Friday, March 6, 2026

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার হুকুম

 প্রশ্ন: তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর বিবাহের প্রস্তাব সংক্রান্ত মূলনীতি হলো— কোনো ব্যক্তি যদি বিয়ের ইচ্ছা পোষণ করে এবং নির্দিষ্ট কোনো নারীকে প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করে, তবে সে একা কিংবা তার কোনো নিকট আত্মীয়— যেমন বাবা বা ভাই—কে সঙ্গে নিয়ে মেয়ের অভিভাবকের কাছে যেতে পারে। চাইলে অন্য কাউকে মাধ্যম হিসেবেও প্রস্তাব পাঠানো যায়। এ বিষয়ে শরিয়তে প্রশস্ততা রয়েছে।তবে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিও বিবেচনায় রাখা উচিত; কারণ কিছু দেশে প্রস্তাবদাতার একাকী যাওয়া অপ্রচলিত বা অসমীচীন হিসেবে দেখা হয়।এছাড়া প্রস্তাবদাতার জন্য প্রস্তাবিত নারীকে দেখা শরিয়তসম্মত। অন্যদিকে,
তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন; এ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা প্রয়োজন।
.
প্রথমত: বিয়ের প্রস্তাব (খুতবাহ) দুই ধরনের হতে পারে: স্পষ্ট প্রকাশ (تصريح) অথবা ইঙ্গিত প্রদান (تعريض)।
(ক).স্পষ্ট প্রকাশ (তাসরিহ): এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা যা শুধুমাত্র বিয়ের অর্থ বহন করে, অন্য কোনো সন্দেহ বা দ্ব্যর্থবাদ রাখে না। উদাহরণস্বরূপ— “তোমার ইদ্দত শেষ হলে আমি তোমার সঙ্গে বিয়ে করব” বলা, অথবা সরাসরি তার অভিভাবকের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি।
.
(খ).ইঙ্গিত প্রদান (তারিদ): এমন শব্দ ব্যবহার করা যাতে বিয়ের প্রস্তাবের সম্ভাবনাও থাকে আবার অন্য অর্থও হতে পারে। যেমন— “আপনার মতো গুণবতী নারী সবার কাম্য,” অথবা “আমি একজন স্ত্রী খুঁজছি,” অথবা “আশা করি আল্লাহ আপনার জন্য উত্তম কোনো ব্যবস্থা বা রিজিকের ফয়সালা করবেন” ইত্যাদি।
.
দ্বিতীয়ত: ইদ্দত পালনরত নারীকে সরাসরি বা স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নাজায়েজ (হারাম)। চাই তিনি তালাক-এ-রাজয়ি (ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে এমন তালাক),হোক কিংবা তালাক-এ-বায়েন (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ এমন তালাক) অথবা স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত পালনকারিণী হোন না কেন।যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: এবং নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না।”[সূরা বাকারা: ২৩৫] এ বিধানের গূঢ় রহস্য হলো সেই নারী গর্ভবতী হওয়া থেকে নিরাপদ না হওয়া। যার ফলে একজনের পানির সাথে অন্যজনের পানির মিশ্রণ ঘটবে এবং বংশ পরিচয়ে জটিলতা তৈরী হবে।
.
​তবে ইঙ্গিতপূর্ণ বিবাহ প্রস্তাবের (তারিদ) ক্ষেত্রে বিস্তারিত বিধান রয়েছে:
​(১).যদি নারী তালাক-এ-রাজয়ি-এর ইদ্দত পালন করেন, তাহলে তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়াও জায়েজ নেই। কারণ, রাজয়ি তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর মর্যাদাভুক্ত থাকেন। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন:(وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلاحا)”আর তাদের স্বামীরা এই মেয়াদের মধ্যে তাদের ফিরিয়ে নিতে চাইলে তারা অধিক হকদার” (সূরা বাকারা: ২২৮)। এখানে আল্লাহ তালাকদাতা স্বামীকে স্পষ্টভাবে ‘স্বামী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অতএব,যখন নারী এখনও অন্যের বিবাহাধীনে আছেন,তখন তাকে অন্য কেউ প্রস্তাব দেওয়া কীভাবে সম্ভব!
.
ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন;ولا يجوز التعريض لخطبة الرجعية إجماعا؛ لأنها كالزوجة” انتهى.”ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তালাকে রাজ’ঈপ্রাপ্তা নারীকে (যে তালাকের পর ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে) ইশারা-ইঙ্গিতেও বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া বৈধ নয়; কারণ ইদ্দত চলাকালীন তিনি স্ত্রীর মতোই গণ্য।”(তাফসিরে কুরতুবি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮৮)
.
​(২).যদি কোনো নারীর স্বামীর মৃত্যুবরণ করে বা তিন তালাক দেয়, অথবা অন্য কোনো শরীয়ত সম্মত ত্রুটির কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের ইদ্দত পালন করেন,তাহলে তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া জায়েজ,কিন্তু সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া নাজায়েজ। ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব জায়েজ হওয়ার দলিল হলো মহান আল্লাহর এই বাণী:وَ لَا جُنَاحَ عَلَیۡكُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِهٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَكۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِكُمۡ ؕ عَلِمَ اللّٰهُ اَنَّكُمۡ سَتَذۡكُرُوۡنَهُنَّ وَ لٰكِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡهُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ وَ لَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّكَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡكِتٰبُ اَجَلَهٗ ؕ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِكُمۡ فَاحۡذَرُوۡهُ ۚ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ”আর যদি তোমরা আকার-ইঙ্গিতে (সে) নারীদের বিয়ের প্রস্তাব দাও বা তোমাদের অন্তরে গোপন রাখ তবে তোমাদের কোন পাপ নেই। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তাদের সম্বন্ধে অবশ্যই আলোচনা করবে: কিন্তু বিধিমতো কথাবার্তা ছাড়া গোপনে তাদের সাথে কোন প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখো না; এবং নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন। কাজেই তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম সহনশীল।”(সূরা বাকারা: ২৩৫)
.
সূরা বাকারা’র এই আয়াতটি মূলত সেই মহিলার ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে যার স্বামী মারা গেছেন। তবে ওলামায়ে কেরাম (ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ) কিয়াস বা সাদৃশ্যের ভিত্তিতে একে সেই সব মহিলাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলেছেন যারা এমন ইদ্দত পালন করছেন যেখানে স্বামীর আর ফিরিয়ে নেওয়ার (রাজআত) সুযোগ নেই।
.
আয়াতটির তাফসিরে ইবনে আতিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে বলেছেন:والتعريض هو الكلام الذي لا تصريح فيه، كأنه يَعْرِض لفكر المتكلم به.وأجمعت الأمة على أن الكلام مع المعتدة بما هو نص في تزويجها ، وتنبيه عليه : لا يجوز. وكذلك أجمعت على أن الكلام معها ، بما هو رفث وذكر جماع أو تحريض عليه: لا يجوز. وجُوِّز ما عدا ذلك”
“তা’রীয’ (ইশারা-ইঙ্গিত) হলো এমন কথা যাতে (উদ্দেশ্যটি) স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয় না, বরং তা কেবল বক্তার চিন্তাকে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করে। উম্মতের আলেমগণ এই বিষয়ে (ইজমা) একমত হয়েছেন যে, ইদ্দত পালনকারী নারীর সাথে এমন কথা বলা জায়েজ নয় যা সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব বা তার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তেমনিভাবে আলেমগণ এ বিষয়েও ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে,অশ্লীল কথাবার্তা, যৌন মিলন বা তার প্রতি উস্কানিমূলক কথা বলাও যে নাজায়েজ এ ছাড়া বাকি সব (ইশারা-ইঙ্গিতপূর্ণ) কথা বলা বৈধ রাখা হয়েছে”।(তাফসীরে ইবনে আতিয়্যাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩১৫)
.
সৌদি আরবের প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.] বলেছেন,”
هذا حكم المعتدة من وفاة, أو المبانة في الحياة. فيحرم على غير مبينها (زوجها) أن يصرح لها في الخطبة, وهو المراد بقوله : ( وَلَكِنْ لَا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا ).وأما التعريض, فقد أسقط تعالى فيه الجناح. والفرق بينهما: أن التصريح, لا يحتمل غير النكاح, فلهذا حرم, خوفاً من استعجالها, وكذبها في انقضاء عدتها, رغبة في النكاح ، وقضاءً لحق زوجها الأول, بعدم مواعدتها لغيره مدة عدتها.وأما التعريض وهو: الذي يحتمل النكاح وغيره, فهو جائز للبائن كأن يقول: إني أريد التزوج, وإني أحب أن تشاوريني عند انقضاء عدتك, ونحو ذلك, فهذا جائز لأنه ليس بمنزلة التصريح, وفي النفوس داع قوي إليه. وكذا إضمار الإنسان في نفسه أن يتزوج من هي في عدتها, إذا انقضت (يعني لا حرج فيه أيضاً) . ولهذا قال : ( أَوْ أَكْنَنْتُمْ فِي أَنْفُسِكُمْ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ سَتَذْكُرُونَهُنَّ ) هذا التفصيل كله, في مقدمات العقد. وأما عقد النكاح فلا يحل ( حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ ). أي: تنقضي العدة “
​”এটি এমন নারীর বিধান যে তার (স্বামীর) মৃত্যুতে কিংবা জীবদ্দশায় চূড়ান্ত বিচ্ছেদের (বায়েন তালাক) কারণে ইদ্দত পালন করছে। সুতরাং যে স্বামী তাকে বিচ্ছিন্ন করেছে (অর্থাৎ বায়েন তালাকের ক্ষেত্রে), সে ব্যতীত অন্য কারো জন্য তাকে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হারাম। আর আল্লাহ তাআলার বাণী— ‘কিন্তু তোমরা তাদের সাথে গোপনে কোনো প্রতিশ্রুতি দিও না’—এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।তবে ইশারায় বা ইঙ্গিতে (বিয়ের কথা) বলার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ গুনাহ তুলে নিয়েছেন (অর্থাৎ তা বৈধ করেছেন)।সরাসরি প্রস্তাব এবং ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্য হলো:’সরাসরি প্রস্তাব’ বিবাহ ছাড়া অন্য কোনো অর্থ বহন করে না, তাই এটি হারাম করা হয়েছে; এই আশঙ্কায় যে,যাতে নারীটি দ্রুত বিয়ের লোভে ইদ্দত শেষ হওয়ার ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য না দেয় এবং প্রথম স্বামীর হকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ইদ্দত চলাকালীন অন্য কারো সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ না হয়। আর ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব যা বিয়ে কিংবা অন্য কোনো অর্থও বহন করতে পারে—তা ‘বায়েন’ (চূড়ান্ত ভাবে বিচ্ছিন্ন) নারীর ক্ষেত্রে জায়েজ। যেমন কেউ তাকে বলল: ‘আমি বিয়ে করার ইচ্ছা রাখি’ অথবা ‘আমি পছন্দ করি যে, আপনার ইদ্দত শেষ হলে আপনি আমার সাথে পরামর্শ করবেন’—এই জাতীয় কথা। এটি জায়েজ হওয়ার কারণ হলো এটি স্পষ্ট প্রস্তাবের সমপর্যায়ভুক্ত নয় এবং মানুষের মনে এমন আকাঙ্ক্ষা জাগা স্বাভাবিক।অনুরূপভাবে, ইদ্দত শেষ হওয়ার পর কোনো নারীকে বিয়ে করার সংকল্প মনে মনে গোপন রাখাও বৈধ। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন: ‘অথবা তোমরা তোমাদের মনের মধ্যে যা গোপন রাখো, আল্লাহ জানেন যে তোমরা অবশ্যই তাদের কথা স্মরণ করবে। এই বিস্তারিত আলোচনাটি কেবল বিয়ের প্রাথমিক আলোচনা (প্রস্তাব) সংক্রান্ত। আর বিয়ের মূল আকদ বা চুক্তি করা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ নয়, ‘যতক্ষণ না নির্ধারিত সময় (ইদ্দত) তার শেষ সীমায় পৌঁছাবে’—অর্থাৎ, যতক্ষণ না ইদ্দত পূর্ণ হবে।”(তাফসির আস সাদী; পৃষ্ঠা: ১০৬; আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: আল-মুগনি; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১১২; আল-মাওসুআহতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ১৯১)।
.
▪️এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে-সরাসরি প্রস্তাব এবং ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্যের হিকমত (রহস্য) কী?
.
​সরাসরি প্রস্তাব এবং ইশারার মধ্যে পার্থক্যের পেছনে হিকমত হলো:সরাসরি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একজন নারীর মনে এই নিশ্চয়তা তৈরি হয় যে, প্রস্তাবকারী তাকে বিয়ে করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমতাবস্থায় দ্রুত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নারী তার ইদ্দত শেষ হওয়ার ব্যাপারে অসত্য তথ্য দিতে পারে। কিন্তু ইশারা-ইঙ্গিত কোনো নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি অস্পষ্ট সম্ভাবনা মাত্র। এই অনিশ্চয়তার কারণে নারী কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মিথ্যা বলার ঝুঁকি নেয় না।শরীয়ত এখানে দুটি স্বার্থের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখেছে:(১).আগ্রহী পুরুষের স্বার্থ: ইশারা-ইঙ্গিতের সুযোগ রেখে আগ্রহী পুরুষকে তার পছন্দ প্রকাশের একটি পথ দেওয়া হয়েছে, যাতে অন্য কেউ তার আগে বিয়ের সুযোগ না পায়। (২)অনিষ্ট রোধ: সরাসরি প্রস্তাব নিষিদ্ধ করে তাড়াহুড়ো বা মিথ্যার মাধ্যমে ইদ্দতের পবিত্রতা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে।এছাড়া ইশারা সব সময় নিজের জন্যই হতে হবে এমন নয়; অনেক সময় তা অন্য কারো পক্ষেও হতে পারে। যেমন সহীহ মুসলিম-এর (১৪৮০) হাদিসে বর্ণিত আছে,রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইদ্দত চলাকালে ফাতিমা বিনতে কায়েস-এর কাছে লোক পাঠিয়ে বলেন: “আমার অনুমতি ছাড়া তুমি নিজের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।” পরে তাঁর ইদ্দত শেষ হলে তিনি তাঁকে উসামাহ্‌ ইবনু হারিসাহ্‌ (রাঃ)-এর সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন।”(সহীহ মুসলিম হা/২৫৯২) আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৩২৩৭)
.
▪️আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানা অত্যন্ত জরুরি:
.
আর তা হলো:কখনো কখনো অজ্ঞতার কারণে এমন ঘটে যে, কোনো নারীর ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই তার সঙ্গে বিবাহ সম্পাদন করা হয়। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী এটি হারাম। তাই কোনো নারী ইদ্দত অবস্থায় থাকা অবস্থায় যদি তার সঙ্গে বিবাহ করা হয়, তবে সে বিবাহ শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হবে এবং উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো আবশ্যক। এরপর ওই নারীকে অবশ্যই তার প্রথম স্বামীর ইদ্দত সম্পূর্ণ করতে হবে।
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে এসেছে;
اتفق الفقهاء على أنه لا يجوز للأجنبي نكاح المعتدة أيا كانت عدتها من طلاق أو موت أو فسخ أو شبهة ، وسواء أكان الطلاق رجعيا أم بائنا بينونة صغرى أو كبرى . وذلك لحفظ الأنساب وصونها من الاختلاط ومراعاة لحق الزوج الأول ، فإن عقد النكاح على المعتدة في عدتها ، فُرّق بينها وبين من عقد عليها ، واستدلوا بقوله تعالى : ( ولا تعزموا عقدة النكاح حتى يبلغ الكتاب أجله ) والمراد تمام العدة ، والمعنى : لا تعزموا على عقدة النكاح في زمان العدة ، أو لا تعقدوا عقدة النكاح حتى ينقضي ما كتب الله عليها من العدة … وفي الموطأ : أن طليحة الأسدية كانت زوجة رشيد الثقفي وطلقها ، فنكحت في عدتها ، فضربها عمر بن الخطاب وضرب زوجها بخفقةٍ ضربات ، وفرق بينهما ، ثم قال عمر : أيما امرأة نكحت في عدتها فإن كان الذي تزوجها لم يدخل بها فرق بينهما ، ثم اعتدت بقية عدتها من زوجها الأول ، ثم إن شاء كان خاطبا من الخطاب . وإن كان دخل بها فُرق بينهما ، ثم اعتدت بقية عدتها من الأول ، ثم اعتدت من الآخر ، ثم لا ينكحها أبدا “
“ফকিহগণ (ইসলামি আইনজ্ঞ) এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোনো ভিনদেশি বা পরপুরুষের জন্য ইদ্দত পালনরত নারীকে বিবাহ করা বৈধ নয়; চাই সেই ইদ্দত তালাক, মৃত্যু, বিবাহ বিচ্ছেদ (ফাসখ) কিংবা শুবহাহ (সংশয়পূর্ণ মিলন) যে কারণেই হোক না কেন।তালাকটি রাজঈ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) হোক কিংবা বাইন—ছোট বিচ্ছেদ (বাইনুনা সুগরা) কিংবা বড় বিচ্ছেদ (বাইনুনা কুবরা) হোক—সর্বাবস্থায় এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।এ বিধান রাখা হয়েছে বংশধারা সংরক্ষণ, বংশের মিশ্রণ থেকে সুরক্ষা এবং প্রথম স্বামীর অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্য।যদি ইদ্দত চলাকালীন কোনো নারীর সাথে বিবাহের আকদ (চুক্তি) সম্পন্ন করা হয়, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে তারা আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মাধ্যমে দলিল পেশ করেছেন: (আর তোমরা বিবাহের সংকল্প করো না যতক্ষণ না ইদ্দত তার নির্ধারিত সময়ে পৌঁছায় (অর্থাৎ শেষ হয়)।”(সূরা বাকারা: ২৩৫) আর (এই আয়াতে বর্ণিত নির্ধারিত সময়) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইদ্দত পূর্ণ হওয়া। এর অর্থ হলো: তোমরা ইদ্দত চলাকালীন সময়ের মধ্যে বিবাহের সংকল্প করো না, অথবা আল্লাহ তার (নারীর) ওপর ইদ্দতের যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না।”মুয়াত্তা (ইমাম মালিক)-এ বর্ণিত হয়েছে যে: তালিহা আল-আসাদিয়্যা রুশাইদ আস-সাকাফীর স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি তাকে তালাক দিয়েছিলেন।তারপর ওই নারী তার ইদ্দত চলাকালীন সময়েই (অন্যত্র) বিবাহ করেন। তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাকে এবং তার স্বামীকে চাবুক দিয়ে কয়েকবার আঘাত করেন এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন। অতঃপর উমর (রা.) বলেন:”যে নারীই তার ইদ্দত চলাকালীন সময়ে বিবাহ করবে, যদি সেই বিবাহকারী স্বামী তার সাথে সহবাস না করে থাকে, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সেই নারী তার প্রথম স্বামীর ইদ্দতের অবশিষ্ট অংশ পূর্ণ করবে। এরপর (ইদ্দত শেষে) সেই ব্যক্তি চাইলে অন্য আর দশজন প্রস্তাবকারীর মতো পুনরায় বিবাহের প্রস্তাব দিতে পারবে। আর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তার সাথে সহবাস করে থাকে, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ওই নারী প্রথম স্বামীর ইদ্দতের অবশিষ্ট অংশ পূর্ণ করবে, অতঃপর (সহবাসের কারণে) দ্বিতীয় স্বামীর জন্য ইদ্দত পালন করবে। এরপর (শাস্তিস্বরূপ) ওই (দ্বিতীয় স্বামী ও স্ত্রী) উভয় আর কখনোই (আজীবন) বিবাহ করতে পারবে না।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩৪৬)
.
প্রিয় পাঠক!ওমর (রা.)-এর এই আসার (বর্ণনা) থেকে বোঝা যায় যে, কোনো তালাকপ্রাপ্তা নারী যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে তার ক্ষেত্রে দুটি অবস্থা হতে পারে:
প্রথমত: যদি শুধু বিবাহ সম্পন্ন হয় কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মিলন (সহবাস) না ঘটে: সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়ে দেওয়া হবে এবং নারীটি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করবেন। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি চাইলে তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত: যদি বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মিলন ঘটে থাকে: সেক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়ে দেওয়া হবে এবং নারীটি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করবেন। এরপর দ্বিতীয় স্বামীর কারণেও তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। এমতাবস্থায় (ওমর রা.-এর ফতোয়া অনুযায়ী) ওই নারী দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যাবেন; তিনি তাকে আর কখনোই বিবাহ করতে পারবেন না। এটি মালিকী মাযহাবের মত এবং হাম্বলী মাযহাবের দুটি মতের একটি। তবে হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত (জমহুর) অনুযায়ী, ইদ্দত শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে বিবাহ করতে পারবেন।
.
​অবশ্য হাম্বলী ফকীহগণ বলেন: দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে ততক্ষণ বিবাহ করতে পারবেন না যতক্ষণ না “উভয় ইদ্দত” (প্রথম স্বামীর ইদ্দত এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে মিলনের কারণে পালনীয় ইদ্দত) শেষ হয়।মাতালিবু উলিন নুহা” গ্রন্থে বলা হয়েছে:وللثاني الذي تزوجته في عدتها ووطئها أن ينكحها بعد انقضاء العدتين ، لأنه قبل انقضاء عدة الأول يكون ناكحا في عدة غيره ، وأما انقضاء عدته فلأنها عدة لم تثبت لحقه ؛ لأن نكاحه لا أثر له ، وإنما هي لحق الولد فلم يجز له النكاح فيها كعدة غيره”যে ব্যক্তি ইদ্দত চলাকালীন কোনো নারীকে বিবাহ করেছে এবং তার সাথে সহবাস করেছে, সে ব্যক্তি উভয় ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। কারণ প্রথম ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে বিবাহ করলে তা অন্যের ইদ্দত চলাকালীন বিবাহ হিসেবে গণ্য হয়। আর দ্বিতীয় ইদ্দত (যা নিজের মিলনের ফলে ওয়াজিব হয়েছে) শেষ হওয়া জরুরি, কারণ এটি একটি শরয়ি ইদ্দত যা সন্তানের বংশপরিচয় রক্ষার জন্য আবশ্যক। তাই অন্যের ইদ্দতের মতোই এই ইদ্দত চলাকালীন বিবাহ জায়েজ নয়।”(দ্রষ্টব্য: আল-মুনতাকা লিল-বাজি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১৭; মাতালিবু উলিন নুহা; খণ্ড: ৫/৯৭, ৫৭৭; আহকামুল কুরআন লিল-জাসাস; খণ্ড: ১;পৃষ্ঠা: ৫৮০), ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৪৮)।
.
তবে এই মাসালায় (আল্লাহু আলাম) অধিকতর সঠিক (রাজ্যেহ) মত হলো:ইদ্দতের মধ্যে বিবাহকারী নারী যদি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করেন, তবে দ্বিতীয় ব্যক্তি তার সাথে নতুন করে আকদ (বিবাহ) করতে পারবেন; সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য আলাদা ইদ্দতের প্রয়োজন নেই। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই নারীর অভিভাবকের (ওয়ালী) অনুমতি এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতিতে হতে হবে। নারী নিজে নিজের বিয়ের আকদ করতে পারেন না।(দ্রষ্টব্য: ইবনু উসাইমীন আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৮৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
​▬▬▬▬✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

তারাবীহ ও তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য এবং রমাদান মাসে একই রাতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ আদায়ের বিধান

 প্রশ্ন: তারাবি ও তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য কি? রমাদান মাসে একই রাতে তারাবি ও তাহাজ্জুদ আদায়ের বিধান কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:
.
▪️তারাবীহ ও তাহাজ্জুদের মধ্যে পার্থক্য:
.
রাত্রির বিশেষ নফল সালাত তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ নামে পরিচিত। আর এগুলো কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত। রমাদানে এশার পর প্রথম রাতে পড়লে তাকে ‘তারাবীহ’ এবং রমাদান ও রমাদানের বাহিরে অন্যান্য সময়ে শেষরাতে পড়লে তাকে ‘তাহাজ্জুদ’ বলা হয়। রাত্রির সালাত বা সালাতুল লায়েল’ নফল হলেও তা খুবই ফযীলতপূর্ণ। যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيْضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ “ফরয সালাতের পরে সর্বোত্তম সালাত হল রাত্রির (নফল) সালাত”।(সহীহ মুসলিম, হা/১১৬৩; মিশকাত, হা/২০৩৯)। তিনি আরও বলেন, “আমাদের পালনকর্তা মহান আল্লাহ প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কে আছ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছ আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব? এভাবে তিনি ফজর স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত আহ্বান করেন”। (সহীহ মুসলিম, হা/১৭৭৩; মিশকাত, হা/১২২৩)।সুতরাং তারাবি ও তাহাজ্জুদ এ দুইটি পৃথক কোন সালাত নয়, যেমনটি অনেক সাধারণ মানুষ ধারণা করে থাকেন। বরং রমজান মাসে যে ‘কিয়ামুল লাইল’ আদায় করা হয় সেটাকে‘সালাতুত তারাবী’বা বিরতিপূর্ণ নামায বলা হয়।কারণ সলফে সালেহীন (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীগণের প্রজন্ম) যখন এই সালাত আদায় করতেন তখন তাঁরা প্রতি দুই রাকাত বা চার রাকাত অন্তর বিরতি নিতেন। কেননা তাঁরা মহান মৌসুমকে কাজে লাগাতে ও রাসূলের হাদিস“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল পালন করে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়”?সহীহ বুখারী হা/৩৬) এ বর্ণিত সওয়াব পাওয়ার আশায় নামাযকে দীর্ঘ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন।আল্লাহ তা‘আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৭৩০)
.
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেন, تِلْكَ صَلَاةٌ وَاحِدَةٌ إِذَا تَقَدَّمَتْ سُمِّيَتْ بِاِسْمِ التَّرَاوِيْحِ إِذَا تَأَخَّرَتْ سُمِّيَتْ بِاِسْمِ التَّهَجُّدِ “এটা (তারবি ও তাহাজ্জুদ) একই সালাত; যখন রাতের প্রথমাংশে পড়া হবে, তখন তার নাম হবে তারাবীহ। আর যখন শেষাংশে পড়া হবে, তখন তার নাম হবে তাহাজ্জুদ’ (ফায়যুল বারী, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪২০)
.
আল-মাওসু‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ-এ বলা হয়েছে:” لا خلاف بين الفقهاء في سنية قيام ليالي رمضان ؛ لقوله صلى الله عليه وسلم : ( من قام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه ) وقال الفقهاء : إن التراويح هي قيام رمضان ؛ ولذلك فالأفضل استيعاب أكثر الليل بها ; لأنها قيام الليل “রমজানের রাতগুলোতে কিয়াম করা সুন্নত।এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। কারণ রাসূল (ﷺ) বলেছেন:যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ফকীহগণ বলেছেন: তারাবীহই হলো রমজানের কিয়াম। তাই উত্তম হলো:এর মাধ্যমে রাতের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করা, কারণ এটি মূলত কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ)”।(আল-মাওসু‘আহ আল-ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৩৪; পৃষ্ঠা: ১২৩)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: তারাবিহ এবং কিয়ামের (তাহাজ্জুদ) মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? রমজানের শেষ দশকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা (কিয়াম), দীর্ঘ রুকু এবং দীর্ঘ সেজদা করার কি বিশেষ কোনো দলিল আছে?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
الفرق بين التراويح والقيام والإطالة في العشر الأواخر
س: هل هناك فرق بين التراويح والقيام؟ وهل من دليلٍ على تخصيص العشر الأواخر بطول القيام والركوع والسجود؟
ج: الصلاة في رمضان كلها تُسمَّى قيامًا كما قال ﷺ: مَن قام رمضان إيمانًا واحتسابًا غُفر له ما تقدَّم من ذنبه[1]، فإذا قام ما تيسر منه مع الإمام سُمِّي قيامًا، ولكن في العشر الأخيرة يُستحب الإطالة؛ لأنه يُشرع إحياؤها بالصلاة والقراءة والدعاء؛ لأن الرسول عليه الصلاة والسلام كان يُحيي الليل كله في العشر الأخيرة، ولهذا شُرعت الإطالة فيها كما أطال النبي ﷺ فإنه قرأ في بعض الليالي بالبقرة والنساء وآل عمران في ركعةٍ واحدةٍ.فالمقصود أنه عليه الصلاة والسلام كان يُطيل في العشر الأخيرة ويُحييها؛ فلهذا شُرع للناس إحياؤها والإطالة فيها حتى يتأسّوا به ﷺ بخلاف العشرين الأول، فإنه ما كان النبي عليه الصلاة والسلام يُحييها، كان يقوم وينام عليه الصلاة والسلام كما جاء ذلك في الأحاديث، أما في العشر الأخيرة فكان عليه الصلاة والسلام يُحيي الليل كله، ويُوقظ أهله، ويشدّ المئزر عليه الصلاة والسلام ولأن فيها ليلةً مباركةً؛ ليلة القدر
“রমাদান মাসের নফল নামাজসমূহকে সামগ্রিকভাবে ‘কিয়াম’ বলা হয়। কারণ মুহাম্মদ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমাদানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”(সহীহ বুখারী হা/৩৭) অতএব,কেউ যদি ইমামের সঙ্গে যতটুকু সম্ভব সালাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তাও তার জন্য কিয়াম হিসেবেই গণ্য হবে। তবে রমাদানের শেষ দশকে দীর্ঘ কিয়াম করা মুস্তাহাব। কেননা এই সময়কে সালাত, তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে জীবন্ত রাখা শরিয়তসম্মত আমল। রাসূল ﷺ নিজেও শেষ দশকে পুরো রাত ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। এ কারণেই এ সময়ে দীর্ঘ কিয়ামের প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।নবী (ﷺ) দীর্ঘ তিলাওয়াত করতেন এমনকি কোনো কোনো রাতে এক রাকাআতেই সূরা আল-বাকারা, আন-নিসা ও আলে-ইমরান তিলাওয়াত করেছেন। মূল উদ্দেশ্য হলো, তিনি শেষ দশকে দীর্ঘ কিয়াম ও রাত জাগরণের মাধ্যমে ইবাদতে অধিক মনোযোগ দিতেন; তাই উম্মতের জন্যও এই সময় ইবাদতে জাগ্রত থাকা ও কিয়াম দীর্ঘ করা সুন্নাহ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, যাতে তারা তাঁর অনুসরণ করতে পারে।রমজানের প্রথম বিশ রাতের অবস্থা ভিন্ন ছিল। তখন তিনি পুরো রাত জেগে থাকতেন না; বরং কিছু সময় নামাজ আদায় করতেন এবং কিছু সময় (ঘুমিয়ে) বিশ্রাম নিতেন যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে;কিন্তু শেষ দশকে তিনি রাতভর ইবাদত করতেন, নিজের পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন (অর্থাৎ ইবাদতে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন)। আর এর বিশেষ কারণ হলো—এই দশকের মধ্যেই রয়েছে এক মহিমান্বিত ও বরকতময় রাত, লাইলাতুল কদর।”।(ইমাম বিন বায; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩৩৮)
.
▪️রমাদান মাসে একই রাতে তারাবি ও তাহাজ্জুদ আদায়ের বিধান কি?
.
একই রাতে বিশেষত রমাদানের শেষ দশকে রাতের প্রথম অংশে তারাবি এবং শেষ তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ আদায় করার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁদের একদল এটিকে জায়েজ মনে করেন, আবার অপর একটি অংশ একে বিদআত বলে অভিহিত করেছেন।
.
যারা এমনটি করা বিদআত বলেছেন তাদের যুক্তি হল:
‘তারাবীহ’ ও ‘তাহাজ্জুদ’ মূলত একই সালাত। আর এ জন্যই মুহাদ্দিছগণ একই হাদীস ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন, ‘তারাবীহ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন (সহীহ বুখারী, হা/২০১৩, ১/২৬৯ পৃ.হা/১১৪৭, ১/১৫৪, হা/৩৫৬৯, ১/৫০৪)।তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একই রাত্রে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়েননি। প্রশ্নকারী আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে রমাদানের রাত্রির সালাত কেমন ছিল সে বিষয়েই জিজ্ঞেস করেছিলেন। আর তারই উত্তরে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ১১ রাক‘আতের কথা বলেন। এছাড়া উক্ত উদ্ভট দাবীকে চূর্ণ করেছেন প্রখ্যাত হানাফী বিদ্বান আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রাহিমাহুল্লাহ)। তিনি মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীছটি উল্লেখ করে বলেন, فِيْهِ تَصْرِيْحٌ أَنَّهُ حَالُ رَمَضَانَ فَإنَّ السَّائِلَ سَأَلَ عَنْ حَالِ رَمَضَانَ وَغَيْرِه ‘এতে পরিষ্কার ব্যাখ্যা রয়েছে যে, এটা রমাদানেরই অবস্থা। কারণ প্রশ্নকারী রামাযানসহ অন্যান্য অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন’ (আল-আরফুশ শাযী শরহে তিরমিযী, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬৬) অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তৃতীয় দিন ২৭-এর রাত্রে সাহারীর সময় পর্যন্ত তারাবীহর ছালাত দীর্ঘ করেছিলেন, যাতে সাহাবায়ে কেরাম সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। যেমন হাদীছে এসেছে, فَقَامَ بِنَا حَتَّى خَشِيْنَا أَنْ تَفُوْتَنَا الْفَلَاحُ ‘আমাদের নিয়ে তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে ছালাত পড়লেন, যাতে আমরা সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলাম’ (আবু দাঊদ, হা/১৩৭৫, ১/১৯৫; তিরমিযী, হা/৮০৬, ১/১৬৬; মিশকাত, হা/১২৯৮)। তাহলে এই রাতে তাহাজ্জুদ কখন পড়লেন?
.
অনুরূপ সাহাবীদের যুগেও তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই সালাত বলে গণ্য হত। কারণ ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যে হাদীছে ১১ রাক‘আত তারাবীহ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, ঐ হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘ক্বিরাআত লম্বা হওয়ার কারণে (পরিশ্রান্ত হয়ে) আমরা লাঠির উপর ভর দিতাম এবং ফজরের সালাতের সময় হওয়ার উপক্রম হলে সালাত শেষ করে চলে আসতাম”।(সহীহ ইবনু খুযায়মাহ, ৪/১৮৬ পৃ.; মুওয়াত্ত্বা মালেক, ১/১১৫)।সুতরাং স্পষ্ট হল যে,রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবায়ে কেরাম একই রাত্রে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়তেন না। অন্য আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّىْ مَا بَيْنَ أَنْ يَفْرُغَ مِنْ صَلَاةِ الْعِشَاءِ إِلَى الْفَجْرِ إِحْدَى عَشَرَةَ رَكْعَةً”নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এশার সালাত শেষ করার পর হতে ফজর পর্যন্ত মাত্র ১১ রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন’ (সহীহ মুসলিম, হা/৭৩৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৫৮)। উক্ত হাদীস থেকে আরো স্পষ্ট হল যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এশার সালাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত ১১ রাক‘আতের বেশী সালাত কখনো পড়তেন না।অনুরূপ ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তারাবীহর জামা‘আত পুনরায় চালু করা সংক্রান্ত ছহীহ বুখারীতে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, তাতে একই সালাতের কথা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, وَالَّتِىْ يَنَامُوْنَ عَنْهَا أَفْضَلُ مِنْ الَّتِىْ يَقُوْمُوْنَ يُرِيْدُ آخِرَ اللَّيْلِ وَكَانَ النَّاسُ يَقُوْمُوْنَ أَوَّلَهُ ‘তবে তারা যা পড়ছে তার চেয়ে উত্তম সেটাই, যার জন্য তারা ঘুমাত অর্থাৎ শেষ রাত্রের ছালাত। তবে লোকেরা প্রথমাংশেই পড়ত’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০১০; মিশকাত, হা/১৩০১, পৃ. ১১৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১২২৭, ৩/১৫১-৫২)।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: প্রশ্নকারী: হে আমাদপর শাইখ, বর্তমানে যা ঘটছে রমাদানেরশেষ দশকে তারা কিয়ামের (তাহাজ্জুদ/তারাবিহ) সালাতকে দুই ভাগে ভাগ করে নিচ্ছে; কিছু রাতের প্রথম অংশে এবং কিছু শেষ অংশে। আর এটা যেন একটি স্থায়ী নিয়মে পরিণত হয়েছে? জবাবে ইমাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
: بدعة, السائل : طيب كيف يكون, يعني لو أردنا أن نقيم السنة ونخفف على الناس, فكيف نفعل ؟
الشيخ : تؤخرون كما قال عمر: ” والتي يؤخرونها أفضل ” يعني هو أمر أبيّ بن كعب أن يقيم صلاة القيام بالناس بعد صلاة العشاء ففعل ولما خرج يتحسس قال: ” نعمة البدعة هذه والتي ينامون عنها أفضل ” .السائل : يعني يبقى الحال على ما هو قبل العشر ؟ الشيخ : أي نعم
“(এটি একটি) বিদআত। প্রশ্নকারী: তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি কী হবে? অর্থাৎ, যদি আমরা সুন্নাহ কায়েম করতে চাই এবং মানুষের জন্য সহজও করতে চাই, তবে আমাদের কী করা উচিত?
শাইখ: তোমরা এটি বিলম্বিত করবে (রাতের শেষ অংশে পড়বে), যেমনটি ওমর (রা.) বলেছিলেন: “যেটি তারা বিলম্বিত করে আদায় করে, সেটিই উত্তম।” অর্থাৎ, তিনি উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি ইশার পর লোকদের নিয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করেন। তিনি তা-ই করলেন। এরপর ওমর (রা.) (বাইরে) বের হয়ে পরিস্থিতি দেখলেন এবং বললেন: “এটি কতই না উত্তম বিদআত! আর রাতের যে অংশে তারা ঘুমিয়ে থাকে (অর্থাৎ শেষ রাত), সেই সময়ের সালাতেই অধিক উত্তম।” প্রশ্নকারী: তার মানে কি শেষ দশকের আগের দিনগুলোতে যেভাবে চলত, তেমনই থাকবে?
​শাইখ: হ্যাঁ, তাই থাকবে।”(ইমাম আলবানী; সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, অডিয়ো ক্লিপ নং-৭১৯)
.
অপরদিকে যেসব আলেম একই রাতে বিশেষত রমাদানের শেষ দশকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ উভয় সালাত আদায়কে জায়েজ বলেছেন, তাঁদের অভিমত হলো: রমাদানের রাতের নফল ইবাদত মূলত কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত; আর কিয়ামুল লাইলকে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ—এই দুই ধাপে আদায় করা শরীয়তসম্মত। কারণ, তারাবীহর জন্য শরিয়তে নির্দিষ্ট কোনো রাকাতসংখ্যা নির্ধারিত হয়নি এবং ইশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত পুরো রাতই ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত সময়। অতএব, যেহেতু সমগ্র রাতই কিয়ামের সময়,তাই ইবাদতের মাঝে বিরতি দেওয়া যদি স্বতন্ত্র কোনো নতুন ইবাদত হিসেবে উদ্দেশ্য না হয়ে বরং মুসল্লিদের জন্য সহজতা সৃষ্টি, অধিক সওয়াব অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া এবং রাতের শেষ তৃতীয়াংশের বিশেষ ফজিলত লাভের উদ্দেশ্যে হয়—যেমনটি বিশেষত রমজানের শেষ দশকে অনেক ইমাম করে থাকেন তাহলে তা শরীয়তসম্মত এবং নিষিদ্ধ নয়। যেমন: এশার পর জামাতের সাথে তারাবি আদায় করা, তারপর রাতের শেষ ভাগে পুনরায় মসজিদে ফিরে এসে কিয়াম করা। এ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করার মতো কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই; বরং শেষ দশকে সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদতে অধিক প্রচেষ্টা করাই কাম্য।আর যদি কেউ নিজের রাতকে নামাজ, বিশ্রাম, ঘুম ও কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে ভাগ করে নেয়, তবে সে অবশ্যই উত্তম কাজই করলো। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়ও দেখা যায়, মুসলিমরা সহজতা ও সহনীয়তার জন্য অনেক সময় ইবাদতকে এভাবেই ভাগ করে নিয়েছেন।পক্ষান্তরে, সমসাময়িক কিছু আলেম এই বিভাজন পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ বলেছেন। তাঁদের প্রধান যুক্তি হলো—বিতরসহ এগারো রাকআতের বেশি আদায় করা বিদআত। তবে এ মতটি দুর্বল; কারণ এটি নবী ﷺ-এর সাধারণ (মুতলাক) নির্দেশনার পরিপন্থী এবং সাহাবা ও পরবর্তী যুগের আমলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সাহাবা ও তাবেঈনদের মধ্যে কেউ বিশ রাকআত, কেউ ঊনচল্লিশ রাকআত পর্যন্তও আদায় করেছেন। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়: যারা রাতের প্রথমাংশে তারাবি আদায় করে পরে তাহাজ্জুদ পড়তে চান, তাদের জন্য উত্তম হলো প্রথম অংশে বিতির না পড়ে বরং রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদের পর বিতির আদায় করা যাতে সেটিই রাতের সর্বশেষ সালাত হয়।
আর এরই মতো: যদি কোনো ব্যক্তি ইমাম হিসেবে দুই মসজিদে বা দুই জামাতে সালাত পড়ান রাতের শুরুতে একবার এবং রাতের শেষে একবার; অথবা যদি এমন হয় যে, এক জামাতে তিনি মুক্তাদি হিসেবে সালাত পড়েন এবং অন্যটিতে ইমাম হিসেবে সালাত পড়ান—এর প্রতিটিই ইনশাআল্লাহ জায়েজ এবং এতে কোনো অসুবিধা নেই। দলিল হচ্ছে: ক্বায়িস ইবনু ত্বালক্ব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা রমাদান মাসে ত্বালক্ব ইবনু ‘আলী (রাঃ) আমাদের সাথে দেখা করতে এসে এখানে সন্ধ্যা অতিবাহিত করেন এবং এখানেই ইফতার করেন। অতঃপর রাতে আমাদেরকে নিয়ে তারাবীহ ও বিতর সালাত আদায় করেন। অতঃপর তিনি নিজেদের মাসজিদে গিয়ে তার সাথীদেরকে নিয়েও সালাতআদায় করেন। অতঃপর বিতর সালাতের জন্য এক ব্যক্তিকে সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে বলেন, তোমার সাথীদেরকে বিতর পড়াও। কেননা আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনছি : একই রাতে দুইবার বিতর হয় না”।(সুনানে আবু দাউদ হা/১৪৩৯;তিরমিযী হা/৪৭০;নাসাঈ হা/১৬৭৯;মুসনাদে আহমদ হা/১৬২৯৬;এই হাদিসটিকে ইবনুিল মুলাককিন তাঁর “আল-বদরুল মুনীর” (৪/৩১৭) গ্রন্থে, একইভাবে হাফেজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারী” (২/৪৮১) গ্রন্থে ‘হাসান’ বলেছেন। মুসনাদে আহমাদ-এর মুহাক্কিকগণও একে ‘হাসান’ বলেছেন এবং ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সুনানে আবু দাউদ”-এ হাদিসটি ‘সহীহ’ হিসেবে গণ্য করেছেন।
.
হাদিসটির ব্যাখায় আস-সিন্দী (রাহিমাহুলাহ) বলেন: فصلى بِأَصْحَابِهِ ) الظَّاهِر أَنه صلى بهم الْفَرْض وَالنَّفْل جَمِيعًا ، فَيكون اقْتِدَاء الْقَوْم بِهِ فِي الْفَرْض ، من اقْتِدَاء المفترض بالمتنفل) (অতঃপর তিনি তাঁর সাহাবীদের নিয়ে সালাত পড়লেন—এর বাহ্যিক অর্থ হলো তিনি তাঁদের নিয়ে ফরজ ও নফল উভয় সালাতই আদায় করেছেন। এমতাবস্থায় (সাহাবীগণের তথা) কওমের এই ইক্তিদা ছিল ‘নফল আদায়কারীর পেছনে ফরজ আদায়কারীর ইক্তিদা’ করার অন্তর্ভুক্ত।”[হাশিয়াতুস সিন্দী আলা সুনানিন নাসাঈ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৩০)
​ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহকে.)-কে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে রমাদান মাসে সালাত (তারাবীহ) আদায় করে এবং তাদের নিয়ে বিতর পড়ে, অথচ সে অন্য একদল মানুষের ইমামতি করারও ইচ্ছা রাখে? তিনি (রাহি.) উত্তরে বলেন:يشتغل بينهما بشيء ، بأكل أو شرب أو يجلس “সে যেন এই দুইয়ের মাঝে কোনো কিছুতে নিয়োজিত হয়; যেমন— পানাহার করা অথবা (কিছুক্ষণ) বসে থাকা।”
.
​ইবনু কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وذلك لأنه يكره أن يوصل بوتره صلاة ، فيشتغل بينهم بشيء ، ليكون فصلا بين وتره وبين الصلاة الثانية ، وهذا إذا كان يصلي بهم في موضعه ، أما في موضع آخر فذهابه فصل ، ولا يعيد الوتر ثانية ( لا وتران في ليلة ) “এর কারণ হলো—তিনি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) বিতর সালাতের সাথে (অন্য কোনো) সালাত সরাসরি জুড়ে দেওয়া অপছন্দ করতেন। তাই তিনি এ দুটির মাঝে কোনো কাজে মশগুল হতেন যেন বিতর এবং পরবর্তী সালাতের মধ্যে একটি ‘বিচ্ছেদ’ বা পার্থক্য তৈরি হয়। এটি তখনকার নিয়ম যখন কেউ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে (উভয়) সালাত আদায় করে। কিন্তু যদি অন্য স্থানে গিয়ে সালাত পড়ে, তবে তার সেই হেঁটে যাওয়াই একটি ‘বিচ্ছেদ’ হিসেবে গণ্য হবে। আর সে দ্বিতীয়বার বিতর পড়বে না; কেননা (এক রাতে দুইবার বিতর নেই)”।(ইবনু কাইয়ুৃম; বাদায়ে‘উল ফাওয়ায়েদ খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১১১)
.
হাফিয ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন,وروى المروذي، عن أحمد – في الرجل يصلي شهر رمضان، يقوم فيوتر بهم، وهو يريد يصلي بقوم آخرين -: يشتغل بينهما بشيء، يأكل أو يشرب أو يجلس.قال أبو حفص البرمكي: وذلك لأنه يكره أن يوصل بوتره صلاة، ويشتغل بينهما بشيء؛ ليكون فصلا بين وتره، وبين الصَّلاة الثانية. وهذا إذا كانَ يصلي بهم في موضعه، فإما إن كانَ موضع آخر، فذهابه فصل، ولا يعيد الوتر ثانية؛ لأنه لا وتران في ليلة. “আল-মারওয়াযী ইমাম আহমাদ (রাহি.) থেকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন—যে রমাদান মাসে লোকদের নিয়ে সালাত (তারাবি) পড়ে এবং তাদের নিয়ে বিতরও পড়ে ফেলে, অথচ সে এরপর অন্য একটি দলের সাথে সালাত আদায়ের ইচ্ছা রাখে—ইমাম আহমাদ বলেন: সে দুই সালাতের মাঝে কোনো কাজে লিপ্ত হবে; যেমন—কিছু খাবে বা পান করবে অথবা (কিছুক্ষণ) বসে থাকবে। আবু হাফস আল-বারমাকী বলেন: এটি এ কারণে যে, বিতরের সাথে সাথে (পরবর্তী) সালাত মিলিয়ে ফেলা মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। তাই মাঝে কোনো কাজে লিপ্ত হবে যেন তার বিতর এবং দ্বিতীয় সালাতের মাঝে একটি ব্যবধান তৈরি হয়। এটি তখন প্রযোজ্য যখন সে একই স্থানে তাদের নিয়ে সালাত পড়ে। তবে যদি স্থান ভিন্ন হয়, তবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়াই ‘বিচ্ছেদ’ বা ব্যবধান হিসেবে গণ্য হবে। আর সে দ্বিতীয়বার বিতর পড়বে না; কারণ এক রাতে দুই বিতর নেই। (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।
.
​তবে ইমাম আহমাদ থেকে এর বিপরীত বক্তব্যও বর্ণিত আছে: যেমন-সালিহ-এর বর্ণনায় ইমাম আহমাদ সেই ব্যক্তি সম্পর্কে—যে ইমামের সাথে বিতর পড়ে ঘরে ফিরে গেছে—বলেছেন: ‘আমার কাছে পছন্দনীয় হলো সে যেন (পুনরায় সালাত শুরুর আগে) একটু শুয়ে নেয় অথবা দীর্ঘ সময় কথাবার্তা বলে।’ রমাদান মাসে ‘তাকীব’ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। ‘তাকীব’ হলো: লোকজন মসজিদে জামাতের সাথে সালাত (তারাবীহ ও বিতর) পড়ার পর বেরিয়ে যাবে, এরপর আবার মসজিদে ফিরে এসে রাতের শেষাংশে জামাতের সাথে সালাত আদায় করবে। আবু বকর আব্দুল আজিজ ইবনে জাফর এবং আমাদের (হাম্বলি মাযহাবের) অন্যান্য ফকিহগণ এভাবেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মারওয়াযী ও অন্যান্যরা ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে: এতে কোনো অসুবিধা নেই। আনাস (রা.) থেকেও এ ব্যাপারে বর্ণনা রয়েছে। আবার ইবনুল হাকাম তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আহমাদ বলেছেন: ‘আমি এটি অপছন্দ করি। আনাস (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে যে তিনি এটি অপছন্দ করতেন। আবু মিজলায ও অন্যান্য থেকেও এর অপছন্দনীয়তার কথা বর্ণিত আছে। বরং তারা কিয়ামকে (সালাত) রাতের শেষাংশ পর্যন্ত বিলম্বিত করতেন, যেমনটি উমর (রা.) বলেছিলেন।’আবু বকর আব্দুল আজিজ বলেন: ‘ইবনে হাকামের বর্ণিত মতটি ইমাম আহমাদের পুরনো মত। বর্তমানে আমল হলো সেই বর্ণনার ওপর যা একদল ফকিহ বর্ণনা করেছেন যে, এতে কোনো অসুবিধা নেই।’ (উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।
.
প্রখ্যাত তাবি‘ঈ, আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস, ইমাম সুফইয়ান আস-সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৯৭ হি: মৃত: ১৬১ হি] বলেন:التعقيب محدث. ومن أصحابنا من جزم بكراهيته، إلا أن يكون بعد رقدة، أو يؤخره إلى بعد نصف الليل، وشرطوا: أن يكون قد أوتروا جماعة في قيامهم الأول، وهذا قول ابن حامد والقاضي وأصحابه. ولم يشترط أحمد ذلك. وأكثر الفقهاء على أنه لا يكره بحالٍ…ونقل ابن المنصور، عن إسحاق بن راهويه، أنه إن أتم الإمام التراويح في أول الليل، كره له أن يصلي بهم في آخره جماعة أخرى؛ لما روي عن أنس وسعيد بن جبير من كراهته. وإن لم يتم بهم في أول الليل وآخر تمامها إلى آخر الليل لم يكره.”তাকীব (তারাবীহ শেষে পুনরায় জামাতে নফল পড়া) একটি নব-উদ্ভাবিত বিষয়। আমাদের (হাম্বলী মাজহাবের) একদল ফকীহ একে ‘মাকরূহ’ বলে সুনিশ্চিত মত দিয়েছেন—কিন্তু যদি তা সামান্য ঘুমের পর হয় অথবা রাতের মধ্যভাগের পরে বিলম্বিত করে পড়া হয়,তাহলে ভিন্ন কথা। তারা আরও শর্ত দিয়েছেন যে, মুসল্লিরা যেন তাদের প্রথম দফার কিয়ামেই (তারাবিহতে) জামাতের সাথে বিতর সম্পন্ন করে নেয়। এটি ইবনে হামিদ, কাজী আবু ইয়ালা ও তাঁর অনুসারীদের অভিমত। অবশ্য ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এই (বিতর পড়ার) শর্তটি দেননি। অন্যদিকে অধিকাংশ ফকীহর মত হলো এটি কোনো অবস্থাতেই মাকরূহ নয়।…ইবনে মানসুর ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে: যদি ইমাম রাতের প্রথম ভাগে তারাবিহ (পুরো ৮/২০ রাকাত বা নির্ধারিত অংশ) সম্পন্ন করে ফেলেন, তবে রাতের শেষ ভাগে মুসল্লিদের নিয়ে পুনরায় জামাতে সালাত পড়া মাকরূহ। কারণ আনাস (রা.) ও সাঈদ ইবনুল জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে এর অপছন্দনীয়তা বর্ণিত হয়েছে। তবে যদি তিনি রাতের প্রথম ভাগে সালাত পূর্ণ না করে তার কিছু অংশ রাতের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিলম্বিত করেন, তবে তা মাকরূহ হবে না।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন ইবনু রজব; ‘ফাতহুল বারী’, ইবনে রজব; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৭৪)। আর এই ‘মাকরূহ’ হওয়াটা সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন ইমাম রাতের প্রথম ভাগে বিতর পড়ে ফেলেন এবং এরপর আবার জামাতে সালাত শুরু করেন। বর্তমানে কিছু মানুষ এমনটা করে থাকেন। তবে ইবনে রজব যেমনটি বলেছেন—অধিকাংশ ফকিহর মতে এটি মাকরূহ নয়। মূল কথা হলো, এই ‘ফাসল’ বা বিরতি দেওয়া একটি প্রাচীন বিষয় যা নিয়ে সালাফগণ (পূর্বসূরিরা) আলোচনা করেছেন।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনির ব্যাখ্যায় বলেন:
قوله: لا التعقيب في جماعة ، أي: لا يُكره التَّعقيب بعد التَّراويح مع الوِتر، ومعنى التَّعقيب: أن يُصلِّيَ بعدها ، وبعد الوِتر ، في جماعة. وظاهرُ كلامه: ولو في المسجد.
مثال ذلك: صَلّوا التَّراويح والوتر في المسجد، وقالوا: احضروا في آخر الليل لنقيم جماعة، فهذا لا يُكره على ما قاله المؤلِّف.ولكن هذا القول ضعيف، لأنه مستندٌ إلى أثر عن أنس بن مالك رضي الله عنه أنَّه قال: لا بأس به، إنما يرجعون إلى خير يرجونه … أي: لا ترجعوا إلى الصَّلاة إلا لخير ترجونه.لكن هذا الأثر، إنْ صَحَّ عن أنس: فهو مُعَارِض لقوله صلّى الله عليه وسلّم: اجْعَلوا آخِرَ صَلاتِكم بالليل وِتْراً ؛ فإنَّ هؤلاء الجماعة صَلُّوا الوِتر، فلو عادوا للصَّلاة بعدها ، لم يكن آخرُ صلاتهم بالليل وِتراً. ولهذا كان القولُ الرَّاجحُ: أنَّ التَّعقيب المذكور مكروه، وهذا القول إحدى الرِّوايتين عن الإمام أحمد رحمه الله، وأطلق الروايتين في المقنع و الفروع و الفائق وغيرها، أي: أنَّ الروايتين متساويتان عن الإمام أحمد، لا يُرَجَّح إحداهما على الأخرى.لكن لو أنَّ هذا التَّعقيبَ جاء بعد التَّراويح، وقبل الوِتر، لكان القول بعدم الكراهة صحيحاً، وهو عمل النَّاس اليوم في العشر الأواخر من رمضان، يُصلِّي النَّاس التَّراويح في أول الليل، ثم يرجعون في آخر الليل، ويقومون يتهجَّدون”
লেখকের কথা—”জামাতে তাকীব নয়”অর্থাৎ তারাবি ও বিতর আদায়ের পর ‘তাকীব’ করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) নয়। ‘তাকীব’-এর অর্থ হলো: তারাবি ও বিতর শেষ করার পর পুনরায় জামাতের সাথে (নফল) সালাত আদায় করা। তাঁর (মূল লেখকের) বক্তব্যের বাহ্যিক মর্ম হলো: এটি মসজিদে হলেও (মাকরূহ হবে না)।
​উদাহরণস্বরূপ: তারা মসজিদে তারাবীহ ও বিতর আদায় করল এবং বলল, ‘আপনারা রাতের শেষাংশে উপস্থিত হবেন, আমরা পুনরায় জামাত কায়েম করব’—লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী এটি মাকরূহ নয়। কিন্তু এই মতটি দুর্বল। কারণ, এটি আনাস ইবনে মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত একটি আছরের (উক্তির) ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন: ‘এতে কোনো অসুবিধা নেই, তারা তো কেবল সেই কল্যাণের দিকেই ফিরে আসে যার তারা আশা রাখে…’ অর্থাৎ: তোমরা সালাতে ফিরে এসো না কেবল সেই কল্যাণ লাভের প্রত্যাশা ব্যতীত। তবে আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই আছরটি যদি বিশুদ্ধও হয়, তবুও তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই বাণীর পরিপন্থী: ‘তোমরা তোমাদের রাতের শেষ সালাতটিকে বিতর করো।’ কারণ, এই জামাতটি তো ইতিপূর্বেই বিতর পড়ে ফেলেছে। এমতাবস্থায় তারা যদি পুনরায় সালাতে ফিরে আসে, তবে তাদের রাতের শেষ সালাতটি আর বিতর থাকল না। এ কারণেই সঠিক মত (কওলু রাজেহ) হলো: উল্লিখিত এই ‘তাকীব’ মাকরূহ। এটি ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত দুটি বর্ণনার একটি। ‘আল-মুগনি’, ‘আল-ফুরু’ এবং ‘আল-ফাইক’ সহ অন্যান্য কিতাবে উভয় বর্ণনাকে (কোনোটি প্রাধান্য না দিয়ে) সমানভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইমাম আহমাদ থেকে বর্ণিত উভয় মতই সমপর্যায়ের, একটির ওপর অন্যটিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। তবে, যদি এই ‘তাকীব’ (পুনরায় জামাত) তারাবীহর পরে কিন্তু বিতরের আগে হয়, তবে মাকরূহ না হওয়ার বিষয়টিই সঠিক হবে। আর রমাদানের শেষ দশকে বর্তমানে মানুষের আমলও এটিই—তারা রাতের প্রথম ভাগে তারাবি পড়ে, অতঃপর রাতের শেষ ভাগে ফিরে আসে এবং তাহাজ্জুদ (কিয়ামুল লাইল) আদায় করে (অতঃপর বিতর পড়ে)।”(ইমাম উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৬৭)।
.
শায়খ আব্দুল্লাহ আবাত্বিন রাহিমাহুল্লাহ কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;প্রশ্ন: রমজানের প্রথম বিশ দিনের তুলনায় শেষ দশকে নামাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কিছু মানুষ যে অস্বীকার বা আপত্তি করে, তার জবাব কী? জবাবে শাইখ বলেন:
مسألة في الجواب عما أنكره بعض الناس على من صلى في العشر الأواخر من رمضان زيادة على المعتاد في العشرين الأول ، وسبب إنكارها لذلك غلبة العادة ، والجهل بالسنة وما عليه الصحابة والتابعون وأئمة الإسلام . فنقول‏:‏ قد وردت الأحاديث عن النبي صلى الله وعليه وسلم بالترغيب في قيام رمضان ، والحث عليه ، وتأكيد ذلك في عشره الأخير .إذا تبين أنه لا تحديد في عدد التراويح ، وأن وقتها عند جميع العلماء من بعد سنة العشاء إلى طلوع الفجر ، وأن إحياء العشر سنة مؤكدة ، وأن النبي صلى الله وعليه وسلم صلاها ليالي جماعة ، فكيف ينكر على من زاد في صلاة العشر الأواخر عما يفعلها أول الشهر ، فيصلي في العشر أول الليل ، كما يفعل في أول الشهر ، أو قليل ، أو كثير ، من غير أن يوتر ، وذلك لأجل الضعيف لمن يحب الاقتصار على ذلك ، ثم يزيد بعد ذلك ما يسره الله في الجماعة ، ويسمى الجميع قياماً وتراويح .وربما اغتر المنكر لذلك بقول كثير من الفقهاء ‏:‏ يستحب أن لا يزيد الإمام على ختمة ، إلا أن يؤثر المأمومون الزيادة ، وعللوا عدم استحباب الزيادة على ختمة بالمشقة على المأمومين ، لا كون الزيادة غير مشروعة ، ودل كلامهم على أنهم لو آثروا الزيادة على ختمة كان مستحباً ، وذلك مصرح به في قولهم : إلا أن يؤثر المأمومون الزيادة‏ .‏ وأما ما يجري على ألسنة العوام من تسميتهم ما يفعل أول الليل تراويح ، وما يصلي بعد ذلك قياماً ، فهو تفريق عامي ، بل الكل قيام وتراويح ، وإنما سمي قيام رمضان تراويح لأنهم كانوا يستريحون بعد كل أربع ركعات من أجل أنهم كانوا يطيلون الصلاة ، وسبب إنكار المنكر لذلك لمخالفته ما اعتاده من عادة أهل بلده وأكثر أهل الزمان ، ولجهله بالسنة والآثار ، وما عليه الصحابة والتابعون وأئمة الإسلام ، وما يظنه بعض الناس من أن صلاتنا في العشر هي صلاة التعقيب الذي كرهه بعض العلماء فليس كذلك ؛ لأن التعقيب هو التطوع جماعة بعد الفراغ من التراويح والوتر‏ .‏
هذه عبارة جميع الفقهاء في تعريف التعقيب أنه التطوع جماعة بعد الوتر عقب التراويح، فكلامهم ظاهر في أن الصلاة جماعة قبل الوتر ليس هو التعقيب
“এটি রমাদানের শেষ দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা; বিশেষ করে মাসের প্রথম বিশ দিনের স্বাভাবিক অভ্যাসের চেয়ে শেষ দশকে যারা বেশি সালাত আদায় করেন, তাদের প্রতি কিছু মানুষের আপত্তির জবাব প্রসঙ্গে। তাদের এই আপত্তির মূল কারণ হলো—প্রচলিত অভ্যাসের প্রাধান্য এবং সুন্নাহ, সাহাবী, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামদের আমল সম্পর্কে অজ্ঞতা।আমরা বলি: নবী ﷺ থেকে রমজানের কিয়াম (রাতের নামাজ) সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে এই ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং শেষ দশকে এর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটি স্পষ্ট যে তারাবির রাকাআতের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারিত নয় এবং সকল আলেমের মতে এর সময় এশার সালাতের পর থেকে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত; সেহেতু শেষ দশ রাত ইবাদতে জাগরণ করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’। নবী ﷺ নিজে কয়েক রাত জামাতে তা আদায় করেছেন। ​তাহলে সেই ব্যক্তির ওপর কেন আপত্তি করা হবে, যে মাসের শুরুতে যতটুকু সালাত পড়ত, শেষ দশকে তার চেয়ে বেশি পড়ে? অর্থাৎ, সে শেষ দশকে রাতের প্রথম অংশে মাসের শুরুর মতোই সালাত আদায় করল, কিন্তু তখন বিতর পড়ল না—যাতে দুর্বলরা বা যারা এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় তারা চলে যেতে পারে। এরপর ইমাম আবার জামাতে আল্লাহ যতটুকু তাওফিক দেন অতিরিক্ত সালাত আদায় করলেন; আর এসবকেই সমষ্টিগতভাবে ‘কিয়াম’ ও ‘তারাবি’ বলা হয়। সম্ভবত আপত্তিকারীরা অনেক ফকীহের এই বক্তব্যে বিভ্রান্ত হয়েছে যে: “ইমামের জন্য এক খতমের বেশি না করা মুস্তাহাব, যদি না মুসল্লিরা অতিরিক্তের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।” ফকীহরা এক খতমের বেশি না করাকে মুস্তাহাব বলেছেন মুসল্লিদের কষ্টের আশঙ্কার কারণে; অতিরিক্ত পড়া শরিয়তসম্মত নয়—এই কারণে নয়। বরং তাদের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, যদি মুসল্লিরা চায় তবে এক খতমের বেশি পড়াও মুস্তাহাব হবে। এটি তাদের কথাতেই স্পষ্ট: “যদি না মুসল্লিরা অতিরিক্তের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।”সাধারণ মানুষের মুখে প্রচলিত রাতের প্রথম অংশের সালাতকে “তারাবি” এবং পরের অংশকে “কিয়াম” বলা—এটি তাদের তৈরি একটি কৃত্রিম পার্থক্য মাত্র। মূলত সবই ‘কিয়াম’ ও ‘তারাবি’। রমাদানের কিয়ামকে “তারাবীহ” বলা হয়েছে এই কারণে যে, তারা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে সালাত পড়তেন এবং প্রতি চার রাকাআত পরপর বিশ্রাম (তারউয়িহ) নিতেন। এ বিষয়ে আপত্তিকারীর আপত্তির মূল কারণ হলো—নিজ এলাকার প্রচলিত রীতি ও অধিকাংশ মানুষের অভ্যাসের বিরোধিতা হওয়া এবং সুন্নাহ, সাহাবীদের আছার, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামদের পথ সম্পর্কে অজ্ঞতা। আর কিছু মানুষ মনে করে শেষ দশকে এই অতিরিক্ত সালাতটি সেই “তা‘কীব”, যা কিছু আলেম অপছন্দ করেছেন; বিষয়টি আসলে তা নয়। কারণ সমস্ত ফকীহদের সংজ্ঞা অনুযায়ী “তা‘কীব” হলো—তারাবি ও বিতর শেষ করার পর পুনরায় জামাতে নফল সালাত আদায় করা। সুতরাং তাদের বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিতরের আগে জামাতে অতিরিক্ত সালাত পড়া কোনোভাবেই “তা‘কীব” নয়।”(আদ-দুরার আস-সানিয়্যাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৬৪)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
ولا بأس أن يزيد في عدد الركعات في العشر الأواخر عن عددها في العشرين الأول ويقسمها إلى قسمين قسما يصليه في أول الليل ويخففه على أنه تراويح كما في العشرين الأول ؛ وقسما يصليه في آخر الليل ويطيله على أنه تهجد ، فقد كان النبي صلى الله عليه وسلم يجتهد في العشر الأواخر ما لا يجتهد في غيرها ، وكان إذا دخلت العشر الأواخر شمر وشد المئزر وأحيا ليله وأيقظ أهله تحريا لليلة القدر ، فالذي يقول لا يزيد في آخر الشهر عما كان يصليه في أول الشهر مخالف لهدي النبي صلى الله عليه وسلم ومخالف لما كان عليه السلف الصالح من طول القيام في آخر الشهر في آخر الليل فالواجب اتباع سنته صلى الله عليه وسلم وسنة الخلفاء الراشدين من بعده وحث المسلمين على صلاة التراويح وصلاة القيام لا تخذيلهم عن ذلك وإلقاء الشبه التي تقلل من اهتمامهم بقيام رمضان .
وبالله التوفيق ، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم
“রমাদানের শেষ দশকে (রাতের) রাকাত সংখ্যা প্রথম বিশ দিনের তুলনায় বৃদ্ধি করাতে কোনো অসুবিধা নেই। এই রাকাতগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: এক ভাগ রাতের প্রথম অংশে আদায় করা হবে এবং কিছুটা হালকা বা সংক্ষেপ করা হবে—যাকে প্রথম বিশ দিনের মতো ‘তারাবীহ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। আর অন্য ভাগটি রাতের শেষ অংশে আদায় করা হবে এবং দীর্ঘ করা হবে—যাকে ‘তাহাজ্জুদ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। কেননা, নবী করীম (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শেষ দশকে ইবাদতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন, তা অন্য সময়ে করতেন না। যখন শেষ দশক প্রবেশ করত, তখন তিনি কোমর বেঁধে নামতেন (তথা পূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন), লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন, সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তাঁর পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে তুলতেন।অতএব, যে ব্যক্তি বলে যে—মাসের শেষে রাকাত সংখ্যা বাড়ানো যাবে না যা মাসের শুরুতে পড়া হতো, তার এই কথা নবী (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শের পরিপন্থী। এটি সলফে সালেহীনদের (পুণ্যবান পূর্বসূরি) আমলেরও বিরোধী, কারণ তাঁরা মাসের শেষে রাতের শেষাংশে দীর্ঘ কিয়াম (সালাত) আদায় করতেন।কাজেই ওয়াজিব বা আবশ্যক হলো নবী (সালাহুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং তাঁর পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের অনুসরণ করা এবং মুসলমানদেরকে তারাবীহ ও কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের ব্যাপারে উৎসাহিত করা। তাদেরকে এ থেকে নিরুৎসাহিত করা এবং এমন সংশয় ছড়ানো উচিত নয় যা রমজানের কিয়ামের প্রতি তাদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। আল্লাহই তাওফিক দানকারী। আমাদের নবী মুহাম্মদ (ﷺ) তাঁর পরিবার ও সাহাবীবর্গের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৮২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] তাঁর কিতাব ‘ইত্তিহাফু আহলিল ঈমান বি মাজালিসি শাহরি রমাজান’ এ বলেন:
وأما في العشر الأواخر من رمضان ، فإن المسلمين يزيدون من اجتهادهم في العبادة ، اقتداء بالنبي صلى الله عليه وسلم ، وطلباً لليلة القدر التي هي خير من ألف شهر ، فالذين يصلون ثلاثاً وعشرين ركعة في أول الشهر يقسمونها في العشر الأواخر ، فيصلون عشر ركعات في أول الليل ، يسمونها تراويح‏ ،‏ ويصلون عشراً في آخر الليل ، يطيلونها مع الوتر بثلاث ركعات ، ويسمونها قياماً‏ ،‏ وهذا اختلاف في التسمية فقط ، وإلا فكلها يجوز أن تسمى تراويح ، أو تسمى قياماً‏ ،‏ وأما من كان يصلى في أول الشهر إحدى عشرة أو ثلاث عشرة ركعة فإنه يضيف إليها في العشر الأواخر عشر ركعات ، يصليها في آخر الليل ، ويطيلها ، اغتناماً لفضل العشر الأواخر ، وزيادة اجتهاد في الخير ، وله سلف في ذلك من الصحابة وغيرهم ممن كانوا يصلون ثلاثاً وعشرين كما سبق ، فيكونون جمعوا بين القولين ‏:‏ القول بثلاث عشرة في العشرين الأول ، والقول بثلاث وعشرين في العشر الأواخر “
“আর রমজানের শেষ দশকের ব্যাপারে কথা হলো—নিশ্চয়ই মুসলিমগণ এই সময়ে ইবাদতে অধিকতর সচেষ্ট হন; যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধানে করা হয়, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।সুতরাং যারা মাসের শুরুতে ২৩ রাকাত (তারাবীহ) পড়েন, তারা শেষ দশকে তা দু’ভাগে ভাগ করে নেন। রাতের প্রথম অংশে তারা ১০ রাকাত পড়েন যাকে তারা ‘তারাবীহ’ নামকরণ করেন; আর রাতের শেষ অংশে ৩ রাকাত বিতরসহ আরও ১০ রাকাত পড়েন যা তারা দীর্ঘ করেন এবং একে ‘কিয়াম’ (তাহাজ্জুদ) নামে অভিহিত করেন। মূলত এটি কেবল নামকরণের পার্থক্য মাত্র; অন্যথায় এই সবগুলোকে ‘তারাবীহ’ বা ‘কিয়াম’ উভয়ই বলা বৈধ।আর যারা মাসের শুরুতে ১১ বা ১৩ রাকাত পড়তেন, তারা শেষ দশকের ফযিলত অর্জন এবং নেক আমলে অধিকতর পরিশ্রমের উদ্দেশ্যে রাতের শেষভাগে আরও ১০ রাকাত বৃদ্ধি করে দীর্ঘ করে পড়েন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্যদের আদর্শ (পূর্বসূরি) বিদ্যমান যারা ২৩ রাকাত পড়তেন—যেমনটি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত উভয় মতের মধ্যেই সমন্বয় ঘটালেন: অর্থাৎ প্রথম বিশ রাতে ১৩ রাকাতের মত এবং শেষ দশকে ২৩ রাকাতের মত।”(ইত্তিহাফু আহলিল ঈমান বি মাজালিসি শাহরি রমাজান পুস্তিকা; আরও দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০৯৭৬৮)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে রাতের সকল নফল সালাতই কিয়ামুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত। তাই রাতের প্রথম অংশ সংক্ষিপ্ত এবং শেষ অংশ দীর্ঘ করে কিয়ামুল লাইল আদায় করা বৈধ ও শরিয়তসম্মত। এমনকি কেউ একাধিক জামাতে ইমাম বা মুক্তাদি হিসেবে সালাত আদায় করলেও তা জায়েজ; তবে একই রাতে দুইবার বিতির আদায় করা শরিয়তে প্রমাণিত নয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

রাবেয়া বসরী কে ছিলেন

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর রাবেয়া আল-আদাবিয়া (রহি’মাহাল্লাহ); যিনি ‘রাবেয়া বসরী’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন।বিজ্ঞ আলেমদের বক্তব্য থেকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তিনি ছিলেন তাবি-তাবিঈন যুগের এক অনন্য ও পরহেজগার নারী। তিনি হিজরী ১০০ সনে ইরাকের বসরা নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮০ বছর বয়সে ১৮০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। রাবেয়া বসরী একজন ‘যাহিদাহ’ (দুনিয়া বিমুখ), ‘আবিদাহ’ (আল্লাহর ইবাদত গুজার) এবং অত্যন্ত বিনয়ী নারী হিসেবে জগদ্বিখ্যাত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, সেই যুগে ‘তাসাউফ’ বা সুফিবাদ বর্তমানের মতো নির্দিষ্ট নাম কিংবা বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিচিত ছিল না; বরং তখন এমন কিছু ইবাদতগুজার মানুষ ছিলেন যারা তাদের পরহেজগারিতা ও দুনিয়াবিমুখতার জন্য স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।সালাফে সালেহীনের বহু ইমাম তাঁর প্রশংসা করেছেন—যাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ)। একইভাবে ইবনুল জাওজী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সিফাতুস সাফওয়া-এ রাবেয়ার গুণাবলি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর জীবনীর ওপর একটি স্বতন্ত্র রচনাও সংকলন করেছেন।যদিও পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ তাঁর প্রতি ‘হুলুল’ (সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির মাঝে মিশে যাওয়া) মতবাদের অভিযোগ আরোপ করেছেন, তবে মহান মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ ইমাম আয‑যাহাবী তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সিয়ারু আলামিন নুবালা-তে এ অভিযোগকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৪৮) তার সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ গ্রন্থে রাবেয়া বসরীর জীবনীতে লিখেছেন:رابعة العدوية البصرية الزاهدة العابدة الخاشعة، رابعة بنت إسماعيل أم عمر ولاؤها للعتكيين، ولها سيرة في جزء لابن الجوزي،”রাবেয়া আদবিয়া আল-বাসরিয়া ছিলেন অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ, ইবাদতগুজার এবং আল্লাহভীরু নারী। তিনি ছিলেন ইসমাঈলের কন্যা এবং উম্মে আমর উপনামে পরিচিত। তাঁর বংশীয় সম্পর্ক ছিল আতিক গোত্রের সাথে। ইবনুল জাওজী তাঁর জীবনী নিয়ে একটি পুস্তিকা লিখেছেন।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন;সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ২৪১)
.
ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) আরও উল্লেখ করেন যে, ইবনে আবিদ দুনইয়া বর্ণনা করেছেন: মুহাম্মদ বিন হুসাইন আমাদের বলেছেন, উবাইস বিন মাইমুন আল-আত্তার আমাকে বলেছেন, রাবেয়া আদবিয়ার সেবিকা আবদাহ বিনতে আবি শাওয়াল বলেছেন:
كانت رابعة تصلي بالليل كله فإذا طلع الفجر هجعت في مصلاها هجعة خفيفة حتى يسفر الفجر فكنت أسمعها تقول : إذا وثبت من مرقدها ذلك وهي فزعة : يا نفس كم تنامين ؟ إلى كم تقولين ؟ يوشك أن تنامي نومة لا تفوقين منها إلا ليوم النشور قالت فكان هذا دأبها دهرها حتى ماتت
“রাবেয়া সারা রাত ধরে (তাহাজ্জুদের) নামাজ আদায় করতেন। যখন ফজর উদিত হতো, তিনি তাঁর জায়নামাজে অল্প সময়ের জন্য একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেন (হালকা ঘুমাতেন)। যখন সুবহে সাদিক স্পষ্ট হয়ে যেত, তখন তিনি তাঁর বিছানা থেকে আতঙ্কিত হয়ে লাফিয়ে উঠতেন এবং আমি তাঁকে বলতে শুনতাম:”হে নফস (মন)! তুমি আর কতকাল ঘুমাবে? কতক্ষণ এভাবে (অচেতনে) পড়ে থাকবে?খুব শীঘ্রই তুমি এমন এক ঘুমে বিভোর হতে যাচ্ছ,(মৃত্যু) যা থেকে হাশরের দিন (পুনরুত্থান দিবস) ছাড়া আর কখনোই জাগবে না। বর্ণনাকারী আবদাহ বলেন—মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সারা জীবন এটিই ছিল তাঁর চিরচেনা স্বভাব ( অর্থাৎ তিনি এভাবেই নিজেকে নসিহত করতেন)।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনুল ঈমাদ হাম্বালী; শযারাতুয যাহাব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯৩) এবং সিফাতুস সফওয়াহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৭)।
.
আবু সাঈদ ইবনুল আ’রাবী (রহি’মাহুল্লাহ) বলেন:أما رابعة فقد حمل الناس عنها حكمة كثيرة، وحكى عنها سفيان وشعبة وغيرهما ما يدل على بطلان ما قيل عنها”লোকেরা রাবেয়ার থেকে অনেক প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা-বার্তা বর্ণনা করেছে। সুফিয়ান আস-সাউরী, শু’বাহ এবং অন্যান্য (প্রসিদ্ধ হাদীসের রাবীগণ) তাঁর হিকমাহ বর্ণনা করেছেন,যা তাঁর নামে প্রচলিত ভিত্তিহীন কথাগুলোকে বাতিল বা মিথ্যা প্রমাণ করে।”
.
রাবেয়া আদবিয়ার দিকে নিসবত করা একটি কবিতার চরণের ভুল ব্যাখ্যা করে তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হয়েছিল। কবিতাটি হলো:ولقد جعلتك في الفؤاد محدثي * وأبحت جسمي من أراد جلوسي.”আমি তো হৃদয়ে তোমাকেই (আল্লাহকে) স্থান দিয়েছি,আর আমার দেহটা রেখেছি তাদের জন্য, যারা আমার সান্নিধ্যে বসতে চায়।”
.
সুফিবাদের পরিভাষায় এই চরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো:​”আমার অন্তর সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মগ্ন (হৃদয়ের সঙ্গী)। আর মানুষের সাথে যখন আমি বসি বা কথা বলি, তখন কেবল আমার শরীরটাই সেখানে উপস্থিত থাকে (দেহকে তাদের জন্য রেখেছি), কিন্তু আমার রুহ বা আত্মা থাকে তাঁরই সান্নিধ্যে।” অর্থাৎ, তিনি বলতে চেয়েছেন তিনি লোকসমাজে থাকলেও মানসিকভাবে পুরোপুরি আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন। মানুষের সাথে তাঁর লেনদেন কেবল শরীর বা লৌকিকতার পর্যায়ে, হৃদয়ের পর্যায়ে নয়।
.
অথচ এই কবিতার অর্ধেক অংশ দিয়ে কেউ কেউ তাঁকে ‘হুলুল’ (সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার বিলীন হওয়া) এবং পুরো অংশ দিয়ে ‘ইবাহাত’ (শরীয়তের বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া) এর দিকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এর জবাবে ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وهذا غلو وجهل ولعل من نسبها إلى ذلك مُباحي حلولي ليحتج بها على كفرها كاحتجاجهم بخبر ” كنت سمعه الذي يسمع به”আর এটি (রাবেয়ার প্রতি এই অভিযোগ) অতিরঞ্জন এবং মূর্খতা। সম্ভবত যারা তাকে (রাবেয়াকে) এগুলোর সাথে সম্পর্কিত করেছে, তারা হলো এমন ‘মুবাহি’ (যারা মনে করে শরিয়তের সবকিছু তাদের জন্য বৈধ হয়ে গেছে) ও ‘হুলুলি’ (সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিতে বিলীন হওয়ার প্রবক্তা), যারা তাদের নিজেদের কুফুরীর সপক্ষে এটি দ্বারা দলিল পেশ করতে চায়—ঠিক যেভাবে তারা (নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদের সপক্ষে) ‘আমি তার কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শোনে’—এই বর্ণনাটি (হাদিসে কুদসি) দিয়ে দলিল পেশ করে থাকে।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন;সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড:৮; পৃষ্ঠা: ২৪১)
.
জেনে রাখা ভাল যে, রাবেয়া বসরী রহি’মাহাল্লাহ থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোন ‘কারামত’ বা অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত হয়নি। তবে তাঁর থেকে অনেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী এবং তাঁর দুনিয়া বিমুখ জীবনের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন রাবেয়া বসরী (রহি’মাহাল্লাহ) সুফিয়ান আস-সাউরী রহি’মাহুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,إنما أنت أيام معدودة فإذا ذهب يوم ذهب بعضك ، يوشك إذا ذهب البعض أن يذهب الكل وأنت تعلم ، فاعمل“আপনার জীবন সামান্য কতগুলো দিনের সমষ্টি মাত্র। যখনই একটা দিন অতিবাহিত হয়, আপনার জীবনের একটা অংশ শেষ হয়ে যায়। শীঘ্রই এমন একটা সময় আসবে, যখন দিনগুলো শেষ হয়ে আপনার জীবনও শেষ হয়ে যাবে। আপনি এই কথা জানেন, সুতরাং সে অনুযায়ী আমল করুন।”(ইবনুল ঈমাদ হাম্বালী; শযারাতুয যাহাব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৯৩; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫৯৯৪)
.
রাবেয়া বসরী (রহি’মাহাল্লাহ)-এর প্রজ্ঞার আরও উদাহরণ হচ্ছে তাঁর এই বাণীاستغفر الله من قلة صدقي في قولي : أستغفر الله“আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার ব্যাপারে আমার আন্তরিকতার অভাব থাকার কারণেও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি।”
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক! দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো—ভারতীয় উপমহাদেশে রাবেয়া বসরী (রহিমাহা)-কে ঘিরে যে অসংখ্য কাহিনী প্রচলিত আছে, সেগুলোর বড় অংশেই ঐতিহাসিক সত্যের তুলনায় অতিরঞ্জন ও অলঙ্কারই বেশি পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন বক্তা ও লেখক তাঁর নামে এমন সব ঘটনা ও বক্তব্য বর্ণনা করেন, যেগুলোর অনেকগুলোরই নির্ভরযোগ্য কোনো সনদ নেই; বরং কখনো কখনো সেগুলো ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব মনগড়া কাহিনীর প্রভাবে অনেক সময় সঠিক মানহাজের অনুসারীদের মধ্যেও ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়—তাঁরা মনে করেন, হয়তো রাবেয়া বসরী (রহি.) নিজেই কোনো ভ্রান্ত মতের অনুসারী ছিলেন; অথচ প্রকৃত সত্য তা নয়। উদাহরণস্বরূপ: সূফীবাদের কিছু অনুসারী—বিশেষত দেওবন্দী ও বেরেলুবী পরিমণ্ডলে তাঁর সম্পর্কে নানা আজগুবী ও ভিত্তিহীন কাহিনী প্রচারিত হয়েছে। যেমন একটি প্রচলিত গল্পে কুখ্যাত চরমোনাই পীর তার বইয়ে লিখেছেন,“একদিন রাবেয়া বসরী তাঁর এক হাতে আগুন আরেক হাতে পানি নিয়ে রাস্তায় বের হলেন। লোকেরা তাঁকে এইভাবে বের হতে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? রাবেয়া বসরী বললেন, “হে ভীতুর দলেরা! তোমরা যারা আল্লাহর ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করো, আমি এই পানি দিয়ে জাহান্নামকে নিভিয়ে দিব। তখন তোমরা কিসের ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে? আর তোমরা যারা জান্নাতের লোভে আল্লাহর ইবাদত করো হে লোভীর দলেরা! আমি এই আগুন দিয়ে জান্নাত পুড়িয়ে দেব। তাহলে তোমরা কিসের লোভে আল্লাহর ইবাদত করবে? আমি আল্লাহর শাস্তির ভয়ে কিংবা জান্নাতের লোভে ইবাদত করি না। আমি তো মাওলার প্রেমে তাঁর ইবাদত করি।” অথচ এ গল্পটি নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে প্রমাণিত নয়; বরং এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। এই ধরনের গোমরাহীপূর্ণ গল্পের কারণে অনেক সময় সঠিক মানহাজের লোকেরাও ভুলভাবে ধারণা করেন যে, রাবেয়া বসরী (রহি.) হয়তো নিজেই ভ্রান্ত বা বিদআতি ছিলেন ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাঁরা তাঁর সমালোচনা করে বসেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।যেমনটি ইমাম আয-যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) সহ বহু মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর নামে প্রচলিত অধিকাংশ কাহিনীই ভিত্তিহীন। বরং তিনি ছিলেন একজন বিদুষী, ইবাদতগুজার ও মুত্তাকী নারী। অতএব অন্যদের রচিত মনগড়া বক্তব্য তাঁর ওপর আরোপ করা মোটেও ইনসাফসম্মত নয়। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নাকি বিদআত

 প্রশ্ন: নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নাকি এটি বিদআত হিসেবে গণ্য হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক অমূল্য নিয়ামত—যা একবার অতিবাহিত হলে আর কখনো ফিরে আসে না। কুরআন-এর সূরা আল-আসর আমাদের স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, সময়ের যথাযথ ব্যবহার না করলে মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; তবে যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে,সত্যের উপদেশ দেয় এবং ধৈর্যের উপর অবিচল থাকে তারাই প্রকৃত সফলকাম। হাদিসেও সতর্ক করা হয়েছে যে, মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় দুটি নিয়ামত নিয়ে—সুস্থতা ও অবসর।এমনকি কিয়ামতের দিন মানুষকে তার জীবন এবং বিশেষত যৌবন কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করেছে! এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।এই উপলব্ধি থেকেই সময়কে মূল্যবান মনে করে তা কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা প্রকৃত সফলতার পথ। অথচ আধুনিক যুগে জীবনযাত্রা ক্রমেই ব্যস্ত ও জটিল হয়ে উঠেছে; একই সঙ্গে এমন বহু মাধ্যম ও পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা মানুষকে দ্বীন থেকে উদাসীন করে দিতে পারে। তাই দুনিয়াবি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা, নফল ইবাদতে যত্নবান হওয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও হিফয, অর্থ-তাফসির অধ্যয়ন এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।এ লক্ষ্য অর্জনে যেসকল বৈধ পরিকল্পনা,পদ্ধতি বা উপকরণ সহায়ক হয়,সেগুলো গ্রহণ করা শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ ও উপকারী। সুতরাং দৈনন্দিন সুন্নাহসম্মত আমল স্মরণ রাখা ও সেগুলো নিয়মিত পালন করার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত বা শিক্ষামূলকভাবে কোনো চার্ট বা তালিকা তৈরি করা সত্তাগতভাবে বিদআত নয়। কারণ এতে নতুন কোনো ইবাদত প্রবর্তন করা হয় না; বরং শরিয়তে প্রমাণিত আমলগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে পালনের জন্য এটি একটি সহায়ক মাধ্যম।অতএব এগুলো মূলত সময় ব্যবস্থাপনা ও স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আধুনিক পদ্ধতি, যা ইবাদত ও দৈনন্দিন দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে। তাই যথাযথ বিশ্লেষণ ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা না করে কোনো বিষয়কে সরাসরি বিদআত বলে আখ্যা দেওয়া সঠিক নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতি ও প্রয়োগের ধরন অনুযায়ী তা বিদআতের অন্তর্ভুক্তও হতে পারে। এজন্য কোন ক্ষেত্রে এটি বৈধ মাধ্যম আর কোন ক্ষেত্রে বিদআত সে বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
.
▪️
নিয়মিত ইবাদত ও আমল সহজভাবে পালন করার জন্য ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কোন পরিস্থিতিতে শরিয়তসম্মত (বৈধ) হবে এবং কোন অবস্থায় তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে?
.
নিয়মিত আমল করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের চার্ট তৈরি করা কখন বৈধ হবে এবং কখন তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে—এ বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে একটি মৌলিক নীতিকে সামনে রাখতে হয়। মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপ সাধারণত দুই ধরনের:
(১️). দ্বীনি কার্যক্রম (ইবাদত ও আকীদা সংক্রান্ত)
(২️). দুনিয়াবী কার্যক্রম (জীবনযাপন ও পার্থিব কাজকর্ম) দুনিয়াবী কাজের ক্ষেত্রে শরিয়তের মূলনীতি হলো—এগুলো মূলত মুবাহ (বৈধ), যতক্ষণ না কোনো নিষিদ্ধ বিষয়ের সাথে জড়িত হয়। তাই একজন মুসলিম তার সুবিধা অনুযায়ী দিনের কাজগুলো নির্দিষ্ট সময়ে ভাগ করে নিতে পারেন।যেমন,সকালে কাজে যাওয়ার সময় নির্ধারণ করা,বিকেলে ফিরে আসার সময় ঠিক করা,খাবার, বিশ্রাম বা ব্যায়ামের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা ইত্যাদি এই আচরণগুলো মূলত ‘মুবাহ’ বা বৈধ। এগুলোর কোনোটিকে ‘বিদআত’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না; কারণ এগুলো ইবাদতের পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারিত নয়, বরং জীবনকে সুশৃঙ্খল করার উপায় মাত্র। বিদআত মূলত সেই বিষয়গুলোতে প্রযোজ্য, যেগুলো দ্বীনের অংশ হিসেবে নতুনভাবে প্রবর্তন করা হয়—যেমন আকীদা, ইবাদতের নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা এমন কোনো আমলকে শরিয়তের নির্ধারিত রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যার শরয়ী দলিল নেই।এই ভিত্তিতে বলা যায়—দৈনন্দিন ইবাদতসমূহ নিয়মিত ও সুসংগঠিতভাবে আদায় করার সুবিধার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমলের তালিকা তৈরি করা নীতিগতভাবে বিদআত নয়। তবে কিছু বিশেষ অবস্থায় এটি বিদআতের রূপ নিতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে এ ধরনের রুটিন প্রণয়ন শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে, আর শর্ত ভঙ্গ হলে তা বিদআত হিসেবে গণ্য হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো সেই শর্তগুলো কী?
.
আমরা আমাদের পূর্বসূরি সন্মানিত ইমামগণের ফাতওয়ার আলোকে যা বুঝতে পেরেছি তার আলোকে বললে এই রুটিনকে বিদআতমুক্ত ও বৈধ রাখার জন্য নিম্নলিখিত শর্তসমূহ পূরণ করা অপরিহার্য:
.
(ক) প্রথমত: দৈনন্দিন ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত সময়কে সুশৃঙ্খলভাবে ভাগ করে নিজের জন্য একটি তালিকা বা চার্ট তৈরি করা নীতিগতভাবে জায়েজ। উদাহরণস্বরূপ: ফজরের পর কুরআন তেলাওয়াত ও হিফজ রিভিশন,যোহরের পর আক্বীদা বা ফিকহ অধ্যয়ন,আসরের পর কোনো ইলমি মজলিসে অংশগ্রহণ, মাগরিবের পর সন্তানদের লালন-পালন ও শিক্ষার দায়িত্ব;এই ধরনের সুশৃঙ্খল রুটিনের কোনো দিকই বিদআত হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ এটি ইবাদতের অংশ নয়; এটি কেবল দৈনন্দিন কাজগুলো সুসংগঠিতভাবে সম্পন্ন করার একটি মাধ্যম মাত্র; যাতে কোনো দায়িত্ব অবহেলা না হয়।তাছাড়া যেসব বিষয় কেবল ‘মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়,সেগুলি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।পক্ষান্তরে, যদি কেউ এই তালিকা তৈরিকে স্বতন্ত্র ইবাদত মনে করে, অথবা এটিকে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ বলে বিশ্বাস করে, কিংবা মনে করে যে শুধু এ ধরনের চার্ট তৈরির মাধ্যমেই বিশেষ সওয়াব অর্জিত হয়—তবে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ এ ধরনের বিশ্বাসের শরয়ি কোনো ভিত্তি নেই। উপরন্তু, এ বিষয়ে ইসলামি শরীয়তে কিংবা খুলাফায়ে রাশেদীন-এর পক্ষ থেকেও কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা বর্ণিত হয়নি।
.
(খ) দ্বিতীয়ত: এই ধরনের তালিকা বা চার্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরিয়তে ইবাদতের জন্য যে সময়, পদ্ধতি ও বিধান নির্ধারিত রয়েছে, তা অবশ্যই ঠিক সেই নিয়মেই পালন করতে হবে। আর অতিরিক্ত নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে যদি কেউ নির্দিষ্ট কোনো সময়, দিন বা সংখ্যা বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারণ না করে, বরং নিজের সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী সুন্নাহ অনুসরণ করে আমল করে—তবে তা বিদআত নয়। কারণ এটি মূলত আমলকে সুশৃঙ্খলভাবে গুছিয়ে নেওয়ার অন্তর্ভুক্ত, আর এতে শরিয়তসম্মত কোনো আপত্তি নেই। বরং ন্যায়নিষ্ঠ সালাফদের জীবনেও এমন পদ্ধতির দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।সালাফগণ নিজেদের সাথে অঙ্গীকার করতেন এবং সময়কে মূল্যবানভাবে কাজে লাগাতেন যা বর্তমান ভাষায় “সময় ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা” হিসেবে পরিচিত।অতএব, এমন উদ্যোগ যা মানুষকে নেক আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়।কারণ এগুলো নিজে ইবাদত নয়; বরং ইবাদত পালনে সহায়ক মাধ্যম। এগুলো মানুষকে স্মরণ করায়, অনুপ্রাণিত করে এবং তার সময়কে সুশৃঙ্খল করে তোলে।পক্ষান্তরে,শরিয়তের স্পষ্ট দলিল ছাড়া নিজ উদ্যোগে ইবাদতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন, সময় বা সংখ্যা নির্ধারণ করা বা তা বাধ্যতামূলক করে নেওয়া বিদআত হিসেবে গণ্য হবে। যেমন—রজব মাসের ২৭ তারিখকে নির্দিষ্ট করে মিরাজ উদযাপন করা, অথবা দুই ঈদের বাইরে অন্য কোনো দিনকে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নির্ধারণ করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ ঐতিহাসিকভাবে মিরাজের রাত নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত নয় এবং এ রাতে বিশেষ কোনো ইবাদত শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। একইভাবে মুসলিমদের জন্য দুই ঈদের বাইরে অন্য কোনো দিনকে ইবাদতের উদ্দেশ্যে উৎসব হিসেবে পালন করার কোনো শর‘ই ভিত্তি নেই।
.
গ) তৃতীয়ত: ইবাদতের জন্য কোনো রুটিন বা চার্ট প্রণয়ন করা হলে তা যেন কেবল আত্মশুদ্ধি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত চারিত্রিক উন্নতির সহায়ক মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এর মূল উদ্দেশ্য হবে—শরঈ দলিলের আলোকে কোন সময় কোন ইবাদত আদায় করা হবে তা স্মরণ রাখা এবং নিজের আমলকে সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক করা।ইবাদতের সময় বিন্যাসে আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হলো নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর পবিত্র জীবন। তিনি ফজরের পর সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন; ফজরের সালাত আদায়ের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মুসাল্লায় অবস্থান করে আল্লাহর যিকির ও তাসবিহে মগ্ন থাকতেন অথবা সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে বিনয়ী আলাপচারিতায় সময় কাটাতেন। এরপর ইশরাকের দুই রাকাত সালাত আদায়ের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু করতেন।একইভাবে তাঁর দিনের সমাপ্তিও ছিল শান্ত ও সুশৃঙ্খল। এশার সালাতের পর অহেতুক গল্প-গুজব পরিহার করে দ্রুত ঘরে ফিরে যেতেন, পরিবারের সঙ্গে কিছু সময় অতিবাহিত করতেন, বিশ্রাম নিতেন এবং রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে বিশেষ ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতেন। এ ছাড়া একজন মুসলিমের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দৈনন্দিন কাজগুলোকে সালাতের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো উচিত, যাতে কোনো দায়িত্ব মসজিদে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক না হয়। যেমন—ফজরের পর কুরআন তিলাওয়াত ও হিফজের পুনরালোচনা যোহরের পর ফিকহ বা আকীদার অধ্যয়ন,আসরের পর ইলমি মজলিসে অংশগ্রহণ,মাগরিবের পর সন্তানদের শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব ইত্যাদি এ ধরনের সুশৃঙ্খল রুটিনের কোনো অংশই বিদআত নয়; কারণ এটি নিজেই ইবাদত নয়, বরং ইবাদত ও দায়িত্বগুলোকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার একটি মাধ্যম মাত্র। আর যে বিষয় কেবল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাতে বিদআতের অবকাশ থাকে না।পক্ষান্তরে,ইবাদত সম্পন্ন হওয়ার পর কে কতটুকু আমল করল তার ওপর নম্বর নির্ধারণ করা,ইবাদত শেষে টিক চিহ্ন দিয়ে সেগুলো মূল্যায়ন করা, লোক দেখানো মানসিকতা সৃষ্টি করা, অন্যদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করা, কাউকে এমন তালিকা অনুসরণে বাধ্য করা, কিংবা নিজের নির্ধারিত পদ্ধতিকে সবার জন্য অপরিহার্য মনে করে চাপিয়ে দেওয়া বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এ ধরনের আচরণ বিদআতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হতে পারে।কারণ,ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন; কিন্তু যখন তা প্রতিযোগিতা, বাহ্যিক মূল্যায়ন বা সামাজিক চাপের রূপ নেয়, তখন ইবাদতের রূহ ও ইখলাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
.
অতএব, ইবাদত পালনের সহজার্থে ব্যক্তিগত রুটিন বা আমল-চার্ট তৈরি করা বৈধ, তবে শর্ত হলো এটি শুধুমাত্র নিজের ইবাদত ও নেক আমল সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রণীত হতে হবে, শরীয়তের সীমা অতিক্রম করা যাবে না, এবং এতে কোনো ধরনের অবৈধ প্রভাব বা বিদআতধর্মী ধারণা সৃষ্টি করা যাবে না।এই আলোচনার ভাব উপলব্ধি করার সুবিধার্থে, নীচে সম্মানিত ইমামগণের প্রাসঙ্গিক ফাতওয়া সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
تصرفات العباد من الأقوال والأفعال نوعان : عبادات يصلح بها دينهم ، وعادات يحتاجون إليها في دنياهم ، فباستقراء أصول الشريعة نعلم أن العبادات التي أوجبها الله أو أحبها لا يثبت الأمر بها إلا بالشرع . وأما العادات فهي ما اعتاده الناس في دنياهم مما يحتاجون إليه ، والأصل فيه عدم الحظر ، فلا يحظر منه إلا ما حظره الله سبحانه وتعالى … والعادات الأصل فيها العفو ، فلا يحظر منها إلا ما حرمه ، وإلا دخلنا في معنى قوله تعالى : ( قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ آللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ ) .ولهذا ذم الله المشركين الذين شرعوا من الدين ما لم يأذن به الله وحرموا ما لم يحرمه … وهذه قاعدة عظيمة نافعة”
“মানুষের কথা ও কাজ এই সব আমল দুই প্রকার:
এক প্রকার হলো ইবাদত, যার দ্বারা তাদের দ্বীন শুদ্ধ হয়। আরেক প্রকার হলো (আদাত) দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজকর্ম,যা তাদের দুনিয়ার জীবনের জন্য দরকার। শরয়ী মূলনীতি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা জানতে পারি যে সব ইবাদত আল্লাহ ফরজ করেছেন বা পছন্দ করেন, সেগুলোর বিধান কেবল শরিয়তের (দলিলের) মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে। আর দৈনন্দিন প্রয়োজনসমূহ হলো মানুষের দুনিয়াবি জীবনে প্রচলিত ও প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ। এগুলোর মূলনীতি হলো মুক্ত বা বৈধ থাকা এগুলোর মধ্যে কেবল সেটাই নিষিদ্ধ হবে,যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নিষিদ্ধ করেছেন।অতএব,(আদাতের) দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার মূলনীতি হলো অব্যাহতি (ছাড়, ক্ষমা ও অবকাশ); সুতরাং যা আল্লাহ হারাম করেননি, তা হারাম বলা যাবে না।‌অন্যথায় আমরা আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীর অর্থের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ব:”বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ তোমাদের জন্য যে রিযিক নাযিল করেছেন, তার কিছু তোমরা হারাম আর কিছু হালাল করে নিয়েছ? বলুন, আল্লাহ কি তোমাদের এ অনুমতি দিয়েছেন, না কি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছ?”।(সূরা ইউনুস: ৫৯)। একারণেই আল্লাহ তাআলা সেই মুশরিকদের নিন্দা করেছেন, যারা এমন কিছু দ্বীনের মধ্যে চালু করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি, এবং এমন কিছু হারাম করেছিল যা আল্লাহ হারাম করেননি।..আর এটি (ইবাদত ও আদাতের পার্থক্য বুঝা) একটি অত্যন্ত মহান ও উপকারী মূলনীতি।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২১; পৃষ্ঠা: ১৭-১৮)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: বিদআত কি ‘বিদআতে হাসানা’ (উত্তম বিদআত) এবং ‘বিদআতে সাইয়্যিআ’ (মন্দ বিদআত) এই দুই ভাগে বিভক্ত?
তিনি উত্তরে বলেন:
لا يمكن أن يقال عن البدعة في دين الله: إنها بدعةٌ حسنـة أبداً مع قول النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم: كل بدعةٍ ضلالة. فإن هذه الجملة؛ أعني : (كل بدعةٍ ضلالة) صدرت من أفصح الخلق محمدٍ صلى الله عليه وعلى آله وسلم ، وأنصح الخلق ، وأعلم الخلق بشرع الله، وأعلم الخلق بمدلول خطابه، وقد قال هذه الجملة العامة: (كل بدعةٍ ضلالة) فكيف يأتي إنسانٌ بعد ذلك، فيقول: البدعة منها ما هو بدعةٌ سيئة، ومنها ما هو بدعةٌ حسنة. وهل هذا إلا إخراج لقول رسول الله صلى الله عليه وعلى آله وسلم عن ظاهره، فالبدعة كلها بدعةٌ سيئة ، والبدعة كلها ضلالة.
لكن قد يستحسن الإنسان شيئاً يظنه بدعة وما هو ببدعة، وقد يستحسن شيئاً، وهو بدعة يظنه حسناً، وما هو بحسن، أما أن يجتمع كونه بدعة وكونه حسناً، فهذا لا يمكن أبداً؛ فمثلاً قد يقول القائل: بناء المدارس بدعة؛ لأنها لم تكن معروفة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم، لكنه بدعةٌ حسنة.
فنقول: لا شك أن بناء المدارس حصل، لكنه ليس البدعة التي أرادها الرسول صلى الله عليه وعلى آله وسلم؛ إذ إن بناء المدارس وسيلة لتنظيم الدراسة، وتهيئة الدروس للدارسين، وليس مقصوداً في ذاته؛ بمعنى أننا لسنا نتعبد لله تعالى، ببناء المدارس على أن البناء نفسه عبادة؛ ولكن نتعبد لله تعالى ببناء المدارس على أنها وسيلةٌ؛ لحفظ العلم، وتنظيم العلم، ووسيلةُ المقصود مقصودة؛ ولهذا كان من القواعد المقررة عند العلماء أن للوسائل أحكام المقاصد …وخلاصة القول:أنه لا يمكن أن تكون البدعة الشرعية تنقسم إلى قسمين؛ حسنة، وسيئة، مع قول الرسول عليه الصلاة والسلام: (كل بدعةٍ ضلالة) ، وأن ما ظنه بعض الناس بدعةً، وهو حسن؛ فإن ظنه إياه بدعة خطأ، وما ظنه الإنسان حسناً، وهو بدعة حقيقةً؛ فإن ظنه أنه حسن خطأ”
“আল্লাহর দ্বীনে কোনো বিদ‘আত সম্পর্কে কখনো বলা যাবে না: এটি হাসানা’ বা ‘উত্তম বিদ‘আত। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:”প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।”(সহীহ মুসলিম হা/৮৬৭) এই ব্যাপক কথাটি বলেছেন সর্বাধিক শুদ্ধ ভাষার অধিকারী, সর্বাধিক উপদেশদাতা, আল্লাহর শরিয়ত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী, এবং নিজের কথার অর্থ সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি যখন সাধারণভাবে বলেছেন: প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা, তখন এর পর কেউ এসে বলে বিদ‘আতের কিছু ভালো, কিছু মন্দ এটি কি রাসূলের কথাকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে বের করে দেওয়া নয়? অতএব, বিদ‘আত সবই মন্দ এবং সবই ভ্রষ্টতা। তবে এমন হতে পারে কেউ কোনো বিষয়কে বিদ‘আত মনে করে ভালো ভাবছে, অথচ তা আসলে বিদ‘আত নয়। আবার কেউ কোনো বিদ‘আতকে ভালো মনে করছে, অথচ তা ভালো নয়। কিন্তু কোনো বিষয় একই সঙ্গে বিদ‘আতও হবে এবং ভালোও হবে এটা কখনো সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ কেউ বলতে পারে:মাদরাসা বা বিদ্যালয় নির্মাণ বিদ‘আত, কারণ তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ছিল না তবে এটি ভালো বিদ‘আত।
জবাবে আমরা বলি: নিঃসন্দেহে মাদরাসা/বিদ্যালয় নির্মাণ (পরবর্তীতে) উদ্ভাবিত হয়েছে; কিন্তু এটি সেই বিদ‘আত নয় যা রাসূল (ﷺ) )শরীয়তের দৃষ্টিতে) উদ্দেশ্য করেছেন। কারণ বিদ্যালয় নির্মাণ মূল উদ্দেশ্য নয় বরং এটি পড়াশোনাকে সুসংগঠিত করা, শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ প্রস্তুত করা এসবের একটি মাধ্যম (ওয়াসিলা) মাত্র; এটি নিজে কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ইবাদত (মাকসুদ) নয়। অর্থাৎ, আমরা মাদ্রাসা নির্মাণকে ইবাদত মনে করে করছি না যে, এই নির্মাণ কাজটুকুই একটি ইবাদত; বরং এটিকে জ্ঞান সংরক্ষণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর ইবাদত করি।আর মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে মাধ্যম বা উপায় অবলম্বন করা হয়, তা সেই লক্ষ্যেরই পর্যায়ভুক্ত হয়। একারণেই উলামায়ে কেরামের নিকট একটি স্বীকৃত মূলনীতি হলো: ‘উপায়সমূহ মূল উদ্দেশ্যের বিধানেরই অনুগামী হয়।’ (অর্থাৎ উদ্দেশ্য যদি পুণ্যময় হয়, তবে সেই উদ্দেশ্যে গৃহীত মাধ্যমও সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য হবে)।সুতরাং সারকথা হলো: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুস্পষ্ট বাণী:”প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা” বিদ্যমান থাকা অবস্থায় শরয়ী বিদআতকে ‘হাসানা’ (উত্তম) ও ‘সাইয়্যিআ’ (মন্দ) এই দুই ভাগে বিভক্ত করার অবকাশ নেই। সুতরাং, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো উত্তম কাজকে (যা শরীয়তসম্মত) ‘বিদআত’ মনে করে, তবে তার সেই ধারণাই ভুল। আর যদি কেউ প্রকৃত কোনো বিদআতকে ‘উত্তম’ মনে করে, তবে তার সেই সিদ্ধান্ত বা মনে করাটাই ভুল।”(গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪০৫১২)
.
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”ধর্মীয় লেকচার বা ইলমি হালকার জন্য প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা কি নিষিদ্ধ বিদআত? যেহেতু ইলম অন্বেষণ একটি ইবাদত অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ইবাদতের জন্য কোনো সময় নির্দিষ্ট করেননি। একইভাবে একদল ভাই যদি প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট রাতে মসজিদে একত্রিত হয়ে কিয়ামুল লাইল আদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কি সেটি বিদআত হবে?
তিনি উত্তরে বলেন:
“إن تحديد يوم معين منتظم لإلقاء محاضرة، أو حلقة علم ليس ببدعة منهي عنها، بل هو مباح، كما يقرر يوم معين في المدارس والمعاهد لحصة الفقه، أو التفسير أو نحو ذلك.ولا شك أن طلب العلم الشرعي من العبادات ، لكن توقيته بيوم معين تابع لما تقتضيه المصلحة، ومن المصلحة أن يعين يوم لذلك حتى لا يضطرب الناس. وطلب العلم ليس عبادة مؤقتة بل هو بحسب ما تقتضيه المصلحة والفراغ.لكن لو خص يوماً معيناً لطلب العلم باعتبار أنه مخصوص لطلب العلم وحده فهذا هو البدعة.وأما اتفاق مجموعة على الالتقاء في ليلة معينة لقيام الليل فهذا بدعة؛ لأن إقامة الجماعة في قيام الليل غير مشروعة إلا إذا فعلت أحياناً وبغير قصد ، كما جرى للنبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم مع عبد الله بن عباس رضي الله عنهما.
“একটি নির্দিষ্ট দিন বা সময় নির্ধারণ করে নিয়মিত কোনো লেকচার (বক্তৃতা) বা ইলমি হালকার (শিক্ষামূলক আসর) আয়োজন করা কোনো নিষিদ্ধ বিদআত নয়, বরং এটি বৈধ। যেমনটি স্কুল বা মাদরাসায় ফিকহ বা তাফসিরের ক্লাসের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন ও সময় নির্ধারন করা হয়।নিঃসন্দেহে শরয়ী ইলম অর্জন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত তবে এটিকে নির্দিষ্ট দিনের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া মানুষের সুবিধা ও প্রয়োজনের (মাসলাহাহ) ওপর নির্ভরশীল, যাতে মানুষের জন্য সুবিধা হয় এবং বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।কারন দ্বীনি জ্ঞান অর্জন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ইবাদত নয়, বরং এটি সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়।কিন্তু,যদি কেউ এই বিশ্বাস নিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনকে (ইলম) জ্ঞান অর্জনের জন্য নির্ধারিত করে যে, কেবল ওই দিনটিই ইলম অর্জনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ (শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত),তাহলে তা বিদ‘আত হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে,যদি কোনো দল নির্দিষ্ট রাতে একত্রিত হয়ে নিয়মিত তাহাজ্জুদের জামাত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে তা বিদ‘আত। কারণ কিয়ামুল লাইল জামাতে আদায় করা শরয়তসম্মত নয়, তবে মাঝে মাঝে, পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ছাড়া হয়ে গেলে তা বৈধ যেমনটি নবী ﷺ)-এর সাথে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)-এর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ২৬, পৃষ্ঠা: ১৮২)
.
ইমাম ইবনে উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: কিছু মানুষ তাদের নিজেদের ফরয নামাজসমূহ এবং সুন্নাতে রাতিবাহ (ফরয নামাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সুন্নাত নামাজসমূহ) আদায়ের হিসাব রাখার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। আর তা হলো, সে একটি ছক বা রুটিন তৈরি করে। এই ছকটি এক সপ্তাহের নামাজ আদায়ের হিসাব রাখার জন্য তৈরি করা হয়। যেখানে সে নামাজের প্রতিটি ওয়াক্তের সামনে দুটি করে ঘর বা বর্গ রাখে; যার একটি ফরযের জন্য এবং অন্যটি সুন্নাতে রাতিবাহর জন্য। অতঃপর যখন সে জামা‘আতের সাথে ফরয নামাজ আদায় করে, তখন সে তার নামাজের জন্য একটি নাম্বার বা পয়েন্ট (কিংবা টিক চিহ্ন) দেয়। আর যখন সে সুন্নাতে রাতিবাহ আদায় করে, তখন তার জন্য একটি নাম্বার দেয়। আর যদি সে নামাজ না পড়ে, তবে সে কোনো নাম্বার দেয় না… এভাবেই চলতে থাকে। অতঃপর সপ্তাহের শেষে সে মোট নাম্বার বের করে। আর এই কাগজটিতে এক মাসের জন্য চারটি ছক থাকে। এরা বলে: নিশ্চয়ই এই ধরনের মাধ্যম ফরয ও সুন্নাতসমূহ আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে সাহায্য করে। সুতরাং এই পদ্ধতির ব্যাপারে আপনার মতামত কী? এটি কি শরী‘আতসম্মত নাকি নয়? এবং এটি প্রচার করার ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
অতঃপর তিনি জবাবে বলেছিলেন:
هذه الطريقة غير مشروعة ، فهي بدعة ، وربما تسلب القلب معنى التعبد لله تعالى ، وتكون العبادات كأنها أعمال روتينية كما يقولون ، وفي الصحيحين عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال : دخل رسول الله صلى الله عليه وسلم المسجد فإذا حبل ممدود بين ساريتين ، فقال : ( ما هذا ) ؟ ، قالوا : حبل لزينب تصلي فإذا كسلت ، أو فترت أمسكت به فقال : ( حلوه ، ليصل أحدكم نشاطه فإذا كسل ، أو فتر فليقعد ) ، ثم إن الإنسان قد يعرض له أعمال مفضولة في الأصل ثم تكون فاضلة في حقه لسبب ، فلو اشتغل بإكرام ضيف نزل به عن راتبة صلاة الظهر لكان اشتغاله بذلك أفضل من صلاة الراتبة .
وإني أنصح شبابنا من استعمال هذه الأساليب في التنشيط على العبادة ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم حذر من مثل ذلك حيث حث على اتباع سنته وسنة الخلفاء الراشدين ، وحذر من البدع ، وبين أن كل بدعة ضلالة ، يعني وإن استحسنها مبتدعوها ، ولم يكن من هديه ولا هدي خلفائه وأصحابه رضي الله عنهم مثل هذا “
“এই পদ্ধতি শরীয়তসম্মত নয় বরং এটি বিদ‘আত। কখনো কখনো এটি অন্তর থেকে আল্লাহর জন্য ইবাদতের প্রকৃত অনুভূতিও ছিনিয়ে নিতে পারে এবং ইবাদতসমূহ যেন রুটিন মাফিক কাজে পরিণত হয়, যেমনটি তারা বলে। আর সহীহাইনে (বুখারী ও মুসলিমে) আনাস ইবনু মালিক (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন দুই স্তম্ভের মাঝে একটি দড়ি টানানো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: এই রশিটি কিসের? সাহাবীগণ বললেন: এটি যায়নাব (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহা)-এর রশি,তিনি নামাজ পড়েন, অতঃপর যখন ক্লান্ত হয়ে যান বা অলসতা অনুভব করেন, তখন এটি ধরে রাখেন। তখন নবীজি (ﷺ) বললেন: না, এটি খুলে ফেলো। তোমাদের কারো উচিত তার উদ্যম থাকা অবস্থায় নামাজ পড়া। অতঃপর যখন সে অলসতা অনুভব করবে বা ক্লান্ত হয়ে যাবে, তখন সে যেন বসে পড়ে।”(সহীহ বুখারী হা/১১৫০) আর নিশ্চয়ই মানুষের সামনে এমন কিছু আমল উপস্থিত হতে পারে, যা মূলত? অন্য কাজের তুলনায়) ফযীলতের দিক থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিশেষ কোনো কারণে সেটি তার জন্য অধিক ফজিলতপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।যেমন- কোনো মেহমান এলো,আর তাকে সম্মান-আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকার কারণে যোহরের সুন্নাতে রাতিবাহ পড়তে না পারে, তবে সেই মুহূর্তে মেহমানদারিতে নিয়োজিত থাকা তার জন্য সুন্নাতে রাতিবাহ পড়ার চেয়েও উত্তম।আর আমি আমাদের যুবকদের ইবাদতে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরণের (মনগড়া) পদ্ধতি অবলম্বন করা থেকে সতর্ক করছি। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জাতীয় কাজ থেকে সতর্ক করেছেন;যেখানে তিনি তাঁর সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত অনুসরণ করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এবং তিনি বিদ‘আত থেকে সতর্ক করেছেন। আর তিনি স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন যে, প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা। অর্থাৎ যদিও বিদ‘আতকারীরা একে ভালো মনে করে। আর এই ধরনের কাজ তাঁর হিদায়াত বা আদর্শ এবং তাঁর খলীফাগণ ও সাহাবায়ে কিরামগণের (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) হিদায়াত বা আদর্শের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ১১১)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”আমরা ছয়জন বন্ধু প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর একজনের বাড়িতে দ্বীনি মজলিস করি। আমাদের কর্মসূচিতে কুরআন তিলাওয়াত, নববীর চল্লিশ হাদিস, মিনহাজুল মুসলিম ও রিজালুন হাওলার রাসূল ﷺ) পাঠ এবং নসিহত অন্তর্ভুক্ত থাকে।আমাদের বিশেষ একটি পদ্ধতি হলো ‘মুসাবাকা টেবিল’ (আমলের ছক)। এটি একটি মাসিক ফরম যেখানে প্রতিদিনের আমল (যেমন: জামাতে সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, নফল রোজা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা) লিপিবদ্ধ করা হয়। আমরা দেখেছি, এই ছকটি অনুসরণ করলে আমলে গতি আসে, আর এটি ছেড়ে দিলে অলসতা জেঁকে বসে। জানার বিষয় হলো, আত্মশুদ্ধি বা আমল সংশোধনের উদ্দেশ্যে এই ধরনের ‘আমলনামা’ বা ‘মুসাবাকা টেবিল’ মেইনটেইন করার শরয়ি বিধান কী?
শাইখ হাফিজাহুল্লাহ উত্তরে বলেন:
” الحمد لله : الذي يظهر لي أن اتخاذ هذا الجدول والتنافس على فقراته : بدعة ؛ لأنه يتضمن التفاخر ، والإعجاب بالعمل ، ويتضمن كذلك إظهار العمل الذي إخفاؤه أفضل ؛ لأن إخفاء العمل من الصدقة ، وتلاوة القرآن ، أو الذكر : أبعد عن الرياء ، قال تعالى : ( ادعوا ربكم تضرعاً وخفية ) الأعراف/ 55 ، وقال : ( ذكر رحمت ربك عبده زكريا إذ نادى ربه نداء خفياً ) مريم/ 2 ، 3 ، وأحد السبعة الذين يظلهم الله في ظله : ( رجل تصدق بصدقة فأخفاها حتى لا تعلم شماله ما تنفق يمينه ) .فالذي ينبغي : التواصي بالتزود من نوافل الطاعات ، والإكثار من ذلك ، وكلٌّ يعمل ما تيسر له فيما بينه وبين ربه ، وبهذا يحصل التعاون على البر والتقوى ، وتحصل السلامة مما يفسد العمل ، أو ينقص ثوابه ، والله الموفق ، والهادي إلى سبيل الرشاد ، والله أعلم “
“যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমার নিকট যা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—এই ধরনের তালিকা (ছক) তৈরি করা এবং এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর বিভিন্ন অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতা করা একটি বিদ‘আত (দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবন);কারণ এটি (নিজের আমল নিয়ে) অহংকার এবং নিজের আমলের প্রতি নিজে মুগ্ধ হওয়ার (আত্মতৃপ্তির) বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে,একইসাথে এটি এমন সব আমল প্রকাশ করে দেয় যা গোপন রাখাই ছিল অতি উত্তম;কেননা দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত কিংবা জিকিরের মতো আমলগুলো গোপন রাখা ‘রিয়া’ (লোক। দেখানো মানসিকতা) থেকে অধিকতর নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো কাকুতি-মিনতি করে এবং গোপনে।’ (সূরা আল-আরাফ: ৫৫) তিনি আরও বলেন: ‘(এটি) আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা জাকারিয়ার প্রতি; যখন তিনি তাঁর প্রতিপালককে ডেকেছিলেন নিভৃতে (গোপনে)।”(সূরা মারইয়াম: ২-৩),আর (কিয়ামতের দিন) যে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর (আরশের) ছায়াতলে স্থান দেবেন, তাদের একজন হলো: ‘সেই ব্যক্তি যে এমনভাবে সদকা করে যে, তার ডান হাত কী খরচ করছে তার বাম হাতও তা জানতে পারে না’।সুতরাং যা করা উচিত তা হলো: নফল ইবাদত বেশি বেশি করার জন্য এবং এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য একে অপরকে উপদেশ দেওয়া এবং প্রত্যেকে তার রবের সাথে একান্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে যতটুকু সম্ভব আমল করবে, এর মাধ্যমেই নেক কাজ ও তাকওয়ার ওপর পারস্পরিক সহযোগিতা অর্জিত হবে; এবং এমন সব বিষয় থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে যা আমলকে নষ্ট করে দেয় কিংবা আমলের সওয়াব কমিয়ে দেয়। আল্লাহই তাওফিকদাতা, তিনিই সঠিক পথের হেদায়েতকারী। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।”(http://www.islamway.com/?iw_s=Fatawa&iw_a=view&fatwa_id=8762
.
মহান আল্লাহ আমাদের জীবনকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত করার তাওফিক দান করুন। তিনি-ই সর্বাধিক জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Wednesday, February 25, 2026

রোযা ও রমাযান সম্পর্কিত ৫১টি যয়ীফ ও জাল হাদীস!!!!!!!!!!!!!!

 

রোযা ও রমাযান সম্পর্কিত ৫১টি যয়ীফ ও জাল হাদীস!!!!!!!!!!!!!!
রোযা ও রমাযানকে কেন্দ্র করে বহু যয়ীফ ও জাল হাদীস লোকমুখে তথা বহু বই-পুস্তকে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। এ স্থলে সেই শ্রেণীরই কিছু হাদীস সংক্ষেপে উল্লেখ করব। যাতে পাঠক তা পাঠ করে সতর্ক হতে পারেন এবং তদ্দবারা আমল ও তাতে উল্লেখিত কথার উপর বিশ্বাস না করে বসেন। আর এ কথা বিদিত যে, কোন জাল তো দূরের কথা, কোন যয়ীফ হাদীস দ্বারা আমল করা বৈধ নয়; চাহে সে হাদীস আহকাম সম্পর্কিত হোক অথবা ফাযায়েলে আ’মাল সম্পর্কিত। বরং সহীহ ও শুদ্ধভাবে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তাই আমলের জন্য যথেষ্ট; যদি আমরা সত্যপক্ষে আমল করতে চাই।[1] উক্ত প্রকার কিছু হাদীস নিম্নরূপঃ-

Translate