Sunday, July 9, 2023

আমাদের সমাজে বিদ্যমান ঈদ‌ কেন্দ্রিক কতিপয় পাপাচার

 আমাদের সমাজে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের আল্লাহর নাফরমানি ও হারাম কার্যক্রম সংঘটিত হয়।‌ সেগুলোর মধ্যে কিছু প্রকাশ্য পাপাচার আর কিছু গোপনীয় পাপাচার। এইসব পাপাচার ঈদের পবিত্রতা এবং রুহানিয়াতকে ধ্বংস করে এবং আল্লাহর ক্রোধকে অবিসম্ভাবী করে তোলে। তাই আমাদের উচিত, আল্লাহকে ভয় করা এবং ঈদের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে সব ধরনের আল্লাহর নাফরমানি মূলক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।

🔸নিম্নে মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করার উদ্দেশ্যে আমাদের সমাজে প্রচলিত পাপাচারের উল্লেখযোগ্য ২০টি নমুনা তুলে ধরা হলো:

১. ঈদের রাত ও তার পরের কয়েকদিন নানা পাপাচার ও হারাম কার্যক্রমের মাধ্যমে উদযাপন করা। যেমন: তথাকথিত বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড ডেটিং, ঘুরাঘুরি, ধূমপান, মদ পান, বিভিন্ন নাইট ক্লাব বা ড্যান্স বারে আড্ডাবাজি করা, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পর্যটনে গিয়ে নানা পাপকর্মে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি।

২. যু্বতী মেয়েদের আঁট-সাঁট ও পাতলা পোশাক পরিধান করা‌ এবং বিভিন্ন রংবেরঙের পোশাক পরে পর্দাহীনভাবে যত্রতত্র সৌন্দর্য প্রদর্শনী করে বেড়ানো।

৩. ঈদ উৎসব এবং আনন্দ বিনোদন ও ঈদ মেলার নামে নানা ধরনের উশৃংখলতা, অশ্লীলতা ও নোংরামি মূলক কার্যক্রম করা এবং অপসংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়া।

৪. ঈদ শপিং-এর নামে মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও বিনা প্রয়োজনে ঘুরাঘুরি করা।

৫. ঈদ উপলক্ষে দাড়িতে ডিজাইন ও ফ্যাশন করা, দাড়ি কাট-ছাঁট করা বা শেভ করা।

৬. পুরুষদের টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে এবং মহিলাদের টাখনুর উপরে উঠিয়ে জামা-কাপড় পরিধান করা।

৭. বিভিন্ন কা/ফে/র-ফাসেক নায়ক-নায়িকা, মডেল ইত্যাদির অনুকরণে চুল কাটা বা জামা-কাপড় পরিধান করা বা এসব ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের ফ্যাশন অনুসরণ করা। (যেমন: ছেঁড়া প্যান্ট পরা, নাভির নিচে ঝুলিয়ে প্যান্ট পরা, মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রকাশিত হয় এমন ভাবে পোশাক পরা ইত্যাদি)

৮. পুরুষদের রেশমি পোশাক পরিধান করা বা হাতে ব্রেসলেট, গলায় মালা, কানে দুল ইত্যাদি পরিধান করা। অনুরূপভাবে ভারতীয় নায়ক, মডেল বা হি/ন্দু/দের অনুকরণে হাতে
লাল, কমলা, হলুদ, কালো—নানা রঙের সুতো ধরণ করা। কিংবা হাতের আঙ্গুলে স্বর্ণের আংটি বা গলায় স্বর্ণের চেন ইত্যাদি ব্যবহার করা।

৯. যুবক-যুবতীদের অবাধ মেলামেশা, হইহুল্লোড় ও‌ আড্ডাবাজিতে‌ মেতে ওঠা।

১০. ছেলেদের হাতে, পায়ে বা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে মেহেদি বা রং এবং মেয়েদের সুগন্ধি ব্যবহার করা। উল্লেখ্য যে, ছেলেদের চুল ও দাড়িতে মেহেদি ব্যবহার করায় এবং মেয়েদের স্বামী, নারী অঙ্গন ও মাহারম পুরুষদের কাছে থাকা অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহারে কোন দোষ নেই।

১১. সাজ-সজ্জার নামে শরীরে উল্কি বা ট্যাটু অংকন করা।

১২. মিউজিক ও গান-বাজনা নিয়ে মেতে ওঠা।

১৩. সিনেমা হলে বা টিভি চ্যানেল, ইউটিউব-ফেসবুক ইত্যাদিতে ঈদের বিশেষ নাটক-সিনেমা, মিউজিক ভিডিও ইত্যাদি দেখা।

১৪. অতিথি আপ্যায়ন বা বিভিন্ন পার্টিতে‌ কিংবা হোটেল, রেস্তোরাঁ, রেস্ট হাউস ইত্যাদিতে খাদ্য-পানীয় অপচয় করা। অনুরূপভাবে ঘরবাড়ি , মার্কেট, শপিং মল ইত্যাদি সাজাতে মাত্রাতিরিক্ত লাইটিং ও ডেকোরেশন করা যা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত।

১৫. সমাজের গরিব-অসহায় ও দুস্থ মানুষদের খোঁজ-খবর না নেওয়া।

১৬. ঈদের নানা আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কারণে অথবা বিনা কারণে জামায়াতে সালাত পরিত্যাগ করা বা সালাতের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা।

১৬. বিশেষ করে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন নাটক-সিনেমা, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ফজরের সালাত মিস করা।

১৭. আল্লাহর জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, দুআ, তাসবিহ ও ইলম চর্চা থেকে অমনোযোগী থাকা।

১৮. রমজান শেষে ইবাদত-বন্দেগি বাদ দিয়ে দেওয়া বা তাতে অলসতা করা।

১৯. ঈদ উৎসবকে অন্যান্য ধর্ম ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মতো নিছক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান সর্বস্ব মনে করা। প্রকৃতপক্ষে ঈদ হলো, আল্লাহর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা‌ প্রকাশের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। তাই প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির দিকটি খেয়াল রাখা আবশ্যক।

২০. এছাড়াও আমাদের সমাজে রয়েছে ঈদকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় লেবাসে নানা ধরনের বিদআত ও শরিয়ত বিরোধী কার্যক্রম। আল্লাহ তাআলা আমাকে সহ পৃথিবীর সকল মুসলিমকে সকল ধরনের আল্লাহর নাফরমানি ও পাপাচার থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬◆◈◆ ▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

মাইসুরা, মুসকান, সারা ও সাফা নামগুলোর অর্থ

 প্রশ্ন: মাইসুরা, মুসকান, সারা ও সাফা-এ নামগুলোর অর্থ কী?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর:
▪️১. মাইসুরা (ميسورة) আরবি শব্দ। এর অর্থ: সহজ, সহজসাধ্য, সচ্ছল।

▪️২. মুসকান (مسكان) উর্দু শব্দ। এর অর্থ: মৃদ হাসি, মুচকি হাসি। মুসকান শব্দটি আরবিতেও ব্যবহৃত হয়। তার অর্থ: ডাউন পেমেন্ট (Down payment) অর্থাৎ কোনও কিছু ক্রয়ের চুক্তির সময় অগ্রীম প্রদত্ব অর্থ।

ভারত উপমহাদেশে মেয়েদের নাম রাখার ক্ষেত্রে উর্দু শব্দ (মুচকি হাসি) বিবেচনায় রাখা হয়।

▪️৩. সারা (ساره/سارة/سارا):
সারা শব্দটি বুৎপত্তিগতভাবে আরামীয় ভাষা (Aramaic language) থেকে উৎকলিত। (আরবি বা হিব্রু থেকে নয়) এর অর্থ: রাণী, মহিলা শাসক, সম্রাজ্ঞি, নেত্রী, ভদ্র মহিলা, অভিজাত নারী ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল ইবরাহিম আ. এর স্ত্রী এবং আল্লাহর নবী ইসহাক আ. এর মার নাম ছিল সারা।

▪️৪. সাফা (صفاء), আরবি শব্দ। এর অর্থ: পরিচ্ছন্নতা, নিষ্কলুষতা, নির্মলতা, হৃদ্যতা, আন্তরিকতা, আন্তরিক বন্ধুত্ব ইত্যাদি।

-আরেকটি অর্থ: (الصفا) কঠিন শিলা খণ্ড, মসৃণ প্রস্তর খণ্ড। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ ٱلصَّفَا وَٱلۡمَرۡوَةَ مِن شَعَآئِرِ ٱللَّه
“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা বাকারা: ১৫৮]
মারওয়া অর্থ: নরম সাদা পাথর, মসৃণ শ্বেত প্রস্তর খণ্ড। এ দু নামে মক্কায় কাবা পার্শ্বস্থ দুটি পাহাড় । হজ ও ওমরার সময় যে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ করতে হয়।
মেয়েদের নামকরণের ক্ষেত্রে প্রথম অর্থটি বিবেচনায় রাখা হয়।

– বিশেষ দ্রষ্টব্য: এখানে কোন নামের অর্থ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে না। তাই কমেন্টে এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন না করার জন্য অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নেকির পাল্লা ভারী হবে নাকি গুনাহের পাল্লা ভারী হবে এ দুশ্চিন্তায় বিভোর থাকবেন একথা সঠিক নয়

 প্রশ্ন: কোনো এক বক্তব্যে শুনেছি যে, “বিচারের মাঠে যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলনামা দাঁড়িপাল্লায় উঠানো হবে তখন তিনি চিন্তিত থাকবেন যে, তিনি জান্নাতে যাবেন নাকি জাহান্নামে যাবেন!” অথবা তাঁর নেকির পাল্লা ভারী হবে নাকি গুনাহের পাল্লা ভারী হবে-এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবেন। উপরোক্ত বক্তব্য কি সঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: উপরোক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। কেননা এ বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস নেই। এর পক্ষে একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়ে থাকে কিন্তু সেটিও প্রাজ্ঞ হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে জয়িফ বা দুর্বল। বিশেষ করে হাশরের ময়দানে আল্লাহর নবী তাঁর নিজের পরিণতি নিয়ে দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হওয়ার ব্যাপারে (যা অদৃশ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত) এমন দুর্বল হাদিস কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বহু বিশুদ্ধ হাদিসে প্রমাণিত যে, তিনি একদিকে দুনিয়াতে জীবদ্দশায় আল্লাহর নিকট থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হয়েছেন, অন্যদিকে কিয়ামতের দিন তিনি বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকার এবং সর্বপ্রথম ব্যক্তি হিসেবে জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ ও প্রতিশ্রুতি লাভ করেছেন। যদিও আমাদের প্রিয় শাইখ আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (হাফিজাহুল্লাহ) উক্ত দুর্বল হাদিসের ভিত্তিতে বলেছেন যে, কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লায় আমলনামা মাপার সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিণতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবেন আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবেন যে, তার নেকির পাল্লা ভারী হয় নাকি গুনাহর পাল্লা ভারী হয়?!!
(আল্লাহ শায়খকে ক্ষমা করুন। আমিন
কমেন্টে শাইখের বক্তব্যের লিংক দেওয়া হল)
তাছাড়া উক্ত হাদিসটি অন্যান্য একাধিক সহিহ হাদিস পরিপন্থী।

যেমন: বহু সংখ্যক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, সকল মানুষের মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন।

এ মর্মে দুটি হাদিস পেশ করা হলো:

▪️ ক. আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« آتِي بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتفْتِحُ، فَيَقُولُ الْخَازِنُ: مَنْ أَنْتَ؟ فَأَقُولُ: مُحَمَّدٌ، فَيَقُولُ: بِكَ أُمِرْتُ لَا أَفْتَحُ لِأَحَدٍ قَبْلَكَ »
“কিয়ামতের দিন আমি জান্নাতের দরজার নিকটে এসে দরজা খুলতে বললে জান্নাতের রক্ষক বলবেন, কে আপনি? আমি বলব: মুহাম্মদ। তিনি বলবেন, আপনার জন্যই দরজা খোলার অনুমতি আছে। আপনার পূর্বে কারও জন্য দরজা খোলার অনুমতি নাই।” [মুসলিম, হাদিস নাম্বার ১৯৮]

▪️খ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,
أَنَا أَوَّلُ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“আমি হলাম সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
[সহিহ জামে তিরমিযী ও মাজমাউয যাওয়ায়েদ। শাইখ আলবানি বলেন, سنده جيد، رجاله رجال الشيخين “এর সনদটি ভালো। আর বর্ণনাকারীগণ সবাই বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনাকারী।” [সহীহাহ, ১০০/৪]

▪️এছাড়াও ‌বহু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় কঠিন পরিস্থিতিতে যখন অন্যান্য সকল নবী-রাসুল অপারগতা প্রকাশ করবেন তখন তিনি সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকে হিসাব-নিকাশ ও বিচার কার্য শুরু করার জন্য মহা বিচারক আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবেন এবং তিনি তা কবুল করবেন। এটাকে বলা হয়, শাফায়াতে উযমা বা সর্ববৃহৎ শাফায়াত। এ কারনেই তিনি মাকামে মাহমুদ বা সর্বজন প্রশংসিত আসনের অধিকারী হবেন। কেননা সকল নবী-রাসূল এবং তাবৎ মানব কুল সেদিন তাঁর প্রশংসা করবে।

আল্লাহ তাআলা এ বিষয়টি কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
عَسَىٰٓ أَن يَبۡعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامٗا مَّحۡمُودٗا
“আশা করা যায় আপনার রব আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।” [সূরা ইসরার: ৭৯]

▪️জান্নাতের সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ স্থানের অধিকারী হবেন প্রিয় নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি ছাড়া আর কোন নবী-রাসুল এই মহা সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবেন না। ওই মর্যাদাপূর্ণ স্থানটির নাম, ওসিলা (الوسيلة)‌ যা আজানের দুআর মধ্যে উল্লেখিত হয়েছে।

▪️ বহু সংখ্যক সাহাবি থেকে মুতাওয়াতি সূত্রে প্রমাণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের মালিক হবেন। এটি কুরআনের সর্বকনিষ্ঠ সুরা কাউসার-এর প্রথম আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে।

🔸আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন আমলনামা ওজনের সময়‌ তিনি জান্নাতি হবেন নাকি জাহান্নামে হবেন বা তার নেকির পাল্লা ভারী হবে, নাকি হালকা হবে- এ ভয়ে ভীত থাকবেন- এ বিষয়ে দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হাদিসটি সহিহ নয়:

হাদিসটি নিম্নরূপ:
عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا ذَكَرَتِ النَّارَ فَبَكَتْ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا يُبْكِيكِ؟ قَالَتْ: ذَكَرْتُ النَّارَ فَبَكَيْتُ، فَهَلْ تَذْكُرُونَ أَهْلِيكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَّا فِي ثَلَاثَةِ مَوَاطِنَ فَلَا يَذْكُرُ أَحَدٌ أَحَدًا: عِنْدَ الْمِيزَانِ حَتَّى يَعْلَمَ أَيَخِفُّ مِيزَانُهُ أَوْ يَثْقُلُ، وَعِنْدَ الْكِتَابِ حِينَ يُقَالُ (هَاؤُمُ اقْرَءُوا كِتَابِيَهْ) حَتَّى يَعْلَمَ أَيْنَ يَقَعُ كِتَابُهُ أَفِي يَمِينِهِ أَمْ فِي شِمَالِهِ أَمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِهِ، وَعِنْدَ الصِّرَاطِ إِذَا وُضِعَ بَيْنَ ظَهْرَيْ جَهَنَّمَ قَالَ: يَعْقُوبُ، عَنْ يُونُسَ وَهَذَا لَفْظُ حَدِيثِهِ ضعيف، المشكاة (٥٥٢٠)
হাসান রহ. বর্ণনা করছেন আয়েশা রা. থেকে। একবার তিনি জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদতে থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছো কেন?বতিনি বলেন, জাহান্নামের কথা স্মরণ করে কাঁদছি। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কিয়ামতের দিন আপনার স্ত্রী-পরিবারের কথা স্মরণ করবেন?

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিনটি স্থান এমন আছে, যেখানে কেউ কারো কথা স্মরণ করবে না। যথা:
১. মিজান বা দাঁড়িপাল্লায় বান্দার আমলনামা ওজনের সময়-যতক্ষণ না কেউ জানতে পারবে যে, তার পাল্লা ভারী হবে নাকি হালকা হবে।
২. আমলনামা পাওয়ার সময়, যখন বলা হবে, “এই নাও, তোমরা তোমাদের আমলনামা পাঠ কর-যতক্ষণ না কেউ জানতে পারবে যে, তা কোন দিক থেকে আসে-ডান, বাম না পেছনের দিক থেকে।
৩. এবং সে সময় যখন সে পুলসিরাতের নিকটে থাকবে এবং তা স্থাপিত থাকবে জাহান্নামের উপরে।
[আহমদ ও আবু দাউদ। বর্ণনাকারী হাসান রহ. হাদিসটি আয়েশা রা. থেকে শুনেননি, বিধিয় তা মুরসাল। আর মুরসাল হাদিস জয়িফ (দুর্বল) হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। দ্রষ্টব্য: যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম‌ আলবানি এর জয়িফ আবু দাউদ, হা/৭৪৫৫ ও জয়িফ তারগিব, হা/২১০৮]

উপরোক্ত কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং আলোচনা থেকে প্রতিমান হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই হাশরের ময়দানে মহা মর্যাদা পূর্ণ অবস্থানের এবং চিরশান্তির নীড় জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এ সুসংবাদ প্রদানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সব ধরনের সংকট ও ভয়-ভীতি থেকে দুশ্চিন্তা মুক্ত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।

🔸তিনি ছিলেন আল্লাহর ক্ষমা প্রাপ্ত নিষ্পাপ এবং পুতপবিত্র:

মুগিরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি সালাত আদায় করতেন যে, তাঁর পদযুগল ফুলে যেতো। তাঁকে জিজ্ঞেস হল, আল্লাহ তো আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন।
তিনি বললেন,
أَفَلاَ أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا
“আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?”
[সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) অধ্যায়: ৫২/ তাফসীর, পরিচ্ছেদ: আল্লাহর বাণী:
ليغفر لك الله ما تقدم من ذنبك وما تأخر ويتم نعمته عليك ويهديك صراطا مستقيما
“যেন আল্লাহ্‌ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তার অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন (৪৮: ২)]
সুতরাং এইসব দলিলের আলোকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে, কিয়ামতের দিন বান্দার হিসাব-নিকাশ এবং আমলনামা ওজনের সময় ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতি হবেন না কি জাহান্নামি হবেন’ কিংবা ‘তাঁর নেকি পাল্লা ভারী হবে, নাকি গুনাহের পাল্লা ভারী হবে’-এমন দু:শ্চিন্তায় পতিত হবেন না। অতএব যে বক্তা এমন কথা বলেছে তার বক্তব্য সঠিক নয়।
الله اعلم
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ঋণগ্রস্থ মৃত ব্যক্তির জানাজার বিধান

 প্রশ্ন: ঋণগ্রস্থ মৃত ব্যক্তির জানাজার বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: কোন মুসলিম ব্যক্তি ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করলেও তার জানাজা পড়া ফরজ। জানাজা বিহীনভাবে তাকে দাফন দেওয়া হারাম। কারণ ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করলে মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না। আর ইসলামের বিধান অনুযায়ী কোন মুসলিম মৃত্যুবরণ করলে জীবিতদের জন্য ফরজ হলো, তার কাফন, জানাজা এবং দাফনের ব্যবস্থা করা। এটি ফরজে কেফায়া। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মুসলিম যদি তা পালন করে তাহলে অন্য সকলেই গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু কেউ তা না করলে সকলেই গুনাহগার হবে।
– হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা রা. সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أَسْرِعُوا بِالْجَنَازَةِ فَإِنْ تَكُ صَالِحَةً فَخَيْرٌ – لَعَلَّهُ قَالَ – تُقَدِّمُونَهَا عَلَيْهِ وَإِنْ تَكُنْ غَيْرَ ذَلِكَ فَشَرٌّ تَضَعُونَهُ عَنْ رِقَابِكُمْ
“মৃতকে তাড়াতাড়ি দাফন করে দাও। যদি সে ব্যক্তি সৎকর্মশীল হয় তবে তাকে কল্যাণের দিকে অগ্রসর করে দিলে। আর যদি অন্য কিছু হয় তবে মন্দকে তোমাদের কাঁধ হতে সরিয়ে দিলে।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ১২/ জানাজা সম্পর্কিত, পরিচ্ছেদ: ১৪.‌ অনতিবিলম্বে জানাজা সম্পন্ন করা প্রসঙ্গ]। এই বিধানের মধ্যে সকল মুসলিম শামিল। বিশেষ কোন গুনাহগার‌‌ ব্যক্তিকে এই বিধানের বাইরে রাখা হয়নি। ‌ঋণগ্রস্থ ব্যক্তিকে এই বিধানের থেকে বাহির করতে হলে আলাদা সুস্পষ্ট হাদিস থাকা আবশ্যক। কিন্তু তা নেই। সুতরাং কোন ব্যক্তি ঋণ রেখে মারা গেলেও এই হাদিসের আলোকে তার জানাজার ব্যবস্থা করতে হবে।

তাছাড়া এটি মুসলিমদের পারস্পরিক পাঁচ বা ছয়টি হকের মধ্যে অন্যতম যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। তাই কোন ঋণগ্রস্থ মুসলিম ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তাকে বিনা জানাজায় দাফন করা হলে তার ফরজ হক লঙ্ঘন করার কারণে সকল মুসলিম গুনাহগার হবে। (আল্লাহ ক্ষমা করুন, আমিন)।

🔹 ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি মারা গেলে জানাজা দেওয়ার বৈধতার প্রমাণে দু‌টি হাদিস এবং আলেমদের ফতোয়া উল্লেখ করা হলো:

১. জাবের রা. সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্থ অবস্থায় মারা গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার জানাজা পড়তেন না। একবার তাঁর নিকট একটি লাশ আনা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার উপর কোনো ঋণ আছে কি? সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, দু দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) ঋণ আছে।
তিনি বললেন,
صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ
“তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা পড়ো।”
তখন আবু কাতাদাহ আল-আনসারি রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ঋণ পরিশোধের জিম্মা আমি নিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা পড়লেন। পরবর্তীতে আল্লাহ যখন তাঁর রাসুলকে বিভিন্ন যুদ্ধে বিজয়ী করলেন, তখন তিনি বললেন, “আমি প্রত্যেক মুমিনের নিকট তার নিজের জীবনের থেকেও অধিক নিকটতর। সুতরাং কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। আর কেউ সম্পদ রেখে মারা গেলে তার হকদার তার উত্তরাধিকারীগণ।” [সুনান আবু দাউদ (তাহকিককৃত), অধ্যায়: ১৭/ ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিচ্ছেদ: ৯. ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধে কড়াকড়ি করা]

২. আরেকটি হাদিস,

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যখন কোন ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা উপস্থিত করা হত তখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “সে তার ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ-সম্পদ রেখে গেছে কি?”
যদি তাঁকে বলা হত যে, সে তার ঋণ পরিশোধের মতো অর্থ-সম্পদ রেখে গেছে তখন তার জানাজা পড়তেন। অন্যথায় বলতেন, “তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জানাজা আদায় করে নাও।”

পরবর্তীতে যখন আল্লাহ মুসলিমদের অনেক বিজয় দান করলেন তখন তিনি বললেন, আমি মুমিনদের জন্য তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী। তাই কোন মুমিন ব্যক্তি ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার। আর যে ব্যক্তি অর্থ-সম্পদ রেখে যায়, সেগুলো তার উত্তরাধিকারীদের।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]। এই দুটি হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমগণ ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা সালাত আদায় করবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়ার জন্য সাহাবিদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ
“তোমরা তোমাদের সাথীর জানাজা আদায় করো।”
অতএব ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা বৈধ হওয়ার জন্য উপরোক্ত হাদিস দুটিই যথেষ্ট।
▪️এখন প্রশ্ন হল, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়েননি?

আলিমগণ এর দু ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যথা:

১. তিনি এমনটি করেছেন‌ এই সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য যে, মানুষ যেন ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঢিলেমি না করে। বরং যত দ্রুত সম্ভব ঋণ পরিশোধে আগ্রহী হয়। যেমনটি বলেছেন, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ.। [ফাতহুল বারী]।

অতএব সমাজের অনুসরণীয় বড় আলেম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণে ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি, আত্মহত্যা কারী এবং পাপিষ্ঠ লোকদের জানাজা থেকে বিরত থাকে তাহলে তা জায়েজ রয়েছে। যেন অন্যরা এ ব্যাপারে সতর্ক হয়। তবে অন্যান্য মুসলিমদের জন্য তাদের জানাজা পড়ায় কোন বাধা নেই। এই মত ব্যক্ত করেছেন ইবনে তাইমিয়া সহ একদল বিদ্বান।

২. অন্য একদল আলেমের মতে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম পর্যায়ে ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়তেন না যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য কেউ তা পরিশোধের দায়িত্ব না নিত। কিন্তু পরবর্তীতে যখন আল্লাহ তাআলা ইসলামের বিজয় দান করেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ-সম্পদ জমা হয় তখন তিনি ঋণগ্রস্থ মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করতেন এবং তাদের জানাজার সালাত আদায় করতেন। যেমনটি পূর্বোক্ত হাদিসের শেষাংশে বলা হয়েছে। অর্থাৎ আগের বিধানটি মানসুখ বা রহিত হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে ইমাম মুনযেরি রহ. বলেন,
قد صح عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه كان لا يصلي على المدين، ثم نسخ ذلك
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজার সালাত পড়তেন না। কিন্তু পরবর্তীতে তা রহিত হয়ে যায়।” [আত তারগীব ওয়াত তারহীব]। এছাড়াও আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমদের মধ্যে সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায. এবং এই শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন প্রমূখগণ ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির জানাজা পড়া বৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছেন। আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

যৌবনকাল হচ্ছে হজে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়

 সচেতনতা মূলক পোস্ট: “এখন যৌবন যার হজে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়”

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, পবিত্র ও সুন্দরতম ঘর হচ্ছে কাবা শরিফ। যুগ যুগান্তর ও
কাল পরিক্রমায় এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আল্লাহর মেহমানরা চিরশান্তির নীড় জান্নাতে যাওয়ার প্রত্যাশা বুকে নিয়ে তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ, পবিত্র ও আলোকিত করার উদ্দেশ্যে ছুটে আসেন। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, সারা পৃথিবীর মধ্যে আমাদের ভারত উপমহাদেশ থেকে আসা এত বৃদ্ধ, দুর্বল এবং রোগ-শোকে জর্জরিত হাজি আর কোথাও থেকে দেখা যায় না।

আমাদের হাজিদের মধ্যে যুবকদের সংখ্যা খুবই কম। ১০০ জনের একটি হজ কাফেলায় খুব বেশি হলে ৩-৪ জন যুবক হাজি পাওয়া যায়। এটি খুবই চিন্তার বিষয়। অতি বার্ধক্য ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেক হাজি সঠিকভাবে হজ আদায় করতে পারে না, হজের কার্যাবলী সম্পাদন করতে গিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত এবং অচল হয়ে পড়ে। প্রচুর পরিমাণ হাজি হাসপাতালমুখী হয়, অনেকেই হজ কাফেলা থেকে দলছুট হয়ে হারিয়ে যায়।‌ এমন আরো অনেক সমস্যা ঘটে। যে বিষয়ে হজ এজেন্সি, হজের সেবা দানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ কনস্যুলেট অফিস এবং সংশ্লিষ্টগণ মারাত্মক ভুক্তভোগী।

▪️আমাদের সমাজে অনেকেই যুবক বয়সে হজ করে না বা হজ করতে উৎসাহ বোধ করে না-এর অন্যতম একটি কারণ হলো, তারা ভাবে, যৌবন বয়সে হজ করলে এরপরে ‘হজ ধরে রাখতে পারবে না’ বা হজের মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে না এবং গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকা সম্ভব হবে না।

তাই যৌবনে আমোদ-ফুর্তি করে বুড়ো বয়সে হজ করে নিজেকে শুদ্ধ করে নেবে। তাই দেখা যায়, দৃষ্টিশক্তি যখন ক্ষীণ হয়ে আসে, পিঠ কুঁজো হয়ে বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে, যখন পাপ করার শক্তিই আর থাকে না তখন হজ করতে যান এ দেশের অনেক মানুষ।

তার মানে আমাদের নিয়ত ও চিন্তাভাবনার মধ্যেই সমস্যা।

কিন্তু এটা নিতান্তই ভুল চিন্তাভাবনা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পরেও যেহেতু মানুষের জীবনে পাপ কর্ম ও ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে, রমজান মাসে রোজা রাখার পরেও মানুষের দ্বারা নানা গুনাহের কাজ ঘটে যেতে পারে ঠিক একইভাবে হজ করার পরেও তার জীবনে ভুলভ্রান্তি ও গুনাহের কাজ ঘটতে পারে। কারণ মানুষকে বিপথে পরিচালিত করার জন্য শয়তানের সার্বক্ষণিক কুট পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। সাথে রয়েছে নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কুপ্রবৃত্তি যা তাকে প্রতিনিয়ত আল্লাহর নাফরমানির দিকে প্ররোচিত করে।

কিন্তু রব্বুল আলামিনের তওবার দরজা সব সময় খোলা রয়েছে। ‌ইচ্ছাকৃতভাবে পাপকর্ম থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা অপরিহার্য কিন্তু তারপরও যদি কখনো তা ঘটে যায় তাহলে তৎক্ষণাৎ লজ্জিত অন্তরে আল্লাহর কাছে তওবা করে নিতে হবে। তাহলে আশা করা যায় যে, আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

ইচ্ছাকৃতভাবে পাপকর্ম করা বা তা থেকে তওবা করতে বিলম্ব করা জায়েজ নেই।‌ একথা বলা সংগত নয় যে, পরবর্তীতে তওবা করে সংশোধন হয়ে যাব। কারণ কার কখন কী পরিস্থিতিতে মৃত্যু ঘটবে সে ব্যাপারে কেউ জানে না।
তাইতো আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্রুততার সাথে আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্তি ও জান্নাতের দিকে ছুটে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَسَارِعُوٓاْ إِلَىٰ مَغۡفِرَةٖ مِّن رَّبِّكُمۡ وَجَنَّةٍ عَرۡضُهَا ٱلسَّمَٰوَٰتُ وَٱلۡأَرۡضُ أُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِينَ
“আর তোমরা দ্রুত ছুটে যাও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং সে জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকি তথা পরহেজগার ও আল্লাহ ভীরুদের জন্য।” [সূরা আলে ইমরান: ১৩৩]
▪️তাছাড়া আমাদের অজানা নয় যে, ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে, শারীরিক এবং আর্থিক সক্ষমতা। এর জন্য প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া ছাড়া নির্দিষ্ট কোন বয়সসীমা নির্ধারণ করা নেই।
সুতরাং প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তির মধ্যে যখনই এই শর্ত পাওয়া পাওয়া যাবে তখনই তার জন্য হজ করা ফরজ। অতএব কোন ব্যক্তির উপরে যদি যৌবন বয়সে হজ ফরজ হয়ে থাকে তাহলে শরিয়ত সম্মত কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে তা বিলম্বিত করে বার্ধক্যের জন্য অপেক্ষা করা হারাম। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনতিবিলম্বে হজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা হতে পারে কোন আর্থিক সংকট, বিশ্ব পরিস্থিতি বা শারীরিক রোগব্যাধি ইত্যাদি কারণে পরবর্তীতে হজ আদায় করা সম্ভব হবে না। যেমন: হাদিসে এসেছে ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«تَعَجَّلُوا إِلَى الْحَجِّ – يَعْنِي : الْفَرِيضَةَ – فَإِنَّ أَحَدَكُمْ لاَ يَدْرِي مَا يَعْرِضُ لَهُ».
“তোমরা কাল বিলম্ব না করে ফরজ হজ আদায় করে নাও। কারণ তোমাদের কেউ জানে না, কী বিপদাপদ বা সমস্যা তার সামনে আসবে।” [সনাদে আহমদ‌ও ইবনে মাজাহ। হাদিসটি হাসান। দ্রষ্টব্য: শায়খ আলবানির ইরওয়াউল গালিল, হা/৯৯০]।
আমাদের শারীরিক এবং আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান যুব সমাজ যদি যৌবন বয়সে আল্লাহর ঘরে এসে হজ আদায় করত এবং হজের শিক্ষাকে তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতো তাহলে আমাদের সমাজ আরো দ্রুত পরিবর্তন হতো। সমাজ থেকে পাপ-পঙ্কিলতা, অন্যায়-অপকর্ম, দুর্নীতি এবং নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমে যেত।

তাই কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আরশের ছায়া তলে আশ্রয় প্রত্যাশী যুবকদের কর্তব্য হলো, যৌবন বয়সকে আল্লাহর ইবাদতে কাটানোর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করা এবং যদি শারীরিক ও আর্থিকভাবে হজ ফরজ হয়ে থাকে তাহলে অনতিবিলম্বে হজ করে ফেলা। এমনকি সম্ভব হলে বিয়ের পূর্বে কিংবা বিয়ের পরে নব দম্পতির সহকারে হজে আসা উচিত। আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate