Tuesday, August 4, 2026

ইমাম রুকুতে চলে গেছেন অথচ আপনার সূরা ফাতিহা শেষ হয়নি তখন কী করবেন

 অনেক সময় কিছু ইমাম (আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত করুন) সিররি বা নিচুস্বরে কিরাত পড়ার সালাতে এত দ্রুত সূরা ফাতিহা পাঠ করে রুকুতে চলে যান যে, পেছনে যে সব মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পাঠ করে তারা তা শেষ করতে পারে না। এমতবস্থায় সে মুক্তাদি কী করবে?

— সে কি একা একা সূরা ফাতিহা পাঠ করে তারপর রুকুতে যাবে ইমাম রুকু থেকে উঠে গেলেও? অতঃপর পরে সে রাকাতটা ইমামের সালাম ফেরানোর পর একাকী উঠে কাজা পড়ে নিবে? (যেহেতু অধিক বিশুদ্ধ মতে ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পড়া সালাতের রোকন। তা ছাড়া সালাত শুদ্ধ হবে না।)
— নাকি যতটুকু পড়া হয়েছে ততটুকু পড়েই ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হবে?
— আর এমনটি করলে কি তার ঐ রাকাতটি শুদ্ধ বলে গণ্য হবে নাকি হবে না?
এসব বিষয়ে অনেক মুসল্লি দ্বিধান্বিত থাকে। তাই এই বহুল জিজ্ঞাসিত সমস্যার সঠিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো, যুগের তিন শ্রেষ্ঠ আলেম তথা শাইখ উসাইমিন (রাহ.), শাইখ বিন বায (রাহ.) এবং শাইখ আলবানি (রাহ.)-এর দলিল ভিত্তিক ফতওয়ার আলোকে:
তার আগে আমাদের জানা কর্তব্য যে, সূরা ফাতিহা পাঠ করা ইমাম, মুক্তাদি ও একাকী সালাত আদায়কারী—প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই প্রতি রাকাতেই একটি রোকন (অপরিহার্য অংশ)। ফকিহগণের নিকট এটিই সর্বাধিক অগ্রগণ্য মত। এর সপক্ষে প্রমাণ হলো, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিম্নোক্ত হাদিসটি:
“مَنْ صَلَّى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَهِيَ خِدَاجٌ -ثَلَاثًا- غَيْرُ تَمَامٍ”
“যে ব্যক্তি এমন সালাত আদায় করল যাতে সে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পাঠ করল না তার সেই সালাত ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ—অসম্পূর্ণ।” [সহিহ মুসলিম: ৩৯৫, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত]
এ ছাড়াও এ মর্মে আরও বহু হাদিস রয়েছে। তবে এই বিধান থেকে কেবল একটি ক্ষেত্র ব্যতিক্রম আর তা হলো ‘মাসবুক’ (দেরিতে জামাতে আসা মুক্তাদি), যদি সে ইমামকে রুকু অবস্থায় পায়।
❒ শাইখ ইবনে উসাইমিন (রাহ.) বলেন:
«هَذَا الَّذِي ذَكَرْنَاهُ ـ وَهُوَ أَنَّ قِرَاءَةَ الْفَاتِحَةِ رُكْنٌ فِي حَقِّ كُلِّ مُصَلٍّ: الْإِمَامِ، وَالْمَأْمُومِ، وَالْمُنْفَرِدِ. وَلَا يُسْتَثْنَى مِنْهَا إِلَّا مَسْأَلَةٌ وَاحِدَةٌ، وَهِيَ الْمَسْبُوقُ إِذَا أَدْرَكَ إِمَامَهُ رَاكِعاً، أَوْ قَائِماً وَلَمْ يَتَمَكَّنْ مِنْ قِرَاءَةِ الْفَاتِحَةِ ـ هَذَا هُوَ الَّذِي دَلَّتْ عَلَيْهِ الْأَدِلَّةُ الشَّرْعِيَّةُ.
فَإِذَا قَالَ قَائِلٌ: مَا الدَّلِيلُ عَلَى اسْتِثْنَاءِ هَذِهِ الصُّورَةِ؟
فَالْجَوَابُ: الدَّلِيلُ عَلَى ذَلِكَ حَدِيثُ أَبِي بَكْرَةَ الثَّابِتُ فِي صَحِيحِ الْبُخَارِيِّ حَيْثُ أَدْرَكَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ رَاكِعٌ، فَأَسْرَعَ وَرَكَعَ قَبْلَ أَنْ يَصِلَ إِلَى الصَّفِّ، ثُمَّ دَخَلَ فِي الصَّفِّ، فَلَمَّا انْصَرَفَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الصَّلَاةِ سَأَلَ مَنِ الْفَاعِلُ؟ فَقَالَ أَبُو بَكْرَةَ: أَنَا، فَقَالَ: زَادَكَ اللَّهُ حِرْصاً وَلَا تَعُدْ، وَلَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَاءِ الرَّكْعَةِ الَّتِي أَدْرَكَ رُكُوعَهَا، دُونَ قِرَاءَتِهَا، وَلَوْ كَانَ لَمْ يُدْرِكْهَا لَكَانَتْ قَدْ فَاتَتْهُ، وَلَأَمَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَضَائِهَا، كَمَا أَمَرَ الْمُسِيءَ فِي صَلَاتِهِ أَنْ يُعِيدَهَا، فَلَمَّا لَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَائِهَا عُلِمَ أَنَّهُ قَدْ أَدْرَكَ الرَّكْعَةَ، وَسَقَطَتْ عَنْهُ قِرَاءَةُ الْفَاتِحَةِ، فَهَذَا دَلِيلٌ مِنَ النَّصِّ.
وَالْمَعْنَى يَقْتَضِي ذَلِكَ: لِأَنَّ هَذَا الْمَأْمُومَ لَمْ يُدْرِكِ الْقِيَامَ الَّذِي هُوَ مَحَلُّ الْقِرَاءَةِ، فَإِذَا سَقَطَ الْقِيَامُ سَقَطَ الذِّكْرُ الْوَاجِبُ فِيهِ وَهُوَ الْقِرَاءَةُ» انْتَهَى مِنْ “الشَّرْحِ الْمُمْتِعِ” (٣/ ٢٩٨).
“আমরা যা উল্লেখ করেছি—অর্থাৎ সূরা ফাতিহা পাঠ করা ইমাম, মুক্তাদি ও একাকী সালাত আদায়কারী প্রতিটি মুসল্লির জন্যই একটি রোকন। এ নিয়ম থেকে কেবল একটি মাসআলাই ব্যতিক্রম। তা হলো, মাসবুক ব্যক্তি যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় কিংবা এমন অবস্থায় পায় যে ফাতিহা পড়ার সুযোগ পায়নি। (অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সূরা ফাতিহা না পড়লেও সালাত শুদ্ধ হবে) শরয়ি দলিলগুলো মূলত এই বিধানটিই নির্দেশ করে।
কেউ যদি প্রশ্ন করেন: এই ব্যতিক্রমী বিধানের দলিল কী?
এর উত্তর হলো: এর দলিল হলো সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু বাকরা (রা.)-এর প্রসিদ্ধ হাদিস। তিনি এসে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রুকু অবস্থায় পেয়েছিলেন। তাই তিনি তাড়াহুড়ো করে নামাজের কাতারে পৌঁছার আগেই রুকু করে ফেলেন এবং পরে কাতারে গিয়ে শামিল হন।
সালাত শেষে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এমন করেছ?’
আবু বাকরা (রা.) বললেন, ‘আমি।’
তখন তিনি বললেন:
«زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ»
“আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিন। তবে আর এমন করো না।”
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সেই রাকাতটি পুনরায় আদায় করার নির্দেশ দেননি। অথচ তিনি কেবল রুকু পেয়েছিলেন; ফাতিহা পড়ার সুযোগ পাননি। যদি তিনি সেই রাকাত না পেতেন তবে তা তাঁর ছুটে যেত এবং নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে তা কাজা করার নির্দেশ দিতেন—যেমন সালাতে ভুল কারী ব্যক্তিকে (মুসিউস সালাত) তিনি সালাত পুনরায় পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেহেতু তিনি তাঁকে কাজা করার নির্দেশ দেননি তাই প্রমাণিত হলো যে, তিনি রাকাতটি পেয়ে গেছেন এবং তাঁর ওপর থেকে সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে গেছে। এটি একটি স্পষ্ট নস বা শরয়ি দলিল।
আর অর্থের দিক থেকেও বিষয়টি যৌক্তিক। কারণ এই মুক্তাদি কিয়াম বা দাঁড়ানোর অবস্থাটাই পায়নি, যা মূলত কিরাত বা পাঠ করার মূল স্থান। সুতরাং যখন কিয়ামই রহিত হয়ে গেল তখন তার সাথে সম্পৃক্ত ওয়াজিব জিকির তথা কিরাতও রহিত হয়ে গেল।” — সমাপ্ত, “আশ শারহুল মুমতি” (৩/২৯৮) থেকে সংগৃহীত [Islamqa info]
শাইখকে আরও প্রশ্ন করা হয়—
এক ব্যক্তি জামাতে এমন সময় শরিক হলো, যখন ইমাম তাকবিরে তাহরিমা শেষ করে সূরা ফাতিহা পাঠ সম্পন্ন করেছেন। এরপর সে নিজে ফাতিহা পড়া শুরু করল। কিন্তু মাঝপথে ইমাম রুকুতে চলে গেলেন—তাহলে এই মুক্তাদি কি ইমামের সাথে রুকুতে চলে যাবে, নাকি নিজের মতো করে ফাতিহা পাঠ শেষ করবে?
উত্তরে তিনি বলেন, কোনও মুক্তাদি যখন জামাতে এমন সময় প্রবেশ করল যখন ইমাম রুকুতে যাওয়ার উপক্রম করেছেন, আর ওই মুক্তাদি তখনও পূর্ণ ফাতিহা পড়ার সুযোগ পায়নি—তখন দেখতে হবে যে তার কতটুকু বাকি আছে। যদি মাত্র এক বা দুই আয়াত বাকি থাকে, যা দ্রুত পড়ে নিয়ে ইমামকে রুকুতে ধরে ফেলা সম্ভব তবে সে তা-ই করবে (অর্থাৎ ফাতিহা শেষ করে রুকুতে যাবে)।
আর যদি এর চেয়ে বেশি অংশ বাকি থাকে, যা পড়তে গেলে ইমামকে রুকুতে পাওয়া যাবে না তবে সে ফাতিহা অসমাপ্ত রেখেই ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হয়ে যাবে। [al-eman]
❒ আল্লামা শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.):
ইমাম রুকুতে চলে গেছেন অথচ মুসল্লি সূরা ফাতিহা শেষ করতে পারেননি—এখন মুক্তাদির কী করণীয়?
প্রশ্ন: আমাদের এক ভাই জানতে চেয়েছেন: ইমাম রুকুতে চলে গেলেন অথচ আমি তখনও সূরা ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে পারিনি। এই অবস্থায় আমি কি ইমামের সাথে রুকুতে চলে যাব, নাকি ফাতিহা শেষ করব? আর মুক্তাদির ওপর থেকে কখন সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে যায়?
উত্তর:
إِذَا كَانَ لَمْ يَبْقَ إِلَّا شَيْءٌ يَسِيرٌ، كَالْآيَةِ وَالْآيَتَيْنِ يُكْمِلُ، وَإِذَا كُنْتَ تَخْشَى أَنْ يَرْفَعَ؛ فَارْكَعْ، وَيَسْقُطْ عَنْكَ مَا بَقِيَ، كَمَا لَوْ جِئْتَ وَالْإِمَامُ قَدْ رَكَعَ؛ تَرْكَعُ وَتَسْقُطُ عَنْكَ الْفَاتِحَةُ، لَوْ جَاءَ الْمَأْمُومُ وَالْإِمَامُ رَاكِعٌ؛ رَكَعَ مَعَهُ، وَأَجْزَأَهُ، أَجْزَأَتْهُ الرَّكْعَةُ كَمَا فِي صَحِيحِ الْبُخَارِيِّ مِنْ حَدِيثِ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ جَاءَ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَاكِعٌ؛ فَرَكَعَ دُونَ الصَّفِّ، ثُمَّ دَخَلَ فِي الصَّفِّ، فَلَمَّا سَلَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: «زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ» وَلَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَاءِ الرَّكْعَةِ.
وَهَذَا قَوْلُ الْأَئِمَّةِ الْأَرْبَعَةِ جَمِيعًا، أَنَّ مَنْ أَدْرَكَ الْإِمَامَ رَاكِعًا أَجْزَأَتْهُ الرَّكْعَةُ، وَسَقَطَتْ عَنْهُ الْفَاتِحَةُ، فَهَكَذَا إِذَا قَرَأَ أَوَّلَهَا، ثُمَّ خَافَ مِنْ فَوَاتِ الرَّكْعَةِ؛ يَرْكَعُ، وَلَا يَضُرُّهُ ذَلِكَ، وَهَكَذَا لَوْ نَسِيَهَا الْمَأْمُومُ، أَوْ كَانَ جَاهِلًا؛ سَقَطَتْ عَنْهُ، وَأَجْزَأَتْهُ صَلَاتُهُ مَعَ الْإِمَامِ.
بِخِلَافِ الْمُفْرِدِ وَالْإِمَامِ فَإِنَّهَا لَا تُجْزِئُهُ، لَوْ سَهَا عَنْهَا، أَوْ جَهِلَهَا؛ لَابُدَّ مِنْ قِرَاءَتِهَا؛ لِأَنَّهَا رُكْنُ صَلَاتِهِ، أَمَّا الْمَأْمُومُ فَهِيَ فِي حَقِّهِ وَاجِبَةٌ مَعَ الذِّكْرِ، وَمَعَ الْعِلْمِ، بِدَلِيلِ أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَأْمُرْ أَبَا بَكْرَةَ الثَّقَفِيَّ بِالْإِعَادَةِ لَمَّا جَاءَ وَالْإِمَامُ رَاكِعٌ، نَعَمْ
“সূরা ফাতিহা থেকে যদি মাত্র এক বা দুই আয়াত বাকি থাকে তবে তা পড়ে নেওয়া ভালো। তবে যদি আশঙ্কা হয় যে, ইমাম রুকু থেকে মাথা তুলে ফেলবেন তবে দেরি না করে সাথে সাথে রুকুতে চলে যাবে; বাকি অংশটুকু মাফ হয়ে যাবে। যেমন—কোনও মুসল্লি মসজিদে এসে পেলেন যে ইমাম রুকুতে চলে গেছেন। তখন তিনি ইমামের সাথেই রুকুতে শরিক হয়ে যাবেন এবং তাঁর ওপর থেকে ফাতিহা মাফ হয়ে যাবে। এর পক্ষে দলিল রয়েছে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু বাকরা (রা.)-এর ঘটনা। তিনি এসে দেখলেন যে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন রুকুতে আছেন তখন তিনি কাতারে পৌঁছানোর আগেই পেছনের দিকে রুকু করে ফেলেন। এরপর কাতারে গিয়ে যোগ দেন। সালাত শেষে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন,
«زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ»
“আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিন, তবে আর এমন করো না।” [সহিহ বুখারি] নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে সেই রাকাত পুনরায় পড়ার নির্দেশ দেননি। চার মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো:
—যে ব্যক্তি ইমামকে রুকু অবস্থায় পেল তার ওই রাকাত আদায় হয়ে গেল এবং তার থেকে সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে গেল।
– ঠিক তেমনিভাবে, কেউ যদি ফাতিহার কিঞ্চিৎ অংশ পড়ার পর রাকাত ছুটে যাওয়ার ভয়ে রুকুতে চলে যায় তাতে তার কোনও সমস্যা নেই।
– একইভাবে কোনও মুক্তাদি যদি ভুলবশত ফাতিহা না পড়ে অথবা এ বিধান না জানার কারণে না পড়ে তবে তার থেকেও তা মাফ হয়ে যাবে এবং ইমামের সাথে তার সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে।
➧ তবে একা সালাত আদায়কারী (মুনফারিদ) এবং ইমামের হুকুম ভিন্ন। তারা যদি ভুলে যান কিংবা না জেনে ছেড়ে দেন তবুও তাঁদের জন্য ফাতিহা পড়া জরুরি। কারণ এটি তাঁদের সালাতের রোকন (অপরিহার্য অংশ)। পক্ষান্তরে মুক্তাদির ক্ষেত্রে তা স্মরণ থাকা ও জানার শর্তে ওয়াজিব। এর বড় প্রমাণ তো সেটাই, যেখানে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবু বাকরা সাকাফি (রা.)-কে রাকাত পুনরায় পড়ার হুকুম দেননি। অথচ তিনি ইমামকে রুকু অবস্থায় পেয়েছিলেন।”
ফতওয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)।
সাবেক প্রধান মুফতি এবং সভাপতি, সিনিয়র স্কলার পরিষদ, সৌদি আরব।
❒ আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি (রাহ.):
আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি রাহ.-এর ফতওয়ার সারাংশ নিম্নরূপ:
কোনও মুক্তাদির যদি প্রবল ধারণা হয় যে, একটু দ্রুত পড়লে সে সূরা ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে পারবে এবং ইমাম রুকু থেকে ওঠার আগেই তাকে রুকুতে গিয়ে ধরে ফেলতে পারবে তবে সে ফাতিহা শেষ করেই রুকুতে যাবে।
আর যদি তার প্রবল ধারণা হয় যে, ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে গেলে ইমামের রুকু ছুটে যাবে তবে সে আর অপেক্ষা করবে না; যতটুকু পড়তে পেরেছে ততটুকুই থামিয়ে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ফাতিহা অসম্পূর্ণ থাকলেও তার সালাতে কোনও সমস্যা হবে না। শাইখ আলবানি (রাহ.) এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন যে, সালাতে রুকু পাওয়া নিয়ে সকল মুসলিম আলেম একমত যে এটি সালাতের একটি অপরিহার্য রোকন; রুকু না করলে রাকাতই আদায় হবে না। এর বিপরীতে, মুক্তাদির ওপর সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব কি না—এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে বেশ মতভেদ রয়েছে। যেমন—হানাফি মাজহাবের মতে, মুক্তাদি ইমামের পেছনে চুপ থাকবে এবং কোনও কিছুই (না ফাতিহা, না অন্য কিছু) পড়বে না। যদিও শাইখ আলবানি হানাফিদের এই মতটিকে দুর্বল (মারজুহ) মনে করেন এবং “যে ব্যক্তি ফাতিহা পড়েনি তার সালাত হয়নি”—এই হাদিসটিকেই সঠিক মনে করেন তবুও তিনি মনে করেন এই হাদিসটি একেবারে ব্যতিক্রমহীন নয়। কারণ একাধিক সাহাবি থেকে প্রমাণিত আছে যে, দেরিতে জামাতে আসা মুক্তাদি (মাসবুক) যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় তবে সে ফাতিহা পড়তে না পারলেও ওই রাকাত তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই এই হাদিসটিকে “আম মাখসুস” العامِّ المخصوص বা এমন একটি সাধারণ হুকুম বলা হয় যার নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। অর্থাৎ নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস—”যে ব্যক্তি ফাতিহা পড়েনি, তার সালাত হয়নি”—এটি মূলত সাধারণ একটি নিয়ম। তবে মাসবুক বা দেরিতে আসা ব্যক্তি যখন ইমামকে রুকুতে পান তখন তিনি ফাতিহা পড়ার সুযোগ না পেলেও তাঁর রাকাত আদায় হয়ে যায়। সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত এই ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ নিয়মের ভেতর এটি একটি নির্দিষ্ট ছাড়। তাই আপনার যদি মনে হয় যে ফাতিহা শেষ করতে গেলে ইমাম রুকু থেকে মাথা তুলে ফেলবেন, তবে আর দেরি না করে সাথে সাথে রুকুতে চলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে; অসম্পূর্ণ ফাতিহা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

লোবানের পরিচয় ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং লোবান খাওয়ার ব্যাপারে কতিপয় হাদিস

 নিম্নে লোবানের পরিচয় এবং তার স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন উপকারিতা উল্লেখ করার পর এ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিস ও আসার সমূহের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হল:

❑ লোবান বা কন্দুর পরিচয়:
লোবান হলো, এক ধরণের সুগন্ধযুক্ত প্রাকৃতিক আঠা বা রজন, যা প্রধানত ‘বোসওয়েলিয়া’ (Boswellia) প্রজাতির গাছের ছাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। এটি দেখতে কিছুটা স্বচ্ছ পাথরের টুকরো বা স্ফটিকের মতো এটি অতি প্রাচীন একটি ঔষধি উপাদান। সাধারণত লোবান পুড়িয়ে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এটি আগরবাতি এবং আতরেও ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ওমান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও ভারতে ভালো জাতের লোবান পাওয়া যায়।
❑ লোবানের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা:
• কফ ও সর্দি-কাশি উপশম: লোবানের বাষ্প বা নির্যাস বুক ও গলার জমে থাকা কফ পরিষ্কার করতে এবং হাঁপানি বা সর্দির অস্বস্তি কমাতে বেশ কার্যকর।
• বাতের ব্যথা ও প্রদাহ কমানো: এতে শক্তিশালী প্রদাহ রোধী (anti-inflammatory) উপাদান রয়েছে, যা হাড়ের জোড়ায় বাত বা প্রদাহজনিত ব্যথা উপশমে সাহায্য করে।
• মানসিক প্রশান্তি ও চাপ হ্রাস: এর প্রাকৃতিক সুগন্ধ মস্তিষ্কের স্নায়ুকে শিথিল করে, যা মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিদ্রা দূর করতে বেশ সহায়ক।
• মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা: লোবান চিবানোর অভ্যাস মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে, দুর্গন্ধ দূর করে এবং মাড়ি মজবুত রাখে।
• ত্বকের বার্ধক্য রোধ: লোবানের তেল বা নির্যাস ত্বকের বলিরেখা ও বয়সের ছাপ দূর করে ত্বককে সতেজ ও উজ্জ্বল রাখতে ব্যবহৃত হয়।
• পরিবেশ বিশুদ্ধিকরণ: ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
➧ উল্লেখ্য যে, লোবান ও ধূপ এক নয়। লোবান হলো নির্দিষ্ট গাছের প্রাকৃতিক সুগন্ধি আঠা, যা পোড়ালে ধূপের মতো সুগন্ধি ধোঁয়া দেয়। তাই সবাই একে ধূপ বললেও, বাজারের সাধারণ সব ধূপ খাঁটি লোবান নয়।
❑ লোবান খাওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদিস কি শুদ্ধ?
প্রশ্ন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি কখনো বলেছেন:
أَكْلُ اللَّبَانِ يُورِثُ الْحِفْظَ وَيُذْهِبُ النِّسْيَانَ وَيَقْطَعُ الْبَلْغَمَ
“লোবান বা কন্দুর খাওয়া স্মরণশক্তি বাড়ায়, ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে এবং কফ বিনাশ করে”? এ কথাটি কি তাঁর থেকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত?
উত্তর: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, আর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর। এরপর বক্তব্য হলো━ “আল মুজামুল ওয়াসিত” (২/৮১৪) গ্রন্থে লোবানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে: “এটি সুগন্ধযুক্ত উদ্ভিদের একটি প্রজাতি, যা থেকে আঠা বা রজন নির্গত হয় এবং একে ‘কন্দুর’ বলা হয়।” আর আল্লামা ইবনে মুফলিহ আল হাম্বলি “আল আদাব আশ শারইয়্যাহ” (২/৪০৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একে “হাসা লুবান” বা লোবানের কঙ্কর বা দানা’ও বলা হয়।
(লোবান বা কন্দুর যখন গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় তখন এটি শুকিয়ে ছোট ছোট স্বচ্ছ দানা, পাথর বা স্ফটিকের টুকরোর মতো আকার ধারণ করে। দেখতে অনেকটা ছোট নুড়ি পাথরের মতো লাগার কারণেই একে আরবিতে “হাসা লোবান” বা লোবানের দানা বলা হয়ে থাকে।) হাদিসে এই গাছ বা উপাদানের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায়নি। কোনও মুহাদ্দিস এর কোনও সনদ বর্ণনা করেননি এবং হাদিসের কোনও প্রামাণ্য গ্রন্থেই এর কোনও মূল বা সনদ আমাদের নজরে আসেনি। অবশ্য আব্দুল মালিক ইবনে হাবিব আল কুরতুবি (মৃত্যু: ২৩৮ হিজরি) খাদ্য ও চিকিৎসা ভিত্তিক তাঁর একটি ছোট গ্রন্থে (পৃষ্ঠা: ৪১) কোনও ধরনের সনদ বা সূত্র ছাড়াই এটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“أكل اللبان يُورث الْحِفْظ وَيذْهب النسْيَان وَيقطع البلغم”
“লোবান খাওয়া স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে, ভুলে যাওয়া দূর করে এবং কফ দূর করে।” অতঃপর তিনি নিজেই এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: “লোবান খাওয়া কফ দূর করে আর যে জিনিসই কফ দূর করে সেটিই ভুলে যাওয়া দূর করে এবং স্মরণশক্তি বাড়ায়।”
তবে হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনও বর্ণনাকে সহিহ বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার জন্য এ ধরনের বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বরং এর সঠিক সনদ ও উৎস খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এটি ঝুলন্ত বা ভিত্তিহীন কথাই থেকে যায়। যেহেতু কথাটি প্রমাণিত নয় তাই কারো পক্ষ থেকেই এটি হাদিস হিসেবে বর্ণনা করা বা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর চালিয়ে দেওয়া কিছুতেই জায়েজ নয়। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন:
“مَنْ يَقُلْ عَلَيَّ مَا لَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ”
“যে ব্যক্তি আমার পক্ষ থেকে এমন কোনও কথা বলে যা আমি বলিনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” [সহিহ বুখারি: ১০৯]
আল্লাহু আলাম। (সবকিছু ভালো জানেন একমাত্র আল্লাহ)। [Islamqa info]
❑ লোবান সংক্রান্ত অন্যান্য হাদিসগুলো সংক্ষিপ্ত তাহকিক:
উপরে লোবানের ব্যাপারে একটি হাদিসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের মতামত দেওয়া হয়েছে। নিম্নে আরও কয়েকটি হাদিস ও আসারের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হলো:
✪ ১. ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর আসার:
“عليكم باللبانِ فإنه يمسحُ الحزنَ من القلبِ كما يمسحُ الأصبعُ العرَقَ عن الجبينِ وإنه يشدُّ القلبَ ويزيدُ في العقلِ ويُذَكِّي الذهنَ ويجلو البصرَ ويُذهبُ النسيانَ”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃদয় থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে, যেভাবে আঙুল কপাল থেকে ঘাম মুছে ফেলে। এটি হৃদয়কে মজবুত করে, বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়, মেধা তীক্ষ্ণ করে, দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার করে এবং ভুলে যাওয়া দূর করে।”
➧ এ হাদিসটি দুর্বল। কারণ এর সনদে মুহাম্মদ ইরাহিম ইবনে আমর ইবনে ইউসুফ রয়েছেন। মুহাদ্দিস ইবনে মানদাহ বলেছেন, “তিনি মুনকার বা আপত্তিকর হাদিস বর্ণনা করতেন।”
আর আলি ইবনে যানজওয়াইহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমি তাঁকে চিনি না।” [ইবনে ইরাক আল কিনানি, তানজিহুশ শারিয়াহ ২/২৬২]
✪ ২. আলি রা.)-এর উক্তি: (জইফ বা দুর্বল)
“عليكم باللبان فإنه يشجع القلب ويذهب بالنسيان”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃৎপিণ্ডকে সবল করে এবং বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে।”
➧ এটিও দুর্বল। এই উক্তটি আবু নুয়াইম তার আত ত্বিব্বুন নব্বীতে দু জায়গায় বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার উল্লেখিত সনদও দুর্বল (মুনকার)। এতে সুলাইমান ইবনে সালমাহ ও ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আত্তার-এর মতো দুর্বল ও মাতরূক রাবি (মুহাদ্দিসগণের নিকট পরিত্যক্ত ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী) রয়েছেন। এর আরেকটি সনদও রয়েছে। কিন্তু সেটাও দুর্বল।
৪. আলি (রা.) এর নামে লুবানের তেল মালিশ সংক্রান্ত বর্ণনা: (জাল বা বানোয়াট)
“ادَّهِنوا بالِّلبانِ فإنه أحظى لكم عند نسائِكم”
“তোমরা লোবান দ্বারা তেল মালিশ করো। কেননা এটি স্ত্রীদের কাছে তোমাদের আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।”
➧ এই বর্ণনাটি মউজু বা জাল। এটি আহলে বাইত (আলি রা. এর) নামে মিথ্যাচার। এর শায়েখ বা বর্ণনাকারীগণ অপরিচিত। এর আদভী একজন কাযযাব বা মিথ্যুক বর্ণনাকারী। [ইবনুল কায়সারানি, যখিরাতুল হুফফাজ (১/২৬০]
সারাংশ: লোবান ঔষধি গুণ সম্পন্ন ও অত্যন্ত উপকারী বস্তু। কিন্তু এর উপকারিতা সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কোনও হাদিস বা কোনও সাহাবি থেকে এর সংক্রান্ত বিশুদ্ধ সূত্রে আসার সাব্যস্ত হয়নি।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Sunday, July 26, 2026

স্বামীর আনুগত্য করার আবশ্যকতা এবং তার অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়ার বিধান

 প্রশ্ন: একজন মহিলা কুরআন-হাদিস অনুযায়ী চলার চেষ্টা করেন এবং পর্দাও করেন। কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য স্বামীর আদেশ মানতে চান না। যেমন: স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও ভাইয়ের পাত্রী দেখার জন্য বাড়ি থেকে চলে গেল। তার দাবি, আমি আম্মার সাথে গিয়েছি। এটা আমার জন্য অনুমতি আছে। কিন্তু স্বামী এতে রাজি নয়।

প্রশ্ন হল, এভাবে উক্ত মহিলার জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম কী বলে? এ ক্ষেত্রে স্বামীর করণীয় কি?

উত্তর:

স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য করা ফরয যদি তা গুনাহের কাজ বা সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজের নির্দেশ না হয়।
সুতরাং স্ত্রীর জন্য জরুরি হল, বিশেষ কোনো কাজে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে স্বামীর নিকট অনুমতি নেয়া। স্বামী অনুমতি দিলে পরিপূর্ণ পর্দা সহকারে এবং নিজেকে ফিতনা থেকে হেফাযতে রেখে স্ত্রী বাইরে যেতে পারে। দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার হলে অবশ্যই তার পিতা, ভাই ইত্যাদি মাহরাম পুরুষের সাথে যাবে। কিন্তু স্বামী যদি তাকে যেতে নিষেধ করে তাহলে স্ত্রীর জন্য তা লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। অন্যথায় সে স্বামীর ‘অবাধ্য’ হিসেবে গণ্য হবে এবং গুনাহগার হবে।

পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই এই আনুগত্য করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা পুরুষকে পরিবারের মূল পরিচালনার দায়িত্ব এবং স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা অর্পণ করেছেন। (সূরা নিসা: ৩৪ নং আয়াত)।

সুতরাং স্ত্রী যদি এই আনুগত্যের বিষয়টিকে উন্মুক্ত হৃদয়ে গ্রহণ না করে তাহলে পরিবারিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে যেতে বাধ্য। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমীন।

জ্ঞাতব্য যে, ইসলামের বিধান হল, কোন স্ত্রী যদি স্বামীর ‘অবাধ্য’ হয় বা তার আনুগত্য করতে অস্বীকার করে তাহলে তার জন্য স্ত্রীর ভরণ-পোষণ দেয়া বন্ধ করার অধিকার রয়েছে।

🌀 ইসলামে স্বামীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তার আনুগত্যের বিষয়টি নিম্নোক্ত হাদিস থেকে সুষ্পষ্ট ভাবে প্রতিভাত হয়:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِغَيْرِ اللهِ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَالَّذِى
نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ تُؤَدِّى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤَدِّىَ حَقَّ زَوْجِهَا وَلَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِىَ عَلَى قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعْهُ-
“যদি আমি কাউকে নির্দেশ দিতাম আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সিজদা করার, তাহ’লে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।ঐ সত্তার শপথ করে বলছি যার হাতে আমার জীবন, মহিলারা ঐ পর্যন্ত আল্লাহর হক আদায় করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত সে স্বামীর হক আদায় না করে, এমনকি স্বামী যদি যাত্রা পথে ঘোড়ার পৃষ্ঠেও তাকেও আহবান করে তখনও তাকে বাধা না দেয়।” (ইবনে মাজাহ হা/১৮৫৩; সহীহাহ হা/১২০৩।)
সুতরাং স্ত্রীর জন্য স্বামীর অবাধ্যতা করে বাইরে কোথাও যাওয়া জায়েয নয় যদি নিজের বাবা-মা বা আত্মীয় স্বজনের বাড়ি হোক না কেন।

🌀 এর দলিল হল, বিখ্যাত ইফকের ঘটনায় মা আয়েশা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট তার বাবা-মার কাছে যাওয়ার অনুমতি চাওয়ার হাদিস:
তিনি বলেন:
أتأذن لي أن آتي أبوي
“(হে আল্লাহর রাসূল,) আপনি কি আমাকে আমার বাবা-মার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিবেন?” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)

▪ ইরাকী বলেন, আয়েশা রা. এ কথা থেকে বুঝা গেল, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার পিতামাতার বাড়িতে যাবে না।” (ত্বরবুত তাসরীব ৮/৫৮)

▪ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রা. এক বিবাহিত মহিলার ব্যাপারে বলেন-যার মা অসুস্থ ছিল:
طاعة زوجها أوجب عليها من أمها ، إلا أن يأذن لها
” মা’র চেয়ে স্বামীর কথার আনুগত্য করা তার জন্য অধিক অপরিহার্য। তবে স্বামী যদি তাকে অনুমতি দেয় তাহলে ভিন্ন কথা।” (শারহু মুনতাহাল ইরাদাত ৩/৪৭)

▪ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি বলেন:
لا يجوز للمرأة الخروج من بيت زوجها إلا بإذنه ، لا لوالديها ولا لغيرهم ؛ لأن ذلك من حقوقه عليها ، إلا إذا كان هناك مسوغ شرعي يضطرها للخروج
“কোন মহিলার জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়া জায়েয নয়। পিতামাতা বা অন্য কারো নিকট নয়। কারণ এটি তার উপর স্বামীর হক। অবশ্য যদি শরিয়ত সম্মত বিশেষ কোনো কারণ থাকে তাহলে ভিন্ন কথা।” (ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ১৯/১৬৫)

তবে স্বামীর কর্তব্য হল, সময়-সুযোগ ও প্রয়োজন বুঝে স্ত্রীকে মাঝে-মধ্যে তার পিতামাতা ও অন্যান্য মাহরাম নিকটাত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া যদি এতে ক্ষয়-ক্ষতি ও ফেতনার আশঙ্কা না করে।

♻ অবশ্য একান্ত জরুরি অবস্থায় স্বামীর অনুমতি ছাড়াও বাইরে যাওয়া জায়েয আছে। যেমন, বাড়িতে থাকা যদি তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ হয়, ঘর ভেঙ্গে পড়ে, জরুরি চিকিৎসা, ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাদ্য সামগ্রী ক্রয় ইত্যাদি।

পরিশেষে বলব, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাস, ভালবাসা ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে যে কোনো সমস্যা সমাধান করা যায়। এগুলো দাম্পত্য জীবনে অপরিহার্য দাবী। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের চাহিদা ও হক আদায় করবে এবং প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রাখবে। তাহলে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়া থেকে রক্ষা পাবে ইনশাআল্লাহ।

তবে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও দাম্পত্য জীবনের বৃহত্তর স্বার্থে উভয়কে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত সমাধান করতে হবে। তাহলে দুজনের দাম্পত্য জীবন ভরে থাকবে অবারিত সুখ, শান্তি ও অনাবিল ভালোবাসায় ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬💠💠▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

Thursday, July 23, 2026

ঘুষের সংজ্ঞা এবং ঘুষ আদান-প্রদানের বিধান

 প্রশ্ন: ঘুষের সংজ্ঞা কি? শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে ঘুষ আদান-প্রদানের বিধান কি? কোনো পরিস্থিতিতে ঘুষ প্রদান করা জায়েজ?

▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সাধারণ ভাবে ঘুষ হলো—কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অন্যায়ভাবে নিজের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জন, অধিকারবহির্ভূত সুবিধা লাভ, অথবা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নিজের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দিতে প্রভাবিত করার জন্য অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা প্রদান করা।আল-মাউসূআহ আল-ফিকহিয়্যাহ’-এ ঘুষের সংজ্ঞা এভাবে এসেছে—الرشوة هي ما يدفعه الإنسان ليأخذ ما ليس من حقه، أو ليتهرب بها من حق عليه.অর্থাৎ, “কোন ব্যক্তি তার প্রাপ্য নয় এমন কিছু অর্জন করার জন্য অথবা তার ওপর অর্পিত কোনো দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি লাভের উদ্দেশ্যে যা কিছু প্রদান করে, তাই ঘুষ।”[আল-মাউসূআহ আল-ফিকহিয়্যাহ, ৫/৩৬২] এ সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঘুষ কেবল অর্থ বা সম্পদ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং অন্যায্য সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ উপকার করা, মূল্যবান উপহার দেওয়া, বিশেষ সেবা প্রদান করা বা অন্য যেকোনো ধরনের সুবিধা দেওয়া—এসবও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।অর্থাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে অর্থ, উপহার, বিশেষ সেবা কিংবা অন্য কোনো সুবিধা দিয়ে যদি অন্যায়ভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা অর্জন করা হয় অথবা তার দায়িত্ব পালনে প্রভাব বিস্তার করা হয়, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে।যদিও কিছু আলেম ঘুষকে “অন্যের অধিকার নষ্ট করে অন্যায়ভাবে কোনো সুবিধা বা অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে অর্থ বা অন্য কোনো বিনিময় প্রদান”—এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তবে ‘আল-মাউসূআহ আল-ফিকহিয়্যাহ’-এর সংজ্ঞাটি অধিক ব্যাপক ও সর্বসম্মত অর্থ প্রকাশ করে। এটি শুধু অন্যের অধিকার হরণ নয়; বরং নিজের ওপর বর্তানো দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য প্রদত্ত সব ধরনের অবৈধ বিনিময়কেও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত করেছে।
.
ঘুসের সংজ্ঞায় ইমাম ইবনুল আসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الرِّشْوة والرُّشْوة: الوُصلة إلى الحاجة بالمُصانعة. وأصله من الرِشاء الذي يُتَوصَّل به إلى الماء. فالراشي مَن يُعطِي الذي يُعِينه على الباطل. والمُرْتَشِي الآخِذُ. والرائِش الذي يسْعى بينهما يَسْتزيد لهذا ويَسْتنقِص لهذا.”রিশওয়াহ অর্থাৎ ঘুস বলতে বোঝায় কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য তোষামোদ বা অবৈধ উপায় অবলম্বন করা। এর মূল শব্দ রিশা, যার অর্থ সেই দড়ি যার মাধ্যমে কূপ থেকে পানি তোলা হয়। রাশি হলো সেই ব্যক্তি, যে অন্যায় কাজে সহযোগিতা লাভের জন্য অর্থ দেয়। মুরতাশি হলো যে সেই অর্থ গ্রহণ করে। আর রায়িশ হলো সেই মধ্যস্থতাকারী, যে উভয়ের মধ্যে দালালি করে, এক পক্ষের কাছ থেকে বেশি আদায় করে এবং অন্য পক্ষকে কম দেওয়ার চেষ্টা করে…..(আন নিহায়াহ ফি গরীবিল হাদীস;২/২২৬)
.
◽শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে ঘুস আদান-প্রদানের বিধান:
.
ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে ঘুসের লেনদেন সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি কবিরাহ গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা ঘুস মানুষের অধিকার নষ্ট করে, যুলুম ও অবিচারের পথ সুগম করে এবং সমাজে দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি ও স্বার্থপরতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে। তাই ইসলাম সর্বপ্রকার ঘুষের লেনদেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এ মর্মে মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে এরশাদ করেন-لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَ تُدۡلُوۡا بِہَاۤ اِلَی الۡحُکَّامِ لِتَاۡکُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ”আর তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভক্ষণ কর না এবং জানা সত্ত্বেও অসৎ উপায়ে মানুষের সম্পদ গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকের নিকট (ঘুষ দেয়ার জন্য) নিয়ে যেও না”।(সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৮৮)।হাদিসে এসেছে,আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন:لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي”রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে অভিশাপ দিয়েছেন।[মুসনাদে আহমদ হা/৬৭৯১; ও আবু দাউদ হা/৩৫৮০; শাইখ আলবানী ইরওয়াউল গালীল বইয়ে (২৬২১) এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন] অত্র হাদীসে স্পষ্টই উল্লেখ করা হয়েছে, ঘুষ আদান-প্রদান অভিশাপের কারণ। যে ঘুষ প্রদান করবে, আর যে তা গ্রহণ করবে উভয়ের উপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লা‘নত করেছেন। অভিশাপকৃত কর্ম বা অভিশপ্ত ব্যক্তির মধ্যে কোন কল্যাণ থাকতে পারে না। অন্য হাদিসে এসেছে, আবূ উমামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”যে ব্যক্তি কারো জন্য সুপারিশ করল এবং সেই সুপারিশের প্রতিদান স্বরূপ তাকে কিছু উপহার দিল। যদি সে তা গ্রহণ করে তাহলে সে সূদের দরজাসমূহের একটি বড় দরজায় উপস্থিত হল”।(আবূ দাঊদ, হা/৩৫৪১; সিলসিলা সহীহাহ হা/৩৪৬৫; মিশকাত, হা/৩৭৫৭)
.
◽কোন কোন পরিস্থিতিতে ঘুস প্রদান জায়েজ হতে পারে?
ইসলামে ঘুস (রিশওয়াহ) দেওয়া ও নেওয়া—উভয়ই মূলত হারাম এবং এটি কবীরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা—উভয়ের ওপর লানত করেছেন। তবে আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করেছেন। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের ন্যায্য ও অপরিহার্য অধিকার আদায় করতে, অথবা অন্যায়-জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হয় এবং ঘুষ প্রদান ছাড়া তার সামনে আর কোনো কার্যকর ও বৈধ উপায় না থাকে, তাহলে এমন চরম বাধ্যতামূলক অবস্থায় ঘুষ দেওয়ার অবকাশ (রুখসত) রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঘুষদাতা গুনাহগার হবে না; বরং সম্পূর্ণ গুনাহ বর্তাবে সেই ব্যক্তির ওপর, যে অন্যায়ভাবে ঘুষ গ্রহণ করেছে। যেমন—কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি বৈধ কাগজপত্র, লাইসেন্স বা প্রাপ্য সেবা দেওয়ার জন্য বেআইনিভাবে অর্থ দাবি করলে, অন্যায় আটক, নির্যাতন বা জুলুম থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে অর্থ দিতে হলে, কিংবা নিজের বৈধ সম্পদ বা ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার অন্য কোনো বাস্তবসম্মত উপায় না থাকলে—এসব ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করলে তা ঘুষদাতার জন্য ক্ষমাযোগ্য হবে; তবে ঘুষ গ্রহণকারীর জন্য তা সর্বাবস্থায় হারাম এবং সে-ই গুনাহগার হিসেবে বিবেচিত হবে। পক্ষান্তরে, অন্যায় সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে ঘুষ দেওয়া কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয়। যেমন—অন্যের অধিকার নষ্ট করে চাকরি লাভ, টেন্ডার বা চুক্তি অন্যায়ভাবে নিজের নামে নেওয়া, আদালত বা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অবৈধভাবে নিজের অনুকূলে আনা, পরীক্ষায় প্রতারণার মাধ্যমে পাস করা, অবৈধভাবে লাইসেন্স বা সনদ অর্জন করা,অথবা বৈধ বিকল্প থাকা সত্ত্বেও ঘুষের পথ বেছে নেয়,কিংবা কোনো হারাম বা বেআইনি কাজের অনুমতি নেওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া—উভয়ই নিঃসন্দেহে হারাম। সুতরাং ইসলামের মূলনীতি হলো, অন্যায় সুবিধা লাভের জন্য ঘুষ সর্বাবস্থায় হারাম; তবে একান্ত বাধ্য হয়ে নিজের ন্যায্য অধিকার উদ্ধার করা বা জুলুম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হলে তার গুনাহ ঘুষগ্রহীতার ওপর বর্তাবে, ঘুষদাতার ওপর নয়। এ মতটি ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ইমাম হাসান আল-বাসরীসহ বহু প্রখ্যাত আলেম সমর্থন করেছেন। তারা এ বিষয়ে ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর হাদীস দ্বারা দলিল প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:”(إِنَّ أَحَدَهُمْ لَيَسْأَلُنِي الْمَسْأَلَةَ فَأُعْطِيهَا إِيَّاهُ فَيَخْرُجُ بِهَا مُتَأَبِّطُهَا ، وَمَا هِيَ لَهُمْ إِلا نَارٌ ، قَالَ عُمَرُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، فَلِمَ تُعْطِيهِمْ ؟ قَالَ : إِنَّهُمْ يَأْبَوْنَ إِلا أَنْ يَسْأَلُونِي ، وَيَأْبَى اللَّهُ لِي الْبُخْلَ) “তাদের কেউ কেউ আমার কাছে কিছু চায়। আমি তাকে তা দিয়ে দিই। অথচ সে তা বগলে নিয়ে বের হয়, কিন্তু বাস্তবে তা তার জন্য আগুন ছাড়া আর কিছু নয়।উমার (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে আপনি তাদের দেন কেন? তিনি বললেন, তারা চাওয়া ছাড়া মানে না, আর আল্লাহ আমার জন্য কৃপণতা পছন্দ করেন না।”(মুসনাদে আহমেদ হা/১০৭৩৯;সহিহ আত তারগীব হা/৮৪৪) অর্থাৎ,নবী (ﷺ) জানতেন যে তাদের জন্য এ সম্পদ গ্রহণ করা হারাম। তবুও তিনি তাদের দিতেন, যাতে কৃপণতার অপবাদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন।এ হাদীস থেকে আলেমগণ বুঝিয়েছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের জবরদস্তি বা অনৈতিক দাবির কারণে বাধ্য হয়ে কিছু দিতে বাধ্য হয়, তবে সেই দেওয়ার গুনাহ তার ওপর নয়; বরং প্রকৃত গুনাহগার সেই ব্যক্তি, যে অন্যায়ভাবে তা গ্রহণ করেছে। তাই মুসলিমের কর্তব্য হলো, সর্বাবস্থায় ঘুষ থেকে বেঁচে থাকা; তবে একান্ত নিরুপায় অবস্থায় নিজের ন্যায্য অধিকার উদ্ধার বা জুলুম থেকে আত্মরক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করলে তার জন্য শরীয়তে অবকাশ রয়েছে, যদিও ঘুষ গ্রহণকারীর জন্য তা সর্বদাই হারাম ও গুরুতর পাপ।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:” فأما إذا أهدى له هدية ليكف ظلمه عنه أو ليعطيه حقه الواجب كانت هذه الهدية حراما على الآخذ , وجاز للدافع أن يدفعها إليه , كما كان النبي صلى الله عليه وسلم يقول : ( إني لأعطي أحدهم العطية …الحديث )”কোনো ব্যক্তি যদি কোনো কর্মকর্তাকে এই উদ্দেশ্যে উপহার দেয়, যেন সে তার ওপর থেকে জুলুম প্রতিহত করে অথবা তার প্রাপ্য অধিকার তাকে বুঝিয়ে দেয়, তাহলে এই উপহার (ঘুস) গ্রহণ করা কর্মকর্তার জন্য হারাম হবে; কিন্তু প্রদানকারীর জন্য তা প্রদান করা জায়েজ।এর প্রমাণ নবী ﷺ-এর উক্তি: ‘আমি তো কখনো কখনো কাউকে কোনো দান দিয়ে থাকি… (হাদীস)’।”(আল-ফাতাওয়াল কুবরা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৭৪)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:قَالَ الْعُلَمَاءُ : يَجُوزُ رِشْوَةُ الْعَامِلِ لِدَفْعِ الظُّلْمِ لا لِمَنْعِ الْحَقِّ ، وَإِرْشَاؤُهُ حَرَامٌ فِيهِمَا ( يعني : أخذه للرشوة حرام ) . . .وَمِنْ ذَلِكَ : لَوْ أَعْطَى الرَّجُلُ شَاعِرًا أَوْ غَيْرَ شَاعِرٍ ; لِئَلا يَكْذِبَ عَلَيْهِ بِهَجْوٍ أَوْ غَيْرِهِ ، أَوْ لِئَلا يَقُولَ فِي عِرْضِهِ مَا يَحْرُمُ عَلَيْهِ قَوْلُهُ كَانَ بَذْلُهُ لِذَلِكَ جَائِزًا وَكَانَ مَا أَخَذَهُ ذَلِكَ لِئَلا يَظْلِمَهُ حَرَامًا عَلَيْهِ ; لأَنَّهُ يَجِبُ عَلَيْهِ تَرْكُ ظُلْمِهِ . . .فَكُلُّ مَنْ أَخَذَ الْمَالَ لِئَلا يَكْذِبَ عَلَى النَّاسِ أَوْ لِئَلا يَظْلِمَهُمْ كَانَ ذَلِكَ خَبِيثًا سُحْتًا ; لأَنَّ الظُّلْمَ وَالْكَذِبَ حَرَامٌ عَلَيْهِ فَعَلَيْهِ أَنْ يَتْرُكَهُ بِلا عِوَضٍ يَأْخُذُهُ مِنْ الْمَظْلُومِ فَإِذَا لَمْ يَتْرُكْهُ إلا بِالْعِوَضِ كَانَ سُحْتًا “আলেমগণ বলেছেন: জুলুম প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকর্তাকে অর্থ (ঘুস) প্রদান করা বৈধ,কিন্তু অন্যের হক নষ্ট করার জন্য ঘুষ দেওয়া বৈধ নয়। অবশ্য উভয় অবস্থাতেই গ্রহীতার জন্য তা গ্রহণ করা হারাম। (অর্থাৎ, তার জন্য ঘুষ নেওয়া নাজায়েজ)।এর একটি দৃষ্টান্ত হলো: কোনো ব্যক্তি যদি একজন কবি বা অন্য কাউকে এই উদ্দেশ্যে অর্থ দেয়, যাতে সে তার নামে মিথ্যা বা ব্যঙ্গাত্মক কবিতা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে কুৎসা রটনা না করে, অথবা তার সম্মানহানি করে এমন কোনো কথা না বলে যা বলা তার জন্য হারাম—তবে দাতার জন্য এমন অর্থ (ঘুস) প্রদান করা জায়েজ। কিন্তু গ্রহীতা যে অর্থ গ্রহণ করল, তা তার জন্য হারাম।কারণ তার তো এমনিতেই জুলুম ও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা ফরজ ছিল।অতএব, যে ব্যক্তি মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলা বা তাদের ওপর জুলুম না করার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করে, তার এ অর্থ নিকৃষ্ট ও হারাম।কারণ জুলুম ও মিথ্যা বলা তার ওপর সর্বাবস্থায় হারাম। তাই কোনো ধরনের বিনিময় বা প্রতিদান ছাড়াই তা পরিত্যাগ করা তার দায়িত্ব। কিন্তু সে যদি বিনিময় বা মূল্য ছাড়া জুলুম করা থেকে বিরত না থাকে, তবে তার গৃহিত সেই অর্থ হারাম হবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ২৫২)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:قَالَ الْعُلَمَاءُ : إنَّ مَنْ أَهْدَى هَدِيَّةً لِوَلِيِّ أَمْرٍ لِيَفْعَلَ مَعَهُ مَا لا يَجُوزُ كَانَ حَرَامًا عَلَى الْمَهْدِيِّ وَالْمُهْدَى إلَيْهِ . وَهَذِهِ مِنْ الرَّشْوَةِ الَّتِي قَالَ فِيهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم : ( لَعَنَ اللَّهُ الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي ) .فَأَمَّا إذَا أَهْدَى لَهُ هَدِيَّةً لِيَكُفَّ ظُلْمَهُ عَنْهُ أَوْ لِيُعْطِيَهُ حَقَّهُ الْوَاجِبَ : كَانَتْ هَذِهِ الْهَدِيَّةُ حَرَامًا عَلَى الآخِذِ وَجَازَ لِلدَّافِعِ أَنْ يَدْفَعَهَا إلَيْهِ كَمَا ، كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ : ( إنِّي لأُعْطِي أَحَدَهُمْ الْعَطِيَّةَ فَيَخْرُجُ بِهَا يَتَأَبَّطُهَا نَارًا . قِيلَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ فَلِمَ تُعْطِيهِمْ ، قَالَ : يَأْبَوْنَ إلا أَنْ يَسْأَلُونِي ، وَيَأْبَى اللَّهُ لِي الْبُخْلَ ) .وَمِثْلُ ذَلِكَ : إعْطَاءُ مَنْ كَانَ ظَالِمًا لِلنَّاسِ ، فَإِعْطَاءُه جَائِزٌ لِلْمُعْطِي ، حَرَامٌ عَلَيْهِ أَخْذُهُ .وَأَمَّا الْهَدِيَّةُ فِي الشَّفَاعَةِ : مِثْلُ أَنْ يَشْفَعَ لِرَجُلِ عِنْدَ وَلِيِّ أَمْرٍ لِيَرْفَعَ عَنْهُ مَظْلِمَةً أَوْ يُوَصِّلَ إلَيْهِ حَقَّهُ أَوْ يُوَلِّيَهُ وِلَايَةً يَسْتَحِقُّهَا أَوْ يَسْتَخْدِمُهُ فِي الْجُنْدِ الْمُقَاتِلَةِ – وَهُوَ مُسْتَحِقٌّ لِذَلِكَ – أَوْ يُعْطِيَهُ مِنْ الْمَالِ الْمَوْقُوفِ عَلَى الْفُقَرَاءِ أَوْ الْفُقَهَاءِ أَوْ الْقُرَّاءِ أَوْ النُّسَّاكِ أَوْ غَيْرِهِمْ – وَهُوَ مِنْ أَهْلِ الِاسْتِحْقَاقِ . وَنَحْوَ هَذِهِ الشَّفَاعَةِ الَّتِي فِيهَا إعَانَةٌ عَلَى فِعْلٍ وَاجِبٍ أَوْ تَرْكُ مُحَرَّمٍ : فَهَذِهِ أَيْضًا لا يَجُوزُ فِيهَا قَبُولُ الْهَدِيَّةِ وَيَجُوزُ لِلْمهْدِي أَنْ يَبْذُلَ فِي ذَلِكَ مَا يَتَوَصَّلُ بِهِ إلَى أَخْذِ حَقِّهِ أَوْ دَفْعِ الظُّلْمِ عَنْهُ . هَذَا هُوَ الْمَنْقُولُ عَنْ السَّلَفِ وَالأَئِمَّةِ الأَكَابِرِ”আলেমগণ বলেছেন: যদি কেউ কোনো শাসক, কর্মকর্তা বা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকে এমন উদ্দেশ্যে উপহার (ঘুস) দেয় যে, তিনি তার জন্য এমন কোনো কাজ করবেন যা শরীয়তসম্মত নয়, তাহলে এই উপহার দেওয়া ও গ্রহণ উভয়ই হারাম। এটাই সেই ঘুষ, যার সম্পর্কে নবী ﷺ বলেছেন: আল্লাহ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহণকারী উভয়ের ওপর লানত করেছেন।কিন্তু যদি কেউ তাকে উপহার দেয়, যাতে সে তার ওপর থেকে জুলুম বন্ধ করে, অথবা তার ন্যায্য অধিকার তাকে প্রদান করে, তাহলে এই উপহার গ্রহণ করা গ্রহণকারীর জন্য হারাম; তবে প্রদানকারীর জন্য তা দেওয়া বৈধ। এ প্রসঙ্গে নবী সা. বলেছেন:আমি কখনো কাউকে কিছু দান করি, অথচ সে তা বগলদাবা করে আগুন (জাহান্নামের শাস্তি) নিয়ে চলে যায়। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আপনি তাদের দেন কেন? তিনি বললেন, তারা না চেয়ে থাকে না, আর আল্লাহ আমার জন্য কৃপণতা পছন্দ করেন না।অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি মানুষের ওপর জুলুম করে, তাকে (নিজের জুলুম থেকে বাঁচার জন্য) কিছু দেওয়া দাতার জন্য বৈধ কিন্তু তা গ্রহণ করা তার জন্য হারাম।আর সুপারিশের বিনিময়ে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রেও একই বিধান। যেমন, কেউ কোনো শাসক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে কারো জন্য সুপারিশ করল, যাতে তার ওপর থেকে অন্যায় দূর করা হয়, অথবা তার ন্যায্য অধিকার তাকে পৌঁছে দেওয়া হয়, অথবা সে যে পদ বা দায়িত্বের যোগ্য, তা তাকে দেওয়া হয়, কিংবা তাকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয় যদি সে তার যোগ্য হয়—অথবা গরিব, ফকিহ, ক্বারী, ইবাদতকারী বা অন্য যাদের জন্য ওয়াকফকৃত সম্পদ নির্ধারিত, তাদের মধ্যে সে যদি প্রকৃত হকদার হয়, তবে তাকে সেই সম্পদ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। এ ধরনের সুপারিশ, যা কোনো ফরজ কাজ সম্পাদন বা হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে এর বিনিময়ে উপহার গ্রহণ করাও বৈধ নয়। তবে যার অধিকার আদায় বা যার ওপর থেকে জুলুম দূর করার জন্য এ সুপারিশ করা হচ্ছে, তার জন্য নিজের অধিকার পাওয়া বা জুলুম থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করা বৈধ। এটাই সালাফে সালেহীন ও প্রখ্যাত ইমামদের থেকে বর্ণিত মত।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ৩১; পৃষ্ঠা: ২৭৮)
.
তাকীউদ্দীন সুবকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:والمراد بالرشوة التي ذكرناها ما يعطى لدفع حق أو لتحصيل باطل ، وإن أعطيت للتوصل إلى الحكم بحق فالتحريم على من يأخذها , وأما من يعطيها فإن لم يقدر على الوصول إلى حقه إلا بذلك جاز ، وإن قدر إلى الوصول إليه بدونه لم يجز “আমরা যে ঘুষের কথা বলেছি, তার উদ্দেশ্য হলো এমন অর্থ বা উপহার, যা কোনো ন্যায্য অধিকার নষ্ট করার জন্য অথবা অন্যায় সুবিধা অর্জনের জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু যদি ন্যায্য রায় বা নিজের বৈধ অধিকার পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা দেওয়া হয়, তাহলে হারাম হবে গ্রহণকারীর জন্য। আর দাতার ক্ষেত্রে যদি সে এ ছাড়া নিজের অধিকার আদায় করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তার জন্য তা দেওয়া বৈধ। তবে যদি ঘুষ ছাড়াই নিজের অধিকার আদায় করতে পারে, তাহলে তার জন্য ঘুষ দেওয়া বৈধ নয়।”(ফাতাওয়াউস সুবকী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২০৪)। ইমাম সুয়ূতী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আশবাহুন নাযায়ির নামক গন্থে বলেন:القاعدة السابعة والعشرون : ( ما حرم أخذه حرم إعطاؤه ) كالربا ، ومهر البغي , وحلوان الكاهن والرشوة , وأجرة النائحة والزامر .ويستثنى صور : منها : الرشوة للحاكم , ليصل إلى حقه , وفك الأسير ، وإعطاء شيء لمن يخاف هجوه “সাতাশতম মূলনীতি: যা গ্রহণ করা হারাম, তা প্রদান করাও হারাম। যেমন সুদ, ব্যভিচারিণীর মোহর, গণকের পারিশ্রমিক, ঘুষ, বিলাপকারিণী ও বাদ্যযন্ত্র-বাদকের পারিশ্রমিক।তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন বিচারকের কাছে ঘুষ দিয়ে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় করা,বন্দীকে মুক্ত করার জন্য অর্থ প্রদান, অথবা এমন কাউকে কিছু দেওয়া, যার কুৎসা বা অপবাদ দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হিলওয়ানুল কাহিন বলতে বোঝায গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তা তার গণনার বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে।”(আশবাহুন নাযায়ির পৃষ্ঠা: ১৫০)
.
আল মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহতে এসেছে:وفي “الأشباه” لابن نجيم (حنفي) , ومثله في “المنثور” للزركشي (شافعي) : ما حرم أخذه حرم إعطاؤه , كالربا ومهر البغي وحلوان الكاهن والرشوة للحاكم إذا بذلها ليحكم له بغير الحق , إلا في مسائل : في الرشوة لخوفٍ على نفسه أو ماله أو لفك أسير أو لمن يخاف هجوه ” ইবনু নুজাইমের আল আশবাহ এবং ইমাম যারকাশীর আল মানছুর-এ বলা হয়েছে: যা গ্রহণ করা হারাম, তা প্রদান করাও হারাম। যেমন সুদ, ব্যভিচারিণীর মোহর, গণকের পারিশ্রমিক এবং বিচারককে এমন ঘুষ দেওয়া, যাতে তিনি অন্যায়ভাবে রায় দেন। তবে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, যেমন: নিজের প্রাণ বা সম্পদের নিরাপত্তার জন্য ঘুষ দেওয়া, বন্দীকে মুক্ত করার জন্য, অথবা এমন ব্যক্তিকে কিছু দেওয়া, যার কুৎসার ভয় রয়েছে। ড. ওহবা যুহাইলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إذا تعينت الرشوة دون غيرها سبيلاً للوصول إلى الغرض جاز الدفع للضرورة‏ ،‏ ويحرم على الآخذ”যদি উদ্দেশ্য অর্জনের একমাত্র উপায় ঘুষ দেওয়াই হয়, তাহলে প্রয়োজনের কারণে ঘুষ দেওয়া বৈধ তবে তা গ্রহণ করা হারাম।
.
ইমাম ইবনুল আসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:فأمَّا ما يُعْطَى تَوصُّلا إلى أخْذِ حق أو دَفْع ظُلْم فغير داخلالظلم رُوِي أنّ ابن مسعود أُخِذ بأرض الحَبشة في شيء فأعْطَى دينارين حتى خُلّى سبيله. ورُوِي عن جماعة من أئمة التابعين قالوا: لا بأس أن يُصانِع الرجل عن نفسه ومالِه إذا خاف الظلم”নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে বা নিজের ওপর থেকে জুলুম দূর করতে যে অর্থ দেওয়া হয়, তা এই নিষিদ্ধ ঘুষের অন্তর্ভুক্ত নয়।বর্ণিত আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হাবশায় একটি বিষয়ে আটক হয়েছিলেন। তখন তিনি দুই দীনার প্রদান করলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। আরও বর্ণিত হয়েছে, তাবেয়ীদের একদল ইমাম বলেছেন: ‘যদি কেউ নিজের জান-মালকে জুলুম থেকে রক্ষা করার আশঙ্কায় কিছু অর্থ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে, তবে এতে কোনো অসুবিধা নেই। (আন নিহায়াহ ফি গরীবিল হাদীস: ২/২২৬)
.
ইমাম খাত্তাবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:إذا أَعطى ليتوصل به إلى حقه، أو يدفع عن نفسه ظلماً، فإنه غير داخل في هذا الوعيد”যদি কেউ নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য অথবা নিজের ওপর থেকে জুলুম দূর করার জন্য কিছু অর্থ প্রদান করে, তবে সে এই হাদিসে বর্ণিত কঠোর শাস্তির আওতাভুক্ত হবে না।”(মাআলিমুস সুনান: ৪/১৬১)
.
ইমাম মানাভী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الرشوة على تبديل أحكام الله إنما هي خصلة نشأت من اليهود المستحقين اللعنة ، فإذا سرت الخصلتان إلى أهل الإسلام استحقوا من اللعن ما استحقه اليهود … وقد جاء النهي عن الرشا حتى في التوراة ، ففي السفر الثاني منها : لا تقبلن الرشوة ؛ فإن الرشوة تعمي أبصار الحكام في القضاء”আল্লাহর বিধান পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ঘুষ গ্রহণ করা এমন একটি নিকৃষ্ট স্বভাব, যা মূলত সেই ইহুদিদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল, যারা আল্লাহর লানতের উপযুক্ত হয়েছিল। যখন এই দুটি নিকৃষ্ট স্বভাব মুসলিমদের মধ্যেও প্রবেশ করবে, তখন তারাও সেই লানতের অংশীদার হবে, যার উপযুক্ত ইহুদিরা হয়েছিল। এমনকি তাওরাতেও ঘুষের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে: তুমি ঘুষ গ্রহণ করবে না কারণ ঘুষ বিচারকদের দৃষ্টিশক্তিকে অন্ধ করে দেয় এবং ন্যায়বিচারকে বিকৃত করে।”(ফাইযুল কাদীর; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৪২)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:أما الرشوة التي يتوصل بها الإنسان إلى حقه ، كأن لا يمكنه الحصول على حقه إلا بشيء من المال ، فإن هذا حرام على الآخذ ، وليس حراماً على المعطي ، لأن المعطي إنما أعطى من أجل الوصول إلى حقه ، لكن الآخذ الذي أخذ تلك الرشوة هو الآثم لأنه أخذ ما لا يستحق “যে ঘুষের মাধ্যমে একজন মানুষ তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারে অর্থাৎ অর্থ না দিলে তার অধিকার পাওয়ার কোনো উপায় নেই সে ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণকারীর জন্য তা হারাম, কিন্তু অর্থদাতার জন্য হারাম নয়। কারণ অর্থদাতা কেবল নিজের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্য অর্থ দিয়েছে। কিন্তু গ্রহণকারী এমন অর্থ গ্রহণ করেছে, যার সে কোনো হকদার ছিল না। তাই গুনাহ তারই।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ: ৪/৩০২)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই মূলত হারাম এবং কবীরা গুনাহ। তবে একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে—যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ন্যায্য ও প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে বা নিজের ওপর সংঘটিত জুলুম ও অবিচার থেকে রক্ষা পেতে বাধ্য হয়, এবং সেই অধিকার অর্জন বা জুলুম দূর করার অন্য কোনো বৈধ ও কার্যকর উপায় অবশিষ্ট না থাকে, তখন তার জন্য ঘুষ প্রদান করার অবকাশ থাকতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বৈধতা কেবল ঘুষ প্রদানকারীর জন্য; ঘুষ গ্রহণকারী কর্মচারীর জন্য তা সর্বাবস্থায় হারামই থেকে যায়। কিন্তু যদি কেউ এমন কোনো সুবিধা, পদ, সুযোগ বা অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে ঘুষ দেয়, যার সে আদৌ হকদার নয়, অথবা বৈধ বিকল্প থাকা সত্ত্বেও ঘুষের পথ বেছে নেয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে হারাম এবং কবীরা গুনাহ। তাই এ ক্ষেত্রে বৈধতার দাবি কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন (১) উদ্দেশ্য হবে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায় বা জুলুম থেকে মুক্তি লাভ এবং (২) এর জন্য অন্য কোনো বৈধ ও কার্যকর উপায় বিদ্যমান থাকবে না।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Wednesday, July 22, 2026

ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতি

 একথায় কোন সন্দেহ নাই যে, বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম। এটি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এ ছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের জীবন যাপন কষ্টসাধ্য বা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ভালো-মন্দ সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির ওপর। নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতিগুলো তুলে ধরা হলো:

▪️১. মোবাইল ফোন আল্লাহর দেওয়া এক বড় নেয়ামত। কিন্তু এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের গন্তব্য—জান্নাত নাকি জাহান্নাম।
একজন আত্মমর্যাদাশীল মুমিন হিসেবে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, এই ডিভাইসের প্রতিটি স্পর্শ এবং প্রতিটি ক্লিক আমাদের আমলনামায় যুক্ত হচ্ছে। এটি ব্যবহারের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মহৎ উদ্দেশ্য। কারণ যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত, ইলম অর্জন, ইসলামের প্রচার-প্রসার, আত্মীয়তার হক আদায় কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি সেই প্রযুক্তিই যদি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে তবে তা ইহকাল ও পরকাল—উভয়কেই ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
হাদিসে এসেছে, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।” [সহীহ বুখারী: ৬০১৮]
অথচ দুঃখজনকভাবে, অনেকেই এই মোবাইলকে গিবত, চোগলখুরি, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। অবৈধ সম্পর্ক, পরকীয়া, অশ্লীলতার প্রসার, গুজব ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা কাউকে হুমকি দেওয়ার মতো কাজগুলো কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিতেই হারাম নয় বরং তা একজন মানুষের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো, অনলাইন ভিত্তিক জুয়া বা বেটিংয়ের মতো মরণফাঁদ। এটি কেবল অর্থলিপ্সা নয় বরং সুস্পষ্ট হারাম এবং কবিরা গুনাহ। যারা সাময়িক উত্তেজনার লোভে এই নেশায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছে তারা নিজের পরিবার ও ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের অতলে ঠেলে দিচ্ছে। আজকের দিনে অনলাইন গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস কিংবা অন্তহীন নাটক-সিনেমা মানুষকে এমন এক কৃত্রিম নেশায় ডুবিয়ে রেখেছে, যা তার জীবনের মূল্যবান সময়কে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। বাস্তবতার চেয়ে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে পড়ে থাকাটা এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর পরিণাম বড় ভয়াবহ। সালাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত কিংবা জ্ঞান অর্জনের মতো মহৎ কাজগুলো আজ অনেকের কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে। জিকির-আজকার তো দূরের কথা, রবের স্মরণের জন্য এক মুহূর্ত সময় বের করার মানসিকতাটুকুও অনেকে হারিয়ে ফেলেছেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, এই আসক্তি মানুষকে এতটাই অন্ধ করে দিচ্ছে যে, সে নিজের পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনেও চরম অবহেলা প্রদর্শন করছে। যে সময়টা তার পরিবারকে দেওয়ার কথা, যে সময়টা সন্তানদের লালন-পালন ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করার কথা তা সে নিঃশেষ করছে অর্থহীন স্ক্রলিং আর গেমিংয়ের পেছনে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় বরং একটি বড় সামাজিক অবক্ষয়। ধর্মীয় ও সামাজিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ধিক্কার জানানোর মতো এবং কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। নিজের জীবনের মালিকানা হারিয়ে এভাবে আসক্তির দাস হওয়াটা মূলত নিজের সর্বনাশ ডেকে আনারই নামান্তর। একজন সচেতন ইমানদার কখনোই আল্লাহর দেওয়া এই নেয়ামতকে তার আমলনামা কলুষিত করার বা নিজের ধ্বংস ডেকে আনার মাধ্যম হতে দিতে পারেন না। তাই সতর্ক হোন, নিজের সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে—এই অনুভূতিই হোক মোবাইল ব্যবহারের মূল চালিকাশক্তি।
▪️২. মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক আদব ও শিষ্টাচার বজায় রাখা একজন সভ্য ও দায়িত্বশীল মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যেন সৌজন্যবোধ হারিয়ে না ফেলি সেদিকে লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত জরুরি।
জনসম্মুখে মোবাইল ব্যবহারের সময় নিচের বিষয়গুলো আমাদের ব্যক্তিত্ব ও মার্জিত আচরণের প্রতিফলন ঘটায়:
– পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় বা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে মোবাইলে ডুবে থাকা শিষ্টাচার হীনতা। এটি উপস্থিত ব্যক্তিদের বুঝিয়ে দেয় যে, আপনি তাদের চেয়ে আপনার ডিভাইসের স্ক্রিনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই সামাজিক পরিবেশে থাকাকালীন মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সচেতন ও সংযমী হওয়া প্রয়োজন।
– পাবলিক প্লেসে কথা বলার সময় চিৎকার করে বা চেঁচিয়ে কথা বলা অত্যন্ত অশোভন। বিশেষ করে জনাকীর্ণ স্থানে বা গণপরিবহনে উচ্চস্বরে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক আলাপ চালিয়ে যাওয়া অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়। আরও দুঃখজনক হলো, অনেকে রাগের মাথায় জনসম্মুক্ষে ফোনে গালাগালি বা কটু ভাষা ব্যবহার করেন যা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব ও রুচিকে সবার সামনে নিচু করে দেয়। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি আচরণই আপনার শিক্ষা ও রুচির পরিচয় বহন করে। প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার যেন আপনার ভেতরের মানবিক সৌজন্যবোধকে বিলীন করে না দেয়। একটি শান্ত ও মার্জিত কথোপকথন কেবল আপনার ব্যক্তিত্বকেই উজ্জ্বল করে না বরং আশপাশের মানুষের সাথে আপনার সম্পর্কের গভীরতা ও শ্রদ্ধাবোধকেও অটুট রাখে। নিজের আচরণের মাধ্যমে অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ না হয়ে, ধৈর্য ও শালীনতার পরিচয় দেওয়াই একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
– কোনো মাহফিল, মজলিস, সভা বা সেমিনারে উপস্থিত থাকা কিংবা কারো সাথে সরাসরি আলাপচারিতায় মগ্ন থাকা অবস্থায় মোবাইলে ডুবে থাকা কেবল প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়, এটি রীতিমতো সৌজন্যবোধের অভাব ও বেয়াদবি। যখন আপনি কারো সাথে সামনাসামনি কথা বলছেন বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসে আছেন তখন মোবাইলে গেম খেলা, রিলস দেখা বা বারবার ভিডিও কল রিসিভ করা—এই প্রতিটি কাজই আপনার সামনে থাকা মানুষটিকে ছোট করার নামান্তর। আপনার এই আচরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ওই ব্যক্তি বা মজলিস আপনার কাছে মোবাইল ফোনের ভার্চুয়াল জগত থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি আপনার সাথে কথা বলছে বা যে মজলিসে আপনি উপস্থিত আছেন তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া। অন্যের সময়ের মর্যাদা রক্ষা করা এবং মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা একজন ব্যক্তিত্ববান ও রুচিশীল মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। মনে রাখবেন, আপনি যখন কারো সাথে কথোপকথনরত অবস্থায় ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তখন এটি উল্টো পাশের মানুষটির মনে বিরক্তি ও অবহেলার জন্ম দেয়। তাই যেকোনো সামাজিক জমায়েতে নিজের মোবাইল ফোনটিকে পকেটে বা ব্যাগে রেখে পূর্ণ মনোযোগ উপস্থিত মানুষের দিকে দেওয়াটাই সভ্যতা ও মার্জিত আচরণের দাবি। প্রযুক্তির নেশায় পড়ে যেন আমরা আমাদের মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কগুলোকে নষ্ট না করি, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা একান্ত প্রয়োজন।
– মসজিদ, দ্বীনি মাহফিল বা হাসপাতালের মতো জায়গাগুলোর একটি নিজস্ব গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা রয়েছে। মসজিদ আল্লাহর ঘর, দ্বীনি আলোচনা জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র, আর হাসপাতাল যেখানে মানুষ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় শান্তি খোঁজে—এই স্থানগুলোতে মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার কেবল অসৌজন্যমূলক নয় বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এসব সংবেদনশীল স্থানে মোবাইল ফোন সাইলেন্ট বা ভাইব্রেট মুডে না রাখা কেবল আপনার উদাসীনতাই প্রকাশ করে না বরং এটি অন্যের ইবাদত, মনোযোগ কিংবা বিশ্রামে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। ভাবুন তো, নামাজের রুকু-সিজদায় বা গোরস্থানের মতো কোনও স্থানে হঠাৎ কর্কশ কোনো রিংটোন বেজে ওঠা কতটা পীড়াদায়ক হতে পারে! হাসপাতালের ওয়ার্ডে যেখানে রোগী একটু প্রশান্তির অপেক্ষায়‌ পড়ে আছে সেখানে মোবাইলের উচ্চশব্দ তাদের বিরক্তির কারণ হওয়াটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। একজন সচেতন ও রুচিশীল মানুষ হিসেবে এই জায়গাগুলোতে প্রবেশের সাথে সাথেই ফোনের সাউন্ড বন্ধ করে দেওয়া আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা আমাদেরই হাতে। তাই সামান্য সচেতনতা আর দায়িত্ববোধই পারে একটি মার্জিত পরিবেশ বজায় রাখতে। মনে রাখবেন, আপনার একটি ছোট পদক্ষেপই অন্যের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটায়।
– অন্যদের সাথে আলাপকালে অনুমতি ছাড়া লাউড স্পিকার ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং নৈতিকতার পরিপন্থী। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, অপর পক্ষের অজান্তে তার একান্ত কথা অন্যদের শোনানো—এটি কেবল সামাজিক অপরাধ নয় বরং আমানতের খেয়ানত ও গিবতের শামিল।
– মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি রক্ষা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যদি না সেই কথোপকথনে এমন কিছু থাকে যা অন্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে তবে বিনা অনুমতিতে কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা রেকর্ড করা—কোনোটাই বৈধ নয়। কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করা এবং তার বিশ্বাসের অমর্যাদা করা একজন ইমানদারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
– রিংটোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের রুচিবোধ ও সচেতনতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। অনেকেই শখ করে রিংটোন হিসেবে উদ্ভট শব্দ, উচ্চস্বরে গান-বাজনা বা অসংলগ্ন মিউজিক ব্যবহার করেন, যা জনসম্মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং অন্যের বিরক্তির কারণ হয়। আবার অনেকেই না বুঝে রিংটোন হিসেবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ব্যবহার করেন, যা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এটি আল্লাহর কালামের প্রতি এক ধরণের অবমাননা ও অপব্যবহার। কারণ ফোনের রিংটোন যখন কোনো অপবিত্র স্থানে বা বিব্রতকর মুহূর্তে বেজে ওঠে তখন তা কুরআনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
তাই একজন সচেতন ও মার্জিত মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত:
– কারো অনুমতি ছাড়া তার কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা রেকর্ড করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা।
– রিংটোনের ক্ষেত্রে সব সময় সাধারণ ও স্বাভাবিক টোন ব্যবহার করা, যা কারো বিরক্তির কারণ হবে না।
– পবিত্র কুরআন বা দ্বীনি কোনো বিষয়কে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থেকে তার যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তির প্রতিটি ব্যবহারই আমাদের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। তাই নিজের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো যেমন গোপন রাখা জরুরি, অন্যের গোপনীয়তা এবং সম্মান রক্ষা করাও তেমনি আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।
▪️৩. কারো সাথে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে ইসলামি আদব মেনে চলা কর্তব্য। যেমন:
– কথোপকথন শুরুর আগে সালাম বিনিময় করা।
– কারো বিশ্রামের সময় বা অসময়ে কল না দেওয়া এবং কেউ কল রিসিভ না করলে বারবার কল করে বিরক্ত না করে সম্ভব হলে একটি মেসেজ দিয়ে রাখা উত্তম।
– অন্যের অনুমতি ছাড়া তার ফোন ব্যবহার করা বা কারো ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের কাছে শেয়ার করা নৈতিকভাবে অন্যায়।
▪️৪. ইসলামের দৃষ্টিতে সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক আমানত এবং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত হিসাবের খাতায় জমা হচ্ছে, তাই এই সময়কে কেবল বিনোদনের উপকরণে বা সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে অপচয় করা মানে নিজের আখেরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। মনে রাখা দরকার, অহেতুক কাজে ডুবে থাকা কেবল সময় হারানো নয় বরং এটি জীবনের সেই মূল্যবান অংশ হারানো যা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
একজন বুদ্ধিমান মুমিন তার সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডকে ইহকাল ও পরকালের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করেন। সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্রযুক্তির পেছনে অকারণে সময় না দিয়ে, সেই সময়টুকু যদি কুরআন তেলাওয়াত, ইলম অর্জন, সৃজনশীল কাজ, কিংবা সমাজ ও পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করা হয় তবেই জীবন সার্থক হয়। প্রবাদে আছে, “সময় একটি ধারালো তলোয়ারের মতো; তুমি যদি একে না কাটো তবে এটি তোমাকে কেটে ফেলবে।” তাই সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম গতির পেছনে না ছুটে নিজের জীবনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিটি মুহূর্তকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করাই হলো প্রকৃত ইমানদারের কাজ। মনে রাখবেন, কাল কিয়ামতের ময়দানে প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। এই বোধটুকু জাগ্রত থাকলেই একজন মানুষ সময়ের অপচয় রোধ করে তার জীবনকে অর্থবহ ও সফল করে তুলতে পারবে। সহজ কথায়, মোবাইল ফোনকে আপনি আপনার জীবনের উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন, নাকি অধঃপতনের দিকে ছুটে চলবেন—এই সিদ্ধান্ত আপনার হাতে। এর দ্বারা আপনি আপনার আমলনামাকে সমৃদ্ধ করবেন নাকি কলুষিত করবেন তাও আপনার সিদ্ধান্ত। কল্যাণকর কাজে এই মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে বিজ্ঞানের এই মূল্যবান অবদানটি হবে আমাদের জন্য একটি বিশাল নেয়ামত। আর ভুল কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে তা হবে আমাদের জন্য ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারণ। আল্লাহ আমাদেরকে মোবাইল ফোন কে উপকারী কাজে ব্যবহার করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Translate