Tuesday, September 26, 2023

স্বামী - স্ত্রীর মনোমালিন্য হলে করণীয় কি?

 




মনোমালিন্য

 ‘‘সংসার সাগরে দুঃখ-তরঙ্গের খেলা,
  আশা তার একমাত্র ভেলা।’’
কিন্তু সেই ভেলা ডুবে গেলে আর কার কি সাধ্য?  স্বামী যদি স্ত্রীকে না চায়। তার কোন ত্রুটির কারণে তাকে উপেক্ষা করে, তবে স্ত্রী চাইলেও কি করতে পারে? মহান আল্লাহ তার সমাধান দিয়েছেনঃ-
‘‘স্ত্রী যদি তার  স্বামীর দুর্ব্যবহার ও উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তবে তারা আপোস-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোন দোষ নেই। বস্ত্ততঃ আপোস করা অতি উত্তম।[1]
স্ত্রী নিজের কিছু অধিকার বিসর্জন দিয়ে
সন্ধির মাধ্যমে  স্বামীর সংসর্গ গ্রহণ করাই একমাত্র পথ।
কিন্তু স্ত্রী  স্বামীকে উপেক্ষা করতে চাইলে এবং  স্বামী তাকে প্রাণ দিয়ে চাইলে তার সমাধান কি? স্ত্রীর এই উপেক্ষা যদি সংগত কারণে হয়; অর্থাৎ  স্বামীর ভরণ-পোষণ বা সঙ্গমের অযোগ্যতা যথার্থভাবে প্রমাণিত হয় অথবা আরোপিত শর্তাদি পালন না করে থাকে, তাহলে এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,
﴿إِلاَّ أَنْ يَخَافَا أَلاَّ يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلاَّ يُقِيمَا حُدُودَ اللهِ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ تِلْكَ حُدُودُ اللهِ فَلا تَعْتَدُوهَا وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾
‘‘তবে যদি তাদের উভয়ের আশংকা হয় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করে চলতে পারবে না এবং তোমরা যদি আশংকা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা (বাস্তবিকই) রক্ষা করে চলতে সক্ষম নয়। তবে সে অবস্থায় স্ত্রী কোন কিছুর বিনিময়ে (মোহর ফেরৎ বা অতিরিক্ত কিছু অর্থদন্ড দিয়ে) ( স্বামী থেকে) নিষ্কৃতি পেতে চাইলে তাতে ( স্বামী-স্ত্রীর) কারো পাপ নেই। এ সব আল্লাহর গন্ডীসীমা। অতএব তোমরা তা লঙ্ঘন করো না, আর যারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা উল্লংঘন করে তারাই অত্যাচারী।’’[2]
সুতরাং  স্বামী মোহর ফেরৎ নিয়ে স্ত্রীকে তালাক দেবে। না দিলে স্ত্রী কাজীর নিকট অভিযোগ করে  ‘খোলা তালাক’ নিতে পারে।
পক্ষান্তরে স্ত্রী যদি অকারণে বা সামান্য ত্রুটির কারণে; যেমন পর্দায় থাকতে পারবে না বলে,  স্বামী লজেন্স কিনে খাওয়ায় না বলে অথবা প্যান্ট পরে না বলে ‘খোলা’ চায় তবে তার উপর জান্নাতের সুগন্ধিও হারাম।[3]
প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন,
الْمُخْتَلِعَاتُ وَالْمُنْتَزِعَاتُ هُنَّ الْمُنَافِقَاتُ.
‘‘খোলা তালাক প্রার্থিনী এবং বিবাহ বন্ধন ছিন্নকারিণীরা মুনাফিক মেয়ে।’’[4]
তালাক বৈধ হলেও তা কোন খেল-তামাশা নয়। পর্যাপ্ত কারণ বিনা তালাক দেওয়া বা নেওয়ার উপর জবাবদিহি করতে হবে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিবর্গকে।
পক্ষান্তরে স্ত্রী একান্ত অবাধ্য হলে  স্বামীর উচিৎ, প্রথমতঃ তাকে সদুপায়ে উপদেশ দেওয়া ও বুঝানো। আল্লাহ ও তাঁর আযাবের ভয় প্রদর্শন করা। তাতেও বিরত না হলে তার শয্যাত্যাগ করা। তবে কক্ষ ত্যাগ করা উচিৎ নয়। কিন্তু শয্যাত্যাগ করাকে যদি স্ত্রী ভালো মনে করে এবং তাতে কোন ফললাভ না হয়, তাহলে এরপর সে তাকে প্রহার করতে পারে। তবে চেহারায় নয় বা এমন প্রহার নয়; যাতে কেটে-ফুটে যায়।[5]
এতে যদি স্ত্রী  স্বামীর অনুগতা হয়ে সোজা পথে এসে যায়, তাহলে আর অন্য কোন ভিন্নপথ অবলম্বন করা (তালাক দেওয়া)  স্বামীর জন্য উচিৎ নয়।[6]
প্রকাশ যে,  স্বামী-স্ত্রীর মাঝে প্রেম বা বিচ্ছেদ সৃষ্টি করতে কোন প্রকার যোগ-যাদু ইত্যাদি অভিচার ক্রিয়ার সাহায্য নেওয়া বৈধ নয়। কারণ যাদু এক প্রকার কুফরী।[7]
৪ মাস অপেক্ষা কম সময়ের জন্য  স্বামী তার স্ত্রীর নিকট না যাওয়ার কসম খেয়ে সেই সময়ের ভিতরে স্ত্রী-মিলন চাইলে কসমের কাফ্ফারা আদায় করতে হবে। মেয়াদ পূর্ণ করলে কাফ্ফারা লাগবে না। পক্ষান্তরে ৪ মাসের অধিক সময়ের জন্য স্ত্রী-স্পর্শ না করার কসম খেলে কসমের কাফ্ফারা দিয়ে ৪ মাসের পূর্বেই স্ত্রীর নিকট যাওয়া জরুরী। নচেৎ ৪ মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে স্ত্রীর তালাক হয়ে যাবে বা স্ত্রী কাজীর নিকট অভিযোগ করে  স্বামীকে তার সংসর্গে আসতে অথবা তালাক দিতে বাধ্য করতে পারবে। মহান আল্লাহ বলেন,
{لِّلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِن نِّسَآئِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ فَإِنْ فَآؤُوا فَإِنَّ اللهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (226) وَإِنْ عَزَمُواْ الطَّلاَقَ فَإِنَّ اللهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ} (227) سورة البقرة
‘‘যারা নিজেদের স্ত্রীর কাছে না যাওয়ার শপথ (ঈলা) করে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে; অতঃপর তারা যদি মিলে যায়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যদি তারা তালাকই দিতে সংকল্প করে, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’’[8]
স্ত্রী পছন্দ না হলে যদি  স্বামী তালাক দেয়, তবে প্রদত্ত মোহর সে ফেরৎ পাবে না। স্ত্রী ‘খোলা’ নিলে  স্বামী মোহর ফেরৎ পাবে। সুতরাং এই মোহর বা অতিরিক্ত অর্থদন্ডের লোভে স্ত্রীর উপর নির্যাতন চালিয়ে তাকে ‘খোলা’ নিতে বাধ্য করা  স্বামীর জন্য বৈধ নয়। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهاً وَلا تَعْضُلُوهُنَّ لِتَذْهَبُوا بِبَعْضِ مَا آتَيْتُمُوهُنَّ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ﴾
‘‘হে মুমিনগণ! জোর-জুলুম করে নারীদের ওয়ারেস হওয়া তোমাদের জন্য হালাল নয়। তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ, তার কিয়দংশ আত্মসাৎ করার (ফিরিয়ে নেবার) উদ্দেশ্যে তাদের উপর উৎপীড়ন করো না (বা আটক রেখো না); যদি না তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়।’’[9]
তিনি আরো বলেন,
﴿وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَاهُنَّ قِنْطَاراً فَلا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئاً أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَاناً وَإِثْماً مُبِيناً﴾
‘‘আর যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করারই ইচ্ছা কর এবং তাদের একজনকে প্রচুর অর্থ দিয়ে থাক, তবুও তা থেকে কিছুই গ্রহণ করো না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপাচরণ দ্বারা তা গ্রহণ করবে?’’[10]
 স্বামীর এরূপ দুরভিসন্ধি বুঝা গেলে সে মোহর ফেরৎ পাবে না।[11]
 স্বামীর জন্য বৈধ নয় যে, সে নিছক জব্দ করা ও কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে লটকে রাখবে। আল্লাহর আদেশ,
﴿وَلا تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَاراً لِتَعْتَدُوا وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ وَلاَ تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللهِ هُزُواً﴾
‘‘তাদের উপর নির্যাতন বা বাড়াবাড়ি করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। যে ব্যক্তি এমন করে সে নিজেরই ক্ষতি করে। আর তোমরা আল্লাহর নির্দেশসমূহকে ঠাট্টা-তামাশার বস্ত্ত মনে করো না।--।’’[12]
বনিবনাও চরম স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছে গেলে, প্রহারাদি করেও স্ত্রী  স্বামীর অনুগতা না হলে আর এক উপায় আল্লাহ বলে দিয়েছেন,
﴿وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَماً مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَماً مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلاحاً يُوَفِّقِ اللهُ بَيْنَهُمَا﴾
‘‘যদি উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা কর তবে তোমরা এর ( স্বামীর) পরিবার হতে একজন ও ওর (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন সালিস নিযুক্ত কর; যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চায় তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন।’’[13]
এ উপায় ফলপ্রসূ না হলে তিক্তময় জীবন থেকে নিষ্কৃতি পেতে শেষ পন্থা হল তালাক। প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন,
ثَلاَثَةٌ يَدعُونَ فَلاَ يُستَجَابُ لَهُم : رَجُلٌ كاَنَت تَحتَهُ امرَأَةٌ سَيِّئَة الخُلُق فَلَم يُطَلِّقهَا وَرَجُلٌ كَانَ لَه عَلى رَجُل مَالٌ فَلَم يَشهَد عَلَيه وَرَجُل آتى سَفيهاً مَالَهُ وَقَد قَالَ الله عَزَّ وَجَلَّ : { وَلاَ تُؤتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُم }.
‘‘তিন ব্যক্তি দুআ করে কিন্তু কবুল হয় না; যে তার অসৎ চরিত্রের স্ত্রীকে তালাক দেয় না। যে ঋণ দিয়ে সাক্ষী রাখে না এবং যে নির্বোধকে নিজের অর্থ প্রদান করে; অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘‘তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের অর্থ প্রদান করো না।’’[14]
তালাক কোন বিধেয় কর্ম নয়, বরং বৈধ কর্ম। বড় হতভাগারাই তালাকের আশ্রয় নিয়ে থাকে। আসলে তালাক হল ইমারজেন্সী গেটের মতো। যখন চারিদিকে আগুন লাগে এবং সমস্ত গেট বন্ধ হয়ে যায়, তখন নিরুপায়ে ঐ গেট ব্যবহার না করলে জীবন বাঁচে না।
[1] (সূরা আন-নিসা (৪) : ১২৮) [2] (সূরা আল-বাক্বারা (২) : ২২৯) [3] (আবু দাঊদ, তিরমিযী, ইবনে হিববান , সহীহ আল-জা-মিউস সাগীর অযিয়াদাতুহ ২৭০৬নং) [4] (নাসাঈ, বাইহাকী, মুসনাদে আহমদ, আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ ৬৩২নং) [5] (আবু দাঊদ) [6] (সূরা আন-নিসা (৪) : ৩৪) [7] (ফাতাওয়াল মারআতিল মুসলিমাহ ১/১৪৮) [8] (সূরা আল-বাক্বারা (২) : ২২৬-২২৭, ফিকহুস সুন্নাহ ২/১৭৮-১৭৯) [9] (সূরা আন-নিসা (৪) :১৯) [10] (সূরা আন-নিসা (৪) : ২০) [11] (ফিকহুস সুন্নাহ ২/২৬৮) [12] (সূরা আল-বাক্বারা (২) : ২৩১) [13] (সূরা আল-বাক্বারা (৪) : ৩৫) [14] (সূরা আন-নিসা (৪) : ২) (সহীহ আল-জা-মিউস সাগীর অযিয়াদাতুহ ৩০৭৫নং)

গুপ্ত অভ্যাস (হস্তমৈথুন) ব্যবহার করা বৈধ কি? ইসলামের দৃষ্টিতে হস্তমৈথুনের ক্ষতিকারক দিক গুলো কি কি?

 


গুপ্ত অভ্যাস (হস্তমৈথুন) ব্যবহার করা বৈধ কি?


গুপ্ত অভ্যাস (হাত বা অন্য কিছুর মাধ্যমে বীর্যপাত, স্বমৈথুন বা হস্ত মৈথুন) করা কিতাব, সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেকের নির্দেশ মতে হারাম।
কিতাব বা কুরআনের দলীল; আল্লাহ তা’আলা বলেন,
“যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে নিজেদের পত্নি অথবা অধিকারভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে অন্যথা করলে তারা নিন্দনীয় হবে না। আর যারা এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।” (সূরা মু’মিনূন ৫-৭)
সুতরাং যে ব্যক্তি তার স্ত্রী ও অধিকারভুক্ত দাসী (অধিকারভুক্ত দাসী বলতে ক্রীতদাসী ও কাফের যুদ্ধবন্দিনীকে বুঝানো হয়েছে। এখানে কাজের মেয়ে, দাসী, খাদেম বা চাকরানী উদ্দেশ্য নয়।) ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা কামলালসা চরিতার্থ করতে চায়, সে ব্যক্তি “এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করে।” বলা বাহুল্য, এই আয়াতের পরিপেক্ষিতে সে সীমালঙ্ঘঙ্কারী বলে বিবেচিত হবে।
সুন্নাহ থেকে দলীল, আল্লাহ্‌র নবী (সঃ) বলেন,
“হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যে কেউ স্ত্রী সঙ্গম ও বিবাহ খরচে সমর্থ, সে যেন বিবাহ করে! কারণ টা অধিক দৃষ্টি-সংযতকারী এবং অধিক যৌনাঙ্গ রক্ষাকারী, যেহেতু তা এর জন্য (খাসী করার মত) কাম দমন কারীর সমান।”  (বুখারী, মুসলিম)
সুতরাং নবী (সঃ) বিবাহে অসমর্থ ব্যক্তিকে রোযা রাখতে আদেশ করলেন, অথচ যদি হস্তমৈথুন বৈধ হত, তবে নিশ্চয় তিনি তা করতে নির্দেশ দিতেন। অতএব তা সহজ হওয়া স্বত্বেও যখন তিনি তা করতে নির্দেশ দিলেন না, তখন জানা গেল যে তা বৈধ নয়।
আর সুচিন্তিত মত এই যে, যেহেতু এই কাজে বহুমুখী ক্ষতি ও অনিষ্টের আশঙ্কা রয়েছে, যা চিকিৎসাবিদগণ উল্লেখ করে থাকেন; এতে এমন ক্ষতি রয়েছে যা স্বাস্থ্যের পক্ষে বড় বিপদ বিপজ্জনক; এ কাজ যৌনশক্তিকে দুর্বল করে ফেলে, চিন্তাশক্তি ও দূরদর্শিতার ক্ষতি সাধন করে এবং কখনো বা এর অভ্যাসী ব্যক্তিকে প্রকৃত দাম্পত্যসুখ থেকে বঞ্চিত করে। কারণ যে কেউ এ ধরনের অভ্যাসে নিজ কাম-লালসাকে চরিতার্থ করে থাকে, সে হয়তো বা বিবাহের প্রতি ভ্রূক্ষেপই করবে না।  (ইবনে উষাইমীন)

শাইখঃ আব্দুল হামীদ ফাইযী

 ইসলামের দৃষ্টিতে হস্তমৈথুনের ক্ষতিকারক দিক গুলো কি কি?

ইসলামের দৃষ্টিতে হস্তমৈথুন :

আল্লাহ তা’আলার দেয়া এ সুন্দর যৌবনকালটাকে ক্ষয় করার জন্য যে ব্যক্তি তার স্বীয় লিঙ্গের পিছনে লেগে যায় এবং নিজ হাত দিয়ে এটা চর্চা করায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তার এ হাত পরকালে সাক্ষী দেবে যে, সে এ পাপ কোথায় কতবার করেছে- যা পবিত্র কালামে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “সেই দিন আমি তাদের মুখের উপর মোহর মেরে দেব, বরং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে, আর তাদের পা সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত সে-সন্বন্ধে। ” -(আল- কুরআন, ৩৬:৬৫) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ “ যে ব্যক্তি স্বীয় জিহ্বা এবং লজ্জাস্থান জামিন হবে আমি তার জাহান্নামের জন্যে জামিন হবো।” -(বুখারি, মিশকাত) উক্ত হাদিস থেকে প্রমানিত হচ্ছে, মানব দেহের এ দু’টো অঙ্গ অত্যন্ত দুর্বল ও বিপদজনক। এ দু’টো অঙ্গের মাধ্যমে বিশেষ করে লজ্জাস্থানের মাধ্যমে পাপ করাতে শয়তানের জন্য খুব সুবিধা। এ দু’টো অঙ্গের মাধ্যমে বেশীরভাগ পাপ হয়ে থাকে। যদি কোন ব্যক্তি এ দু’টো অঙ্গের হেফাজত করে, বিশেষ করে যুবক  লিঙ্গের হেফাজত করে অবয়িদ কোন প্রকারেই বীর্যপাত ঘটাতে চেষ্টা না করে তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশের বিরাট সুযোগ পেয়ে যাবে। অন্যত্র সহীহ হাদীস থেকে আরও প্রমানিত হয়ঃ “(একদা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যুবকদের লক্ষ্য করে বলেন) হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে, তাদের বিবাহ করা উচিত। কেননা বিবাহ দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর যে বিবাহের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখে না, তার উচিত (কামভাব দমনের জন্য) রোযা রাখা।” -(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেনঃ “তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহ তা’আলা নিজের দায়িত্ব মনে করেন। (১) ঐ খতদাতা ব্যক্তি, যে তার খতের মূল্য পরিশোধের চেষ্টা করে। (২) সে বিবাহিত যুবক, যে চরিত্রের হিফাজতের উদ্দেশে বিবাহ করে। (৩) সে মুজাহিদ, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।” -(হাসানঃ আত-তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত) হস্তমৈথুন এমনই একটি কাজ যার অর্থ নিজেকে কলুষিত করা। এটা একটা জঘন্য কলুষ বা পাপ বোধযুক্ত কাজ। হস্তমৈথুন এমনই গোপনীইয় পাপ যা মানুষ চোরের মত চুপিসারে করে এবং প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেনঃ “উত্তম চরিত্র হল পু্ন্য। আর যে কাজ তোমার মনে খটকা সৃষ্টি করে এবং লোকের কাছে প্রকাশ হওয়াকে তুমি পছন্দ কর না, তা হল পাপ।” -(মুসলিম, মিশকাত) অশালীন, অশোভনীয় ও অন্যায় কাজে মনে সঙ্কোচবোধ করার নাম হলো লজ্জা বা হায়া। যার লজ্জা নেই সে পারে হস্তমৈথুনে লিপ্ত হতে। লজ্জা বা হায়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ “লজ্জাশীলতা কল্যাণই বয়ে আনে । ” – [বুখারী ও মুসলিম] মুসলিমের এক বর্ণনায় এরূপ রয়েছেঃ “লজ্জাশীলতার পুরোটাই কল্যাণময়।

 ইসলামের দৃষ্টিতে হস্তমৈথুনের ক্ষতিকারক দিক গুলো কি কি?

ইসলামের দৃষ্টিতে এটা হারাম এবংকবীরা গুনাহ। শরীয়ত অনুযায়ী যারা
হস্তমৈথুন করে তারা সীমালংগনকারী ।শারীরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা
হয়েছে। পুরুষ হস্তমৈথুন করলে প্রধান  যে্সব সমস্যায় ভুগতে পারে তার মধ্যে একটি হল
[১ ] পুরুষ হস্তমৈথুন করতে থাকলে সে
ধীরে ধীরে নপুংসক (Impotent) হয়ে
যায়। অর্থাৎ যৌন সংগম স্থাপন করতে
অক্ষম হয়ে যায় ।[২] আরেকটি সমস্যা হল অকাল
বীর্যপাত। ফলে স্বামী তার স্ত্রীকে
সন্তুষ্ট করতে অক্ষম হয় । বৈবাহিক
সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয় না ।[৩ ] অকাল বীর্যপাত হলে বীর্যে
শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যায় । তখন বীর্যে
শুক্রাণুর সংখ্যা হয় ২০মিলিয়নের কম ।।
যার ফলে সন্তান জন্মদানে ব্যর্থতার
দেখা দেয় ।
(যে বীর্য বের হয় সে বীর্যে শুক্রাণুর
সংখ্যা হয় ৪২ কোটির মত ।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মতে কোন পুরুষের থেকেযদি ২০ কোটির কম শুক্রাণু বের হয় তাহলে সে পুরুষ থেকে কোন সন্তান হয়না। )[৪ ] । অতিরিক্ত হস্তমৈথুন পুরুষে যৌনাঙ্গকে দুর্বল করে দেয় ।Dr.Liu বলেন –
“There is a huge change in body
chemistry when one
masturbates excessively”
আর শরীরের অন্যান্য যেসব ক্ষতি হয়-
১ ) Nervous system, heart, digestive
system, urinary system এবং আরো
অন্যান্য system ক্ষতিগ্রস্ত হয় । পুরো
শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং শরীর রোগ –
বালাইয়ের যাদুঘর হয়ে যায় ।
২ ) চোখের ক্ষতি হয় ।৩ ) স্মরণ শক্তি কমে যায় ।৪ ) মাথা ব্যথা হয় ইত্যাদি আরো অনেক
সমস্যা হয় হস্তমৈথুনের কারণে।
৫ ) আরেকটি সমস্যা হল Leakage of semen। অর্থাৎ সামান্য উত্তেজনায়
যৌনাঙ্গ থেকে তরল পদার্থ বের হয় । ফলে অনেক মুসলিম ভাই নামায পড়তে
পারেন না ।মহান আল্লাহ্ তা’ আলার স্মরণ থেকে মুসলিমদের দূরে রাখে
হস্তমৈথুন।রসূলুল্লাহ্ ( সঃ ) বলেছেন-“যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের
মধ্যবর্তী জিনিস (জিহ্বার) এবং দুইপায়ের মধ্যবর্তী জিনিস (যৌনাঙ্গের)
নিশ্চয়তা (সঠিক ব্যবহারের) দেবে আমি তার বেহেশতের নিশ্চয়তা দিব । ” –
(বুখারী ও মুসলিম)

কোনো অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলে তার জন্য কী কী করণীয়

 প্রশ্ন: একজন হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। তাকে ইসলামে ধর্মে দীক্ষিত করার জন্য কী কী কাজ করতে হবে?

উত্তর: ইসলাম অত্যন্ত সহজ, সুন্দর ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। এটি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার চূড়ান্ত মনোনীত দ্বীন এবং মানবতার মুক্তির একমাত্র ঠিকানা। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। একজন অমুসলিম যখন ইসলামে ছায়াতলে প্রবেশ করে তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর অতীত জীবনের সকল পাপ রাশী মোচন করে তাকে নির্মল, পরিশুদ্ধ ও সম্পূর্ণ নিষ্পাপ মানুষে পরিণত করেন। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَنَّ الإِسْلاَمَ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ
“ইসলাম পূর্ববর্তী সকল পাপ মিটিয়ে দেয়।“ [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, অনুচ্ছেদ: ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরত ও হজ্জ পালনের দ্বারা পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়। হা/২২০]

যাহোক, কোনো অমুসলিম যদি ইসলাম গ্রহণ করতে চায় তাহলে তার জন্য সহজ কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন:
▪১. ইসলাম গ্রহণ কারতে ইচ্ছুক ব্যক্তি প্রথমে মনের মধ্যে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর প্রেরিত দূত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস সহকারে সত্য ধর্ম ইসলাম গ্রহণ এবং তা পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
▪২. অত:পর আরবিতে এই সাক্ষ্য বাণী পাঠ করবে (অথবা কেউ তাকে পাঠ করে শুনাবে আর সে তা শুনে শুনে পাঠ করবে):
“আশহাদু আল্লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ ওয়া আন্না মুহাম্মদার রাসূলুল্লাহ।”
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নাই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল বা প্রেরিত দূত।
এই ‘সাক্ষ্য বাণী’ উচ্চারণের সাথে সাথে সে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে। একজন ব্যক্তি যদি একাকী তার নিজের ঘরে বসেও এই কালিমা পাঠ করে তাহলেও সে মুসলিম হয়ে যাবে। এ জন্য আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। আর ইসলামে প্রবেশের সাথে সে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ও পূত-পবিত্র মানুষে পরিণত হবে। অর্থাৎ কালিমা পাঠ করার পরপরই যদি সে মারা যায় তাহলে সে সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে-সুবহান আল্লাহ!
▪৩. এরপর গোসল করা উত্তম। কেননা, কালিমা শাহাদাহ উচ্চারণ তথা ঈমান আনয়নের মাধ্যমে অন্তরাত্মা পবিত্র হয় আর গোসলের মাধ্যমে শরীর পবিত্র হয়।
▪৪. ওজু এবং নামাজের পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হবে এবং যথারীতি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা শুরু করতে হবে।
▪৫. তাওহিদ, শিরক, ওজু, গোসল, নামায, যাকাত, রোজা, হজ ইত্যাদি ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হবে।
▪৬. ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তির নাম যদি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তা পরিবর্তন করে একটি সুন্দর অর্থবোধক ইসলামী নাম গ্রহণ হবে।
▪৭. এবং ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি পুরুষ হলে সময় সাপেক্ষে তার খতনার ব্যবস্থা করতে হবে। (এটি অধিক অগ্রাধিকারযোগ্য মতানুসারে সুন্নতে মুআক্কাদা)
▪৮. মুসলিমদের উচিৎ, নব দীক্ষিত মুসলিম ভাইকে স্বাগত জানানো এবং তার সাথে সুন্দর আচরণ করা। তৎসঙ্গে সে যদি আর্থিক সমস্যায় থাকে তাহলে বা আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যা লাঘবের চেষ্টা করা নি:সন্দেহে উত্তম কাজ।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Saturday, September 16, 2023

আবু বকর রা. অতঃপর উমর রা. কর্তৃক এক বুড়ির সেবা করা সংক্রান্ত কিচ্ছাটি বানোয়াট

 সম্মানিত সাহাবি আবু বকর রা. অতঃপর উমর রা. কর্তৃক এক বুড়ির সেবা করা সংক্রান্ত কিচ্ছাটি বানোয়াট:

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিম্নোক্ত লেখাটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত:

“তুমি আমার জন্য খেজুর এনেছো কিন্তু এগুলোর বীচি ফেলোনি ! ”
এটা একটি বিখ্যাত আরবি প্রবাদ।‌ কিন্তু এই প্রবাদটির উৎপত্তি কীভাবে হয়? আর কীভাবেই বা এটি বিখ্যাত হয়ে উঠে?
▪️এর পেছনে যে ঘটনাটা রয়েছে তা হল, নিম্নরূপ:
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কে কেউ একজন জানালো যে, আবু বকর রা. ফজরের সালাত শেষ করে মদিনার সীমানার দিকে যান, একটা ছোটো বাড়িতে বেশ কিছু সময় কাটান, তারপর নিজের ঘরে ফিরে আসেন।

আবু বকর রা. কী করতেন না করতেন তার সব খবরই উমর রা. রাখতেন; শুধুমাত্র এই বাড়িতে কী হতো তা তাঁর অগোচরে ছিলো।

দিন যায় কিন্তু খলিফা আবু বকর রা. এর ঐ বাড়িতে গমন বন্ধ হয় না। উমর. সিদ্ধান্ত নিলেন, ফজরের পর আবু বকর রা. ঐ বাড়িতে গিয়ে কী করেন, তা তিনি নিজের চোখে একবার দেখে আসবেন।
উমর রা. ঐ ঘরে গিয়ে দেখতে পেলেন, ওখানে একজন বৃদ্ধা বাস করেন। বৃদ্ধার কেউ নেই। তার উপর বৃদ্ধা অন্ধ।

উমর রা. অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হলেন। বৃদ্ধার সাথে আবু বকরের কী সম্পর্ক তা জানার জন্য তিনি আগ্রহী হয়ে উঠলেন।
উমর রা. বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“এই লোক আপনার বাড়িতে প্রতিদিন কী জন্য আসে?”
বৃদ্ধা জবাব দিলেন,
“আল্লাহর কসম, আমার জানা নেই। সে প্রতিদিন আসে, তারপর আমার ঘর ঝাড়ু দেয়, সব কিছু পরিষ্কার করে, তারপর আমার জন্য খাবার তৈরি করে, তারপর কোনো কথা না বলেই চলে যায়। ”
আবু বকর রা. এর মৃত্যুর পর আমিরুল মুমিনিন উমর রা.ও একইভাবে বৃদ্ধার সেবা করতে আরম্ভ করলেন।
বৃদ্ধা কিছু একটা টের পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার বন্ধু কি মারা গেছেন?”
উমর রা. অন্ধ বৃদ্ধার প্রশ্ন শুনে প্রচণ্ড অবাক হলেন। তিনি রা. বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
বৃদ্ধা জবাব দিলেন,‌ “তুমি আমার জন্য খেজুর এনেছো, কিন্তু খেজুরগুলোর বীচি ফেলোনি।” (অথচ এই সামান্য বিষয়টাও তোমার বন্ধুর নজর এড়াতো না)
উমর রা. হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লেন। তাঁর চোখ অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। আর এই অবস্থায় উমর রা. তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি বললেন,
“হে আবু বকর, আপনি পরবর্তী খলিফাদের কাজ অত্যন্ত কঠিন করে গেছেন। ”
(আল্লাহ্‌ তাঁদের উপর রহম করুন)
[সংগৃহীত]

🔎 ঘটনার সত্যতা বিশ্লেষণ:

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত। ইসলামিক মোটিভেশনাল লেখকরাও তাদের বইয়ে এ গল্পটি তুলে ধরেছেন। যেমন:
ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান আরিফী তার বিখ্যাত “জীবনকে উপভোগ করুন (আরবি নাম: استمتع بحياتك)” বইয়ে এই গল্পটি আকর্ষণীয় ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু এই বইয়ের উপরে মন্তব্য করতে গিয়ে গবেষক ডক্টর আতাবি সহ অন্যান্য গবেষকগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, উক্ত গল্পের বিস্তারিত বিবরণ বানোয়াট।
তাছাড়াও আবু বকর রা. বা ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর জীবনী সংক্রান্ত কোনো গ্রন্থ, খলিফাদের জীবনী শীর্ষক বই বা নির্ভরযোগ্য কোন হাদিসের কিতাবে তা স্থান পায়নি।
তবে তারিখে ইবনে আসাকির শীর্ষক ইতিহাস গ্রন্থে এই ঘটনার সাথে কিছুটা সাদৃশ্য আছে (কিন্তু বিবরণগতভাবে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান) এমন একটি গল্প উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেটিও সনদগতভাবে অত্যাধিক দুর্বল। কারণ এর সনদ একাধিক মাজহুল (অজ্ঞাত পরিচয়ধারী) ও মাতরুক (পরিত্যাজ্য)‌ বর্ণনাকারী এবং সনদের মধ্যে ইনকিতা (বিচ্ছিন্নতা), ইরসাল ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত।
সুতরাং তাও গ্রহণযোগ্য নয়।

▪️তাছাড়া নিম্মোক্ত বিষয়টিও ঘটনাটির মিথ্যাচারিতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তা হল:

এ ব্যাপারে ফকিহগণ কোন দ্বিমত করেননি যে, কোন পুরুষের জন্য নির্জনে কোন নন‌ মাহরাম মহিলার ঘরে প্রবেশ করা জায়েজ নেই যদিও সে বয়স্কা বা বৃদ্ধা হয় না কেন। কেননা কুরআন-হাদিসে এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধ পুরুষ বা মহিলার জন্য আলাদাভাবে ছাড় দেওয়া হয়নি। বরং হাদিসে আম ভাবে বলা হয়েছে,

لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ وَلا تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ
“কোন পুরুষ পরনারীর সাথে নির্জনতা অবলম্বন করবে না এবং
মাহরাম (বিবাহ নিষিদ্ধ পুরুষ) সঙ্গী ব্যতিরেকে পর নারীর সাথে সফর করবে না।” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

ইমাম নওয়াবি এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,
وَأَمَّا إِذَا خَلَا الْأَجْنَبِيّ بِالْأَجْنَبِيَّةِ مِنْ غَيْر ثَالِث مَعَهُمَا، فَهُوَ حَرَام بِاتِّفَاقِ الْعُلَمَاء
“তৃতীয় ব্যক্তি ছাড়া পরপুরুষ পরনারীর সাথে নির্জনতা অবলম্বন করা আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।”

– ফিকাহ বিশ্বকোষ (২৯/২৯৫) এ এসেছে,
ولفظ الرجل في الحديث يتناول الشيخ والشاب, كما أن لفظ المرأة يتناول الشابة والمتجالة (العجوز) ” انتهى.
“হাদিসে ‘পুরুষ’ শব্দটি যুবক এবং বৃদ্ধ এবং ‘নারী’ শব্দটি যুবতী এবং বৃদ্ধা উভয়ই শামিল করে।”

🔸সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি এবং বিশ্ব বরেণ্য আলেম আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. বলেন,
لا يخلو رجل بامرأة فإن الشيطان ثالثهما
ولا فرق بين العجوز والشابة ، لكن الشابة أشد خطراً، والنبي صلى الله عليه وسلم عمم، ولم يقل إلا أن تكون عجوزاً .. والشيطان يخشى منه على الرجل مع المرأة العجوز ومع غيرها…” انتهى من فتاوى “نور على الدرب
(রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,) “কোন পুরুষ পর নারীর সাথে নির্জনতা অবলম্বন করলে সেখানে তৃতীয় জন হবে শয়তান।” যুবতী বা বৃদ্ধের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে যুবতী বেশি বিপদজনক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম ভাবে বলেছেন। এ কথা বলেননি যে, “বৃদ্ধ মহিলা ব্যতিরেকে।” (অর্থাৎ তিনি একথা বলেননি যে, বৃদ্ধ মহিলার জন্য এ বিধান প্রযোজ্য নয়‌)
একজন পুরুষের জন্য শয়তানকে ভয় করা কর্তব্য, বৃদ্ধা অথবা অন্য যেকোনো মহিলার ক্ষেত্রে।” [ফাতাওয়া নুরুন আলাদ্দারব (সৌদি আরবের ইসলামি প্রশ্ন-উত্তর বিষয়ক রেডিও প্রোগ্রাম)]

সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘনিষ্ঠতম এবং এই উম্মতের সবচেয়ে মর্যাদাবান এই দুই সম্মানিত সাহাবি একজন নন মাহরাম বৃদ্ধ মহিলার নির্জন ঘরে গিয়ে সেবা করবেন-এমন হারাম কাজ করতে পারেন না। এটি তাদের মর্যাদা এবং শরিয়তের জ্ঞানের ব্যাপারে অপবাদের শামিল। কোন অসহায় বৃদ্ধ নারীর বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন থাকলে তারা অবশ্যই অন্য কোন মহিলা বা দাসী পাঠিয়ে তাদের সেবা করার ব্যবস্থা করতেন।
মোটকথা, ইসলামে মানবিকতা, মানবসেবা ও সৎকাজে প্রতিযোগিতা ইত্যাদির জন্য সাহাবিদের নামে কোন মিথ্যা ও বানোয়াট কিচ্ছা কাহিনীর অবতারণার প্রয়োজন নেই। বরং এসব ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদিসের যেসব মহান দিক নির্দেশনাবলী রয়েছে সেগুলোই যথেষ্ট।
আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের রং মাখানো মিথ্যা ও বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহ ক্ষমা করুন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কাউকে নির্দিষ্টভাবে শহিদ বলা জায়েজ নাই

 আল্লাহ এবং তাঁর রসুল যাদেরকে নির্দিষ্টভাবে শহিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তাদেরকে ছাড়া আর কোন মানুষকে নির্দিষ্ট করে শহিদ বলা জায়েজ নাই। সে যেই হোক না কেন। এমনকি জিহাদে কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মারা গেলেও তাদেরকে নির্দিষ্টভাবে শহিদ বলা বৈধ নয় যে, উমুক, উমুক শহিদ। কারণ আমি-আপনি জানি না সে কী নিয়তে জিহাদ করেছে। আল্লাহর দ্বীনের জন্য নাকি মানুষ তাকে বীর যোদ্ধা বা সহাসী মুজাহিদ বলবে সে জন্য। তবে কোনও ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থার প্রতি সুধারণা রেখে তা জন্য দুআ করা যাবে যে, আল্লাহ তাকে শহিদ হিসেবে কবুল করুন। অথবা আশা করা যায়, যে সে আখিরাতে শহিদি মর্যাদা লাভ করবে। অথবা আমভাবে বলা যাবে যে, যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে তারা শহিদ. যারা এই এই করবে তারা শহিদ। কিন্তু নাম ধরে নির্দিষ্টভাবে নয়।

ইমাম বুখারি এভাবে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যে,
باب لا يقال: فلان شهيد
”একথা বলা যাবে না যে, অমুক ব্যক্তি শহিদ।”

ইবনে হাজার আসকালানি রাহ. বলেন,

: أي على سبيل القطع بذلك إلا إن كان بالوحي، وكأنه أشار إلى حديث عمر أنه خطب فقال: تقولون في مغازيكم فلان شهيد ومات فلان شهيداً ولعله قد يكون قد أوقر راحلته. ألا لا تقولوا ذلكم ولكن قولوا كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من مات في سبيل الله أو قتل فهو شهيد. وهو حديث حسن أخرجه أحمد وسعيد بن منصور وغيرهما من طريق محمد بن سيرين … وعلى هذا فالمراد النهي عن تعيين وصف واحد بعينه بأنه شهيد، بل يجوز أن يقال ذلك على طريق الإجمال. انتهى

অর্থাৎ ওহির মাধ্যমে অবগত হওয়া ব্যতীত অকাট্য ভাবে কারও জন্য শহিদ হওয়ার ফায়সালা দেওয়া যাবে না। তিনি (ইমাম বুখারি রাহ.) সম্ভবত উমর রা. এর একটি ভাষণের দিকে ইংগিত করেছেন। তিনি বলেছেন, “তোমরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে বলে থাক, অমুক ব্যক্তি শহিদ, অমুক ব্যক্তি শহিদ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। কিন্তু হতে পারে সে তার বাহনে আরোহন করেছে, ব্যবসার উদ্দেশ্যে।

খবরদার! এভাবে বলো না বরং তোমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মতো বল যে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যু বরণ করল অথবা জীবন দিল সে শহিদ।” [মুসনাদ আহমদ-হাসান]
এ কথার ভিত্তিতে ইমাম বুখারির অনুচ্ছেদ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কাউকে নির্দিষ্টভাবে শহিদ উপাধিতে ভূষিত করা নিষিদ্ধ। তবে অনির্দিষ্টভাবে তা বলা জায়েজ।” [ফাতহুল বারি ৬/৯০]

✪ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. বলেন,

أن تقيد الشهادة بشخص معين مثل أن تقول لشخص بعينه: “إنه شهيد”، فهذا لا يجوز إلا لمن شهد له النبي صلى الله عليه وسلم أو اتفقت الأمة على الشهادة له بذلك، وقد ترجم البخاري -رحمه الله- لهذا بقوله: “باب لا يقال: فلان شهيد”

“কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বিশেষভাবে শহিদ হিসেবে আখ্যায়িত করা-যেমন: এ কথা বলা যে, উমুক ব্যক্তি শহিদ-এটা নাজায়েজ। তবে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যার শহিদ হওয়ার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন অথবা সমগ্র উম্মত যার শহিদ হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছে তার বিষয়টি ভিন্ন। আর তাই তো ইমাম বুখারি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন বলেছেন: باب لا يقال: فلان شهيد “অনুচ্ছেদ: এ কথা বলা যাবে না যে, উমুক ব্যক্তি শহিদ।”

✪ তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেছেন,

ولأننا لو شهدنا لأحد بعينه أنه شهيد لزم من تلك الشهادة أن نشهد له بالجنة، وهذا خلاف ما كان عليه أهل السنة، فإنهم لا يشهدون بالجنة إلا لمن شهد له النبي صلى الله عليه وسلم بالوصف أو بالشخص

“কারণ আমরা যদি কাউকে নির্দিষ্টভাবে শহিদ বলে সাক্ষ্য দেই যে, তাহলে এই সাক্ষ্য দ্বারা তাকে জান্নাতি বলে সাক্ষ্য দেওয়া আবশ্যক হয়ে যায়। অথচ তা সালাফদের নীতি বিরুদ্ধ। কারণ সালাফগণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকে নির্দিষ্টভাবে অথবা বৈশিষ্টগতভাবে জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন তাকে ছাড়া তারা কাউকে জান্নাতের সাক্ষ্য দিতেন না।” আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate