Friday, June 20, 2025

দুই তিনটার বেশি পোশাক থাকা কি অপচয়

 প্রশ্ন: দুই-তিনটার বেশি পোশাক থাকা কি অপচয়? অতিরিক্ত দামি পোশাক, গয়না ইত্যাদি ব্যবহার করা কি অপচয়? অপচয়ের মূলনীতি কী?

উত্তর: জীবন যাপনের ক্ষেত্রে ইসলাম কিছু মূলনীতি দিয়েছে সেগুলো আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত। যেমন:
১ অপচয় না করা:
ইসলামে অপচয় অত্যন্ত নিন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
(يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ)
❝হে আদমসন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের শোভা-পোশাক পরিধান করো। খাও ও পান করো। তবে অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।❞
— [সূরা আ’রাফ: ৩১]
> এখানে “শোভা-পোশাক” বলতে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর এবং পর্দানুযায়ী উপযুক্ত পোশাক বোঝানো হয়েছে যা নামাজের মর্যাদার উপযোগী।
আর খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুলতা ও অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অপচয় আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা, বরকত হীনতা এবং সর্বোপরি ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
তবে ইসলামের দৃষ্টিতে অপচয়ের বিষয়টি আপেক্ষিক। তা মানুষের অবস্থার উপর নির্ভরশীল। একজন দরিদ্র মানুষের জন্য যে জিনিসটি ‘অপচয়’ হিসেবে গণ্য হতে পারে তা ধনীর জন্য খুবই সাধারণ বলে গণ্য হবে।
২. অহংকার না করা। ইসলামে অহংকার করা মারাত্মক অপরাধ।
৩. দরিদ্রদেরকে ভুলে না যাওয়া। আমাদের জন্য আবশ্যক হলো, ফরজ জাকাত আদায়ের পাশাপাশি গরিব-অসহায় মানুষকে যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করা।
৪. পোশাক-পরিচ্ছদ, সাজগোজ ও অলংকার ইত্যাদির পিছনে অতিরিক্ত ব্যতিব্যস্ত না থাকা বা এসবের জন্য সীমাতিরিক্ত অর্থ খরচ না করা।
৫. বিলাসবহুল জীবন যাপন না করা:
দুনিয়ার চাকচিক্য ও বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে না দিতে ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে। অতিরিক্ত বিলাসিতাকে ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ বিলাসিতা মানুষকে পাপাচারের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيْهَا فَفَسَقُوْا فِيْهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيْرًا
“যখন আমি কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন আমরা সেখানকার বিলাসিতায় ডুবে থাকা ব্যক্তিদের নির্দেশ দেই। তখন তারা সেখানে পাপাচারে মেতে ওঠে। ফলে তার উপর শাস্তি অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমরা ওটাকে বিধ্বস্ত করে দেই।” [বনী ইসরাঈল: ১৬]
৬. যুহদ বা দুনিয়া বিমুখতা:
ইসলাম মানুষকে দুনিয়ার অতিরিক্ত চাকচিক্যে না ডুবে বরং আখেরাতমুখী হতে উৎসাহিত করে। তাই আমাদের উচিত, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়া।
৭. হালাল উপার্জন করা:
আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন মানুষের আয়-ব্যয় সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। তাই আমাদের জন্য আবশ্যক হলো, আয়ের ক্ষেত্রে যেমন হালাল পদ্ধতি অবলম্বন করা তেমনি হালাল খাতে অর্থ খরচ করা।
আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে হারাম উপায় অবলম্বন করা থেকে সর্বান্তঃকরণে দূরে থাকা আবশ্যক।
আমাদের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলাম প্রদর্শিত এসব মূলনীতি ঠিক রাখা আবশ্যক।
▪️ কতগুলো পোশাক ব্যবহার করা উচিত?
একজন মুসলিম ব্যক্তির কতগুলো পোশাক থাকা উচিত এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসে কোন বক্তব্য আসেনি। তার অর্থ হলো, এ বিষয়টি উন্মুক্ত। সুতরাং সামর্থ্যবান ব্যক্তি প্রয়োজন বোধে দুই তিন বা ততোধিক পোশাক ব্যবহার করতে পারে যদি তা সীমালংঘন পর্যায়ে না যায়।
– কোন সম্পদশালী ব্যক্তি যদি একাধিক পোশাক রাখে এবং একেক সময় একেকটা পরিধান করে এটাকে ‘অপচয়’ বলা যাবে না।
পক্ষান্তরে একজন গরিব মানুষ যদি আর্থিক সংকট থাকার পরেও ধনী মানুষের মত অনেকগুলো পোশাক ক্রয় করে তাহলে এটা তার জন্য অপচয় ও বিলাসিতা হিসেবে গণ্য হবে ।
❇️ অপচয়-এর মূলনীতি:
▪️শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.)–কে প্রশ্ন করা হয়েছিল:
আমরা শুনি, অপচয় ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়—যেমন: তার কাছে কতটুকু সম্পদ আছে তা অনুযায়ী, সে ব্যবসায়ী হোক বা ধনী?
উত্তরে তিনি বললেন:
“হ্যাঁ, এটি সত্য। অপচয় একটি আপেক্ষিক বিষয়। এটি কাজের নিজের সাথে নয় বরং করণকারীর সাথে সম্পৃক্ত।
যেমন ধরো: একজন গরিব নারী এমন গহনা পরল যা একজন ধনী নারীর গহনার সমান দামের—তাহলে সে কি অপচয়কারী হবে? যদি এই গহনা একটি ধনী নারী নেয়, আমরা বলব, এতে কোনো অপচয় নেই। কিন্তু যদি একটি গরিব নারী নেয়, তবে বলব—এতে অপচয় আছে।
এমনকি খাবার-দাবারের ক্ষেত্রেও অপচয় ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়। হতে পারে একজন দরিদ্র মানুষ সামান্য খাবারেই তৃপ্ত হয়ে যায়, অন্যদিকে আরেকজনের জন্য তা যথেষ্ট নয়।
তাছাড়া এমনও হতে পারে যে, কারো ঘরে মেহমান আসে—সে তখন এমন খাবার পরিবেশন করে যা সে নিজে সাধারণত খায় না। তবে এটিও অপচয় গণ্য হবে না।
সারসংক্ষেপে—অপচয় কাজের নিজস্বতায় নয় বরং কার দ্বারা তা হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করে। কারণ মানুষ একরকম নয়।”
[লিকাউল বাবিল মাহতুহ, ৮৮তম পর্ব / ৩৪ নম্বর প্রশ্ন]
▪️তিনি আরও বলেছেন,
“অপচয় হলো—সীমা অতিক্রম করা। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেছেন, তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।
আমরা যদি বলি—অপচয় মানে সীমালঙ্ঘন, তাহলে এটি বিভিন্নরকম হতে পারে।
হতে পারে, কোনো কাজ একজনের জন্য অপচয়, কিন্তু আরেকজনের জন্য নয়।
যেমন, কেউ যদি ২০ লক্ষ রিয়াল দিয়ে একটি বাড়ি কেনে, তারপর ৬ লক্ষ রিয়ালে তা সাজায়, আবার দামি একটি গাড়িও কিনে—
যদি সে ধনী হয়, তাহলে এটি তার জন্য অপচয় নয়, কারণ ধনীদের জন্য এটি সহজ ব্যাপার।
কিন্তু সে যদি ধনী না হয়, তাহলে এটি অপচয় হিসেবে গণ্য হবে—সে মধ্যবিত্ত হোক বা গরিব।
অনেক গরিব মানুষ দেখা যায়, যারা নিজেদের ‘সম্পূর্ণ’ করে তোলার আকাঙ্ক্ষায় বিশাল অট্টালিকা কেনে, ব্যয়বহুল আসবাবে সাজায়—even কিছু টাকা ধার করেও। এটা ভুল।
সারসংক্ষেপে তিন শ্রেণি রয়েছে:
➤ প্রথম: ধনী ব্যক্তি—বর্তমান সময়ে সে যদি ২০ লক্ষ রিয়ালে বাড়ি, ৬ লক্ষ রিয়ালে আসবাব কিনে, গাড়িও নেয়—তবে তাকে অপচয়কারী বলা হবে না।
➤ দ্বিতীয়: মধ্যবিত্ত—এই ধরনের খরচ তার জন্য অপচয়।
➤ তৃতীয়: গরিব—তার জন্য এটি শুধুই অপচয় নয়, বরং বোকামি (সফাহাহ)।
কারণ, কীভাবে সে ঋণ করে এমন কিছু কিনতে পারে, যা তার একান্ত প্রয়োজন নয়?!”
[লিকাউল বাবিল মাহতুহ, ১০৭তম পর্ব / ২৩ নম্বর প্রশ্ন, উৎস: islamqa]
সর্বোপরি বলব, আমাদের উচিত, জীবন যাপনের সবকিছুতে (খাওয়া, পরা, ঘরবাড়ি, সাজসজ্জা, গ্যাস ও পানির ব্যবহার, যানবাহন ইত্যাদি) মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। খুব বেশি মিতব্যয়ী হওয়া কিম্বা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বা সীমালংঘন থেকে দূরে থাকা।
✅ উপদেশ: যদি আলমারিতে অনেক সংখ্যক পোশাক অব্যবহৃত অবস্থায় বছরকে বছর পড়ে থাকে তাহলে সেগুলো গরিবদেরকে দিয়ে দেওয়া উচিত। এতে বিশাল সওয়াব অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু অপ্রয়োজনে সেগুলো জমিয়ে রাখা এক ধরনের মানসিক সংকীর্ণতা বা কৃপণতা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

জুমার এক রাকাত অথবা শুধু তাশাহুদ পেলে করণীয়

 প্রশ্ন: এক ব্যক্তি জুমার নামাজে দেরিতে পৌঁছে শুধু তাশাহুদ পেল। আরেক ব্যক্তি দেরিতে পৌঁছে দ্বিতীয় রাকাত পেল। উভয় ক্ষেত্রে কী করণীয়? তারা কি চার রাকাত নামাজ পড়বে নাকি দুই রাকাত?

উত্তর: যে ব্যক্তি জুমার নামাজের এক রাকাত পেয়েছে, সে জুমা পেয়েছে। ইমামের সালাম ফেরানোর পর সে আরও এক রাকাত যোগ করবে। এরপর তাশাহুদ ও দুআ পড়ে সালাম ফেরালে তার জুমার নামাজ সম্পন্ন হবে। এটি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে:
«مَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الْجُمُعَةِ؛ فَلْيُضِفْ إِلَيْهَا أُخْرَى، وَقَدْ تَمَّتْ صَلاَتُهُ»
“যে ব্যক্তি জুমার এক রাকাত পেল সে যেন তার সাথে আরও এক রাকাত যোগ করে, তাহলে তার নামাজ পূর্ণ হবে।”
এবং এই হাদিসের উপর ভিত্তি করে:
«مَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الصَّلاَةِ؛ فَقَدْ أَدْرَكَ الصَّلاَةَ»
“যে ব্যক্তি নামাজের এক রাকাত পেল, সে নামাজ পেয়েছে।”
আর যে ব্যক্তি শুধু তাশাহুদ পেয়েছে, সে জোহর নামাজ পড়বে। তার জুমার নামাজ ছুটে গেছে। যদি সূর্য হেলে গিয়ে থাকে (যাওয়াল হয়ে থাকে), তাহলে সে জোহর নামাজ পড়বে। তবে যদি সূর্য এখনো না হেলে থাকে তাহলে সে যাওয়ালের আগে নামাজ পড়বে না। কারণ কিছু মানুষ জুমার নামাজ সূর্য হেলে যাওয়ার আগেই পড়ে থাকে। তবে খতিব এবং ইমামদের উচিত, সূর্য হেলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। কারণ অধিকাংশ আলেমদের মতে, জোহরের নামাজের মতোই সূর্য হেলে যাওয়ার আগে জুমা’আর নামাজ আদায় করা জায়েজ নয়।
কিছু আলেম অবশ্য কিছু হাদিসের ভিত্তিতে সূর্য হেলে যাওয়ার আগেও জুমার নামাজ জায়েজ বলে থাকেন। তবে মুমিনের জন্য নিরাপদ হলো, সূর্য হেলে যাওয়ার পর নামাজ আদায় করা। যাতে মতবিরোধ থেকে বাঁচা যায়। সুতরাং যদি দেরিতে আসা ব্যক্তি ইমামকে তাশাহহুদে পায় এবং সূর্য হেলে গিয়ে থাকে তাহলে ইমামের সালাম ফেরানোর পর সে জোহরের নিয়তে চার রাকাত নামাজ পড়বে। কিন্তু যদি সূর্য এখনো না হেলে থাকে, তাহলে সে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করবে এবং এরপর নিজের বাড়িতে, মসজিদে বা যেকোনো স্থানে জোহর নামাজ পড়বে।
উত্তরদাতা: ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. (সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি) [Source: binbaz org]
▪️যে ব্যক্তি জুমার এক রাকাত পেল সে কি কিরাত উচ্চস্বরে নাকি নীরবে পড়বে?
উত্তর: যে ব্যক্তি ইমামের সাথে জুমার নামাজের এক রাকাত পায়, সে ইমামের সালাম ফেরানোর পর দ্বিতীয় রাকাত আদায়ের জন্য দাঁড়াবে। আর জুমার নামাজ যেহেতু একটি জেহরি (উচ্চস্বরের) নামাজ সেহেতু তার জন্য দ্বিতীয় রাকাতে উচ্চস্বরে কিরাত পড়া শরিয়তসম্মত। [Source: Islamweb]
– এ প্রসঙ্গে বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ডক্টর শাইখ সালেহ আল ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, এ ক্ষেত্রে সে চাইলে উচ্চস্বরেও কিরাত পাঠ করতে পারে, নিম্নস্বরেও পাঠ করতে পারে। উভয়টি জায়েজ। তবে উচ্চস্বরে পাঠ করা সুন্নত। কারণ জুমার নামাজ একটি জেহরি নামাজ। [উৎস: শাইখের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল)
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

কুরবানি করার উত্তম সময় কোনটি

 প্রশ্ন: কুরবানি করার উত্তম সময় কোনটি? ঈদের ২য় দিন কুরবানি করার থেকে ঈদের দিন কুরবানি করার সওয়াব কি বেশি?

উত্তর: ইসলামে যে কোন ভালো কাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ
“অত:এব তোমরা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করো।” [সূরা বাকারা: ১৪৮]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
بادروا بالأعمال
“তোমরা আগেভাগে নেকির কাজ সম্পন্ন করো।” ✓সহিহ মুসলিম]
সুতরাং যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি কুরবানি করা উচিৎ। বিনা কারণে বিলম্ব করা ঠিক নয়।
◯ কুরবানি করার সর্বমোট সময় কয় দিন এবং উত্তম সময় কোনটি?
জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহার সালাত আদায়ের পর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখের সূর্য ডোবা পর্যন্ত মোট চার দিন (রাত-দিন) যে কোন সময় কুরবানি করা জায়েজ। তবে সর্বোত্তম সময় হল, ঈদের সালাত শেষ করার পরই কুরবানি করা। সালাতের আগে পশু জবেহ করলে কুরবানি সহিহ হবে না। বারা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، مَنْ فَعَلَهُ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا، وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلُ فَإِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ قَدَّمَهُ لِأَهْلِهِ، لَيْسَ مِنَ النُّسُكِ فِي شَيْءٍ
“ঈদের দিন আমরা প্রথমে সালাত আদায় করব। অতঃপর ফিরে এসে কুরবানি করব। যে ব্যক্তি এভাবে আদায় করবে সে আমাদের নিয়ম মতো করল। আর যে সালাতের আগেই পশু জবাই করল সেটা তার পরিবারের জন্য গোশত হবে; এটা কুরবানি হবে না।” [সহিহ মুসলিম ২/১৫৪]। তাই সালাত শেষ করার পরপর কুরবানি করার চেষ্টা করতে হবে। (খুতবা শেষ করার পর পর কুরবানি করা আরও অধিক উত্তম)।
এতে কুরবানি দাতার জন্য আরেকটি সুন্নত পালন করা সম্ভব হয়। তা হল, ঈদের দিন কোন কিছু না খেয়ে ঈদের সালাত পড়া। তারপর ফিরে এসে সর্বপ্রথম কুরবানি গোশত খাওয়া। বেশি বিলম্ব করলে বা পরের দিন কুরবানি করলে এ সুন্নতটি আদায় করা হয়ত সম্ভব হবে না।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, বুরাইদা রা. বলেন,
ﻛَﺎﻥَ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻟَﺎ ﻳَﻐْﺪُﻭ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻔِﻄْﺮِ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺄْﻛُﻞَ ﻭَﻟَﺎ ﻳَﺄْﻛُﻞُ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﺄَﺿْﺤَﻰ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺮْﺟِﻊَ ﻓَﻴَﺄْﻛُﻞَ ﻣِﻦْ ﺃُﺿْﺤِﻴَّﺘِﻪِ
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের জন্য না খেয়ে বের হতেন না। আর ঈদুল আযহায় সালাত থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত কিছু খেতেন না। এরপর তার কুরবানি থেকে খেতেন।” [মুসনাদে আহমদ, হা/২২৯৮; সুনানে দারাকুতনী ১/৪৫, হা/১৭১৫; হাদিসটিকে শুআইব আরনাবুত হাসান বলেছেন-তাখরিজুল মুসনাদ: ২২৯৮৪। অনুরূপভাবে ইমাম নববিও হাসান বলেছেন-আল মাজমু ৫/৫]
উল্লেখ্য যে, ঈদের সালাত থেকে ফিরে এসে তিনি সর্বপ্রথম কুরবানির ‘কলিজা’ খেতেন মর্মে বর্ণিত হাদিসটি সহিহ নয়।
বিনা কারণে বিলম্ব করা এ কারণেও ঠিক নয় যে, এতে কুরবানির পশুর মৃত্যু, চুরি হওয়া, হারিয়ে যাওয়া বা অন্য কোন দুর্ঘটনা ও বিপদাপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন হয়ত কুরবানি দেয়াই সম্ভব হবে না। তাই যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতে হবে।
◯ শাইখ বিন বায রহ. বলেন, “কুরবানি করা অধিক উত্তম ঈদের দিন, তারপর ২য় দিন, তারপর ৩য় দিন, তারপর ৪র্থ দিন।” [শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট]
আল্লাহু আলম।
▬▬▬◆◯◆▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

খাবারের ইসলামি আদবসমূহ

 এখানে ইসলামে খাবার গ্রহণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব বর্ণনা করা হলো:

▪️১. খাবারের শুরুতে তাসমিয়া (বিসমিল্লাহ) বলা:
সহীহ বুখারি ও মুসলিমে উমার ইবনে আবি সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: “আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তত্ত্বাবধানে থাকা এক বালক ছিলাম। খাবার থালায় আমার হাত ঘোরাঘুরি করছিল। তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
‘يا غلام، سمِّ الله، وكُلْ بيمينِك، وكُلْ مما يَليك’
“হে বৎস! আল্লাহর নাম স্মরণ করো (অর্থাৎ বিসমিল্লাহ বলো), ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার সামনের দিক থেকে খাও)।” [বুখারী (৫৩৭৬), মুসলিম (২০২২)]
▪️২. যদি শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায় তবে ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ বলা:
তিরমিযিতে আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“إذا أكل أحدُكم طعامًا، فليقل: بسم الله، فإن نسي في أوله، فليقل: بسم الله في أوله وآخره”
“যখন তোমাদের কেউ খাবার খাবে, সে যেন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। যদি সে শুরুতে ভুলে যায়, তবে যেন বলে: ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু’ (এর শুরু ও শেষ আল্লাহর নামে)।” (ইমাম তিরমিযি হাদিসটিকে হাসান-সহিহ বলেছেন)
অন্য একটি বর্ণনায় আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছয়জন সাহাবির সাথে খাবার খাচ্ছিলেন। তখন এক বেদুঈন এসে দুই লোকমায় তা খেয়ে ফেলল।
তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
“أما إنه لو سَمَّى لكفاكم”
“যদি সে বিসমিল্লাহ বলত তবে তা তোমাদের জন্য যথেষ্ট হতো)।” [তিরমিযি (১৮৫৮), হাসান-সহিহ]
▪️৩. ডান হাত দিয়ে খাওয়া:
মুসলিমে সহীহ বর্ণনায় ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“إذا أكل أحدُكم فليأكُلْ بيمينه، وإذا شرِب فليشرَب بيمينه؛ فإن الشيطان يأكل بشِماله، ويشرب بشماله”
“যখন তোমাদের কেউ খায়, সে যেন তার ডান হাত দিয়ে খায়। আর যখন পান করে, সে যেন তার ডান হাত দিয়ে পান করে। কারণ শয়তান তার বাম হাত দিয়ে খায় এবং বাম হাত দিয়ে পান করে।” [মুসলিম (২০২০)] ইয়াস ইবনে সালামা ইবনুল আকওয়া’ থেকে বর্ণিত আছে যে, তার পিতা তাকে বলেছেন যে, একজন ব্যক্তি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বাম হাত দিয়ে খাচ্ছিল। তখন তিনি বললেন: “তুমি ডান হাত দিয়ে খাও।” সে বলল: আমি পারব না। তিনি বললেন: তুমি যেন সক্ষম না হও।”
তাকে অহংকার ছাড়া আর কিছু বাধা দেয়নি। রাবী (বর্ণনাকারী) বলেন: এরপর সে আর তার হাত মুখের কাছে তুলতে পারেনি। [মুসলিম (২০২১)]
▪️৪. নিজের সামনের দিক থেকে খাওয়া:
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে উমার ইবনু আবী সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন:
“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তত্ত্বাবধানে থাকা এক বালক ছিলাম। খাবার থালায় আমার হাত ঘোরাঘুরি করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
‘يا غلامُ، سَمِّ اللهَ، وكُلْ بيمينك، وكُلْ مما يليك’
“হে বৎস! আল্লাহর নাম নাও (বিসমিল্লাহ বলো), ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার নিজের দিক থেকে খাও।” এরপর থেকে আমার সেই নিয়মই প্রচলিত হয়ে গেল।” [বুখারী (৫৩৭৬), মুসলিম (২০২২)]
▪️৫. থালা বা ডিশের পাশ থেকে খাওয়া:
আবু দাউদে (হাসান সনদ সহ) আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন:
كان للنبي – صلى الله عليه وسلم – قصعة ، يحملها أربعة رجال ، يقال لها : الغراء ، فلما أضحوا وسجدوا الضحى ، أتي بتلك القصعة وقد ثرد فيها ، فالتفوا عليها ، فلما كثروا ، جثا رسول الله – صلى الله عليه وسلم – فقال أعرابي : ما هذه الجلسة ؟ ، فقال النبي – صلى الله عليه وسلم : ” إن الله جعلني عبدا كريما ، ولم يجعلني جبارا عنيدا ” ثم قال : ” كلوا من جوانبها ، ودعوا ذروتها يبارك فيها
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি বড় থালা ছিল, যাকে ‘আল-গাররা’ বলা হতো। চারজন লোক তা বহন করত। যখন তারা ভোর করে দুহা (চাশত) এর সালাত আদায় করলেন, তখন সেই থালা আনা হলো। তাতে সারিদ ( রুটি এবং গোশত বা সবজি মিশ্রিত একপ্রকার এরাবিয়ান ঐতিহ্যবাহী খাবার) ছিল। তারা এর চারপাশে জড়ো হলেন। যখন তারা বেশি হয়ে গেলেন, তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুঠো করে (খাবার) দিলেন। তখন একজন বেদুঈন বলল: এই বসার ধরন কেমন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘আল্লাহ আমাকে একজন সম্মানিত বান্দা বানিয়েছেন। তিনি আমাকে দাম্ভিক ও অবাধ্য বানাননি।”
এরপর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা এর পাশ থেকে খাও এবং এর উপরের অংশ/মধ্যভাগ ছেড়ে দাও।‌ তাহলে তাতে বরকত থাকব)।” [আবু দাউদ (৩৭৭৩), সনদ হাসান, অন্যান্য শাহেদ দ্বারা সহীহ] ইমাম আহমদ প্রখ্যাত সাহাবি ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
“كُلُوا في القصعة مِن جوانبها، ولا تأكلوا من وسطِها؛ فإن البركةَ تنزِل في وسطِها”
“তোমরা থালার পাশ থেকে খাও; এর মধ্যভাগ থেকে খেও না। কারণ বরকতের মধ্যভাগে নেমে আসে।” [আহমদ (২৩৭৫), সহিহ সনদ। এখানে আতা ইবনুস সাইব নামক যে বর্ণনাকারী আছেন তিনি বিশ্বস্ত হলেও শেষ জীবনে স্মৃতি বিভ্রাট ঘটেছিল। তবে সুফিয়ান সাওরি তার কাছ থেকে স্মৃতি বিভ্রাটের আগে বর্ণনা করেছেন।]
▪️৬. হেলান দিয়ে না খাওয়া:
বুখারির সহিহ বর্ণনায় আবু জুহাইফা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“لا آكلُ متكئًا”
“আমি হেলান দিয়ে খাই না।” [বুখারী (৫৩৯৮)]
▪️৭. খাবারের দোষ না ধরা:
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন:
عاب النبي صلى الله عليه وسلم طعامًا قط، إن اشتهاه أكله، وإلا تركه
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না। যদি তাঁর পছন্দ হতো তাহলে খেতেন; অন্যথায় তা ছেড়ে দিতেন।” [বুখারী (৩৪৩৬), মুসলিম (২০৬৪)]
▪️৮. পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা:
তিরমিযিতে মিকদাম ইবনে মা’দি কারিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
ما ملأ آدميٌّ وعاءً شرًّا من بطن، بحسب ابن آدم أكلات يُقِمْن صلبه، فإن كان لا محالة فثُلُث لطعامه، وثلث لشرابه، وثلث لنفَس
“আদম সন্তান তার পেট থেকে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র ভর্তি করে না। আদম সন্তানের জন্য কয়েকটি লোকমা যথেষ্ট, যা তার মেরুদণ্ড সোজা রাখে। যদি তাকে অবশ্যই ভরতে হয়, তবে এক-তৃতীয়াংশ তার খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ তার পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ তার শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য।” [তিরমিযি (২৩৮০), হাসান সহিহ]
▪️৯. খাবার ও পানীয়তে ফুঁ না দেওয়া:
ইমাম আহমদ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার ও পানীয়তে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন।” [আহমদ (২৮১৩), সহিহ সনদ সহ] তিরমিযিতে আবু সাঈদ আল-খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে,
نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن النفخ في الطعام والشراب
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করার সময় ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। তখন একজন ব্যক্তি বলল: আমি পাত্রে ময়লা দেখতে পাই। তিনি বললেন: “তা ঢেলে দাও।” সে বলল: আমি এক শ্বাসে তৃপ্ত হই না। তিনি বললেন: “তাহলে পাত্রটি তোমার মুখ থেকে দূরে সরাও।”
[আবু দাউদ (৩৭২২), তিরমিযি (১৮৭৭), হাসান সহীহ]
▪️১০. পড়ে যাওয়া লোকমা ছেড়ে না দেওয়া:
মুসলিম শরীফের সহীহ বর্ণনায় জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
“إن الشيطان يحضُرُ أحدَكم عند كل شيء من شأنه حتى يحضره عند طعامه، فإذا سقطت من أحدكم اللقمة فليُمِط ما كان بها من أذًى، ثم ليأكُلْها، ولا يدَعْها للشيطان، فإذا فرغ فليَلْعَق أصابعه؛ فإنه لا يدري في أي طعامه تكون البركة”
“শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের প্রতিটি কাজে উপস্থিত হয়, এমনকি খাবারের সময়ও সে উপস্থিত হয়। যখন তোমাদের কারো লোকমা পড়ে যায়, তখন সে যেন তা থেকে ময়লা দূর করে এবং তা খেয়ে নেয়, শয়তানের জন্য যেন তা ছেড়ে না দেয়। আর যখন খাওয়া শেষ হয়, সে যেন তার আঙুল চেটে নেয়। কারণ সে জানে না তার কোন খাবারে বরকত রয়েছে।” [মুসলিম (২০৩৩)]
▪️১১. অন্যের অনুমতি ছাড়া খেজুর বা অনুরূপ ফল জোড়া জোড়া করে না খাওয়া:
সহীহ বুখারি ও মুসলিমে ইবনে উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ব্যক্তিকে একবারে দুটি খেজুর একসাথে খেতে নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না সে তার সাথীদের অনুমতি নেয়। [বুখারী (২৪৮৯), মুসলিম (২০৪৫)]
▪️১২. খাবার শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা:
আবু দাউদে (সহীহ সনদ সহ) আবু আইয়ুব আল-আনসারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন:
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খাবার খেতেন বা পান করতেন, তখন বলতেন:
“الحمد لله الذي أطعم وسقى وسوَّغه، وجعل له مخرجًا”
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আত্ব’আমা ওয়া সাক্বা ওয়া সাওয়াগাহু, ওয়া জা’আলা লাহু মাখরাজান।
অর্থ: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি খাওয়ালেন, পান করালেন, তা সহজলভ্য করলেন এবং এর জন্য নির্গমনের পথ তৈরি করলেন।” [আবু দাউদ (৩৮৫১), সহিহ সনদ সহ] বুখারির বর্ণনায় আবু উমামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর দস্তরখান উঠাতেন তখন বলতেন:
“الحمد لله كثيرًا طيبًا مباركًا فيه، غير مَكْفيٍّ ولا مُوَدَّع ولا مُستغنًى عنه ربُّنا”
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহি কাছীরান ত্বায়্যিবান মুবারাকান ফীহি, গায়রু মাকফিইয়্যিন ওয়ালা মুওয়াদ্দা’ইন ওয়ালা মুসতাগনান আ’নহু রাব্বুনা।
অর্থ: প্রচুর, পবিত্র ও বরকতময় সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যা যথেষ্টকারী নয়, পরিত্যাজ্য নয় এবং যা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না; হে আমাদের প্রতিপালক।” [বুখারী (৫৪৫৮)]
ইমাম আহমদ (হাসান সনদ সহ) আবদুর রহমান ইবনে জুবাইর থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একজন ব্যক্তি, যিনি আট বছর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমত করেছিলেন, তাকে জানিয়েছেন যে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন খাবার পরিবেশন করা হতো, তখন তিনি
‘بسم الله’
“বিসমিল্লাহ” বলতেন।
আর যখন তাঁর খাবার শেষ হতো, তখন তিনি বলতেন:
“اللهم أطعمتَ وأسقيتَ، وأغنيت وأقنيت، وهديت وأحيَيْتَ، فلك الحمد على ما أعطيتَ”
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আত্ব’আমতা ওয়া আসক্বাইতা, ওয়া আগনাহতা ওয়া আক্বনাইতা, ওয়া হাদাইতা ওয়া আহইয়াইতা, ফালাকাল হামদু আ’লা মা আ’ত্বাইতা।
অর্থ: “হে আল্লাহ! তুমিই খাইয়েছো, পান করিয়েছো, অভাবমুক্ত করেছো, সন্তুষ্ট করেছো, পথ দেখিয়েছো এবং জীবন দিয়েছো। সুতরাং তুমি যা দিয়েছো তার জন্য সমস্ত প্রশংসা তোমারই)।” [আহমদ (৪/৫৬২/৩৭৫), হাসান সনদ সহ]
খাবারের পর আল্লাহর প্রশংসা করা বান্দার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম কারণ। সহিহ মুসলিমে আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“إن الله ليرضى عن العبد أن يأكل الأكلةَ، فيحمَده عليها، ويشرب الشربة، فيحمَده عليها”
“নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন যখন সে একটি খাবার খায় এবং তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে, অথবা একটি পানীয় পান করে এবং তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে।” [মুসলিম (৫০২২)]
Source: alukah.net
অনুবাদ: আব্দুল্লাহল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

Thursday, June 19, 2025

জাতির উদ্দেশ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির ভাষণ

জাতির উদ্দেশ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির ভাষণ ইতিহাসের সেরা

হুবহু তুলে ধরা হলো-
লেখা সংযোজন
মোঃ আব্দুর রশিদ
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”
আমি ইরানের মহান ও গৌরবময়ী জাতিকে সালাম জানাই।
সর্বপ্রথম, আমি কৃতজ্ঞতা জানাই ইরানিদের সেই দৃঢ় ও সাহসী অবস্থানের জন্য, যা তারা বিদেশি ষড়যন্ত্রের মুখে প্রদর্শন করেছে।
গাদীরের দিনে জাতির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, জনসমাগম জুমার নামাজের উপস্থিতি এবং পরবর্তী মিছিলে অংশগ্রহণ সবই প্রমাণ করে দিয়েছে ইরান এখন কেবল একটি জাতি নয় বরং আত্মিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির এক প্রতিচ্ছবি।
আমি আল্লাহর শোকর আদায় করছি, যিনি এই জাতিকে এমন শক্তি মানুষিকতা ও প্রজ্ঞা দান করেছেন। আমি এখানে একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্তের কথাও বলতে চাই; শত্রুর হামলার পর টিভি উপস্থাপক 'তাকবীর' উচ্চারণ করে জাতির মনোভাব সারা বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছে।
এটি ছিল ইতিহাসের এক গৌরব্যউজ্জ্বল মুহূর্ত।
এখন দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল- এই হামলা সরাসরি আমাদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসন ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন আমাদের কূটনীতিকরা আমেরিকার সঙ্গে সরাসরিও পরোক্ষভাবে আলোচনা চালাচ্ছিল ইরানের তরফে কোন উস্কানি বা সামরিক উত্তেজনার ইঙ্গিত ছিল না।
এটাই স্পষ্ট যে, ইসরায়েল একপেশে সিদ্ধান্তে এই হামলা চালিয়েছে।
শুরু থেকেই আমাদের সন্দেহ ছিল, এতে আমেরিকার হাত রয়েছে।
এখন যেসব বক্তব্য তারা দিচ্ছে তা আমাদের সেই সন্দেহকে আরও জোরালো করছে।
ইরানি জাতি কখনো চাপের কাছে নত হয়নি। যেমন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমরা লড়েছি, তেমনি চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত শান্তির বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে আছি। আমরা কারো দাসত্ব বা আধিপত্য মেনে নিই না।
আমি চিন্তাবিদ, লেখক এবং বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্তদের প্রতি আহ্বান জানাই তারা যেন এই সত্যগুলো পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে, জনগণের সামনে তুলে ধরে এবং শত্রুর মিথ্যা প্রচারণার জবাব দেয়।
ইসরাইল এক ভয়াবহ ভুল করেছে এবং একটি অপরাধ করেছে, এর জন্য তাকে শাস্তি পেতেই হবে এবং তারা সেটা তার পাচ্ছেও।
আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী ইতোমধ্যে এর প্রতিশোধ নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই মুহূর্তে আমেরিকার বন্ধুরা মাঠে নামছে। এটাই প্রমাণ করে তারা দুর্বল, ভীত এবং অসহায়। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমাদের হুমকি দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে এক হাস্যকর দাবি করেছেন। ইরানি জাতিকে তার সামনে আত্মসমর্পণ করতে বলছেন। এটা একেবারেই অযৌক্তিক।
ইরানি জাতি হুমকির সামনে ভয় পায় না। আমরা সেটা বারবার প্রমাণ করেছি। সেই আরবিতে বলা আয়াতের মতো: "তোমরা দুঃখ করোনা, হীনবল হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মু'মিন হও।"
আমরা জানি হুমকি আমাদের মনোভাব বদলাতে পারে না এবং আত্মসমর্পণ করার কথাটা এমন কেউই বলতে পারে যে ইতিহাস, ইরানের জাতিসত্তা, আর আত্মমর্যাদা সম্পর্কে জানেনা।
'আমরা কখনো নত হইনি, হবও না।
আমরা কারো দাস নই,হবও না।'
আমেরিকার যারা বাস্তবতা বোঝে, তারা জানে এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করলে তার ফল তাদের জন্য ভয়াবহ হবে। যেটুকু ক্ষতি ইরানের হতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি আমেরিকার হবে এবং এই ক্ষতি অপূরণীয়।
আমি আমার জাতিকে বলছি, ভয় পেয়ো না, দুর্বলতা প্রকাশ করো না,
যদি শত্রু বুঝে ফেলে তুমি ভয় পাচ্ছো, তবে সে তোমাকে ছাড়বে না।
তোমাদের শক্ত অবস্থান বজায় রাখো, সব দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা; প্রশাসন, প্রচার, জনসংযোগ যেন আল্লাহর উপর ভরসা রেখে দায়িত্ব পালন করে
কারণ, বিজয় একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
আর আল্লাহই সত্য ও ইনসাফের পক্ষকে জয়ী করবেন, ইনশাআল্লাহ।

Translate