Tuesday, December 2, 2025

ভূমিকম্প কিংবা আগুন সংঘটিত হলে সালাত ছেড়ে দেয়ার হুকুম কি

 পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ভূমিকম্প,আগুন কিংবা অন্য যেকোন সমস্যার কারণে নামায ছেড়ে দেয়ার দুটি অবস্থা হতে পারে।

▪️প্রথম অবস্থা: যদি সালাতটি নফল (ঐচ্ছিক) সালাত হয়, তবে বিষয়টি সহজ। কারণ ওজর (বৈধ কারণ) ছাড়াই নফল সালাত ভেঙে দেওয়া জায়েজ, সুতরাং ওজর থাকলে তো তা আরও বেশি জায়েজ হবে। এটি হলো শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের মত এবং এটাই বিশুদ্ধ মত। এর প্রমাণ হলো: উম্মুল মু’মিনীন আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদিন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এলেন। তিনি বললেন, তোমার কাছে কী (খাবার) কিছু আছে? আমি বললাম, না (কিছুতো নেই)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তাহলে আমি (আজ) সিয়াম পালন করবো! এরপর আর একদিন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার কাছে এলেন। (জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কী খাবার কিছু আছে?) আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের জন্য ‘হায়স’ হাদিয়্যাহ্ এসেছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আনো, আমাকে দেখাও। আমি সকাল থেকে সওম রেখেছি। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘হায়স’ খেয়ে নিলেন।”(সহীহ মুসলিম হা/১১৫৪, তিরমিযী হা/ ৭৩৩, নাসায়ী হা/২৩২৭,সহীহ ইবনু খুযায়মাহ হা/২১৪৩)
.
​আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ গ্রন্থে এসেছে:” أما قطع التطوع بعد الشروع فيه فقد اختلف الفقهاء في حكمه فقال الحنفية والمالكية: لا يجوز قطعه بعد الشروع بلا عذر كالفرض ويجب إتمامه؛ لأنه عبادة.وقال الشافعية والحنابلة: يجوز قطع التطوع، عدا الحج والعمرة، لحديث ( المتنفل أمير نفسه ) – أخرجه الترمذي من حديث أم هانئ بلفظ: ( الصائم أمير أو أمين نفسه ) -، ولكن يستحب إتمامه .أما الحج والعمرة فيجب إتمامهما، وإن فسدا إذا شرع فيهما، لأن نفلهما كفرضهما“নফল (ঐচ্ছিক) ইবাদত শুরু করার পর তা ভেঙে দেওয়ার বিধান সম্পর্কে ফকীহদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। হানাফি ও মালিকি ফকীহগণ বলেন:নফল ইবাদত শুরু করার পর কোনো ওজর (উপযুক্ত কারণ) ছাড়া তা ভঙ্গ করা বৈধ নয়; বরং ফরজ ইবাদতের মতোই তা সম্পন্ন করা আবশ্যক,কারণ এটিও একটি ইবাদত। অন্যদিকে শাফেয়ী ও হাম্বলী ফকীহগণ বলেন:হজ্ব ও ওমরাহ ছাড়া অন্যান্য নফল ইবাদত শুরু করার পর তা ভেঙে দেওয়া বৈধ। এ মতের প্রমাণ হলো রাসূল (ﷺ)-এর হাদীস: “(নফলকারীর) নিজের ব্যাপারে সে নিজেই আমির (নিজ সিদ্ধান্তের অধিকারী)”ইমাম তিরমিযী উম্মে হানী (রাঃ) থেকে “নফল রোযা পালনকারী নিজের আমানাতদার।’—এ শব্দে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।” (তিরমিযী হা/৭৩১) তবে নফল ইবাদত সম্পন্ন করে ফেলা উত্তম (মুস্তাহাব)।কিন্তু হজ্ব ও ওমরাহর ক্ষেত্রে বিধান ব্যতিক্রম;কারণ—এই দুটিতে (নফলও হোক, ফরজও হোক) একবার ইহরাম বেঁধে শুরু করলে তা নষ্ট হয়ে গেলেও সম্পন্ন করা ওয়াজিব; কেননা নফল হজ-ওমরাহর বিধানও ফরজের মতোই।”
(আল-মাউসু’আতুল-ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ৩৪; পৃষ্ঠা;৫১)
.
▪️দ্বিতীয় অবস্থা: যদি সালাতটি ফরজ সালাত হয় তাহলে মূলনীতি হলো, যে ব্যক্তি ফরজ সালাত শুরু করেছে, কোনো বৈধ ওজর ছাড়া তার জন্য তা ভেঙে দেওয়া জায়েজ নয়। সুতরাং ফরজ সালাত আদায়ের সময় যদি অপ্রত্যাশিতভাবে ভূমিকম্প, অগ্নিসংযোগ বা অনুরূপ কোনো মারাত্মক দুর্যোগ শুরু হয় এবং মুসল্লির দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, এ দুর্ঘটনাতে সে আক্রান্ত হবে এবং ওই স্থান ত্যাগ করলে তিনি নিশ্চিত বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন, তবে আত্মরক্ষার জন্য সালাত ভেঙে দেওয়া এবং দ্রুত স্থান ত্যাগ করা তাঁর কর্তব্য। এই পরিস্থিতিতে তিনি পরিবেশ ও বিপদ বিবেচনা করে, নিরাপদ স্থানে গিয়ে পরবর্তীতে তাঁর অসম্পূর্ণ সালাত পূর্ণ করবেন অথবা ছেড়ে দেবেন। তার যদি ধারণা হয় যে, সালাতের স্থানে থাকলে তার মৃত্যু হবে সেক্ষেত্রে তার জন্য সেখানে অবস্থান করা জায়েয হবে না। যদি থেকে যায় তাহলে সে যেন নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করল। তদ্রূপ অন্য কাউকে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর জন্য নামায ছেড়ে দেয়াও তার উপর আবশ্যক; যেমন পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে, আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকে কিংবা কূপে পড়ে যাওয়া থেকে। এ বিষয়ের মূল দলিল হল আল্লাহ্‌ তাআলার বাণী:وَلا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ “তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। আর ভাল কাজ করো; যারা ভাল কাজ করে আল্লাহ্‌ তাদেরকেই ভালোবাসেন।”(সূরা বাক্বারা: ১৯২) এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: لَا ضَرَرَ وَلا ضِرَارَ “নিজে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া কিংবা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্থ করা নয়”।(মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে ইবনে মাজাহ হা/২৩৪১) এবং আলবানী হাদিসটিকে ‘সহিহ ইবনে মাজাহ’ গ্রন্থে সহিহ বলেছেন)
.
আল-মাউসু’আ আল-ফিকহিয়্যা আল-কুয়েতিয়্যা’ গ্রন্থে এসেছে:” قطع العبادة الواجبة بعد الشروع فيها ، بلا مسوغ شرعي : غير جائز باتفاق الفقهاء، لأن قطعها بلا مسوغ شرعي عبث يتنافى مع حرمة العبادة ، وورد النهي عن إفساد العبادة، قال تعالى: ( وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ ) . أما قطعها بمسوغ شرعي : فمشروع، فتقطع الصلاة لقتل حية ونحوها ، للأمر بقتلها، وخوف ضياع مال له قيمة ، له أو لغيره، ولإغاثة ملهوف، وتنبيه غافل أو نائم قصدت إليه نحو حية، ولا يمكن تنبيهه بتسبيح، ويقطع الصوم لإنقاذ غريق، وخوف على نفس، أو رضيع”ফকীহগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো যে—শার’ঈ কোনো ওজর ছাড়া শুরু করার পর কোনো ওয়াজিব ইবাদত ভঙ্গ করা বৈধ নয়। কারণ শার’ঈ ওজর ছাড়া ইবাদত ভেঙে ফেলা ইবাদতের মর্যাদা ও পবিত্রতার পরিপন্থী একটি অনর্থক কাজ; আর ইবাদত নষ্ট করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:“তোমরা নিজেদের আমলসমূহ বিনষ্ট করে দিও না।” (সূরা মুহাম্মদ: ৩৩) তবে যদি কোনো শার’ঈ কারণ উপস্থিত থাকে তবে ইবাদত ভেঙে দেওয়া বৈধ। যেমন সালাতে থাকা অবস্থায় সাপ–বিচ্ছু ইত্যাদি মেরে ফেলার প্রয়োজন হলে সালাত ভাঙা বৈধ; কারণ এ ধরনের ক্ষতিকর প্রাণী হত্যা করার নির্দেশ রয়েছে।তদ্রূপ, নিজের অথবা অন্য কারো মূল্যবান সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, কিংবা কোনো বিপদগ্রস্থ ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে হলে, অথবা কোনো অসচেতন বা ঘুমন্ত ব্যক্তিকে সাপ-বিচ্ছুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখে তাকে সতর্ক করা প্রয়োজন হলে এবং কেবল তাসবীহ পড়া দ্বারা তাকে সতর্ক করা সম্ভব না হলে এ অবস্থায় সালাত ভেঙে সতর্ক করা বৈধ। একইভাবে, ডুবন্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য, নিজের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার কারণে, অথবা শিশুর হিফাযতের স্বার্থে রোজা ভেঙে দেওয়া বৈধ।”(আল-মাউসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড: ৩৪; পৃষ্ঠা: ৫১)
.
ইমাম আল-বাহূতী (রাহিমাহুল্লাহ) কাশশাফুল ক্বিনা গ্রন্থে বলেন:
“(ويجب رد كافر ، معصوم) بذمة أو هدنة أو أمان ، (عن بئر ونحوه) ، كحية تقصده (كـ) رد (مسلم) عن ذلك ، بجامع العصمة .(و) يجب (إنقاذ غريق ونحوه) ، كحريق ؛ (فيقطع الصلاة لذلك) ، فرضا كانت أو نفلا، وظاهره: ولو ضاق وقتها، لأنه يمكن تداركها بالقضاء، بخلاف الغريق ونحوه .(فإن أبى قطعها) ، أي الصلاة ، لإنقاذ الغريق ونحوه : أثم ، و(صحت) صلاته ، كالصلاة في عمامة حرير”
“যে কাফেরের জান নিরাপদ—যিম্মী হওয়ার কারণে, কিংবা চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কারণে কিংবা নিরাপত্তা দেয়ার কারণে তাকে কূপ ও এ জাতীয় অন্য কিছুতে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা আবশ্যক। যেমন কোন সাপ যদি তার উপর আক্রমণ করে। যেমনিভাবে কোন মুসলিমকে এসব থেকে রক্ষা করা আবশ্যক। যেহেতু উভয় প্রাণই মাসুম (নিরাপত্তাপ্রাপ্ত)। পানিতে ডুবে যাচ্ছে কিংবা আগুনে পুড়ে যাচ্ছে এমন ব্যক্তিকে রক্ষা করা আবশ্যক। এর জন্য সালাত ছেড়ে দিতে হবে; সেটা ফরয সালাত হোক কিংবা নফল নামায হোক। এর প্রত্যক্ষ মর্ম হল: এমনকি যদি ওয়াক্ত একেবারে সংকীর্ণ হয়ে যায় তবুও। যেহেতু কাযা পালন করার মাধ্যমে সালাতের প্রতিকার করার সুযোগ আছে। কিন্তু পানিতে পড়ে যাওয়া ব্যক্তি কিংবা এ জাতীয় অন্য কোন দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই। যদি পানিতে পড়া ব্যক্তি বা এ জাতীয় অন্য দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে বাঁচানোর জন্য সালাত ছেড়ে না দেয় তাহলে সে গুনাহগার হবে। তবে তার সালাত সহিহ হবে; যেমনিভাবে রেশমের পাগড়ী পরে সালাত পড়লেও সালাত শুদ্ধ হয়।”(কাশশাফুল ক্বিনা; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮০)
.
ইবনে রজব হাম্বলি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
وقال قتادة: إن أُخذ ثُوبه : يتبع السارقَ ، ويدع الصلاة. وروى عبد الرزاق في (كتابه)، عن معمر، عن الحسن وقتادة :في رجل كان يصلي، فأشفق أن تذهب دابته ، أو أغار عليها السبع؟ قالا: ينصرف .وعن معمر، عن قتادة، قالَ: سألته، قلت: الرجل يصلي، فيرى صبياً على بئر، يتخوف أن يسقط فيها، أفينصرف؟ قال: نعم. قلت: فيرى سارقاً يريد أن يأخذ نعليه؟ قال: ينصرف .
ومذهب سفيان: إذا عرض الشيء المتفاقم، والرجل في الصلاة : ينصرف إليه . رواه عنه المعافى . وكذلك إن خشي على ماشيته السيل، أو على دابته .ومذهب مالك: من انفلتت دابته وهو يصلي؛ مشى فيما قرب، إن كانت بين يديه، أو عن يمينه أو عن يساره، وإن بعدت: طلبها، وقطع الصَّلاة. ومذهب أصحابنا: لو رأى غريقاً، أو حريقاً، أو صبيين يقتتلان، ونحو ذلك، وهو يقدر على إزالته: قطع الصلاة وأزاله .ومنهم من قيده بالنافلة. والأصح: أنه يعم الفرض وغيره. وقال أحمد – فيمن كان يلازم غريماً له، فدخلا في الصلاة، ثم فر الغريم وهو في الصلاة -: يخرج في طلبه. وقال أحمد – أيضا -: إذا رأى صبياً يقع في بئر، يقطع صلاته ويأخذه . قال بعض أصحابنا: إنما يقطع صلاته إذا احتاج إلى عمل كثير في أخذه، فإن كان العمل يسيراً لم تبطل به الصلاة. وكذا قال أبو بكر ، في الذي خرج وراء غريمه ؛ أنه يعود ، ويبني على صلاته. وحمله القاضي على أنه كان يسيراً. ويحتمل أن يقال: هو خائف على ماله، فيغتفر عمله، وإن كثر”
“ক্বাতাদাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: যদি কেউ তার কাপড় নিয়ে যায় তাহলে সে সালাত ছেড়ে দিয়ে চোরের পিছু নিবে। আব্দুর রাজ্জাক তাঁর কিতাবে মা’মার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হাসান ও কাতাদা থেকে বর্ণনা করেছেন যে: এক ব্যক্তি সালাত পড়ছিল। এর মধ্যে সে তার পশুটি ছুটে চলে যাওয়ার আশংকা করলো কিংবা কোন হিংস্র জানোয়ার তার উপর আক্রমণ করার আশংকা করলো? তারা উভয়ে বলেন: সে সালাত ছেড়ে দিবে। মা’মার থেকে বর্ণিত আছে, তিনি কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন: জনৈক লোক নামায পড়ছে। এর মধ্যে সে দেখতে পেল যে, একটি বাচ্চা কূপের ধারে। আশংকা হচ্ছে বাচ্চাটি কূপের মধ্যে পড়ে যাবে। সে কি সালাত ছেড়ে দিবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি বললাম: কেউ দেখল যে, চোর তার জুতাজোড়া নিয়ে যাচ্ছে? তিনি বললেন: সালাত ছেড়ে দিবে। সুফিয়ানের মাযহাব হচ্ছে: কোন ব্যক্তি সালাতে থাকাবস্থায় যদি বিপদজনক কিছুর সম্মুখীন হোন তাহলে তিনি সালাত ছেড়ে দিবেন। এটি মুআফি তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য হবে যদি কেউ নিজের পশুপাল বা আরোহণের পশু পানির ঢলের শিকার হওয়ার আশংকা করেন। ইমাম মালেকের মাযহাব হচ্ছে: যে ব্যক্তি সালাতরত অবস্থায় তার আরোহণের পশু ছুটে গেছে; যদি তার কাছাকাছি হয় সামনের দিকে হোক, ডানে হোক বা বামে হোক সে তার দিকে হেঁটে যাবে। আর যদি দূরে হয় তাহলে সালাত ছেড়ে দিয়ে পশুর সন্ধান করবে। আমাদের মাযহাবের আলেমদের অভিমত হচ্ছে: যদি কোন লোককে ডুবে যেতে দেখে কিংবা পুড়ে যেতে দেখে কিংবা দুই বালককে মারামারি করতে দেখে ইত্যাদি এবং তার এ অনিষ্ট দূর করার সক্ষমতা থাকে তাহলে সে সালাত ছেড়ে দিবে এবং এ অনিষ্ট দূর করবে। কোন কোন আলেম এটাকে নফল সালাতের সাথে বিশিষ্ট করেছেন। সর্বাধিক সঠিক অভিমত হচ্ছে: এটি নির্বিশেষে ফরয সালাত ও অন্যান্য সালাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইমাম আহমাদ বলেন: যে ব্যক্তি তার ঋণপ্রাপ্য ব্যক্তিকে অনুসরণ করেন, তারা উভয়ে সালাত শুরু করল, একটু পরে সে ব্যক্তি সালাতে থাকাবস্থায় ঋণী লোকটি পালিয়ে যেতে লাগল: তখন ঋণী লোকটিকে ধরার জন্য তিনি সালাত থেকে বেরিয়ে যাবেন। ইমাম আহমাদ আরও বলেন: যদি কেউ কোন বাচ্চাকে কূপে পড়ে যেতে দেখে তখন সালাত ছেড়ে দিয়ে বাচ্চাটিকে বাঁচাবে। আমাদের কোন কোন আলেম বলেছেন: যদি বাচ্চাটিকে বাঁচাতে গিয়ে আমলে কাছির (অনেক কাজ) করতে হয় তাহলে সেক্ষেত্রে সালাত কর্তন করবে। আর যদি অল্পতে বাঁচানো যায় তাহলে এতে করে তার সালাত বাতিল হবে না। আবু বকর একই ধরণের কথা ঋণপ্রাপ্য ব্যক্তির অনুসরণে যে ব্যক্তি বেরিয়েছে তার ব্যাপারে বলেছেন যে, সে ব্যক্তি ফিরে এসে অবশিষ্ট সালাত পূর্ণ করবে। কাযী এ অভিমতকে এ অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন যে, যদি সেটা অল্প কর্ম হয়। এমন একটি ব্যাখ্যাও করা যেতে পারে যে: সে তার সম্পদের ব্যাপারে আতংকিত। তাই তার সে কর্ম অধিক হলেও সেটি মার্জনীয়।”(ইবনে রজব ‘ফাতহুল বারী’; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৩৬-৩৩৭)
.
পরিশেষে, উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের জীবননাশের আশঙ্কা করেন বা এমন কারো জীবন হুমকির মুখে পড়ে যাকে তিনি বাস্তবিকভাবে রক্ষা করতে সক্ষম তাহলে তার জন্য সালাত চালিয়ে যাওয়া বৈধ নয়। এ বিধান ফরজ সালাত হোক বা নফল উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। অতএব এ পরিস্থিতিতে সালাত অব্যাহত রাখলে তিনি গুনাহগার হবেন। আর যদি সালাত চালিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি নিজে মৃত্যুবরণ করেন বা আহত হন তবে তিনি নিজেকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন বলে গণ্য হবেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩২৬০৭০)
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

যদি কোন ব্যক্তি সুদকে হালাল মনে করে তাহলে শরিয়তে তার বিধান কী

 ভূমিকা:পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ইসলামে সুদ সম্পূর্ণরূপে হারাম—এ বিষয়টি কুরআন, সহীহ হাদীস এবং উম্মাহর সর্বসম্মত মত (ইজমা‘) দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। অতএব, কেউ যদি ইজমার ভিত্তিতে সাব্যস্ত সুদের এই হারাম হওয়াকে অস্বীকার করে বা সুদকে হালাল মনে করে, তবে সে গুরুতর ভ্রান্তিতে পতিত হবে এবং ইসলামের দৃষ্টিতে কাফির গণ্য হবে।কারণ মূলনীতি হলো: যে ব্যক্তি এমন কোনো স্বীকৃত বিষয় অস্বীকার করে, যার ওপর উলামাদের স্পষ্ট ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—সে ব্যক্তি ইসলামের পরিসীমার বাইরে চলে যায়।

.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:إن الإيمان بوجوب الواجبات الظاهرة المتواترة ، وتحريم المحرمات الظاهرة المتواترة هو من أعظم أصول الإيمان ، وقواعد الدين ، والجاحد لها كافر بالاتفاق”নিশ্চিতভাবে সুপ্রমাণিত (মুতাওয়াতির) প্রকাশ্য ফরজ কাজগুলো আবশ্যিক বলে বিশ্বাস করা, এবং নিশ্চিতভাবে সুপ্রমাণিত (মুতাওয়াতির) প্রকাশ্য হারাম কাজগুলো নিষিদ্ধ বলে বিশ্বাস করা হলো ঈমানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভিত্তি এবং দ্বীনের মূলনীতিসমূহের অন্যতম। আর যে ব্যক্তি এগুলোকে অস্বীকার করে, সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের (অবিশ্বাসী)।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৪৯৭)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:ومن اعتقد حل شيء أجمع على تحريمه وظهر حكمه بين المسلمين وزالت الشبهة فيه للنصوص الواردة فيه كلحم الخنزير والزنى وأشباه ذلك مما لا خلاف فيه كَفَر “যে এমন কোনো জিনিসকে হালাল মনে করে, যার হারাম হওয়ায় উম্মাহর ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং মুসলিমদের মধ্যে যার হুকুম স্পষ্টভাবে প্রচলিত, যার ব্যাপারে কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট দলিলের কারণে কোনো সন্দেহ-সংশয় অবশিষ্ট নেই যেমন শূকরের মাংস, ব্যভিচার এবং এ ধরনের যেসব বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই সে কাফের।”(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, খন্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ২৭৬)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:
فَأَمَّا الْيَوْم وَقَدْ شَاعَ دِينُ الْإِسْلَام وَاسْتَفَاضَ فِي الْمُسْلِمِينَ عِلْمُ وُجُوب الزَّكَاة حَتَّى عَرَفَهَا الْخَاصّ وَالْعَامّ , وَاشْتَرَكَ فِيهِ الْعَالِم وَالْجَاهِل , فَلَا يُعْذَر أَحَد بِتَأْوِيلِ يَتَأَوَّلهُ فِي إِنْكَارهَا . وَكَذَلِكَ الْأَمْر فِي كُلّ مَنْ أَنْكَرَ شَيْئًا مِمَّا أَجْمَعَتْ الْأُمَّة عَلَيْهِ مِنْ أُمُور الدِّين إِذَا كَانَ عِلْمه مُنْتَشِرًا كَالصَّلَوَاتِ الْخَمْس وَصَوْم شَهْر رَمَضَان وَالاغْتِسَال مِنْ الْجَنَابَة وَتَحْرِيم الزِّنَا وَالْخَمْر وَنِكَاح ذَوَات الْمَحَارِم وَنَحْوهَا مِنْ الْأَحْكَام إِلَّا أَنْ يَكُون رَجُلًا حَدِيث عَهْدٍ بِالْإِسْلَامِ وَلَا يَعْرِف حُدُوده فَإِنَّهُ إِذَا أَنْكَرَ شَيْئًا مِنْهَا جَهْلًا بِهِ لَمْ يَكْفُر . . . فَأَمَّا مَا كَانَ الْإِجْمَاع فِيهِ مَعْلُومًا مِنْ طَرِيق عِلْم الْخَاصَّة كَتَحْرِيمِ نِكَاح الْمَرْأَة عَلَى عَمَّتهَا وَخَالَتهَا , وَأَنَّ الْقَاتِل عَمْدًا لَا يَرِث وَأَنَّ لِلْجَدَّةِ السُّدُس , وَمَا أَشْبَهَ ذَلِكَ مِنْ الْأَحْكَام فَإِنَّ مَنْ أَنْكَرَهَا لا يَكْفُر , بَلْ يُعْذَر فِيهَا لِعَدَمِ اِسْتِفَاضَة عِلْمهَا فِي الْعَامَّة”
“কিন্তু বর্তমানে, যখন ইসলামের দীন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মুসলমানদের মধ্যে যাকাতের আবশ্যকতা সংক্রান্ত জ্ঞান এতোটা প্রচলিত হয়েছে যে,তা আলেমদের মতো সাধারণ লোকও তা জানে,আর শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলের মধ্যেই এর জ্ঞান বিদ্যমান, তখন কেউ যদি যাকাত অস্বীকার করে, তবে তার ভ্রান্ত ব্যাখ্যার (তা’বীল-এর) অজুহাতে তাকে ক্ষমা করা হবে না।আর ঠিক একই বিধান প্রযোজ্য হবে সেইসব ক্ষেত্রে, যা দীনের এমন বিষয় যার উপর উম্মাহর ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত এবং যার জ্ঞান মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। যেমন: পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমযান মাসের সিয়াম (রোজা),জানাবাত (নাপাকি) থেকে গোসল, যিনা (ব্যভিচার) ও মদ হারাম হওয়া, মাহরাম (রক্ত সম্পর্কীয়) নারীর সাথে বিবাহ হারাম হওয়া এবং এ ধরনের অন্যান্য বিধান। যদি কেউ এগুলো অস্বীকার করে, তবে সে কাফের গণ্য হবে।তবে, যদি কোনো ব্যক্তি সম্প্রতি ইসলাম গ্রহণ করে এবং সে ইসলামের বিধানাবলী সম্পর্কে অবহিত না থাকে, তবে অজ্ঞতার কারণে সে যদি এর কোনো একটি অস্বীকার করে, তবে সে কাফের হবে না…কিন্তু যেসব বিষয়ে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অথচ সেই ইজমার জ্ঞান শুধুমাত্র নির্দিষ্ট আলিমদের মাধ্যমেই জানা যায় (অর্থাৎ,সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত নয়), যেমন: কোনো নারীকে তার ফুফু বা খালার উপরে বিবাহ করা হারাম হওয়া,ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া; এবং দাদি (বা নানি)-এর জন্য সুদুস (এক-ষষ্ঠাংশ) অংশ নির্ধারিত হওয়া—এরকম অন্যান্য বিধানাবলী যদি কেউ অস্বীকার করে, তবে সে কাফির হবে না। বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে এর জ্ঞান ব্যাপকভাবে প্রচলিত না হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে তার ওজর গ্রহণযোগ্য হবে।”(ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২২৩৩৯)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
حكم الربا : أنه محرم بالقرآن والسنة وإجماع المسلمين. ومرتبته : أنه من كبائر الذنوب ؛ لأن الله تعالى قال : (ومن عاد فأولئك أصحاب النار هم فيها خالدون) ، وقال تعالى : (فإن لم تفعلوا فأذنوا بحرب من الله ورسوله) ؛ ولأن الرسول صلى الله عليه وسلم ” لعن آكل الربا وموكله وشاهديه وكاتبه ” فهو من أعظم الكبائر. وهو مجمع على تحريمه ، ولهذا من أنكر تحريمه ممن عاش في بيئة مسلمة فإنه مرتد ؛ لأن هذا من المحرمات الظاهرة المجمع عليها.ولكن إذا قلنا هذا ، هل معناه أن العلماء أجمعوا على كل صورة ؟ الجواب : لا ، فقد وقع خلاف في بعض الصور ، وهذا مثل ما قلنا في أن الزكاة واجبة بالإجماع ، ومع ذلك ليس الإجماع على كل صورة ، فاختلفوا في الإبل والبقر العوامل ( التي تستخدم في الحرث والسقي ) ، واختلفوا في الحلي وما أشبه ذلك ، لكن في الجملة العلماء مجمعون على أن الربا حرام بل من كبائر الذنوب )
“রিবার (সুদ) বিধান: এর হুকুম হলো এটি কুরআন, সুন্নাহ এবং মুসলিমদের ঐকমত্য (ইজমা) দ্বারা হারাম।এর অপরাধের স্তর হলো এটি কবীরা গুনাহসমূহের (বড় গুনাহ) অন্তর্ভুক্ত। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:”…আর যে পুনরায় তা করবে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী থাকবে।” এবং তিনি (আল্লাহ) আরো বলেছেন:”যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে রাখো।”আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘সুদখোর, সুদদাতা, এর সাক্ষীদ্বয় এবং এর লেখক সবার ওপর লা‘নত (অভিসম্পাত) করেছেন।’ সুতরাং এটি সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহসমূহের অন্যতম।রিবার হারাম হওয়াতে সর্বসম্মত ঐকমত্য (ইজমা) রয়েছে। এ কারণেই যে ব্যক্তি মুসলিম পরিবেশে বসবাস করেও রিবার হারাম হওয়াকে অস্বীকার করে, সে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলে গণ্য হবে। কারণ এটি এমন প্রকাশ্য হারাম বিষয়গুলোর অন্যতম, যার ওপর উম্মাহর ইজমা রয়েছে।তবে আমরা যখন এ কথা বলি, এর অর্থ কি এই যে উলামারা রিবার প্রতিটি স্বতন্ত্র রূপ (ছবি) সম্পর্কে সর্বসম্মত? উত্তর হলো: না। কিছু কিছু রূপ নিয়ে মতভেদ হয়েছে। এটি সেই উদাহরণের মতো, যেখানে আমরা বলি যাকাত ওয়াজিব (ফরজ) হওয়াতে ইজমা রয়েছে, কিন্তু সব বিস্তারিত বিষয়ে ঐকমত্য নেই। যেমন: উলামারা হালচাষ ও পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত উট ও গরু (যাকে ‘আওয়ামিল’ বলা হয়) এবং গয়না (হুলী) ইত্যাদির ওপর যাকাত আছে কি না, সে বিষয়ে মতভেদ করেছেন। কিন্তু সার্বিকভাবে উলামারা সর্বসম্মত যে রিবা হারাম, বরং তা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।”(ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি, খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৩৮৭)
.
অতএব উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, যে ব্যক্তি রিবা (সুদ) হারাম—এই প্রতিষ্ঠিত বিধানকে অস্বীকার করবে, সে কুফরির মধ্যে পড়বে; কারণ রিবার নিষিদ্ধতা সম্পর্কে কোরআন ও সহীহ হাদিসে বহু স্পষ্ট, চূড়ান্ত দলিল রয়েছে এবং এ বিষয়ে উলামাদের সুপরিচিত ও অবিচল সর্বসম্মত ঐক্যমত্যও প্রতিষ্ঠিত।কিন্তু কেউ যদি রিবার এমন কোনো ধরন বা শাখার নিষিদ্ধতাকে অস্বীকার করে, যা নিয়ে উলামাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে অথবা যার হারাম হওয়া বিষয়ে স্পষ্ট ইজমা প্রমাণিত নয়—তাহলে তাকে কাফির গণ্য করা হবে না। বরং তার অবস্থার দিকে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা হবে:যদি সে ইজতিহাদকারী হয়, তবে তার ইজতিহাদের জন্য সে সওয়াব পেতে পারে;যদি সে অজ্ঞতার কারণে ভুল করে থাকে, তবে তা ক্ষমাযোগ্য হতে পারে;আর যদি সে নফসের খেয়াল-খুশির অনুসরণে এটিকে হালাল বলে মনে করে, তবে সে ফাসিক (পাপাচারী) হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আর আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি শান্তি ও বরকত বর্ষণ করুন। আমীন!!
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Wednesday, November 26, 2025

কেন এত ভূমিকম্প হয়? এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায়

 

কয়েকদিন পরপরই মৃদু কম্পনে সারা দেশ কম্পিত হয়ে উঠছে, এগুলো বড় একটা কম্পন আসার আগে সতর্ককারী কম্পন। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের সতর্ক করেন যাতে করে তারা অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে। চলুন দেখি কুরআন ও সহীহ হাদীস অনুযায়ী ভূমিকম্পের কারণ অনুসন্ধান এবং এ থেকে কিভাবে আমরা বাঁচতে পারি তার উপায় বের করি।

কেন এত ভূমিকম্প সংগঠিত হয়? এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় :

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং শান্তি বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের, তাঁর পরিবারের উপর, তাঁর সাহাবাদের উপর এবং তাদের উপর যারা তাদের অনুসরণ করেন।

মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, তাঁর ইচ্ছা এবং তিনি যা কিছু প্রেরণ করবেন সে সকল বিষয়ে তিনিই সবকিছু জানেন এবং তিনি সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সর্বাধিক অবহিত তাঁর আইন কানুন ও আদেশ সম্পর্কে। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাহদেরকে সতর্ক করার জন্য বিভিন্ন প্রকারের নিদর্শন সৃষ্টি করেন এবং বান্দাহর উপর প্রেরণ করেন যাতে করে তারা মহান আল্লাহ কর্তৃক তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন ও ভীত হয়। বান্দাহরা মহান আল্লাহর সাথে যা শিরক করে (অর্থাৎ, ইবাদত করার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে অংশিদারিত্ব করে) এবং তিনি যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি এই নিদর্শন সমূহ প্রেরণ করেন যাতে করে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে, তাদের বোধদয় হয় এবং তাদের রবের দিকেই একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করে।

মহান আল্লাহ বলেন:
আমি ভয় দেখানোর জন্যই (তাদের কাছে আযাবের) নিদর্শনসমূহ পাঠাই” ( সূরা ইসরা ১৭:৫৯)

অচিরেই আমি আমার (কুদরতের) নিদর্শনসমূহ দিগন্ত বলয়ে প্রদর্শন করবো এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও (তা আমি দেখিয়ে দিবো)যতোক্ষণ পর্যন্ত তাদের উপর এটা পরিস্কার হয়ে যায় যেএই (কুরআনই মূলত) সত্যএকথা কি যথেষ্ট নয় যেতোমার মালিক সবকিছু সম্পর্কে অবহিত?” (সূরা হা-মীম আস সিজদা : ৫৩)

বল: আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপরতোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আযাব পাঠাতে সক্ষমঅথবা তিনি তোমাদের দল-উপদলে বিভক্ত করে একদলকে আরেক দলের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতেও সম্পূর্ণরূপে সক্ষম।” (সূরা আল আনআম : ৬৫)

ইমাম-বুখারী তার সহীহ বর্ণনায় জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণনা করেন,

তিনি বলেন: যখন তোমদের উপর থেকে (আসমান থেকে) ” নাযিল হলো তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি”, অথবা যখন, “ অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আযাব পাঠাতে সক্ষম” নাযিল হলোতখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবললেন: আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সহীহ আল বুখারী৫/১৯৩)

(আবূল-শায়খ আল-ইস্পাহানি এই আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেন,

“বল: আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) ” যার ব্যাখ্যা হলো, তীব্র শব্দ, পাথর অথবা ঝড়ো হাওয়া; “অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আযাব পাঠাতে সক্ষম”, যার ব্যাখ্যা হলো, ভুমিকম্প এবং ভূমি ধ্বসের মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়া।)

নিঃসন্দেহে বর্তমানে যেসকল ভূমিকম্পগুলো ঘটছে তা মহান আল্লাহর প্রেরিত সতর্ককারী নিদর্শনগুলোর একটি যা দিয়ে তিনি তাঁর বান্দাহদের ভয় দেখিয়ে থাকেন। এই ভূমিকম্প এবং অন্যান্য সকল দূর্যোগগুলো সংগঠিত হওয়ার ফলে অনেক ক্ষতি হচ্ছে, অনেকে মারা যাচ্ছে এবং আহত হচ্ছে; এই দূর্যোগগুলো আসার কারণ হচ্ছে, শিরকী কার্যকলাপ(ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে মহান আল্লাহর অংশীদার বানানো) এবং মানুষের পাপ (মহান আল্লাহ যে কাজগুলো করতে নিষেধ করেছেন সে কাজগুলো করার কারণে)।

এক্ষেত্রে মহান আল্লাহ বলেন:

“(
হে মানুষ) যে বিপদ আপদই তোমাদের উপর আসুক না কেনতা হচ্ছে তোমাদের নিজেদের হাতের কামাইএবং (তা সত্ত্বেও) আল্লাহ তাআলা তোমাদের অনেক (অপরাধ এমনিই) ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আশ শূরা : ৩০)

যে কল্যাণই তুমি লাভ কর (না কেনমনে রেখো)তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসেআর যেটুকু অকল্যাণ তোমার উপর আসে তা আসে তোমার নিজের থেকে। (সূরা আন নিসা : ৭৯)

মহান আল্লাহ অতীত জাতীর উপর প্রেরিত আযাব সম্পর্কে বলেন:

“অতপর এদের সবাইকে আমি (তাদের) নিজ নিজ গুণাহের কারণে পাকড়াও করেছি, এদের কারো উপর প্রচন্ড ঝড় পাঠিয়েছি (প্রচন্ড পাথরের বৃষ্টি) {যেভাবে লূত জাতির উপর প্রেরণ করা হয়েছিল}, কাউকে মহাগর্জন এসে আঘান হেনেছে {যেভাবে শুআইব (আ) এর জাতীর উপর আঘাত হেনেছিল}, কাউকে আমি যমীনের নীচে গেড়ে দিয়েছি {যেভাবে কারুন জাতীদের উপর এসেছিল}, আবার কাউকে আমি (পানিতে) ডুবিয়ে দিয়েছি {নূহ জাতী ও ফেরাউন ও তার লোকদের কে যেভাবে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল}, (মূলত) আল্লাহ তাআলা এমন ছিলেন না যে তিনি এদের উপর যুলুম করেছেন, যুলুম তো বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর করেছে”। ( সূরা আল আনকাবূত : ৪০)

এখন মুসলামানদের এবং অন্যান্যদের খুবই আন্তরিকভাবে মহান আল্লাহর নিকট তওবা করা উচিত, আল্লাহর কর্তৃক নির্দিষ্ট একমাত্র দ্বীন ইসলামকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরা এবং আল্লাহ তাআলা যেসব শিরকী কার্যকলাপ ও পাপ কাজ করতে নিষেধ করেছেন (যেমন: নামায পরিত্যাগ না করা, যাকাত আদায় করা থেকে বিরত না হওয়া, সুদ-ঘুষ না খাওয়া, মদ পান না করা, ব্যাভিচার না করা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা না করা, গান ও বাদ্যযন্ত্র না শোনা, হারাম কাজ সমূহ ভঙ্গ না করা প্রভৃতি) তা থেকে বিরত থাকা। এটা হতে আসা করা যায়, তারা এই দুনিয়া ও পরবর্তীতে কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পাবে এবং আল্লাহ তাদের আযাব থেকে নিরাপদে রাখবেন এবং তাদের উপর রহমত বর্ষন করবেন।

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:
অথচ যদি সেই জনপদের মানুষগুলো (আল্লাহ তাআর উপর) ঈমান আনতো এবং (আল্লাহ তাআলাকে) ভয় করতোতাহলে আমি তাদের উপর আসমান-যমীনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতামকিন্তু (তা না করে) তারা (আমার নবীকেই) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলোসুতরাং তাদের কর্মকান্ডের জন্য আমি তাদের ভীষণভাবে পাকড়াও করলাম। (সূরা আল আরাফ : ৯৬)

এবং আল্লাহ আহলে কিতাবধারীদের সম্পর্কে বলেন:
যদি তারা তাওরাত ও ইনজিল (তথা তার বিধান) প্রতিষ্ঠা করতোআর যা তাদের উপর তাদের মালিকের কাছ থেকে এখন নাযিল করা হচ্ছে (কুরআন) তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতোতাহলে তারা অবশ্যই রিযিক পেতো তাদের মাথার উপরের (আসমান) থেকে ও তাদের পায়ের নীচের (যমীন) থেকে। (সূরা আল মায়িদা : ৬৬)

এবং আল্লাহ আরো বলেন:

”(এ) লোকালয়ের মানুষগুলো কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে (তারা মনে করে নিয়েছে)আমার আযাব (নিঝুম) রাতে তাদের কাছে আসবে নাযখন তারা (গভীর) ঘুমে (বিভোর হয়ে) থাকবে! অথবা জনপদের মানুষগুলো কি নির্ভয় হয়ে ধরে নিয়েছে যেআমার আযাব তাদের উপর মধ্য দিনে এসে পড়বে না- তখন তারা খেল-তামাশায় মত্ত থাকবে। কিংবা তারা কি আল্লাহ তাআলার কলা-কৌশল থেকেও নির্ভয় হয়ে গেছেঅথচ আল্লাহ তাআলার কলা-কৌশল থেকে ক্ষতিগ্রস্থ জাতি ছাড়া অন্য কেউই নিশ্চিত হতে পারে না।” (সূরা আল আরাফ :৯৭-৯৯)

আল-আল্লামা ইবনে আল-কাইউম (রহ) বলেন: “মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে উঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরনের ভূমিকম্প অনুষ্ঠিত হয়; এইটা মানুষগুলোকে ভীত করে, তারা মহান আল্লাহর নিকট তওবা করে, পাপ কর্ম করা ছেড়ে দেয়, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং তাদের কৃত পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়”। আগেকার যুগে যখন ভূমিকম্প হতো তখন সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকেরা বলতেন: “মহান আল্লাহ তোমাদেরকে সতর্ক করছেন”। মদীনায় যখন একবার ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) তার জনগনকে ভাষণে বললেন: “যদি আরো একবার ভূমিকম্প সংগঠিত হয় তাহলে আমি এখানে তোমাদের সাথে থাকবো না।”

সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকদের কাছে এরকম আরো অনেক ঘটনার বিবরণ রয়েছে।

যখন কোথাও ভূমিকম্প সংগঠিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষদের উচিত মহান আল্লাহর নিকট অতি দ্রুত তওবা করা, তাঁর নিকট নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা এবং মহান আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা যেভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূর্য গ্রহণ দেখলে বলতেন: “যদি তুমি এরকম কিছু দেখে থাক, তখন দ্রুততার সাথে মহান আল্লাহকে স্মরণ কর, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর।” (আল-বুখারী ২/৩০ এবং মুসলিম ২/৬২৮)

দরিদ্র ও মিসকিনদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা এবং তাদের দান করা উচিত, কারণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
দয়া প্রদর্শন করতোমার প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হবে ( ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত, ২/১৬৫)

যারা দয়া প্রদর্শন করে মহান দয়াশীল আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া দেখাবেন। পৃথিবীতে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করএবং স্বর্গে যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন।” ( আবু দাউদ কতৃক বর্ণিত ১৩/২৮৫আত-তিরমিযী ৬/৪৩)

যারা দয়া প্রদর্শন করবে না তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হবে না। (আল-বুখারী ৫/৭৫মুসলিম ৪/১৮০৯ কর্তৃক বর্ণিত)

বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ভূমিকম্প সংগঠিত হতো, উমর ইবনে আব্দুল আযিয (রহ) তার গভর্ণরদের দান করার কথা লিখে চিঠি লিখতেন।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা মানুষকে বিপর্যয়(আযাব) থেকে নিরাপদে রাখবে তাহলো, যারা ক্ষমতায় আছে (অর্থাৎ যারা দেশ পরিচালনা করছে) তাদের উচিত দ্রুততার সাথে সমাজে প্রচলিত অন্যায় থামিয়ে দেওয়া, তাদের শরিয়া আইন মেনে চলতে বাধ্য করা এবং সে অনুযায়ী চলা, ভাল কাজের আদেশ দেওয়া এবং খারাপ কাজ নিষেধ করা।

মহান আল্লাহ বলেন:

মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা হচ্ছে একে অপরের বন্ধু। এরা (মানুষদের) ন্যায় কাজের আদেশ দেয়অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখেতারা নামায প্রতিষ্ঠা করেযাকাত আদায় করে, (জীবনের সব কাজে) আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলে (বিধানের) অনুসরণ করেএরাই হচ্ছে সে সব মানুষযাদের উপর আল্লাহ তাআলা অচিরেই দয়া করবেনঅবশ্যই আল্লাহ তাআলা পরাক্রমশালীকুশলী।” (সূরা আত তওবা : ৭১)

আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন যে আল্লাহ তাআলার (দ্বীনে) সাহায্য করেঅবশ্যই আল্লাহ তাআলা শক্তিমান ও পরাক্রমশালী। আমি যদি এ (মুসলমান) -দের (আমার) যমীনে (রাজনৈতিক) প্রতিষ্ঠা দান করিতাহলে তারা (প্রথমে) নামায প্রতিষ্ঠা করবে, (দ্বিতীয়ত) যাকাত আদায় (এর ব্যবস্থা) করবেআর (নাগরিকদের) তারা সৎকাজের আদেশ দিবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবেতবে সক কাজেরই চূড়ান্ত পরিণতি একান্তভাবে আল্লাহ তাআলারই এখতিয়ারভূক্ত।” (সূরা আল হজ্জ : ৪০-৪১)

যে ব্যক্তি আল্লাত তাআলাকে ভয় করেআল্লাহ তাআলা তার জন্যে (সংকট থেকে বের হয়ে আসার) একটা পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন রিযিক দান করেন যার (উৎস) সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নেইযে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার উপর ভরসা করেতার জন্য আল্লাহ তাআলাই যথেষ্ট।” (সূরা আত তালাক্ব : ২-৩)

এই বিষয়ে এরকম আরো অনেক আয়াত রয়েছে।

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে দিবেআল্লাহ তাআলা তার প্রয়োজন পূরণ করে দিবেন।” (আল-বুখারী ৩/৯৮মুসলিম ৪/১৯৯৬)

এবং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

যে ব্যক্তিএই পৃথিবীতে একজন বিশ্বাসীর দুশ্চিন্তা দূর করে দিবেমহান আল্লাহ তাকে পুনরুত্থান দিবসের দূশ্চিন্তা থেকে নিরাপদে রাখবেন। যে ব্যক্তিকারো কাজকে সহজ করে দিবে(যে কঠিন কাজে নিয়োজিত)মহান আল্লাহ তার দুনিয়া ও পরকালের কাজকে সহজ করে দিবেন। যে ব্যক্তিএকজন মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে মহান আল্লাহ দুনিয়া ও পরকালে তার দোষ গোপন রাখবেন। মহান আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত একজনকে সাহায্য করতে থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার ভাইকে সাহায্য করতে থাকে।” (মুসলিম ৪/২০৭৪);

এই বিষয়ের উপর এরকম আরো অনেক হাদীস রয়েছে।

মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন সকল মুসলিমদের খারাপ অবস্থা থেকে ভাল অবস্থার দিকে উন্নীত করেন এবং তাদেরকে হিদায়াত করেন যেন তারা ইসলামকে ভালভাবে বুঝতে পারে ও দৃঢ়তার সাথে একে আকড়ে ধরে রাখে এবং তিনি যেন তাদের সকল পাপকে ক্ষমা করে দেন। আমরা মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন যারা মুসলামানদের ক্ষমতায় আছে(সরকার) তাদের সংগঠিত করেন, এবং তাদের মাধ্যমে সত্যকে সাপোর্ট আর মিথ্যাকে দূরীভূত করে দেন, এবং শরীয়া আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করার জন্য যেন তিনি তাদের সাহায্য করেন, এবং শয়তান যেন তাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত, প্ররোচিত ও প্রতারিত করতে না পারে তাথেকে মহান আল্লাহ তাদের রক্ষা করেন, কারণ মহান আল্লাহই একমাত্র সবকিছূ করার ক্ষমতা রাখেন।

মহান আল্লাহর রহমত এবং শান্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর পরিবারের এবং সাহাবাদের এবং কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তাদেরকে যারা অনুসরণ করবে তাদের উপর আপতিত হোক।

লিখেছেনঃ আবদ্ আল-আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বাজ (রহিমাহুল্লাহ)
(সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব)

মৃতব্যক্তি কি জীবিত ব্যক্তির যিয়ারত ও সালাম বুঝতে পারে?

 মৃতব্যক্তি কি জীবিত ব্যক্তির যিয়ারত ও সালাম বুঝতে পারে? না-কি বুঝে না? জবাব: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«ما من مسلم يمر بقبر أخيه كان يعرفه في الدنيا فَيُسَلم عليه، إلا رد الله عليه روحه، حتى يرد عليه السلام».

“যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তি দুনিয়াতে পরিচিত তার কোনো মৃত্যু ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে গমন করে এবং তাকে সালাম দিলে তখন তার সালামের উত্তর দেওয়ার জন্য আল্লাহ তার রূহকে ফেরত দেন।”[1] হাদীসের এ কথা দ্বারা প্রমাণিত যে,

মৃত ব্যক্তি তাকে চিনতে পারেন এবং তার সালামের উত্তর দেন।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, কবরবাসীকে যখন তারা সালাম দিবেন তখন তাদেরকে মুখাতিব তথা উপস্থিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করার শব্দ দ্বারা সালাম দিবেন। ফলে মুসলিম কবরবাসীকে সালামের সময় বলবে,

«السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ».

“তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, হে মুমিনদের গৃহে বসবাসকারী।”[2]
মুতাওয়াতির সূত্রে সালাফদের থেকে অসংখ্য আসার (বাণী) বর্ণিত আছে যে, মৃত ব্যক্তি জীবিত ব্যক্তির যিয়ারত বুঝতে পারেন এবং এতে সে খুশী হন।
কবর যিয়ারতকারী মুসলিমকে যিয়ারতকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তারা যদি কারো উপস্থিতি অনুধাবন করতে না পারে তবে যিয়ারতকারীকে যায়ির তথা যিয়ারতকারী বলা হতো না। কেননা যার যিয়ারতের জন্য যাওয়া হয় সে যদি যিয়ারতকারীকে না জানে তবে এ কথা বলা শুদ্ধ হবে না যে, সে তার যিয়ারত করেছে। যিয়ারতের এ ব্যাপারটি সব জাতির কাছে জ্ঞাত ব্যাপার। এমনিভাবে কবরবাসীকে সালাম দেওয়া। কেননা যাকে সালাম দেওয়া হয় সে যদি তা বুঝতে না পারে এবং সালাম প্রদানকারীকে না জানে তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে সালাম দেওয়াও অসম্ভব। সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির জানাযার পরে তার কবরের পাশে কিছুক্ষণ কারো অবস্থান করে থাকা সে পছন্দ করে ও ভালোবাসে।[3]
ফুটনোটঃ[1] ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসটি ইবন আব্দুল বার রহ. তার সনদে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, আল-ইসতিযকার, ১/১৮৫; আর-রূহ ফিল কালাম ‘আলা আরওয়াহিল আমওয়াতি ওয়াল আহইয়াই বিদ-দালায়িলি মিনাল কিতাব ওয়াস-সুন্নাহ, ইবনুল কাইয়্যিম রহ. পৃষ্ঠা ৫।
[2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৯।
[3] দেখুন সহীহ মুসলিমের হাদীস নং ১২১। এতে ‘আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মৃত্যুর পূর্বে তার সন্তানকে বলেছিলেন, “আমাকে যখন দাফন করবে তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে এবং দাফন সেরে একটি উট যবাই করে তার গোশত বণ্টন করতে যে সময় লাগে, ততক্ষণ আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে, যেনো তোমাদের উপস্থিতির কারণে আমি আতঙ্ক-মুক্ত অবস্থায় চিন্তা করতে পারি যে, আমার রবের দূতের (ফিরিশতার) কী জবাব দেবো।” -অনুবাদক

Translate