Friday, September 29, 2023

হাদিসের গল্পঃ ইবরাহীম (আঃ), সারা ও অত্যাচারী বাদশাহ

 আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত। তিনি বলেন,ইবরাহীম (আঃ) তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি। তন্মধ্যে দু’বার ছিল আল্লাহর ব্যাপারে। তার উক্তি ‘আমি অসুস্থ’ (ছাফফাত ৮৯) এবং  তাঁর অন্য এক উক্তি ‘বরং এ কাজ করেছে, এই তো তাদের বড়টি’ (আম্বিয়া ৬৩)। বর্ণনাকারী বলেন, একদা তিনি [ইবরাহীম (আঃ)] এবং সারা অত্যাচারী শাসকগণের কোন এক শাসকের এলাকায় এসে পৌঁছালেন। তখন তাকে খবর দেয়া হল যে,এ এলাকায় জনৈক ব্যক্তি এসেছে। তার সঙ্গে একজন সবচেয়ে সুন্দরি মহিলা আছে। তখন সে তাঁর নিকট লোক পাঠাল। সে তাঁকে  নারীটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল,এ নারীটি কে? তিনি উত্তর দিলেন,মহিলাটি আমার বোন।

অতঃপর তিনি সারার নিকট আসলেন এবং বললেন, হে সারা! তুমি আর আমি ব্যতীত পৃথিবীতে আর কোন মু’মিন নেই। এ লোকটি আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন আমি তাকে জানিয়েছি যে,তুমি আমার বোন। কাজেই তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। অতঃপর  বাদশাহ সারাকে আনার জন্য লোক পাঠাল। তিনি তার নিকট পরামর্শ করলেন এবং রাজা তার দিকে হাত বাড়াল।

সারা অযূ করে ছালাত আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দো‘আ করলেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার উপর এবং তোমার রাসূলের উপর ঈমান এনেছি এবং আমার স্বামী ব্যতীত অন্যদের থেকে আমার লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করেছি। তুমি এই কাফেরকে  আমার উপর ক্ষমতা দিও না। তখন রাজা বেহুঁশ হয়ে পড়ে মাটিতে  পা  দ্বারা  আঘাত করতে লাগল। অতঃপর সারা বললেন,হে আল্লাহ! এ যদি মৃত্যুবরণ করে তবে লোকেরা বলবে, মহিলাটি একে হত্যা করেছে। তখন সে জ্ঞান ফিরে পেল। এ ঘটনা আরো দু’বার বা তিনবার ঘটার পর রাজা তার এক দারোয়ানকে ডেকে বলল, তুমিতো আমার নিকট কোন মানুষ আননি। বরং এনেছ এক শয়তান।

অতঃপর রাজা সারার খিদমতের জন্য হাজেরাকে দান করল। অতঃপর তিনি (সারা) তাঁর (ইবরাহীম) নিকট আসলেন, তিনি দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করছিলেন। তখন তিনি হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন,কি ঘটেছে? তখন সারা বললেন, আল্লাহ  কাফির  বা  ফাসিকের  চক্রান্ত  তারই  বুকে  ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর সে হাজেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন,হে আকাশের পানির (যমযম) ছেলেরা! হাজেরাই তোমাদের আদি মাতা।

[বুখারী  হা/২২১৭,  ৩৩৫৮  ‘নবীদের  কাহিনী’  অধ্যায়,  অনুচেছদ-৮, মিশকাত হা/৫৭০৪]

শিক্ষা:

১. আল্লাহ্‌ তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে যাবতীয় বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
২. সারার  ঈমান  ও  চারিত্রিক  দৃঢ়তা  সকল  মুসলিম  রমণীর  জন্য অনুকরণীয়।
৩. প্রকৃত  ঈমানদারদের  সংখ্যা  সর্বদা  কমই  হয়ে  থাকে।  তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মানদন্ড নয়।

হাদিসের গল্প – খিযির ও মূসা (আঃ)-এর কাহিনী



 সংকলন ও প্রকাশনায়: কুরআনের আলো টিম

হযরত ইবনু আব্বাস (রা:) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত উবাই ইবনু কা‘ব (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) হ’তে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) একদা বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হ’ল, কোন ব্যক্তি সর্বাধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন, আমিই সর্বাধিক জ্ঞানী। জ্ঞানকে আল্লাহর দিকে সোপর্দ না করার কারণে আল্লাহ্‌ তাকে তিরস্কার করে বললেন, বরং দু’সাগরের সঙ্গমস্থলে আমার এক বান্দা আছে, যিনি তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী।

হযরত মূসা (আঃ) বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক!  তার নিকট পৌছাতে কে আমাকে সাহায্য্ করবে?  কখনো সুফইয়ান এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমি কিভাবে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি? তখন বলা হ’ল, তুমি একটি থলিতে করে একটি মাছ নাও। যেখানে তুমি মাছটি হারাবে, সেখানেই আমার সে বান্দা আছে। অতঃপর হযরত মূসা (আঃ) একটি মাছ ধরলেন এবং থলিতে রাখলেন।অতঃপর মাছ নিয়ে তাঁর সঙ্গী ইউশা বিন নূনকে সাথে নিয়ে চললেন।শেষ পর্যন্ত তারা একটি পাথরের কাছে পৌছলেন এবং তার উপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিলেন।মূসা (আঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলি থেকে বের হয়ে লাফিয়ে সমুদ্রে চলে গেল।অতঃপর সে সমুদ্রে সুড়ঙ্গের মত পথ করে নিল।আর আল্লাহ্‌ মাছটির চলার পথে পানির প্রবাহ থামিয়ে দিলেন।ফলে তার গমনপথটি সুড়ঙ্গের মত হয়ে গেল।অতঃপর তারা উভয়ে অবশিষ্ট রাত এবং পুরো দিন পথ চললেন।

পরদিন সকালে হযরত মূসা (আঃ) তার সাথীকে বললেন, আমরা তো সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমাদের খাবার নিয়ে এস।হযরত মূসা (আঃ)-কে আল্লাহ্‌ যে স্থানে যাবার কথা বলেছিলেন, সেই স্থান অতিক্রম করার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোনরূপ ক্লান্তিবোধ করেননি। সাথী ইউশা বিন নুন তখন বলল, আপনি কি ভেবে দেখেছেন, যে পাথরটির নিকট আমরা বিশ্রাম নিয়েছিলাম সেখানেই মাছটি অদ্ভুতভাবে সমুদ্রের মধ্যে চলে গেছে।কিন্তু আমি মাছটির কথা আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। মূলত: শয়তানই আমাকে এ কথা ভুলিয়ে দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, পথটি মাছের জন্য ছিল একটি সুড়ঙ্গের মত আর তাঁদের জন্য ছিল আশ্চর্যজনক  ব্যাপার।

হযরত  মূসা  (আঃ)  বললেন,  আমরা  তো  সেই স্থানটিরই অনুসন্ধান করছি।অতঃপর তারা তাদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললেন এবং ঐ পাথরের নিকটে পৌঁছে দেখলেন, এক ব্যক্তি কাপড় মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। মূসা (আঃ) তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, এখানে সালাম কি করে এলো? তিনি বললেন, আমি মূসা। খিযির জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বনী ইসরাঈল বংশীয় মূসা? মূসা (আঃ) বললেন, হ্যাঁ। আমি এসেছি এজন্য যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা হ’তে আপনি আমাকে শিক্ষা দিবেন। খিযির বললেন, হে মূসা! আমার আল্লাহ্‌ প্রদত্ত কিছু জ্ঞান আছে, যা আপনি জানেন না। আর আপনিও আল্লাহ্‌ প্রদত্ত এমন কিছু জ্ঞানের অধিকারী, যা আমি জানি না। মূসা (আঃ) বললেন, আমি কি আপনার সাথী হ’তে পারি? খিযির বললেন, ‘আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। যে বিষয় আপনার জ্ঞানের আওতাধীন নয় সে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করবেন কেমন করে?’ মূসা (আঃ) বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ্‌ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না’ [কাহফ ৬৭-৬৯]

অতঃপর তাঁরা দু’জনে সাগরের কিনারা ধরে হেঁটে চললেন। তখন একটি নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা তাদেরকে নৌকায় তুলে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তারা খিযির-কে চিনতে পেরে বিনা ভাড়ায় তাঁদেরকে নৌকায় তুলে নিলো। যখন তাঁরা দু’জনে নৌকায় চড়লেন, তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকাটির কিনারায় বসল এবং সমুদ্র থেকে এক ফোঁটা বা দুই ফোঁটা পানি পান করল। খিযির বললেন, ‘হে মুসা! আমার ও আপনার জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহ্‌ জ্ঞান হ’তে ততটুকুও কমেনি যত টুকু এ পাখিটি তাঁর ঠোটের দ্বারা সাগরের পানি হ্রাস করেছে’।

তখন খিযির একটি কুড়াল নিয়ে নৌকাটির একটা তক্তা খুলে ফেললেন। মূসা (আঃ) অকস্মাৎ  দৃষ্টি দিতেই দেখতে পেলেন যে, তিনি কুড়াল দিয়ে একটি তক্তা খুলে ফেলেছেন। তখন তিনি তাঁকে বললেন, আপনি একি করলেন? এ লোকেরা বিনা ভাড়ায় আমাদেরকে নৌকায় তুলে নিলো, আর আপনি তাদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য নৌকা ছিদ্র করে দিলেন? আপনি তো একটি গুরুতর কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার এ ব্যবহারে আমার প্রতি কঠোর হবেন না।মূসা (আঃ)-এর পক্ষ থেকে প্রথম এ কথাটি ছিল ভুলক্রমে।

অতঃপর তাঁরা যখন উভয়ে সমুদ্র পার হলেন, তখন তারা একটি বালকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যে অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করছিল।খিযির ছেলেটির মাথা দেহ হ’তে ছিন্ন করে ফেললেন। হযরত মুসা  (আঃ) বললেন, আপনি একটি নিষ্পাপ শিশুকে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন? আপনি খুবই খারাপ একটা কাজ করলেন। খিযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না। মূসা (আঃ) বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে আর কোন প্রশ্ন করি, তাহ’লে আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না।অতঃপর উভয়ে চলতে লাগলেন। চলতে চলতে তাঁরা একটি জনপদের অধিবাসীদের নিকট পৌঁছে তাদের নিকট কিছু খাবার চাইলেন। কিন্তু জনপদ বাসী তাদের দু’জনের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল।সেখানে তারা একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন, যা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।হযরত খিযির প্রাচীরটি মেরামত করে সুদৃঢ় করে দিলেন।হযরত মুসা (আঃ) বললেন, এই বসতির লোকদের নিকট এসে আমরা খাবার চাইলাম।তারা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল।অথচ আপনি এদের দেয়াল সোজা করে দিলেন।আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতেন।হযরত খিযির বললেন, এবার আমার এবং আপনার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেল।এক্ষণে যে বিষয়ে আপনি ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, আমি এর তাৎপর্য বলে দিচ্ছি।

নৌকাটির ব্যাপার ছিল এই যে, সেটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির।তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষণ করত।আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত করে দিতে চাইলাম। কারণ, তাদের সামনে ছিল এক রাজা, যে ভাল নৌকা পেলেই জোরপূর্বক কেড়ে নিত। তারপর যখন এটাকে দখল করতে লোক আসল, তখন ছিদ্রযুক্ত দেখে ছেড়ে দিল। অতঃপর নৌকাওয়ালারা একটা কাঠ দ্বারা নৌকাটি মেরামত করে নিলো।আর বালকটি সূচনা লগ্নেই ছিল কাফের। আর সে ছিল তার ঈমানদার বাবা- মার বড়ই আদরের সন্তান । আমি আশঙ্কা করলাম যে, সে বড় হয়ে অবাধ্যতা  ও কুফরি দ্বারা তাদেরকে কষ্ট দিবে। অতঃপর আমি ইচ্ছা করলাম  যে,  তাদের  পালনকর্তা  তাদেরকে  তার  চেয়ে  পবিত্রতায়  ও ভালবাসায় ঘনিষ্ঠতর একটি শ্রেষ্ঠ সন্তান  দান করুন।আর  প্রাচীরের  ব্যাপার  এই  যে,  সেটি  ছিল  নগরের  দু’জন  ইয়াতীম বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন। তাদের পিতা ছিলেন সৎকর্ম পরায়ণ। সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াপরবেশ হয়ে ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পণ করে নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ ইচ্ছায় এসব করিনি। আপনি যে বিষয়গুলোতে ধৈর্যধারণ করতে পারেননি, এই হ’ল  তার ব্যাখ্যা ।

[কাহফ ৭৯-৮২; ছহীহ বুখারী হা/৩৪০১ ‘নবীদের কাহিনী’অধ্যায়, ‘খিযিরের সাথে মূসা (আঃ)-এর কাহিনী’অনুচ্ছেদ, মুসলিম হা/২৩৮০, ‘ফাযায়েল’অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৬]।

শিক্ষা:

১) সকল  জ্ঞানের আধার আল্লাহ্‌  রাববুল আলামীন। তিনি যাকে যতটকু  ইচ্ছা প্রদান করেন।
২) জ্ঞান অর্জনের জন্য সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩) শয়তান সর্বদা  মানুষের  পিছে  পড়ে  থাকে। সে  তাকে  প্রতিনিয়িত আল্লাহ্‌ বিমুখ করার চেষ্টা করে।
৪) জ্ঞান অর্জনের জন্য ধৈর্য অবলম্বন করা জরুরী।
৫) অহংকার করা বা নিজেকে সবচেয়ে জ্ঞানী ভাবা ঠিক নয়

হাদিসের গল্পঃ কা‘ব বিন মালিক (রাঃ)-এর তওবা

আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) থেকে বণির্ত,কা‘ব বিন মালিকের  পুত্রদের মধ্যে আব্দুল্লাহ তাঁর পিতা কা‘ব (রাঃ) অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাহায্যকারী ও  পথপ্রদর্শনকারী ছিলেন। আব্দুল্লাহ বলেন,‘আমি কা‘ব বিন মালিককে তাঁর তাবূক যুদ্ধে পেছনে  থেকে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি’।কা‘ব  (রাঃ)  বলেন,‘রাসূলুল্লাহ (সা:) যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তার মধ্যে তাবূক ও বদর ছাড়া আর কোন যুদ্ধেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন,তাদের কাউকে তিনি ভৎর্সনা করেননি। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা:) শুধুমাত্র একটি কুরাইশ কাফেলার সন্ধানে বের হয়েছিলেন । অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের ও শত্রুদের মাঝে অঘোষিত এ যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবার রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকার জন্য আমাদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন। তাই আমি আকাবার বায়‘আতের চেয়ে বদরের যুদ্ধকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করতাম না। যদিও মানুষের মাঝে আকাবার ঘটনা অপেক্ষা বদর যুদ্ধ অধিক প্রসিদ্ধ ছিল।

যাহোক আমার ঘটনা এই যে,আমি যখন তাবূকের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলাম,সে সময়ের চেয়ে অন্য কোন সময়েই আমি অধিক শক্তিশালী ও সচছল ছিলাম না। আললাহর কসম! ইতিপূর্বে  আমার কাছে কখনো একসাথে দু’টো সওয়ারী ছিল না। অথচ এ যুদ্ধের সময় (যুদ্ধের পূর্বে) আমি তা সংগ্রহ করেছিলাম। আর রাসূলুল্লাহ (সা:) যখনই কোন যুদ্ধের ইচছা করতেন,তখন (যাতে শত্রুরা বুঝতে না পারে) সেজন্য বিপরীত পন্থা অবলম্বন করতেন। কিন্তু এ যুদ্ধের সময় যখন আসল,তখন ছিল ভীষণ গরম। পথ ছিল দীর্ঘ এবং স্থান ছিল বিশাল মরুভূমি। আর শত্রুর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। কাজেই রাসূলুল্লাহ (সা:) যেদিকে যাত্রা করবেন,তা বলে দিলেন।যাতে তারা তাদের যুদ্ধের সরঞ্জামাদি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তখন তার সাথে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ছিলেন। তবে তাঁদের নাম কোন রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ ছিল না।

কা‘ব (রাঃ) বলেন,ফলে যদি কেউ যুদ্ধে না যাওয়ার ইচছা পোষণ করত,তাহ’লে সহজেই তা করতে পারত,যতক্ষণ না তার বিষয়ে অহি নাযিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) এমন এক সময় এ  অভিযান শুরু করেছিলেন,যখন ফলমূল পাকার ও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়ার সময় ছিল। রাসূল (সা:) এবং তাঁর সাথে সকল মুসলমান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচিছলেন। আমিও প্রত্যহ সকালে তাঁদের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু ফিরে এসে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। শুধু মনে মনে বলতাম, ‘আমি তো যে কোন সময় প্রস্তুত হওয়ার ক্ষমতা রাখি। এভাবে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে আমার সময় কেটে যেতে লাগল। পক্ষান্তরে লোকেরা পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল।

একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ (সা:) মুসলমানদের নিয়ে রওয়ানা দিলেন। অথচ তখনো আমি কোন   প্রকার প্রস্তুতি নেইনি। মনে মনে ভাবলাম,‘দু’এক দিন পরে প্রস্তুতি নিয়েও তাঁদের সঙ্গে মিলিত  হ’তে পারব’। তারা চলে যাওয়ার পর একদা আমি মসজিদে গেলাম এবং প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা করলাম কিন্তু সিদ্ধান্তহীনভাবে ফিরে আসলাম। পরদিন সকালে যাওয়ার নিয়ত করলাম,কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত না নিয়েই ফিরে আসলাম। আমার এ দোদুল্যমনতার মাঝে মুসলিম সেনারা দ্রুত চলছিলেন এবং বহুদূর চলে গেলেন। আর আমি রওনা দিয়ে তাঁদের ধরে ফেলার ইচছা পোষণ করতে থাকলাম। আফসোস! আমি যদি এমনটি করে ফেলতাম (তাহ’লে ভালই হ’ত)! কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর চলে যাওয়ার পর আমি যখন বাইরে  বের হ’তাম,তখন পথে-ঘাটে মুনাফিকদেরকে অথবা  দুর্বল  হওয়ার  কারণে  আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে  দিয়েছেন,তাদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। আর এটা আমাকে চিন্তান্বিত করে তুলত।

রাসূলুল্লাহ (সা:) তাবূকে পৌঁছার আগে পর্যন্ত আমার কথা জিজ্ঞেস করলেন না,তবে তাবূকে  পৌঁছে যখন তিনি সবাইকে নিয়ে বসলেন,তখন জিজ্ঞেস করলেন,‘কা‘বের কি হ’ল’? বনী সালামার একজন ব্যক্তি বললেন,‘হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! তাঁর বসন-ভূষণ ও অহংকারই তাঁকে  বাধা দিয়েছে’। মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ) বললেন,‘তুমি নিতান্তই বাজে কথা বললে। আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! আমরা তার ব্যাপারে ভাল বৈ আর কিছুই জানি না’। এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ (সা:) চুপ করে থাকলেন। কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে অবহিত হ’লাম,তখন আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। ভাবতে লাগলাম,  কোন  মিথ্যা  তালবাহানা  করা  যায়  কি-না? যার  মাধ্যমে আগামীকাল আমি তাঁর ক্রোধ থেকে  বাঁচতে পারি। এ ব্যাপারে পরিবারের কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তির পরামর্শও চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন বলা হ’ল যে,রাসূলুল্লাহ (সা:) মদীনার একেবারে নিকটে এসে পৌঁছে গেছেন,তখন আমার মন থেকে বাতিল ধ্যান-ধারণা বিদূরিত হয়ে গেল। আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে,তাঁর নিকট মিথ্যা বলে আমি মুক্তি পাব না। সুতরাং সত্য বলার জন্য দৃঢ়প্রত্যয়ী হ’লাম।

সকালে রাসূলুল্লাহ (সা:) মদীনায় পৌঁছে গেলেন। আর তাঁর নিয়ম ছিল যখনই তিনি সফর থেকে ফিরে আসতেন,প্রথমে মসজিদে যেতেন এবং সেখানে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন। তারপর লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বসে যেতেন। যখন তিনি ছালাত শেষ করে (মসজিদে নববীতে) বসে গেলেন,তখন তাবূক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকা লোকেরা আসতে লাগল। তাঁরা হলফ করে নিজেদের ওযর পেশ করতে লাগল। এদের সংখ্যা ছিল আশির ঊধের্ব। বাহ্যিক অবস্থার বিচারে রাসূলুললাহ (সা:) তাদের ওযর কবুল করতঃ তাদের কাছ থেকে পুনরায় বায়‘আত নিয়ে তাদের মাগফিরাতের জন্য দো‘আ করলেন এবং তাদের মনের গোপন বিষয় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করলেন।

কা‘ব (রাঃ) বলেন,‘আমিও আসলাম তার কাছে। আমি সালাম দিতেই তিনি বিরাগমিশ্রিত মুচকি হেসে বললেন,‘এস এস’। আমি গিয়ে তাঁর সামনে বসে পড়লাম। অতঃপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস  করলেন,‘কি কারণে তুমি পিছনে পড়ে থাকলে? তুমি কি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাহন ক্রয় করনি’? আমি বললাম হ্যাঁ,ক্রয় করেছি’। আরো বললাম,‘আল্লাহর কসম! যদি আমি আপনার  সামনে না বসে দুনিয়ার অন্য কোন লোকের সামনে বসতাম,তাহ’লে  আমি নিশ্চিত  যে,যে কোন ওযর পেশ  করে  তাঁর ক্রোধকে নির্বাপিত করতে পারতাম। আর আমি তর্কে পটু। কিন্তু আল্লাহর

শপথ! আমি জানি,আজ যদি আপনার কাছে মিথ্যা বলে আপনাকে খুশী করে যায়,তাহ’লে অচিরেই আল্লাহ্‌ আপনাকে আমার উপর ক্রদ্ধ করে দিবেন। আর যদি আজ আপনার সাথে সত্য কথা বলে যাই,তাতে আপনি নাখোশ হ’লেও আল্লাহর ক্ষমা লাভের আশা করা যায়। আল্লাহর কসম! আমার কোন ওযর ছিল না। আল্লাহর কসম! আমি যখন (অর্থাৎ তাবূক যুদ্ধে) আপনাদের থেকে পিছনে থেকে যাই,তখনকার মত আর কোন সময় আমি ততটা শক্তি-সামর্থ্যের ও সচছলতার অধিকারী ছিলাম না’। একথা শুনে রাসূলুললাহ (সা:) বললেন,‘যদি আসলে এরূপ হয়,তবে কা‘ব সত্য বলেছে। ঠিক আছে,চলে যাও, দেখ আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি ফায়ছালা দেন’।

আমি উঠে পড়লাম। বনী সালামার কিছু লোক আমাকে অনুসরণ করতে লাগল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে তুমিকোন পাপ করেছ বলে তো আমরা জানি না। পেছনে থেকে যাওয়া অন্যান্য লোকদের মত তুমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর নিকট একটা বাহানা পেশ করতে পারলে না? তাহ’লে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর ক্ষমা প্রার্থনাই তোমার পাপ মোচনের

জন্য যথেষ্ট হয়ে যেত। তারা আমাকে এমনভাবে তিরস্কার করতে লাগল  যে,একপর্যায়ে আমি রাসলূলুল্লা (সা:)-এর কাছে ফিরে গিয়ে আমার প্রথম কথাটিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার মনস্থ  করলাম। অতঃপর তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম,‘আচছা আমার মতো নিজের ভুল স্বীকার করেছে এমন আর কাউকেও কি তোমরা সেখানে দেখেছ’? তারা জবাব দিল,‘হ্যাঁ ,আরো দু’জন লোককে আমরা দেখেছি, যারা তোমার মত একই কথা বলেছে।আর তাদেরকেও তোমার মতো সেই একই কথা বলা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,তারা কারা? লোকেরা জবাব দিল,তারা দু’জন হচেছন মুরারাহ বিন রাবী আল-‘আমরী এবং হিলাল বিন উমাইয়া আল-ওয়াকেফী। তারা আমার কাছে এমন দু’জন সৎ লোকের কথা বললেন, যাঁরা বদর যুদ্ধ অংশ গ্রহণ করেছিলেন  এবং আদর্শস্থানীয় ছিলেন। তাঁদের দু’জনের কথা শুনে আমি চলতে শুরু করলাম।

এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা:) পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের মধ্য থেকে আমাদের এ তিনজনের সাথে কথা বলা সমস্ত  মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন। কাজেই লোকেরা আমাদেরকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং আমাদের  প্রতি তাদের আচরণ পরিবর্তন করে ফেলল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হ’তে লাগল যে,চিরচেনা দুনিয়া যেন অচেনা হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমরা ৫০ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার সাথীদ্বয় নীরব হয়ে ঘরের মধ্যে বসে গেলেন এবং কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তবে আমি ছিলাম খুব শক্তিশালী ও ধৈর্যশীল যুবক। তাই আমি বাইরে বের হয়ে

মুসলমানদের সাথে ছালাতে যোগ দিতাম এবং বাজারে ঘুরাফিরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলত না। আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর কাছে আসতাম। তিনি যখন ছালাতের পর  মজলিসে বসতেন, আমি তাঁকে সালাম দিতাম। আমি মনে মনে বলতাম,আমার সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁট নড়ল কি নড়ল না? তারপর আমি তাঁর সন্নিকটে ছালাত আদায় করতাম। আমি  আড়চোখে লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখতাম। কাজেই দেখতে পেতাম যে,যখন আমি ছালাতে মশগূল থাকি, তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবার আমি যখন তাঁর দিকে দৃষ্টি দিতাম, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি লোকদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকল।

একদিন আমার চাচাত ভাই আবূ ক্বাতাদাহর বাগানের প্রাচীর টপকে তার কাছে আসলাম। সে  ছিল আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আমি তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমার সালামের জবাব দিল না। আমি তাকে  বললাম,হে  আবূ  ক্বাতাদাহ!  আল্লাহর দোহায়  দিয়ে  তোমাকে জিজ্ঞেস করি,তুমি কি জান না,আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা:)-কে ভালবাসি? সে চুপ করে থাকল। আমি আবার আল্লাহর নামে কসম  করে  তাকে এ প্রশ্ন করলাম। এবারও সে চুপ করে থাকল। আমি তৃতীয়বার তাকে একই প্রশ্ন করলাম। এবার সে জবাব দিল,’(এ ব্যাপারে) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন’। (এতদশ্রবণে) আমার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। অতঃপর প্রাচীর টপকে পুনরায় ফিরে এলাম।

কা‘ব  বলেন,ইত্যবসরে একদিন আমি মদীনার বাজারে  হাঁটছিলাম। সিরিয়ার একজন খৃষ্টান  কৃষক মদীনার বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি করতে এসেছিল। সে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করছিল, কে আমাকে কা‘ব বিন মালিকের ঠিকানা বলে দিতে পারে? তখন লোকেরা তাকে ইশারা করে দেখিয়ে দিল। সে আমার কাছে এসে গাসসানের রাজার একটি চিঠি আমার হাতে অর্পণ করল। তাতে লেখা ছিল,‘পর সমাচার এই যে,আমি জানতে পেরেছি আপনার সাথী  আপনার  উপর  যুলুম  করেছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখেননি। আপনি আমাদের এখানে চলে আসুন। আমরা আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব’। চিঠিটা পড়ে আমি বললাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। কাজেই আমি চুলা খুঁজে চিঠিটা আগুনে জ্বালিয়ে দিলাম।

এভাবে ৫০ দিনের মধ্যে ৪০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এমন সময় আমার কাছে রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর একজন দূত এসে বললেন,রাসূল (সা:) তোমাকে তোমার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বললাম,আমি কি তাকে তালাক দিব,না কি করব? তিনি বললেন, না, তালাক দিবে না। বরং তার থেকে পৃথক থাকবে এবং তার কাছে ঘেঁষবে না। আমার অন্য দু’জন সাথীর কাছেও এ মর্মে দূত পাঠানো হ’ল। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আর আল্লাহ আমার এ ব্যাপারে কোন ফায়ছালা না দেওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে অবস্থান কর।

কা‘ব (রাঃ) বলেন, হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী রাসূল (সা:)-এর কাছে এসে বললেন,হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! হিলাল বিন উমাইয়া অতিশয় বৃদ্ধ। তার কোন সেবক নেই। যদি আমি তার সেবা করি, তবে কি আপনি অপছন্দ করবেন? তিনি জবাব দিলেন,না,তবে সে যেন তোমার কাছে না ঘেঁষে।  তিনি  বললেন,আল্লাহর  কসম! তার মধ্যে এ কাজের প্রতি উৎসাহবোধ-ই নেই। আল্লাহর কসম! যেদিন থেকে এ ঘটনা ঘটেছে সেদিন থেকে অদ্যাবধি সে কাঁদছে।

 কা‘ব (রাঃ) বলেন,আমাকেও আমার পরিবারের কেউ কেউ বলল,তুমিও তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূল (সা:)-এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে এস,যাতে সে তোমার সেবা করতে পারে, যেমন হিলাল বিন উমাইয়ার স্ত্রী তার স্বামীর  সেবা  করার  ব্যাপারে  অনুমতি  নিয়ে  এসেছে। আমি   বললাম,আললাহর কসম! আমি রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে কোন অনুমতি আনতে যাব না। জানি না যখন আমি এ ব্যাপারে অনুমতি চাইব,তখন রাসূলুলাল হ (সা:) কি বলবেন। কারণ আমি  একজন  যুবক। এভাবে আরো দশদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাদের সাথে কথাবার্তা  বন্ধ করে দেওয়ার পর পঞ্চাশতম রাত্রিটিও অতিক্রম করল। ঐদিন সকালে ফজরের  ছালাত  আদায়  করলাম  এবং  আমাদের  এক  ঘরের  ছাদে বসেছিলাম, যে অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। মনে হচিছল,জীবন ধারণ আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে এবং পৃথিবী যেন তার সমস্ত বিস্তির্ণতা সত্ত্বেও আমার জন্য অত্যন্ত  সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন সময় আমি সাল‘ পর্বতের উপর  উচ্চৈঃস্বরে চীৎকারকারী একজনের শব্দ শুনতে পেলাম। সে চীৎকার করে বলছে, হে কা‘ব বিন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ কর!

কা‘ব বলেন,আমি  আল্লাহর  দরবারে  সিজদায়  পড়ে  গেলাম। আমি অনুধাবন করতে পারলাম  যে,এবার সংকট কেটে গেছে। রাসূলুল্লাহ (সা:) ফজরের ছালাতের পর ঘোষণা করে দিয়েছিলেন  যে,আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করেছেন। কাজেই লোকেরা আমার ও আমার অপর দু’জন সাথীর কাছে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আসতে লাগল। একজন তো ঘোড়ায় চড়ে এক দৌড়ে  আমার কাছে আসলেন এবং আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি দৌড়িয়ে পাহাড়ে উঠলেন। তার কথা  অশ্বারোহীর চেয়েও দ্রুততর হ’ল। যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসল,তখন সুসংবাদ দেয়ার প্রতিদান স্বরূপ আমার পোশাক জোড়া খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আললাহর কসম! তখন আমার কাছে ঐ পোশাক জোড়া ছাড়া আর কোন কাপড় ছিল না। তারপর আমি এক জোড়া পোষাক ধার করে নিলাম এবং তা পরিধান করে রাসূল (সা:)-এর সাথে সাক্ষাতের নিমিত্তে বের হ’লাম। পথে দলে দলে লোকজন আমার সাথে সাক্ষাৎ করছিল এবং তওবা কবুল হওয়ার জন্য তারা আমাকে মুবারকবাদ জানাচিছল। তারা বলছিল, তোমার তওবা কবুল করে আল্লাহ্‌ তোমাকে যে পুরষ্কৃত করেছেন, এজন্য তোমাকে মুবারকবাদ। কা‘ব (রাঃ) বলেন, এভাবে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে রাসূলুললাহ (সা:) লোকজন পরিবেষ্টিত হয়ে বসেছিলেন। ত্বালহা বিন ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) আমাকে দেখে দৌড়ে এসে মুছাফাহা করলেন এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন। আল্লাহর কমস!  মুহাজিরদের  মধ্য  থেকে  সে  ব্যতীত  অন্য  কেউ  এভাবে  এসে আমাকে ধন্যবাদ জানায়নি। আমি কোনদিন তাঁর অনুগ্রহ ভুলব না।

কা‘ব (রাঃ) বলেন,তারপর আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে সালাম দিলাম। তখন খুশীতে তাঁর চেহারা  উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। রাসূল (সা:) বললেন,(হে কা‘ব)! তোমার মা তোমাকে জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত  অতিক্রান্ত দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভাল দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর! কা‘ব বলেন, আমি বললাম,হে আল্লাহর রাসূল (সা:)! এ (ক্ষমা) আপনার পক্ষ থেকে, না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন,না,এ তো আল্লাহর পক্ষ থেকে।

রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন খুশী হ’তেন,তখন তাঁর চেহারা এক ফালি চাঁদের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আমরা চেহারা দেখে তাঁর খুশী বুঝতে পারলাম। তারপর আমি তাঁর সামনে বসে বললাম,হে আললাহর রাসূল (সা:)! আমার তওবা কবুলের জন্য শুকরিয়া স্বরূপ  আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের পথে ছাদাক্বা করে দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন,তোমার  সম্পদের কিছু অংশ  নিজের জন্য রেখে দাও। তাতে তোমার কল্যাণ হবে। আমি বললাম, তাহ’লে আমি শুধু  খায়বারের অংশ টুকুই আমার জন্য রাখলাম। তারপর আমি বললাম,হে আললাহর রাসূল! আল্লাহ এবার সত্য কথা বলার কারণে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন। কাজেই আমার এ তওবা কবুল হওয়ার কারণে আমি জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে সত্য কথাই বলতে থাকব। আল্লাহর কসম! আমি জানি না,রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর কাছে সত্য কথা বলার কারণে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত  আল্লাহ্‌ আমার প্রতি যে মেহেরবানী করেছেন,তেমনটি আর কোন মুসলমানের উপর করেছেন কি-না। আর রাসূল (সা:)-কে যেদিন থেকে এ কথা বলেছি,সেদিন থেকে সজ্ঞানে মিথ্যা কথা বলিনি। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহ আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচাবেন বলে আশা করি।

আর আল্লাহ রাসূলুললাহ  (সা:)-এর  উপর  নিম্নোক্ত  আয়াত নাযিল করেছেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই অনুগ্রহপরায়ণ হ’লেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনছারদের প্রতি যারা তার অনুসরণ করেছিল সংকটকালে- এমনকি যখন তাদের এ দলের চিত্ত-বৈকল্যের উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ্‌ তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি তো তাদের প্রতি দয়ার্দ্র,পরম দয়ালু। এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও,যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল,যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য তা সংকুচিত হয়েছিল  এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়েছিল এবং তারা উপলব্ধি করেছিল যা,আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই,তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন ব্যতীত,পরে তিনি তাদের তওবা কবুল করলেন যাতে তারা তওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তরভুক্ত হও।’ [তওবা ১১৭-১১৯]

আল্লাহর কসম! ইসলাম গ্রহন করার পর এর চাইতে উৎকৃষ্ট আর কোন অনুগ্রহ আল্লাহ আমার উপর করেননি যে,রাসূল (সা:)-এর সামনে সত্য বলার তাওফীক্ব দান করে আমাকে ধ্বংসের   হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। অন্যথা অন্যান্য মিথ্যাবাদীদের মত আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম।  কারণ অহি যখন  নাযিল হচিছল (অর্থাৎ রাসূল (সা:)-এর জীবদ্দশায়), সে সময় যারা মিথ্যা বলেছিল তাদের সম্পর্কে আল্লাহ যে মারাত্মক কথা বলেছিলেন,তা আর কারো সম্পর্কে বলেননি।

মহান আল্লাহ্‌ বলেছিলেন, ‘তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে অচিরেই তারা আল্লাহর শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের  উপেক্ষা কর। সুতরাং তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করবে। তারা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ জাহান্নাম তাদের আবাসস্থল। তারা তোমাদের নিকট শপথ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হও।তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হ’লেও আল্লাহ তো সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের প্রতি তুষ্ট হবেন না’ [তওবা ৯৫-৯৬]।

কা‘ব (রাঃ) বলেন,আর আমরা তিনজন সেসব লোকদের থেকে  আলাদা,যারা তাদের যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে মিথ্যা শপথ করেছিল এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের   কথা মেনে নিয়ে তাদেরকে বায়‘আত করিয়েছিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ব্যাপারটি তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন (আললাহর উপর)। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ যে ব্যাপারে ফায়ছালা দিয়েছিলেন,সে ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন, ‘সেই তিনজন, যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল’ (তওবা ১১৮) ।

(অর্থাৎ আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছিলেন)। যারা জেনে বুঝে জিহাদ থেকে পেছনে থেকে গিয়েছিল,তাদের কথা এখানে বলা হয়নি। বরং এখানে কেবল আমাদের (তিনজনের) কথা বলা হয়েছিল। আর যারা হলফ করেছিল ও ওযর পেশ করেছিল এবং তাদের ওযর রাসূল (ছাঃ) গ্রহণ করেছিলেন তাদের থেকে আমাদের ব্যাপারে ফায়ছালাটি পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।

[ছহীহ বুখারী, হা/৪৪১৮ ‘মাগাযী’ অধ্যায়, ‘কা‘ব বিন মালিকের ঘটনা’ অনুচেছদ, মুসলিম হা/২৭৬৯, ‘তওবা’ অধ্যায়, অনুচেছদ-৯]

শিক্ষা:

  • সত্য কথা বিপদ থেকে মুক্তি দেয়।
  • কোন আনন্দের সংবাদে দিশেহারা না হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়  করা উচিৎ।
  • মুমিন ব্যক্তি তার কর্তব্য পালনে অবহেলা করলে ব্যথিত-মর্মাহত হয়।
  • মুমিন তার ভাইকে কখনো লাঞ্ছিত-অপদস্থ-অপমানিত করবে না, বরং তার মান-সম্মান রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট থাকবে।
  • মুমিন ব্যক্তি কোন প্রলোভনে পড়ে তার দ্বীন-ধর্মকে বিকিয়ে দিতে পারে না।
  • যদি মানুষ শয়তানী প্ররোচনায় পাপ করে ফেলে তাহলে সে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হ’তে পারে

বিশ্ব মানবতার প্রতি মহানবীর ১০ অবদান

 লিখেছেন: ড. আদেল বিন আলী আশ-শিদ্দী । অনুবাদ: আলী হাসান তৈয়ব

সকল প্রশংসা কেবল নিখিল জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি।

অব্যাহতভাবে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর স্বেচ্ছা বিকৃতির প্রভাবে  অমুসলিমদের কেউ কেউ বিশেষত পশ্চিমারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবতার জন্য কী উপস্থাপন করেছেন, মানবতার প্রতি তাঁর অবদান কী তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশ্ববাসীর সামনে নবীয়ে রহমত বা দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঠিক পরিচয় তুলে ধরার ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ ছাড়াও আমাদের নির্ধারিত কর্তব্যসমূহের একটি হলো বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়ে এ প্রশ্নের জবাব দেয়া।  নবীকুল শিরোমনি, নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ আমাদের মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বমানবতার জন্য কী উপহার নিয়ে এসেছেন তা সংক্ষেপে তুলে ধরা।

নিচে দশটি পয়েন্টে ভাগ করে আমরা সে বিষয়টিই আলোচনার প্রয়াস পাব : 

  1. আল্লাহর ওহী লাভের মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বমানবতাকে মানুষের দাসত্ব ও তাদের গোলামি থেকে একমাত্র শরীকবিহীন আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে গেছেন। এতে করে মানুষ আল্লাহ ছাড়া আর সব কিছুর দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে। বলাবাহুল্য এটিই মানুষের সবচে বড় সম্মান।
  2. আল্লাহর ওহী লাভের মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্বমানবতাকে সকল কল্পকথা ও কুসংস্কার   এবং সব রকমের মিথ্যা ও প্রতারণার সামনে শির না নোয়াবার শিক্ষা দিয়েছেন। অক্ষম প্রতিমা ও অলীক প্রভুদের বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেছেন। মুক্ত করেছেন তিনি সুস্থ বিবেক পরিপন্থী  চিন্তাধারার বিশ্বাস থেকে। যেমন : এ কথা  বিশ্বাস করা যে মানুষের মধ্য থেকেই আল্লাহর কোনো সন্তান রয়েছেন। যিনি কোনো অপরাধ বা পাপ ছাড়াই মানবতার কল্যাণে উৎসর্গিত হয়ে তাদের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন।
  3. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশ্ব মানবতার চেতনায় ক্ষমা ও উদারতার ভিতগুলোকে সুদৃঢ় করেছেন। পবিত্র কুরআনে খোদ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রতি ‘ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই’ মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন। এদিকে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মুসলিমের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসকারী অমুসলিমদের সকল অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তাদের জীবন, সন্তান, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা ঘোষণা করেছেন। তাইতো আজ অবধি মুসলিম দেশগুলোতে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সসম্মানের জীবন যাপন করতে দেখা যায়। অথচ একই সময়ে মুসলিম অস্তিত্ব সংক্রান্ত স্পেনের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি পাশ্চাত্য সভ্যতা ও পশ্চিমাদের প্রকাশ্য মূল্যবোধ বিরোধী বংশধারা থেকে সে ভূমিকে পবিত্র করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
  4. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধর্ম, বর্ণ ও বংশ নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষার মধ্যে বরং এমন উপাদানেরও অভাব নেই যা পক্ষী ও প্রাণীকুলের প্রতি মায়া-মমতা ও কোমলতা দেখাতেও গুরুত্ব দেয়। নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এদের অকারণে কষ্ট প্রদান কিংবা এদের প্রতি বিরূপ আচরণকে।
  5. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অগ্রবর্তী সকল নবীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের এক উজ্জ্বল চিত্র উপস্থাপন করেছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন নবী ইবরাহীম, মুসা ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) প্রমুখ নবী-রাসূল।  উপরন্তু তাঁর প্রতি আল্লাহ তা‘আলা এ মর্মে বাণীই প্রেরণ করেছেন, যে কেউ তাঁদের (আল্লাহর প্রেরিত নবীদের) মধ্যে কাউকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে অথবা তাঁর সম্মানহানী ঘটাবে, সে মুসলিম নয়। কেননা সকল নবী ভাই-ভাই। তাঁরা সবাই মানুষকে লাশরীক এক আল্লাহর প্রতি ডাকার কাজে সমান।
  6. নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছোট-বড় ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার রক্ষা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তার সামাজিক মর্যাদা বা জীবনযাত্রার মানের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন নি। এ ব্যাপারে  তিনি চমৎকার একগুচ্ছ নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এর অন্যতম হলো প্রস্থানের তিন মাস আগে বিদায় হজে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের কিছু বাণী। এতে তিনি মানুষের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানে আঘাত হানাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি এ ভাষণ প্রদান করেন এমন সময় বিশ্ব যখন ১২১৫ সালে ম্যাগনাকার্টা লিবার্ট্যাটাম, ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কর্পাস অ্যাক্ট, ১৬৯৮ সালের ব্রিটিশ বিল অব রাটইস, ১৭৭৬ সালের আমেরিকান স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৭৮৯ সালের ফরাসি ডিক্লারেশন অব হিউম্যান অ্যান্ড সিভিল রাইটস এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার কথা পৃথিবীবাসী কল্পনাও করে নি।
  7. মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানব জীবনে আখলাক তথা সচ্চরিত্রের মান তুলে ধরেছেন অনেক উঁচুতে। মানুষকে তিনি উত্তম আখলাক তথা সচ্চরিত্র ও তার সহায়ক গুণগুলো বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। যেমন তিনি সততা, সত্যবাদিতা ও চারিত্রিক নিষ্কলুষতার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক সম্পর্ক সুদুঢ় করতে তিনি পিতামাতার সঙ্গে সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বহাল রাখতে বলেছেন। জীবনে তিনি এর সফল প্রয়োগও ঘটিয়েছেন। পক্ষান্তরে তিনি অসৎ চরিত্র অবলম্বন থেকে বারণ করেছেন। তিনি নিজে যেমন মন্দ স্বভাব থেকে দূরে থেকেছেন, তেমনি অন্যদেরও এ থেকে সতর্ক করেছেন। যেমন : মিথ্যা, ছলনা, হিংসা, যেনা-ব্যভিচার ও পিতামাতার অবাধ্যচরণ করা। শুধু তাই নয়, এসব থেকে সৃষ্ট সমস্যাবলির প্রতিকারও বলে দিয়েছেন তিনি।
  8. আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী প্রাপ্তির প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুদ্ধি কাজে লাগাতে বলেন। সৃষ্টি জগত উদ্ঘাটন ও তার পরিচয় লাভে উৎসাহিত করেন। একে তিনি নেকী তথা পুণ্য কাজ বলে গণ্য করেন। অথচ একই সময়ে অপর সভ্যতাগুলোর জ্ঞানী ও চিন্তা নায়করা নির্যাতন ভোগ করছিলেন। ধর্ম অবমাননা ও ধর্ম বিদ্বেষকে তখন সর্বাধিক মূল্য দেয়া হচ্ছিল। ধর্ম প্রচারকদের শাস্তি ও কারাভোগ  এমনকি মৃত্যুর হুমকি পর্যন্ত দেয়া হচ্ছিল।
  9. আল্লাহর ওহী লাভের মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের প্রকৃতি ও স্বভাব বান্ধব এক দীন নিয়ে আবির্ভুত হন যা আত্মিক খোরাক ও দৈহিক চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রাখে।পার্থিব কাজ ও আখিরাতের আমলের মধ্যে ভারসাম্য বিধান করে। পরিশীলিত ও পরিামর্জিত করে মানুষের সহজাত বাসনা ও ঝোঁককে। অপরাপর জাতিগুলোর সভ্যতার মতো একে ধ্বংস বা অবদমিত করে না। অন্য জাতিগুলোর সভ্যতায় দেখা যায়, তারা মানুষের প্রকৃতির বিরুদ্ধ মূর্তিপূজোর মধ্যে ডুবে গিয়েছিল। ধর্ম অন্তপ্রাণ ও তপস্যানুরাগীদেরকে তাদের প্রাকৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। যেমন : বিয়ে-শাদি। বঞ্চিত করেছিল অবিচারের বিরুদ্ধে তাদের স্বভাবসুলভ মানবিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের অধিকার থেকে। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তাদেরকে একেবারে প্রতিক্রিয়াহীন বানিয়ে ছেড়েছিল। যা ওই সভ্যতার সিংহভাগ সন্তানেরই শিক্ষা ও সুরুচিকে করেছিল লুপ্তপ্রায়। পরন্তু তাদের ঠেলে দিয়েছিল নিছক জড় জগতের অন্ধকারে। যা কেবল দেহের চাহিদায় সাড়া দেয় আর আত্মাকে নিক্ষেপ করে বিশাল শুন্যতায়।
  10. মানবতার কল্যাণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের আন্তঃসম্প্রদায়ে ভ্রাতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ নমুনা পেশ করেছিলেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, কোনো মানব সম্প্রদায়ের ওপর অন্য কোনো মানব সম্প্রদায়ের ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মূল সৃষ্টি, অধিকার ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে তারা সবাই সমান। শ্রেষ্ঠত্ব বিবেচিত হবে কেবল ঈমান ও তাকওয়া তথা বিশ্বাস ও আল্লাহভীতির নিরিখে। তিনি তাঁর সকল সঙ্গী-সাহাবীকে দীনের খেদমত করার এবং তাতে সম্পৃক্ত হবার সমান সুযোগ দিয়েছেন। তাইতো তাঁদের মধ্যে আরবদের পাশাপাশি ছিলেন (রোম দেশের) সুহাইব রূমী, (হাবশার) বিলাল হাবশী এবং (পারস্যের) সালমান ফারসী রাদিআল্লাহু আনহুম।

পরিশেষে: 

এই দশটি পয়েন্টের প্রতিটিই সংক্ষিপ্ত প্রমাণাদি উল্লেখ পূর্বক বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু আল্লাহর ওহী প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবতার জন্য যা উপহার দিয়েছেন তা উল্লেখের এ জায়গা পর্যাপ্ত নয়। সবিস্তারে এসব পয়েন্ট জানার জন্য নবীয়ে রহমতের সঠিক পরিচয় তুলে ধরার আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামের নিজস্ব ওয়েবসাইট ব্রাউজ করুন :  www.mercyprophet.com, http://www.rasoulallah.net/

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নবী মুহাম্মদ, তাঁর সকল নবী ভাই এবং তাঁর সকল পরিবার-পরিজন ও সাহাবা-তাবেঈদের ওপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক।

আপনি কি মুহাম্মাদ (সাঃ) কে চেনেন?

 


নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) র বৈশিষ্টঃ

  •  তিনি আদম সন্তানের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও তাদের নেতা। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “আমার পালনকর্তার নিকট আদম-সন্তানদের মধ্যে আমিই সর্বাধিক সম্মানিত, এতে অহংকারের কিছু নেই।” [তিরমিযী]
  • তিনি নবী-রাসূলদের মধ্যে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “কিয়ামতের দিন আমিই হব নবীগণের ইমাম (নেতা), তাঁদের মুখপত্র এবং তাঁদের সুপারিশ কারী, এতে কোন অহংকার নেই।” [বুখারী ও মুসলিম]
  • তিনি সর্বপ্রথম পুনরুত্থিত হবেন। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “সকলের আগে আমিই কবর থেকে উত্থিত হব। অতঃপর আমাকে জান্নাতের একজোড়া পোশাক পরানো হবে। যখন সকল মানুষ আল্লাহর দরবারে একত্রিত হবে, তখন আমি তাদের ব্যাপারে বক্তব্য পেশ করব। তারা যখন নিরাশ ও হতাশা গ্রস্থ হবে তখন আমিই তাদেরকে সুসংবাদ প্রদানকারী হব। সেদিন প্রশংসার পতাকা আমার হাতেই থাকবে।” [তিরমিযী]
  • তিনি সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন।
  • তিনি হাশরের মাঠে সর্ব প্রথম শাফায়াত করবেন এবং সর্ব প্রথম তাঁর শাফায়াত গ্রহণ করা হবে।
  • আল্লাহ তাআলা যেমন করে ইবরাহীম (আঃ)কে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। তেমনি নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
  • তিনি এবং তাঁর উম্মতকে ছয়টি বিষয় দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছে, যা অন্যান্য নবীদেরকে দেয়া হয়নি। “আমাকে ছয়টি জিনিস প্রদান করে অন্যান্য নবীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। ১) অল্প কথায় অধিক অর্থপ্রকাশ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। ২) ভীতি দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। ৩) গনীমতের সম্পদ আমার জন্য বৈধ করা হয়েছে। ৪) পৃথিবীর মাটি আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম করা হয়েছে। ৫) আমাকে সৃষ্টিকুলের সকলের জন্য রাসূল করে পাঠানো হয়েছে। ৬) আমার মাধ্যমেই নবীদের ধারাবাহিকতা শেষ করা হয়েছে।” [মুসলিম]
  • হাশরের মাঠে নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর হাউয সর্ববৃহৎ। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় আমি আপনাকে হাউযে কাওছার প্রদান করেছি।” [সূরা কাওছার-১]
  • তিনি নিষ্পাপ। তাঁর পূর্বের এবং পরের সমস্ত- ত্রুটি মার্জনা করা হয়েছে। “যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটি সমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।” [সূরা ফাতাহ-২]  “আমি লাঘব করেছি আপনার বোঝা।” [সূরা শারাহ-২]
  • আল্লাহর নিকট তিনি ছিলেন সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত।
  • নবীজীর কথা মেনে চলা মানেই আল্লাহকে মানা। আল্লাহ বলেন, “যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। ” [সূরা নিসা- ৮০]

নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর বংশ পরিচয়:

তাঁর বংশ পরিচয় হচ্ছে, তাঁর নাম মুহাম্মাদ পিতার নাম আবদুল্লাহ দাদার নাম আবদুল মুত্তালিব। তাঁর বংশের নাম কুরাইশ। এই বংশ আরবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এ বংশের উৎপত্তি হয়েছে ইবরাহীম পুত্র ইসমাঈল (আঃ) থেকে।

নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নাম:

১) মুহাম্মাদ।
২) আহমাদ।
৩) আল হাশের। যাঁর নিকট কিয়ামতের মাঠে সমসমস্তমানুষ একত্রিত হবে।
৪) আল মাহী। যাঁর দ্বারা আল্লাহ তা’আলা কুফরের অন্ধকার মিটিয়ে দিয়েছেন।
৫) আল আক্বেব। যাঁর পরে আর কোন নবী আসবে না।
৬) নবীউত্‌ তাওবাহ্‌। (তওবার নবী)
৭) নবীউল মালাহিম। (বীরশ্রেষ্ঠ নবী)
৮) নবীউর রহমাহ। (রহমতের নবী)

নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দৈহিক গঠন:

  • তিনি দীর্ঘকায় ছিলেন না এবং বেঁটেও ছিলেন। বরং মানুষের মাঝে মধ্যম আকৃতির ছিলেন।
  • তাঁর গায়ের রং অতিরিক্ত ফর্সাও ছিল না এবং কালোও ছিল না, বরং সাদা-লাল মিশ্রিত গৌরবর্ণের ছিলেন।
  • তাঁর মাথার চুল কোঁকড়ানোও ছিল না এবং সোজাও ছিল না। বরং কিছুটা ঢেউ খেলানো ছিল।
  • মাথা বিরাটকায় ছিল। (এটা বীরপুরুষদের পরিচয়)
  • তাঁর মুখমণ্ডল ছিল সর্বাধিক সুন্দর। এক ব্যক্তি বারা বিন আযেব (রা:)কে জিজ্ঞেস করলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর চেহারা মোবারক কি তরবারির ন্যায় চকচকে ছিল? তিনি বললেন, না বরং চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল ও সুন্দর ছিল। (বুখারী) তাঁর মুখাবয়ব সম্পূর্ণ গোলাকার ছিল না, বরং কিছুটা গোলাকার ছিল। (তিরমিযী)
  • উভয় স্কন্ধের মধ্যবর্তী সন্তান  প্রশস্ত ছিল।
  • দাড়ি ঘন সুন্দর বক্ষ দেশ ছেয়ে প্রলম্বিত ছিল।

নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্বভাব-চরিত্র:

  • তিনি সর্বোচ্চ  ও সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর সচ্চরিত্রের প্রশংসা করে এরশাদ করেন: “নিশ্চয় আপনি সুমহান চরিত্রের অধিকারী।” [সূরা ক্বলম-৪]
  • তিনি ছিলেন অতীব বিনয়ী। যে বিষয়ে আল্লাহ কাউকে অধিকার দেননি এমন বিষয়ে কোন দাবী তিনি করতেন না। আল্লাহ্‌ বলেন: “আপনি বলুন: আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লার ভাণ্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি গায়েব সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখি না। আমি এমনও বলি না যে আমি ফেরেশতা। আমি তো ঐ ওহীরই অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে।” [সূরা আনআম- ৫০]
  • কারো সাথে কথা বললে সম্পূর্ণভাবে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন এবং গুরুত্ব সহকারে তার কথা শুনতেন।
  • ইসলামী বিষয়ে তিনি কখনই নিজের পক্ষ থেকে কোন কথা বলতেন না। আল্লাহ্‌ বলেন: “তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোন কথা বলেন না। যা বলেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নিকট ওহী করা হয়।” [সূরা নজম-৩/৪]
  • তিনি অশ্লীল বাক্যালাপ করতেন না। তাঁর স্বভাবে, কথায়, কাজে ও আচরণে কখনো অশ্লীলতা প্রকাশ পায়নি।
  • হাটে-বাজারে গেলে কখনো উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন না।
  • কেউ অসদাচরণ করলে তার প্রতিশোধ নিতেন না। তার সাথে অসদাচরণ করতেন না, বরং ক্ষমা করে দিতেন।
  • আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ক্ষেত্র ছাড়া কখনো কোন নারী বা ভৃত্যকে প্রহার করেননি।
  • তাঁর উপর কেউ অন্যায় করলেও নিজের সাহায্যের জন্য কিছু করতেন না।   কিন্তু আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় লঙ্ঘিত হলে তিনি তাকে ছাড়তেন না।
  • দুটি বিষয়ের মাঝে স্বাধীনতা দেয়া হলে, সহজ বিষয়টিই গ্রহণ করতেন- যদি তাতে কোন গুনাহ না থাকে।
  • তিনি মুমিনদের প্রতি ছিলেন খুবই করুণাময়: “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে থেকে তোমাদের কাছে একজন রাসূল আগমন করেছেন। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।” [সূরা তওবা-১২৮] “আল্লাহর করুণায় আপনি তাদের জন্য নম্র ব্যবহার করেন।” [সূরা আল ইমরান- ১৫৯]
  • মানুষ যা পছন্দ করে না এমন চেহারা নিয়ে তিনি তাদের সম্মুখবর্তী হতেন না।
  • দুনিয়াবী বিষয়ের কোন কিছু চাইলে কখনো ‘না’ বলেন নি।
  • তিনি ছিলেন সম্মানিত দানশীল। এমনকি তাঁর দানের হস- দ্রুতগতিতে প্রবহমান ঝড়ের চাইতেও ক্ষিপ্র ছিল।
  • তিনি হাদিয়া-উপহার গ্রহণ করতেন এবং তার জন্য দু’আ করতেন।
  • তিনি ছিলেন খুবই লাজুক প্রকৃতির। এমনকি ঘরের কোনে লুকায়িত লজ্জাবতী কুমারী নারীর চাইতেও অধিক লাজুক ছিলেন।
  • কোন কিছু অপছন্দ করলে তার লক্ষণ মুখমণ্ডলে ফুটে উঠত।
  • তাঁর কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত বিষয় ছিল মিথ্যা বলা।
  • তিনি হাসি-ঠাট্টা করতেন। কিন্তু কখনই অবান্তর কথা বলতেন না।
  • অধিকাংশ সময় মুচকি হাসতেন। কখনো কখনো অট্টহাসি দিতেন এবং এতে সম্মুখের দাঁত প্রকাশ পেত, কিন্তু এরূপ খুবই কম হত।
  • তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধির অধিকারী ছিলেন। আর আতর-সুগন্ধি তিনি ভালবাসতেন।
  • পানি পান করলে তিন শ্বাসে পান করতেন।
  • খাদ্য খাওয়ার পর আঙ্গুল সমূহ চেটে খেতেন।
  • কখনো হেলান দিয়ে খাদ্য খেতেন না।
  • পরিধেয় লুঙ্গি থাকত সর্বদা অর্ধ হাঁটু বরাবর।
  • তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও ভদ্র।
  • এগারতম হিজরীতে ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার দিবসে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলা আলিহি ওয়া আছহাবিহি ওয়া সাল্লামা তাসলীমান কাছীরা)

হে আল্লাহ! রোজ কিয়ামতে তোমার নবীর শাফায়াত নছীব করো এবং তাঁর পবিত্র হাত থেকে হাউযে কাওছারের পানি পান করার তাওফীক দাও।

আমীন!!

সংকলন ও অনুবাদ: শাইখ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ্‌ আল্‌ কাফী [দাঈ, জুবাইল দা’ওয়া এন্ড গাইডেন্স সেন্টার,পো: বক্স নং ১৫৮০, জুবাইল- ৩১৯৫১ সঊদী আরব]

Translate