Monday, April 21, 2025

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া কি আশআরীরা দ্বীনের রক্ষক এমন কথা বলেছেন

 প্রশ্ন: শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া কি আশ’আরীদেরকে ‘আনসারু উসূলিদ্দীন’ (أَنصَارُ أُصُولِ الدِّينِ) অর্থাৎ আশʿআরীরা দ্বীনের (মৌলিক বিষয়) এর রক্ষক।” এমন কথা বলেছেন?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর দুঃখজনক হলেও সত্যি, সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া বিভিন্ন ফোরাম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কথা প্রচারিত হয় যে, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] আশʿআরীদের সম্পর্কে বলেছেন:وَأَمَّا لَعْنُ الْعُلَمَاءِ لِأَئِمَّةِ الْأَشْعَرِيَّةِ فَمَنْ لَعَنَهُمْ عُزِّرَ . وَعَادَتْ اللَّعْنَةُ عَلَيْهِ فَمَنْ لَعَنَ مَنْ لَيْسَ أَهْلًا لِلَّعْنَةِ وَقَعَتْ اللَّعْنَةُ عَلَيْهِ وَالْعُلَمَاءُ أَنْصَارُ فُرُوعِ الدِّينِ وَالْأَشْعَرِيَّةُ أَنْصَارُ أُصُولِ الدِّينِ“আর যারা আশʿআরী ইমামদের অভিশাপ দেয়, তাদের শাস্তি দেওয়া উচিত। অভিশাপ যার প্রাপ্য নয় তাকে অভিশাপ দিলে তা অভিশাপ দাতার উপরই ফিরে আসে। আলেমরা দ্বীনের فروع (শাখা-প্রশাখা) এর রক্ষক, আর আশʿআরীরা দ্বীনের اصول (মৌলিক বিষয়) এর রক্ষক।”(মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়্যাহ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৬) এটি ফাতওয়াটি প্রচার করে তারা দাবি করে যে শাইখ ইবনে তাইমিয়ার উক্তি!! কিন্তু এটি তাদের ভুল ধারণা কেননা এটি শাইখুল ইসলামের উক্তি নয় বরং এটি একজন আশআরী আলেমের উক্তি।

আমরা প্রতিটি পাঠককে অনুরোধ করছি, ইবনে তাইমিয়ার “মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া” (৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬)-এ উদ্ধৃত অংশটি নিজে পর্যালোচনা করার জন্য। ওই বক্তব্যের ঠিক আগে “قال” (তিনি বলেছেন) শব্দটি লক্ষ্য করুন, যা স্পষ্ট করে দেয় যে এটি ইবনে তাইমিয়ার নিজের কথা নয়, বরং তিনি অন্য একজন (আবু মুহাম্মাদ নামক এক ফকীহ) এর বক্তব্য শাইখুল ইসলাম উদ্ধৃত করছেন। ১৫ নং পৃষ্ঠার শেষ লাইনের শুরুতে ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলছেন: وكذلك رأيت في فتاوى الفقيه أبي محمد فتوى طويلة.. قال فيها:..” إلى أن يقول: [قال: وأما لعن العلماء الأئمة الأشعرية فمن لعنهم عزر وعادت اللعنة عليه… والعلماء أنصار فروع الدين والأشعرية أنصار أصول الدين.” قال: وأما دخولهم النار..]]الخ’“আমি ফকীহ আবু মুহাম্মাদের ফাতাওয়ায় একটি দীর্ঘ রায় দেখেছি… যেখানে তিনি বলেছেন: […] “আর যদি কোনো আলেম আশ‘আরী ইমামদের لعن (অভিশাপ) দেয়, তাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। কারণ, যারা অভিশাপের অযোগ্য তাদের অভিশাপ করলে তা অভিশাপকারীর উপরই ফিরে আসে। আলেমরা দ্বীনের فروع (শাখা-প্রশাখা)-এর রক্ষক, আর আশ‘আরীরা দ্বীনের اصول (মৌলিক বিষয়)-এর রক্ষক।” তিনি আরও বলেন: ‘আশ‘আরীদের জাহান্নামে যাওয়া সম্পর্কে…’ ইত্যাদি।”
.
কিন্তু পরবর্তীতে (পৃষ্ঠা: ১৫৮–১৫৯) ইবনে তাইমিয়া সরাসরি “আবু মুহাম্মাদ ও তার অনুসারীদের সমালোচনা” করে লিখেন:وأيضاً فيقال لهؤلاء الجهمية الكلابية كصاحب هذا الكلام أبي محمد وأمثاله كيف تدعون طريقة السلف وغاية ما عند السلف أن يكونوا متابعين لرسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟” إلى أن يقول: ”وأبو محمد وأمثاله قد سلكوا مسلك الملاحدة الذين يقولون إن الرسول صلى الله عليه وسلم لم يبين الحق في باب التوحيد’“এই জাহমী-কুল্লাবীদের জিজ্ঞাসা করা উচিত: তোমরা কিভাবে সালাফদের পথ দাবি করো? সালাফদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ। আর আবু মুহাম্মাদ ও তার মতো লোকেরা সেই মুলহিদদের (নাস্তিকদের) পথে চলেছে, যারা বলে, রাসূল (ﷺ) তাওহীদের বিষয়ে সত্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেননি।”(মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়্যাহ খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৫৮-১৫৯)
.
একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে—
(ক) আলোচিত উক্তিটি ইবনে তায়মিয়ার নয়, বরং একজন আশ’আরী তা বলেছেন, যিনি নিজের মতবাদকেই প্রশংসা করেছেন।

(খ) শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া এই ব্যক্তিকে এবং তার মতবাদকে জাহমি-কুল্লাবী মতাদর্শ ও নাস্তিকদের পথ অনুসরণকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন, এবং তাদের ‘সালাফদের পথের অনুসারী’ হওয়ার দাবিকে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, যারা এই উক্তিকে ইবনে তায়মিয়ার প্রশংসা হিসেবে প্রচার করেছে, তারা প্রকৃতপক্ষে প্রতারণামূলক উপায়ে মিথ্যা প্রচার চালিয়েছে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রাহিমাহুল্লাহ) এর পক্ষ থেকে আশ’আরীদের ব্যাপারে কখনোই কোনো নিরঙ্কুশ প্রশংসা উচ্চারিত হয়নি। তার সবোর্চ্চ ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায় মাজমু‘উল ফাতাওয়ার ১২তম খণ্ডে, যেখানে তিনি বলেন, আশ’আরীরা অন্যদের তুলনায় কিছুটা নিকটবর্তী, এবং তাদের মতবাদ ওহি ও দর্শনের সংমিশ্রণ। তিনি যেসব আশ’আরীদের প্রশংসা করেছেন, তারা মূলত হাদীসচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। আশ’আরী হওয়ার কারণে নয়, বরং সুন্নাহ্‌র অনুসরণে নিয়োজিত থাকার কারণে। তাও আবার, যেসব বিষয়ে তারা তাদের কালামি মতবাদের অনুসরণ করেছে, সেসব ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তবে এসব হালকা প্রশংসা তাদেরকে বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও ভুলপথের অনুসারী বলার জায়গাগুলোর তুলনায় অনেক কম। কেননা, তিনি বহু স্থানে স্পষ্ট ভাষায় আশ’আরীদের বিদআতী, বিভ্রান্তিকর এবং বিপথগামী মতবাদের অনুসারী বলেছেন। এমনকি এত বেশি জায়গায় যে তা গণনা করাও কঠিন।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি] পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন, একজন ব্যক্তি কখন আশআরীর অনুসারী হয়েও আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত বিবেচিত হতে পারেন। তিনি বলেন:أما من قال منهم بكتاب الإبانة الذي صنفه الأشعري في آخر عمره ولم يظهر مقالة تناقض ذلك؛ فهذا يعَدُّ من أهل السنة، لكن مجرد الانتساب إلى الأشعري ؛ لا سيما وأنه بذلك يوهم حسناً لكل من انتسب هذه النسبة، وينفتح بذلك أبواب شر’“যারা আশআরীর জীবনের শেষ দিকে রচিত ‘আল-ইবানাহ’ গ্রন্থের বক্তব্যকে গ্রহণ করে এবং এর পরিপন্থী কোনো মত প্রকাশ করেনি, তাদেরকে আহলুস সুন্নাহ ধরা যেতে পারে। তবে কেবলমাত্র আশআরীর প্রতি নিজেকে সম্পৃক্ত করা, বিশেষ করে যখন এতে মনে হয় যেন আশআরী নামে পরিচিত প্রত্যেকেই সঠিক পথের অনুসারী,এটি ভুল ধারণা তৈরি করে এবং এতে অনেক ফিতনার দরজা খুলে যায়।”(মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়্যাহ খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৩৬০)অর্থাৎ, যারা বাস্তবে সালাফদের আক্বীদার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাদের জন্যও আশআরী নামে নিজেদের পরিচয় দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি একটি বিদআতি পরিচয় এবং নিন্দনীয় একটি বিষয়ে সম্পৃক্ততা।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
__________________________
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: শাইখ নাসরুল্লাহ আল মাদানী হাফি.।

প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের ফজিলত এবং প্রথম কাতারে নিজের জন্য একটি স্থান সংরক্ষিত রাখার বিধান

 প্রশ্ন: প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের ফজিলত কি? সালাতে প্রথম কাতারে নিজের জন্য একটি স্থান সংরক্ষিত রাখা এবং দীর্ঘ সময় তা থেকে দূরে থাকার বিধান কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর কুরআন সুন্নার আলোকে যা প্রমানিত তা হল প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের গুরুত্ব অত্যধিক।কারন রাসূল (ﷺ) বলেছেন,”মানুষ যদি জানত আযান দেয়া ও সালাতের প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর মধ্যে কী সাওয়াব রয়েছে এবং লটারী করা ছাড়া এ সুযোগ না পেত, তাহলে লটারী করতো। আর যদি জানতো সালাত আদায় করার জন্য আগে আগে আসার সাওয়াব, তাহলে তারা এ (যুহরের) সালাতে অন্যের আগে পৌঁছাবার চেষ্টা করতো। যদি জানতো ‘ইশা ও ফজরের সালাতের মধ্যে কি আছে, তাহলে (শক্তি না থাকলে) হামাগুড়ি দিয়ে হলেও সালাতে উপস্থিত হবার চেষ্টা করতো।”(সহীহ বুখারী হা/৬১৫; মুসলিম হা/৪৩৭; মিশকাত হা/৬২৮) রাসূল (ﷺ) আরো বলেন, সালাতের প্রথম কাতার ফেরেশতাদের কাতারের মতো। তোমরা যদি প্রথম কাতারের ফযীলত জানতে তাহ’লে অবশ্যই দৌঁড়ে যেতে।(আবূদাঊদ হা/৫৫৪; মিশকাত হা/১০৬৬) তিনি (ﷺ) আরো বলেন, প্রথম কাতারের (মুসল্লীদের) উপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতাগণ দো‘আ করেন’(ইবনু মাজাহ হা/৯৯৭)। তিনি আরো বলেন,পুরুষদের জন্য সর্বোত্তম কাতার হ’ল প্রথম কাতার।”(সহীহ মুসলিম হা/৪৪০; মিশকাত হা/১০৯২) এমনকি মসজিদে যদি শুধুমাত্র একটি কাতার থাকে তাহলে সেটিই প্রথম কাতার হিসাবে গণ্য হবে এবং এর যাবতীয় ফযীলত অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। কেননা প্রথম কাতার বলতে ইমামের পিছনের কাতারকেই বুঝানো হয়েছে।”(ইবনু হাজার,ফাৎহুল বারী; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২০৮)।
.
▪️সালাতে প্রথম কাতারে নিজের জন্য একটি স্থান সংরক্ষিত রাখা।
.
একজন ব্যক্তি যদি মসজিদে অবস্থান করেন, তবে তিনি কাতারে নির্দিষ্ট স্থানে নিজের জন্য একটি জায়নামাজ বা অনুরূপ কিছু রাখতে পারেন। প্রয়োজনে তিনি মসজিদের পেছনে বিশ্রাম নিতে পারেন, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন, কিংবা অযুর প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে মসজিদ থেকে বের হতে পারেন। তবে শর্ত হলো, তিনি ইকামতের পূর্বেই নিজের স্থানে ফিরে আসবেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তার রাখা স্থানটির অধিক হকদার থাকবেন যদিও তা প্রথম কাতারে থাকে। কিন্তু যদি কেউ জায়নামাজ বিছিয়ে নির্দিষ্ট স্থান সংরক্ষণ করে রেখে বিনা প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য হলেও বাইরে চলে যান এবং ইকামত হওয়ার নিদিষ্ট সময় পূর্বে উপস্থিত না থাকেন, তবে সেই স্থানে তার আর কোনো অধিকার থাকবে না। সে ক্ষেত্রে তার রাখা জায়নামাজ সরিয়ে ফেলা হবে এবং সেখানে উপস্থিত অন্য কেউ দাঁড়াবে। কারণ যথাসময়ে ফিরে আসার বিষয়ে অবহেলা বা দেরি করা হলে সংরক্ষিত স্থানের অধিকার বাতিল হয়ে যায়। এ ব্যাপারে দলিল হলো: আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত: নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: তোমাদের কেউ তার বসার স্থান থেকে উঠে গিয়ে আবার ফিরে এলে সে-ই উক্ত স্থানের অধিক হকদার।(সহীহ মুসলিম হা/ ২১৭৯; আবূ দাউদ ৪৮৫৩; মুসনাদে আহমাদ হা/ ৭৫১৪, ৭৭৫১, ৮৩০৪, ৮৮১০, ১০৪৪২, ১১৫৫৯)।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,إٍذا جلس في مكان , ثم بدت له حاجة , أو احتاج إلى الوضوء , فله الخروج . . . . فإذا قام من مجلسه , ثم رجع إليه فهو أحق به , لقول النبي صلى الله عليه وسلم : ( مَنْ قَامَ مِنْ مَجْلِسِهِ ثُمَّ رَجَعَ إِلَيْهِ فَهُوَ أَحَقُّ بِهِ ) “যদি কেউ মসজিদের কোনো স্থানে বসেন, এরপর তার কোনো প্রয়োজনে বা ওযু করতে বের হতে হয়, তাহলে সে বের হতে পারে। পরে যদি সে পুনরায় ফিরে এসে আগের স্থানে বসতে চায়, তবে তিনি সেই (যেখানে বসে ছিলেন) স্থানের অধিক হকদার। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:”যে ব্যক্তি তার আসন থেকে উঠে পুনরায় সেখানে ফিরে আসে, সে হল বেশি হকদার।(ইবনু কুদামা আল মুগনী: খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১০১) ।
.
তিনি (ইবনু কুদামা) মাতালিব আওলান নুহা ফী শারহি গায়াতুল মুনতাহা গ্রন্থে বলেছেন:والعائد قريبا من قيامه لعارضٍ لَحِقَه كتطهرٍ أحق بمكانه الذي كان سبق إليه من كل أحد . فلو جلس فيه أحد , فله إقامته . . .”যে ব্যক্তি কোনো কারণবশত সামান্য সময়ের জন্য উঠে গিয়েছিল, যেমন পবিত্রতা অর্জনের জন্য, সে তার আগের জায়গায় ফিরে এসে বসার বেশি হকদার, অন্য যে কারও তুলনায়। যদি তার অনুপস্থিতিতে কেউ সেই জায়গায় বসে যায়, তাহলে সে (প্রথম ব্যক্তি) তাকে উঠিয়ে সেখানে বসতে পারে…(মাতালিব আওলান নুহা ফী শারহি গায়াতুল মুনতাহা খন্ড:১; পৃষ্ঠা: ৭৮৬)।
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:

: ليس لأحد أن يفرش شيئا ويختص به مع غيبته، ويمنع به غيره، هذا غصب لتلك البعقة، ومنع للمسلمين مما أمر الله تعالى به من الصلاة، والسنة أن يتقدم الرجل بنفسه، وأما من يتقدم بسجادة فهو ظالم إن لم ينته عنه، ويجب رفع تلك السجاجيد، ويمكن الناس من مكانها، هذا مع أن أصل الفرش بدعة، لا سيما في مسجد النبي صلى الله عليه وسلم، ولما قدم عبد الرحمن بن مهدي من العراق وفرش في المسجد أمر مالك بن أنس بحبسه تعزيرا له حتى روجع في ذلك، فذكر أن فعل هذا في مثل هذا المسجد بدعة يؤدب صاحبها. وعلى الناس الإنكار على من يفعل ذلك والمنع منه، لا سيما ولاة الأمر الذين لهم ولاية على المسجد، فإنه يتعين عليهم رفع هذه السجاجيد، ولو عوقب أصحابه بالصدقة بها لكان هذا مما يسوغ في الاجتهاد

“কোনো ব্যক্তির এ অধিকার নেই যে, সে নিজের অনুপস্থিতিতে কোনো স্থান জায়নামাজ বা অন্যকিছু দিয়ে দখল করে রাখবে এবং অন্যদেরকে তা ব্যবহারে বাধা দেবে। এটি একধরণের ঐ স্থান দখল করে রাখা এবং মুসল্লিদেরকে আল্লাহর নির্দেশিত সালাত থেকে বিরত রাখার শামিল। সুন্নাহর নির্দেশ হলো, মানুষ স্বয়ং আগে এসে নিজের জায়গা দখল করবে। কিন্তু যে আগে থেকে জায়নামাজ বিছিয়ে রাখে, সে স্পষ্ট জালিম যদি সে এ কাজ থেকে বিরত না থাকে। এসব জায়নামাজ অপসারণ করা এবং সাধারণ মানুষকে স্বাধীনভাবে সে স্থান ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া আবশ্যক। উল্লেখ্য, মসজিদে জায়নামাজ বিছানোই মূলত বিদআত, বিশেষত মাসজিদে নববীতে। ইতিহাসে দেখা যায়, ইরাক থেকে আগত আবদুর রহমান ইবনে মাহদী যখন মাসজিদে জায়নামাজ বিছান, ইমাম মালিক ইবনে আনাস তাকে শাস্তিস্বরূপ আটকের নির্দেশ দেন, যতক্ষণ না তাকে বিষয়টি পুনরায় চিন্তা করার জন্য বলা হয়। পরবর্তীতে এ নিয়ে আলোচনায় তিনি স্পষ্ট বলেন, “এমন পবিত্র মাসজিদে এ ধরনের কাজ বিদআত, এবং এরকম ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া উচিত।”এক্ষেত্রে সমাজের দায়িত্ব হলো, এমন অপকর্মের প্রতিবাদ করা এবং তা বন্ধ করার চেষ্টা করা। বিশেষত যারা মাসজিদ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত।তাদের জন্য আবশ্যক হলো এসব জায়নামাজ সরিয়ে দেওয়া। যদি অপরাধীদের শাস্তি হিসেবে এসব জায়নামাজ সদকা করে দেওয়া হয়, তবে এটি গ্রহণযোগ্য ইজতেহাদ হিসেবে বিবেচিত হবে।(অর্থাৎ তা শরিয়তসম্মত সমাধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে)”।(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২২; পৃষ্ঠা:১৯৩)
..
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] মসজিদে একটি স্থান সংরক্ষিত করার পরে মসজিদ থেকে বের হওয়া নিষেধ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন:والصحيح في هذه المسألة أن الحجز والخروج من المسجد لا يجوز ، وأن للإنسان أن يرفع المصلَّى المفروش ؛ لأن القاعدة : (ما كان وضعه بغير حق فرفعه حق) ، لكن لو خيفت المفسدة برفعه من عداوة أو بغضاء ، أو ما أشبه ذلك ، فلا يُرفع ، لأن درأ المفاسد أولى من جلب المصالح ، وإذا علم الله من نيتك أنه لولا هذا المصلى المفروش لكنت في مكانه ، فإن الله قد يثيبك ثواب المتقدمين ؛ لأنك إنما تركت هذا المكان المتقدم من أجل العذر “এ মাসয়ালার ক্ষেত্রে সঠিক কথা হল: মসজিদের কোনো জায়গা দখল করা অত:পর মসজিদ ত্যাগ করা জায়েজ নয়। আর যে ব্যক্তি কোনো অধিকার ছাড়া স্থান সংরক্ষণ করে,তার সংরক্ষিত মুসল্লা স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া বৈধ; কারণ মূলনীতি হলো: “যা অন্যায়ভাবে স্থাপন করা হয়েছে, তা অপসারণ করাই ন্যায্য”। তবে যদি এটি সরিয়ে নেওয়ার ফলে শত্রুতা, বিদ্বেষ বা অনুরূপ কোনো ক্ষতিকর পরিণতি বা ফিতনার আশঙ্কা থাকে,তাহলে তা সরানো উচিত নয়, কারণ মন্দ প্রতিরোধ করাই কল্যাণ অর্জনের চেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তোমার নিয়ত সম্পর্কে অবগত। যদি তোমার অন্তরে এই সংকল্প থাকে যে, যদি সুযোগ থাকত, তুমি সামনের কাতারেই থাকতে, তবে আল্লাহ তোমাকে সামনের কাতারে বসা ব্যক্তিদের মতোই পুরস্কৃত করবেন। কারণ, তুমি কেবল একটি বৈধ কারণেই সেই স্থানটি ছেড়েছো।..(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি’,খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৩৫ থেকে সংক্ষেপিত) ।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের অত্যাধিক ফজিলত রয়েছে, তাই সকল মুসলিমদের উচিত আগে ভাগে মসজিদের চলে আসা এবং প্রথম কাতারে সালাত আদায়ে সর্বদা সচেষ্ট থাকা। এখন প্রথম কাতারে নিজের জন্য একটি স্থান সংরক্ষণ করে কোন ব্যক্তি যদি মসজিদের বারিন্দায় অবস্থান করে অথবা জরুরি প্রয়োজনে যেমন: প্রস্রাব-পায়খানা কিংবা ওযু করার জন্য মসজিদ থেকে বের হয় অতঃপর ইকামাতের পূর্বে যথা সময়ে জামাআতে হাজির হয় তাহলে সংরক্ষিত ওই স্থানের জন্য এই ব্যক্তি অধিক হকদার সুতরাং তার সংরক্ষিত জায়গা থেকে তার মুসল্লা সরানো উচিত হবে না। কিন্তু একজন ব্যাক্তি যদি প্রথম কাতারে নিজের জন্য একটি স্থান দখল করে বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয় অথবা নিজ বাড়িতে চলে যায় অতঃপর পরবর্তী ওয়াক্তের জামআত শুরু হওয়ার সময় পুনরায় আসে তাহলে এটি জায়েজ নয় এবং এক্ষেত্রে সে তার সংরক্ষিত জায়গার জন্য উপযুক্ত নয় বরং সেখানে উপস্থিত যারা রয়েছেন তারা তার মুসল্লা সরিয়ে উপস্থিত কেউ সেখানে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
________________________
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: শাইখ নাসরুল্লাহ আল মাদানী (হাফি.)।

শাওয়াল মাসের সিয়াম পালনের হুকুম ও ফজিলত এবং শাওয়াল মাসের ৬টি সিয়াম সম্পর্কে যে বিষয়গুলো আমাদের জানা উচিত

 প্রশ্ন: শাওয়াল মাসের সিয়াম পালনের হুকুম এবং ফজিলত কি? শাওয়াল মাসের ৬টি সিয়াম সম্পর্কে যে বিষয়গুলো আমাদের জানা উচিত।

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তরের সারাংশ: রমাদান মাসের রোজগুলো সম্পন্ন করার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি সিয়াম রাখলে, পুরা এক বছর সিয়াম রাখার ফজিলত পাওয়া যাবে। বিস্তারিত জানতে পুরো আর্টিকেলটি পড়ুন।

বিস্তারিত উত্তর: প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর রমজানের সিয়াম পালনের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখা সুন্নত-মুস্তাহাব। এটি ফরজ নয়, তাই কেউ না রাখলে গুনাহ হবে না, তবে যে ফজিলত ও সওয়াব রয়েছে, তা থেকে বঞ্চিত হবে। শাওয়াল মাসের এই ছয়টি রোজার ফজিলত অসীম। এ সিয়ামগুলো পালনে আল্লাহর অশেষ রহমত লাভ হয়, গুনাহ মোচন হয় এবং তাকওয়া অর্জনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া যায়। তাই আমাদের উচিত এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরকালীন সঞ্চয় বৃদ্ধি করা। যে ব্যক্তি রমাদানের সবগুলো সিয়াম পালনের পর এই ৬ টি সিয়াম পালন করবে সে যেন গোটা বছর সিয়াম রাখল। এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে; আবু আইয়ুব (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রমজানের সিয়াম রাখল, এরপর শাওয়াল মাসে ছয়টি সিয়াম পালন করল, সে যেন পুরো বছর সিয়াম রাখল।”(সহিহ মুসলিম হা/১১৬৪; সুনানে আবু দাউদ হা/২৪৩৩) এ হাদিসটিকে নবী (ﷺ) অন্য হাদিসের বাণী দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পরে ছয়দিন সিয়াম রাখবে সে যেন গোটা বছর সিয়াম রাখল, যে ব্যক্তি একটি নেকি করবে সে দশগুণ সওয়াব পাবে।” অন্য বর্ণনাতে আছে- “আল্লাহ এক নেকিকে দশগুণ করেন। সুতরাং এক মাসের সিয়াম দশ মাসের সিয়ামের সমান। বাকী ছয়দিন সিয়াম রাখলে এক বছর হয়ে গেল।”[সুনানে নাসায়ী, সুনানে ইবনে মাজাহ]হাদিসটি সহিহ আত-তারগীব ও তারহীব (১/৪২১) গ্রন্থেও রয়েছে। সহিহ ইবনে খুজাইমাতে হাদিসটি এসেছে এ ভাষায়- “রমজান মাসের সিয়াম হচ্ছে দশ মাসের সমান। আর ছয়দিনের সিয়াম হচ্ছে দুই মাসের সমান। এভাবে এক বছরের সিয়াম হয়ে গেল।”
.
হাম্বলি মাযহাব ও শাফেয়ি মাযহাবের ফিকাহবিদগণ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, রমজান মাসের পর শাওয়াল মাসে ছয়দিন সিয়াম রাখা একবছর ফরজ সিয়াম পালনের সমান। অন্যথায় সাধারণ নফল সিয়ামের ক্ষেত্রেও সওয়াব বহুগুণ হওয়া সাব্যস্ত। কেননা এক নেকিতে দশ নেকি দেয়া হয়। এ ছাড়া শাওয়ালের ছয়টি সিয়াম রাখার আরও ফায়দা হচ্ছে- অবহেলার কারণে অথবা গুনাহর কারণে রমজানের সিয়ামের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে সেটা পুষিয়ে নেয়া। কেয়ামতের দিন ফরজ আমলের কমতি নফল আমল দিয়ে পূরণ করা হবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কেয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন: আমাদের রব ফেরেশতাদেরকে বলেন- অথচ তিনি সবকিছু জানেন- তোমরা আমার বান্দার সালাত দেখো; সেকি সালাত পূর্ণভাবে আদায় করেছে নাকি সালাতে ঘাটতি করেছে। যদি পূর্ণভাবে আদায় করে থাকে তাহলে পূর্ণ সালাত লেখা হয়। আর যদি কিছু ঘাটতি থাকে তখন বলেন: দেখো আমার বান্দার কোন নফল সালাত আছে কিনা? যদি নফল সালাত থাকে তখন বলেন: নফল সালাত দিয়ে বান্দার ফরজের ঘাটতি পূর্ণ করো। এরপর অন্য আমলের হিসাব নেয়া হবে।[সুনানে আবু দাউদ হা/৮৬৪, তিরমিযি হা/ ৪১৩)
.
▪️দ্বিতীয়ত: শাওয়ালের ছয়টি সিয়াম শাওয়াল মাসের শুরুতে কিংবা শেষে ধারাবাহিকভাবে যেমন রাখা যাবে তেমনি ভেঙ্গে ভেঙ্গেও রাখা যাবে, শাওয়ালের সিয়াম গুলো সাপ্তাহিক সোমবার ও বৃহস্পতিবার কিংবা প্রতি মাসের তথা আইয়ামে বীজের তিনটি সিয়াম, একই নিয়তে রাখা জায়েজ, এভাবে সিয়াম রাখলে সিয়ামকারীর জন্য ছয় সিয়ামের সওয়াব এবং সোমবার ও বৃহস্পতিবারে সিয়াম রাখার সওয়াব এবং আইয়ামে বীজের সিয়াম রাখার সওয়াবও লেখা হবে ইনশাআল্লাহ। তবে যাদের রমজানের সিয়ের কাযা রয়েছে কিংবা মানতের সিয়াম রয়েছে, তাদের জন্য একই নিয়তে উভয় সিয়াম রাখা জায়েজ নয়, কারন নফল সিয়ামের নিয়ত ও ফরয সিয়ামের নিয়ত একত্রে করা জায়েয নেই। তাছাড়া রমজানের সিয়ামের সাথে অন্য নফল সিয়ামের কোন সম্পর্ক নেই। ফরজ সিয়ামের জন্য স্বতন্ত্র বিশেষ নিয়তের প্রয়োজন রয়েছে, যেমনিভাবে শাওয়ালের ছয় সিয়ামের জন্যেও নিয়তের প্রয়োজন। এই মর্মে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে কয়েকটি ফাতওয়া মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করুন।
.
(১).একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ধরুন কারো কারো রমজানের বেশকিছু সিয়ামের কাযা রয়েছে কিন্তু তিনি শাওয়াল মাসের শুরুতে সেগুলো আদায় করেননি। অতঃপর মাসের শেষে যে কয়দিন বাকী আছে সেদিনগুলো যদি রমজানের কাযা সিয়াম ও শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখার জন্য যথেষ্ট না হয় তাহলে কি কাযা সিয়ামের আগে ছয় সিয়াম রাখা জায়েয হবে?

উত্তর: সঠিক মতানুযায়ী শাওয়ালের ছয়টি সিয়াম রমজানের সিয়াম পূর্ণ করার সাথে সম্পৃক্ত। দলিল হচ্ছে- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّامِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ “যে ব্যক্তি রমজান মাসে সিয়াম রাখল অতঃপর এ সিয়ামের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি সিয়াম রাখল সে যেন গোটা বছর সিয়াম রাখল।”(সহিহ মুসলিম হা/১১৬৪) হাদিসে উল্লেখিত ثُمَّ শব্দটি حرف عطف যা الترتيب (বিন্যাস) ও التعقيب (ক্রমধারা) অর্থে ব্যবহৃত হয়। এদিক থেকে হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, আগে রমজানের সিয়াম পূর্ণ করতে হবে। সেটা সুনির্দিষ্ট সময়ে আদায় হিসেবে হোক অথবা (শাওয়াল মাসে) কাযা পালন হিসেবে হোক। অর্থাৎ রমজানের সিয়াম পূর্ণ করার পর শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখতে হবে। তাহলে হাদিসে উল্লেখিত সওয়াব পাওয়া যাবে। কারণ যে ব্যক্তির উপর রমজানের কাযা সিয়াম বাকী আছে সেতো পূর্ণ রমজান মাস সিয়াম রাখেনি। রমজান মাসের কিছু দিন সিয়াম রেখেছে। তবে কারো যদি এমন কোন ওজর থাকে যার ফলে তিনি শাওয়াল মাসে রমজানের কাযা সিয়াম রাখতে গিয়ে শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখতে পারেননি। যেমন কোন নারী যদি নিফাসগ্রস্ত (প্রসবোত্তর স্রাবগ্রস্ত) হন এবং গোটা শাওয়াল মাস তিনি রমজানের সিয়াম কাযা করেন তাহলে তিনি জিলক্বদ মাসে শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখতে পারবেন। কারণ এ ব্যক্তির ওজর শরিয়তে গ্রহণযোগ্য। অন্য যাদের এমন কোন ওজর আছে তারা সকলে রমজানের সিয়াম কাযা করার পর শাওয়ালের ছয় সিয়াম জিলক্বদ মাসে কাযা পালন করতে পারবেন। কিন্তু কোন ওজর ছাড়া কেউ যদি ছয় সিয়াম না রাখে এবং শাওয়াল মাস শেষ হয়ে যায় তাহলে সে ব্যক্তি এই সওয়াব পাবেন না। শাইখ উসাইমীনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: কোনো নারীর উপর যদি রমজানের সিয়ামের ঋণ থেকে যায় তাহলে তার জন্য কি রমজানের ঋণের আগে শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখা জায়েয হবে; নাকি শাওয়ালের ছয় সিয়ামের আগে রমজানের ঋণের সিয়াম রাখতে হবে? জবাবে তিনি বলেন: যদি কোন নারীর উপর রমজানের কাযা সিয়াম থাকে তাহলে তিনি কাযা সিয়াম পালনের আগে ছয় সিয়াম রাখবেন না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّامِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ “যে ব্যক্তি রমজান মাসে সিয়াম রাখল এবং এ সিয়ামের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি সিয়াম রাখল সে যেন গোটা বছর সিয়াম রাখল।”(সহিহ মুসলিম হা/১১৬৪)

যার উপর কাযা রয়ে গেছে সেতো রমজানের সিয়াম পূর্ণ করেনি। সুতরাং সে কাযা আদায়ের আগে এই সিয়াম পালনের সওয়াব পাবে না। যদি ধরে নেয়া হয় যে, কাযা সিয়াম পালন করতে গোটা মাস লেগে যাবে(যেমন কোন নারী যদি নিফাসগ্রস্ত হন এবং তিনি গোটা রমজানে একদিনও সিয়াম রাখতে না পারেন, শাওয়াল মাসে তিনি রমজানের কাযা সিয়াম রাখা শুরু করেন, কিন্তু কাযা সিয়াম শেষ করতে করতে জিলক্বদ মাস শুরু হয়ে যায়) তাহলে তিনি জিলক্বদ মাসে ছয়টি সিয়াম রাখবেন। এতে করে তিনি শাওয়াল মাসে ছয় সিয়াম রাখার সওয়াব পাবেন। কেননা তিনি বাধ্য হয়ে এই বিলম্ব করেছেন (যেহেতু শাওয়াল মাসে তার পক্ষে সিয়াম রাখা সম্ভবপর ছিল না)। তাই তিনি সওয়াব পাবেন।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ২০) এর সাথে আরেকটু যোগ করে বলা যায়, যে ব্যক্তি বিশেষ কোন ওজরের কারণে রমজানের সিয়াম ভেঙ্গেছে সেটা কাযা করা তার দায়িত্বে ফরজ। রমজানের সিয়াম ইসলামের পঞ্চ বুনিয়াদের অন্যতম। তাই এই ইবাদত পালন প্রাধান্য পাবে এবং ফরজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়াকে অন্য মুস্তাহাব আমলের উপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।
.
(২).শাওয়ালের ছয় সিয়াম কি লাগাতরভাবে রাখা শর্ত? নাকি আমি আলাদা আলাদাভাবে রাখতে পারি?
.
শাওয়ালের সিয়ামগুলো লাগাতরভাবে রাখা শর্ত নয়। তাই এ সিয়ামগুলো কেউ আলাদা আলাদাভাবে রাখুক কিংবা লাগাতরভাবে রাখুক এতে কোন অসুবিধা নেই। তবে যত তাড়াতাড়ি আদায় করা যায় তত ভাল। কেননা আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “তোমরা ভাল কাজে অগ্রণী হও।” আল্লাহ্‌ আরও বলেন: “তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমার দিকে দ্রুত ছুটে আসো।” মুসা আলাইহিস সালাম বলেন: “আমি তাড়াতাড়ি আপনার কাছে আসলাম, আপনি সন্তুষ্ট হবেন এ জন্য।”[সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ৮৪] তাছাড়া দেরী করলে নানা বিপদ-আপদ ঘটতে পারে। এটি শায়েফি মাযহাবের আলেমগণ ও হাম্বলি মাযহাবের কিছু কিছু আলেমের অভিমত। কিন্তু, অবিলম্বে আদায় না করে মাসের মাঝখানে কিংবা শেষে আদায় করলেও কোন অসুবিধা নেই।

শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,

“قَالَ أَصْحَابُنَا: يُسْتَحَبُّ صَوْمُ سِتَّةِ أَيَّامٍ مِنْ شَوَّالٍ، لِهَذَا الْحَدِيثِ قَالُوا: وَيُسْتَحَبُّ أَنْ يَصُومَهَا مُتَتَابِعَةً فِي أَوَّلِ شَوَّالٍ فَإِنْ فَرَّقَهَا أَوْ أَخَّرَهَا عَنْ شَوَّالٍ جَازَ. وَكَانَ فَاعِلا لأَصْلِ هَذِهِ السُّنَّةِ، لِعُمُومِ الْحَدِيثِ وَإِطْلاقِهِ. وَهَذَا لا خِلافَ فِيهِ عِنْدَنَا وَبِهِ قَالَ أَحْمَدُ وَدَاوُد.”

“আমাদের মাযহাবের আলেমগণ বলেন: এ হাদিসের দলিলের ভিত্তিতে শাওয়াল মাসের ছয় সিয়াম রাখা মুস্তাহাব। শাওয়াল মাসের প্রথম দিকে লাগাতরভাবে সিয়ামগুলো রাখা মুস্তাহাব। আর যদি আলাদাভাবে রাখে কিংবা শাওয়াল মাসের পরে রাখে তবুও জায়েয হবে এবং এ সুন্নত পালনকারী হিসেবে গণ্য হবে এ হাদিসের ব্যাপকতার কারণে। এ বিষয়ে আমাদের আলেমগণের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। ইমাম আহমাদ ও দাউদও এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।”[আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব; ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭৮৫৮)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে নিম্নোক্ত প্রশ্নটি করা হয়েছিল; প্রশ্ন: ছয় সিয়াম কি রমযানের পর ঈদের দিনের অব্যবহিত পরেই শুরু করা আবশ্যক; নাকি ঈদের কয়েকদিন পর শাওয়াল মাসে লাগাতরভাবে রাখাও জায়েয; নাকি জায়েয নয়?

জবাবে তারা বলেন,

لا يلزمه أن يصومها بعد عيد الفطر مباشرة، بل يجوز أن يبدأ صومها بعد العيد بيوم أو أيام، وأن يصومها متتالية أو متفرقة في شهر شوال حسب ما يتيسر له، والأمر في ذلك واسع، وليست فريضة بل هي سنة.

“ঈদের দিনের অব্যবহিত পরেই ছয় সিয়াম রাখা আবশ্যকীয় নয়। বরং ঈদের একদিন পর কিংবা কয়েক দিন পর শুরু করাও জায়েয। লাগাতর ভাবে রাখা বা ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাখা; যেভাবে সুবিধা হয় সেভাবে রাখা জায়েয। এ বিষয়টি প্রশস্ত। এটি ফরয রোযা নয়; বরং সুন্নত সিয়াম”।(ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দায়িমা খন্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ৩৯১)।
.
(৩).শাওয়ালের ছয় সিয়াম কি সোমবার ও বৃহস্পতিবারে রাখা যেতে পারে?
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে শাওয়ালের ছয় সিয়াম কি সোমবার ও বৃহস্পতিবারে রাখা যেতে পারে কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে জবাবে শাইখ বলেন,

إذا اتفق أن يكون صيام هذه الأيام الستة في يوم الاثنين أو الخميس فإنه يحصل على أجر الاثنين بنية أجر الأيام الستة، وبنية أجر يوم الاثنين أو الخميس ، لقوله صلى الله عليه وسلم: (إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى).”

“যদি এই ছয়দিনের সিয়াম সোমবারে বা বৃহস্পতিবারে পড়ে তাহলে তিনি দুটো সওয়াবই পেতে পারেন; যদি তিনি ছয় সিয়ামের নিয়ত করেন এবং সোমবার বা বৃহস্পতিবারে সিয়াম রাখারও নিয়ত করেন। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “কর্মসমূহ নিয়ত অনুযায়ী হয়ে থাকে। কোন ব্যক্তি যা নিয়ত করেন সেটাই তার প্রাপ্য”।(উসাইমীন ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৫৪)
.
(৪).শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়ামের মধ্যে তিনটি সিয়াম কি শাওয়াল মাসের ১৩, ১৪, এবং ১৫ এই তিনদিন আইয়ামে বীজের নিয়তে রাখা যাবে?
.
যে ব্যক্তি শাওয়ালের ছয় সিয়ামের মধ্যে তিনটি সিয়াম আইয়ামে বীযের দিনগুলোর সিয়ামের সাথে একই নিয়তে রাখবে সে কি ফযিলত পাবে? এমন প্রশ্ন বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] করা হলে জবাবে শাইখ বলেন,

بأنه يُرجى له ذلك لأنّه يصدق أنه صام الستّ من شوال كما يصدق أنه صام الأيام البيض وفضل الله واسع.

“আশা করি তিনি সে ফযিলত পাবেন। কেননা তার ক্ষেত্রে এ কথা বলা সত্য যে, তিনি ছয় সিয়াম রেখেছেন এবং এ কথা বলাও সত্য যে, তিনি বীযের দিনগুলোর সিয়াম রেখেছেন। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ প্রশস্ত”।
.
একই মাসয়ালার জবাবে শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন আমাকে জবাব দিয়েছেন:

نعم ، إذا صام ست أيام من شوال سقطت عنه البيض، سواء صامها عند البيض أو قبل أو بعد لأنه يصدق عليه أنه صام ثلاثة أيام من الشهر ، وقالت عائشة رضي الله عنها: كان النبي صلى الله عليه وسلم يصوم ثلاثة أيام من كل شهر لا يبالي أصامها من أول الشهر أو وسطه أو آخره، و هي من جنس سقوط تحية المسجد بالراتبة فلو دخل المسجد وصلى السنة الراتبة سقطت عنه تحية المسجد …”

হ্যাঁ। যদি কেউ শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখে তার উপর বীযের সিয়ামগুলো বাদ হয়ে যাবে; হোক না তিনি বীযের দিনগুলোতে কিংবা আগে কিংবা পরে সিয়ামগুলো রাখুন না কেন। যেহেতু তার ক্ষেত্রে এ কথা বলা সত্য হয় যে, তিনি প্রত্যেক মাসের তিনদিন সিয়াম রেখেছেন। তিনি কি মাসের প্রথমে সিয়ামগুলো রাখলেন; নাকি মাঝে রাখলেন; নাকি শেষে রাখলেন সেটা ধর্তব্য নয়। সুন্নত সালাত আদায় করার মাধ্যমে যেমন তাহিয়্যাতুল মসজিদের সালাত পড়া বাদ হয়ে যায় এটি সেই শ্রেণীর আমল। কেউ যদি মসজিদে প্রবেশ করে সুন্নত সালাত পড়ে তাহলে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করার বিধান বাদ হয়ে যায়…।আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।(ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতাওয়া নং-৪০১৫)
.,
(৫).শাওয়াল মাসের ৬ টি সিয়াম কি রমজানের কাযা সিয়াম আদায়ের সাথে একই নিয়তে রাখা যাবে?
.
রমজানের কাযা আদায় ও শাওয়ালের ছয় দিনের সিয়াম এক নিয়্যতে এক সাথে আদায় করা শুদ্ধ হবে কিনা এমন একটি প্রশ্ন আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে করা হলে জবাবে শাইখ বলেন,

من صام يوم عرفة ، أو يوم عاشوراء وعليه قضاء من رمضان فصيامه صحيح ، لكن لو نوى أن يصوم هذا اليوم عن قضاء رمضان حصل له الأجران: أجر يوم عرفة ، وأجر يوم عاشوراء مع أجر القضاء ، هذا بالنسبة لصوم التطوع المطلق الذي لا يرتبط برمضان ، أما صيام ستة أيام من شوال فإنها مرتبطة برمضان ولا تكون إلا بعد قضائه، فلو صامها قبل القضاء لم يحصل على أجرها ، لقول النبي صلى الله عليه وسلم : (من صام رمضان ثم أتبعه بست من شوال فكأنما صام الدهر) ومعلوم أن من عليه قضاء فإنه لا يعد صائماً رمضان حتى يكمل القضاء”

“যে ব্যক্তি আরাফাতের দিন অথবা আশুরার দিনে সিয়াম পালন করে এবং তার উপর রমজানের কাযা সিয়াম অনাদায় থাকে তবে তার সিয়াম রাখাটা সহিহ। তবে তিনি যদি এই সিয়ামের মাধ্যমে রমজানের কাযা সিয়াম পালনেরও নিয়্যত করেন তবে তার দুটি সওয়াব হবে। আরাফাতের দিন অথবা আশুরার দিন সিয়াম পালনের সওয়াব ও কাযা সিয়াম আদায়ের সওয়াব। এটি সাধারণ নফল সিয়ামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রমজানের সিয়ামের সাথে যে নফল সিয়ামের কোন সম্পর্ক নেই। তবে শাওয়ালের ছয় সিয়াম রমজানের সাথে সম্পৃক্ত। সে সিয়াম রমজানের কাযা সিয়াম আদায়ের পরেই রাখতে হবে। তাই যদি কেউ কাযা আদায়ের আগে তা পালন করে তবে তিনি এর সওয়াব পাবেন না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম বলেছেন : من صام رمضان ثم সম্পূর্ণ করে।”(উসাইমীন; ফাতাওয়াস্ সিয়াম’ পৃষ্ঠ: ৪৩৮)
.
(৬).কসম এর কাফ্‌ফারার সিয়াম শাওয়াল মাসের ছয় সিয়াম হিসেবে গণ্য হবে কী?
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: শাওয়ালের ছয় সিয়াম, আশুরার সিয়াম ও আরাফার দিনের সিয়াম কি শপথ ভঙ্গের সিয়াম হিসেবে আদায় হবে? যদি ব্যক্তি শপথের সংখ্যা নির্ধারণ করতে অক্ষম হয়?

উত্তরে তারা বলেন:

كفارة الأيمان هي : عتق رقبة مؤمنة ، أو إطعام عشرة مساكين ، أو كسوتهم ، فإن لم تجد شيئاً من ذلك : فتصوم عن كل يمين ثلاثة أيام .وأما عجزك عن حصر الأيمان : فيجب عليك الاجتهاد في حصرها بالتقريب ، ثم التكفير فيما حنثت فيه منها ، ويكفيك ذلك إن شاء الله .ولا يجزئ صيام يوم عاشوراء ، وعرفة ، وستة من شوال ، عن كفارة اليمين ، إلا إذا نوى بصيامها أنه عن الكفارة لا التطوع .الشيخ عبد العزيز بن باز ، الشيخ عبد الرزاق عفيفي ، الشيخ عبد الله بن غديان

“শপথের কাফ্‌ফারা হচ্ছে, একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করা কিংবা দশজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো কিংবা তাদেরকে পোশাক দেয়া। যদি এগুলোর কোনটি কেউ করতে না পারে তাহলে সে প্রতিটি শপথ ভঙ্গের বদলে তিনদিন সিয়াম রাখবে। আপনি বলেছেন যে, আপনি শপথের সংখ্যা হিসাব করতে অক্ষম: আপনার কর্তব্য হচ্ছে, কাছাকাছি সংখ্যা হিসাব করার চেষ্টা করা। এরপর এ শপথগুলোর মধ্যে যেগুলো আপনি ভঙ্গ করেছেন সেগুলোর কাফ্‌ফারা আদায় করা। এভাবে করা আপনার জন্য যথেষ্ট হবে, ইনশাআল্লাহ্‌। আশুরার সিয়াম, আরাফার রোযা ও শাওয়ালের ছয় সিয়াম শপথ ভঙ্গের কাফ্‌ফারার সিয়াম হিসেবে আদায় হবে না; তবে ব্যক্তি যদি নিয়ত করে যে, এটা কাফ্‌ফারার সিয়াম; নফল সিয়াম নয় তাহলে আদায় হবে।”(ফাতাওয়াল লাজনাহ্‌ দায়িমাহ; খণ্ড ২৩; পৃষ্ঠা: ৩৭,৩৮)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্নকারী বোন উল্লেখ করেছেন যে, তিনি শপথ করেছেন; এখন তিনি তিনদিন সিয়াম রেখে এ শপথের কাফ্‌ফারা আদায় করতে চাচ্ছেন। আমার জন্যে কি এ রোযাগুলো শাওয়ালের ছয় সিয়ামের সাথে রাখা জায়েয হবে? অর্থাৎ আমি ছয়দিন সিয়াম রাখব?

উত্তরে তিনি বলেন:

أولاً : لا يجوز للحالف إذا حنث في يمينه أن يصوم ، إلا إذا كان لا يجد إطعام عشرة مساكين ، أو كسوتهم ، أو تحرير رقبة ؛ لأن الله سبحانه وتعالى قال ( فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلاثَةِ أَيَّامٍ ذَلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ) ، وقد اشتهر عند كثير من العامة : أن كفارة اليمين إذا حنث الحالف : صيام ثلاثة أيام لمن يجد الإطعام ، أو الكسوة ، أو العتق ، ومن لا يجد ، وهذا غلط ، بل لا يجوز الصيام إلا إذا كان الحالف الذي حنث لا يجد إطعام عشرة مساكين ، أو يجد لكن لا يجد مساكين ، فحينئذٍ يصوم ثلاثة أيام متتابعة .ثم إذا كان يندرج تحت صيام الأيام الثلاثة : فإنه لا يجزئ أن ينوي بها صيام ستة أيام من شوال ؛ لأنهما عبادتان مستقلتان ، فلا تغني إحداهما عن الأخرى ، بل يصوم ستة أيام من شوال ، ثم يصوم الأيام الثلاثة زائدة على صيام الأيام الستة

“শপথকারী শপথ ভঙ্গ করলে তার জন্য সিয়াম দিয়ে কাফ্‌ফারা আদায় করা জায়েয হবে না; যদি না তিনি দশজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়ানো কিংবা তাদেরকে পোশাক দেয়া কিংবা একজন কৃতদাস মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখেন। কেননা আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, “এর কাফ্‌ফারা হচ্ছে- দশজন মিসকীনকে মধ্যম ধরণের খাদ্য দান, যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, বা তাদেরকে বস্ত্রদান, কিংবা একজন দাসমুক্তি। অতঃপর যার সামর্থ্য নেই তার জন্য তিন দিন সিয়াম পালন। তোমরা শপথ করলে এটাই তোমাদের শপথের কাফ্‌ফারা।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৮৯] সাধারণ মানুষের কাছে একটা বিষয় মশহুর হয়ে গেছে যে, শপথ ভঙ্গ করার কাফ্‌ফারা তিনদিন সিয়াম রাখা; চাই সে ব্যক্তি মিসকীনকে খাদ্য দেয়া কিংবা পোশাক দেয়া কিংবা দাস মুক্ত করার সামর্থ্য রাখুক কিংবা না-রাখুক এটি ভুল। বরং যে শপথভঙ্গকারী দশজন মিসকীনকে খাদ্য দেয়ার সামর্থ্য রাখে না, কিংবা সামর্থ্য রাখলেও মিসকীন খুঁজে পায় না; সে ব্যক্তি লাগাতর তিনদিন সিয়াম রাখবে।শপথভঙ্গকারী ব্যক্তি যদি তিনদিন সিয়াম রাখার শ্রেণীভুক্ত হয় সেক্ষেত্রে এ রোযাগুলোর মাধ্যমে শাওয়ালের ছয় সিয়ামের নিয়ত করা জায়েয হবে না। কেননা, এ দুইটি স্বতন্ত্র দুটি ইবাদত। একটি দিয়ে অপরটি আদায় হবে না। বরং সে ব্যক্তি শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখবে। তারপর ছয়দিনের উপর আর তিনটি সিয়াম অতিরিক্ত রাখবে।(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, পৃষ্ঠা: ৮৪, ৮৫)
.
(৭).যাদের মানতের সিয়াম বাকি আছে এমতাবস্থায় শাওয়াল মাসে তাদের জন্য কি শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখা উত্তম; নাকী মানতের সিয়াম রাখা উত্তম?

প্রশ্ন: বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে প্রশ্ন: আমি একবার রোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম এবং মানত করেছিলাম যে, সুস্থ হলে আল্লাহর জন্য ১৫টি সিয়াম রাখব; আমি কোন সময় নির্ধারণ করিনি। আলহামদুলিল্লাহ, আমি সুস্থ হয়েছি এবং রজব মাস থেকে সিয়াম রাখা শুরু করেছি। পাঁচদিন সিয়াম রেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এরপর শাবান মাসে আরও পাঁচদিন সিয়াম রেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এরপর রমজান শুরু হলে রমজানের সিয়াম রেখেছি। এখন আমরা শাওয়াল মাসে আছি। এমতাবস্থায় আমার জন্য কি শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখা উত্তম; নাকি মানতের বাকী পাঁচদিনের সিয়াম পরিপূর্ণ করা উত্তম? দয়া করে জানাবেন, আল্লাহ আপনাকে মোবারকময় করুন।

জবাবে শাইখ বলেন,

عليك أولاً أن تصومي بقية النذر، ثم تصومي الستة من شوال إذا تمكنت من ذلك، وإن تركتيها فلا بأس، لأن الصوم للستة من شوال مستحب وليس بواجب. أما صوم النذر فهو واجب فريضة فالواجب عليك أن تبدئي بالفريضة قبل النافلة، وإذا كنت قد نويت التتابع ؛ أنك تصومين خمسة عشر يوماً متتابعة فلابد أن تصوميها متتابعة، ولا يجوز تفريقها بل عليك أن تصوميها متتابعة، والصوم السابق يلغى.أما إذا نويت صيامها غير متتابعة فقد وجب عليك الباقي وهي خمسة أيام تصومينهن إن شاء الله وانتهى الأمر.ولا ينبغي أن تنذري بعد ذلك، فالنذر لا ينبغي، يقول النبي صلى الله عليه وسلم: لَا تَنْذِرُوا، فَإِنَّ النَّذْرَ لَا يَرُدُّ شَيْئًا مِنْ الْقَدَرِ، وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنْ الْبَخِيلِ.فلا ينبغي النذر لا للمريض ولا غير المريض، ولكن متى نذر الإنسان طاعة لله وجب عليه الوفاء كالصوم والصلاة، لقول النبي صلى الله عليه وسلم: مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ، وَمَنْ نَذَرَ أَنْ يَعْصِيَهُ فَلَا يَعْصِهِ رواه البخاري في الصحيح.فإذا نذر الإنسان صوم أيام معدودة، أو صلاة ركعتين، أو صدقة بكذا من المال لزمه أن يوفي بما نذر من الطاعات ؛ لأن الله مدح المؤمنين فقال: يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا الإنسان/7.ولأن الرسول صلى الله عليه وسلم أمر بالوفاء كما في الحديث السابق، فالنذر ليس هو سبباً للبرء، وليس سببا لحصول الحاجة المطلوبة، فلا حاجة إليه، ولكنه شيء يكلف الإنسان به نفسه، ويستخرج به من البخيل، ثم بعد ذلك يندم ويقع في الحرج ويود أنه لم ينذر، فالشريعة بحمد الله جاءت بما هو أرفق وأنفع للناس وهو النهي عن النذر”

“আগে মানতের অবশিষ্ট সিয়ামগুলো শেষ করা আপনার কর্তব্য। এরপর সম্ভব হলে শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখবেন। যদি ছয় সিয়াম নাও রাখতে পারেন কোন অসুবিধা নেই। কারণ শাওয়ালের ছয় সিয়াম রাখা মুস্তাহাব; ফরজ নয়। পক্ষান্তরে মানতের সিয়াম রাখা ফরজ। তাই আপনার কর্তব্য হচ্ছে- নফলের আগে ফরজ সিয়াম রাখা। আপনি যদি লাগাতরভাবে ১৫টি সিয়াম রাখার নিয়ত করে থাকেন তাহলে আপনাকে লাগাতরভাবে ১৫টি সিয়াম রাখতে হবে। আলাদা আলাদাভাবে রাখলে চলবে না; বরং লাগাতরভাবে রাখতে হবে। আর পূর্বের রোজাগুলো বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি আপনি লাগাতরভাবে রাখার নিয়ত না করে থাকেন তাহলে বাকী ৫টি সিয়াম রাখলে ইনশাআল্লাহ আপনার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে।আর পরবর্তীতে কখনও মানত করবেন না; মানত করা সমীচীন নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা মানত করো না; কারণ মানত তাকদীর পরিবর্তন করে না। মানতের মাধ্যমে কৃপণের সম্পদ খরচ করানো হয়।”এ কারণে মানত করা ঠিক না। অসুস্থ ব্যক্তির জন্যেও না; অসুস্থ নয় এমন ব্যক্তির জন্যেও না। তবে কেউ যদি আল্লাহর কোন একটি আনুগত্য পালন করার মানত করে যেমন- সালাত, সিয়াম তাহলে সে মানত পূর্ণ করা ফরজ। দলিল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার মানত করেছে তার উচিত সে আনুগত্য পূর্ণ করা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার মানত করেছে সে আল্লাহর অবাধ্য হবে না।”[সহিহ বুখারি] অতএব কোন ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট কিছুদিন সিয়াম রাখার অথবা দুই রাকাত সালাত পড়ার অথবা বিশেষ সম্পদ সদকা করার মানত করে থাকে তার উচিত সে আনুগত্যের কাজ পালন করা। কেননা আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন: “তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে যেদিনের অনিষ্ট সম্প্রসারিত।”[সূরা আল-ইনসান, আয়াত: ৭] এবং কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্বোক্ত হাদিসে মানত পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং মানত রোগমুক্তির কারণ নয়; প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার কারণ নয়। তাই মানতের কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু মানুষ নিজের উপর সেটা অনিবার্য করে নেয়। এর মাধ্যমে কৃপনের সম্পদ খরচ করানো হয়। পরবর্তীতে মানতকারী আফসোস করে, কষ্টে পড়ে এবং প্রত্যাশা করে সে যদি মানত না করত। আলহামদুলিল্লাহ ইসলামি শরিয়ত এমন বিধান জারী করেছে যা মানুষের জন্য কল্যাণকর ও সহজতর। সেটা হচ্ছে- মানত করা থেকে নিষেধাজ্ঞা।”(শাইখ বিন বায; ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব: ৩/১২৬১) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
______________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফী।

রমাদান মাস থেকে আমরা কী শিক্ষা নিবো

 প্রশ্ন: মহিমান্বিত মাস রমাদান তো শেষ হয়ে গেলো। রমাদান মাস থেকে আমরা কী শিক্ষা নিবো?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আরবী ১২টি মাসের মধ্যে রমাদান মহান আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি মাস। রমাদান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক মহান রহমত ও নেয়ামত। এ মাসে আমাদের আমল এবং ইবাদত বেশি হওয়ার কারণে আমরা অনেক সওয়াব লাভ করি। রমাদান চলে গেলেও আমাদের কর্তব্য শেষ হয়নি। মুমিনের জন্য প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তেই ইবাদত করার সুযোগ থাকে, কারণ আমাদের রব আল্লাহ তাআলা সব সময়ের প্রভু। রমাদান থেকে যে সকল ভালো আমল অভ্যাস করা হয়েছে, তা চালিয়ে যেতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِيْن “মৃত্যু আসা অবধি তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকো।” (সূরা হিজর: ১৫/৯৯)। হাদিসে এসেছে আয়িশাহ (রদিয়াল্লহু আনহা) বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ‘আমল কী? তিনি বললেনঃ “যে ‘আমল সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয়। যদিও বা তা পরিমাণে কম হয়।’’(সহীহ বুখারী হা/৬৪৬৫; সহীহ মুসলিম হা/৭৮৩)
.
রমাদানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো তাক্বওয়া অর্জন করা, যা হলো আল্লাহভীতি। সুতরাং কতটুকু তাকওয়া অর্জন করতে পেরেছি আমরা? কেননা তাক্বওয়াই তো মুমিন নারী- পুরুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। তাক্বওয়ার স্থান হলো, ক্বলব বা অন্তর। যে ব্যক্তি তাক্বওয়া অর্জন করবে সে ব্যক্তি যেমন আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও জান্নাত পাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকে; এবং মুমিন ব্যক্তি সব ধরনের অসত্‍ কাজ, যেমন মিথ্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি, চুরি, মদ, গান-বাজনা, বেহায়াপনা, এবং যেকোনো প্রকার জাহেলিয়াত থেকে বেঁচে থাকে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,”তাক্বওয়া’ হল, فِعْلُ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ وَتَرْكُ مَا نَهَى اللهُ عَنْهُ ‘আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা প্রতিপালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন, তা পরিত্যাগ করা”(মাজমূউল ফাতাওয়া; খন্ড:২৭/৩৯)। আবু বকর আল-জাযায়েরী বলেন,”তাক্বওয়া’ হল,فِعْلُ مَا أَمَرَ اللهُ بِهِ وَرَسُوْلُهُ وَتَرْكُ مَا نَهَى اللهُ عَنْهُ وَرَسُوْلُهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ”আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) যা আদেশ করেছেন তা প্রতিপালন করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) যা নিষেধ করেছেন, তা পরিত্যাগ করা”।(আইসারুত তাফাসীর লি-কালামিল উ‘লা আল-কাবীর (মদীনা মুনাওয়ারা: মাকতাবাতুল ‘উলূম ওয়াল হিকাম, ৫ম সংস্করণ, ১৪২৪ হি./২০০৩ খ্রি.),পৃষ্ঠা: ৫৮৬) সুতরাং রমাদানে যেমন মুসলিমরা তাদের পাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে চেষ্টা করে, বিড়ি-সিগারেট, তামাক ও জর্দা খাওয়া ব্যক্তিরাও তাতে বিরত থাকার চেষ্টা করেছে, এবং এ মাসে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ও শ্রম দিয়ে আমল ও ইবাদত করার চেষ্টাও করেছে, তেমনই পরবর্তী মাসগুলোতেও সেই প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম যেন অব্যাহত থাকে। তার সব আমল এমন হওয়া উচিত যেন সে মনে করে, সে সেগুলো রমাদানেই করছে এবং তার কর্মে রমাদানের পবিত্রতার ছাপ যেন সর্বদা প্রতিফলিত হয়।
.
হে আমাদের পাঠক! রমাদানের পরও নেক আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কবুলিয়তের অন্যতম লক্ষণ। যদি রমাদানের পর আপনি আল্লাহর ইবাদতে আগ্রহী থাকেন, তাহলে এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আপনার রোযা ও তারাবীহ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু যদি রমাদানের পর পুরোনো জীবনে ফিরে যান, তাহলে এটি ঠিক সেই নারীর মতো হয়ে যাবে, যাকে আল্লাহ কুরআনে উদাহরণ হিসেবে এনেছেন “তোমরা ওই নারীর মতো হয়ো না, যে সুতো পাকিয়ে শক্ত করার পর তা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে।” (সূরা আন-নাহল: ৯২) এই নারী কষ্ট করে সুতা পাকিয়ে টুপি, কাপড়, কম্বল ইত্যাদি বানাতো, কিন্তু পরে নিজেই সেটি ছিঁড়ে ফেলতো। তার এই কাজ দেখে লোকে তাকে পাগল ভাবতো।তেমনি রোযাদারদের অনেকের অবস্থাও এমনই এক মাস সিয়াম সাধনা করে, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে, দোয়া-ইস্তিগফারে মশগুল থাকে; কিন্তু রমাযান শেষ হতেই পুরোনো গুনাহের জীবনে ফিরে যায়।এটি এমন, যেন কেউ পরীক্ষার হলে বসে তিন ঘণ্টা ধরে চমৎকার উত্তর লিখলো, কিন্তু খাতা জমা না দিয়ে নিজেই ছিঁড়ে ফেলে দিলো!
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] বলেছেন,”রামাদান হোক বা অন্য যে কোনো সময়, আল্লাহর কাছে কোনো আমল কবুল হওয়ার অন্যতম লক্ষণ হলো একটি সৎকর্মের পর আরেকটি সৎকর্ম করা। যদি কোনো মুসলিম রামাদানের পরও নিজেকে নেক আমলের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখে, সৎকর্মে অগ্রসর হয় এবং ইবাদত-বন্দেগিতে মনোযোগী থাকে, তবে এটি তার আমল কবুল হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ। অন্যদিকে যদি কেউ এর বিপরীত আচরণ করে নেক আমলের পর গুনাহের পথে ফিরে যায়, রামাদান শেষে গাফিলতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যায়, তবে এটি তার আমল প্রত্যাখ্যাত হওয়ার লক্ষণ।”(মাজালিসু শাহরে রামাযান; পৃষ্ঠা: ১১৯)
.
রমদান পর মুসলিমের জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ও বর্জনীয় আমলসমূহ, নিম্নোক্ত তা আলোচনা করা হলো:

▪️ রমাদান পর মুসলিমের করনীয়:
____________________________________
(১).কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইবাদত চালিয়ে যাওয়া:

প্রিয় পাঠক! ইবাদতের পথ কখনো থামে না; এটি মৃত্যুর সীমানা পর্যন্ত চলমান। সুতরাং ইবাদত শুধু রমাদানের জন্য নয়, বরং মৃত্যু পর্যন্ত মুমিনের জীবনজুড়ে অব্যাহত থাকা উচিত। আল্লাহ বলেন,«وَ اعۡبُدۡ رَبَّكَ حَتّٰی یَاۡتِیَكَ الۡیَقِیۡنُ”তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত।(সূরা হিজর, ১৫ আয়াত: ৯৯)
.
(২).রমাদানের শিক্ষা অব্যাহত রাখা: রমাদান আমাদের আত্মসংযম এবং ত্যাগের শিক্ষা দেয়। তাই রমাদানের পরও তার শিক্ষা অব্যাহত রাখা উচিত। যেমন নিয়মিত ফরজ নফল ইবাদত করা, অন্তরকে হিংসা বিদ্বেষ মুক্ত রাখা,সামর্থ্য অনুযায়ী দান সদকা করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো,আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ‘আমল কী? তিনি বললেনঃ যে ‘আমল সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয়।যদিও বা তা পরিমাণে কম হয়।’’(সহীহ বুখারী হা/৬৪৬৫; সহীহ মুসলিম হা/৭৮৩)
.
(৩). ফরজের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া: রমাদান শেষে আমাদের তাহাজ্জুদ নামাজ ও অন্যান্য নফল ইবাদত চালিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে আমরা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারি। কেননা তাহাজ্জুদ নামাজ নফসের প্ররোচনায় গুনাহ সংঘটিত হতে বাধা দানকারী: আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই রাত্রিজাগরণ প্রবৃত্তি দমনে অত্যন্ত কার্যকর।’’(সূরা মুযযাম্মিল, আয়াত: ৬) এমনকি এটি জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায়”(তিরমিযি হা/২৪৮৫; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৩৪)
.
(৬).নিয়মিত কুর’আন তেলাওয়াত করা: “কুরআন তেলাওয়াত কখনোই পরিত্যাগ করা উচিত নয়। যারা শুধুমাত্র রমজান মাসে কুরআন তেলাওয়াত করেন এবং বাকি সময় তা পরিত্যাগ করেন, তাদের প্রতি এমন আচরণ ঠিক নয়। নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন, «أهل الْقُرْآنَ هُمْ أَهْلُ اللهِ،وَخَاصَّته.»কুরআন তেলাওয়াতকারীরা আল্লাহর পরিজন এবং তাঁর বিশেষ বান্দা।'(মুসনাদ আহমদ হা/১২২৯২) আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, «یٰیَحۡیٰی خُذِ الۡكِتٰبَ بِقُوَّةٍ”হে ইয়াহইয়া, তুমি কিতাবটি দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো।”(সূরা মারিয়াম: ১২) আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ) বলেন,إِنِّي لَأَسْتَحْيِي أَلَّا أَنْظُرَ كُلَّ يَوْمٍ فِي عَهْدِ رَبِّي مَرَّةً ‘প্রতিদিন একবার হ’লেও আমার রবের প্রতিশ্রুতি (কুরআনের) দিকে একবার নযর না বুলানোকে আমি খুই লজ্জাবোধ করি”।(তাফসীরে কুরতুবী; খণ্ড: ১;
পৃষ্ঠা: ২৮) ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:فَإِنَّ الَّذِي يُدَاوِمُ عَلَى ذَلِكَ (القُرْآنِ) يَذِلُّ لَهُ لِسَانُهُ وَيَسْهُلُ عَلَيْهِ قِرَاءَتُهُ، فَإِذَا هَجَرَهُ ثَقُلَتْ عَلَيْهِ القِرَاءَةُ وَشَقَّتْ عَلَيْهِ، ‘যে ব্যক্তি এই কুরআন নিয়মিত তেলাওয়াত করবে, এর জন্য তার জিব্বা নমনীয় হবে এবং তেলাওয়াত তার জন্য সহজ হয়ে যাবে। আর যখন সে কুরআন পরিত্যাগ করবে তখন এর তেলাওয়াত তার কাছে ভারী ও কঠিন হয়ে যাবে”।(ফাৎহুল বারী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৭৯)
.
(৪).বেশি বেশি দু’আ করা: মুমিন রমজানের পরও আল্লাহর কাছে সুন্দর এবং কল্যানকর জীবনযাপনের জন্য দু’আ করে, কারণ একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহেই যাবতীয় বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। কুরআনে বলা হয়েছে:”হে আমাদের রব! হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে বিভ্রান্ত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে করুণা দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।”(আল ইমরান ৩:৮) মুমিনের জীবনের যাবতীয় দুশ্চিন্তা দূর করার শ্রেষ্ঠ উপায় দু’আ। রাসূল (ﷺ) বলেন:”আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিষয় হলো দু’আ।” (ইবনে মাজাহ, হা/৩৮২৯; হাসান)
.
(৫).হালাল উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করা: হালাল উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত শান্তি ও সন্তুষ্টির কারণ নয়, বরং এটি সমাজের কল্যাণেও অবদান রাখে। তাছাড়া হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হারাম উপার্জন বা খাদ্য গ্রহণকারী ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় না। রাসূল (ﷺ) বলেছেন:”এক ব্যক্তি দীর্ঘ ভ্রমণে ধুলিমলিন অবস্থায় হাত উঠিয়ে দোয়া করে বলে, ‘হে প্রভু, হে প্রভু,’ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় হারাম এবং তার আহার্য হারাম, ফলে কেমন করে তার দোয়া কবুল হতে পারে?”(সহীহ মুসলিম: ১০১৫)
.
(৬).বেশি বেশি নফল সিয়াম পালন করা: নফল সিয়াম পালন করা একটি মহৎ ইবাদত, যা আত্মশুদ্ধি, তাক্বওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। এই আমল শুধু পাপ মোচনই করে না, বরং আখিরাতের জন্য অফুরন্ত সওয়াবের ভান্ডারও তৈরি করে। তাই নিয়মিত নফল রোজার অভ্যাস গড়ে তুলতে ছোট থেকে শুরু করুন, যেমন: প্রথমেই রমাদানের কাযা সিয়াম থাকলে আগে সেগুলো রাখুন, তারপর সপ্তাহে একদিন, তারপর ধীরে ধীরে বাড়ান। যেমন প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার, প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তিনটি সিয়াম, আশুরার সিয়াম,শাওয়াল মাসের ৬ টি সিয়াম, আরাফার সিয়াম ইত্যাদি। রাসূল ﷺ বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন রোজা রাখে, আল্লাহ তা’আলা তাকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে সরিয়ে দেন।”(সহীহ মুসলিম,হা/১১৫৩)
.
রমাদান শেষে মুসলিমদের জন্য কিছু কাজ বর্জনীয় যা তাদের ঈমান ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রমাদান পর মুসলিমদের বর্জনীয় কিছু কাজ:
_______________________________________
(১).ফরজ আমল ত্যাগ করা এবং নিষিদ্ধ কাজে যুক্ত হওয়া:

কোনো অবস্থাতেই ফরজ আমল ত্যাগ করা এবং হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া যাবে না। কারণ,এ দুটোই মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার মূল ভিত্তি।” সুতরাং শরীয়ত বিরোধী কোন কাজে যুক্ত হওয়ার পূর্বে মাথায় রাখতে হবে আল্লাহ সবকিছু দেখছেন এবং তার নিয়জিত ফেরেশতারা লিখছেন। একদিন সবকিছুর হিসাবে দিতে হবে।(দেখুন সূরা আহকাফ: ১৮; তিরমিজি হা/২৪১৯ সিলসিলা সহিহাহ হা/ ৯৪৬)
.
(২).নফসের আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করা:
.
রমাদান মাস আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও তাক্বওয়ার প্রশিক্ষণের এক মহান সুযোগ। এ মাসে মুসলিমরা নিজেদের নফসের খেয়াল-খুশি ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু রমাদানের পর যদি কেউ আবার নফসের দাসত্বে ফিরে যায়, তবে সে রমযানের মূল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। প্রকৃত বিজয় সেই ব্যক্তি অর্জন করে, যে রমাদানের পরও নফসের আবেগ ও কুপ্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ না করে, বরং তাক্বওয়ার ওপর অটল থাকে। আল্লাহ বলেন:قَدۡ اَفۡلَحَ مَنۡ زَكّٰىهَا ۪ۙ”সফল সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করলো।” (সূরা আশ-শামস: ৯) রমাদানের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তা আমাদের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনে, আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং নফসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে।
.
(৩). গান বাজনা নাটক সিনেমা দেখা:
.
মিউজিক বাজানো ও শোনা, অশ্লীল নাটক সিনেমা দেখা হারাম হওয়ার ব্যাপারে ‘আলিমদের মধ্যে কোনো মতদ্বৈধতা নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ ‘আর মানুষের মধ্যে থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা ক্রয় করে। আর তারা এগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাজনক আযাব”(লুক্বমান, ৩১/৬)।উক্ত আয়াতে লাহওয়াল হাদীস বলতে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘ঐ সত্তার কসম, যিনি ছাড়া প্রকৃত কোনো মা‘বূদ নেই! নিশ্চয়ই এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গান’। তিনি একথাটি তিনবার বলেন।(ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ, ইগাসাতুল লাহফান, ১/২৫৮-২৫৯) আবূ ‘আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি নাবী ﷺ কে বলতে শুনেছেন, لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الحِرَ، وَالحَرِيرَ، وَالخَمْرَ، وَالمَعَازِفَ “আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও মা‘আযিফকে (বাদ্যযন্ত্র) হালাল বলে বিশ্বাস করবে।” [সাহীহ বুখারী, হা/৫৫৯০] মা‘আযিফ হলো বাদ্যযন্ত্র, যা দিয়ে গান বাজানো হয়। যেমন: বীণা, বাঁশি, তবলা, তাম্বুরা, ক্লাইনেট, মন্দিরা প্রভৃতি।
.
(৪).অতি গর্ব ও অহংকার করা:
.
রমাদান ছিল আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস, যেখানে বিনয় ও নম্রতা অর্জনের শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু রমাদানের পর যদি কেউ গর্ব ও অহংকারে মত্ত হয়, তবে তা রমাদানের মূল শিক্ষা ও ইসলামের আদর্শের বিপরীত। প্রকৃত মুত্তাকি সেই ব্যক্তি, যিনি রমাদানের পরও বিনয় ধরে রাখেন এবং নিজের অর্জনকে আল্লাহর দান হিসেবে দেখেন, অহংকারের উপলক্ষ হিসেবে নয়। কেননা অহংকার হলো পতনের মূল। রাসূল ﷺ বলেছেন,”ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যার অন্তরে কণা পরিমাণ অহংকার রয়েছে।(মুসলিম হা/৯১; মিশকাত হা/৫১০৮) শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,التَّكَبُّرُ شَرٌّ مِنَ الشِّرْكِ فَإِنَّ الْمُتَكَبِّرَ يَتَكَبَّرُ عَنْ عِبَادَةِ اللهِ تَعَالَى، وَالْمُشْرِكَ يَعْبُدُ اللهَ وَغَيْرَهُ.”অহংকার শিরকের চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা অহংকারী ব্যক্তি আল্লাহর দাসত্বের বিরুদ্ধে অহংকার করে। আর মুশরিক আল্লাহর ইবাদত করে এবং সাথে অন্যেরও করে”।(ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন; ২/৩১৬)
.
(৫).ধূমপান/মাদকে আসক্ত হওয়া:

রামাদান সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। এটি শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার সময় নয়; বরং আত্মগঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ। যারা ধূমপান বা মাদকাসক্তি ত্যাগ করতে চান, তাদের জন্য রামাদান হতে পারে এক নতুন সূচনা।এই মাসে সারাদিন ধূমপান থেকে বিরত থাকাই প্রমাণ করে যে, আপনি চাইলেই ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তাই রামাদানের সুযোগ নিয়ে ধাপে ধাপে ধূমপানের পরিমাণ কমিয়ে আনুন এবং ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একসময় সম্পূর্ণরূপে তা পরিত্যাগ করুন। রমাদান শেষে যেন আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে না যান, সেজন্য খাবারের পর সিগারেট বা মাদকের প্রলোভনকে প্রশ্রয় দেবেন না। মনে রাখবেন, আপনার শরীর ও মন উভয়ের সুস্থতার জন্য এটি এক অনন্য সিদ্ধান্ত। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, এবং এই পবিত্র মাসকে নিজের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যম বানান। মনে রাখবেন সাধারণ দলিলপ্রমাণের ভিত্তিতে ধূমপান হারাম। এটি শারিরীক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই ক্ষতিকর। আল্লাহ বলেন,«وَ لَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡكُمۡ اِلَی التَّهۡلُكَةِ”স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না”।(সূরা বাকারা২ আয়াত:১৯৫)
.
(৬).গুনাতে লিপ্ত হওয়া আর বলা ঈমান হচ্ছে অন্তরে:
.
এই কথাটি কিছু অশিক্ষিত ও ভ্রান্ত যুক্তিদাতা লোকেরা বেশি বলে থাকে। এই সত্য কথাটি বলে বাতিলকে উদ্দেশ্য করা হয়। কেননা এই কথা উদ্ধৃতকারী ব্যক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের পাপের পক্ষে সাফাই গাওয়া। কেননা সে দাবী করে যে, নেক আমল করা ও পাপ ত্যাগ করার পরিবর্তে অন্তরের ঈমানই যথেষ্ট। এটি সুস্পষ্ট ভ্রান্ত যুক্তি। কেননা ঈমান শুধু অন্তরে নয়। বরঞ্চ ঈমান যেমনটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আলেমগণ সংজ্ঞা দেন: মুখের কথা, অন্তরের বিশ্বাস ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কর্ম। ইমাম হাসান আল-বসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: ঈমান বাহ্যিক বেশভুষা কিংবা অলীক চিন্তা নয়; বরং ঈমান হলো যা অন্তরে স্থির হয়েছে এবং কর্ম সেটাকে সত্যে পরিণত করেছে। পাপে লিপ্ত হওয়া ও নেক আমল বর্জন করা প্রমাণ করে যে, অন্তরে ঈমান নেই কিংবা রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ঈমান। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা সুদ ভক্ষণ করো না।”[সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩০] এবং তিনি বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় করো, তার নৈকট্যলাভের উপায় অন্বেষণ করো এবং তাঁর পথে জিহাদ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”[সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩৫] এবং তিনি আরও বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র প্রতি ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনেছে এবং সৎ কর্ম করেছে।”(সূরা মায়িদা,আয়াত: ৬৯)
.
(৭).গীবত, পরনিন্দা করা, দোষচর্চা করা:

গীবত করা শুধু একটি নৈতিক দোষ নয়,গীবত একটি ভয়াবহ পাপ। সমাজে যেসব পাপের প্রচলন সবচেয়ে বেশী তন্মধ্যে গীবত অন্যতম। এই পাপটি নীরব ঘাতকের মতো। বান্দার অজান্তেই এটা তার নেকীর ভান্ডার নিঃশেষ করে দেয় এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে ছাড়ে। এটি চুরি-ডাকাতি, সূদ-ঘুষ, যিনা-ব্যভিচার ও মরা মানুষের পঁচা গোশত খাওয়ার চেয়েও মারাত্মক ও নিকৃষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন,”তোমাদের কেউ কি চাইবে যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাবে? তোমরা তো এটাকে ঘৃণাই করো!” (সূরা আল-হুজুরাত: ১২) রাসূল ﷺ বলেন:বান্দা কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক এমন কথা বলে ফেলে, যার গুরুত্ব সে নিজেও উপলব্ধি করতে পারে না। অথচ এ কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে”।(সহীহ বুখারী হা/৬৪৭৮; মিশকাত হা/৪৮১৩)তাই আসুন, আমরা গীবত থেকে বিরত থাকি এবং আমাদের জিহ্বাকে কল্যাণমুখী করে তুলি।
.
পরিশেষে, হে আমার প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা! আপনার উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলুন, গাফিলতির ঘুম থেকে জেগে উঠুন। দুনিয়ার মোহ আপনাকে ভুলিয়ে রাখার আগেই পথের পাথেয় সংগ্রহ করুন। অনন্ত জীবনের সে দীর্ঘ সফরের জন্য প্রস্তুত হোন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দিকে ফিরে আসুন, তাঁর করুণা ও ক্ষমার দ্বারস্থ হোন। হতে পারে, আপনি তাঁর ডাকে সাড়া পাবেন, তাঁর অশেষ রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পাবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত লাভ করে, সেই-ই প্রকৃত সৌভাগ্যবান। ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি (রাহিমাহুল্লাহ), বলেন, রামাদানের বিদায়ে মুমিনের চোখ কীভাবে অশ্রুসিক্ত হয় না অথচ সে জানে না যে, তার জীবনে রামাদান আবার ফিরে আসবে কি না!’ (ইমাম ইবনু রজব হাম্বলি (রাহিমাহুল্লাহ) লাতাইফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ২১৭)।
.
ইবনু রজব হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, ‘ঈদ ওই ব্যক্তির জন্য নয় যে নতুন পোশাক পরিধান করে; বরং ঈদ ওই ব্যক্তির জন্য যে তার আনুগত্য বৃদ্ধি করে। ঈদ ওই ব্যক্তির জন্য নয় যে নতুন পোশাকের সাজসজ্জা ও গাড়ি বহর প্রদর্শন করে; বরং ঈদ ওই ব্যক্তির জন্য যার পাপ মোচন করা হয়েছে।’ (ইবনে রজব হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) লাত্বায়েফুল মাআরেফ, পৃষ্ঠা: ২৭৭)। সুফিয়ান সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) -এর কতিপয় সাথী বলেন, আমি ঈদের দিন (ঈদের) সর্বপ্রথম শুরু করব চোখ নিম্নগামী করার মাধ্যমে। (ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) আত্ব-তাবছিরা, পৃ. ১০৬) আল্লাহ আমাদের সকলকে তোওফিক দান করুন, আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
________________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ফিতরা পাওয়ার হকদার কারা

 প্রশ্ন: ফিতরা পাওয়ার হকদার কারা? অনেকে বলেন হাদীসে তো শুধু মিসকীনদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সুতরাং এর বাহিরে ফকিরকেও ফিতরা দেওয়া যাবে না! এই বক্তব্য কতটুকু সঠিক?

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর যাকাতুল ফিতরের প্রকৃত হকদার কারা এটি শুধুমাত্র ফকির -মিসকীনকে দিতে হবে নাকি কুরআনে উল্লেখিত আট শ্রেণীর মাঝে কি ফিতরা বণ্টন করা যাবে, এই মাসালায় আলেমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এক্ষেত্রে দুটি প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়।
.
(১). জমহুর আলেমদের মতে ফিতরা বণ্টন করার খাত ও সম্পদের যাকাত বণ্টন করার খাত অভিন্ন।অর্থাৎ ফিতরা যাকাতের মতোই আট শ্রেণির প্রাপ্যদের মধ্যে বণ্টিত হবে এ মতের পক্ষে দলিল হলো সূরা আত-তাওবাহ’র ৬০ নং আয়াত। এতে বলা হয়েছে যে সাদাকাহ, অর্থাৎ যাকাত, নির্দিষ্ট আট শ্রেণির মানুষের জন্য নির্ধারিত। যেহেতু ফিতরাও এক প্রকার সাদাকাহ বা দান এবং যেহেতু এটি যাকাতের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই এটিও যাকাতের মতো ওই আট শ্রেণির মধ্যে বিতরণ করা হবে।এটি হানাফী, শাফি‘ঈ ও হাম্বালী মাযহাবসহ অধিকাংশ ওলামাদের মত।(আসনাল মাতালিব; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪০২ এবং কিতাবুল ফিক্বহি ‘আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আহ, পৃষ্ঠা: ৩৩৯)।
.
(২). ফিতরা গ্রহণের যোগ্য একমাত্র ফকির ও মিসকীন। অর্থাৎ এটি যাকাতের মতো আট শ্রেণিতে বিভক্ত হবে না। কারণ, ফিতরা যাকাতের অনুরূপ নয়; বরং এটি ফরজ করা হয়েছে মূলত মিসকীনদের খাদ্যের ব্যবস্থা হিসেবে। সুতরাং এটি গরীব-মিসকীনদের জন্য খাস। দলিলের আলোকে এটিই বিশুদ্ধ মত। এই মতের পক্ষে রয়েছেন, মালেকি মাযহাবের ইমাম আহমেদ ইবনে হাম্বলের দুটি মতের একটি মত, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া ও প্রিয় ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম বিন বায,ইবনু উসাইমীন, ইমাম আলবানী, শাইখ সালেহ আল ফাওযানসহ বহু বিশিষ্ট ফকিহ এ মতকে সমর্থন করেছেন। এই মতটি গ্রহণযোগ্য তার কারন হচ্ছে,রাসূল ﷺ মিসকীনদের খাদ্যস্বরূপ ফিতরাকে ফরজ করেছেন। তিনি অন্য কোনো খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য ফিতরাকে ফরজ করেননি। ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন,فَرَضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ زَكَاةَ الفِطرِ طُهرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغوِ وَالرَّفَثِ، وَطُعمَةً لِلمَسَاكِينِ.“আল্লাহ’র রাসূল ﷺ রোজা অবস্থায় কৃত অনর্থক কথাবার্তা ও অশালীন আচরণ থেকে রোজাদারকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং মিসকীনদের আহারের সংস্থান করার জন্য ফিতরাকে ফরজ করেছেন।”(আবূ দাঊদ, হা/১৬০৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৮২৭; হাদিসটি হাসান) সুতরাং এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ফিতরা কেবল ফকির-মিসকীনকে দিতে হবে, অন্য কোনো খাতে দেওয়া যাবে না। এছাড়াও ফিতরা অনেকটা কাফ্ফারার মতোই এক প্রকার পবিত্রতা দানকারী ইবাদত। রাসূল ﷺ এটি ফরজ করেছেন, যেন রোজাদার রোজা রাখার সময় যদি কোনো অনর্থক কথা বা অশালীন আচরণ করে থাকে, তাহলে ফিতরার মাধ্যমে তা পরিশুদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং ফিতরার খাদ্য কেবল তাদেরই দেওয়া উচিত, যারা কাফফারা গ্রহণের অধিকারী। আর এটি সুস্পষ্ট যে, কাফফারা গ্রহণের অধিকার কেবল ফকির ও মিসকীনেরই রয়েছে।(সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ,খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮৫] এমনকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ছিল এ সদকাটা মিসকীনদেরকে দেওয়া। তিনি মুটে মুটে আট শ্রেণীর মাঝে ভাগ করতেন না এবং সে নির্দেশও দেননি। এবং কোন সাহাবীও এমন কাজ করেননি। সাহাবীদের পরেও কেউ করেননি। বরং আমাদের কাছে দুটো অভিমতের একটি হচ্ছে মিসকীন ছাড়া অন্যদের মাঝে ফিতরা বণ্টন করা নাজায়েয। এ অভিমতটি আট শ্রেণীর মাঝে ভাগ করে দেওয়ার অভিমতের চেয়ে অগ্রগণ্য।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইবনু ক্বাইয়্যিম; যাদুল মা‘আদ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২১)।
.
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন,وَلَا يَجُوزُ دَفْعُ زَكَاةِ الفِطْرِ إِلَّا لِمَن يَسْتَحِقُّ الكَفَّارَةُ، وَهُو مَن يَأْخُذُ لِحَاجَتِهِ لَا فِي الرِّقَابِ وَالمُؤَلَّفَةِ وَغَيرِ ذَلِكَ.“ফিতরার যাকাত কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিকে দেওয়া বৈধ, যে কাফফারা গ্রহণের উপযুক্ত (অর্থাৎ ফকির ও মিসকীন)। আর সে-ই তো মিসকীন, যে তার নিজের প্রয়োজনের কারণে (ফিতরা) গ্রহণ করে। এটি দাস মুক্তকরণ, মুআল্লাফাতুল কুলূব (যাদের হৃদয় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করা হয়) ও অন্যান্য খাতে প্রদান করা যাবে না।”
(ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-ইখতিয়ারাত; পৃষ্ঠা: ২৮২) বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,ومصرفها الفقراء والمساكين. لما ثبت عن ابن عباس
رضي الله عنهما قال: «فرض رسول الله ﷺ زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين».
“ফিতরা বণ্টনের খাত হচ্ছে গরীব, মিসকীন। যেহেতু ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিতরা ফরয করেছেন অনর্থক কথা-কাজ ও যৌনালাপ থেকে রোযাদারকে পবিত্র করাস্বরূপ এবং মিসকীনদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থাস্বরূপ।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ২০২) বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে ফিতরা বণ্টনের খাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,ليس لها إلا مصرف واحد وهم الفقراء، كما في حديث ابن عباس رضي الله عنهما قال: «فرض رسول الله ﷺ زكاة الفطر طهرة للصائم من اللغو والرفث وطعمة للمساكين».”ফিতরার কেবল একটি মাত্র খাত রয়েছে, আর তা হচ্ছে,ফকির ব্যক্তিবর্গ। যেমন ইবনু ‘আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা)-এর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:‘আল্লাহর রাসূল ﷺ রোজাদারের অনর্থক কথা ও অশালীন আচরণ থেকে তাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং অভাবগ্রস্তদের খাদ্যের সংস্থান করার জন্য ফিতরা সদকা ফরজ করেছেন।’”(আবু দাউদ, হা/১৬০৯; ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন, মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৫৯) সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা একথা পরিস্কার যে, ফিতরা শুধুমাত্র ফকির মিসকিন এই দুই শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গের জন্য।
.
এবার দেখবো যারা ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত হাদিসের ভিত্তিতে বলেন, ফিৎরা একমাত্র মিসকিনকে দিতে হবে। এর বাইরে ফকিরকেও দেয়া যাবেনা তাদের বক্তব্য কতটুকু সঠিক!
.
যারা বলেন ফিতরা শুধুমাত্র মিসকিনদের জন্য ফকির কে দেওয়া যাবে না তাদের ফাতওয়া সঠিক নয়। বরং বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে ফিতরা ফকির ও মিসকীন উভয় শ্রেনীর মধ্যেই বন্টন করা জায়েজ। আলেমগন বলেছেন; যখন কেবল “ফকির” শব্দটি উল্লেখ করা হয়, তখন সেটি “মিসকিন”-কেও অন্তর্ভুক্ত করে। আবার যখন কেবল “মিসকিন” শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি “ফকির”-কেও শামিল করে। তবে যখন উভয় শব্দ একত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন তাদের অর্থ পৃথক হয়। সেক্ষেত্রে “ফকির” দ্বারা বোঝানো হয় সেই ব্যক্তি, যিনি “মিসকিন”-এর তুলনায় আরও বেশি অভাবগ্রস্ত। ফকির ও মিসকীনেরর মধ্যে পার্থক্য হলো: ফকির বেশি দরিদ্র। ফকির হলো এমন ব্যক্তি যার কাছে তার নিজের ও তার পরিবারের অর্ধেক বছর চলার মত সম্পদ নাই। আর মিসকীনের অবস্থা ফকিরের চেয়ে ভাল। মিসকীনের কাছে তাদের প্রয়োজনের অর্ধেক বা ততোর্ধ অংশ পূরণ করার মত সম্পদ আছে; তবে সম্পূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করার মত সম্পদ নাই। তাদেরকে তাদের প্রয়োজন নিবারণের জন্য যাকাত বা যাকাতুল ফিতর দেয়া হবে।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: ফকির ও মিসকিন এর মাঝে পার্থক্য কী?

জবাবে শাইখ বলেন:

لفرق بين الفقير والمسكين إذا ذكرا جميعاً هو أن الفقير أشد حاجة من المسكين ، لأن الفقير مأخوذ من الفقر وهو الخلو ، ومنه قولهم : هذه أرض قفر ، أي ليس فيها نبات ، فالفقير هو الذي لا يجد شيئاً أو يجد من كفايته دون النصف ، والمسكين من هو فوق ذلك لا يجد الكفاية التامة ولكنه يجد النصف فأكثر ، مأخوذ من سكن يسكن ، لأن هذا المسكين عنده من الذل لسبب قلة ذات يده ، فإذا ذكرا جميعاً كان هذا هو الفرق بينهما ، أما إذا ذكر أحدهما دون الآخر فإن معناهما واحد ، فتقول مثلاً : تصدق على الفقراء وتصدق على المساكين ، ويكون المعنى واحداً ، ويفسر هنا الفقير بأنه من لا يجد كفايته وكفاية عائلته لمدة سنة ، والمسكين يفسر بذلك أيضاً ، ولهذا نقول في هاتين الكلمتين وأمثالهما إنهما كلمتان إذا اجتمعتا افترقتا وإذا افترقتا اجتمعتا ، ومثل ذلك الإسلام والإيمان فإذا ذكرا جميعاً صار الإيمان ما في القلب والإسلام في الجوارح ، وإذا قيل الإسلام عموماً دخل فيه أعمال الجوارح وأعمال القلوب ، وكذلك إذا قيل هذا مؤمن كما في قوله : (( فتحرير رقبة مؤمنة )) شمل الإسلام والإيمان ، ولهذا نظائر في اللغة العربية أن الكلمتين تطلقان فيكون لهما معنى عند الانفراد ومعنى عند الاجتماع .

“যদি “ফকির” ও “মিসকিন” একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, তখন ফকিরের অবস্থা মিসকিনের চেয়ে আরও করুণ বুঝায়। “ফকির” শব্দটি “ফাকর” থেকে এসেছে, যার অর্থ সম্পূর্ণ শূন্য থাকা। যেমন বলা হয়, “এটি একটি অনুর্বর জমি” অর্থাৎ সেখানে কোনো উদ্ভিদ জন্মায় না। তাই ফকির এমন ব্যক্তি, যার কিছুই নেই বা যার প্রয়োজনীয় চাহিদার অর্ধেকেরও কম আছে। অন্যদিকে, মিসকিন হলো সেই ব্যক্তি, যার কিছুটা আছে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়, বরং অর্ধেক বা তার থেকে বেশি পরিমাণে আছে। “মিসকিন” শব্দটি এসেছে “সাকানা ইয়াসকুনু” থেকে, যা শান্ত বা স্থির অবস্থাকে বোঝায়। এর অর্থ হলো, এই ব্যক্তি দারিদ্র্যের কারণে বিনয়ের সাথে থাকে, কারণ তার সম্পদের পরিমাণ খুবই সীমিত। যদি “ফকির” ও “মিসকিন” একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, তবে তাদের মধ্যে এই পার্থক্য থাকে। কিন্তু যদি একটিমাত্র শব্দ ব্যবহার করা হয়, তাহলে উভয়ই দরিদ্র ব্যক্তিকে বোঝায়। যেমন: “গরীবদের দান করুন”বা “মিসকীনদের সাহায্য করুন”এখানে উভয় ক্ষেত্রেই অর্থ অভাবগ্রস্ত মানুষ। সুতরাং গরিব হলো সেই ব্যক্তি যে নিজের ও তার পরিবারের এক বছরের জীবিকা অর্জনে অক্ষম।এ ধরনের শব্দের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা একসঙ্গে থাকলে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে, কিন্তু আলাদাভাবে ব্যবহৃত হলে একই অর্থ বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ, “ইসলাম” ও “ঈমান” একসঙ্গে উল্লেখ করলে, ঈমান অন্তরের বিশ্বাস বোঝায় এবং ইসলাম বাহ্যিক কর্মসমূহ বোঝায়। কিন্তু যদি কেবল “ইসলাম” বলা হয়, তবে তাতে অন্তরের বিশ্বাস ও বাহ্যিক কর্ম- উভয়ই অন্তর্ভুক্ত হয়। ঠিক তেমনিভাবে, কুরআনে বলা হয়েছে: – فتحرير رقبة مؤمنة (অর্থাৎ একজন মুমিন দাস মুক্ত করা), যেখানে “মুমিন” শব্দটি ইসলাম ও ঈমান উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।এ ধরনের অনেক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে দুটি শব্দ আলাদাভাবে থাকলে একে অপরের অর্থ ধারণ করে, কিন্তু একসঙ্গে থাকলে তাদের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য দেখা যায়।”(ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন;ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব; ও ফাতহু যিল জালালি ওয়াল ইকরাম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৯৫)।
.
আর ফকির মিসকীনের পরিচয় দিতে সৌদি ফতোয়া বোর্ড এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] ফকির ও মিসকীনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন:”ফকির হল সেই ব্যক্তি, যার সারা বছরের প্রয়োজন মেটানোর মতো সম্পদ নেই, অথবা থাকলেও তা খুব অল্প পরিমাণে রয়েছে। সুতরাং, তাকে সম্পূর্ণ বছরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যাকাত দেওয়া হবে। আর মিসকীন হল সেই ব্যক্তি, যার কাছে সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় রসদের অর্ধেক বা অর্ধেকের কিছু বেশি আছে, অর্থাৎ তার অবস্থা ফকিরের তুলনায় কিছুটা ভালো। সুতরাং, তাকে তার পুরো বছরের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য যাকাত দেওয়া হবে।” [শারহু যাদিল মুস্তাকনি‘,খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়:শাইখ মুহাম্মাদ নাসরুল্লাহ মাদানী (হাফি.)। লিসান্স মাদীনা বিশ্ববিদ্যালয়,সৌদি আরব।

Translate