Thursday, July 25, 2024

আল্লাহ, রাসূল, কুরআন বা ইসলামের কোন বিধানকে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ ও গালমন্দ করার বিধান ও শাস্তি এবং এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের করণীয়

 প্রশ্ন: কেউ যদি আমার আল্লাহ অথবা নবী অথবা কুরআনকে গালমন্দ করে ইসলামের দৃষ্টিতে তার বিধান কি এবং একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে তার প্রতি আমার কী করণীয়?

উত্তর: এ কথায় কোন সন্দেহ নাই যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে গালাগালি করা, কুরআন, হাদিস, সালাত, হজ্জ, পর্দা ইত্যাদি ইসলামের বিধিবিধানকে উপহাস ও ঠাট্টা-মশকরা করা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক অন্যায় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোন মুসলিম নামধারী অজ্ঞ ব্যক্তি যদি এমনটি করে তাহলে সে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফির-মুরতাদ বলে গণ্য হবে।

ইসলামের বিধিবিধান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করার ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ أَبِاللَّـهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ – لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ ۚ
“আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তার আয়াত (নিদর্শন ও বিধিবিধান) এর সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে হাসি-ঠাট্টা করছিলে? ওজর পেশ করো না, নিশ্চিতভাবে তোমরা যে কাফের হয়ে গেছো ঈমান আনার পর।” [সূরা তওবা: ৬৫-৬৬]

তিনি আরও বলেন,

وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

“আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তার দীন (ইসলাম) থেকে ফিরে যায় আর সে অবিশ্বাসী অবস্থায় মারা যায়, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের সকল নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে। এই লোকেরাই হল জাহান্নামের অধিবাসী। তারা চিরকাল সেখানে থাকবে।” (সূরা বাকারা: ২১৭)

❑ ইসলামি ফৌজদারি দণ্ডবিধি মোতাবেক ইসলাম ত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যদি সে তওবা না করে:

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلاَّ بإِحْدَى ثَلاثٍ: الثَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالتَّاركُ لِدِينه المُفَارِقُ للجمَاعَةِ

“তিন কারণের কোনও একটি ব্যতীত কোন মুসলিমের রক্ত প্রবাহিত করা হালাল নয়:
ক. বিবাহিত জিনাকারী।
খ. হত্যার বিনিময়ে হত্যা।
গ. যে ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করে (মুসলিমদের) জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।” (সহীহ বুখারি, হাদিস ৬৮৭৮, জামে তিরমিযী, হাদিস ১৪০২, মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হাদিস ১৮৭০৪, বায়হাকী ৮:১৯৪ ইত্যাদি)
এছাড়াও এ মর্মে একাধিক হাদিস রয়েছে।

তাছাড়া মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে ইসলামি স্কলারদের মাঝে কোন দ্বিমত নাই আল হামদুলিল্লাহ।
ইবনে আব্দুল বার (মৃত্যু: ৪৬৩ হিজরি) লিখেছেন,
إن من ارتد عن دينه حل دمه، وضربت عنقه، والأمة مجتمعة على ذلك
“যে তার দীন (ইসলাম) ত্যাগ করে তাকে হত্যা করা বৈধ হয়ে যাবে এবং তার শিরশ্ছেদ করা হবে। এ বিষয়ে পুরো উম্মতের মতৈক্য রয়েছে।” [আত তামহীদ ৫/৩০৬]

❑ এ ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য করণীয় হল:

◆ ১) প্রথমত: তাকে নসিহত করা এবং সুন্দরভাবে বুঝানো যে, এসব কথাবার্তা ভ্রষ্টতা ও কুফরি। কেউ এসব কথা বললে মুরতাদ বা ইসলাম চ্যুত হিসেবে গণ্য হয়। ইসলামি আইনে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এতে তার অন্তরে পরিবর্তন আসতে পারে এবং ভুল পথ থেকে তওবা করে ইসলামের পথে ফিরে আসতে পারে যদি তার ভাগ্য ভালো হয়।

◆ ২) ইসলাম, আল্লাহ, রসূল, কুরআন ইত্যাদি সম্পর্কে তার সংশয় বা প্রশ্ন থাকলে উত্তর দেয়ার এবং তার সংশয় দূর করার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। নিজে না পারলে আলেমদের সহায়তা নিতে হবে। পাশাপাশি তার হেদায়েতের জন্য আল্লাহর নিকট দুআও করতে হবে।
◆ ২) ক্ষমতা থাকলে তার অন্যায় কথাবার্তার প্রতিবাদ করতে হবে এবং বিভ্রান্তির যথোপযুক্ত জবাব দিতে হবে।
◆ ৩) সে যেখানে এ সব খারাপ কথা বলবে সেখানে বসে বসে তার কথা শুনবে না। বরং তার প্রতিবাদ করার পরও সে তার কথা অব্যাহত রাখলে স্থান ত্যাগ করতে হবে।
(দেখুন: সূরা আনআম: ৮৬)
◆ ৪) তারপর আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে হবে। যদি ইসলামি আদালত হয় তাহলে তাকে প্রথমত: সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে অপরাধ প্রমাণিত হলে তওবা করার মাধ্যমে সংশোধন করার চেষ্টা চালাবে। কিন্তু সে তওবা করতে অস্বীকৃতি জানালে শরিয়ার নির্দেশনা মোতাবেক তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে।

আর ইসলামি আদালত না হলে দেশীয় আইনে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বা ‘কোন ধর্মকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা’র আইনে তার বিরুদ্ধে সাজা মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

❑ মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগী) বা আল্লাহর-রাসূল, কুরআন ইত্যাদিকে গালমন্দকারীকে হত্যা করার দায়িত্ব কার?

ইসলামের সব ধরণের হুদুদ কায়েম বা ফৌজদারি দণ্ডবিধি (যথা: মৃত্যুদণ্ড, বেত্রাঘাত, জেল, জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ) বাস্তবায়ন করার একমাত্র অধিকারী সরকার বা তার স্থলাভিষিক্ত; সাধারণ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়।
ইবনে রুশদ (Averroes) কুরতুবি [জন্ম: ১১২৬, মৃত্যু: ১১৯৮ খৃ] বলেন:
وأما من يقيم هذا الحد – أي : جلد شارب الخمر – فاتفقوا على أن الإمام يقيمه وكذلك الأمر في سائر الحدود
“আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, এই হদ (তথা মদ পানকারীর উপর চাবুক মারার বিধান) বাস্তবায়ন করবে ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান)। সকল হুদুদ (দণ্ড প্রয়োগ) এর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।” (বিদায়াতুল মুজতাহিদ ২/২৩৩)
তবে কেবল মনিব কর্তৃক দাস-দাসীর উপর দণ্ড প্রয়োগের বিষয়টি ভিন্ন। কারণ তা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
—————–
◯ প্রশ্ন:
“বিড়াল কুকুর মেরো না।
নাস্তিক পেলে ছেড়ো না।”
“রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিরুদ্ধে কথা বললে জিহ্বা কেটে নেব।”
এ জাতীয় কথাবার্তা বলা কি ইসলাম সমর্থন করে?
উত্তর:
সাধারণ মানুষের এমন কথা-বার্তা বলা শরিয়ত সম্মত নয়। কেননা এটি আইন নিজের হাত তুলে নেয়ার প্রতি উস্কানি মূলক বক্তব্য।
মনে রাখতে হবে, ইসলাম বিনা বিচারে হত্যা, মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ বা কোন ধরণের শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার দেয় না। কারণ এতে হিংসার বশবর্তী হয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসিয়ে দেয়ার এবং অন্যায় রক্তপাত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পর্যাপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হতে পারে।

তা ছাড়া আইনকে নিজের হাতে তুলে নেয়া দেশের প্রচলিত আইনেও একটি অপরাধ।

ইসলামের নামে এমনটি করা হলে, ইসলাম বিদ্বেষীরা ইসলামকে একটি বিশৃঙ্খল ধর্ম হিসেবে বদনাম করার সুযোগ হাতে পাবে অথচ ইসলাম সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও সুসভ্য জীবনাদর্শের নাম।
ইসলামের বিধান হল, এ জাতীয় মামলায় ইসলাম ত্যাগী মুরতাদ বা আল্লাহ, রাসূল, কুরআন বা ইসলামের কোন বিধিবিধানকে গালাগালি বা কুটুক্তি কারীকে শরঈ আদালতের মাধ্যমে প্রথমত: তওবার সুযোগ দেয়াা হবে। তাতে সে পরিবর্তন না হলে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগতভাবে সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) প্রদান করা হবে।

শরঈ আদালত না থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানা যতটুকু হয় ততটুকু হবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মুসলিমদেরকে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করত: ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। কেননা হদ বা দণ্ডবিধি প্রয়োগের একমাত্র অধিকারী হল, মুসলিম শাসক বা তার স্থলাভিষিক্ত; কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি নয়। শাসক যদি তার উপর অর্পিত ফরজ দায়িত্ব পালন না করে তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহর বিচারের কাঠ গড়ায় দাণ্ডয়মান হতে হবে। কিন্তু কোন দল বা গোষ্ঠী কর্তৃক বা সাধারণ কোন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশ্যে বা গোপনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হত্যা বা আক্রমণ করতে পারবে না। ইসলাম তার অনুমতি দেয় না বরং এটি হবে আরেকটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল। দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

হাদিসের আলোকে নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত শাসকের ৪ বৈশিষ্ট্য

 নিম্নে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে এমন চারটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো‌ যেগুলো একজন শাসকের মধ্যে বিদ্যমান থাকলে সে একদিকে যেমন দেশের সাধারণ মানুষের নিকট নিকৃষ্ট শাসক ও ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয় অন্যদিকে সে আল্লাহর নিকটও লাঞ্ছিত-অপদস্ত এবং অভিশাপ যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এমনকি জাহান্নামেরও হকদার হয়ে যায়।সেগুলো হলো:

❂ ১. যে শাসককে জনগণ ঘৃণা করে ও তার প্রতি অভিশাপ দেয় এবং সেও তাই করে:

প্রখ্যাত সাহাবি আওফ ইবনে মালিক আশজাঈ রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে,

خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُحِبُّونَهُمْ وَيُحِبُّونَكُمْ وَتُصَلُّونَ عَلَيْهِمْ وَيُصَلُّونَ عَلَيْكُمْ وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُبْغِضُونَهُمْ وَيُبْغِضُونَكُمْ وَتَلْعَنُونَهُمْ وَيَلْعَنُونَكُمْ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلاَ نُنَابِذُهُمْ عِنْدَ ذَلِكَ قَالَ ‏”‏ لاَ مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلاَةَ لاَ مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلاَةَ أَلاَ مَنْ وَلِيَ عَلَيْهِ وَالٍ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ فَلْيَكْرَهْ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللَّهِ وَلاَ يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ ‏”‏

“তোমাদের সর্বোত্তম শাসক হচ্ছে তারা, যারা তোমাদেরকে ভালোবাসে ও তোমরাও তাদেরকে ভালোবাসো এবং তোমরা তাদের জন্য দুআ কর ও তারাও তোমাদের জন্য দুআ করে।

আর তোমাদের নিকৃষ্ট শাসক হচ্ছে তারা, যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর, তোমাদেরকেও তারা ঘৃণা করে এবং তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দাও ও তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দেয়।

সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রসুল, এ সময় আমরা কি তাদেরকে প্রতিহত করবো না?
তিনি বললেন, না, যে যাবত তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখবে। তবে যার উপর কোন শাসক নিয়োগ করা হবে আর সে তাকে আল্লাহর কোন নাফরমানি করতে দেখবে তখন ঐ শাসক যতক্ষণ আল্লাহর নাফরমানিতে থাকবে ততক্ষণ তাকে ঘৃণা করতে থাকবে কিন্তু আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নেবে না।”

এ হাদিসের একজন বর্ণনাকারী ইবনে জাবের রাহ. বলেন, বর্ণনাকারী জুরাইক যখন এ হাদিস আমার কাছে বর্ণনা করছিলেন তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আবু মিকদাম, আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, সত্যিই কি আপনি মুসলিম ইবনে কারাজাকে বর্ণনা করতে শুনেছেন যে, আওফ ইবনে মালিক রা. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে হুবহু এ রকম বলতে শুনেছেন?

বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি তার দু হাঁটুর উপর ভর করে কিবলা মুখী হয়ে বসে পড়লেন এবং বললেন, সেই আল্লাহর কসম করে বলছি, যিনি ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই আমি অবশ্যই মুসলিম ইবনে কারাজাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি আওফ রা. কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি।” [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), অধ্যায়: ৩৪। প্রশাসন ও নেতৃত্ব, পরিচ্ছেদ: ১৭. উত্তম শাসক ও নিকৃষ্ট শাসক। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নাম্বার: ৪৬৫২, ইসলামিক সেন্টার হাদিস নাম্বার: ৪৬৫৪]

❂ ২. যে শাসককে জনগণ অপছন্দ করে:

আবু উমামা রা. হতে বর্ণনা আছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

ثَلاَثَةٌ لاَ تُجَاوِزُ صَلاَتُهُمْ آذَانَهُمُ الْعَبْدُ الآبِقُ حَتَّى يَرْجِعَ وَامْرَأَةٌ بَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَلَيْهَا سَاخِطٌ وَإِمَامُ قَوْمٍ وَهُمْ لَهُ كَارِهُونَ

“তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের কানের নিচে অতিক্রম করে না (অর্থাৎ আল্লাহর নিকট কবুল হয় না)। তারা হলো:
ক. যে দাস তার মালিক থেকে পালিয়ে যায় যে পর্যন্ত সে তার নিকট ফিরে না আসে।
খ. যে মহিলা এমন অবস্থায় রাত অতিবাহিত করে যে তার স্বামী তার উপর রাগান্বিত ছিল।
গ. এবং যে ইমামকে তার কওমের লোকেরা অপছন্দ করে।”

[সুনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত), অধ্যায়: ২/ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত নামাজ বিষয়ক হাদিস, পরিচ্ছেদ: ১৫৪. লোকজনের অসন্তোষ সত্ত্বেও তাদের ইমামতি করা]

আলেমগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে ইমাম দ্বারা উদ্দেশ্য অত্যাচারী-অনাচারী ও পাপিষ্ঠ শাসক। অর্থাৎ এরাই সর্ব প্রথম উক্ত হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হবে। তারপর অন্তর্ভুক্ত হবে নামাজের ইমামগণ। [islamweb]

❂ ৩. যে শাসক জনগণের সাথে নির্দয় আচরণ করে:

উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

اللَّهُمَّ مَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَشَقَّ عَلَيْهِمْ فَاشْقُقْ عَلَيْهِ وَمَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِ أُمَّتِي شَيْئًا فَرَفَقَ بِهِمْ فَارْفُقْ بِهِ ‏”

“হে আল্লাহ, যে আমার উম্মতের বিষয়ে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব লাভ করে এবং তাদের প্রতি কঠিন আচরণ করে তুমি তার প্রতি কঠিন আচরণ করো আর যে আমার উম্মতের বিষয়ে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব লাভ করে এবং তাদের প্রতি নম্র ও সদয় আচরণ করে তুমি তার প্রতি নম্র ও সদয় আচরণ করো।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) , ৩৪/ রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রশাসন, পরিচ্ছেদ: ৫. ন্যায়পরায়ণ শাসকের ফজিলত ও জালেম শাসকের শাস্তি। শাসিতদের প্রতি নম্রতা অবলম্বন ও কঠোরতা বর্জন]

❂ ৪. যে শাসক জনগণের সাথে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করে:

মাকেল ইবনে ইয়াসার রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছি যে,

‏ مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلاَّ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ ‏

“আল্লাহ তাআলা যে বান্দাকে জনগণের দায়িত্ব (নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব) দিয়েছেন কিন্তু যদি তাদের সাথে প্রতারণা ও খেয়ানত করে এবং এ অবস্থায় যদি তার মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।” সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ১/ কিতাবুল ঈমান, পরিচ্ছেদ: ৬২. জনগণের সঙ্গে খিয়ানত কারী শাসক জাহান্নামের যোগ্য]
আল্লাহ তাআলা আমাদের শাসকদেরকে হেদায়েত করুন অথবা তাদের থেকে জাতিকে মুক্তি দান করুন। আমিন।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

আশুরার শোক উদযাপন বিদআত কেন

 মুহররম মাসের দশ তারিখ আশুরার দিন হিসেবে পরিচিত। ৬১ হিজরির ১০ মুহররম তারিখে আল্লাহ রব্বুল আলামিন হুসাইন রা. কে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। এই শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা অনেক উন্নীত করেছেন। কারণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান ও হুসাইন রা.-এর ব্যাপারে এ শুভ সংবাদ প্রদান করে গেছেন যে, তারা হবেন জান্নাতের যুবকদের নেতা।

আর এ কথা চির সত্য, যে যত বড় মর্যাদা লাভ করে তাকে তত বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করা হল,

أيُّ النَّاسِ أشدُّ بلاءً؟ قال: الأنبياءُ ثمَّ الأمثلُ فالأمثَلُ، فيُبتلى الرَّجلُ على حسْبِ دينِه، فإن كانَ في دينهِ صلبًا اشتدَّ بلاؤُهُ، وإن كانَ في دينِهِ رقَّةٌ ابتليَ على حسْبِ دينِه، فما يبرحُ البلاءُ بالعبدِ حتَّى يترُكَهُ يمشي على الأرضِ ما عليْهِ خطيئةٌ

“মানব জাতির মধ্যে কে সব চেয়ে বেশি পরীক্ষা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন? তিনি বললেন, নবিগণ, তারপর আল্লাহর নেককার বান্দাগণ।তারপর অন্যদের মধ্যে যারা যে পরিমাণ ঈমান ও পরহেজগারিতার অধিকারী তারা সে পরিমাণ পরীক্ষা সম্মুখীন হয়েছেন। মানুষ তার দ্বীনদারি অনুযায়ী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। কেউ যদি মজবুত দ্বীনের অধিকারী হয় তবে সে বেশি পরিমাণ পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। আর কারো দ্বীনদারিতে কমতি থাকলে তার বিপদাপদ কম আসে এবং পরীক্ষাও কম হয়। মুমিন বান্দা যতদিন পৃথিবীতে চলা ফেরা করে ততদিন তার উপর বিপদাপদ পতিত হতে থাকে এবং এভাবে তার আর কোন গুনাহ বাকী থাকে না।” [মুসনাদ আহমদ ও তিরমিযি-সনদ হাসান]

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের এই মর্যাদা পূর্বেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের মতই বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছেন। ইসলামের মর্যাদা নিয়েই তারা দুনিয়াতে আগমন করেছেন এবং ইসলাম প্রদত্ত মর্যাদা সহকারে তারা প্রতিপালিত হয়েছেন। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সংস্পর্শ, স্নেহ-মমতা, আদর ও ভালবাসা পেয়ে তাদের জীবন সৌভাগ্য মণ্ডিত হয়েছে। যার কারণে মুসলিমগণ তাদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইহজগৎ ত্যাগ করেন তখন তাঁরা ভালোমন্দ বুঝার বয়সে উপনীত হননি।

আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এমন নিয়ামত দিয়েছেন যার মাধ্যমে তারা তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে গিয়ে মিলিত হতে পারে। কারণ তাদের চেয়ে যিনি বেশি মর্যাদার অধিকারী তথা তাদের পিতা আলি রা. ও শহিদ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন।

হুসাইন রা.-এর নিহত হওয়ার ঘটনায় জনমানুষের মাঝে ফেতনা-ফ্যাসাদের বিস্তার ঘটে। যেভাবে উসমান রা.-এর নিহত হওয়ার ঘটনা বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। যার কারণে আজ পর্যন্ত মুসলিম জাতি বিভক্ত।

❖ হুসাইন রা.-এর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড:

খারেজি সম্প্রদায়ের আব্দুর রহমান বিন মুলজিম আলি রা. কে হত্যা করার পর সাহাবিদের একাংশ হাসান রা. এর হাতে বয়াত নিলেন। তার ব্যাপারে আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إنَّ ابْنِي هذا سَيِّدٌ، ولَعَلَّ اللَّهَ أنْ يُصْلِحَ به بيْنَ فِئَتَيْنِ عَظِيمَتَيْنِ مِنَ المُسْلِمِينَ

“আমার এই ছেলে (নাতি) একজন নেতা। সম্ভবত: সে মুসলিমদের দুটি বড় বড় (বিবদমান) দলের মধ্যে সমাধান করবেন।” [সহিহ বুখারি-আবু বকরা বিন নুফাই রা. থেকে বর্ণিত]।

তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। এর মাধ্যমে মুয়াবিয়া এবং হাসান রা.-এর সমর্থক দু দলের মধ্যে সমাধান হল। অতঃপর তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করলেন। এরপর বেশ কিছু মানুষ হুসাইন রা.-এর নিকট চিঠির পর চিঠি লেখা শুরু করল। তারা বলল, যদি হুসাইন রা. ক্ষমতা গ্রহণ করেন তবে তাঁকে তারা সাহায্য-সহযোগিতা করবে। অথচ তারা এ কাজের যোগ্য ছিল না।

অতঃপর হুসাইন রা. যখন তাদের নিকট তার চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকিল ইবনে আবু তালিবকে পাঠালেন তখন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তার দুশমনকে তাকে প্রতিহত করতে এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করল।

এদিকে বিচক্ষণ সাহাবিগণ এবং হুসাইন রা. হিতাকাঙ্ক্ষীগণ-যেমন: ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর রা. প্রমুখ তারা সবাই হুসাইন রা. কে ঐ সকল লোকদের ডাকে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন। তারা বললেন, হুসাইন রা.-এর সেখানে যাওয়াতে কোন লাভ নেই। এতে কোন কল্যাণ বয়ে আসবে না। পরে ঘটনা যা ঘটার তাই ঘটল। আল্লাহর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হল।

হুসাইন রা. বিজ্ঞ সাহাবিগণের পরামর্শ উপেক্ষা করে যখন বের হলেন তখন দেখলেন, অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনি তাদের নিকট আবেদন করলেন, তাকে ছেড়ে দেওয়া হোক। তিনি যেন তিনি মদিনায় ফিরে যেতে পারেন অথবা কোন সীমান্ত প্রহরায় অংশ গ্রহণ করতে পারেন। অথবা তাকে যেন ইয়াজিদের সাথে সাক্ষাত করতে দেওয়া হয়। কিন্তু তারা তার কোন প্রস্তাব গ্রহণ করল না। বরং তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে যুদ্ধ করতে বাধ্য করল। তিনি এবং তার সঙ্গীগণ যুদ্ধ করে পরিশেষে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।

এই শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাকে মর্যাদার সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করলেন এবং তাঁর অন্যান্য পূত-পবিত্র পরিবারবর্গের সাথে মিলিত করলেন এবং তাঁর উপর যারা এহেন নিষ্ঠুর আচরণ করল তাদেরকে লাঞ্ছিত করলেন।

ইতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড জনমানুষের মধ্যে অত্যন্ত খারাপ প্রভাব ফেলল। মানুষ দু ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এ নিয়ে অনেক মানুষ মুনাফেকি, মূর্খতা এবং গোমরাহির মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। একদল মানুষ এই আশুরার দিন কে মাতম, আহাজারি, কান্নাকাটি এবং শোক দিবস হিসেবে গ্রহণ করল। তারা সেদিন জাহেলি জামানার বিভিন্ন আচরণ প্রদর্শনী শুরু করল। তারা সে দিন, শোক র‍্যালি, কালো পতাকা মিছিল, নিজের শরীরে চাবুক-তলোয়ার ইত্যাদি ধারাল অস্ত্র দ্বারা দিয়ে জখম, নিজেদের গালে আঘাত, শরীরের কাপড় ছেড়া, জামার পকেট ছেড়া, চুল ছেড়া ইত্যাদি বিভিন্ন জাহেলি প্রথা অনুযায়ী শোক দিবস পালন করে থাকে। যা আজ পর্যন্ত পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর আশুরার দিন তারা ইসলামি শরিয়তের সম্পূর্ণ বিপরীত এহেন কার্যকলাপ করে থাকে। তারা মনে করে, এ সব কাজ করার মাধ্যমে তারা হুসাইন রা. এবং তার আহলে বাইত তথা পরিবারবর্গের প্রতি ভালবাসা এবং সমবেদনা প্রকাশ করে!!

❖ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

“হুসাইন রা.-এর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে শয়তান মানুষের মধ্যে দুটি বিদআত আবিষ্কার করল। একটি হল, আশুরার দিন শোক ও কান্নাকাটি করার বিদআত। যে দিন শরীরে আঘাত করা, চিৎকার করে কান্নাকাটি করা, পিপাসার্ত থাকা, মর্সিয়া পালন ইত্যাদি কার্যক্রম করা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয় বরং এ দিন পূর্বপুরুষদেরকে গালাগালি করা হয়, তাদের উপর অভিশাপ দেওয়া হয় এবং এমন সব লোকদেরকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় যারা প্রকৃতপক্ষে অপরাধী নয় এবং হুসাইন রা. এর মৃত্যু সংক্রান্ত এমন সব কাহিনী বয়ান করা হয় যেগুলো অধিকাংশই মিথ্যা এবং বানোয়াট।

যারা এসবের সূচনা করেছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফেতনা-ফ্যাসাদের দরজা উন্মুক্ত করা এবং মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা। এসব কাজ তো মুসলিমদের ঐকমত্যে ওয়াজিব নয় মোস্তাতাহাবও নয় বরং এতে শুধু অতীতে ঘটে যাওয়া বিপদাপদকে কেন্দ্র করে ধৈর্য হীনতা এবং কান্নাকাটি নতুন করে উজ্জীবিত করা হয়। অথচ তা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রসুল কর্তৃক শক্তভাবে নিষিদ্ধ জিনিস।”

ধৈর্য হীনতা প্রকাশ করা বা চিৎকার-কান্নাকাটি করা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। বিপদে-মসিবতে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নির্দেশ হল, ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া, ‘ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্নালিল্লাইহি রাজিঊন’ পাঠ করার পাশাপাশি আত্ম সমালোচনা করা। যেমন:

▪ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَبَشِّرِالصَّابِرِينَ – الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّـهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ولَـٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

“আর ধৈর্য ধারণকারীদেরকে শুভ সংবাদ দাও। যারা বিপদ এলে বলে, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন’ (আমরা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন এবং তাঁর নিকটই প্রত্যাবর্তনকারী)। এদের উপরই আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়া ও করুণা বর্ষিত হয় এবং এরাই সুপথে প্রতিষ্ঠিত।” [সূরা বাকারা: ১৫৫]

▪ সহিহ বুখারিতে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন,

لَيْسَ مِنّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُودَ، وَشَقَّ الْجُيُوبَ، وَدَعا بِدَعْوى الْجاهِلِيَّةِ

“যে ব্যক্তি গালে চপেটাঘাত করে, জামার পকেট ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মত আহবান করে তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।” [মজমু ফাতাওয়া শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ২৫/৩০২, ৩০৭]

▪ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أَنا بَرِيءٌ مِمَّنْ بَرئَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم بَرِئَ مِنَ الصَّالِقَةِ وَالْحالِقَةِ وَالشَّاقَّةِ

“যে মহিলা (বিপদে-মসিবতে) চিৎকার করে, মাথার চুল মুণ্ডন করে, কাপড় ছেঁড়ে তার থেকে আমি সম্পর্ক মুক্ত।” [সহিহ মুসলিম]

▪ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,

النَّائِحَةُ إذا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِها، تُقامُ يَومَ القِيامَةِ وعليها سِرْبالٌ مِن قَطِرانٍ، ودِرْعٌ مِن جَرَبٍ

“বিলাপকারিণী মহিলা যদি তওবা করার আগে মৃত্যু বরণ করে তবে সে কিয়ামতের দিন আলকাতরা মাখানো পায়জামা আর ঘা বিশিষ্ট বর্ম পরিহিত অবস্থায় উঠবে।” [সহিহ মুসলিম, জানাজা অধ্যায়]

▪ সহিহ বুখারিতে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

ما مِن عبدٍ تُصيبُه مُصيبةٌ، فيقولُ: إنَّا لله وإنَّا إليه راجعونَ، اللهُمَّ أْجُرْني في مُصِيبتِي، وأَخْلِفْ لي خيرًا منها، إلَّا أَجَرَه اللهُ في مُصِيبته، وأَخْلَفَ له خيرًا منها

“যে আল্লাহর বান্দা বিপদে অপতিত হলে বলে: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্লাইহি রাজিঊন, “আল্লাহুম্মা আজিরনী ফী মুসীবাতী ওয়াখলুফ লাহু খাইরান মিনহা” (নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য নিবেদিত এবং তার কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ, বিপদে আমাকে প্রতিদান দাও এবং এর থেকে উত্তম বিকল্প দান কর)।” আল্লাহ তাকে তার বিপদে উত্তম প্রতিদান দিবেন এবং তার চেয়ে ভালো বিকল্প ব্যবস্থা করবেন।” [সহিহ মুসলিম, জানাজা অধ্যায়]

▪ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

أَرْبَعٌ في أُمَّتي مِن أمْرِ الجاهِلِيَّةِ، لا يَتْرُكُونَهُنَّ: الفَخْرُ في الأحْسابِ، والطَّعْنُ في الأنْسابِ، والاسْتِسْقاءُ بالنُّجُومِ، والنِّياحَةُ

“আমার উম্মতের মধ্যে চারটি জিনিস জাহেলিয়াত বা মূর্খতা সুলভ কাজ যেগুলো তারা ছাড়বে না। বংশ আভিজাত্য নিয়ে গর্ব করা, অন্যের বংশকে দোষারোপ করা, তারকার সাহায্যে বৃষ্টি প্রার্থনা করা এবং মানুষের মৃত্যুতে বিলাপ করা।” [সহিহ মুসলিম, জানাযা অধ্যায়]
সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি হুসাইন রা.-এর নিহত হওয়ার ঘটনায় অন্য মুমিন-মুসলিমদের প্রতি জুলুম-অত্যাচার করে, তাদেরকে গালাগালি করে বা তাদের উপর অভিশাপ দেয় এবং দ্বীনের দুশমন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কাজে সাহায্য করা সহ নানা অন্যায় কাজে জড়িত হয় তাদের পরিণতি কী হতে পারে?!

শয়তান গোমরাহ লোকদের জন্যে আশুরার দিনকে শোক ও মাতম প্রকাশের দিন হিসেবে সুসজ্জিত ভাবে তুলে ধরেছে। যার কারণে এ সব লোক আশুরা আসলে কান্নাকাটি, দুঃখের কাওয়ালি গাওয়া, বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী বর্ণনা ইত্যাদি কার্যক্রম শুরু করে দেয়। এতে কি কিছু লাভ হয়? হ্যাঁ, এতে যা হয় তা হল, মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ এবং গোঁড়ামির বিষ বাষ্প ছড়ানো, মুসলিমদের মাঝে ফেতনা-ফ্যাসাদ উজ্জীবিত করা এবং অতীত কালের মানুষদের গালাগালি করা। এভাবে দ্বীনের মধ্যে অসংখ্য ফেতনা ছড়ানো হয় এবং মিথ্যার পরিচর্যা করা হয়।

ইসলামের ইতিহাসে এত ফেতনা-ফ্যাসাদ, দ্বীনের নামে মিথ্যাচার এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফেরদেরকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে এ শিয়া সম্প্রদায়টির চেয়ে অগ্রগণ্য আর কোন মানুষ দেখা য়ায়নি। (সমাপ্ত)
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উৎস: শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আহমদ আত তুওয়াইজিরি রাহ. কর্তৃক রচিত ‘আল বিদা আল হাওলিয়া’ (মাস্টার্স এর থিসিস)
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি। দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মন আত্মসম্মান নিয়ে আসো যে আল্লাহ তকদির লেখার আগে জিজ্ঞাসা করবেন বান্দা তুমি কী চাও একটি কুফরি বাক্য

 প্রশ্ন: এই বাক্য কি কুফরি হবে যে, তুমি এমন আত্মসম্মান নিয়ে আসো যে, আল্লাহ তকদির লেখার আগে জিজ্ঞাসা করবেন যে, বান্দা তুমি কী চাও?

উত্তর: এ বাক্যটি মারাত্মক ভ্রান্ত ও ইমান বিধ্বংসী কুফরি কথা।

নিম্নে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হলো: و بالله التوفيق

❑ প্রথমত: তকদিরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা হলো, ঈমানের ছয়টি রোকনের একটি। এ ছাড়া ইমানের দাবী করার সুযোগ নাই। এ ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে পর্যাপ্ত দলিল এসেছে। আর তকদিরের উপর ইমানের অন্তর্গত হলো এ কথায় বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ রব্বুল আলামিন আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর পূর্বেই সবকিছুর তকদির লিপিবদ্ধ করেছেন।

যেমন: হাদিসে এসেছে,

❂ আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إنَّ اللَّهَ قدَّرَ مقاديرَ الخلائقِ قبلَ أن يخلقَ السَّمواتِ والأرضَ بخمسينَ ألفَ سنةٍ

‘‘আল্লাহ তা‘আলা আসমান-জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সমস্ত সৃষ্টির তকদির লিপিবদ্ধ করেছেন।” [সহীহ বুখারী, হা/৩১৯১]

সুতরাং বান্দার তকদির লেখার আগে মহান আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন-এটা মারাত্মক ভ্রান্ত ও ইমন বিধ্বংসী কথা। কারণ মহান আল্লাহ তার সকল কর্মে স্বাধীন। ‌তিনি যা ইচ্ছে তাই করেন। তিনি কাউকে জিজ্ঞাসা করে তকদির লিখেন না। এটা তার বড়ত্ব, মর্যাদা ও শানের খেলাফ। বরং সবকিছুই সেভাবেই সংঘটিত হয় যেভাবে তিনি তকদিরে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং যখন যেভাবে চান। এর ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব নয়।

❂ আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَعَّالٌ لِمَا يُرِيدُ

“তিনি যা চান তাই করেন’’ [সূরা বুরুজ: ১৫]

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ত্বহাবি বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা যখন যা ইচ্ছা তাই করেন। فعال لما يريد এর মধ্যে ما শব্দটি সাধারণ মাওসুলা। এর অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা যা করার ইচ্ছা করেন তা সবই করেন। তার কাজের সাথে সম্পৃক্ত ইচ্ছার ব্যাপারে এ কথা। তার যে ইচ্ছা বান্দার কাজের সাথে সম্পৃক্ত, তার জন্য রয়েছে আরেক অবস্থা। বান্দা থেকে তিনি যে কাজ সম্পাদিত হওয়ার ইচ্ছা করেন, কিন্তু নিজের পক্ষ হতে বান্দাকে যদি উক্ত কাজ করতে সাহায্য না করেন এবং বান্দাকে কর্ম বাস্তবায়ন কারী না বানান তাহলে সে কাজ সংঘটিত হয় না। যদিও তিনি শরিয়ত গত দিক থেকে তার ইচ্ছা করেন। কিন্তু বান্দাকে কর্ম সম্পাদনকারী না বানানো পর্যন্ত সে কাজ সংঘটিত হয় না।” [শারহুল আক্বীদা আত্-ত্বহাবীয়া, অধ্যায়: ১৪. সৃষ্টি করার পর তার গুণবাচক নাম খালিক (সৃষ্টিকর্তা) হয়নি এবং সৃষ্টি জগৎ উদ্ভাবন করার কারণে তার গুণবাচক নাম উদ্ভাবক হয়নি (لَيْسَ بَعْدَ خَلْقِ الْخَلْقِ اسْتَفَادَ اسم الْخَالِق وَلَا بِإِحْدَاثِهِ الْبَرِيَّةَ اسْتَفَادَ اسم الْبَارِي)- ইমাম ইবনে আবিল ইয আল হানাফি রাহ.]

❂ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

‏ لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ ‎

“তিনি যা করেন সে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।” [সূরা আম্বিয়া: ২৩]

❂ হাদিসে এসেছে, আবুল আসওয়াদ দুআলী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রখ্যাত সাহাবি ইমরান ইবনে হুসাইন রা. আমাকে বললেন,

أَرَأَيْتَ مَا يَعْمَلُ النَّاسُ الْيَوْمَ وَيَكْدَحُونَ فِيهِ أَشَىْءٌ قُضِيَ عَلَيْهِمْ وَمَضَى عَلَيْهِمْ مِنْ قَدَرِ مَا سَبَقَ أَوْ فِيمَا يُسْتَقْبَلُونَ بِهِ مِمَّا أَتَاهُمْ بِهِ نَبِيُّهُمْ وَثَبَتَتِ الْحُجَّةُ عَلَيْهِمْ فَقُلْتُ بَلْ شَىْءٌ قُضِيَ عَلَيْهِمْ وَمَضَى عَلَيْهِمْ قَالَ فَقَالَ أَفَلاَ يَكُونُ ظُلْمًا قَالَ فَفَزِعْتُ مِنْ ذَلِكَ فَزَعًا شَدِيدًا وَقُلْتُ كُلُّ شَىْءٍ خَلْقُ اللَّهِ وَمِلْكُ يَدِهِ فَلاَ يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ ‏.‏ فَقَالَ لِي يَرْحَمُكَ اللَّهُ إِنِّي لَمْ أُرِدْ بِمَا سَأَلْتُكَ إِلاَّ لأَحْزُرَ عَقْلَكَ إِنَّ رَجُلَيْنِ مِنْ مُزَيْنَةَ أَتَيَا رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالاَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ مَا يَعْمَلُ النَّاسُ الْيَوْمَ وَيَكْدَحُونَ فِيهِ أَشَىْءٌ قُضِيَ عَلَيْهِمْ وَمَضَى فِيهِمْ مِنْ قَدَرٍ قَدْ سَبَقَ أَوْ فِيمَا يُسْتَقْبَلُونَ بِهِ مِمَّا أَتَاهُمْ بِهِ نَبِيُّهُمْ وَثَبَتَتِ الْحُجَّةُ عَلَيْهِمْ فَقَالَ ‏”‏ لاَ بَلْ شَىْءٌ قُضِيَ عَلَيْهِمْ وَمَضَى فِيهِمْ وَتَصْدِيقُ ذَلِكَ فِي كِتَابِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ :‏(‏ وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا – فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا‏)‏ ‏”‏

“আজকাল লোকেরা যে সব আমল করে এবং যে কষ্ট করে, সে সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কী? তা কি এমন কিছু যা তাদের উপর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং ভাগ্যলিপি দ্বারা তাদের উপর পূর্ব নির্ধারিত? নাকি ভবিষ্যতে তারা করবে যা তাদের কাছে তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছেন এবং যাদের উপর দলিল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

তখন আমি বললাম, “বরং ব্যাপারটি তো তাদের উপর অতীতে নির্ধারিত হয়ে গেছে।”

বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি (ইমরান রা.) বললেন, তাহলে তা কি জুলুম হবে না?

তিনি বললেন, এতে আমি খুবই ঘাবড়ে গেলাম এবং বললাম, প্রতিটি বস্তুই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর ক্ষমতার অধীন। সুতরাং তিনি যা করেন, সে বিষয়ে কেউ তাকে প্রশ্ন করতে পারবে না বরং তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে।

এরপর তিনি (ইমরান রা.) আমাকে বললেন, আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। আমি তোমাকে প্রশ্ন করে তোমার জ্ঞানের (ইলমের যথার্থতা) উপলব্ধি অনুমান করতে চেয়েছিলাম।

মুযায়না গোত্রের দুজন লোক রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, ইয়া রসুলাল্লাহ! লোকেরা বর্তমানে যে সব আমল করে এবং কষ্ট-পরিশ্রম করে, সেগুলো কি তাদের জন্য ফয়সালা হয়ে গিয়েছে, আগেই তকদির দ্বারা নির্ধারিত নাকি ভবিষ্যতে তারা সে সব আমল করবে, যা তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে নিয়ে এসেছে এবং তাদের উপর দলিল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
তখন তিনি বললেন, না বরং বিষয়টি তাদের জন্য আগেই ফয়সালা হয়ে গেছে এবং সু সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। আল্লাহর কিতাবে তার প্রমাণ। (আল্লাহ বলেন,)

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا‏

“আর কসম মানুষের এবং তার, তিনি তাকে সুঠাম করেছেন, এরপর তাকে তিনি পাপ-পুণ্যের জ্ঞান দান করেছেন।” [সূরা শামস: ৭ ও ৮]

[সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৪৮/ তকদির, পরিচ্ছেদ: ১. মাতৃ উদরে মানুষ সৃষ্টির অবস্থা (ক্রমধারা), তার রিজিক, মৃত্যু, আমল এবং তার দুর্ভাগ্য ও তার সৌভাগ্য লিপিবদ্ধকরণ]

❑ দ্বিতীয়ত: বান্দা কি নিজে নিজে আত্মসম্মান নিয়ে আসতে পারে আল্লাহ যদি তা তার আগে থেকেই তার তকদির লিপিবদ্ধ করে না রাখেন? তাহলে এমন কথা কি তকদিরের পূর্বে বান্দার কাজ করার ক্ষমতা প্রমাণিত হয় না? সুতরাং নিঃসন্দেহে এ কথা তকদিরের প্রতি ঈমানের‌ সাথে সাংঘর্ষিক।
মোটকথা উক্ত কথাটি ঈমান পরিপন্থী ও কুফরি মূলক কথা। এতে কোন সন্দেহ নেই।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদেরকে গোমরাহি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬ উত্তর প্রদানে:

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Wednesday, July 24, 2024

কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র ও জনগণের করণীয়

প্রশ্ন: কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়ে আমাদের করণীয় কী? উভয় পক্ষের দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সংঘর্ষ, অবরোধ ইত্যাদি কার্যক্রমে জন দুর্ভোগ বাড়ছে বৈ কমছে না। এ বিষয়ে শরিয়ার হুকুম কী?

উত্তর: একটি দেশে সুস্থ ও সুন্দর জীবনধারার জন্য অশান্তি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

এ ক্ষেত্রে সরকারের কর্তব্য, অনতিবিলম্বে কোটা সংস্কার বিষয়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে বসে তাদের দাবী-দাওয়া আন্তরিকতার সাথে শোনা এবং অতি দ্রুত সুষ্ঠু সমাধানের পথ বের করা ও সংকট নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যদি তাদের দাবি-দাওয়া সঠিক ও ন্যায় সঙ্গত হয় তবে তা মেনে নেওয়া। অন্যথায় তাদের নিকট যৌক্তিকভাবে তাদের দাবীর অন্যায্যতা ও অসারতা ব্যাখ্যা করা অথবা আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা।

কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে ছাত্রদেরকে ব্যঙ্গোক্তি ও উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে খেপিয়ে তোলা কোন শাসকের জন্য গ্রহণযোগ্য আচরণ হতে পারে না। এর দ্বারা দেশে হিংসাত্মক কার্যক্রম, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

অনুরূপ ভাবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশে সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সর্বসাধারণের নিরাপত্তা বিধান করা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেই নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের রক্ত ঝরছে। ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। আহত হয়েছে, কয়েক শত। হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে অনেকে।

একজন নিরস্ত্র প্রতিবাদ কারী শিক্ষার্থীকে দু হাত উপরে উত্তোলিত অবস্থায় সামনে থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এটা কোনও দায়িত্বশীল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ হতে পারে না। প্রয়োজন বোধে তাকে অন্যভাবে সরানো‌ যেত।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকার দলীয় ক্যাডার বাহিনী লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। হাসপাতালে আহত রোগীদের উপর আক্রমণ করছে। অথচ সেখানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্যাতিতদের সাহায্যে এগিয়ে না এসে তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রশাসনের এহেন ভূমিকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আর ছাত্রদের উচিত, কোন ধরনের ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও জানমালের ক্ষতি হয় এমন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা এবং শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরা, গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা, জনমত সৃষ্টি করা, সভা, সেমিনার, লেখালেখি, সোশ্যাল মিডিয়া, টকশো, স্মারকলিপি প্রদান‌ ইত্যাদি বিভিন্নভাবে কোটা সংস্কারের যৌক্তিকতা তুলে ধরা। আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া।

এত কিছুর পরও সরকার দাবি পূরণে সম্মত না হলে ধৈর্যের সাথে বিকল্প পন্থা খুঁজবে, ইমানদারগণ সমস্যার সমাধানের জন্য মহান আল্লাহর নিকট দুআ করবে ও অন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে কিন্তু কোনভাবেই ফিতনা-ফ্যাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অবকাশ নেই। কোন এমন পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না যাতে সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরে। কেননা ইসলাম তা সমর্থন করে না।

❑ দাঙ্গাহাঙ্গামা, মারামারি-কাটাকাটি ও রক্তপাত সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

ইসলামে সমাজে ফেতনা-ফ্যাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং জি**হাদের ময়দা ছাড়া র**ক্তপাত ও দাঙ্গাহাঙ্গামাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করা হয়েছে।

এ মর্মে কয়েকটি হাদিস পেশ করা হলো:

✪ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেন,

« إنَّ دِماءكُمْ ، وَأمْوَالَكُمْ ، وأعْرَاضَكُمْ ، حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا »

“নিশ্চয়ই তোমাদেল পরস্পরের রক্ত (জীবন), ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম ও সম্মানের যোগ্য, তোমাদের আজকের এ দিনের সম্মানের মতই।” [বুখারী, হাদিস নং ১০৫; মুসলিম, হাদিস নং ৪৪৭৭]

✪ তিনি আরও বলেন,

« كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ : دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ »

“প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির রক্ত (জীবন), ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান অপর সব মুসলিমের জন্য হারাম।” [মুসলিম, হাদিস নং ৬৭০৬]

✪ তিনি আরও বলেছেন,

« سِبَابُ المُسْلِمِ فُسُوقٌ ، وَقِتالُهُ كُفْرٌ »

“মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেওয়া পাপ এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করা কুফরি।” [বুখারী, হাদিস নং ৬৬৬৫; মুসলিম, হাদিস নং ২৩০]

❑ অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করার ব্যাপারে ইসলামের মূলনীতি কী?

আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি,

مَنْ رَأَى مِنْكُم مُنْكراً فَلْيغيِّرْهُ بِيَدهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطعْ فبِلِسَانِهِ ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبقَلبهِ وَذَلَكَ أَضْعَفُ الإِيمانِ

“তোমাদের কেউ যখন কোন অন্যায় দেখবে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা (শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে) পরিবর্তন করে দেয়। যদি সে সে সামর্থ্য না রাখে তাহলে যেন মুখ দিয়ে পরিবর্তন করে (মুখে প্রতিবাদ করে)। যদি এ সামর্থ্যও না থাকে তাহলে যেন অন্তরে তাকে ঘৃণা করে (এবং মনে মনে ভিন্ন পন্থায় তা প্রতিহত করার পরিকল্পনা আঁটতে থাকে)। আর এটি হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতার স্তর।” [সহিহ মুসলিম]

এ হাদিসে অন্যায় প্রতিহত করার তিনটি স্তর বলা হয়েছে। এ তিনটি মধ্যে ১ম স্তরটি অর্থাৎ হাত দ্বারা বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন করা এর পরের দুটি স্তর থেকে নি:সন্দেহ অধিক উত্তম। তবে তা শক্তি-সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ যদি কারও অন্যায় প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি-সামর্থ্য থাকে তাহলে তা ব্যবহার করে অন্যায় পরিবর্তন করবে। আর এটি হল শক্তিশালী মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সে শক্তি না থাকলে মুখে (যেমন: মৌখিকভাবে সরাসরি প্রতিবাদ করা, বক্তৃতা, সভা-সেমিনার, টকশো, সামাজিক মাধ্যম, লেখালেখি, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ইত্যাদি মাধ্যমে) প্রতিবাদ করবে। সে সুযোগ না থাকলে অন্তরে উক্ত অন্যায় কর্মের প্রতি ঘৃণা পোষণ করবে এবং বিকল্প পন্থায় অন্যায় প্রতিহত করার সুযোগ খুঁজবে। অন্যায়ের প্রতিবাদে এই ধারাবাহিকতা লঙ্ঘন করা যাবে না।

❑ দেশে সংঘাত ও হানাহানি পরিবেশ কতটা ক্ষতিকর?

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, নিজেদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত, হানাহানি, কাটাকাটি ও রক্তপাত আমাদের একতা, সংহতি ও শক্তিকে বিনষ্ট করবে যা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে পারে। কেননা শত্রুরা এমন ফিতনা-সংকুল ও বিশৃঙ্খল পরিবেশের অপেক্ষায় থাকে।

অরাজক পরিস্থিতি দেশের সাধারণ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, দেশের অর্থনীতিতে ধ্বস নামে, দেশের সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, সমাজে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র, হাহাকার ও অশান্তি বৃদ্ধি করে, শিক্ষা, গবেষণা, দ্বীন চর্চা, দাওয়াতি কার্যক্রম ইত্যাদি সব কিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অবশ্য আমাদের দেশে তথাকথিত গণতন্ত্র না আছে সরকারের মধ্যে, না আছে জনগণের মধ্যে। বরং এখানে বিশৃঙ্খলা করাটাই যেন নিয়ম। এটাই যেন গণতন্ত্রের ভাষা।
বাস্তবতা হলো, যেমন জনগণ তেমন সরকার। যে দেশের অধিকাংশ মুসলিম ইসলামি আদর্শ ও রীতি-নীতি এবং ইসলাম চর্চা থেকে দূরে চলে যায় আল্লাহ তাদের উপর আজাব হিসেবে জালিম শাসককে চাপিয়ে দেন।

সুতরাং এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় আল্লাহর দ্বীনের পথে আমাদেরকে ফিরে আসতে হবে এবং সব ধরণের পাপাচার ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে তওবা করতে হবে। অন্যথায় এহেন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

আমাদের কর্তব্য, সর্ব প্রকার পাপাচার, আল্লাহর নাফরমানি, শিরক, বিদআত, মুনাফেকি, নৈতিক স্খলন, জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচার, অধিকার হরণ, দুর্নীতি ইত্যাদি থেকে আল্লাহর নিকট তওবা করা এবং নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। তাহলে আল্লাহও আমাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। অন্যথায় পরিবর্তনের আশা করা দূরাশা ছাড়া কিছু নয়।

✪ আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّـهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ

“আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (অর্থাৎ পাপ-পঙ্কিলতা ও আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসে)।” [সূরা রা’দ: ১১]

✪ তিনি আরও বলেন,

ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّـهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَىٰ قَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ

“তার কারণ এই যে, আল্লাহ কখনও পরিবর্তন করেন না সে সব নেয়ামত, যা তিনি কোন জাতিকে দান করেছিলেন, যতক্ষণ না সে জাতি নিজেই পরিবর্তিত করে দেয় নিজের জন্য নির্ধারিত বিষয়।” [সূরা আনফাল: ৫৩]

আল্লাহ এই সরকার, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং দেশে ফিতনার আগুন নির্বাপিত করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার। সৌদি আরব

Translate