Saturday, February 10, 2024

আবুল আলা নামের ব্যাপারে সংশয় নিরসন

 কিছু মানুষ ‘আবুল আলা’ নামটির ব্যাপারে আপত্তি করে থাকে। তারা বলে থাকে, “আলা আল্লাহর নাম। সুতরাং ‘আবুল আলা’ অর্থ হয়, আল্লাহর পিতা। (নাউযুবিল্লাহ)। সুতরাং ‘আবুল আলা’ না বলে ‘আব্দুল আলা’ (আল্লাহর বান্দা) বলতে হবে।”

নিম্নে এই সংশয় নিরসন এবং এ বিষয়ে সঠিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হল:

‘আবুল আলা’ নামটি ভারত উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় একটি নাম। কিন্তু আরবি ভাষা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না থাকার কারণে কিছু মানুষ উপরোক্ত বিভ্রান্তি মূলক ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করে থাকে। ফলে মানুষ এ নাম নিয়ে মহা বিড়ম্বনায় পড়ে যায় এবং নাম পরিবর্তনের জন্য অস্থির হয়ে যায়। অথচ এ নামটিতে শরিয়ত বিরোধী বা আপত্তিকর কিছু নেই। কারণ ‘আবুল আলা’ শব্দটির সঠিক আরবি উচ্চারণ হবে: أبو العلاء (আবুল আলা)। এর অর্থ: সুউচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন, সম্মানের অধিকারী। যেমন আমাদের দেশে আলাউদ্দিন (علاء الدين) নামে বহু মানুষের নাম রয়েছে। এখানেও ‘আলা’ শব্দের অর্থ: উচ্চ মার্যাদা বা সম্মান। অর্থাৎ উভয় নামের মধ্যে ‘আলা’ শব্দটি একই অর্থ বোধক।

◆ একজন বিখ্যাত আরবি কবি, সাহিত্যক ও নাহবি (ব্যকরণ বিদ)-এর নাম: আবুল আলা আল মাআররি (أبو العلاء المعري)। [পুরো নাম: আহমদ বিন আব্দুল্লাহ আল মায়াররি-সিরিয়া]

সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘আবুল আলা’ নামে কোন আপত্তি নেই।

◆ তবে কারও নাম হিসেবে আরবি أبو الأعلى (আবুল আ’লা) লেখা বা উচ্চারণ করা জায়েজ নাই। কেননা “আল আ’লা” হলো, মহান আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى
“আপনি আপনার সর্বোচ্চ পালনকর্তার নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন।” [সূরা আ’লা: ১]

আমরা সেজদার তাসবিহ হিসেবে পাঠ করে থাকি: سبحان ربي الأعلى (সুবহা-না রাব্বিয়াল আ’লা) অর্থ: “আমি আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি।”
◆ সুতরাং কেউ যদি এ নামটি আরবিতে أبو الأعلى “আবুল আ’লা” লিখে বা উচ্চারণ করে তাহলে তা জায়েজ হবে না। যেমন: পাকিস্তানের একজন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম উর্দু বা আরবিতে أبو الأعلى লেখা হয়। যা নিঃসন্দেহে ভুল। বরং এ ক্ষেত্রে عبد الأعلى ‘আব্দুল আ’লা’ (সুউচ্চ আল্লাহর বান্দা) লেখা আবশ্যক।
আসলে বাংলা ভাষী মানুষেরা ‘আবুল আ’লা’ উচ্চারণ করে না বরং সাধারণভাবে ‘আবুল আলা’ উচ্চারণ করে থাকে। তাই ‘আবুল আলা’ (أبو العلاء)-ই ধরতে হবে; “আবুল ‘আ’লা” (أبو الأعلى) নয়। তাহলে এ নামে আর আপত্তি থাকবে না ইনশাআল্লাহ।
মোটকথা, শব্দের বানান ও উচ্চারণ ভেদে অর্থের পরিবর্তন হয়ে থাকে। তাই এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য, আকৃতি ও বেশভূষা অবলম্বন করা হারাম ও কবিরা গুনাহ

 ইসলামের দৃষ্টিতে বিপরীত লিঙ্গের, সাদৃশ্য, আকৃতি ও বেশভূষা অবলম্বন হারাম ও কবিরা গুনাহ হওয়ার ব্যাপারে নিম্নে কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করা হলো:

✪ ১. ইবনে আব্বাস রা . হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُخَنَّثِينَ مِنْ الرِّجَالِ وَالْمُتَرَجِّلَاتِ مِنْ النِّسَاءِ وَقَالَ أَخْرِجُوهُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ قَالَ فَأَخْرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فُلَانًا وَأَخْرَجَ عُمَرُ فُلَانًا

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষ হিজড়াদের উপর এবং পুরুষের বেশধারী মহিলাদের উপর লানত (অভিসম্পাত) করেছেন। তিনি বলেছেন, “ওদেরকে ঘর থেকে বের করে দাও।” ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম অমুককে বের করেছেন এবং উমর রা. অমুককে বের করে দিয়েছেন।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৫৮৮৬]

➤ হাদিসের ব্যাখ্যা:

এ হাদিসের ব্যাখ্যা হল, যে সকল পুরুষ কৃত্রিমভাবে নারীর বেশ-ভুষা অবলম্বন করে হিজড়া সাজে অর্থাৎ যারা পোশাক-পরিচ্ছদ, কণ্ঠস্বর, কথা বলার ধরণ, চলাফেরা, রূপসজ্জা ইত্যাদি দিক দিয়ে নারীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে তাদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে হিজড়া হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু সৃষ্টিগতভাবে হিজড়াদের কোন দোষ নেই। কারণ এ ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কোন হাত নেই। বরং মহান আল্লাহ তাদেরকে সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন। অনুরূপভাবে যে সকল মহিলা পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন, চুলের স্টাইল, সাজসজ্জা, কথা বলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে পুরুষদের সাদৃশ্য ধারণ করে তাদের প্রতিও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লানত (অভিসম্পাত) করেছেন।

✪ ২. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,

ثَلاَثٌ لاَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ ، وَلاَ يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : الْعَاقُّ بِوَالِدَيْهِ ، وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ الْمُتَشَبِّهَةُ بِالرِّجَالِ وَالدَّيُّوثُ

“তিন ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের দিকে তাকাবেন না। তারা হল:
ক. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান,
খ. পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী নারী
গ. এবং দাইয়ুস। [মুসনাদ আহমদ: ৬১৮]

✪ ৩. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ، وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ»

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন যারা নারীদের পোশাক পরে এবং সেসব নারীকে অভিসম্পাত করেছেন যারা পুরুষের পোশাক পরিধান করে। [আবু দাউদ : ৪০৯৮]

✪ ৪. রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

لَيسَ منَّا مَن تشبَّهَ بالرِّجالِ منَ النِّساءِ ولا من تَشبَّهَ بالنِّساءِ منَ الرِّجالِ

“যে নারী পরুষের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং যে সব পুরুষ নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করে, তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” [আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত, সহীহুল জামে হা/৪৫৩৩, সহীহ]

✪ ৫. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لَعَنَ الْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ وَالْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিশাপ দিয়েছেন যেসব নারী পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং যেসব পুরুষ নারীদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে।” [আবু দাউদ, অধ্যায়: পোশাক-পরিচ্ছেদ,অনুচ্ছেদ: নারীদের পোশাক। সহীহ]

পোশাকের ক্ষেত্রে ইসলামের কতিপয় মূলনীতি আছে সেগুলো ঠিক রেখে একজন মুসলিম যে কোন পোশাক পরতে পারে। ইসলাম তার অনুমোদন দিয়েছে।

◯ ইসলাম প্রদত্ত পোশাকের মূলনীতিগুলো নিম্নরূপ:

● পুরুষদের টাখনুর নিচে পরা যাবে না।
● বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করা যাবে না।
● খুব পাতলা বা আঁটোসাঁটো হওয়া যাবে না যাতে লজ্জা স্থানগুলো ফুটে উঠে বা দেখা যায়।
● বিধর্মীদের ধর্মীয় পোশাকের মত হবে না (যেমন: বৌদ্ধদের বিশেষ কালারের পোশাক),
● সমাজে প্রচলিত নয় এমন অদ্ভুত ডিজাইন ও কালারে পোশাক পরিধান যাবে না যাকে হাদিসে ‘লিবাসুস শুহরাহ’ বলা হয়েছে ইত্যাদি।
আল্লাহ আমাদেরকে এসকল ভয়াবহ গুনাহ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে হিজড়াদের সাথে মেলামেশা ও লেনদেন এবং খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির বিধান

 ইসলামের দৃষ্টিতে হিজড়াদের সাথে মেলামেশা, লেনদেন, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির বিধান এবং হিজড়াদের সাথে আচরণের পদ্ধতি ও মূলনীতি:

❑ এক. ইসলামের দৃষ্টিতে হিজড়াদের সাথে মেলামেশা, লেনদেন, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির বিধান: আমাদের জানা আবশ্যক যে, একজন হিজড়া এবং সাধারণ মানুষের মাঝে মৌলিক কোন পার্থক্য নাই বিয়ে-যৌনতা ইত্যাদি কিছু বিধি-বিধান ছাড়া। তারাও আল্লাহর প্রতি ঈমান-কুফরি, আল্লাহর আনুগত্য-নাফরমানি, ইবাদত-বন্দেগি, ইসলামের বিধিবিধান পালন এবং সামাজিক সম্মান-মর্যাদার ক্ষেত্রে অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতই। তারাও ইসলাম, ঈমান, তাকওয়া-পরহেজগারিতা, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত।
তারা যদি নেকির কাজ করে তাহলে আখিরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরষ্কার প্রাপ্ত হবে এবং যদি কোন অন্যায় করে আখিরাতে শাস্তির সম্মুখীন হবে। কারণ তারাও মানুষ। আর প্রতিটি সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন ও প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের উপর আল্লাহর আদেশ-নিষেধ প্রযোজ্য।

◆ আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সকল মানুষের উদ্দেশ্য বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‎

“হে মানব জাতি, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা আল্লাহ ভীতি অর্জন করতে পারবে।” [সূরা বাকারা: ২১]

◆ তিনি‌ আরও বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً

“হে মানব জাতি, তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।” [সূরা নিসা: ১]

◆ আল্লাহ তাআলা মানবজাতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

“আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।” [সূরা যারিয়াত: ৫৬]

এভাবে কুরআনে আল্লাহ মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করে আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বের অন্যান্য সুস্থ মস্তিষ্ক ও প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিটি মানুষই এর অন্তর্ভুক্ত। চাই সে সুস্থ হোক, অসুস্থ হোক, স্বাভাবিক হোক বা প্রতিবন্ধী হোক, সাধারণ নারী-পুরুষ হোক বা হিজড়া হোক। কেউই এ নির্দেশনার বাইরে নয়। তবে তারা লিঙ্গ প্রতিবন্ধী। এটি আল্লাহ তাআলার কর্ম কুশলতা এবং সৃষ্টি বৈচিত্রের নিদর্শন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে হিজড়াদেরকে ভিন্ন চোখে দেখা হয় এবং সামাজিকভাবে তাদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। যার কারণে তারাও জীবন-জীবিকার তাগিদে এমন কিছু কাজ করে যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায়-জুলুমের পর্যায়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। সুতরাং তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে, তাদেরকে সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে এবং তাদের প্রতি সব ধরণের বৈষম্য দূর করতে হবে।

অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রতিবন্ধীদের মত লিঙ্গ প্রতিবন্ধী হিজড়ারা আমাদের সভ্য সমাজেরই অংশ। তারা আমাদেরই কারও সন্তান। অতএব তাদেরকে নপুংসক বলে তিরস্কার করা যাবে না, তাদেরকে হেয় বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা অবহেলা করা যাবে না, অন্যায়ভাবে তাদের উপর জুলুম-নির্যাতন করা যাবে না, তাদেরকে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, হালাল পন্থায় চিত্তবিনোদন এবং সামাজিক নিরাপত্তা, বিচার পাওয়া ইত্যাদি কোনও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। মোটকথা, যারা সৃষ্টিগতভাবে প্রকৃতই হিজড়া ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের সাথে সাধারণভাবে মেলামেশা, উঠবস, লেনদেন, খাওয়া-দাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে কোন আপত্তি নেই। তবে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকাও জরুরি যে, বর্তমানে হিজড়া হিসেবে পরিচিত কিছু মানুষ প্রকৃত হিজড়া নয় বরং তারা কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে হিজড়া বেশ ধারণ করে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে আবার কিছু মানুষকে দুষ্কৃতিকারীরা বাধ্য করে হিজড়া বানিয়ে রেখেছে বিশেষ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন।

❑ দুই. হিজড়াদের সাথে আচরণের পদ্ধতি ও মূলনীতি:

বর্তমান শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফিকাহবিদ এবং সৌদি আরবের সাবেক মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. বলেন,

الخنثى فيه تفصيل؛ فالخنثى قبل البلوغ يشتبه هل هو ذكر أو أنثى؛ لأن له آلتين آلة امرأة وآلة رجل، لكن بعد البلوغ يتبين في الغالب ذكورته أو أنوثته. فإذا ظهر منه ما يدل على أنه امرأة مثل أن يتفلك ثدياه، أو ظهر عليه ما يميزه عن الرجال بحيض أو بول من آلة الأنثى، فهذا يحكم بأنه أنثى وتزال منه آلة الذكورة بالعلاج الطبي المأمون. وإذا ظهر منه ما يدل على أنه ذكر كنبات اللحية والبول من آلة الذكر وغيرها مما يعرفه الأطباء فإنه يحكم بأنه ذكر ويعامل معاملة الرجال، وقبل ذلك يكون موقوفًا حتى يتبين الأمر، فلا يزوج حتى يتبين الأمر هل هو ذكر أو أنثى، وهو بعد البلوغ كما قال العلماء بتبين أمره

“হিজড়ার ব্যাপারে ব্যাখ্যা রয়েছে। বয়ঃসন্ধির আগে একজন হিজড়া সে পুরুষ না মহিলা তা অনিশ্চিত। কারণ তার দুটি যন্ত্র আছে, একটি নারীর অপরটি পুরুষের। কিন্তু বয়ঃসন্ধির পর তার পুরুষত্ব বা নারীত্ব প্রায়শই স্পষ্ট হয়ে যায়। যদি লক্ষণ দেখায় যে, সে একজন নারী, যেমন: তার স্তন শিথিল হয়ে যাওয়া, অথবা এমন কিছু যা তাকে পুরুষদের থেকে আলাদা করে। যেমন: ঋতুস্রাব বা যৌনাঙ্গ থেকে প্রস্রাব তাহলে তাকে নারী বলে গণ্য করা হবে এবং নিরাপদ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পুরুষাঙ্গটি রিমুভ করে ফেলতে হবে। আর যদি তার মধ্যে এমন কিছু পাওয়া যায় যা ইঙ্গিত করে যে সে একজন পুরুষ, যেমন: দাড়ি বৃদ্ধি, লিঙ্গ থেকে প্রস্রাব ইত্যাদি যে সব বিষয় ডাক্তারগণ জানেন, তাহলে তাকে পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার সাথে পুরুষের মতই আচরণ করা হবে।
তবে যদি কোন একটি দিক পরিষ্কার না হয় তাহলে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকবে। তাই যতদিন না বিষয়টি পরিষ্কার হবে যে তিনি একজন পুরুষ নাকি নারী (যা বিশেষজ্ঞদের মতে বয়ঃসন্ধির মাধ্যম প্রকাশিত হয়) তার বিয়ে দেওয়া যাবে না।” [binbaz org]
আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

রজব মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনও নামাজ রোজা উমরা ইতিকাফ ইত্যাদি ইবাদত সুন্নাহ দ্বারা কি সাব্যস্ত হয়েছে

 প্রশ্ন: রজব মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনও নামাজ, রোজা, উমরা, ইতিকাফ ইত্যাদি ইবাদত সুন্নাহ দ্বারা কি সাব্যস্ত হয়েছে?

উত্তর: রজব মাসে বিশেষভাবে নফল রোজা রাখা, নফল নামাজ পড়া, উমরা আদায় করা অথবা ইতিকাফ করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। বরং এ উপলক্ষে বিশেষ কিছু ইবাদত করা দ্বীনের মধ্যে সৃষ্ট বিদআতের অন্তর্ভূক্ত।

যারা এ সব করে তারা এমন কিছু হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে যেগুলো দুর্বল অথবা বানোয়াট।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, রজব ও শাবানকে মিলিয়ে একসাথে পুরো দু মাস বিশেষভাবে রোজা রাখা অথবা ইতিকাফ করার সমর্থনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবিগণ, কিংবা মুসলিমদের ইমামগণের পক্ষ থেকে কোন প্রমাণ নেই। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসে রোজা রাখতেন। তিনি রমজান মাসের আগমনের প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসে যে পরিমাণ রোজা রাখতেন রমজান ছাড়া বছরের অন্য কোন মাসে এত রোজা রাখতেন না। [বুখারী, কিতাবুস সাওম, মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম]

রজব মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে রোজা রাখার ব্যাপারে কিছু হাদিস দুর্বল আর অধিকাংশই বানোয়াট। আহলে ইলমগণ এগুলোর প্রতি নির্ভর করেন না। এগুলো সে সকল দুর্বল হাদিসের অন্তর্ভুক্ত নয় যেগুলো ফজিলতের ক্ষেত্রে বর্ণনা করা হয়। বরং অধিকাংশই মিথ্যা ও বানোয়াট। রজব মাসের ফজিলতে সব চেয়ে বেশি যে হাদিসটি বর্ণনা করা হয় সেটা হল এই দু্আটি:
اللهم بارك لنا في رجب وشعبان وبلغنا رمضان
“হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে রজব ও শাবানে বরকত দাও এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছাও।” [মুসনাদ আহমদ, ১/২৫৯]
এ হাদিসটি দুর্বল।

এ হাদিসের সনদে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে যার নাম যায়েদাহ বিন আবুর রিকাদ। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. বলেন মুনকারুল হাদিস। ইমাম নাসাঈ তার সুনান গ্রন্থে তার নিকট থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন, “চিনি না এই ব্যক্তি কে?” আর তিনি তার যুয়াফা কিতাবে তার সম্পর্কে বলেন, মুনকারুল হাদিস। কুনা গ্রন্থে বলেন, তিনি নির্ভরযোগ্য নন। ইবনে হিব্বান বলেন, তার বর্ণিত কোন হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। [দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী ফযলি রাজাব, ১২ পৃষ্ঠা। আয যুয়াফাউল কাবীর (২/৮১) তাহযীবুত তাহযীব ৩/৩০]

ইবনে তাইমিয়া রহ. আরও বলেন, “রজব মাসকে বিশেষ সম্মান দেখানো বিদআতের অন্তর্ভুক্ত যা বর্জন করা উচিৎ। রজব মাসকে বিশেষভাবে রোজার মওসুম হিসেবে গ্রহণ করাকে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল সহ অন্যান্য ইমামদের নিকটে অপছন্দনীয়।” [ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ২য় খণ্ড, ৬২৪ ও ৬২৫ পৃষ্ঠা]

– ইবনে রজব বলেন, রজব মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে রোজা রাখার ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কিংবা সাহাবিদের থেকে কোন কিছুই সহীহ ভাবে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু আবু কিলাবা থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, “যারা রজবে বেশি বেশি রোজা রাখবে তাদের জন্য জান্নাতে প্রাসাদ রয়েছে।” এই কথাটির ব্যাপারে ইমাম বায়হাকী বলেন, আবু কিলাবা একজন বড় মাপের তাবেঈ। তার মত ব্যক্তি হাদিসের তথ্য না পেলে এমন কথা বলতে পারেন না।
কিন্তু এ কথার প্রতি উত্তরে বলা যায় যে, ইসমাইল আল হারাবী, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ আলেমগণ এ মর্মে একমত যে, রজব মাসকে কেন্দ্র করে রোজা রাখার ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদিস প্রমাণিত হয়নি। এ মর্মে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কিছু হল যঈফ আর অধিকাংশই বানোয়াট।

– আবু শামা রহ. বলেন, কোন ইবাদতকে এমন কোন সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিৎ নয় শরিয়ত যেটা নির্দিষ্ট করে নি। বরং ইসলামি শরিয়ত যে সময় যে ইবাদত নির্ধারণ করেছে সেটা ছাড়া যে কোন ইবাদত যে কোন সময় করা যাবে। এক সময়কে অন্য সময়ের উপর প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।

ইসলামি শরিয়তে বিশেষ কিছু সময়কে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বিশেষ কিছু’ ইবাদতের জন্য। ঐ সময়গুলোতে ঐ ইবাদতগুলোই ফজিলত পূর্ণ; অন্য কোন ইবাদত নয়। যেমন: আরাফাহর দিনে রোজা রাখা, আশুরার দিনে রোজা রাখা, গভীর রাতে নফল নামাজ পড়া, রমজান মাসে উমরা আদায় করা।

অনুরূপভাবে এমন বিশেষ কিছু সময়কে নির্ধারণ করা হয়েছে যেগুলোতে ‘যে কোন ধরণের’ নেকির কাজ করার ফজিলত রয়েছে। যেমন: জিলহজমাসের প্রথম দশ দিন, লাইলাতুল কদর যার মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এই রাতে যে কোন ইবাদতই করা হোক তা অন্য হাজার মাসের চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ।
মোটকথা, বিশেষ কোন সময়কে বিশেষ কোন ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করার অধিকার কেবল ইসলামি শরিয়তই সংরক্ষণ করে; অন্য কোন ব্যক্তি নয়। আল্লাহ সব চেয়ে ভাল জানেন। [আল বায়িস, পৃষ্ঠা নং ৪৮]
[আল বিদা আল হাউলিয়া গ্রন্থ থেকে অনুদিত]

সুতরাং রজব মাসে বিশেষ ইবাদত করা বা রজব মাসকে আলাদাভাবে সম্মান দেখানো বিদআতের অন্তর্ভূক্ত। তবে কেউ যদি সব অন্যান্য মাসে নফল নামাজ, নফল রোজা, দান সদকা ইত্যাদি ইবাদত করে থাকে তাহলে এ মাসেও তা অব্যহত রাখতে পারে। মোটকথা, এ মাসকে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ মনে করে আলাদা কোন ধরণের ইবাদত করা ঠিক হবে না। কেননা তা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।

বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিক্ষা

 বিশুদ্ধ ভাষণ ও সুস্পষ্ট উচ্চারণ মানুষের ব্যক্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। ইসলাম মাতৃভাষাকে শুদ্ধভাবে চর্চা করার শিক্ষা প্রদান করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষা চর্চা বা বিশুদ্ধভাবে কথা বলা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্যতম শিক্ষা।

শিশু মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মের পর বিশুদ্ধ ভাষা ও শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার লক্ষ্যে বিশুদ্ধ ভাষাভাষী বানু সাআদ গোত্রের হালিমা সাদিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

ঐতিহাসিকদের মতে, ‘আরবের সম্ভ্রান্ত লোকদের মধ্যে এ প্রথা প্রচলিত ছিল যে তারা তাদের সন্তানদের বেদুঈন কোনো গোত্রে প্রতিপালনের জন্য পাঠাতেন। কেননা বেদুঈনরা বিশুদ্ধ ভাষাভাষী ছিল, ফলে বেদুঈনদের সঙ্গে মিশে তাদের শিশুরাও বিশুদ্ধ ভাষা শিখতে পারবে।’ [সিরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ১৬২]।
সুতরাং এ বক্তব্যে মাতৃভাষার গুরুত্বকেই স্বীকার করা হয়েছে।

– মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিশুদ্ধা ভাষায় কথা বলতেন: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুদ্ধ ভাষায় স্পষ্টভাবে কথা বলতেন।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “আমি আরবদের মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ভাষাভাষী।” হাদিস হিসেবে বাক্যটির সূত্রে দুর্বলতা থাকলেও বহু মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক তা বর্ণনা করেছেন।

– রাসুলুলাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাষার বিশুদ্ধতা ও উপযুক্ত শব্দচয়ন ইত্যাদির প্রতি তাগিদ প্রদান করেছেন। একবার কোনো এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আ-আলিজু?’ আরবি ভাষায় এ শব্দের ব্যবহার ‘প্রবেশ’ অর্থে প্রচলিত থাকলেও অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে তা প্রমিত শব্দ নয়।

প্রমিত শব্দ হচ্ছে, ‘আ-আদখুলু?’ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তুমি ‘আ-আদখুলু?’ বলো। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “তোমরা এশার নামাজকে আতামা বলবে না, এশা বলবে।” “আঙুরকে কারাম বলবে না, ইনাব বলবে।” এভাবে তিনি মুসলিম সমাজের ভাষাগত সংশোধনে সঠিক শব্দ প্রয়োগের নির্দেশনা দিয়েছেন। [সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৫১৭৭]

❑ শব্দচয়নে সতর্কতা:

সহিহ মুসলিমে ‘কিতাবুল আলফাজ’ শিরোনামে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে বিভিন্ন হাদিসে রাসুলল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথাবার্তায় যেসব শব্দের প্রায়োগিক সংশোধন করেছেন তা বর্ণিত হয়েছে।

ইবনে আবি শায়বার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে ‘কিতাবুল আদব’-এর একটি শিরোনাম হলো, ‘মান কানা ইউয়ালিমুহুম ওয়াদরিবুহুম আলাল লাহনি’ অর্থাৎ সন্তানকে ভাষা শিক্ষা দেওয়া এবং ভুল হলে শাসন করা প্রসঙ্গ।

এ পরিচ্ছেদে সহিহ সনদে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে ‘কথাবার্তায় লাহন বা ভাষাগত ভুল হলে তিনি সন্তানদের শাসন করতেন।’

এ থেকে বোঝা যায় যে দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যেক ব্যক্তির ভাষা বিশুদ্ধ ও শালীন হতে হবে। এটা দ্বিনি ভাষার প্রসঙ্গ নয়; বরং মাতৃভাষার প্রসঙ্গ। অতএব মাতৃভাষার বিশুদ্ধতা ইসলামের নির্দেশ।

❑ চার উপায়ে মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন:

মানুষকে তার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য কোনো বিশেষ ভাষায় কথা বলার দক্ষতা অর্জন করতে হয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জনের মৌলিক চারটি মাধ্যম শোনা, বলা, পড়া ও লেখার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন।

ক. মানুষ যেসব মাধ্যম ব্যবহার করে জ্ঞান অর্জন করে থাকে পড়া তার অন্যতম। আল্লাহ সর্বপ্রথম রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ [সুরা আলাক, আয়াত: ১]

কেননা পড়া ছাড়া জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যে ভাষায় পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা তাঁর মাতৃভাষা।

খ. জ্ঞান অর্জন করার দ্বিতীয় মাধ্যম শোনা। আল্লাহ বলেন, ‘যখন কোরআন পড়া হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগসহ শুনবে এবং নিশ্চুপ হয়ে থাকবে, যাতে তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়।’ [সুরা আরাফ, আয়াত: ২০৪]

বস্তুত রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে যে ভাষায় আল্লাহ তাআলা তাঁর আয়াত শোনার নির্দেশ দেন তা হলো মাতৃভাষা। মানবশিশু প্রথমে তার মায়ের কাছ থেকে শুনে শুনে জ্ঞান অর্জন করে থাকে। এটা যে ভাষায় ঘটে থাকে তা-ই ব্যক্তির মাতৃভাষা।

গ. বলা: আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তাকে বায়ান তথা ভাবপ্রকাশ শিক্ষা দিয়েছেন।” [সুরা আর-রহমান, আয়াত: ৩-৪)

এখানে ‘বায়ান’ শব্দের অর্থ বলা। শিশু প্রথমে তার মাতৃভাষাতেই কথা বলতে শুরু করে। পরে সে অন্য ভাষা আয়ত্ত করে।

গ. মানুষকে তার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য লেখায়ও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। আর এটি মনের ভাব প্রকাশের আরেকটি মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, “যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।” [সুরা আলাক, আয়াত: ৪]

কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার অর্থ তিনি লিখে পাঠ করে শিক্ষা লাভের নির্দেশ দিয়েছেন। একবার রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কয়েকজন লোককে শিক্ষা দিচ্ছিলেন। শিক্ষার্থীদের একজন বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার কাছ থেকে হাদিস শুনি কিন্তু ভুলে যাই। তখন হাতে লেখার প্রতি ইংগিত দিয়ে রাসুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তুমি তোমার ডান হাতের সাহায্য গ্রহণ কোরো তথা লিখে রাখো।’ [সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৬৬]

লক্ষ্য করা যায়, বাংলা অঞ্চলে আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান, খোরাসান, তুরস্ক, মিসর প্রভৃতি দেশ থেকে ইসলাম প্রচারকরা আগমন করেছেন। তারা এখানে এসে এ অঞ্চলের মানুষের ভাষা আয়ত্ত করেছেন এবং এ অঞ্চলের মানুষের ভাষাতেই ইসলাম প্রচার করেছেন। মানুষ অতি সহজেই তাদের কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। ফলে মুসলিমদের আগমনের ফলে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয় এবং মর্যাদার আসন লাভ করে। বাংলার সুলতান ও শাসকগণের পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বপ্রথম বাংলায় রামায়ণ-মহাভারত অনূদিত হয় এবং বাংলা রাজদরবারে প্রবেশাধিকার পায়। তা ছাড়া ইসলাম বিভিন্ন ইবাদত ও দোয়ার ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার চর্চাকে স্বীকৃতি দিয়েছে; বরং যারা আরবি ভাষায় পারদর্শী নন তাদের জন্য মাতৃভাষায় দোয়া করাই উত্তম। মাতৃভাষার মাধ্যমে মনের অভিব্যক্তি যেভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয় অন্য কোনো ভাষায় তা সম্ভব হয় না। মাতৃভাষার মাধ্যমে মানুষ তার মনের সব আকুতি প্রকাশ করতে পারে এবং তাঁর রহমতের ও ক্ষমার আশায় প্রশান্তি লাভ করে।

উল্লেখ্য যে, ইসলামে বিশুদ্ধ ভাষা ব্যবহার ও সঠিক উচ্চারণের অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে যা উক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত। তবে ক্ষেত্রে বিশেষ আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা দোষণীয় নয় যদি বিশুদ্ধ ভাষা বুঝতে সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হয়। (সম্পাদক)

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
সম্পাদনা ও পরিমার্জনে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
[উৎস: kalerkantho]

Translate