Wednesday, August 6, 2025

কারো জীবন বাঁচাতে গিয়ে যদি নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে কী করণীয়

 প্রশ্ন: কারো জীবন বাঁচাতে গিয়ে যদি নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে তাহলে কী করণীয়? খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা।

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর যখন কোনো মানুষের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে, তখন তাকে রক্ষার সামর্থ্য রাখে এমন প্রতিটি ব্যক্তির ওপর তার প্রাণ বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা ওয়াজিব (অবশ্যক কর্তব্য)। এমনকি কেউ যদি সালাতে রত থাকে, তবুও তাকে সেই সালাত ভেঙে উদ্ধারে অগ্রসর হতে হবে যদিও এতে সালাতের সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই সালাত কাযা করতে হবে। কারণ, ইসলামে মানুষের প্রাণের গুরুত্ব অতুলনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—”ومن أحياها فكأنما أحيا الناس جميعًا“যে কেহ কোনো প্রাণ বাঁচায়, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই বাঁচিয়ে দিল।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২) ইসলাম এতটাই মানবকেন্দ্রিক যে, কোনো ব্যক্তি যদি খাদ্যাভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হয়, তবে তার জন্য সাময়িকভাবে হারাম খাদ্যও হালাল করে দেওয়া হয়েছে শুধু প্রাণ রক্ষার স্বার্থে। তবে যদি কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে সে আত্মত্যাগ জায়েয নয়। কারণ শরিয়ত কাউকে নিজের জান-মালের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে অন্যের প্রতি এমনভাবে অগ্রাধিকার দিতে অনুমতি দেয়নি, যাতে সে নিজেই ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়। উদাহরণস্বরূপ একজন ডুবন্ত মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে যদি কেউ নিজেই ডুবে যায়, অথবা নিজেও অনাহারে ক্লিষ্ট থাকা অবস্থায় অন্য ক্ষুধার্তকে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য দিয়ে দেয় এমন যে খাদ্য ছাড়া সে নিজেও জীবন রক্ষা করতে পারবে না তাহলে এরূপ আত্মত্যাগ শরিয়তসম্মত নয়। কারণ ইসলামে প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো নিজের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন,وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ“আর তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)আর এ কারণে আল্লাহর দরবারে তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে না। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেন,فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ“অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটুকু তোমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে।” (সূরা তাগাবুন: ১৬) হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন যে,لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ “নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না; অন্যের ক্ষতি করাও যাবেনা”(মুসনাদে আহমাদ হা/২২২৭২, সিলসিলা সহীহা হা/২৫০)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:
‎
” وإذا اشتدت المخمصة في سنة المجاعة ، وأصابت الضرورة خلقا كثيرا ، أو كان عند بعض الناس قدر كفايته وكفاية عياله ، لم يلزمه بذله للمضطرين ، وليس لهم أخذه منه ; لأن ذلك يفضي إلى وقوع الضرورة به ، ولا يدفعها عنهم . وكذلك إن كانوا في سفر ومعه قدر كفايته من غير فضلة ، لم يلزمه بذل ما معه للمضطرين … لأن هذا مفض به إلى هلاك نفسه ، وهلاك عياله ، فلم يلزمه ، كما لو أمكنه إنجاء الغريق بتغريق نفسه . ولأن في بذله إلقاء بيده إلى التهلكة ، وقد نهى الله عن ذلك”
“যখন দুর্ভিক্ষের বছরগুলিতে খাদ্যাভাব চরমে পৌঁছায়, এবং বহু মানুষের উপর তা বিপর্যয় ডেকে আনে, কিংবা কারো কাছে নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য থাকে তবে সে বাধ্য নয় যে, তা দরিদ্রদের দিয়ে দেবে। এমনকি দরিদ্ররাও তার কাছ থেকে সেটা জোর করে নিতে পারবে না। কারণ, এতে করে তার নিজের উপরই সংকট দেখা দেবে, অথচ তাদের সমস্যাও এতে পুরোপুরি দূর হবে না। একইভাবে, যদি তারা সফরে থাকে এবং তার কাছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট খাবার থাকে কিন্তু অতিরিক্ত কিছু না থাকে তাহলে সে বাধ্য নয় তার খাবার দরিদ্রদের দিয়ে দিতে কারণ এতে নিজের এবং পরিবারের ধ্বংস ডেকে আনা হয়, তাই তা তার উপর আবশ্যক নয়। যেমন: কেউ যদি ডুবে যাওয়া একজনকে বাঁচাতে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়ার পরিস্থিতিতে পড়ে, তাহলে সেটাও তার জন্য আবশ্যক নয়। আর এটা এই কারণেও বৈধ নয় যে এতে নিজের হাত দিয়ে নিজেকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করা হয়, অথচ আল্লাহ তা নিষেধ করেছেন। সুতরাং, নিজে ডুবে গিয়ে কাউকে বাঁচানো বৈধ নয়। তেমনি, খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া বৈধ নয়, যদি এতে নিজের ধ্বংস ঘটে।”(ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী,খন্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪২১)
.
শারহু মুনতাহাল ইরাদাত গ্রন্থে বলা হয়েছে: (ومن لم يجد) ما يسد رمقه (إلا طعام غيره : فربه المضطر ، أو الخائف أن يُضطر : أحق به) ؛ لمساواته الآخر في الاضطرار ، وانفراده بالملك؛ أشبه غير حالة الاضطرار .(وليس له) أي: رب الطعام إذا كان كذلك (إيثاره)، أي: غيره به؛ لئلا يلقي بيده إلى التهلكة”যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় পড়ে যে, তার ক্ষুধা নিবারণের (অর্থাৎ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত টিকে থাকার) জন্য নিজের কোনো খাবার নেই এবং কেবল অন্যের খাবারই রয়েছে তাহলে যদি সে চরম প্রয়োজনগ্রস্ত হয় কিংবা আশঙ্কা করে যে, খুব শিগগিরই সে প্রয়োজনের মুখে পড়বে তবে সে ঐ খাবারের প্রতি অধিক হকদার হবে। “কারণ, যেমন করে সে (খাদ্য চাওয়া ব্যক্তি) প্রয়োজনে পড়েছে, তেমনি মালিক নিজেও সেই প্রয়োজনে পড়েছে। কিন্তু মালিকের একচেটিয়া অধিকার রয়েছে ঐ খাদ্যের উপর, যা তাকে প্রয়োজনের বাইরে অন্য কোনো পরিস্থিতির মতোই অধিকারী করে তোলে। সুতরাং মালিকের জন্য বৈধ নয় যে, সে অন্য কাউকে তা দিয়ে নিজের জীবনকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।”(শারহু মুনতাহা আল-ইরাদাত, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
إذا اضطر إلى مال الغير، فإن صاحب المال إن كان مضطراً إليه فهو أحق به.مثاله: رجل معه خبزة وهو جائع وصاحبه جائع، وليس معه خبز، فالصاحب محتاج إلى عين مال الغير، لكن الغير ـ أيضاً ـ محتاج إليه، ففي هذه الحال لا يحل للصاحب أن يأخذ مال الغير؛ لأن صاحبه أحق به منه .
ولكن هل يجوز لصاحبه أن يؤثره أو لا؟
الجواب: المذهب أن الإيثار في هذه الحال لا يجوز، وقد سبق لنا قاعدة في ذلك، وهي أن الإيثار بالواجب غير جائز، ومن أمثلتها في باب التيمم إذا كان الإنسان ليس معه من الماء إلا ما يكفي لطهارته، ومعه آخر يحتاج إلى ماءٍ فلا يعطيه إياه والثاني يتيمَّم؛ لأن هذا إيثار بالواجب، والإيثار بالواجب حرام.
وعلى هذا : فإذا كان صاحب الطعام محتاجاً إليه، يعني مضطراً إليه ، كضرورة الصاحب: فإنه لا يجوز أن يؤثر به الصاحب؛ لأن هذا يجب عليه أن ينقذ نفسه، وقد قال النبي عليه الصلاة
والسلام: ابدأ بنفسك ، فلا يجوز أن يؤثر غيره؛ لوجوب إنقاذ نفسه من الهلكة قبل إنقاذ غيره، هذا هو المشهور من المذهب.
وذهب ابن القيم ـ رحمه الله ـ إلى أنه يجوز في هذه الحال أن يؤثر غيره بماله .ولكن المذهب في هذا أصح، وأنه لا يجوز، اللهم إلا إذا اقتضت المصلحة العامة للمسلمين أن يؤثره، فقد نقول: إن هذا لا بأس به، مثل لو كان هذا الصاحب المحتاج رجلاً يُنتفع به في الجهاد في سبيل الله، أو رجلاً عالماً ينفع الناس بعلمه، وصاحب الماء المالك له، أو صاحب الطعام رجل من عامة المسلمين، فهنا قد نقول: إنه في هذه الحال، مراعاة للمصلحة العامة: له أن يؤثره، وأما مع عدم المصلحة العامة فلا شك أنه يجب على الإنسان أن يختص بهذا الطعام الذي لا يمكن أن ينقذ به نفسه، وصاحبه”
“যদি কেউ অপরের সম্পদের প্রতি বাধ্য হন (অর্থাৎ, জীবন রক্ষার জন্য অপরের সম্পদ নিতে বাধ্য হন), তাহলে যদি সেই সম্পদের মালিকও তা গ্রহণে বাধ্য হন, তবে মালিকেরই এতে অধিকার বেশি। উদাহরণস্বরূপ: একজন মানুষের কাছে একটি রুটি আছে এবং সে ক্ষুধার্ত। তার সাথের আরেকজনও ক্ষুধার্ত, কিন্তু তার কাছে রুটি নেই। অর্থাৎ, সাথের লোকটি অপরের রুটির প্রতি প্রয়োজনে পড়েছে। কিন্তু অপরজনও ঠিক একইভাবে এই রুটির প্রয়োজন অনুভব করছে। এমতাবস্থায়, সাথের লোকটির জন্য অপরের রুটি নেওয়া বৈধ নয়; কারণ, রুটির মালিক তার চেয়ে বেশি হকদার। তবে প্রশ্ন হলো: রুটির মালিক কি অপরজনকে এই রুটি নিজের ওপর প্রাধান্য দিয়ে দিতে পারবে?
উত্তর: মাযহাব অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে প্রাধান্য (إيثار) দেওয়া বৈধ নয়। পূর্বে আমরা একটি মূলনীতি আলোচনা করেছি: “যে কাজ ফরজ, তা অন্যের জন্য ত্যাগ করা বৈধ নয়”।এর একটি উদাহরণ হলো তায়াম্মুম (মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন): যদি কারো কাছে এতটুকু পানি থাকে যা কেবলমাত্র তার নিজের অজুর জন্য যথেষ্ট,এবং তার সাথের একজনেরও পানি প্রয়োজন হয় তবে সে সেই পানিটি তাকে দিতে পারবে না। বরং দ্বিতীয়জন তায়াম্মুম করবে। কারণ, এটি ফরজ কাজ অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে ত্যাগ করা, আর তা হারাম।
এই ভিত্তিতে, যদি খাবারের মালিক নিজেও এ খাবারের চরমভাবে প্রয়োজনমুখী হন যেমন তা দিয়ে তার জীবন বাঁচাতে হয়, তাহলে তার জন্য সেই খাবার কাউকে দিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। বরং তার জন্য আবশ্যক যে, সে নিজেই তা গ্রহণ করে নিজের জীবন রক্ষা করবে। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:“তোমার নিজের থেকে শুরু করো।” অতএব, নিজের জান বাঁচানো অন্যের জান বাঁচানোর চেয়ে অধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এটাই হলো (হাম্বলী) মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত। তবে ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন এই অবস্থায় একজন নিজের সম্পদ অন্যকে দিয়ে দিতে পারে,অর্থাৎ ইসার তথা অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া বৈধ)। কিন্তু মাযহাবের বক্তব্যই অধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য যা হলো: এমন অবস্থায় ইসার (নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া) বৈধ নয়। তবে একটি ব্যতিক্রম হতে পারে যদি মুসলিম সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের স্বার্থে কাউকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রয়োজন হয়। তখন বলা যায় এতে কোনো সমস্যা নেই। যেমন: যদি সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তি এমন কেউ হন যিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশ নেন, কিংবা এমন একজন আলেম যিনি তার জ্ঞানের দ্বারা সমাজ উপকৃত করে থাকেন, আর খাবারের মালিক হন সাধারণ এক ব্যক্তি তাহলে এ জাতীয় ক্ষেত্রে সামষ্টিক কল্যাণ বিবেচনায় প্রাধান্য দেওয়া বৈধ হতে পারে। কিন্তু যদি কোনো সামষ্টিক কল্যাণের দিক বিবেচনায় না থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হবে যে, সে নিজেই সেই খাবার খেয়ে নিজের জীবন রক্ষা করবে।” (ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ৪০)
.
শাফেয়ী মাযহাবের বক্তব্য হলো: যদি কোনো মুসলমান এমন কিছু পায় যা তার জীবন রক্ষা করতে পারে এবং সে বাধ্যগত অবস্থায় থাকে, তবে সে তা অপর এক মুসলমানকে দিতে পারবে—অর্থাৎ তাকে নিজের উপর প্রাধান্য দিতে পারবে। তবে যদি সেই ব্যক্তি অমুসলিম হয়, তাহলে তাকে নিজের উপর প্রাধান্য দেওয়া বৈধ নয়।শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,
إذا وجد المضطر طعاما حلالا لغيره فله حالان.أحدهما: أن يكون مالكه حاضرا. فإن كان مضطرا إليه، فهو أولى به، وليس للأول أخذه منه إذا لم يفضل عن حاجته …فإن آثر المالك غيره على نفسه، فقد أحسن. قال الله تعالى: (وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ) .وإنما يؤثر على نفسه مسلما.فأما الكافر فلا يؤثره، حربيا كان أو ذميا، وكذا لا يؤثر بهيمة على نفسه”
“যদি কোনো বিপদাপন্ন ব্যক্তি এমন কোনো হালাল খাদ্য খুঁজে পায় যা অপর একজনের মালিকানাধীন, তবে এর দুটি অবস্থা হতে পারে:
(১) যদি মালিক উপস্থিত থাকেন এবং তিনিও সেই খাদ্যের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে থাকেন (অর্থাৎ তিনিও বিপদগ্রস্ত), তবে মালিকই এ খাদ্যের অধিক হকদার। তখন অপর ব্যক্তি তা জোরপূর্বক গ্রহণ করতে পারবে না।
(২) তবে যদি মালিক নিজে ক্ষুধার্ত বা প্রয়োজনীয় অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও অপর ব্যক্তিকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেন, তাহলে এটি একটি মহান কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:“তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়।” (সূরা আল-হাশর: ৯) তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, এই প্রাধান্য দেওয়া কেবল মুসলমানের ক্ষেত্রে বৈধ; কোনো কাফের হোক সে যুদ্ধরত (হারবী) অথবা অমুসলিম নাগরিক (যেমন: জিম্মি) কিংবা কোনো পশুর জন্য নিজেকে বঞ্চিত করা বৈধ নয়।”(রওযাতুত-তালিবীন; পৃষ্ঠা: ৩; পৃষ্ঠা: ২৮৫; নববী আল মাজমু; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৫)
.
পরিশেষে, উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে অন্য একজনকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবনকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ যদি সাঁতার জানে না, তবুও একজন ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাঁপ দেয় তাহলে তা বৈধ নয়, কারণ এতে নিজের জীবন হুমকির মুখে পড়ে। অনুরূপভাবে যদি কেউ সাঁতার জানে ঠিকই, তবে ডুবন্ত ব্যক্তি তাকে আঁকড়ে ধরার কারণে তার নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা হয় তাহলে তার জন্য নিজেকে সেই ব্যক্তির কবল থেকে মুক্ত করে নেওয়া এবং প্রয়োজনে তাকে ছেড়ে দেওয়া বৈধ হবে এমনকি যদি এতে ডুবন্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। কারণ এমন পরিস্থিতিতে নিজের জীবন রক্ষা করাই সর্বাগ্রে আবশ্যক, তা সে ডুবন্ত ব্যক্তি মুসলিম হোক বা অমুসলিম। বরং প্রকৃত কথা হলো নিজের জীবন রক্ষা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে একটি ফরজ (আবশ্যিক কর্তব্য)। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর তোমরা স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না।”(সূরা আল-বাকারা: ১৯৫) তবে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর অনুসারী একদল আলেমের মতে, যদি বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি একজন মুসলমান হন এবং তাকে বাঁচানো সম্ভব হয় তাহলে নিজের ওপর তাকেই প্রাধান্য দেওয়া বৈধ হবে। ইমাম শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ) এর মাযহাবেও এটিই গ্রহণযোগ্য মত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বিবেকবান, ভারসাম্যপূর্ণ ও শরিয়তসম্মতভাবে মানবিক দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

কেউ কোনো দুর্ঘটনা বা হামলা বা দুর্যোগে আহত হওয়ার ফলে যদি তার সাহায্যের প্রয়োজন হয় তাহলে আশে পাশের অন্যান্য মুসলিমদের করণীয়

 প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি যদি সড়ক দুর্ঘটনা, হামলা বা দুর্যোগে আহত হয় এবং এর ফলে তার সাহায্যের প্রয়োজন হলে আশে পাশের অন্যান্য মুসলিমদের করণীয় কী?

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর যে ব্যক্তি তাৎক্ষণিক ধ্বংস বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে যেমন দুর্ঘটনা, হামলা বা কোনো বিপর্যয়ে পড়ে প্রাণনাশের ঝুঁকিতে থাকে তাহলে তাকে বাঁচানো সক্ষম ব্যক্তির জন্য আবশ্যিক (ওয়াজিব)। এমনকি ব্যক্তি সালাত রত অবস্থায় থাকলেও সালাত ভঙ্গ করে প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করতে হবে যদিও সালাতের সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। উদ্ধার কাজ শেষ করার পর উক্ত সালাত কাজা পড়তে হবে। কেননা ইসলামে মানুষের প্রাণ রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তাআলা বলেন:مَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَآ أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا“আর যে মানুষের প্রাণ বাঁচালো,সে যেন সকল মানুষকে বাঁচালো।”(সূরা মায়িদাহ: ৩২) ইমাম জাসসাস এই আয়াতের তাফসীরে বলেন:وعلى كل أحد أن ينجي غيره إذا خاف عليه التلف مثل أن يرى إنسانا قد قصده غيره بالقتل أو خاف عليه الغرق وهو يمكنه تخليصه”যদি কেউ দেখে অন্য কেউ তাকে হত্যা করতে যাচ্ছে, বা সে ডুবে যাচ্ছে আর সে যদি তাকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার দায়িত্ব তাকে উদ্ধার করা।”(ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-১১৪৭৮৩) হাদিসে রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে কোন ব্যক্তি তার ভাইয়ের কোন উপকার করতে সমর্থ হলে সে যেন তা করে।”(সহিহ মুসলিম হা/৫৬২২) অপর বর্ননায় রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমার ভাইকে সাহায্য কর। সে জালিম হোক অথবা মজলুম হোক। এক লোক বলল, হে আল্লাহ্‌র রসূল! মজলুম হলে তাকে সাহায্য করব তা তো বুঝলাম। কিন্তু জালিম হলে তাকে কিভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন: তাকে অত্যাচার থেকে বিরত রাখবে। আর এটাই হল তার সাহায্য।”(সহিহ বুখারী হা/৬৯৫২)
.
তবে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তাহলে সে গুনাহগার হিসেবে পরিগণিত হবে। কাশফুল ক্বিনা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে:ولو وجد آدميا معصوما في هلكة ، كغريق : لزمه – مع القدرة – إنقاذه) من الهلكة”যদি কোনো নিরাপরাধ (হত্যা করা নিষিদ্ধ) মানুষকে ধ্বংসের মুখে পাওয়া যায়, যেমন: একজন ডুবন্ত ব্যক্তি, তাহলে তার পক্ষে যদি সক্ষমতা থাকে, তবে তার জন্য তাকে ধ্বংস থেকে বাঁচানো আবশ্যক।”(কাশফুল ক্বিনা খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৪)
.
আর শরিয়তে ‘মা‘সুম (যার জান রক্ষা করা অপরিহার্য) বলতে বুঝানো হয় সেই ব্যক্তি যার জীবন শরিয়ত অনুযায়ী সুরক্ষিত। অর্থাৎ, যার ওপর অন্যায়ভাবে আঘাত হানা হারাম। মুসলিমদের পাশাপাশি, অমুসলিমদের মধ্যেও কিছু শ্রেণি যেমন মুসলিম, জিম্মী (ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসরত চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিক), মুআহাদ (চুক্তিভিত্তিক শান্তিপূর্ণ কাফির) এবং মুস্তাআ’মান (যাকে মুসলিম রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিয়েছে)। এই শ্রেণির লোকদের প্রাণ রক্ষা আবশ্যক। তবে যারা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন: কাফির শত্রু, ধর্মত্যাগী (মুরতাদ), শরিয়ত অনুযায়ী রজমযোগ্য বিবাহিত ব্যভিচারী তাদের জীবন রক্ষা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে আবশ্যক নয়। “কাশশাফুল ক্বিনাআ’” গ্রন্থে বলা হয়েছে:”(ويجب رد كافر معصوم) بذمة أو هدنة أو أمان (عن بئر ونحوه) كحية تقصده (ك) رد (مسلم) عن ذلك ، بجامع العصمة .(و) يجب (إنقاذ غريق ونحوه) كحريق (فيقطع الصلاة لذلك) ، فرضا كانت أو نفلا .وظاهره: ولو ضاق وقتها، لأنه يمكن تداركها بالقضاء، بخلاف الغريق ونحوه ؛ (فإن أبى قطعها) ، أي الصلاة لإنقاذ الغريق ونحوه : أثم”কাফির যদি মাসুম হয় (যেমন জিম্মি, চুক্তিবদ্ধ বা নিরাপত্তা প্রাপ্ত), তাকে কূপে পড়া বা সাপ দংশনের মতো বিপদ থেকে বাঁচানো ওয়াজিব যেমনটি একজন মুসলমানকে বাঁচানো ওয়াজিব, কারণ উভয়ই মাসুম। এমনকি কেউ যদি সালাতে থাকে, তবুও (যদি সে পারত) তাহলে ডুবে যাওয়া ব্যক্তি বা আগুনে আটকে পড়া কাউকে উদ্ধার করা তার জন্য ওয়াজিব। সালাত ফরজ হোক বা নফল, তাও কাটতে হবে এই উদ্ধারের জন্য। যদি সালাতের সময় সংকীর্ণও হয়, তাও তাকে সালাত ভেঙে উদ্ধার করতে হবে, কারণ সালাত পরে কাজা করা সম্ভব, কিন্তু ডুবে যাওয়া বা আগুনে পড়া ব্যক্তি রক্ষা পাবে না। যদি কেউ তাও না করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে। তাই যদি কেউ এমন অবস্থায় থাকে যে সে সালাতে আছে অথবা রোজা রাখছে এবং কাউকে উদ্ধার করতে হলে তাকে সালাত ভাঙতে হবে বা রোজা ভেঙে ফেলতে হবে, তবুও তা করা ফরজ, এবং তা না করলে সে গুনাহগার হবে।”(কাশশাফুল ক্বিনাআ’ খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮০)
.
আল-মাওসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ” গ্রন্থে বলা হয়েছে:” إغاثة الغريق والعمل على إنجائه من الغرق : واجب على كل مسلم ، متى استطاع ذلك .يقول الفقهاء : يجب قطع الصلاة لإغاثة غريق إذا قدر على ذلك، سواء أكانت الصلاة فرضا أم نفلا ، وسواء استغاث الغريق بالمصلي ، أو لم يعيّن أحدا في استغاثته ، حتى ولو ضاق وقت الصلاة ؛ لأن الصلاة يمكن تداركها بالقضاء ، بخلاف الغريق “ডুবে যাওয়া ব্যক্তি বা এজাতীয় বিপদের শিকার কারো সাহায্য করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর আবশ্যক, যদি সে তা করতে সক্ষম হয়। এমনকি যদি সে সালাতে থাকে, ফরজ হোক বা নফল এবং এমনকি যদি ডুবে যাওয়া ব্যক্তি তার কাছ থেকে সাহায্য চায় বা চায় না তবুও তাকে সালাত ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ সালাত পরে কাজা করা যায়, কিন্তু একজন মানুষ মারা গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না।এই বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে ভিন্নমত আছে যে, কেউ যদি উদ্ধার না করে তাহলে তার ওপর কী বিধান প্রযোজ্য হবে।”(আল-মাওসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ খণ্ড: ৩১; পৃষ্ঠা: ১৮৩)
.
ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
لا شك أن إنقاذ الغريق من أهم الواجبات على كل قادر على إنقاذه ، فإذا أخذ في إنقاذه ، فتعلق به حتى خشي على نفسه أن يغرق مثله : فليس عليه في هذه الحالة وجوب ، لا شرعا ، ولا عقلا، فيخلص نفسه منه ، ويدعه، سواء كان قد أشرف على النجاة أم لا، بل ظاهر قوله تعالى: ( وَلا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ) [البقرة: 195]، أنه يجب عليه تخليص نفسه.والآية هذه ، وإن كانت واردة على سبب خاص ، كما في سن أبي داود وغيرهما ؛ فالاعتبار بعموم اللفظ ، لا بخصوص السبب ، كما تقرر في الأصول ، وهو الحق”
“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সামর্থবান ব্যক্তির উপর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব (অবশ্যপালনীয়) এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়ে যদি আশঙ্কা থাকে যে, ডুবন্ত ব্যক্তি তাকে জাপটে ধরবে এবং সেও তার মতোই ডুবে মরবে তাহলে এই অবস্থায় তার জন্য এটি ওয়াজিব নয় শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও নয় বা জ্ঞান-বুদ্ধির বিচারেও নয়। এই অবস্থায় সে তাকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করবে। চাই তার বাঁচার সম্ভাবনা থাকুক অথবা না থাকুক। বরং মহান আল্লাহর বাণী: “আর তোমরা নিজেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” (সূরা বাকারা: ১৯৫) এর প্রকাশ্য অর্থ এটাই যে, ডুবন্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করা তার জন্য ওয়াজিব। যদিও আয়াতটি একটি নির্দিষ্ট ঘটনা উপলক্ষে নাজিল হয়েছে যেমনটি আবু দাউদসহ বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত তবুও উসূলুল ফিকহের মূলনীতির আলোকে স্বীকৃত সত্য হলো, কুরআনের আয়াতে ব্যবহৃত সাধারণ ভাষা ও শব্দরূপই বিধান নির্ধারণে মুখ্য; নাজিল হওয়ার বিশেষ কারণ নয়। এটাই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত।”(আস সাইলুল জাররা মুন্তাফিক আলা হাদাইকুল আজহার, পৃষ্ঠা নং ৮৯২)
.
সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন:إنه يجب على المرء المسلم إذا رأى أخاه المسلم في أمر يُخشَى منه الهلاك، يجب عليه أن يسعى لإنقاذه بكل وسيلة،حتى إنه لو كان صائمًا صيام الفرض في رمضان، وحصل شيء يُخشَى منه الهلاك على أخيه المسلم، واضطر إلى أن يُفطِرَ لإنقاذه، فإنه يفطر لإنقاذه، وعلى هذا فإذا مررت بحادث سيارة، ورأيت الناس في حال يُخشَى عليهم من التَّلَفِ أو من تضاعف الضرر، فإنه يجب عليك إنقاذهم بقدر ما تستطيع، ولو أن تحمِلَ النساء، وإن لم يكن معهن محارم؛ لأن هذه ضرورة”؛”যদি কোনো মুসলমান তার ভাইকে এমন বিপদে দেখে যা তার ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি করে তাহলে তাকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে যেকোনো উপায়ে। এমনকি যদি সে রমজানের ফরজ রোজায় থাকে এবং তার ভাই বিপদের মধ্যে পড়ে আর তাকে উদ্ধার করতে গেলে রোজা ভেঙে ফেলতে হয়, তাহলেও সে রোজা ভেঙে ফেলবে। যেমন কেউ গাড়ি দুর্ঘটনা দেখতে পেলো এবং মানুষ মারাত্মক বিপদের মধ্যে আছে তখন তোমার ওপর ফরজ হয়ে যায় তাদের উদ্ধার করা, যতটুকু সম্ভব। এমনকি যদি তোমাকে মহিলাদের গাড়িতে তোলাও লাগে, যদিও তাদের সাথে কোনো মাহরাম নেই তবুও সেটা বৈধ, কারণ এটি জরুরি অবস্থা। (ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৫৯)
.
অতএব উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে কোনো মুসলিম দুর্ঘটনা, হামলা বা দুর্যোগে আহত হলে তাকে সাহায্য করা উপস্থিত মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব হয়ে যায় যদি তারা সক্ষম হয়। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অবহেলা করা বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি জীবন রক্ষা করতে সালাত ভঙ্গ করাও বৈধ। যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সাহায্য, চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামী দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের সকলকে মানবিক দায়িত্ব পালনে যত্নবান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

সালাতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ও চতুর্থ রাকআতের সিজদাহ থেকে কিভাবে দাঁড়াতে হবে

 প্রশ্ন: সালাতে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ রাকআতের সিজদাহ থেকে কিভাবে দাঁড়াতে হবে? একটি দলিল ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর সিজদা থেকে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ রাকাআতে উঠে দাঁড়ানোর পদ্ধতি কেমন হবে? এই বিষয়ে আহালুল আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই বিষয়ে দুটি মত রয়েছে।
▪️প্রথম মতামত: সালাতে সিজদা থেকে দাঁড়ানোর সময় হাঁটুতে ভর দেওয়া উত্তম। হাত দিয়ে ভর দেওয়া তখনই জায়েয, যখন ব্যাক্তি বৃদ্ধ, দুর্বল বা অসুস্থ হওয়ায় দাঁড়াতে কষ্ট হয়। এই অভিমত গ্রহণ করেছেন হানাফি ও হাম্বলি মাজহাব, একই মত পোষণ করেছেন ইমাম দাঊদ আয-জাহিরি। এ মতের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ), ইমাম আব্দুল আযীয ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) এবং ইমাম মুহাম্মাদ ইবন উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ)। যেসব আলেম হাতের ওপর ভর না দিয়ে দাঁড়ানোকে উত্তম মনে করেন, তারা সাহাবায়ে কেরামের আমল, মানুষের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওঠে দাঁড়ানোর অভ্যাস, এবং উটের মতো ভর দিয়ে ওঠা থেকে বারণ করার হাদীসকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন।” এই মতের পক্ষে দলিল হচ্ছে, আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ইবনু জাবির (রহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:আমি ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে লক্ষ করলাম, তিনি (প্রথম রাকাআতের) সিজদার পর বসতেন না; বরং তিনি পায়ের পাতার ওপর ভর করে উঠে দাঁড়াতেন।”(ইমাম ইবনু আবী শাইবা,আল-মুসান্নাফ হা/২৮২৫; মাসায়েলে ইমাম আহমেদ ইবনু হাম্ভল ইবনে হানীর রেওয়াত হা/৯১১) অপর রিওয়ায়াতে এসেছে: তিনি বলেন: আমি নামাজে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে লক্ষ্য করলাম। দেখলাম, তিনি (সিজদা থেকে উঠার সময়) বসতেন না; বরং প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাআতে তিনি পায়ের আঙুলের উপর ভর করে সরাসরি দাঁড়িয়ে যেতেন।”(ইমাম ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ হা/২৪৮৩)
.
এই দলীলগুলো থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়: প্রথমত: এখানে বর্ণনা করা হয়েছে যে ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) পায়ের আঙুলের গোড়ালির উপর ভর দিয়ে উঠে যেতেন অর্থাৎ, তিনি উঠার সময় জমিনে হাত দিয়ে ভর দিতেন না। দ্বিতীয়ত: হাতের তুলনায় হাঁটু আগে তুলে উঠা মানুষের স্বাভাবিক নড়াচড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ যখন একজন মানুষ মাটি থেকে উঠে, তখন শরীরের উপরের অংশ আগে উঠে এবং তারপর নিচের অংশ উঠে। তৃতীয়ত: হাতের আগে হাঁটু তুলে ওঠা পদ্ধতি উটের ওঠার পদ্ধতির থেকে ভিন্ন, কারণ উট উঠার সময় প্রথমে দুই পা তোলে আর তার হাত বা পায়ের সামনে অংশ মাটিতে থাকে।এবং এটি সেই পদ্ধতি, যার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে বিরত রেখেছেন এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন।
.
▪️দ্বিতীয় মতামত: সালাতে সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো মুস্তাহাব। এই মত গ্রহণ করেছেন মালিকি মাজহাব, শাফেয়ি মাজহাব, এবং এটি সালাফদের একটি দলের মত। এমনকি এটি বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আলবানী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মনোনীত মত। যারা দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর দেওয়াকে মুস্তাহাব মনে করেন, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল এবং শরিয়তের সহজতা ও সহনশীলতার দিকটি সামনে রাখেন। এই মতের পক্ষের আলেমগন ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। হাদীসটি বুখারীর ৮২৪ নম্বর হাদীসে এসেছে ‎আবু কিলাবা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইব্‌নু হুয়াইরিস (রাঃ) এসে আমাদের এ মসজিদে আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের নিয়ে সালাত আদায় করব। এখন আমার সালাত আদায়ের কোন ইচ্ছা ছিল না, তবে আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছি তা তোমাদের দেখাতে চাই। আইয়ুব (রহঃ) বলেন, আমি আবূ কিলাবা (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর [মালিক ইব্‌নু হুয়াইরিস (রাঃ)-এর] সালাত কীরূপ ছিল? তিনি [আবূ কিলাবা (রহঃ)] বলেন, আমাদের এ শায়খ অর্থাৎ আমর ইবনু সালিমা (রহঃ)-এর সালাতের মতো। আইয়ুব (রহঃ) বললেন, শায়খ তাকবীর পূর্ণ বলতেন এবং যখন দ্বিতীয় সিজদা হতে মাথা উঠাতেন তখন বসতেন, অতঃপর মাটিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।”(সহিহ বুখারী হা/৮২৪) এই হাদীসের আলোকে তারা বলেন, এভাবে মাটির উপর ভর নিয়ে দাঁড়ানো সালাতের বিনয় ও একাগ্রতাকে আরও গভীর করে তোলে, সালাত আদায়কারীকে স্বস্তি দেয় এবং অস্থিরতা ও পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়।”
.
▪️তৃতীয়ত: যারা সিজদা থেকে উঠার সময় হাতের উপর ভর দেওয়া উত্তম বলে মত প্রকাশ করেছেন, তাঁদের মধ্যেও এ ভর দেওয়ার ধরন কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। মালিকি ও শাফিঈ ইমামদের মতে, উঠার সময় হাতের তালু ও আঙুলের পৃষ্ঠভাগ (পেটভাগ) দিয়ে মাটি স্পর্শ করে ভর দিতে হবে; হাত মুঠো করা যাবে না। অন্যদিকে, কিছু আলেম যাঁদের মধ্যে বিগত শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত মুজাদ্দিদ ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখযোগ্য তাঁরা মত দিয়েছেন যে, হাত মুঠো করে আঙুলের উপর ভর দিয়ে উঠা অধিক উত্তম। তিনি একে ‘আজন’-এর (আটার খামির মাখানোর) ভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারা দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন, আল-আরযাক ইবনে কায়েস (রহঃ) বলেন: আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-কে সালাতে “আটা মাখানোর মতো” উঠতে দেখেছি, তিনি দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর দিতেন। আমি বললাম: “হে আবু আব্দুর রহমান! আপনি কী করছেন?” তিনি বললেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে সালাতে এভাবেই (আটা মাখানোর ভঙ্গিতে) উঠতে দেখেছি।”(ত্বাবারাণী, মু’জামুল আওসাত্ব ৪/২১৩, হা/৪০০৭; সিলসিলা সাহীহাহ ৬/৩৮০, ৩৮২ হা/২৬৭৪; সিলসিলা যঈফাহ ২/৩৯১-৩৯২ পৃষ্ঠা; সিফাতু সলাতিন নাবী ﷺ পৃষ্ঠা/১৫৫) অন্য এক বর্ণনায় আছে: নবী ﷺ সালাতে আজন করতেন; অর্থাৎ দাঁড়ানোর সময় দুই হাতে ভর দিতেন।” তাহক্বীক হাদীসটি বিশুদ্ধতা নিয়ে মহাদ্দিসগণের মধ্যে মতাবেদ রয়েছে, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: رواه أبو إسحاق الحربي بسندٍ صالح، ومعناه عند البيهقي بسند صحيح “এই হাদিস আবু ইসহাক আল হারবী একটি গ্রহণযোগ্য সানাদে বর্ণনা করেছেন, আর বায়হাকীর বর্ণনায় এটি একটি সহিহ সানাদে এসেছে। (ইমাম আলবানী সিফাতু সালাতিন নাবী, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮২৪) অপরদিকে জমহুর আলেমগন হাদিসটি দুর্বল বলেছেন। কারন হাদিসটির সনদে হাইসাম ইবনে ইমরান আছেন, যিনি অজ্ঞাত (মাজহুল)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল: আমি মুগনিল মুহতাজ ইলা মা‘রিফাতি মা‘আনি আলফায আল-মিনহাজ কিতাবে (যা শাইখ মুহাম্মাদ আশ-শারবীনী রচিত) একটি হাদীস পড়েছি যেখানে ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায থেকে উঠার সময় তাঁর হাত জমিনে এমনভাবে রাখতেন যেভাবে আটার মাখুনে (অর্থাৎ হাতের তালু ও আঙুল ভাঁজ করে) রাখে। এই হাদীসের সনদ কতটুকু সহীহ? এবং এর অর্থ কী? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।”
তিনি উত্তরে বলেন:المعروف أنه ليس بصحيح، والإنسان يعتمد كيف شاء على يديه على بطونها، أو على ظهورها، يعتمد حيث شاء، هذا هو الأصل، وإذا اعتمد على ركبتيه إذا كان قويًا نشيطًا فهو أفضل، وإن احتاج للأرض اعتمد على الأرض ببطون يديه، أو بظهور أصابعه، كل ذلك لا حرج فيه، والحمد لله، الأمر في هذا واسع، وأما كونه على صفة العاجن فليس عليه دليل صحيح.”বিশ্বস্ত মত অনুযায়ী, এই হাদীসটি সহীহ নয়। মানুষ চাইলেই যেভাবে সুবিধা হয়, সেভাবেই (সালাত থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময়) হাত ব্যবহার করে ভর নিতে পারে হাতের তালুতে ভর দিয়ে হোক, কিংবা হাতের পিঠে ভর দিয়ে হোক, যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে ভর নিতে পারে। এটাই মূলনীতি। আর যদি কেউ শক্তিশালী ও সক্রিয় হয়, তাহলে হাঁটুর উপর ভর করে উঠা উত্তম। আর যদি মাটির উপর ভর নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে হাতের তালুর উপর ভর দিয়ে উঠা বা আঙ্গুলের পিঠে ভর দিয়ে উঠা সবই বৈধ। আলহামদুলিল্লাহ, এ ব্যাপারে শরীয়তে প্রশস্ততা আছে। আর “আটা মেখে এমনভাবে দাঁড়ানো” (يعني: صفة العاجن গুটিয়ে হাঁটু টেনে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ানো) এই রকম কায়দার পক্ষে কোন সহীহ দলিল নেই।”(বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-৯১৩৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে বলেন:
أن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم ( كان إذا أراد أن يقوم اعتمد على يديه ) ولكن هل هو كصفة العاجن أم لا؟ هذا ينبني على صحة الحديث الوارد في ذلك، وقد أنكر النووي رحمه الله في المجموع صحة هذا الحديث، أي: أنه يقوم كالعاجن، وبعض المتأخرين صححه.وعلى كلٍ فالذي يظهر من حال النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم أنه يجلس، لأنه كبر وأخذه اللحم، فكان لا يستطيع النهوض تماماً من السجود إلى القيام، فكان يجلس ثم إذا أراد أن ينهض ويقوم اعتمد على يديه ليكون ذلك أسهل له، هذا هو الظاهر من حال النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم، ولهذا كان القول الراجح في هذه الجلسة -أعني: جلسة الاستراحة- التي يسميها العلماء جلسة الاستراحة أنه إن احتاج إليها لكبر أو ثقل أو مرض أو ألم في ركبتيه أو ما أشبه ذلك فليجلس، ثم إن احتاج إلى أن يعتمد عند القيام على يديه فليعتمد على أي صفة كانت، سواء اعتمد على ظهور الأصابع، يعني: جمع أصابعه هكذا واعتمد عليها أو على راحته، أو غير ذلك، المهم إذا احتاج إلى الاعتماد فليعتمد، وإن لم يحتج فلا يعت
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সেজদা থেকে উঠে দাঁড়াতে চাইতেন, তখন তিনি তাঁর হাতের উপর ভর করে দাঁড়াতেন। কিন্তু তিনি এই ভরটি কীভাবে নিতেন তা কি আটার খামির মাখানো ব্যক্তির ভঙ্গিতে, অর্থাৎ হাতের আঙুলের পিঠে ভর দিয়ে, নাকি তালু দিয়ে এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এ সংক্রান্ত যে হাদীসটি আছে, তার প্রামাণিকতা নির্ভরযোগ্য কি না, সে নিয়েও আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থ আল-মাজমু‘-তে এই হাদীসটির সহীহ হওয়া অস্বীকার করেছেন, অর্থাৎ তিনি একে সহীহ মনে করেননি। তবে পরবর্তী যুগের কিছু মুহাদ্দিস এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের বাস্তব অবস্থান ও বার্ধক্যকালীন অবস্থা থেকে ধারণা করা যায় যে, তিনি সেজদা থেকে সরাসরি না উঠে আগে বসতেন, এরপর দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর ভর নিতেন যাতে দাঁড়ানো সহজ হয়। কারণ বয়স বৃদ্ধি, শরীর ভারী হয়ে যাওয়া ও দুর্বলতা এইরূপ কায়দার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই ফিকহবিদদের কাছে ‘জালসাতুল ইস্তিরাহা’ অর্থাৎ বিশ্রামের বসা বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, কেউ যদি বার্ধক্য, শরীরের ভার, হাঁটুর ব্যথা বা কোনো ধরনের অসুস্থতার কারণে সরাসরি দাঁড়াতে না পারেন, তাহলে তিনি বসে বিশ্রাম নিতে পারেন এবং প্রয়োজনে হাতের উপর ভর নিয়ে দাঁড়াতে পারেন তা হাতের তালু দিয়েই হোক, আঙুলের পিঠ দিয়েই হোক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। এতে কোনো সমস্যা নেই। মূল কথা হলো, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী হাতের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো জায়েয। আর যদি সে প্রয়োজন না থাকে, তবে ভর না নিয়ে দাঁড়ানোতেও কোনো অসুবিধা নেই।”(ইবনু উসাইমীন, লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, সাক্ষাৎকার নং-৬৫)
.
অপরদিকে হানাবিলা (হাম্বলি মাজহাব) মতে,নামাজে দাঁড়ানোর সময় হাঁটুতে ভর দেওয়া উত্তম।হাত দিয়ে ভর দেওয়া তখনই জায়েয, যখন বৃদ্ধ, দুর্বল বা অসুস্থ হওয়ায় দাঁড়াতে কষ্ট হয়। হাফিয যাইনুদ্দীন আবুল ফারজ ‘আব্দুর রহমান বিন শিহাব যিনি ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী নামে প্রসিদ্ধ রাহিমাহুল্লাহ [জন্ম: ৭৩৬ হি. মৃত: ৭৯৫ হি:] বলেছেন:
وقد اختلف العلماء في القائم إلى الركعة الثانية من صلاة: كيف يقوم؟
فقالت طائفة: يعتمد بيديه على الأرض، كما في حديث مالك بن الحويرث هذا…
وهو قول مالك والشافعي وإسحاق.
وروي عن أحمد، أنه كان يفعله، وتأوله القاضي أبو يعلى وغيره على أنه فعله لعجز وكبر.
وقد روي عن كثير من السلف، أنه يعتمد على يديه في القيام إلى الركعة الثانية، منهم: عمر، وعبادة بن نسي، وعمر بن عبد العزيز، ومكحول، والزهري، وقال: هو سنة الصلاة -، وهو قول الاوزاعي وغيره، ورخص فيه قتادة…
والأكثرون على أنه لا تلازم بين الجلسة والاعتماد، فقد كان من السلف من يعتمد ولا يجلس للاستراحة، منهم: عبادة بن نسي، وحكاه عن أبي ريحانة الصحابي…
ولا يبعد إذا قلنا: إن جلسة الاستراحة فعلها تشريعا للأمة، أن يكون الاعتماد فعله كذلك “
“দ্বিতীয় রাকাআতে উঠার সময় কীভাবে উঠবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম বলেছেন উঠার সময় মাটিতে দুই হাত রেখে ভর দিয়ে ওঠা উত্তম; যেমনটি সাহাবি মালিক ইবনু হুয়াইরিস (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এ অভিমত ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম ইসহাক (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর। এমনকি ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর পক্ষ থেকেও এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়, যদিও ক্বাযী আবু ইয়ালা ও অন্যান্য আলেমরা এটিকে বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত আমল বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এছাড়া বহু সালাফ, সাহাবি ও তাবেঈন থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা দ্বিতীয় রাকাআতে উঠার সময় হাত দিয়ে মাটিতে ভর দিতেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু), উবাদাহ ইবন নুসাই, উমর ইবনু আবদুল আজিজ, মাখুল এবং ইমাম যুহরী (রহিমাহুল্লাহ)। ইমাম যুহরী বলেন: “এটি সালাতের একটি সুন্নাহ।” এ মতের পক্ষেই ইমাম আওযায়ীসহ আরও অনেক আলেমের অভিমত রয়েছে। কাতাদা (রহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। বেশিরভাগ আলেমের মতে, বসা এবং হাত দিয়ে ভর দেওয়া এই দুটি কাজের মধ্যে আবশ্যিক কোনো সম্পর্ক নেই। সালাফদের মধ্যে অনেকেই এমন ছিলেন যারা হাত দিয়ে ভর দিতেন কিন্তু বসতেন না। যেমন: উবাদাহ ইবনু নুসাই এবং তিনি সাহাবি আবু রাইহানা (রাযি.) সম্পর্কেও এমন বলেছেন…আর আমরা যদি বলি: বসা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য শরিয়তস্বরূপ আমল তাহলে বলা অসম্ভব নয় যে, হাতের উপর ভর দেওয়াও তেমনি শরিয়তস্বরূপ আমল ছিল।”―(ইবনু রজব আল-হাম্বালী, ফাতহুল বারী শারহু সাহীহিল বুখারী; খন্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ২৯১)
.
ইবনু বাত্তাল (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
“اختلف العلماء في اعتماد الرجل على يديه عند القيام، فروى عن ابن عمر أنه كان يعتمد على يديه إذا أراد القيام، ويروى مثله عن مكحول، وعطاء، ومسروق، والحسن، وهو قول الشافعي، وأحمد.
ورأت طائفة أن لا يعتمد على يديه إلا أن يكون شيخا كبيرا أو مريضا، وروى ذلك عن على بن أبى طالب، وبه قال النخعي، والثوري، وكره الاعتماد ابن سيرين.
وقال الشافعي: كان عمر، وعلى وأصحاب رسول الله ينهضون في الصلاة على صدور أقدامهم، وعن ابن مسعود مثله”
“ইমামগণ ও ফিকহবিদগণ নামাজে সিজদা থেকে উঠার সময়—অর্থাৎ দাঁড়ানোর সময় হাতের ওপর ভর দেওয়ার বৈধতা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি দাঁড়াতে চাইলে নিজের হাতের উপর ভর দিতেন। অনুরূপভাবে মাকহুল, আতা, মাসরূক ও হাসান বসরি(রহিমাহুমুল্লাহ)-এর থেকেও একই ধরনের আমল বর্ণিত হয়েছে। এই অভিমত ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ (রহিমাহুমুল্লাহ)-এরও মতানুযায়ী। অন্যদিকে, আরেক দল আলেমের মতে যারা বলেন হাতের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়; তবে বৃদ্ধ বা দুর্বল ব্যক্তি এর ব্যতিক্রম। এ মত আলী ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, এবং নাখাঈ, সুফিয়ান সাওরি প্রমুখ আলেমগণ এ মতকে সমর্থন করেছেন। এমনকি ইবনু সীরিন (রহিমাহুল্লাহ) হাতের উপর ভর দিয়ে উঠা অপছন্দ করতেন।ইমাম শাফিঈ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “উমর, আলী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক সাহাবী নামাজে সিজদা থেকে উঠার সময় পায়ের আঙুলের উপর ভর করে দাঁড়াতেন।” অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকেও।”(ইবনু বাত্তাল, শারহু সহীহুল বুখারী খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪৪০)
.
ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে বলেন:
ينهض إلى القيام على صدور قدميه معتمدا على ركبتيه، ولا يعتمد على يديه. قال القاضي: لا يختلف قوله، أنه لا يعتمد على الأرض، سواء قلنا: يجلس للاستراحة أو لا يجلس. وقال مالك، والشافعي: السنة أن يعتمد على يديه في النهوض؛ لأن مالك بن الحويرث قال في صفة صلاة رسول الله – صلى الله عليه وسلم – ، إنه لما رفع رأسه من السجدة الثانية استوى قاعدا، ثم اعتمد على الأرض . رواه النسائي. ولأن ذلك أعون للمصلي. ولنا ما روى وائل بن حجر، قال: رأيت رسول الله – صلى الله عليه وسلم – إذا سجد وضع ركبتيه قبل يديه، وإذا نهض رفع يديه قبل ركبتيه رواه النسائي، والأثرم، وفي لفظ: وإذا نهض نهض على ركبتيه، واعتمد على فخذيه . وعن ابن عمر، قال: نهى رسول الله – صلى الله عليه وسلم – أن يعتمد الرجل على يديه إذا نهض في الصلاة . رواهما أبو داود، وقال علي كرم الله وجهه: إن من السنة في الصلاة المكتوبة، إذا نهض الرجل في الركعتين الأوليين، أن لا يعتمد بيديه على الأرض، إلا أن يكون شيخا كبيرا لا يستطيع . رواه الأثرم. وقال أحمد: بذلك جاء الأثر عن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – وعن أبي هريرة، أن النبي – صلى الله عليه وسلم – كان في الصلاة ينهض على صدور قدميه . رواه الترمذي. وقال: يرويه خالد بن إلياس. قال أحمد: ترك الناس حديثه. ولأنه أشق فكان أفضل، كالتجافي والافتراش. وحديث مالك محمول على أنه كان من النبي – صلى الله عليه وسلم – لمشقة القيام عليه لضعفه وكبره، فإنه قال – عليه السلام -: إني قد بدنت، فلا تسبقوني بالركوع ولا بالسجود.
“সালাতে সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় তাকে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং হাঁটুর সাহায্যে দাঁড়াতে হবে; হাতের ওপর ভর দেওয়া উচিত নয়। কাযী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এই বিষয়ে ইমামদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই যে, সালাত আদায়কারী মাটিতে হাত রাখবে না সে ‘ইসতিরাহা’ (বিশ্রামের জন্য বসা) করুক আর না-ই করুক। মালিক ও শাফেয়ি (রহিমাহুমাল্লাহ) বলেন: হাতের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ানো সুন্নত। কারণ, মালিক ইবনে হুয়াইরিস (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণনা করেছেন: “নবী ﷺ যখন তিনি প্রথম রাকআতে দ্বিতীয় সিজদা থেকে মাথা ওঠাতেন, তখন সোজা হয়ে বসতেন। তারপর মাটিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।(এই হাদীস নাসাঈ হা/১১৫৩ বর্ণনা করেছেন)।কারণ এতে নামাজি সহজে দাঁড়াতে পারেন।
আমাদের দলিল হলো: ওয়াইল ইবনে হুজর (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখেছি, তিনি সিজদায় যাওয়ার সময় হাঁটু আগে রাখতেন এবং উঠার সময় হাত আগে উঠাতেন।” (এই হাদীস নাসাঈ ও আহমাদ বর্ণনা করেছেন)। অন্য এক বর্ণনায় আছে:”তিনি হাঁটু ব্যবহার করে উঠে দাঁড়াতেন এবং উরুর ওপর ভর দিতেন।”ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন:”নবী ﷺ নিষেধ করেছেন যে, সালাতে দাঁড়ানোর সময় পুরুষ যেন হাতে ভর না দেয়।”আলী (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন:”ফরজ সালাতে যখন কেউ দ্বিতীয় রাকাআতের পর দাঁড়াতে চায়, সে যেন হাতে ভর না দেয়; তবে যদি সে বৃদ্ধ হয়, তাহলে সে ব্যতিক্রম।”(এই বর্ণনাটি ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন।) ইমাম আহমাদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: এই মাসআলায় সাহাবিদের পক্ষ থেকে একাধিক হাদীস এসেছে। আবু হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে,”নবী ﷺ সালাতে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঠতেন।”(এই হাদীস তিরমিযী বর্ণনা করেছেন)। তবে হাদীসটির বর্ণনাকারী খালিদ ইবনে ইলিয়াস সম্পর্কে ইমাম আহমাদ বলেন: মানুষ তাঁর হাদিস বর্জন করেছে। কারণ, পায়ের ভর দিয়ে উঠা বেশি কষ্টকর, তাই তা উত্তম, যেমন সিজদায় শরীর খোলা রাখা। মালিক ইবনে হুয়াইরিসের বর্ণনাটি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যদি ধরে নেওয়া হয় যে, নবী ﷺ বৃদ্ধ বা দুর্বলতার কারণে ভিন্নভাবে দাঁড়িয়েছেন, যেমন তিনি বলেছিলেন: আমি মোটা হয়ে গেছি, কাজেই তোমরা রুকু বা সিজদার সময় আমাকে অতিক্রম করো না (অগ্রাহ্য করো না)।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২১৫)
.
▪️চতুর্থত: সিজদা থেকে উঠার সময় হাতের উপর ভর দেওয়ার ধরন কেমন হওয়া উচিত? এই মতভেদটি মূলত “আজন” শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও এর প্রয়োগ পদ্ধতি বোঝার পার্থক্য থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।
.
ইবনুস সালাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “এই (আজন) শব্দটি অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। কেউ কেউ শব্দটি ভুল করে “আ’জিয” (অক্ষম ব্যক্তি) পড়ে, আবার কেউ কেউ সঠিক উচ্চারণে “আজন” পড়লেও ভুলভাবে বুঝে নেয় যে, এটি আটা মাখানোর ভঙ্গি তখন তারা হাতের আঙুল মুঠো করে, একত্র করে ভর দেয় এবং হাতের তালু মাটি থেকে তুলে রাখে, যা আসলে সঠিক নয়। ইবনু রজব হাম্বলি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: কিছু আলেম ব্যাখ্যা করেছেন যে, এখানে ‘আজন’ বলতে বোঝানো হয়েছে বৃদ্ধ মানুষ যেভাবে দুই হাতের তালুর ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়; এটি রুটির খামির মাখানোর ভঙ্গি নয়। ফাতহুল বারী; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ২৯৩)
.
শায়খ আবু ফুরাইহান জামাল বিন ফুরাইহান আল-হারিসী বলেন:
“فعلى اختلاف تفسير أهل اللغة والحديث لمعنى “العَجْنُ فِي الصَّلَاةِ” ؛ يظهر لي والله أعلم أنه لا يُشدد في ذلك ولا يُشترط الالتزام والمواضبة على هيئة معينة في النهوض إلى الركعة معتمداً على اليدين سواء النهوض على أليتي الكف – أي : الكفّين منبسطة – أو مقبوضة أصابع كفية ومضمومة ، فالأمر واسع حتى يأتينا نصٌ مرفوع أو في حكم المرفوع يفسر لنا صفة “العجن في الصلاة” .
“যদিও আরবি ভাষাবিদ ও হাদিস বিশারদদের মধ্যে ‘নামাজে আজন (العَجْنُ في الصلاة)’ এর অর্থ নির্ধারণে মতভেদ রয়েছে, তবে আমার দৃষ্টিতে (আল্লাহই ভালো জানেন) এটি স্পষ্ট যে এ বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করা উচিত নয়। নামাজে দাঁড়ানোর সময় হাতের ওপর ভর দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কায়দাকে আবশ্যক মনে করাও সঠিক নয় চাই তা হাত দুটি খোলা রেখে হোক, অথবা আঙুলগুলো মুঠো করে একত্রিত করে হোক। এই বিষয়টি উন্মুক্ত ও সহজসাধ্য, যতক্ষণ পর্যন্ত এমন কোনো সহিহ, স্পষ্ট মারফূ হাদিস পাওয়া না যায় যা সালাতে ‘আজন’ এর প্রকৃত রূপ নির্ধারণ করে দেয়। সুতরাং এ ধরনের বিষয় নামাজকে নষ্ট করে না; বরং ইমামদের মধ্যে যে মতভেদ রয়েছে, তা হলো সালাতে দাঁড়ানোর সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি কোনটি তা নির্ধারণ নিয়ে।”
.
শায়খ বকর আবু জাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
وقال الشيخ بكر أبو زيد: ” وصفة العجن بأن يقوم المصلي من ركعة إلى أخرى على هيئة العاجن، وهو أن يجمع يديه ويتكئ على ظهورهما عند القيام كحال من يعجن العجين. وهذه: هيئة أعجمية، ليست سنة شرعية…ثم العجن له صفتان في لغة العرب: المذكورة، والثانية ببسط الكفين على الأرض، كما هو معروف من حال النساء عند عجن العجين. ومتى كان التشبه بالنساء، أو العمل حال العجز سنة من سنن الهدى…. مع أن الحديث ضعيف لا تقوم به الحجة، وترك التسنن به “.
“সালাতে ‘আজন’ বলতে বোঝানো হয় রাকাআতের মধ্যে দাঁড়ানোর সময় এমনভাবে হাতের ওপর ভর দেওয়া, যেন কেউ আটা মাখাচ্ছে।অর্থাৎ, হাতগুলো মুঠো করে তার ওপর ভর দেওয়া। এই ভঙ্গি আরবের ঐতিহ্যে নেই; বরং এটি আজমী (বিদেশী) রীতির অংশ, এটা কোনো সুন্নত নয়। আরবি ভাষায় ‘আজন’ শব্দের দুই অর্থ আছে (১) হাত খোলা রেখে হাতের তালুতে ভর দেওয়া (যেমন নারীরা ময়দা মাখানোর সময় করে), (২) আঙুলগুলো মুঠো করে ভর দেওয়া। তাই যখন এই ভঙ্গি নারীদের মতো বা দুর্বলতার কারণে করা হয়, তখন তাকে সুন্নত বলা যায় না। বিশেষ করে যদি হাদিস দুর্বল হয়, তা দিয়ে সুন্নতের প্রমাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়”।(সূত্র: আল-ফিকহুল ওয়াযিহ মাযহাব ও প্রবল মত অনুযায়ী, ‘যাদুল মুস্তাকনি’ সালাত অধ্যায়; আরও দেখুন ‘লা জদীদ ফী আহকাম আস-সালাহ’, পৃষ্ঠা: ৪৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◐✪◑▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

লটারি কখন হালাল ও কখন হারাম তা নিয়ে বিস্তারিত

 প্রশ্ন: লাভের আশায় লটারির টিকিট ক্রয় করা কিংবা অর্থের বিনিময় পুরস্কারভিত্তিক লটারি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা এবং তার মাধ্যমে প্রাপ্ত পুরস্কার এর বিধান কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতঃপর লাভের আশায় লটারির (Lottery) টিকিট ক্রয়-বিক্রিয় মূলত জুয়া ও বাজিরই আরেক নাম। এটি জুয়ার এমন একটি রূপ, যাকে ‘ভাগ্যপরীক্ষা’ বলে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয়।জুয়ার সংজ্ঞায় শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,أن يؤخذ مال الإنسان وهو على مخاطرة : هل يحصل له عوضه أو لا يحصل “জুয়া (قمار) বলা হয়, এমনভাবে মানুষের নিকট অর্থ গ্রহণ করা যে, সে তার বিনিময় পাবে নাকি না সে ব্যাপারে ঝুঁকিতে থাকে।”(মাজমুল ফাতাওয়া; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ২৮৩) আবু বাক্বার আল-হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:كل لعب يشترط فيه – غالبًا – أن يأخذ الغالبُ شيئا من المغلوب ، فهو قمار“
প্রতিটি খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতা, যাতে (সাধারণত) এই শর্ত থাকে যে বিজয়ী ব্যক্তি পরাজিত ব্যক্তির নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করবে তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।” (আল-কুল্লিয়্যাত, পৃষ্ঠা: ৭০২) কোনও কোনও ফকিহের মতে, জুয়াঁ হল, كل لعب يشترط فيه أن يأخذ الغالب من المغلوب شيئا “যে খেলায় এই শর্ত থাকে যে, বিজয়ী ব্যক্তি পরাজিত ব্যক্তি থেকে কোনও কিছু গ্রহণ করবে।” [almaany]
.
জুয়া খেলায় মূলত নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ বা বস্তু (যা পুরস্কার হিসেবে ধার্য করা হয়) নির্ধারণ করা হয়। তারপর কোনও একটি বিষয়ে দুই পক্ষ চুক্তি করে হার-জিত নির্ধারণ করে। যে পক্ষ হেরে যায় সে অপর পক্ষকে সেই নির্ধারিত অর্থ বা বস্তু প্রদান করে। এই খেলায় হেরে যাওয়া বা জিতে যাওয়াতে উভয় পক্ষেরই ঝুঁকি নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ: কেউ দশ টাকা দিয়ে একটি টিকিট কিনে, যার মাধ্যমে সে হয়তো দশ লক্ষ টাকার পুরস্কার জেতার সুযোগ পায়।পুরস্কার পেলে সে প্রচুর লাভবান হয়, আর না পেলে পুরো টাকাটাই হারিয়ে ফেলে। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে জুয়ার প্রকৃত স্বরূপ: লাভ কিংবা ক্ষতি কেবলই অনিশ্চিত সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল।কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলসমূহের ভিত্তিতে এ ধরনের ড্র ও লটারিতে অংশগ্রহণ স্পষ্টত হারাম। আর এ হারাম উপায়ে পুরস্কার জেতার আশায় অর্থ ব্যয় করাও গর্হিত ও নিন্দনীয় হারাম কাজ।আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ- إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ :”হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের একটি ঘৃণ্য কাজ; অতএব এসব থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা সফল হতে পার।শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?”(সূরা মায়িদা: ৯০-৯১) অপর আয়াতে আল্লাহ আরো বলেছেন;”হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)।”(সূরা নিসা: ২৯) ইবনু আব্বাস ও ইবনু উমর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) বলেন:“الْمَيْسِر (মাইসির) অর্থই হলো জুয়া।”(তাফসির ইবনু কাসীর, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৭৮) এই আয়াতগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,জুয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং তা থেকে বাঁচা ঈমানদারদের জন্য অপরিহার্য।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: কিছু কিছু দাতব্য সংস্থা তাদের শিক্ষামূলক, চিকিৎসামূলক এবং সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য লটারির (ইয়ানাসিব) আয়োজন করে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এর বিধান কী?”
উত্তরে শাইখ বলেন:
عمليات اليانصيب عنوان لعب القمار ، وهو الميسر ، وهو محرم بالكتاب والسنة والإجماع ، كما قال الله عز وجل : ( يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (90) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ (91) ) .ولا يحل لجميع المسلمين اللعب بالقمار مطلقاً سواء كان ذلك المال الذي يحصل بالقمار يصرف في جهات بر أو في غير ذلك ؛ لكونه خبيثاً محرَّماً لعموم الأدلة ؛ ولأن الكسب الحاصل بالقمار من الكسب الذي يجب تركه والحذر منه ، والله ولي التوفيق .
“লটারির (ইয়ানাসিব) কার্যক্রম মূলত জুয়ারই একটি রূপ। আর জুয়া হলো ‘মাইসির’ (مَيْسِر), যা কুরআন, সুন্নাহ এবং মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্য অনুযায়ী হারাম (নিষিদ্ধ)। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করেন: হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের একটি ঘৃণ্য কাজ; অতএব এসব থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা সফল হতে পার।শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?”(সূরা মায়িদা: ৯০-৯১) সুতরাং সকল মুসলিমের জন্যই জুয়া খেলা হারাম সেটি যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন। এমনকি যদি সেই অর্থ কল্যাণমূলক বা দানযোগ্য কাজে ব্যয় করা হয় তবুও তা বৈধ নয়। কারণ, এটি একটি অপবিত্র ও হারাম উপার্জন। জুয়া থেকে অর্জিত সম্পদ অবৈধ উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত, যা পরিহার করা ও এর থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক। আল্লাহই তাওফিক দানকারী।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪৪২)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: লটারি) তে অংশগ্রহণ করার হুকুম কী? অংশগ্রহণ বলতে বোঝানো হচ্ছে এক ব্যক্তি একটি টিকিট কিনে, তারপর যদি সৌভাগ্যবশত জিতে যায়, তবে সে একটি বড় অঙ্কের অর্থ পায়। প্রশ্নকারী জানিয়েছেন, তিনি যদি এই অর্থ পান, তাহলে তিনি তা ইসলামী প্রকল্পে ব্যয় করবেন এবং মুজাহিদদের সাহায্যে কাজে লাগাবেন যাতে তারা উপকৃত হতে পারে। উত্তরে শাইখ বলেন:
هذه الصورة التي ذكرها السائل : أن يشتري تذكرة ثم قد يحالفه الحظ – كما يقول – فيربح ربحاً كبيراً : هذه داخلة في الميسر الذي قال الله تعالى فيه : يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (90) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ (91) وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَاحْذَرُوا فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّمَا عَلَى رَسُولِنَا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ (92) سورة المائدة / الآيات : 90 – 92 .فهذا الميسر – وهو كل معاملة دائرة بين الغُنم والغُرم – : لا يدري فيها المعامِل هل يكون غانماً أو يكون غارماً ، كله محرَّم ، بل هو من كبائر الذنوب ، ولا يخفى على الإنسان قبحه إذا رأى أن الله تعالى قرنه بعبادة الأصنام وبالخمر والأزلام ، وما نتوقع فيه من منافع : فإنه مغمور بجانب المضار ، قال تعالى : ( يسئلونك عن الخمر والميسر قل فيهما إثم كبير ومنافع للناس وإثمهما أكبر من نفعهما ) سورة البقرة / الآية : 219 .وتأمل هذه الآية حيث ذكر المنافع بصيغة الجمع ، وذكر الإثم بصيغة المفرد ، فلم يقل ” فيهما آثام كبيرة ومنافع للناس ” بل قل : إثم كبير ، إشارة إلى أن المنافع مهما كثرت ومهما تعددت فإنها مغمورة بجانب هذا الإثم الكبير ، والإثم الكبير راجح بها ، فإثمهما أكبر من نفعهما مهما كان فيهما من النفع الحاصل بهما.إذن لا يجوز للإنسان أن يتعامل بيناصيب وإن كان غرضه أن ما يحصله سوف يضعه في منافع عامة كإصلاح الطرق وبناء المساجد وإعانة المجاهدين وما أشبه ذلك ، بل إنه إذا صرف هذه الأموال المحرمة التي اكتسبها بطريق محرم ، إذا صرفها في هذه الأشياء يريد التقرب بها إلى الله فإن الله لا يقبلها منه ، ويبقى عليه الإثم ويحرم من الأجر ، لأن الله تعالى طيب لا يقبل إلا طيباً. وإن صرفها في هذه المصالح والمنافع كبناء المساجد تخلصاً منها فهذا من السفه ، إذا كيف يكتسب الإنسان الخطيئة ثم يحاول التخلص منها ، والعقل كل العقل الذي يؤيده الشرع أن يدع الخطيئة أصلاً دون أن يتلطخ بها ثم يحاول أن يتخلص منها ، وعلى هذا فإنه لا يجوز للإنسان أن يكتسب هذا المال الحرام لأجل أن يقيم عليه أشياء يتقرب بها إلى الله ، ولا أن يكتسبه وهو ينوي أنه إذا حصله تخلص منه بصرفه فيما ينفع العباد ، بل الواجل على المؤمن أن يدع المحرم رأساً ولا يتلبس به .
“প্রশ্নকারী যে পরিস্থিতি বা চিত্রটি বর্ণনা করেছেন—যে, কেউ একটি টিকিট ক্রয় করে, তারপর ভাগ্য সহায় হলে (যেমনটা বলা হয়) সে একটি বড় পুরস্কার জিতে নিতে পারে—এটি সেই মাইসির (জুয়া)-এর অন্তর্ভুক্ত, যার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:”হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের একটি ঘৃণ্য কাজ; অতএব এসব থেকে দূরে থাক; যাতে তোমরা সফল হতে পার।শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?”আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের আর সাবধান হও। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে জেনে রাখ যে, আমার রাসূলের দায়িত্ব শুধু সুস্পষ্টভাবে (আমার বাণী) পৌঁছে দেয়া।”(সূরা মায়েদাহ: ৯০–৯২) এই ‘মাইসির’ বা জুয়া যা এমন প্রতিটি লেনদেনের অন্তর্ভুক্ত যেখানে লাভ ও ক্ষতির মাঝে দোদুল্যমানতা থাকে, অর্থাৎ লেনদেনকারী জানে না, সে লাভবান হবে না ক্ষতিগ্রস্ত হবে? এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের লেনদেনের নিকৃষ্টতা কারো অজানা নয়, বিশেষত যখন সে লক্ষ্য করবে আল্লাহ তাআলা একে মদ, প্রতিমা পূজা ও ভাগ্য নির্ধারণকারী তীর নিক্ষেপের মতো জঘন্য কাজগুলোর সঙ্গে একসারিতে রেখেছেন। আর অনেকে যে সম্ভাব্য উপকারের আশায় লটারিতে অংশগ্রহণ করে, সেটি বাস্তবে একেবারেই তুচ্ছ। বরং এর ক্ষতি উপকারের তুলনায় অনেক বেশি। যেমন আল্লাহ বলেন:“তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এতে রয়েছে মারাত্মক পাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে; কিন্তু তাদের পাপ উপকারের তুলনায় অনেক বড়।”(সূরা আল-বাকারা: ২১৯) এই আয়াতটি গভীরভাবে চিন্তা করুন, যেখানে আল্লাহ ‘উপকারিতা’ শব্দটি বহুবচনে বলেছেন, অথচ ‘পাপ’ শব্দটি একবচনে ব্যবহার করেছেন। তিনি (আল্লাহ) বলেননি: ‘তাতে রয়েছে বড় বড় পাপ এবং বহু উপকারিতা’,বরং বলেছেন: ‘তাতে রয়েছে বড় পাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারিতা।’ এভাবে বলার মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে—উপকারিতাগুলো যত বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অধিক হোক না কেন! ওই ‘বড় পাপ’-এর তুলনায় সেগুলো একেবারেই তুচ্ছ ও অপ্রতুল। এই পাপ এতটাই প্রবল ও গুরুতর যে, তা সমস্ত উপকারকে ঢেকে দেয়।কাজেই, এতে যতটুকু উপকারই থাকুক না কেন, তার ক্ষতি ও গুনাহের দিকটি অনেক বড়, এবং ভয়াবহ। সুতরাং মানুষের জন্য লটারি, জুয়া বা এই জাতীয় যেকোনো লেনদেনে অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়—এমনকি যদি তার উদ্দেশ্য হয় সেই অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করা যেমন রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কার, মসজিদ নির্মাণ, মুজাহিদদের সহায়তা অথবা অন্য কোনো সৎ কাজ,বরং কেউ যদি হারাম অর্থ উপার্জন করে তা (মসজিদ নির্মাণ, গরিব-দুঃখীর সাহায্য) বা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে এই আশায় যে, এতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন ও নিজেও সওয়াব লাভ করবে তাহলে সে মারাত্মক ভুল করছে। কেননা, আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র (হালাল ও খাঁটি) জিনিসই কবুল করেন। এমন ব্যক্তি সেই গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে না, বরং তার সদকা বা দান গ্রহণযোগ্য হবে না,কেননা ভিত্তিই ছিল নাজায়েয। আর কেউ যদি এই অর্থ মসজিদ নির্মাণের মতো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে শুধুমাত্র এর থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাহলে সেটিও একপ্রকার ধোঁকা ও মূর্খতার পরিচায়ক। কারণ, একজন জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহে লিপ্ত হয় না যে, পরে সেই গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার কৌশল খুঁজবে। বরং প্রকৃত প্রজ্ঞা ও তাকওয়া এটাই যে, শুরু থেকেই গুনাহ ও হারাম উপার্জন থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা। সুতরাং, কোনো মুসলিম যেন এ নিয়তে হারাম উপার্জন না করে যে, পরে তা সদকা করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে কিংবা লোকদের উপকারে তা ব্যয় করবে। বরং একজন মু’মিনের কর্তব্য হলো হারাম উপার্জন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা এবং তা নিজের জীবনে কখনো স্থান না দেওয়া।”(উবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬; ফাতাওয়া ইসলামিয়াহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪৪১)
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬
প্রশ্ন: বর্তমানে কিছু ব্যবসায়ী সোশ্যাল মিডিয়ায় পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতাদের কুপন দিয়ে লটারি ড্র আয়োজন করে, যার উদ্দেশ্য থাকে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা, যেখানে উমরাহ, মোটরসাইকেল, এসি, ফ্রিজ ইত্যাদি উপহার দেওয়া হয়।শরিয়তের দৃষ্টিতে এমন লটারিতে অংশগ্রহণের হুকুম কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিক্রি বৃদ্ধি ও গ্রাহক আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। এই বিষয়ে আমাদের সমসাময়িক তথা বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয় এবং তাদের অভিমত মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত। প্রথম অভিমত: এই ধরনের প্রতিযোগিতা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় অভিমত: নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এগুলো বৈধ হতে পারে। যাঁরা এগুলোকে সম্পূর্ণরূপে হারাম বলে ফাতওয়া দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা,এবং বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ)। এবং যারা কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে বৈধ বলেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) নিচে উভয় মতের পক্ষে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ও ফাতওয়া উল্লেখ করা হলো:
.
▪️প্রথম মত অনুযায়ী যারা নিষিদ্ধ বলেছেন:
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আমেরিকায় কিছু খাদ্যপণ্যের দোকান রয়েছে, যারা গ্রাহকদের কাছ থেকে কিছু ক্রয় করার সময় অজানা কিছু নম্বর দেয়। নির্দিষ্ট কিছু নম্বর সংগ্রহ করতে পারলে দোকান কর্তৃপক্ষ একটি পুরস্কার প্রদান করে, যা সাধারণত নগদ অর্থ হয়। এসব নম্বর কেবলমাত্র কেনাকাটার মাধ্যমেই পাওয়া যায়; এতে কোনো অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হয় না। প্রশ্ন হলো এভাবে প্রাপ্ত পুরস্কার গ্রহণ করা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ? উত্তরে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:
إذا كان الأمر كما ذكرت فلا يجوز لك أخذ الجائزة التي يدفعها المحل التجاري بسبب شرائك منه أو زيارتك له واختبارك الرقم الذي كان مجهولاً لك وقت الاختيار وصار معلوماً بعد الاختيار لأن هذا من الميسر وقد علم تحريمه بالكتاب والسنة وإجماع أهل العلم .
“যদি বাস্তবতা এমনই হয়, যেমনটি আপনি উল্লেখ করেছেন, তাহলে এই ধরনের পুরস্কার গ্রহণ করা বৈধ নয়,যেখানে আপনি কেবল কোনো দোকান থেকে পণ্য ক্রয় করেছেন বা কোনো সফরে অংশ নিয়েছেন, আর তার মাধ্যমে এমন একটি নাম্বার নির্বাচন করেছেন, যা তখন আপনার অজানা ছিল এবং পরে তা প্রকাশিত হয়েছে। এটি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআন, সুন্নাহ ও সম্মানিত উলামায়ে কিরামের ঐকমত্য অনুযায়ী সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ১৯১; ফাতওয়া নং ৫৮৪৭)
.
স্থায়ী কমিটির আলেমগনকে আরও একটি প্রশ্নে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “আমাদের এখানে কিছু দোকানদার একটি চিপসের কার্টুন ১০০ রিয়ালে বিক্রি করে, অথচ অন্যান্য দোকানে সেটির দাম মাত্র ২০ রিয়াল। তারা লোকদের আকৃষ্ট করতে পুরস্কার হিসেবে গাড়ি ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিস রাখে। ফলে মানুষ সেগুলো কিনে পুরস্কার পাওয়ার আশায় সেই দোকানে ভিড় জমায়। এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি? উত্তরে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:
هذا العمل الذي سألت عنه لا يجوز بل هو منكر ومن الميسر الذي حرمه الله لما فيه من المخاطرة والغرر وأكل أموال الناس بالباطل وقد قال الله عز وجل : ( يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (90) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمْ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنْ الصَّلاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ(91) .وقال سبحانه : ( يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ ) .وقد صح عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه نهى عن بيع الغرر وفقك الله لكل خير وأعانك ويسر أمرك .
“আপনি যে কার্যটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন, তা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়; বরং এটি একটি গর্হিত কাজ এবং জুয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তা‘আলা নিষিদ্ধ করেছেন। কারণ, এতে রয়েছে ঝুঁকি, প্রতারণা ও মানুষের সম্পদ অন্যায়ের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: “হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও ছালাতে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত হবে না?’ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০-৯১) তিনি আল্লাহ আরো বলেছেন; হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না, তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে ব্যবসার মাধ্যমে (গ্রহণ করলে তা বৈধ)।”(সূরা নিসা: ২৯) এছাড়া সহিহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘বাই‘ উল-গারার’ (অস্পষ্টতা ও প্রতারণা সংশ্লিষ্ট বেচাকেনা) নিষিদ্ধ করেছেন।আল্লাহ আপনাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন, আপনাকে সহায়তা করুন এবং আপনার জন্য সকল কাজ সহজ করে দিন।।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ১৯৫; ফাতওয়া নং ১৮৩২৪)
.
স্থায়ী কমিটির আলেমদেরকে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল: “কিছু টেলিফোন কোম্পানি কলকারীদের উপহার বা পুরস্কার দিয়ে থাকে, যাতে মানুষ একাধিকবার কল করতে উৎসাহিত হয় এর শরয়ি হুকুম কী?”
.
উত্তরে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:
ما يعطى للمتصلين بالهواتف من المراكز العامة باسم الهدايا على النظام المذكور لا يجوز لما فيه من المقامرة والتغرير بالناس وأكل المال بالباطل من أجل ترويج الاتصالات الهاتفية وزيادة الدخل منها مع ما يتبع ذلك من الشحناء وإيقاد نار العداوة والبغضاء بين أصحاب المراكز أنفسهم وبين المتصلين أيضاً والله تعالى يقول : ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ(90)إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمْ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنْ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ(91) .
“উল্লেখিত পদ্ধতিতে টেলিফোন কেন্দ্রগুলো জনসাধারণের জন্য যে উপহার বা পুরস্কার দিয়ে থাকে, তা বৈধ নয়। কারণ এতে জুয়া (মাইসির), প্রতারণা এবং অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ রয়েছে যার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো: ফোন কল প্রচারের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি করা। এর পাশাপাশি এতে মানুষের মাঝে বিদ্বেষ, হিংসা ও শত্রুতা সৃষ্টি হয় হোক তা টেলিফোন কেন্দ্রগুলোর মালিকদের মাঝে, অথবা ফোনকলকারীদের মাঝে।আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে মুমিনগণ! নিঃসন্দেহে মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ধারণের তীরসমূহ সবই শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। নিশ্চয়ই শয়তান মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে চায়। তবে কি তোমরা বিরত থাকবে না?”(সূরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৯০-৯১; ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ১৯৬; ফাতওয়া নং-১৯৫৬০)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] এর নিকট নিম্নোক্ত প্রশ্নটি উপস্থাপন করা হয়েছিল: “আমাদের শহরে একটি সমবায় সংস্থা রয়েছে, যারা তাদের দোকানের প্রবেশদ্বারে একটি গাড়ি প্রদর্শন করেছে। যে কেউ ১০০ দিরহাম বা তদূর্ধ্ব মূল্যের পণ্য ক্রয় করবে, তাকে একটি কুপন বিনামূল্যে প্রদান করা হয়, যাতে লেখা থাকে “মূল্য: ১০ দিরহাম”। পরবর্তীতে একটি লটারি আয়োজন করা হয়, যেখানে তাদের ভাষায় ‘সৌভাগ্যবান বিজয়ী’ উক্ত গাড়ি লাভ করে। আমার দুটি প্রশ্ন হলো:
(১) এ লটারিতে অংশগ্রহণ করার শরয়ি বিধান কী, যেখানে কুপনটি ক্রেতাকে বিনামূল্যে প্রদান করা হয় এবং সে বিজয়ী না হলেও তার কোনো আর্থিক ক্ষতি হয় না?
(২) এই সমবায় প্রতিষ্ঠান থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুপন পাওয়ার উদ্দেশ্যে কেনাকাটা করার বিধান কী? কারণ এখানকার সাধারণ মানুষ এমনকি অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিও এই বিষয়ে দ্বিধান্বিত। তাই আমি দলিলসহ সুস্পষ্ট একটি উত্তর কামনা করছি, যাতে মুসলিমরা তাদের দ্বীনের ব্যাপারে নিশ্চিত অবস্থানে থাকতে পারে। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
.
ইমাম ইবনু বায (রহিমাহুল্লাহ) এর জবাব:
( هذه المعاملة تعتبر من القمار وهو الميسر الذي حرمه الله والمذكور في قوله تعالى : ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنْصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ ) المائدة/90ـ91 ، فالواجب على ولاة الأمر وأهل العلم في الفجيرة وغيرها إنكار هذه المعاملة والتحذير منها ، لما في ذلك من مخالفة كتاب الله العزيز وأكل أموال الناس بالباطل ، رزق الله الجميع الهداية والاستقامة على الحق
“এই লেনদেনটি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা মাইসির তথা সেই গ্যাম্বলিং যাকে আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন। তিনি আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:”হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত হবে না?”।(সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০-৯১) সুতরাং ফুজাইরাহ সহ অন্যান্য স্থানের শাসক, দায়িত্বশীল ও বুদ্ধিজীবীদের উচিত এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। কেননা এটি কুরআনের আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভক্ষণ করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা সকলকে হিদায়াত দান করুন এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।(মাজাল্লাতুদ দাওয়াহ, সংখ্যা ১১৪৫, তারিখ ২৯/১০/১৪০৮ হি.)।
.
▪️দ্বিতীয় মত অনুযায়ী যারা শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ বলেছেন।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ক্রেতার জন্য কুপনের মাধ্যমে লটারি ড্র করে পুরস্কার জেতার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার পর দু’টি শর্ত সাপেক্ষে জায়েয করেছেন। তিনি বলেন,
( الشركات – الآن – تجعل جوائز لمن يشتري منها ، فنقول : هذه لا بأس بها بشرطين :
الشرط الأول :
أن يكون الثمن – ثمن البضاعة – هو ثمنها الحقيقي ، يعني : لم يرفع السعر من أجل الجائزة ، فإن رفع السعر من أجل الجائزة : فهذا قمار ولا يحل .
الشرط الثاني :
ألاَّ يشتريَ الإنسان السلعة من أجل ترقب الجائزة ، فإن كان اشترى من أجل ترقب الجائزة فقط ، وليس له غرض في السلعة : كان هذا من إضاعة المال ، وقد سمعنا أن بعض الناس يشتري علبة الحليب أو اللبن ، وهو لا يريدها لكن لعله يحصل على الجائزة ، فتجده يشتريه ويريقه في السوق أو في طرف البيت ، وهذا لا يجوز ؛ لأن فيه إضاعة المال ، وقد نهى النبي – صلى الله عليه وسلم – عن إضاعة المال
“বর্তমান সময়ে কোম্পানীগুলো তাদের ক্রেতাদের যে সমস্ত পুরস্কার দিয়ে থাকে, আমরা বলি: দু’টি শর্ত সাপেক্ষে তা দোষনীয় নয়। যথা:
(ক) দ্রব্যমূল্যটা প্রকৃত অর্থেই পণ্যের বর্তমান বাজার দর হতে হবে। পুরস্কারের কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা যাবে না। যদি পুরস্কারের কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে এটি জুয়া হয়ে যাবে, যা জায়েয নয়।
(খ) মানুষ যেন শুধু পুরস্কার জেতার জন্য পণ্যটি ক্রয় না করে। কেউ যদি শুধু পুরস্কার জেতার জন্য ক্রয় করে, আদতে পণ্য ক্রয় করা উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে এটি জায়েয নয়। কেননা এর মধ্যে অর্থের অপচয় রয়েছে,আমরা শুনেছি কেউ কেউ দুধ বা দইয়ের কৌটা কেনে শুধুমাত্র পুরস্কারের আশায়, তারপর তা ফেলে দেয় বাজারে বা বাড়ির পাশে। এটি বৈধ নয়, কারণ এটি সম্পদের অপচয়, আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সম্পদের অপচয় থেকে নিষেধ করেছেন।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১১৬২)।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আমাদের দেশে (কুয়েতে) এক ধরনের বিক্রয় পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে। একজন ব্যবসায়ী তার পণ্যসমূহ প্রদর্শন করেন এবং ক্রেতারা যে পরিমাণে পণ্য ক্রয় করে, সে পরিমাণ অনুযায়ী তাদের কুপন প্রদান করেন। পরে এই কুপনগুলোর মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বিজয়ী নির্বাচন করা হয়, যারা ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে পুরস্কার পেয়ে থাকে। প্রশ্ন হলো, শরিয়তের দৃষ্টিতে এই পদ্ধতির হুকুম কী? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন:
هذا نوع من البيع نخاطب به البائع والمشتري ، فنقول للبائع : هل أنت ترفع سعر السلعة من أجل هذه الجائزة أم لا ؟ فإن كنت ترفع السعر : فإنه لا يجوز ؛ لأنه إذا رفع السعر واشترى الناس منه : صاروا إما غارمين وإما غانمين ، إما رابحين وإما خاسرين ، فإذا كانت هذه السلعة في السوق – مثلاً – قيمتها عشرة فجعلها باثني عشر من أجل الجائزة : فهذا لا يجوز ؛ لأن المشتري باثني عشر إما أن يخسر الزائد على العشرة ، وإما أن يربح أضعافاً مضاعفة بالجائزة ، فيكون هذا من باب الميسر والقمار المحرم .فإذا قال البائع : أنا أبيع بسعر الناس ، لا أزيد ولا أنقص : فله أن يضع تلك الجوائز ، تشجيعاً للناس على الشراء منه .ثم نتجه إلى المشتري فنقول له : هل اشتريت هذه السلعة لحاجتك إليها ، وأنك كنت ستشتريها سواء كانت هناك جائزة أم لا ، أم أنك اشتريتها من أجل الجائزة فقط ؟ فإن قال : الأول : قلنا : لا بأس أن تشتري من هذا أو من هذا ؛ لأن السعر ما دام أنه كسعر السوق ، وأنت ستشتري هذه السلعة لحاجتك : فحينئذ تكون إما غانماً أو سالماً ، ففي هذه الحالة لا بأس أن تشتري من صاحب الجوائز .وأما إذا قال : أنا أشتري ، ولا أريد السلعة ، وإنما أشتري لأجل أن أحصل على الجائزة : قلنا : هذا من إضاعة المال ؛ لأنك لا تدري أتصيب الجائزة أم لا تصيبها .
وقد بلغني أن بعض الناس يشتري علب اللبن ، وهو لا يريدها ، يشتريها ويريقها لعله يحصل على الجائزة ، فهذا يكون من إضاعة المال ، وقد ثبت أن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن إضاعة المال .بقي شيء ثالث : إذا قال قائل : هذه المعاملة ربما تضر بالبائعين الآخرين ؛ لأن هذا البائع إذا جعل جوائز للمشترين ، وكان سعره كسعر السوق : اتجه جميع الناس إليه ، وكسدت السلع عند التجار الآخرين ، فيكون في هذا ضرر على الآخرين ، فنقول : هذا يرجع إلى الدولة ، فيجب عليها أن تتدخل ، فإذا رأت أن هذا الأمر يوجب اضطراب السوق : فإنها تمنعه إذا رأت أن المصلحة في منعه ، أو إذا رأت أنه من التلاعب في الأسواق ، والتلاعب في الأسواق يجب على ولي الأمر أن يمنعه منها “
“এটি এমন এক ধরনের ক্রয়-বিক্রয়, যেখানে বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয় পক্ষকেই লক্ষ্য করে কথা বলতে হয়। এক্ষেত্রে আমরা বিক্রেতার উদ্দেশ্যে বলব: আপনি পুরস্কারের জন্য দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করেছেন কি-না? যদি করে থাকেন, তাহলে জায়েয নয়। কেননা যদি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা হয়, আর মানুষ তা ক্রয় করে, সেক্ষেত্রে তারা হয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে নতুবা লাভবান। উদাহরণস্বরূপ যদি পণ্যের বাজার দর ১০ রিয়াল হয়, আর পুরস্কারের জন্য যদি তার মূল্য ১২ রিয়াল করে দেয়, তাহলে তা জায়েয নয়। কেননা এক্ষেত্রে যে ১২ রিয়াল দিয়ে কিনলো, সে হয় অতিরিক্ত ২ রিয়াল হারাল, নয়তো পুরস্কার পেয়ে অনেক বেশি লাভ করল। এতে এটি জুয়া ও মাইসিরের (সৌভাগ্যের ভিত্তিতে সম্পদ অর্জনের) শামিল হয়ে যায়, যা ইসলামে হারাম। পক্ষান্তরে যদি বিক্রেতা বলেন: “আমি বাজারমূল্যেই পণ্য বিক্রি করছি, কোনো অতিরিক্ত মূল্য নিচ্ছি না”, তবে তিনি মানুষকে উৎসাহিত করতে পুরস্কার দিতে পারেন। অতঃপর আমরা ক্রেতার উদ্দেশ্যে বলব: আপনি কি আপনার প্রয়োজনেই পণ্যটি ক্রয় করেছেন? যদি পুরস্কার না থাকতো তবুও কি আপনি ক্রয় করতেন? না-কি আপনি শুধু পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য ক্রয় করেছেন? যদি বলেন: “প্রয়োজন ছিল,পুরস্কার থাকুক বা না থাকুক আমি কিনতাম”, তাহলে আমরা বলি: এতে কোনো অসুবিধা নেই। আপনি যেহেতু বাজার মূল্যে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনেছেন, আপনি তখন হয় উপকৃত হবেন অথবা অন্তত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। কিন্তু যদি বলেন: “আমি পণ্য চাই না, শুধু পুরস্কারের জন্য কিনেছি”, তাহলে আমরা বলব:সেক্ষেত্রে (এটি জুয়া) ও অর্থ অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা আপনি জানেন না যে, আপনি পুরস্কার পাবেন কি-না! আমার কাছে সংবাদ এসেছে, কিছু মানুষ এমনভাবে দুগ্ধজাত পণ্যের প্যাকেট কিনে যদিও তাদের দুধের কোনো প্রয়োজনই নেই; বরং তারা কেবল পুরস্কারের আশায় তা ক্রয় করে পরে ফেলে দেয়। এ তো নিছক অর্থের অপচয়। অথচ প্রমাণিত রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে সম্পদ অপচয় নিষেধ করেছেন। তৃতীয় আরও একটি বিষয় অবশিষ্ট রয়েছে। কেউ যদি এভাবে বলেঃ“এই ধরণের লেনদেন অর্থাৎ ক্রেতাদের জন্য পুরস্কার নির্ধারণ অন্যান্য বিক্রেতাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ, যদি এই বিক্রেতা বাজারমূল্যে পণ্য বিক্রি করে এবং সাথে ক্রেতাদের জন্য পুরস্কার নির্ধারণ করে, তবে স্বাভাবিকভাবেই সব ক্রেতা তার দিকেই ছুটবে, ফলে অন্যান্য ব্যবসায়ীর পণ্য বিক্রি হবে না। এতে অন্যদের ক্ষতি হবে। তখন আমরা বলব: এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র চাইলে এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। যদি তারা দেখেন যে এই ধরণের কার্যক্রম বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে,তবে প্রয়োজন হলে এটা নিষিদ্ধ করতে হবে। অথবা যদি তারা মনে করেন এটি একধরনের প্রতারণামূলক চালবাজি এবং বাজার ব্যবস্থাকে ধোঁকা দেওয়ার শামিল, তাহলে তা প্রতিহত করা ওয়ালী (রাষ্ট্রীয় শাসক) তথা দায়িত্বপ্রাপ্ত শাসনকর্তার কর্তব্য।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বা’আত বাবিল-মাফতুহ লিক্বা নং-৪৯, প্রশ্ন-৫)
.
ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)- ফাতওয়া উল্লেখ করে শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন,وهذا القول هو الأقرب ـ إن شاء الله ـ مادام الإنسان متحققا في قرارة نفسه من انطباق الشرط الثاني عليه إذ هو وحده الذي يعلم من نفسه ما لا يعلمه غيره من البشر .”এই মতামতটাই ইনশাআল্লাহ দলীলের অধিক নিকটবর্তী। যদি কোনো ব্যক্তি হৃদয়ের গভীরে নিশ্চিতভাবে অনুভব করে যে, দ্বিতীয় শর্তটি (প্রয়োজনীয়তার জন্য ক্রয় করা) তার ওপর প্রযোজ্য। কারণ সে-ই একমাত্র ব্যক্তি যে নিজেকে এমনভাবে জানে, যেমনভাবে অন্য কেউ জানে না।”(ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব,ফৎওয়া নং-২২৮৬২, ৯৭৬৪৮)।
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনার আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য কূপনের মাধ্যমে লটারী ড্র করে যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, তা বৈধ নাকি অবৈধ তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রামাণ্য দলিল ও বিশ্লেষণের আলোকে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো যদি কুপনের কারণে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি না করা হয়, ক্রেতাকে ধোঁকা দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য না থাকে এবং ক্রেতা শুধুমাত্র পুরস্কার পাওয়ার আশায় নয়, বরং প্রকৃত প্রয়োজনেই সেই পণ্য ক্রয় করে তাহলে এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ গণ্য হবে। এমনকি সে লটারিতে বিজয়ী হলে পুরস্কার গ্রহণ করাও বৈধ হবে। কারণ, এটি মূলত একটি প্রচারমূলক কৌশল, যা মূল্যছাড় বা বিশেষ অফারের মতোই একটি বৈধ ব্যবসায়িক উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমনটি আমাদের ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) ব্যাখ্যা করেছেন। (আল্লাহ তা‘আলাই অধিক অবগত)।
▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬
সম্পাদনায়: শাইখ ড. আবু বকর মোহাম্মদ যাকারিয়া (হাফিযাহুল্লাহ)।
অনার্স, মাস্টার্স, এম-ফিল, পি.এইচ.ডি মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সৌদি আরব।
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate