Tuesday, August 19, 2025

হাদিসে উল্লেখিত নজদ এর অর্থ

 হাদিসে উল্লেখিত ‘নজদ’ এর অর্থ: সঠিক ব্যাখ্যা জানুন এবং বিভ্রান্তি থেকে বাঁচুন।

প্রশ্ন: হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, “ফিতনা নজদ থেকে বের হবে অথবা দজ্জাল নজদের ভূমি থেকে বের হবে।” ‘নজদ’ শব্দের অর্থ কী? এই হাদিসের উদ্দেশ্য কী? নজদ কী? এবং (আরবের) নজদ কি অন্য কোনও হাদিসে উল্লেখ হয়েছে? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম আল্লাহর রসুল এবং তাঁর পরিবার ও সাহাবীদের ওপর। অতঃপর:
ইমাম বুখারি তাঁর সহীহ গ্রন্থে ‘কিতাবুল ফিতান’ অধ্যায়ে ইবনে উমর রা. এর হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন:
“الفتنة ها هنا، الفتنة ها هنا، من حيث يطلع قرن الشيطان، أو قال: قرن الشمس”
“ফিতনা এখান থেকে আসবে, ফিতনা এখান থেকে আসবে, যেখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হয়।” অথবা তিনি বললেন: “সূর্যের শিং উদিত হয়।” অন্য এক বর্ণনায় তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্ব দিকে মুখ করে বলতে শুনেছেন:
“ألا إن الفتنة ها هنا من حيث يطلع قرن الشيطان”
“ সাবধান! ফিতনা এখান থেকে আসবে, যেখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হয়।”
– আরেকটি বর্ণনায় তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (ইবনে উমর রা.) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
“اللهم بارك لنا في شامنا، اللهم بارك لنا في يمننا”
“ হে আল্লাহ! আমাদের শামে বরকত দিন, হে আল্লাহ! আমাদের ইয়েমেনে বরকত দিন।” লোকেরা বলল: “وفي نجدنا؟” “এবং আমাদের নজদে?” তিনি বললেন: “اللهم بارك لنا في شامنا، اللهم بارك لنا في يمننا” “হে আল্লাহ! আমাদের শামে বরকত দিন, হে আল্লাহ! আমাদের ইয়েমেনে বরকত দিন।” লোকেরা আবার বলল: “يا رسول الله، وفي نجدنا؟” “হে আল্লাহর রসুল! এবং আমাদের নজদে?”
বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা, তৃতীয়বার তিনি বললেন:
“هناك الزلازل، والفتن، وبها يطلع قرن الشيطان”
“ সেখানে ভূমিকম্প, ফিতনা এবং সেখান থেকেই শয়তানের শিং বের হবে।”
❑ ইমামদের ব্যাখ্যা:
◈ হাফিজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে বলেছেন:
«وقال الخطابي: نجد من جهة المشرق، ومن كان بالمدينة كان نجده بادية العراق، ونواحيها، وهي شرق أهل المدينة، وأصل النجد: ما ارتفع من الأرض وهي خلاف الغور، فإنه ما انخفض من الأرض، وتهامة كلها من الغور، ومكة من تهامة. انتهى.»
“ইমাম খাত্তাবি বলেন: নজদ পূর্ব দিক থেকে। যে মদিনায় ছিল, তার জন্য নজদ ছিল ইরাকের মরুভূমি এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, যা মদিনা বাসীর পূর্ব দিকে অবস্থিত। নজদের মূল অর্থ: যা ভূমি থেকে উঁচু আর এটি ‘গাওর’-এর বিপরীত, যা ভূমি থেকে নিচু। পুরো তিহামা গাওর-এর অন্তর্ভুক্ত এবং মক্কা তিহামার অন্তর্ভুক্ত।”
«وعرف بهذا وهاء ما قاله الداودي إن نجدًا من ناحية العراق، كأنه توهم أن نجدًا موضع مخصوص، وليس كذلك، بل كل شيء ارتفع بالنسبة إلى ما يليه يسمى نجدًا، والمنخفض غورًا. اهـ.»
“এর মাধ্যমে দাউদির কথা দুর্বল প্রমাণিত হয় যে, নজদ ইরাকের দিক থেকে। যেন তিনি ধারণা করেছিলেন যে, নজদ একটি নির্দিষ্ট স্থান। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। বরং যা কিছু তার পাশের স্থানের তুলনায় উঁচু তাকে নজদ বলা হয়। আর নিচু স্থানকে গাওর বলা হয়।”
সুনানের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, ফিতনা প্রাচ্য থেকে বেশি আসে এবং ইতিহাসও এর সাক্ষী।
◈ হাফিজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে আরও বলেছেন:
«وقال غيره ـ أي: غير الخطابي ـ كان أهل المشرق يومئذ أهل كفر، فأخبر صلى الله عليه وسلم أن الفتنة تكون من تلك الناحية، كما أخبر، وأول الفتن كان من قبل المشرق، فكان ذلك سببًا للفرقة بين المسلمين، وذلك ما يحبه الشيطان، ويفرح به، وكذلك البدع نشأت من تلك الجهة. اهـ.»
“অন্যরা (অর্থাৎ খাত্তাবি ছাড়া) বলেছেন: সেই সময়ে প্রাচ্যের অধিবাসীরা কাফের ছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবর দিয়েছিলেন যে, ফিতনা সেই দিক থেকে আসবে-যেমনটি তিনি খবর দিয়েছিলেন। আর প্রথম ফিতনা প্রাচ্য থেকেই এসেছিল এবং তা মুসলিমদের মধ্যে বিভেদের কারণ হয়েছিল। শয়তান এটিই পছন্দ করে এবং এতে আনন্দিত হয়। একইভাবে, বিদআতও সেই দিক থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল।”
◈ ইমাম নববী বলেছেন:
«والمراد بذلك اختصاص المشرق بمزيد من تسلط الشيطان، ومن الكفر، كما قال في حديث آخر: “رأس الكفر نحو المشرق”، وكان ذلك في عهده صلى الله عليه وسلم حين قال ذلك، ويكون حين يخرج الدجال من المشرق، وهو فيما بين ذلك منشأ الفتن العظيمة، ومثار لكفرة الترك الفاسقة العاتية الشديدة البأس. اهـ.»
“এর উদ্দেশ্য হল, প্রাচ্যের ওপর শয়তানের অধিক আধিপত্য এবং কুফর। যেমন তিনি অন্য হাদিসে বলেছেন: رأسُ الكفْرِ نحوَ المشرِقِ “কুফরের কেন্দ্র প্রাচ্য মুখী।” [বুখারি ও মুসলিম]। এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে যখন তিনি এ কথা বলেছিলেন এবং এটি ঘটবে যখন দাজ্জাল প্রাচ্য থেকে বের হবে। এর মধ্যবর্তী সময়েও এটি বড় বড় ফিতনার উৎস এবং বিদ্রোহী ও শক্তিশালী তুর্কি কাফেরদের উত্থান স্থল।”
◈ ইমাম কাসতাল্লানি বলেছেন:
«إنما أشار عليه الصلاة والسلام إلى المشرق؛ لأن أهله يومئذ أهل كفر، فأخبر أن الفتنة تكون من تلك الناحية، وكذا وقع، فكان وقعة الجمل، ووقعة صفين، ثم ظهور الخوارج في أرض نجد، والعراق، وما وراءها، وكان أصل ذلك كله وسببه قتل عثمان بن عفان -رضي الله عنه-، وهذا علم من أعلام نبوته صلى الله عليه وسلم، وشرف، وكرم.»
“তিনি অর্থাৎ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রাচ্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কারণ সেই সময়ে সেখানকার অধিবাসীরা কাফের ছিল। তাই তিনি জানিয়েছিলেন যে, ফিতনা সেই দিক থেকে আসবে। এবং তেমনই ঘটেছে। ওয়াকেয়ায়ে জামাল (উটের ঘটনা/উষ্ট্রের যুদ্ধ) ও সিফফিন যুদ্ধ, তারপর নজদ, ইরাক এবং তার বাইরের অঞ্চলে খারেজিদের আবির্ভাব। এই সবকিছুর মূল কারণ ছিল, উসমান ইবনে আফফান রা. এর হত্যা। এটি তাঁর নবুয়তের অন্যতম নিদর্শন, সম্মান ও মর্যাদা।” এই ইমামদের কথাকে সমর্থন করে যে, অধিকাংশ ফিতনা ও বিদআত প্রাচ্য থেকে এসেছে। যেমন: কাদিয়ানি, বাহাই, বাবিয়া, নুসাইরিয়া, দ্রজ, শিয়া-রাফেজি, মঙ্গলীয় ফিতনা, কারামিতা এবং অন্যান্য। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আছে:
“رأس الكفر نحو المشرق، والفخر، والخيلاء في أهل الخيل، والإبل، الفدادين أهل الوبر، والسكينة في أهل الغنم.”
“কুফরের কেন্দ্র প্রাচ্য মুখী। অহংকার ও দাম্ভিকতা ঘোড়া ও উটওয়ালাদের মধ্যে যারা রূঢ়ভাষী পশমওয়ালা লোক আর প্রশান্তি বকরীওয়ালাদের মধ্যে।”
◈ হাফিজ ইবনে হাজার তার ফাতহুল বারী গ্রন্থে ‘কিতাবুল বাদউল খালক (সৃষ্টির সূচনা) অধ্যায়ে বলেছেন:
«وفي ذلك إشارة إلى شدة كفر المجوس؛ لأن مملكة الفرس، ومن أطاعهم من العرب، كانت من جهة المشرق بالنسبة إلى المدينة، وكانوا في غاية القوة، والتكبر، والتجبر؛ حتى مزق ملكهم كتاب النبي صلى الله عليه وسلم، كما سيأتي في موضعه، واستمرت الفتن من قبل المشرق، كما سيأتي واضحًا في الفتن. اهـ.»
“এতে অগ্নি উপাসকদের কুফরের তীব্রতার ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ পারস্য সাম্রাজ্য এবং তাদের অনুগত আরবরা মদিনার দিক থেকে প্রাচ্যে ছিল। তারা চরম শক্তি, অহংকার ও জুলুমে লিপ্ত ছিল। এমনকি তাদের রাজা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছিল, যে বিষয়ে আলোচনা যথাস্থানে আসবে। এবং ফিতনা প্রাচ্য থেকেই অব্যাহত ছিল, যেমনটি ‘ফিতান’ অধ্যায়ে স্পষ্ট হবে।”
❑ সারসংক্ষেপ:
মোটকথা: ‘নজদ’ বলতে কোনও নির্দিষ্ট স্থানকে বোঝানো হয়নি। বরং ভূমির যে কোনও উঁচু অংশই ‘নজদ’। কিন্তু হাদিস অনুযায়ী, প্রাচ্য দিকটিই এই হাদিসগুলোতে উদ্দেশ্য। আর যারা এটিকে ইরাকের নজদের সাথে সম্পর্কিত করেছেন, তা সেখানকার ফিতনার আধিক্যের কারণে। ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিস এর প্রমাণ। তিনি বলেন:
«دعا نبي الله صلى الله عليه وسلم، فقال: اللهم بارك لنا في صاعنا، ومدنا، وبارك لنا في شامنا، ويمننا. فقال رجل من القوم: يا نبي الله، وعراقنا؟ قال: إن بها قرن الشيطان، وتهيج الفتن، وإن الجفاء بالمشرق. رواه الطبراني في الكبير، ورواته ثقات.»
“আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করলেন এবং বললেন: হে আল্লাহ! আমাদের সা’ ও মুদ্দ-এ বরকত দিন এবং আমাদের শামে ও ইয়েমেনে বরকত দিন। তখন লোকদের মধ্য থেকে একজন বলল: হে আল্লাহর নবী! এবং আমাদের ইরাকে?
তিনি বললেন: সেখানে শয়তানের শিং এবং ফিতনা তীব্র হয় আর কঠোরতা প্রাচ্যে।” [এটি তাবারানি তাঁর ‘আল কাবির’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।]
– মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে ফুযাইল ইবনে গাজওয়ানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, আমি সালিম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. কে বলতে শুনেছি:
«يا أهل العراق، ما أسألكم عن الصغيرة، وأركبكم للكبيرة! سمعت أبي، يقول: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: “إن الفتنة تجيء من ها هنا، وأومأ بيده نحو المشرق، من حيث يطلع قرن الشيطان”.»
“হে ইরাক বাসীরা! আমি তোমাদের ছোট বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করি না, আর তোমরা বড় বিষয় নিয়ে জড়িয়ে পড়ো!
আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন: আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “ফিতনা এখান থেকে আসবে,” এবং তিনি তাঁর হাত দিয়ে প্রাচ্যের দিকে ইশারা করলেন, “যেখান থেকে শয়তানের শিং উদিত হয়।”
এটি জেনে রাখা উচিত যে, এর অর্থ এই নয় যে, এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী বা জন্ম নেওয়া প্রত্যেককে নিন্দা করা হচ্ছে। কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তি এমন কথা বলবে না। কত বড় বড় জ্ঞানী, মুহাদ্দিস, ফকিহ এবং আবেদ এই অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন! তাঁদের মধ্যে আবু হানিফা, আহমদ, সুফিয়ান সাওরী এবং অন্যান্য অনেক মহান ব্যক্তি রয়েছেন। কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তার স্থানের মর্যাদা বা নিকৃষ্টতার ভিত্তিতে প্রশংসা বা নিন্দা করা হয় না। বরং তার কথা ও কাজের ভিত্তিতেই বিচার করা হয়। কত মানুষ আছে যারা মক্কা, মদিনা ও শামের মতো সম্মানিত স্থানে বসবাস করেও কোনও ফজিলত, জ্ঞান, এমনকি ইমানও রাখে না। আল্লাহু আলাম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [সোর্স: islamweb]
❑ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. এর ফতোয়া:
শইখের নিকট প্রশ্ন করা হয়, হাদিসে এসেছে, “হে আল্লাহ, আমাদের জন্য আমাদের শাম (সিরিয়া) ও ইয়েমেনে বরকত দিন” তারা বলল: “আর আমাদের নজদেও?” তিনি নীরব রইলেন। শয়তানের শিং কি সত্যিই নজদ থেকে বের হবে?
উত্তরে তিনি বলেন,
هذا صحيح، حديث صحيح اللهم بارك لنا في شامنا ويمننا قالوا: وفي نجدنا، فأعادها مرات، ثم قال: هناك قرن الشيطان يعني في الشرق، وأنه في نجد، وفي الشرق كله، ونجد بين الرسول ﷺ أن هناك مضر وربيعة عندهم من الشر والجفاء، قال: أصحاب الإبل.
بين -عليه الصلاة والسلام- أن قبائل العرب عندها من الجهل، وعندها من الشر ما عندها، إلا من هداه الله، وليس المقصود نجد فقط، المقصود به الشرق هاهنا من حيث يطلع قرن الشيطان، يعني من الشرق كله، شرق المدينة، وشرق الدنيا كلها، لأنه هناك وجد أصناف البدع، وأصناف الشرور، وظهرت الشيوعية، وظهر الفساد هناك في الشرق.
وكذلك يوجد في الجزيرة هذه من الشرور، وارتد كثير من العرب بعد موته ﷺ وشر في بني حنيفة، وبني أسد، وفي بني تميم، وادعى بعضهم النبوة، مسيلمة في بني حنيفة، وسجاح في بني تميم، وطليحة في بني أسد، وعماها شر كبير، ثم هداهم الله، ودخلوا في دين الله، ولكن الشر من جهة خراسان، ومن جهة ما وراء ذلك من جهة الصين، ومن جهة البلاد …. فيها شر كثير
“এটি সহিহ (বিশুদ্ধ) হাদিস। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন: “হে আল্লাহ, আমাদের জন্য আমাদের শাম (সিরিয়া) ও ইয়েমেনে বরকত দিন।” তখন সাহাবারা বললেন: “আর আমাদের নজদেও?” তিনি কয়েকবার এর পুনরাবৃত্তি করলেন, তারপর বললেন: “সেখানে শয়তানের শিং (বা দল) বের হবে।” অর্থাৎ পূর্ব দিক থেকে এবং তা নজদে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে বলেছেন যে, নজদে এবং সমগ্র পূর্ব দিকে শয়তানের শিং বের হবে। তিনি আরও বলেছেন যে মুদার ও রাবিয়া গোত্রের মধ্যে মন্দ ও কঠোরতা বিদ্যমান এবং তিনি তাদের “উট পালনকারী” বলে উল্লেখ করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও স্পষ্ট করেছেন যে, আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে অজ্ঞতা ও মন্দ বিদ্যমান। তবে আল্লাহ যাকে হেদায়েত দিয়েছেন সে ব্যতীত। এখানে কেবল নজদকে উদ্দেশ্য করা হয়নি বরং সমগ্র পূর্ব দিক থেকে শয়তানের শিং বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ মদিনার পূর্ব দিক এবং পৃথিবীর সমগ্র পূর্ব দিক। কারণ সেই পূর্ব দিকে বিভিন্ন ধরনের বিদআত ও মন্দ দেখা গেছে এবং সেখানে কমিউনিজম ও নানা বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে।
তেমনিভাবে, এই উপদ্বীপেও অনেক মন্দ বিদ্যমান ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মৃত্যুর পর অনেক আরব মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে গিয়েছিল। বনু হানিফা, বনু আসাদ এবং বনু তামিম গোত্রের মধ্যে মন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের কেউ কেউ নবুয়তের দাবি করেছিল, যেমন: বনু হানিফাতে মুসায়লামা, বনু তামিমে সাজাহ এবং বনু আসাদে তুলাইহা। এর ফলে বড় ধরনের মন্দ দেখা দিয়েছিল।
পরবর্তীতে আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করেন এবং তারা আল্লাহর দ্বীনে ফিরে আসে। তবে খোরাসান থেকে এবং এর বাইরে, যেমন চীন ও অন্যান্য দেশ থেকে অনেক মন্দ এসেছে, যেখানে অনেক মন্দ বিদ্যমান ছিল।”
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের অপরিহার্যতা

 জুমার খুতবা: ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের অপরিহার্যতা এবং তাদের অবাধ্যতার পরিণতি:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আলহামদুলিল্লাহ, আস-সালাতু ওয়াস-সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ, আম্মা বাদ:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য, যিনি আমাদেরকে সালাতুল জুমা আদায় করার পর খুতবার অনুবাদ ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনায় অংশ নেওয়ার তাওফিক দান করেছেন। এজন্য আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি আলহামদুলিল্লাহ। সম্মানিত খতিব সাহেব খুতবার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর দরুদ পেশ করার পর তাকওয়া সংক্রান্ত বেশ কিছু আয়াত উল্লেখ পূর্বক মুসলিম উম্মাহকে তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি অর্জনের নির্দেশ দেন। নিঃসন্দেহে তাকওয়া মুমিন জীবনের শ্রেষ্ঠ অলংকার। দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণ তাকওয়ার মাধ্যমেই লাভ করা যায়। এরপর সম্মানিত খতিব সাহেব জুমার খুতবায় আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে বেছে নেন, বিরুল ওয়ালিদাইন বা পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ। নিন্মে উক্ত খুতবার অনুবাদ ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো:
————————–
আল্লাহ তাআলা কুরআনে একাধিক স্থানে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এটি সন্তানের উপরে অপরিহার্য দায়িত্ব এবং পিতা-মাতার হক। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
“আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয় তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।” [সূরা বনি ইসরাইল: ২৩] পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এই আয়াতে মহান আল্লাহর হক আদায় তথা একমাত্র তাঁর ইবাদতের পরেই স্থান দেওয়া হয়েছে, পিতা-মাতার হক আদায় অর্থাৎ তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশকে।
– তিনি আরও বলেন,
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا
“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছি।” [সূরা আহকাফ: ১৫]
– তিনি আরও বলেছেন,
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا
“আর আমি মানুষকে তাদের পিতামাতার প্রতি সুন্দর আচরণের নির্দেশ দিয়েছি।” [সূরা আনকাবুত: ৮]
ইমাম তাবারী (রহ.) বলেছেন:
«أَيْ: وَصَّى اللَّهُ فِيهِمَا بِجَمِيعِ مَعَانِي الْحُسْنِ
‘অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা পিতামাতার সাথে সকল প্রকার সুন্দর আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।'” অর্থাৎ উত্তম আচরণ বলতে যা বুঝায় সবই এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন: সুন্দর ও নম্র কথা, ভালো পোশাক, আন্তরিক সেবা ইত্যাদি সবকিছু।”
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন,
سَأَلْتُ النَّبِيَّ ﷺ أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ قَالَ: الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا قُلْتُ ثُمَّ أَيٌّ قَالَ: بِرُّ الْوَالِدَيْنِ قُلْتُ ثُمَّ أَيٌّ قَالَ: الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম,
– আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?
তিনি বললেন, যথাসময়ে নামাজ আদায় করা।
– আমি বললাম, এরপর কোনটি?
তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা।
– আমি বললাম, এরপর কোনটি?
তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা।”
[সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম]
একজন সাহাবি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
أحيّ والداك؟ قال: نعم. قال: ففيهما فجاهد
“তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন?
তিনি বললেন: হ্যাঁ।
তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তবে তোমার জিহাদ তাদের সেবায় করো।”
[সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, পিতা-মাতার সেবা অনেক সময় জিহাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ আমল হতে পারে।
✪ পিতামাতার সাথে নম্র আচরণ এবং তাদের জন্য দুআর নির্দেশ:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
”তুমি দয়া থেকে তাদের প্রতি নম্রতার ডানা বিস্তার কর এবং বল, হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি রহম কর যেমন তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছেন।” [সূরা বনী ইসরাইল: ২৪]।
✪ পিতামাতার অবাধ্যতা: কবিরা গুনাহ:
– নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَلا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ: الْإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ
“আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহর কথা জানাব? সাহাবিগণ বললেন: হ্যাঁ।
তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শিরক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা।” [সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম]।
– আরেক হাদিসে এসেছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
رِضَا اللَّهِ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ اللَّهِ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
“আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত আছে পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত আছে পিতার অসন্তুষ্টিতে।”[সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯ সহিহ]
তাই আমাদের উচিত, পিতা-মাতার সাথে নম্রতা পূর্ণ কথা বলা, তাদের পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনা, তাদের প্রয়োজন মেটানো, তাদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করা এবং যথাসাধ্য তাদের সেবা করা।
✪ পিতামাতার অবাধ্য সন্তানের ফরজ বা নফল কোনও ইবাদত কবুল হবে না:
আবু দারদা রা.থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«ثَلاثَةٌ لا يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُمْ صَرْفًا وَلا عَدْلًا: عَاقٌّ، وَمَنَّانٌ، وَمُكَذِّبٌ بِالْقَدَرِ»
“তিন শ্রেণীর লোকের ফরজ বা নফল কোন ইবাদতই আল্লাহ কবুল করবেন না:
১. অবাধ্য সন্তান,
২. দান করে খোটা দানকারী (উপকারের কথা জাহির কারী),
৩. তাকদির (ভাগ্য) অস্বীকারকারী।
[তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০; আহমদ৬/৪৪২; সহিহুল জামে: ৩০৭৭]
❑ পিতা-মাতার আনুগত্যের জন্য তিনটি শর্ত:
নিম্নোক্ত তিনটি শর্ত সাপেক্ষে পিতামাতার আনুগত্য করা ফরজ:
❖ ১. সাধ্যের অতিরিক্ত না হওয়া:
যদি পিতা-মাতা এমন কোনও আদেশ বা নিষেধ করেন যা সন্তানের সাধ্যের বাইরে বা পালন করা অসম্ভব তাহলে তা মানা আবশ্যক নয়।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
❖ ২. শিরক, বিদআত বা নাফরমানিমূলক কাজ না হওয়া:
যদি তারা আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে, শিরক, বিদআত বা অন্য কোনও নাফরমানিমূলক (পাপ কাজ) কাজের আদেশ বা নিষেধ করেন তাহলে সেটা মানা যাবে না। বরং আল্লাহ তার রসুলের নির্দেশই এখানে প্রাধান্য পাবে।
– আল্লাহ তাআলা সূরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন:
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِۦ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۖ وَصَاحِبْهُمَا فِى الدُّنْيَا مَعْرُوفًا
“আর যদি তারা (পিতামাতা) তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে বাধ্য করে-যে বিষয়ে তোমার কোনও জ্ঞান নেই-তবে তুমি তাদের আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস করো।”
– নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ”
“স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনও সৃষ্টির আনুগত্য নেই।”
[মুসনাদে আহমদ, হা/ ১০৯৫; সহীহ আল জামি, হা/ ৭৫২০]
❖ ৩. সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকা:
পিতা-মাতা যদি এমন কোনও কাজে আদেশ বা নিষেধ করেন যা পালন করতে গেলে সন্তানের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বা দ্বীনি ক্ষতির সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত আশঙ্কা থাকে তাহলে সেই আদেশ মান্য করা আবশ্যক নয়।
হাদিসে এসেছে,
قضَى أن لا ضررَ ولا ضِرارَ
“রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মর্মে ফয়সালা দিয়েছেন যে, অনিচ্ছা বশতঃ বা ইচ্ছাকৃত ভাবে কারও ক্ষতি সাধন করা যাবে না।”
সহিহ ইবনে মাজাহ, হা/১৯০৯]
◯ পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করলে দুনিয়ায় দুটি বড় উপকার লাভ হয়:
১. রিজিকে বরকত।
২. হায়াতে বরকত।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَن أَحَبَّ أَن يُبسَطَ لَهُ فِي رِزقِهِ، وَأَن يُنسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَليَصِلْ رَحِمَهُ
“যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিকে প্রাচুর্য আসুক এবং তার আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন তার নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।” [সহীহ বুখারি, হাদিস নং ২০৬৭] আর নিকটাত্ময়ীদের মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হল, পিতামাতা।
❑ মৃত পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের করণীয়:
যাদের পিতা-মাতা ইন্তেকাল করেছেন, তাদের জন্য দুআ করা, দান-সদকা করা, হজ-ওমরা করা, তাদের বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা, তাদের বৈধ ওসিয়ত পূরণ করা এসবই সন্তানের করণীয়।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে পিতা-মাতার অনুগত সন্তান হিসেবে কবুল করুন, তাদের প্রতি দয়া করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তাদেরকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
[জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন (সৌদি আরব) সংলগ্ন জামে আবু বকর সিদ্দিক রা. মসজিদে ১৫-৮-২০২৫ তারিখে প্রদত্ত জুমার খুতবার অনুবাদ ও বিশ্লেষণ]
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

জমজমের পানি কি বিক্রি করা জায়েজ

 প্রশ্ন: আমি এক ব্যক্তির কাছে শুনেছি যে, জমজমের পানি বিক্রি করা জায়েজ নয়, এটা কি সঠিক? একজন ব্যক্তি কি হারাম থেকে জমজমের পানি এনে নিজ দেশে বা অন্য দেশে বিক্রি করতে পারবে? এর প্রমাণ কী?

উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতপর জমজমের পানি বিক্রির বিধান: মূলনীতি হলো, পানি যতক্ষণ তার উৎস বা প্রবাহে থাকে ততক্ষণ তা বিক্রি করা জায়েজ নয়। কিন্তু যখন কেউ কোনো পাত্রে পানি সংগ্রহ করে নেয় তখন তা বিক্রি করা জায়েজ। এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।
◯ ইবনে কুদামা (রহ.) তাঁর “আল-মুগনি” (৪/২১৫) গ্রন্থে বলেছেন:
وأما ما يحوزه من الماء في إنائه فإنه يملكه بذلك وله بيعه بلا خلاف بين أهل العلم … وعلى ذلك مضت العادة في الأمصار ببيع الماء في الروايا من غير نكير ، وليس لأحد أن يشرب منه ولا يتوضأ ولا يأخذ إلا بإذن مالكه ، وكذلك لو وقف على بئره أو بئر مباح فاستقى بدلوه أو بدولاب أو نحوه فما يرقيه من الماء فهو ملكه وله بيعه لأنه ملكه بأخذه في إنائه . قال أحمد : إنما نهى عن بيع فضل ماء البئر والعيون في قراره ، ويجوز بيع البئر نفسها والعين ومشتريها أحق بمائها ” انتهى باختصار
“কেউ যখন কোনো পাত্রে পানি সংগ্রহ করে, তখন সে সেটার মালিক হয়ে যায় এবং তা বিক্রি করা তার জন্য জায়েজ। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতানৈক্য নেই… শহরের বিভিন্ন স্থানে মশকে করে পানি বিক্রির রেওয়াজ বহু আগে থেকেই চলে আসছে। কেউ এতে আপত্তি জানায়নি। কাউকে তার মালিকের অনুমতি ছাড়া সে পানি পান করতে, ওজু করতে বা নিতে নিষেধ করা হয় না।
অনুরূপভাবে, যদি কেউ তার কূপ বা সাধারণ কোনো কূপ থেকে বালতি বা চাকা (কূপ থেকে পানি তোলার জন্য ব্যবহৃত ঘূর্ণায়মান যন্ত্র) এর মাধ্যমে পানি তোলে, তবে যে পানি সে উপরে তোলে, তা তার মালিকানাধীন এবং সে তা বিক্রি করতে পারবে। কারণ সে তা তার পাত্রে নিয়ে মালিকানা লাভ করেছে। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন: ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল কূপ ও ঝরনার বাড়তি পানি তার উৎসস্থলে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। আর মূল কূপ ও ঝরনা বিক্রি করা জায়েজ এবং যে তা ক্রয় করবে তার পানির উপর সেই বেশি অধিকার রাখে।'”
◯ আল্লামা সালেহ আল ফাওজান (হাফি.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “পানি বিক্রি করা কি জায়েজ? কখন?”
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
في ذلك تفصيل : إذا كان حاز الماء في وعائه أو بركته فإنه يملكه ويجوز له أن يبيعه ؛ لأنه حازه واستولى عليه وتعب في تحصيله ، فصار ملكًا له .
أما إذا كان الماء باقيًا في البئر أو في النهر أو في المجرى الذي يجري في ملكه فهذا فيه خلاف بين أهل العلم ، والصحيح أنه لا يجوز له بيعه ، بل يكون هو أولى بالانتفاع به من غيره ، وليس له أن يمنع الآخرين من الانتفاع به انتفاعًا لا يضره هو ولا يضر في ملكه ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن بيع فضل الماء ” انتهى
“এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা আছে: যদি কেউ পানি তার পাত্রে বা পুকুরে সংরক্ষণ করে তবে সে সেটার মালিক হয় এবং তা বিক্রি করা তার জন্য জায়েজ। কারণ সে তা সংগ্রহ করে তার দখলে এনেছে এবং তা সংগ্রহে পরিশ্রম করেছে। ফলে তা তার সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।
তবে যদি পানি কূপ, নদী বা তার মালিকানাধীন কোনো স্থানে প্রবাহিত অবস্থায় থাকে তবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশুদ্ধ মত হলো, তা বিক্রি করা তার জন্য জায়েজ নয় বরং নিজের ব্যবহারের জন্য তার অগ্রাধিকার থাকবে। তবে সে অন্যকে এমনভাবে উপকৃত হতে বাধা দিতে পারবে না যা তার বা তার সম্পত্তির ক্ষতি করে না; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়তি পানি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।” [আল মুনতাকা ৩/১৩] জমজমের পানি ও অন্যান্য পানির ক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য।
◯ শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেছেন:
” لا حرج في بيع ماء زمزم ، ولا في نقله من مكة “
“জমজমের পানি বিক্রি করা বা মক্কা থেকে তা বহন করে নিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা নেই।” [মাজমু’ ফাতাওয়া ইবনে বায। ১৬/১৩৮]
সুতরাং যদি কেউ মক্কার হারাম থেকে জমজমের পানি সংগ্রহ করে নিজের দেশে বা অন্য কোনো দেশে নিয়ে যায় তবে তা বিক্রি করা জায়েজ। আল্লাহু আলাম। আল্লাহ তা’আলাই ভালো জানেন।
উৎস: islamqa
অনুবাদক: আব্দু্ল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মৃত্যুর পর ভাই-বোনের আর কখনো দেখা হবে না একটি ভিত্তিহীন কথা

 “মৃত্যুর পর ভাই-বোনের আর কখনো দেখা হবে না” এমন একটি কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নিতান্তই ভিত্তিহীন ও দলিল বহির্ভূত কথা। কুরআন-হাদিসের এ কথার কোনও সত্যতা নেই। বিজ্ঞ আলেমগণ এমনটাই বলেছেন। নিম্নে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

✪ কুরআন-হাদিসের আলোকে কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে ভাইদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব। তবে তা জরুরি নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
فَإِذَا جَاءَتِ الصَّاخَّةُ -يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ – وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ – وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ – لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ
“অতঃপর যখন আসবে মহা শব্দকারী (বিকট আওয়াজ), যেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা ও বাবার কাছ থেকে এবং তার স্ত্রী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকের এমন এক গুরুতর অবস্থা থাকবে যা তাকে অন্য সব কিছু থেকে উদাসীন করে দেবে।” [সূরা আবাসা: ৩৩-৩৭]। এই আয়াতগুলোতে কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার বর্ণনা করা হয়েছে। “الصَّاخَّةُ” (আস-সাখ্‌খাহ) বলতে কিয়ামতের সেই বিকট শব্দকে বোঝায় যা সব কিছুকে স্তব্ধ করে দেবে। সেই ভয়ংকর দিনে মানুষ এতটাই ভীতসন্ত্রস্ত থাকবে যে, তারা তাদের সবচেয়ে প্রিয়জন, যেমন: ভাই-বোন, মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানগণ দূরে পালাবে। কারণ সেদিন প্রত্যেকেই কেবল নিজের মুক্তির চিন্তায় মগ্ন থাকবে এবং নিজের আমল নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। অন্য কারো দিকে তাকানোর বা সাহায্য করার সুযোগ পাবে না। সেদিন প্রত্যেকের নিজস্ব এক গুরুতর চিন্তা ও ব্যস্ততা থাকবে যা তাকে অন্য সবকিছু থেকে উদাসীন করে দেবে।
আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেন না যে, সেদিন পালানো তখনই সম্ভব যখন সে তাকে চিনতে পারবে অথবা তার সাথে দেখা হবে।
মোটকথা, আখিরাতে ভাই-বোন, মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকেরই একে অপরের সাথে দেখা হবে এবং তা সবাই সবাইকে চিনতে পারবে কিন্তু ভয় ও আতঙ্কের কারণে কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাবে না বা সাহায্য করবে না।
এ ছাড়াও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
المَرْءُ مع مَن أحَبَّ
“(আখিরাতে) মানুষ থাকবে তার প্রিয়জনদের সঙ্গে।” [বুখারি, মুসলিম]। এ হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, দুনিয়াতে যে যাকে ভালোবাসতো কিয়ামতের দিন সে তার সাথে অবস্থান করবে। ভাই-বোনও এ কথার অন্তর্ভূক্ত।
❑ জান্নাতে ভাইবোনদের সাক্ষাৎ সম্পর্কে ফতোয়া:
প্রশ্ন: জান্নাতে কি ভাইবোনেরা একে অপরের সাথে দেখা করতে পারবে? জাযাকাল্লাহু খাইরান-আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর। অতঃপর: আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে মুমিনদেরকে তাদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সাথে একত্রিত করবেন। এটি তাদের জন্য একটি সম্মান এবং তাদের নিয়ামত বৃদ্ধির উপায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا وَمَن صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ
অর্থ: “স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম শীল, তারাও তাদের সাথে প্রবেশ করবে।” [আর-রাদ: ২৩]। ইমাম ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: “অর্থাৎ জান্নাতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাদের প্রিয়জনদের–পিতা-মাতা, স্ত্রী এবং সন্তানদের–মধ্যে যারা জান্নাতে প্রবেশের যোগ্য, তাদের সাথে একত্রিত করবেন, যাতে তাদের চোখ জুড়িয়ে যায়। এমনকি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণায়, নিচের স্তরের ব্যক্তিকে উপরের স্তরের ব্যক্তির মর্যাদায় উন্নীত করা হবে, উপরের ব্যক্তির মর্যাদা কমানো ছাড়াই।” যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ
“আর যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তান-সন্ততিকে একত্রিত করে দেবো।” [আত-তূর: ২১]। জালাল উদ্দিন সুয়ূতী রচিত “আদ-দুররুল মানসূর ফি তাফসীর বিল মা’ছূর” গ্রন্থে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু মিজলিজ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা জানতেন যে, মুমিন ব্যক্তি দুনিয়াতে তার পরিবার-পরিজনকে একত্রিত করতে ভালোবাসে। তাই তিনি আখেরাতেও তাদের জন্য একত্রিত করতে পছন্দ করেছেন।” আল্লাহু আলাম। আল্লাহই ভালো জানেন। [সোর্স: ইসলাম ওয়েব]।
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতিয়মান হল যে, “মৃত্যুর পর ভাই-বোনের আর কখনো দেখা হবে না” প্রচলিত এ কথাটি সঠিক নয়। বরং যদি উভয়েই মুমিন হয় এবং জান্নাত লাভ করে তাহলে তারা জান্নাতে মিলিত হবে। তখন সম্পর্ক আরও সুন্দর হবে। কারণ সেখানে হিংসা, কষ্ট, ঝগড়া কিছুই থাকবে না। কিন্তু যদি তাদের একজন জান্নাতে আরেকজন জাহান্নামে যায় তখন আর দেখা নাও হতে পারে।
এমনকি হাশরের ময়দানেও বিচারের আগে তাদের মাঝে সাক্ষাত ঘটবে। কিন্তু তারা একে অপর থেকে পলায়ন করবে। অর্থাৎ ভাই-বোন কেউ কাউকে সাহায্য করবে না।
মোটকথা, কিয়ামতের দিন ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, মা-বাবা ইত্যাদি একে অপরকে চিনতে পারবে। কিন্তু বিচারফলের আগে সবাই নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। ভাই-বোন উভয়েই যদি জান্নাতে যায় তবে তারা দেখা-সাক্ষাত করবে, নানা ধরণের খোশ গল্প করবে এটাই মুমিনের জন্য চূড়ান্ত সুখ। তবে যদি একজন জান্নাতি আরেকজন জাহান্নামি হয় তখন দেখা হতেও পারে নাও পারে। তবে কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীদের মাঝেও কখনো দেখা ও কথোপকথন হবে। ফলে জান্নাতবাসীদের আনন্দ এবং জাহান্নামিদের কষ্ট আরও বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate