Monday, November 24, 2025

যখন কোন সালাফি আলেম কোন বিদআতী কথা বলবে অথবা ধর্মীয় কোন একটি মাসআলার ক্ষেত্রে বিদআতিদের পথে চলবে তাহলে কি তাকে বা তাদেরকে বিদআতিদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী কোনো সালাফি আলেম যদি কোনো দলিল যথাযথভাবে না বুঝার কারণে বা বিষয়টি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ইলম না থাকার কারণে অথবা ভুল তাবিলের (ব্যাখ্যার) ফলে কোনও বিদআতে লিপ্ত হয় তাহলে তাকে ‘বিদআতি’ বলা যাবে না বরং তার উক্ত কাজটাকে ’বিদআত’ বলতে হবে। সেই বিদআত অনুসরণ করা বৈধ নয়।তবে তার সামনে কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিল-প্রমাণ পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করে ভুল ধারণা দূর করার পরও যদি তিনি সেই বিদআতের উপর অটল থাকেন, গোঁড়ামি করেন কিংবা মানুষকে সে দিকে আহ্বান করতে থাকেন তাহলে তাকে সতর্ক করা এবং প্রয়োজনে বর্জন করা আবশ্যক। কারণ শরিয়তে বিদআত সৃষ্টি করা অত্যন্ত গুরুতর এবং ভয়াবহ অপরাধ। তবে এ বিষয়টি মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইতিহাসে বহু বিশিষ্ট আলেম ঈমানিয়াতসহ গুরুতর মাসআলায় ভুল করেছেন; সম্ভব যে তাদের কাছে হক্ক স্পষ্টভাবে পৌঁছায়নি বা প্রমাণ যথাযথভাবে পৌঁছায়নি। তাই শুধুমাত্র কোনো ভুল মত বা তাবিলের কারণে সালাফি মানহাজের পরিচিত কোনো আলেমকে ‘বিদআতী’ হিসেবে অভিহিত করা এবং তার অন্যান্য খেদমতকে অস্বীকার করা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতি নয়। এমন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে উম্মাহর কেউই বিদ’আত থেকে রক্ষা পেত না।

.
ড. আহমাদ ইবনু আব্দুল আজিজ হুলায়বী,শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বিদআতীদের উপর হুকুম আরোপের মূলনীতিসমূহ নিয়ে একটি বই লিখেছেন যার আরবি নাম হচ্ছে,”উসুলুল হুকমি আলাল মুবতাদিআহ” অতঃপর এই বইয়ের চতুর্থ মূলনীতি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন:الأصل الرابع عدم الحكم على من وقع في بدعة أنه من أهل الأهواء والبـدع، ولا معاداته بسببها، إلا إذا كانت البدعة مشتهرة مغلظة عند أهل العلم بالسنة অর্থাৎ “যে ব্যক্তি কোনো বিদআতে লিপ্ত হয়েছে, তাকে সরাসরি আহলে আহওয়া ও আহলে বিদআতের অন্তর্ভুক্ত বলে রায় দেওয়া উচিত নয়,তদ্রূপ,শুধুমাত্র সেই কারণে তার সাথে শত্রুতা করাও উচিত নয়, যতক্ষণ না সেই বিদআত এমন সুপরিচিত ও গুরুতর হয় যা আহলে সুন্নাহর আলেমদের কাছে স্পষ্টভাবে নিন্দিত ও স্বীকৃত।”(উসুলুল হুকমি আলাল মুবতাদিআহ” খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৮২)
.
অতঃপর তিনি ফাতওয়া উল্লেখ করেছেন, যেখানে হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:(البدعة التي يُعد بها الرجل من أهل الأهواء: ما اشتهر عند أهل العلم بالسنة مخالفتها للكتاب والسنة؛ كبدعة الخوارج والروافض والقدرية والمرجئة) “যে বিদআতের কারণে কোনো ব্যক্তিকে আহলুল আহওয়া (ভ্রান্ত মতের অনুসারী) হিসেবে গণ্য করা হয়, তা হলো এমন বিদআত যা আহলে সুন্নাহর আলেমদের কাছে কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিরোধী হিসেবে সুপরিচিত ও সুস্পষ্ট। যেমন খারেজী, রাফেযী, (শিয়া) ক্বাদরীয়া এবং মুরজিয়া সম্প্রদায়ের বিদআতসমূহ।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩৫; পৃষ্ঠা: ৪১৪)
.
কারণ এগুলো এমন ধরনের বিদআত যেগুলোর কারণে তাদের অনুসারীদের বক্তব্য এত গুরুতর হয়ে উঠেছিল যে তারা আহলে সুন্নাহর পরিসর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুরজিয়ারা তেমন কোনো মারাত্মক বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং তাদের বক্তব্যে ফকীহ ও এবাদতমূলক লোকদের বহু দল অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাদেরকে পূর্বে আহলে সুন্নাহ হিসেবেই গণ্য করা হতো। পরে যখন তারা তাদের কথায় অতিরিক্ত ও গুরুতর বক্তব্য যোগ করল, তখন তাদের অবস্থা কঠোর হয়ে গেল। এর সাথে তুলনা করলে যারা কবরে যাত্রা করে, কবরকে পূজার স্থান, মসজিদ বা উৎসবস্থল বানায় তারা তো এর চেয়েও বড় বিদআতের অধিকারী। কারণ, সাহাবী, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনদের যুগে এমন কোনো দল ছিল না যারা কবরে হজ্জ করত, কিংবা ইসলামে এমন কোনো কবর বা মাযার ছিল না যাকে হজ্জ বা যিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা হতো। এ ধরনের বিদআত পরে, তিন উত্তম যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পর দেখা দেয়। সাধারণ নীতি হলো, যত বেশি কোনো বিদআত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিরোধী, তত দেরিতে তা প্রকাশ পায় আর যে বিদআতগুলো বই ও সুন্নাহর তুলনায় কম বিরোধী, সেগুলোই আগে দেখা দেয় যেমন খারেজীদের বিদআত। অতএব, বিদআতের গুরুতরতা কেবল প্রাথমিক যুগের বিদআতগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং শিরকের বিদআতগুলো পরবর্তীতে দেখা দিয়েছে, যেগুলো আরও গুরুতর, কঠিন ও বিপদজনক। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
ان الذين يعدون من اهل البدع والاهواء هم من اتصف بما يلي:-
1:- انهم يجعلون ما ابتدعوه قولا يفارقون به جماعة المسلمين يوالون عليه ويعادون. 2:- انهم ينازعون فيما توافرت به السنة.
আহলে আহওয়া ও বিদআতের অন্তর্ভুক্ত তারা, যারা নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে..
(ক) তারা তাদের উদ্ভাবিত মতবাদকে এমন একটি বিশ্বাসে রূপ দেয়, যার মাধ্যমে তারা মুসলিম সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এর ওপর ভিত্তি করে তারা বন্ধুত্ব স্থাপন করে ও শত্রুতা পোষণ করে।
(খ) তারা সেই বিষয়গুলোতে বিতর্ক করে যা সুন্নাহ দ্বারা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে (যেমন মুতাওয়াতির হাদিস)”।(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৪৯; এবং খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪২৫)।
.
এইভাবেই আহলে সুন্নাহ ও আহলে বিদআতের পার্থক্য নির্ধারিত হয়। যারা কোনো বিদআতে পতিত হয়েছে কিন্তু যদি তারা তাদের উদ্ভাবিত বিষয়ে এমন কোনো মত না বানায় যার মাধ্যমে তারা মুসলিম সমাজ থেকে আলাদা হয়, বন্ধুত্ব ও শত্রুতা গড়ে তোলে, তাহলে সেটা কেবল একটি ভুলের ধরন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বিশ্বাসী বান্দাদের এমন ভুল ক্ষমা করে দেন।এ কারণেই পূর্বসূরী সালাফ ও ইমামদের অনেকেই কিছু বিষয়ে ইজতিহাদ করে এমন মত পোষণ করেছেন যা কিতাব ও সুন্নাহর বিপরীত ছিল। তবে তারা এমন ছিল না যে, নিজের মতকে সমর্থনকারীকে বন্ধুত্ব করত এবং ভিন্নমতাবলম্বীকে শত্রু ভাবত, মুসলিম সমাজে বিভাজন আনত, মতবিরোধীদের কাফের বা ফাসিক বলত, কিংবা তাদের সঙ্গে যুদ্ধকে বৈধ মনে করত।যারা এভাবে আচরণ করে, তারাই হলো প্রকৃত বিভাজনকারী ও বিদআতী সম্প্রদায়ের লোক। এছাড়াও মুসলিম ইমামরা একমত যে, যে ব্যক্তি এমন বিষয়ে বিরোধিতা করে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ জানা আলেমদের নিকট জরুরীভাবে জানা ও নিশ্চিত, তাকে বিদআতী গণ্য করা হবে। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফা‘আত (সুপারিশ), হাউয কাওসার, বড় পাপের লোকদের জাহান্নাম থেকে বের হওয়া এবং আল্লাহর সিফাত (গুণাবলী), তাকদীর, উচ্চতা ও দর্শন এর মতো বিষয়গুলোতে মুতাওয়াতির হাদীসসমূহে বিশ্বাস।এসব বিষয়গুলো আহলে সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে ঐক্যমত্যে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যারা এমন বিষয়ে মতবিরোধ করে যেগুলো এ পর্যায়ে পৌঁছেনি, যেমন একজন সাক্ষী ও শপথের ভিত্তিতে রায় প্রদান, কিসামাহ (রক্তপণ দাবির বিশেষ শপথপ্রথা), ক্বরআহ (লটারির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত) ইত্যাদি বিষয়ে এসব বিষয়ে মতবিরোধ বিদআতের পর্যায়ে পড়ে না।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;
প্রশ্নকারী: কোন ব্যক্তিকে বিদ’আতী নির্ধারণ করার মানদণ্ড কী?
শাইখ: তোমার প্রশ্নটা কী?
প্রশ্নকারী: আল্লাহ আপনার উপকার করুন, হে সম্মানিত শাইখ! আমার প্রশ্ন হচ্ছে কখন বা কীভাবে কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে বলা যাবে যে সে বিদ’আতী? অর্থাৎ, কাউকে চিহ্নিত করে বলা যে সে বিদ’আতী এর মূল মানদণ্ড কী?
শাইখ: যখন তার মানহাজ এমন হয় যে, সে কথা, কাজ ও অনুমোদনের দিক থেকে সুন্নাহর ব্যাপক অর্থে বিরোধিতা করে তখনই তাকে বিদ’আতী বলা হয়।কিন্তু যদি কেউ কোনো এক বা একাধিক বিদ’আতে জড়িয়ে পড়ে ইজতিহাদের মাধ্যমে, যদিও সে তাতে ভুল করেছে তাহলে তাকে বিদ’আতী বলা হবে না।না হলে কোনো মানুষই বিদ’আত থেকে রক্ষা পেত না।
প্রশ্নকারী: যখন সে কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধিতা করে, তখন কি?
শাইখ: না, আমি কুরআন কথাটি উল্লেখ করিনি, কারণ এটি তো স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। আমরা জানি কুরআন সুন্নাহ ছাড়া বোঝা যায় না। আর সুন্নাহ তিন প্রকার: কথা , কাজ ও অনুমোদন। এই তিন দিক থেকেই সুন্নাহর বিরোধিতা করে নিজের মতামত বা খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভর করে এবং সে সুন্নাহর প্রতি উদাসীন থাকে, বরং এটাকেই নিজের জীবনের পথ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সেই বিদ’আতী ব্যক্তি। কিন্তু কেউ যদি কোনো কারণে সুন্নাহর বিরোধিতা করে এবং তাতে কোনো বিদ’আতে পড়ে যায়, বরং কখনো সরাসরি হারামেও লিপ্ত হয় তবুও তাকে বিদ’আতী বলা হবে না, এবং সে এজন্য ফাসিকও হবে না, যদিও সে একটি হারাম কাজ করেছে।
প্রশ্নকারী: ভালো, হে শাইখ! আগের যুগের বিদ’আতীদের ব্যাপারে কী বলবেন? কীভাবে সালাফগণ তাদেরকে বিদ’আতী বলে অভিহিত করলেন? তারা কীভাবে জানলেন যে তারা বিদ’আতী?
শাইখ: কারণ তারা সালাফে সালিহীনের মানহাজের বিরোধিতা করেছিল।
প্রশ্নকারী: কিন্তু আমরা কীভাবে জানব কেউ খেয়াল-খুশির অনুসারী, নাকি শুধু ভুল করেছে?
শাইখ: আমরা তো জানি না এবং তুমি যদি বলো আমরা জানি না, তাহলে আমি তোমার সঙ্গে একমত। সত্যিই, আমরা জানি না। তাই আমরা বলি: আল্লাহই তাদের হিসাব নেবেন। তবে তারা বিদ’আতী কি না এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তারা বিদ’আতীই, কারণ তারা সালাফে সালিহীনের মানহাজের বিরোধিতা করেছে। আর আমি তোমাকে এমন একটি বিষয় শোনাবো, যা হয়তো তুমি আগে শোনোনি: অনেক আলেম দ্বীনকে ভাগ করেছেন মূলনীতি ও শাখাতে। তারপর তারা এই বিভাজনের ওপর আরেকটি ভিত্তি দাঁড় করিয়েছেন যে শাখা বিষয়ে ভুল করলে তা ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু মূলনীতিতে ভুল ক্ষমাযোগ্য নয়।কিন্তু বাস্তবে, এই বিভাজনের কোনো ভিত্তি নেই। কারণ: দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা যেমন শাখা বিষয়ে হতে পারে, তেমনি মূলনীতিতেও হয়। উভয় ক্ষেত্রেই কোনো পার্থক্য নেই যতক্ষণ না কেউ এমন কোনো বিষয়ে বিরোধিতা করে, যা কুরআন, সুন্নাহ বা সালাফে সালিহীনের সর্বসম্মত মতের বিরুদ্ধে যায়।
সে যদি তা জেনেশুনে করে তাহলে সে দোষী, তা মূলনীতি হোক বা শাখা উভয়ের ক্ষেত্রেই সমান।
প্রশ্নকারী: (যে বিরোধিতা করছে) সে তো জানে যে এটি (নসের) বিরোধী।
শাইখ: সে নস (দলীল) জানে, তারপরও সে তার বিরোধিতা করছে, এক্ষেত্রে সে যে গুনাহ করছে, সে গুনাহ ফুরু‘ (শাখা) হোক বা উসূল (মূলনীতি) হোক—কোনো পার্থক্য নেই। উভয় ক্ষেত্রেই একই রকম গুনাহ।
এর বিপরীত চিত্র হলো: কেউ ফুরু‘ বা উসূলের কোনো বিষয়ে নসের বিরোধিতা করল, কিন্তু সে ছিল একজন মুজতাহিদ—সত্যকে জানতে চেয়েছে, কিন্তু তার বিরোধিতার বিপরীত কোনো নস তার সামনে আসেনি, সে সেটি জানতে পারেনি। এমন ব্যক্তি নসের বিরোধিতা করলেও, যেহেতু সে তা জানত না—তার ওপর কোনো গুনাহ নেই।
প্রশ্নকারী: ঠিক আছে শাইখ, যদি নসটি উভয় দিক বা অর্থ বহন করে?
শাইখ: এপর্যন্ত বুঝতে পেরেছো তো?
প্রশ্নকারী: জি শাইখ বুঝতে পেরেছি।
শাইখ: আমি তোমার আগের প্রশ্নের উত্তর শেষ করতে চাই, তার আগে তুমি বিস্তারিত প্রশ্নে ঢুকে যাচ্ছ।
এখন, যেমন কিছু ব্যক্তি, দল কিংবা জামাআত আছে যারা কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফুস সালিহীনের পদ্ধতির বিরোধিতা করে। আমরা তাদের সম্পর্কে বলি যে তারা মুবতাদি‘ (বিদ‘আতকারী)—এখন তুমি জানলে মুবতাদি‘ কে? সে-ই মুবতাদি‘, যে সালাফদের পথের বিপরীত একটি পদ্ধতি নিজের জন্য গ্রহণ করে। এমন লোকদের ব্যাপারে—আমরা তো তাদের অন্তরের খবর জানি না, তাদের নিয়ত সম্পর্কে জানি না। আমরা জানি না তারা মুজতাহিদ ছিল, নাকি প্রকৃতপক্ষে আহলুল আহওয়া (বিভ্রান্ত মতের অনুসারী)। এটি ঠিক যেমন—কেউ কোনো মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কিসাস/হত্যার দণ্ড পেলেও, আল্লাহর কাছে সে হয়তো নির্দোষ। কিন্তু শরীয়াহর আইন প্রয়োগ হয় বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। তুমি জানো, আমরা বাহ্যিক চেহারা অনুযায়ী হুকুম দিই, আর অন্তরের বিষয় আল্লাহর হাতে।সুতরাং আমাদের কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ—তার অন্তর ভাল কি মন্দ নয়; বরং তার ব্যবহারিক মানহাজ সালাফের বিরোধী কি না। যদি বিরোধী হয়, তবে সে মুবতাদি‘। অবশ্যই, হতে পারে কোনো ব্যক্তি মুবতাদি‘ হলেও মুজতাহিদ—যেমন আমি উত্তরের শুরুতে ইঙ্গিত করেছিলাম। আর কেউ হয়তো কোনো হারাম কাজ করল, কিন্তু ছিল মুজতাহিদ—তবুও সে গুনাহগার নয়; বরং সে পুরস্কৃতই হয়।কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:“হাকিম যখন ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, তার জন্য দুই পুরস্কার; আর ভুল হলে এক পুরস্কার।” এখন, এই বিষয়ে বা অন্য কোনো বিষয়ে যদি তোমার আরও প্রশ্ন থাকে, করতে পারো। আমি আমার ব্যাখ্যা শেষ করেছি।আর এবারের পর আবু উবায়দাহকে আমরা কথা বলার সুযোগ দেবো, যখন সে তার কথাগুলো শেষ করবে—ঠিক আছে।
প্রশ্নকারী: আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন, শাইখ। যদি সেই নস, যেটি নিয়ে আহলুস সুন্নাহ ও মুবতাদি‘দের মধ্যে মতভেদ হয়—তার দুটি সম্ভাব্য অর্থ থাকে। এবং মুবতাদি‘ ওই দ্বিতীয় অর্থের ভিত্তিতে তার বিদ‘আতকে প্রমাণ করে এবং বলে—“এটাই আমার বুঝ।সুতরাং তুমি তোমার বুঝ নাও, আমি আমারটি নিই। আর এই বিষয়ে সালাফদের কোনো স্পষ্ট বক্তব্যও নেই।”তাহলে, হে শাইখ, এ ক্ষেত্রে মানদণ্ড কী?
শাইখ: যদি তুমি যা বলছো তা সত্যিই তাই হয়, তাহলে—তোমার তার ওপর কোনো আপত্তি নেই।
প্রশ্নকারী: অর্থাৎ সে মুবতাদি‘ নয়, শাইখ?
শাইখ: না, সে মুবতাদি‘ নয়—মুবতাদি‘ তখনই হয় যখন সে সালাফের মানহাজ জানে এবং তবুও তার বিরোধিতা করে।কিন্তু তুমি তোমার কথায় বলেছো—এই বিষয়ে সালাফদের কোনো বক্তব্য নেই। তাহলে তোমারও সালাফের কোনো দলীল নেই, তারও নেই। এখানে তোমার একটি বুঝ আছে, তারও একটি বুঝ আছে। তাহলে তোমরা দুজনই একই অবস্থায়। না সে মুবতাদি‘, না তুমি মুবতাদি‘।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আসে—সেটি হলো: সে (বা অন্য কেউ), তোমার কথা নয়—সে কি আহলুল ইলমের অন্তর্ভুক্ত? যদি সে আলিম হয়—তাহলে আগের উত্তরের মতোই হুকুম হবে। কিন্তু যদি সে আলিম না হয়—তাহলে তাকে বলা হবে আল্লাহর বাণী: “তোমরা যদি না জান তাহলে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর।”(সূরা নাহল: ৪৩) পরিষ্কার?
প্রশ্নকারী: জি পরিষ্কার।
শাইখ: শেষ?
প্রশ্নকারী: জ্বি শেষ।”(ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ক্যাসেট নং-৬১৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:যদি কোনো আলেম কোনো বিদআত বিষয়ে কথা বলেন, অথবা বিদআতিদের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট বিদআতে একমত হন, তাহলে কি তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবেন?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
السؤال ذو شقين :
إذا تكلم العالم ببدعة أو سلك مسلك المبتدعة في مسألة من المسائل فهل يعد منهم ؟
الجواب : لا . لا يعد منهم ، ولا يُنسب إليهم ، إذا وافقهم في مسألة من المسائل فإنه وافقهم في هذه المسالة ولا يصح أن يُنسب إليهم نسبة مطلقة .
مثال : من كان على مذهب الإمام أحمد ، لكنه أخذ في مسألة معينة بقول الإمام مالك ، فهل يُعد مالكياً ؟ لا .
وكذلك لو أن فقيهاً على مذهب أبي حنيفة لكنه أخذ في مسالة معينة بمذهب الشافعي هل نقول إنه شافعي ؟ لا .
فإذا رأينا عالماً معتبراً معروفاً بنصحه أخذ بشيءٍ مما ذهب إليه أهل البدع فلا يصح أن نقول هو منهم ، وعلى مذهبهم ، بل نقول : هؤلاء لما نرى لهم من النصيحة لكتاب الله وسنة رسول الله وعباد الله إذا أخطأوا في هذه المسألة فخطؤهم هذا صادرٌ عن اجتهاد والمجتهد من هذه الأمة إن أصاب فله أجران وإن أخطأ فله أجرٌ واحد .
ومن ردَّ جميع الحق لكلمة أخطأ فيها من قال بالحق فإنه ضال ، خصوصاً إذا كان هذا الخطأ الذي ظنه خطـأ ليس بخطأ . لأن بعض الناس إذا خالفه أحد قال هو على خطأ ، وخطَّأه أو ضلله أو ربما كفَّره والعياذ بالله ، وهذا مذهبٌ سيئٌ للغاية . هذا أيضاً ـ الذي يكفر الناس لأي سبب أو لأي معصية ـ إذا صدق هذا التعبير لأي معصية كانت صار مذهبه أشد من مذهب الخوارج ؛ لأن مذهب الخوارج أنهم يكفرون فاعل الكبيرة وليس أي معصية فإذا وجد الآن من يكفر المسلمين بأي معصية فإنه ضال مخالف للكتاب والسنة زائد على مذهب الخوارج الذين قاتلهم علي بن أبي طالب واختلف المسلمون في تكفيرهم فمنهم من كفرهم ومنهم من فسقهم وجعلهم من البغاة الظلمة . أوليس الله يقول : إن تجتنبوا كبائر ما تنهون عنه نكفر عنكم سيئاتكم وندخلكم مدخلاً كريماً . فالإنسان باجتنابه الكبائر يكفر عنه الصغائر إذا لم يُصر على الصغيرة أما إذا أصر فقد قال العلماء إن الإصرار على الصغيرة يجعلها كبيرة . فهذا القول لاشك أنه ضلال . ثم ليعلم هذا القائل ـ بتكفير المسلمين بالمعاصي ـ أن الرسول صلى الله عليه وسلم قال : ” من دعى أخاه بالكفر ـ يعني وليس كما قال ـ إلا رجع عليه ” وهذا الكلام قاله الرسول ، فإنه إن لم يكن كافراً في الدنيا صار كافراً عند الله .
প্রশ্নটি দুটি দিক থেকে বিবেচ্য: যদি কোনো আলেম কোনো বিদআত বিষয়ে কথা বলেন, অথবা কোনো বিষয়ে বিদআতিদের পথ অনুসরণ করেন তবে কি তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে?
উত্তর: না। তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে না, এবং তাদের সঙ্গে তার সম্পূর্ণ সম্পর্কও স্থাপন করা যাবে না। যদি তিনি কোনো একটি বিষয়ে তাদের সঙ্গে একমত হন, তবে তিনি সেই নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের সঙ্গে একমত হয়েছেন, কিন্তু এ কারণে তাকে সামগ্রিকভাবে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলা সঠিক নয়।
উদাহরণ: যে ব্যক্তি ইমাম আহমাদের মাযহাব অনুসরণ করেন, কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ইমাম মালিকের মত গ্রহণ করেন তাকে কি মালিকী বলা যাবে? না। তেমনি, যদি কোনো ফকীহ আবু হানিফার মাযহাব অনুসরণকারী হন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ইমাম শাফেয়ীর মত নেন তাহলে কি আমরা বলব, তিনি শাফেয়ী? না। তাই, যদি আমরা কোনো স্বীকৃত ও সম্মানিত আলেমকে দেখি যিনি কুরআন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ও বান্দাদের কল্যাণে আন্তরিক পরামর্শদাতা হিসেবে পরিচিত এবং তিনি কোনো বিষয়ে বিদআতিদের মতের সঙ্গে মিল রেখেছেন, তবে আমরা বলতে পারি না যে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত, বা তাদের মাযহাবে আছেন। বরং আমরা বলব, যেহেতু আমরা তার মধ্যে কুরআন, সুন্নাহ ও বান্দাদের প্রতি আন্তরিক পরামর্শের মানসিকতা দেখি তাই যদি তিনি ঐ বিষয়ে ভুল করেন, তবে তার এই ভুলটি ইজতিহাদের ফল। আর এই উম্মতের মুজতাহিদ যদি সঠিক হন, তবে তার জন্য দুইটি সওয়াব আর যদি ভুল করেন, তবে একটি সওয়াব। আর যে ব্যক্তি এমন লোকের সমস্ত সত্য কথাকেও প্রত্যাখ্যান করে, শুধুমাত্র এজন্য যে তিনি কোনো একটি বিষয়ে ভুল বলেছেন সে ব্যক্তি বিভ্রান্ত। বিশেষ করে তখন, যখন যেটাকে সে ভুল মনে করছে, আসলে সেটি ভুল নয়। কারণ, কিছু মানুষ আছে কেউ যদি তার মতের বিরোধিতা করে, সঙ্গে সঙ্গে বলে দেয়: সে ভুল করেছে, তাকে বিভ্রান্ত বলে, এমনকি কখনো তাকে কাফেরও বলে ফেলে নাউযুবিল্লাহ, এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট এক পন্থা। আর যারা সামান্য কারণেই মানুষকে কাফের বলে বসে যদি যে কোনো পাপের জন্যই এই অভিব্যক্তি সত্য হয় তবে তার মতবাদ খারেজিদের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ, খারেজিরা কেবল বড় পাপের কারণে কাউকে কাফের বলে কিন্তু এখন যদি কেউ কোনো ছোট পাপের কারণেও মুসলমানদের কাফের বলে বসে, তবে সে বিভ্রান্ত, কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী, এবং খারেজিদের পথের চেয়েও বেশি সীমালঙ্ঘনকারী। যাদের বিরুদ্ধে আলী ইবনু আবি তালিব (রাদিআল্লাহু আনহু) যুদ্ধ করেছিলেন। মুসলমানরা খারেজিদের ব্যাপারে মতভেদ করেছিলেন কেউ তাদের কাফের বলেছেন, আবার কেউ বলেছেন তারা ফাসিক ও অবিচারী বিদ্রোহী। আল্লাহ কি বলেননি:”তোমরা যদি সেসব কবীরা গুনাহ পরিহার কর, যা থেকে তোমাদের বারণ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাব সম্মানজনক প্রবেশস্থলে”(সুরা নিসা: ৩১)
অতএব, মানুষ যদি বড় পাপ থেকে বেঁচে থাকে, তবে তার ছোট পাপগুলো মাফ হয়ে যায় যতক্ষণ না সে ছোট পাপে অবিচল থাকে। কিন্তু যদি সে ছোট পাপে অবিচল থাকে, তখন আলেমরা বলেছেন, ছোট পাপে স্থির থাকা সেটিকেও বড় পাপে পরিণত করে। সুতরাং, মুসলমানদের কেবল পাপের কারণে কাফের ঘোষণা করা এতে কোনো সন্দেহ নেই, এটি স্পষ্ট বিভ্রান্তি।আর এই ব্যক্তির জেনে রাখা উচিত যে মুসলমানদের পাপের কারণে কাফের বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি তার ভাইকে কাফের বলে ডাকে অথচ বাস্তবে তা সত্য নয় তবে সেই কথা তার নিজের দিকেই ফিরে আসে। অর্থাৎ, যদি সে প্রকৃতপক্ষে কাফের না হয়, তাহলে এই কথা বলার কারণে বলনে ওয়ালা নিজেই আল্লাহর কাছে কাফের গণ্য হয়।”(ইবনু উসাইমিন; আল-লিক্বাউশ শাহরী লিক্বা নং-১৫)
.
পরিশেষে আল্লাহ আমাদেরকে এবং আপনাকে এমন কাজ করার তৌফিক দান করুন যা তিনি পছন্দ করেন এবং যাতে তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Saturday, November 15, 2025

কুরআন হিফয করার পর ভুলে যাওয়ার শাস্তি কী

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ভুলে যাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই তো কবি বলেন: “ইনসানকে ইনসান (ভুলকারী) নাম দেয়া হয়েছে যেহেতু সে ভুলে যায়। আর কলব (অন্তর) কে কলব (পরিবর্তনশীল) নাম দেয়া হয়েছে যেহেতু সে পরিবর্তিত হয়”। আর নিঃসন্দেহে কুরআন অধ্যয়ন করা, তেলাওয়াত করা ও মুখস্থ করা উত্তম নেকীর কাজ। কুরআন ভুলে যাওয়ার আশংকা রোধ করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত কুরআন পড়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ মুখস্থকৃত অংশ নিয়মিত পুনঃপাঠ করা ও বারবার তেলাওয়াত করা। অন্যদিকে কুরআন ভুলে যাওয়া গর্হিত কাজ। কারণ এতে আল্লাহর কিতাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ও এ কিতাবকে পরিহার করার আলামত পাওয়া যায়।তাছাড়া কুরআন ভুলে যাওয়ার আশঙ্কায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বারবার পাঠ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন,”যে ব্যক্তি অন্তরে কুরআন গেঁথে (মুখস্থ) রাখে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মালিকের ন্যায়, যে উট বেঁধে রাখে। যদি সে উট বেঁধে রাখে, তবেই উট তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, কিন্তু যদি সে বাঁধন খুলে দেয়, তবে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়”।(সহীহ বুখারী হা/৫০৩১; সহীহ মুসলিম হা/৭৮৯)। অন্যত্র তিনি বলেছেন,”যদি কেউ এভাবে বলে যে, আমি অমুক অমুক আয়াত ভুলে গিয়েছি, তাহলে তা তার জন্য খুবই খারাপ। বরং তাকে তো ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা কুরআনকে স্মরণ রাখ। কারণ কুরআন মানুষের হৃদয় থেকে পা বাঁধা পলায়নপর চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধিক পলায়নপর। ছাড়া পেলেই পালিয়ে যায়ে অর্থাৎ স্মরণ রাখার চেষ্টা না করলেই ভুলে যায়”।(সহীহ বুখারী, হা/৫০৩২; সহীহ মুসলিম, হা/৭৯০; মিশকাত, হা/২১৮৮)।

.
▪️কুরআন হিফয করার পর ভুলে যাওয়ার শাস্তি:
.
কুরআন ভুলে যাওয়ার হুকুম কি এ ব্যাপারে আলেমগণ মতানৈক্য করেছেন: কেউ বলেন: কুরআন ভুলে যাওয়া কবিরা গুনাহ। কোন কোন মতে এটি গুনাহর কাজ; তবে কবিরা গুনাহর পর্যায়ে পৌঁছবে না। আবার কারো কারো মতে এটি এমন একটি মুসিবত যা বান্দার অন্তর ও দ্বীনদারিকে আক্রান্ত করে। এর ফলে বান্দার কোন কোন আমলের উপর আল্লাহর শাস্তি নামতে পারে। যদিও এটি কবিরা গুনাহ নয় বা পাপ নয়;অনেকের মতে এ মাসয়ালায় এটি তৃতীয়টি সর্বাধিক অগ্রগণ্য অভিমত। তবে আমি এই বিষয়ে আহালুল আলেমগনের মতামত গুলো পর্যালোচনা করে যেটা বুঝতে পারলাম সেটা হল কুরআন হিফয করার পর ভুলে যাওয়া দুইটি অবস্থা হতে পারে যথা: (১).স্বভাবগত ভুলে যাওয়া– অর্থাৎ,মানুষের প্রকৃতিগত দুর্বলতা ও স্মৃতিশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে ভুলে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে বান্দার জন্য কোনো গুনাহ নেই, এবং এর জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না। (২).গাফলতির কারণে ভুলে যাওয়া–অর্থাৎ, কুরআনের প্রতি উদাসীনতা, অবহেলা, কিংবা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ফলে ভুলে যাওয়া।এটি এক ধরনের আত্মিক বিপর্যয় বা মুসিবত, যা বান্দার অন্তর ও ঈমানি শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে বান্দার কোন কোন আমলের উপর আল্লাহর শাস্তি নামতে পারে।আবুল ‘আলিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”আমরা কোন ব্যক্তির কুরআন শিক্ষার পর তা থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখার কারণে ভুলে যাওয়াকে বড় পাপ হিসাবে গণ্য করতাম”।ইবনু সীরীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”কেউ কুরআন ভুলে গেলে লোকেরা তাকে কঠিন ভাষায় ভৎর্সনা করত”।(ইবনু হাজার, ফাৎহুল বারী হা/৫০৩৮-এর আলোচনা)। তবে জেনে রাখা ভালো'”যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করে ভুলে যাবে সে ক্বিয়ামতের দিন অঙ্গহানী অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ (আবু দাঊদ হা/১৪৭৪; মিশকাত হা/২২০০; যঈফুল জামে‘ হা/৫১৩৬, ৫১৫৩)। এছাড়া ‘কুরআন বা কুরআনের কোন আয়াত ভুলে যাওয়া সবচেয়ে বড় গোনাহ‘ মর্মে বর্ণিত হাদীছটিও যঈফ”।(তিরমিযী, মিশকাত হা/৭২০, যঈফুল জামে‘ হা/৩৭০০)।অতএব আমরা বলব—একজন হাফেযে কুরআন,নারী হোক বা পুরুষ—তার জন্য কুরআন মুখস্থ করার পর এর তেলাওয়াতে গাফলতি করা বা নিয়মিত তেলাওয়াতের প্রতি উদাসীন থাকা মোটেই সমীচীন নয়। বরং একজন হাফেযের উচিত সওয়াবের আশায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তেলাওয়াত করা; যাতে তার মুখস্থ কুরআন অক্ষুণ্ণ থাকে, ভুলে না যায় এবং সে কুরআনের নির্দেশনা ও হুকুম-আহকাম দ্বারা নিজেকে উপকৃত করতে পারে।
.
▪️একনজরে কুরআন হিফয করার পর ভুলে যাওয়া সম্পর্কে সন্মানিত আলেমদের বক্তব্য নিম্নরূপ:
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন—فإن نسيان القرآن من الذنوب “নিশ্চয়ই কুরআন ভুলে যাওয়া হলো গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।”(মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া (১৩/৪২৩)
.
শাইখ যাকারিয়া আল-আনসারী আল-শাফেয়ি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:( ونسيانه كبيرة ) , وكذا نسيان شيء منه ؛ لخبر ( عُرضت عليَّ ذنوب أمتي فلم أر ذنبا أعظم من سورة من القرآن أو آية أوتيها رجل ثم نسيها ) ، وخبر ( من قرأ القرآن ثم نسيه لقي الله عز وجل يوم القيامة أجذم ) رواهما أبو داود ) “(কুরআন ভুলে যাওয়া) একটি কবিরা গুনাহ। এমনকি কুরআনের কিছু অংশ ভুলে যাওয়াও একই রকম। কারণ হাদীসে এসেছে—‘আমার উম্মতের গুনাহসমূহ আমাকে দেখানো হলো। আমি এমন কোনো গুনাহ দেখিনি যা এর চেয়ে বড়, যে ব্যক্তি কুরআনের একটি সূরা বা আয়াত মুখস্থ করেছিল, তারপর তা ভুলে গেছে।’ এবং অন্য হাদীসে এসেছে—‘যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে তারপর তা ভুলে যায়, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে কাটা হাতওয়ালা অবস্থায় উপস্থিত হবে।’এই দুই হাদীস আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।”(আসনাল মাত্বালিব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৪) আর-রামলী ‘নিহায়াতুল মুহতাজ’ গ্রন্থে এর ব্যাখ্যায় বলেন—قوله : ( ونسيانه كبيرة موضعه إذا كان نسيانه تهاوناً وتكاسل“তিনি বলেছেন, (কুরআন ভুলে যাওয়া কবিরা গুনাহ)—এর অর্থ হলো,যখন ভুলে যাওয়াটা হবে অবহেলা ও অলসতার কারণে।”(হাশিয়াতুর রামলী; আসনাল মাত্বালিব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৪) এই আলোচনা থেকে বুঝা যায় কুরআন ভুলে যাওয়া কবিরা গুনাহ নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক ধরনের পরীক্ষা বা শাস্তি। সাধারণত এমনটি তখনই ঘটে, যখন কেউ কুরআন তিলাওয়াত ও তার ওপর আমল করা থেকে গাফেল হয়ে যায়, এবং নিয়মিত পুনরাবৃত্তি করে মুখস্থ অংশকে সতেজ রাখে না। অথচ তাকে উভয় বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কুরআনের ওপর আমল করা এবং নিয়মিত পাঠ করা।যখন সে এসব অবহেলা করে, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে সেই মহান নেয়ামত থেকে বঞ্চিত করেন—এটাই এক প্রকার শাস্তি।তবে যদি কেউ দুর্বল স্মৃতিশক্তির কারণে ভুলে যায়, তাহলে তার ওপর কোনো গুনাহ নেই; বরং তার উচিত নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা এবং পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে মুখস্থ অংশকে দৃঢ় রাখা। কেননা এটাই কুরআন মুখস্থ রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
.
যারা বলেছেন যে এটি “মুসীবাহ” (বিপদ বা দুর্ভাগ্য): হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:وأخرج أبو عبيد من طريق الضحاك بن مزاحم موقوفاً قال : ” ما مِن أحد تعلم القرآن ثم نسيه إلا بذنب أحدثه ؛ لأن الله يقول : ( وما أصابكم من مصيبة فبما كسبت أيديكم ) ، ونسيان القرآن من أعظم المصائب “আবু উবাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) দাহহাক ইবনু মুযাহিম থেকে বর্ণনা করেছেন:“যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করেছে,তারপর তা ভুলে গেছে, সে কোনো না কোনো গুনাহ করেছে। কারণ আল্লাহ বলেন:”আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল।”(সূরা আশ-শূরা: ৩০) আর কুরআন ভুলে যাওয়া হলো সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি।”(ইবনু হাজার; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৮৬)
.
আবার যারা বলেছেন এটি এক ধরনের “শাস্তি” তাদের বক্তব্য উল্লেখ করে হাফিজ ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قال أبو العباس القرطبي – رحمه الله – :مَن جمع القرآن : فقد علت رتبته ، ومرتبته ، وشرف في نفسه ، وقومه شرفاً عظيماً ، وكيف لا يكون ذلك و ” من حفظ القرآن فكأنما أدرجت النبوة بين كتفيه ” [ قاله عبد الله بن عمرو بن العاص ، وانظر ” السلسلة الضعيفة ” ( 5118 ) ]، وقد صار ممن يقال فيه : ” هو مِن أهلِ الله تعالى وخاصته ” [ رواه ابن ماجه ( 215) وهو صحيح ] ، وإذا كان كذلك : فمِن المناسب تغليظ العقوبة على من أخلَّ بمزيته الدينية ، ومؤاخذته بما لا يؤاخذ به غيره ، كما قال تعالى : ( يا نساء النبي من يأتِ منكن بفاحشة مبينة يضاعف لها العذاب ضعفين ) ؛ لاسيما إذا كان ذلك الذنب مما يحط تلك المزية ويسقطها ؛ لترك معاهدة القرآن المؤدي به إلى الرجوع إلى الجهالة”আবুল আব্বাস আল-কুরতুবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:”যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করেছে, তার মর্যাদা ও অবস্থান উঁচু হয়েছে, এবং সে তার নিজের ও জাতির মাঝে মহান সম্মান অর্জন করেছে। আর কেনই বা এমনটা হবে না,যখন (হাদীসে) বলা হয়েছে,”যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করে, তার দুই কাঁধের মাঝে যেন নবুয়্যাত গুঁজে দেওয়া হয়েছে।”[এটি আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) বলেছেন, এবং ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি দুর্বল বলেছেন ‘আস-সিলসিলাতুদ-দ্বা’ঈফাহ’ হা/৫১১৬)] এবং সে এমন লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যাদের সম্পর্কে বলা হয়: ‘সে আল্লাহ তা’আলার আপনজন ও বিশেষ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।”(ইবনু মাজাহ হা/২১৫ সনদ সহীহ) কাজেই, যখন কুরআনে হাফিজ হওয়া এমন উচ্চ মর্যাদা,তখন যদি কেউ তা অবহেলা করে, তার বিরুদ্ধে শাস্তি কঠোর হওয়া যুক্তিযুক্ত, যেমন নবীদের স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন—“হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীলতা করলে,তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে।”(সূরা আহযাব: ৩০) বিশেষ করে যদি সেই পাপ এমন হয় যা ঐ বিশেষ মর্যাদাকে হ্রাস করে দেয় ও বিলুপ্ত করে ফেলে যেমন কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা, যা তাকে আবার অজ্ঞতার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।”(আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখীসে কিতাবে মুসলিম, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪১৯)
.
এ জন্য কুরআন হিফয করার পর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে ধরে রাখার। এ ব্যাপারে সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,فلا يليق بالحافظ له أن يغفل عن تلاوته ، ولا أن يفرط في تعاهده ، بل ينبغي أن يتخذ لنفسه منه ورداً يوميّاً يساعده على ضبطه ، ويحول دون نسيانه ؛ رجاء الأجر ، والاستفادة من أحكامه ، عقيدة ، وعملاً ، ولكن مَن حفظ شيئاً مِن القرآن ثم نسيه عن شغل ، أو غفلة : ليس بآثم ، وما ورد من الوعيد في نسيان ما قد حفظ : لم يصح عن النبي صلى الله عليه وسلم “অতএব,যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করে,তার উচিত নয় এর তেলাওয়াত থেকে বিমুখ হওয়া, বা এর প্রতি যত্ন নেওয়া থেকে অবহেলা করা। বরং, তার উচিত প্রতিদিন কুরআনের একটি নির্দিষ্ট অংশ (ওয়ার্দ) নির্ধারণ করে নেওয়া—যা তাকে মুখস্থ অংশ দৃঢ়ভাবে সংরক্ষণে সহায়তা করবে এবং ভুলে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।সে এটি করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও প্রতিদানের আশায়, এবং কুরআনের শিক্ষা ও বিধান থেকে আকীদা ও আমল উভয় দিক থেকেই উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্যে। আর কেউ যদি কুরআন মুখস্থ করার পর ব্যস্ততা ও উদাসীনতার কারণে ভুলে যায়, তাহলে সে গুনাহগার হবে না। কেননা কুরআন ভুলে যাওয়ার শাস্তি সম্পর্কে যে দলীল পেশ করা হয়, তা নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে ছহীহসূত্রে প্রমাণিত নয়”।(ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৪র্থ খণ্ড; পৃষ্ঠা: ৯৯)।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “আমরা ইলম অন্বেষণকারী ছাত্ররা দলিল-প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনেক আয়াত মুখস্থ করি। কিন্তু বছরের শেষে তার অনেক কিছুই ভুলে যাই। এতে কি আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত হব, যাদেরকে মুখস্থকৃত বিষয় ভুলে যাওয়ার কারণে শাস্তি দেওয়া হবে? জবাবে শাইখ বলেন:
نسيان القرآن له سببان :
الأول : ما تقتضيه الطبيعة .
والثاني : الإعراض عن القرآن ، وعدم المبالاة به .
فالأول : لا يأثم به الإنسان ، ولا يعاقب عليه ، فقد وقع من رسول الله صلى الله عليه وسلم حين صلى بالناس ، ونسي آية ، فلما انصرف ذكَّره بها أبيّ بن كعب ، فقال له النبي صلى الله عليه وسلم : ( هلا كنت ذكرتنيها ) ، وسمع رسول الله قارئاً يقرأ ، فقال : ( يرحم الله فلاناً فقد ذكرني آية كنت أنسيتها ) .
وهذا يدل على أن النسيان الذي يكون بمقتضى الطبيعة : ليس فيه لوم على الإنسان .أما ما سببه الإعراض ، وعدم المبالاة : فهذا قد يأثم به ، وبعض الناس يكيد له الشيطان ، ويوسوس له أن لا يحفظ القرآن لئلا ينساه ويقع في الإثم ! والله سبحانه وتعالى يقول : ( فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَانِ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفاً ) النساء/ 76 ، فليحفظ الإنسان القرآن ؛ لأنه خير ، وليؤمل عدم النسيان ، والله سبحانه عند ظن عبده به
“কুরআন ভুলে যাওয়ার দু’টি কারণ আছে: প্রথম: স্বভাবগত কারণ। দ্বিতীয়: কুরআন থেকে বিমুখ হওয়া এবং ভ্রুক্ষেপ না করা। প্রথম কারণে কোন গুনাহ হবে না এবং শাস্তি ধার্য হবে না। এমনকি এটি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল, রাসূল (ﷺ) যখন সালাতের ইমামতি করেছিলেন, তখন তিনি একটি আয়াত ভুলে গিয়েছিলেন। অতঃপর নামাজ শেষ করার পর উবাই ইবনু কা‘ব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে সেই আয়াতটির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তখন নবী ﷺ বললেন: “তুমি আমাকে তা স্মরণ করিয়ে দাওনি কেন?”(আবূ দাঊদ হা/৯০৭) আর একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক ক্বারীর তিলাওয়াত শুনলেন এবং বললেন: “আল্লাহ তাকে রহম করুন! আমাকে এমন আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছিল।”(সহীহ মুসলিম হা/১৭১১) এটা প্রমাণিত হয় যে, স্বভাবগত কারণে মানুষ ভুলে যেতে পারে এতে তিরস্কারের কিছু নেই। অপরদিকে কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ও ভ্রুক্ষেপ না করার কারণে গুনাহ হবে। কতিপয় মানুষকে শয়তান আয়ত্বাধীন করে নেয় এবং এভাবে কুমন্ত্রনা দেয় যে, কুরআন মুখস্থ করো না, তা ভুলে যাবে। এতে গুনাহ হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“অতএব তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধ করো;নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল।”(সূরা নিসা: ৭৬) সুতরাং,মানুষের উচিত কুরআন মুখস্থ করা, কারণ এটি সর্বতোভাবে কল্যাণকর। এবং তার উচিত এই আশা পোষণ করা যে, সে তা ভুলে যাবে না। নিশ্চয়ই, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর বান্দার তাঁর সম্পর্কে ধারণার উপরই আচরণ করেন।”(ইবনু উসাইমীন, কিতাবুল ইলম,পৃষ্ঠা: ৯৬–৯৭)
.
পরিশেষে আল্লাহ আমাদেরকে এবং আপনাকে এমন কাজ করার তৌফিক দান করুন যা তিনি পছন্দ করেন এবং যাতে তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরআন তিলাওয়াত করা বা কবরের পাশে কুরআন পড়ার শরয়ি হুকুম কী

 প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরআন তিলাওয়াত করা বা কবরের পাশে কুরআন পড়ার শরয়ি হুকুম কী? এ তিলাওয়াতের সওয়াব কি মৃতের কাছে পৌঁছে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের শহর-গ্রাম সর্বত্র মৃত ব্যক্তিদের জন্য যে ইবাদতগুলো চালু রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা এবং সেই তিলাওয়াতের সওয়াব তাদের উদ্দেশ্যে দান বা কবরে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এ ধরনের প্রথার পক্ষে স্পষ্ট কোনো ইসলামিক দলিল রয়েছে কি না, তা অনেক সময় যাচাই-বাছাই করা হয় না।জেনে রাখুন, ইসলামের অন্যতম মূলনীতি হলো—সকল ইবাদত কেবল তওফিফিয়ায় বা কুরআন ও সুন্নাহর প্রমাণের উপর নির্ভরশীল। একজন প্রকৃত ইমানদারের কর্তব্য হলো দলিলের অনুসরণ করা, নতুন উদ্ভাবন করা নয়। ইসলামে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কিংবা তার কবরের পাশে কুরআন তিলাওয়াত করলে সেই তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
.
▪️প্রথম মত: মৃতের পক্ষ থেকে সম্পাদিত সব নেক আমলের সওয়াব তার কাছে পৌঁছে যায়। এতে কুরআন তিলাওয়াত, রোযা, সালাত এবং অন্যান্য সকল ইবাদতই অন্তর্ভুক্ত।এটি হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের বিখ্যাত মত, আর শাফেয়ী মাযহাবের কিছু আলেমও এ মতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।এ মতের সমর্থনে তারা দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তার সহীহ বুখারীতে:بَاب مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ نَذْرٌ”মানত আদায় না করে কেউ যদি মারা যায়।” নামে অধ্যায় রচনা করে বলেন;وَأَمَرَ ابْنُ عُمَرَ امْرَأَةً جَعَلَتْ أُمُّهَا عَلَى نَفْسِهَا صَلاَةً بِقُبَاءٍ فَقَالَ صَلِّي عَنْهَا وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ نَحْوَهُ”ইবনু ‘উমার (রাঃ) এক মহিলাকে আদেশ করেছিলেন যার মা কুবার মসজিদে সালাত আদায় করবে বলে মানত করেছিল। তিনি তাকে বলেছিলেন, তার পক্ষ থেকে সালাত আদায় করতে। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-ও এরকম বর্ণনা করেছেন।”(সহীহ বুখারী অধ্যায়: ৮৩/৩০ হা/৬৬৯৮)
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ,গ্রন্থে এসেছে;اختلف العلماء في قراءة القرآن للميت وإهداء ثوابها له، فذهب الحنفية والحنابلة إلى جواز قراءة القرآن للميت وإهداء ثوابها له، قال ابن عابدين نقلا عن البدائع: ولا فرق بين أن يكون المجعول له ميتا أو حيا، والظاهر أنه لا فرق بين أن ينوي به عند الفعل للغير أو يفعله لنفسه ثم بعد ذلك يجعل ثوابه لغيره، وقال الإمام أحمد: الميت يصل إليه كل شيء من الخير، للنصوص الواردة فيه، ولأن الناس يجتمعون في كل مصر ويقرؤون يهدون لموتاهم من غير نكير فكان إجماعا، قاله البهوتي من الحنابلة.”মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তার সওয়াব তাকে উৎসর্গ করার বিষয়ে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের ফকীহগণ বলেন—মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তার সওয়াব তাকে ইহসান (উৎসর্গ) করা জায়েয ও গ্রহণযোগ্য। ইবনু ‘আবিদীন (রহিমাহুল্লাহ) আল-বাদায়েউস-সানায়ি‘ থেকে বর্ণনা করেছেন: “যার প্রতি সওয়াব পৌঁছানো উদ্দেশ্য, সে মৃত হোক বা জীবিত তাতে কোনো পার্থক্য নেই। বাহ্যিকভাবে দেখা যায়, কাজটি অন্যের জন্য নিয়ত করে করা বা প্রথমে নিজের জন্য করে পরে তার সওয়াব অন্যকে পৌঁছে দেওয়া — উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:“নেক আমলের সবকিছুই মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায়, কারণ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নস (প্রমাণ) বিদ্যমান। তাছাড়া, মানুষ প্রত্যেক শহরে তাদের মৃতদের জন্য একত্র হয়, কুরআন পাঠ করে এবং তাদের সওয়াব উৎসর্গ করে থাকে— অথচ কেউ এর বিরোধিতা করে না।সুতরাং এটি এক প্রকারের ঐকমত্য (ইজমা‘) বলে গণ্য হয়েছে।”এই বক্তব্যটি হাম্বলী আলেম আল-বুহূতি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দ্বারাও বর্ণিত হয়েছে।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ; খণ্ড: ৩৩; পৃষ্ঠা: ৬০)
.
আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী’ হানাফি (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:১০১৬ হি:মতান্তরে ১০১০ হি:] বলেন;وفي الهداية: مذهب أهل السنة والجماعة أن الإنسان له أن يجعل ثواب عمله لغيره: صلاة. أو صوماً، أو صدقة، أو غيرها. يعني قراءة قرآن، وأذكار، وأدعية”আল-হিদায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মাযহাব হলো—মানুষ তার নিজের আমলের সওয়াব অন্য কাউকে দান করতে পারে; তা সালাত (নামায) হোক, সাওম (রোযা) হোক, সাদাকা (দান) হোক কিংবা অন্য কোনো ইবাদত হোক—যেমন কুরআন তিলাওয়াত, যিকর ও দোআ ইত্যাদি।”(ফাতহু বাবিল ইনায়াহ বি শারহিন নিকায়াহ” খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৪০; এবং হাশিয়াতু ইবনে আবিদীন; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৯৫)।
.
প্রিয় পাঠক! যদিও এই মতের পক্ষে কিছু আলেম রয়েছেন, তবে দলিলের দিক থেকে এটি দূর্বল মত। কারণ এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোনো সুস্পষ্ট সহিহ বর্ণনা নেই। এছাড়াও, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহু, তাঁর স্ত্রী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং তাঁর তিন কন্যা, যারা তাঁর জীবদ্দশায় মারা গিয়েছিলেন, তিনি তাঁদেরকে উৎসর্গ করে কোরআন তেলাওয়াত, কোরবানি, রোজা বা সালাত ইত্যাদি কিছুই আদায় করেননি। একইভাবে, সাহাবায়ে কেরামদের কারও কাছ থেকেও এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায়নি।সুতরাং যদি এটি শরীয়তসম্মত হতো, তবে তাঁরা অবশ্যই এ কাজটি করতেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে যা বৈধ এবং যার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়, তা হলো: হজ্ব, ওমরাহ, ওয়াজিব রোজা, সাদকা (দান) এবং দোয়া।
.
▪️দ্বিতীয় মত: মৃত ব্যক্তির কাছে কোনো নেক আমলের সওয়াব পৌঁছায় না; কেবল সেই আমলগুলো ব্যতীত, যেগুলোর বিষয়ে শরিয়তের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বিদ্যমান। এটি শাফেয়ী, এবং মালেকি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত।bআর দলিলের আলোকে এটাই অধিকতর সঠিক এবং শক্তিশালী (রাজেহ) মত।কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা হামজা (রাদিয়াল্লাহু আনহু), তাঁর মহীয়সী স্ত্রী খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এবং তাঁর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করা তিন কন্যার কারও জন্যই তিনি (ﷺ) কুরআন তিলাওয়াত করেননি, কোরবানি দেননি, রোজা রাখেননি বা তাদের পক্ষ থেকে সালাত আদায় করেননি—এমন কোনো প্রমাণ সহিহ সূত্রে বর্ণিত নেই। সাহাবায়ে কেরামের কারও থেকেও এরকম কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় না।অতএব, যদি এ ধরনের আমল শরিয়তে বৈধ ও প্রমাণিত হতো, তবে নিশ্চয়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণ আমাদের আগে তা করতেন। তবে শরয়ি দলিল দ্বারা যা ব্যতিক্রম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে এবং যার সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে যায়, তা হলো—হজ্ব, ওমরাহ, ওয়াজিব রোজা, দান-সদকা ও তাদের জন্য দোয়া এবং তাদের ঋণ পরিশোধ করা ইত্যাদি।
.
এই মতের পক্ষে প্রমাণ হলো আল্লাহ তাআলার বাণী:وَ اَنۡ لَّیۡسَ لِلۡاِنۡسَانِ اِلَّا مَا سَعٰی “আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তা ছাড়া তার জন্য আর কিছুই নেই।”(সূরা আন-নাজম: ৩৯) এবং রাসূল (ﷺ)-বানী: প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যখন মানুষ মারা যায় তখন তার আমল স্থগিত হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় কিংবা নেক সন্তান যে তার তার জন্য দোয়া করে।”(সহিহ মুসলিম হা/১৬৩১)
.
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আল্লাহ্‌ তাআলা বান্দার মর্যাদা উন্নীত করেন। তখন বান্দা বলে, এই মর্যাদা আমি কিভাবে পেলাম? তখন আল্লাহ্‌ বলেন: তোমার জন্য তোমার সন্তানের দোয়ার কারণে।” (তাবারানীর ‘আদ-দোয়া’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা-৩৭৫), হাইছামী তাঁর ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ গ্রন্থে (১০/২৩৪) হাদিসটিকে ‘বায্‌যার’’এর বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বাইহাকী তাঁর ‘আস-সুনানুল কুবরা’ গ্রন্থে (৭/৭৮) হাদিসটি সংকলন করেছেন] ইমাম যাহাবী তাঁর ‘আল-মুহায্‌যাব’’গ্রন্থে (৫/২৬৫০) বলেন: হাদিসটির সনদ শক্তিশালী। হাইছামী বলেন: সনদের বর্ণনাকারীগণ সকলে সহিহ হাদিসের বর্ণনাকারী; শুধু আসেম বিন বাহদালা ব্যতীত। তিনি ‘হাসান’ হাদিসের রাবী।
.
হাফেজ ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) আল্লাহর বাণী: (وأن ليس للإنسان إلا ما سعى) অর্থ:”আর এই যে, মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে”(সূরা নাজম:৩৯) এর তাফসিরে তিনি বলেন: “ومن هذه الآية استنبط الشافعي ومن تبعه أن القراءة لا يصل إهداء ثوابها إلى الموتى ؛ لأنه ليس من عملهم ولا كسبهم ، ولهذا لم يندب إليه رسول الله صلى الله عليه وسلم أمته ولا حثهم عليه، ولا أرشدهم إليه بنص ولا إيماء ، ولم ينقل عن أحد من الصحابة رضي الله عنهم ، ولو كان خيراً لسبقونا إليه وباب القربات يقتصر فيه على النصوص ، ولا يتصرف فيه بأنواع الأقيسة والآراء ، فأما الدعاء والصدقة ، فذاك مجمع على وصولها ومنصوصٌ من الشارع عليها “এই আয়াত থেকে ইমাম আশ-শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর অনুসারীগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে পৌঁছানো বৈধ নয়; কারণ এটি মৃত ব্যক্তির নিজস্ব কর্ম বা অর্জন নয়। এই কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে এর জন্য উৎসাহিত করেননি; তাদেরকে এর প্রতি আহ্বান জানাননি; না কোনো স্পষ্ট বাণীতে, না কোনো ইঙ্গিতপূর্ণভাবে। এমনকি সাহাবিদের কারো পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে কিছুই বর্ণিত হয়নি।আর যদি এটি কল্যাণকর (সুন্নাত ও নেক কাজের) অন্তর্ভুক্ত হতো, তবে নিশ্চয়ই সাহাবাগণ আমাদের আগে তা করতেন।কারণ,‘নৈকট্য ও ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—এগুলো কেবল শরয়ি দলিলের উপর নির্ভরশীল; এখানে কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তি) বা ব্যক্তিগত মতামতের কোনো অবকাশ নেই। তবে দো‘আ ও সদকা (দান)-এর সওয়াব পৌঁছানো বিষয়ে উম্মতের মধ্যে সর্বসম্মতি (ইজমা‘) রয়েছে, এবং শরিয়ত প্রণেতা (রাসূলুল্লাহ ﷺ) এ বিষয়ে স্পষ্ট দলিল দ্বারা তা অনুমোদন করেছেন।”।”(তাফসিরে ইবনু কাসীর; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৫৮)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,طبعة دار إحياء التراث العربي، بيروت: “وأما قراءة القرآن: فالمشهور من مذهب الشافعي أنه لا يصل ثوابها إلى الميت “কুরআন তেলাওয়াতের বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাজহাবে প্রচলিত মত হলো, মৃত ব্যক্তির কাছে এর সওয়াব পৌঁছায় না।”(ইমাম নববী; শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৯০)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে মা-এর জন্য কুরআন তেলাওয়াত ও সাদকার সওয়াব জীবিত বা মৃত অবস্থায় দান করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন:
أما قراءة القرآن فقد اختلف العلماء في وصول ثوابها إلى الميت على قولين لأهل العلم ، والأرجح أنها لا تصل لعدم الدليل ؛ لأن الرسول صلى الله عليه وسلم لم يفعلها لأمواته من المسلمين كبناته اللاتي مُتْن في حياته عليه الصلاة والسلام ، ولم يفعلها الصحابة رضي الله عنهم وأرضاهم فيما علمنا ، فالأولى للمؤمن أن يترك ذلك ولا يقرأ للموتى ولا للأحياء ولا يصلي لهم ، وهكذا التطوع بالصوم عنهم ؛ لأن ذلك كله لا دليل عليه ، والأصل في العبادات التوقيف إلا ما ثبت عن الله سبحانه أو عن رسوله صلى الله عليه وسلم شرعيته . أما الصدقة فتنفع الحي والميت بإجماع المسلمين ، وهكذا الدعاء ينفع الحي والميت بإجماع المسلمين ، فالحي لا شك أنه ينتفع بالصدقة منه ومن غيره وينتفع بالدعاء ، فالذي يدعو لوالديه وهم أحياء ينتفعون بدعائه ، وهكذا الصدقة عنهم وهم أحياء تنفعهم ، وهكذا الحج عنهم إذا كانوا عاجزين لكبر أو مرض لا يرجى برؤه فإنه ينفعهم ذلك ، ولهذا ثبت عنه صلى الله عليه وسلم : أن امرأة قالت يا رسول الله إن فريضة الله في الحج أدركت أبي شيخا كبيرا لا يثبت على الراحلة أفأحج عنه ؟ قال: ” حجي عنه” وجاءه رجل آخر فقال : يا رسول الله إن أبي شيخ كبير لا يستطيع الحج ولا الظعن أفأحج عنه وأعتمر ؟ قال:” حج عن أبيك واعتمر” فهذا يدل على أن الحج عن الميت أو الحي العاجز لكبر سنه أو المرأة العاجزة لكبر سنها جائز ، فالصدقة والدعاء والحج عن الميت أو العمرة عنه، وكذلك عن العاجز كل هذا ينفعه عند جميع أهل العلم، وهكذا الصوم عن الميت إذا كان عليه صوم واجب سواء كان عن نذر أو كفارة أو عن صوم رمضان لعموم قوله صلى الله عليه وسلم : ” من مات وعليه صيام صام عنه وليه” متفق على صحته ، ولأحاديثٍ أخرى في المعنى ، لكن من تأخر في صوم رمضان بعذر شرعي كمرض أو سفر ثم مات قبل أن يتمكن من القضاء فلا قضاء عنه ولا إطعام ؛ لكونه معذورا اهـ .
“কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো নিয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে।তবে অধিকতর সঠিক মত হলো, তা পৌঁছায় না, কারণ এর কোনো দলিল নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত মুসলিম স্বজনদের জন্য (যেমন তাঁর কন্যাগণ যারা তাঁর জীবদ্দশায় মারা গিয়েছিলেন) এটি করেননি, এবং আমাদের জানামতে সাহাবায়ে কেরামও তা করেননি। তাই একজন মুমিনের জন্য উত্তম হলো, এ কাজ থেকে বিরত থাকা; মৃত বা জীবিত কারও জন্য কুরআন তেলাওয়াত করা কিংবা সালাত আদায় না করা। অনুরূপভাবে, তাদের পক্ষ থেকে নফল রোজা রাখাও প্রমাণিত নয়; কারণ এর কোনো শরয়ি দলিল নেই।ইবাদতের মূলনীতি হলো ‘তাওক্বীফ’ (যা আল্লাহ বা তাঁর রাসূল দ্বারা প্রমাণিত), শুধুমাত্র আল্লাহ বা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রমাণিত বিষয় ছাড়া। তবে সাদকা (দান) সর্বসম্মতভাবে জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্য উপকারী, তেমনি দোয়াও সর্বসম্মতভাবে জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্য উপকারী। জীবিত ব্যক্তি নিঃসন্দেহে তার নিজের বা অন্যের সাদকা এবং দোয়া দ্বারা উপকৃত হয়। যে ব্যক্তি তার জীবিত পিতামাতার জন্য দোয়া করে, তারা তার দোয়ায় উপকৃত হয়, এবং তাদের জন্য সাদকাও তাদের উপকার করে। অনুরূপভাবে, বার্ধক্য বা আরোগ্যহীন রোগের কারণে অক্ষম হলে তাদের পক্ষ থেকে হজ্ব করাও তাদের উপকার করে। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক মহিলা এসে বলেছিলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরযকৃত হজ্ব আমার বৃদ্ধ পিতার উপর এমন অবস্থায় এসেছে যে তিনি সওয়ারীর উপর স্থির থাকতে পারেন না। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ করতে পারি?’ তিনি বললেন: ‘তুমি তাঁর পক্ষ থেকে হজ্ব করো।’ অন্য একজন লোক এসে বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমার পিতা খুবই বৃদ্ধ, তিনি হজ্ব ও সওয়ারী বহন করতে পারেন না। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে হজ ও ওমরাহ করতে পারি?’ তিনি বললেন: ‘তোমার পিতার পক্ষ থেকে হজ্ব ও ওমরাহ করো।’এটি প্রমাণ করে যে, মৃত বা বার্ধক্যজনিত অক্ষম জীবিত পুরুষ বা নারীর পক্ষ থেকে হজ করা বৈধ। সুতরাং সাদকা, দো‘আ, মৃত বা অক্ষমের পক্ষ থেকে হজ্ব ও ওমরাহ এ সবই আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে তাদের উপকার করে।অনুরূপভাবে, যদি মৃত ব্যক্তির ওপর কোনো ওয়াজিব রোযা বাকি থাকে—তা মানত, কাফফারা বা রমজানের কাজা যাই হোক—তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাধারণ হাদীসের কারণে তার অভিভাবক তার পক্ষ থেকে রোযা রাখবে: “যে ব্যক্তি মারা গেল এবং তার ওপর রোযা বাকি ছিল, তার অভিভাবক যেন তার পক্ষ থেকে রোযা রাখে।(সহীহ মুত্তাফাক আলাইহ)।তবে যদি কেউ অসুস্থতা বা সফরের মতো শরয়ি ওজরের কারণে রমজানের রোযা বিলম্বিত করে এবং কাজা করার সুযোগ পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করে, তবে তার পক্ষ থেকে কাজা বা ফিদিয়া কিছুই দিতে হবে না, কারণ সে ওজরযুক্ত অবস্থায় মারা গেছে।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৪৬)
.
তবে হা, মৃত ব্যক্তির উপকারে আসে দান-সদকা, দো‘আ তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ কিংবা হজ্ব উমরাহ ইত্যাদি তা হোক উত্তরাধিকারী কিংবা পরের পক্ষ থেকে। নাইলুল মাআবির বি শারহি দালিলিত তালিব’ গ্রন্থে এসেছে-وكلَّ قربةٍ فَعَلَها مسلمٌ ، وجعَلَ ثوابَها لمسلمٍ ، حيٍّ أو ميّتٍ : حصَل له ثوابُها ، ولو جَهِلَ الجاعلُ من جعلَه لهُ ، كالدعاءِ إجماعاً ، والاستغفارِ”জীবিত বা মৃত মুসলমানের জন্য যদি কোন মুসলিম নেক কাজ করে এর সওয়াব উৎসর্গ করে মুসলিম সে সওয়াব পাবে। যদিও সে মুসলিম না জানে কে তার জন্য নেক কাজটি করল। এমন নেক কাজের মধ্যে রয়েছে- দুআ ও ইসতিগফার।”(নাইলুল মাআবির বি শারহি দালিলিত তালিব খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৩৭)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: একজন মানুষ কি তার মাল দান করে সেই দানের সওয়াব অন্য কারো সাথে ভাগ করতে পারে?
তিনি উত্তর দিলেন:يجوز أن يتصدق الشخص بالمال وينويها لأبيه وأمه وأخيه ، ومن شاء من المسلمين ، لأن الأجر كثير ، فالصدقة إذا كانت خالصة لله تعالى ومن كسب طيب تضاعف أضعافاً كثيرة ، كما قال اله تعالى : ( مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ ) البقرة/261. وكان النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يضحي بالشاة الواحدة عنه وعن أهل بيته “একজন মানুষ তার ধন-সম্পদ দিয়ে দান করতে পারে এবং তা উদ্দেশ্য করতে পারে তার বাবা-মা, ভাই এবং ইচ্ছেমতো মুসলিমদের জন্য। কারণ সওয়াব অনেক বেশি। দান যদি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তাআলার জন্য হয় এবং সৎভাবে অর্জিত অর্থ থেকে করা হয়, তাহলে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন,”যারা নিজেদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আর আল্লাহ সর্বব্যাপী প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ”।(সূরা বাকারা: ২৬১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ছাগল কুরবানি করতেন নিজের জন্য এবং নিজের পরিবারের জন্য।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৪৯)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الصدقة تقبل وتنفع ، عن الأب والأم وعن غيرهما ، فالصدقة فيها خير كثير عن الحي والميت
“পিতামাতার জন্য বা অপর কারো জন্য সদকা করলে কবুল হয় এবং উপকার দেয়। অতএব জীবিত মৃত উভয়ের জন্য সদকার মধ্যে বহু কল্যাণ রয়েছে। সমাপ্ত নুরুন (১৪/৩০৩) আলাদ দারব থেকে]
.
পরিশেষে আমরা আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন, আপনাকে বাবার ভালবাসার কারণে উত্তম প্রতিদান দেন এবং আপনার বাবাকে ক্ষমা করে দেন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)এর কিছু নাসীহাহ।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে অনশন ধর্মঘট

 অনশন বা উপবাস বলতে শাব্দিক ভাবে বোঝায়, কোনরূপ খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ না করা। তবে খাবারের অভাবের কারণে অভুক্ত থাকা অনশন নয়। বাংলা উইকিসোর্স-এ বলা হয়েছে, “সাধারণতঃ অনশন বলিতে মৃত্যুসংকল্পপূর্বক উপবাস বুঝায়।” রাজনীতির ভাষায়, অনশন ধর্মঘটকে নীরব প্রতিবাদ বা অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচী হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে বা কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন বা দাবী আদায়ের উদ্যেশ্যে দীর্ঘ সময় উপবাস করে থাকেন। এর উদ্দেশ্য হল, সরকার, নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তি বিশেষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং দাবি আদায়ের জন্য তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করা। তা হয় কখনো হয় ব্যক্তি পর্যায়ে, কখনো দল বা সংগঠনের পক্ষ থেকে। কখনো ব্যক্তির নিকট বিশেষ দাবী আদায়, (যেমন: বিয়ের দাবীতে অনশন), কখনো বিশেষ কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী আদায় (যেমন: জেল কর্তৃপক্ষ) আবার কখনো হয় রাষ্ট্রের নিকট দাবি উপস্থাপন। যখন এই অনশনকে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা বিশেষ দাবি পূরণের জন্য প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং তা আমৃত্যু (Hunger Strike to Death) করার হুমকি দেওয়া হয় তখন ইসলামে এর বিধান নিয়ে আলোচনা আসে।

❑ অনশন ধর্মঘটের ব্যাপারে ইসলামের বিধান:
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনশন করতে গিয়ে ইতিহাসে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে পানাহার করার সুযোগ থাকার পরেও বা পানাহারের সক্ষমতা থাকার পরেও কেউ যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে না খেয়ে থাকে (অনশন করে) এবং এর ফলে যদি তার মৃত্যু ঘটে তাহলে সে ‘আত্মহত্যা কারী’ বলে গণ্য হবে। অথবা এর কারণে যদি তার অঙ্গহানি বা শারীরিক ক্ষয়-ক্ষতি হয় তাহলেও সে গুনাহগার হবে। উভয়টির পরিণতি জাহান্নাম।
মোটকথা, স্বেচ্ছায় এমন কোনও কাজ করা যা নিজের ক্ষতির কারণ হয় কিংবা মৃত্যু ডেকে আনে তা হারাম বা নিষিদ্ধ। চাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হোক বা অন্য কোনও উদ্দেশ্যে হোক।
নিম্নে এর কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হল:
✪ ১. ইসলামে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ:
জীবন আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। তাই ইসলাম মানুষকে দেওয়া জীবনের সুরক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। সে কারণে ইচ্ছাকৃত ভাবে নিজের জীবনকে বিপন্ন করা বা মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
“আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। [সূরা নিসা: ২৯]
তিনি আরও বলেন:
وَأَنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ۛ وَأَحْسِنُوا ۛ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
“আর তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর তোমরা সৎকার্য করো। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্ম শীলদের ভালোবাসেন।” [সূরা বাকারা: ১৯৫]
আত্মহত্যার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এ ব্যাপারে মানবজাতিকে সতর্ক করে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِشَيْءٍ عُذِّبَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে ব্যক্তি কোনও কিছু দ্বারা আত্মহত্যা করবে কিয়ামতের দিন তাকে সেই জিনিস দিয়েই শাস্তি দেওয়া হবে।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১০৯]
✪ ২. ইসলামে এমন কোনও কাজ করা হারাম যা ক্ষতিকর:
এটি ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি যে, ইসলামে এমন কোনও কাজ করা হারাম যাতে নিজের বা অন্যের জন্য ক্ষতির কারণ হয়।
নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজের বা অন্যের কোনও ক্ষতি করা যাবে না। ”[ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৩৪১; মুয়াত্তা মালেক, হাদিস ১৪২৯]
সুতরাং যে কাজ করলে মৃত্যু সংঘঠিত হওয়ার অথবা কোনও প্রকার শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দীর্ঘমেয়াদী অনশনের ফলে শারীরিক নানা ধরণের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
❑ দীর্ঘ অনশনে শরীরের কী কী ক্ষতি হতে পারে?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ অনশনে বা স্বাভাবিক সময়ের বেশি না খেয়ে থাকলে শরীরে বিশাল ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
◆ ১. শরীরের নিজস্ব খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়া:
প্রথম দিকে শরীর শক্তি জোগানোর জন্য লিভার (যকৃৎ) থেকে জমা রাখা শর্করা (গ্লাইকোজেন) এবং চর্বি ব্যবহার করে।
এরপর যখন জমা থাকা চর্বিও শেষ হয়ে যায় তখন শরীর শক্তি পেতে শুরু করে মাংসপেশি (Muscle) ভাঙতে। এই মাংসপেশি ভাঙা থেকেই শরীর কোনোমতে কাজ চালানোর মতো খাবার জোগাড় করে।
◆ ২. মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া:
দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার কারণে রক্তে শর্করার (Sugar) পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে যায়।
মস্তিষ্ক মূলত শর্করা থেকে শক্তি নেয়। শর্করার অভাবে ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে এবং অনশন কারী অচৈতন্য (Unconscious) হয়ে যেতে পারেন।
◆ ৩. বিষাক্ত কিটোন তৈরি হওয়া:
মাংসপেশি ভাঙার সময় শরীরে কিটোন বডি নামে কিছু উপাদান তৈরি হয়। এগুলি শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বা বিষাক্ত।
কিছু কিটোন প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে গেলেও, বাকিটা শরীরের ভিতরেই থেকে যায়। এই অবস্থায় অনশন চালিয়ে গেলে কিডনি, যকৃৎ (Liver), হৃৎপিণ্ড (Heart) সহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
◆ ৪. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি:
কিটোন বডি এবং শর্করার অভাবের কারণে যেসব অঙ্গের বড় ক্ষতি হতে পারে:
কিডনি (বৃক্ক) ও যকৃৎ (Liver): কিটোন বডির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মস্তিষ্ক (Brain): শর্করার অভাবে এর স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
হৃৎপিণ্ড (Heart): রক্তচাপ অনিয়মিত হওয়ার কারণে হৃৎপিণ্ড এবং মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাত আসতে পারে।
◆ ৫. দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী ক্ষতি:
এই ক্ষতিগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানা প্রয়োজন। যদি পরীক্ষা করে দেখা যায় যে হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক বা কিডনির মতো অঙ্গগুলো একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে সেই ক্ষতি সাধারণত আর পূরণ করা যায় না। সেক্ষেত্রে অনশন কারীকে বাকি জীবন এই ক্ষতির মাত্রা জেনে-বুঝেই বিশেষ সতর্কতার সাথে কাটাতে হয়। [Anandabazar-এর অনলাইন পোর্টাল থেকে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত]
✪ ৩. এটি ভিন্ন সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ:
ইসলামের দৃষ্টিতে অনশনের মাধ্যমে নিজের জীবনের ধ্বংস ডেকে আনা, কোনও ভাবে আত্মহননের পথে বেছে নেওয়া বা নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দেওয়া━কারণ যাই হোক না কেন━বড় অপরাধ এবং কবিরা গুনাহ। এটি অমুসলিমদের বা পাশ্চাত্যের রাজনীতির অংশ। এমনকি তা হিন্দু ধর্মের একটি ধর্মীয় রীতি থেকে আসতে পারে। কেননা হিন্দুধর্মে পূজা-পার্বণের পূর্বে কিংবা কোনও ব্রত অর্জনের লক্ষ্যে আমৃত্যু অনশন করার বিধান রয়েছে। অনশন তিন রকম স্বল্পানশন, অর্ধাশন ও পূর্ণানশন।” [অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম]
❑ পানাহার না করার ফলে মৃত্যু: আলেমদের ফতোয়া
কেউ যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে পানাহার থেকে বিরত থাকার ফলে মৃত্যুমুখে পতিত হয় তাহলে ইসলামি পণ্ডিতদের মতে সে আত্মহত্যা কারী━যার পরিণতি জাহান্নাম। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।
১. ইমাম আবু বকর আর রাযী আল জাসসাস আল হানাফি রাহ.- বলেন,
” مَنْ امْتَنَعَ مِنْ الْمُبَاحِ حَتَّى مَاتَ كَانَ قَاتِلا نَفْسَهُ مُتْلِفًا لَهَا عِنْدَ جَمِيعِ أَهْلِ الْعِلْمِ… لَوْ امْتَنَعَ مِنْ أَكْلِ الْمُبَاحِ مِنْ الطَّعَامِ مَعَهُ حَتَّى مَاتَ كَانَ عَاصِيًا لِلَّهِ تَعَالَى
“যে ব্যক্তি মুবাহ (বৈধ ও অনুমোদিত) বস্তু গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে এবং এভাবে সে মারা যাবে, সে সকল আহলে ইলমের মতে সে আত্মহত্যাকারী ও নিজের জীবন বিনাশকারী হিসেবে পরিগণিত হবে… যদি সে তার কাছে থাকা মুবাহ খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে এবং মারা যায় তবে সে আল্লাহ তাআলার নাফরমান বলে গণ্য হবে।” [সূত্র: আহকামুল কুরআন (১/১৭৭]
২. ইমাম আল কারাফি আল মালিকি রাহ. বলেন,
” لَوْ مَنَعَ مِنْ نَفْسِهِ طَعَامَهَا وَشَرَابَهَا حَتَّى مَاتَ : فَإِنَّهُ آثِمٌ قَاتِلٌ لِنَفْسِهِ
“যদি কোনও ব্যক্তি তার আত্মার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং এর ফলে সে মারা যায়: তবে সে পাপী এবং নিজ আত্মার হত্যাকারী বলে গণ্য হবে।” [সূত্র: “আল-ফুরূক” (৪/১৮৩)]
৩. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন,
الأَكْلَ عِنْدَ الضَّرُورَةِ وَاجِبٌ . قَالَ مَسْرُوقٌ : مَنْ اُضْطُرَّ إلَى الْمَيْتَةِ ، فَلَمْ يَأْكُلْ ، فَمَاتَ دَخَلَ النَّارَ
“চরম প্রয়োজনের সময় খাদ্য গ্রহণ করা ওয়াজিব। মাসরুক রহ. বলেন: “যে ব্যক্তি মৃত জন্তু (যা সাধারণত হারাম) খেতে বাধ্য হল কিন্তু খেলো না এবং মারা গেল সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” [সূত্র: আল ফাতাওয়া আল কুবরা (১/৩৮৯)]
❑ আমরণ অনশন ধর্মঘট সম্পর্কে আধুনিক যুগের আলেমদের ফতওয়া:
আমরণ অনশন ধর্মঘট সম্পর্কে আধুনিক আলেমগণও উপরোক্ত দলিলের উপর নির্ভর করে ফতওয়া দিয়েছেন।
❖ শাইখ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.:
বিশ্ব বরেণ্য ইসলামি স্কলার, সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রা. কে প্রশ্ন করা হয়━
আমরা প্রায়শই শুনতে পাই যে, মানুষ দাবি আদায়ের জন্য আমরণ অনশন ধর্মঘট করছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এর বিধান কী?
উত্তরে তিনি বলেন,
هذا الإضراب ما له أصل، هذا إعانة للأعداء على مقاصدهم الخبيثة، هذا النظام ما له أصل، وإذا كان يفضي إلى ضرر عليه، أو قتل نفسه؛ فهو لا يجوز، هذا الذي نعتقده في هذا، هذا أخذوه من أعداء الله، هذا لا نعرف له أصلًا
“এই ধরনের অনশনের শরিয়তে কোনও ভিত্তি নেই। এটি বরং শত্রুদের মন্দ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাহায্য করার নামান্তর। এই পদ্ধতির কোনও ভিত্তি নাই।
যদি এই অনশন নিজের ক্ষতির কারণ হয় অথবা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয় তবে তা জায়েজ নেই। এই বিষয়ে আমাদের আকিদা এটাই। এই প্রথাটি আল্লাহর শত্রুদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ইসলামে আমরা এর কোনও ভিত্তি জানি না।”
২. আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন,
” حُكم من توفي وهو مضرب عن الطعام ، أَنَّه قاتل نفسه وفاعل ما نهى عنه الله تعالى ، فإن الله سبحانه وتعالى يقول: ( وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ) ، ومن المعلوم أن من امتنع عن الطعام والشراب لابدَّ أن يموت ، وعلى هذا فيكون قاتلاً لنفسه ، ولا يحلُّ لإنسان أن يُضرِبَ عن الطعام والشراب لمدة يموت فيها ، أما إذا أضرب عن ذلك لمدة لا يموت فيها ، وكان هذا السبب الوحيد لخلاص نفسه من الظلم ، أو لاسترداد حقه فإنَّه لا بأس به ، إذا كان في بلد يكون فيه هذا العملُ للتخلص من الظلم ، أو لحصول حقِّه ، فإنَّه لا بأس به ، أما أن يَصِلَ إلى حدِّ الموت : فهذا لا يجوز بكل حال ” .
“যে ব্যক্তি অনশন রত অবস্থায় মারা যায়, তার বিধান হল সে আত্মহত্যাকারী এবং সে এমন কাজ করেছে যা আল্লাহ তা’আলা নিষেধ করেছেন। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
‘আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ [সূর নিসা: ২৯]।
এটা জানা কথা যে, যে ব্যক্তি খাবার ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে সে অবশ্যই মারা যাবে। আর এর ভিত্তিতে সে নিজের আত্মহত্যাকারী হিসেবে গণ্য হবে। কোনও মানুষের জন্য এমন সময় পর্যন্ত অনশন করা বৈধ নয় যার ফলে তার মৃত্যু হবে। তবে যদি সে এমন সময় পর্যন্ত অনশন করে যে, এতে তার মৃত্যু হবে না এবং এটিই যদি তার উপর চলতে থাকা জুলুম থেকে মুক্তি পাওয়ার অথবা নিজের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার একমাত্র পথ হয় তাহলে এতে কোনও দোষ নেই—যদি সেই দেশে এটি জুলুম থেকে মুক্তি বা অধিকার আদায়ের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। কিন্তু মৃত্যুর পর্যায়ে পৌঁছানো: এটি কোনও অবস্থাতেই জায়েজ নয়।”[মাজমু’ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল আল উসাইমিন (২৫/৩৬৫)] এ ফতোয়ার আলোকে এটিও প্রতীয়মান হয় যে, যদি কেউ সাময়িকভাবে খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন এবং এর উদ্দেশ্য যদি হয় কোনও দাবি আদায়ের জন্য সহানুভূতি লাভ করা কিন্তু তাতে জীবন নাশ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থায়ী ক্ষতির কোনও আশঙ্কা না থাকে তবে তা জায়েজ। যেমন: ছেলে-মেয়েরা তাদের বিশেষ কোনও দাবি পূরণের জন্য সাময়িকভাবে খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকলে, বাবা-মার সহানুভূতি নিয়ে তাদের দাবী পূরণ হলে ইনশাআল্লাহ তাতে কোনও দোষ নেই। মূল পার্থক্যটা হল: জীবনের ক্ষতি বা মৃত্যুর হুমকি ছাড়া সাময়িক প্রতিবাদ এবং আমৃত্যু বা স্থায়ী ক্ষতির উদ্দেশ্যে অনশন-এই দুটির মধ্যে শরীয়তের বিধান ভিন্ন।
➧ মোটকথা, কোনভাবেই নিজেকে অনর্থক কষ্ট দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। তাই মুসলিমদের জন্য পাশ্চাত্যের এই সকল ফালতু ও ক্ষতিকর প্রতিবাদের পদ্ধতি বর্জন করা অপরিহার্য।
❑ অন্যায়ের প্রতিবাদের ক্ষেত্রে ইসলামি পদ্ধতি:
কেউ যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চায় তাহলে অবশ্যই শরিয়ত সম্মত পন্থায় যৌক্তিক উপায়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। আর ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়ের প্রতিবাদের মূলনীতি প্রতিধ্বনিত হয়েছে নিম্নোক্ত হাদিসটিতে:
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনও মন্দ কাজ দেখে, তাহলে সে যেন তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করে। যদি সে এতটা সামর্থ্য না রাখে তাহলে সে যেন মুখ দিয়ে বলে। যদি এটাও না পারে তাহলে যেন অন্তরে ঘৃণা করে। আর এটি হলো ইমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।” [সহিহ মুসলিম: ৪৯]
অবশ্য পাশ্চাত্যের আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্র যেমন হারাম তেমনি এর জন্য এই ধরনের হারাম কর্মসূচি (অনশন ধর্মঘট) ডাবল হারাম। এগুলো মূর্খদের মুর্খামি ছাড়া কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে সব ধরণের জাহেলি প্রথা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate