Sunday, July 9, 2023

বেনামাজি কি কাফের এবং তার কুরবানি কি বাতিল

 বিংশ শতকের অন্যতম যুগশ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.-এর ফতোয়া এবং তার ব্যাখ্যা:

বেনামাজির কুরবানি প্রসঙ্গে শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. বলেন,
فإذا أراد تارك الصلاة أن يضحي فعليه أن يتوب إلى الله أولاً من تركه الصلاة ، فإن لم يفعل وأصر على ما هو عليه ، فإنه لا يثاب على تلك الأضحية ، ولا تقبل منه ، وإذا تولى ذبحها بنفسه فهي ميتة ، لا يجوز الأكل منها ، لأن ذبيحة المرتد ميتة حرام

“অতএব যদি সালাত পরিত্যাগকারী কুরবানি করার ইচ্ছা পোষণ করে তাহলে তার উচিত হলো, সালাত পরিত্যাগ করার জন্য প্রথমত আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা করা। যদি সে তওবা না করে এবং তার উপরেই সে অটল থাকে অর্থাৎ সালাত আদায় না করে তাহলে তার ওই কুরবানিতে নেকি হবে না এবং কুরবানি কবুলও হবে না। যদি সে সালাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেই জবাই করে তাহলে তা হবে মৃত প্রাণির ন্যায়। আর মৃত প্রাণি খাওয়া হালাল নয়। কারণ মুরতাদ (ইসলাম থেকে বিচ্যুত) কর্তৃক জবাই করা গোশত খাওয়া হারাম।” [সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক রেডিও প্রোগ্রাম ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ৩২/১২৪]।

শাইখের সালাত পরিত্যাগ করার বিধান এবং তার কুরবানি বাতিল হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া অনেকেই ভুল বুঝেছেন। যার কারনে তারা শাইখের ফতোয়া উল্লেখ পূর্বক তার সঠিক ব্যাখ্যা ছাড়াই সালাত পরিত্যাগকারীকে কাফের-মুরতাদ এবং তার কুরবানি বাতিল বলে ফতোয়া দিচ্ছেন!

তাহলে আসুন, শাইখের ফতোয়ার সঠিক ব্যাখ্যা জানা যাক।

শাইখের এ ফতোয়াটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। তা হল, কুরবানি বাতিল হওয়া-না হওয়া নির্ভর করছে সালাত পরিত্যাগকারীর হুকুমের উপর যে, সে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত কাফির-মুরতাদ কি না। যদি সে কাফের-মুরতাদ হয় তাহলে তার কুরবানি বাতিল।‌ আর কাফের-মুরতাদ না হলে বাতিল নয়।

মূলত তিনি ঐ সালাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বলেছেন যে মোটেও সালাত পড়ে না। অর্থাৎ শাইখের মতে পরিপূর্ণভাবে সালাত পরিত্যাগকারী কাফের। সুতরাং এমন ব্যক্তি যদি কুরবানি দেয় তাহলে তার কুরবানি বাতিল‌ বলে গণ্য হবে এবং তার জবাই করা প্রাণির গোশত খাওয়াও জায়েজ নেই। কেননা সে মুসলিম নয়।
কিন্তু যে যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত আদায় করে আর মাঝেমধ্যে ছাড়ে তাকে তিনি কাফের বলেননি বরং ফাসেক (পাপিষ্ঠ) ও কবিরা গুনাহকারী বলেছেন। আর ফাসেক (পাপিষ্ঠ) ও কাবিরা গুনাহকারী ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের-মুরতাদ নয়। এটাই শাইখের ফতোয়ার সঠিক ব্যাখ্যা। সুতরাং তার জবাই কৃত পশুর গোশত খাওয়াকে হারাম বলা যাবে না।

প্রকৃতপক্ষে এটাই অধিক নির্ভরযোগ্য ও মধ্যমপন্থী অবস্থান।

▪️যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত পরিত্যাগ করে তার ব্যাপারে শাইখের ফতোয়া নিম্নরূপ:
الذي يظهر لي أنه لا يكفر إلا بالترك المطلق بحيث لا يصلي أبداً ، وأما من يصلي أحيانا فإنه لا يكفر لقول الرسول صلى الله عليه وسلم : ( بين الرجل وبين الشرك والكفر ترك الصلاة ) ولم يقل ترك صلاة ، بل قال : ” ترك الصلاة ” ، وهذا يقتضي أن يكون الترك المطلق ، وكذلك قال : ( العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها ـ أي الصلاة ـ فقد كفر ) ، وبناء على هذا نقول : إن الذي يصلي أحيانا ويدع أحيانا ليس بكافر ” انتهى من “مجموع فتاوى ابن عثيمين ” ( 12 / 55 )
“আমার নিকট যেটা স্পষ্ট হয় তা হলো,‌ যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে সালাত পরিত্যাগ করে অর্থাৎ কখনোই সালাত আদায় করে‌ না কেবল তাকেই কাফের বলা যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত পড়ে তাকে কাফের বলা যাবে না। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‏ إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ
“বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত পরিত্যাগ করা।” তিনি বলেননি যে, “এক ওয়াক্ত সালাত পরিত্যাগ করা করা” বরং বলেছেন, “সালাত পরিত্যাগ করা।” এ শব্দ প্রয়োগের দাবী হলো, পরিপূর্ণভাবে সালাত ত্যাগ করা। অনুরূপভাবে তিনি বলেছেন,
«العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها فقد كفر»
“আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে যে পার্থক্য হলো সালাত। অতএব, যে তা পরিত্যাগ করবে সে কুফুরি করবে।” এর উপর ভিত্তি করে আমরা বলব, যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে সালাত আদায় করে আর মাঝেমধ্যে ছাড়ে সে কাফের (ইসলাম থেকে পরিপূর্ণ বহিষ্কৃত কাফের-মুরতাদ) নয়।” [মাজমু ফাতাওয়া উসাইমিন ১২/৫৫]।

▪️তাকে আরো প্রশ্ন করা হয় যে, যে ব্যক্তি ফজর সালাতকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত বিলম্বিত করে তাকে কি কাফের হিসেবে গণ্য করা যাবে?

তিনি উত্তরে বলেন,
هذا لا يكفر لأنه لم يترك الصلاة لكن تهاون بها ولا يحل له أن يفعل ذلك
“তাকে কাফের বলা যাবে না। কারণ সে সালাত পরিত্যাগ করেনি। বরং সালাতে অবহেলা করেছে। এমনটি করা তার জন্য বৈধ নয়।” [ফাতাওয়া উসাইমিন ১২/৩১]

▪️অন্যত্র তিনি সালাত পরিত্যাগ কারী কাফের কিনা এ বিষয়ে দলিল ভিত্তিক আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,
الأصل بقاء الإسلام ، فلا نخرجه منه إلا بيقين ؛ لأن ما ثبت بيقين لا يرتفع إلا بيقين ” انتهى من ” الشرح الممتع لابن عثيمين ” ( 2 / 27 – 28 ) .
“মূল হচ্ছে ইসলাম অবশিষ্ট থাকা। আমরা সুনিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া তাকে ইসলাম থেকে বের করব না। কেননা যা সুনিশ্চিত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে সুনিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া তা উঠবে না।” [শারহুল মুমতাজ ২/২৭-২৮]।

উল্লেখ্য যে, শাইখ আলবানি রাহ. যে সব হাদিসে সালাত পরিত্যাগ করাকে কুফরি বলা হয়েছে সেগুলোকে কর্মগত কুফরি (ছোট কুফরি) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন (বিশ্বাসগত বা কুফরি বড় নয়)। যেমন: গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া, কোনও মুসলিমের সাথে লড়াই করা, মনিব থেকে গোলামের পলায়ন করা ইত্যাদি বিষয়কে হাদিসে কুফরি বলা হয়েছে। কিন্তু এগুলো বিশ্বাসগত (বড়) কুফরি নয় বরং কর্মগত (ছোট) কুফরি) যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। সালাতের বিষয়টিও অনুরূপ। তবে সালাত পরিত্যাগ করার বিষয়টি আরো ভয়ানক। এর ফলে বড় কুফরিতে পতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে সালাত পরিত্যাগ করাকে হালাল মনে না করলে বা সালাতকে অস্বীকার না করলে তাকে ইসলাম থেকে বহিস্কৃকত কাফের-মুরতাদ বলা যাবে না।” [শাইখের ফতোয়ার সারসংক্ষেপ]
মূলত এটি ইসলামের সাধারণ মূলনীতির আলোকে খুবই যৌক্তিক ও চমৎকার ব্যাখ্যা।
তবে অনেক আলেমের মতে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত সালাত পরিত্যাগ করে তারা ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত কাফের-মুরতাদ। কিন্তু দলিলের আলোকে আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন এবং শায়খ আলবানির অভিমত অধিক শক্তিশালী বলে বিবেচিত হয়। আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

আমাদের সমাজে বিদ্যমান ঈদ‌ কেন্দ্রিক কতিপয় পাপাচার

 আমাদের সমাজে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের আল্লাহর নাফরমানি ও হারাম কার্যক্রম সংঘটিত হয়।‌ সেগুলোর মধ্যে কিছু প্রকাশ্য পাপাচার আর কিছু গোপনীয় পাপাচার। এইসব পাপাচার ঈদের পবিত্রতা এবং রুহানিয়াতকে ধ্বংস করে এবং আল্লাহর ক্রোধকে অবিসম্ভাবী করে তোলে। তাই আমাদের উচিত, আল্লাহকে ভয় করা এবং ঈদের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে সব ধরনের আল্লাহর নাফরমানি মূলক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

🔸নিম্নে মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করার উদ্দেশ্যে আমাদের সমাজে প্রচলিত পাপাচারের উল্লেখযোগ্য ২০টি নমুনা তুলে ধরা হলো:

১. ঈদের রাত ও তার পরের কয়েকদিন নানা পাপাচার ও হারাম কার্যক্রমের মাধ্যমে উদযাপন করা। যেমন: তথাকথিত বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড ডেটিং, ঘুরাঘুরি, ধূমপান, মদ পান, বিভিন্ন নাইট ক্লাব বা ড্যান্স বারে আড্ডাবাজি করা, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পর্যটনে গিয়ে নানা পাপকর্মে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি।

২. যু্বতী মেয়েদের আঁট-সাঁট ও পাতলা পোশাক পরিধান করা‌ এবং বিভিন্ন রংবেরঙের পোশাক পরে পর্দাহীনভাবে যত্রতত্র সৌন্দর্য প্রদর্শনী করে বেড়ানো।

৩. ঈদ উৎসব এবং আনন্দ বিনোদন ও ঈদ মেলার নামে নানা ধরনের উশৃংখলতা, অশ্লীলতা ও নোংরামি মূলক কার্যক্রম করা এবং অপসংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়া।

৪. ঈদ শপিং-এর নামে মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও বিনা প্রয়োজনে ঘুরাঘুরি করা।

৫. ঈদ উপলক্ষে দাড়িতে ডিজাইন ও ফ্যাশন করা, দাড়ি কাট-ছাঁট করা বা শেভ করা।

৬. পুরুষদের টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে এবং মহিলাদের টাখনুর উপরে উঠিয়ে জামা-কাপড় পরিধান করা।

৭. বিভিন্ন কা/ফে/র-ফাসেক নায়ক-নায়িকা, মডেল ইত্যাদির অনুকরণে চুল কাটা বা জামা-কাপড় পরিধান করা বা এসব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের ফ্যাশন অনুসরণ করা। (যেমন: ছেঁড়া প্যান্ট পরা, নাভির নিচে ঝুলিয়ে প্যান্ট পরা, মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রকাশিত হয় এমন ভাবে পোশাক পরা ইত্যাদি)

৮. পুরুষদের রেশমি পোশাক পরিধান করা বা হাতে ব্রেসলেট, গলায় মালা, কানে দুল ইত্যাদি পরিধান করা। অনুরূপভাবে ভারতীয় নায়ক, মডেল বা হি/ন্দু/দের অনুকরণে হাতে
লাল, কমলা, হলুদ, কালো—নানা রঙের সুতো ধরণ করা। কিংবা হাতের আঙ্গুলে স্বর্ণের আংটি বা গলায় স্বর্ণের চেন ইত্যাদি ব্যবহার করা।

৯. যুবক-যুবতীদের অবাধ মেলামেশা, হইহুল্লোড় ও‌ আড্ডাবাজিতে‌ মেতে ওঠা।

১০. ছেলেদের হাতে, পায়ে বা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে মেহেদি বা রং এবং মেয়েদের সুগন্ধি ব্যবহার করা। উল্লেখ্য যে, ছেলেদের চুল ও দাড়িতে মেহেদি ব্যবহার করায় এবং মেয়েদের স্বামী, নারী অঙ্গন ও মাহারম পুরুষদের কাছে থাকা অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহারে কোন দোষ নেই।

১১. সাজ-সজ্জার নামে শরীরে উল্কি বা ট্যাটু অংকন করা।

১২. মিউজিক ও গান-বাজনা নিয়ে মেতে ওঠা।

১৩. সিনেমা হলে বা টিভি চ্যানেল, ইউটিউব-ফেসবুক ইত্যাদিতে ঈদের বিশেষ নাটক-সিনেমা, মিউজিক ভিডিও ইত্যাদি দেখা।

১৪. অতিথি আপ্যায়ন বা বিভিন্ন পার্টিতে‌ কিংবা হোটেল, রেস্তোরাঁ, রেস্ট হাউস ইত্যাদিতে খাদ্য-পানীয় অপচয় করা। অনুরূপভাবে ঘরবাড়ি , মার্কেট, শপিং মল ইত্যাদি সাজাতে মাত্রাতিরিক্ত লাইটিং ও ডেকোরেশন করা যা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত।

১৫. সমাজের গরিব-অসহায় ও দুস্থ মানুষদের খোঁজ-খবর না নেওয়া।

১৬. ঈদের নানা আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কারণে অথবা বিনা কারণে জামায়াতে সালাত পরিত্যাগ করা বা সালাতের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা।

১৬. বিশেষ করে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন নাটক-সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ফজরের সালাত মিস করা।

১৭. আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, দুআ, তাসবিহ ও ইলম চর্চা থেকে অমনোযোগী থাকা।

১৮. রমজান শেষে ইবাদত-বন্দেগি বাদ দিয়ে দেওয়া বা তাতে অলসতা করা।

১৯. ঈদ উৎসবকে অন্যান্য ধর্ম ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মতো নিছক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান সর্বস্ব মনে করা। প্রকৃতপক্ষে ঈদ হলো, আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা‌ প্রকাশের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। তাই প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির দিকটি খেয়াল রাখা আবশ্যক।

২০. এছাড়াও আমাদের সমাজে রয়েছে ঈদকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় লেবাসে নানা ধরনের বিদআত ও শরিয়ত বিরোধী কার্যক্রম। আল্লাহ তাআলা আমাকে সহ পৃথিবীর সকল মুসলিমকে সকল ধরনের আল্লাহর নাফরমানি ও পাপাচার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬◆◈◆ ▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

মাইসুরা, মুসকান, সারা ও সাফা নামগুলোর অর্থ

 প্রশ্ন: মাইসুরা, মুসকান, সারা ও সাফা-এ নামগুলোর অর্থ কী?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর:
▪️১. মাইসুরা (ميسورة) আরবি শব্দ। এর অর্থ: সহজ, সহজসাধ্য, সচ্ছল।

▪️২. মুসকান (مسكان) উর্দু শব্দ। এর অর্থ: মৃদ হাসি, মুচকি হাসি। মুসকান শব্দটি আরবিতেও ব্যবহৃত হয়। তার অর্থ: ডাউন পেমেন্ট (Down payment) অর্থাৎ কোনও কিছু ক্রয়ের চুক্তির সময় অগ্রীম প্রদত্ব অর্থ।

ভারত উপমহাদেশে মেয়েদের নাম রাখার ক্ষেত্রে উর্দু শব্দ (মুচকি হাসি) বিবেচনায় রাখা হয়।

▪️৩. সারা (ساره/سارة/سارا):
সারা শব্দটি বুৎপত্তিগতভাবে আরামীয় ভাষা (Aramaic language) থেকে উৎকলিত। (আরবি বা হিব্রু থেকে নয়) এর অর্থ: রাণী, মহিলা শাসক, সম্রাজ্ঞি, নেত্রী, ভদ্র মহিলা, অভিজাত নারী ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল ইবরাহিম আ. এর স্ত্রী এবং আল্লাহর নবী ইসহাক আ. এর মার নাম ছিল সারা।

▪️৪. সাফা (صفاء), আরবি শব্দ। এর অর্থ: পরিচ্ছন্নতা, নিষ্কলুষতা, নির্মলতা, হৃদ্যতা, আন্তরিকতা, আন্তরিক বন্ধুত্ব ইত্যাদি।

-আরেকটি অর্থ: (الصفا) কঠিন শিলা খণ্ড, মসৃণ প্রস্তর খণ্ড। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّه
“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা বাকারা: ১৫৮]
মারওয়া অর্থ: নরম সাদা পাথর, মসৃণ শ্বেত প্রস্তর খণ্ড। এ দু নামে মক্কায় কাবা পার্শ্বস্থ দুটি পাহাড় । হজ ও ওমরার সময় যে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ করতে হয়।
মেয়েদের নামকরণের ক্ষেত্রে প্রথম অর্থটি বিবেচনায় রাখা হয়।

– বিশেষ দ্রষ্টব্য: এখানে কোন নামের অর্থ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে না। তাই কমেন্টে এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন না করার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নেকির পাল্লা ভারী হবে নাকি গুনাহের পাল্লা ভারী হবে এ দুশ্চিন্তায় বিভোর থাকবেন একথা সঠিক নয়

 প্রশ্ন: কোনো এক বক্তব্যে শুনেছি যে, “বিচারের মাঠে যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলনামা দাঁড়িপাল্লায় উঠানো হবে তখন তিনি চিন্তিত থাকবেন যে, তিনি জান্নাতে যাবেন নাকি জাহান্নামে যাবেন!” অথবা তাঁর নেকির পাল্লা ভারী হবে নাকি গুনাহের পাল্লা ভারী হবে-এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবেন। উপরোক্ত বক্তব্য কি সঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: উপরোক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। কেননা এ বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস নেই। এর পক্ষে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়ে থাকে কিন্তু সেটিও প্রাজ্ঞ হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে জয়িফ বা দুর্বল। বিশেষ করে হাশরের ময়দানে আল্লাহর নবী তাঁর নিজের পরিণতি নিয়ে দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হওয়ার ব্যাপারে (যা অদৃশ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত) এমন দুর্বল হাদিস কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বহু বিশুদ্ধ হাদিসে প্রমাণিত যে, তিনি একদিকে দুনিয়াতে জীবদ্দশায় আল্লাহর নিকট থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হয়েছেন, অন্যদিকে কিয়ামতের দিন তিনি বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকার এবং সর্বপ্রথম ব্যক্তি হিসেবে জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ ও প্রতিশ্রুতি লাভ করেছেন। যদিও আমাদের প্রিয় শাইখ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (হাফিজাহুল্লাহ) উক্ত দুর্বল হাদিসের ভিত্তিতে বলেছেন যে, কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লায় আমলনামা মাপার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিণতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবেন আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবেন যে, তার নেকির পাল্লা ভারী হয় নাকি গুনাহর পাল্লা ভারী হয়?!!
(আল্লাহ শায়খকে ক্ষমা করুন। আমিন
কমেন্টে শাইখের বক্তব্যের লিংক দেওয়া হল)
তাছাড়া উক্ত হাদিসটি অন্যান্য একাধিক সহিহ হাদিস পরিপন্থী।

যেমন: বহু সংখ্যক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, সকল মানুষের মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন।

এ মর্মে দুটি হাদিস পেশ করা হলো:

▪️ ক. আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« آتِي بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتفْتِحُ، فَيَقُولُ الْخَازِنُ: مَنْ أَنْتَ؟ فَأَقُولُ: مُحَمَّدٌ، فَيَقُولُ: بِكَ أُمِرْتُ لَا أَفْتَحُ لِأَحَدٍ قَبْلَكَ »
“কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরজার নিকটে এসে দরজা খুলতে বললে জান্নাতের রক্ষক বলবেন, কে আপনি? আমি বলব: মুহাম্মদ। তিনি বলবেন, আপনার জন্যই দরজা খোলার অনুমতি আছে। আপনার পূর্বে কারও জন্য দরজা খোলার অনুমতি নাই।” [মুসলিম, হাদিস নাম্বার ১৯৮]

▪️খ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,
أَنَا أَوَّلُ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“আমি হলাম সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
[সহিহ জামে তিরমিযী ও মাজমাউয যাওয়ায়েদ। শাইখ আলবানি বলেন, سنده جيد، رجاله رجال الشيخين “এর সনদটি ভালো। আর বর্ণনাকারীগণ সবাই বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাকারী।” [সহীহাহ, ১০০/৪]

▪️এছাড়াও ‌বহু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় কঠিন পরিস্থিতিতে যখন অন্যান্য সকল নবী-রাসুল অপারগতা প্রকাশ করবেন তখন তিনি সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকে হিসাব-নিকাশ ও বিচার কার্য শুরু করার জন্য মহা বিচারক আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন এবং তিনি তা কবুল করবেন। এটাকে বলা হয়, শাফায়াতে উযমা বা সর্ববৃহৎ শাফায়াত। এ কারনেই তিনি মাকামে মাহমুদ বা সর্বজন প্রশংসিত আসনের অধিকারী হবেন। কেননা সকল নবী-রাসূল এবং তাবৎ মানব কুল সেদিন তাঁর প্রশংসা করবে।

আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
عَسَىٰٓ أَن يَبۡعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامٗا مَّحۡمُودٗا
“আশা করা যায় আপনার রব আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” [সূরা ইসরার: ৭৯]

▪️জান্নাতের সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ স্থানের অধিকারী হবেন প্রিয় নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি ছাড়া আর কোন নবী-রাসুল এই মহা সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবেন না। ওই মর্যাদাপূর্ণ স্থানটির নাম, ওসিলা (الوسيلة)‌ যা আজানের দুআর মধ্যে উল্লেখিত হয়েছে।

▪️ বহু সংখ্যক সাহাবি থেকে মুতাওয়াতি সূত্রে প্রমাণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের মালিক হবেন। এটি কুরআনের সর্বকনিষ্ঠ সুরা কাউসার-এর প্রথম আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে।

🔸আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন আমলনামা ওজনের সময়‌ তিনি জান্নাতি হবেন নাকি জাহান্নামে হবেন বা তার নেকির পাল্লা ভারী হবে, নাকি হালকা হবে- এ ভয়ে ভীত থাকবেন- এ বিষয়ে দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হাদিসটি সহিহ নয়:

হাদিসটি নিম্নরূপ:
عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا ذَكَرَتِ النَّارَ فَبَكَتْ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا يُبْكِيكِ؟ قَالَتْ: ذَكَرْتُ النَّارَ فَبَكَيْتُ، فَهَلْ تَذْكُرُونَ أَهْلِيكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَّا فِي ثَلَاثَةِ مَوَاطِنَ فَلَا يَذْكُرُ أَحَدٌ أَحَدًا: عِنْدَ الْمِيزَانِ حَتَّى يَعْلَمَ أَيَخِفُّ مِيزَانُهُ أَوْ يَثْقُلُ، وَعِنْدَ الْكِتَابِ حِينَ يُقَالُ (هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ) حَتَّى يَعْلَمَ أَيْنَ يَقَعُ كِتَابُهُ أَفِي يَمِينِهِ أَمْ فِي شِمَالِهِ أَمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ، وَعِنْدَ الصِّرَاطِ إِذَا وُضِعَ بَيْنَ ظَهْرَيْ جَهَنَّمَ قَالَ: يَعْقُوبُ، عَنْ يُونُسَ وَهَذَا لَفْظُ حَدِيثِهِ ضعيف، المشكاة (٥٥٢٠)
হাসান রহ. বর্ণনা করছেন আয়েশা রা. থেকে। একবার তিনি জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদতে থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছো কেন?বতিনি বলেন, জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদছি। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কিয়ামতের দিন আপনার স্ত্রী-পরিবারের কথা স্মরণ করবেন?

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিনটি স্থান এমন আছে, যেখানে কেউ কারো কথা স্মরণ করবে না। যথা:
১. মিজান বা দাঁড়িপাল্লায় বান্দার আমলনামা ওজনের সময়-যতক্ষণ না কেউ জানতে পারবে যে, তার পাল্লা ভারী হবে নাকি হালকা হবে।
২. আমলনামা পাওয়ার সময়, যখন বলা হবে, “এই নাও, তোমরা তোমাদের আমলনামা পাঠ কর-যতক্ষণ না কেউ জানতে পারবে যে, তা কোন দিক থেকে আসে-ডান, বাম না পেছনের দিক থেকে।
৩. এবং সে সময় যখন সে পুলসিরাতের নিকটে থাকবে এবং তা স্থাপিত থাকবে জাহান্নামের উপরে।
[আহমদ ও আবু দাউদ। বর্ণনাকারী হাসান রহ. হাদিসটি আয়েশা রা. থেকে শুনেননি, বিধিয় তা মুরসাল। আর মুরসাল হাদিস জয়িফ (দুর্বল) হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। দ্রষ্টব্য: যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম‌ আলবানি এর জয়িফ আবু দাউদ, হা/৭৪৫৫ ও জয়িফ তারগিব, হা/২১০৮]

উপরোক্ত কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং আলোচনা থেকে প্রতিমান হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই হাশরের ময়দানে মহা মর্যাদা পূর্ণ অবস্থানের এবং চিরশান্তির নীড় জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এ সুসংবাদ প্রদানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সব ধরনের সংকট ও ভয়-ভীতি থেকে দুশ্চিন্তা মুক্ত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।

🔸তিনি ছিলেন আল্লাহর ক্ষমা প্রাপ্ত নিষ্পাপ এবং পুতপবিত্র:

মুগিরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি সালাত আদায় করতেন যে, তাঁর পদযুগল ফুলে যেতো। তাঁকে জিজ্ঞেস হল, আল্লাহ তো আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন।
তিনি বললেন,
أَفَلاَ أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا
“আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?”
[সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) অধ্যায়: ৫২/ তাফসীর, পরিচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী:
ليغفر لك الله ما تقدم من ذنبك وما تأخر ويتم نعمته عليك ويهديك صراطا مستقيما
“যেন আল্লাহ্‌ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন (৪৮: ২)]
সুতরাং এইসব দলিলের আলোকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে, কিয়ামতের দিন বান্দার হিসাব-নিকাশ এবং আমলনামা ওজনের সময় ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতি হবেন না কি জাহান্নামি হবেন’ কিংবা ‘তাঁর নেকি পাল্লা ভারী হবে, নাকি গুনাহের পাল্লা ভারী হবে’-এমন দু:শ্চিন্তায় পতিত হবেন না। অতএব যে বক্তা এমন কথা বলেছে তার বক্তব্য সঠিক নয়।
الله اعلم
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ঋণগ্রস্থ মৃত ব্যক্তির জানাজার বিধান

 প্রশ্ন: ঋণগ্রস্থ মৃত ব্যক্তির জানাজার বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: কোন মুসলিম ব্যক্তি ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করলেও তার জানাজা পড়া ফরজ। জানাজা বিহীনভাবে তাকে দাফন দেওয়া হারাম। কারণ ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করলে মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না। আর ইসলামের বিধান অনুযায়ী কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে জীবিতদের জন্য ফরজ হলো, তার কাফন, জানাজা এবং দাফনের ব্যবস্থা করা। এটি ফরজে কেফায়া। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মুসলিম যদি তা পালন করে তাহলে অন্য সকলেই গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু কেউ তা না করলে সকলেই গুনাহগার হবে।
– হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা রা. সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أَسْرِعُوا بِالْجَنَازَةِ فَإِنْ تَكُ صَالِحَةً فَخَيْرٌ – لَعَلَّهُ قَالَ – تُقَدِّمُونَهَا عَلَيْهِ وَإِنْ تَكُنْ غَيْرَ ذَلِكَ فَشَرٌّ تَضَعُونَهُ عَنْ رِقَابِكُمْ
“মৃতকে তাড়াতাড়ি দাফন করে দাও। যদি সে ব্যক্তি সৎকর্মশীল হয় তবে তাকে কল্যাণের দিকে অগ্রসর করে দিলে। আর যদি অন্য কিছু হয় তবে মন্দকে তোমাদের কাঁধ হতে সরিয়ে দিলে।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ১২/ জানাজা সম্পর্কিত, পরিচ্ছেদ: ১৪.‌ অনতিবিলম্বে জানাজা সম্পন্ন করা প্রসঙ্গ]। এই বিধানের মধ্যে সকল মুসলিম শামিল। বিশেষ কোন গুনাহগার‌‌ ব্যক্তিকে এই বিধানের বাইরে রাখা হয়নি। ‌ঋণগ্রস্থ ব্যক্তিকে এই বিধানের থেকে বাহির করতে হলে আলাদা সুস্পষ্ট হাদিস থাকা আবশ্যক। কিন্তু তা নেই। সুতরাং কোন ব্যক্তি ঋণ রেখে মারা গেলেও এই হাদিসের আলোকে তার জানাজার ব্যবস্থা করতে হবে।

তাছাড়া এটি মুসলিমদের পারস্পরিক পাঁচ বা ছয়টি হকের মধ্যে অন্যতম যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। তাই কোন ঋণগ্রস্থ মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তাকে বিনা জানাজায় দাফন করা হলে তার ফরজ হক লঙ্ঘন করার কারণে সকল মুসলিম গুনাহগার হবে। (আল্লাহ ক্ষমা করুন, আমিন)।

🔹 ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি মারা গেলে জানাজা দেওয়ার বৈধতার প্রমাণে দু‌টি হাদিস এবং আলেমদের ফতোয়া উল্লেখ করা হলো:

১. জাবের রা. সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্থ অবস্থায় মারা গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার জানাজা পড়তেন না। একবার তাঁর নিকট একটি লাশ আনা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার উপর কোনো ঋণ আছে কি? সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, দু দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) ঋণ আছে।
তিনি বললেন,
صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ
“তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ো।”
তখন আবু কাতাদাহ আল-আনসারি রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ঋণ পরিশোধের জিম্মা আমি নিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা পড়লেন। পরবর্তীতে আল্লাহ যখন তাঁর রাসুলকে বিভিন্ন যুদ্ধে বিজয়ী করলেন, তখন তিনি বললেন, “আমি প্রত্যেক মুমিনের নিকট তার নিজের জীবনের থেকেও অধিক নিকটতর। সুতরাং কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। আর কেউ সম্পদ রেখে মারা গেলে তার হকদার তার উত্তরাধিকারীগণ।” [সুনান আবু দাউদ (তাহকিককৃত), অধ্যায়: ১৭/ ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিচ্ছেদ: ৯. ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধে কড়াকড়ি করা]

২. আরেকটি হাদিস,

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন কোন ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা উপস্থিত করা হত তখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “সে তার ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ-সম্পদ রেখে গেছে কি?”
যদি তাঁকে বলা হত যে, সে তার ঋণ পরিশোধের মতো অর্থ-সম্পদ রেখে গেছে তখন তার জানাজা পড়তেন। অন্যথায় বলতেন, “তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জানাজা আদায় করে নাও।”

পরবর্তীতে যখন আল্লাহ মুসলিমদের অনেক বিজয় দান করলেন তখন তিনি বললেন, আমি মুমিনদের জন্য তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী। তাই কোন মুমিন ব্যক্তি ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার। আর যে ব্যক্তি অর্থ-সম্পদ রেখে যায়, সেগুলো তার উত্তরাধিকারীদের।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]। এই দুটি হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমগণ ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা সালাত আদায় করবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়ার জন্য সাহাবিদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ
“তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা আদায় করো।”
অতএব ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা বৈধ হওয়ার জন্য উপরোক্ত হাদিস দুটিই যথেষ্ট।
▪️এখন প্রশ্ন হল, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়েননি?

আলিমগণ এর দু ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যথা:

১. তিনি এমনটি করেছেন‌ এই সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য যে, মানুষ যেন ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঢিলেমি না করে। বরং যত দ্রুত সম্ভব ঋণ পরিশোধে আগ্রহী হয়। যেমনটি বলেছেন, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ.। [ফাতহুল বারী]।

অতএব সমাজের অনুসরণীয় বড় আলেম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণে ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি, আত্মহত্যা কারী এবং পাপিষ্ঠ লোকদের জানাজা থেকে বিরত থাকে তাহলে তা জায়েজ রয়েছে। যেন অন্যরা এ ব্যাপারে সতর্ক হয়। তবে অন্যান্য মুসলিমদের জন্য তাদের জানাজা পড়ায় কোন বাধা নেই। এই মত ব্যক্ত করেছেন ইবনে তাইমিয়া সহ একদল বিদ্বান।

২. অন্য একদল আলেমের মতে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম পর্যায়ে ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়তেন না যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য কেউ তা পরিশোধের দায়িত্ব না নিত। কিন্তু পরবর্তীতে যখন আল্লাহ তাআলা ইসলামের বিজয় দান করেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ-সম্পদ জমা হয় তখন তিনি ঋণগ্রস্থ মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করতেন এবং তাদের জানাজার সালাত আদায় করতেন। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসের শেষাংশে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আগের বিধানটি মানসুখ বা রহিত হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মুনযেরি রহ. বলেন,
قد صح عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه كان لا يصلي على المدين، ثم نسخ ذلك
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজার সালাত পড়তেন না। কিন্তু পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে যায়।” [আত তারগীব ওয়াত তারহীব]। এছাড়াও আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমদের মধ্যে সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায. এবং এই শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন প্রমূখগণ ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়া বৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছেন। আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate