও মৃত শিশু ভূমিষ্ট হ’ল’।[7] এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, সুলায়মানবিশ্বের সর্বাধিকক্ষমতাসম্পন্ন বাদশাহ হ’লেও এবংজিন, বায়ু, পক্ষীকুল ও সকল জীবজন্তুতাঁর হুকুম বরদার হ’লেও আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত তার কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না। অতএব তাঁর‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে ভুলে যাওয়াটা ছোটখাট কোন অপরাধ নয়।এ ঘটনায় এটাও স্পষ্ট হয় যে,যারা যত বড় পদাধিকারী হবেন, তাদের ততবেশী আল্লাহর অনুগত হ’তে হবে এবংসর্বাবস্থায় সকল কাজে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। সর্বদা বিনীত হয়ে চলতেহবে এবং কোন অবস্থাতেই অহংকার করা চলবে না।অনেক তাফসীরবিদ সূরা ছোয়াদ ৩৪আয়াতে বর্ণিত ‘সিংহাসনের উপরে নিষ্প্রাণ দেহ’ রাখার ঘটনার সাথে কিছুটা সাদৃশ্য দেখেছহীহ বুখারীতে বর্ণিত উপরোক্ত ঘটনাকে উক্ত আয়াতের তাফসীর হিসাবে সাব্যস্তকরেছেন। তারা বলেন যে, সিংহাসনে নিষ্প্রাণ দেহ রাখার অর্থ এই যে, সুলায়মান(আঃ)-এরজনৈক চাকর উক্ত মৃত সন্তানকে এনে তাঁর সিংহাসনে রেখে দেয়। এতে সুলায়মান (আঃ)বুঝে নেন যে, এটা তাঁর ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার ফল। সেমতে তিনি আল্লাহর দিকে রুজুহ’লেন ও ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ক্বাযী আবুস সাঊদ, আল্লামা আলূসী, আশরাফআলীথানভী প্রমুখ এ তাফসীর বর্ণনা করেছেন। এতদ্ব্যতীত ইমাম রাযীও আরেকটিতাফসীর করেছেন যে, সুলায়মান (আঃ) একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে এমন দুর্বল হয়ে পড়েনযে, সিংহাসনে বসালে তাঁকে নিষ্প্রাণ দেহ বলে মনে হ’ত। পরে সুস্থ হ’লে তিনিআল্লাহরদিকে রুজু হন…। এ তাফসীর একেবারেই অনুমান ভিত্তিক। কুরআনী বর্ণনার সাথেএর কোন মিল নেই।প্রকৃত প্রস্তাবে ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত ঘটনাকে উক্ত আয়াতেরঅকাট্ট তাফসীর বলা যায়না। কেননা এ ঘটনায় বর্ণিত রেওয়ায়াত সমূহের কোনটাতেই এরূপইঙ্গিত পাওয়া যায় না যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলোচ্য ঘটনাটিকে উক্ত আয়াতের তাফসীর হিসাবেবর্ণনা করেছেন। সম্ভবতঃ এ কারণেই অত্র হাদীছটি ছহীহ বুখারীর ‘জিহাদ’ ‘আম্বিয়া’‘শপথসমূহ’ প্রভৃতি অধ্যায়ে একাধিক সনদে আনা হ’লেও সূরা ছোয়াদের উপরোক্ত ৩৪আয়াতের তাফসীরে ইমাম বুখারী আনেননি। এতে বুঝা যায় যে, ইমাম বুখারীর মতেওআলোচ্য হাদীছটি উক্ত আয়াতের তাফসীর নয়। বরং রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) অন্যান্য পয়গম্বরেরযেমন বহু ঘটনা বর্ণনা করেছেন, এটাও তেমনি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র। এটা কোনআয়াতের তাফসীর নয়।বস্ত্ততঃ কুরআন পাকে এই ঘটনা উল্লেখ করার আসল উদ্দেশ্য হ’লমানুষকে একথা বুঝানো যে, তারা কোন বিপদাপদে বা পরীক্ষায় পতিতহ’লে যেনপূর্বাপেক্ষা অধিকভাবেআল্লাহর দিকে রুজু হয়। যেমন সুলায়মান (আঃ) হয়েছিলেন।(৮) হারূতও মারূত ফেরেশতাদ্বয়ের কাহিনী :সুলায়মান (আঃ)-এর রাজত্বকালে বেঈমান জিনেরালোকদের ধোঁকা দিতএই বলে যে, সুলায়মান জাদুর জোরেসবকিছু করেন। তিনি কোননবী নন। শয়তানদের ভেল্কিবাজিতে বহু লোক বিভ্রান্ত হচ্ছিল। এমনকি শেষনবী (ছাঃ)-এরসময়েও যখন তিনি সুলায়মান (আঃ)-এর প্রশংসা করেন, তখন ইহুদী নেতারা বলেছিল,আশ্চর্যের বিষয় যে, মুহাম্মাদ সুলায়মানকে নবীদের মধ্যে শামিল করে হক ও বাতিলেরমধ্যে সংমিশ্রণ ঘটাচ্ছেন। অথচ তিনি ছিলেন একজন জাদুকর মাত্র। কেননাস্বাভাবিকভাবেকোন মানুষ কি বায়ুর পিঠে সওয়ার হয়ে চলতে পারে? (ইবনু জারীর)।এক্ষণে সুলায়মান (আঃ)যে সত্য নবী, তিনি যে জাদুকর নন, জনগণকে সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য এবংনবীগণের মু‘জেযা ও শয়তানদের জাদুর মধ্যে পার্থক্য বুঝাবার জন্য আল্লাহ পাক হারূত ওমারূত নামে দু’জন ফেরেশতাকে ‘বাবেল’ শহরে মানুষের বেশে পাঠিয়ে দেন।‘বাবেল’হ’ল ইরাকের একটি প্রাচীন নগরী, যা ঐসময় জাদু বিদ্যার কেন্দ্র ছিল। ফেরেশতাদ্বয়সেখানে এসে জাদুর স্বরূপ ও ভেল্কিবাজি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে থাকেনএবং জাদুকরদেরঅনুসরণ থেকে বিরত হয়ে যেন সবাই সুলায়মানের নবুঅতের অনুসারী হয়,সেকথা বলতে লাগলেন।জাদু ও মু‘জেযার পার্থক্য এই যে, জাদু প্রাকৃতিক কারণের অধীন।কারণ ব্যতীত জাদু সংঘটিত হয় না। কিন্তু দর্শক সে কারণ সম্পর্কে অবহিত থাকে না বলেইতাতে বিভ্রান্ত হয়। এমনকি কুফরীতে লিপ্ত হয় এবং ঐ জাদুকরকেই সকল ক্ষমতার মালিকবলে ধারণা করতে থাকে। আজকের যুগে ভিডিও চিত্রসহ হাযার মাইল দূরের ভাষণ ঘরে বসেশুনে এবং দেখে যেকোন অজ্ঞ লোকের পক্ষে নিঃসন্দেহে বিভ্রান্তিতে পড়াস্বাভাবিক। তেমনি সেযুগেও জাদুকরদের বিভিন্ন অলৌকিক বস্ত্ত দেখে অজ্ঞ মানুষবিভ্রান্তিতে পড়ত।পক্ষান্তরে মু‘জেযা কোন প্রাকৃতিক কারণের অধীন নয়। বরংতা সরাসরিআল্লাহর নির্দেশে সম্পাদিত হয়। নবী ব্যতীত আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের প্রতি তাঁর ‘কারামত’ বাসম্মান প্রদর্শনের বিষয়টিও একইভাবে সম্পাদিত হয়। এতে প্রাকৃতিক কারণের যেমন কোনসম্পৃক্ততা নেই, তেমনি সম্মানিত ব্যক্তির নিজস্ব কোন ক্ষমতা বা হাত নেই। উভয় বস্ত্তরপার্থক্য বুঝার সহজ উপায় এই যে, মু‘জেযা কেবল নবীগণের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। যারাআল্লাহভীতি, উন্নত চরিত্র মাধুর্য এবং পবিত্র জীবনযাপন সহ সকল মানবিক গুণে সর্বকালেসকলের আদর্শ স্থানীয় হন।আর নবী ও অলীগণের মধ্যে পার্থক্য এই যে, নবীগণপ্রকাশ্যে নবুঅতের দাবী করে থাকেন। কিন্তু অলীগণ কখনোই নিজেকে অলীবলে দাবী করেন না। অলীগণ সাধারণভাবে নেককার মানুষ। কিন্তু নবীগণ আল্লাহরবিশেষভাবে নির্বাচিত বান্দা, যাদেরকে তিনি নবুঅতের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে থাকেন।নবীগণের মু‘জেযা প্রকাশে তাদের নিজস্ব কোন ক্ষমতা বা কৃতিত্ব নেই। পক্ষান্তরেদুষ্ট লোকেরাই জাদুবিদ্যা শিখে ও তার মাধ্যমে নিজেদের দুনিয়া হাছিল করে থাকে।উভয়ের চরিত্র জনগণের মাঝে পরিষ্কারভাবে পার্থক্য সৃষ্টি করে।বস্ত্ততঃ সুলায়মান (আঃ)-এরনবুঅতের সমর্থনেই আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়কেবাবেল শহরে পাঠিয়ে ছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺗَّﺒَﻌُﻮْﺍ ﻣَﺎ ﺗَﺘْﻠُﻮﺍ ﺍﻟﺸَّﻴَﺎﻃِﻴْﻦُ ﻋَﻠَﻰﻣُﻠْﻚِ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻭَﻣَﺎ ﻛَﻔَﺮَ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥُ ﻭَﻟَـﻜِﻦَّ ﺍﻟﺸَّﻴْﺎﻃِﻴْﻦَ ﻛَﻔَﺮُﻭْﺍ ﻳُﻌَﻠِّﻤُﻮْﻥَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﺍﻟﺴِّﺤْﺮَ ﻭَﻣَﺎ ﺃُﻧْﺰِﻝَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻤَﻠَﻜَﻴْﻦِﺑِﺒَﺎﺑِﻞَ ﻫَﺎﺭُﻭْﺕَ ﻭَﻣَﺎﺭُﻭْﺕَ ﻭَﻣَﺎ ﻳُﻌَﻠِّﻤَﺎﻥِ ﻣِﻦْ ﺃَﺣَﺪٍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﻘُﻮْﻻَ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﻓِﺘْﻨَﺔٌ ﻓَﻼَ ﺗَﻜْﻔُﺮْ ﻓَﻴَﺘَﻌَﻠَّﻤُﻮْﻥَ ﻣِﻨْﻬُﻤَﺎ ﻣَﺎﻳُﻔَﺮِّﻗُﻮْﻥَ ﺑِﻪِ ﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟْﻤَﺮْﺀِ ﻭَﺯَﻭْﺟِﻪِ ﻭَﻣَﺎ ﻫُﻢْ ﺑِﻀَﺂﺭِّﻳﻦَ ﺑِﻪِ ﻣِﻦْ ﺃَﺣَﺪٍ ﺇِﻻَّ ﺑِﺈِﺫْﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻳَﺘَﻌَﻠَّﻤُﻮْﻥَ ﻣَﺎ ﻳَﻀُﺮُّﻫُﻢْ ﻭَﻻَﻳَﻨْﻔَﻌُﻬُﻢْ، ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻋَﻠِﻤُﻮْﺍ ﻟَﻤَﻦِ ﺍﺷْﺘَﺮَﺍﻩُ ﻣَﺎ ﻟَﻪُ ﻓِﻲ ﺍﻵﺧِﺮَﺓِ ﻣِﻦْ ﺧَﻼَﻕٍ ﻭَﻟَﺒِﺌْﺲَ ﻣَﺎ ﺷَﺮَﻭْﺍ ﺑِﻪِ ﺃَﻧْﻔُﺴَﻬُﻢْ ﻟَﻮْ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍﻳَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ – ﻭَﻟَﻮْ ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻭﺍﺗَّﻘَﻮْﺍ ﻟَﻤَﺜُﻮْﺑَﺔٌ ﻣِّﻦْ ﻋِﻨْﺪِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺧَﻴْﺮٌ، ﻟَﻮْ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ- ‏(ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ১০২-১০৩)-‘(ইহুদী-নাছারাগণ) ঐ সবের অনুসরণ করে থাকে, যা সুলায়মানের রাজত্বকালেশয়তানরা আবৃত্তি করত। অথচ সুলায়মান কুফরী করেননি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারামানুষকে জাদু বিদ্যা শিক্ষা দিত এবং বাবেল শহরে হারূত ও মারূত দুই ফেরেশতার উপরে যা নাযিলহয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। বস্ত্ততঃ তারা (হারূত-মারূত) উভয়ে একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত নাযে, আমরা এসেছি পরীক্ষা স্বরূপ। কাজেই তুমি (জাদু শিখে) কাফির হয়ো না। কিন্তু তারাতাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যার দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। অথচআল্লাহরআদেশ ব্যতীত তদ্বারা তারা কারু ক্ষতি করতে পারত না। লোকেরা তাদের কাছেশিখত ঐসব বস্ত্ত যা তাদের ক্ষতি করে এবং তাদের কোন উপকার করে না। তারা ভালভাবেইজানে যে, যে কেউ জাদু অবলম্বন করবে, তার জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। যারবিনিময়ে তারা আত্মবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ, যদি তারা জানতো’। ‘যদি তারা ঈমান আনত ওআল্লাহভীরু হ’ত, তবে আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম প্রতিদান পেত, যদি তারা জানত’ (বাক্বারাহ২/১০২-১০৩)।বলা বাহুল্য, সুলায়মান (আঃ)-কে জিন, বায়ু, পক্ষীকুল ও জীবজন্তুর উপরেএকচ্ছত্র ক্ষমতা দান করা ছিল আল্লাহর এক মহা পরীক্ষা। শয়তান ও তাদের অনুসারী দুষ্টলোকেরা সর্বদা এটাকে বস্ত্তবাদী দৃষ্টিতে দেখেছে এবং যুক্তিবাদের ধূম্রজালেপড়ে পথ হারিয়েছে। অথচ আল্লাহর নবী সুলায়মান (আঃ) সর্বদা আল্লাহর নে‘মতের শুকরিয়াআদায় করেছেন। আমরাও তার নবুঅতের প্রতি দ্বিধাহীনভাবে বিশ্বাস স্থাপন করি।(৯) বায়তুলমুক্বাদ্দাস নির্মাণ ও সুলায়মান (আঃ)-এর মৃত্যুর বিস্ময়কর ঘটনা :বায়তুল মুক্বাদ্দাসের নির্মাণসর্বপ্রথম ফেরেশতাদের মাধ্যমে অথবা আদম (আঃ)-এর কোন সন্তানের মাধ্যমেসম্পন্ন হয় কা‘বাগৃহ নির্মাণের চল্লিশ বছর পরে। অতঃপর স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে হযরত ইয়াকূব (আঃ) তাপুনর্নির্মাণ করেন। তার প্রায় হাযার বছর পরে দাঊদ (আঃ) তার পুনর্নির্মাণ শুরু করেন এবং সুলায়মান(আঃ)-এর হাতে তা সমাপ্ত হয়। কিন্তু মূল নির্মাণকাজ শেষ হ’লেও আনুসঙ্গিক কিছু কাজ তখনওবাকী ছিল। এমন সময় হযরত সুলায়মানের মৃত্যুকাল ঘনিয়ে এল। এই কাজগুলি অবাধ্যতাপ্রবণজিনদের উপরে ন্যস্ত ছিল। তারা হযরত সুলায়মানের ভয়ে কাজ করত। তারাতাঁর মৃত্যু সংবাদজানতে পারলে কাজ ফেলে রেখে পালাতো। ফলে নির্মাণ কাজ অসম্পূর্ণ থেকেযেত। তখন সুলায়মান (আঃ) আল্লাহরনির্দেশে মৃত্যুর জন্যে প্রস্ত্তত হয়ে তাঁর কাঁচ নির্মিতমেহরাবে প্রবেশ করলেন। যাতে বাইরে থেকে ভিতরে সবকিছু দেখা যায়। তিনিবিধানানুযায়ী ইবাদতের উদ্দেশ্যে লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে গেলেন, যাতে রূহ বেরিয়েযাবার পরেও লাঠিতে ভর দিয়ে দেহ স্বস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। সেটাই হ’ল। আল্লাহর হুকুমেতাঁর দেহ উক্ত লাঠিতে ভর করে এক বছর দাঁড়িয়ে থাকল। দেহ পচলো না, খসলো না বাপড়ে গেল না। জিনেরা ভয়ে কাছে যায়নি। ফলে তারা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে কাজ শেষকরে ফেলল। এভাবে কাজ সমাপ্ত হ’লে আল্লাহর হুকুমে কিছু উই পোকার সাহায্যে লাঠিভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং সুলায়মান (আঃ)-এর লাশ মাটিতে পড়ে যায়। উক্ত কথাগুলি আল্লাহবলেননিম্নোক্ত ভাবে- ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻗَﻀَﻴْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺍﻟْﻤَﻮْﺕَ ﻣَﺎ ﺩَﻟَّﻬُﻤْﻌَﻠَﻰ ﻣَﻮْﺗِﻪِ ﺇِﻻَّ ﺩَﺍﺑَّﺔُ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺗَﺄْﻛُﻞُ ﻣِﻨْﺴَﺄَﺗَﻪُ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺧَﺮَّﺗَﺒَﻴَّﻨَﺖِ ﺍﻟْﺠِﻦُّ ﺃَﻥ ﻟَّﻮْ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ ﺍﻟْﻐَﻴْﺐَ ﻣَﺎ ﻟَﺒِﺜُﻮْﺍ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ ﺍﻟْﻤُﻬِﻴْﻦِ- ‏( ﺳﺒﺎ ১৪)-‘অতঃপর যখন আমরাসুলায়মানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন ঘুনপোকাই জিনদেরকে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল।সুলায়মানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। অতঃপর যখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন, তখন জিনেরাবুঝতে পারল যে, যদি তারা অদৃশ্য বিষয় জানতো, তাহ’লে তারা (মসজিদ নির্মাণের) এই হাড়ভাঙ্গাখাটুনির আযাবের মধ্যে আবদ্ধ থাকতো না’ (সাবা ৩৪/১৪)। সুলায়মানের মৃত্যুর এই ঘটনা আংশিককুরআনের আলোচ্য আয়াতের এবং আংশিক ইবনে আববাস (রাঃ) প্রমুখ থেকে বর্ণিতহয়েছে (ইবনে কাছীর)।সুলায়মানের এই অলৌকিক মৃত্যু কাহিনীর মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ :(১) মৃত্যুর নির্ধারিত সময় উপস্থিত হ’লে নবী-রাসূল যে-ই হৌন না কেন, এক সেকেন্ডআগপিছ হবে না।(২) আল্লাহ কোন মহান কাজ সম্পন্ন করতে চাইলে যেকোন উপায়ে তাসম্পন্ন করেন। এমনকি মৃত লাশের মাধ্যমেও করতে পারেন।(৩) ইতিপূর্বে জিনেরা বিভিন্নআগাম খবর এনে বলত যে, আমরা গায়েবের খবর জানি। অথচ চোখের সামনেমৃত্যুবরণকারী সুলায়মান (আঃ)-এর খবর তারা জানতে পারেনি এক বছরের মধ্যে। এতেতাদের অদৃশ্য জ্ঞানের দাবী অসার প্রমাণিত হয়।সংশয় নিরসন(১) সুলায়মানের আংটি চুরি ওরাজত্ব হরণ :বাক্বারাহ ১০২ : ﻭَﺍﺗَّﺒَﻌُﻮْﺍ ﻣَﺎ ﺗَﺘْﻠُﻮﺍ ﺍﻟﺸَّﻴَﺎﻃِﻴْﻦُ ﻋَﻠَﻰ ﻣُﻠْﻚِ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ‘এবং সুলায়মানেররাজত্বে শয়তানগণ যা আবৃত্তি করত, তারা (ইহুদীরা) তার অনুসরণ করত’।উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায়তাফসীর জালালাইনে বলা হয়েছে, ﻣﻦ ﺍﻟﺴﺤﺮ، ﻭﻛﺎﻧﺖ ﺩﻓﻨﺘﻪ ﺗﺤﺖ ﻛﺮﺳﻴﻪ ﻟَﻤَّﺎ ﻧُﺰِﻉَ ﻣﻠﻜُﻪ -‘(শয়তানেরা) জাদু হ’তে (আবৃত্তি করত), যা সুলায়মান-এর সিংহাসনেরনীচে তারা দাফন করেছিলতাঁর রাজত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার প্রাক্কালে। আমরা বলি, সুলায়মান (আঃ) একজন জলীলুল ক্বদরনবী ছিলেন। তিনি জাদুকর ছিলেন না বা জাদুর শক্তির বলে তিনি সবকিছুকে অনুগত করেননি।তাঁর সিংহাসনের নীচে কোন জাদুও কেউ লুকিয়ে রাখেনি। তাছাড়া তাঁর রাজত্ব ছিনিয়ে নেবারমত কোন অঘটন ঘটেনি এবং এমন কোন খবরও আল্লাহ বা তাঁর রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকেদেননি। এগুলি নবীগণের মর্যাদার বরখেলাফ এবং স্রেফ ইস্রাঈলী কল্পকাহিনী মাত্র।অতএব উক্ত আয়াত সমূহের প্রকাশ্য অর্থ এই যে, সুলায়মান (আঃ)-এর অতুলনীয় সাম্রাজ্যেঈর্ষান্বিত শয়তানেরা সর্বত্র রটিয়ে দেয় যে, জিন-ইনসান ও পশু-পক্ষী সবার উপরেসুলায়মানের একাধিপত্যের মূল কারণ হ’ল তাঁর পঠিত কিছু কালেমা, যার কিছু কিছু আমরা জানি। যারাএগুলি শিখবে ও তার উপরে আমল করবে, তারাও অনুরূপ ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। তখনলোকেরা ঐসব জাদু বিদ্যা শিখতে ঝুঁকে পড়ল ও তাদের অনুসারী হ’ল এবং কুফরী করতেশুরু করল। বর্ণিত আয়াতে এর প্রতিবাদ করা হয়েছে এবং সুলায়মান (আঃ)-এর নির্দোষিতা ঘোষণাকরা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, সুলায়মান জাদুর বলে নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতাবলে দেশ শাসন করেন। মূল কথা হ’ল, ইহুদীরা সকল নবীকে গালি দিয়েছে এবংসেভাবে সুলায়মান (আঃ)-কেও তোহমত দিয়েছে।(২) হারূত ও মারূতের কাহিনী :একইআয়াতে হারূত ও মারূত দুই ফেরেশতা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। যেখানে মাননীয়তাফসীরকার বলেছেন, ﻗﺎﻝ ﺇﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ : ﻫﻤﺎ ﺳﺎﺣﺮﺍﻥ، ﻛﺎﻧﺎ ﻳﻌﻠﻤﺎﻥ ﺍﻟﺴﺤﺮ – ইবনু আববাস (রাঃ)বলেন, ‘তারা ছিলেন দু’জন জাদুকর। তারা জাদু শিক্ষা দিতেন’। অথচ তাঁরা জাদুকর ছিলেন না। বরংফেরেশতা ছিলেন। যারা কখনোই আল্লাহর অবাধ্য ছিলেন না। জাদুকর বলে তাদের উপরেতোহমত লাগানো হয়েছেমাত্র।এতদ্ব্যতীত বাহরুল মুহীত্ব, বায়যাবী প্রভৃতি তাফসীরগ্রন্থে যেমন বলা হয়েছে যে, (ক) আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা স্বরূপ মানুষ হিসেবেদুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। পরে তারা মানুষের ন্যায় মহাপাপে লিপ্ত হয়। (খ) তখন শাস্তি স্বরূপতাদের পায়ে বেড়ী দিয়ে বাবেল শহরে একটি পাহাড়ের গুহার মধ্যেআটকিয়ে রাখা হয়।যারা যেখানে ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করবে। (গ) আর যে সুন্দরী মেয়েটির সঙ্গেতারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিল, সে মেয়েটি আসমানে ‘যোহরা’ তারকা হিসেবে ক্বিয়ামতপর্যন্ত ঝুলন্ত থাকবে’– এগুলি সব তাফসীরের নামে উদ্ভট গল্প মাত্র, যা সুলায়মানের শত্রুইহুদী-নাছারাদের উর্বর মস্তিষ্কের ফসল ছাড়া কিছুই নয়।মূল ঘটনা এই যে, ঐ সময় ইরাকেরবাবেল বা ব্যবিলন শহর জাদু বিদ্যায় শীর্ষে ছিল। সুলায়মানের বিশাল ক্ষমতাকে শয়তান ও দুষ্টলোকেরা উক্ত জাদু বিদ্যার ফল বলে রটনা করত। তখন নবুঅত ও জাদুর মধ্যে পার্থক্যবুঝানোর জন্য আল্লাহ হারূত ও মারূত নামক দু’জন ফেরেশতাকে সেখানে শিক্ষক হিসাবেমানুষের বেশে পাঠান। তারা লোকদের জাদু বিদ্যার অনিষ্টকারিতা ও নবুঅতের কল্যাণকারিতাসম্পর্কে বুঝাতে থাকেন। কিন্তু লোকেরা অকল্যাণকর বিষয়গুলিই শিখতে চাইত। যাকুরআনের উক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।(৩) সুলায়মানের (আঃ)-এর উপরে প্রদত্ততোহমত :ছোয়াদ ৩৪ : ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻓَﺘَﻨَّﺎ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻭَﺃَﻟْﻘَﻴْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻛُﺮْﺳِﻴِّﻪِ ﺟَﺴَﺪﺍً ﺛُﻢَّ ﺃَﻧَﺎﺏَ ‘আমিসোলায়মানকে পরীক্ষা করলাম এবং তার আসনের উপরে রেখে দিলাম একটি নিষ্প্রাণদেহ। অতঃপর সে বিনত হ’ল।’ এখানে তাফসীরজালালাইনে বলা হয়েছে, ﺍﺑﺘﻠﻴﻨﺎﻩ ﺑﺴﺒﺐ ﻣﻠﻜﻪ،ﻭﺫﻟﻚ ﻟﺘﺰﻭﺟﻪ ﺑﺎﻣﺮﺃﺓ ﻫﻮﺍﻫﺎ، ﻭﻛﺎﻧﺖ ﺗﻌﺒﺪ ﺍﻟﺼﻨﻢ ﻓﻰ ﺩﺍﺭﻩ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﻋﻠﻤﻪ ﻭﻛﺎﻥ ﻣُﻠﻜﻪ ﻓﻰ ﺧﺎﺗﻤﻪ،ﻓﻨﺰﻋﻪ ﻣﺮﺓ ﻋﻨﺪ ﺇﺭﺍﺩﺓﺍﻟﺨﻼﺀ ﻋﻨﺪ ﺃﻣﺮﺃﺓ ﺍﻟﻤﺴﻤﺎﺓ ﺑﺎﻷﻣﻴﻨﺔ ﻋﻠﻰ ﻋﺎﺩﺗﻪ، ﻓﺠﺎﺀﻫﺎ ﺟﻨّﻰ ﻓﻰ ﺻﻮﺭﺓﺳﻠﻴﻤﺎﻥ ﻓﺄﺧﺬﻩ ﻣﻨﻬﺎ … ﺛﻢ ﺃﻧﺎﺏ : ﺭﺟﻊ ﺳﻠﻴﻤﺎﻥ ﺇﻟﻰ ﻣُﻠﻜﻪ ﺑﻌﺪ ﺃﻳﺎﻡ، ﺑﺄﻥ ﻭﺻﻞ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﺨﺎﺗﻢ ﻓﻠﺒﺴﻪﻭﺟﻠﺲ ﻋﻠﻰ ﻛﺮﺳﻴﻪ -‘আমরা তাকে তার রাজত্বের কারণে পরীক্ষা করলাম। সেটা এই যে,তিনিএকজন মহিলাকে বিবাহ করেন, যার প্রতি তিনি আসক্ত হয়েছিলেন। ঐ মহিলা তার গৃহে তারঅগোচরে মূর্তি পূজা করত। আর সুলায়মানের রাজত্ব ছিল তার আংটির কারণে। একদিন তিনিটয়লেটে যাবার সময় অভ্যাসবশতঃ আংটিটি খুলে তাঁর উক্ত স্ত্রী ‘আমীনা’-র নিকটে রেখেযান। এমন সময় একটি জিন সুলায়মানের রূপ ধারণ করে সেখানে উপস্থিত হয় ও তার নিকটথেকে আংটিটি নিয়ে নেয়।…অতঃপর সুলায়মান বেরিয়ে এসে দেখেন তাঁর সিংহাসনেঅন্যজন বসে আছে এবং লোকেরা সবাই তাকে অস্বীকার করে।…‘অতঃপর সে বিনত হ’ল’অর্থাৎ সুলায়মান কিছু দিন পরে তাঁর আংটির নিকটে পৌঁছে যান। অতঃপর আংটি পরিধান করে নিজ রাজআসনে উপবেশন করেন’।আমরা বলি, এই ব্যাখ্যার মধ্যে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে। কেননাএই ব্যাখ্যা দ্বারা নবী ও তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের মর্যাদাহানি করা হয়েছে। যেখানেনবীদের ইয্যতের হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহর, সেখানে এ ধরনের তাফসীর বাতিলপ্রতিপন্ন হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। সুলায়মান (আঃ)-কে আল্লাহ পরীক্ষা করেছিলেনএবং সেপরীক্ষার ফলে তিনি আল্লাহর দিকে অধিকতর রুজু হয়েছিলেন। কুরআন মাজীদে এই ঘটনাআমাদেরকে শুনানোর উদ্দেশ্য হ’ল যাতে আমরাও কোন পরীক্ষায় নিপতিত হ’লেদিশেহারানা হয়ে যেন আল্লাহর দিকে অধিকতর রুজু ও বিনীত হই- একথা বুঝানো। এখানেমূল ঘটনা বর্ণনা করা আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়। তার কোন প্রয়োজনও নেই এবং তার জানারযথার্থ কোন উপায়ও আমাদেরকাছে নেই।এ সম্পর্কে মাননীয় তাফসীরকার যে আংটিরঘটনা উল্লেখ করেছেন, তাছাড়াও তাঁর আংটি শয়তানের করায়ত্ত হওয়া, ৪০দিন পরে তা মাছেরপেট থেকে উদ্ধার করে পুনরায় সিংহাসন ফিরে পাওয়া ইত্যাদি গল্পকে হাফেয ইবনু কাছীরস্রেফ ইস্রাঈলী উপকথা বলেপ্রত্যাখ্যান করেছেন।নবী সুলায়মানের স্বীয়স্ত্রীদের সাথে ঘটনার যে বিবরণ ছহীহ বুখারী সহ অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে এসেছে,সেটিকে ক্বাযী আবুস সঊদ, আল্লামা আলূসী, আশরাফ আলী থানভী প্রমুখমুফাসসিরগণের ন্যায় অনেকে অত্র আয়াতের তাফসীর ভেবেছেন। কিন্তু সেটাও ঠিকনয়। ইমাম বুখারী স্বয়ং উক্ত হাদীছকে অত্র আয়াতের তাফসীরে আনেননি। বরং বিভিন্ননবীর ঘটনা বর্ণনার ন্যায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সুলায়মান নবী সম্বন্ধেও একটি ঘটনাউল্লেখকরেছেন মাত্র। অত্র আয়াতের শানে নুযূল বা ব্যাখ্যা হিসাবে নয়। উল্লেখ্য যে,ই.ফা.বা. ঢাকা-রঅনুবাদের টীকাতেও উক্ত ঘটনাকে অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় আনা হয়েছে (পৃঃ৭৪৪ টীকা ১৪১)। যা নিতান্তই ভুল।সুলায়মান (আঃ)-এর জীবনী থেকে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ:১. নবুঅত ও খেলাফত একত্রে একই ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া সম্ভব।২. ধর্মইরাজনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। ধর্মীয় রাজনীতির মাধ্যমেই পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তিপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।৩. প্রকৃত মহান তিনিই, যিনি সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও অহংকারীহন না। বরং সর্বদা আল্লাহর প্রতি বিনীত থাকেন।৪. শত্রুমুক্ত কোন মানুষ দুনিয়াতে নেই।সুলায়মানের মত একচ্ছত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাদশাহর বিরুদ্ধেও চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ওমিথ্যাচার চালানো হয়েছে।৫. সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে প্রজাসাধারণের কাজ করলেও তারাঅনেক সময় না বুঝে বিরোধিতা করে। যেমন বায়তুল মুক্বাদ্দাস মসজিদের নির্মাণ কাজ সমাপ্তনা হওয়ায় আল্লাহ বাকী সময়ের জন্য সুলায়মানের প্রাণহীন দেহকে লাঠিতে ঠেস দিয়েদাঁড় করিয়ে রাখেন জিন মিস্ত্রী ও জোগাড়েদের ভয় দেখানোর জন্য। যাতে তারা কাজফেলে রেখে চলে না যায় এবং নতুন চক্রান্তে লিপ্ত হবার সুযোগ না পায়।সুলায়মানের মৃত্যুও রাজত্বকাল :সুলায়মান (আঃ) ৫৩ বছর বেঁচেছিলেন। তন্মধ্যে ৪০ বছর তিনি রাজত্ব করেন।তাঁর মৃত্যুরপরে তাঁর পুত্র রাহবা‘আম ( ﺭﺣﺒﻌﺎﻡ ) ১৭ বছর রাজত্ব করেন। অতঃপর বনু ইস্রাঈলেররাজত্ব বিভক্ত হয়ে যায়।[8] সুলায়মান মনছূরপুরীর হিসাব মতে শেষনবী (ছাঃ)-এরআবির্ভাবের প্রায় ১৫৪৬ বছর পূর্বে সুলায়মান (আঃ) মৃত্যুবরণ করেন।[9][1]. যথাক্রমে(১) সূরা বাক্বারাহ ২/১০২; (২) নিসা ৪/১৬৩; (৩) আন‘আম ৬/৮৪; (৪) আম্বিয়া২১/৭৮-৭৯, ৮১-৮২; (৫) নমল ২৭/১৫-৪৪=৩০; (৬) সাবা ৩৪/১২-১৪; (৭)ছোয়াদ ৩৮/৩০-৪০=১১;মোট ৫১টি আয়াত।[2]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৭১৯ ‘ক্বিয়ামতের অবস্থা’ অধ্যায় ‘সৃষ্টিরসূচনা ও নবীগণের আলোচনা’ অনুচ্ছেদ-৯।[3]. কুরতুবী, সাবা ১২ আয়াতের টীকাদ্রষ্টব্য।[4]. মাহমূদ আলূসী (মৃ: ১২৭০হি:), রূহুল মা‘আনী (বৈরুত: দার এহইয়াউত তুরাছিল‘আরাবী, তাবি), তাফসীর সূরা ছোয়াদ ৩৫, ২৩/২০১ পৃ:।[5]. কুরতুবী, তাফসীর সূরা নমল ২০আয়াত।[6]. কুরতুবী, তাফসীর সূরা নমল ৪৪ ও ২৩ আয়াত।[7]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাতহা/৫৭২০ ‘ক্বিয়ামতের অবস্থা’ অধ্যায় ‘সৃষ্টির সূচনা ও নবীগণের আলোচনা’ অনুচ্ছেদ-৯।[8].ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ২/২৯-৩০।[9]. মানছূরপুরী, রহমাতুল লিল আলামীন ৩/১০৯পৃঃ।

হযরত সালেহ আঃ এর জীবনী

 



হযরত ছালেহ (আ:) জীবনিহযরত ছালেহ(আলাইহিস সালাম)1.কওমে ছামূদ-এর প্রতি হযরত ছালেহ (আঃ)-এর দাওয়াত2.ছালেহ(আঃ)-এর দাওয়াতের ফলশ্রুতি1.কওমে ছামূদ-এর উপরে আপতিত গযবের বিবরণ2.গযবেরধরন3.কওমে ছামূদ-এর ধ্বংস কাহিনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ‘আদ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০বছরপরে হযরত ছালেহ (আঃ) কওমে ছামূদ-এর প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন।[1]কওমে‘আদ ও কওমে ছামূদ একই দাদা ‘ইরাম’-এর দু’টি বংশধারার নাম। এদের বংশ পরিচয় ইতিপূর্বে হূদ(আঃ)-এর আলোচনায় বিধৃত হয়েছে। কওমে ছামূদ আরবের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় বসবাসকরত। তাদেরপ্রধান শহরের নাম ছিল ‘হিজ্র’ যা শামদেশ অর্থাৎ সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল।বর্তমানে একে সাধারণভাবে ‘মাদায়েনে ছালেহ’ বলাহয়ে থাকে। ‘আদ জাতির ধ্বংসের পরছামূদ জাতি তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। তারাও ‘আদ জাতির মত শক্তিশালী ও বীরের জাতি ছিল। তারাপ্রস্তর খোদাই ও স্থাপত্য বিদ্যায় খুবই পারদর্শী ছিল। সমতল ভূমিতে বিশালকায় অট্টালিকা নির্মাণছাড়াও পর্বতগাত্র খোদাই করে তারা নানারূপ প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করত। তাদের স্থাপত্যেরনিদর্শনাবলী আজও বিদ্যমান রয়েছে। এগুলোর গায়ে ইরামী ও ছামূদী বর্ণমালার শিলালিপিখোদিত রয়েছে। অভিশপ্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে এলাকাটি আজও পরিত্যক্ত অবস্থায়রয়েছে। কেউ সেখানে বসবাস করে না। ৯ম হিজরীতে তাবূক যুদ্ধে যাওয়ার পথেমুসলিম বাহিনী হিজ্রে অবতরণকরলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে সেখানে প্রবেশ করতেনিষেধ করে বলেন, ﻻَ ﺗَﺪْﺧُﻠُﻮﺍ ﻣَﺴَﺎﻛِﻦَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮﺍﺃَﻧْﻔُﺴَﻬُﻢْ ﺇِﻻَّﺃَﻥْ ﺗَﻜُﻮﻧُﻮﺍ ﺑَﺎﻛِﻴْﻦَ ﺃَﻥْ ﻳُﺼِﻴﺒَﻜُﻢْ ﻣَﺎﺃَﺻَﺎﺑَﻬُﻢْ -‘তোমরা ঐসব অভিশপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করো না ক্রন্দনরত অবস্থায়ব্যতীত। যদি ক্রন্দন করতে না পার, তাহ’লে প্রবেশ করো না। তাহ’লে তোমাদের উপরঐ গযব আসতে পারে, যা তাদের উপর এসেছিল’।[2]রাসূলের এই বক্তব্যের মধ্যে সুক্ষ্মতাৎপর্য এই যে, এগুলি দেখে যদি মানুষ আল্লাহর গযবে ভীত না হয়, তাহ’লে তাদেরঅন্তর শক্ত হয়ে যাবে এবং ঐসব অভিশপ্তদের মত অহংকারী ও হঠকারী আচরণ করবে।ফলে তাদের উপর অনুরূপ গযব নেমে আসবে, যেরূপ ইতিপূর্বে ঐসব অভিশপ্তদেরউপর নেমে এসেছিল।পার্থিব বিত্ত-বৈভব ও ধনৈশ্বর্যের পরিণতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অশুভহয়ে থাকে। বিত্তশালীরা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভুলে গিয়ে ভ্রান্ত পথে পা বাড়ায়। ছামূদজাতির বেলায়ও তাই হয়েছিল। অথচ কওমে নূহের কঠিন শাস্তির ঘটনাবলী তখনওলোকমুখে আলোচিত হ’ত। আর কওমে ‘আদ-এর নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঘটনা তো তাদের কাছেএকপ্রকার টাটকা ঘটনাই ছিল।অথচ তাদের ভাইদের ধ্বংসস্ত্তপের উপরে বড় বড় বিলাসবহুলঅট্টালিকা নির্মাণ করে ও বিত্ত বৈভবের মালিক হয়ে তারা পিছনের কথা ভুলে গেল। এমনকি তারা‘আদ জাতির মত অহংকারীকার্যকলাপ শুরু করে দিল। তারা শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হ’ল।এমতাবস্থায় তাদের হেদায়াতের জন্য তাদেরই বংশের মধ্য হ’তে ছালেহ (আঃ)-কে আল্লাহনবী মনোনীত করে পাঠালেন।কওমে ছামূদ-এর প্রতি হযরত ছালেহ (আঃ)-এর দাওয়াত:পথভোলা জাতিকে হযরত ছালেহ (আঃ) সর্বপ্রথম তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। তিনিতাদেরকে মূর্তিপূজাসহ যাবতীয় শিরক ও কুসংস্কার ত্যাগ করে এক আললাহর ইবাদত ও তাঁরপ্রেরিত বিধান সমূহের প্রতি আনুগত্যের আহবান জানালেন। তিনি যৌবনকালে নবুঅতপ্রাপ্ত হন।তখন থেকে বার্ধক্যকাল অবধি তিনি স্বীয় কওমকে নিরন্তর দাওয়াত দিতে থাকেন। কওমেরদুর্বল শ্রেণীর লোকেরা তাঁর উপরে ঈমান আনলেও শক্তিশালী ও নেতৃস্থানীয়লোকেরা তাঁকে অস্বীকার করে। ছালেহ (আঃ)-এর দাওয়াত সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের৭৩-৭৯ আয়াতে আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﻟَﻰ ﺛَﻤُﻮْﺩَ ﺃَﺧَﺎﻫُﻢْ ﺻَﺎﻟِﺤﺎً ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍ ﺍﻟﻠﻪَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَـﻪٍﻏَﻴْﺮُﻩُ ﻗَﺪْ ﺟَﺎﺀﺗْﻜُﻢْ ﺑَﻴِّﻨَﺔٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﻫَـﺬِﻩِ ﻧَﺎﻗَﺔُ ﺍﻟﻠﻪِ ﻟَﻜُﻢْ ﺁﻳَﺔً ﻓَﺬَﺭُﻭْﻫَﺎ ﺗَﺄْﻛُﻞْ ﻓِﻲْ ﺃَﺭْﺽِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻻَ ﺗَﻤَﺴُّﻮْﻫَﺎﺑِﺴُﻮْﺀٍ ﻓَﻴَﺄْﺧُﺬَﻛُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﺃَﻟِﻴْﻢٌ، ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭْﺍ ﺇِﺫْ ﺟَﻌَﻠَﻜُﻢْ ﺧُﻠَﻔَﺎﺀَ ﻣِﻦْ ﺑَﻌْﺪِ ﻋَﺎﺩٍ ﻭَﺑَﻮَّﺃَﻛُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﺗَﺘَّﺨِﺬُﻭْﻥَ ﻣِﻦْﺳُﻬُﻮْﻟِﻬَﺎ ﻗُﺼُﻮْﺭﺍً ﻭَﺗَﻨْﺤِﺘُﻮْﻥَ ﺍﻟْﺠِﺒَﺎﻝَ ﺑُﻴُﻮْﺗﺎً ﻓَﺎﺫْﻛُﺮُﻭْﺍ ﺁﻵﺀَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻻَ ﺗَﻌْﺜَﻮْﺍ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻣُﻔْﺴِﺪِﻳْﻦَ، ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻸُﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺍﺳْﺘَﻜْﺒَﺮُﻭْﺍ ﻣِﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻟِﻠَّﺬِﻳْﻦَ ﺍﺳْﺘُﻀْﻌِﻔُﻮْﺍ ﻟِﻤَﻦْ ﺁﻣَﻦَ ﻣِﻨْﻬُﻢْ ﺃَﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ ﺃَﻥَّ ﺻَﺎﻟِﺤﺎً ﻣُّﺮْﺳَﻞٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻪِ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍﺇِﻧَّﺎ ﺑِﻤَﺎ ﺃُﺭْﺳِﻞَ ﺑِﻪِ ﻣُﺆْﻣِﻨُﻮْﻥَ، ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺍﺳْﺘَﻜْﺒَﺮُﻭْﺍ ﺇِﻧَّﺎ ﺑِﺎﻟَّﺬِﻳْﺂﻣَﻨﺘُﻢْ ﺑِﻪِ ﻛَﺎﻓِﺮُﻭْﻥَ، ﻓَﻌَﻘَﺮُﻭﺍ ﺍﻟﻨَّﺎﻗَﺔَ ﻭَﻋَﺘَﻮْﺍ ﻋَﻦْﺃَﻣْﺮِ ﺭَﺑِّﻬِﻢْ ﻭَﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﻳَﺎ ﺻَﺎﻟِﺢُ ﺍﺋْﺘِﻨَﺎ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌِﺪُﻧَﺎ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠِﻴْﻦَ، ﻓَﺄَﺧَﺬَﺗْﻬُﻢُ ﺍﻟﺮَّﺟْﻔَﺔُ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤُﻮْﺍ ﻓِﻲْﺩَﺍﺭِﻫِﻢْ ﺟَﺎﺛِﻤِﻴْﻦَ، ﻓَﺘَﻮَﻟَّﻰ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺑْﻠَﻐْﺘُﻜُﻤْﺮِﺳَﺎﻟَﺔَ ﺭَﺑِّﻲْ ﻭَﻧَﺼَﺤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦ ﻻَّ ﺗُﺤِﺒُّﻮْﻥَﺍﻟﻨَّﺎﺻِﺤِﻴْﻦَ – ‏)ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৭৩-৭৯(-অনুবাদ: ‘ছামূদ জাতির নিকটে (আমরা প্রেরণ করেছিলাম) তাদেরভাই ছালেহকে। সে বলল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীততোমাদের কোন উপাস্যনেই। তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হ’তেএকটি প্রমাণ এসে গেছে। এটি আল্লাহর উষ্ট্রী, তোমাদের জন্য নিদর্শন স্বরূপ। অতএবতোমরা একে ছেড়ে দাও আল্লাহর যমীনে চরে বেড়াবে। তোমরা একেঅন্যায়ভাবে স্পর্শ করবে না। তাতে মর্মান্তিক শাস্তি তোমাদের পাকড়াও করবে’(আ‘রাফ৭/৭৩)। ‘তোমরা স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে ‘আদ জাতির পরে তাদেরস্থলাভিষিক্ত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে ঠিকানা করে দেন। সেমতে তোমরাসমতল ভূমিতে অট্টালিকা সমূহ নির্মাণ করেছ এবং পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে প্রকোষ্ঠসমূহ নির্মাণ করেছ। অতএব তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ সমূহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে অনর্থসৃষ্টি করো না’ (৭৪)। কিন্তু তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক নেতারা ঈমানদার দুর্বল শ্রেণীরউদ্দেশ্যে বলল, ‘তোমরা কি জানো যে, ছালেহ তার প্রভুর পক্ষ হ’তে প্রেরিত নবী?তারা বলল,আমরা তো তার আনীত বিষয় সমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী’ (৭৫)।‘(জবাবে)দাদ্ভিক নেতারা বলল, তোমরা যে বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেছ, আমরা সে বিষয়েঅস্বীকারকারী’ (৭৬)। ‘অতঃপর তারা উষ্ট্রীকে হত্যা করল এবং তাদের প্রভুর আদেশঅমান্য করল। তারা বলল, হে ছালেহ! তুমি নিয়ে এস যদ্বারা তুমি আমাদের ভয় দেখাতে, যদি তুমিআল্লাহর প্রেরিত নবীদের একজন হয়ে থাক’ (৭৭)। ‘অতঃপরভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করলএবং সকাল বেলা নিজ নিজ গৃহে সবাই উপুড় হয়ে পড়ে রইল’ (৭৮)। ‘ছালেহ তাদের কাছথেকে প্রস্থান করল এবং বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে আমারপ্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদেরকল্যাণ কামনা করেছি। কিন্তু তোমরাকল্যাণকামীদের ভালবাস না’(আ‘রাফ ৭/৭৩-৭৯)।ছালেহ (আঃ)-এর উপরোক্ত দাওয়াত ও তাঁরকওমের আচরণ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ২২টি সূরায় ৮৭টিআয়াতে বিভিন্নভাবে বর্ণিতহয়েছে।[3]ছালেহ (আঃ)-এর দাওয়াতের ফলশ্রুতি:ইতিপূর্বেকার ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলির ন্যায়কওমে ছামূদও তাদের নবী হযরত ছালেহ (আঃ)-কে অমান্য করে। তারা বিগত ‘আদ জাতিরন্যায়পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে থাকে। নবী তাদেরকে যতই দাওয়াত দিতে থাকেন,তাদের অবাধ্যতা ততই সীমা লংঘন করতে থাকে। ‘তারা বলল, ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻳَﺎ ﺻَﺎﻟِﺢُ ﻗَﺪْ ﻛُﻨْﺖَ ﻓِﻴْﻨَﺎ ﻣَﺮْﺟُﻮًّﺍﻗَﺒْﻞَ ﻫَﺬَﺍ ﺃَﺗَﻨْﻬَﺎﻧَﺎ ﺃَﻥ ﻧَّﻌْﺒُﺪَ ﻣَﺎ ﻳَﻌْﺒُﺪُ ﺁﺑَﺎﺅُﻧَﺎ ﻭَﺇِﻧَّﻨَﺎ ﻟَﻔِﻲْ ﺷَﻚٍّ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﺪْﻋُﻮْﻧَﺎ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻣُﺮِﻳْﺐٍ- ‏)ﻫﻮﺩ ৬২(-হেছালেহ! ইতিপূর্বে আপনি আমাদের কাছে আকাংখিত ব্যক্তি ছিলেন। আপনি কি বাপ-দাদার আমলথেকে চলে আসা উপাস্যদের পূজা করা থেকে আমাদের নিষেধ করছেন? অথচ আমরাআপনার দাওয়াতের বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান’(হূদ ১১/৬২)। তারা কওমের দুর্বল ও দরিদ্রশ্রেণীর লোকদের জমা করে বলল, ﺃَﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ ﺃَﻥَّ ﺻَﺎﻟِﺤﺎً ﻣُّﺮْﺳَﻞٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻪِ -‘তোমরা কি বিশ্বাসকর যে, ছালেহ তার প্রভুর পক্ষ হ’তে প্রেরিত ব্যক্তি’? তারা জবাব দিল ,ِ ﺇِﻧَّﺎﺑِﻤَﺎ ﺃُﺭْﺳِﻞَ ﺑِﻪِﻣُﺆْﻣِﻨُﻮْﻥَ-‘আমরা তো তাঁর আনীত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী’। একথা শুনেদাম্ভিকনেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে উঠল, ‘তোমরা যে বিষয়ে ঈমান এনেছ, আমরা ঐসবকিছুকে অস্বীকার করি’(আ‘রাফ ৭/৭৫)। তারা আরও বলল, ﻓَﻘَﺎﻟُﻮﺍ ﺃَﺑَﺸَﺮًﺍ ﻣِّﻨَّﺎ ﻭَﺍﺣِﺪًﺍ ﻧَّﺘَّﺒِﻌُﻪُ ﺇِﻧَّﺎ ﺇِﺫًﺍ ﻟَّﻔِﻲْﺿَﻼَﻝٍ ﻭَﺳُﻌُﺮٍ – ﺃَﺅُﻟْﻘِﻲَ ﺍﻟﺬِّﻛْﺮُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻣِﻦ ﺑَﻴْﻨِﻨَﺎ ﺑَﻞْ ﻫُﻮَ ﻛَﺬَّﺍﺏٌ ﺃَﺷِﺮٌ – ‏) ﺍﻟﻘﻤﺮ ২৪-২৫(-‘আমরা কি আমাদেরইএকজনের অনুসরণ করব? তাহ’লে তো আমরা বিপথগামী ও বিকারগ্রস্ত বলে গণ্য হব’।‘আমাদের মধ্যে কি কেবল তারই উপরেঅহী নাযিল করা হয়েছে? আসলে সে একজনমহা মিথ্যাবাদী ও দাম্ভিক’(ক্বামার ৫৪/২৪-২৫)। তারা ছালেহকে বলল, ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺍﻃَّﻴَّﺮْﻧَﺎ ﺑِﻚَ ﻭَﺑِﻤَﻦ ﻣَّﻌَﻚَ…-‘আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা আছে তাদেরকে অকল্যাণের প্রতীক মনেকরি’…(নামল ২৭/৪৭)। এইভাবে সমাজের শক্তিশালী শ্রেণী তাদের নবীকে অমান্যকরল এবং মূর্তিপূজা সহ নানাবিধ শিরকও কুসংস্কারে লিপ্ত হ’ল এবং সমাজে অনর্থ সৃষ্টি করতেথাকল। আল্লাহর ভাষায়, ﻓَﺎﺳْﺘَﺤَﺒُّﻮﺍ ﺍﻟْﻌَﻤَﻰ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻬُﺪَﻯ ﻓَﺄَﺧَﺬَﺗْﻬُﻢْ ﺻَﺎﻋِﻘَﺔُ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ ﺍﻟْﻬُﻮْﻥِ ﺑِﻤَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍﻳَﻜْﺴِﺒُﻮْﻥَ -‘তারা হেদায়াতের চাইতে অন্ধত্বকেই পসন্দ করে নিল। অতঃপর তাদের কৃতকর্মেরফলে অবমাননাকর শাস্তির গর্জন এসে তাদের পাকড়াওকরল’(ফুছছিলাত/হামীম সাজদাহ ৪১/১৭)।কওমে ছামূদ-এর উপরে আপতিত গযবের বিবরণ :ইবনু কাছীর বর্ণনা করেন যে,হযরতছালেহ (আঃ)-এর নিরন্তর দাওয়াতে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রদায়ের নেতারা স্থির করল যে,তাঁর কাছে এমন একটা বিষয় দাবী করতে হবে, যা পূরণ করতে তিনি ব্যর্থ হবেন এবং এরফলে তাঁর দাওয়াতও বন্ধ হয়ে যাবে। সেমতে তারা এসে তাঁর নিকটে দাবী করল যে,আপনি যদি আল্লাহর সত্যিকারের নবী হন, তাহ’লে আমাদেরকে নিকটবর্তী ‘কাতেবা’পাহাড়ের ভিতর থেকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বেরকরে এনে দেখান।এ দাবী শুনে হযরত ছালেহ (আঃ) তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনিলেন যে, যদি তোমাদের দাবী পুরণ করা হয়, তবে তোমরা আমার নবুঅতের প্রতি ওআমার দাওয়াতের প্রতি ঈমান আনবে কি-না। জেনে রেখ, উক্ত মু‘জেযা প্রদর্শনেরপরেও যদি তোমরা ঈমান না আনো, তাহ’লে আল্লাহর গযবে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে’।এতে সবাই স্বীকৃত হ’ল ও উক্ত মর্মে অঙ্গীকার করল। তখন ছালেহ (আঃ) ছালাতেদাঁড়িয়ে গেলেনএবং আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ পাক তার দো‘আকবুলকরলেন এবং বললেন, ﺇِﻧَّﺎ ﻣُﺮْﺳِﻠُﻮ ﺍﻟﻨَّﺎﻗَﺔِ ﻓِﺘْﻨَﺔً ﻟَّﻬُﻢْ ﻓَﺎﺭْﺗَﻘِﺒْﻬُﻢْ ﻭَﺍﺻْﻄَﺒِﺮْ ‘আমরা তাদেরপরীক্ষার জন্য একটি উষ্ট্রী প্রেরণ করব। তুমি তাদেরপ্রতি লক্ষ্য রাখ এবং ধৈর্য ধারণকর’(ক্বামার ৫৪/২৭)। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের গায়ে কম্পন দেখা দিল এবং একটি বিরাটপ্রস্তর খন্ড বিস্ফোরিত হয়ে তার ভিতর থেকে কওমের নেতাদের দাবীর অনুরূপ একটিগর্ভবতী ও লাবণ্যবতী তরতাযা উষ্ট্রী বেরিয়ে এল।ছালেহ (আঃ)-এর এই বিস্ময়করমু‘জেযা দেখে গোত্রের নেতা সহ তার সমর্থক লোকেরা সাথে সাথে মুসলমান হয়েগেল। অবশিষ্টরাও হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। কিন্তুপ্রধান ধর্মনেতা ও অন্যান্য সমাজনেতাদের বাধার কারণে হ’তে পারল না। তারা উল্টা বলল, ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺍﻃَّﻴَّﺮْﻧَﺎ ﺑِﻚَ ﻭَﺑِﻤَﻦ ﻣَّﻌَﻚَ …-‘আমরাতোমাকে ও তোমার সাথে যারা আছে তাদেরকে অকল্যাণের প্রতীক মনেকরি…’(নামল ২৭/৪৭)। হযরত ছালেহ (আঃ) কওমের নেতাদের এভাবে অঙ্গীকার ভঙ্গকরতে দেখে এবং পাল্টা তাঁকেই দায়ী করতে দেখে দারুণভাবে শংকিত হ’লেন যে,যেকোনসময়ে এরা আল্লাহর গযবে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি তাদেরকে সাবধান করেবললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻃَﺎﺋِﺮُﻛُﻢْ ﻋِﻨْﺪَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺑَﻞْ ﺃَﻧﺘُﻢْ ﻗَﻮْﻡٌ ﺗُﻔْﺘَﻨُﻮْﻥَ -‘দেখ, তোমাদের মঙ্গলামঙ্গল আল্লাহরনিকটে রয়েছে। বরং তোমরা এমন সম্প্রদায়, যাদেরকে পরীক্ষা করাহচ্ছে’(নামল২৭/৪৭)। অতঃপর পয়গম্বরসূলভ দয়া প্রকাশ করে বললেন, ﻫَـﺬِﻩِ ﻧَﺎﻗَﺔُ ﺍﻟﻠّﻪِ ﻟَﻜُﻢْ ﺁﻳَﺔً ﻓَﺬَﺭُﻭْﻫَﺎ ﺗَﺄْﻛُﻞْﻓِﻲْ ﺃَﺭْﺽِ ﺍﻟﻠّﻪِ ﻭَﻻَ ﺗَﻤَﺴُّﻮْﻫَﺎ ﺑِﺴُﻮْﺀٍ ﻓَﻴَﺄْﺧُﺬَﻛُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﻗَﺮِﻳْﺐٌ- ‏)ﻫﻮﺩ ৬৪(-‘এটি আল্লাহর উষ্ট্রী।তোমাদের জন্য নিদর্শন স্বরূপ। একে আল্লাহর যমীনে স্বাধীনভাবে চরে বেড়াতেদাও। সাবধান! একে অসৎ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করো না। তাহ’লে তোমাদেরকে সত্বরযন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পাকড়াও করবে’(হূদ ১১/৬৪)।আল্লাহ উক্ত উষ্ট্রীর জন্য এবং লোকদেরজন্য পানি বণ্টন করে দিয়েছিলেন। তিনি নবীকে বলে দেন ,َ ﻧَﺒِّﺌْﻬُﻢْ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻤَﺎﺀَ ﻗِﺴْﻤَﺔٌ ﺑَﻴْﻨَﻬُﻢْ ﻛُﻞُّﺷِﺮْﺏٍ ﻣُّﺤْﺘَﻀَﺮٌ ‘হে ছালেহ! তুমি ওদেরকে বলে দাও যে, কূপের পানি তাদের মধ্যে বণ্টিতহয়েছে। প্রত্যেক পালায় তারা হাযির হবে’(ক্বামার ৫৪/২৮)। ﻟَّﻬَﺎ ﺷِﺮْﺏٌ ﻭَﻟَﻜُﻢْ ﺷِﺮْﺏُ ﻳَﻮْﻡٍﻣَّﻌْﻠُﻮْﻡٍ-‘একদিন উষ্ট্রীর ও পরের দিন তোমাদের (পানি পানের) জন্য পালা নির্ধারিতহয়েছে’(ক্বামার ৫৪/২৮; শো‘আরা ২৬/১৫৫)।আল্লাহ তা‘আলা কওমে ছামূদ-এর জন্য উক্তউষ্ট্রীকেই সর্বশেষ পরীক্ষা হিসাবে নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি বলেন, ﻭَﺁﺗَﻴْﻨَﺎ ﺛَﻤُﻮْﺩَﺍﻟﻨَّﺎﻗَﺔَ ﻣُﺒْﺼِﺮَﺓً ﻓَﻈَﻠَﻤُﻮْﺍ ﺑِﻬَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﻧُﺮْﺳِﻞُ ﺑِﺎﻵﻳَﺎﺕِ ﺇِﻻَّ ﺗَﺨْﻮِﻳْﻔًﺎ -‘আর আমরা ছামূদকে উষ্ট্রী দিয়েছিলামস্পষ্ট নিদর্শন হিসাবে। কিন্তু তারা তার প্রতি যুলুম করেছিল। বস্ত্ততঃ আমরা ভীতি প্রদর্শনেরউদ্দেশ্যেই নিদর্শন সমূহ প্রেরণ করে থাকি’(ইসরা ১৭/৫৯)।ছামূদ জাতির লোকেরা যে কূপথেকে পানি পান করত ও তাদের গবাদি পশুদের পানি পান করাত, এ উষ্ট্রীও সেই কূপথেকে পানি পান করত। উষ্ট্রী যেদিন পানি পান করত, সেদিন কূয়ার পানি নিঃশেষে পান করেফেলত। অবশ্য ঐদিন লোকেরা উষ্ট্রীর দুধ পান করত এবং বাকী দুধ দ্বারা তাদের সবপাত্র ভরে নিত। কিন্তু এই হতভাগাদের কপালে এত সুখ সহ্য হ’লনা। তারা একদিন পানি না পাওয়াকেঅসুবিধার কারণ হিসাবে গণ্য করল।তাছাড়া উষ্ট্রী যখন ময়দানে চরে বেড়াত, তখন তার বিশালদেহ ও অপরূপ চেহারা দেখে অন্যান্য গবাদি পশু ভয় পেত। ফলে তারা উষ্ট্রীকেমেরে ফেলতে মনস্থ করল। কিন্তু আল্লাহর গযবের ভয়ে কেউ সাহস করল না।ইবনুজারীর প্রমুখ মুফাসসিরগণের বর্ণনা মতে, অবশেষে শয়তান তাদেরকে সর্ববৃহৎ কুমন্ত্রণাদিল। আর তা হ’ল নারীরপ্রলোভন। ছামূদ গোত্রের দু’জন পরমা সুন্দরী মহিলা, যারা ছালেহ(আঃ)-এর প্রতি দারুণ বিদ্বেষী ছিল, তারা তাদের রূপ-যৌবন দেখিয়েদু’জন পথভ্রষ্ট যুবককেউষ্ট্রী হত্যায় রাযী করালো। অতঃপর তারা তীর ও তরবারির আঘাতে উষ্ট্রীকে পাকেটে হত্যা করে ফেলল। হত্যাকারী যুবকদ্বয়ের প্রধানকেলক্ষ্য করেই কুরআনেবর্ণিত হয়েছে, ﺇِﺫِ ﺍﻧْﺒَﻌَﺚَ ﺃَﺷْﻘَﺎﻫَﺎ ‘যখন তাদের সবচেয়ে হতভাগা লোকটি তৎপর হয়েউঠেছিল’(শাম্স ৯১/১২)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা খুৎবায় উক্ত আয়াত পাঠ করে বলেন, ঐ লোকটিছিল কঠোর হৃদয় ও দুশ্চরিত্র ( ﺭﺟﻠﻌﺰﻳﺰ ﻋﺎﺭﻡ )।[4]কেননা তার কারণেই গোটা ছামূদ জাতিগযবে পতিত হয়। আল্লাহ বলেন, ﻓَﻨَﺎﺩَﻭْﺍ ﺻَﺎﺣِﺒَﻬُﻢْ ﻓَﺘَﻌَﺎﻃَﻰ ﻓَﻌَﻘَﺮَ، ﻓَﻜَﻴْﻒَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﺬَﺍﺑِﻲ ﻭَﻧُﺬُﺭِ، ﺇِﻧَّﺎﺃَﺭْﺳَﻠْﻨَﺎﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺻَﻴْﺤَﺔً ﻭَﺍﺣِﺪَﺓً ﻓَﻜَﺎﻧُﻮْﺍ ﻛَﻬَﺸِﻴْﻢِ ﺍﻟْﻤُﺤْﺘَﻈِﺮِ -‘অতঃপর তারা তাদের প্রধান ব্যক্তিকে ডাকল।অতঃপর সে উষ্ট্রীকে ধরল ও বধ করল’(২৯)। ‘অতঃপর কেমন কঠোর ছিল আমার শাস্তি ওভীতি প্রদর্শন!(৩০)। ‘আমরা তাদের প্রতি প্রেরণ করলাম একটিমাত্র নিনাদ। আর তাতেইতারাহয়ে গেল খোয়াড় মালিকের চূর্ণিত শুষ্ক খড়কুটো সদৃশ’(ক্বামার ৫৪/২৯-৩১)।উল্লেখ্যযে, উষ্ট্রী হত্যার ঘটনার পর ছালেহ (আঃ) স্বীয় কওমকে আল্লাহর নির্দেশ জানিয়েদিলেন যে, ﺗَﻤَﺘَّﻌُﻮْﺍ ﻓِﻲْ ﺩَﺍﺭِﻛُﻢْ ﺛَﻼَﺛَﺔَ ﺃَﻳَّﺎﻡٍ ﺫَﻟِﻚَ ﻭَﻋْﺪٌ ﻏَﻴْﺮُ ﻣَﻜْﺬُﻭْﺏٍ -‘এখন থেকে তিনদিন তোমরাতোমাদের ঘরে আরাম করে নাও (এর পরেই আযাব নেমে আসবে)। এ ওয়াদার (অর্থাৎ এসময়সীমার) কোন ব্যতিক্রম হবে না’(হূদ ১১/৬৫)। কিন্তু এই হতভাগারা এরূপ কঠোর হুঁশিয়ারিরকোন গুরুত্ব না দিয়েবরং তাচ্ছিল্যভরে বলল, ﻳَﺎ ﺻَﺎﻟِﺢُ ﺍﺋْﺘِﻨَﺎ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌِﺪُﻧَﺎ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠِﻴْﻦَ ‘হেছালেহ! তুমি যার ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে আস দেখি, যদি তুমি সত্যিকারের নবী হয়েথাক’(আ‘রাফ ৭/৭৭)। তারা বলল, আমরা জানতে চাই,এ শাস্তি কিভাবে আসবে, কোত্থেকেআসবে, এর লক্ষণ কি হবে? ছালেহ (আঃ)বললেন, আগামীকাল বৃহষ্পতিবার তোমাদেরসকলের মুখমন্ডল হলুদ হয়ে যাবে। পরের দিন শুক্রবার তোমাদের সবার মুখমন্ডল লালবর্ণধারণ করবে। অতঃপর শনিবার দিন সবার মুখমন্ডল ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে যাবে। এটাই হবেতোমাদের জীবনের শেষ দিন।[5]একথা শোনার পর হঠকারী জাতি আল্লাহর নিকটে তওবাকরে ক্ষমা প্রার্থনার পরিবর্তে স্বয়ং ছালেহ (আঃ)-কেই হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ভাবল,যদি আযাব এসেই যায়, তবে তার আগে একেই শেষ করে দিই। কেননা এর নবুঅতকেঅস্বীকার করার কারণেই গযব আসছে।অতএব এই ব্যক্তিই গযবের জন্য মূলতঃ দায়ী। আরযদি গযব না আসে, তাহ’লে সে মিথ্যার দন্ড ভোগ করুক’। কওমের নয়জন নেতা এ নিকৃষ্টষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দেয়। তাদের এই চক্রান্তের বিষয় সূরা নমলে বর্ণিত হয়েছেএভাবে যে, ﻭَﻛَﺎﻥَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤَﺪِﻳْﻨَﺔِ ﺗِﺴْﻌَﺔُ ﺭَﻫْﻂٍ ﻳُﻔْﺴِﺪُﻭْﻥَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻭَﻻَ ﻳُﺼْﻠِﺤُﻮْﻥَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺗَﻘَﺎﺳَﻤُﻮْﺍ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِﻟَﻨُﺒَﻴِّﺘَﻨَّـﻪُ ﻭَﺃَﻫْﻠَﻪُ ﺛُﻢَّ ﻟَﻨَﻘُﻮﻟَﻦَّ ﻟِﻮَﻟِﻴِّﻪِ ﻣَﺎ ﺷَﻬِﺪْﻧَﺎ ﻣَﻬْﻠِﻚَ ﺃَﻫْﻠِﻪِ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﻟَﺼَﺎﺩِﻗُﻮْﻥَ- ‏) ﻧﻤﻞ ৪৮-৪৯(-‘সেই শহরে ছিলএমন নয় ব্যক্তি, যারা জনপদে অনর্থ সৃষ্টি করে বেড়াত এবং কোনরূপ সংশোধনমূলক কাজতারা করত না’ (৪৮)। ‘তারা বলল, তোমরা পরস্পরে আল্লাহর নামে শপথকর যে, আমরারাত্রিকালে ছালেহ ও তার পরিবার বর্গকে হত্যা করব। অতঃপর তার রক্তের দাবীদারকে আমরাবলে দেব যে, আমরা এ হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করিনি। আর আমরা নিশ্চিতভাবে সত্যবাদী’(নমল২৭/৪৮-৪৯)।তারা যুক্তি দিল, আমরা আমাদের কথায় অবশ্যই সত্যবাদী প্রমাণিত হব। কারণ রাত্রিরঅন্ধকারে কে কাকে মেরেছে, তা আমরা নির্দিষ্টভাবে জানতে পারব না। নেতৃবৃন্দের এসর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ও চক্রান্ত অনুযায়ী নয় নেতা তাদের প্রধান ক্বাদার বিন সালেফ-এরনেতৃত্বে রাতের বেলা ছালেহ (আঃ)-কে হত্যা করার জন্য তাঁর বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানাহ’ল। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা পথিমধ্যেই তাদেরকে প্রস্তর বর্ষণে ধ্বংস করে দিলেন।আল্লাহ বলেন, ﻭَﻣَﻜَﺮُﻭْﺍ ﻣَﻜْﺮًﺍ ﻭَﻣَﻜَﺮْﻧَﺎ ﻣَﻜْﺮًﺍ ﻭَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭْﻥَ، ﻓَﺎﻧْﻈُﺮْ ﻛَﻴْﻒَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﺎﻗِﺒَﺔُ ﻣَﻜْﺮِﻫِﻢْ ﺃَﻧَّﺎﺩَﻣَّﺮْﻧَﺎﻫُﻢْ ﻭَﻗَﻮْﻣَﻬُﻢْ ﺃَﺟْﻤَﻌِﻴْﻦَ – ‏) ﻧﻤﻞ ৫০-৫১(-‘তারা ষড়যন্ত্র করল। আমরাও পাল্টা কৌশল করলাম। অথচতারা কিছুই জানতে পারল না’। ‘তাদের চক্রান্তের পরিণতি দেখ। আমরা অবশ্যই তাদেরকে ওতাদের সম্প্রদায়ের সবাইকে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম’(নমল ২৭/৫০-৫১)।উল্লেখ্য যে,কুরআনে ঐ নয় ব্যক্তিকে ﺗِﺴْﻌَﺔُ ﺭَﻫْﻂٍ বা ‘নয়টি দল’ বলা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, ওরানয়জন নয়টি দলের নেতা ছিল এবং তারা ছিল হিজ্র জনপদের প্রধান নেতৃবৃন্দ(ইবনু কাছীর, সূরানমল, ঐ)।উপরোক্ত চক্রান্তের ঘটনায় একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, জাতির শীর্ষ দুষ্টমতিনেতারা কুফর, শিরক, হত্যা-সন্ত্রাস ও ডাকাতি-লুণ্ঠনের মত জঘন্য অপরাধ সমূহ নির্বিবাদে করেগেলেও তারা তাদের জনগণের কাছে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হ’তে রাযী ছিল না। আর তাই একমিথ্যাকে ঢাকার জন্য শত মিথ্যার আশ্রয় নিতেও তারা কখনো কুণ্ঠাবোধ করে না।যাই হোকনির্ধারিত দিনে গযব নাযিল হওয়ার প্রাক্কালেই আল্লাহর হুকুমে হযরত ছালেহ (আঃ) স্বীয়ঈমানদার সাথীগণকে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। যাওয়ার সময় তিনি স্বীয় কওমকে উদ্দেশ্যকরে বলেন, ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺑْﻠَﻐْﺘُﻜُﻢْ ﺭِﺳَﺎﻟَﺔَ ﺭَﺑِّﻲْ ﻭَﻧَﺼَﺤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦ ﻻَّ ﺗُﺤِﺒُّﻮْﻥَ ﺍﻟﻨَّﺎﺻِﺤِﻴْﻦَ -‘হে আমারজাতি! আমি তোমাদের কাছে স্বীয় পালনকর্তার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি এবং সর্বদা তোমাদেরকল্যাণ কামনা করেছি। কিন্তু তোমরা তোমাদের কল্যাণকামীদের ভালবাসো না’(আ‘রাফ৭/৭৯)।গযবের ধরন :হযরত ছালেহ (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীঅনুযায়ী বৃহষ্পতিবার ভোরেঅবিশ্বাসী কওমের সকলের মুখমন্ডল গভীর হলুদ বর্ণ ধারণ করল। কিন্তু তারা ঈমান আনলনা বা তওবা করল না। বরং উল্টা হযরত ছালেহ (আঃ)-এর উপর চটে গেল ও তাঁকে হত্যা করারজন্য খুঁজতে লাগল। দ্বিতীয় দিন সবার মুখমন্ডল লাল বর্ণ ও তৃতীয় দিন ঘোর কৃষ্ণবর্ণহয়ে গেল। তখন সবই নিরাশ হয়ে গযবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। চতুর্থ দিন রবিবারসকালে সবাই মৃত্যুর জন্য প্রস্ত্ততি নিয়ে সুগন্ধি মেখে অপেক্ষা করতে থাকে।[6]এমতাবস্থায় ভীষণ ভূমিকম্প শুরু হ’ল এবং উপর থেকে বিকট ও ভয়াবহ এক গর্জন শোনাগেল। ফলে সবাই যার যার স্থানে একযোগে অধোমুখী হয়ে ভূতলশায়ী হ’ল(আ‘রাফ৭/৭৮; হূদ ১১/৬৭-৬৮)এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হ’ল এমনভাবে, যেন তারা কোনদিন সেখানে ছিল না’।অন্য আয়াতে এসেছে যে, ‘আমরা তাদের প্রতি একটিমাত্র নিনাদ পাঠিয়েছিলাম। তাতেই তারাশুষ্ক খড়কুটোর মত হয়ে গেল’(ক্বামার ৫৪/৩১)।কোন কোন হাদীছে এসেছেরাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ছামূদ জাতির উপরে আপতিত গযব থেকে ‘আবু রেগাল’ নামক জনৈকঅবিশ্বাসী নেতা ঐ সময় মক্কায় থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু হারাম শরীফথেকে বেরোবার সাথে সাথে সেও গযবে পতিত হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবায়েকেরামকে মক্কার বাইরে আবু রেগালের উক্ত কবরের চিহ্ন দেখান এবং বলেন যে, তারসাথে একটা স্বর্ণের ছড়িও দাফন হয়ে গিয়েছিল। তখন কবর খনন করে তারা ছড়িটি উদ্ধারকরেন। উক্ত রেওয়ায়াতে একথাও বলা হয়েছে যে, ত্বায়েফের প্রসিদ্ধ ছাক্বীফগোত্র উক্ত আবু রেগালের বংশধর। তবে হাদীছটি যঈফ।[7]অন্য হাদীছে এসেছেরাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন যে, ‘ছাক্বীফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী (ভন্ড নবী) ও একজনরক্ত পিপাসুর জন্ম হবে।[8]রাসূলের এ ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হয় এবং এই বংশে মিথ্যা নবীমোখতার ছাক্বাফী এবংরক্তপিপাসু কসাই ইরাকের উমাইয়া গবর্ণর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জন্মহয়। কওমে ছামূদ-এর অভিশপ্ত বংশের রক্তধারার কু-প্রভাব হওয়াটাও এতে বিচিত্র নয়।অন্য একহাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে,৯ম হিজরীতে তাবূক যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সিরিয়া ওহেজাযের মধ্যবর্তী ‘হিজ্র’ নামক সে স্থানটি অতিক্রম করেন, যেখানে ছামূদ জাতিরউপরে গযব নাযিল হয়েছিল। তিনি ছাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দেন, কেউ যেন ঐগযব বিধ্বস্ত এলাকায় প্রবেশ না করে এবং ওখানকার কূয়ার পানি ব্যবহার না করে’।[9]এসব আযাব-বিধ্বস্ত এলাকাগুলিকে আল্লাহ তা‘আলা ভবিষ্যৎ মানবজাতির জন্য শিক্ষাস্থল হিসাবে সংরক্ষিতরেখেছেন, যাতে তারা উপদেশ হাছিল করতে পারে এবং নিজেদেরকে আল্লাহর অবাধ্যতাহ’তে বিরত রাখে।আরবরা তাদের ব্যবসায়িক সফরে নিয়মিত সিরিয়া যাতায়াতের পথে এইসবধ্বংসস্ত্তপ গুলি প্রত্যক্ষ করত। অথচ তাদের অধিকাংশ তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি এবংশেষনবীর উপরে বিশ্বাসস্থাপন করেনি। যদিও পরবর্তীতে সব এলাকাই ‘মুসলিম’ এলাকায়পরিণত হয়ে গেছে। আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﻢْ ﺃَﻫْﻠَﻜْﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺔٍ ﺑَﻄِﺮَﺕْ ﻣَﻌِﻴْﺸَﺘَﻬَﺎ ﻓَﺘِﻠْﻚَ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨُﻬُﻢْ ﻟَﻢْﺗُﺴْﻜَﻦ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِﻫِﻤْﺈِﻻَّ ﻗَﻠِﻴﻼً ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺍﻟْﻮَﺍﺭِﺛِﻴْﻦَ، ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻣُﻬْﻠِﻚَ ﺍﻟْﻘُﺮَﻯ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺒْﻌَﺚَ ﻓِﻲْ ﺃُﻣِّﻬَﺎ ﺭَﺳُﻮﻻًﻳَﺘْﻠُﻮ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺁﻳَﺎﺗِﻨَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﻛُﻨَّﺎ ﻣُﻬْﻠِﻜِﻲ ﺍﻟْﻘُﺮَﻯ ﺇِﻻَّ ﻭَﺃَﻫْﻠُﻬَﺎ ﻇَﺎﻟِﻤُﻮْﻥَ – ‏) ﺍﻟﻘﺼﺺ ৫৮-৫৯(-‘আমরা অনেকজনপদ ধ্বংস করেছি; যেসবের অধিবাসীরা তাদের বিলাসী জীবন যাপনে মত্ত ছিল।তাদের এসব আবাসস্থলে তাদের পরে মানুষ খুব সামান্যই বসবাস করেছে। অবশেষেআমরাই এসবের মালিক রয়েছি’। ‘আপনার পালনকর্তা জনপদ সমূহকে ধ্বংস করেন না, যেপর্যন্ত না তার কেন্দ্রস্থলে রাসূল প্রেরণ করেন। যিনি তাদের কাছে আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করেন। আর আমরা জনপদ সমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখনতার বাসিন্দারা (অর্থাৎনেতারা) যুলুম করে’(ক্বাছাছ ২৮/৫৮-৫৯)।উল্লেখ্য যে, উপরে বর্ণিত কাহিনীর প্রধানবিষয়গুলি পবিত্র কুরআনের ২২টি সূরায় ৮৭টিআয়াতে এবং কিছু অংশ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে।কিছু অংশ এমনও রয়েছে যা তাফসীরবিদগণ বিভিন্ন ইস্রাঈলী বর্ণনা থেকে সংগ্রহকরেছেন, যা সত্য ও মিথ্যা দুই-ই হ’তে পারে। কিন্তু সেগুলি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় এবংসেগুলির উপরে ঘটনার প্রমাণ নির্ভরশীল নয়।কওমে ছামূদ-এর ধ্বংস কাহিনীতে শিক্ষণীয়বিষয় সমূহ :১. সমাজের মুষ্টিমেয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও শক্তিশালী শ্রেণী সবারআগে শয়তানের পাতানো ফাঁদে পা দেয় ও সমাজকে জাহান্নামের পথে আহবান করে এবংতাদেরকে ধ্বংসের পথে পরিচালনা করে। যেমন কওমে ছামূদ-এর প্রধান নয় কুচক্রীনেতা করেছিল(নামল ২৭/৪৮)।২. দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা সাধারণতঃ অন্যদের আগেআল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী হয় ও এজন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্ত্তত হয়েযায়।৩. অবিশ্বাসীরা মূলতঃ দুনিয়াবী স্বার্থে আল্লাহ প্রেরিত শরী‘আতে বিশ্বাস ওতদনুযায়ী আমল প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজেদের কল্পিত শিরকী আক্বীদায় বিশ্বাস ওতদনুযায়ী আমলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং তারা সর্বদা তাদের বাপ-দাদা ও প্রচলিতপ্রথার দোহাই দেয়।৪. নবী ও সংস্কারকগণ সাধারণতঃ উপদেশদাতা হয়ে থাকেন- শাসক নন।৫.নবী ও সংস্কারকদের বিরুদ্ধে শাসক ও সমাজ নেতাগণ যুলুম করলে সরাসরি আল্লাহর গযবনেমে আসা অবশ্যম্ভাবী।৬. মানুষকে বিপথে নেওয়ার জন্য শয়তানের সবচাইতে বড়হাতিয়ার হ’ল নারী ও অর্থ-সম্পদ।৭. হঠকারী ও পদগর্বী নেতারা সাধারণতঃ চাটুকার ওচক্রান্তকারী হয়ে থাকে ও ঈমানদারগণের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে জয়ী হয়। কিন্তুঅবশেষে আল্লাহর কৌশল বিজয়ী হয় এবং কখনো কখনো তারা দুনিয়াতেই আল্লাহর গযবেসম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। আর আখেরাতের আযাব হয় তার চাইতে কঠিনতর(ক্বলম৬৮/৩৩)।৮. আল্লাহ পাক তাঁর বান্দাকে নে‘মতরাজি দান করেন তাকে পরীক্ষা করার জন্য। শুকরিয়া আদায়করলে সে আরও বেশী পায়। কিন্তু কুফরী করলে সে ধ্বংস হয় এবং উক্ত নে‘মত তারকাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।৯. অহংকারীদের অন্তর শক্ত হয়। তারা এলাহী গযবপ্রত্যক্ষ করার পরেও তাকে তাচ্ছিল্য করে। যেমন নয় নেতা ১ম দিন গযবে ধ্বংস হ’লেওঅন্যেরা তওবা না করে তাচ্ছিল্য করেছিল। ফলে অবশেষে ৪র্থ দিন তারা সবাই ধ্বংস হয়েযায়।১০. আল্লাহ যালেম জনপদকে ধ্বংস করেন অন্যদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য।১১. আল্লাহসংশোধনকামী জনপদকে কখনোই ধ্বংস করেন না।১২. কখনো মাত্র একজন বা দু’জনেরকারণে গোটা সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। ছালেহ (আঃ)-এর উষ্ট্রী হত্যাকারীছিল মাত্র দু’জন।অতএব মুষ্টিমেয় কুচক্রীদের বিরুদ্ধেবৃহত্তর সমাজকে সদা সতর্ক থাকতেহয়।১৩.কুচক্রীদের কৌশল আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না। যেমন ছামূদকওমের নেতারা বুঝতে না পেরে অযথা দম্ভ করেছিল(নামল ২৭/৫০-৫১)।১৪. আল্লাহমানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্যই দুনিয়াতে ছোট-খাট শাস্তির আস্বাদন করিয়েথাকেন ও তাদেরকে ভয় দেখান(ইসরা ১৭/৫৯; সাজদাহ ৩২/২১)।১৫. সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্বেঅবশেষে সত্য সেবীদেরই জয় হয়। যেমন হযরত ছালেহ (আঃ) ও তাঁর ঈমানদার দুর্বলশ্রেণীর লোকেরা এলাহী গযব থেকে নাজাত পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন ও মিথ্যারপূজারী শক্তিশালীরা ধ্বংস হয়েছিল।[1]. তারীখুল আম্বিয়া ১/৪৯ পৃঃ।[2]. বুখারী হা/৪৩৩; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫১২৫ ‘শিষ্টাচার’অধ্যায় ‘যুলুম’ অনুচ্ছেদ।[3]. যথাক্রমে: (১) সূরা আ‘রাফ ৭/৭৩-৭৯ (২) তওবা ৯/৭০ (৩) হূদ১১/৬১-৬৮, ৮৯ (৪) ইবরাহীম ১৪/৯ (৫) হিজর ১৫/৮০-৮৪ (৬) ইসরা ১৭/৫৯ (৭) হজ্জ ২২/৪২ (৮)ফুরক্বান ২৫/৩৮-৩৯ (৯) শো‘আরা ২৬/১৪১-১৫৯ (১০) নামল ২৭/৪৫-৫৩ (১১) আনকাবূত ২৯/৩৮(১২) ছোয়াদ ৩৮/১৩ (১৩) গাফের/মুমিন ৪০/৩১-৩৩ (১৪) ফুছছিলাত/হা-মীম সাজদাহ ৪১/১৩,১৭-১৮ (১৫) ক্বাফ ৫০/১২ (১৬) যারিয়াত ৫১/৪৩-৪৫ (১৭) নাজম ৫৩/৫১ (১৮) ক্বামার ৫৪/২৩-৩১(১৯)আল-হা-ক্বক্বাহ ৬৯/৪-৫ (২০) বুরূজ৮৫/১৮ (২১) ফাজ্র ৮৯/৯ (২২) শাম্স ৯১/১১-১৫। সর্বমোট৮৭।[4]. মুসলিম, হা/২৮৫৫; কুরতুবী হা/৩১০৬; আ‘রাফ ৭৭-৭৯; ইবনু কাছীর, ঐ।[5]. তাফসীর ইবনুকাছীর, সূরা আ‘রাফ ৭৭-৭৮।[6]. ইবনু কাছীর, সূরা আ‘রাফ ৭৩-৭৮।[7]. ইবনু কাছীর, আ‘রাফ ৭৮;আলবানী, যঈফআবুদাঊদ, ‘কবর উৎপাটন’ অনুচ্ছেদ; যঈফাহ হা/৪৭৩৬।[8]. মুসলিম, মিশকাতহা/৫৯৯৪ ‘কুরায়েশ-এর মর্যাদা’ অনুচ্ছেদ।[9]. বুখারী হা/৪৩৩, মুসলিম, আহমাদ, ইবনু কাছীর, সূরাআ‘রাফ ৭৩

হযরত শোয়াইব আঃ এর জীবনী

 

হযরত শোয়াইব আঃ এর জীবনী


হযরত শোআয়েব (আ:)১৩. হযরত শো‘আয়েব (আলাইহিসসালাম)সূচীপত্রহযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতকওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ও সামাজিকঅবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্মশো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতিশিক্ষণীয় বিষয় সমূহআহলেমাদইয়ানের উপরে আপতিত গযবের বিবরণ।আল্লাহরগযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ৬টি প্রাচীন জাতিরমধ্যেপঞ্চম জাতি হ’ল ‘আহলে মাদইয়ান’। ‘মাদইয়ান’হ’ল লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাযেরসীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধিপূর্ব জর্ডনের সামুদ্রিক বন্দর ‘মো‘আন’ ( ﻣﻌﺎﻥ )-এরঅদূরে বিদ্যমান রয়েছে। কুফরী করা ছাড়াও এইজনপদের লোকেরা ব্যবসায়ের ওযন ও মাপেকম দিত, রাহাজানি ও লুটপাট করত। অন্যায়পথেজনগণের মাল-সম্পদ ভক্ষণ করত।[1] ইয়াকূত হামাভী(মৃঃ ৬২৬/১২২৮খৃঃ) বলেন, ইবরাহীম-পুত্র মাদইয়ানেরনামে জনপদটি পরিচিত হয়েছে।[2] হযরতশো‘আয়েব(আঃ) এদের প্রতি প্রেরিতহয়েছিলেন। ইনি হযরত মূসা (আঃ)-এর শ্বশুর ছিলেন।কওমে লূত-এর ধ্বংসের অনতিকাল পরে কওমেমাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন (হূদ ১১/৮৯)।চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি ( ﺧﻄﻴﺐ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ )‘খাত্বীবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের মধ্যে সেরাবাগ্মী) নামে খ্যাত ছিলেন।[3] আহলে মাদইয়ান-কে পবিত্র কুরআনে কোথাও কোথাও ‘আছহাবুলআইকাহ’ ( ﺍﺻﺤﺎﺏ ﺍﻷﻳﻜﺔ ) বলা হয়েছে। যার অর্থ‘জঙ্গলের বাসিন্দাগণ’। এটা বলার কারণ এই যে, এইঅবাধ্য জনগোষ্ঠী প্রচন্ড গরমে অতিষ্ট হয়েনিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলেআশ্রয় নিলেআল্লাহ তাদেরকে সেখানেই ধ্বংস করে দেন।এটাও বলা হয় যে, উক্ত জঙ্গলে ‘আইকা’ ( ﺍﻷﻳﻜﺔ )বলে একটা গাছকে তারা পূজা করত। যার আশপাশেজঙ্গল বেষ্টিত ছিল।মাদইয়ান ( ﻣﺪﻳﻦ ) ছিলেন হাজেরাওসারাহর মৃত্যুর পরে হযরত ইবরাহীমের আরববংশোদ্ভূত কেন‘আনী স্ত্রী ক্বানতূরাবিনতেইয়াক্বত্বিন ( ﻗﻨﻄﻮﺭﺍ ﺑﻨﺖ ﻳﻘﻄﻦ ) -এর ৬টি পুত্রসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র।[4]উল্লেখ্য যে,হযরত শো‘আয়েব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্রকুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াতে বর্ণিতহয়েছে।[5]হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর দাওয়াত:ধ্বংসপ্রাপ্ত বিগত কওমগুলোর বড় বড় কিছু অন্যায়কর্ম ছিল। যার জন্য বিশেষভাবে সেখানে নবীপ্রেরিত হয়েছিলেন। শো‘আয়েব-এরকওমেরওতেমনি মারাত্মক কয়েকটি অন্যায় কর্ম ছিল, যেজন্যখাছ করে তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকটেশো‘আয়েব (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়। তিনি তাঁরকওমকে যে দাওয়াত দেন, তার মধ্যেইবিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﻟَﻰ ﻣَﺪْﻳَﻦَ ﺃَﺧَﺎﻫُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍﺍﻟﻠﻪَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَـﻪٍ ﻏَﻴْﺮُﻩُ ﻗَﺪْ ﺟَﺎﺀﺗْﻜُﻢ ﺑَﻴِّﻨَﺔٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْﻓَﺄَﻭْﻓُﻮﺍ ﺍﻟْﻜَﻴْﻞَ ﻭَﺍﻟْﻤِﻴﺰَﺍﻥَ ﻭَﻻَ ﺗَﺒْﺨَﺴُﻮﺍ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﺃَﺷْﻴَﺎﺀﻫُﻢْ ﻭَﻻَﺗُﻔْﺴِﺪُﻭﺍ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺻْﻼَﺣِﻬَﺎ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَّﻜُﻢْ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ- ﻭَﻻَ ﺗَﻘْﻌُﺪُﻭﺍ ﺑِﻜُﻞِّ ﺻِﺮَﺍﻁٍ ﺗُﻮﻋِﺪُﻭﻥَ ﻭَﺗَﺼُﺪُّﻭﻥَ ﻋَﻦﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣَﻦْ ﺁﻣَﻦَ ﺑِﻬِﻮَﺗَﺒْﻐُﻮﻧَﻬَﺎ ﻋِﻮَﺟﺎً ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭﺍ ﺇِﺫْ ﻛُﻨﺘُﻢْﻗَﻠِﻴﻼً ﻓَﻜَﺜَّﺮَﻛُﻢْ ﻭَﺍﻧﻈُﺮُﻭﺍ ﻛَﻴْﻒَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﺎﻗِﺒَﺔُ ﺍﻟْﻤُﻔْﺴِﺪِﻳﻦَ – ﻭَﺇِﻥْﻛَﺎﻥَ ﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻣِّﻨﻜُﻢْ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺑِﺎﻟَّﺬِﻱ ﺃُﺭْﺳِﻠْﺖُ ﺑِﻪِ ﻭَﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻟَّﻢْﻳْﺆْﻣِﻨُﻮﺍ ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৮৫-৮৭)-‘আমি মাদইয়ানের প্রতিতাদের ভাই শো‘আয়েবকে প্রেরণ করেছিলাম।সে তাদের বলল, হে আমারসম্প্রদায়! তোমরাআল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদেরকোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছেতোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সুস্পষ্টপ্রমাণ এসে গেছে। অতএবতোমরা মাপ ও ওযনপূর্ণ কর। মানুষকে তাদের মালামাল কম দিয়োনা।ভূপৃষ্ঠে সংস্কার সাধনের পরতোমরা সেখানেঅনর্থ সৃষ্টি করো না। এটাই তোমাদের জন্যকল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’। ‘তোমরাপথে-ঘাটে এ কারণে বসে থেকো না যে,ঈমানদারদের হুমকি দেবে, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টিকরবে ও তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করবে। স্মরণকর, যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে, অতঃপরআল্লাহ তোমাদেরকে আধিক্য দান করেছেন এবংলক্ষ্য কর কিরূপ অশুভ পরিণতি হয়েছেঅনর্থকারীদের’। ‘আর যদি তোমাদের একদল ঐবিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যা নিয়ে আমিপ্রেরিত হয়েছি এবং আরেক দল বিশ্বাস স্থাপন নাকরে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত নাআল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন।কেননা তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (আ‘রাফ৭/৮৫-৮৭)।কওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ওসামাজিক অবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্ম:উপরোক্তআয়াত সমূহে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি প্রতীয়মান হয়।প্রথমতঃ তারা আল্লাহর হক ও বান্দার হক দু’টিই নষ্টকরেছিল। আল্লাহর হক হিসাবে তারা বিশ্বাসেরজগতে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির পূজায় লিপ্তহয়েছিল কিংবা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীককরেছিল। তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়েছিল।দুনিয়াবী ধনৈশ্বর্যে ও বিলাস-ব্যসনে ডুবে গিয়েতারা আল্লাহরসত্তা ও গুণাবলী এবং তাঁর হক সম্পর্কেগাফেল হয়ে গিয়েছিল। সেই সাথে নিজেদেরপাপিষ্ঠ জীবনের মুক্তির জন্য বিভিন্ন সৃষ্টবস্ত্তকে শরীক সাব্যস্ত করে তাদের অসীলায়মুক্তি কামনাকরত। এভাবে তারা আল্লাহ ও তাঁর গযবেরব্যাপারে নিঃশংক হয়ে গিয়েছিল। সেকারণ সকলনবীর ন্যায় শো‘আয়েব (আঃ) সর্বপ্রথমআক্বীদা সংশোধনের জন্য ‘তাওহীদেইবাদত’-এর আহবান জানান। যাতে তারা সবদিক থেকে মুখফিরিয়ে স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করে এবং সকলব্যাপারে স্রেফ আল্লাহর ও তাঁর নবীর আনুগত্যকরে। তিনি নিজের নবুঅতের প্রমাণ স্বরূপতাদেরকে মু‘জেযা প্রদর্শন করেন।যা স্বয়ংপ্রতিপালকের পক্ষ হ’তে ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ রূপেতাঁরনিকটে আগমন করে।দ্বিতীয়তঃ তারা মাপ ওওযনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করত। সেদিকেইঙ্গিত করে শো‘আয়েব (আঃ) বলেন, ‘তোমরামাপ ও ওযন পূর্ণ কর এবং মানুষের দ্রব্যাদিতে কমদিয়ে তাদের ক্ষতি করো না’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।আয়াতের প্রথমাংশে খাছভাবে মাপ ও ওযন পূর্ণ করারনির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং শেষাংশে সর্বপ্রকারহকে ত্রুটি করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সে হকমানুষের ধন-সম্পদ, ইযযত-আবরূ বা যেকোনবস্ত্তর সাথে সম্পর্কযুক্ত হৌক না কেন। বস্ত্ততঃদ্রব্যাদির মাপ ও ওযনেকম দেওয়া যেমন মহাঅপরাধ, তেমনিকারু ইযযত-আবরূ নষ্ট করা, কারুপদমর্যাদা অনুযায়ী তাকে সম্মান না করা, যাদেরআনুগত্য করা যরূরী তাদের আনুগত্যে ত্রুটি করাঅথবা যাকে সম্মান করা ওয়াজিব তার সম্মানে ত্রুটিকরাইত্যাদি সবই এ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত, যাশো‘আয়েব (আঃ)-এরসম্প্রদায় করত। সে সমাজেমানীরমান ছিল না বা গুণীর কদর ছিল না।তৃতীয়তঃ বলাহয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করোনা, সেখানে সংস্কার সাধিত হওয়ার পর’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।অর্থাৎ আল্লাহ পৃথিবীকে যেভাবেআভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবদিক দিয়ে সুন্দর ওসামঞ্জস্যশীল করে সৃষ্টি করেছেন, তোমরাতাতে ব্যত্যয় ঘটিয়ো না এবং কোনরূপ অনর্থ সৃষ্টিকরো না।চতুর্থতঃ তোমরা মানুষকে ভীতিপ্রদর্শন ও আল্লাহর পথে বাধা দানের উদ্দেশ্যেপথে-ঘাটে ওঁৎ পেতে থেকো না (আ‘রাফ৭/৮৬)। এর দ্বারা মাদইয়ান বাসীদের আরেকটিমারাত্মক দোষের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে,তারা রাস্তার মোড়ে চৌকি বসিয়ে লোকদের কাছথেকে অবৈধভাবে চাঁদাআদায় করত ও লুটপাট করত।সাথে সাথে তারা লোকদেরকে শো‘আয়েব(আঃ)-এর উপরে ঈমান আনতে নিষেধ করতও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করত। তারা সর্বদা আল্লাহর পথেবক্রতার সন্ধান করত’ (আ‘রাফ ৭/৮৬) এবং কোথাওঅঙ্গুলি রাখার জায়গা পেলে আপত্তি ও সন্দেহেরঝড় তুলে মানুষকে সত্যধর্ম হ’তে বিমুখ করারচেষ্টায় থাকত।মাদইয়ানবাসীদের আরেকটি দুষ্কর্মছিল যে, তারা প্রচলিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রারপার্শ্বহ’তে সোনা ও রূপার কিছু অংশ কেটেরেখে সেগুলো বাজারে চালিয়ে দিত।শো‘আয়েব (আঃ) তাদেরকে একাজ থেকেনিষেধ করেন।[6]পঞ্চমতঃ তাদের অকৃতজ্ঞতারবিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলাহয়েছে যে, ‘স্মরণকর তোমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, অতঃপর আল্লাহতোমাদের বংশবৃদ্ধি করে তোমাদেরকে একটিবিরাট জাতিতে পরিণত করেছেন’ (আ‘রাফ ৭/৮৬)।তোমরা ধন-সম্পদে হীন ছিলে, অতঃপরআল্লাহতোমাদের প্রাচুর্য দান করেছেন। অথচ তোমরাআল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে নানাবিধ শিরক ওকুফরীতে লিপ্ত হয়েছ। অতএব তোমরা সাবধানহও এবং তোমাদের পূর্ববর্তী কওমে নূহ, ‘আদ,ছামূদ ও কওমে লূত-এর ধ্বংসলীলার কথা স্মরণ কর(আ‘রাফ ৭/৮৬)। তাদের মর্মান্তিক পরিণাম ওঅকল্পনীয় গযবের কথা মনে রেখে হিসাব-নিকাশকরে পা বাড়াও।ষষ্ঠতঃ মাদইয়ানবাসীদের উত্থাপিতএকটি সন্দেহের জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা বলতযে, ঈমানদারগণ যদি ভাল ও সৎ হয়, আর আমরা কাফিররাযদি মন্দ ও পাপী হই, তাহ’লে আমাদের উভয়দলের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা একরূপ কেন?কাফিররা অপরাধী হ’লে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের শাস্তিদিতেন। এর উত্তরে নবী বলেন, ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ ، ‘অপেক্ষা করযতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মাঝে ফায়ছালা করেনবস্ত্ততঃ তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী’ (আ‘রাফ ৭/৮৭)।অর্থাৎ আললাহ স্বীয় সহনশীলতা ও কৃপাগুণেপাপীদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তারা যখনচূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়, তখন সত্য ও মিথ্যার ফায়ছালানেমে আসে। তোমাদের অবস্থাও তদ্রূপ হবে।অবিশ্বাসী ও পাপীদের উপরে আল্লাহর চূড়ান্তগযব সত্বর নাযিল হয়ে যাবে। একই ধরনেরবক্তব্য উল্লেখিত হয়েছে সূরা হূদে (১১/৮৪-৮৬আয়াতে)।হযরত শো‘আয়েব (আঃ) একথাও বলেনযে,‘(আমার এ দাওয়াতের জন্য) আমি তোমাদেরকাছে কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদানবিশ্বপালনকর্তাই দেবেন’ (শু‘আরা ২৬/১৮০)। তিনিবললেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও শেষদিবসের আশা রাখ। তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টিকরো না’ (আনকাবূত ২৯/৩৬)।শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতি :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরনিঃস্বার্থ ও আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াত তাঁর উদ্ধতকওমের নেতাদের হৃদয়ে রেখাপাত করল না।তারাবরং আরও উদ্ধত হয়ে তাঁর দরদ ভরা সুললিত বয়ান ওঅপূর্ব চিত্তহারী বাগ্মীতার জবাবে পূর্ববর্তীধ্বংসপ্রাপ্ত কওমের পাপিষ্ঠ নেতাদের ন্যায়নবীকে প্রত্যাখ্যান করল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ওতাচ্ছিল্য করেবলল, ﺃَﺻَﻼَﺗُﻚَ ﺗَﺄْﻣُﺮُﻙَ ﺃَﻥْ ﻧَﺘْﺮُﻙَ ﻣَﺎ ﻳَﻌْﺒُﺪُﺁﺑَﺎﺅُﻧَﺎ ﺃَﻭْ ﺃَﻥْ ﻧَﻔْﻌَﻞَ ﻓِﻲ ﺃَﻣْﻮَﺍﻟِﻨَﺎﻣَﺎ ﻧَﺸَﺂﺀ ﺇِﻧَّﻚَ ﻟَﺄَﻧﺖَ ﺍﻟْﺤَﻠِﻴﻢُﺍﻟﺮَّﺷِﻴﺪُ – ‘তোমার ছালাত কি তোমাকে একথা শিখায়যে, আমরা আমাদের ঐসব উপাস্যের পূজা ছেড়েদিই, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যুগ যুগ ধরে যেসবের পূজা করে আসছে? আর আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত আমরা যা কিছু করে থাকি, তা পরিত্যাগকরি? তুমি তো একজন সহনশীল ও সৎ ব্যক্তি’ (হূদ১১/৮৭)। অর্থাৎ তুমি একজন জ্ঞানী, দূরদর্শী ওসাধু ব্যক্তি হয়ে একথা কিভাবে বলতে পার যে,আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসাদেব-দেবীর পূজা ও শেরেকী প্রথা সমূহপরিত্যাগ করি এবং আমাদের আয়-উপাদানে ও রূযী-রোজগারে ইচ্ছামত চলা ছেড়ে দেই। আয়-ব্যয়ে কোন্টা হালাল কোন্টাহারাম তা তোমার কাছথেকে জেনে নিয়ে কাজ করতে হবে এটা কিকখনো সম্ভব হ’তে পারে? তাদের ধারণা মতেতাদের সকল কাজ চোখ বুঁজে সমর্থন করা ওতাতে বরকতের জন্য দো‘আ করাই হ’ল সৎ ও ভালমানুষদের কাজ। ঐসব কাজে শিরক ও তাওহীদ, হারামও হালালের প্রশ্ন তোলা কোন ধার্মিক (?) ব্যক্তিরকাজ নয়।দ্বিতীয়তঃ তারা ইবাদাত ও মু‘আমালাতকেপরস্পরের প্রভাবমুক্ত ভেবেছিল। ইবাদতকবুলের জন্য যে রূযী হালাল হওয়া যরূরী, একথাতাদের বুঝে আসেনি। সেজন্য তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল-হারামের বিধান মানতে রাযী ছিল না।যদিও ছালাত আদায়ে কোন আপত্তি তাদের ছিল না।কেননা দেব-দেবীর পূজা সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্তাহিসাবে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি সবারইছিল (লোকমান ৩১/২৫)। তাদের আপত্তি ছিল কেবলএকখানে যে, সবকিছু ছেড়ে কেবলমাত্রআল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং দুনিয়াবীক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-নিষেধমেনেচলতে হবে। তারা ধর্মকে কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমিত মনে করত এবংব্যবহারিক জীবনে তার কোন দখল দিতেপ্রস্ত্তত ছিল না। শো‘আয়েব (আঃ) অধিকাংশ সময়ছালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন বলে তাকেবিদ্রূপ করে কোন কোন মূর্খ নেতা এরূপ কথাওবলে ফেলে যে, তোমার ছালাত কি তোমাকেএসব আবোল-তাবোল কথা-বার্তা শিক্ষা দিচ্ছে?কওমের লোকদের এসব বিদ্রূপবান ও রূঢ় মন্তব্যসমূহে বিচলিত না হয়ে অতীব ধৈর্য ও দরদেরসাথে তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﺃَﻳْﺘُﻢْ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖُ ﻋَﻠَﻰ ﺑَﻴِّﻨَﺔٍ ﻣِﻦ ﺭَّﺑِّﻲ ﻭَﺭَﺯَﻗَﻨِﻲ ﻣِﻨْﻪُﺭِﺯْﻗًﺎ ﺣَﺴَﻨًﺎ ﻭَﻣَﺎ ﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺃَﻥْ ﺃُﺧَﺎﻟِﻔَﻜُﻢْ ﺇِﻟَﻰ ﻣَﺎ ﺃَﻧْﻬَﺎﻛُﻢْ ﻋَﻨْﻪُ ﺇِﻥْﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺇِﻻَّ ﺍﻹِﺻْﻼَﺡَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ ﻭَﻣَﺎ ﺗَﻮْﻓِﻴْﻘِﻲْ ﺇِﻻَّ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻪِﺗَﻮَﻛَّﻠْﺖُ ﻭَﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺃُﻧِﻴْﺐُ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻻَ ﻳَﺠْﺮِﻣَﻨَّﻜُﻢْ ﺷِﻘَﺎﻗِﻲْ ﺃَﻥﻳُّﺼِﻴْﺒَﻜُﻢْ ﻣِﺜْﻞُ ﻣَﺎ ﺃَﺻَﺎﺏَ ﻗَﻮْﻡَ ﻧُﻮْﺡٍ ﺃَﻭْﻗَﻮْﻡَ ﻫُﻮْﺩٍ ﺃَﻭْ ﻗَﻮْﻡَﺻَﺎﻟِﺢٍ ﻭَﻣَﺎ ﻗَﻮْﻡُ ﻟُﻮْﻁٍ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﺑِﺒَﻌِﻴْﺪٍ- ﻭَﺍﺳْﺘَﻐْﻔِﺮُﻭﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢْﺛُﻤَّﺘُﻮْﺑُﻮْﺍ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲ ﺭَﺣِﻴْﻢٌ ﻭَﺩُﻭْﺩٌ – ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻳَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻣَﺎﻧَﻔْﻘَﻪُ ﻛَﺜِﻴﺮًﺍ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﻘُﻮْﻝُ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﺮَﺍﻙَ ﻓِﻴْﻨَﺎ ﺿَﻌِﻴْﻔًﺎﻭَﻟَﻮْﻻَ ﺭَﻫْﻄُﻚَﻟَﺮَﺟَﻤْﻨَﺎﻙَ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺑِﻌَﺰِﻳْﺰٍ- ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﻫْﻄِﻲْ ﺃَﻋَﺰُّﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﺗَّﺨَﺬْﺗُﻤُﻮْﻩُ ﻭَﺭَﺍﺀَﻛُﻢْ ﻇِﻬْﺮِﻳًّﺎ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲْ ﺑِﻤَﺎﺗَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ ﻣُﺤِﻴْﻂٌ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﻤَﻠُﻮْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻜَﺎﻧَﺘِﻜُﻢْ ﺇِﻧِّﻲْﻋَﺎﻣِﻞٌ ﺳَﻮْﻑَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ، ﻣَﻦ ﻳَّﺄْﺗِﻴﻪِ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﻳُّﺨْﺰِﻳْﻪِ ﻭَﻣَﻦْ ﻫُﻮَﻛَﺎﺫِﺏٌ ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ – ‏( ﻫﻮﺩ ৮৮-৯৩)-‘হেআমার জাতি! তোমরা কি মনে কর আমি যদি আমারপালনকর্তার পক্ষ হ’তে সুস্পষ্ট দলীলের উপরেকায়েম থাকি, আর তিনি যদি নিজের তরফ থেকেআমাকে (দ্বীনী ও দুনিয়াবী) উত্তম রিযিক দানকরে থাকেন, (তবে আমি কি তাঁর হুকুম অমান্যকরতে পারি?)। আর আমি চাই না যে, আমিতোমাদেরকে যে বিষয়ে নিষেধ করি, পরেনিজেই সে কাজে লিপ্ত হই। আমি আমার সাধ্যমততোমাদের সংশোধন চাই মাত্র। আর আমার কোনইক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত। আমি তাঁরউপরেইনির্ভর করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই’ (৮৮)।‘হে আমার জাতি! আমার প্রতি হঠকারিতা করে তোমরানিজেদের উপরে নূহ, হূদ বা ছালেহ-এর কওমেরমত আযাব ডেকে এনো না। আর লূতের কওমেরঘটনা তো তোমাদের থেকে দূরে নয়’ (৮৯)।‘তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনাকর ও তাঁর দিকেই ফিরে এস। নিশ্চয়ই আমারপালনকর্তা অতীব দয়ালু ও প্রেমময়’ (৯০)। ‘তারাবলল, হে শো‘আয়েব! তোমার অত শত কথাআমরা বুঝি না। তোমাকে তো আমাদের মধ্যকারএকজন দুর্বল ব্যক্তি বলে আমরা মনে করি। যদিতোমার জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা না থাকত,তাহ’লে এতদিন আমরা তোমাকে পাথর মেরে চূর্ণকরে ফেলতাম। তুমি আমাদের উপরে মোটেইপ্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি নও’ (৯১)। ‘শো‘আয়েববলল, হে আমার কওম! আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী কিতোমাদের নিকটে আল্লাহর চেয়ে অধিকক্ষমতাশালী? অথচ তোমরা তাঁকে পরিত্যাগ করেপিছনে ফেলে রেখেছ? মনে রেখতোমাদের সকল কার্যকলাপ আমার পালনকর্তারআয়ত্তাধীন’ (৯২)। ‘অতএব হে আমার জাতি!তোমরা তোমাদের স্থানে কাজ কর, আমিওকাজকরে যাই। অচিরেই তোমরা জানতে পারবেকার উপরে লজ্জাষ্কর আযাব নেমে আসে, আরকে মিথ্যাবাদী। তোমরা অপেক্ষায় থাক, আমিওঅপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ ১১/৮৮-৯৩)।জবাবে ‘তাদেরদাম্ভিক নেতারা চূড়ান্তভাবে বলে দিল, ﻟَﻨُﺨْﺮِﺟَﻨَّﻚَ ﻳَﺎﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﻣَﻌَﻚَ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺘِﻨَﺎ ﺃَﻭْ ﻟَﺘَﻌُﻮﺩُﻥَّ ﻓِﻲﻣِﻠَّﺘِﻨَﺎ – ‘হে শো‘আয়েব! আমরা অবশ্যইতোমাকে ও তোমার সাথী ঈমানদারগণকে শহরথেকে বের করে দেব অথবা তোমরাআমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে’ (আ‘রাফ৭/৮৮)। তারা আরও বলল, ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺴَﺤَّﺮِﻳﻦَ- ﻭَﻣَﺎﺃَﻧْﺖَ ﺇِﻟَّﺎ ﺑَﺸَﺮٌ ﻣِﺜْﻠُﻨَﺎ ﻭَﺇِﻥْ ﻧَﻈُﻨُّﻚَ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟْﻜَﺎﺫِﺑِﻴﻦَ – ﻓَﺄَﺳْﻘِﻂْﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻛِﺴَﻔًﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ187-185 )-‘নিঃসন্দেহে তুমি জাদুগ্রস্তদের অন্যতম’।‘তুমি আমাদের মত একজন মানুষ বৈ কিছুই নও।আমাদের ধারণা তুমি অবশ্যই মিথ্যাবাদীদেরঅন্তর্ভুক্ত’। ‘এক্ষণে যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবেআকাশের কোন টুকরা আমাদের উপরে ফেলেদাও’ (শো‘আরা ২৬/১৮৫-১৮৭)। শো‘আয়েব (আঃ)তখন নিরাশ হয়ে প্রথমে কওমকে বললেন, ﻗَﺪِﺍﻓْﺘَﺮَﻳْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﻛَﺬِﺑﺎً ﺇِﻥْ ﻋُﺪْﻧَﺎ ﻓِﻲ ﻣِﻠَّﺘِﻜُﻢ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺫْ ﻧَﺠَّﺎﻧَﺎﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻟَﻨَﺎ ﺃَﻥْ ﻧَﻌُﻮﺩَ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺇِﻻَّ ﺃَﻥ ﻳَّﺸَﺂﺀَ ﺍﻟﻠﻪُﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻭَﺳِﻊَ ﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋِﻠْﻤﺎً ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﺗَﻮَﻛَّﻠْﻨَﺎ ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ৮৯)-‘আমরা আল্লাহর উপরে মিথ্যারোপকারী হয়েযাব যদি আমরা তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই। অথচআল্লাহ আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।ঐ ধর্মে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়,তবে যদি আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ সেটা চান।আমাদের পালনকর্তা স্বীয় জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেকবস্ত্তকে বেষ্টন করে আছেন। (অতএব)আল্লাহর উপরেই আমরাভরসা করলাম।’অতঃপর তিনিআল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বললেন, ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺍﻓْﺘَﺢْﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﺑَﻴْﻦَ ﻗَﻮْﻣِﻨَﺎ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﺃَﻧﺖَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﻔَﺎﺗِﺤِﻴﻦَ – ‘হেআমাদের পালনকর্তা! আমাদের ও আমাদেরকওমের মধ্যে তুমি যথার্থ ফায়ছালা করে দাও। আরতুমিই তো শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (৮৯)। ‘তখন তারকওমের কাফের নেতারা বলল, ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻸُ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَﻛَﻔَﺮُﻭﺍ ﻣِﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻟَﺌِﻦِ ﺍﺗَّﺒَﻌْﺘُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﺇِﻧَّﻜُﻢْ ﺇِﺫﺍً ﻟَّﺨَﺎﺳِﺮُﻭﻥَ -যদি তোমরা শো‘আয়েবের অনুসরণ কর, তবেতোমরা নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (আ‘রাফ৭/৮৯-৯০)।অতঃপর শো‘আয়েব (আঃ) স্বীয়কওমের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এ বিষয়েআল্লাহ বলেন, ﻓَﺘَﻮَﻟَّﻰ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺑْﻠَﻐْﺘُﻜُﻢْﺭِﺳَﺎﻻَﺕِ ﺭَﺑِّﻲ ﻭَﻧَﺼَﺤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻓَﻜَﻴْﻒَ ﺁﺳَﻰ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﻮْﻡٍﻛَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৯৩)-‘অনন্তর তিনি তাদের কাছথেকে প্রস্থান করলেন এবং বললেন, হে আমারসম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকেআমার প্রতিপালকেরপয়গাম পৌছে দিয়েছি এবং তোমাদের উপদেশদিয়েছি। এখন আমি কাফেরদের জন্যআর কিভাবেসহানুভূতি দেখাব’ (আ‘রাফ ৭/৯৩)।শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ:হযরত শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর কওমেরনেতাদের মধ্যকার উপরোক্ত কথোপকথনেরমধ্যে নিম্নোক্ত শিক্ষণীয় বিষয়গুলি ফুটে ওঠে।যেমন:(১) শো‘আয়েব (আঃ) একটি সম্ভ্রান্তগোত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। নবুঅতেরসম্পদ ছাড়াও তিনি দুনিয়াবী সম্পদে সমৃদ্ধিশালীছিলেন। বস্ত্ততঃ সকল নবীই স্ব স্ব যুগেরসম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তারাউচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তি ছিলেন। (২) কওমেরনেতারা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় বিধি-বিধানমানতে প্রস্ত্তত থাকলেও বৈষয়িক জীবনেধর্মীয় বাধা-নিষেধ মানতেরাযী ছিল না (৩)আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাদের মধ্যেঅসীলা পূজা ও মূর্তিপূজার শিরকের প্রাদুর্ভাবঘটেছিল (৪) বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসারসমপূজা ছেড়ে নির্ভেজাল তাওহীদের সংস্কারধর্মী দাওয়াত তারা কবুল করতে প্রস্ত্তত ছিল না (৫)মূলতঃ দুনিয়া পূজা ও প্রবৃত্তি পূজারকারণেই তারা শিরকীরেওয়াজ এবং বান্দার হক বিনষ্টকারী অপকর্মসমূহের উপরে যিদ ধরেছিল।(৬) প্রচলিত কোনঅন্যায় রসমের সঙ্গে আপোষ করে তা দূর করাসম্ভবনয়। বরং শত বাধা ও ক্ষতি স্বীকার করেহ’লেও স্রেফ আল্লাহর উপরে ভরসা করেআপোষহীনভাবে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াইপ্রকৃত সমাজ সংস্কারকের কর্তব্য (৭) সংস্কারককেসর্বদা স্পষ্ট দলীলের উপরে কায়েম থাকতেহবে (৮) তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল ও প্রকৃতসমাজদরদী হ’তে হবে (৯) কোনরূপ দুনিয়াবীপ্রতিদানের আশাবাদী হওয়া চলবে না (১০) সকলব্যাপারে কেবল আল্লাহর তাওফীক কামনা করতেহবে এবং প্রতিদান কেবল তাঁর কাছেই চাইতে হবে(১১) শিরক-বিদ‘আত ও যুলুম অধ্যুষিত সমাজেতাওহীদের দাওয়াতের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রমচালিয়ে যাওয়াকে দুনিয়াদার সমাজনেতারা ‘ফাসাদ’ ও‘ক্ষতিকর’ মনে করলেও মূলতঃ সেটাই হ’ল ‘ইছলাহ’বা সমাজ সংশোধনের কাজ। সকল বাধা উপেক্ষাকরেতাওহীদের দাওয়াত দিয়ে যাওয়াই হ’ল সংস্কারকেরমূল কর্তব্য (১২) চূড়ান্ত অবস্থায় আল্লাহর নিকটেইফায়ছালা চাইতে হবে।আহলে মাদইয়ানের উপরেআপতিত গযবের বিবরণ :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর শত উপদেশ উপেক্ষা করে যখন কওমেরনেতারা তাদের অন্যায় কর্মসমূহ চালিয়ে যাবারব্যাপারে অনড় রইল এবং নবীকে জনপদ থেকেবের করেদেবার ও হত্যা করার হুমকি দিল ওসর্বোপরি হঠকারিতা করে তারা আল্লাহর গযবপ্রত্যক্ষ করতে চাইল, তখন তিনি বিষয়টি আল্লাহরউপরে সোপর্দ করলেন এবং কওমেরনেতাদের বললেন, ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ ‘(ঠিকআছে), তোমরা এখন আযাবের অপেক্ষায় থাক।আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ১১/৯৩)।বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় চিরন্তনবিধান অনুযায়ী শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর ঈমানদারসাথীগণকে উক্ত জনপদ হ’তে অন্যত্র নিরাপদেসরিয়ে নিলেন। অতঃপর জিবরীলের একগগণবিদারী নিনাদে অবাধ্য কওমের সকলেনিমেষে ধ্বংস হয়ে গেল। এ বিষয়ে আল্লাহবলেন, ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَ ﺃَﻣْﺮُﻧَﺎ ﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻣَﻌَﻪُﺑِﺮَﺣْﻤَﺔٍ ﻣِّﻨَّﺎ ﻭَﺃَﺧَﺬَﺕِ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍ ﺍﻟﺼَّﻴْﺤَﺔُ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤُﻮْﺍ ﻓِﻲﺩِﻳَﺎﺭِﻫِﻢْ ﺟَﺎﺛِﻤِﻴْﻦَ- ﻛَﺄَﻥ ﻟَّﻢْ ﻳَﻐْﻨَﻮْﺍﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﻻَ ﺑُﻌْﺪﺍً ﻟِّﻤَﺪْﻳَﻦَ ﻛَﻤَﺎﺑَﻌِﺪَﺕْ ﺛَﻤُﻮْﺩُ- ‏(ﻫﻮﺩ ৯৪-৯৫)-‘অতঃপর যখন আমারআদেশ এসে গেল, তখন আমি শো‘আয়েব ওতার ঈমানদার সাথীদের নিজ অনুগ্রহে রক্ষা করলাম।আর পাপিষ্ঠদের উপর বিকট গর্জন আপতিত হ’ল।ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে মরেপড়ে রইল’। ‘(তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হ’ল) যেন তারাকখনোই সেখানে বসবাস করেনি। সাবধান! ছামূদজাতির উপর অভিসম্পাতের ন্যায় মাদইয়ানবাসীরউপরেও অভিসম্পাত’ (হূদ ১১/৯৪-৯৫)। যদিও তারাদুনিয়াতে মযবুত ও নিরাপদ অট্টালিকায় বসবাস করত।আছহাবে মাদইয়ানের উপরে গযবের ব্যাপারেকুরআনে ﻇُﻠَّﺔٌ (শো‘আরা ১৮৯), ﺭَﺟْﻔَﺔٌ (হূদ ৯৪),ﺻَﻴْﺤَﺔٌ (আ‘রাফ ৮৮) তিন ধরনের শব্দ ব্যবহৃতহয়েছে। যার অর্থ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, বিকট নিনাদ,ভূমিকম্প। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন,আহলে মাদইয়ানের উপরে প্রথমে সাতদিন এমনভীষণ গরম চাপিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা দহনজ্বালায় ছটফট করতে থাকে। অতঃপরআল্লাহ তা‘আলাএকটি ঘন কালো মেঘমালা পাঠিয়ে দিলেন, যার নীচদিয়ে শীতল বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন কওমেরলোকেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে সেখানে দৌড়ে এল।এভাবে সবাই জমা হবার পর হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হ’ল এবংমেঘমালা হ’তে শুরু হল অগ্নিবৃষ্টি। তাতে মানুষ সবপোকা-মাকড়ের মত পুড়ে ছাই হ’তে লাগল। ইবনুআববাস (রাঃ) ওমুহাম্মাদ বিন কা‘ব আল-কুরাযী বলেন,অতঃপর তাদের উপর নেমে আসে এক বজ্রনিনাদ।যাতে সব মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল’।[7] এভাবেকোনরূপ গ্রেফতারী পরোয়ানা ও সিপাই-সান্ত্রীর প্রহরা ছাড়াই আল্লাহদ্রোহীরা সবাইপায়ে হেঁটে স্বেচ্ছায় বধ্যভূমিতে উপস্থিত হয়এবং চোখের পলকে সবাই নিস্তনাবুদ হয়ে যায়।মক্কা থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথেএসব ধ্বংসস্থলনযরে পড়ে। আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﻢْ ﺃَﻫْﻠَﻜْﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺔٍﺑَﻄِﺮَﺕْ ﻣَﻌِﻴْﺸَﺘَﻬَﺎ ﻓَﺘِﻠْﻚَ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨُﻬُﻢْ ﻟَﻢْ ﺗُﺴْﻜَﻦ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِﻫِﻢْ ﺇِﻟَّﺎﻗَﻠِﻴْﻼً ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺍﻟْﻮَﺍﺭِﺛِﻴﻦَ ، ‘এসব জনপদ ধ্বংস হওয়ার পরপুনরায় আবাদ হয়নি অল্প কয়েকটি ব্যতীত।অবশেষে আমরাই এ সবের মালিক রয়েছি’ (ক্বাছাছ২৮/৫৮)। তিনি বলেন, ﺇِﻥَّ ﻓِﻲ ﺫَﻟِﻚَ ﻵﻳَﺎﺕٍ ﻟِّﻠْﻤُﺘَﻮَﺳِّﻤِﻴْﻦَ ،‘নিশ্চয়ই এর মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্যনিদর্শনসমূহ রয়েছে’ (হিজর ১৫/৭৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)যখন এসব স্থান অতিক্রম করতেন, তখন আল্লাহরভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন ও সওয়ারীকে দ্রুতহাঁকিয়ে নিয়ে স্থান অতিক্রম করতেন।[8] অথচএখনকার যুগের বস্ত্তবাদী লোকেরা এসবস্থানকে শিক্ষাস্থল না বানিয়ে পর্যটন কেন্দ্রেরনামে তামাশার স্থলে পরিণত করেছে। আল্লাহআমাদের সুপথ প্রদর্শন করুন- আমীন!ওয়াহাব বিনমুনাবিবহ বলেন, শু‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর মুমিন সাথীগণমক্কায় চলে যান ও সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। কা‘বাগৃহের পশ্চিম দিকে দারুন নাদওয়া ও দার বনু সাহ্মেরমধ্যবর্তী স্থানে তাদের কবর হয়’।[9] তবে এইসকল বর্ণনার ভিত্তি সুনিশ্চিত নয়। আর থাকলেওসেগুলি সবই এখন নিশ্চিহ্ন এবং সবই বায়তুল্লাহরচতুঃসীমার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।[1]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[2]. মু‘জামুলবুলদান, বৈরুত : দার ছাদের, ১৯৭৯), ৫/৭৭ পৃঃ, ।[3].আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[4]. ইবনু কাছীর,আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৬৪ পৃঃ।[5]. যথাক্রমে সূরাআ‘রাফ ৭/৮৫-৯৩=৯; তওবাহ ৯/৭০; হূদ ১১/৮৪-৯৫=১২;হিজর ১৫/৭৮-৭৯; হজ্জ ২২/৪৪;শো‘আরা২৬/১৭৬-১৯১=১৬; ক্বাছাছ ২৮/২৩-২৮=৬; আনকাবূত২৯/৩৬-৩৭; ছোয়াদ ৩৮/১৩-১৫=৩; ক্বাফ ৫০/১৪।সর্বমোট = ৫৩টি।[6]. তাফসীরে কুরতুবী, হূদ৮৭।[7]. তাফসীর ইবনে কাছীর, শো‘আরা ১৮৯;কুরতুবী, ঐ।[8]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫১২৫‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ‘যুলুম’ অনুচ্ছেদ।[9]. আল-বিদায়াহওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৯।

Translate